শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

হোর্হে লুই বোর্হেসের আত্মজীবনী

অনুবাদ : 
রাজু আলাউদ্দিন 
রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী

প্রস্তাবনা

আত্মজীবনীটি আকারে সংক্ষিপ্ত হলেও মূলত বোর্হেসের লেখা সবচেয়ে দীর্ঘ একক রচনা। এক বেপরোয়া প্রতিশ্রুতির প্রকোপে জট পাকানো কিছু পরিস্থিতির ফসল এই রচনা।

১৯৭০ সালের শুরুর দিকে, আমরা যখন ‘আলেফ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ (১৯৩৩-১৯৬৯) গল্পগ্রন্থের কাজ প্রায় শেষ করে আনছিলাম, তখন আমি মনের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তিবোধ থেকে পাঠকদের জন্য বোর্হেসের আরেকটি গদ্য সংকলনের কথা ভাবতে শুরু করলাম, যেটি ইংরেজিতে প্রকাশিত বোর্হেসের প্রথম সাতটি বইয়ের তৃতীয় খণ্ড। ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস কয়েক আগে নিজের বিষয়ে দেওয়া বোর্হেসের বক্তৃতার পর আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম, বোর্হেসের জীবনের গল্প_তাঁর সমস্ত লেখালেখির কথা এবং তাঁর আর্জেন্টাইন বংশপরিক্রমা ও উৎসের প্রসঙ্গ তুলে ধরা_নিয়ে একটি রচনা দাঁড় করাতে পারলে উত্তম হয়। বোর্হেস রাজি হলেন এবং সেভাবেই আমাদের নিউইয়র্কের প্রকাশকের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলাম। ওকলাহোমা থেকে বোর্হেস যখন আমাকে ২০ পৃষ্ঠার খসড়াটা পাঠালেন, আমি চুপসে গেলাম। বক্তৃতাটি ছিল বেশ উপভোগ্য ও ভালো। কিন্তু লিখিত আকারে দেখি, জায়গায় জায়গায় সমস্যা।


ব্যাপারটি নিয়ে বোর্হেস যতটা না, তার চেয়ে বেশি আমি নিরাশ হলাম। বোর্হেস খুশি মনে বললেন, আমরা আবার গোড়া থেকে শুরু করব। আমরা তা-ই করলাম। কিন্তু কাজটা খুব ঢিমেতালে এগোচ্ছিল। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজটি শেষ করতে হবে। কিন্তু ওদিকে স্ত্রীর সঙ্গে বোর্হেসের ছাড়াছাড়ি প্রায় চূড়ান্ত; এবং ঠিকমতো বসে যে লিখবেন, সেই মন তাঁর নেই। শেষ পর্যন্ত আমরা ৬০ পৃষ্ঠার যে রচনাটি দাঁড় করালাম, সেটি শেষ করতে তিন মাসের বেশি সময় লাগল। সত্যি সত্যি মনোযোগের সঙ্গে যখন লেখার কাজটি ঘটল, তখন সেটি ছিল যুদ্ধের মধ্যে একটু করে শান্তির ডেরায় পলায়নের মতো।

নরম্যান টমাস ডি জোভানি্ন


আমার মা লেওনোর আসেবেদো দে বোর্হেস আর্হেন্তিনীয় এবং উরুগুয়াই বংশোদ্ভূত। ৯০ বছর বয়সেও তিনি বলিষ্ঠ, হৃদয়বান এবং একজন ভালো ক্যাথলিক। আমি যখন বেড়ে উঠছিলাম, ধর্ম ছিল তখন নারী আর শিশুদের বিষয়। বুয়েন্স আয়ার্সের বেশিরভাগ পুরুষই ছিলেন মুক্তচিন্তার অধিকারী। যদিও কেউ প্রশ্ন করলে নিজেকে তারা হয়তো ক্যাথলিক বলেই পরিচয় দিতেন। মানুষ সম্পর্কে শ্রেষ্ঠতম ভাবনার গুণ এবং বন্ধুত্বের গভীর চেতনাও, আমি মনে হয়, মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছি। অতিথিপরায়ণ মানসিকতা আমার মায়ের সব সময়ই ছিল। আমার বাবার কাছ থেকে ইংরেজি শেখার সময় থেকে আমার মা তার বেশিরভাগ পড়াশোনা করেছেন ওই ভাষাতেই। বাবার মৃত্যুর পর লক্ষ করলেন, তিনি মুদ্রিত কাগজে মনস্থির করতে পারছেন না। মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার জন্য তিনি উইলিয়াম সারোইয়ানের দ্য হিউম্যান কমেডি অনুবাদে হাত দিতে চেষ্টা করলেন। অনুবাদটি পরে মুদ্রিতও হয়; এবং এজন্য বুয়েন্স আয়ার্সে আর্মেনিয়ান সোসাইটি তাকে সম্মাননা জ্ঞাপন করে। পরে তিনি হর্থনের কিছু গল্প, শিল্প বিষয়ক হার্বার্ট রিডের একটি বই, মেনভিল, ভার্জিনিয়া উলফ এবং ফকনারের কিছু অনুবাদও করেছেন, যেগুলো আমার বলে বিবেচনা করা হয়। তিনি আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে আছেন। বিশেষ করে পরের বছরগুলোতে আমি যখন অন্ধ হয়ে যাই, তখন তিনি হয়ে ওঠেন সমমনস্ক এক ক্ষমাশীল বন্ধু। বহু বছর ধরেই একেবারে ইদানীংকাল পর্যন্ত আমার সচিবের কাজ, চিঠিপত্রের উত্তর দেওয়া, পড়ে শোনানো, আমার ডিকটেশন নেওয়া_এগুলো তিনিই করছেন। বিভিন্ন উপলক্ষে দেশ-বিদেশে আমার সফরসঙ্গীও তিনিই। তিনিই নীরবে এবং কার্যকরভাবে আমার সাহিত্যিক বৃত্তিকে তৈরি করেছেন, যদিও তার এই দিকটির প্রতি আমি কখনোই মনোযোগ দেইনি।

তার দাদা ছিলেন কর্নেল ইসিদোরো সুয়ারেস, যিনি ১৮২৪ সালে ২৪ বছর বয়সে পেরুভিয়ান এবং কলোম্বিয়ান অশ্বারোহী বাহিনীর বিখ্যাত নেতৃত্ব দেন, যা পেরুর হুনিনে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। এ ছিল দক্ষিণ আমেরিকায় শেষ স্বাধীনতা যুদ্ধের অব্যবহিত আগের ঘটনা। ১৮৩৫ থেকে ১৮৫২ পর্যন্ত আর্হেন্তিনার স্বৈরাচারী হুয়ান মানুয়েল দে রোসাসের দ্বিতীয় কাজিন ছিলেন সুয়ারেস। কিন্তু তিনি বুয়েন্স আয়ার্সে স্বৈরাচারী শাসনের জাঁতাকলে বাস করার চেয়ে মন্তেবিদেওতে নির্বাসন এবং দারিদ্র্যকেই বেছে নিয়েছিলেন। সন্দেহ নেই, তার জমিজমা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল এবং তার এক ভাইকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল। আমার মায়ের পরিবারের আরেকজন হচ্ছেন ফ্রান্সিসকো দে লাপ্রিদা, যিনি ১৮১৬ সালে যে কংগ্রেস আর্হেন্তেনীয় কনফেডারেশনের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল, তার সভাপতিত্ব করেছিলেন। ১৮২৯ সালের গৃহযুদ্ধে তিনি নিহত হন। আমার নানা ইসিদোরো আসেবেদো বেসামরিক লোক হলেও তিনি ১৮৬০ ও ১৮৮০ সালের গৃহযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সুতরাং আমার পরিবারের পিতৃকুল ও মাতৃকুল_দু’দিক থেকেই আমার রয়েছে সামরিক পূর্বসূরি। আমার মহাকাব্যিক নিয়তির প্রতি আমার আকুলতার পেছনে এগুলো বিবেচ্য হতে পারে, যদিও ঈশ্বর আমাকে তা থেকে বঞ্চিতই করেছেন। সন্দেহ নেই, তা ভালোর জন্যই করেছেন।

ইতিমধ্যেই বলেছি, আমার শৈশবের একটা বড় সময় কেটেছে ঘরের ভেতর। শৈশবে কোনো বন্ধু-বান্ধব না থাকায় আমার বোন আর আমি দুটো কাল্পনিক সঙ্গী আবিষ্কার করেছিলাম_যেকোনো কারণেই হোক। তাদের একটির নাম কুইলোস (Quilos), আর অন্যটির নাম উইন্ডমিল। (আমরা ওই দুটোতে শেষমেশ বিরক্ত হয়ে গেলে পরে মাকে বলতাম, ওরা মরে গেছে) আমার ক্ষীণ দৃষ্টির খুব সমস্যা ছিল সব সময়ই। তাই চশমা পরতে হতো। আমি ছিলাম দুর্বল প্রকৃতির। আমাদের পরিবারের বেশিরভাগ লোকই যেহেতু সৈনিক ছিলেন, এমনকি আমার চাচাও ছিলেন নৌবাহিনীর অফিসার এবং আমি জানতাম, আমি সে রকম কিছু হবো না, তাই সেই প্রথমদিকেই, অ্যাকশনধর্মী লোক না হয়ে বইমুখী লোক হওয়ায় আমি লজ্জিত বোধ করতাম। গোটা শৈশবে, আমার মনে হতো, প্রিয়ভাজন হওয়াটা আসলে অন্যায়। কোনো বিশেষ ভালোবাসা আমার প্রাপ্য বলে আমি অনুভব করিনি; এবং মনে পড়ে, জন্মদিনের অনুষ্ঠানগুলোতে আমি লজ্জায় ডুবে যেতাম। কারণ, আমি যখন মনে করতাম, কোনোকিছুই আমার প্রাপ্য নয়, তখন সবার দেওয়া উপহারের স্তূপ এসে জড়ো হতো আমার ওপর। নিজেকে আমার ভুয়া কিছু মনে হতো। বছর তিরিশেক পড়ে অবশ্য এই অনুভূতি আর থাকেনি।

