অনুবাদ : নাহার তৃণা
বাবার আদর্শ এবং সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে বেড়ে ওঠা আমাদেও পেরাল্টা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতো কর্কশ স্বভাব নিয়ে বেড়ে উঠেছিল। তার বাবা মনে করতেন স্কুল-কলেজে গিয়ে লেখাপড়া করার কোনো দরকার নেই। ওসব হলো লুতুপুতু ধরনের ছেলেদের কাজ। তিনি সবসময় বলতেন বড়লোক হবার জন্য বইপত্র জরুরি কোনো বিষয় নয়। শুধুমাত্র বুদ্ধি আর শক্তি থাকলেই জীবনে উন্নতি করা যায়। সে কারণে তিনি সন্তানদের কঠিন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। দুনিয়ার যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য তারা প্রস্তুত।
কিন্তু সম্প্রতি তিনি টের পেতে শুরু করলেন পৃথিবী আর আগের মতো নেই। সবকিছু বদলে যাচ্ছিল এবং পরিবর্তনটা বেশ দ্রুত গতিতেই হচ্ছিল। বুঝতে পারলেন নিজের কাজকারবারগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য তাকে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে। সপাটে চুরি ডাকাতি করে চলার দিন শেষ। সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে ঘুষ আর দুর্নীতির মতো সুক্ষ্ণ ব্যাপারস্যাপার। অতএব তাকে নিজের সহায় সম্পদ টিকিয়ে রাখার খাতিরে আধুনিক যুগের সাথে তাল মেলানোর সিদ্ধান্ত নিতে হলো। সেই সাথে নিজের সুনাম উন্নতির দিকেও মন দিতে হলো।
তাই তিনি একদিন তার পুত্রদের ডেকে কিছু জরুরি নির্দেশ দিলেন। বললেন, সমাজের প্রভাবশালী লোকদের সাথে বন্ধুতা গড়ে তুলে আইন আদালতের মারপ্যাঁচগুলো শিখে নিতে। যাতে তারা সেই সুবিধাদি ব্যবহার করে ভাবমূর্তির কোনো ক্ষতি ছাড়াই নিজেদের আয় রোজগার বাড়াতে পারে। তিনি তাদেরকে আরো উৎসাহিত করলেন যেন তারা প্রাচীন অভিজাত পরিবারের মেয়েদের সাথে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলে। পেরাল্টা পরিবারের বদনাম ঘুচিয়ে অতীতের পঙ্কিল ও রক্তাক্ত অধ্যায়টা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলা দরকার।
ইতোমধ্যে আমাদেও বত্রিশ বছরের পরিণত বয়সে পৌঁছেছিল এবং তার চরিত্রের মধ্যে মেয়েদের ফুসলিয়ে ভোগ করে ছেড়ে দেবার বদভ্যাসটি গভীরভাবে আসন পাতে। বিয়েশাদী করে থিতু হবার বিষয়টা তার একেবারেই পছন্দ নয়। কিন্তু পিতার আদেশ অমান্য করার সাহসও ছিল না। অতএব সে এক ধনী জমিদারকন্যার সাথে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে তুললো যারা ছয় পুরুষ ধরে অভিজাত একটি বাড়িতে বসবাস করছিল।
যদিও জমিদারকন্যা জানতো তার প্রণয়-প্রার্থীর অনেক দুর্নাম আছে তবু মেয়েটি তাকে প্রেমিক হিসেবে মেনে নিয়েছিল। কারণ সে দেখতে তেমন সুন্দরী নয়, তার ভয় ছিল সুপাত্রের সন্ধান পেতে পেতে হয়তো সে বুড়ি হয়ে যাবে। কয়েকদিন পর ওরা মেয়েটির পৈত্রিক বাড়িতেই প্রাচীন পন্থায় দেখাসাক্ষাৎ শুরু করল । আমাদেও মলিন সাদা লিনেনের একটা স্যুটের সাথে পালিশ করা জুতো পরে প্রতিদিন তার বাদত্তার সাথে দেখা করতে যেত তার হবু শাশুড়ির বাজপাখির মতো দৃষ্টির সামনে দিয়ে। মেয়েটি যখন কফি আর পেয়ারার জেলি নিয়ে তার সামনে আসতো তখন আমাদেও ঘন ঘন ঘড়ি দেখে ভাবতো কত তাড়াতাড়ি সেখান থেকে পালানো যায়।
বিয়ের কয়েক সপ্তাহ আগে পেরাল্টাকে ব্যবসায়িক কাজে অন্য এক প্রদেশে যেতে হয়েছিল। তখন সে আগুয়া সান্তা নামে অখ্যাত এক শহরে যাত্রা বিরতি করেছিল। ওরকম ছোটখাট শহরে কেউ রাত্রিযাপন করে না এবং পর্যটকরা তাদের নামও মনে রাখে না। সেদিন দুপুরে সিয়েস্তার সময়ে একটা সরু গলি দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে সে যখন বিশ্রী গরম আর ভ্যাপসা গন্ধকে শাপশাপান্ত করছিল, তখন তার কানে মৃদু একটা মিহি রিনিঝিনি শব্দ ভেসে এলো। যেন পাথরের ওপর দিয়ে একটা স্বচ্ছ জলতরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। শব্দটা আসছিল শহরের রোদ বৃষ্টিতে রঙের চলটা উঠে যাওয়া সাদামাটা বাড়িগুলোর একটি থেকে। বাড়ির নকশাদার ঝাঁজরির মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছিল দুপাশে সাদা রং করা দেয়ালের মাঝ দিয়ে একটা কালো পাথর বিছানো পথ চলে গেছে ভেতরে। সেখানে একটা বারান্দায় পা দুটো ভাঁজ করে বসে থাকা এক তরুণী কোলের ওপর একটা কাঠের সল্টারি (বাদ্যযন্ত্র) রেখে টুং টাং করে বাজাচ্ছে।
