চিত্রণ: দ্য নিউ ইয়র্কার; মূল আলোকচিত্র: পিটার টারজিয়ান

অনুবাদ : তনুশ্রী বিশ্বাস

আমরা একটা লম্বা টেবিল ঘিরে বসেছিলাম। কথা হচ্ছিল উপন্যাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে। বিষয়টা বেশ নিরাপদই মনে হচ্ছিল, কারণ এখন আর খুব বেশি মানুষ উপন্যাস পড়ে না। উপন্যাস কীভাবে লেখা হয়, বা অন্যভাবে কীভাবে লেখা যেতে পারে, সে কথা ভাবার লোক তো আরও কম। কাজেই আমরা যা-ই বলি, তাতে কারও কিছু মনে করার সম্ভাবনা ছিল না।

পাশের খাবারঘরে আমাদের মতোই আরেকটা দল প্রায় একই রকম একটা টেবিল ঘিরে বসেছিল। তাদের কথাবার্তার যতটুকু আমার কানে আসছিল, তাতে মনে হচ্ছিল, আমাদের চেয়ে তাদেরই লক্ষ্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

আমার ঠিক উল্টো দিকে যে লোকটা বসেছিল, তার মুখে কোনো মাস্ক ছিল না। তাকে দেখে সহজে কথা বলা যায় বলে মনে হলো। তাই আমি বললাম, “আগে ব্যাপারটা ছিল এমন, তুমি যা জানো আর আমি যা জানি। কিন্তু এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কম্পিউটারগুলো যা জানে। আমার মনে হয়, এই ব্যাপারটা এখনো ঠিকমতো কোনো উপন্যাসে আসেনি। ধরো,” আমি বললাম, “তোমার বাঁ দিকে তিন আসন পরে যে লোকটা বসে আছে, তার নাম কি তুমি জানো?”

আমি যে লোকটার কথা বলছিলাম, তার দিকে চোখ ফেরালাম না। সেটা অভদ্রতা হতো। আঙুল দিয়ে দেখানোর মতো চোখ দিয়েও কাউকে দেখানো অভদ্র হতে পারে। হয়তো আমি এটাও চাইনি যে লোকটা বুঝে ফেলুক আমরা তাকে নিয়ে কথা বলছি। তার মাথাটা দেখতে ছোট একটা গাঁটের মতো, চামড়ার রং যেন সেনাবাহিনীর পোশাকের সবুজ, আর মুখটা একটা ভিসরে ঢাকা।

“ওর নাম জানো?” আমি আমার উল্টো দিকে বসা লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম।

সে মাথা নাড়ল।

“আমিও জানি না,” আমি স্বীকার করলাম। “তবে ওর টি-শার্টে লেখা আছে, ও NP4। আর সেটা অবিশ্বাস করারই বা কী কারণ আছে?”

আমার উল্টো দিকে বসা লোকটা হেসে উঠল।

ওরা এখন আসছে, সেটা আমরা টের পাচ্ছিলাম। তবু তখনও মনে হচ্ছিল, আমাদের জন্য নয়, পাশের খাবারঘরের দলটার জন্যই ওরা আসছে। যদিও তাদের জন্যই আসার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে হচ্ছিল, আমাদের দল ঠিক করল উঠে একটু হাঁটাহাঁটি করা যাক।

চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে আমার উল্টো দিকে বসা সেই খোলামেলা মুখের লোকটা জিজ্ঞেস করল, “দুই আর দুই কেন?”