বাড়িতে ইংরেজি এবং স্প্যানিশ_দুটোই চলত। আমার জীবনের প্রধান ঘটনার কথা যদি জানতে চাওয়া হয়, তাহলে আমি আমার বাবার গ্রন্থাগারের কথাই বলব। আসলে, মাঝেমধ্যে ভাবি, গ্রন্থাগারের বাইরে আমি কখনোই এলোমেলো ঘুরে বেড়াইনি। এখনো আমি তা দেখতে পাই। একটা রুমের মধ্যে কাচের দরজাসমেত বইয়ের তাক; এবং নিশ্চয়ই কয়েক হাজার বই তো হবেই। খুব ক্ষীণদৃষ্টির হওয়ায় তখনকার বেশিরভাগ চেহারাই আমি ভুলে গেছি (সম্ভবত এমনকি আমি যখন আমার নানা আসেবেদোর কথা ভাবি, তখন তার ছবির কথাই আমার মনে পড়ে)। তারপর পরিষ্কারভাবে আমার মনে পড়ে, চেম্বার্স এনসাইক্লোপিডিয়া এবং ব্রিটানিকার অসংখ্য স্টিল এনগ্রেভিংস। সেই সময় আমার প্রথম পড়া উপন্যাসটি হচ্ছে হাকলবেরি ফিন। এরপর রাফিংইট এবং ফ্লাশ ডেইস ইন ক্যালিফোর্নিয়া। ক্যাপ্টেন ম্যারইয়াটের বইগুলোও পড়েছি। ওয়েলসের ফার্স্ট ম্যান ইন দ্য মুন, পো, লংফেলোর একখণ্ডের এক সংস্করণ, ট্রেজার আইল্যান্ড, ডিকেন্স, দোন কিহোতে, টম ব্রাউন’স স্কুল ডেজ, গ্রিমসের ফেইরি টেলস, লুইস ক্যারল, দ্য অ্যাডভেঞ্চার্স অব মি. ডের্ভান্ট গ্রিন (এখন বিস্মৃত), কার্টনের এ থাউজ্যান্ড নাইটস অ্যান্ড এ নাইট। তখনকার দিনে অশ্লীলতায় পূর্ণ হিসেবে বিবেচিত বার্টন ছিল নিষিদ্ধ। আমাকে তা পড়তে হয়েছিল ছাদের ওপর লুকিয়ে। কিন্তু আমি এর জাদুতে এতই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে, আপত্তিকর অংশগুলো আমার চোখেই পড়েনি। গল্পগুলোর অন্য কোনো অর্থ সম্পর্কে অসচেতনভাবেই পড়ে গেছি। উল্লিখিত সব বই-ই পড়েছি ইংরেজিতে। পরে আমি যখন মূল ভাষায় দোন কিহোতে পড়লাম, তখন আমার কাছে তা অনুবাদের মতো মনে হয়েছিল। আমার এখনো সেই গার্নিয়ের সংস্করণের স্বর্ণের অক্ষরের লাল খণ্ডগুলোর কথা মনে পড়ে। আমার বাবার গ্রন্থাগারটি অংশত ভেঙে যায়; এবং আমি যখন অন্য এক সংস্করণে দোন কিহোতে পড়লাম, তখন মনে হলো, এটা আসল ‘কিহোতে’ নয়। পরে আমার এক বন্ধুকে বললাম, একই ধরনের স্টিল এনগ্রেভিংস, একই পাদটীকা আর একই শুদ্ধিপত্রের গার্নিয়েরের সংস্করণটা আমার জন্য জোগাড় করতে। আমার কাছে এসব কিছু মিলিয়েই হচ্ছে বইটি। এটাকেই আমি আসল ‘কিহোতে’ বলে মনে করি। স্প্যানিশ, আর্হেন্তিনীয় মাস্তান/দস্যু (Outlaws) এবং দুঃসাহসীদের (Desperadoes) নিয়ে লেখা এদুয়ার্দো গুতিয়েররেজের অনেক বইও আমি পড়েছি। সেগুলোর মধ্যে হুয়ান মোরেইরা হচ্ছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য; ‘সিলুয়েতাস মিলিতারেস’ও তার মধ্যে একটি। এই বইটির মধ্যে রয়েছে কর্নেল বোর্হেসের মৃত্যুর বলিষ্ঠ (Forceful) বিবরণ। মা আমাকে মার্তিন ফিয়েররো পড়তে বারণ করেছিলেন। কারণ, ওই বইটি নাকি গুণ্ডা আর স্কুলের ছেলেপেলের জন্যই কেবল উপযোগী। তাছাড়া ওটা সত্যিকারের গাউচোদের নিয়ে নয় মোটেই। সেটাও আমি লুকিয়ে পড়েছি। তার এই ধারণার ভিত্তি হচ্ছে, এর্নান্দেস রোসাসের (Rosas) সমর্থক। অতএব আমাদের ইউনিটারিয়ান পূর্বপুরুষদের শত্রু। সার্মিয়েন্তোর ‘ফাকুন্দো’ও পড়েছি। গ্রিসের অসংখ্য বই। পরে নর্স, পুরাণ, কবিতা_এগুলো পড়েছি ইংরেজিতে। আমার বাবার ভীষণ প্রিয় শেলি, কিটস, ফিটজেরাল্ড এবং সুইনবার্ন তো আছেই, যাদের ভূরি ভূরি উদ্ধৃতি তিনি দিতে পারতেন এবং দিতেনও।

আমার বাবার পরিবারে সাহিত্যের ঐতিহ্য প্রবহমান ছিল। তাঁর চাচাতো দাদা (Great-uncle) হুয়ান ক্রিসোস্তোমো লাফিনুর ছিলেন আর্হেন্তিনার প্রথমদিককার কবিদের একজন। ১৮২০ সালে তাঁর বন্ধু জেনারেল মানুয়েল বেলগ্রানোর মৃত্যুতে একটি শোকগাথা (Ode) লিখেছিলেন। আমার বাবার এক নিকটাত্দীয় ভাই আলবারো মেলিয়ান লাফিনুরকে আমি শৈশব থেকেই চিনতাম। তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয় এক সৌন কবি। পরে তিনি আর্হেন্তিনীয় একাডেমি অব লেটার্সে যোগ দিয়েছিলেন। আমার বাবার মাতৃকূলের দাদা এডওয়ার্ড ইয়াং হাশলাম আর্হেন্তিনায় প্রথমদিককার ইংরেজি পত্রিকাগুলোর একটি সাউদার্ন ক্রস সম্পাদনা করেছেন। আমার ঠিক মনে নেই। তিনি হাইডেলবার্গের কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব ফিলোসফি বা ডক্টর অব লেটার্স করেছিলেন।

হাশলামের সামর্থ্যে কুলায়নি অক্সফোর্ড বা ক্যামব্রিজে পড়াশোনা করার। ফলে তিনি জার্মানি চলে যান। সেখানে পুরো কোর্স লাতিনে করে ডিগ্রি নিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে তিনি মারা যান পারানাতে। আমার বাবা একটা উপন্যাস লিখেছিলেন। ১৯২১ সালে তা মাহোর্কা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এর বিষয় ছিল এন্দ্রে রিওসের ইতিহাস। সেটার নাম ছিল দ্য কাউদিইয়ো। তিনি একটি প্রবন্ধের বই লিখেছিলেন (এবং ধ্বংস করে ফেলেন)। আর মূল ছন্দের অনুসরণে ফিটজেরাল্ডের ওমর খৈয়ামের অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন। অ্যারাবিয়ান নাইটসের অনুসরণে প্রাচ্যগল্পের একটি বই তিনি বাতিল করেছিলেন। আর সন্তানের ব্যাপারে পিতার হতাশা সম্পর্কে লেখা নাটক আছিয়া লা নাদা (শূন্যতার প্রতি) লিখেছিলেন। আর্হেন্তিনীয় কবি এনরিকে বাঞ্চের অনুকরণে কিছু সুন্দর সনেট প্রকাশ করেছিলেন। আমার শৈশবে তিনি অন্ধ হয়ে গেলে, এটা না বললেও বোঝা যাচ্ছিল, যে পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে আমার বাবা সাহিত্যিক নিয়তি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, আমাকে তা পূরণ করতে হবে। এটা একরকম অনুমোদিত হয়েছিল (আর এ ধরনের ব্যাপারে একেবারে কথিত বিষয়গুলোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ)। আমি লেখক হবো_এটাই ছিল প্রত্যাশিত।

আমি প্রথম লেখা শুরু করেছিলাম ছয়-সাত বছর বয়সে। আমি অনুকরণের চেষ্টা করেছিলাম স্প্যানিশ চিরায়ত লেখকদের। যেমন, মিগেল দে সের্বান্তেস। একেবারেই বাজে ইংরেজিতে আমি গ্রিক পুরাণ নিয়ে একটা পুস্তিকা লিখেছিলাম। সন্দেহ নেই, তা ছিল লেম্প্রিয়েখ্-এর নকল। এটাই হয়তো আমার প্রথম সাহিত্যিক অভিযান। আমার প্রথম গল্পটি ছিল সের্বান্তেসের ধরনে লেখা এক আবোলতাবোল রচনা, লা বিসেরা ফাতাল (The fatal helmet) নামের এক পুরনো ধরনের রোমান্স। খুব পরিপাটিভাবে এগুলো আমি কপিবুকে লিখেছিলাম। আমার বাবা এসবে কখনো নাক গলাতেন না। আমার নিজস্ব ভুলগুলো আমি করি_এটা তিনি চাইতেন; আর বলতেন, ‘বাচ্চারাই বাবাদের শেখায়; বাবারা নয়।’



আমার বয়স যখন ৯ বা তার কাছাকাছি, তখন আমি অস্কার ওয়াইল্ডের হ্যাপি প্রিন্স স্প্যানিশে অনুবাদ করি এবং তা বুয়েন্স আয়ার্সের একটি দৈনিক পত্রিকা এল পাইসে ছাপা হয়। লেখাটিতে লেখক হিসেবে যেহেতু কেবল হোর্হে বোর্হেস উল্লিখিত ছিল, সেহেতু লোকজন ধরেই নিয়েছিল, ওটা আমার বাবার করা অনুবাদ।

আমার প্রথম দিককার স্কুলজীবনের দিনগুলো স্মরণ করে কোনো আনন্দ খুঁজে পাই না। প্রথমত, ৯ বছর না হওয়া পর্যন্ত আমি স্কুলে যাওয়া শুরু করিনি। এর কারণ হলো, আমার বাবা নৈরাশ্যবাদী হিসেবে রাষ্ট্র কর্তৃক যাবতীয় উদ্যোগে আস্থাহীন ছিলেন। ইটন কলার ও টাইসহ পোশাকের সঙ্গে চশমা পরার কারণে আমার স্কুলের বেশিরভাগ সঙ্গীই ঠাট্টা-মশকরা এবং গালমন্দ করত। ওরা ছিল শৌখিন মাস্তান। স্কুলের নামটা আমার মনে পড়ছে না। তবে মনে হয়, ওটা ছিল টমাস স্ট্রিটে। আমার বাবা প্রায়ই বলতেন, আর্হেন্তিনীয় ইতিহাস এখন প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শিক্ষাদানের জায়গায় পৌঁছেছে। সুতরাং আর্হেন্তিনীয় সবকিছুর প্রতি আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা থাকা উচিত। যেমন, বিভিন্ন ভূখণ্ড এবং তার গড়ে ওঠা বহু শতাব্দী সম্পর্কে কোনো ধারণা হওয়ার আগেই আমাদের আর্হেন্তিনার ইতিহাস শেখানো হয়েছিল। স্প্যানিশে যেভাবে লেখা হয়, বেশ ফুলেল বর্ণনায়, আমাদের লিখতে শেখানো হয়েছিল : aquettos quo lucharon your ura yatria, bibre, iodeyeodieote, gloriora (যারা গৌরবময়, স্বাধীন-সার্বভৌম জাতির জন্য লড়াই করেছিল...)। পরে জেনেভায় গিয়ে আমি জানলাম, এ ধরনের লেখা অর্থহীন এবং বিষয়গুলো আমার নিজস্ব চোখ দিয়ে দেখা উচিত। ১৯০১ সালে জন্ম নেওয়া আমার বোন নোরা অবশ্যই গার্লস স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। ওই সময়ে আমরা গ্রীষ্মকালটা সাধারণত বুয়েন্স আয়ার্স থেকে ১০-১৫ মাইল দক্ষিণে আদ্রোগেতে কাটাতাম। আমাদের নিজস্ব ভিটায় তৈরি লম্বা একতলা বাড়ির দুটি সামারগাউজ, একটা উইন্ডমিল, আর একটা ঝাঁকড়াচুলের বাদামি শিপডগ ছিল। আদ্রোগে তখন ছিল গ্রীষ্মকালীন আবাসগুলোর হারিয়ে যাওয়া এক শান্ত গোলকধাঁধা। গেটপোস্ট, উদ্যান আর রাস্তার পাশে গাছপালার শোভিত আয়রন ফেন্সে সৃদৃশ্য ছিল এর আশপাশ। বিভিন্ন প্লাজাকে উজ্জ্বল করে রাখত এই পরিবেশ। আর ইউক্যালিপ্টাসের ঘ্রাণ ছিল সর্বব্যাপী। কয়েক দশক পর্যন্ত আদ্রোগেতে আমাদের যাতায়াত ছিল।

পাম্পা (pamya) সম্পর্কে আমার সত্যিকারের অভিজ্ঞতা হয় ১৯০৯ সালে। বুয়েন্স আয়ার্সের উত্তর-পশ্চিম দিকে সান নিকোলাসের অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি এক জায়গায় আমরা বেড়াতে গিয়েছিলাম। মনে পড়ে, দিগন্তে সবচেয়ে কাছের একটা বাড়িকে আবছা মতো দেখাচ্ছিল। দেখলাম, এই অন্তহীন দূরত্বকেই পাম্পা বলা হতো। আর যখন জানলাম, এদুয়ার্দো গুতিয়ের্রেসদের চরিত্রের মতো গাউচোরাই (Gaucho) হচ্ছে খামারকর্মী, যা তাদের আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

আমি সব সময়ই বইয়ে পড়ার পরই বিষয়গুলো সম্পর্কে সজাগ হই। একবার খুব সকালে ঘোড়ায় চড়ে ওদের সঙ্গে গরুর পাল নিয়ে নদীতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। লোকগুলো ছিল ছোটখাটো আর একটু কালো ধরনের। প্রশস্ত আর ঢিলেঢালা ধরনের; ট্রাউজার বোম্বাচা (bombache) পরিহিত।

আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, ওরা সাঁতার জানে কি না, তখন ওরা বলল, ‘পানি তো গরুর জন্য’। আমার মা একটা লম্বা কার্ডবোর্ডের বাক্সের ভেতর সাজানো একটা পুতুল উপহার দিয়েছিলেন সর্দারের মেয়েকে। পরের বছর গিয়ে আমরা ওই ছোট্ট মেয়েটির কথা জিজ্ঞেস করলাম। ওরা বলল, ‘ওই পুতুলটা পেয়ে ও যে কী খুশি!’ আমাদের ওটা দেখাল। তখনো ওটা ওই বাক্সের ভেতর। দেয়ালে একটা ছবির মতো ঝোলানো রয়েছে। মেয়েটাকে নিশ্চয়ই কেবল ওটা দেখার সুযোগ দেওয়া হতো; ছুঁয়ে দেখার জন্য। কারণ, তাতে ওটা ভেঙে বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বিপদসীমার বাইরে ওপরে ঝুলিয়ে রাখা ওটা ছিল দূর থেকে ভক্তি জানানোর জন্য। লুগোনেস লিখেছেন, কোর্দোবায়, পত্র-পত্রিকা আসার আগে, তিনি গাউচোদের ঝুপড়ির দেয়ালে খেলার তাসকে ছবির মতো ঝুলিয়ে রাখতে দেখেছেন বহুবার। ছোট্ট সিংহ আর দুই সৌধের চার কোপাই (Coyas) ছিল বিশেষভাবে কাঙ্ক্ষিত। জেনেভা যাওয়ার আগে মনে হয়, কবি আস্কাসুবির অনুকরণে গাউচোদের নিয়ে একটি কবিতা শুরু করেছিলাম। মনে পড়ছে, যতটা সম্ভব গাউচো শব্দ দিয়ে কাজটা করার চেষ্টা করেছিলাম। তবে কলা-কৌশলগত সমস্যাগুলো আমার বাইরে থেকে গেছে। অল্প কিছু স্তবকের বেশি আমি কখনোই এগোতে পারিনি।


ইউরোপ

১৯১৪ সালে আমরা ইউরোপে যাই। আমার বাবার দৃষ্টিশক্তি অবনতির দিকে যাচ্ছিল। বাবার একটা উক্তি মনে পড়ছে_’আমি যদি পড়তেই না পারি, তাহলে এই ধরাধামে আইনি কাগজপত্রে স্বাক্ষর করব কিভাবে?’ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বাধ্যতামূলক অবসর গ্রহণের পর ঠিক ১০ দিনের মধ্যে তিনি আমাদের সফরের পরিকল্পনা করেন। পৃথিবী তখন সন্দেহবাতিকগ্রস্ত ছিল না। পাসপোর্ট লাগত না কিংবা লালফিতার কোনো বালাই ছিল না। প্রথমে আমরা কয়েক সপ্তাহ প্যারিসে কাটাই। প্যারিস আমাকে কখনোই বিশেষভাবে মুগ্ধ করেনি, যেমনটা প্রত্যেক আর্হেন্তিনীয়কে করে থাকে। সম্ভব, অজান্তেই আমি সব সময়ই ছিলাম একটু ব্রিটিশ ভাবাপন্ন। আসলে ওয়াটারলুকে আমি সব সময়ই বিজয় হিসেবে মনে করি। আমার বোন এবং আমার কাছে সফরের ধারণাটি ছিল জেনেভার স্কুলে যাওয়া। আমরা থাকতাম নানির কাছে, যিনি আমাদের মহাদেশ সফরকালেই মারা গিয়েছিলেন। ওই সময় আমার বাবা জেনেভার বিখ্যাত এক চক্ষু চিকিৎসকের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। সেই সময় বুয়েন্স আয়ার্সের তুলনায় ইউরোপে সবকিছু সস্তা ছিল, আর্জেন্তিনীয় মুদ্রার মান ভালো ছিল সেই সময়। যাকগে, ইতিহাস সম্পর্কে আমরা এতটাই অজ্ঞ ছিলাম যে, আগস্টেই যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেই ধারণা আমাদের ছিল না। যখন এ ঘটনা ঘটে, বাবা-মা তখন জার্মানিতে। তবে জেনেভায় আমাদের কাছে তাঁরা ফিরে আসতে পেরেছিলেন। যুদ্ধ সত্ত্বেও, বছরখানেক বা তারও কিছু পরে আমরা তখন উত্তর ইতালির আল্পস অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ভেরোনা এবং ভেনিস নিয়ে আমার উজ্জ্বল স্মৃতি রয়েছে। ভেরোনার বিশাল শূন্য এমফিথিয়েটারে আস্কাসুবির একাধিক গাউচো কবিতা দরাজ গলায় আবৃত্তি করেছিলাম।

১৯১৪ সালের প্রথম গ্রীষ্মে জন ফেলভিনের প্রতিষ্ঠিত কলেজ অব জেনেভায় পড়াশোনা শুরু করি। ওটা ছিল ডে-শিফটের স্কুল। ক্লাসে আমরা ৪০ জনের মতো ছিলাম। অর্ধেকটাই বিদেশি ছাত্রছাত্রী। প্রধান বিষয় ছিল লাতিন। এবং অচিরেই লক্ষ করলাম, লাতিন ভালো জানলে অন্য বিষয়গুলোতে অত মনোযোগ না দিলেও কোনো ক্ষতি নেই। যাহোক, অন্য বিষয়গুলো হচ্ছে অ্যালজেব্রা, কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স, মিনের্যালজি, বোটানি, জুওলজি_এগুলো পড়ানো হতো ফরাসি ভাষায়। ওই বছর ফরাসি ছাড়া বাকি সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলাম সাফল্যের সঙ্গেই। আমাকে কিছু না বলেই আমার স্কুলের ছাত্ররা সবার স্বাক্ষরসহ হেডমাস্টারের কাছে আবেদন করে বসল। তারা বলল, সব পাঠ্য বিষয় আমাকে ফরাসিতে পড়তে হবে। ফলে এটাও আমাকে শিখতে হলো। হেডমাস্টারকে তারা বিষয়টি বিবেচনায় নিতে বলল। এবং তিনি দয়া করে তা-ই করলেন। ফরাসি ধরনে এক স্বরে (Syllable) আমার নামটি উচ্চারণ করায় প্রথমে আমি বুঝতেই পারিনি, শিক্ষক আমার নাম ধরে ডাকছেন (Call)। এ বর্ণটা আমরা স্কটিশ ঐ বর্ণের মতো উচ্চারণ করি। ফলে প্রত্যেকবার আমাকে সাড়া দিতে হতো পাশের সহপাঠীর কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে।

আমরা থাকতাম শহরের দক্ষিণ দিকে বা পুরনো অঞ্চলে, এক ফ্ল্যাটে। এখনো পর্যন্ত বুয়েন্স আয়ার্সের চেয়ে জেনেভা আমি অনেক ভালো চিনি। এর সহজ কারণ হলো, জেনেভার রাস্তার দুটো কোনা এক রকম নয়। যে কেউ সহজেই এই পার্থক্যটা দ্রুত বুঝে ফেলতে পারেন। প্রতিদিন আমি শহরের একেবারে ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সবুজ আর বরফি নদী রনের (Rhone) পাশ দিয়ে হাঁটতাম; দেখতে একেবারে ভিন্ন_এ রকম সাতটা সেতু পর্যন্ত লম্বা পথ হেঁটে যেতাম। সুইসরা একটু গর্বিত এবং অমিশুক ধরনের। পোলিশ ইহুদি বংশোদ্ভূত আমার দুই ঘনিষ্ঠ ইয়ার সিমোন হিশলিনিস্কি এবং মোরিস আব্রামোভিচ_তাদের একজন লয়াব আর অন্যজন ফিজিশিয়ান হয়েছিলেন। ওদের আমি ত্রুকো (Rhone) খেলা শিখিয়েছিলাম। খেলাটা ওরা এত ভালো আর দ্রুত শিখেছিল যে, প্রথম দিনের খেলায়ই আমাকে ওরা একেবারে কানাকড়িহীন করে ফেলে। আমার ব্যক্তিগত বেশিরভাগ পড়াশোনা যখন ইংরেজিতে করছিলাম, তখন আমি বেশ ভালো লাতিন বোদ্ধা (Scholar) হয়ে উঠি। বাসায় আমরা স্প্যানিশ বলতাম। তবে আমার বোন ফরাসি ভাষায় এতই দক্ষ হয়ে উঠেছিল যে, স্বপ্নও দেখত সে ওই ভাষাতেই। মনে পড়ে, মা একদিন বাসায় ফিরে দেখেন, নোরা লাল প্লাশ (plush) পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ভয়ে চিৎকার করে বলছে_’Une mouche, une mouche (মাছি, মাছি)!’ মাছি যে ভয়ঙ্কর_ফরাসি এই ধারণায় সে একাত্ম হয়ে গেছে বলে মনে হয়। ‘ওখান থেকে বেরিয়ে এসো’_মা ওকে বকলেন, কিছুটা আদেশাত্মকভাবেই। ‘তুমি এই মাছির মধ্যে জন্মেছ এবং বড় হয়েছ! ইতালি সফর এবং সুইজারল্যান্ডের ভেতরে ঘোরাঘুরি ছাড়া যুদ্ধের ফলে আর কোথাও যাইনি আমরা। পরে জার্মান সাবমেরিনকে অগ্রাহ্য করে কেবল চার/পাঁচজন যাত্রীসহ ইংরেজ দাদি আমাদের কাছে চলে আসেন। স্কুলের বাইরে নিজ উদ্যোগে জার্মান শেখায় হাত দেই। এই অভিযানে লিপ্ত হওয়ার জন্য দায়ী কার্লাইলের সার্তর রেসার্তুস (The taibor retailored), যা আমাকে অভিভূত এবং মুগ্ধ করেছিল। নায়ক ডায়জেনস ডেভিলসডাং ভাববাদের জার্মান এক প্রফেসর। জার্মান সাহিত্যে আমি ট্যাসিটাসের ধরনের কিছু জার্মান বিষয় খুঁজছিলাম। তবে আমি সেটা কেবল পরে ওল্ড ইংলিশ এবং ওল্ড নরসে খুঁজে পেয়েছিলাম। জার্মান সাহিত্য রোমান্টিক এবং রুগ্ন হয়ে পড়েছিল। প্রথমে আমি কান্টের ক্রিটিকিউ অব পিওর রিজন দিয়ে শুরু করেছিলাম। কিন্তু বেশিরভাগ লোকের মতো, এমনকি বেশিরভাগ জার্মানের মতোই এতে পরাজিত হই। পরে ভাবলাম, সংক্ষিপ্ততার কারণে কবিতা হয়তো সহজ হবে।

সুতরাং হাইনের প্রথমদিকের কবিতার বই লিরিক্স ইন্টের্মেজ্জো (Lyriches Intermesso) আর একটা জার্মান-ইংলিশ অভিধান জোগাড় করলাম। একটু একটু করে হাইনের সহজ শব্দাবলি আয়ত্ত করার পর দেখলাম, অভিধান ছাড়াই পড়তে পারছি। দ্রুতই আমি ভাষার সৌন্দর্যে নিজের মতো প্রবেশ করতে পারলাম। মেইরিস্কের উপন্যাস ‘ডের গোলেম’ও পড়ে ফেললাম। (১৯৬৯ সালে আমি যখন ইসরায়েলে ছিলাম, তখন গের্শম স্কোলেমের সঙ্গে গোলেমের বোহেমীয় লিজেন্ড নিয়ে আলাপ করেছিলাম। স্কোলেম হচ্ছেন ইহুদি মরমিবাদের একজন নেতৃস্থানীয় পণ্ডিত। গোলেম বিষয়ে আমার নিজের এক কবিতায় সম্ভাব্য ছন্দময় শব্দ হিসেবে তাঁর নামটি দুই বার ব্যবহার করেছি।) কার্লাইল এবং ডিকুয়েন্সির সুবাদে আমি জাঁ পল বিক্টারের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। এটা ১৯১৭ সালের ঘটনা। তবে অচিরেই আমি আবিষ্কার করলাম, এই পড়াশোনায় আমি বেশ বিরক্ত (Bored) হয়ে পড়েছি। তার দুই ইংরেজ প্রবক্তা সত্ত্বেও রিক্টারকে বেশ ক্লান্তিকর (Long winded) এবং আবেগহীন মনে হয়েছে।

যাহোক, আমি জার্মান এক্সপ্রেশনিজমে আগ্রহী হয়ে উঠি। সমকালীন অন্যসব মতবাদ, যেমন ইমেজিজম, ক্যুবিজম, ফিউচারিজম, সুররিয়ালিজম ইত্যাদি থেকে এক্সপেশনিজমকে আমি এখনো আলাদাভাবে দেখি। কয়েক বছর পর মাদ্রিদে বেশ কয়েকজন এক্সপ্রেশনিস্ট কবির কবিতা স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদের প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র উদ্যোগ নিয়েছিলাম।

