অনুবাদ: উৎপল দাশগুপ্ত
পর্ব-৪৬
সেই রাত্রে শহরের উত্তরপ্রান্তের খুব কম পরিবারই ঘুমোতে পেরেছিল। ছায়ামূর্তির মতো ইন্ডিয়া বাড়ির পেছনের উঠোন দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় রান্নাঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা ওর উদ্বিগ্ন ফিসফাস, আর তারপর ঝোড়ো অন্ধকারের মধ্যে আতঙ্ক আর দুরাশা বুকে নিয়ে ওর মিলিয়ে যাওয়া, সব মিলিয়ে ক্ল্যানের বিপর্যয়ের আর রেটের সুকৌশল হস্তক্ষেপের খবর নিঃশব্দ পদচারণায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল।
আপাতদৃষ্টিতে কালো কালো গৃহের সারি, নিস্তব্ধ, যেন নিদ্রার অতলে তলিয়ে আছে। কিন্তু প্রতিটি গৃহের অভ্যন্তরে রাতভর বহু কণ্ঠের মৃদু কিন্তু উত্তপ্ত গুঞ্জন। সেদিন রাতের অভিযানে অংশগ্রহণকারীরাই কেবল নয়, ক্ল্যানের প্রতিটি সদস্য পলকের ইশারায় সমরে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত। সেদিন রাতে পীচট্রী স্ট্রিটের প্রায় প্রতিটি আস্তাবলে অন্ধকারের মধ্যেই জিন পরিয়ে ঘোড়া তৈরি রাখা হয়েছে। জিন থেকে ঝোলা রসদের থলিতে আহার্য। কোমরবন্ধে পিস্তল বাঁধা। এঁরা কেউই বেরিয়ে পড়েননি, কারণ যাওয়ার সময় চাপা গলায় বলে গেছে, “ক্যাপটেন বাটলার বলে দিয়েছেন, আপনারা কেউ যেন বের না হন। প্রতিটি রাস্তায় নজর রাখা হচ্ছে। ওই ওয়াটলিং মেয়েমানুষটার সঙ্গে উনি বন্দোবস্ত করে রেখেছেন – ” অন্ধকারের ভেতর থেকেই পুরুষমানুষরা চাপা গলায় বলেছেন, “ওই শয়তান স্ক্যালাওয়াগ বাটলারটাকে বিশ্বাস করব কেন? কে বলতে পারে এটা একটা ফাঁদ নয়?” আর মহিলারা মিনতি করে বলেছেন, “যেও না! উনি যদি অ্যাশলে আর হিউকে বাঁচিয়ে এনে থাকতে পারেন, উনি সবাইকেই বাঁচাতে পারবেন। ইন্ডিয়া আর মেলানি যদি ওঁকে বিশ্বাস করে থাকতে পারে – ” ফলে ওঁরা কেউ বের হননি, পুরোপুরি ওঁকে বিশ্বাস না করতে পারলেও, কারণ বিশেষ কিছু করবার উপায়ও ছিল না।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা সৈন্যরা প্রায় ডজনখানেক বাড়ির দরজায় কড়া নেড়েছিল। সেই রাতে কোথায় ছিল যারা বলতে পারেনি, বা বলতে চায়নি, তাদের সবাইকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। যাদের সেদিন জেলে রাত কাটাতে হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিল রেনে পিকার্ড আর মিসেজ় মেরিওয়েদারের একজন ভাইপো, সিমন্স ভাইয়েরা আর অ্যান্ডি বনেল। এরা সকলেই সেই রাতের বিফল অভিযানে ভাগ নিয়েছিল কিন্তু গ্রহের ফেরে গুলি চলার পরে একে অপরের থেকে ছিটকে পড়েছিল। জোরে ঘোড়া ছুটিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই ওদের গ্রেফতার করা হয়। রেটের পরিকল্পনার কথা ওরা জানতেই পারেনি। ভাগ্যক্রমে জেরার জবাবে ওরা সবাই বলেছিল সেই রাতে ওরা কোথায় ছিল সেটা ওদের নিজস্ব ব্যাপার, ইয়াঙ্কিদের তাতে নাক গলানোর অধিকারই নেই। সকালে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওদের গারদে পুরে রাখা হলো। বৃদ্ধ মেরিওয়েদার আর আঙ্কল হেনরি হ্যামিলটন নির্লজ্জের মতো বলে দিলেন যে ওঁরা সন্ধ্যেটা বেল ওয়াটলিংয়ের শুঁড়িখানায় কাটিয়েছেন। ক্যাপটেন জেফরি বিরক্ত মুখে বললেন ওঁদের যা বয়স, তাতে কথাটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। এই শুনে ওঁরা ফুঁসে উঠে ক্যাপটেনকে এই মারেন কি সেই মারেন!
