অনুবাদ: উৎপল দাশগুপ্ত

ফ্রানৎস কাফকা বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক। তিনি ১৮৮৩ সালের ৩ জুলাই প্রাগে (তৎকালীন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য) জন্মগ্রহণ করেন এবং জার্মান ভাষায় লিখতেন। ছিলেন বীমা দপ্তরের কর্মকর্তা। দিনের চাকরির পাশাপাশি রাতে লিখতেন। অন্তর্মুখী, আত্মসন্দিহান এবং পিতা-সম্পর্কিত মানসিক টানাপোড়েন তাঁর লেখায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বিয়ে করেননি।
জার্মান ভাষা থেকে গল্প দুটি ইংরেজি অনুবাদ করেছেন : উইলা এবং এড্যুইন মুইর


১. আইনের দরজায়

আইনের দরজায় পাহারা দিচ্ছে একজন প্রহরী।

দূর গ্রাম থেকে আসা এক মানুষ ঢোকার অনুমতি চাইল। প্রহরী মাথা নেড়ে বলল, “এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।” লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর জিগ্যেস করল , “একদিন কি ঢুকতে পারব?” প্রহরী বলল, “হ্যাঁ, পারবে। তবে এখনই ঢুকতে পারবে না।”

দরজাটা খোলা। প্রহরী সরে দাঁড়াতেই লোকটা ভেতরে উঁকি দেয়। প্রহরী হেসে বলে, “এতই যদি ইচ্ছে, আমার নিষেধ অমান্য করেই ঢুকে যাও। তবে মনে রেখো, আমার কিন্তু অনেক ক্ষমতা। অথচ আমি এই দরজার সব থেকে নগণ্য পাহারাদার। একটা হলের পর আরেকটা হল। প্রত্যেক হলের দরজায় একজন করে প্রহরী। প্রত্যেকেই আগের জনের থেকে বেশি ক্ষমতাশালী। তিন নম্বর প্রহরী এতই ভয়ংকর যে ওর দিকে চেয়ে থাকবার সাহস আমারও নেই।”

গ্রাম থেকে আসা লোকটার কল্পনাতেও ছিল না যে এভাবে আটকে যাবে। ওর বিশ্বাস, আইন তো সবার জন্য। সেই দরজা তো সব সময় খোলা থাকার কথা। পশমের কোট পরা, ছুঁচলো নাক আর কালো তাতার দাড়িওয়ালা পাহারদারকে ভালো করে দেখে ঠিক করল, অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো।

দারোয়ান ওকে একটা টুল এনে দিলো। দরজার এক পাশে বসতে বলল। লোকটা ওই জায়গায় বসে রইল, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। অনেকবার ভেতরে ঢোকবার চেষ্টা করল। বারবার ভেতরে ঢোকবার অনুমতি চেয়ে প্রহরীকে বিরক্ত করে ফেলল। প্রহরীও প্রায়ই ওকে ওর গ্রাম, ওর বাড়ি, আরও অনেক কিছু নিয়ে দু’চারটে প্রশ্ন করত। তবে প্রশ্নগুলো করত নির্লিপ্ত মুখে, ঠিক যেভাবে মনিবরা জিগ্যেস করে থাকে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হতো একইভাবে, এখনও ওকে ভেতরে যেতে দেওয়ার সময় হয়নি।

দীর্ঘ যাত্রার জন্য লোকটা সঙ্গে অনেক মূল্যবান জিনিস এনেছিল। একে একে সবকটা জিনিসই ঘুষ হিসেবে দারোয়ানের হাতে তুলে দিলো। দরোয়ান সবই নিল, কিন্তু প্রতিবার একই কথা বলল, “এগুলো নিচ্ছি শুধু এই জন্যই যাতে পরে তোমার মনে না হয়, কোনও কাজ বাদ পড়ে গেল।”

এভাবেই কেটে যায় বহু বছর। লোকটার সমস্ত মনোযোগ যেন ওই একটি দরোয়ানকে ঘিরেই বন্দি হয়ে থাকে। অন্য দরোয়ানদের কথা ওর মনেই পড়ে না। ওর মনে হতে থাকে, আইনের দরজায় পৌঁছনোর একমাত্র বাধা হলো এই প্রথম লোকটাই। নিজের দুর্ভাগ্যকে অভিশাপ দিতে থাকে। প্রথম জীবনে, দৃঢ় এবং উচ্চস্বরে। পরে যখন বয়স বেড়ে যেতে লাগল, কেবল বিড়বিড় করে। ধীরে ধীরে ও শিশুসুলভ হয়ে ওঠে। অনেক বছর ধরে প্রহরীকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে করতে, লোকটার পশমের কলারের উকুনগুলোও তাকে চিনে ফেলল। পাহারাদারের মন নরম করার কাজে সাহায্য করার জন্য উকুনগুলোর কাছেও সে মিনতি করে।

ক্রমশ ওর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে। অন্ধকারটা বাইরে নেমেছে, নাকি শুধু ওর চোখের ভেতর – বুঝে উঠতে পারে না। তবু সেই অন্ধকারের মধ্যেও টের পায়, আইনের দরজা থেকে এক অনির্বাণ দীপ্তি ক্রমাগত বেরিয়ে আসছে। বুঝতে পারে, ওর সময় ফুরিয়ে আসছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার সব স্মৃতি, সব অভিজ্ঞতা এসে ওর মনে একটাই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। সেই প্রশ্নটা যেটা পাহারাদারকে কখনও জিগ্যেস করেনি। অবশ শরীর আর তুলতে পারে না। ইশারায় দরোয়ানকে কাছে ডাকে। বয়সের ভারে লোকটা এতটাই কুঁকড়ে গেছে যে দু'জনের উচ্চতার পার্থক্য এখন অনেক বেশি।

দরোয়ান নিচু হয়ে মুখের কাছে আসে। “আবার কী জানতে চাও?” পাহারাদার জিগ্যেস করল। “তোমার কৌতূহলের আর শেষ নেই!” “আইনের কাছে পৌঁছতে তো সবাই চায়,” লোকটা বলল। “তাহলে এত বছরে আমি ছাড়া আর কেউ এই দরজায় এলো না কেন?” দারোয়ান বুঝতে পারল, লোকটার সময় ফুরিয়ে এসেছে। তাই ওর কানের কাছে জোরে জোরে বলল, “আর কারোর আসার প্রশ্নই ছিল না। এই দরজাটা তো কেবল তোমার জন্যই বানানো হয়েছিল। এবার আমি এটা বন্ধ করে দিচ্ছি।”


২. সম্রাটের শেষ বার্তা

শোনা যায়, মৃত্যুশয্যা থেকে সম্রাট তোমার জন্য একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। শুধু তোমার জন্য। এই বিশাল সাম্রাজ্যের এক অতি সামান্য প্রজা তুমি। সম্রাটের অমিত জ্যোতির সামনে দূরে কুঁকড়ে থাকা একটি ছায়া।

সম্রাট দূতকে মৃত্যুশয্যার পাশে হাঁটু গেড়ে বসতে বললেন। তারপর বার্তাটি ওর কানে ফিসফিস করে বললেন। বার্তাটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, দূতকে সেটি ফিসফিস করে ওঁর কানে পুনরাবৃত্তি করার আদেশ দিলেন। তারপর মাথা নেড়ে জানালেন – ঠিকই হয়েছে। হ্যাঁ, মৃত্যুশয্যার চারপাশে জড়ো হওয়া সকলের সামনে, ভেঙে পড়েছে সব বাধার দেয়াল। আকাশছোঁয়া প্রশস্ত সিঁড়ির ধাপে ধাপে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্যের মহারাজকুমারেরা। ওদের সবাইকে সাক্ষী রেখে সম্রাট এই বার্তাটি অর্পণ করলেন।

বার্তাবাহক সঙ্গে সঙ্গে পথে বেরিয়ে পড়ল। শক্তিমান, অবসাদহীন মানুষ। কখনও ডান, কখনও বাঁ হাত বাড়িয়ে জনতার ভিড় চিরে পথ করে এগোতে লাগল। কোথাও বাধা এলে, ও আঙ্গুল দিয়ে বুকের ওপর জ্বলজ্বল করা সূর্যের প্রতীকটির দিকে ইঙ্গিত করে। পথ খুলে যায়। আর কোনও মানুষের জন্য এত সহজে খুলত না।

কিন্তু মানুষের ভিড়ের কোনও শেষ নেই। একবার যদি ও খোলা আকাশের নিচে পৌঁছতে পারত, উড়ে যেত। তাহলে হয়তো আরও তাড়াতাড়ি তোমার দরজায় ওর মুঠির সেই আকাঙ্ক্ষিত করাঘাত শুনতে পেতে। কিন্তু ওর এই এত পরিশ্রমই নিরর্থক। শক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এখনও প্রাসাদের কক্ষের গোলকধাঁধাতেই ঘুরপাক খাচ্ছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসাটাই একরকম অসম্ভব। যদি বা সফলও হয়, তবু কোনও লাভ হবে না। এরপর ওকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে পথ করে নিতে হবে। সেটাও যদি পারে, তাহলেও কিছু লাভ হবে না। তারপর আছে প্রাঙ্গণ। সেটা পেরোতে হবে। প্রাঙ্গণের পর রয়েছে দ্বিতীয় বাহিরমহল, আর তারপর আবার অনেকগুলো সিঁড়ি, আবার অনেক প্রাঙ্গণ।

তারপর আবার একটি প্রাসাদ। তারপর আরও একটি। এভাবেই হাজার হাজার বছর। আর যদি একদিন সব থেকে বাইরের দরজাটিও ভেঙে ফেলতে পারে, ওর সামনে বিস্তৃত হবে সাম্রাজ্যের রাজধানী, পৃথিবীর কেন্দ্র, জনারণ্যে ফেটে পড়া এক শহর। যদিও সেটা হয়তো কখনওই ঘটবে না।

মৃত সম্রাটের বার্তা হাতে নিয়েও কেউ এই নগর পেরোতে পারবে না। তবু তুমি প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার পর জানালার পাশে বসে মনে মনে সেই বার্তারই স্বপ্ন বুনে যাও। ·