সুইজারল্যান্ডে থাকার সময় আমি শোপেনহাওয়ার পড়তে শুরু করি। আজ যদি আমাকে কেবল একজন দার্শনিক পছন্দ করতে বলা হয়, তাহলে আমি তার নামই বলব। বিশ্বজগতের ধাঁধা যদি শব্দাবলিতে প্রকাশিত হয়ে থাকে, তাহলে আমার ধারণা, সেই শব্দাবলিকে খুঁজে পাওয়া যাবে তাঁর লেখায়। আমি তাকে বহুবার পড়েছি, জার্মান ভাষায় এবং অনুবাদে, আমার বাবা ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মাসেদোনিও ফের্নান্দেসের সঙ্গে। জার্মান এখনো আমার কাছে সুন্দর ভাষা মনে হয়; সম্ভবত এই ভাষার সাহিত্যের চেয়ে বেশি সুন্দর। মতবাদ এবং আন্দোলনের প্রতি মুগ্ধতা থাকলেও কূটাভাসিক ধরনে ফরাসি ভাষার রয়েছে সুন্দর সাহিত্য। তবে ভাষাটাকে আমার বরং কুৎসিত মনে হয়। ফরাসিতে কিছু বললে তা গুরুত্বহীন মনে হয়। স্প্যানিশ শব্দগুলো খুব দীর্ঘ এবং ভারী হলেও, এই দুই ভাষার মধ্যে স্প্যানিশকেই আমার ভালো মনে হয়। আর্হেন্তিনীয় একজন লেখক হিসেবে এর সঙ্গে আমার এঁটে (Coye with) উঠতে সমস্যা হয়নি, আর আমি এর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে খুবই সচেতন। মনে পড়ে, গ্যেটে লিখেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে ভাষাটি নিয়ে তাকে কাজ করতে হচ্ছে_ জার্মান। ভাষা নিয়ে কাজ করেন_ এ রকম বেশিরভাগ লেখকই মনে হয় এ ধারণার সঙ্গে একমত। যেমন ইতালীয় ভাষার কথা ধরা যাক। বারটা ভাষার চেয়ে বেশি ভিন্ন সংস্করণে আমি বার বার দ্য ভিডাইন কমেডি পড়েছি। আরিওস্তো, তাসসো, ফ্রোচে এবং জেন্টিনও পড়েছি। তবে ইতালীয় বলতে বা ইতালীয় নাটক বা ছায়াছবি দেখতে আমি একেবারেই পারি না।

জেনেভাতেই আমি প্রথম ওয়াল্ট হুইটম্যানের সঙ্গে পরিচিত হই, যদিও জোহানেস স্কলাফের জার্মান অনুবাদে। আমেরিকান কবিকে জার্মান অনুবাদে পড়ার এই অদ্ভুতুড়ে ব্যাপারটা আমাকে নিশ্চয়ই আলোচিত করেছিল। অতএব লন্ডন থেকে লিভস অব গ্লাসের একটা কপি পাঠানোর অর্ডার দিই। ওটা এখনো আমার মনে পড়ে_সবুজ রঙের বাঁধাই। একটা সময় হুইটম্যানকে আমি কেবল মহান নয়, একমাত্র কবি বলে মনে করতাম। আসলে আমি ভাবতাম ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর সব কবিই হুইটম্যানের প্রতি পুরোপুরি ঝুঁকে পড়েছিলেন এবং তাঁর অনুকরণ না করাটা ছিল অজ্ঞতারই প্রমাণ। এ অনুভূতিটা আমার ইতিমধ্যে তখন ঘটেছিল কার্লাইলের গদ্যের ক্ষেত্রে, যা এখন আমার কাছে অসহ্য মনে হয়, আর ঘটেছিল সুইনবার্নের কবিতার বেলায়ও। এ পর্যায়গুলোই আমি পার হয়েছিলাম। পরে, বিশেষ কিছু লেখকের দ্বারা অভিভূত হওয়ার ফলে ওই রকম একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।

১৯১৯ সাল পর্যন্ত আমরা সুইজারল্যান্ডেই ছিলাম। তিন থেকে চার বছর জেনেভায় কাটানোর পর বছরখানেক লুগানোতে থাকি। ইতিমধ্যে আমার ব্যাচেলর ডিগ্রি নেয়া হয়েছে এবং তখন বুঝতে পারছিলাম যে লেখাতে আমার মনোযোগী হতে হবে। বাবাকে আমার পাণ্ডুলিপি দেখাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বললেন, তিনি উপদেশ দেয়ায় বিশ্বাস করেন না এবং ট্রায়াল অ্যান্ড এররের মধ্য দিয়ে আমার নিজের ধরনে আমাকে অবশ্যই কাজ করতে হবে। আমি ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষায় সনেট লিখছিলাম। ইংরেজি সনেটগুলো ছিল ওয়ার্ডসওয়ার্থের দুর্বল (poor) অনুকরণ, আর ফরাসিগুলো ছিল পানসে ধরনের, প্রতীকবাদী কবিতার অনুকরণ। ফরাসি নিরীক্ষার আমার একটি পঙক্তি এখনো মনে আছে : ‘petste Boste nosre your Le violon cosse’. কবিতার শিরোনাম ছিল ‘poeme your etrc recite avec un accent russe’. আমি যেহেতু জানতাম আমি লিখছি বিদেশির ফরাসি ভাষায়, তাই ভাবলাম আর্হেন্তিনীয়র চেয়ে রুশ শ্বাসাঘাত বরং ভালো। আমার ইংরেজি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ১৮ শতকের আবহ এবং অভ্যাসগুলো আনতে চেয়েছিলাম, যেমন over-এর পরিবর্তে ‘O'er’, ছন্দমিলের খাতিরে ‘Sings’-এর বদলে ‘doth sing’ ব্যবহার করতাম। যাই হোক, আমি জনতাম স্প্যানিশই হবে আমার অনিবার্য নিয়তি।

আমরা বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম, তবে প্রথমে বছরখানেক স্পেনে কাটিয়ে। স্পেন তখন আর্হেন্তিনীয়দের দ্বারা ধীরে ধীরে আবিষ্কৃত হচ্ছে। তখনো পর্যন্ত লেওপোলদো লুগনেস এবং রিকার্দো গুইরালদেসের মতো বিখ্যাত লেখকরা ইউরোপ ভ্রমণের সময় স্পেনকে ইচ্ছে করে এড়িয়ে যেতেন। এটা কোনো হুজুক ছিল না। বুয়েন্স আয়ার্সে স্পেনীয়রা সব সময় নিম্নস্তরের কাজ করত, যেমন চাকর-বাকর, রেস্তোরাঁর ওয়েটার এবং শ্রমিক কিংবা ছোটখাটো ব্যবসায়ী আর আমরা আর্হেন্তিনীয়রা নিজেদের স্পেনীয় ভাবতাম না। আসলে আমরা স্পেনীয় হওয়াটা ছেড়ে দিয়েছি ১৮১৬ সালে, যখন আমরা নিজেদের স্পেন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলাম। ছেলেবেলায় আমি যখন প্রেসকটের পেরু বিজয় (Conquest of peru) পড়ি, তখন বিজয়ীদের (Conquestadores) রোমান্টিক ধরনে উপস্থাপন করতে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এই কর্মকর্তাদের থেকে আসা লোকদের আমার কাছে খুব একটা কৌতূহল-উদ্দীপক মনে হয়নি। যাই হোক, ফরাসিদের মতে লাতিন আমেরিকার লোকজন স্পেনীয়দের দেখত প্রাণবন্ত হিসেবে, গার্সিয়া লোরকার পরিভাষায়_জিপসি, বুলফাইট এবং মুসলিম যুগের স্থাপত্য। যদিও স্প্যানিশ আমাদের ভাষা এবং আমরা স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ রক্তের ধারাবাহিকতা, তারপরও আমাদের পরিবার তিনশ বছরের অনুপস্থিতির পরও স্পেন ঘুরে আসার কথা ভাবেনি।

আমরা গিয়েছিলাম মাহোর্কা (Majorca), কারণ ওই জায়গাটা তখন ছিল সস্তা, সুন্দর আর আমরা ছাড়া অন্য কোনো ট্যুরিস্টও খুব একটা ছিল না। পাহাড়ের ওপর পালমা এবং বাইয়াদেমোসা গ্রামে প্রায় গোটা বছর কাটিয়েছিলাম। লাতিন চর্চা করে যাচ্ছিলাম। এবার অবশ্য এক পুরুতের (priest) অধীনে যিনি বলেছিলেন, যেহেতু প্রয়োজনীয় সহজাত ছিল যথেষ্ট, তাই তিনি কখনো উপন্যাস পড়ার উদ্যোগ নেননি। আমরা ভার্জিল পড়ছিলাম, যাঁকে আমি এখনো উঁচুস্তরের মনে করি। মনে পড়ে স্থানীয় লোকদের আমি চমৎকার সাঁতারের মাধ্যমে চমৎকৃত করে দিয়েছিলাম। এর কারণ আমি স্রোতশীল বিভিন্ন নদীতে, যেমন উরুগুয়াই এবং রন নদীতে সাঁতার শিখেছি, অন্যদিকে মাহোর্কার লোকজন শিখেছে শান্ত, স্রোতহীন সাগরে। বাবা তাঁর উপন্যাস লিখে যাচ্ছিলেন, যার বিষয় তাঁর জন্মস্থান এন্ত্রে রিওসের ১৮৭০ সালের গৃহযুদ্ধের পুরনো দিনগুলো। মনে পড়ে তাঁকে আমি বেশ বাজে কিছু মেটাফর দিয়েছিলাম, যেগুলো জার্মান এক্সপ্রেশনিজম থেকে ধার করা। তিনি সেগুলো নিরুপায় হয়ে গ্রহণ করেছিলেন। শ’পাঁচেক মুদ্রিত কপি ছিল বইটির। সেগুলো তিনি বুয়েন্স আয়ার্সে এনে বন্ধুদের বিতরণ করেন।

পাণ্ডুলিপিতে যতবার তাঁর হোম টাউন ‘পারানা’ শব্দটি পাওয়া গেছে, প্রুফরিডার সব বদলে দিয়ে ‘পানামা’ বানিয়ে দিয়েছে। তারা ধরে নিয়েছে পাণ্ডুলিপির ভুল সংশোধন করে দিচ্ছে। বাবা ওদের কোনো সমস্যায় না ফেলে শব্দটা ওরকমই রেখে দিয়েছেন। দেখলেন তাতে করে ব্যাপারটা মজারই হচ্ছে। এখন আমার অনুতাপ হয় এ বইয়ে যৌবনকালে অনুপ্রবেশের কারণে। সতের বছর পরে, তাঁর মৃত্যুর আগে, তিনি আমাকে বললেন বেগুনি তালি-তাপ্পি বাদ দিয়ে সুন্দর ভাষায় সরাসরি ভঙ্গিতে উপন্যাসটি আমি পুনর্লিখন করলে তিনি খুব খুশি হবেন। সেই সময় আমি নিজে নেকড়ে-মানব (werewolf) নিয়ে একটা গল্প লিখে তা লা এসফেরা নামে মাদ্রিদের একটি জনপ্রিয় সাময়িকীতে পাঠিয়েছিলাম। সম্পাদক সেটি প্রত্যাখ্যান করে খুবই জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন।

১৯১৯-২০ সালের শীতকালটা আমরা সের্বিইয়েতে কাটাই। ওখানেই আমার কবিতা প্রথম মুদ্রিত হয়। ওটার শিরোনাম ছিল ‘সমুদ্রের প্রতি স্তুতি’, ১৯১৯ সালে ৩১ ডিসেম্বরে গ্রেসিয়াতে ছাপা হয়েছিল। কবিতাটিতে আমি যতটা সম্ভব ওয়াল্ট হুইটম্যান হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম :

হে সমুদ্র! হে পুরাণ! হে সবিতা!
হে বিশাল শ্রান্তির স্থল!
আমি জানি কেন ভালোবাসি তোমাকে।
জানি আমরা দুজনেই ভীষণ প্রাচীন,
বহু বহু শতাব্দী ধরে মোরা চিনি দুজনাকে...
হে প্রটীয়, জন্ম আমার তোমাতে_
আমরা পরস্পর শৃঙ্খলিত আর ভ্রাম্যমাণ;
আমরা দুজনেই তৃষ্ণার্ত নক্ষত্রের তরে,
দুজনেই আশা আর নিরাশায় বাঁধা...!

