অনুবাদ : শাহাব আহমেদ

দক্ষিণের পর্বত সমূহের মধ্যে লুভিনা হচ্ছে সবচেয়ে উঁচু, সবচেয়ে পাথুরে। এটি ধূসর বর্ণের চুনাপাথর দিয়ে পরিপূর্ণ হলেও ওরা এখান থেকে চুন সংগ্রহ করে না বা অন্য কোনো কাজেও লাগায় না। তারা একে অপরিশোধিত পাথর বলে এবং যে পাহাড়টা এখান থেকে লুভিনার দিকে চলে গেছে তাকে বলে অপরিশোধিত পাথুরে পাহাড়। রৌদ্র এবং বাতাস নিজেরাই দায়িত্ব নিয়েছে একে চূর্ণ-বিচূর্ণ ও চুরচুরে করার, তাই মাটি এখানে সততই সাদা ও উজ্জ্বল, যেন তা সবসময়ই ঝলমল করতো ভোরের শিশিরে, যদিও এটা লোকে বলে কিন্তু লুভিনায় দিনেরা রাতের মতই শীতল এবং শিশির মাটিতে পড়ার আগে আকাশেই জমে যায়।

মাটি এখানে খুবই খাড়া এবং সবদিক থেকে গভীর ও নিতল গিরিসংকট দিয়ে তা হিংস্রভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। লোকে বলে লুভিনায় স্বপ্নেরা আসে গিরিসংকট থেকে কিন্তু আমি যা আসতে দেখেছি তা হল বাতাস, যেন খাঁদের নিচটাকে কেউ মুচড়িয়ে শিস দেওয়া বেনুবাঁশে বদলে দিয়েছে। এমনই বাতাস যা দুলকামারা পর্যন্ত গজাতে দেয় না, সেই বিষণ্ণ গুল্ম যা সবগুলো হাত দিয়ে শিলা পাহাড়ের দূরারোহ পার্শ্বদেশে একবিন্দু মাটি আঁকড়ে ধরেও গজাতে পারে।

কদাচিত, যেখানে পাথরের মাঝে একটু ছায়া থাকে, সেখানে শিকালোট ফোটে সাদা সাদা পপি ফুলে। কিন্তু শিকালোট দ্রুতই শুকিয়ে যায়। তারপরে শোনা যায় বাতাসে তার কাঁটাযুক্ত ডালের আঁচড় কাটার শব্দ, শান-পাথরে ছুরির শব্দের মত। “লুভিনার ওপর দিয়ে যে বাতাস বয়, তুমি তা দেখতে পাবে। তা ঘন অন্ধকার। লোকে বলে, আগ্নেয়গিরির বালিতে ভরা তাই; যা হোক, কালো বাতাস। তুমি দেখতে পাবে। লুভিনার জিনিসপত্র সে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে যেন দাঁত দিয়ে কামড়ে দেবে। এবং প্রায়শই তা ঘরের ছাদ তুলে নিয়ে যায়, মাথা থেকে টুপি উড়িয়ে নেবার মত, খালি দেয়ালগুলো ফেলে রেখে। এই বাতাস আঁচড় কাটে যেন তার নখ আছে: তুমি তা শুনতে পাও, কী সকালে, কী রাতে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, না থেমে, দেয়াল খামচিয়ে, মাটির টুকরো ছিঁড়ে, ধারালো বেলচা দিয়ে দরজার নীচে খুঁড়ে, যতক্ষণ না তুমি অনুভব করো যে এটি তোমার ভেতরে টগবগ করছে তোমার হাড়ের কব্জাগুলি খুলে নেবার জন্য। তুমি অবশ্যই দেখতে পাবে।”

যে লোকটি কথা বলছিল, সে বাইরের দিকে তাকিয়ে একটু থামে। বটগাছের ডালপালার মাঝ দিয়ে আসা ফুলেফেপে ওঠা নদীর শব্দ এসে পৌঁছায় তাদের কাছে, আমন্ড গাছের পাতায় মৃদু ঝিরঝির করা শব্দের সাথে, আর আসে দোকানের আলোতে আলোকিত ছোট স্থানটিতে খেলারত শিশুদের চিৎকারের শব্দ।

উঁইপোকা উড়ে এসে তেলের প্রদীপটিতে আঘাত পেয়ে পোড়া ডানা নিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। বাইরে রাত বেড়ে চলে।

“এই কামিলো, আরো দুটি বিয়ার দাও।”—লোকটি আবার বলে। তারপরে সে যোগ করে, “আরো একটা জিনিস আছে, সেঙর। আপনি লুভিনায় কখনই নীল আকাশ দেখতে পাবেন না। পুরোটা দিগ্বলয় জুড়ে অপরিচ্ছন্ন ও মলিন একটা রং যা সর্বক্ষণ একটি কালো দাগ দিয়ে আচ্ছন্ন করে রাখে এবং কখনই মিলিয়ে যায় না। পাহাড়গুলো নগ্ন ও নিষ্পাদপ, দৃষ্টিকে বিশ্রাম দেয়ার মত সবুজ কিছু নেই, সবকিছুই ধূসর ধোঁয়ায় আবৃত। তুমি দেখতে পাবে জিনিসটা কী, ওই পাহাড়গুলো নীরব, যেন তারা মৃত এবং এখানকার সর্বোচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় সাদা বাড়িগুলো নিয়ে লুভিনা যেন মৃতের মাথার মুকুট—”

শিশুদের হট্টগোলটা কাছে এগিয়ে এসে দোকানে প্রবেশ করে। লোকটি উঠে দরজার কাছে যায়, ওদের লক্ষ্য করে চিৎকার করে, “সরে যা তোরা এখান থেকে, আমাদের বিরক্ত করিস না। খেল কিন্তু এত হৈ চৈ করিস না।”

তারপরে টেবিলের কাছে ফিরে আসে, বসে, বলে, “হ্যাঁ, যা বলছিলাম, সেখানে খুব একটা বৃষ্টি হয় না। বছরের মাঝামাঝি কিছু ঝড় হয় যা পৃথিবীকে চাবকিয়ে ছিন্নভিন্ন করে যায়, পাথুরে খোলার ওপরে নুড়ি ছাড়া আর কিছুই থাকে না। দেখতে ভালো লাগে মেঘগুলো কীভাবে হামাগুড়ি দেয়, এক পাহাড় থেকে লাফিয়ে অন্য পাহাড়ে যায়, স্ফীত থলির মত আছড়ে পড়ে এবং বজ্রধ্বনি করে যেন উঁচু খাড়া পর্বতের উপর ভেঙে পড়ছে। কিন্তু দশ বারো দিন যেতে না যেতেই তারা চলে যায় এবং পরের বছর পর্যন্ত ফিরে আসে না। কখনও কখনও বেশ কয়েক বছর তাদের দেখা মেলে না। না, খুব বেশি বৃষ্টি হয় না। প্রায় না বললেই চলে, তাই পৃথিবী শুধু শুকিয়ে, চামড়ার মতো কুঁচকেই যায় না, ফাটলে ভরে যায় এবং শক্ত মাটির টুকরোগুলো হাঁটার সময় ধারালো পাথরের মতো পায়ে বিঁধে, যেন পৃথিবী নিজেই এখানে কাঁটার চাষ করেছে। ঠিক এমনটাই অনুভূত হয়।

