সেদিন রাত্রে ফ্র্যাঙ্ক স্কারলেটকে, আন্ট পিটিকে আর বাচ্চাদের মেলানির জিম্মায় রেখে অ্যাশলেকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে গেলেন। স্কারলেট ক্ষোভে আর অপমানে ফেটে পড়তে পারত। এত রাত থাকতে আজ রাতেই কেন রাজনৈতিক সভা করার জন্য ওঁরা বেরিয়ে যেতে পারলেন? কী ব্যাপার, না রাজনৈতিক সভা! সন্ধ্যেবেলাতেই স্কারলেটের ওপর এমন একটা আক্রমণ হয়েছে, ভাল মন্দ কিছু একটা হয়েই যেতে পারত ওর, আর ঠিক সেই রাতেই! এরকম হৃদয়হীন হয়ে স্বার্থপরের মত এমন একটা কাজ উনি করতে পারলেন? শুনেছেন পুরো ঘটনাটা, আশ্চর্যজনক রকম শান্তভাবে। স্যাম যখন ওকে বাড়ি নিয়ে এল, ফোঁপাচ্ছে তখনও, পোশাক কোমর অবধি ছেঁড়া। ঘটনাটা কাঁদতে কাঁদতে যখন বলছিল, ফ্র্যাঙ্ক একবারের জন্যও ফুঁসে উঠে দাড়ি টেনে ছেড়ার চেষ্টা করেননি। শান্তভাবে জানতে চেয়েছিলেন, “তুমি কি আঘাত পেয়েছ, সোনা – না কি শুধু ভয় পেয়েছ?”
রাগে আর কান্নায় বাকরুদ্ধ হয়ে স্কারলেট জবাব দিতে পারেনি। স্যামই ওর হয়ে জবাব দিল। স্কারলেট ভয়ই পেয়েছে।
“ওঁর ড্রেস ছিঁড়ে আর বেশি কিছু করার আগেই আমি ওখানে পৌঁছে গেছিলাম।”
“খুব ভাল ছেলে তুমি, স্যাম। তুমি যা করেছ, আমি ভুলে যাব না। যদি তোমার জন্য আমি কিছু করতে পারি – ”
“হ্যাঁ স্যার, যত তাড়াতাড়ি হয় আপনি আমাকে তারাতে পাঠিয়ে দিতে পারেন। ইয়াঙ্কিরা আমার পেছনে লেগেছে।”
ওর বক্তব্যও ফ্র্যাঙ্ক খুব শান্তভাবে শুনলেন। কোনও প্রশ্ন করলেন না। যে রাত্রে টোনি এসে দরজায় ধাক্কা দিয়েছিল, ঠিক সেদিনের মতই ওঁর হাবভাব। এই পুরো ব্যাপারটাই যেন পুরুষমানুষদের এক্তিয়ারে পড়ে, আবেগ না দেখিয়ে, যথা সম্ভব কম কথা বলে ব্যাপারটা সামলে নিতে হবে।
“যাও তুমি বগিতে গিয়ে বোসো। পিটারকে বলব তোমাকে রাফ অ্যান্ড রেডি পর্যন্ত আজ রাতেই তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে। ওওখনো জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে থেকে রাতটা কাটিয়ে নিতে পারবে। সকাল জোনসবোরো থেকে ট্রেন ধরে নিও। সেটাই নিরাপদ হবে … নাও সোনা, এবার কান্না থামাও। যা হবার হয়ে গেছে, তোমার সেরকম চোটও কিছু লাগেনি। মিস পিটি, আপনার স্মেলিং সল্টের শিশিটা একটু দেবেন? আর ম্যামি, স্কারলেটের জন্য এক গেলাস ওয়াইন নিয়ে এস।”
স্কারলেট কান্নায় ভেঙে পড়ল। ক্রোধের অশ্রু। চাইছিল একটু সহানুভূতি, ভেবেছিল উনি রেগে উঠবেন, প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলবেন। এমনকি উনি যদি রেগে গিয়ে ওকে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে উনি আগেই সাবধান করেছিলেন যে এরকম কিছু হতে পারে, সেটাও মেনে নিত। অথচ উনি ঘটনাটাকে তেমন গুরুত্বই দিলেন না, যেন একটা আকস্মিক দুর্ঘটনা! হ্যাঁ, উনি খুবই ধীরস্থিরভাবে ওর সব কথা শুনেছেন, কিন্তু মনটা যেন অন্য কোথাও পড়ে ছিল, যেন এর চেয়েও জরুরী কোনও একটা বিষয় নিয়ে বেশি ভাবিত।
আর সেই জরুরি বিষয়টা কী? না একটা তুচ্ছ রাজনৈতিক সভা!
যখন উনি ওকে পোশাক পালটে তৈরি হয়ে নিতে বললেন যাতে উনি ওকে মেলানির বাড়িতে সন্ধ্যেটা কাটানোর জন্য পৌঁছে দিতে পারেন, তখন ও নিজের কানকেই বিশ্বাসই করতে পারছিল না। ওঁর বোঝা উচিত ছিল কী ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন ওকে হতে হয়েছিল। এটাও ওঁর বোঝা উচিত ছিল এরকম ক্লান্ত শরীর নিয়ে আর বিধ্বস্ত মন নিয়ে সন্ধ্যেটা মেলানির বাড়িতে কাটাতে ওর একটুও ইচ্ছে করছিল না। ইচ্ছে হচ্ছিল বিছানা আর কম্বলের উষ্ণ আশ্রয়ে গরম সেঁক দিয়ে পায়ের আঙুলের সাড় ফিরিয়ে আনার আর এক পাত্র গরম ‘টডি’ পান করে আতঙ্কটা মন থেকে সরিয়ে দেবার। সত্যি উনি যদি ওকে ভালবাসতেন, কোনও কাজই ওর কাছ থেকে সারা রাত ওঁকে নড়াতে পারত না। উনি বাড়িতেই থাকতেন, নিজের হাতে ওর হাত নিয়ে বারবার বলতেন, ওর কিছু হলে উনি মরেই যেতেন। ঠিক আছে রাত্রে ফিরতে দাও ওঁকে, যখন একা পাবে, স্কারলেট ভাল মত কথা শুনিয়ে দেবে।
মেলানিদের বসার ছোট ঘরটা শান্ত আর নিবিড় – যেসব দিনে ফ্র্যাঙ্ক আর অ্যাশলেকে বেরোতে হয়, আর মহিলারা এখানে একসাথে বসে সেলাইয়ের কাজ করতে থাকে – সেই সব দিনের মতই। বেশ উষ্ণ আর প্রফুল্ল পরিবেশ। টেবিলের ওপর ল্যাম্পের হলুদ রশ্মিকে ঘিরে চারটে মাথা ঝুঁকে পড়ে ছুঁচের কাজ করে চলেছে। চারটে স্কার্ট অল্প অল্প নড়ে উঠছে। চার জোড়া ছোট ছোট পা রুচিসম্মতভাবে মেঝেতে পাতা গদীর ওপর রাখা। নার্সারির খোলা দরজা দিয়ে ওয়েড, এলা আর বিউয়ের শ্বাসপ্রশ্বাসের অনুচ্চ আওয়াজ ভেসে আসছে। আর্চি একটা টুল নিয়ে ফায়ারপ্লেসের কাছে বসে আছে, পিঠটা ফায়ারপ্লেসের দিকে মুখ করা, তামাকের জন্য গাল টোপলা হয়ে আছে, এক টুকরো কাঠ খুব মনোযোগ দিয়ে ফালা করে চলেছে। নোংরা, লোমশ বৃদ্ধ লোক আর চারজন ঝরঝরে সুন্দরী ভদ্রমহিলার এতটাই বৈপরীত্য ছিল যে মনে হচ্ছিল ও যেন ছাইরঙা একটা পাহারাদার কুকুর আর ওরা চারটে ছোট ছোট বেড়ালছানা।
উষ্মা মেশানো মৃদুস্বরে মেলানি লেডি হার্পিস্টদের সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ নিয়ে কথা বলেই চলেছিল। পরবর্তী অনুষ্ঠান নিয়ে জেন্টলমেন’স গ্লী ক্লাবের দৃষ্টিভঙ্গি ওরা মেনে নিতে পারেনি। বিকেলে মহিলারা মেলানির কাছে এসে মিউজ়িকাল সার্কল থেকে দলবদ্ধভাবে ইস্তফা দেবার ইচ্ছে জানায়। মেলানি অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, বুঝিয়ে সুঝিয়ে এই সিদ্ধান্ত মুলতবি রাখার জন্য ওদের রাজি করিয়েছে।
স্কারলেট অতিমাত্রায় উত্তেজিত হয়ে ছিল। চীৎকার করে ওর বলে উঠতে ইচ্ছে করছিল, “চুলোয় যাক লেডি হার্পিস্টরা!” ইচ্ছে করছিল নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে। চাইছিল ঘটনাটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করে ওদের ভয় পাইয়ে দিয়ে নিজের আতঙ্ক কম করতে। ও যে কত সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করেছে সেটা জানাতে চাইছিল, যাতে ও নিজেকেই বিশ্বাস করাতে পারে যে বাস্তবিকই ও খুব সাহস দেখিয়েছে। কিন্তু যতবারই কথাটা তুলতে চেয়েছে, মেলানি কৌশলে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গিয়ে অন্য কোনও নিরীহ বিষয়ের দিকে সরিয়ে দিয়েছে। এতে স্কারলেট খুব চটে যাচ্ছিল। এরাও ফ্র্যাঙ্কের মতই সহানুভূতিহীন।
কী করে এরা এত শান্ত আর খোশমেজাজে থাকতে পারে, যখন এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে ও কোনোক্রমে বেঁচে ফিরেছে? সাধারণ সৌজন্যবোধটুকুও এদের নেই, ওকে বলার সুযোগ দিয়ে স্বস্তি দিতে!
বিকেলের ঘটনাটা ওকে ভালমতই নাড়িয়ে দিয়েছে, নিজের কাছে যতটা স্বীকার করতে প্রস্তুত, তার থেকেও বেশি। যতবার সেই ক্রুর কালো মুখটার সাঁঝের অন্ধকারে ওর দিকে তাকিয়ে থাকার দৃশ্যটা মনে পড়ছে, ততবার ও ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠছে। যতবার ওই কালো হাতটা ওর বুকের ভেতর অনুভব করছে, আর শিউরে উঠছে এই ভেবে যে বিগ স্যাম ঠিক সময়ে না এসে পড়লে কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটে যেতে পারত, ততবারই ও মুখ নিচু করে চোখদুটো চেপে বন্ধ করে ফেলছে। এই শান্ত পরিবেশে নীরবে সেলাইয়ে মন দেওয়ার চেষ্টা করতে মেলানির কথা শুনতে শুনতে ওর স্নায়ু ক্রমেই আরও আড়ষ্ট হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল যে কোনও মুহুর্তে ওরা ব্যাঞ্জোর তার ছিঁড়ে গেলে যেরকম হিস করে শব্দ হয় সেরকম শব্দ করে ভেঙে পড়বে।
আর্চির কাঠ ফালা করার শব্দ ওর অসহ্য লাগছিল। ভুরু কোঁচ করে ওর দিকে তাকাল। হঠাৎ মনে হল ওখানে এক খণ্ড কাঠ নিয়ে ওর বসে থাকাটা কেমন যেন বিসদৃশ। সন্ধ্যেবেলা পাহারায় থাকলে লোকটা তো সাধারণত সোফায় চিৎ হয়ে পড়ে থাকে। ঘুমিয়ে পড়ে এমন জোরে নাক ডাকায় যে লম্বা দাড়ি থেকে থেকে হাওয়ায় ভেসে ওঠে। এর থেকেও বিসদৃশ হল মেলানি কিংবা ইন্ডিয়া কেউ ওকে মেঝেতে কাগজ বিছিয়ে নিতে বলেনি যাতে মেঝেটা নোংরা না হয়। ফায়ারপ্লেসের সামনে বিছানো কম্বলটা ইতিমধ্যেই জঙ্গল বানিয়ে ফেলেছে, আর ওরা ওটা দেখেও দেখছে না।
স্কারলেট যখন ওর দিকে তাকিয়েছিল, তখন আর্চি হঠাৎ আগুনের দিকে ফিরে সশব্দে তামাকের পিক ফেলল। ইন্ডিয়া, মেলানি আর পিটি তিনজনেই চমকে উঠলেন, যেন একটা বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে।
“এত জোরেই পিক ফেলতেই হত?” ইন্ডিয়া আতঙ্কিত গলায় চেঁচিয়ে উঠল। স্কারলেট একটু অবাক হয়েই ইন্ডিয়ার দিকে তাকাল, কারণ ও সচরাচর উত্তেজনা প্রকাশ করে না।
আর্চিও জবাবে কটমট করে ওর দিকে চাইল।
“বেশ করেছি, ফেলেছি,” শীতল স্বরে কথাটা বলেই আবার থুক করে পিক ফেলল। মেলানি ইন্ডিয়ার দিকে তাকিয়ে ভ্রূকুটি করল।
“ভাগ্যিস বাপি তামাক চিবোতেন না,” পিটি বলতে আরম্ভ করলেন। মেলানির ভুরু আরও ভাঁজ হয়ে পড়ল। ঘুরে গিয়ে খুব রূঢ় গলায় কথা বলল, এমন রূঢ় গলায় মেলানিকে কথা বলতে স্কারলেট কখনও শোনেনি।
“চুপ কর, আন্টি! তোমার কি বোধবুদ্ধি কিছুই নেই?”