ক্যাপটেন জেফরির তলবের জবাব বেল ওয়াটলিং নিজে এসেই দিলো। উনি কিছু জিগ্যেস করার আগেই চেঁচামেচি করে জানিয়ে দিলো যে কোঠাবাড়ি আজ রাত্তিরের মতো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যের মুখেই নাকি একদল ঝগড়াটে মাতাল কিছু লোক এসে একে অপরের সঙ্গে হাতাহাতি লাগিয়ে দেয়, জিনিসপত্র তছনছ করে দেয়, দামী দামী সব আয়না সব ভেঙে দেয় আর ওর মেয়েদের এমন ভড়কে দেয় যে বাধ্য হয়েই আজ রাতের মতো ওদের ছুটি দিতে হয়েছে। অবশ্য ক্যাপটেন জেফরি যদি মদ্যপানের ইচ্ছে থাকে, তাহলে পানশালা এখনও খোলা আছে, - ”
ওঁর লোকজন সবাই মিলে যে মুখ টিপে হাসাহাসি করছে, সেটা ক্যাপটেন জেফরির নজর এড়াল না। খুব অসহায় মনে হচ্ছিল নিজেকে। একটা কুহেলিকার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন যেন। রেগেমেগে বললেন যে মেয়েদের কাছেও ওঁর কোনো প্রয়োজন নেই, না মদ্যপান করবার কোনো ইচ্ছে তাঁর আছে। বেলের কাছে কড়া গলায় জানতে চাইলেন ওইসব উড়নচণ্ডে খদ্দেরদের নাম ওর জানা আছে কিনা। অবশ্যই জানা আছে বেল-এর, কারণ ওঁরা যে ওর নিয়মিত খদ্দের! প্রতি বুধবার ওঁরা এখানে আসেন। নিজেদের নাম দিয়েছেন ‘বুধবারের ডেমোক্র্যাটস’, যদিও সেটা বলতে কী বোঝায় তা ও জানে না, জানবার কোনও ইচ্ছেও নেই। ওঁরা যদি দোতলার হলের আয়নাগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ না দেন, তাহলে আদালতে যেতে বাধ্য হবে। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ও এই আখড়া চালায় আর – ওহো, ওঁদের নাম জানতে চাইছেন? বেল গড়গড় করে যে বারোজন সন্দেহভাজন, তাঁদের নাম বলে গেল। তিক্ত হাসি হাসলেন ক্যাপটেন জেফরি।
“এই শয়তান বিদ্রোহীগুলোর সংগঠন আমাদের গুপ্তচর বাহিনীর থেকে কোনো অংশে কম নয়,” ক্যাপটেন বললেন। তোমার মেয়েদের নিয়ে তোমাকে আগামীকাল প্রোভোস্ট মার্শালের সামনে হাজিরা দিতে হবে।”
“প্রভোস্ট ওঁদের কাছ থেকে আমার আয়নার দাম আদায় করে দেবেন তো?”
“চুলোয় যাক তোমার আয়না! রেট বাটলারের কাছ থেকে আদায় করে নিও। ওই তো জায়গাটার মালিক, ঠিক কিনা?”
ভোর হতে না হতেই, প্রাক্তন কনফেডারেটদের প্রত্যেক পরিবারই পুরো ঘটনাটা জেনে গেল। আর ওদের নিগ্রোরা, যাদের সঙ্গে এসব নিয়ে কোনো কথাই বলা হয়নি, তারাও সব জেনে গেল, কালো মানুষদের নিজস্ব বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের থেকে। কী ভাবে এই মাধ্যম কাজ করে সেটা সাদা মানুষদের বুদ্ধির অগম্য। হানাহানির খবর সবাই বিস্তারিতভাবে জানে, ফ্র্যাঙ্ক কেনেডির হত্যার কথা, টমি ওয়েলবার্নের চোট লাগার কথা, আর ফ্র্যাঙ্কের দেহ সরিয়ে আনার সময় অ্যাশলের গুলি লাগার কথা।
চরম দুঃখজনক এই ঘটনার কিছুটা দায় যে স্কারলেটের ওপরেই বর্তায়, সেটা মহিলাদের মনে হয়েছিল। তাই ওঁরা স্কারলেটকে তীব্র ঘৃণার চোখে দেখছিলেন। তবে বেচারা স্বামীকে হারিয়েছে, আর জেনেও কথাটা মুখে আনতে পারছে না, তাই ওঁদের ঘৃণা কিছুটা হলেও প্রশমিত হলো। একটাই মাত্র সান্ত্বনা, ফ্র্যাঙ্কের দেহের দাবীটা অন্তত জানাতে পারবে। কিন্তু এই মুহূর্তে তো ওর কিছুই জানার কথা নয়। কাল আলো ফোটার পর ফ্র্যাঙ্ক আর টমির মৃতদেহ যতক্ষণ না আবিষ্কৃত হচ্ছে, একে অপরের দিকে পিস্তল তাক করা অবস্থায়, কি না, কোঠার একটা মেয়ের জন্য ঝগড়া করতে গিয়ে দুজনে দুজনের ওপর গুলি চালিয়ে দিয়েছে, আর সেই খবর কর্তৃপক্ষ যতক্ষণ না জানাচ্ছে, ততক্ষণ মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হবে। টমির বউ ফ্যানির অল্প কয়েকদিন আগেই বাচ্চা হয়েছে। অন্ধকারে বেরিয়ে গিয়ে ওকে সান্ত্বনা দেবার জন্য সবাই ব্যাকুল হয়ে আছে। অথচ যাওয়ার উপায় নেই। একদল ইয়াঙ্কি বাড়ির সামনে টহল দিচ্ছে টমির ফিরে আসার অপেক্ষায়। আর এদিকে আন্ট পিটির বাড়ির সামনেও টহল দিচ্ছে আরেকদল ইয়াঙ্কি, ফ্র্যাঙ্কের ফেরার অপেক্ষায়।