সে ওখানে খানিকটা সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে মেয়েটিকে দেখতে লাগলো। তারপর হাতের ইশারায় তাকে ডাক দিলো, ‘এই যে মিষ্টি মেয়ে, এদিকে একটু এসো তো।’
ডাক শুনে মেয়েটি চোখ তুলে তাকালো এবং দূর থেকেও সে কিশোরী মেয়েটির বিস্মিত দৃষ্টি আর অনিশ্চিত হাসি দেখতে পেল। পেরাল্টা খসখসে গলায় প্রায় আকুল হয়েই মেয়েটিকে ডাকলো, ‘এসো না লক্ষ্মী মেয়ে, আমার কাছে এসো।’
মেয়েটি একটু দ্বিধান্বিত ছিল। সে তার বাজনার শেষ অংশ এমনভাবে দীর্ঘায়িত করল যেন সে বাতাসের মধ্যে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে। পেরাল্টা অধীর কণ্ঠে আবারো ডাকতে লাগল।
এবার মেয়েটি উঠে দাঁড়ালো এবং সোজা হেঁটে এলো তার দিকে। পেরাল্টা লোহার গ্রিলের ভেতরে হাত গলিয়ে গেটটা খুলল এবং তার হাত ধরলো। তারপর তার চিরাচরিত মেয়ে পটানো কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করল। সে কসম কেটে বলল- ‘জানো মেয়ে, আমি তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি। সারাজীবন ধরে তোমাকেই খুঁজে যাচ্ছিলাম। তোমাকে আমি জীবনে কোনোদিন ছাড়তে পারবো না। তুমি হলে আমার স্বপ্নের নারী। আমার ভাগ্য তোমার সাথেই লেখা হয়ে গেছে।’
আসলে এতকিছু না বললেও চলত, কারণ মেয়েটি এমনিতেই খুব সোজা সরল। সে পেরাল্টার মধুকণ্ঠ শুনে এতটাই বশীভূত হয়ে পড়েছে যে তার মেয়ে পটানির কথাগুলোর মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করেনি।
মেয়েটির নাম হর্টেনসিয়া। বয়স মাত্র পনের বছর। তার দেহে তখন মাত্র প্রথম যৌবনের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছিল। যদিও সে তখনো বুঝে উঠতে পারছিল না তার ভেতরে তৈরি হওয়া সেই রোমাঞ্চ কিংবা কাঁপুনির নাম কী। পেরাল্টার পক্ষে এরকম একটা সহজ সরল মেয়েকে পটিয়ে ফেলা কোনো ব্যাপার ছিল না। সে মেয়েটিকে গাড়িতে তুলে কাছের জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গেল। তারপর তার কামনা চরিতার্থ করে এক ঘন্টা পর ছেড়ে দিয়ে নিজের পথে চলে গেল। মেয়েটির প্রতি তার মনোযোগ এতই সাময়িক ছিল যে এক সপ্তাহ পর মেয়েটি যখন একশো চল্লিশ মাইল দূরে তার বাড়িতে এসে উপস্থিত হলো তখন আমাদেও প্রথমে তাকে চিনতেই পারল না। পরনে হলুদ সুতির জামা, ক্যানভাসের জুতো পায়ে, বগলে সল্টারিটা নিয়ে প্রবল প্রেমানলে দগ্ধ হয়ে নাছোড়বান্দার মতো মেয়েটি তার বাড়ি খুঁজে বের করেছিল।
সাতচল্লিশ বছর পর যখন হর্টেনসিয়াকে একটা পরিত্যক্ত খনির ভেতরে বন্দি দশা থেকে উদ্ধার করা হয় তখন সারা দেশ থেকে সাংবাদিকরা ছুটে এসেছিল তার ছবি তোলার জন্য। মেয়েটি তখন এমনকি নিজের নামটাও মনে করতে পারছিল না। কীভাবে ওখানে গেল সেটাও মনে নেই তার।
সাংবাদিকরা আমাদেও পেরাল্টাকে জেরা করতে গিয়ে প্রশ্ন করেছিল, ‘কেন আপনি মেয়েটিকে একটা ইতর জন্তুর মতো বন্দি করে রেখেছিলেন?’
পেরাল্টা শান্তভাবে জবাব দিয়েছিলেন, ‘কারণ আমি সেটাই চেয়েছিলাম।’
ততদিনে তার বয়স প্রায় আশি বছর হয়ে গেছে, তবু কথাবার্তা আগের মতোই টনটনে। তিনি বুঝতে পারছিলেন না অতি পুরোনো একটা ব্যাপার নিয়ে এত খিচমিচ করার কী আছে? কারো কাছে কোনো রকম ব্যাখ্যা দিতে তিনি রাজি নন। তিনি একজন কর্তৃত্বপরায়ণ প্রবীণ ব্যক্তি, একজন পিতা এবং পিতামহ। তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস নেই কারো। এমনকি গীর্জার পুরোহিতরা তাকে দেখলে মাথা নুইয়ে সম্মান জানান। এত যুগ পর তিনি তার পিতার সুত্রে পাওয়া সম্পদ কয়েকগুন বাড়িয়ে তুলেছেন। তিনি স্পেনিশ দুর্গের পাশে পরিত্যক্ত সব জমিজমা কিনে নিয়েছেন, তারপর রাজনীতিতে যোগ দিয়ে এলাকার সবচেয়ে প্রতাপশালী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
