অনুবাদ : জয়া চৌধুরী
সে রিম্বাউদ ছিল না, স্রেফ একটা ইন্ডিয়ান উপজাতির বাচ্চা ছিল।
[আর্থার রিম্বাউদ : ফরাসী কবি, সুররিয়ালিজমের উজ্জ্বল নক্ষত্র, আধুনিক প্রজন্মের কবিদের ওপরে দারুণ প্রভাব ফেলেছিলেন।]
১৯৮৬ সালে ওকে প্রথম দেখি আমি। সে বছরেই ওরা যাতে গল্পে চলে না আসে কিংবা এখন যেটা আমার একেবারে বস্তা পচা লাগে সে উদ্দেশ্যে কদিনের জন্য ইরাপুয়াতোয় ছিলাম। ইরাপুয়াতো হল স্ট্রবেরি ফলের রাজধানী । সেখানে আমার এক দাঁতের ডাক্তার বন্ধুর বাড়িতে ছিলাম যে তখন খুব খারাপ সময়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। বাস্তবে খারাপ কাটছিল যার সে হল এ শর্মার (আমার আপাত দীর্ঘ সম্পর্কটা তখন হঠাত করে সদ্য ভেঙে ফেলবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আমার প্রেমিকা)। কিন্তু ইরাপুয়াতোয় যখন এসে পৌঁছলাম যেখানে আমার ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবতে যথেষ্ট অবসর পাব আর নিজেকে শান্ত করতেও পারব বলে ধারণা ছিল আমার, সেখানে সদা বিচক্ষণ, দায়িত্ববান, দাঁতের ডাক্তার বন্ধুকে হতাশার শেষ সীমায় দাঁড়ানো অবস্থায় তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আমার।
পৌঁছনোর দশ মিনিট বাদে সে এল এবং এসেই বলল যে সে একজন রোগীকে মেরে ফেলেছে। যেহেতু আমার মাথায় ঢোকে নি যে কিভাবে একজন দাঁতের ডাক্তার কোন রোগীকে কিভাবে মারতে পারে আমি ওকে শান্ত হতে বললাম। পুরো কাহিনি বলতে বললাম আমায়। সেটা সাধারণ ঘটনা ছিল। মানে যতদূর সাধারণ হওয়া যায় ততখানি সাধারণই ছিল সেটা।
এ ধরণের গল্পগুলো থেকে, বলা ভাল বর্ণনা থেকে কাহিনীর সুতো খুলতে খুলতে আমার বন্ধুটি স্থির করেছে যে তাকে কোন মানুষ খুন করার দায়ে আঙুল তোলা যায়। উল্টো দিকে গল্পটা আমার যেমন মনে হল, বেশ অদ্ভুত। আমার বন্ধু একটা ক্লিনিকে দাঁতের ডাক্তারির কাজ করা ছাড়াও এমন কিছু করত যা থেকে তার ভালই মালকড়ি আসত। গরীব আর অভাবী লোকেদের জন্য তৈরী একটা ঐ রকমই মেডিক্যাল কোঅপারেটিভে কাজ করত ওভারটাইম। কিন্তু আমার বন্ধুটি আর সেইসব আদর্শবাদী মানুষগুলো যারা মনে করে এইসব সংস্থা কি মহান কাজ করে তাদের ভাবনার চেয়ে বিষয়টা আসলে কিন্তু একরকম নয়। কোঅপারেটিভে শুধু দুজন দাঁতের ডাক্তার থাকে আর সেখানে কাজের চাপও বেশি। কোঅপারেটিভে ডাক্তারের সংখ্যা অপ্রতুল বলে, ডাক্তারেরা তাঁদের নিজেদের চেম্বারেই বেশি সময় কাটায়, ব্যবসার সময় নয় (বন্ধুটি নিজেই এই শব্দ ব্যবহার করেছিল ‘ব্যবসার’ সময়) বিশেষত রাতে তাঁদের সাহায্য করত ডাক্তারী পাঠরত ছেলেরা। তারা বেশির ভাগই বামপন্থী ও তারা প্র্যাক্টিস করতে ইচ্ছুক।
মৃতা বৃদ্ধা মহিলাটি ইন্ডিয়ান জাতির, এক রাতে মাড়িতে পুঁজ নিয়ে এসেছিল। আমার বন্ধুটি পুঁজ অপারেশন করে ফেলেনি। কিন্তু কো-অপারেটিভে সেটার অপারেশন হয়েছিল। কাজটা করেছিল একজন শিক্ষানবীশ ডাক্তার। মহিলার মাথা ঘুরে যায় এবং তিনি জ্ঞান হারান। তার নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়। অন্য ছাত্রটি টেলিফোনে আমার বন্ধুকে ডাকে। সে যখন কোঅপারেটিভে পৌঁছায় দেখে আনাড়ি হাতে মাড়ির ক্যান্সারে ছুরি চালিয়ে দিয়েছে। দ্রুত বুঝে গেল সে যে এখন আর কিছু করার নেই। ইরাপুয়াতো-র হাসপাতালে মহিলাকে ভর্তি করে দিল যেখানে হপ্তার শেষদিকে তিনি মারা গেলেন।
এই ধরনের ঘটনা, বন্ধুটি যেমন বলল, যে খুব কমই ঘটে থাকে। দশহাজার কেস এর মধ্যে একটা হয়ত কেস দেখা যায় এরকম। আর কোন ডাক্তারই তার কেরিয়ারে এমন রুগী পেতে চায় না। ওকে বললাম বুঝেছি। সত্যিটা হল কিস্যুই বুঝি নি। সে রাতে আমরা মদ্যপান করতে বেরোই। শহরের বারগুলোতে যখন ঘুরছিলাম আমরা, বেশ উচ্চশ্রেণীর লোকেদের বার সেগুলো, সেই বৃদ্ধা ইন্ডিয়ান জাতির মহিলা আর ওনার মাড়ির ক্যানসার রোগটার কথা মাথায় বারবার এসে যাচ্ছিল।
আমার বন্ধুটি ঘটনাটি আবার বলতে শুরু করল তবে মদের ঝোঁকে বেশ চোখে পরার মত কিছু অদল বদল ঘটিয়ে আর ততক্ষণে বেশ হতাশ করে ফেলেছে। তারপর আমরা ওর ভক্সওয়াগনের চড়ে বসলাম। ইরাপুয়াতোর শহরতলীতে এক সস্তার রেস্তোরাঁয় খেতে গেলাম। দৃশ্যের বদলটা বেশ চোখে পড়ার মত। আগে যদি আমরা প্রফেশনাল, অফিসার, ব্যবসায়ীদের গা ঘেঁষাঘেঁষি না করে থাকি এখন কিন্তু আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকে বেকার, শ্রমিক আর ভিখারীরা।
অন্যদিকে আমার বন্ধুটির মনখারাপ চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছয়। রাত বারোটার সময় সে চিত্রকর কাবেরনাসের বিরুদ্ধেশুরু করে অকথ্য গালাগাল । বছর কয়েক আগে বন্ধুটি দুটো এনগ্রেভ করা ছবি কেনে যেগুলো তার বাড়ির দেওয়ালে বেশ গর্বের সঙ্গে টাঙিয়ে রেখেছিল। একদিন হঠাতই তার ‘গোলাপী অঞ্চল’-এর বাড়িতে সেই প্রাচুর্যময় শিল্পীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল একটা পার্টিতে। সে এক নিবেদিতপ্রাণ দাঁতের ডাক্তার সে, যদি না আমার স্মৃতি মন্দ হয় থাকে, প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মত মেক্সিকান আর্টের সাত তারা লেভেলের একটা হাসি দিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে গেল।
কাবেরনাস প্রথমে, বন্ধুটি যেমন বলেছিল, তার সঙ্গে কথা বলতে শুধু রাজিই হল না উপরন্তু তার ব্যক্তিগত কথা বলতেও রাজি হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাবেরনাস এক তরুণী বান্ধবীকে আমার বন্ধুটির সঙ্গে ভাগ করে নিতে প্রস্তাব দিল। মেয়েটি মনে হচ্ছিল কোন এক অজ্ঞাত কারণে শিল্পীর থেকে দাঁতের ডাক্তারের প্রতি আগ্রহ ছিল বেশি। আমার বন্ধুটি মেয়েটিকে পাত্তাই দেয় নি। এভাবেই ও আমায় জানাল। অপরপক্ষে বন্ধুটি এক রাতে তিনজনে মিলে ভালবাসায় আগ্রহী ছিল না বরং কাভেরনাসের কোন এনগ্রেভিং কিনতে আগ্রহ ছিল এমন দামে যা শিল্পী ধার্য করত সবসময়, এমন কোন মাস্টারপিস যার নিচে লেখা থাকবে—“পাঞ্চোর প্রতি... এক পাগল রাতের স্মৃতিতে।”
সেই মুহূর্ত থেকে কাবেরনাসের হাবভাব বদলে গেল। ত্যারছা চোখে আমার দিকে তাকাতে লাগল- বলল বন্ধুটি। বলল—আমরা দাঁতের ডাক্তারেরা শিল্পকলা থোড়াই বুঝি। সে জিজ্ঞেস করল আমি গে কিনা! কিংবা উল্টোদিকে মেয়েটা ফালতু কোন মেয়েছেলে কি না! আমার বন্ধুটির নিশ্চিত ভাবে একটু দেরী হয়েছিল বুঝতে যে কাবেরনাস ওর সঙ্গে ঠাট্টা করছে। যখন উত্তর দিতে চাইল যে তার আকর্ষণ এক শিল্পের অসামান্য কীর্তির প্রতি আকর্ষণ মাত্র যেমন বিশ্বের সব সেরা শিল্পের প্রতি মানুষের আকর্ষণ থাকে, চেয়ে দেখল কাবেরনাস তখন সেখান থেকে চলে গিয়েছে।