ভোর হতে না হতেই চতুর্দিকে খবর রটে গেল যে সামরিক তদন্ত সেদিনই হবে। উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষা আর রাত্রি জাগরণে ক্লান্ত নগরবাসীর জানা ছিল যে কিছু বিশিষ্ট নাগরিকের নিরাপত্তা তিনটে জিনিসের ওপর নির্ভর করছে – নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অ্যাশলে উইল্কসের সামরিক বোর্ডের সামনে হাজিরা দেওয়ার সামর্থ্য, যাতে মনে হয় অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে পরের দিন সকালে মাথাব্যথা নিয়ে ঘুম থেকে ওঠার চেয়ে বেশি গুরুতর কিছুই ওর হয়নি; বেল ওয়াটলিংয়ের সাক্ষ্য, যে এই সব লোকেরা সারাটা সন্ধ্যে ওর কোঠাবাড়িতেই হাজির ছিল; আর রেট বাটলারের সাক্ষ্য, যে উনিও ওঁদের সাথেই ছিলেন।
এই শেষের দুটো ব্যাপারকে কেন্দ্র করে শহরের মানুষ কিন্তু মনে মনে জ্বলছিল! বেল ওয়াটলিং! শেষে কিনা ওর কথার ওপরেই এঁদের মরণবাঁচন নির্ভর করছে! অসহ্য! বেলকে আসতে দেখেই যে সব মহিলারা জাঁক দেখিয়ে রাস্তা পার হয়ে যেতেন, তাঁরা কম্পিতহৃদয়ে ভাবতে বসলেন সেই সব কথা ও মনে রেখেছে কিনা! যদি মনে রেখে থাকে? মহিলাদের মতো পুরুষমানুষরা কিন্তু বেল-এর কাছ থেকে জীবন ভিক্ষা নিতে ততটা অপমানিত বোধ করলেন না, কারণ ওঁদের মধ্যে অনেকেই বেলকে ভালো মনের মানুষ বলে মনে করেন। কিন্তু রেট বাটলার, যে কিনা এক নম্বরের জোচ্চোর, তার ওপর একজন স্ক্যালাওয়াগ, তারই কথার ওপরে ওঁদের জীবন আর মুক্তি পাওয়া ঝুলে রয়েছে, এই কথাটাই বুকে বেশি করে বাজল। বেল আর রেট, একজন শহরের সব চাইতে নামকরা গণিকা, আর অন্যজন সর্বাপেক্ষা ঘৃণিত মানুষ! আর এদের কাছেই কিনা ঋণী হয়ে থাকতে হবে!
অন্য একটা ভাবনাও ওদের মনে নিষ্ফল আক্রোশ তৈরি করল, সেটা হলো ইয়াঙ্কিরা খুব হাসাহাসি করবে। কী হাসিটাই না হাসবে! শহরের বারোজন মান্যগণ্য নাগরিকের নাকি বেল ওয়াটলিংয়ের শুঁড়িখানায় নিয়মিত যাতায়াত! এঁদের মধ্যে দুজন আবার সস্তা একটা মেয়েছেলের জন্য লড়াই করে জান দিয়ে দিয়েছে! অন্যদের মাতলামি করার জন্য ওই জায়গা থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে হয়েছে, কারণ সেটা বেল-এর কাছেও অসহ্য মনে হয়েছিল! এঁদের মধ্যে কাউকে কাউকে আবার গারদে পুরে দেওয়া হলেও দাবী করছেন যে ওঁরা মোটেই ওখানে ছিলেন না, এদিকে শহরের সবাই জেনে গিয়েছে, ওঁরা ওখানেই ছিলেন!
ইয়াঙ্কিরা যে হাসাহাসি করবে, অ্যাটলান্টার মানুষ কথাটা ঠিকই আন্দাজ করেছিল। বহুদিন ধরেই ইয়াঙ্কিরা দক্ষিণের মানুষদের শীতলতা আর ঘৃণা সহ্য করে অস্বস্তিবোধ করত। শেষমেষ সেই অহঙ্কার বুদ্বুদের মতো ফেটে গেল, খুব একচোট হাসির খোরাক হয়ে। অফিসাররা সহযোদ্ধা বন্ধুদের ঘুম থেকে তুলে খবরটা দিলেন। স্বামীরা স্ত্রীদের ভোরবেলা ঘুম থেকে জাগিয়ে খবরটা বললেন, অবশ্যই মেয়েদের কাছে যতটা খোলাখুলি বলা যায় ততটাই জানালেন। আর মহিলারা, সাত তাড়াতাড়ি গায়ে পোশাক চড়িয়ে, খটখট করে পড়শিদের দরজা খুলিয়ে খবরটা চাউর করে দিলেন। ইয়াঙ্কি মহিলারা খবরটা জেনে যার পর নাই মজা পেলেন, আর হাসতে হাসতে ওঁদের চোখে জল এসে গেল। তার মানে সৌজন্যবোধ আর বীরত্বের যে বড়াই তোমরা করে থাক, সেটা এই? যে সব মহিলারা এতদিন দেমাক দেখিয়ে বাড়িয়ে দেওয়া বন্ধুত্বের হাত প্রত্যাখ্যান করেছে আর কি মাথা উঁচু করে চলতে পারবে, যখন সবাই জেনে গেছে যে ওদের স্বামীরা রাজনৈতিক সভার নাম করে কোথায় সময় কাটাত! রাজনৈতিক সভা! আর লোক হাসিও না তোমরা!