তিনি সেই জমিদারের কুৎসিত কন্যাটিকে বিয়ে করেছিলেন এবং নয়জন উত্তরাধিকারীর জন্ম দিয়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য নারীর গর্ভে জন্ম নেওয়া বেনামী সন্তানের সংখ্যাও কম নয়, তাদের সবাইকে তিনি চিনতেও পারেন না। চিরাচরিত প্রেম পিরিতির ব্যাপারগুলো কোনো কালেই তার ধাতে ছিল না। শুধু একটা নারীকে তিনি সম্পূর্ণ বর্জন করতে পারেননি, সে হলো হর্টেনসিয়া। মেয়েটি মূর্তিমান দুঃস্বপ্নের মতো তার মগজে সেঁটে ছিল।
সেদিন দীর্ঘ ঘাসের জঙ্গলের ভেতর মেয়েটির সাথে মিলনপর্ব সেরে সে বাড়ি ফিরে এসেছিল। তারপর নিজের বৈষয়িক কাজকর্ম এবং বাগদত্তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। হর্টেনসিয়াই তাকে পাগলের মতো খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছিল। মেয়েটি নিজ থেকে তার গলায় ঝুলে পড়েছিল। একজন ক্রীতদাসের মতো নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করেছিল যেন বোতলবন্দি একটা মাছ। আমাদেও বিরক্ত হয়ে ভাবছিল, আমি যখন সব গুছিয়ে বিয়ে করার জন্য তৈরি হচ্ছি অমনি এই বেকুব মেয়েটা আমার দরজায় এসে উপস্থিত। এটা ভেবে সে প্রথমে তাকে ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু যখন সে মেয়েটির হলুদিয়া পোশাক আর অপূর্ব চোখ জোড়া দেখলো তখন তার মত বদলে গেল। সে ভাবলো এই সুযোগ কাজে না লাগানোটা বোকামি হবে। তখনই সে মেয়েটিকে লুকিয়ে রাখার একটা উপায় খুঁজে বের করল।
আর সেভাবেই নিতান্ত অবহেলার সাথে হর্টেনসিয়ার ঠাঁই হলো পেরাল্টা পরিবারের মালিকানাধীন একটা পরিত্যক্ত চিনিকলের ভূগর্ভস্থ কক্ষে, যেখানে তাকে গোটা জীবন কাটিয়ে দিতে হবে। ওটা ছিল বড়সড় স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ঘর, শুকনো মৌসুমে রাতের বেলা প্রচণ্ড ঠান্ডা থাকে। ঘরের মধ্যে তেমন কোনো মালামাল ছিল না। কিছু খুচরো আসবাবপত্র, একটা খড়ের তৈরি ম্যাট্রেস বাদে আর কিছু না। আমাদেও পেরাল্টা মেয়েটিকে একটু ভালো রাখার জন্য কখনো কোনো চেষ্টা করেনি। যদিও সে মাঝে মাঝে কল্পনা করত প্রাচ্য দেশীয় কায়দায় তাকে রক্ষিতার মতো সাজিয়ে রাখবে। তার ভাবতে ভালো লাগতো একটা ময়ূরের পালক দিয়ে ঘেরা দামি ব্রোকেড সিলিং দেওয়া তাঁবুর ভেতর মেয়েটা কাচের প্রদীপে আলোকিত ঘরে চকচকে পোশাক পরে বসে আছে। পুরু গালিচা বিছানো ঘরের ভেতর কারুকার্যময় সোনার আসবাবপত্রে ভরপুর, যেখানে সে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে।
সে ওরকম কিছুর ব্যবস্থা করত যদি হর্টেনসিয়া তাকে প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিতো। কিন্তু মেয়েটা ছিল সেই বুনো গুয়াচারোস পাখির মতো যারা গুহার অন্ধকারে বসবাস করতে পছন্দ করে। তার শুধু সামান্য খাবার আর একটু পানি হলেই চলত। হলুদ রঙের পোশাকটা মলিন হতে হতে ছিঁড়ে যাবার পর থেকে সে নগ্ন হয়েই থাকতো।
যখন প্রতিবেশীরা তাকে সেই অন্ধকার গুহা থেকে উদ্ধার করে তখনও মেয়েটি বারবার বলছিল, ‘সে আমাকে ভালোবাসে, সে সবসময় আমাকে ভালোবেসে এসেছে।’
বহুবছর ধরে নির্জন কক্ষে নৈঃশব্দ্যের মধ্যে বন্দি জীবন কাটানোর পর সে শব্দের ব্যবহার ভুলে গেছে। তার কণ্ঠ চিরে যে শব্দ বের হচ্ছিল সেটা শুনলে মনে হয় যেন মৃত্যুশয্যায় শুয়ে কেউ কথা বলছে।
সেই ভূগর্ভস্থ কক্ষটিতে আমাদেও পেরাল্টা মেয়েটার সাথে কয়েক সপ্তাহ বেশ লম্বা সময় কাটিয়েছিল। তখন সে ইচ্ছে মতো তার অতৃপ্ত ইন্দ্রিয় ক্ষুধা মিটিয়েছিল। মেয়েটাকে যেন আর কেউ খুঁজে না পায়, এটা নিয়ে সে সবসময় সতর্ক থাকতো। এমনকি সেনিজেকেও পুরোপুরি বিশ্বাস করত না। তাই দিনের আলোয় তাকে কখনো বের হতে দিতো না। ছোট একটা ফোকর দিয়ে সামান্য রোদের আলো কোনোমতে প্রবেশ করত সেখানে। সেই আধো আলো আঁধারিতে দুজনে পাগলের মতো মিলিত হতো। তাদের চামড়া পুড়তে থাকতো কামনার আগুনে। তাদের হৃদয় ক্ষুধার্ত কাকড়ার মতো পরস্পরকে আঁকড়ে ধরার জন্য অস্থির হয়ে থাকতো। সেই বদ্ধ গুহার ভেতর সব ধরনের গন্ধ এবং স্বাদ বেড়ে গিয়ে চরম অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। প্রচণ্ড আদর সোহাগের প্রাবল্যের সময়টাতে দুজন দুজনের অস্তিত্বের ভেতরে এমনভাবে একাত্ম হয়ে পড়তো যেন ওরা পরস্পরের সবগুলো গোপন আকাঙ্ক্ষার মধ্যে হারিয়ে গেছে। তাদের কণ্ঠস্বর, চুম্বন, শীৎকারধ্বনি চারপাশের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আরো জোরালোভাবে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসতো। সেই কক্ষটি অ্যামনিওটিক তরল ভরতি একটি সিল করা ফ্লাস্কে পরিণত হয়েছিল যেন ফুলে ফেঁপে বড় হয়ে যাওয়া একজোড়া যমজ ভ্রণ পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে সাঁতার কেটে চলেছে। দিনের পর দিন তারা এক অনিঃশেষ কামকাতর অবস্থায় পতিত হয়ে নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছিল, যাকে তারা প্রেম বলে ভুল করেছিল।