দেখা পেতে দেরী হল। সেই ফাঁকে সে মনে মনে ঝালিয়ে নিচ্ছিল যে দেখা হলে শিল্পীকে কি বলবে। তাকে দেখতে পেল ব্যলকনিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছে দুটো লোকের সঙ্গে। চেহারা দেখলে পুরো গ্যাংস্টার মনে হবে। কাবেরনাস তাকে আসতে দেখে সঙ্গীদের কি যেন বলল। আমার দাঁতের ডাক্তার বন্ধুটি হাসল। কাবেরনাসের সঙ্গীরাও হাসল আমার বন্ধুটি সম্ভবত তারা যা ভেবেছিল বা মনে করতে চাইবে তার চেয়েও বেশি মাতাল ছিল। এটা নিশ্চিত যে চিত্রকর বন্ধুটিকে অপমানই করেছিল। আর তার সঙ্গীরা তাকে পাঁজাকোলা করে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়েছিল। বন্ধুটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে।
আবছা মনে পড়ে তার যে কাবেরনাস তাকে বারবার সমকামী বলতে থাকে, পুরুষদের হাসিগুলো তার কানে বাজতে থাকে, সব গাড়িগুলো আকাশে পার্ক করতে থাকে, ধূসর রঙের একটা আকাশ দেখে মনে হয় ঠিক যেন সেভিইয়া শহরের এক রাস্তা। যে প্রতীতির সঙ্গে তুমি মারা যাও আর যে কিচ্ছু নায়ের জন্যও তুমি মারা যাও, বোকামির জন্য, তোমার জীবনের জন্য, যে জীবন তুমি প্রায় হারাতে বসেছ, সেটাও তো একটা ভুলের সিরিজের ফল হিসেবে ঘটতে যাওয়া এক ঘটনা। এমনকী প্রতীতির ও কথাও যেন সম্ভ্রম হারিয়ে যায়।
পথচলতি বারে বসে তেকিলায় চুমুক দিতে দিতে এসব বলছিল সে, যে বারে মদ বিক্রি করার পারমিশানই ছিল না, সেটা ইরাওউয়াতোর একটা নিচের দিককার অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। তারপর সে একটা লম্বা বিতর্ক চালাল যার কেন্দ্রে ছিল সেই বিষয় টা যে—শিল্পের ব্যর্থতা। আমি জানি এখনো কাবেরনাসের এংরেভ করা ছিত্রগুলো ওর বাড়ির দেওয়ালে টাঙানো। আর আমার কাছে এমন কোন সংবাদ এসেও পৌঁছয় নি যে আমার বন্ধুটি তাদের কোনটাকেও বিক্রি করার কথা ভাবছে। আমি যখন চাইছি ওর সঙ্গে তর্ক করতে যে কাবেরনাসের সঙ্গে বিষয়টা স্রেফ একটা প্রেমের বিষয়, ওটার সঙ্গে শিল্প ভালবাসার কোন সম্পর্ক নেই, আর সে কারণেই সেটা মানুষের ব্যর্থতার কাহিনী হিসেবে বলা যেতে পারে তবে সেটা শিল্পীর ব্যর্থতা নয়, শিল্পকলার তো নয়ই, সেই সময় বন্ধুটি আকাশের দিকে চেয়ে চিৎকার করে উঠল।
শিল্প তার নিজের বক্তব্য বলার ঢের আগে তা হল কোন বিশেষ কাহিনীর অংশ। সে বলল শিল্পকলা নিজেই একটি কাহিনী। এইটে একমাত্র নির্দিষ্ট সম্ভাব্য কাহিনী। এটি একটি নির্দিষ্ট কাহিনী এবং একই সঙ্গে কাহিনীটির গর্ভও বটে। নির্দিষ্ট কাহিনীর গর্ভ ব্যাপারটা কি?—আমি বললাম। সঙ্গে সঙ্গেই ভাবলাম আর আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল—শিল্পকলা। আমি এও ভাবলাম যে ওটা ভদ্রলোকের ভাবনা। আর আমরা যেহেতু ইতিমধ্যেঈ যথেষ্ট মদ্যপান করেছি অতএব এখন বাড়ি ফেরবার সময় হয়েছে। কিন্তু বন্ধুটি বলল- নির্দিষ্ট কাহিনীর গর্ভ হল আসলে কাহিনীর ভেতরকার গোপন কাহিনীটি।
কয়েক মুহূর্তের জন্য তীব্র চোখে আমার দিকে চাইল। ভাবলাম ইন্ডিয়ান মহিলাটির মাড়িতে ক্যানসার হয়ে মরে যাবার ঘটনাটা মনে খুব আলোড়ন ফেলেছে তার, অন্ততঃ প্রথমটায় যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে বেশি।
আর তুই বলবি গোপন গপ্পোটা কি?—বন্ধু বলল। দ্যাখ, গোপন কাহিনীটা হল, দিনের পর দিন যে জীবনটা আমরা কাটাই, ভাবি যে আমরা বেঁচে আছি, ভাবি যে জীবনের ঘটনাগুলো সবই আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ভাবতে থাকি যে যেসব ঘটনাগুলো ওপর থেকে আমাদের সঙ্গে ঘটে সেগুলোর কোন গুরুত্ব নেই, আমাদের সেই জীবনে নিজেদের কখনই চিনে উঠতে পারি না আমরা। কিন্তু সব কিছুর গুরুত্ব আছে ছাগল! শুধু আমরা সেটা খেয়ালই করি না। আমরা বিশ্বাস করি শিল্পটিল্প জীবনের এক ফুটপাথ দিয়ে ঘটে যায় আর জীবনটা, আমাদের জীবন বয়ে যায় ওই ফুটপাথ দিয়ে। খেয়ালও করি না যে একথা মিথ্যে।
একটা ফুটপাথের সঙ্গে অন্য ফুটপাথের তফাৎ কি?—জিজ্ঞেস করল আমায়। এটাকে আমার উত্তর দেওয়াই উচিৎ, সম্ভবত, তবে আমার মনে নেই ঠিক কি বলেছিলাম আমি। কারণ সেই সময় আমার বন্ধু একজন চেনা লোককে দেখে আমার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে তার সঙ্গে করমর্দন করেছিল।মনে পড়ে যে দোকানটায় আমরা বসেছিলাম সেটা লোকের ভীড় হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে। মনে পড়ে দোকানের সবুজ টাইলসের দেওয়ালগুলোকে। ওগুলো যেন পাবলিক শৌচাগার হয়ে উঠছিল, আর বারটা যেখানে আগে কেউ ছিল না, এখন সেটা ক্লান্ত কিংবা ফুর্তিবাজ অথবা অপরাধীদের গোর দেওয়ার জায়গা হিসাবে বিভিন্ন ধরনের লোকে ভর্তি হয়ে গেছিল। মনে পড়ে দোকানটার এক কোণে এক অন্ধ গান গাইছিল কিংবা একটা গান যেটা কিনা এক অন্ধের কথা বলছিল। ধোঁয়ারা, আগে অনুপস্থিত ছিল, এখন ওপর থেকে আমাদের মাথার চারপাশ ভরিয়ে তুলছিল। তখন সেই বন্ধুটা যাকে আমার বন্ধু কুশল জানিয়েছিল হাত নাড়িয়ে আমাদের টেবলের কাছে চলে এল।
সতের বছরের বেশি হবে না ওর বয়স। দেখে আরো কম মনে হচ্ছিল। বেশ বেঁটে, আর চেহারা শক্তিশালী হতে পারত, গোলগাল হবার দিকে, শিল্পীদের লোপাট করার দিকে ঝোঁকা চেহারা ছিল তার। বেশ গরীবের মত পোশাক আসাক তার, যদিও পোশাকে এমন একটা ব্যাপার ছিল যেটা জমাট বাঁধা থামায় নি, মানে ব্যাপারটা একটা মাথা ঘামানোর মত গুণ, পোশাকটা যেন এক এক সময় দূরের কোন জায়গা থেকে কিছু বলে যাচ্ছিল। হাতে অনেক হাঁটার ফলে ছেঁড়াখোঁড়া কিছু টেনিসজুতো, কিছু টেনিস জুতো আমার বন্ধু বৃত্তের। কিংবা আরো ভালভাবে বললে আমাদের বন্ধুদের কারো কারো কিছু ছেলেমেয়ের বৃত্ত বহুদিন থেকে যা ক্লোজেটে রাখা ছিল অথবা নোংরা ফেলার বাস্কেটে ফেলে রাখা ছিল।