সকলে মিলে ব্যাপারটা নিয়ে হাসাহাসি করলেও, স্কারলেটের লোকসানের জন্য ওরা কিন্তু দুঃখ প্রকাশ করল। সর্বোপরি স্কারলেট একজন লেডি, এবং অ্যাটলান্টার বিরল লেডিদের একজন যে ইয়াঙ্কিদের মানুষ বলে মনে করে। ওদের সহানুভূতি স্কারলেট আগে থেকেই পেয়ে গেছিল, কারণ মেয়ে হয়েও ওকে অর্থোপার্জনের জন্য এত পরিশ্রম করতে হয়, ওর স্বামীর যা রোজগার যথেষ্ট নয়, কিংবা উনি কার্পণ্য করতেন। একথা ঠিক যে উনি স্বামী হিসেবে মোটেও ভালো ছিলেন না, কিন্তু তাঁর যে চরিত্রদোষও ছিল, সেটা জানতে পারাটা বেচারির পক্ষে খুবই কষ্টকর। আরও বেশি কষ্টকর এই জন্য যে ওঁর আনুগত্যহীনতার খবর আর মৃত্যুর মতো দুঃসংবাদ বেচারিকে একসঙ্গে পেতে হলো। হাজার হলেও স্বামী না থাকার থেকে কৃপণ স্বামী থাকাও ভালো। ফলে ইয়াঙ্কি মহিলারা ঠিক করলেন এখন থেকে ওঁরা স্কারলেটের প্রতি আরও বেশি সহৃদয়তা দেখাবেন। তবে অন্যান্যরা, যেমন মিসেজ় মীড, মিসেজ় মেরিওয়েদার, মিসেজ় এলসিং, টমি ওয়েলবার্নের বিধবা এবং বিশেষ করে মিসেজ় অ্যাশলে উইল্কস, এঁদের সাথে দেখা হলেই ওঁরা বিদ্রুপ করবেন। সৌজন্যবোধ কাকে বলে, তাহলে ওঁরা বুঝতে পারবেন।
সেদিন রাত্রে, শহরের উত্তরপ্রান্তে, নিজের নিজের ঘরের অন্ধকারে বসে, এই একই ব্যাপার নিয়ে বেশিরভাগ ফিসফাস চলছিল। অ্যাটলান্টার মহিলারা সরোষে তাঁদের স্বামীদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, ইয়াঙ্কিরা কী ভাবছে না ভাবছে তাতে ওঁরা বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। অবশ্য মনে মনে ওঁরা ভাবছিলেন, ইয়াঙ্কিদের হাসির খোরাক হওয়ার চেয়ে ওঁদের যদি চরমতম শাস্তিও মিলত, সেটা অনেক বেশি সম্মানজনক হতো। স্বামীদের ব্যাপারে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করতে না পারায় মনে মনে ফুঁসছিলেন ওঁরা।
যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি্র মধ্যে রেট চালাকি করে ওঁকে এবং অন্যান্যদের জড়িয়ে দিয়েছেন এবং সম্মানহানি ঘটিয়েছেন, সেটা সইতে না পেরে ডঃ মীড মিসেজ় মীডকে বললেন, যদি অন্যদের ধরা পড়বার ভয় না থাকত, তাহলে উনি নিজে গিয়ে সব কথা স্বীকার করে বরং ফাঁসি যাওয়াটাই ভালো হতো। বেল-এর কোঠায় ছিলেন বলার থেকে সেটাই অনেক বেশি সম্মানের হতো।
“এটা তোমার অপমান, মিসেজ় মীড,” ক্রুদ্ধস্বরে বললেন।
“কিন্তু সবাই তো জানবে, তুমি – তুমি ওই নরকে – ”
“ইয়াঙ্কিরা জানবে না। যদি আমরা মাথা বাঁচাতে পারি, এই কথাটা ওদের বিশ্বাস করতেই হবে। আর ওরা হাসাহাসি করবে। একজনও কেউ যদি কথাটা বিশ্বাস করে আর হাসে, আমার রাগ হবে। আর এটা তোমারও অপমান, বুঝেছ, কারণ আমি কখনোই তোমার বিশ্বাসভঙ্গ করিনি।”
“সে কী আমি জানি না?” অন্ধকারের মধ্যে মিসেজ় মীড তাঁর শীর্ণ হাত দিয়ে ডঃ মীডের হাত স্পর্শ করলেন। “কিন্তু কি জানো, তোমার সামান্যতম বিপদ হওয়ার চেয়ে কথাটা সত্যি হলেও আমি কিছু মনে করতাম না।”
“তুমি কী বলছ, মিসেজ় মীড সে কি তুমি জান?” আর্তনাদ করে উঠলেন ডাক্তারবাবু। স্ত্রীর এই অপ্রত্যাশিত বাস্তবতায় উনি পীড়িত বোধ করতে লাগলেন।
“হ্যাঁ, জানি আমি। ডার্সি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, ফিল আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, তুমিই এখন আমার সর্বস্ব। তোমাকে হারানোর থেকে, তুমি যদি ওই জায়গায় গিয়ে থাকতে শুরু কর, সেটাও আমি মেনে নেব।”
“তোমার মাথা একদম খারাপ হয়ে গেছে! কিছু না বুঝেই যা তা বলছ।”
“বুড়ো বয়সে তোমার ভিমরতি ধরেছে,” মিসেজ় মীড ওঁর বাহুতে মাথা রেখে হেলান দিয়ে মিসেজ় মীড সস্নেহে বললেন।