মিলনপর্ব সেরে হর্টেনসিয়া যখন ঘুমিয়ে পড়তো, তখন তার প্রেমিক খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে যেত। মেয়েটি জেগে ওঠার আগেই নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে আসতো আদরের চক্রটি পুনরায় শুরু করার জন্য। একের পর এক জলন্ত মশালের মতো পরস্পরকে গ্রাস করে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছিল যে সেই কামনার আগুনে পুড়ে মরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের ভালোবেসে যেতে হবে।
কিন্তু সবকিছুরই একটা শেষ আছে। এরকম ব্যাপার চিরকাল চলতে পারে না। ফলাফল কী হবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। শেষমেষ হয়েছেও তাই। পেরাল্টার মধ্যে মহত্বের ছিঁটেফোঁটাও ছিল না। এক মাস পার হবার আগেই সে সম্পর্কটা নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। একই খেলার পুনরাবৃত্তি দেখতে দেখতে সে বিরক্ত হতে শুরু করেছিল। ওই ঘুপচি অন্ধকার ঘরের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় তার শরীরের অন্ধিসন্ধিগুলো ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে পড়েছিল। কিছুদিন পার হবার পর সে ওই গুহার দেয়ালের বাইরের জিনিসগুলোর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করল। বাইরের খোলামেলা প্রাণবন্ত জগতে ফিরে আসার তাগিদে, দুনিয়াদারীর কাজকর্মের ওপর ছড়ি ঘোরানোর জন্য ওই গুহার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলো।
চলে আসার সময় সে অবশ্য জানিয়েছিল, ‘তুমি কিন্তু আমার জন্য সবসময় অপেক্ষা করবে এখানে। আমি বাইরে গিয়ে খুব বড়লোক হয়ে ফিরে আসবো। তোমার জন্য অনেক দামি উপহার জামাকাপড় আনবো। রাজরাণীরা যেসব জিনিস পরে, তেমন মূল্যবান পোশাক আর অলংকার নিয়ে আসবো।’
হর্টেনসিয়া আকুতি জানিয়েছিল, ‘আমি একটা বাচ্চার মা হতে চাই।’
পেরাল্টা সে কথা উড়িয়ে দিয়েছিল, ‘বাচ্চা? নাহ বাচ্চাকাচ্চার দরকার নাই। আমি তোমার জন্য পুতুল নিয়ে আসবো।’
পরের মাসগুলোতে পেরাল্টা তার প্রতিশ্রুত জামাকাপড়, গহনা এবং পুতুল কোনো কিছুর কথাই মনে রাখেনি। মাঝে মাঝে হর্টেনসিয়ার কথা মনে পড়লে তাকে দেখতে যেত শুধু। সবসময় প্রেম করার জন্য যেত না, কখনো কখনো কেবল সল্টারিতে কিছু পুরানো সুর শোনার জন্য যেত। মেয়েটি যখন বাদ্যযন্ত্রটার ওপর কাত হয়ে তারের ওপর হাত বোলাতো তখন সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে তার এত তাড়া থাকতো যে সে ঠিকমত কথাও বলতে পারত না। সে তার জলের পাত্রগুলো ভরে দিতো। তার জন্য খাবার ভরতি একটা বস্তা রেখে চলে যেত।
একবার দীর্ঘ নয় দিন বেমালুম মেয়েটির কথা ভুলে বসেছিল। পরে যখন মনে পড়ল তখন গিয়ে তাকে প্রায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দেখতে পেয়েছিল। তারপর সে বুঝতে পারল বন্দিকে দেখাশোনা করার জন্য একটা লোক রাখা দরকার। কারণ পরিবার, ভ্রমণ, ব্যবসা এবং সামাজিক ব্যস্ততার মধ্যেই তার সবটুকু সময় চলে যেত ।
মেয়েটিকে দেখাশোনা করার জন্য মুখ বন্ধ রাখবে তেমন একজন নেটিভ ইন্ডিয়ানকে বেছে নিল। সেই মহিলার কাছে ঘরের চাবি থাকতো, সে নিয়মিতভাবে ঘরটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দিতো। হর্টেনসিয়ার শরীরে জমতে থাকা প্রায় অদৃশ্য ছত্রাকের মতো ময়লাগুলো পরিষ্কার করে দিতো।
সেই ইন্ডিয়ান মহিলাকেও গ্রেফতার করা হলো কিডন্যাপের সাথে জড়িত থাকার দায়ে । তখন তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ‘আপনার কখনো খারাপ লাগতো না বেচারি মেয়েটির জন্য?’