সে আমাদের টেবিলে এসে বসল আর আমার বন্ধুটা বলল সে তার যা খুশি যেন চাইতে পারে। সেই প্রথমবার ও হাসল। এটা বলতে পারব না যে সেটা খুব সুন্দর কোন হাসি, বরং এর বর বেশি উল্টোটাই, একটা অবিশ্বাসীর হাসি। এমন একটা হাসি যেটা আরো অতিরিক্ত কিছু ছোটখাট জিনিষের অপেক্ষা করছে আর সেসবই খারাপ জিনিষ। সেই সময় যখন বয়ঃসন্ধির ছেলেটা আমাদের সঙ্গে বসল, তার শীতল হাসি বিনিময় করল। আমার মাথায় খেলে গেল আমার বন্ধুর একটা সম্ভাবনা। বনশু একজন পাকাপোক্ত অবিবাহিত লোক ছিল, যে বহুদিন ধরে মেক্সিকো সিটিতে থাকত, যে তার জন্মের শহর ইরাপুয়াতো থেকে চলে যেতে চায় নি কখনও, সে হোমোসেক্সুয়াল হয়ে গিয়েছিল। কিংবা হয়ত বরাবর তেমন ছিল । শুধু সে রাতে নির্দিষ্ট ভাবে সেই রাতে যখন আমরা ইন্ডিয়ান মহিলার মৃত্যু। মাড়ির ক্যানসার ইত্যাদি নিয়ে কথা বলছিলাম, এক সত্যি একটা যুক্তিহীন বিষয় ভেসে উঠেছিল সামনে, যা বহু বছর ধরে লুকোনো ছিল। কিন্তু দ্রুত ভাবনাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম। কিংবা সদ্য আগত ছেলেটার দিকে মন দিলাম, অথবা ওর চোখদুটোতেই, যেগুলো আমায় নাধ্য করছিল মনের ভয়গুলোকে একপাশে সরিয়ে রাখতে। (দেখুন সম্ভাবনা, দূরতম কোন, যে আমার বন্ধু হোমোসেক্সুয়াল ছিল একথাটা আমায় সেই সময় আতঙ্কে হিম করে রেখেছিল) আমি মন সঁপে দিয়েছিলাম সেই নবাগতের দিকে যে তার বয়ঃসন্ধি আর অদ্ভুত কৈশোরের মাঝামাঝি ছিল।
ওর চোখ দুটো, কিভাবে বলব, খুব শক্তিশালী ছিল। এই বিশেষণটাই সে মুহূর্তে আমার মাথায় এসেছিল। এমন এক বিশেষণ যা হয়ত বলা বাহুল্য বাস্তবে সে চোখদুটো পরিবেশে ছড়াচ্ছিল তার মধ্যে গভীর ভাবে নিহিত ছিল না। সে দৃষ্টির সামনে তাকানো যাচ্ছিল না বেশীক্ষণ, ভুরুর মাঝে একটা বিশেষ ধরণের যন্ত্রণা কিন্তু আর কাউকে পেলাম যা আমার উদ্দেশ্য তার চেয়ে বেশি ভাল সাধন করবে। তার শরীরটা বিছানো ছিল আগেই বলেছি একটা বৃত্তাকার ভঙ্গী যাকে বছর দৃঢ়তার সঙ্গে শেষ করতে পারেনি। চোখদুটো ধারালো ভাবে বিছানো ছিল, খুব ত্বড়িত তার চলন।
বন্ধুটা আমাকে ওর পরিচয় করিয়ে দিল তার আনন্দ লুকিয়ে। ওর নাম খোসে রামিরেস। ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম (জানি না কেন, আমার তো এসব ফর্মালিটি আসে না, অন্তত একটা বারে আর এমন রাতের বেলায়) আর সেও তার হাত বাড়াল। ও যখন হাত বাড়াল তখন কোন অবাক ভাবই ফুটে উঠল না ওর মুখে। ওর ডানহাতটা অপেক্ষা করছিল শান্তভাবে। যে কোন বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়ের মতই দুলছিল সেটা। ক্যালাস ভঙ্গীতে সেটা জড় করে রেখেছিল যেটা দেখে ওকে লোহার মানুষ মনে হচ্ছিল। একটা হাত যেটা বড্ড বেশি লম্বা। এখন যখন আমি সে রাতে ফিরে যাই ইরাপুয়াতোর শহরতলীতে, আমার কাছে সে দুটো ছোটই লাগে। গোল করে কিংবা সেই বারে ঝিকমিক আলোয় ঘিরে আছে একটা হাত। একট আহাত যেটা কোন অজানা থেকে উঠে এসেছে, একটা হাত ঝড়ের কর্ষিকা, কিন্তু কঠিন, কামারশালায় বানানো নকল হাত।
আমার বন্ধু হাসল। গোটা দিনের ভেতর সেই প্রথমবার ওর মুখে আমি খুশির হাসির ঝলক দেখলাম। যেন উপস্থিতিটা ভঙ্গুর। (ওর গোলগাল চেহারা, ধারালো চোখ, কঠিন হাত নিয়ে) খোসে রামিরেস সেই ইন্ডিয়ান মিহিলাকে মুখের ক্যানসারের জন্য দোষারোপ করছিল। চিত্রশিল্পী কাভেরনাসের বারবার অসুস্থ হওয়াটা ওকে বিচলিত করছিল। যেন সে প্রশ্নের সুযোগ খুঁজছিল যা ঘটে যাবার জন্য ছুকছুক করছিল, যাই হোক শিক্ষার প্রাথমিক প্রশ্ন ছাড়াই সে এটা করত না। বন্ধু বলল খোসে রামরেসকে সে পেশার সূত্রেই চিনেছে।
সে যে দাঁতের ডাক্তারির কথা বলছে সেকথা বুঝতে আমার একটু দেরী হয়েছিল। ফ্রি-ভারী গলায় ছেলেটাকে বললাম, এমন ভাবে যেন ওর বাকী শরীরটার মূল্য নেই। কোওপারেটিভের চেম্বারে—বন্ধুটা বলল। ছ’টা দাঁত ফিল করেছিল সে, সূক্ষ্ম কাজ। খোসে রামিরেস বসে চোখ নামাল নিচের দিকে। যেন মুহূর্তে সে বদলে গেল তার স্বরূপে নতুন করে, একটা সতের বছরের ছেলে। মনে পড়ে তারপর আমরা আরো পানীয় অর্ডার দিয়েছিলাম। খোসে রামিরেস এক প্লেট চিলাকো খেয়েছিল আর আমার বন্ধু তাকে বলেছিল তার যা খুশি সে যেন অর্ডার করে খায়।
পুরোটা সময় আমরা কথাবার্তার ভেতরে ডুবে রইলাম যা ওদের দুজনের মধ্যেই সীমিত রয়েছিল। আর আমি এক প্রান্তে বসেছিলাম। মাঝে মাঝে ওর কথা কানে আসছিল। শিল্পের কথা বলছিল বলাই বাহুল্য আমার বন্ধুর কাভেরনাসের কাহিনী জানাই ছিল, ওগুলোই আবার সে শুরু করল, যে সে বিক্ষিপ্ত ভাবে প্রচন্ড যন্ত্রণার মাঝখানে হাসপাতালের বেডে মৃত সেই ইন্ডিয়ান মহিলার কথার সঙ্গে মিশিয়ে ফেলছিল কিংবা হয়ত তাকে আনাস্থেশিয়া দেওয়া হয়েছিল অথবা হয়ত কেউ নিয়মিত তাকে মরফিন ইঞ্জেকশন দিত। তবে ভাবমূর্তিটা দাঁড়িয়েছিল যে বৃদ্ধা মহিলাকে মাড়িতে সামান্য একটা ফোঁড়া ব্যাথা নিয়ে ভর্তি হবার পর ইরাপুয়াতোর হাসপাতালে তাকে ফেলে রাখা হয়েছিল। আর কাভেরনাসের হাসি কিংবা তার হাতের ছাপ দাঁতের ডাক্তারের সেই ঘরটার চারদিকে দেওয়ালে নিখুঁতভাবে পাওয়া গিয়েছিল , একটা ঘর শেষমেশ যা আসলে একটা বাড়ি যেটা খোসে খুয়ান রামিরেস তা দেখতে গিয়েছিল। আমার বন্ধুর কথা থেকে এমনটাই বোঝা গিয়েছিল। যেখানে কাভেরনাসের জিনিষপত্র দেখতে গিয়েছিলাম, কাভেরনাসের তোলা। বিশেষ করে আর্ট গ্যালারিতে রাখা তার গয়নাগাঁটি গুলো ওর খুব পছন্দ হয়েছে। সেসময় আমরা ওখান থেকে চলে গিয়েছিলাম। বন্ধু টাকা মিটিয়ে দিলে তারপর সবার আগেই উঠে দরজার দিকে চলে গেল। ততটাও মাতাল ছিল না সে। আবার আমি যখন ওকে গাড়িতে ড্রাইভারের আসন বদলাতে বললাম সে অস্বীকার করল। অন্য জায়গার কথাও মনে পড়ে যেসব জাতগায় আমরা বেশীক্ষণ থাকি নি। শেষ পর্যন্ত একটা বিশাল বন্ধ্যা জায়গার কথা মনে পড়ছে, একটা শুনশান রাস্তা যেটা একটা মাঠে এসে পড়েছে, যেখানে খোসে রামরেস গাড়ি থেকে নেমে গেল। হাত নাড়িয়েই বিদায় নিল সে।
আগেই বলেছিলাম আমার অবাক লেগেছিল যে ছেলেটা ওরকম জায়গায় থাকে দেখে। যেখানে কোন বাড়িঘর নেই, শুধু অন্ধকার আর হয়ত একটা পাহাড়ের সিল্যুয়েট, আরো ভেতরে খুব ক্ষীণ চাঁদের আলো। বলেছিলাম যে কিছুটা পথ আমরা ওকে সঙ্গ দিয়েছিলাম। আমার বন্ধু (বলাতে আমার দিকে তাকাল না সে, তার হাত দুটো স্টিয়ারিং হুইলের ওপরে ছিল। চালচলন দেখে মনে হচ্ছিল ক্লান্ত আর শান্তও) উত্তর দিল যে ও সঙ্গ দিতে পারবে না। আমি যেন অস্থির না হই, ওই ছেলেট আপথঘাট ভালই চেনে। তারপর ইঞ্জিনে স্টার্ট দিল। হেডলাইট জ্বালাল, আর গাড়িটা ব্যাক গীয়ারে যাবার আগে আমি দেখতে পেলাম এক অপার্থিব দৃশ্য। যেন সাদায় কালোয় তোলা ছবি। রোগা রোগ আগাছ, আগাছায় ভরা, গরুর গাড়ি চলার পথ, আবর্জনা আর গাছগাছালির চেনা পরিবেশের মাঝখানে দোআঁশলা এক চিরাচরিত মেক্সিকান গ্রাম্য ছবি।
ছেলেটার কোন চিহ্নমাত্র নেই।