মিসেজ় মীডের গালে সস্নেহে হাত বোলাতে বোলাতে ডঃ মীড নীরব ক্রোধে ফুঁসতে লাগলেন। তারপর আবার বিস্ফারিত হয়ে বললেন, “আর ওই বাটলার লোকটার কাছে ঋণী হয়ে থাকা! এর থেকে ফাঁসি যাওয়াটাই অনেক সহজ ছিল। হতে পারে ওই লোকটার জন্য আমার প্রাণ বেঁচে গেছে, তা বলে আমি কিছুতেই ওর সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করতে পারব না! ওর আস্পর্ধা একেবারে আকাশচুম্বি, আর ওই নির্লজ্জ মুনাফাখোর আমার রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয়! যে লোকটা কখনোই যুদ্ধে গেল না, তার কাছে জীবনভিক্ষা পাওয়া যে কী – ”
“মেলি বলেছে, অ্যাটলান্টার পতন হওয়ার পরে উনি নাম লিখিয়েছিলেন।”
“ডাহা মিথ্যে কথা! যে কোনও বজ্জাত লোকের বাকচাতুর্যেই মিস মেলি গলে যায়। একটা ব্যাপার কিছুতেই আমার মাথায় আসছে – লোকটা এই সব ঝামেলায় নিজেকে জড়াচ্ছে কেন? বলতে আমার খারাপ লাগছে – ওই লোকটার সাথে মিসেজ় কেনেডিকে জড়িয়ে অনেক কানাঘুষো শুনি। গত বছর ওদের দুজনকে মাঝে মাঝেই একসাথে ফিরতে দেখেছি। এত কিছু, মনে হয়, মিস মেলির জন্যই লোকটা করেছে।”
“স্কারলেটের জন্য হলে, উনি আঙ্গুলটাও নাড়াতেন না। ফ্র্যাঙ্ক কেনেডি ফাঁসি গেলেও ওঁর কিছু এসে যেত না। আমারও মনে হয় মেলির জন্যই – ”
“মিসেজ় মীড, ওদের দুজনের মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে এরকম কোনও কটাক্ষ তুমি করতে পার না!”
“বোকার মত কথা বোলো না! তবে যুদ্ধের সময় প্রত্যর্পণের মাধ্যমে অ্যাশলেকে ছাড়িয়ে আনার পর থেকে মেলি ওঁর প্রতি একটু বেশি মাত্রাতেই অনুরক্ত হয়ে পড়েছে। তবে ওঁর সম্বন্ধে এই কথা আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, উনি যখন মেলির সঙ্গে থাকেন, ওঁর মুখে কখনোই সেই গা-জ্বালানো হাসিটা থাকে না। তখন ওঁকে অত্যন্ত সুরূচিসম্পন্ন এবং চিন্তাশীল ব্যক্তি বলে মনে হয় – একেবারে অন্য ধরণের মানুষ। মেলির সঙ্গে উনি যেরকম ব্যবহার করে থাকেন, তাতে বোঝা যায় চাইলে উনিও শালীন হতে পারেন। তাই উনি এত কিছু কেন করছেন, সেটা নিয়ে আমার ধারণা – ” মিসেজ় মীড একটু থামলেন। “ডাক্তারবাবু, তোমার হয়তো আমার ধারণাটা ভালো লাগবে না।”
“পুরো ব্যাপারটাই আমার ভাল লাগছে না!”
“বেশ, তবে আমার কি মনে হয় জানো? মেলির কথা ভেবেই কাজটা উনি করেছেন ঠিকই, অন্তত খানিকটা তো বটেই, তবে ওঁর আরেকটা গুঢ় উদ্দেশ্যে হলো আমাদের হাসির খোরাক তৈরি করে দেওয়া। আমরা ওঁকে এত ঘৃণা করেছি, আর কোনও রাখঢাক না করেই করেছি। আর এখন উনি আমাদের সবাইকে বাগে পেয়ে গেছেন। হয় তোমার লাজলজ্জার মাথা খেয়ে ইয়াঙ্কিদের সামনে স্বীকার কর, তোমরা ওই ওয়াটলিং মেয়েমানুষটার ওখানে ছিলে, যাতে তোমাদের বউদের মাথাও কাটা যায়, আর নয়তো সত্যি কথাটা বলে ফাঁসি যাও। উনি এটাও ভালো করেই জানতেন আমরা সবাই ওঁর কাছে – আর ওঁর রক্ষিতার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকব – হয় আমরা ফাঁসি যাব আর নয়তো ওঁদের কাছে ঋণী হয়ে থাকব। পুরো ব্যাপারটা উনি যে খুব উপভোগ করছেন, এ কথা আমি বাজি রেখে বলতে পারি!”
ডাক্তারবাবু মৃদু আর্তনাদ করে উঠলেন। “আমাদের যখন ওপরতলায় নিয়ে গেল, ওর মুখটা সত্যিই হাসি হাসি দেখাচ্ছিল।”
“আচ্ছা, ডাক্তারবাবু,” মিসেজ় মীড একটু ইতস্তত করে জিগ্যেস করলেন, “জায়গাটা ঠিক কেমন ছিল?”
“কী বলছ তুমি, মিসেজ় মীড?”
“ওর বাড়িটা। সেটা কেমন ছিল? ঝাড়বাতিগুলো কি স্ফটিকের ছিল? আর লাল রঙের ভারী পর্দা আর সোনা দিয়ে বাঁধানো পূর্ণদৈর্ঘ্যের আয়না? আচ্ছা, মেয়েগুলো – ওরা কি জামাকাপড় না পরেই ছিল?”
