অনুবাদ : নাহার তৃণা

ফুলে ওঠা চোখের পাতা ফাঁক করে সে দেখল কঠোর-মুখো দুই প্রহরী কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করছে। হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করানোর পর, বেঁটে গড়নের প্রহরীটি কর্কশ স্বরে তাকে প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিলো। অসংখ্য লড়াইয়ের ধকলে শরীর তখনো দুর্বল; নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ার জন্য সে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়ালো।

তার তত্ত্বাবধায়ক, যে এখন তার এক পুরনো বন্ধু, তার পাশে দাঁড়িয়ে হাতের সামনের অংশে কাপড় জড়িয়ে দিচ্ছিল এবং আগের কোনো লড়াইয়ে পাওয়া কাঁধ ও ঘাড়ের ক্ষতগুলোতে মলম লাগিয়ে দিচ্ছিল। প্রহরীরা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল; এমন নিষ্ঠুর এক জায়গায় স্নেহ ও মমতার এমন গভীর প্রকাশে বুঝি তাদের মন ছুঁয়ে গেল।

গ্ল্যাডিয়েটর তার পায়ের নলা ও হাতের সামনের অংশে শক্ত চামড়ার বর্ম বেঁধে নিল, তারপর হেলমেটটি মাথায় পরলো। তত্ত্বাবধায়ক যখন তার শরীরের ওপরের অংশে ধাতব বর্ম (মেইল ভেস্ট) পরিয়ে দিচ্ছিল, তখন তার মন চলে গেল স্বাধীন মানুষ হিসেবে কাটানো শেষ দিনগুলোর এক স্মৃতিতে। প্রিসিলার সাথে কাটানো সেই নীরব রাতটির কথা মনে পড়লো, যখন কোনো কথা ছাড়াই সব অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছিল এবং কোনো কিছুই অস্পষ্ট থাকেনি। সবশেষে সে তার তলোয়ার ও ঢাল তুলে নিল, প্রহরীদের অনুসরণ করে অ্যারেনার প্রবেশপথে গিয়ে দাঁড়ালো এবং ডাকের অপেক্ষায় রইল।

তূর্যধ্বনি বেজে উঠল, দর্শকদের মধ্য থেকে ভেসে এলো সম্মিলিত চিৎকার। প্রহরীরা তাকে ঠেলে সেই অস্থায়ী অ্যারেনার ভেতরে পাঠিয়ে দিলো, যেখানে তাকে নিজের জীবন বাঁচাতে লড়াই করতে হবে।

সব লড়াই-ই যে জীবন-মরণের লড়াই হয় তা নয়। তবে আজকের লড়াইয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। চোখ কুঁচকে সে চারপাশটা দেখে নিল। যুদ্ধক্ষেত্র, গ্যালারি, আর তিনজন লোক মিলে এক অচেতন পরাজিত যোদ্ধাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে (যাকে দেখে মনে হচ্ছিল কোনো মানুষের হাতে নয়, বরং সিংহের আক্রমণে সে ক্ষতবংশত হয়েছে)। এরপর সে তার প্রতিপক্ষকে দেখলো, অবিশ্বাস্য রকমের বিশালদেহী। বর্শার মতো ঋজু ভঙ্গি, দৃঢ় চিবুক, কাঁটাযুক্ত পট্টি জড়ানো মুষ্টিবদ্ধ হাত, আর মুখের একপাশে—যেখানে আগে একটি চোখ ছিল এখন সেখানে ব্যান্ডেজ বাঁধা। তার চেহারায় এমন এক হিংস্র ভাব ফুটে ছিল যে তা দেখে গ্ল্যাডিয়েটরের পা যেন অবশ হয়ে এলো।

এক বৃদ্ধ যোদ্ধা একবার তাকে বলেছিল, শেষ লড়াইয়ের ঠিক আগে মানুষের জীবনের নানা মুহূর্ত স্বপ্নের মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সে বুঝতে পারলো এখন ঠিক সেটাই ঘটছে। স্মৃতির এক স্বপ্নিল স্রোত যেন সুদূর অতীত থেকে ধেয়ে আসছে। সেই স্মৃতির মিছিলে প্রিসিলার স্মৃতিটা ছিল প্রথম সারিতে। বন্ধুদের সাথে ‘হর্সটেইল ফলস’-এর পাদদেশে জলাশয়ে জলকেলি; বরফ-ঢাকা পাহাড়ে চড়া, যেখানে সে তার মা ও ভাইয়ের সাথে গ্রীষ্মের ছুটি কাটাত; সেই সুবাসিত বনভূমি যেখানে সে তার প্রথম প্রেমিকাকে জড়িয়ে শুয়েছিল; বসন্তকালে গাছে গাছে নতুন কুঁড়ি দেখে তার প্রথম বিস্ময়—ঋতুচক্রের জাদুকরী রূপ দেখে অভিভূত হওয়া; শ্যাওলার স্নিগ্ধ আর্দ্রতা; আর অগণিত প্রজাতির বিচিত্র সব প্রজাপতি, যাদের দেখে মনে জেগেছিল মাথা-ঘুরিয়ে দেওয়া প্রশ্ন: "এই সব সৌন্দর্যের উদ্দেশ্য কী?"

প্রথম আঘাতেই মনে হলো যেন তার বুকের পাঁজরগুলো ভেঙে ভেতরে দেবে যাচ্ছে; সে টলমল পায়ে পিছিয়ে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এখন তার সামনে এক ভয়াবহ সিদ্ধান্ত—হয় লড়াই করা অথবা মৃত্যু। শ্বাস নেওয়ার জন্য সে ধুঁকছিল, তলোয়ারের এক খোঁচা থেকে কোনোমতে গড়িয়ে সরে এলো এবং নিজেকে সামলে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো। ঢাল উঁচিয়ে প্রস্তুত হলো সে, মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলো এক অজানা দেবতার কাছে।

ডাক্তার যখন আমাকে জানালেন আমার ক্যান্সার আবার ফিরে এসেছে, ঠিক এই দৃশ্যটাই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। ·

মূলগল্প : The Gladiator by Ed Newman


লেখক পরিচিতি : এড নিউম্যান একজন লেখক, গল্পকার ও ব্লগার। তিনি বিজ্ঞাপনী জগতে ত্রিশ বছরেরও বেশি সময়ের কর্মজীবন শেষে এখন অবসরপ্রাপ্ত। বর্তমানে তিনি মিনেসোটার ডুলুথে বসবাস করছেন এবং গত দশ বছর ধরে সক্রিয়ভাবে ‘ডুলুথ ডিলান ফেস্ট’-এর প্রচার ও আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত আছেন।