তারপর আমরা বাড়ি ফিরতে এলাম। ঘুম আসতে খুব দেরী হল। অতিথিদের ঘরে ইরাপুয়াতোর এক চিত্রকরের ছবি বাঁধানো আছে। ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীর ছবি, একটা প্রাকৃতিক দৃশ্য। স্খানে একটা শহর, এক উপত্যকা, এক বিরাট এলাকা জুড়ে হলুদের দাপাদাপি। মনে হয় ছবিটার ভেতর খারাপ কিছু আছে। মনে পড়ে বিছানায় ওলোট পালট খাচ্ছিলাম, ক্লান্ত কিংবা নিদ্রাহীন চোখে। জানলা দিয়ে মরা আলো ভেসে আসছিল আক্ষরিক ভাবেই দৃশ্যটাকে জ্বালিয়ে দিয়ে যতক্ষণ না ওটা দুলে ওঠে। ওটা খুব ভালো কোন ছবি নয়। এমন নয় যে ওটার জন্য আমি অবসেসড ছিলাম। যেটা আমায় ঘুমোতে দিত না বা কোন বুজতে না চাওয়া কোন দুঃখের দৃশ্য মনেও করাত না। যদিও ভালমুখেই বিছানা থেকে উঠলাম আমি তারপর ওটাকে দেওয়ালের দিকে ফিরিয়ে রাখলাম। আর ভাল মনেই সে রাতেই ডিস্ট্রিক্ট ফেডেরাল এ ফিরে এসেছিলাম।
পরের দিন বেলা করে উঠেছিলাম। খাবার সময় পর্যন্ত বন্ধুটাকে দেখতেও পাই নি। বাড়িতে শুধু ঘর দোর ঝাড়পোঁছ করার মহিলাটি আসত। ঠিক করলাম বাড়ি থেকে বেরোব, গোটা শহরটায় একটা চক্কর লাগাব। ইরাপুয়াতো কোন সুন্দর শহর ছিল না। কিন্তু তার রাস্তাঘাট, শহরের কেন্দ্রে তার শান্ত পরিবেশ ইত্যাদির সুনাম ছিল। সেখানে ইরাপুয়াতোবাসীরা ডিস্ট্রিক্ট ফেডেরালের বাসিন্দারা তাদের মূর্তিমান অসুবিধার কারণ বলে ভাবত। আমার যেহেতু কোন কাজ করার ছিল না, আমি এক রেস্তোরাঁয় সকালের খাবার খাওয়ার পর এক গ্লাস কমলালেবুর রস খেতে খেতে চব্যাঙ্কে পাঠানো খবরের কাগজ পড়ছিলাম। আর সেই ফাঁকে পাশ দিয়ে সেকেন্ডারীর ছাত্র ছাত্রীরা কিংবা কোন অফিসের কেরানীরা অর্থহীন বকবক করতে করতে হেঁটে যাচ্ছিল।
তখন সেটা কী ভীষণ দূরের মনে হচ্ছিল আমার। যবে থেকে এই যাত্রাটা শুরু করেছি তখন থেকে প্রথম বার ডিস্ট্রিক্ট ফেডেরালের সমস্যাগুলো আর আমার নিজের সমস্যা মনে হচ্ছিল না। যদিও ইরাপুয়াতোর বাইরে থেকে আসা পাখিগুলোও ওখানে ছিল। অনেক পরে একটা বইয়ের দোকান পেলাম (ওখানে ঢুকতে মেহনত করতে হল), সেখান থেকে একটা বই কিনলাম এমিলিও কাররান্সা-র ইলাস্ট্রেশন দেওয়া বই। তিনি ওখানকার একটা হাসপাতালে কিংবা ইরাপুয়াতোরইও কোন গ্রামে জন্মেছিলেন। ভাবলাম উনি নিশ্চয় আমার বন্ধুটিকে ভালবেসে ছবিখানি দিয়েছেন।
বিকেলে দেখা হল আমাদের। ওর পরামর্শ নিতে গেছিলাম। শেষ মুহূর্তে একজন সাক্ষাৎপ্রার্থী এসে যাওয়াতে সেক্রেটারিনীটি মিষ্টি হেসে আমায় অপেক্ষা করতে বলল। ব্যস্ত হতে না করল দেরী হবে না বেশি। ওয়েটিং রুমে বসলাম। একটা ম্যাগাজিন হাতে তুলে নিলাম। আশেপাশে কেউ ছিল না। নিস্তন্ধতা কেবল আমার বন্ধুর চেম্বারে নয় গোটা বিল্ডিংটায় ছিল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল সেক্রেটারিনী আমায় মিথ্যে বলেছে, বন্ধু সেখানেই নেই। হয়ত কিছু খারাপ ঘটনা ঘটেছে। তাড়াহুড়ো করে বেরোবার আগে ঐ যে সব নির্দেশাবলী সে রেখে গিয়েছে সেটা হয়ত কোন বিপদ সংকেত না দেবার জন্যই। ব্যাপারটাই কেমন অসম্ভব লাগল।
রিসেপশনে তখন সেক্রেটারিনীটি ছিল না। ইচ্ছে করল ফোনটা ধরে একজনকে ফোন করি। তবে সেটা মুহূর্তের উত্তেজনায় মনে এসেছিল। কিন্তু এই অজানা অচেনা শহরে কাকেই ফোন করব? ইরাপুয়াতোয় এসেছি বলে নিজেকে হাজার বার দোষ দিতে লাগলাম। দুর্বল ভাবনাচিন্তার জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে থাকলাম। শপথ করলাম আর নয়, এবার ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল অফ মেক্সিকোয় ফিরে একটা সুন্দরী বুদ্ধিমতী মেয়ে দেখে বিয়ে করে ফেলব। সবার ওপর অভ্যাস। ওটা থাকলেই খুব বেশি হাত না কচলেও একটা মেয়েকে বিয়ে করে ফেলা যাবে। সেক্রেটারির চেয়ারে বসলাম। নিজেকে শান্ত করা চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ টাইপরাইটারটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, সাক্ষাৎ প্রার্থীদের নাম লেখার খাতাটায়, একটা কাঠের পেনসিলদানি, ক্লিপ, ইরেজার, সবকিছু টিপটপ সাজানো। আমার যা দেখে অসম্ভব লাগছিল, কারণ কোন সুস্থ মানুষ পেনসিল ইরেজার সাজিয়ে রাখতে পারে কিন্তু তাই বলে ক্লিপও! আমার অনিচ্ছুক হাত টাইপরাইটারের ওপর কাঁপতে কাঁপতে কী সব লিখে চলছিল আর বন্ধুর জন্য আশংকায় আমার মন অবধারিত ভাবে কী যেন খুঁজছিল।
যাই হোক, শিক্ষা কখনও কখনও দ্রুত নার্ভাসনেসের আক্রমণকে কাটিয়ে দেয়। ততক্ষণে দরজা খুলে গেছে আর চেম্বারের ভেতর থেকে চিৎকার করে কেউ সাক্ষাৎ প্রার্থীদের ডাকতে শুরু করেছে। মনে পড়ে আমি সেইসময় ভাবতে শুরু করেছি কী অজুহাত দেখাবো যে কখন দেখেছি আমি বা কিভাবে পেলাম। হ্যাঁ আমি ওটা দেখতে পেয়েছিলাম। এখনও বুঝতে পারি না সেদিন বিকেলে আমার কী হয়েছিল! সম্ভবত ওটাই আমার মেজাজ খারাপ বা দুঃখের শেষ প্রতিক্রিয়া ছিল, যে দুঃখ বা মন্দ মেজাজ আমি মেক্সিকো ডি এফথেকে বয়ে নিয়ে এসেছিলাম আর ইরাপুয়াতোয় এসে উবে গেছিল।।
বন্ধু যথারীতি তার চেম্বারের মধ্যেই ছিল। ওর কাছে একজন রুগীকে দেখলাম। এক মহিলা ত্রিশের মত বয়স হবে। হাবভাব বেশ অভিজাত, আর ওর নার্স, ছোটখাট চেহারার কমবয়সী একট আমেয়ে, সম্ভবত মিশ্র রক্তের, যাকে আজকের আগে কখনও দেখি নি। তারা কেউই চেম্বারে আমার ঢুকে পড়া দেখে অবাক হন নি। এখন শেষ করি, আমার দিকে চেয়ে হেসে বলল বন্ধু ওর রুগীকে। অনেক পরে সেদিন ওর চেম্বারে বসে ঠিক কি মনে হচ্ছিল সেকথা ওকে বলতে গিয়ে (মানে বলা যেতে পারে বোধ, ভয়, অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রণা যা আপনাআপনিই বেড়ে যাচ্ছিল) আমার বন্ধু ঘোষণা করল যে এইরকম অনুভূতি ফাঁকা বিল্ডিং গুলোতে অনেকেরই হয়। বুঝলাম কথাগুলো স্রেফ আমায় সান্ত্বনা দেবার জন্যই বলা আমি যাতে ওসব নিয়ে বেশি না ভাবি। কিন্তু বন্ধু যখন বলতে উঠল তখন কে যেন ওকে থামিয়ে দিচ্ছিল। খাবার সময় ব্যাপারটা শুরু হলে সেটা তিনটে থেকে ছটা পর্যন্ত গড়িয়ে গেল। ওঁর মাথায় বিষয়টা চেপে বসেছিল-আপাতদৃষ্টিতে ফাঁকা বিল্ডিং মানে যেগুলোতে লোকে ভাবে কেউ থাকে না ফাঁকা। আর এটা কেউ ভাবে তখনই যখন সেখানে কোন গন্ডগোল থাকে না, যদিও সেগুলো বাস্তবে ফাঁকা নয়। আর সেটা ও লোকে জানে যদিও অনুভূতিগুলো, আওয়াজ, দৃশ্য, সবকিছু তাকে জানাতে পারে যে বিল্ডিংটা ফাঁকা। আর তখন যন্ত্রণা, ভয় ওরা খুব একট আমান্য করে না যতটা লোকে ভাবে তারা করে। বলা যেতে পারে ফাঁকা বিল্ডিঙের ভেতরে থাকার সত্যতা এমনকী সেটা ঘটনাও নয়, কোন অবাক করা কিছুই নয়। ফাঁকা বিল্ডিঙের আটকে পড়া বা আটক থাকা বরং কেউ জানে, মনের ঢের গভীরে কেউ জানে যে বিল্ডিঙেরা ফাঁকা থাকে না। বরং বাঞ্চোত ফাঁকা বিল্ডিঙগুলোতে সময়ই কেউ থাকে যে কোন গোলমাল না করে আমাদের ভেতর থেকেই আমাদের দিকে চেয়ে থাকে। আর এভাবে সব কমে যায়, আমরা একা থাকি না। আমার বন্ধু বলল—যখন সব যুক্তিবুদ্ধি বলে আমরা একা আছি তখনও না।