আজকাল সমুদ্র নিয়ে খুব একটা ভাবি না। এমনকি নিজের ব্যাপারেও না। অনেক বছর পর, আর্নল্ড বেনেটের The third-rate grandiose বাক্যবন্ধের মুখোমুখি হই, আমি সঙ্গে সঙ্গে এর অর্থ বুঝতে পেরেছিলাম। কয়েক মাস পর আমি যখন মাদ্রিদ আসি, যেহেতু ওটাই ছিল আমার একমাত্র প্রথম মুদ্রিত কবিতা, তাই লোকজন আমাকে সমুদ্রের গায়ক বলে ধরে নিয়েছে।

গ্রেসিয়াকে ঘিরে যে-দলটা যখন ছিল, আমি সের্বিইয়েতে গিয়ে পড়লাম ওই দলের মধ্যে। এ দলটি নিজেদের উলত্রাইস্ত বলে ডাকত। শিল্পের শাখা-সাহিত্যের নবায়নের জন্য যাত্রা শুরু করলেও ওরা এর কিছুই জানত না। ওদের একজন আমাকে একদিন বলল, ওর সব পঠন-পাঠন হচ্ছে গিয়ে বাইবেল, সের্বান্তেত, দারিও এবং গুরু রাফায়েল কান্সিনোস-আসেন্স দু-একটি বই, এ ব্যাপারটা আমার আর্হেন্তিনীয় মনকে বেশ ভাবনার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল : ওদের ফরাসি জ্ঞান নেই এবং ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। মানবতাবাদী হিসেবে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় এবং পরিচিত একজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, যার লাতিন-জ্ঞান আমার চেয়েও কম ছিল। আর গ্রেসিয়ার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে তা হলো এর সম্পাদক ইসাক ফেল বান্দো বিইয়ারের পুরো কাব্যসামগ্রী তাঁর কোনো না কোনো অধস্তন সহকর্মীর দ্বারা লিখিত। মনে পড়ে এদের একজন একদিন আমাকে বললেন, ‘আমি খুবই ব্যস্ত ইসাক একটি কবিতা লিখছে।’

পরে আমরা গেলাম মাদ্রিদ, সেখানে আমার জীবনে যে বিরাট ঘটনা ছিল তা হলো রাফায়েল কান্সিনোস আসেন্সের সঙ্গে বন্ধুত্ব। আমি এখনো নিজেকে তাঁর শিষ্য ভাবতে পছন্দ করি। তিনি ছিলেন সেবিইয়ের লোক, সেখানে তিনি কামেল (priesthood) হওয়ার পড়াশোনা করেন, কিন্তু ইনকুইজিশনের দলিল-দস্তাবেজে কান্সিনোস নামটি দেখে তিনি যে ইহুদি_এ সিদ্ধান্তে আসেন। এই আবিষ্কার তাঁকে হিব্রু চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে এবং পরে তিনি খতনাও করেন। আন্দালুসিয়ার সাহিত্যিক বন্ধুরা আমাকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আমি সলজ্জভাবে তাঁকে অভিনন্দন জানাই সমুদ্রবিষয়ক তাঁর একটি কবিতার জন্য। ‘হ্যাঁ, তিনি বললেন, মৃত্যুর আগে তা দেখার কী যে সাধ’ সব ধরনের কান্তিয়দের (Casilian) প্রতি আন্দালুসীয় ঘৃণা নিয়ে তিনি ছিলেন দীর্ঘদেহী। কান্সিনোসের ব্যাপারে যেটা লক্ষণীয় তা হলো টাকা এবং খ্যাতির প্রতি কোনো মোহ ছাড়াই তিনি পুরোপুরি সাহিত্যের জন্য বেঁচে ছিলেন। ভালো কবি ছিলেন এবং একটি সপ্তবাহুর ঝাড় লণ্ঠন (El condelabro de los siete brases) নামে একটি প্রধানত আদিরসের স্তোত্র গ্রন্থ লিখেছিলেন। ১৯১৫ সালে বইটি বেরিয়েছিল। প্রবন্ধ, গল্প এবং উপন্যাসও লিখেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার যখন পরিচয় হয় তখন তিনি একটি সাহিত্যচক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।

প্রতি শনিবার আমি কাফে কলোনিয়াতে যেতাম, মধ্যরাতে আমরা একত্রিত হতাম আর আড্ডা চলতো ভোর পর্যন্ত। কখনো কখনো ২০ থেকে ৩০ জনের মতো হতাম। দলটা সব ধরনের স্পেনীয় স্থানিকতাকে (Locol color) ঘৃণা করত, যেমন_কান্তে হোন্দো এবং ষাঁড়ের লড়াই। ওরা বেশি পছন্দ করত আমেরিকান জাজ আর স্পেনীয় হওয়ার চেয়ে ইউরোপীয় হওয়াটাই। কান্সিনোস বিষয় প্রস্তাব করত_রূপক, ফ্রি ভার্স, কবিতার ঐতিহ্যবাহী প্রকরণ, আখ্যান কবিতা, বিশেষণ, ক্রিয়া। একেবারে তাঁর নিজের ধরনে তিনি ছিলেন একনায়ক (Dictator), সমকালীন লেখকদের অবন্ধুসুলভ। পরোক্ষ উল্লেখ তিনি অনুমোদন করতেন না এবং আলাপ-আলোচনাকে তিনি উঁচুস্তরে ধরে রাখার চেষ্টা করতেন।

কান্সিনোস ছিলেন গোগ্রাসি পাঠক। তিনি ডি-কুয়েন্সির ‘গাঁজাখোর’ (Oyium-Easer) গ্রিক থেকে মার্কাস আউবেলিয়াসের ‘অনুধ্যান’, বারবুসের উপন্যাস এবং স্কোউবের ভিয়ে ইমাহিনারি (vies inaginares) পরে গ্যোটে এবং দস্তয়েভস্কির সমগ্র রচনা অনুবাদ করেন। আরব্য রজনীর প্রথম সংস্করণও তাঁরই করা, যা বার্টন এবং লেনের তুলনায় অনেক খোলামেলা (Free) হলেও আমার ধারণা, তা পড়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি উপভোগ্য। একবার তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। আমাকে তাঁর গ্রন্থাগারে নিয়ে গেলেন। বরং বলা ভালো, তাঁর পুরো ঘরটাই ছিল গ্রন্থাগার। অরণ্যে পথ করে নেয়ার মতো ব্যাপার আর কি! শেলফ কেনার সামর্থ্য তাঁর ছিল না আর বইগুলো মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত একটার উপর আরেকটা উঁচু করে রাখা, যার ফলে আলম্ব এই বইয়ের স্তম্ভের মধ্য দিয়ে সাবধানে হাঁটা ছাড়া উপায় থাকে না। কান্সিনোসকে আমার কাছে মনে হয়েছিল যেন তিনি পেছনে ফেলে আসা ইউরোপের গোটা অতীত_প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য, সব সংস্কৃতির এক প্রতীকের মতো। তবে ওনার মধ্যে যে বিকৃতি ছিল তা ওনাকে নেতৃস্থানীয় সমসাময়িকদের কাছাকাছি যেতে বাধা দিয়েছে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির লেখকদের ভূয়সী প্রশংসা করে বই লেখার মধ্যে এ ব্যাপারটা রয়েছে। ওর্তেগা ই গাসেৎ তখন খ্যাতির চূড়ায়, কিন্তু কান্সিনোস তাঁকে বাজে দার্শনিক এবং বাজে লেখক হিসেবে গণ্য করতেন। ওনার কাছ থেকে আমি আসলে যে জিনিসটা পেয়েছি তা হলো সাহিত্যিক আলাপের আনন্দ। আমি তাঁর Fardlung পাঠের দ্বারাও উদ্বুদ্ধ ছিলাম। লেখায় আমি তাঁর অনুকরণ করতে শুরু করেছিলাম। লেখায় তিনি অস্প্যানিশ এবং তীব্র হিব্রু স্বাদের দীর্ঘ এবং প্রবহমান বাক্য লিখতেন।

অনেক বেখাপ্পা মনে হলেও, কান্সিনোসই ১৯১৯ সালে আল্ট্রাইম পরিভাষাটি উদ্ভাবন করেন। তিনি মনে করতেন, স্প্যানিশ সাহিত্য সময় থেকে সর্বদাই পিছিয়ে আছে। হুয়ান লাস ছদ্মনামে তিনি কিছু ছোটগল্প, কিছু আলট্রাইস্ট Laconic লেখা লিখেছেন। গোটা বিষয়টাই এখন দেখলে মনে হয় রসিকতার (Mockeru) মানসিকতা থেকে করা। কিন্তু আমরা তরুণরা তখন এটাকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলাম। গিইয়ের্মো দে তোররে ছিল পাঁড় অনুসারীদের একজন, যার সঙ্গে আমার মাদ্রিদে দেখা এবং নয় বছর পরে আমার বোন নোরার সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

সেই সময় মাদ্রিদে রামোন গোমেস দেলা ছেরনাকে ঘিরে আরেকটা দল ছিল। একবার আমি সেখানে গিয়েছিলাম কিন্তু আচার-আচরণ আমার ভালো লাগেনি।

১৯২১ সালের মার্চের শেষ দিকে ‘রেইনা বিক্তোরিয়া এউহেনিয়া’ জাহাজে চেপে আমরা বুয়েনস আয়ার্সে ফিরে এলাম। অনেক ইউরোপীয় শহরে থেকে আসার পর জেনেভা, জুরিখ, নিমস, কর্ডোভা ও লিসবনের অজস্র স্মৃতি নিয়ে নিজ শহরে ফিরে আসার পর বিস্মিত হলাম এর চেহারা দেখে, কত বড় হয়ে গেছে আমার এত চেনা শহরটা! চেনাই যায় না নতুন বিশাল এলোমেলোভাবে গড়ে ওঠা শহরটাকে। আনুভূমিক ছাদওয়ালা নিচু নিচু ভবনের সারি যেন শেষই হয় না, পশ্চিমে সীমানা ছাড়িয়ে চলে গেছে এদিকটায় যেটাকে ভূগোলবিদ আর সাহিত্যের লোকজন পাম্পা নামে ডাকে। ঘরে ফেরা নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু : পুনরাবিষ্কার। আমি খুব উৎসাহ নিয়ে আগ্রহসহকারে বুয়েনস আয়ার্সকে দেখতে পেলাম। কেননা বহুদিন হয় আমি এর কাছ থেকে দূরে ছিলাম। এত দিন পর একে দেখে যেমন করে অদ্ভুত এক ধাক্কা আমার অনুভূতিতে দোলা দিল, যেমন করে আমাকে উত্তেজিত করে তুলল আমার এই শহর_সেটা বিদেশে যদি কোনো দিন না যেতাম তাহলে ঘটত কি না জানি না। অবশ্যই গোটা শহরের কথা বলছি না, বরং এর কিছু কিছু জায়গা যার একটা অন্যরকম আবেদন ছিল আমার কাছে, যার অনুপ্রেরণায় আমার এখন প্রকাশিত বই কাব্যগ্রন্থ ‘ফের্বোর দে বুয়েনস আয়ার্স’-এর কবিতাগুলো লেখা।