“হায় কপাল!, পিটি সেলাইটা কোলের ওপর ছেড়ে দিলেন। অভিমানে মুখ কালো হয়ে গেল। “আমি জানতে চাই, কী এমন হয়েছে, যে আজ তোমার এমন গোমড়ামুখো হয়ে আছ? কিছু বললেই তুমি আর ইন্ডিয়া চিড়বিড় করে উঠছ!”
কেউ ওঁর কথার জবাব দিল না। এমনকি নিজের রুক্ষ ব্যবহারে জন্য মেলানি মাফ চাওয়ার ধার কাছ দিয়েই গেল না। উলটে বেশ রোষের সঙ্গে সেলাই করতে শুরু করল আবার।
“এক এক ইঞ্চি লম্বা ফোঁড় দিচ্ছ,” বেশ খানিকটা পরিতৃপ্তি নিয়েই আন্ট পিটি বলে উঠলেন। “প্রতিটা ফোঁড় খুলতে হবে, দেখে নিয়ো! কী হয়েছে তোমার?”
তবুও মেলানি কোনো জবাব দিল না।
কী হয়েছে এদের? স্কারলেট অবাক হয়ে ভাবে। নিজের আতঙ্ক নিয়ে এতই মগ্ন ছিল যে খেয়াল করেনি? হয়ত তাই, মেলানি যদিও চেষ্টা করে চলেছে সন্ধ্যেটা আগে কাটানো গোটা পঞ্চাশেক সন্ধ্যের মতই স্বাভাবিক লাগানোর, তবুও পরিবেশটা একটু যেন থমথমে। আজ বিকেলে যা ঘটেছে কেবল তার জন্যই এই অস্বস্তিকর ভাব, এমন সতর্কতা, তা হতেই পারে না। সঙ্গীসাথীদের দিকে স্কারলেট একবার আড়চোখে তাকাল। ইন্ডিয়ার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। দৃষ্টিটা সুবিধের মনে হল না, কেমন যেন অস্বস্তিকর, মাপা চাউনি, দৃষ্টির গভীরে ঘৃণার থেকেও বেশি কিছু যেন লুকিয়ে রাখা, এমন কিছু যা অবজ্ঞার থেকেও বেশি অপমানকর।
“এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন যা ঘটেছে, তার জন্য আমিই দায়ী,” স্কারলেট রেগেমেগে ভাবতে লাগল।
ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে ইন্ডিয়া আর্চির দিকে তাকাল। মুখে যে বিরক্তির ভাবটা ছিল সেটা এখন আর নেই। চোখে মুখে একটা চাপা উদ্বেগ। কিন্তু আর্চি ওর দিকে তাকালই না। স্কারলেটের দিকে তাকাল তার বদলে। ঠিক ইন্ডিয়ার মতই শীতল রুষ্ট দৃষ্টি।
মেলানি নতুন করে আর কথাবার্তা শুরু করল না। ঘরের ভেতর এক অস্বস্তিকর নীরবতা। তার মধ্যেই স্কারলেট বাইরে থেকে ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ শুনতে পেল। সব দিক থেকেই সন্ধ্যেটা নিরানন্দময় হয়ে উঠেছে। পরিবেশটা যে বেশ থমথমে হয়ে উঠেছে, স্কারলেট সেটা ভাল মতই অনুভব করল। সারা সন্ধ্যেতেই কি পরিবেশটা এরকমই থমথমে ছিল, স্কারলেট অবাক হয়ে ভাবল। হয়ত নিজে বিপর্যস্ত থাকার জন্যই খেয়াল করেনি। আর্চির চোখে যেন কিছুর সতর্ক প্রতীক্ষা। ওর কান থেকে চুলের গুচ্ছ বেরিয়ে এসে যেন খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেলানি আর ইন্ডিয়ার মধ্যে একটা চাপা অস্বছন্দতা। রাস্তায় ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনতে পেলেই, বা ঝোড়ো বাতাস লেগে ডালপালার আন্দোলনের, বা রাস্তায় পড়া শুকনো পাতার সামান্য সরসর শব্দ কানে আসতেই সেলাই থেকে মাথা উঠিয়ে তাকাচ্ছে। ফায়ারপ্লেসে কাঠ জ্বলে ফটফট শব্দে হলেও ওরা সচকিত হয়ে উঠছে, যেন কেউ পা টিপে টিপে আসছে।
কিছু একটা গণ্ডোগোল তো আছেই, কিন্তু কী সেটা, স্কারলেট ভাববার চেষ্টা করল। একটা কিছু ঘটতে চলেছে, অথচ ও তার বিন্দুবিসর্গও জানে না! আন্ট পিটির গোলগাল সরল মুখ, যেটা উনি অভিমানে বাঁকিয়ে রেখেছেন, তার দিকে তাকিয়ে স্কারলেট বুঝল উনিও ওর মতই অজ্ঞ। কিন্তু আর্চি, মেলানি আর ইন্ডিয়া জানে। নৈঃশব্দের মধ্যেই স্কারলেট উপলব্ধি করতে পারল ওরা খাঁচায় বন্ধ কাঠবেড়ালির মত ফুঁসে রয়েছে। ওরা কিছু একটা জানে, কিছু একটা ঘটবার প্রতীক্ষা করছে, যদিও স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু ওদের চাপা উত্তেজনা দেখেই স্কারলেট মনে মনে আরও ভয় পেয়ে গেল। অসতর্ক হয়ে ফোঁড় দিতে গিয়ে ছুঁচটা ওর বুড়ো আঙুলে ফুটে গেল। ব্যথায় কাতরে উঠতেই সবাই লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল। স্কারলেট ব্যথার জায়গাটা চেপে ধরতেই টকটকে লাল রঙের একটা বিন্দু দেখতে পেল।
“এত দুশ্চিন্তা হচ্ছে আমার, সেলাই করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে,” রিফু করার কাপড়টা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে বলে উঠল। “এত অশান্তি হচ্ছে যে আমি চেঁচিয়ে উঠতে পারি। আমি বাড়ি যাব, শুতে হবে। ফ্র্যাঙ্ক জানত তবুও বেরিয়ে গেল। নিগ্রো আর কার্পেটব্যাগারদের থেকে মেয়েদের সুরক্ষা দেওয়া নিয়ে কথা বলেই যায়, বলেই যায় আর বলেই যায়, আর যখন কিছু করে দেখানোর সময় হল তখন কোথায় সে? বাড়িতে, আমাকে সুরক্ষা দিচ্ছে? মোটেই না, উনি এখন অনেকের সঙ্গে সভা আলো করে বসে আছেন, কাদের সঙ্গে, না যারা বড় বড় কথা বলা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না, আর – ”
ওর এলোমেলো দৃষ্টি ঘুরতে ঘুরতে ইন্ডিয়ার মুখের ওপর এসে স্থির হল। ইন্ডিয়া ফোঁসফোঁস করছে। ওর পলকহীন চোখ মৃত্যু শীতলতা নিয়ে স্কারলেটের মুখের ওপর নিবদ্ধ।
“তোমার যদি খুব অসুবিধে না থাকে, ইন্ডিয়া,” কণ্ঠে শ্লেষ মিশিয়ে বলে উঠল, “আমার দিকে সারা সন্ধ্যে ধরে অমন করে চেয়ে আছ কেন, সেটা বললে খুবই বাধিত হব। খুব অসুস্থ দেখাচ্ছে নাকি আমাকে?”
“নাহ্, কী অসুবিধে? বলে অত্যন্ত আনন্দ পাব,” ইন্ডিয়ার চোখ চকচক করে উঠল। “তুমি যেভাবে মিস্টার কেনেডির মত অসম্ভব ভদ্র একজন মানুষের নিন্দে করছ, সেটাকে আমি ঘেন্না করি। কারণ তুমি যদি জানতে – ”
“ইন্ডিয়া!” মেলানি সাবধান করার মত করে বলে উঠল, সেলাইটাকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে।
“আমার মনে হয়, আমার স্বামীকে তোমার থেকে আমি বেশি চিনি,” বেশ কলহের মেজাজ নিয়ে স্কারলেট বলল। ইন্ডিয়ার সঙ্গে খোলাখুলি ঝগড়া আগে ওর কখনও হয়নি। মেজাজটা যত চড়ে যেতে থাকল, ভয়টাও ততই কমে যেতে লাগল। মেলানি ইন্ডিয়াকে চোখ দিয়ে ইশারা করল। ইন্ডিয়া অনিচ্ছার সঙ্গে চুপ করে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই আবার মুখ খুলল, আর বেশ ঘৃণার সঙ্গে শীতল গলায় কথা বলে উঠল।
“তোমাকে নিরাপত্তা দেওয়া নিয়ে যখন গলা তুলে কিছু বল, স্কারলেট ও’হারা, আমার শরীর খারপ লাগতে শুরু করে! তুমি মোটেই নিরাপত্তার ধার ধার না! যদি তাই ধারতে, তাহলে এই কয়েক মাস ধরে তুমি যা যা করে চলেছ, মোটেই করতে না! নির্লজ্জের মত সারা শহর চষে বেড়াচ্ছ, অজানা অচেনা লোকদের সঙ্গে তোমার দহরম মহরম, ভাবছ যে ওরা বিগলিত হয়ে পড়বে! বিকেলে আজ যেটা হল, সেটা তোমার পাওনাই ছিল। ন্যায় বিচার হলে তোমার আরও কড়া শাস্তি প্রাপ্য ছিল।”
“ওহ্, ইন্ডিয়া, চুপ কর তুমি!” মেলানি চেঁচিয়ে উঠল।
“বলতে দাও ওকে,” স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। “বেশ লাগছে শুনতে আমার। কবে থেকেই জানি ও আমাকে ঘেন্না করে। সেটা স্বীকার করার বুকের পাটাও ওর নেই। কেউ ওকে দেখে বিগলিত হবে জানতে পারলে ও সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত উলঙ্গ হয়েও রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে পারে!”