আর তারপর বলেছিল—কখন আমরা সত্যি সত্যি একা থাকি জানিস? অনেক মানুষে মধ্যে আমরা একা থাকি। কথাটা এমন ভাবতে ভাবতে ও বলল মনে হয় যেন জন্স্রোতের দিকে চেয়ে কথাটা বলছে। কিন্তু না ও অনেকের মধ্যে ছিল না। ওটা আমি নিশ্চিত কল্পনা করে নিতে পারি। বরং মৃত্যুর পেছনে এলমাত্র মেক্সিকান একাকীত্ব একমাত্র ইরাপুয়াতোর একাকীত্ব।
সে রাতে আমরা মাতাল হয়েছিলাম। ওকে আমার উপহারটা দিলাম। আমায় বলল ও চিত্রকর কাররানসাকে চেনে না। আমরা খেতে বেরোলাম। মাতাল হয়েছিলাম সে রাতে।
শহরের মাঝখানের একটা ক্যান্টিনে শুরু করলাম। তারপর শহরতলিতে বেরোলাম। যেখানে গত রাতে ছিলাম, যেখানে রামিরেস ছোকরা। মনে পরে আমাদের সেই মুহূর্ত সেই এলোমেলো ঘোরাঘুরির মুহূর্ত ভেবেছিলাম যে বন্ধুই রামরেসকে খুঁজছিল। কথাটা বললাম। ও বলল নিশ্চিত নয় । আমি বললাম আমার সঙ্গে সে খোলামেলা কথা বলতে পারে। বললান আমাদের মধ্যে যা কথা হবে সেসব আমাদের মধ্যেই থাকবে। একটু সময় পরে আমার চোখের দিকে চেয়ে বলল ওর কিছুই লুকোনোর নেই। বলল আমার সঙ্গে ও চিরকাল খোলাখুলিই কথা বলেছে আমি বিশ্বাস করলাম। কিন্তু যে গভীর অনুসন্ধিৎসু ভাবে ছেলেটাকে খুঁজছিল সেটা রয়েই গেল। সে রাতে আমরা দেরি করে শুতে গেলাম। শুতে শুতে প্রায় ভোর ছটা বেজে গেছিল। কোন এক সময় বন্ধুটার মনে পড়ছিল আমাদের যৌবনের কথাম আমরা যখন উনাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। দুজনেই অন্ধের মত এলিজোন্দো-র লেখা গিলতাম। আমি দর্শন বিভাগে আর ও ডেন্টিস্ট্রিতে। ওখানকার সিনে ক্লাবে সম্ভবত বলিভিয়ার নির্দেশক সাখিনের কোন ছবির সেমিনারে আমাদের প্রথম পরিচয়।
সেমিনার চলাকালীন বন্ধু উঠে দাঁড়াল তারপর চলে গেল। জানি না একমাত্র সেই গেল কি না। তবে প্রথমে ঐ গেল কি না তবে ওটা ওর ভাল লাগে নি সেকথা কিন্তু ওইই প্রথম বলেছিল এবং কেন সেটাও। ছবিটা আমারও ভাল লাগে নি কিন্তু আমি কিন্তু তা কক্ষনও স্বীকার করতে পারতাম না। আমাদের ভেতরকার বন্ধুত্ব খুব স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে গড়ে উঠেছিল। সেইদিন রাতেই ও যে এলিজোন্দো-র ভক্ত সেকথা জানতে পেরেছিলাম। আমরা দুজনেই নার্দার চরিত্রগুলোকে নকল করতে চেয়েছিলাম কিংবা গ্রীষ্মে মাসাতলান-এর সমুদ্রের ধারে একটা ছোট্ট বাড়ি ভাড়া করতে। ওটা যদিও ইতালির সমুদ্রতীর নয় তবু সামান্য কল্পনাশক্তির সাহায্যে ওর মত কোন জায়গা তো বটেই।
তারপর বড় হলাম। আমাদের অ্যাডভেঞ্চারগুলো আমাদের কাছেই আর পছন্দসই লাগত না। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মেক্সিকোর তরুণেরা সাল্ভাদারো এলিজোন্দোকে নকল করে তলিয়ে যেতে লাগলাম। এমনকী কখনও অননুকরণীয় কিওসোভস্কিকেও নকল করতাম। কিংবা ধীরে ধীরে ব্যাবসায় ঢুকে বা সরকারী চাকরিতে ঢুকে মুটিয়ে যেতে থাকলাম। অথবা কখনও মুখোশধারী চ্যারিটেবল সংস্থা বা কখনও বামপন্থী সংস্থাগুলোয় অন্ধের মত ঢুকতাম আবার বেরিয়ে যেতে থাকলাম। এলিজোন্দো-র বইগুলো পুনর্পঠনের ইচ্ছে করত না আর। চিত্রকর কাভেরনাস তখন আমাদের অনিঃশেষ আগ্রহ শুষে নিচ্ছেন। এবং তার প্রতিটি কামড়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরো একটু গরীবম আরো একটু রোনা, আরো একটু কুৎসিত আরো একটু হাস্যকর হয়ে যেতে লাগলাম। তারপর বন্ধু ইরাপুয়াতোয় ফিরে এল। আর আমি মেক্সিকো ডি এফ-এ রয়ে গেলাম। এবং যেভাবেই হোক না কেন আমরা দুজনেই আমাদের জীবনের ধীরগতিতে জাহাজডুবি হবার ব্যাপারটা অনাগ্রহী হয়ে পড়ছিলাম। নান্দনিকতার ধীর ভরাডুবি, নীতির ভরাডুবি মেক্সিকোর আমাদের ফাকিং স্বপ্নের ধীর ভরাডুবি হচ্ছিল।
কিন্তু বন্ধুত্বটাকে আমরা প্রাণপণ রক্ষা করছিলাম। আর সেটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেখানেই আমরা আমাদের যৌবনের গল্প করছিলাম, ভয়ঙ্কর রকমের উড়ুউড়ু, বড্ড মাতাল হবার গল্প। হঠাত বন্ধুটা সেই বুড়ি ইন্ডিয়ান জাতির মহিলার কথা মনে করল, যে মাড়িতে ক্যানসার হয়ে মারা গেছিল। আমাদের কলাবিদ্যার ইতিহাস আলোচনা মনে করল, বিশেষ বিষয়ের ওপর কথাবার্তা মনে করল। ফুটপাথ দুটোর কথা বলল। (আমি আবার ও বিষয়টার প্রায় কিচ্ছু মনে রাখতে পারি নি) এবং শেষমেশ খাবারটার দিকে মন দিয়েছি যেখানে আমাদের সঙ্গে খোসে রামিরেসের দেখা হয়েছিল। সংক্ষেপে যেখানে ও পৌঁছতে চেয়েছিল। আমায় জিজ্ঞেস করেছিল কেমন লাগল ওকে। তবে এমনভাবে প্রশ্নটা করেছিল ও আমি কিন্তু নিশ্চিত ছিলাম না ও কার সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিল ও নিজে না কি সেই বয়ঃসন্ধির ছেলেটার সম্বন্ধে। আর নিজের শরীরটাকে জুতে আনার জন্য বললাম আমি কারো কথাই ভাবি নি। কিংবা হয়ত এমন একটা ভঙ্গী করেছিলাম যা দেখে নানারকম অর্থই বের করা যেতে পারত। আর আমার বন্ধু ঠিক পরের কাজটাই ছিল যে আমি আদৌ বিশ্বাস করেছি কি না, আমার মাথায় এটা ঢুকেছে কি না যে ও আর সেই রামিরেস মানে ওইসব বেশি পাকা আর বাড়াবাড়ি রকমের মেক্সিকান ছেলেপিলের ভেতর কিছু ব্যাপার ছিল কি না। আর আমি বললাম ভগবানের ভয়ে নয়, হাত, কিভাবে তোমার মাথায় এল এটা, এত হাওয়ায় ভাসিয়ে দিও না চিন্তাটাকে, কিংবা হয়ত আমিই বাড়াবাড়ি করছি এখন, আমার স্মৃতি বাড়াবাড়ি করছে। হয়ত বাড়াবাড়ি করছিও না। হয়ত তখন ছ্যাঁদা নিজে নিজে খুলে গেছিল। বিল্ডিংটা নকল ফাঁকা ছিল এমনটাই অনুভব করেছিলাম। প্রথমবার ইন্ডিয়ান ছেলেটা যখন আমাদের দিকে এগিয়ে এসেছিল আমি ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম যখন আমরা কথা বলছিলাম নিজেরা অথবা আমার বন্ধু কথাবলছিল কিংবা ইন্ডিয়ান বুড়িটা মরতে বসেছিল। তখন সবকিছু আমায় অতিক্রম করে গেল, মানে তখন হয়ত মাতাল হয়ে গেছিলাম, আমাদের আবির্ভূত যৌবন আমাদের পঠনপাঠন। কিংবা কোনকিছুই না আবার হয়ত গ্রীস্মকালেরম এলিজোন্দোর একটা জাতীয় গৌরব, মাসাতলান-এ আমাদের কাল্পনিক ও স্বেচ্ছাগমনের গ্রীষ্মকাল। আমার প্রেমিকা আশ্চর্যজনক ভাবে বদলে ফেলেছিল তার সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষার কেরিয়ারের দিশা, বছরগুলো, কাভেরনাস আর আমার বন্ধুর আর্ট গ্যালারি। ইরাপুয়াতোয় আমার যাওয়া, ইরাপুয়াতোর রাস্তাগুলো এত শান্ত, বন্ধুর রহস্যময় সিদ্ধান্ত যে ওখানেই সে সেটল করবে, ওখানেই প্র্যাকটিস করবে, যখন সবকিছু সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল...
আর তখন ও বলল—তোর খোসের সঙ্গে আলাপ করা উচিৎ। ‘আলাপ’ ক্রিয়াপদটার ওপরে জোর দিল ও। আলাপ তোর করাই দরকার। আমি, আমি না। আমি ওইসব শ্রেণীর মধ্যে পড়ি না। তুই জানিস। আমি নয়। তারপর মৃত ইন্ডিয়ান বুড়িটার কথা বলল, কোঅপারেটিভে কাজ করার কথা বলল। আর বলেই চলল—আমি না, আমি নয় নিশ্চিত। তাই না? আমি বললাম—হ্যাঁ তাই। তারপর আমরা বার বদলালাম। হাঁটার সময় ও বলল আমায়—কাল দেখা হবে। আমি বোধহয় জানতাম ও মোটেই মাতাল ছিল না যে পরদিন একথা ওর মনে পড়বে না। জানতাম প্রতিজ্ঞা হল প্রতিজ্ঞা, তাই না? সত্যি। তারপর কয়হা বলার অন্য বিষয় খুঁজতে থাকলাম। ওকে ছোটবেলার একটা ঘটনার কথা বললাম, যখন একবার আমাদের বিল্ডিঙের লিফটের ভেতর আটকে গেছিলাম। তখন সেখানে একাই ছিলাম, সত্যি। বন্ধু হাসিমুখে আমার কথা শুনল। ভাবটা এমন তোর মত বোকা ছাগলের পক্ষেই এরকম সম্ভব। তারপর মেক্সিকো ডি এফ এ বহুবছর ধরে ওইসব কালো কাজকম্মো কেমন করে হয়েছিল, তারপর পড়া ও গবেষণা করা বইগুলো ওইসব কালো ধান্দাওয়ালা কী সব পড়েছিল, কি শেখানো হয়েছিল ইত্যাদি। কিন্তু আমি জোর করলাম। একাই ছিলাম। বহুক্ষণ একা ছিলাম। কখনও কখনও (খুব ক্বচিৎ সত্যির চেয়েও বেশি কিছু) সেকথা লিফটের ভেতরে অনুভব করেছিলাম আমি। জানিস কেন? বন্ধুটা এমন মুখভঙ্গী করল যেন ও জানতে চায় না। নীরসভাবে বলল কারণ সে ছোট ছিল। ওঁর উত্তরটা এখনো মনে আছে। মুখ ঘুরিয়ে গাড়িটা কোথায় পার্ক করেছে খুঁজতে লাগল।
বাঞ্চোত! কাল সকালে দেখবি সত্যিটা কি!
পরদিন সকালে দেখা গেল কিচ্ছু ভোলেনি। বরঞ্চ বলা যায় যা যা ভুলে গেছিল সব মনে করছে। যে ভাবে কথাবলছিল দেখে মনে হচ্ছিল খোসে রামিরেস ওর শিক্ষক বুঝি। আমার মনে পড়ে সে রাতে আমরা এমন সাজগোজ করেছিলাম যেন কোন বেশ্যার কাছে নইলে শিকার করতে যাচ্ছি। যেন অভিযানে যাচ্ছি এমন কিছু ভাবতে ভাবতে বন্ধু বাদামি রঙের করডুরয়ের আর আমি চ্যামড়ার জ্যাকেট পরে নিলাম।
সন্ধ্যে সন্ধ্যে লাগছে, দাড়ি কাটার পরে যেমন গন্ধ বেরোয় তেমনি গন্ধের সাথে প্রথমেই হুইস্কি মেরে দিলাম কয়েক পাইট। খোসে রামিরেস যে বস্তিতে প্রায়ই যায় সেখানে রওনা হলাম আমরা। রাস্তার ধারে কয়েকটা রোডসাইড কাফেটেরিয়া পড়ল। (যেকোন একটায় খাবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু কারোরই খিদে পায় নি তখনো)। ‘আকাশ’ নামের ক্যান্টিনটায় উঁকি মারলাম ইন্ডিয়ান জনজাতির ব্যাটাচ্ছেলের কোন চিহ্ন নেই।
আমরা যখন রাতটাকে ফুরিয়ে ফেলছিলাম, এমন একটা অদ্ভুত রাত যে রাতে দুজনের কেউই প্রায় কথাই বলিনি, একটা আবছা আলোয় ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে আসতে দেখলাম ওকে মানে আন্দাজ করলাম ওইই আসছে। বন্ধু হর্ন বাজাল। একটা রেকলেস ম্যানুভার প্রায় উলটে পড়ছিল গায়ে। ভয় পেয়ে গেছিল। জানলার কাচ নামিয়ে অভিবাদন করল। আমার মাথা ডিঙিয়ে ঘাড় উঁচু করে বন্ধু ওকে ভেতরে আসতে বলল। একটা কথাও না বলে ছেলেটা গাড়িতে উঠে এল। সে রাতের বাকী স্মৃতি আমার দুর্দান্ত। এক্কেবারে যেমন ইচ্ছে খুশির স্মৃতি। মনে হচ্ছিল যে আমরা ছেলেটা জন্মদিন পালন করছি। আমরা যেন ওর বাবা মা। যেন সৎ বাব মা। যে দুই সাদা দুঃখী মেক্সিকান পুরুষ একজন ইন্ডিয়ান জাতির মেক্সিকানকে রক্ষা করছি। আমরা হাসছিলাম। পান করছিলাম হাসছিলাম কারো সাহস হচ্ছিল না আমাদের দিকে এগোয় কিংবা ঠাট্টা করে কেননা বন্ধু যদি ওকে না মেরে ফেলত তাহলে আমি নিজেই তাকে মারতাম।
আমরা খোসে রামরেসের কাহিনি বা তার অবশেষ শুনছিলাম, এমন কাহিনি যা শুনতে শুনতে আমি আর আমার বন্ধু উত্তেজিত হয়ে উঠছিলাম। আমি অবশ্য প্রথমে একটু হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু পরে আমিও উত্তেজিত হয়ে উঠছিলাম। কিন্তু পো-র কবিতার মত যত রাতের অজানা বাঁকে এসে উপস্থিত হচ্ছিলাম সেসব ঝাপসা হয়ে আসছিল। যেন ছেলেটার গলপ আমাদের স্মৃতিতে রয়ে যাবার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না। আর সে কারণেই ওর কথাগুলো প্রায় মনেই পড়ে না। আমি জানি, কেননা ও বলেছিল একটা কবিতা লেখার ওয়ার্কশপে গেছিল ও। কবিতা লেখার একটা ফ্রি ওয়ার্কশপ। অনেকটা গরীবের মেডিক্যাল কোওপারেটিভের মত। শুধু সেটার সাহিত্যিক ভারসান। রামিরেস একটা কবিতাও লেখে নি। শুধু আমার বন্ধুর দিকে তাকয়ে একটা মোচড় দেওয়া হাসি হেসেছিল যা আমি বুঝিনি। আমি মজার কিচ্ছু বুঝি নি যতক্ষণ না জানলাম রামিরেস গদ্য লিখেছিল। গদ্য। কবিতা নয়। তখন ওকে জিজ্ঞেস করলাম সেক্ষেত্রে গদ্যের ওয়ার্কশপে যোগ দেয় নি কেন। আমার দাঁতের ডাক্তার বন্ধুটা বলল কারণ গদ্যের কোন ওয়ার্কশপই ছিল না। বুঝলি? এই জঘন্য মফস্বল ফ্রি তে শুধু কবিতারই ওয়ার্কশপ আছে।
তারপর রামিরেস ওর পরিবারের কথা বলল। অথবা হয়ত বন্ধুটা ওর পরিবার সম্পর্কে বলল। আর ওটা সম্বন্ধে আমার কিছু বলার ছিল না। বুঝলি? কিস্যু না। কিংবা আমি হয়ত বড় বড় ব্যাপার বুঝিই না। তবে একঘরে হয়ে যাবার ভয়ে আমি ফাঁকা বিল্ডিং আর প্রতারণার কথাই বলে গেলাম। কিন্তু আমাকে বন্ধু ইশারায় থামিয়ে দিল। কিছু বলার নেই। কৃষকেরা। খিদেয় মরে যাওয়া মানুষ। বুঝলি? উল্টোটা সইতে পারব না বলে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম। কিন্তু আসলে কিছু বুঝি নি। পরে বন্ধু বলল আমাদের চারপাশে যারা লেখালেখি করে তাদের মধ্যে কম জনই ছেলেটার মত লেখে। মাইরি বলছি, খুব কম জন। তারপর রামিরেসের সম্বন্ধে বিশদে বলা শুরু করল গদগদ হয়ে ব্যাপারটা আমায় হিমশীতল করে দিল।
সবচেয়ে বড় কথা ও বলল বয়ঃসন্ধির এই ভাবলেশহীন, মাঠে কাজ করার সুবাদে পেশিবহুল চেহারার মেক্সিকান জনজাতির ছেলেটার পাশে মেক্সিকান গল্পলেখকেরা ছোট্ট কলিজার শিশুর মত। কিন্তু কি ক্ষেত? জিজ্ঞেস করলাম। যে ক্ষেত আমাদের চারপাশে আছে—আঙুল দিয়ে বৃত্ত আঁকতে আঁকতে বলল বন্ধু। এমন করে বলল যেন ইরাপুয়েতো জঙ্গলের মাঝখানে অ্যাপাচে জাতির কোন এলাকা। তখন চোখের কোন দিয়ে ছেলেটাকে দেখলাম, ভয়ে ভয়ে তাকালাম। দেখলাম ও হাসছে। পরে বন্ধু রামিরেসের একটা গল্প বলল। একটা ছেলে যার অনেকগুলো ভাইবোন। তাদের দেখভালের দায়িত্ব তারই, এটাই ছিল কাহিনী। অন্তত প্রথম দিকটায় তাইই ছিল। পরে যদিও প্লটে বাঁক আসে আবার পরক্ষণেই এক বৃত্তে ফিরে আসে। গল্পটা একটা বোতল বন্দী শিক্ষাবিদের ভূতের কাহিনি হয়ে যায়। তাছাড়াও সেটা ব্যক্তিগত মুক্তির কাহিনীও বটে। অন্যান্য চরিত্রও ঢোকে। দুজন জঘন্য কোয়াক ডাক্তার, একজন বিশের কোঠায় বয়সের ড্রাগ অ্যাডিক্ট মেয়ে, বড় রাস্তায় পড়ে থাকা পরিত্যক্ত একটা অকেজো মোটরগাড়ি যেটা একজন লোককে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছিল। আর সব ঘটনা একুটাই গল্পে—বন্ধু বললে উঠল।
আর আমি যে কিন্যা বিদ্যের জোরে বলতে পারতাম—এটা ভাল আর সেটা শোনাতও আকর্ষণীয়। বলতে পারতাম লেখাটা ভাল কিন্তু বললাম পুরো মতামত দিতে গেলে পুরোটা পড়ে নেওয়া ভাল। আমি উল্টোটা বলতে পারতাম তাহলে বেঁচে যেতে পারতাম। কিন্তু বললাম ঠিক এটাই। তখন বন্ধু রামিরেসকে বলল গদ্যটা নিয়ে আসতে। আমার মনে আছে রামিরেস না উঠে তার দিকে চাইল। তারপর কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল। আমি প্রতিবাদ করতে পারতাম। বলতে পারতাম এটার দরকার নেই। কিন্তু ততক্ষণে আমি জমাট হয়ে গেছি। আমার কিছুতেই কিছু যায় আসে না। যদিও ভেতরে ভেতরে মানে একেবারে গহন অন্দরে লক্ষ্য করছিলাম হাভভাব যা আমরা করছিলাম। তাও আবার অতিমানবীয় নিখুঁত ভাবে। যদিও জানতাম যে ঠিকানা ঠিক করেছি আমরা সেটা আমাদেরই ধাক্কা দিচ্ছে এক অবশ্যম্ভাবী বিপদের দিকে জানতাম এভাবেই এক বিপজ্জনক অঞ্চলে ঢুকে যাচ্ছি আমরা সেখান থেকে ব্যাথা না পেয়ে দাম না চুকিয়ে বেরোতে পারব না। পরবর্তীকালে সে জন্য আক্ষেপ করব।
কিন্তু কিছুই না বলে বার থেকে বেরিয়ে এলামম বন্ধুর গাড়িতে উঠে বসলাম। ইরাপুয়াতোর দিকে গাড়ি ছোটালাম। রাস্তায় কেবল রাতের গাড়িগুলো আর পুলিশের গাড়ি টহল দিচ্ছে। আর আমার বন্ধুর মতে মহোল্লাসে গাড়ি চালাচ্ছি। আর রামিরেস শহুরে হানার পরে প্রতি ভোর আর প্রতি রাতে হেঁটে ফিরত। ঠিক করলাম একটা কথাও আর বলব না। রাস্তার মিটমিটে আলোগুলোর দিকে চেয়ে রইলাম। আমাদের গাড়ির আলো দূরের উঁচু প্রাচীরের গায়ে খোদাই করা ম্যুরালের ওপর, পরিত্যক্ত কারখানার গুদামে, পড়ে প্রতিফলিত হচ্ছিল। সেইসব কারখানা যাদের ভরসায় শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তারপর আমরা পড়ে থাকা বিল্ডিং ভরা শহরের দিকে চলে গেলাম। রাস্তা সঙ্কীর্ণ হয়ে এসেছিল। কুকুরের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। ডাক্তার বললেন—সাঞ্চেজের পবিত্র সন্তান এরা, না, হাত, তাই না? আমি উত্তর দিলাম না। পেছন থেকে রামিরেজের গলা শুনলাম, বাঁদিকে দুবার বেঁকতে তারপর সিধে যেতে বলছিল।
গাড়ির হেডলাইটের আলোটা দুটো কাঠের বেড়া দিয়ে ঘেরা ভাঙা কুঁড়েঘরের গায়ে বুলিয়ে দিয়ে গেল। পৃথিবীর এক রাস্তা। এক সেকেন্ডেই আমরা এমন একটা জায়গায় রইলাম যেটাকে মাঠ ও বলা যায় বাঁ আবর্জনা জমানোর ভ্যাটও। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে এগোলাম। ইন্ডিয়ান মেয়েটার পথ দিয়ে। রামিরেজ যাত্রা শুরু করল। পেছন পেছন ডাক্তার তার পেছনে আমি। দূর থেকে একটা মেঠো পথ। গাড়ির আলোগুলো পিছলে পিছলে যাচ্ছিল, কোন খানে কে জানে। কিন্তু সেই দূরত্বতেও একটা মিল খুঁজে পেলাম। নৃশংস ... একটা নিশ্চিত ক্রূরতা আমাদের গন্তব্যের দিকে। একটা পাহাড়ের সিল্যুয়েট দেখলাম। অন্ধকারে ঝোপঝাড়ের ভেতর কিছুর নড়াচড়া মনে হল। মনে হল ইঁদুর বুঝি। অথচ পাখিও হতে পারত ওরা। তারপর চাঁদ উঠল। পাহাড়ের ঢাকে বাড়িগুলোকে দেখতে পেলাম। অনেক দূরে অন্ধকার মাঠের ওপাশে একটা কষ্টে বানানো একটা বাঁকানো রাস্তা। একটা কৃত্রিম ল্যামপোস্টের মত একটা পাহাড় ছিল। হঠাত ওই কিছোর ছেলেটার গলা শুনলাম। বন্ধুকে কিছু একটা বলল আর আমরা থেমে গেলাম। কোথা থেকে ফুঁড়ে উঠল একটা বাড়ি। সাদা হলুদ একটা বাড়ি। ছাতটা নিচু। রাতের ইরাপুয়াতোর সব দুঃখী বাড়িগুলোর মতই একটা বাড়ি।
এক মুহূর্তের জন্য তিনজন থমকে গেলামম আমি বলব মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম, চাঁদের দিকে চেয়েছিলাম কিংবা কিশোরটির ওই ছোট গন্ডীর দুঃখময় জীবন অথবা উঠোনে স্তূপ হয়ে জমে থাকা জিনিষগুলোর সংকেত উদ্ধার করছিলাম—স্রেফ নিশ্চিত হয়ে বাক্স ফারাক করছিলাম। তারপরে নিচু ছাদওয়ালা একটা ঘরে ঢুকলাম আমরা, ঘরটায় ধোঁয়ার গন্ধ ছিল। রামিরেস একটা লন্ঠন জ্বালালো। তারপর একটা টেবিল দেখলাম, মাটি খোঁড়ার বেলচাও । সেটা দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে রাখা আছে। একটা বাচ্চা ছেলে কৌচে বসে ঝিমোচ্ছে।
ডাক্তার আমার দিকে তাকাল। উত্তেজনায় ওর চোখ চকচক করছিল। সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল
যা করছি সবই অসাড়। সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল যা করছি সবই অসাড়। অপমানের চিন্তার চেয়ে অন্য কোন পরিণতির জন্য একটা রাতের টাইমপাস মাত্র। অন্যরকম আর স্বকীয়। আমি প্রতিবিম্বিত করলাম। রামিরেস কাঠের দুটো চেয়ার টেনে নিয়ে এল। তারপর দরজার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেল। যে দরজাটা দেখে মনে হচ্ছিল লাঙলের ঘায়ে খুলে গেছে। বুঝতে দেরী হল না যে ও ঘরটা মূল বাড়িটার সঙ্গে সম্প্রতি জোড়া হয়েছে। আমরা বসে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। যখন ওকে ফের দেখা গেল তখন হাতে ওর পাঁচ সেন্টিমিটারের চেয়ে বেশী মোটা দু দিস্তা কাগজ। নতুন করে মনোযোগ নিয়ে ও আমাদের পাশে বসল। আমাদের ওগুলো দিল। যা পড়তে চায় ওরা সেসব পড়ল। ফিসফিস করল। আমার বন্ধু দিকে চাইলাম। কাগজপত্রের মধ্যে ইতিমধ্যেই লেখা একটা গল্প ছিল। পৃষ্ঠাগুলোকে সাবধানে গুছিয়ে রাখতে বলল। তাকে বললাম আমার মনে হয় কাগজগুলোকে নিয়ে গিয়ে ওর বাড়িতে বসে আরাম করে ওগুলোকে পড়াই আমার পক্ষে ঠিক মনে হচ্ছে। সম্ভবত এরকম ছিল না ব্যাপারটা। কিন্তু এখন তো ওরকমই মনে হচ্ছে। দৃশ্যটাকে অন্য ভাবে ভাববার কথা মনে হয় নি। এটা বলাই ভাল যে ভাল হত যদি আমরা যেতাম বা আমরা যদি আরো বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে বিষয়টা পড়তাম। আর ডাক্তার এক মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত আসামীর মত কড়া চোখে আমার দিকে চেয়ে থাকছিল আর নির্দেশ দিচ্ছিল যাতে যে কোন একটা গল্প যে কোন আবোলতাবোল সময়ে আমি পড়ি।
আর সেটাই আমি করলাম। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলাম। একটা গল্প বেছে পড়তে লাগলাম। গল্পটায় চারটে পৃষ্ঠা ছিল। হয়ত সেকারণে ছট হওয়ার জন্যই ওটা বাছলাম আমি। কিন্তু যখন শেষ করলাম মনে হল যেন একটা আস্ত উপন্যাস পড়ে শেষ করলাম। রামিরেসের দিকে তাকালাম। আমাদের সামনে বসেছিল ও। ঘুমের তাল করছিল। আমার বন্ধুটাও আমার সঙ্গে সঙ্গে দেখল। ফিসফিস করে বলল অল্পবয়সী লেখকটা রোজ খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে। মাথা নাড়ালাম, তারপর আর একটা গল্প বেছে নিলাম। রামরেসকে দেখার জন্য ফের যখন তাকালাম দেখলাম হাতে ভর দিয়ে ঘুমোচ্ছে ও। আমারও ঘুম ঘুম একটা ভাব হচ্ছিল। তবে এখন আমি পুরোপুরি জেগে গেছি। একপাশে ওটাকে ঝেড়ে ফেললাম। যেটা পড়ছিলাম সেটা শেষ করলাম। ডাক্তার আমায় যে গল্পটা দিয়েছিল সেটা পড়তে শুরু করলাম।