“হে ভগবান!” বিস্ময়ে ডাক্তারবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন। বারবধূদের সম্বন্ধে গৃহবধূদের অন্তরে কী অনিঃশেষ জিজ্ঞাসা জমিয়ে রাখা আছে, সেটা ডাক্তারবাবুর কল্পনাতেও ছিল না। “এরকম নির্লজ্জ প্রশ্ন তুমি কী করে করতে পার? মনে হচ্ছে তুমি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছ। দাঁড়াও, আমি তোমাকে একটা ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি।”
“ঘুমের ওষুধ লাগবে না আমার। আমি শুধু জানতে চাই। বিশ্বাস কর, খারাপ মেয়েরা কেমনভাবে থাকে, এটাই আমার একমাত্র সু্যোগ ছিল জানবার! আর স্বার্থপরের মতো আমার কাছে সবকিছু চেপে যাচ্ছ!”
“আমি কিছুই লক্ষ করিনি। সত্যি বলছি, ওই রকম একটা জায়গায় গিয়ে পড়ায় আমি এতই অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম যে চারদিকটা খুঁটিয়ে দেখার কথা মনেই আসেনি,” গম্ভীর হয়ে ডাক্তারবাবু বললেন। নিজের স্ত্রীর চরিত্রের এই অজানা দিকটা উদ্ঘাটিত হয়ে পড়ায় উনি অত্যন্ত মর্মাহত বোধ করতে লাগলেন, সেদিন সন্ধ্যেবেলার ঘটনাক্রমের কারণে ঘটা মর্মপীড়ার চেয়েও বেশি পরিমাণে। “যদি কিছু মনে না কর, তাহলে আমি একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করি।”
“বেশ, শুয়ে পড় তাহলে,” মিসেজ মীড বললেন। গলার স্বরে সীমাহীন নিরাশা। ডাক্তারবাবু যেই ঘাড় নিচু করে জুতো খোলবার উপক্রম করলেন, অন্ধকারে মিসেজ় মীডের উৎফুল্ল কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, নতুন কিছু একটা উপায় যেন মনে পড়েছে। “মনে হয় ডলি বৃদ্ধ মেরিওয়েদারের কাছ থেকে সব কিছুই জেনে ফেলেছে। ওর কাছ থেকেই সব জানতে পারব।”
“হা ঈশ্বর, মিসেজ় মীড! তুমি কি বলতে চাও ভদ্র মহিলারা নিজেদের মধ্যে এই সব নিয়ে আলোচনা – ”
“যাও, শুয়ে পড় গিয়ে,” মিসেজ় মীড বললেন।
***
খুব শিলাবৃষ্টি হলো পরের দিন। তবে শীতের সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসতে আসতে শিলা পড়া বন্ধ হয়ে ঠাণ্ডা বাতাস চলতে শুরু করল। একটা ক্লোক গায়ে দিয়ে হতভম্ব মেলানি বাড়ির সামনের পায়ে হাঁটা পথটা ধরে এগিয়ে চলল। অপরিচিত একজন নিগ্রো কোচওয়ান রহস্যজনক ইশারায় ওকে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বন্ধ বগিগাড়ির কাছে আসতে অনুরোধ করেছে। বগিগাড়ির সামনে এসে পৌঁছতেই দরজাটা খুলে গেল। দেখতে পেল ভেতরে স্বল্পালোকে একজন মহিলা বসে আছেন।
আরও একটু কাছে গিয়ে, ভেতরে উঁকি মেরে জিগ্যেস করল। “কে আপনি? বাড়ির ভেতরে আসুন। এত ঠাণ্ডা এখানে – ”
“দয়া করে গাড়ির ভেতরে এসে এক মিনিটের জন্য আমার কাছে বসুন, মিজ় উইল্কস,” খুব লজ্জাজড়িত কিন্তু পরিচিত গলার আওয়াজ এলো গাড়ির ভেতর থেকে।
“ও আপনি মিস – মিসেজ় – ওয়াটলিং!” মেলানি অবাক হয়ে বলল। “আমি খুব চাইছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে! আপনি বাড়ির ভেতরে আসুন না।”
“সেটা আমি করতে পারি না, মিজ় উইল্কস,” বেল ওয়াটলিংয়ের কণ্ঠে দ্বিধা। “আপনি বরং ভেতরে এসে আমার সঙ্গে এক মিনিট বসুন।”
মেলানি কোচের ভেতর ঢুকে পড়তেই কোচওয়ান দরজা বন্ধ করে দিলো। বেল-এর পাশ বসে ওর হাতটা ধরল।
“আপনি আজ যা করেছেন তার জন্য আমার কৃতজ্ঞতার সীমা নেই! আমাদের কেউই আপনার ঋণ শোধ করতে পারবে না!”
“মিজ় উইল্কস, সকালে ওই চিরকুটটা আমার কাছে না পাঠালেই ভালো করতেন। আপনার চিরকুট পেয়ে আমি খুব ধন্য হয়ে গেছি, কিন্তু ওটা ইয়াঙ্কিদের হাতে পড়তে পারত। আপনি লিখেছেন, আমার কাছে নিজে এসে ধন্যবাদ দিতে চান – না – না এটা আপনি ঠিক করেননি – মানে ওই ধন্যবাদ জানানোর কথাটা! তাই অন্ধকার হতে না হতেই আমি ছুটে এলাম আপনাকে বলতে যে এরকম কোনও কথা মনেও আনবেন না! কারণ – আমি – কারণ – আপনি – এটা একেবারে ভালো দেখায় না!”