মহিলা প্রথমে কোনো জবাব দেয়নি। নির্বিকার চোখে সোজা তাকিয়ে থাকল এবং তামাকভরতি একদলা থুতু ফেলল।
তারপর যা বলল তার সারমর্ম হলো- সে মেয়েটার জন্য কোনোরকম করুণা বোধ করেনি। সে বিশ্বাস করত ওই মেয়ের কপালে ক্রীতদাসত্বের ছাপ মারা ছিল এবং সে তার দাসত্বের জীবন নিয়েই সুখী ছিল। অথবা সে একটা নিরেট গর্দভ হয়ে জন্ম নিয়েছিল। এরকম গাধারা রাস্তা ঘাটে সবার ঠাট্টা তামাশার শিকার হয়। উপহাসের পাত্র হওয়ার চেয়ে তালাবদ্ধ হয়ে ঘরে বন্দি থাকাটাই শ্রেয়। হর্টেনসিয়াকে যে লোকটা বন্দি করে রেখেছিল তার বিরুদ্ধে সে কখনো প্রতিবাদ করেনি। সে ওখান থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেনি, বাইরের জগৎ নিয়ে তার কোনো কৌতূহল ছিল না। কখনো কোনো বিষয়ে অভিযোগ করেনি। এমনকি বুকভরে তাজা বাতাসে নিঃশ্বাস নেবার জন্য সে কখনো বাইরেও যেতে চায়নি। সে তার বন্দি জীবন নিয়ে কখনো একঘেঁয়ে বোধ করেছে বলে মনে হয়নি।
হয়তো শৈশবের কোনো এক মুহূর্তে হর্টেনসিয়ার মনটা আটকে গিয়েছিল এবং সেই নিঃসীম নিঃসঙ্গতা তাকে কোনোভাবেই বিচলিত করেনি। প্রকৃতপক্ষে, সে ভূগর্ভস্থ অন্ধকার জগতের একটা প্রাণীতে পরিণত হয়েছিল। সেই ভূগর্ভস্থ সমাধিতে তার সমস্ত ইন্দ্রিয় তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিল এবং সে অন্ধকারেও দেখতে শিখে গিয়েছিল। তাকে সার্বক্ষণিকভাবে ঘিরে রেখেছিল একধরনের মায়া বিভ্রমের দেয়াল, যেখানে অদৃশ্য প্রেতাত্মারা তাকে ভিন্ন জগতের কাছে নিয়ে যেত। সে অন্ধকার ঘুপচি ঘরের কোণে বাস করলেও তার দেহটাকে সেখানে আটকে রেখে ক্ষুদে পরমাণুর মতো নিজেকে নক্ষত্র ভরা সুদূর মহাকাশে ছড়িয়ে দিতে পারতো।
যদি তার কাছে একটি আয়না থাকত, তাহলে সে তার নিজের চেহারা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। যেহেতু সে নিজেকে দেখতে পেত না, তাই সে তার নিজের দুর্দশা বুঝতে পারতো না। তার চামড়া থেকে অঙ্কুরিত হওয়া আঁশ, তার লম্বা, জট পাকানো চুলের মধ্যে যে রেশম পোকাগুলো বাসা বেঁধেছিল কিংবা অন্ধকার ছায়ার মধ্যে থাকতে থাকতে তার চোখের মধ্যে সীসা রঙের মেঘের সৃষ্টি হয়েছিল, এসব কিছুই সে জানতো না। সে টের পায়নি তার শ্রবণশক্তি কতটা বেড়ে গেছে। অনেক দূর থেকে ভেসে আসা স্কুল ছুটি হওয়া বাচ্চাদের হাসি, আইসক্রিম বিক্রেতার ঘণ্টা, উড়ন্ত পাখি বা নদীর কলরবের মতো বাহ্যিক শব্দগুলো, এমনকি সবচেয়ে ক্ষীণ এবং সবচেয়ে দূরের শব্দগুলোও তার কানে ভেসে আসতো। সে বুঝতেও পারেনি যে তার একসময়ের সুন্দর এবং দৃঢ় পা দুটো সীমিত জায়গায় চলাফেরা করতে করতে এমন দুর্বল হয়ে পড়েছে যে সেগুলো এখন কেবল হামাগুড়ি দিতে পারে। কিংবা তার পায়ের নখগুলো বড় হতে হতে বুনো জন্তুর খুরের মতো কুঁচকে গিয়েছিল। তার হাড়গুলো চিকন হতে হতে কাঁচের টিউবের মতো ভঙ্গুর হয়ে গিয়েছিল, তার পেটটা লেপটে গিয়েছিল পিঠের সাথে। বাঁকা হয়ে চলাফেরা করতে করতে তার পিঠে একটি কুঁজ তৈরি হয়েছিল।
কেবল তার হাত দুটোর আকার-আকৃতি অবিকৃত রয়ে গিয়েছিল। হাত দুটো সবসময় সল্টারিটা আকড়ে ধরে রাখতো। যদিও তার আঙ্গুলগুলো একসময় যে সুর জানত তা ভুলে গিয়েছিল এবং এখন সেই সুরগুলো তার বুকের ভেতরে আটকে পড়া নিঃশব্দ কান্নার সুর হয়ে বেরিয়ে আসে।
দূর থেকে হর্টেনসিয়াকে দেখতে সার্কাসের একটা হতভাগ্য বানরের মতো লাগে। কাছ থেকে দেখলে তার প্রতি এক সীমাহীন করুণা জাগে। তার ভেতরে যে মারাত্মক রূপান্তরগুলো ঘটে যাচ্ছিল সে সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ ছিল সে। তার স্মৃতিতে নিজের যে চেহারাটা প্রোথিত হয়ে আছে সেটা অল্প বয়সের এক কিশোরীর। আমাদেও যেদিন গাড়িতে করে তাকে এই বদ্ধ ঘরে নিয়ে এসেছিল, সেদিন গাড়ির আয়নার মধ্যে শেষবারের মতো সেই চেহারাটা দেখেছিল। সে ভাবতো তার চেহারা এখনো সেরকম রয়ে গেছে। সে বিশ্বাস করত তার সৌন্দর্য আগের মতোই আছে এবং তার আচার আচরণ ছিল সেরকমই। নিজের সৌন্দর্যের স্মৃতিকে সে তার ভেতরে গভীরভাবে আঁকড়ে রেখেছিল। কেউ যদি তার খুব কাছাকাছি যেত, তবেই প্রাগৈতিহাসিক বামনের চেহারার অন্তরালে সেই রূপটা দেখতে পেত।
অন্যদিকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদেও পেরাল্টা তার ধন সম্পদের পরিমাণ ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছিলেন। সবাই তাকে ভয় করত। পুরো এলাকা জুড়ে শক্তির জাল বিস্তার করেছিলেন তিনি। প্রতি রবিবারে তিনি একটি লম্বা টেবিলের মাথায় বসে থাকতেন যেখানে তার ছেলেমেয়ে, ভাইপো, বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীরা থাকত। সেই সাথে রাজনীতিবিদ ও সেনাপতিদের মতো ক্ষমতাবান অতিথিরাও হাজির হতেন। তাদের সঙ্গে তিনি সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতেন, সেই সাথে এটাও বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করতেন এখানকার আসল প্রভু কে?