রাগে, অপমানে ইন্ডিয়া উঠে দাঁড়াল।
“ঠিকই বলেছ, আমি তোমাকে ঘেন্না তো করিই,” কম্পিত কণ্ঠে ও বলে উঠল। “তবে ভেবো না বুকের পাটা নেই বলে চুপ করে ছিলাম। কেন চুপ করে ছিলাম সেটা বোঝার ক্ষমতা তোমার নেই – কারণ স্বাভাবিক ভদ্রতাবোধও তোমার নেই, সহবত শিক্ষাটা তুমি পাওনি যে! যদি তুচ্ছ পারস্পরিক ঘৃণা ভুলে আমরা এক হয়ে থাকতে পারি, তাহলেই আমরা ইয়াঙ্কিদের শায়েস্তা করতে পারব। আর তুমি কী করছ – না – সব দিক দিয়ে সভ্য ভদ্র মানুষদের অসম্মানিত করে চলেছ – একজন নিষ্ঠাবান স্বামীকে লজ্জায় ফেলছ, ইয়াঙ্কিদের আমাদের নিয়ে মস্করা, তামাশা করার সুযোগ করে দিচ্ছ। আমাদের মধ্যে আভিজাত্যের অভাব রয়েছে বলে ওরা আমাদের নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করছে। ইয়াঙ্কিরা জানেই না যে তুমি আমাদের মত নও, কোনোদিনই ছিলে না। তোমার মধ্যে যে আভিজাত্যের ছিটেফোঁটাও নেই সেটা বোঝার মত জ্ঞানও ওদের নেই। বনের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আক্রমণের মুখে পড়ে তুমি ডার্কি আর বেজন্মা সাদা মানুষকে সমস্ত সুশীল মহিলাদের ওপর আক্রমণ চালাতে প্রলুব্ধ করে দিয়েছ। এবং তোমার জন্যই আজ আমাদের পুরুষমানুষদের জীবন বিপন্ন হতে চলেছে, কারণ ওরা – ”
“হে ঈশ্বর, ইন্ডিয়া!” মেলানি চেঁচিয়ে উঠল। রেগে থাকলেও স্কারলেট লক্ষ্য করল যে ঈশ্বরের নাম নিয়েও মেলানি ওকে চুপ করাতে পারল না। “তুমি চুপ কর! স্কারলেট কিছু জানে না আর তাই – তামো তুমি! তুমি কথা দিয়েছিলে না – ”
“এই মেয়েরা!” আন্ট পিটির গলায় করুণ মিনতি। ওঁর ঠোঁট কাঁপছে।
“কী আমি জানি না?” স্কারলেট দাঁড়িয়ে পড়ল। রাগে ফুঁসতে থাকা ইন্ডিয়া আর মিনতিপূর্ণ মেলানির দিকে মুখ করে দাঁড়াল।
“কচি খুকি সব,” আর্চি আচমকা বলে উঠল। কণ্ঠস্বরে ঘেন্না। কিন্তু ওঁকে কেউ ধমক দেওয়ার আগেই, পাকাচুলো মাথাটা এক ঝটকায় তুলে নিয়েই দ্রুতবেগে উঠে দাঁড়াল। “কেউ যেন আসছে। মিস্টার উইল্কস নন। আপনাদের বকর বকর থামান।”
ওর গলায় পুরুষসুলভ কর্তৃত্বের সুর। খটখট করতে করতে ওকে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে মেয়েরা একেবারে চুপ হয়ে গেল। চোখমুখ থেকে রাগও উধাও হয়ে গেল।
“ওখানে কে?” দরজায় খটখট শোনার আগেই ও জিগ্যেস করল।
“ক্যাপ্টেন বাটলার। আমাকে ভেতরে আসতে দাও।”
মেলানি এত দ্রুত ছুটে গেল যে ওর স্কার্টটা সজোরে ওপরে উঠে গিয়ে হাঁটু পর্যন্ত ওর প্যান্টালেট দৃষ্টিগোচর করে দিল। দরজার হাতলে আর্চির হাত পড়বার আগেই ওটা ধরে টান মেরে দরজা খুলে দিল। রেট বাটলার দাঁড়িয়ে আছেন। কালো টুপিটা চোখের ওপর পর্যন্ত নেমে আছে। ঝোড়ো হাওয়ায় ওঁর উত্তরীয় পাট পাট হয়ে পড়েছে। প্রথমবারের মত ওঁর সৌজন্যবোধ বিদায় নিয়েছে। মাথা থেকে টুপিও খুললেন না, বা ঘরে আর কারোর সাথে কথাও বললেন না। একমাত্র মেলানির দিকে তাকিয়ে কোনও সম্ভাষণ ছাড়াই কথা বলতে শুরু করলেন।
“গেছে কোথায় ওরা? তাড়াতাড়ি বলুন আমাকে। জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।”
স্কারলেট আর পিটি দুজনেই হতচকিত হয়ে একে অপরের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। রোগা পাতলা বেড়ালের মত নিঃশব্দে পদক্ষেপে ইন্ডিয়া মেলানির পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
“কিচ্ছু বোলো না ওঁকে,” তাড়াতাড়ি চেঁচিয়ে সাবধান করল। “উনি গুপ্তচর, স্ক্যালাওয়াগ!”
রেট ওর দিকে তাকালেনও না।
“তাড়াতাড়ি বলুন, মিসেজ় উইল্কস! হয়ত এখনও সময় আছে।”
মেলানি ভয়ে একেবারে পাথর হয়ে গেছে। ফ্যালফ্যাল করে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“কী এমন ঘটেছে – ” স্কারলেট বলতে শুরু করল।
“মুখ বন্ধ রাখুন,” আর্চি হুকুম জারি করল। “মিস মেলি, আপনিও। এই যে বদমাশ স্ক্যালাওয়াগ, মানে মানে কেটে পড়ুন বলছি!”
না, না, আর্চি! মেলানি কাতরভাবে বলল। কাঁপা হাতটা রেটের বাহুতে রাখল, যেন আর্চির হাত থেকে ওঁকে রক্ষা করবার জন্য। “কী হয়েছে? আপনি – আপনি কীভাবে জানলেন?”
রেটের গম্ভীর মুখে সৌজন্য আর অধৈর্যের একটা দ্বন্দ্ব।
“ঈশ্বরের দোহাই, মিসেজ় উইল্কস, একেবারে শুরু থেকেই ওরা সকলেই সন্দেহভাজন ছিল – তবে এতদিন ওরা চোখে ধুলো দিতে পারছিল – মানে আজকের রাত পর্যন্ত! কী করে জানলাম? দুটো মাতাল ইয়াঙ্কি ক্যাপটেনের সঙ্গে বসে আমি পোকার খেলছিলাম, ওরাই ফাঁস করে দিল। আজ রাতে যে ঝামেলা হবে, সেটা ইয়াঙ্কিদের জানা ছিল, ওরা সেজন্য তৈরিও ছিল। আর বোকাগুলো গিয়ে ফাঁদে পা দিয়ে দিল।”
এক মুহুর্তের জন্য মনে হল যেন বিশাল এক ধাক্কা খেয়ে মেলানি পড়েই যাবে। বাহু দিয়ে মেলানির কটি বেষ্টন করে রেট ওঁকে সামলালেন।
“ওঁকে বলে দিও না! উনি তোমাকে ফাঁদে ফেলতে চাইছেন!” ইন্ডিয়া চেঁচিয়ে সাবধান করল, জ্বলন্ত চোখে রেটের দিকে তাকিয়ে। “শুনলে না, উনি সন্ধ্যেবেলা ইয়াঙ্কি অফিসারদের সঙ্গেই ছিলেন?”
রেট তবুও ওর দিকে ফিরে তাকালেন না। মেলানির ফ্যাকাশে মুখের ওপরেই ওঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ।
“বলুন আমাকে। ওরা কোথায় গেছে? দেখা করবার কোনও নির্দিষ্ট জায়গা আছে কি ওদের?”
যদিও স্কারলেট আতঙ্কের মধ্যেই ছিল, ব্যাপার-স্যাপার কিছু বোধগম্যও হচ্ছিল না, তবুও ওর মনে হল আগে কখনো রেটের মত এমন ভাবলেশহীন মুখ আর দেখেনি। তবে মেলানি নিশ্চিতভাবেই আরও বেশি কিছু দেখতে পেল, যার ফলে ওর মনে হল ওঁকে বিশ্বাস করা যায়। হালকা শরীরটা ওঁর বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর শান্ত কিন্তু কম্পিতস্বরে বলল –
“ডিক্যাটুর রোড পেরিয়ে শ্যান্টিটাউনের কাছে। পুরোনো সুলিভ্যান প্ল্যান্টেশনের সেলারে – যেটার অর্ধেক জ্বলে গেছে – ওখানে ওরা দেখা করে।”
“ধন্যবাদ। তাড়াতাড়ি যাচ্ছি আমি। ইয়াঙ্কিরা যদি এখানে আসে, আপনারা কিন্তু কেউ কিছুই জানেন না।”
এত দ্রুতপদে উনি বেরিয়ে গেলেন, ওঁর কালো উত্তরীয় অন্ধকারে এত তাড়াতাড়ি মিলিয়ে গেল যে উনি যে সত্যিই এতক্ষণ এখানেই ছিলেন সেটা ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছিল ওরা। একটু বাদে নুড়ি পাথরের রাস্তা থেকে বিদ্যুতগতিতে ঘোড়ার খুরের শব্দ মিলিয়ে যাওয়া শুনতে পেল।
“ইয়াঙ্কিরা আসছে এখানে?” পিটি আর্তনাদ করে উঠেই নিজেকে সামলাতে না পেরে চেয়ারের ওপরেই পড়ে গেলেন। আতঙ্কে কেঁদে ফেলবার শক্তিটুকুও চলে গেছে।
“এসবের কী মানে? কী বলতে চাইলেন উনি? আমাকে তোমার যদি খুলে না বল, আমি পাগল হয়ে যাব!” স্কারলেট মেলানিকে ধরে জোরে ঝাঁকিয়ে দিল, যেন ঝাঁকালেই জবাবটা পেয়ে যাবে।
“মানে? এর মানে হল তুমি হয়ত অ্যাশলে আর মিস্টার কেনেডির মৃত্যুর কারণ হয়ে গেলে!” কথাটা বলার মধ্যে দুঃখ আর ভয়ের সঙ্গে ইন্ডিয়ার গলায় একটা উল্লাসের রেশও মিলে আছে। “মেলিকে ঝাঁকানো বন্ধ কর। ও অজ্ঞান হয়ে যাবে!”
“না, অজ্ঞান হয়ে যাব না,” মেলানি ফিসফিস করে বলল। একটা চেয়ার আঁকড়ে ধরল।
“হে ভগবান, হে ভগবান! কিছু বুঝতে পারলাম না! অ্যাশলেকে মেরে ফেলব? দয়া করে, কেউ আমাকে খুলে বল – ”
জঙ পড়া কব্জার মত আর্চির কণ্ঠস্বর স্কারলেটের কণ্ঠস্বরকে ছাপিয়ে গেল।
“বসে পড়ুন,” হুকুম দিল ও। “সেলাইয়ে মন দিন। কিছুই হয়নি এরকম ভাব করে সেলাই করে যান। কে জানে, ইয়াঙ্কিরা হয়ত সূর্য ডোবার পর থেকেই এই বাড়ির ওপর নজর রেখে যাচ্ছে। আমি বলছি – বসে পড়ুন – আর সেলাই করুন।”
বাধ্য মেয়ের মত ওরা কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ল। এমনকি পিটিও একটা মোজা তুলে কাঁপা আঙুলে ধরলেন, ওঁর চোখেমুখে শিশুসুলভ আতঙ্ক। সকলের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা।
“অ্যাশলে কোথায়? ওর কী হয়েছে, মেলি?” স্কারলেট আর্তনাদ করে উঠল।
“তোমার স্বামীই বা কোথায়? ওঁকে নিয়ে তোমার কোনও আগ্রহ নেই?” জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে ইন্ডিয়া বলে উঠল, গলায় আক্রোশ ফুটে বেরোচ্ছে। যে তোয়ালেটা ও রিফু করছিল, সেটা বারবার ভাঁজ করছে আর খুলছে।
“আহ, ইন্ডিয়া!” মেলানি কোনো রকমে বলার চেষ্টা করল। কিন্তু চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে কতটা যন্ত্রণা আর ধকল আড়াল করার চেষ্টা করছে। “স্কারলেট, তোমাকে আমাদের বলা হয়ত উচিত ছিল – কিন্তু – তুমি – বিকেলে এতটাই বিধ্বস্ত ছিলে যে – আমাদের – মানে ফ্র্যাঙ্ক ভাবলেন – তাছাড়া তুমি ক্ল্যানের বিরুদ্ধে এমন ঠোঁটকাটা যে – ”
“ক্ল্যান – ”
প্রথমে স্কারলেট কথাটা এমনভাবে বলল যেন নামটা এই প্রথম শুনছে, অর্থবহ হল না কিছু, কিন্তু তারপরেই –
“ক্ল্যান!” প্রায় আর্তনাদ করে উঠল। অ্যাশলে তো ক্ল্যানে ছিল না! ফ্র্যাঙ্কও থাকতে পারে না! আমাকে কথা দিয়েছিল ও!”