“এমন একজন দয়ালু মহিলা, যিনি আমার স্বামীর জীবন বাঁচিয়েছেন, তার সঙ্গে দেখা করে কৃতজ্ঞতা জানালে, সেটা ভালো দেখায় না?”
“চুপ করুন, মিজ় উইল্কস! আমি কী বলতে চাইছি, সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন!”
কয়েক মুহূর্ত মেলানি নীরব হয়ে রইল, অস্বস্তিকর নীরবতা। ওর পাশে রুচিশীল পোশাকে যে সুন্দরী মহিলা কোচের অন্ধকারে বসে আছে, সে কেমন দেখতে হবে বা কেমনভাবে কথা বলবে, এতদিন ধরে মনে মনে যেটা কল্পনা করে রেখেছিল, তার সঙ্গে কিছুই মিলছে না। হয়তো একটু গ্রাম্য ভাব মেশানো সরল ভাষা, কিন্তু ভদ্রতা আর উষ্ণতার অভাব নেই।
“প্রোভোস্ট মার্শালের সামনে আপনি আজ অনবদ্য অভিনয় করেছেন, মিসেজ় ওয়াটলিং! আপনি এবং অন্যান্যরা – আপনার অল্পবয়সী মেয়েরা – আমাদের স্বামীদের জীবনদান করেছেন।”
“আসল কৃতিত্বটা ছিল মিস্টার উইল্কসের। জানি না কী ভাবে দাঁড়িয়ে উনি পুরো ঘটনাটা বলতে পেরেছিলেন, এত শান্তভাবে বললেন, যেন উনি সত্যি সত্যি ওখানে ছিলেন। তখনও নিশ্চয়ই ওঁর খুব রক্ত ঝরছিল? উনি ভালো হয়ে যাবেন তো, মিজ় উইল্কস?”
“নিশ্চয়ই। অনেক ধন্যবাদ। ডাক্তার বলছেন, ক্ষতটা মাংসের মধ্যেই হয়েছে, যদিও অনেকটাই রক্তক্ষরণ হয়েছে। আজ সকালে ও – মানে ওকে অনেকটা ব্র্যান্ডি খাইয়ে চাঙ্গা করা হয়েছিল, সেজন্যই সব কিছু জোর করে সামলে নিতে পেরেছে। কিন্তু সত্যিই যদি কেউ ওদের বাঁচিয়ে থাকে, তাহলে সেটা আপনি, মিসেজ় ওয়াটলিং। আয়না ভেঙে যাওয়ার শোকে আপনার রাগে বিহ্বল হয়ে পড়া – আপনার অভিনয় – অসম্ভব বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল।”
“ধন্যবাদ, ম্যা’ম। তবে আমি – আমার মনে হয় ক্যাপটেন বাটলারও অসাধারণভাবে সাহায্য করেছেন,” বেল বলল, ওর কণ্ঠস্বরে লজ্জাজড়িত গর্ব।
“ঠিক বলেছেন, ওঁর ভূমিকাও অসাধারণ,” মেলানি পরম শ্রদ্ধায় বলল। “ওঁর সাক্ষ্যকে ইয়াঙ্কিদের মেনে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। পুরো ব্যাপারটা এত চতুরভাবে উনি সামলেছেন! ওঁর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোনও শেষ নেই – এবং আপনার কাছেও! আপনারা কত ভাল আর মহানুভব!”
“অসংখ্য ধন্যবাদ, মিজ় উইল্কস। কাজটা করে আমার খুব আনন্দ হয়েছে। আশা করি, মিস্টার উইল্কস নিয়মিত আমার কাছে আসেন – আমি – আমি এই কথা বলায় – আপনি অস্বস্তিবোধ করবেন না। উনি কখনোই আসেননি, আপনি নিশ্চয়ই জানেন – ”
“হ্যাঁ, আমি জানি। না, আমি এর জন্য কোনো রকম অস্বস্তিবোধ করিনি। আর আমি আপনার কাছে খুবই কৃতজ্ঞ।”
“তবে বাজি ধরে বলতে পারি অন্যান্য লেডিরা আমার কাছে কৃতজ্ঞ নন,” হঠাৎ গলায় খানিকটা বিষ ঢেলে বেল বলে উঠল। “এটাও বলতে পারি ওঁরা ক্যাপটেন বাটলারের কাছেও কৃতজ্ঞ নন। আমার বিশ্বাস, ওঁরা ওঁকে আরও বেশি বেশি ঘেন্না করবেন। আপনিই হচ্ছেন একমাত্র লেডি যিনি আমাকে ধন্যবাদ জানালেন, সেটাও আমি জানি। আর রাস্তায় সামনাসামনি পড়ে গেলে ওঁরা যে কেউ আমার দিকে চোখ তুলে তাকাবেন না, তাও জানি। আমি পরোয়া করি না। অন্যদের স্বামীরা ফাঁসি গেলেও আমার কিছু এসে যেত না। কিন্তু মিস্টার উইল্কসের কিছু হলে আমার নিশ্চয়ই কষ্ট হতো। যুদ্ধের সময় আপনি আমার জন্য কী করেছিলেন, সেটা আমি ভুলতে পারব না, হাসপাতালকে অর্থ সাহায্য করার ব্যাপারে। এই শহরের কোনও লেডিই কনোদিন আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেননি, কেবল আপনি ছাড়া। আমি দয়া ভুলে যাই না। আর মনে হয়েছিল, মিস্টার উইল্কসের ফাঁসি হলে, আপনার বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে আপনি একলা হয়ে যাবেন – খুব ভালো ছেলে আপনার, মিজ় উইল্কস। আমার নিজেরও একটা ছেলে আছে আর তাই আমি – ”