কিন্তু আড়ালে বসে তার শত্রুরা ঠিকই সমালোচনা করত, কত মানুষকে তিনি খুন করেছেন, কত মানুষকে তিনি গুম করে ফেলেছেন, সেসব নিয়ে কানাঘুষা চলত। নিজের কুকীর্তি গোপন রাখার জন্য কর্তৃপক্ষকে তিনি কত টাকা ঘুষ দিয়েছেন সেসব নিয়ে ফিসফাস হতো। তিনি চোরাচালান থেকে তার অর্ধেক সম্পদ অর্জন করেছিলেন। কিন্তু কেউ তার অপরাধের প্রমাণ চাইতে সাহস করত না। এমন একটা গুজবও ছড়িয়েছিল যে পেরাল্টা একটা মেয়েকে ভূগর্ভস্থ কোনো একটা কক্ষে বন্দি করে রেখেছেন। তার অন্ধকার জগৎ সম্পর্কে লোকের যে ধারণা ছিল বহুবার সেটার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। বলতে গেলে অনেকেই জানতো ব্যাপারটা। ওটা একটা ওপেন সিক্রেটের মতো ছিল, তবু কেউ কিছু করার সাহস পায়নি।
সেদিন খুব গরম পড়েছিল। বিকেলের দিকে তিনটি কিশোর স্কুল থেকে ফেরার পথে নদীতে সাঁতার কাটার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। তারা কয়েক ঘন্টা ধরে নদী তীরে কাদাপানি ছোঁড়াছুঁড়ি করছিল। খেলাধূলার ফাঁকে ফাঁকে ছেলেগুলো পেরাল্টাদের পরিত্যক্ত চিনিকলের দিকেও ছুটে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে। চিনিকলটি ওই এলাকায় ভূতের বাড়ি হিসেবে কুখ্যাত ছিল। লোকেরা বলাবলি করত সেখান থেকে মাঝে মাঝে শয়তানের আওয়াজ ভেসে আসে। কেউ কেউ দেখেছে সেখানে এক ডাইনি বুড়ি মৃত দাসদের আত্মাকে আহবান করছে।
কিশোরের দলটা চিনিকলের ধ্বংসাবশেষের ভেতরে প্রবেশ করার মতো যথেষ্ট সাহস অর্জন করল। তারা রোমাঞ্চের উত্তেজনা নিয়ে চিনিকলটির ভেতরে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিল। ভেতরে ঢুকে তারা পুরু দেয়াল এবং উইপোকায় খাওয়া বীমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বড় ঘরগুলোর মধ্য দিয়ে ছোটাছুটি করছিল। মেঝে থেকে বেড়ে ওঠা আগাছা, আবর্জনা এবং কুকুরের বিষ্ঠা, পচা ছাদের টাইলস এবং সাপের বাসার ভেতর দিয়ে পথ করে নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছিল। সেসময় ছেলেরা পরস্পরকে সাহস দেবার জন্য একে অন্যের সাথে হাসি ঠাট্টা রসিকতা করছিল। উচ্চস্বরে কথা বলছিল নিজেদের মধ্যে। তারপর তারা বিশাল ছাদবিহীন একটা ঘরে ঢুকে পড়ল। সেই ঘরে ধ্বংসপ্রাপ্ত চিনির কলগুলো ছিল। বৃষ্টি এবং সূর্যের আলো মিলেমিশে সেখানে একটি অপার্থিব চেহারার বাগান তৈরি করেছিল। ছেলেগুলো সেখানে দাঁড়িয়ে চিনি এবং ঘাম মিশ্রিত একটা প্রাচীন ভ্যাপসা গন্ধ পেল।
ছেলেরা যখন আরেকটু সাহসী হয়ে উঠল, ঠিক তখন ঘণ্টাধ্বনির মতো পরিষ্কার, একটি দানবীয় সঙ্গীতের সুর শুনতে পেল। শোনার সাথে সাথে তাদের সবাই ভয়ে কুঁকড়ে গেল। কাঁপতে কাঁপতে তারা পিছু হটতে থাকে। সেই সাথে ভয়টাকে জয় করার একটা প্রলোভনও তাদের ভেতরে কাজ করছিল। সঙ্গীতের শেষ সুরটি যখন তাদের মাথার ভেতরে ঢুকে গেল তখন ধীরে ধীরে তাদের প্রাথমিক ভয়টা কাটতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর তাদের ভয়ডর উবে গেল। তখন তারা সেই অদ্ভুত সঙ্গীতের উৎস খুঁজতে তৎপর হলো। তাদের আগে শোনা যে কোনো সঙ্গীত থেকে ওই শব্দটা ছিল একেবারে আলাদা। তারা মেঝেতে একটি ছোট ফাঁদের মতো দরজা আবিষ্কার করল। দরজাটা একটি তালা দিয়ে আটকানো। তালাটা খুলতে না পেরে কাঠের তক্তাগুলোর ওপর দুমদাম লাথি মারার পর দরজাটা একটু ভেঙে ফাঁক হলো। সেই ফাঁক দিয়ে একটা অবর্ণনীয় বিকট দুর্গন্ধ এসে তাদের নাকে-মুখে আঘাত করল। গন্ধটা তাদেরকে একটি খাঁচায় বন্দি থাকা পশুর কথা মনে করিয়ে দিলো। তারা গলা তুলে ডাকলো, কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। সেই সময় হঠাৎ করে ঘরের উল্টোদিক থেকে একটি কর্কশ কণ্ঠস্বর শুনতে পেল ওরা। শব্দটা শুনে ছেলেগুলো এমন ভয় পেয়ে গেল যে তিনজনই সেখান থেকে এক দৌড়ে বেরিয়ে এলো। তারপর ছুটতে ছুটতে বাড়িতে গিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি সহকারে সবাইকে ডেকে জানালো, পুরোনো চিনিকলের মধ্যে তারা একটা নরকের দরজা আবিষ্কার করেছে।
বাচ্চাদের সেই হৈ হুল্লোড়ে আশপাশের সবাই ঘটনাটা জেনে যায়। প্রতিবেশীরা টের পেল তারা কয়েক দশক ধরে যা সন্দেহ করেছিল সেটাই ফলেছে। প্রথমে সেই কিশোরের মায়েরা দলবল নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ভাঙা দরজার ফাটলের মধ্যে দিয়ে তাকানোর চেষ্টা করল। তারাও সল্টারির বাজনাটা শুনতে পাচ্ছিল। এটা সেই বাজনা যা শুনে বহুকাল আগে আমাদেও পেরাল্টা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল আগুয়া সান্তার ছোট্ট গলিটাতে।