ফেনার বুদবুদগুলো অবশিষ্ট রেখে সে বিয়ারের বোতলটি নামিয়ে রাখে, তারপরে বলে চলে: “যখনই লুভিনার দিকে তাকাবে, দেখবে এটা খুবই বিষণ্ণ জায়গা। তুমি সেখানে যাচ্ছো, জানতে পারবে। আমি বলব, এটা এমনি জায়গা যেখানে দুঃখ বাসা বেঁধে আছে। যেখানে হাসি জিনিসটা সম্পূর্ণ অজানা, যেন মানুষের মুখগুলো জমে গেছে। আর, চাইলে তুমি যেকোনো সময় সেই বিষণ্ণতা দেখতে পাবে। সেখানকার বাতাস এই বিষণ্ণতাকে এখানে সেখানে ঘুরিয়ে আনলেও কখনই সম্পূর্ণভাবে নিয়ে যায় না। মনে হয় যেন এর জন্ম ওখানেই এবং তুমি প্রায় এর স্বাদ নিতে পারো এবং অনুভব করতে পারো, কারণ তা সর্বদাই তোমার ওপরে, তোমার বিরুদ্ধে, এবং তা হৃদয়ের জীবন্ত মাংসের ওপর একটি বড় প্লাস্টারের মতো ভীষণ ভারী অনুভূত হয়।

সেখানকার লোকেরা বলে, যখন পূর্ণিমা চাঁদ থাকে, তখন তারা বাতাসের দেহটিকে স্পষ্ট দেখতে পায় লুভিনার রাস্তা দিয়ে বয়ে যেতে পেছনে একটি কালো কম্বল বহন করে; কিন্তু আমি সেখানে দেখতে পেতাম, চাঁদ শুধুই হতাশার প্রতিচ্ছবি, সবসময়।

"কিন্তু আপনার বিয়ারটা শেষ করেন। দেখতে পাচ্ছি ঠোঁটই ছোয়াননি। খান, খেয়ে দেখেন। নাকি এ রকম গরম বিয়ার আপনার পছন্দ না। কিন্তু আমাদের এখানে এটাই একমাত্র বিয়ার, জানি এর স্বাদ খুব খারাপ, খচ্চরের পেশাবের মতো। অভ্যাস হয়ে যায়। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারি, আপনি ওখানে এটাও পাবেন না। লুভিনায় গিয়ে এর জন্য হা-হুতাশ করতে হবে। ওখানে বড়জোর হোয়াসে গাছ থেকে তৈরি এক ধরনের লিকার পান করতে পারবেন, যার প্রথম ঢোক গেলার পরেই আপনার মাথা ঘুরতে থাকবে পাগলা চরকির মতো, মনে হবে মাথাটি কিছুর সাথে ঠোক্কর খেয়েছে। তাই এই বিয়ারটাই খান। আমি ঠিকই বলছি।"

বাইরে থেকে এখনও নদীর স্রোতের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। বাতাসের শব্দও। বাচ্চারা খেলছে। মনে হচ্ছে সন্ধ্যা এখনও বেশিদূর গড়ায়নি।

লোকটি আবার দরজার কাছে যায়, তারপরে ফিরে এসে বলে : “তুমি যেখানে নেই, তার স্মৃতিচারণ করা সহজ। কারণ ওখানকার কোনো কিছুই এখানে নেই। কিন্তু যখন লুভিনার প্রসঙ্গ আসে আমার তা নিয়ে কথা বলতে একটুও সমস্যা হয় না। আমি সেখানেই ছিলাম। আমি আমার জীবন সেখানেই রেখে এসেছি। সেখানে গিয়েছিলাম স্বপ্ন নিয়ে এবং ফিরে এসেছি বৃদ্ধ ও জড়াজীর্ণ হয়ে। আর এখন আপনি সেখানেই যাচ্ছেন। তাই ঠিক।

আমার শুরুর কথাগুলো মনে আছে। আমি নিজেকে আপনার জায়গায় রেখে ভাবি, যখন আমি প্রথম লুভিনায় যাই—আচ্ছা, আপনার বিয়ারটি পান করতে দেবেন? আমি দেখছি আপনি তার প্রতি কোনোই মনোযোগ দিচ্ছেন না। এটা আমাকে অনেক সাহায্য করে, স্বস্তি দেয়, মনে হয় যেন মাথাটা কর্পূর তেল দিয়ে ঘষে দিয়েছে—যা বলছিলাম, আমি যখন প্রথমবার লুভিনায় পৌঁছাই, খচ্চরচালক আমাদের নিয়ে গিয়েছিল, সে তার পশুদের বিশ্রামও দিতে চাচ্ছিল না। আমাদের নামিয়ে সাথে সাথেই ঘুরে দাঁড়ায়।”
“আমি ফিরে যাচ্ছি,” সে বলে।

“দাঁড়াও, তুমি কি প্রাণীগুলোকে একটু বিশ্রাম দেবে না? ওরা তো ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।”
“এখানে থাকলে ওদের অবস্থা আরও খারাপ হবে।” সে বলে, “চলে যাওয়াই ভালো।”

এবং সে দ্রুতবেগে নালের আঘাতে ঘোড়াগুলোকে তাড়া করে এবড়োথেবড়ো পাথুরে পাহাড়ের পথ ধরে চলে যায়, যেন সে ভূতুড়ে কোনো জায়গা থেকে পালাচ্ছে।

স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে আমি সেখানে থেকে যাই, নগর চত্বরের মাঝখানে, আমাদের সমস্ত জিনিসপত্র হাতে। সেখানে একমাত্র শব্দ শুনতে পাই, বাতাসের শব্দ। একটি খোলা ময়দান, বাতাস রোধ করার কোনো বৃক্ষ নাই। এমন একটি জায়গায় উপস্থিত হয়েছি আমরা।

স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করি, “কোন দেশ এটা, আগ্রিপিনা?”
সে কিছু না বলে কাঁধ নাড়ায়।
“তোমার যদি অসুবিধা না হয়, যাও একটু খোঁজ করে দেখো কোথায় আমরা কিছু খাবার পাবো এবং রাত কাটাতে পারব। আমরা এখানে অপেক্ষা করি।”---আমি বলি।

সে সবচেয়ে ছোট বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে চলে যায়, কিন্তু আর ফিরে আসে না।

গোধূলির কালে যখন সূর্য নেমে এসেছে পাহাড়ের ওপর, আমরা তার খোঁজে বের হই। লুভিনার সরু পথগুলো ধরে হাঁটি, অবশেষে তাকে আমরা গির্জায় পাই। সেই নির্জন গির্জার মাঝখানে বসে আছে সে, বাচ্চাটি ঘুমিয়ে আছে তার কোলে।

“তুমি এখানে কী করছো, আগ্রিপিনা?”
“প্রার্থনা করতে এসেছি”, সে বলে।
“কেন?” আমি প্রশ্ন করি।

সে কাঁধ নাড়ায়।

সেখানে কেউ প্রার্থনা করতে আসেনি। পুরনো পরিত্যক্ত, দরজাহীন, শুধু কিছু উন্মুক্ত বারান্দা ও দরদালান এবং ছিদ্রে ভরা চাল, ঝাঁঝরির মতো বাতাস ঢোকে যেখান দিয়ে।

“খাবার দোকান কোথায়?”
“এখানে কোনো খাবার জায়গা নেই।”
“থাকার জায়গা?”
“তেমন কিছুও নেই।”
“তুমি কাউকে দেখতে পেয়েছো? কেউ বাস করে এখানে?” আমি প্রশ্ন করি।
“হ্যাঁ, রাস্তার ঐ পাশে কয়েকজন মহিলা, এখনও দেখা যায়। ঐ যে দেখো, দরজার ছিদ্রের পেছনে কয়েকটি উজ্জ্বল চোখ আমাদের দেখছে। তারা এদিকেই তাকিয়ে আছে। দেখো তাদের দিকে। আমি তাদের জ্বলজ্বলে চোখ দেখতে পাই। কিন্তু আমাদের খেতে দেবার মত কিছুই তাদের নেই। তারা মাথা বের না করেই আমাকে বলেছে যে এই শহরে খাবার কিছু নেই। তখনই আমি এখানে এসেছি ঈশ্বরের কাছে সাহায্য চাইতে।”
“তুমি কেন ফিরে যাওনি, আমরা তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম?”
“আমি প্রার্থনা করতে এসেছি এবং এখনও তা শেষ হয়নি।”
“এটা কোন দেশ, আগ্রিপিনা?”

এবং সে কাঁধ নাড়ায় আবার।

সে রাতে আমরা সেই গির্জার এক কোনায় যেখান থেকে বেদীটি ভেঙে ফেলা হয়েছে ঘুমানোর ব্যবস্থা করি। বাতাস যদিও সেখানেও পৌঁছেছে তবে অত তীব্র নয়।

শুনতে পাই বাতাস আমাদের ওপর দিয়ে দীর্ঘ আর্তনাদের স্বরে বয়ে যাচ্ছে বিরামহীন। ভেতরে আসছে, আবার বের হয়ে যাচ্ছে দরজার ফাঁকা গর্ত দিয়ে, হাওয়ার মুষ্ঠি দিয়ে আঘাত করছে ‘ভিয়া ক্রসিস’ বা চার্চের দেয়ালের পূর্ণ দৈর্ঘ্যে তার দিয়ে সারি সারি ঝুলানো বিশাল, রুক্ষ মেসকিট কাঠের ক্রুশগুলোকে, যারা হাওয়ার প্রতিটি দমকায় দাঁত কড়মড় করার শব্দ করছে।

বাচ্চারা ভয় পেয়ে না ঘুমাতে পেরে চিৎকার করছে। আমার স্ত্রী সবাইকে তার বাহুবেষ্টনে উষ্ণ আলিঙ্গনে ধরে রাখতে চাচ্ছে। আর আমি, আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করা উচিৎ।

সূর্যোদয়ের কিছু আগে বাতাস একটু থিতু হয়। তারপরে ফিরে আসে আবার। কিন্তু ভোরের এই সময়টায় সামান্য সময়ের জন্য সবকিছু স্থির হয়ে ছিল, যেন আকাশটা মাটিতে নেমে এসেছে নিজ ভারে পৃথিবীর সমস্ত শব্দকে চুরমার করে দিয়ে….ঘুমন্ত শিশুদের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। পাশে আমার স্ত্রীর ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।

“কী এটা?” সে জিজ্ঞেস করে।
“কিসের কথা বলছো?” আমি প্রশ্ন করি।
“ঐযে, ঐ আওয়াজটা।”
“নৈশব্দের শব্দ। ঘুমাও। একটু বিশ্রাম নাও সামান্য সময়ের জন্য হলেও, শিগগিরই সূর্য উঠে যাবে।”

কিন্তু আসলে আমিও শব্দটা শুনতে পেয়েছি। মনে হচ্ছিল যেন অন্ধকারে বাদুড়েরা পাখা ঝাপটাচ্ছে ঠিক আমাদের পাশেই। যেন তারা বড় বড় পাখা দিয়ে মাটি আঁচড়াচ্ছে। আমি উঠি এবং পাখা ঝাপটানোর শব্দটা বেড়ে যায়, যেন কিছু একটা বাদুড়ের ঝাঁকটিকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে, এবং তারা এখন দরজার ছিদ্রগুলোর দিকে উড়ে যাচ্ছে। আমি পা টিপে টিপে সেদিকে হেঁটে যাই, সামনে সেই একঘেয়ে মৃদু শব্দ। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তাদের দেখতে পাই। দেখতে পাই লুভিনার সকল নারী, কাঁধে তাদের জলের কুঁজো, মাথা থেকে শালগুলো ঝুলে আছে এবং তাদের কালো শরীরের কায়া রাতের কালো পটভূমিতে।

“কী চাই তোমাদের?” আমি প্রশ্ন করি। “রাতের এ সময়ে তোমরা কিসের সন্ধান করছো?”
“আমরা জল আনতে যাচ্ছি।” একজন বলে।

তারা সামনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপরে ছায়ার মত রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করে জলের কালো কুঁজো কাঁধে নিয়ে।

“না, আমি কখনই ভুলবো না, লুভিনার প্রথম রাতটির কথা। আপনার কি মনে হয় না আমাকে আর একটি বিয়ার দেবার সময় হয়েছে? আর যাই হোক অন্তত আমার স্মৃতির বিস্বাদটুকু মুখ থেকে সরাতে। মনে হচ্ছে আপনি জানতে চেয়েছেন কত বছর আমি লুভিনায় ছিলাম, তাই না?

সত্য হল, আমি জানি না। সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছি যখন থেকে জ্বরের তোড়ে আমার সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেছে। কিন্তু অনন্ত এক কাল হবে নিশ্চয়ই—সময় সেখানে বড় দীর্ঘ। কেউ সেখানে ঘণ্টা গোনে না, কেউ লক্ষ্যও করে না কিভাবে বছরের ওপরে বছরগুলো স্তুপীকৃত হয়। দিনগুলো শুরু হয়ে শেষ হয়ে যায়। তারপরে রাত আসে। শুধু দিন আর রাত, মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এবং যা আসলে তাদের জন্য আশার দিন।

আপনি হয়তো ভাবছেন আমি একই প্রসঙ্গে বার বার বলছি। হ‍্যাঁ, আমি তাই, সেঙ্গর, দরজার সামনে বসে থাকা, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা, মাথা উঁচু করা, মাথা নীচু করা যতদিন পর্যন্ত না বসন্তগুলো অপচয় হয়ে যায়, তারপরে সবকিছু স্থির, সময়হীন, যেন এভাবেই বেঁচে আছি চিরকাল। বুড়ো মানুষেরা সেখানে তাই করে।

কারণ প্রকৃত বৃদ্ধেরা ও যারা এখনও জন্মগ্রহণ করেনি, লোকে তাই বলে, লুভিনায় বাস করে। এবং দুর্বল নারীরা, এতই শীর্ণ, যেন হাড়ের ওপরে শুধু চামড়া ছাড়া আর কিছু নেই। সেখানে জন্মানো শিশুরা চলে গেছে, তারা দিনের আলো প্রায় দেখেইনি, বড় হয়ে গেছে। তাই লোকে বলে, তারা মায়ের স্তন ফেলে মাটিতে ঝাঁপ দিয়েই উধাও হয়ে গেছে। লুভিনায় এটাই চল।

“সেখানে থাকে শুধু বৃদ্ধেরা ও নি:সঙ্গ নারীরা। শুধু ঈশ্বরই জানেন তাদের স্বামীরা কোথায় এবং যারা মাঝে মধ্যে এসে উদয় হয় ঝড়ের সময়টাতে (যে প্রসঙ্গে আমি আপনাকে বলেছি), তাদের শব্দ শোনা যায় শহরের সর্বত্র যখন তারা ফিরে আসে বুড়োদের জন্য ব্যাগভর্তি খাদ্য নিয়ে এবং নারীদের গর্ভে আরও একটি সন্তানের বীজ বপন করে যখন চলে যায় সর্বত্রই একটা অসন্তোষ ও অভিযোগের পরিবেশ বিরাজ করে। তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না পরের বছর পর্যন্ত—এটাই রীতি। সেখানে ভাবা হয় এটাই আইন এবং এর কোনো পরিবর্তন হবে না। শিশুরা তাদের জীবন কাটায় পিতা-মাতার জন্য কাজ করে। কারণ পিতা-মাতা এক সময় কাজ করেছে তাদের জন্য। তারা জানে বহু প্রজন্ম ধরে এই দায়িত্ব পালন হয়ে এসেছে—এই সময়ে বৃদ্ধেরা দরজার সামনে বসে তাদের জন্য অপেক্ষা করে আর অপেক্ষা করে মৃত্যুর, তাদের বাহু ঝুলে থাকে শিথিলভাবে, যা নড়ে শুধুমাত্র তাদের সন্তানদের কৃতজ্ঞতায়, সেই নিঃসঙ্গ লুভিনায়।