কবিতাগুলো লিখেছিলাম ১৯২১ এবং ১৯২২ সালে আর বই আকারে বের হলো ১৯২৩ সালের শুরুতে। বইটা আসলে ছাপা হয়েছিল পাঁচ দিনে; চটজলদি ছাপাতে হয়েছিল, কারণ হঠাৎ আমাদের ইউরোপ ফিরে যেতে হচ্ছিল। চৌষট্টি পৃষ্ঠার একটা বই করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু পাণ্ডুলিপিটি বেশি বড় হয়ে গেল এবং শেষ পর্যন্ত পাঁচটি কবিতা বাদ পড়ল। আমার কোনো কিছুই আজ মনে নেই। এক ধরনের ছেলেমানুষি মনোভাব নিয়ে বইটার কাজ হয়েছিল। কোনো রকম প্রুফ দেখা হয়নি, কোনো সূচিপত্র ছিল না, আর কোনো পৃষ্ঠা সংখ্যাও দেওয়া হয়নি। আমার বোন প্রচ্ছদের জন্য একটা কাঠখোদাই চিত্র ব্যবহার করল এবং মোট ৩০০ কপি ছাপা হয়েছিল। তখনকার দিনে বই প্রকাশনার কাজটা ছিল একটা ব্যক্তিগত উদ্যোগের ব্যাপার। বই বিক্রেতাদের কাছে কিংবা বইয়ের আলোচনার জন্য কাউকে কোনো কপি পাঠানোর কথা আমি কখনো ভাবিনি। বেশির ভাগ কপিই আমি এদিক-ওদিক বিলি করেছি। কিভাবে বিলি করেছিলাম তার একটা পন্থা মনে আছে। সেই সময় বহুকাল ধরে পরিচিত নির্ভরযোগ্য ম্যাগাজিনগুলোর একটি ছিল ‘নোসোত্রোস’। খেয়াল করলাম, বহু লোক ওই ম্যাগাজিনের অফিসে যায় এবং ক্লোকরুমে তাদের ওভারকোট ঝুলিয়ে রেখে ভেতরে ঢোকে। আমার বইয়ের ৫০ কি ১০০টা কপি নিয়ে ওই ম্যাগাজিনের অন্যতম সম্পাদক আলফ্রেদো বিয়াঞ্চির কাছে গেলাম। বিয়াঞ্চি আমার দিকে বিস্ময়-মেলে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি চাইছো তোমার এই বইগুলো আমি বিক্রি করে দিই?’ ‘না’_আমি উত্তরে বললাম। ‘যদিও কবিতাগুলো আমারই লেখা, কিন্তু আমি ঠিক ওই অর্থে পাগল নই। আমি ভাবছি, আপনাকে হয়তো বলতে পারি, এ বইগুলোর কয়েকটা ওইখানে ঝুলে থাকা কোটগুলোর পকেটে ঢুকিয়ে দিতে পারেন কি না।’

বইটা ছিল মূলত রোমান্টিক ধাঁচের, যদিও লেখা হয়েছিল যৎসামান্য সাদামাটা ভঙ্গিতে এবং প্রচুর পরিমাণে স্বল্পবাক রূপকালংকার ব্যবহার করেছিলাম। সূর্যাস্ত, নির্জন জায়গা এবং শহরের অপরিচিত সব কোনাঘুপচির বন্দনা গীত করা হয়েছে বইটিতে; একটু সাহস করে বার্কলির অধিবিদ্যায় চলে গেছি কখনো কখনো; আর আছে প্রথম সব প্রেমের কথা। একই সঙ্গে কাব্যগ্রন্থটিতে সপ্তদশ শতাব্দীর স্প্যানিশ কবিতার অনুকরণ আছে এবং মুখবন্ধে আমি স্যার টমাস ব্রাউনের রেলিহিও মেদিসির উল্লেখ করেছি। পরিতাপের সঙ্গে বলতেই হয়, বইটা সব মিলিয়ে ছিল বড়দিনের কিশমিশ বসানো পুডিংয়ের মতো_এত কিছু একসঙ্গে। কিন্তু তার পরও পেছন ফিরে দেখলে বলতে হয়, আমার মনে হয় না আমি পরে ওই বই থেকে বের হতে পেরেছি। আমার ধারণা, আমার পরবর্তী সব রচনার বীজ এই প্রথম বইটিই। আমার মনে হয়, আমার বাকি জীবন ধরে ওই একটা বই-ই বার বার লিখে যাচ্ছি।

‘ফের্বোর দে বুয়েনস আয়ার্স’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি কি আলট্রাইস্ট? ইউরোপ থেকে আমি যখন ফিরে এলাম ১৯২১ সালে, আমি সঙ্গে করে ‘আলট্রাইজম’-এর লেবাস নিয়ে এসেছিলাম। সাহিত্যের ঐতিহাসিকদের কাছে এখনো আমি ‘আর্জেন্টাইস আলট্রাইজমের জনক’ হিসেবে পরিচিত। দেশে ফিরে আমি যখন বিষয়টা নিয়ে এদুয়ার্দো গোঞ্জালেস লানুসা, নোরাহ্ ল্যাঞ্জ, ফ্রান্সিসকো পিলিয়েরো, আমার মামাতো ভাই গিইয়ের্মো হুয়ান (বোর্হেস) এবং রোবের্তো ওর্তেইয়ি প্রমুখ সমকালীন কবির সঙ্গে আলোচনায় বসি, তখন শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে আধুনিকতা ও গেজেটের তোপে স্প্যানিশ আলট্রাইজম অতিমাত্রায় ভারাক্রান্ত, ফিউচারিজমের মতোই। রেলট্রেন, প্রোপেলার, এরোপ্লেন এবং ইলেকট্রিক ফ্যান_এর কোনো কিছুই আমাদের আকর্ষণ করল না। আমাদের ইশতেহারে আমরা রূপকের প্রাধান্য বজায় রেখে পরিবর্তন ও আলংকারিক বিশেষণকে খারিজ করে দিয়ে আসলে লিখতে চাইছিলাম মৌলিক কবিতা_আজ এবং এই স্থান, এই কালের গণ্ডি পেরোনো কবিতা, দেশজ বৈশিষ্ট্য বিবর্জিত এবং সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের কাছ থেকে মুক্ত, স্বাধীন। আমার ধারণা, PLAINNESS নামের কবিতাটি আমি ব্যক্তিগতভাবে যা লিখতে চাইছিলাম-তার যথাযথ প্রকাশ ঘটায় : The garden’s grill works gate

opens with the ease of a page
in a much thumbed book,
and, once inside, our eyes
have no need to dwell on objects
already fixed and exact in memory.
Here habits and minds and the private language
all families invent
are everyday things to me.
What necessity is there to speak
or pretend to be someone else?
The whole house knows me,
they�re aware of my worries and weakness.
This is the best that can happeng-
what Heaven perhaps will grant us;
not to be wondered at or required to succeed
but simply to be let in
as part of an undeniable Reality,
like stones of the road, like trees.

আমার ধারণা, আমার প্রথম দিককার স্প্যানিশ আলট্রাইস্ট ধাঁচের কবিতাগুলোর মুখচোরা অতি উচ্ছ্বাসের চেয়ে একেবারেই অন্য রকম। আমার সেসব কবিতা ছিল এ রকম : বন্দুক কাঁধে লোককে দেখেছি ট্রলি কার হিবেসে, সূর্যোদয়ের মধ্যে দেখেছি চিৎকার, কিংবা সূর্যাস্তকে পশ্চিমে ক্রুশবিদ্ধ হতে। পরে এক সময় এ ধরনের অদ্ভুত সব বাক্যবন্ধ পড়িয়ে শোনাতেই আপাদমস্তক সুস্থ আমার এক বন্ধু বলেছিল, ‘ওহ্, আমি বুঝতে পারছি তোমার কাছে কবিতার মূল লক্ষ্যই হলো কাউকে চমকে দেওয়া।’ ফের্বোর দে বুয়েনস আয়ার্স’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো আলট্রাইস্ট কি না তার সদুত্তর আমার হয়ে আমার বন্ধু ও ফরাসি অনুবাদক নেস্তোর ইবাররা দিয়েছিল, ‘তার প্রথম আলট্রাইস্ট কবিতা লেখার সঙ্গে সঙ্গে বোর্হেস আলট্রাইস্ট কবিদের গোত্রমুক্ত হয়ে পড়েন।’ এখন আমি শুধু আমার শুরুর দিকে চড়া সুরের আলট্রাইস্ট কবিতাগুলোর জন্যই আফসোস করতে পারি। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর আজও আমার জীবনের সেই বিদঘুটে পর্বটাকে মানিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি।

বুয়েনস আয়ার্স ফিরে আসার পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ছিল মাসেদোনিও ফের্নান্দেসে’র সাক্ষাৎ। আমার জীবনে যত মানুষের দেখা পেয়েছি, যাঁদের মধ্যে আছেন অসাধারণ কয়েকজন_তাঁদের মধ্যে মাসেদোনিওর মতো এতটা গভীরভাবে আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখেননি আর কেউ। কালো একটা বোউলার টুপি পরা ছোটখাটো একজন মানুষ, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন উত্তরা দার্সেনা বন্দরে। জাহাজ ভেড়ার পর বাবার সূত্র ধরে পরিচয় এবং সেই থেকে বন্ধুত্ব। তাঁরা দুজনই সমান বয়সী ছিলেন। জন্মেছিলেন ১৮৭৪ সালে। আপাত বিরোধিতা ছিল তাঁর চরিত্রে, একদিকে ছিলেন তুখোড় আলাপচারী আবার অন্যদিকে এমনিতে দীর্ঘ সময় থাকতেন চুপচাপ, কথা বলতেন মেপে মেপে। আমরা এক কাফেতে প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় দেখা করতাম, প্লাসা দেল ওন্নের পেলা কাফেতে। ওখানে বসে ভোর না হওয়া পর্যন্ত আমরা কথা বলতাম, মাসেদোনিও হলেন গুরু আর আমি শিষ্য, এভাবে কথাবার্তা চলত। মাদ্রিদে যেমন কান্সিনোস ছিলেন সব শিক্ষার আধার আর এখন মাসেদোনিও হয়ে উঠলেন বিশুদ্ধ ভাবনার অবতার। ওই সময়টায় আমি ছিলাম এক গোগ্রাসী পাঠক, ঘর থেকে খুব একটা বের হতাম না (রাতের খাবারের পর, প্রতি রাতেই আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে আবার পড়তাম), কিন্তু আমার পুরো সপ্তাহটা কেটে যেত এই আশায় যে শনিবার মাসেদোনিওর সঙ্গে আমার দেখা হবে এবং মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাঁর কথা শুনব। তিনি আমাদের বাড়ির কাছেই থাকতেন এবং চাইলেই যখন-তখন তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ আমার ছিল, কিন্তু আমার কেন যেন মনে হতো যে এ রকম একটি বাড়তি সুবিধা নেওয়ার কোনো অধিকারই আমার নেই এবং শনিবার পুরোপুরি করে মাসেদোনিওর কাছ থেকে অনেক কিছু নেব বলে সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয় তাঁকে বিরক্ত না করাই ভালো। মাসেদোনিওর সঙ্গে যখন আমার দেখা হতো, তিনি সব মিলিয়ে হয়তো তিন কী চারবার সবিস্তারে কথা বলতেন। বাকি সময়টা তাঁর সঙ্গে বসা আমাকেই পর্যবেক্ষণ করতেন আর আমার কথার ফাঁকে ফাঁকে হয়তো দু-একটা মন্তব্য করতেন। মন্তব্যগুলো কখনোই উৎসাহব্যঞ্জক কিছু ছিল না। মাসেদোনিও অতিশয় ভদ্র ছিলেন, ছিলেন মিতভাষী, বলতেন এরকম, ‘আচ্ছা, আমার মনে হয় তুমি ব্যাপারটা খেয়াল করেছো...?’ এর পরই তাঁর কষ্টে উচ্চারিত হতো শূলবাঁধা অব্যর্থ মৌলিক কোনো চিন্তা। কিন্তু স্থিরচিত্তে, মন্তব্যটা ছুড়ে দিতেন তাঁর শ্রোতার প্রতি।

হ্যাংলা-পাতলা গোছের বিষণ্ন এক মানুষ ছিলেন তিনি। ছাই রঙা চুল এবং গোঁফ, দেখে মনে হতো মার্ক টোয়েন। লোকে এই সাদৃশ্যটার কথা বললে তিনি খুশি হতেন, কিন্তু যখন তাঁকে এও বলা হতো, তাঁর সঙ্গে পল ভালেরিরও যথেষ্ট মিল, তখন তিনি খেপে যেতেন, ফরাসিদের প্রতি তাঁর কোনো বিশেষ অনুরাগ ছিল না। তিনি সব সময় ওই বোউলার টুপিটা পরে থাকতেন এবং আমি যত দূর জানি ওটা পরে ঘুমাতেনও। শুতে যাওয়ার সময় তিনি কখনোই কাপড়-চোপড় পাল্টাতেন না। আর রাতে হাওয়ার দমকে না জানি আবার দাঁতের ব্যথা শুরু হয়, সে ভয়ে মাথার মধ্যে একটা তোয়ালে পেঁচিয়ে রাখতেন। তখন তাঁকে দেখে মনে হতো এক আরব। তাঁর অন্য পাগলামির মধ্যে ছিল তাঁর জাতীয়তাবাদ (একের পর এক সব আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্টকে তিনি অপ্রশংস দৃষ্টিতে দেখেছেন এই যুক্তি দেখিয়ে যে আর্জেন্টিনার নির্বাচন কমিশন ভুল করতে পারে না), দাঁত আর দাঁতের ডাক্তার নিয়ে তাঁর অদ্ভুত ভয় (মানুষজনের সামনেই হাত দিয়ে দাঁত ধরে টানাটানি করতেন, যাতে একটা সমাধান হয় এবং ডাক্তারের কাছে যেতে না হয়) এবং রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারী নারীদের প্রেমে পড়তেন ঘনঘন।