খবর পেয়ে পুলিশ এবং দমকলকর্মীরা এসে উপস্থিত হলো। তারা দরজা ভেঙে আলো জ্বালিয়ে নানা সরঞ্জাম সাথে নিয়ে গর্তের ভেতর নেমে গেল। গুহার ভেতর তারা একটি নগ্ন প্রাণীকে দেখতে পেল যার গায়ের ফ্যাকাসে চামড়ার ভাঁজগুলো ঝুলছিল। তার মাথা থেকে নেমে আসা ধূসর চুলের জট মেঝে পর্যন্ত ছড়ানো ছিল। এত হৈ চৈ কোলাহলে আতঙ্কিত হয়ে আর্তনাদ করে উঠল সেই প্রাণী।
প্রাণীটা হলো হর্টেনসিয়া।
মেয়েটি অগ্নিনির্বাপকদের লণ্ঠনগুলোর স্থির রশ্মির নিচে ফসফরাসের উজ্জ্বলতা নিয়ে ঝিনুকের ভেতরে থাকা মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছিল। সে প্রায় দৃষ্টিহীন হয়ে গিয়েছিল, তার দাঁত পড়ে গিয়েছিল। পা দুটো এত দুর্বল হয়ে গিয়েছিল যে দাঁড়িয়ে থাকতেও কষ্ট হচ্ছিল তার। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার একমাত্র চিহ্ন ছিল তার বুকের সাথে আটকে থাকা প্রাচীন সল্টারিটা।
খবরটা সারা দেশে খুব উত্তেজনার সৃষ্টি করল। টেলিভিশনের পর্দায় এবং সংবাদপত্রগুলোতে সেই গুহা থেকে উদ্ধার হওয়া মহিলার ছবি প্রদর্শিত হচ্ছিল। যেখানে সে তার গোটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছে প্রায় নগ্ন অবস্থায়। কেউ একজন তার কাঁধের ওপর এক টুকরো কাপড় ছুঁড়ে দিয়েছিল। প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে তার বন্দিত্ব নিয়ে উদাসীন থাকা লোকেরা মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাকে রক্ষা করার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠল। জনতার আবেগ রূপান্তরিত হয়েছিল প্রতিশোধের আগুনে। সেই আগুনে জ্বলে উঠে প্রতিবেশীরা আমাদেও পেরাল্টাকে ধরার জন্য তার বাড়িতে ঢুকে পড়ল। তাকে বাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনল।
সময়মতো পুলিশ এসে হাজির না হলে সবাই মিলে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ টেনে ছিঁড়েই ফেলতো। এত বছর ধরে হর্টেনসিয়াকে উপেক্ষা করার জন্য জনতার ভেতরে জেগে ওঠা অপরাধবোধকে প্রশমিত করার জন্য তারা আমাদেও পেরাল্টার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সবাই হর্টেনসিয়ার জন্য কিছু করতে চাইছিল। তাকে পেনশন দেবার জন্য টাকাপয়সা জোগাড় করতে শুরু করল। এত বিপুল পরিমান পোশাক আর ওষুধ সংগ্রহ হলো যেটা তার প্রয়োজনের বহুগুন বেশি। কয়েকটি সেবা সংস্থা তার শরীর থেকে ময়লা পরিষ্কার করে চুল কেটে এবং মাথা থেকে পা পর্যন্ত সাজিয়ে দেবার কাজ নিল। চুলটুল কেটে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার পর তাকে একজন সাধারণ বয়স্ক ভদ্রমহিলার মতো দেখাচ্ছিল। সন্ন্যাসিনীরা তাকে দরিদ্রদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে বিছানাপত্রের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তবু সে কয়েক মাস ধরে সেই অন্ধকূপে ফিরে যেতে চাইছিল বারবার। সেখানে যাওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য তাকে রীতিমত বেঁধে রাখতে হয়েছিল। অবশেষে সে দিনের আলোতে অভ্যস্ত হয়ে উঠল এবং অন্য মানুষের সাথে বসবাস করতে রাজি হলো।
সংবাদপত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সাধারণ মানুষের ক্ষোভের সুযোগে আমাদেও পেরাল্টার অসংখ্য শত্রু অবশেষে তার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেবার সাহস পেল। যে কর্তৃপক্ষ বছরের পর বছর ধরে তার ক্ষমতার অপব্যবহার উপেক্ষা করেছিল, এখন তারাই আইনের পূর্ণ শক্তি নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার মতো প্রভাবশালী একজনের কারাবন্দি হবার গল্পটি বেশ কিছুকাল সবার মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। তবে বিচারপর্ব শেষ হবার পর তার সাজা হয়ে গেলে উত্তেজনা থিতু হয়ে যায়। তার জেলবাস শুরু হবার পর সেই উত্তেজনার অবসান ঘটে পুরোপুরি। পরিবার ও বন্ধুদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হবার পর তিনি সবার চোখে ঘৃণার প্রতীক হয়ে গিয়েছিলেন। কারারক্ষীদের কাছ থেকেও তিনি হয়রানির সম্মুখীন হয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যকে সঙ্গী করে আমাদেও পেরাল্টা তার জীবনের বাকি দিনগুলো কারাগারে কাটিয়েছিলেন। তিনি নিজের কক্ষ থেকে কখনো বের হতেন না, অন্য বন্দিদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন না। নিজের কারাকক্ষ থেকেই তিনি বাইরের রাস্তার শব্দ শুনতে পেতেন।