“মিস্টার কেনেডি অবশ্যই ক্ল্যানে আছেন, অ্যাশলেও আছে, আমাদের পরিচিত সমস্ত পুরুষমানুষই আছেন,” ইন্ডিয়া চেঁচিয়ে উঠে বলল। “ওঁরাও তো পুরুষমানুষই, নয় কি? শ্বেতাঙ্গ এবং দক্ষিণের মানুষ। তোমার তো গর্ব হওয়া উচিত ছিল, তার বদলে ওঁকে লুকিয়ে বেরোতে হত, যেন উনি লজ্জাজনক কিছু করছেন আর – ”
“তোমার সবাই গোড়া থেকেই জানতে আর আমি কিছুই জানতে – ”
“আমরা ভেবেছিলাম তুমি কষ্ট পাবে,” মেলানি করুণ মুখে বলল।
“তার মানে হল এই সব রাজনৈতিক সভার নাম করে ওরা ওখানেই যেত? ওহো, উনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন! আর এবার ইয়াঙ্কিরা এসে পড়বে আর আমার মিলগুলো দখল করে নেবে আর ওঁকে জেলে পুরে দেবে – রেট বাটলার কী যেন বলতে চেয়েছিলেন?”
ইন্ডিয়া আতঙ্কতাড়িত চোখে মেলানির দিকে তাকাল। স্কারলেট সেলাই ছুঁড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল।
“তোমার আমাকে যদি সব না বল, তাহলে আমি এক্ষুণি বেরিয়ে শহরের দিকে চললাম। আমি জনে জনে জিগ্যেস করতে করতে যাব, যতক্ষণ না আমি জানতে পারছি – ”
“বসে পড়ুন,” আর্চি দৃষ্টিবাণে স্কারলেটকে বিদ্ধ করে বলল। “আমি আপনাকে বলছি। আজ বিকেলে আপনি ছেনালি করতে বেরিয়ে নিজের দোষে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লেন। তাই মিস্টার উইল্কস আর মিস্টার কেনেডি এবং অন্যান্য আরও অনেকে ওই নিগারটা আর ওই সাদা চামড়ার লোকটাকে, যদি নাগালে পান, তবে ওদের হত্যা করবার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছেন, আর ওই শ্যান্টিটাউনের বস্তিটা মাটিতে মিশিয়ে দিতে। আর ওই স্ক্যালাওয়াগটা যেটা বলল, সেটা যদি সত্যি হয়, তাহলে ইয়াঙ্কিরা কিছু না কিছু সন্দেহ করেছে বা কোনোভাবে জানতে পেরেছে, তাই ওদের হাতেনাতে ধরবার জন্য ট্রুপ পাঠিয়ে দিয়েছে। তার মানে আমাদের লোকেরা একটা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে। আর বাটলার যদি মিথ্যে বলে থাকে, তার মানে ও একটা চর, আমাদের লোকদের ইয়াঙ্কিদের হাতে তুলে দেবে। ওরা ইয়াঙ্কিদের হাতে মারা পড়বে। আর তাই যদি ও করে তাহলে আমি নিজের হাতে লোকটাকে খুন করব। যদি সেটা আমার জীবনের শেষ কাজও হয়, তবুও। যদি ওরা কোনোক্রমে বেঁচে যায়, তবে ওদের টেক্সাসে পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে থাকতে হবে। হয়ত ওরা আর কখনোই ফিরতে পারবে না। পুরোটাই আপনার দোষে হয়েছে। আপনার হাতে রক্ত লেগে থাকল।”
মেলানি লক্ষ্য করল ধীরে ধীরে স্কারলেট পুরো ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করে ভয়ে শিউরে উঠল। মেলানির চেহারার আতঙ্ক মুছে গিয়ে ক্রোধে পরিণত হল। উঠে গিয়ে স্কারলেটের কাঁধে হাত রাখল।
“এরকম কথা আরও একবার বলে দেখ, আর্চি, তোমাকে আমি দূর করে দেব,” খুব কড়া করে মেলানি বলল। “স্কারলেটের কোনোই দোষ নেই। যেটা করা ও উচিত মনে করেছে – সেটাই ও করেছে। আমাদের মানুষরাও সেটাই করেছেন, যেটা ওঁরা উচিত বলে মনে করেছেন। প্রত্যেকেরই উচিত যেটা উচিত সেটাই করা। আমরা কেউই এক রকম ভাবে ভাবি না, এক রকম ভাবে কাজও করি না – তাই নিজের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে অন্যের বিচার করা আমাদের সাজে না। কী করে তুমি আর ইন্ডিয়া এমন নিষ্ঠুর কথাগুলো বলতে পারলে যখন ওর স্বামী আর আমার স্বামী – হয়ত – হয়ত – ”
“ওই যে, শুনতে পাচ্ছেন!” আর্চি মাঝপথে বাধা দিল। “বসুন, ম্যা’ম। ঘোড়ার আওয়াজ।”
মেলানি একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। অ্যাশলের একটা শার্ট তুলে নিয়ে, মাথা নিচু করে, অন্যমনস্কভাবে, ধারটা ফিতের মত করে ছিঁড়তে আরম্ভ করল।
বাড়ির নিকটবর্তী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াদের পায়ের আওয়াজ আরও স্পষ্ট হতে লাগল। গাড়ি ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ, চামড়ার মশমশ শব্দ, আর কণ্ঠস্বর শোনা গেল। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ দরজার সামনে এসে বন্ধ হতেই, অন্যদের কণ্ঠস্বরকে ছাপিয়ে গিয়ে একজনের কর্তৃত্বসুলভ কণ্ঠ শোনা গেল। পাশের উঠোন দিয়ে পায়ের শব্দ পেছনের বারান্দার দিকে মিলিয়ে গেল। সামনের পর্দাবিহীন জানলা দিয়ে হাজারখানেক শত্রুভাবাপন্ন চোখ যেন ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। দুরুদুরু বক্ষে চারজন মহিলাই মাথা নিচু করে ছুঁচসুতো তুলে নিল। স্কারলেট মনে মনে গুমরে উঠল, “অ্যাশলেকে আমি মেরে ফেললাম! ওকে আমি মেরে ফেললাম!” সেই বিহ্বল মুহুর্তে একবারের জন্যও ওর মনে হল না, ফ্র্যাঙ্ককেও ও হয়ত মেরে ফেলেছে। ওর কল্পনায় কেবলমাত্র রক্তাক্ত অ্যাশলে ইয়াঙ্কি অশ্বারোহীর পদতলে লুটিয়ে পড়ে আছে, এই দৃশ্য ছাড়া আর কোনও দৃশ্যের অস্তিত্ব ছিল না।
যেই দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা মারার শব্দ এল, ও মেলানির মুখের দিকে তাকাল। শীর্ণ ক্লান্ত মুখে নতুন এক অভিব্যক্তি, একটু আগেই রেট বাটলারের মুখ যে রকম ভাবলেশহীন ছিল, ঠিক সেই রকম। কেবলমাত্র দুটো ঘুঁটি সম্বল করে জুয়াড়ি যখন ধাপ্পা দিয়ে বাজিমাৎ করার চেষ্টা করে ঠিক সেই সময়কার শূন্যদৃষ্টি।
“আর্চি, দরজা খুলে দাও,” খুব নির্লিপ্ত স্বরে বলল।
ছুরিটা জুতোর মধ্যে রেখে, ট্রাউজ়ার বেল্টে রাখা পিস্তলটা ঢিলে করে নিয়ে, আর্চি খোঁড়াতে খোঁড়াতে গিয়ে দরজা টেনে খুলে দিল। দরজার জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ইয়াঙ্কি ক্যাপটেন আর তাঁর পেছনে একদল ব্ল্যু-কোটকে দেখে, পিটি ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মত একবার কিচিকিচ করে উঠলেন। বাকি সকলে চুপ করে রইল। স্কারলেটের মনে হল এই অফিসারকে ও চেনে, তাই অল্প একটু স্বস্তিবোধ করল। ক্যাপটেন টম জাফরি, রেটের একজন বন্ধু। ওঁর গৃহনির্মাণের সময় স্কারলেট ওঁর কাছে চেরাই কাঠ বিক্রি করেছিল। ভদলোক বলেই জানে ওঁকে। ভদ্রলোক বলেই হয়ত উনি অন্তত হাজতে ওদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবেন না। স্কারলেটকে উনি দেখেই চিনতে পেরে গেলেন। মাথা থেকে টুপি খুলে ‘বাও’ করলেন, একটু যেন অপ্রস্তুত।
“শুভ সন্ধ্যা, মিসেজ় কেনেডি। আপনাদের লেডিদের মধ্যে মিসেজ় উইল্কস কোন জন?”
“আমি মিসেজ় উইল্কস,” মেলানি জবাব দিল, ছোটখাটো চেহারার হলেও, ওর কণ্ঠস্বরে ব্যক্তিত্ব ফুটে বেরোচ্ছে। “এই অনধিকারপ্রবেশের কারণটা জানতে পারি কি?”
ক্যাপটেনের চোখ ঘরের চারদিকে ঘুরতে লাগল, প্রত্যেকের মুখের ওপরেই মুহুর্তের জন্য দৃষ্টিটা থেমে গেল, তারপর দৃষ্টি টেবিল আর হ্যাট-র্যাকের দিকে ধাবিত হল, যেন পুরুষমানুষের অস্তিত্বের তালাশ করছেন।
“আমি মিস্টার উইল্কস এবং মিস্টার কেনেডির সঙ্গে কথা বলতে চাই, যদি অসুবিধে না থাকে।”
“ওঁরা এখানে নেই,” মেলানি মৃদু কিন্তু শীতল স্বরে বলল।
“আপনি কি একদম নিশ্চিত?”
“মিসেজ় উইল্কসের কথার ওপর কোনও কথা বলবেন না,” দাড়ি নাড়িয়ে আর্চি বলে উঠল।
“মাফ করবেন, মিসেজ় উইল্কস। আমি আপনাকে অসম্মান করতে চাইনি। আপনি যদি আমাকে আশ্বস্ত করেন, তবে আমি বাড়ির তালাশিও নেব না।”
“আমি আশ্বস্ত করছি আপনাকে। তবে তালাশি নিতে চাইলে নিতে পারেন। শহরে মিস্টার কেনেডির স্টোরে একটা মিটিংয়ে আছেন ওঁরা।”
“না, ওঁরা স্টোরে নেই। আজ রাতে কোনও মিটিংও নেই,” ক্যাপটেন গম্ভীরভাবে বললেন। “ওঁদের ফেরা পর্যন্ত আমরা বাইরেই অপেক্ষা করব।”
ছোট্ট একটা ‘বাও’ করে উনি বেরিয়ে গেলেন, দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে। ঝোড়ো বাতাসে অস্পষ্ট হয়ে কড়া আদেশ ভেসে এল ঘরের ভেতরে যারা ছিল তাদের কানে –
“ঘিরে ফেল বাড়িটা। প্রতিটা জানলা আর দরজার সামনে একজন করে লোক।” তারপর ছোটাছুটির শব্দ। স্কারলেট দেখল দাড়িওয়ালা মুখেরা জানলাগুলোর বাইরে থেকে ওদের দিকে চেয়ে আছে। কোনোক্রমে চমকে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। মেলানি একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। তারপর টেবিলে রাখা একটা বইয়ের দিকে হাত বাড়াল। কাঁপছে না হাতটা। বইটা হল ছেঁড়াখোঁড়া একটা ‘লে মিজ়েরাবল’ – কনফেডারেট সৈন্যবাহিনীর প্রিয় বই একটা। ক্যাম্পে জ্বালানো আগুনের আলোয় বইটা ওরা পড়ত, আর কিছুটা হতাশা মেশানো মজা করে বলত ‘লী’র মিজ়েরাবল’। বইটার মাঝখানের একটা পৃষ্ঠা খুলে একঘেয়ে কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে পড়তে শুরু করল।
“সেলাই করতে থাকুন,” আর্চি ঘড়ঘড়ে গলায় হুকুম দিল। তিনজন মহিলা, মেলানির শান্ত কণ্ঠ থেকে সাহস সঞ্চয় করে, ছুঁচসুতো তুলে নিয়ে ঘাড় নিচু করে সেলাই করতে লাগল।
সেই নজরদারির ঘেরাটোপের মধ্যে বসে মেলানি কতক্ষণ পড়ে চলল, স্কারলেট বলতে পারে না, তবে মনে হয়েছিল সেটা অনন্তকাল। মেলানির পড়ে যাওয়া একটা কথাও ওর কানে ঢোকেনি। ততক্ষণে ও ফ্র্যাঙ্কের কথাও ভাবতে আরম্ভ করে ফেলেছে অ্যাশলের কথা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে। তার মানে সন্ধ্যেবেলা ওঁকে নিরুত্তাপ লাগার এটাই আসল রহস্য! উনি ওঁকে কথা দিয়েছিলেন ক্ল্যানের সঙ্গে ওঁর কোনও রকম সম্পর্ক থাকবে না। এই ধরণেরই একটা বিপর্যয়ের আশঙ্কাই ওর কল্পনাতে ছিল! গত বছরের সমস্ত মেহনত এবার নস্যাৎ হয়ে যাবে! ঝড় জল বৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করে করা ওর সব লড়াই জলে চলে গেল! কে ভাবতে পেরেছিল ফ্র্যাঙ্কের মত নির্জীব বৃদ্ধ একজন মানুষ ক্ল্যানের উগ্র কার্যকলাপের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়বেন? এই মুহুর্তেই উনি হয়ত আর বেঁচে নেই। বেঁচে যদি থাকেনও, ইয়াঙ্কিরা ওঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে! অ্যাশলেকেও!
নখগুলো চেপে বসে ওর হাতের তালুতে টকটকে লাল রঙের অর্ধচন্দ্রাকার রেখা তৈরি করে ফেলল। অ্যাশলের যখন ফাঁসি যাওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা, তখন মেলানি কী করে এমন শান্ত থাকতে পারে? এই মুহুর্তে অ্যাশলে তো মরে গিয়েও থাকতে পারে? তবুও মেলানির নিষ্কম্প সমাহিত স্বরে জ়্যাঁ ভ্যালজ়্যাঁ’র বিষাদ গাথার বর্ণনা স্কারলেটকে ছটফট করে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করা থেকে বিরত রাখল।
যে রাতে টোনি ফোনটেন ওদের বাড়ি এসেছিল, তাড়া খাওয়া, শ্রান্ত, কপর্দকহীন অবস্থায়, স্কারলেটের মন সেই সুদূর অতীতে পাড়ি জমাল। সেদিন যদি ওদের বাড়ি এসে না পৌঁছতে পারত, কিছু টাকাপয়সা আর একটা তাজা ঘোড়া না পেত, তাহলে বহুদিন আগেই ওর ফাঁসি হয়ে যেত। ফ্র্যাঙ্ক আর অ্যাশলে যদি এই মুহুর্তে বেঁচেও থাকেন, তাহলে ওঁদের অবস্থা টোনিরই মত, বরং তার চেয়েও খারাপ। যেভাবে বাড়িটা সেনাপরিবৃত, ওদের পক্ষে বাড়ি এসে ধরা না পড়ে টাকাপয়সা আর জামাকাপড় নেওয়ার চেষ্টা অসম্ভব। কে জানে হয়ত রাস্তার ধারে প্রত্যেক বাড়ির সামনেই এরকম ইয়াঙ্কি প্রহরী লেগে গেছে, যাতে ওরা বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকেও কোনও সাহায্য না পায়। হতে পারে এই রাতেই ওরা টেক্সাসের দিকে প্রাণপণে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে।
না, রেট – হয়ত রেট সঠিক সময়ে ওঁদের কাছে পৌঁছতে পেরেছেন। রেটের পকেটে সর্বদাই প্রচুর নগদ টাকা থাকে। হয়ত ওদের পালিয়ে যাবার জন্য প্রয়োজন মত অর্থ ধার দিয়ে দেবেন। তবে ব্যাপারটা একটু অদ্ভুতই। অ্যাশলের নিরাপত্তা নিয়ে রেট মাথা ঘামাতে যাবেন কেন? উনি যে ওকে পছন্দ করেন না, তাতে তো কোনও সন্দেহই নেই, সব সময়ই ওকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন! তাহলে কেন – কিন্তু এই রহস্যের সমাধানের আগেই স্কারলেটের মন অ্যাশলে আর ফ্র্যাঙ্কের নিরাপত্তা নিয়ে অশান্তিতে নতুন করে ভরিয়ে দিল।
“উফ, সবটাই আমার দোষ!” নিজের মনেই ফুঁপিয়ে উঠল। “ইন্ডিয়া আর আর্চি সত্যি কথাই বলেছে। পুরোটাই আমার দোষ। তবে ওরা দুজনেই যে ক্ল্যানে নাম লেখানোর মত আহম্মক, সেটা আমি ভাবতেই পারিনি! তাছাড়া আমার যে সত্যি সত্যিই কিছু হতে পারে, সেটাও আমি ভাবিনি! আমার যে অন্য কোনও উপায় ছিল না। মেলি ঠিক কথাই বলেছে। যার যেটা কর্তব্য, তার সেটাই করা উচিত। মিলগুলো চালু রাখা আমার কর্তব্য! অর্থ উপার্জন করাও আমার কর্তব্য! এখন হয়ত সবই আমার হাতছাড়া হয়ে গেল! আর সেটা আমারই দোষে!”
বেশ অনেকক্ষণ পরে মেলানির গলা হোঁচট খেল, হালকা হতে হতে এক সময় থেমে গেল। ঘুরে গিয়ে জানলার দিকে তাকাল, যেন কোনও ইয়াঙ্কি জওয়ানই কাঁচের ওপার থেকে তাকিয়ে দেখছে না। বাকিরাও মাথা ওঠালো, দেখল মেলানি কান খাড়া করে কিছু শোনবার চেষ্টা করছে, ওরাও শোনবার চেষ্টা করল।
ঘোড়ার খুরের শব্দ, কেউ যেন গান গাইতে গাইতে আসছে, জানলা বন্ধ থাকায় শব্দগুলো অস্পষ্ট। বাতাসের ঝাপটা খেয়ে যেন দূরে ভেসে যাচ্ছে। তবুও শোনা যাচ্ছে। খুবই ঘৃণ্য একটা গান, যে গানটা শেরম্যানের লোকেদের কাছ অন্য সমস্ত ঘৃণ্য গানের মধ্যে ঘৃণ্যতম – ‘মার্চিং থ্রু জর্জিয়া’। আর গাইছেন রেট বাটলার স্বয়ং।
গানটির প্রথম পংক্তি শেষ করেছেন কি করেননি, আরও দুটো গলা পাওয়া গেল, মাতলামি করা গলা, ক্রুদ্ধ নির্বোধ কণ্ঠস্বর, গানকে ছাপিয়ে কথাগুলো অস্পষ্ট করে দেওয়া। সামনের বারান্দা থেকে সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপটেন জেফরির হুকুম শোনা গেল, তারপরে কিছু পদশব্দ। কিন্তু এই সব শব্দ পাওয়ার আগেই মেয়েরা অবাক হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতাকি করতে লাগল। কারণ মাতাল ওই দুটো গলা অ্যাশলে আর হিউ এলসিংয়ের ছাড়া আর কারোরই নয়।
বাড়িতে আসার সামনের পথে শোরগোল ক্রমে বেড়েই চলল। ক্যাপটেন জেফরির সংক্ষিপ্ত জেরা, হিউয়ের নির্বোধের মত তীক্ষ্ণ অট্টহাসি, আর অ্যাশলের অদ্ভুত জড়ানো গলায় চেঁচামেচি, “বলি হচ্ছেটা কী! হচ্ছেটা কী, অ্যাঁ!”
“ওটা অ্যাশলে হতেই পারে না,” স্কারলেট উদ্ভ্রান্তের মত মনে মনে হিসেব করছে। “ও মোটেও মাতাল হয় না! আর রেট – উনি তো মাতাল হলেই খুব শান্ত হয়ে পড়েন – এমন চেঁচামেচি করেন না তো কখনোই!”
মেলানি উঠে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে আর্চিও। ক্যাপটেনের সুতীব্র গলা ভেসে এল, “এই দুজনকে আমরা গ্রেফতার করলাম।” আর্চির হাতের মুঠোয়ে পিস্তলটা আঁকড়ে ধরল।
“না,” মেলানি নিচু গলায় বলল। “না। আমাকেই দেখতে দাও।”
স্কারলেট মেলানির মুখেচোখে সেই ভাবটা লক্ষ্য করল যেটা সেদিন টারাতে দেখেছিল। সিঁড়ির সব থেকে ওপরের ধাপে দাঁড়িয়ে মেলানি নীচে মৃত ইয়াঙ্কিটার দিকে পলকহীনভাবে চেয়েছিল, দুর্বল কবজি দিয়ে ভারি একটা তরবারি ধরা – শান্ত, নির্বিরোধী একজন মানুষ পরিস্থিতি আর সাবধানতার জন্য কী ভাবে মুহুর্তে বাঘিনীর রূপ ধারণ করতে পারে। মেলানি টান মেরে দরজা খুলে দিল।
“ভেতরে নিয়ে আসুন ওকে, ক্যাপটেন বাটলার,” অত্যন্ত স্পষ্ট স্বরে গলায় বিদ্বেষ মিশিয়ে বলল। “মনে হচ্ছে আপনি আবার ওকে মদ খাইয়েছেন। নিয়ে আসুন ভেতরে!”
বাইরে ঝড়ের মধ্য থেকে ইয়াঙ্কি ক্যাপটেন বলে উঠলেন, “দুঃখিত, মিসেজ় উইল্কস, কিন্তু আপনার স্বামী আর মিস্টার এলসিংকে গ্রেফতার করা হয়েছে।”
“গ্রেফতার করা হয়েছে? কিসের জন্য? মাতলামি করার জন্য? মাতলামির জন্য যদি অ্যাটলান্টাতে ধরপাকড় করা শুরু করা হয় তাহলে তো ইয়াঙ্কি গ্যারিসন হামেশার জন্য জেলেই পচবে! ওকে ভেতরে নিয়ে আসুন, ক্যাপটেন বাটলার – মানে আপনি নিজে যদি চলাফেরা করার অবস্থায় থাকেন!”
তাড়াহুড়োয় স্কারলেটের মাথা কাজ করছিল না। কিছুক্ষণ তো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না। রেট বা অ্যাশলে কেউ যে মাতাল নয় এই ব্যাপারে ওর মনে কোনও সন্দেহ নেই, আর এটাও জানে মেলানির মনেও এটা নিয়ে কোনও ধন্দ নেই। অথচ মেলানি, যে কিনা এমনিতে এত শান্ত আর ভদ্র, সে একেবার তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, ইয়াঙ্কিদেরও ভ্রূক্ষেপ করছে না, যেন ওরা দুজনেই এমন মাতাল হয়ে পড়েছে যে হাঁটবার শক্তিটাও নেই!
গুজগুজ করে ছোট ছোট কিছু কথা কাটাকাটি, মাঝে মাঝে গালাগালি, কয়েকজোড়া টলোমলো পায়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে আসার আওয়াজ। দরজার সামনে অ্যাশলেকে দেখা গেল, ফ্যাকাশে মুখ, মাথা টলছে, মাথার ঝলমলে চুল বিন্যস্ত, লম্বা শরীরটা রেটের কালো উত্তরীয় দিয়ে জড়ানো। হিউ এলসিং আর রেট, দুজনেরই টলায়মান অবস্থা, দুদিক থেকে ওকে সামলে রেখেছে। ছেড়ে দিলেই যে মেঝেতে গড়িয়ে পড়বে সেটা ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। পেছনে পেছনে ঢুকলেন ইয়াঙ্কি ক্যাপ্টেন। চোখেমুখে সন্দেহ আর কৌতুকের মিশেল। দরজার সামনেই দলবল নিয়ে উনি দাঁড়িয়ে রইলেন। ওঁর কাধের ওপর দিয়ে ওরা কৌতুহলী চোখ নিয়ে, ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপট খেতে খেতে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল।
রীতিমত হতবুদ্ধি হয়ে আর আতঙ্কে স্কারলেট একবার মেলানির দিকে তাকাল, তারপর আবার নেতিয়ে পড়া অ্যাশলের দিকে। কিছু কিছু যেন বোধগম্য হচ্ছে। প্রায় চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল, “ও মোটেই মাতাল নয়!” কিন্তু সামলে নিল। বুঝল যে ও এই মুহুর্তে একটা নাটক দেখছে, মরিয়া এক নাটক, যার ওপর জীবনমরণ নির্ভর করছে। এটাও জানে ও এই নাটকের চরিত্র নয়, আন্ট পিটিও নন, কিন্তু অন্যান্য যারা আছে তারা সকলেই নাটকের কুশীলব, একে অন্যের ইশারায় নিপুণভাবে মহলা দেওয়া এই নাটকের অভিনয় করে চলেছে। সবটা না বুঝলেও এটুকু বুঝে গেছিল যে নীরব থাকাটাই সর্বোত্তম পন্থা।
“চেয়ারে বসিয়ে দিন ওকে,” মেলানি রুষ্টকণ্ঠে চেঁচিয়ে বলল। “আর, ক্যাপটেন বাটলার, আপনি, এই মুহুর্তে আমার চোখের সামনে থেকে বিদেয় হন! ওকে এই অবস্থায় নিয়ে কোন মুখে এই বাড়ির পথ আবার মাড়ালেন আপনি!”