সেদিন রাতে যতগুলো গল্প পড়েছিলাম তার শেষ গল্পটা পড়া শেষ করতে করতে আমার সামনে অন্য একটা দরজা খুলে যাচ্ছিল। আর সামনে এমন একজনের ছবি উঠে আসছিল যার বয়স আমাদের মতনই হবে তবে দেখে ঢের বেশী বয়স্ক লাগে। চুপচাপ হেঁটে উঠোনের দিকে যেতে যেতে আমাদের দিকে চেয়ে এক ঝলক হাসল। খোসের পাপা। আমার বন্ধু বলল। অথবা বাইরে টিনের ঠোকাঠুকির শব্দ পাচ্ছিলাম কিংবা কতগুলো পায়ের আওয়াজ যা থেকে শক্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। মনে ঝচ্ছিল কেউ খোলা জায়গায় পেচ্ছাপ করছে সেই আওয়াজ। অন্য পরিস্থিতিতে এটাই যথেষ্ট হত যাতে মানুষ সতর্ক থাকে। ওইসব আওয়াজ এক রকমে বিশেষ ধরনে তার মানে বের করায় মন থাকত পুরোপুরি। কিন্তু আমি যা করলাম তা হল শুধু পড়ে গেলাম।
মানুষ কখনও পড়া শেষ করে না। যদিও বইয়েরা শেষ হয়ে যায়। ঠিক যেভাবে মানুষ বাঁচা শেষ করে না যদিও মৃত্যু বিষয়টা একটা নিশ্চিত ঘটনা। তবে শেষ পর্যন্ত আমরা বলি আমাদের বুঝতে যাতে সেই পাওয়া সময়টুকুতে আমি আমার পাঠটুকু শেষ করে দিই। বহুদিন হল আমার বন্ধু সেসব পড়ে না। অকে দেখলে ক্লান্তি বোঝা যায়। অকে বললাম আমরা যেতে পারি। আমরা ওঠার আগেই দেখলাম রামিরেসের শান্ত ঘুমন্ত মুখ। বেরনোর সময় দেখলাম ও জেগে গেল। উঠোনে কেউ ছিল না। চারপাশের মাঠঘাট দেখে মনে হচ্ছিল পরিত্যক্ত। আমায় জিজ্ঞেস করল পোপ কোথায় থাকতে পারেন। বন্ধুটা ওর গাড়িটাকে ইঙ্গিত করল। আর আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম তার ফল। সেই প্রেক্ষিতে গাড়িটাকে তত অদ্ভূত লাগল না আমার। একটা অতুলনীয় ছবি। আমায় সেকথা বলল সে। এখন আর ফিসফিস করে নয়। ওর কন্ঠস্বর কেমন শোনাল আমার কানে। ঘড় ঘড় করে শোনাচ্ছিল। যেন সারাটা রাত ওর চেঁচামেচি করে কেটেছে। বলল- চল সকালের খাবার সেরে ফেলি। রাজি হলাম। বলল—আমাদের সঙ্গে কি হয়েছিল চলো সেসব বলি তোমাকে।
সে জায়গা ছেড়ে যেতে যেতে সেই না পৌছনোর জায়গাগুলোর ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম। যাকগে। আমরা যা যা বলতে পারি তা যে কত সামান্য। আমাদের দুজনেরই বেশ খুশি খুশি লাগছিল। কিন্তু নিঃসন্দেহে বুঝতে পারছিলাম, আর নিজেদের বলার প্রয়োজন মনে করছিলাম না। সেসব ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা নেই। যে প্রকৃতিতে আমরা বসবাস করেছি তাকে ব্যাখ্যা করারও নয়।
আমরা যখন বাড়ি ফিরলাম ঘুমোতে যাবার আগে আমি নিজেই দুটো হুইস্কি ঢেলে দিলাম। আমার বন্ধু দেয়ালে নিজের গর্তর দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল। নিজের গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে চেয়ারে গা এলিয়ে বসলাম। কিছু বলি নি। ডাক্তার আগে জারের গায়ে খোদাই করা কারুকাজের ওপর হাত বোলাল তারপর একটা হাত টেবিলে ভর দিয়ে চুলে হাত চালাতে লাগল। হাসি পেল। সেও হেসে উঠল। এল মুহূর্তের জন্য মাথায় খেলে গেল যে ছবিটা ও ধরবে, তারপর নিখুঁত করে ওটা ধ্বংস করতে শুরু করবে। কিন্তু তার জায়গায় ও আমার ঠিক পাশেই বসে রইল। নিজের হুইস্কিতে চুমুক দিচ্ছিল। পড়ে আমরা ঘুমোতে গেলাম।
অনেক নয়। পাঁচ ঘন্টা মত। আর আমি রামিরেস ছোকরার বাড়ি ঘুমোলাম। মেয়েটাকে দেখলাম নোংরা মেক্সিকান মরুভূমির মত পরিত্যক্ত জমিতে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হয় যেন এভাবেই সেজে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। এমন ভাবে যেন সে রাতে সারারাত জুড়ে নিশ্চিতভাবে সাহিত্য সম্পর্কিত বিষয়ে ওর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। এক সেকেন্ডে ভেবে নিলাম কলাবিদ্যার রহস্য, তার গোপন প্রকৃতি। কিন্তু তারপর সেই এক স্বপ্নে ইন্ডিয়ান বুড়িটার মরা শরীর যার মৃত্যু হয়েছে কর্কট রোগে। তারপর সব ভুলে গেলাম। মনে হয় ওনাকে রামিরেসের বাড়িতে সবাই রাত জেগে দেখেছিল।
যখন জেগে উঠলাম ডাক্তারকে ঘটনাটা বললাম। কিংবা স্বপ্নের যতটুকু আমার মনে ছিল। তোর মুখটা বাজে দেখাচ্ছে—ও বলল। বাস্তবে ওর মুখটাই বিচ্ছিরি দেখাচ্ছিল। যদিও আমি ওকে এসব কিছুই বলি না। দ্রুত আবিষ্কার করলাম একাই আমি ভাল ছিলাম। ওকে যখন বললাম আমি শহরটা চক্কর দিতে বেরোব দেখলাম ওর মুখে একটা নিশ্চিন্তির আলো ফুটে উঠল। সেদিন বিকেলে সিনেমা দেখতে গেলাম। সিনেমার মাঝখানে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। স্বপ্ন দেখলাম আমরা আত্মহত্যা করেছি কিংবা অন্যকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করছি। যখন বাড়ি ফিরলাম দেখলাম বন্ধু আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমরা ডিনার সারতে বের হলাম। আগের দিন কি কি হয়েছে সে বিষয়ে কথা বলতে শুরু করলাম। বৃথা গেল। ডি এফ এর কিছু বন্ধুবান্ধবদের কথা বলে শেষ করলাম। সেইসব লোকেরা যাদের বেড়ে ওঠার সময় থেকে চিনি, যারা বাস্তবে সত্যি সত্যিই একে অপরের কাছে নিখুঁত ভাবে অপরিচিত। সব কিছু বিরুদ্ধ হলেও ডিনার অপ্রত্যাশিত ভাবে খুব স্বাদু ছিল।
পরের দিন সেদিন শনিবার ছিল আমি ওর সঙ্গে ওর অফিসে গেলাম। সেখানে গরীব মানুষদের সার্বজনীন চিকিৎসার কাজ করবার ছিল। কমিউনিটির প্রতি, আমার স্বেচ্ছা সেবার কাজকর্ম গাড়িতে উঠতে উঠতে সে অবসরের কথা বলল। ভাবছিলাম রবিবার ডি এফের যাব। ভেতরে ভেতরে ভাবছিলাম বন্ধুর সঙ্গে যতটা বেশি সম্ভব সময় কাটিয়ে নিই। আমি জানি না কতখানি সময় লাগবে যতক্ষণ না আমি ওকে ফের দেখব।
অনেকটা সময় ধরে (কতখানি সময় আমার মেপে দেখতে সাহস হল না) আমরা অপেক্ষা করছিলাম- ডাক্তার, দন্ত বিজ্ঞানের ছাত্র আর আমি, একজন খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ·
লেখক ও অনুবাদকের পরিচিতি : রোবেরতো বোলানিও (১৯৫৩–২০০৩) ছিলেন চিলির অন্যতম প্রভাবশালী ঔপন্যাসিক, কবি ও গল্পকার। লাতিন আমেরিকার সমকালীন সাহিত্যে তিনি এক বুনো, অনুসন্ধানী শক্তি, যাঁর লেখায় মিশে থাকে নির্বাসন, সহিংসতা, কবিতা ও রহস্যের অদ্ভুত টান। The Savage Detectives–এর জন্য তিনি Rómulo Gallegos Prize পান, আর মৃত্যুর পর প্রকাশিত 2666 তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করে। জীবনের শেষ দশকে অসাধারণ তাড়নায় লেখা তাঁর কাজগুলো আজও পাঠকদের জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
অপরদিকে, জয়া চৌধুরী বাংলা ভাষার অনুবাদক ও কবিস্বর, যিনি লাতিন আমেরিকার সাহিত্যকে বাংলায় এনে দিয়েছেন এক নতুন স্বচ্ছতা ও সংবেদন। কোর্তাসারসহ বহু লাতিন লেখকের জটিল, বহুস্বরিক গদ্য তিনি অনুবাদ করেছেন এমন এক মিতব্যয়ী ভাষায়, যেখানে মূলের ছন্দ, অস্থিরতা ও আলো-অন্ধকারের টান অক্ষুণ্ণ থাকে। সম্পাদনা ও অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বাংলা পাঠকের সামনে খুলে দিয়েছেন লাতিন বিশ্বের নারীকণ্ঠ, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও গল্পের বহুবর্ণ মানচিত্র। তাঁর কাজের ভঙ্গি শান্ত এবং গভীর পাঠের প্রতি এক আন্তরিক শ্রদ্ধায় নির্মিত।


0 মন্তব্যসমূহ