“ও, তাই বুঝি? ও কি – মানে – ”
“না, না, ম্যা’ম! ও অ্যাটলান্টাতে নেই। ও এখানে কোনোদিনই থাকেনি। ও স্কুলে যায়। ও যখন বাচ্চা ছিল, তারপরে ওকে আর দেখিনি আমি। আমি – যাই হোক, ক্যাপটেন বাটলার যখন বললেন আমাকে ওই ভদ্রলোকদের জন্য মিথ্যে বলতে হবে, আমি জানতে চাইলাম, কারা ওই সব ভদ্রলোক। যখন শুনলাম, মিস্টার উইল্কসও ওর মধ্যে আছেন, আমি আর দ্বিধা করিনি। আমার মেয়েদের বলে দিলাম, আমি বললাম, ‘তোরা যে সারা সন্ধ্যে মিস্টার উইল্কসের সঙ্গে ছিলি, এই কথাটা যদি মনে করে না বলিস, তাহলে তোদের মজা বের করে দেবো’।”
“ওহো!” মেলানি বলল। কথায় কথায় বেল ওর ‘মেয়ে’দের প্রসঙ্গ তুলে ফেলায় সামান্য বিড়ম্বনায় পড়ে গেল। “সেটা আপনার মহানুভবতা – আপনার – এবং ওদেরও।”
“আপনার জন্য যা করতে পারি, তার তুলনায় এ খুবই সামান্য,” খুব আন্তরিকভাবে বেল বলল। “আর কারোর জন্য হলে আমি করতামই না। এমনকি মিজ় কেনেডির স্বামী হলেও, আমি কিচ্ছু করতাম না, ক্যাপটেন বাটলার যত করেই বলুন না কেন!”
“কেন?”
“দেখুন, মিজ় উইল্কস, আমার ধান্ধার লোকেরা অনেক খবর জানে। সম্ভ্রান্ত লেডিরা জেনে আশ্চর্য হয়ে যাবেন ওঁদের সম্বন্ধে আমরা কত কথা জানি। উনিও কিছু ভালো মানুষ নন, মিজ় উইল্কস। উনি ওঁর স্বামী আর ভদ্র ওয়লবার্ন ছেলেটার খুন করেছেন, ব্যাপারটা নিজের হাতে গুলি চালানোর থেকে কম নয়! উনিই এর জন্য দায়ী, অ্যাটলান্টাতে নিজের খুশিমত ঘুরে বেড়ান, নিগ্রো আর বাজে লোকদের সঙ্গে দহরম মহরম। আমার একটা মেয়েও – ”
“আপনি আমার ভাইয়ের বউয়ের সম্বন্ধে এরকম খারাপ কথা বলতে পারেন না,” মেলানি আড়ষ্ট স্বরে বলল।
বেল মেলানিকে শান্ত করার জন্য ওর বাহুতে হাত রাখল, তারপর তাড়াতাড়ি সরিয়ে নিল।
“আমার ওপর রাগ করবেন না, মিজ় উইল্কস। আমার সঙ্গে আপনি এত মিষ্টি আর সহৃদয় ব্যবহার করার পর আমি সেটা সহ্য করতে পারব না। ভুলে গেছিলাম, আপনি ওঁকে খুব ভালবাসেন, যা বলেছি তার জন্য আমি খুব দুঃখিত। হতভাগ্য মিস্টার কেনেডির মৃত্যুর জন্যও আমি খুব দুঃখিত। উনি খুব ভালো লোক ছিলেন। আমি ওঁর কাছ থেকে আমার বাড়ির জন্য অনেক জিনিস কিনেছি, উনি আমার সঙ্গে খুব ভদ্র ব্যবহার করতেন। কিন্তু মিজ় কেনেডি – উনি ঠিক আপনার মতো নন, মিজ় উইল্কস। উনি খুবই হৃদয়হীনা একজন মহিলা, ক্ষমা করবেন, আমি এরকম ভাবতে বাধ্য হচ্ছি বলে – মিস্টার কেনেডিকে কবে গোর দেওয়া হচ্ছে?”
“কাল সকালে। তবে মিসেজ় কেনেডি সম্বন্ধে আপনার ধারণা ঠিক নয়। এই মুহূর্তে ও একেবারে শোকে পাথর হয়ে আছে।”
“হবে হয়তো,” বেল বলল, কিন্তু চোখেমুখে অবিশ্বাস। “আচ্ছা, এবার তবে আমি আসি। আর বেশিক্ষণ থাকলে এই গাড়িটা কেউ না কেউ ঠিক চিনে ফেলবে। তাতে আপনার ভালো হবে না। আর হ্যাঁ, মিজ় উইল্কস, রাস্তায় যদি আমাদের দেখাও হয়ে যায়, আপনাকে আমার সঙ্গে কথা বলতে হবে না। আমি কিছু মনে করব না।”
“আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারলে, গর্বিত বোধ করব। আপনার কাছে ঋণী থেকে আমি গর্ববোধ করব। আশা করি – আমার আশা, আমাদের আবার দেখা হবে।”
“না,” বেল বলল। “সেটা ভালো দেখাবে না। শুভ রাত্রি।” ·

0 মন্তব্যসমূহ