দুজনে মিলে অ্যাশলেকে দোলনা চেয়ারে বসিয়ে দিল। রেট, টলমল করতে করতে, কোনোক্রমে চেয়ারের পেছনটা ধরে নিজেকে সামলালেন। ব্যথা জড়ানো গলায় ক্যাপটেনকে সম্বোধন করে কথা বলতে শুরু করলেন।
“দেখলেন তো, ভাল করতে গিয়ে কী প্রতিদান পেলাম! কেন? না, পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়ে বাড়ি নিয়ে এলাম, সেই জন্য! সারা রাস্তা আমাকে আঁচড়ে, খামচে আর গালি দিতে দিতে এল!”
“আর হিউ এলসিং, তোমার জন্য লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে! বেচারা তোমার মা কী বলবেন? মদ খেয়ে মাতলামি করছ, সেটাও কিনা ওই ইয়াঙ্কি দরদি ক্যাপটেন বাটলারের মত একজন স্ক্যালাওয়াগের সঙ্গে বসে! আর হ্যাঁ, মিস্টার উইল্কস, কী করে করতে পারলে তুমি এমন কাজ?”
“মেলি, আমি খুব একটা মাতাল হইনি,” অ্যাশলে বিড়বিড় করে বলল। বলতে বলতেই ওর মাথাটা টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল। দুই বাহুর মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
“আর্চি, ওকে ওর ঘরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দাও – প্রতিদিন যেমন করে থাক,” মেলানি হুকুম দিল। “আন্ট পিটি, তুমি তাড়াতাড়ি গিয়ে বিছানাটা একটু ঠিক করে দাও, লক্ষ্মীটি। ও – হো -হো!” মেলানি হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। “কী করে এই কাজ করতে পারল? আমাকে কথা দেওয়ার পরেও!”
অ্যাশলের কাঁধে হাত রেখে আর্চি তৈরিই ছিল। পিটি, ভয়ে, অনিশ্চয়তায় উঠে দাঁড়ালেন। ক্যাপটেন বাধা দিলেন।
“ওঁকে ধরার চেষ্টা করবেন না। ওঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সার্জেন্ট!”
রাইফেল কাঁধে নিয়ে সার্জেন্ট যেই ঘরে পা রাখল, রেট নিজেকে একটু সামাল দিয়ে নিলেন। ক্যাপটেনের বাহুতে একটা হাত রেখে ওঁর দিকে অনেক চেষ্টা করে মুখ তুলে চাইলেন।
“টম, কেন ওকে গ্রেফতার করছ? খুব একটা বেশি মাতাল ও হয়নি। ওকে আমি এর থেকেও বেশি মাতাল হতে দেখেছি।”
“নিকুচি করেছে মাতলামির,” ক্যাপটেন গর্জন করে উঠলেন। “মাতাল হয়ে নর্দমায় পড়ে থাকুন উনি, কিচ্ছু যায় আসে না আমার। আমি পুলিশের লোক নই। উনি আর মিস্টার এলসিংকে গ্রেফতার করা হচ্ছে, কারণ আজ রাত্রে শ্যান্টিটাউনে ক্ল্যানের একটা হানার সঙ্গে ওঁদের যোগাযোগ রয়েছে। একজন নিগার আর একজন শ্বেতাঙ্গ খুন হয়েছে। মিস্টার উইল্কস ছিলেন এই হানা দেওয়ার পাণ্ডা।”
“আজ রাত্রে?” রেট হাসতে শুরু করলেন। এত জোরে জোরে হাসতে লাগলেন যে টাল সামলাতে না পেরে সোফার ওপর বসে পড়লেন, তারপর হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলেন। “আজ রাত্রে হতেই পারে না, টম,” যখন কথা বলার মত অবস্থায় এলেন তখন বললেন। “এই দুই মক্কেল তো আজ রাতে আমার সঙ্গেই ছিল – রাত আটটা থেকে – যখন কিনা ওদের মিটিংয়ে থাকার কথা ছিল।”
“তোমার সঙ্গে, রেট? কিন্তু – ” ক্যাপটেনের কপালে ভাঁজ পড়ল। অনিশ্চিত চোখে ঘড়ঘড় করে নাক ডাকা অ্যাশলের আর ওর কেঁদে আকুল হওয়া বউয়ের দিকে তাকালেন। “কিন্তু – তুমি কোথায় ছিলে?”
“সে আমি বলতে পারব না,” একবার আড়চোখে মেলানিকে দেখে নিয়ে রেট বললেন।
“বললেই ভাল করতে!”
“তাহলে বারান্দায় চল। ওখানেই বলব কোথায় ছিলাম।”
“তোমাকে এখানেই বলতে হবে।”
“লেডিদের সামনে বলতে বাধো বাধো ঠেকছে। লেডিরা – আপনারা যদি একটু ঘরের বাইরে যান – ”
“কোথাও যাচ্ছি না আমি!” রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে মেলানি চেঁচিয়ে উঠল। “আমার জানার হক আছে। কোথায় ছিলেন আমার স্বামী আমি জানতে চাই।”
“বেল ওয়াটলিংয়ের শুঁড়িখানায়,” রেট বললেন, লজ্জা লজ্জা মুখ করে। “ও ছিল, আর হিউ, আর ফ্র্যাঙ্ক কেনেডি আর ডঃ মীড আর – আর – আরও অনেকেই ছিল। পার্টি চলছিল। বেশ বড়সড় পার্টি। শ্যামপেন খোলা হয়েছিল। মেয়েছেলে – ”
“কোথায় বললেন? বেল ওয়াটলিংয়ের ওখানে?”
রাগে হতাশায় এমন জোরে চেঁচিয়ে উঠল মেলানি যে ওর গলা ভেঙে গেল। সকলেই ভয় পেয়ে ওর দিকে তাকাল। বুকের কাছটা দুই হাতে আঁকড়ে ধরে টলে গেল। আর্চি ধরে ফেলার আগেই অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। চারধারে শোরগোল শুরু হয়ে গেল। আর্চি ওকে ওঠাল, ইন্ডিয়া রান্নাঘরে দৌড়ে গেল জল আনতে, পিটি আর স্কারলেট বাতাস করতে করতে ওর কবজি ধরে ঝাঁকাতে লাগলেন। হিউ এলসিং বারবার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, “সর্বনাশ হয়ে গেল! সর্বনাশ হয়ে গেল!”
“এবারে কথাটা সারা শহরে চাউর হয়ে যাবে,” রেট নির্মমভাবে বললেন। “আশা করি তোমার শান্তি হল, টম। কাল অ্যাটলান্টায় একজন বউকেও পাওয়া যাবে না যে তার বরের সঙ্গে কথা বলবে!”
“রেট, আমার জানা ছিল না যে – ” খোলা দরজা দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকে ক্যাপটেনের পিঠে লাগলেও উনি ঘামছিলেন।
“ভেবে দেখ! তুমি শপথ নিয়ে বলছ তো এঁরা – ওই – ওই বেল-এর ওখানেই ছিলেন?”
“আরে, হ্যাঁ মশাই!” রেট গজগজ করে উঠলেন। “বিশ্বাস না হয় তো বেলকেই জিগ্যেস করে নাও না। আমাকে দাও, মিসেজ় উইল্কসকে আমি ওঁর ঘরে পৌঁছে দিচ্ছি। আমার কাছে দাও, আর্চি। হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি পারব। মিস পিটি আপনি একটা আলো নিয়ে আগে আগে চলুন।”
মেলানিকে রেট অবলীলায় পাঁজাকোলা করে বাহুতে তুলে নিলেন।
“তুমি বরং মিস্টার উইল্কসকে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দাও, আর্চি। আজ রাতের পরে আমি আর কখনও ওকে ছুঁয়েও দেখতে চাই না।”
পিটির হাত কাঁপছিল, ফলে হাতে ধরা আলোটা পড়ে গিয়ে বাড়িতে আগুন লেগে যেতে পারত। তবুও সেটা ধরে উনি আগে আগে অন্ধকার বেডরুমের দিকে চলে গেলেন। আর্চি একবার ঘোঁত করে অ্যাশলেকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।
“কিন্তু – আমাকে তো এঁদের গ্রেফতার করতে হবে!”
হলঘরের স্বল্পালোকে রেট ঘাড় ঘোরালেন।
“তাহলে সকালেই না হয় গ্রেফতার কোরো। এরকম অবস্থায় এরা কেউ পালিয়ে তো যেতে পারবে না – তাছাড়া শুঁড়িখানায় বসে মদ খাওয়াটা যে বেআইনী সেটা আমার জানা ছিল না। ঈশ্বরের দোহাই টম, ওরা যে বেল-এর ওখানে ছিল সেটা অন্তত জনা পঞ্চাশেক লোক সাক্ষী দিতে পারবে।”
“হুম, দক্ষিণের কোনও মানুষই যেখানে ছিলেন না, সেখানেই ছিলেন প্রমাণ করার জন্য এরকম পঞ্চাশটা সাক্ষী ঠিক জুটে যায়,” ক্যাপটেন বিরস গলায় বললেন। “মিস্টার এলসিং, আপনি আমার সাথে চলুন। মিস্টার উইল্কসকে আমি প্যারোল দিয়ে দেব যদি কথা – ”
“আমি মিস্টার উইল্কসের বোন। ওর হাজির হওয়ার দায়িত্ব আমি নিলাম,” ইন্ডিয়া খুব শীতলস্বরে বলল। “এবারে কি আপনারা বিদায় হবেন? এক রাত্রের পক্ষে যথেষ্ট ঝামেলা করে ফেলেছেন!”
“আমি অত্যন্ত দুঃখিত,” ক্যাপটেন খুব কিন্তু কিন্তু করে বললেন। “আশা করব, ওঁরা যে ওই – মানে মিস – না না মানে মিসেজ় ওয়াটলিংয়ের বাড়িতেই ছিলেন, সেটা প্রমাণ করতে পারবেন। দয়া করে আপনার ভাইকে কাল সকালে প্রোভস্ট মার্শালের সামনে জেরার জন্য হাজির হতে বলবেন।”
ইন্ডিয়া শীতলভাবে ঘাড় নাড়ল, দরজার হাতলের ওপর একটা হাত রেখে। মুখের ভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছিল ওঁদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে যাওয়াটাই ওর কাম্য। হিউ এলসিংকে বগলদাবা করে ক্যাপটেন আর সার্জেন্ট বেরিয়ে গেলেন। ইন্ডিয়া দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল। স্কারলেটের দিকে একবারের জন্যও দৃষ্টিপাত না করে প্রতিটা জানলার সামনে গিয়ে পর্দা নামিয়ে দিতে লাগল। স্কারলেটের তখন হাঁটু কাঁপছে। অ্যাশলে যে চেয়ারটাতে বসেছিল সেটা আঁকড়ে ধরে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। ঘাড় নিচু করে দেখল ওখানে ভিজে কালো একটা দাগ লেগে আছে। দাগটা ওর হাতের তালুর থেকেও চওড়া।
“ইন্ডিয়া,” ফিসফিস করে বলে উঠল, “ইন্ডিয়া, অ্যাশলে – ওর কি চোট লেগেছে?”
“বুদ্ধু কোথাকার! তুমি সত্যি সত্যি ভাবছ নাকি যে ও মাতাল হয়ে গেছিল?”
শেষ পর্দাটা নামিয়ে দিয়েই ইন্ডিয়া দ্রুতপদে সিঁড়ি বেয়ে শোবার ঘরের দিকে চলে গেল। স্কারলেটও পেছনে পেছনে গেল। ভয়ে ওর দমবন্ধ হয়ে গেছে। বড়সড় চেহারা নিয়ে রেট দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু ওঁর কাধের ওপর দিয়ে দেখতে পেল পাণ্ডুর চেহারা নিয়ে অ্যাশলে এখনও বিছানায় শুয়ে। আশ্চর্যজনকভাবে, মেলানি – একটু আগেই যে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছিল – সামলে নিয়ে এমব্রয়ডারি করার একটা কাঁচি দিয়ে রক্তরঞ্জিত শার্টটা কেটে ফেলছে। আর্চি ল্যাম্পটা নিচু করে ধরে আছে আর গাঁঠ ওঠা একটা আঙুল দিয়ে অ্যাশলের কবজিটা ধরে আছে।
“ও কি মরে গেছে?” দুজন মেয়েই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল।
“না, প্রচুর রক্তপাতের ফলে অজ্ঞান হয়ে গেছে। বুলেট কাঁধে লেগে বেরিয়ে গেছে,” রেট বললেন।
“বোকার মত এখানে ওকে নিয়ে এলেন কেন?” ইন্ডিয়া চেঁচিয়ে উঠল। “আমাকে যেতে দিন ওর কাছে! দরজা ছাড়ুন! শুধু শুধু গ্রেফতার হবার জন্য ওকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?”
“দূরে যাত্রা করার জন্য ও যথেষ্ট দুর্বল। কাছাকাছি কোথাও নিয়ে যাবার জায়গাও ছিল না, মিস উইল্কস। তাছাড়া – আপনি কি চান – টোনি ফোনটেনের মত উনিও নিরুদ্দেশ হয়ে যান? আপনি কি চান আপনার প্রতিবেশীরা সবাই টেক্সাসে গিয়ে সারা জীবনের মত ছদ্মনামে কাটিয়ে দিন? ওদের সবাইকে বেকসুর খালাস করিয়ে আনার একটা সুযোগ আছে যদি বেলকে – ”
“যেতে দিন আমাকে!”
“না, মিস উইল্কস। আপনার একটা কাজ আছে। একজন ডাক্তার আনতে হবে – ডঃ মীড নয়। এই ব্যাপারে উনিও জড়িয়ে আছে, হয়ত এই মুহুর্তে ইয়াঙ্কিদের সেটা নিয়ে কৈফিয়ত দিতেই ব্যস্ত আছেন। অন্য কোনও ডাক্তারকে পেতে হবে। রাত্রে বাইরে যেতে আপনার ভয় করবে না তো?”
“না,” ইন্ডিয়া বলল, ওর নিষ্প্রাণ চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। “না, ভয় করবে না।” মেলানির মাথা ঢাকার ওড়না, যেটা হলের দেওয়ালে ঝোলানো ছিল, নিয়ে নিল। “আমি বয়স্ক ডঃ ডীনের খোঁজে যাচ্ছি।” ভেতরে ভেতরে একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছে, সেটা গলার স্বর থেকে টের পাওয়া গেল। কিন্তু জোর করে সেটা দাবিয়ে রেখে নিজেকে শান্ত করল। “আপনাকে আমি গুপ্তচর বলেছি, বোকা বলেছি, আমি সেজন্য খুব দুঃখিত। বুঝতে পারিনি আমি। অ্যাশলের জন্য যা করলেন তার জন্য আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ – তা সত্ত্বেও আমি আপনাকে ঘৃণার চোখে দেখি।”
“অকপট আচরণ আমার খুব পছন্দ – সেই জন্য ধন্যবাদ।” রেট ‘বাও’ করলেন, ওঁর ঠোটে আমোদের হাসি। “এখন তাড়াতাড়ি যান, পেছনের দরজা দিয়ে বেরোবেন, ফেরার সময় যদি দেখেন আশেপাশে সেনাবাহিনীর কেউ আছে, তাহলে এই বাড়িতে ঢুকবেন না।”
অ্যাশলের পানে আরও একবার উদ্বিগ্ন দৃষ্টি হেনে, আর ওড়না দিয়ে শরীর আর মাথা ঢেকে, হাল্কা পায়ে হলের ভেতর দিয়ে পেছনের দরজা খুলে নিঃশব্দে রাতের অন্ধকারে মিশে গেল।
স্কারলেট, চোখ টানটান করে রেটকে পেরিয়ে যা দেখল ওর হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠল। অ্যাশলের চোখ বিস্ফারিত। ধোওয়া কাপড়ের তাক থেকে মেলানি একটা ভাঁজ করা তোয়ালে টেনে নিয়ে অ্যাশলের কাঁধের রক্তের ধারার ওপর চেপে ধরল। অ্যাশলে দুর্বলভাবে হেসে মেলানিকে আশ্বস্ত করল। অনুভব করল রেট তীব্র দৃষ্টিতে ওকে লক্ষ্য করছেন। মনে মনে ও যা ভাবছে, সেটা ওর মুখেই ফুটে উঠেছে। কিন্তু সেটা ঢাকার চেষ্টা করল না।
অ্যাশলের রক্তক্ষরণ হয়েই চলেছে, কে জানে হয়ত মরতেই বসেছে। অথচ ও, যে কিনা অ্যাশলেকে ভালবাসে, কাঁধের ওই ক্ষতটা করে দিয়েছে। ইচ্ছে হচ্ছিল ছুটে বিছানার কাছে চলে যায়, বসে পড়ে ওকে আঁকড়ে ধরে, কিন্তু ওর হাঁটু এত কাঁপছে যে ঘরে ঢুকতেই পারল না। দুহাত মুখে চেপে ধরে মেলানির দিকে তাকাল। নতুন একটা তোয়ালে নিয়ে মেলানি ওর কাঁধে চেপে ধরল। যেন ওভাবে রক্তটা আবার শরীরের ভেতরে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। যেন কোনও জাদুকাঠির ছোঁয়ায় মুহুর্তের মধ্যে তোয়ালেটা আবার লাল হয়ে উঠল।
এত রক্তপাত হয়েও একটা মানুষ বেঁচে থাকে কী করে? কপাল খুব ভাল যে ওর ঠোঁটের কাছে রক্ত উঠছে না – সেই রক্তাক্ত ফেনা, যা কিনা মৃত্যুর অগ্রদূত। নিজের চোখে দেখা – সেই পীচট্রী খাড়িতে লড়াইয়ের ভয়ঙ্কর দিনে – আন্ট পিটির লনে গুরুতর জখম জওয়ানরা সব মুখে রক্ত তুলে মরে যাচ্ছিল।
“মনে বল আনো,” রেট বললেন, ওঁর গলায় তিক্ত কিন্তু মৃদু শ্লেষের আভাস। “মরবে না ও। যাও ভেতরে গিয়ে আলোটা মিসেজ় উইল্কসের জন্য ধরে থাক। আর্চিকে আমার কিছু কাজে পাঠানোর জন্য দরকার।”
আর্চি ল্যাম্পের ফাঁক দিয়ে রেটের দিকে তাকাল।
“আপনার কোনও হুকুম আমি শুনছি না,” মুখের ওপর বলে দিল। তামাকের দলাটা এক গাল থেকে অন্য গালে চালান করতে করতে।
“উনি যা বলছেন সেটা কর,” মেলানি কড়া গলায় বলল, “আর তাড়াতাড়ি কর। ক্যাপটেন বাটলার যা যা বলবেন, সব করবে। স্কারলেট, আলোটা ধর।”
স্কারলেট এগিয়ে ফিয়ে ল্যাম্পটা নিয়ে নিল। দু’হাতে ধরল যাতে পড়ে না যায়। অ্যাশলের চোখ আবার বন্ধ হয়ে গেছে।
খোলা গায়ে ওর ছাতি খুব আস্তে আস্তে উঠছে, আর তারপরেই একেবারে পড়ে যাচ্ছে। মেলানির ক্ষিপ্র আঙুলগুলো লাল রঙের ধারায় সিক্ত হয়ে উঠছে।
খটখট করতে আর্চির রেটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শব্দ স্কারলেট অস্পষ্টভাবে শুনতে পেল, রেট ওকে দ্রুতস্বরে কিছু নির্দেশ দিচ্ছেন। অ্যাশলের চিন্তায় এতই মগ্ন ছিল যে ফিসফিস করে রেটের দেওয়া নির্দেশের প্রথম অর্ধেকটা ওর কানেই গেল না। রেটকে শুধু বলতে শুনল, “আমার ঘোড়াটা নাও … বাইরেই বাঁধা আছে … পড়ি কি মরি ছোটাবে।”
আর্চি জড়ানো গলায় কয়েকটা প্রশ্ন করল। স্কারলেট শুনতে পেল রেট জবাবে বললেন, “পুরোনো সুলিভ্যান প্ল্যান্টেশন। দেখবে পোশাকগুলো সব থেকে উঁচু চিমনির ওপর ঢুকিয়ে দেওয়া আছে। ওগুলো পুড়িয়ে ফেলবে।”
“হুম,” আর্চি ঘোঁত করল।
“আর সেলারে দেখবে দুজন – মানুষ রয়েছে। ভাল করে বেঁধে ঘোড়ায় চাপিয়ে নেবে। বেল-এর বাড়ির পেছনে যে খালি জায়গাটা আছে – বাড়ি আর রেললাইনের মাঝে – ওখানে নিয়ে যাবে। তবে সাবধান। কেউ যেন তোমাকে দেখতে না পায়। তাহলে তুমি তো ফাঁসি যাবেই, আমরাও যাব। ওদের ওখানেই নামিয়ে রাখবে আর পিস্তলগুলো ওদের কাছাকাছি রাখবে – মানে ওদের হাতে। এই যে – আমারগুলো নাও।”
ঘরের ভেতর থেকে স্কারলেট দেখল রেট কোটের পকেট থেকে দুটো রিভলভার বের করলেন। আর্চি সে’দুটো নিয়ে ওর কোমরের বেল্টে গুঁজে নিল।
“প্রত্যেকটার থেকে একটা করে গুলি চালাবে, যাতে এটাকে গুলি চালাচালির সাধারণ একটা ঘটনার মতই লাগে।
আর্চি এমনভাবে ঘাড় নাড়ল যেন নির্দেশগুলো ঠিকঠাক বুঝে নিয়েছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওর রুক্ষ চাউনিতে একটা সম্ভ্রমের আভাস। স্কারলেটের অবশ্য কিছুই বোধগম্য হয়নি। শেষের আধঘন্টা এমন দুঃস্বপ্নের মত কেটেছে যে ওর মনে হচ্ছে কিছুই আর কোনোদিন স্বাভাবিক হবে না, বোধগম্যও হবে না। অবশ্য রেটকে দেখে মনে হচ্ছে এরকম বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিটাও পুরোপুরি ওঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেটুকুই যা সান্ত্বনা।
আর্চি যাবার জন্য ঘুরেছিল, পরমুহুর্তেই আবার ঘুরে গিয়ে রেটের চোখে প্রশ্নসূচক দৃষ্টি রাখল।
“উনি?”
“হ্যাঁ।”
আর্চি ঘোঁত করে মেঝেতে একদলা থুতু ফেলল।
“অনেক মাশুল গুণতে হবে,” বলে আর্চি খটখট করতে হলের মধ্যে দিয়ে পেছনের দরজার দিকে গেল।
চাপা গলায় এই সর্বশেষ বাক্য বিনিময় স্কারলেটের মনে নতুন করে ভয় ধরিয়ে দিল, মনের মধ্যে একটা সন্দেহ দানা পাকিয়ে উঠতে থাকল। তারপর যখন সন্দেহ চরমে পৌঁছল –
“ফ্র্যাঙ্ক কোথায়?” বলে চেঁচিয়ে উঠল।
বেড়ালের মত নিঃশব্দ কিন্তু ক্ষিপ্র পদক্ষেপে রেট ঘরে ঢুকে বিছানার কাছে চলে এলেন।
“সময় হলেই সব জানতে পারবে,” অল্প একটু হেসে বললেন। “আলোটা শক্ত করে ধর, স্কারলেট। তুমি নিশ্চয়ই মিস্টার উইল্কসের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিতে চাও না। মিস মেলি – ”
একজন বাধ্য সৈনিকের মত মেলানি মাথা তুলে আদেশের প্রতীক্ষায় তাকাল। পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গীন যে ওর খেয়ালই হল না যে রেট এই প্রথমবার ওর পরিবারের লোকজন আর বন্ধুবান্ধবরা যে নামে ডাকেন সেই নামে ডাকলেন।
“আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি বলতে চেয়েছিলাম, মিসেজ় উইল্কস – ”
“না, না, ক্যাপটেন বাটলার, ক্ষমা চাইবেন না! আপনি যদি আমাকে ‘মিস’ বাদ দিয়ে শুধু ‘মেলি’ বলেই ডাকেন, তাহলে আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করব! আপনাকে আমি নিজের দাদার মতই মনে করি। কত দয়ালু আপনি, আর কত বুদ্ধিমান! আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই!”
“অনেক ধন্যবাদ,” রেট বললেন। পলকের জন্য ওঁর চোখেমুখে অপ্রস্তুত একটা ভাব। “আমি এতখানি ভাবিনি, কিন্তু মিস মেলি,” ওঁর কণ্ঠস্বরে একটা অপরাধীসুলভ ভাব, “খুব খারাপ লাগছে যে আমাকে বলতে হল মিস্টার উইল্কস বেল ওয়াটলিং-এর বাড়িতে ছিলেন। ওঁকে আর অন্যান্যদের নাম এমন একটা ব্যাপারে জড়িয়ে দিতে হল বলে আমি খুবই দুঃখিত, আসলে পরিস্থিতি এমন একটা – একটা – এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর – আমাকে দ্রুত ভেবে নিতে হচ্ছিল – এটা ছাড়া আর কিছুই মাথা থেকে বেরলো না। মনে হয় আমার কথাটা ওঁরা মেনে নেবেন, ইয়াঙ্কি অফিসারদের মধ্যে আমার অনেক বন্ধুবান্ধব আছেন। কথাটা বলতে বিব্রতবোধ করছি, শহরের মানুষদের মধ্যে আমার যেরকম, কী বলি, বদনাম? যে ওঁরা আমাকে প্রায় নিজেদেরই একজন বলে সম্মান দেন। আর একটা কথা, বেল-এর পানশালাতে সন্ধ্যেবেলায় আমি পোকার খেলছিলাম। ডজনখানেক ইয়াঙ্কি জওয়ানও ওখানে ছিল, ওরা সাক্ষী দিতে পারবে। আর বেল আর ওর মেয়েরা, অবলীলায় মিথ্যে করে বলে দেবে যে মিস্টার উইল্কস এবং অন্যান্যরা সারা সন্ধ্যে ওপরতলাতেই ছিলেন। ইয়াঙ্কিরাও ওদের কথা বিশ্বাস করবে। ইয়াঙ্কিরা আসলে আজব চিড়িয়া। এই শ্রেণীর মেয়েদের মধ্যেও যে প্রগাঢ় আনুগত্য কিংবা গভীর দেশপ্রেম থাকতে পারে, এটা ওরা কল্পনাই করতে পারে না। সন্ধ্যেবেলা যাঁদের মিটিংয়ে থাকার কথা ছিল, সেই সব সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকেরা সত্যিকারের কোথায় ছিলেন সেই ব্যাপারে অ্যাটলান্টার একজনও সম্ভ্রান্ত লেডির মুখের কথা ইয়াঙ্কিরা বিশ্বাস করবে না, অথচ এই সব বারাঙ্গনাদের কথা ঠিক বিশ্বাস করে নেবে। আমার মনে হয়, একজন স্ক্যালাওয়াগ আর এক ডজন বারাঙ্গনা শপথ নিয়ে যদি বলে, তাহলেই ওঁদের ছাড়িয়ে আনা সম্ভব হবে।”
শেষের কথাগুলো বলতে বলতে ওঁর মুখে একটা তিক্ত হাসি ফুটে উঠেছিল, কিন্তু কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে মেলানি চোখ তুলে তাকাতেই সেটা মিলিয়ে গেল।
“ক্যাপটেন বাটলার, আপনি কত বুদ্ধিমান! ওদের বাঁচানোর জন্য যদি বলতেন সন্ধ্যেবেলা ওরা সকলে মিলে জাহান্নামে গেছিল, তাহলেও আমি কিছু মনে করতাম না! কারণ আমি জানি বা আমার পরিচিতরা সকলেই জানে, আমার স্বামী ওই রকম খারাপ জায়গায় যেতেই পারেন না!”
“কিন্তু – ” রেট একটু ইতস্তত করে বলতে আরম্ভ করলেন, “আজ সন্ধ্যেবেলা, সত্যি বলতে কী, উনি বেল-এর ওখানেই ছিলেন।”
মেলানি শীতল চোখে তাকাল।
“এরকম মিথ্যে একটা কথা আপনি কিছুতেই আমাকে বিশ্বাস করাতে পারবেন না!”
“একটু ধৈর্য ধরুন, মিস মেলি! আমাকে বুঝিয়ে বলতে দিন! আজ রাতে আমি যখন পুরোনো সুলিভানদের প্লেসে গেলাম, দেখলাম মিস্টার উইল্কস জখম হয়ে পড়ে আছেন। হিউ এলসিং, ডঃ মীড আর বৃদ্ধ মেরিওয়েদার ওঁর সাথে রয়েছেন – ”
“না, না ওই বুড়ো মানুষটা নিশ্চয়ই নয়,” স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল।
“অক্ষম হবার মত বৃদ্ধ, পুরুষমানুষরা কোনোদিনই হন না। আর আপনার আঙ্কল হেনরি – ”
“হে ভগবান!” আন্ট পিটি আর্তনাদ করে উঠলেন।
“ট্রুপের সঙ্গে ধস্তাধস্তির পর দলের বাকিরা এদিকে ওদিকে ছিটকে পড়েছিলেন। যাঁরা যাঁরা দলছুট হননি, তাঁরা চিমনির ভেতরে পোশাক লুকোনোর জন্য সুলিভান প্লেসে এলেন। মিস্টার উইল্কসের চোট কতটা গুরুতর, সেটাও দেখার উদ্দেশ্যে। ওঁর চোট গুরুতর না হলে এতক্ষণে ওঁরা টেক্সাসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যেতেন – সকলেই – কিন্তু ওঁর পক্ষে বেশি দূর যাওয়া সম্ভব ছিল না – আর ওঁরা ওঁকে ফেলে যেতে রাজি হলেন না। ওঁরা যেখানে ছিলেন সেখানে না থেকে অন্য কোথাও ছিলেন, এটা প্রমাণ করা খুব জরুরি ছিল। তাই আমি ওঁদের পেছনের অলিগলি দিয়ে বেল ওয়াটলিংয়ের বাড়ি নিয়ে গেছিলাম।”
“আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। আপনার সঙ্গে রূঢ়ভাবে কথা বলার জন্য আমাকে মাফ করবেন, ক্যাপটেন বাটলার। এখন বুঝতে পারছি ওঁদের ওখানে নিয়ে যাওয়া কতটা দরকার ছিল কিন্তু – আচ্ছা ক্যাপটেন বাটলার, ওখানে যাওয়ার সময় লোকজন আপনাদের দেখে ফেলে থাকতে পারে!”
“কেউ দেখে ফেলেনি আমাদের। পেছন দিকের নিজেদের জন্য ব্যবহার করবার রাস্তা দিয়ে আমরা ঢুকলাম। রেললাইন যেখান দিয়ে গেছে। জায়গাটা সব সময় অন্ধকার থাকে আর তালা লাগানো থাকে।”
“তাহলে কী করে – ”
“একটা চাবি থাকে আমার কাছে,” মেলানির চোখে চোখ রেখে রেটের সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থপূর্ণ জবাব।
রেটের জবাবের সম্পূর্ণ তাৎপর্য যখন স্পষ্ট হয়ে উঠল, মেলানি এতটাই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল যে ও ব্যান্ডেজটা হাতড়াতে লাগল আর সেটা ক্ষতস্থান থেকে পুরোপুরি সরে গেল।
“আমি কৌতুহল দেখাতে চাইনি – ” অস্ফুটে বলে উঠল। ওর চোখমুখ রাঙা হয়ে উঠেছে। তাড়াতাড়ি তোয়ালেটা সরিয়ে ঠিক জায়গায় রাখল।
“একজন লেডিকে এই রকম একটা কথা বলতে হওয়ায় আমি অনুতপ্ত।”
“কথাটা তাহলে সত্যি!” অদ্ভুত এক বেদনা নিয়ে স্কারলেট ভাবল। “তাহলে উনি সত্যিই ওই নরকের কীটটার সঙ্গে থাকেন! ওর বাড়িটারও মালিক উনিই!”
“বেল-এর সঙ্গে দেখা করে সবটা ওকে বুঝিয়ে বললাম। রাত্রে কারা কারা বাড়ির বাইরে ছিল, তার একটা তালিকা ওকে দিলাম। ও আর ওর মেয়েরা সাক্ষী দেবে যে ওরা সকলেই রাত্রে ওর বাড়িতেই ছিল। তারপরে আমাদের বেরিয়ে যাওয়াটা যাতে সবার নজরে পড়ে, ওর দুটো পোষা মস্তান – যারা ওখানে ঝামেলা হলে হস্তক্ষেপ করে থাকে – ওদের ডাকিয়ে আমাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে পানশালা থেকে বের করে রাস্তায় ফেলে দেয়, যাতে মনে হয় মদ খেয়ে মাতলামি করে আমরা শান্তিভঙ্গ করছিলাম।”
কিছু মনে পড়ায় অল্প একটু হাসলেন। “ডঃ মীডকে মাতাল হিসেবে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য লাগছিল না। এমন একটা জায়গায় থাকতে হল বলে ওঁর সম্মানে আঘাত লাগছিল। তবে আপনার আঙ্কল হেনরি আর বৃদ্ধ মেরিওয়েদার দারুণ অভিনয় চালিয়ে গেলেন। অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে না নেওয়ায়, নাটকের মঞ্চ দুজন প্রতিভাশালী অভিনেতাকে পেল না। মনে হচ্ছিল, ওঁরা ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করছেন। দুঃখের বিষয় মিস্টার মেরিওয়েদারের অত্যুৎসাহী অভিনয়ের জন্য আপনার আঙ্কল হেনরির চোখের তলায় কালশিটে পড়ে গেছে। উনি – ”
পেছনের দরজা খুলে গেল। ইন্ডিয়া ঢুকল। পেছনে পেছনে বৃদ্ধ ডঃ ডীন। শুভ্র কেশ এলোমেলো। চামড়ার জীর্ণ ব্যাগটা উত্তরীয়র ভেতর থেকে ফেটে পড়ছে। অল্প একটু ঘাড় নেড়ে কথা বলে, কথা বলে বৃথা সময় নষ্ট না করে অ্যাশলের কাঁধের ওপর থেকে ব্যান্ডেজটা তুলে ধরলেন।
“ফুসফুস থেকে যথেষ্ট ওপরে,” বললেন উনি। “কাঁধের হাড় ভেঙে না থাকলে তেমন ভয়ের কিছু নেই। লেডিরা, আমাকে অনেকগুলো তোয়ালে এনে দিন। যদি থাকে, তাহলে তুলো দিন আর খানিকটা ব্র্যান্ডি।”
আলোটা রেট স্কারলেটের হাত থেকে নিয়ে টেবিলের ওপরে রাখলেন। মেলানি আর ইন্ডিয়া ডাক্তারের হুকুম তামিল করার জন্য ঘরে বাইরে ছোটাছুটি করছে।
“এখানে তোমার কিছুই করবার নেই। বসার ঘরে আগুনের পাশে গিয়ে বসি চল,” রেট স্কারলেটের বাহু ধরে আকর্ষণ করে ঘর থেকে নিয়ে চললেন। ওঁর কণ্ঠস্বর এবং স্পর্শে কোমলতার ছোঁয়া, যেটা সচরাচর উনি প্রদর্শন করেন না।
স্কারলেট বাধা দিল না। ওঁর সাথে সামনের ঘরে চলে এল। আগুনের সামনে দাঁড়িয়েও ওর সারা শরীর কাঁপতে শুরু করল। বুকের মধ্যে আশঙ্কার যে বীজটা দানা বেঁধেছিল, সেটা ফুলে ফেঁপে দম বন্ধ করে দিচ্ছে। আশঙ্কার থেকেও অনেক বড় কিছু। একটা অবশ্যম্ভাবিতা, ভয়ানক এক অবশ্যম্ভাবিতা। রেটের পাথর হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল। পলকের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তারপর –
“ফ্র্যাঙ্ক – ও কি বেল ওয়াটলিংএর ওখানে ছিল?”
“না।”
রেটের কণ্ঠস্বর শীতল।
“আর্চি ওঁকে বেলের বাড়ির কাছের খালি জায়গাটাতে নিয়ে আসছে। মারা গেছেন। মাথা ফুটো করে গুলি বেরিয়ে গেছে।”

0 মন্তব্যসমূহ