একদিন আমি তাদের অন্য কোথাও উর্বর ভূমিতে চলে যাবার জন্য উদ্বুদ্ধ করি, “চলুন এখান থেকে চলে যাই” - বলি। “আমরা কোথাও না কোথাও থিতু হবার স্থান খুঁজে পাবো, সরকার আমাদের সাহায্য করবে।”

তারা আমার কথা শোনে চোখের পলক না ফেলে, আমার দিকে তাকিয়ে থাকে দৃষ্টির গহীন থেকে, যেখান থেকে সামান্য আলো ছাড়া আর কিছুই বের হয় না।

“তুমি বলছো, সরকার আমাদের সাহায্য করবে, তুমি সরকার সম্পর্কে জানো?”
আমি বলি, “জানি।”
“আমরাও জানি, ঘটনাক্রমে। কিন্তু সরকারের মা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।”
আমি বলি, “এটা তাদের দেশ।” তারা মাথা নাড়ে, “না।” তারপরে তারা হাসে। এই একবারই আমি লুভিনার মানুষকে হাসতে দেখেছি। তারা দাঁতহীন মুখ কিড়মিড় করে এবং বলে, “না, সরকারের কোনো জন্মদাত্রী নেই।”

এবং “আপনি জানেন, তারাই ছিল সঠিক? শুধু ঈশ্বর মনে রেখেছে, যখন তাদের এক সন্তান সেখানে ছোট কোনো অন্যায় করে, তখন সরকার তার খোঁজে লুভিনায় লোক পাঠায় এবং তাকে হত্যা করে। এ ছাড়া তারা জানেই না যে, লুভিনায় মানুষ বাস করে।”

“তুমি বলার চেষ্টা করছো যে আমাদের লুভিনা ছেড়ে যাওয়া উচিত কারণ তুমি মনে করো আমরা কারণ ছাড়াই যথেষ্ট অনাহার সহ্য করেছি”, তারা বলে। “কিন্তু যদি চলে যাই, আমরা কি আমাদের মৃতদের সাথে নিয়ে যেতে পারবো? তারা এখানে বাস করে এবং আমরা তাদের একা ফেলে যেতে পারি না।”

“তাই তারা এখনও সেখানেই আছে। যাচ্ছেন যখন দেখতে পাবেন। ক্ষুধা দূর করার জন্য এখনও শুকনো মেসকিট গাছের শাঁস চিবিয়ে এবং নিজস্ব থুথু গিলে সেখানেই আছে। আপনি তাদের ছায়ার মত হেঁটে যেতে দেখবেন, দেখবেন বাড়ি-ঘরের দেয়াল ধরে বাতাস তাদের প্রায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে।”

“আপনারা কি এই বাতাস শুনতে পান না?”-আমি অবশেষে তাদের প্রশ্ন করি, “এই বাতাসই আপনাদের শেষ করে দেবে।”

“ততদিনই এই বাতাস বইবে, যতদিন তার বইবার কথা। ঈশ্বরের ইচ্ছা তাই।”—তারা উত্তর দেয়। “যখন তা থেমে যাবে, নিয়ে আসবে আমাদের সর্বনাশ। যেদিন তা ঘটবে রৌদ্র গলে পড়বে লুভিনায় এবং আমাদের রক্ত ও সামান‍্য যে আর্দ্রতাটুকু আছে চামড়ায়, শুষে নেবে। বাতাস সূর্যকে ওই উঁচুতে সরিয়ে রাখে এবং তাই আমাদের জন‍্য মঙ্গলকর।”