সেই সময় কারাগারের বাইরে আরেকটি নিয়মিত দৃশ্য দেখা যেত। প্রতিদিন সকাল দশটায় অপ্রকৃস্হ চেহারার হর্টেনসিয়া এলোমেলো পায়ে কারাগারের দিকে চলে আসতো। সেখানে গেটে পাহারায় থাকা গার্ডের হাতে গরম খাবার ভরতি একটা সসপ্যান দিতো। ভেতরে থাকতো একজন বন্দির জন্য খাবার। অনেকটা ক্ষমাপ্রার্থনার সুরে সে গার্ডকে বলতো ‘সে আমাকে প্রায় কখনোই ক্ষুধার্ত রাখেনি।’
তারপর সে তার সল্টারিটা নিয়ে রাস্তায় বসে যেত। ওটার সাথে তার অসম কুস্তাকুস্তি থেকে এমন যন্ত্রণাদায়ক আর্তনাদ বের হতো যা পথচারীদের কানের জন্য পীড়াদায়ক ছিল। পথচারীরা তাকে এই কাজ থেকে নিবৃত্ত রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে টাকাপয়সাও খয়রাত করত।
দেয়ালের উল্টোদিকে কারাগারের ভেতরে কুঁকড়ে পড়ে থাকা আমাদেও পেরাল্টা সেই বাজনার শব্দগুলো শুনতে পেতেন। তার মনে হতো পৃথিবীর অতল থেকে শব্দটা বেরিয়ে এসে তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এটা তার জন্য এক ধরনের শাস্তির মতো ছিল। তিনি ভাবতেন প্রতিদিনের এই শাস্তির কোনো একটা অর্থ নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেটা কি তিনি তা মনে করতে পারতেন না। মাঝে মাঝে একটা অপরাধবোধের ছুরিকাঘাত তার বুকের ভেতর ঘা দিয়ে যেত, কিন্তু কিসের অপরাধ সেটা তিনি বুঝতে ব্যর্থ হতেন। স্মৃতির অতল থেকে কোনো কিছু উদ্ধার করতে পারতেন না। অতীতের চিত্রগুলো মাঝে মাঝে ভেসে উঠে আবারো ঘন কুয়াশায় বাষ্পীভূত হয়ে যেত। তিনি জানতেন না কেন তিনি সেই বদ্ধ সমাধির ভেতরে আটকে আছেন। ধীরে ধীরে তিনি আলোর জগতের কথা ভুলে গেলেন এবং ক্রমশ নিজের দুর্ভাগ্যের অতলে নিজেকে হারিয়ে ফেললেন।
..................................
মূল গল্প : IF YOU TOUCHED MY HEART.
স্প্যানিশ থেকে ইংরেজি অনুবাদ করেছেন : Margaret Sayers Peden
লেখক পরিচিতি : বর্তমান বিশ্বসাহিত্যে ইসাবেল আয়েন্দে একজন সুখ্যাতিপ্রাপ্ত লেখক। চিলিয়ান-আমেরিকান এই লেখকের জন্ম পেরুর লিমা শহরে, ২ আগস্ট, ১৮৪২ সালে। তিনি চিলির খ্যাতিমান রাজনৈতিক এবং সাংবাদিক পরিবারের সদস্য। ১৯৭৩-এ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় চিলির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দ নিহত হন। সেসময় ইসাবেল একজন সংবাদিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁকে ভেনেজুয়েলায় পালিয়ে যেতে হয়, ফলে তাঁর সংবাদিকতায় ইতি ঘটে। নির্বাসনে থাকার সময়ই তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত। ১৯৮২ সালে ইসাবেলের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য হাউজ অফ দ্য স্পিরিটস’ প্রকাশিত হয়, যা ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক সুখ্যাতি লাভ করে।
দীর্ঘ সময় ধরে ইসাবেল আয়েন্দে লিখে চলেছেন। তাঁর অধিকাংশ রচনা বেস্টসেলারের তালিকায় সমহিমায় স্হান করে নেয়। বলাইবাহুল্য, তিনি জীবিত লেখকদের মধ্যে সবচে’ প্রশংসিত, পঠিতদের একজন। তাঁর বই পঁয়ত্রিশের অধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং সত্তর লক্ষের বেশি বিক্রি হয়েছে। তাঁর বহুল প্রচারিত “দ্য হাউজ অফ দ্য স্পিরিটস” সহ অন্যান্য প্রশংসিত বইগুলো হচ্ছে “সিটি অফ দ্য বিস্টস”, “ইভা লুনা”, “ডটার অফ ফরচুন”, “পোর্ট্রেট অফ সোফিয়া”, “পলা”,”মায়াস নোটবুক”, “অ্যা লং প্যাটাল অফ দ্য সী” ইত্যাদি। ২০২৩ সালের জুন মাসে প্রকাশিত উপন্যাস’ দ্য উইন্ড নোজ মাই নেইম’ বইটিও পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। তাঁর লেখায় উঠে আসে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, অভিবাসনের বেড়াজ্বালে আটকে যাওয়া জীবনের মর্মন্তুদ বয়ান এবং নারী জীবনের সংগ্রাম ও তার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের আন্তরিকতা দেখা যায়। রচিত কাহিনিগুলোতে ইসাবেলের সিগনেচার শৈলী এবং জাদুবাস্তবতার উপস্হিতি লক্ষণীয়।


0 মন্তব্যসমূহ