লেখক হিসেবে মাসেদোনিও অন্য ধরনের বেশ কিছু রচনা প্রকাশ করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর ২০ বছর পরও তাঁর অনেক অপ্রকাশিত লেখা গ্রন্থিত হচ্ছে এখন। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম বইটার নাম ছিল নো তোদা এস বিহিলিয়া লা দে লোস ওহোস্ আবিয়ের্তোস (আমরা চোখ খুলে থাকলেই জেগে থাকি না। আদর্শবাদ নিয়ে একটা সুবিস্তারে লেখা বই ছিল ওটা, জট পাকানো দুর্বোধ্য শৈলীতে লেখা; আমার ধারণা, বাস্তবতার জট পাকানো অবস্থাকে তুলে ধরার জন্য। পরের বছর পাপেলেস দে রেসিয়েনবেনিদো (এক নবিসের লেখা) শিরোনামে বিচিত্র সব রচনা নিয়ে তাঁর আরেকটি বই বের হয়, যেটাতে আমিও ছোটখাটো একটা ভূমিকা রেখেছিলাম, অধ্যায়গুলো দাঁড় করানো ও বিন্যাসের কাজে। ঠাট্টাচ্ছলে ঠাট্টা-তামাশা করে লেখা বিচিত্র সব রচনাকে একত্র করা যাকে বলে। মাসেদোনিও উপন্যাস এবং কবিতাও লিখেছেন, যার সবই চমকপ্রদ কিন্তু দুর্বোধ্য, পড়া যায় না। ২০ অধ্যায়ের একটা উপন্যাস আছে তাঁর যেটাতে মুখবন্ধে ৫৬টি ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা লেখা। বিশেষ চমৎকারিত্ব ছিল তাঁর, কিন্তু আমার মনে হয় না মাসেদোনিও তাঁর লেখার মধ্যে পাওয়া যায়। সত্যিকারের আসল মাসেদোনিওকে খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর কথোপকথনে।

মাসেদোনিও অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন, থাকতেন বোর্ডিং হাউসে, একেক সময়ে একেক জায়গায়। এর কারণ তিনি সব সময় ভাড়া দেওয়ার প্রসঙ্গ এলেই কেটে পড়তেন। প্রতিবার এক জায়গা থেকে আরেকটা নতুন জায়গায় যাওয়ার সময় গাদায় গাদায় পাণ্ডুলিপি সব পড়ে থাকত আগের বোর্ডিং হাউসে। একবার তাঁর বন্ধুরা এটা নিয়ে তাঁকে বেশ বকাঝকা করেছিলেন, বলেছিলেন যে এভাবে এত লেখা হারিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা খুবই খারাপ। তিনি আমাদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের কি ধারণা যে আমি যথেষ্ট ধনী যে সব হারিয়ে ফেলছি?’

যাঁরা হিউম এবং শোপেনহাওয়ার পড়েছেন, তাঁদের কাছে মাসেদোনিওর রচনায় নতুন করে কিছু পাওয়ার নেই, কিন্তু উল্লেখযোগ্য ব্যাপারটা হলো এ ব্যাপারে শেষ কথাটা তিনি নিজেই নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন। পরে তিনি আগ্রহ সহকারে হিউম, শোপেনহাওয়ার, বার্কলি এবং উইলিয়াম জেমস পড়েছিলেন, কিন্তু আমার সন্দেহ হয় যে অন্যদের লেখা তিনি তেমন একটা পড়েননি, আর সব সময় একটা লেখকদের উদ্ধৃতিই দিতেন তিনি। তাঁর কাছে স্যার ওয়াল্টার স্কট ছিল শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, হয়তো ছোটবেলায় পড়ে যে মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল তা থেকে আর বের হতে পারেননি। একবার উইলিয়াম জেমসের সঙ্গে তাঁর পত্রমিতালী গড়ে উঠেছিল, যাঁকে তিনি ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসি মেলানো এক ভাষায় চিঠি লিখতেন, এর জন্য ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন যে ‘এই তিনটি ভাষা আমি এত কম জানি যে আমাকে অনবরত এ ভাষা থেকে ও ভাষায় গিয়ে শব্দ খুঁজতে হয়।’ আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, মাসেদোনিওর লেখা এক কি দুই পৃষ্ঠা পড়ার পর ভাবনারা এসে জড়ো হয়। তিনি বারংবার বলেন যে স্বপ্নের মতোই আমাদের নির্মাণ, কিন্তু এটা তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে আমরা সবাই একটা স্বপ্নের পৃথিবীতে বাস করছি। সত্যের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে কি না এ নিয়ে মাসেদোনিওর সংশয় ছিল। তাঁর ধারণা, কতিপয় দার্শনিক সেটা আবিষ্কার করেছেন, যদিও কিন্তু তাঁরা ওটার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন সম্পূর্ণরূপে। যদিও পাশাপাশি তিনি বিশ্বাস করতেন, জাগতিক সব কিছু এবং নিজেকে ও নিজের খোঁজকে ভুলে গিয়ে যদি তিনি পাম্পাসে গিয়ে শুয়ে বসে থাকতে পারেন তাহলে হয়তো হঠাৎ সত্য এসে তাঁর দেখা দেবে। তিনি আরো বলেছেন, হঠাৎ দেখা পাওয়া ওই প্রজ্ঞাকে ব্যাখ্যা করা অবশ্যই অসম্ভব।

জ্ঞানী-গুণী প্রতিভাবান ব্যক্তিদের মুখের ছোট ছোট কথাবার্তা সব জড় করে লিখে রাখার একটা শখ ছিল মাসেদোনিওর। এরকমই একটা নোটে আমি রীতিমতো অবাক হয়ে আমাদের পরিচিত এক মিষ্টি স্বভাবের মহিলার নাম দেখলাম। তার নাম ছিল কিকা গোনসালেস্ আচা দে টমকিনসন আলবেয়ার। আমি মুখ হাঁ করে মাসেদোনিওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। হিউম এবং শোপেনহাওয়ারের নামের সঙ্গে কিকা, ওই মহিলার নাম কিভাবে আসে সেটা আমার বোধগম্য নয়। কিন্তু মাসেদোনিও বললেন, ‘দার্শনিকরা বিশ্বটাকে উপলব্ধি এবং ব্যাখ্যা করার চেষ্টাটা করে গেছেন, আর কিকা সহজেই ওটা বুঝে, অনুভব করে।’ তিনি কিকাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কিকা, অস্তিত্ব কি?’ কিকা উত্তর দেয়, ‘আমি জানি না তুমি কি বলছ, মাসেদোনিও।’ দেখলে, মাসেদোনিও আমাকে বলেন, ‘সে এতটাই সঠিকভাবে বুঝে যে সে এমনকি এটাও বুঝতে পারে না যে আমরা ধাঁধায় পড়ে আছি।’ কিকা যে একজন প্রতিভাবান নারী, এ কথাই সেটা প্রমাণ করে তাঁর কাছে। পরে আমি যখন তাঁকে বললাম যে আপনি তো একটি শিশু বা বিড়ালের ব্যাপারেও একই কথা বলতে পারেন, তখন মাসেদোনিও রেগে যান। মাসেদোনিওর সঙ্গে পরিচয়ের আগে আমি বরাবর ছিলাম এমন এক পাঠক যে যেকোনো কিছু পড়লেই সেটা বিশ্বাস করে ফেলে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব পড়া উচিত_এ ধারণাটা আমার মধ্যে পুঁতে দেন মাসেদোনিও, আমার জন্য এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় উপহার। শুরুতে আমি তাঁকে পুরোপুরি নকল করে এটা-ওটা লিখেছি, তাঁর শৈলী ও আঙ্গিকগত কিছু বৈশিষ্ট্য আমার মধ্যে এসে গিয়েছিল, যার জন্য পরবর্তী সময়ে আমার অনেক অনুশোচনা হয়েছে। এখন পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলে মাসেদোনিওকে মনে হয় স্বর্গোদ্যানে কিংকর্তব্যবিমূঢ় এক আদম। বিস্ময় জাগানিয়া প্রতিভা নিয়ে তিনি আজও আছেন আমাদের মাঝে, কিন্তু তাঁর রচনার সামান্যই আজ পড়া হয়; তাঁর প্রভাবটা অনেকটা সক্রেটিস ধাঁচের। আমি তাঁকে আসলেই ভালোবাসতাম, পূজাই করতাম বলা চলে।

১৯২১ থেকে ১৯৩০_এই সময়টা ছিল সৃষ্টিশীলতার দিক থেকে বেশ বড় একটা অধ্যায়। কিন্তু বোধকরি এর বেশির ভাগই ছিল বাঁধভাঙা আবেগী এবং এমনকি অর্থহীন। কম করে হলেও সাতটি বই রচনা ও প্রকাশ করেছিলাম এই সময়টায়_এদের চারটি বই প্রবন্ধের আর বাকি তিনটি কবিতার। পাশাপাশি তিনটি ম্যাগাজিনও বের করেছিলাম আর ডজনখানেক শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা যেমন লা প্রেন্সা, নোসোত্রোস, ইনিসিয়াল, ক্রিতেরিও এবং সিন্তেসিসর জন্য প্রায়ই এটা-ওটা লিখেছি। এত লেখা কিভাবে লিখলাম সেটা ভাবলেই অবাক হতে হয়। কারণ ওই সময়ে লেখা রচনাগুলোর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অনেক দূরের। চারটি প্রবন্ধ বইয়ের তিনটি_যেগুলোর নাম আর মনে না করাই ভালো_আমি আর দ্বিতীয়বার ছাপাতে দিইনি। ঘটনাবশত ১৯৫৩ সালে আমার বর্তমান প্রকাশক এমেসে যখন আমার ‘সমগ্র রচনা’ বের করার প্রস্তাব দিল, একমাত্র এই কারণে আমি তাদের প্রস্তাবে সায় দিলাম। আমার ওইসব অসংগত রচনাগুলো থাকতে পারবে না। আমার এখন মার্ক টোয়েনের কথা মনে পড়ছে, যিনি একবার বলেছিলেন যে একটা ভালো পাঠাগারের সূচনা হতে পারে। এর সংগ্রহ জেন অস্টেনের বইগুলো না রেখেও এবং এমনকি ওই পাঠাগারে যদি একটাও কোনো বই না থাকে তাও ভালো, এই কারণে যে অন্তত জেন অস্টেনের বইগুলো তো বাদ গেল।

এই সময়কালের কবিতাগুলোর মধ্যে আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থটিও বোধকরি বাদ দেওয়া উচিত ছিল। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত লুনা দে এনফ্রেন্তে (মুন অ্যাক্রস দ্য ওয়ে) নামের এই কাব্য সংকলনটি একেবারে দেশজ রূপ-রস-গন্ধে ভরা। উনবিংশ শতাব্দীর চিলিয়ান রীতিতে আমার প্রথম নাম ঔড়ৎমব’র বানান ‘ঔড়ৎলব’ করে ছেপেছিলাম বইটি যা একটি ছেলেমানুষি বই আর কিছুই নয়। স্প্যানিশ প্রমিত বানান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটা বৃথা চেষ্টা আর কি! বইটির পরবর্তী সংস্করণে আমি সবচেয়ে বাজে কবিতাগুলো বাদ দিয়ে দিলাম, খামখেয়ালি ভাবকে ছেঁটে কেটে ফেলে অনেক বিয়োজন ও সম্পাদনার পর কবিতাগুলোকে একটি মার্জিত রূপে নিয়ে আসলাম। এ সময়কালের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থটিতে (কুয়াদের্নো সান মার্তিন শিরোনামের) বেশ ভালো কিছু কবিতা ঠাঁই পেল, যেমন লা নোচে কে এন এল সুর লো বেলারোন, যে নামটি রবার্ট ফিটজেরাল্ড চমৎকারভাবে ইংরেজিতে ডেথওয়াচ অন দ্য সাউথসাইড নামে অনুবাদ করেছেন। আর ছিল মুয়ের্তেস দে বুয়েনোস আইরেস (ডেথস অব বুয়েনোস আইরেস)। যে কবিতাটি আর্জেন্টিনার রাজধানীর দুইটি প্রধান কবরস্থান নিয়ে লেখা। বইটির একটি কবিতা (আমার পছন্দের তালিকায় এটি নেই) কেমন করে জানি আর্জেন্টিনায় বেশ সাড়া ফেলে দিয়ে ক্ল্যাসিকে পরিণত হয়েছে : ‘দি মিথিক্যাল ফাউন্ডিং অব বুয়েনোস আইরেস।’ এই বইটিও পরিমার্জিত বা পরিশুদ্ধ করা হয়েছে, বছরের পর বছর ধরে নানা বিয়োজন ও সংশোধনের পর।