“আমি তাদের আর কিছু বলিনি। আমি লুভিনা ছেড়ে আসি, আর কখনোই ফিরে যাইনি এবং যাবার ইচ্ছাও নেই। কিন্তু দেখুন পৃথিবীটা কিভাবে ঘুরছে। এখন আপনি সেখানে যাবেন কয়েক ঘণ্টা পরে। সম্ভবত পনেরো বছর আগে আমাকেও কেউ একজন বলেছিল, তুমি সান হুয়ান লুভিনায় যাচ্ছো।”

“ওই দিনগুলোতে তখনও গায়ে বল ছিল, আরছিল স্বপ্ন ও কল্পনায় পরিপূর্ণ মাথা—আপনি জানেন আমরা সবাই স্বপ্ন ও অভিপ্রায়ে টইটুম্বুর। এবং কেউ কেউ এগিয়ে যায় সেইসব জন্জাল মাথায় নিয়ে। আমিও চেষ্টা করেছিলাম লুভিনায় কিন্ত সাফল্য আসেনি, সবকিছু ভেঙে পড়েছিল।”

সান হুয়ান লুভিনা। নামটি আমার মনে হয়েছে স্বর্গীয় একটি নাম। কিন্তু আসলে এটা পাপিষ্ঠের শুদ্ধিলয়। একটি মৃত জনপদ যেখানে এমনকি কুকুরগুলোও মরে গেছে, সুতরাং সেখানে একটি প্রাণিও নেই ঘেউ ঘেউ করে নিরবতা ভাঙার জ‍ন‍্য। দ্রুতই আপনি শক্তিশালী বাতাসে অভ‍্যস্ত হয়ে যাবেন, যে বাতাস সেখানে বয় এবং শুধু শুনতে পাওয়া যায় নিরবতা, যা সেই নি:সঙ্গ জায়গায় রাজত্ব করে। তা মানুষকে আশাহত ও নিরাশ করে ফেলে। আমার দিকে তাকিয়ে দেখুন, আমার কী অবস্থা হয়েছে। আপনি সেখানে যাচ্ছেন, শিগগিরই বুঝতে পারবেন আমি কী বলছি।

কী মনে করেন যদি আমরা এই ছেলেটিকে একটু মেসকাল ঢালতে বলি? বিয়ার খুব ঘন ঘন উঠতে বাধ্য করে এবং আমাদের গল্পে বাধা দেয়।
“এই কামিলো আমাদের দুটো মেসকাল দাও এবার।”
“বেশ, যা বলছিলাম…”

কিন্তু সে বলে না কিছু। টেবিলের একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর দিকে তাকিয়ে থাকে যেখানে কতগুলো উঁই পোকা পাখা হারিয়ে নগ্ন কৃমির মত নড়ছিল।

বাইরে এগিয়ে আসা রাতের পদশব্দ শোনা যাচ্ছিল। বটগাছের কাণ্ডে শব্দ করছিল নদীর জল। যে শিশুরা চিৎকার করছিল তারা এখন অনেক দূরে। খোলা দরজা দিয়ে রূপালি আকাশের তারারা উঁকি মারছিল।

উঁইপোকাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা লোকটা হঠাৎ টেবিলে এলিয়ে পড়ে, তারপরে ঘুমিয়ে যায়। ·


লেখক ও অনুবাদকের পরিচিতি : হুয়ান রুলফো লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের পুরোধা লেখক। তিনি বিশ্বখ্যাত হয়েছেন মূলত দুটি বইয়ের জন্য। একটি তার উপন্যাস ‘পেদ্রো পারামো’, অন্যটি গল্পগ্রন্থ ‘লেলিহান প্রান্তর’—ইংরেজিতে The Burning Plain (স্প্যানিশ El Llano en llamas)। রুলফোর গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে, ‘পেদ্রো পারামো’ প্রকাশের দু’বছর আগে।