“তোমার হাতে কত সময় আছে?” আমি পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম।

“হয়তো পরে আবার এ কথায় ফেরা যাবে,” যে লোকটা একটু আগে আমার উল্টো দিকে বসেছিল, আর এখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, সে হেসে বলল।

“কিন্তু পরে হয়তো আর ফেরাই হবে না,” আমি বললাম, টেবিলের যন্ত্রটায় কার্ডটা ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে। “অঙ্ক থেকে যারা একবার বিরতি নেয়, তারা অনেক সময় আর ফিরে আসে না।”

আমার নিজের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তার বদলে আমি উপন্যাস লেখা শুরু করেছিলাম।

আমরা কোট আর ব্যাকপ্যাকগুলো আসনের কাছেই রেখে গেলাম। আমরা চেয়েছিলাম, ওরা যেন ভাবে আমরা খুব শিগগিরই ফিরে আসব, শুধু একটু তাজা হাওয়া খেতে বেরিয়েছি। আমাদের প্রত্যেককে একটা করে পিতলের পানির বোতল দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমারটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বাইরে বেরোনোর সময় সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে যে বোতলটা দেওয়া হয়েছিল, সেটা কি তার কাছে আছে?

ছিল। সে আমাকে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ বোতলটার ওপর আমার সন্দেহ হলো। আমার পুরোনো পানির বোতলটাই ফিরে পেতে ইচ্ছে করল। কোট আর ব্যাকপ্যাকও। কারণ সত্যি বলতে আমি তো আর রেস্তোরাঁয় ফিরে আসছিলাম না। আমি পালিয়ে যাচ্ছিলাম।

দলটাকে ছেড়ে ঘুরে আবার ভেতরে ঢুকলাম। আমার পুরোনো পানির বোতলটা সেখানেই ছিল। একবার হাত থেকে পড়ে গিয়ে একটা জায়গা তুবড়ে গেছে। বছরের পর বছর বাইকের ফ্রেমে লাগানো হোল্ডারের মধ্যে ঝনঝন করতে করতে বেগুনি রংটাও আঁচড়ে ক্ষয়ে গেছে।

পুরোনো বোতলটা আবার পানি দিয়ে ভরার সময় আছে কি? ওরা যেকোনো মুহূর্তে এসে পড়তে পারে। আর হয়তো নিজের সঙ্গে আনা পানি খেয়েছি বলেই অন্যদের চেয়ে বেশি সজাগ থাকতে পেরেছি। হয়তো সেটাই আমাকে রক্ষা করেছে। হয়তো রেস্তোরাঁর পানিতে এর মধ্যেই কিছু মেশানো হয়েছে।

পাশের খাবারঘরের টেবিলটার দিকে আরেকবার তাকালাম। সবাই তখনো বসে আছে, কিছুই সন্দেহ না করে কথা বলে যাচ্ছে। একজন বয়স্ক লোক তার চেয়ে কমবয়সী একজনের বাহু ছুঁয়ে ছিল, কিন্তু তাতে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। দুজনকেই দেখতে একেবারে মানুষের মতো।

হয়তো আমি ভুলই ভেবেছিলাম যে তাদের কিছু একটা হতে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই বুঝতে পারলাম, ওরা একটা টেবিল বাদ দিয়ে আরেকটা টেবিলের জন্য আসবে না। ওরা এর মধ্যেই প্রতিটি টেবিলে আছে। এর মধ্যেই কত কিছু যে রোজকার নজরের আড়ালে চলে গেছে।

আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। নিজেকে বললাম, চলতেই থাকলে হয়তো আরও কিছুক্ষণ ওদের আগে আগে থাকা যাবে।

পৃথিবীর শেষ সময় এসে গেছে, আর আমরা কয়েকজন একটা বড় পরিত্যক্ত বাড়িতে জড়ো হয়েছি। “এমন একটা সিনেমার মধ্যে থাকাকে স্বাভাবিক ভাবো, যার শেষটা তুমি জানো না,” আমি বললাম, অথবা ঘরের মধ্যে অন্য কেউ বলল। কারণ আমরা জানতাম, আমরা সবাই মরতে যাচ্ছি, কিন্তু কীভাবে বা কখন, সেটা জানতাম না। আমরা একটা সিনেমা দেখছিলাম এবং মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম, সিনেমাটা শেষ হওয়ার আগেই আমরা মরে যাব। তবে পরিস্থিতি যখন এমন, তখন সেটাই স্বাভাবিক।

সিনেমাটার মধ্যে আমরা বেশ ঢুকে পড়েছিলাম, একটু একটু করে চোখও ভিজে আসছিল, এমন সময় বারান্দায় একদল লুটেরা দেখা দিল। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে মানুষ মারছিল আর জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছিল। সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল।

ঠিক তখনই আমার মনে পড়ল, বাড়িটার বেসমেন্টে পুরো আরেকটা ফ্ল্যাট আছে। আমাদের তো সিনেমাটা সেখানেই দেখা উচিত ছিল। তাহলে লুটেরারা বুঝতেই পারত না যে বাড়িতে কেউ আছে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তাতেও কিছু আসত-যেত না। আর তখন ‘শেষ পর্যন্ত’ বলতে কয়েক ঘণ্টার বেশি কিছু নয়।

মরতে থাকা সেই সিনেমাটা দেখতে দেখতে আমার পাশে একটা রোগা কিশোর বসেছিল। আমি তাকে বললাম, সিনেমায় এখনো আমাদের দুজনের কারও কথা একবারও আসেনি। তাই আমার সন্দেহ হচ্ছে, কোনো বিস্ফোরণে আমরা দুজনেই মারা যাই, আর তারপর আমাদের আর কোনো খবর কেউ পায় না। বিদায় হিসেবে তাকে চুমু খাওয়ার কথা একবার ভাবলাম। কিন্তু আমাদের এইমাত্র পরিচয় হয়েছে। তাছাড়া ভাবলাম, সে এতটাই ছোট কি না যে নিজেই এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, এমন কিছু সে চাইবে কি না।

আমি রান্নাঘরে ছিলাম। তিন দিকে জানালা, মাঝখানে চওড়া একটা টেবিল। রাঁধুনি ট্রাম্পের মাথা তৈরি করছিল।

সে একটা চামচ দিয়ে কাজ করছিল। মাথার অনেকটাই গোলাপি আর ঘন, যেন একটু ভালো মানের কুকুরের খাবার। কিন্তু মস্তিষ্কের কয়েকটা অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, সেগুলো তাকে চেঁছে ফেলে দিতে হচ্ছিল। সেগুলো ছিল পচে যাওয়া আলুর ভর্তার মতো পাতলা-থকথকে, হলদে আর তেলতেলে।

আমার মনে হলো, তাকে বুঝিয়ে বলা দরকার যে আমি বোধহয় এর কিছুই খেতে চাই না।

“তাহলে কিন্তু ওকে অপমান করা হবে,” রাঁধুনি বলল।

যে রাতের খাবারে তার মাথা পরিবেশন করা হবে, ট্রাম্প নিজেও সেখানে থাকবে।

“কিন্তু আমি তো নিরামিষাশী,” আমি বলার চেষ্টা করলাম। “এটা যদি ওর মাথা না-ও হতো, তবু আমি খেতে পারতাম না।”

“আচ্ছা, তুমি যদি একটুও না খাও,” রাঁধুনি আমাকে সাবধান করল, “ও যখন তোমার শহরে আসবে, তখন কী করতে হবে তুমি বুঝতে পারবে না।” তার যুক্তি শুনে আমার সিগফ্রিডের কথা মনে পড়ল। সে ড্রাগনের হৃদয়ের কিছুটা খাওয়ার পর হঠাৎ পাখিরা কী বলছে তা বুঝতে পেরেছিল।

রাতের খাবারটা ধীরে ধীরে এমন এক সামাজিক আসরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছিল, যেখান থেকে কীভাবে সরে পড়তে হয় আমি কখনোই বুঝতে পারি না।

কখনো ভবনটা হয় মার্বেলের দেয়ালওয়ালা একটা লাইব্রেরি, যেখানে একটা লিফট আছে। কেউ না দেখার সময় আমাকে তাতে চুপ করে ঢুকে পড়তে হয়।

কখনো সেটা এমন একটা ছাত্রাবাস, যেখানে একসময় আমি থাকতাম। এখন আর চাবিটা আমার কাছে থাকার কথা নয়, তবু সেটা রয়ে গেছে।

ভবনটার ওপরের দিকে সব সময়ই একটা ঘর থাকে, যার কথা আর কেউ জানে না। সেখানে ঢুকতে আমাকে এমন সব কিছুর ওপর উঠতে বা টপকে যেতে হয়, যেখানে ওঠার ঝুঁকি নেওয়ার কথা বেশির ভাগ মানুষের মাথায়ই আসবে না। আর কেউ যদি আমাকে না দেখে, সেই ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছেটাই একটু একটু করে উড়ে যাওয়ার ক্ষমতায় বদলে যায়। শোনা যায়, স্বপ্নে উড়তে পারা নাকি ছোটবেলায় কারও কোলে থাকার স্মৃতি। কিন্তু কেউ না দেখলে আমি সত্যিই উড়তে পারি।

অনেক দিন ধরে আমি প্রতিদিন এই ঘরে আসতাম, কিন্তু কী এক কারণে বেশ কিছুদিন আর আসা হয়নি। আমার অবহেলায় জায়গাটার অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। দেয়ালের সাদা রং গুঁড়ো হয়ে গেছে। দেয়ালে গা লাগতেই সাদা গুঁড়ো আমার কোটের এক হাতায় লেগে যায়। ডাকবাক্স এতটাই ঠাসা যে খুলতেই কষ্ট হয়। ভেতরে বিল আর চিঠিগুলো চাপা পড়ে চ্যাপ্টা হয়ে আছে। সেগুলো দেখে আমার খুব খারাপ লাগে। এত দিন এগুলোর কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি যে এখন ভাবি, হয়তো এখনো দেখিনি এমন ভান করাই ভালো।

ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারলে সাধারণত আমি নিরাপদ। তবে ঢোকা বা বেরোনোর সময় কেউ আমাকে না দেখলেই ভালো।

এই ঘরে থাকার কোনো অধিকার আমার নেই। এ নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই।

আমি শুধু দেখতে এসেছি, আরও একটু সময় এখানে লুকিয়ে থাকা যায় কি না। লুকিয়ে থাকার এই অভ্যাসটা নিয়ে আরেকটু পার পাওয়া যায় কি না।

শুধু এই ঘরেই আমি সত্যিকার আমি হয়ে উঠি।

এই ঘরের গোপন কথাটা আমি কাউকে বলতে পারি না। কারণ যে-ই এর কথা শুনবে, সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় দু-তিনজন মানুষের নাম আসবে, যাদের এই ঘরের ওপর আমার চেয়ে বেশি অধিকার আছে।

আমি এখানে ঢুকি বিনা অনুমতিতে, আর সব সময়ই এভাবেই ঢুকতে হবে।

ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। যেমন থোরো একবার ধরা পড়েছিলেন, জরিপ করার অনুমতি পাওয়ার বহু বছর পরে সেই বনভূমিতে আবার ফিরে গিয়ে।


লেখক পরিচিতি : কেলেব ক্রেইন সমকালীন মার্কিন কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও সমালোচক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে The New Yorker-এ গল্প, প্রবন্ধ ও বই নিয়ে লেখা প্রকাশ করছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস Necessary Errors এবং পরের উপন্যাস Overthrow বিশেষভাবে আলোচিত। এছাড়া American Sympathy নামে তাঁর একটি গবেষণাগ্রন্থও আছে। তাঁর লেখায় একাকিত্ব, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সামাজিক অস্বস্তি, রাজনীতি, নজরদারি এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বারবার ফিরে আসে। বাস্তবতার ভেতরে স্বপ্ন, স্মৃতি ও অদ্ভুততার মিশ্রণও তাঁর সাম্প্রতিক কথাসাহিত্যের একটি লক্ষণ। ২০২৬ সালে তিনি American Academy of Arts and Letters-এর একটি পুরস্কার পেয়েছেন।