১৯২৯ সালে আমার তৃতীয় প্রবন্ধ সংকলনটি এক হাজার পেসো মূল্যমানের দ্বিতীয় মিউনিসিপ্যাল পুরস্কারে ভূষিত হয়, ওই সময়ে যে অর্থ বেশ অনেকখানি। ওই অর্থের একটি পরিমাণ দিয়ে আমি এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকার একাদশ সংস্করণের একটি পুরনো সেট কিনলাম। আর বাকিটা আমার এক বছর নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দেওয়ার যোগান করে দিল এবং আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আর্জেন্টিনার কিছু নিয়ে ব্যাপক আকারে একটি দীর্ঘ বই লিখব। আমার মা চাইলেন আমি আস্কাবুসি, আলমাফুয়ের্তে কিংবা লুগোনেস_এই তিন গুরুত্বপূর্ণ কবির যেকোনো একজনকে নিয়ে লিখি। আজ মনে হচ্ছে, সেটা করলেই হতো। বরং আমি এবারিস্তো কাররিয়েগো নামের প্রায় এক অখ্যাত কবিকে নিয়ে লিখলাম। আমার মা ও বাবা বললেন যে, তাঁর কবিতা তো ভালো না। ‘কিন্তু তিনি আমাদের বন্ধু এবং প্রতিবেশী’ আমি বললাম। ‘ভালো, তুমি যদি মনে কর এই কারণে তাঁকে বিষয় করে একটি বই লেখা যায়, তাহলে লেখো,’ তাঁরা বললেন। পরিত্যক্ত জীর্ণশীর্ণ শহরতলি_আমার শৈশবের পালের্মোকে কেন্দ্রে রেখে যে সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব এ ব্যাপারটা কার্বিয়েগোই চিহ্নিত করেছিলেন। ট্যাংগো নাচ ও সংগীতের বেড়ে ওঠার মতোই তাঁর জীবন ও জীবিকা আমোদ-ফুর্তিতে মেতে ওঠা, দুঃসাহসিক, শুরুতে নির্ভীক যা পরে সেন্টিমেন্টাল হয়ে ওঠে। ১৯১২ সালে, মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে, যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান_ একটামাত্র বই লিখে। ওই বইয়ের একটা কপির কথা আমার মনে আছে, আমার বাবার সংগ্রহে ছিল। আমরা জেনেভায় যাওয়ার সময় যেসব আর্জেন্টাইন বই নিয়ে গিয়েছিলাম সঙ্গে করে তার মধ্যে ছিল ওটা, যা আমি ওখানে বারবার পড়েছি। ১৯০৯ সালে কার্বিয়েগো আমার মাকে একটি কবিতা উৎসর্গ করেন। আসলে আমার মায়ের ফটো অ্যালবামে কবিতাটি লিখে দিয়েছিলেন। ওটাতে তিনি আমার কথা উল্লেখ করেছিলেন: চাইব... তোমার ছেলে... আরো এগিয়ে যাক, উৎসাহের বিশ্বস্ত পাখনায় ভর দিয়ে, এক পূর্ববার্তা নিয়ে, উত্তুঙ্গ আঙ্গুর থেকে একদিন সে যেন সংগীতের সুরা ফলায়।’ কিন্তু আমি যখন বইটা লেখা শুরু করলাম তখন আমার ক্ষেত্রে একই ব্যাপার ঘটল_ যেমনটা ফ্রেডরিক দ্য গ্রেট লিখতে গিয়ে কার্লাইলের হয়েছিল। যতই লিখছিলাম, ততই আমার রচনার নায়ককে ভুলে যাচ্ছিলাম। একেবারে সোজাসাপ্টা একটা জীবনী লিখতে শুরু করে মাঝপথে এসে বারংবার চলে যাচ্ছিলাম পুরনো বুয়েনেস আয়ারেসে, যাবতীয় কৌতূহল নিয়ে। পাঠকরা ওটা পড়তে শুরু করলে বেশিদূর যেতে হয় না এটা বুঝতে যে, বইটির নাম এবারিস্তো কার্বিয়েগোর সঙ্গে এর ভেতরের তেমন কোনো যোগসূত্র নেই, এ বইটার সুরে ছন্দপতন ঘটে। ১৯৫৫ সালে, পঁচিশ বছর পর যখন এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয় আমার রচনাসমগ্রের চতুর্থ খণ্ড হিসেবে, তখন আমি আরো কিছু নতুন অধ্যায় সংযোজন করে বইটির কলেবর বৃদ্ধি করি। যাতে হিস্ট্রি অব ট্যাংগো নামে একটি অধ্যায় ছিল। এই সংযোজনের কারণে আমার বিশ্বাস এবারিস্তো কার্বিয়েগো বইটিতে বাড়তি ভালো কিছু পাওয়া যায়।

ওই বছরগুলো ছিল বেশ সুখের; কেননা অনেক বন্ধুত্ব জুটেছিল আমার। নোরাহ ল্যাঞ্জ মাসেদোনিও, পিনিয়েরো এবং আমার বাবার বন্ধুত্বের কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। আমাদের সবার কাজের পিছনে একটা নিষ্ঠা ছিল; আমাদের মনে হচ্ছিল আমরা গদ্য ও পদ্য দুটোকেই নতুন করে সাজাচ্ছি। আর সব তরুণের মতন আমিও, অবশ্যই, যতটা অসুখী থাকা যায় সেই চেষ্টা করছিলাম_ হ্যামলেট ও রাস্কোলনিকভ এ দুই চরিত্রকে জড়ো করলে যা হয় সেরকম কিছু একটা। আমরা যা অর্জন করেছিলাম সেটা ভালো কিছু না, কিন্তু আমাদের সহমর্মিতা ও বন্ধুত্ব টিকে ছিল।

১৯২৪ সালে, আমি দুই ধারার সাহিত্য গোষ্ঠীর মধ্যে গিয়ে পড়লাম। একটা ধারা, যেটার স্মৃতি মনে করে আজো আমি আনন্দিত হয়ে উঠি, ছিল রিকালদো গুইলারদেসর। যিনি তখনো দোন সেগুন্দো সোম্ব্রা লেখেননি। গুইরালদেস আমার প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন। আমি তাঁকে হয়তো একটা বেশ জবরজং কবিতা দিলাম আর তিনি সেটা একেবারে ছত্র ছত্র ধরে পড়ে বলে দিতেন যে, আমি কী বলতে চাইছি; কিন্তু সাহিত্যিক অদক্ষতার কারণে সেটা বলতে পারছি না ঠিকভাবে। তারপর তিনি অন্যদের সঙ্গে কবিতাটি নিয়ে কথা বলতেন_ যাঁরা তাঁর আলোচনা শুনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতেন যে, ওই বিষয়গুলো তো তারা পড়ে বুঝতে পারেননি। অন্য ধারার গোষ্ঠীটি, যার জন্য আমার অনুশোচনাই হয়, সেটি ছিল মার্তিন ফিয়েররো সাময়িকীর। মার্তিন ফিয়েররো যে ধারার সাহিত্য চর্চা করত সেটা আমার মোটেই পছন্দ ছিল না। তাদের বক্তব্য ছিল ফরাসি এ ভাবধারার যে, সাহিত্য প্রতিনিয়তই পুনর্জাগরিত হচ্ছে। আদম প্রতিদিন সকালেই নতুন করে জন্ম নিচ্ছেন এবং এ ধারণা যে, সাহিত্য মানেই প্যারিস, ওখানেই সব, আমাদের উচিত হবে ওদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এবং ওদেরকে অনুসরণ করা। এ দুই ধারার কারণে একটি সাহিত্যিক কলহ দানা মেলল বুয়েনেস আয়ারেসে_ফ্লোরিদা আর বোয়েদোর মধ্যে। একদিকে ফ্লোরিদা হলো শহরের ধনী কেন্দ্রভাগকে প্রতিনিধিত্ব করছে আর অন্যদিকে বোয়েদো হলো প্রোলেতারিয়েত। আমি বোয়েদো গোষ্ঠীর মধ্যেই থাকার পক্ষপাতী, কেননা পুরনো শহরতলী, এর উত্তরভাগ, বস্তি, দুঃখ-দুর্দশা এবং সূর্যাস্ত নিয়েই আমি লিখছিলাম। কিন্তু দুই ষড়যন্ত্রকারী দলের একজন করে এসে আমাকে জানাল_ ফ্লোরিদার এনেস্তো পালাসিও এবং বোয়েদোর রোবের্তো মারিয়ানি_ যে আমি নাকি ফ্লোরিদা যোদ্ধাদের একজন হয়েই আছি এরই মধ্যে, এখন আর আমার ভেবে লাভ নেই, যা দেরি হওয়ার হয়েই গেছে, চাইলেও এখন আর অন্য দলে যাওয়ার উপায় নেই। পুরো ব্যাপারটাই ছিল গোলমেলে, যে যার মতো করে ঘট পাকাচ্ছিল। কয়েকজন লেখক ছিলেন দুই গোষ্ঠীরই_যেমন রোবের্তো আর্লত্ এবং নিকোলাস ওলিবারি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশ্বাসপ্রবণ পণ্ডিতরা এ কলহটাকে নিয়ে এখন অনেক গবেষণা করেন। কিন্তু আদতেই ওটা ছিল কিছুটা পাবলিসিটি আর কিছুটা ছেলেমানুষি।

এ সময়ের সঙ্গে আরো জড়িয়ে আছে সিলবিনা ও বিক্তোরিয়া ওকাম্পোর নাম। আরো ছিলেন কবি কার্লোস মাস্ত্রোনার্দি, এদুয়ার্দো মাইয়েআ এবং বিশেষ করে আলেহান্দো শুল সোলার। সোজাসাপ্টাভাবে বলতে গেলে, বলা যায় যে, শুল_যিনি ছিলেন মরমী কবি ও চিত্রশিল্পী, হলেন আমাদের উইলিয়াম ব্লেক। একই সময়ে, আলফোনসো রেয়েসর সঙ্গেও আমার পরিচয় হয়েছিল। আর্জেন্টিনায় মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত ছিলেন তিনি এবং প্রতি রবিবার আমাকে তাঁর দূতাবাসে রাতের আহারের নিমন্ত্রণ জানাতেন। আমার মতে রেয়েস এ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ গদ্যশিল্পী এবং আমার রচনার সাদাসিধেভাবে, ঋজুতার অনেকটুকু তাঁর কাছ থেকেই শেখা।

আমার জীবনের এই পর্বটাকে এক কথায় হাজির করতে গিয়ে আমি সেই সময়ের উদ্ধত সেই তরুণের কথা ভেবে কোনো অনুকম্পাই বোধ করছি না। ওই বন্ধুরা, আজো দিব্যি আছেন এবং আমার সঙ্গে তাঁদের সুসম্পর্ক আজো বিদ্যমান। সত্যি কথা বলতে কি, তাঁরা আমার এক অমূল্য অংশ। বন্ধুত্ব, আমার ধারণা, একটি দুঃখমোচনীয় আর্জেন্টাইন প্যাশন।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭২_এই পাঁচ বছর বুয়েনস আয়ার্সে ছিলেন নরম্যান টমাস ডি জোভানি্ন, যার ফলে বিশ্বসাহিত্যের ভাণ্ডারে যোগ হয়েছে হোর্হে লুই বোর্হেসের রচনার অনবদ্য কয়েকটি ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ। নিজ জীবন নিয়ে কোনো কিছু লেখার কোনো রকম আগ্রহ কোনো দিনই ছিল না বোর্হেসের। এই নরম্যানই তাঁকে বাধ্য করেন সেই কাজে, যার ফসল ইংরেজিতে লেখা ২০ হাজার শব্দের আত্মজৈবনিক রচনা। বোর্হেসের পারিবারিক ও ব্যক্তিজীবনের এই দলিলখানা উপহার দেওয়ার জন্য নরম্যান টমাস ডি জোভানি্নর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

হোর্হে লুই বোর্হেস ও নরম্যান টমাস ডি জোভানি্ন রচিত মূল ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন: রাজু আলাউদ্দিন ও রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন