সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

হারুকি মুরাকামি'র গল্প : শেহেরজাদ

অনুবাদ : রওশন জামিল

প্রতিবার সঙ্গমের পর হাবারাকে অদ্ভুত আর জমাট গল্প শোনাত মেয়েটা। ‘সহস্র এক রজনী’র রানি শেহেরজাদের মতো। যদিও সম্রাট যা করেছিলেন, পরদিন সকালে হাবারার সেভাবে ওর গর্দান নেওয়ার কোন পরিকল্পনাই ছিল না। (এমনিতেও মেয়েটা কখনই ওর সঙ্গে সকাল অবধি থাকে না।) মেয়েটা গল্পগুলো হাবারাকে বলার কারণ, ঠিক ওটাই চেয়েছিল সে। হাবারা অনুমান করত, মিলনের পর নিস্তেজ, একান্ত ওই মুহূর্তগুলোতে মেয়েটা বিছানায় গুটিসুটি মেরে পুরুষের সঙ্গে কথা বলে মজা পেত। তাছাড়া, ও বোধহয় সুখও দিতে চেয়েছিল হাবারাকে, কেননা তাকে সবসময় ঘরে বন্দি থাকতে হতো।


এজন্যই, হাবারা মেয়েটির নাম রেখেছিল শেহেরজাদ। ওই নাম ধরে কখনও ওকে ডাকেনি সে, তবে নিজের ক্ষুদ্র ডায়েরিতে ওভাবেই মেয়েটার উল্লেখ করেছিল। ‘আজ শেহেরজাদ এসেছিল,’ বলপেনে আঁচড় কেটেছে সে। তারপর দিনের ঘটনা সংক্ষেপে সহজ, সাংকেতিক ভাষায় এমনভাবে লিখেছে যা ডায়েরিটার ভবিষ্যৎ পাঠককে নির্ঘাত হতবুদ্ধি করবে।

হাবারা জানে না ওর গল্পগুলো সত্যি, না বানানো, নাকি খানিক সত্যি আর খানিক বানানো। তার এটা বলার কোনো উপায় নেই। মেয়েটার কাহিনীগুলো বাস্তবতায় আর অনুমানে, পর্যবেক্ষণে আর নিখাদ কল্পনায় কেমন যেন তালগোল পাকান। হাবারা তাই শিশুর মতো উপভোগ করে ওগুলো, অহেতুক প্রশ্ন না করে। এসব গল্প মিথ্যে বা সত্যি, বা এই দুয়ের জটিল জোড়াতালি হলেও কী এমন ইতরভেদ হতে পারে ওর জন্য?

ব্যাপার যা-ই হোক, গল্প বলার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে শেহেরজাদের যা মন ছুঁয়ে যায়। কাহিনীটা যেমনই হোক না কেন, তাকেই ও আকর্ষণীয় করে তোলে। ওর কণ্ঠস্বর, ওর বিরাম, ওর গতি সবকিছুই নিখুঁত। শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করে ও, লোভাতুর করে তোলে তাকে, আঁচ-অনুমানে বাধ্য করে, এবং তারপর, সবশেষে, যা খুঁজছিল শ্রোতা ঠিক সেটাই তাকে দেয়। বিমুগ্ধ হাবারা, মুহূর্তের জন্য হলেও, চারপাশের বাস্তবতা ভুলে যেতে পারে। ভেজা ন্যাকড়ায় মোছা ব্ল্যাকবোর্ডের মতো, সে দুশ্চিন্তা, অপ্রীতিকর স্মৃতিলুপ্ত হয়। এরচেয়ে বেশি কী-বা চাওয়ার থাকতে পারে? জীবনের সন্ধিক্ষণে, অন্য যে-কোনকিছুর চেয়ে এধরনের বিস্মৃতিই হাবারা আকাঙ্ক্ষা করে বেশি।

শেহেরজাদের বয়স পঁয়ত্রিশ, হাবারার চেয়ে চার বছরের বড়, দুটো সন্তান, প্রাথমিক স্কুলে পড়ে, পুরো দস্তুর গিন্নি (যদিও সে একজন রেজিস্টার্ড নার্স এবং মাঝে-মধ্যে ডাক পড়লে কাজে যায়)। স্বামীটা মার্কামারা গোবেচারা। হাবারার বাড়ি থেকে ওদেরটা গাড়িতে কুড়ি মিনিটের পথ। নিজের সম্পর্কে সব মিলিয়ে (বা এটুকুই) তথ্য হাবারাকে দিয়েছিল ও। সত্যতা যাচাইয়ের কোন উপায় ছিল না হাবারার, তবে সন্দেহ করার মতো কারণও খুঁজে পায়নি। মেয়েটা কখনও নিজের নাম বলেনি। ‘তোমার তা জানার দরকার নেই, আছে কি?’ জিজ্ঞেস করেছিল শেহেরজাদ। হাবারাকেও কখনও নাম ধরে ডাকেনি, যদিও সে ওটা ঠিকই জানত। সতর্কতার সঙ্গে নাম এড়িয়ে গেছে ও, যেন নামটা ওর ওষ্ঠ অতিক্রম করা অমঙ্গলের বা অসঙ্গত হবে।

বাইরে, অন্তত, ‘সহস্র এক রজনী’র অপরূপা রানির সঙ্গে এই শেহেরজাদের কোনই মিল নেই। প্রায় মাঝবয়সী, থলথলে একটা ভাব এসে গেছে এরই মধ্যে, কপোল আর চোখের নিচে বলিরেখার জাল। ওর কেশবিন্যাস, ওর প্রসাধন, ওর পোশাকের বাহার ঠিক উগ্র নয়, কিন্তু তাই বলে ওগুলো প্রশংসা পাবে এমন মনে হয় না। ওর মুখশ্রী জৌলুসহীন হীন নয়, কিন্তু চেহারা নজর কাড়ে না, তাই যে ছাপটা রেখে যায় সেটা নেহাত ঝাপসা। ফলে, রাস্তায় যারা হেঁটে যায় ওর পাশ দিয়ে, বা একই লিফটের যাত্রী হয়, তারা সম্ভবত সামান্যই খেয়াল করবে ওকে। দশ বছর আগে, হয়ত প্রাণবন্ত, আকর্ষণীয় যুবতী ছিল ও; একাধিক মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার কারণ হয়েও থাকতে পারে। তবে, কোনো এক সময়ে, ওর জীবনের ওই অংশে পর্দা পড়ে গেছে এবং তা আবার ওঠার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

শেহেরাজাদে সপ্তাহে দু বার দেখতে আসে হাবারাকে। ধরাবাঁধা কোনো দিন নেই, তবে কখনই সপ্তাহের ছুটির দিনে আসে না। সন্দেহ নেই, বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে সময়টা কাটায়। বরাবর আসার এক ঘণ্টা আগে ফোন করে। বাজার করে স্থানীয় সুপারমার্কেটে, তারপর ওর ছোট, নীল মাজদার হ্যাচব্যাকে করে হাবারার কাছে নিয়ে আসে। একটু পুরোন মডেলের গাড়ি ওটা, পেছনের বাম্পার টোল খাওয়া, চাকাগুলো চিটচিটে কালো। ওই বাড়ির জন্য বরাদ্দ জায়গায় গাড়ি পার্ক করে, ব্যাগগুলো হাতে করে সামনের দরজায় এসে বেল বাজায়। হাবারা পিপহোল দিয়ে দেখে নেয় কে এসেছে, তারপর তালা খুলে চেনটা সরিয়ে ভেতরে আসার পথ করে দেয় ওকে। রান্নাঘরে সদাইপাতি আলাদা করে শেহেরজাদ, রেফ্রিজারেটরে সাজিয়ে রাখে। এরপর বসে পড়ে পরের সপ্তাহের বাজারের ফর্দ তৈরি করতে। খুব দক্ষতার সঙ্গে কাজগুলো করে ও, মুহূর্তের জন্য অকারণে নড়াচড়া আর বাক্যব্যয় না করে।

কাজ শেষ হওয়ার পর, শেহেরজাদ আর হাবারা নীরবে চলে যায় শোবারঘরে, অদৃশ্য কোন স্রোতের টানেই বুঝি-বা। দ্রুত জামাকাপড় খসায় শেহেরজাদ এবং তারপর, এখনও কথা নেই মুখে, হাবারার সঙ্গে মিলিত হয় বিছানায়। সঙ্গমের সময়ে সামান্যই কথা বলে ও, প্রতিটি ক্রিয়া এমন যান্ত্রিকভাবে সম্পন্ন করে যেন ডিউটি করছে। যখন পিরিয়ডের সময় হয়, লক্ষ্যসিদ্ধির জন্য ও নিজের হাত ব্যবহার করে। ওর নিপুণ, সযত্ন ভঙ্গি হাবারাকে মনে করিয়ে দেয় শেহেরজাদ একজন লাইসেন্সধারী নার্স।

মিলনশেষে বিছানায় শুয়ে গল্প করে ওরা। আরও সঠিকভাবে বললে, শেহেরজাদ কথা বলে, আর হাবারা শোনে, কখনও এখানে একটা লাগসই শব্দ যোগ করে, কখনও ওখানে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। যখন বিকেল সাড়ে-চারটা ঘোষণা করে ঘড়িটা, গল্পে ছেদ টানে শেহেরজাদ ( কেন যেন, সবসময় মনে হত গল্পটা মাত্র চরমে পৌঁছুছে), একলাফে উঠে পড়ে বিছানা থেকে, তারপর জামাকাপড় গুছিয়ে নিয়ে বিদায়ের প্রস্তুতি নিত। রাতের খাবার তৈরি করার জন্য তাকে বাসায় যেতেই হচ্ছে, ও বলে।

হাবারা দরজা অবধি পৌঁছে দেয় ওকে, শেকলটা উঠিয়ে রাখে যথাস্থানে, তারপর মলিন নীল রঙের ছোট্ট গাড়িটার যাওয়া লক্ষ করে পর্দার ফাঁক দিয়ে। ঠিক ছটায়, সাদামাঠা ডিনার তৈরি করে হাবারা একাই খাওয়া সারল। একসময়ে ও বাবুর্চির কাজ করেছে, তাই একপ্রস্থ খাবার তৈরি ওর জন্য তেমন কঠিন কিছু নয়। খাবারের সঙ্গে পেরিয়ার পান করল সে (জীবনে সে মদ ছোঁয়নি), তারপর একটা ডিভিডি দেখতে দেখতে বা কোনকিছু পড়তে পড়তে কফিতে চুমুক দিতে লাগল। ওর পছন্দ মোটা বই, বিশেষ করে যেগুলো বোঝার জন্য কয়েকবার পড়তে হয়। এগুলোর বাইরে করার মতো ওর বিশেষ কিছু নেই। কথা বলার জন্য কেউ নেই। ফোন করার জন্য কেউ নেই। কম্প্যুটার না থাকায় ইন্টারনেটে যাওয়ারও উপায় নেই। খবরকাগজ দেয়া হয় না। এবং সে কখনই টেলিভিশন দেখে না। (ওটা দেখার জন্য উপযুক্ত কারণ নেই।) বলা বাহুল্য, হাবারার বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। কোনো কারণে শেহেরজা্দের আগমন যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাকে একাই থাকতে হবে।

সম্ভাবনাটা নিয়ে হাবারা তেমন উদ্বিগ্ন হয় না। যদি একান্তই সেরকম কিছ ঘটে, ভাবল ও, ব্যাপারটা কঠিন হবে, তবে একভাবে না একভাবে আমি একাই চালিয়ে নেব। আমি কোন মরুদ্বীপে আটকা পড়িনি। না, হাবারা ভাবল, আমি নিজেই একটা মরুদ্বীপ। ও সবসময় একলা থাকতে পছন্দ করে। তবে যেটা দুশ্চিন্তায় ফেলছে ওকে, তা হচ্ছে শেহেরজাদের সঙ্গে বিছানায় কথা বলতে না পারা। কিংবা, আরও সঠিকভাবে বললে, শেহেরজাদের গল্পের পরের কিস্তি শুনতে না পারা।

‘আর জন্মে আমি ল্যামপ্রে ছিলাম,’ একবার বিছানায় ওর পাশে শুয়ে বলল শেহেরজাদ। সরল, সোজাসাপ্টা মন্তব্য, এমন আলপটকা যেন ঘোষণা করেছে উত্তর মেরুর অবস্থান হচ্ছে দূর-উত্তরে। হাবারার সামান্যতম ধারণা ছিল না ল্যামপ্রে কী ধরনের মাছ, আরও কম জানত ওটা দেখতে কেমন। ফলে এব্যাপারে সুনির্দিষ্ট মতামত দেয়নি।

‘তুমি জান ল্যামপ্রে কীভাবে ট্রাউট ধরে খায়?’ শেহেরজাদ জিজ্ঞেস করে।

হাবারা জানত না। বলতে কি, এই প্রথম ও শুনছে ল্যামপ্রে ট্রাউট খায়।

‘ল্যামপ্রের চোয়াল নেই। ওটাই ওদেরকে অন্যান্য ঈল থেকে আলাদা করেছে।’

‘হাহ্? ঈলের চোয়াল আছে?’

‘তুমি কি কখনও একটাকেও ভালো করে লক্ষ করনি?’ বলল শেহেরজাদ, কণ্ঠস্বরে নিখাদ বিস্ময়।

‘ঈল খেয়েছি কখনও-সখনও, কিন্তু ওদের চোয়াল আছে কিনা দেখার সুযোগ হয়নি।’

‘সময় করে দেখ একবার। অ্যাক্যুয়ারিয়াম বা এধরনের কোন জায়গায় যেও। সাধারণ ঈলের দাঁতযুক্ত চোয়াল আছে। কিন্তু ল্যামপ্রের কেবল চোষক থাকে, যেটা ওরা ব্যবহার করে নদী বা লেকের তলদেশে পাথরখণ্ডের সঙ্গে নিজেদের আটকে রাখতে। তারপর ভেসে থাকে ওখানে, আগাছার মতো সামনে পেছনে দোলে।’

হাবারা কল্পনায় লেকের তলদেশে একঝাঁক ল্যামপ্রেকে আগাছার মতো দুলতে দেখল। দৃশ্যটাকে কেমন যেন বাস্তবতাবিবর্জিত মনে হয়, যদিও বাস্তবতা, ও জানে, অনেকসময় ভয়ানক অবাস্তব হয়ে থাকে।

‘ল্যামপ্রে ওভাবেই বাস করে, আগাছার ভেতর লুকিয়ে থাকে। বসে থাকে ঘাপটি মেরে। তারপর, মাথার ওপর দিয়ে যখন ট্রাউট সাঁতরে যায়, সবেগে ওপরে উঠে যায় ওরা, চোষক দিয়ে নিজেদের আটকে ফেলে ঈলটার সঙ্গে। চোষকের মধ্যে থাকে দাঁতাল জিহ্বার মত একটা জিনিস; ওটা ঘষে ঘষে মাগুরের পেট ফুটো করে ওরা, তারপর একটু একটু করে মাংস খেতে থাকে।’

‘আমার ট্রাউট হতে ভালো লাগবে না,’ হাবারা বলে।

‘রোমান যুগে, পুকুরে ল্যামপ্রের চাষ করত ওরা। উদ্ধত দাসদের নিক্ষেপ করা হতো পুকুরে, আর ল্যামপ্রেগুলো তাদের জীবন্ত ভক্ষণ করত।’

হাবারা অনুমান করল রোমানদের দাস হতেও তার ভালো লাগবে না।

‘আমি প্রথম ল্যামপ্রে দেখি প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময়ে, অ্যাকোরিয়ামে ক্লাস ট্রিপে,’ শেহেরজাদ বলল। ‘যে মুহূর্তে বর্ণনা পড়লাম ওরা কীভাবে বাস করে, আমি বুঝলাম আগের জীবনে আমি তা-ই ছিলাম। মানে, আমি সত্যি সত্যি মনে করতে পারলাম পাথরে সেঁটে রয়েছি, আগাছার ভেতর সংগোপনে দুলছি, আমার মাথার ওপর দিয়ে হৃষ্টপুষ্ট ট্রাউটের ভেসে যাওয়া লক্ষ করছি।’

‘ওদের খেয়েছ কিনা মনে করতে পার?’

‘না, পারি না।’

‘এটা একটা স্বস্তির ব্যাপার,’ হাবারা বলে। ‘কিন্তু তোমার ল্যামপ্রে জীবনের এইটুকুই কি তুমি মনে করতে পার--নদীর তলদেশে আগে পিছে দুলছ?’

‘আগের জীবনের কথা কেউ ওভাবে চাইলেই মনে করতে পারে না,’ শেহেরজা্দ বলল। ‘তোমার কপাল ভালো হলে, কেমন ছিল সেই জীবন বড়জোর তার একটা চকিত ছবি দেখতে পার। এটা দেয়ালের কোন ফুটোর ভেতর দিয়ে একঝলক দেখার মত। তুমি আগের জীবনের কোনকিছু কি মনে করতে পার?’

‘না, একদম না,’ হাবারা বলে। সত্যি বলতে, সে কখনও বিগত জীবনের স্মৃতিচারণ করার তাগিদ অনুভব করেনি। বর্তমানেরটা সামলাতেই তার প্রাণ ওষ্ঠাগত।

‘এখনও লেকের নিচেটা বেশ পরিপাটি বোধ হয়। পাথরে মুখ আটকে আমি চিত হয়ে মাথার ওপরে মাছের আনাগোনা দেখছি। একবার দাঁত কড়মড় করা এক কচ্ছপও দেখেছিলাম, প্রকা- কালো একটা অবয়ব, “স্টারওয়র্স”-এর দুষ্ট নভোযানের মতো, ভেসে যাচ্ছে। আকাশে লম্বা, তীক্ষè চঞ্চুর শাদা শাদা পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে; নিচে থেকে ওগুলো ভাসমান শাদা মেঘের মত দেখায়।’

‘তুমি এখন এর সবকিছু দেখতে পাচ্ছ?’

‘একেবারে দিনের মত পরিষ্কার,’ বলে শেহেরজাদ। ‘আলো, স্রোতের টান, সবকিছু। এমনকি কখনও কখনও কল্পনায় ওখানে ফিরেও যেতে পারি।’

‘তখন তুমি যেসব ভাবছিলে সেগুলো মনে করতে পার?’

‘হ্যাঁ।’

‘লামপ্রেরা কী নিয়ে ভাবে?’

‘ল্যামপ্রেরা ল্যামপ্রে-সদৃশ ভাবনা ভাবে। একেবারে ল্যামপ্রে-সদৃশ প্রেক্ষাপটে ল্যামপ্রে-সদৃশ বিষয় নিয়ে। সেসব ভাবনা প্রকাশ করার জন্য কোন ভাষা নেই। ওদের বাস জলের পৃথিবীতে। এটা অনেকটা আমাদের মাতৃগর্ভে থাকার মতো। সেখানে আমরা অনেককিছু ভাবি কিন্তু সেগুলো আমরা এখানে যে ভাষা ব্যবহার করি সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না। ঠিক কিনা?’

‘দাঁড়াও! গর্ভে থাকার অবস্থাটা তুমি মনে করতে পার?’

‘নিশ্চয়,’ শেহেরজাদ বলল, হাবারার বুকের ওপর দিয়ে তাকানোর জন্য মাথা উঁচু করেছে। ‘তুমি পার না?’

না, বলল হাবারা। সে পারে না।

‘ঠিকাছে সময় করে কখনও তোমাকে বলব আমি। গর্ভে থাকার জীবন কেমন।’

‘শেহেরজাদ, ল্যামপ্রে, বিগত জীবন’ এই কথাগুলো সেদিন ডায়েরিতে টুকে রাখল হাবারা । কেউ দেখলে শব্দগুলোর অর্থ বুঝবে এ বিষয়ে সে ঘোরতর সন্দিহান।


শেহেরজাদকে হাবারা প্রথম দেখে চারমাস আগে। টোকিওর উত্তরে এক প্রাদেশিক শহরের এই বাড়িতে ওকে স্থানান্তরিত করা হয়। শেহেরজাদের ভূমিকা ছিল ওর ‘সেবাদাসী’ হিশেবে কাজ করা। যেহেতু হাবারা বেরোতে পারত না, মেয়েটার দায়িত্ব ছিল ওর খাবার এবং অন্যান্য দরকারি জিনিসপত্র কিনে বাসায় নিয়ে আসা। হাবারা কী ধরনের বই, ম্যাগাজিন পড়তে চায় বা সিডি শুনতে চায়, সেগুলোর দিকেও নজর রাখত ও। এছাড়া, পাঁচমিশালি কিছু ডিভিডিও এনেছিল ও, তবে এই খাতে মেয়েটির পছন্দের মানদণ্ডটা মেনে নিতে হাবারেকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল।

ওর আগমনের এক সপ্তাহ পর, যেন কাজটা স্বতঃসিদ্ধভাবে পরের ধাপ, শেহেরাজদেহ্ ওকে বিছানায় নিয়ে গেল। হাবারা এসেই দেখেছিল বেডসাইড টেবলে কনডম রাখা। ও অনুমান করল মেয়েটার দায়িত্বের মধ্যে সেক্সও একটা--কিংবা ওরা ‘সেবা কাজ’ পরিভাষাও ব্যবহার করে থাকতে পারে। পরিভাষা যেটাই হয়ে থাক না কেন, আর মেয়েটার আগ্রহের কারণ যা-ই হয়ে থাক, হাবারা স্রোতে গা ভাসিয়েছিল এবং নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেছিল প্রস্তাবটা।

ওদের সেক্সটা ঠিক বাধ্যতামূলক ছিল না, আবার এটাও বলা যাবে না যে ওদের অন্তর এতে সম্পূর্ণ নিবেদিত ছিল। মেয়েটাকে মনে হয়েছিল সতর্ক, পাছে বেশি উৎসাহিত হয়ে ওঠে ওরা--ঠিক একজন ড্রাইভিং ইনস্ট্রাক্টর যেমন চান না তাঁর ছাত্র গাড়িচালানর জন্য বেশি অধীর হয়ে উঠুক। তবে এতকিছুর পরও, ওদের প্রণয়টা আপনারা যাকে বলেন কামার্ত তা না হলেও, একেবারে ব্যবসাসুলভ কাঠখোট্টাও ছিল না। হতে পারে কাজটা মেয়েটার একটা দায়িত্ব হিশেবে শুরু হয়েছিল (অথবা, নিদেনপক্ষে, এমন কিছু যাতে ব্যাপক উৎসাহ দেয়া হয়েছিল), কিন্তু, একটা পর্যায়ে গিয়ে মনে হল মেয়েটা--খুব সামান্য হলেও--মজা পেতে শুরু করেছে। হাবারা এটা টের পায় ওর শরীরী সাড়া থেকে, যে সাড়া তাকেও পুলকিত করে। শত হলেও, সে খাঁচায় পোরা বুনো জন্তু নয়, বরং নানান অনুভূতিসম্পন্ন একজন মানুষ। নিছক দৈহিক খাঁই মেটানোর যৌনতায় পরিপূর্ণ আনন্দ হয় না। তবে শেহেরজাদ ওদের যৌন সম্পর্ককে কতটা ওর দায়িত্বের অন্তর্গত, আর কতটা ওর ব্যক্তিজীবনের অংশ মনে করেছিল? হাবারা তা বলতে পারবে না।

অন্যান্য জিনিসের বেলায়ও কথাটা খাটে। প্রায়ই শেহেরজাদের মনোভাব ও উদ্দেশ্য বুঝতে বেগ পেত হাবারা। যেমন, বেশিরভাগ সময়ে ও সাধারণ সুতির প্যান্টি পরে। হাবারা ধারণা করে বয়স যখন ত্রিশের কোঠায় তখন গৃহবধুরা পরে থাকে এমনটা। অবশ্যি এটা ওর নিছক অনুমান। ওই বয়সের কোন গৃহবধুর সঙ্গে তার পরিচয় নেই। আবার কোন কোনদিন লেসযুক্ত রঙিন সিল্কের প্যান্টি পরত শেহেরোজাদেহ্। ও কেন এই দুটোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি করে সে ব্যাপারে হাবারার সামান্যতম ধারণা নেই।

আরো একটা বিষয় ওকে ধন্দে ফেলেছিল। ওদের সেক্স আর শেহেরজাদের গল্পের মধ্যে এমন আশ্চর্য মিল ছিল যে বোঝার জো থাকত না কোথায় একটার শেষ আর কোথায় অন্যটার শুরু। এর আগে তার এধরনের অভিজ্ঞতা হয়নি; মেয়েটাকে সে ভালোবাসে না একথা ঠিক, সঙ্গমটাও হয় যেন-তেন প্রকারের, তারপরও শেহেরজাদের সঙ্গে একটা প্রচণ্ড শারীরিক বন্ধন অনুভব করে হাবারা। এটা কেমন যেন গোলমেলে মনে হয়।

‘কিশোর বয়স থেকে আমি খালি বাড়িতে সিঁদ কাটতে শুরু করি,’ একদিন বিছানায় ওর পাশে শুয়ে বলল শেহেরজাদ।

হাবারা--বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যা হয়ে থাকে শেহেরজাদ গল্প বলার সময়--একথায় উপযুক্ত কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পেল না।

‘তুমি কখনও কারও বাড়িতে সিঁদ কেটেছ?’ শেহেরজাদ জিজ্ঞেস করে।

‘মনে হয় না,’ হাবারা জবাব দিল শুকনো গলায়।

‘একবার করলে ব্যাপারটা নেশায় পরিণত হয়।’

‘কিন্তু কাজটা তো বেআইনি।’

‘অবশ্যই। বিপজ্জনকও বটে, কিন্তু তারপরও তোমাকে টানবে।’

হাবারা নীরবে ওর কথার অপেক্ষায় থাকে।

‘সবচেয়ে মজা হল খালি বাড়িতে সিঁদা কাটা,’ শেহেরজাদ বলল। ‘একদম শুনসান। কোন সাড়াশব্দ থাকে না। যেন দুনিয়ার সবচেয়ে নীরব জায়গা ওটা। মানে, আমার কাছে এমনটাই মনে হয়। যখন মেঝেয় একদম নিঃসাড়ে বসে থাকি, ল্যামপ্রে হয়ে আমার জীবন ফিরে আসে আমার কাছে। তোমাকে তো বলেছি, না, আর জীবনে আমি ল্যামপ্রে ছিলাম, ঠিক?’

‘হ্যাঁ, বলেছ।’

‘ব্যাপারটি ঠিক ওরকমই। আমার শোষক পানির নিচে পাথরে আটকে রয়েছে, আর দেহটা ওপরে সামনে-পেছনে দুলছে, আমার চারপাশের আগাছার মত। সবকিছু নীরব-নিথর। অবশ্যি যেহেতু আমার কান ছিল না, সে কারণেও অমনটা মনে হয়ে থাকতে পারে। রোদেলা দিনে, সূর্যরশ্মি ওপর থেকে তীরের মত ধেয়ে আসছে নিচে। মাথার ওপরে রঙবেরঙের মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে। আমার মস্তিষ্ক চিন্তাশূন্য। মানে ল্যামপ্রের চিন্তা বাদে আরকি। চিন্তাগুলো ঘোলাটে তবে খাঁটি ছিল। থাকার জন্য চৎকার জায়গা ছিল ওটা।’

সে প্রথম কারও বাড়িতে সিঁদ কাটে, শেহেরজাদ ব্যাখ্যা করল, হাই স্কুলের একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে। ক্লাসের একটা ছেলের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। ঠিক সুদর্শন বলা যায় না ছেলেটিকে। লম্বা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ভালো ছাত্র, হাই স্কুলের ফটবল টিমে খেলত। ওর প্রতি শেহেরজাদ তীব্র আকর্ষণ বোধ করত। কিন্তু ছেলেটা স্পষ্টতই ক্লাসের আরেকটা মেয়েকে পছন্দ করত। এবং শেহেরজাদের দিকে ফিরেও তাকাত না। বলতে কি, ছেলেটা ওর অস্তিত্ব সম্পর্কেই সচেতন ছিল না এমনটা হওয়াও সম্ভব। তবু, ওর চিন্তা মন থেকে তাড়াতে পারত না শেহেরজাদ। ওকে দেখলেই তার হৃদ্স্পন্দন থেমে যায়; কখনও কখনও মনে হয় ভেতরের সবকিছু উগড়ে দেবে। কিছু একটা ব্যবস্থা না নিলে, শেহেরজাদ ভাবল, সে উন্মাদ হয়ে যাবে। তবে ভালোবাসার কথা কবুল করার প্রশ্নই ওঠে না।

একদিন, স্কুল পালিয়ে ছেলেটার বাড়িতে গেল শেহেরজাদ। ও যেখানে থাকে সেখান থেকে পনের মিনিটের হাঁটাপথ ওটা। ছেলেটার পরিবার সম্পর্কে আগেই খোঁজখবর নিয়েছিল। পাশের একটা শহরে ওর মা জাপানিজ ভাষা শেখান। বাবা একটা সিমেন্ট কোম্পানিতে কাজ করতেন, বেশ কয়েক বছর আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। বোনটা জুনিয়র হাই স্কুলে পড়ে। এর মানে দাঁড়ায়, দিনের বেলায় বাড়ি খালি থাকবে। অবাক কিছু নয়, সামনের দরজায় তালা ঝুলছিল। পাপোশের নিচে চাবি খুঁজল শেহেরাজাদে। এবং সত্যি সত্যি পেয়ে গেল। অন্যান্য আর দশটা মফস্বল শহরের মত ওদের আবাসিক এলাকাটাও নিরিবিলি, চুরি-চামারি তেমন হয় না। তাই প্রায়ই পাপোশের নিচে বা চারাগাছের টবে একটা বাড়তি চাবি রাখা থাকে।

সাবধানীর মার নেই, বেল বাজাল শেহেরজাদ, কেউ সাড়া দিচ্ছে না নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করল একটুক্ষণ, কেউ ওকে লক্ষ করছে কিনা বোঝার জন্য দ্রুত নজর বোলালো রাস্তায়, তারপর দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতর থেকে দরজাটা আবার বন্ধ করে দিল ও। জুতো খুলে প্লাস্টিকের একটা ব্যাগে পুরে, পিঠের ন্যাপস্যাকে রেখে দিল। তারপর পা টিপেটিপে উঠে গেল দোতলায়।

ছেলেটার শোবারঘর ওখানেই, যেমনটা অনুমান করেছিল ও। বিছানা পরিপাটি করে পাতা। বুকশেলফে একটা ছোট স্টিরিও আর কয়েকটা সিডি। দেয়ালে, বার্সেলোনা ফুটবল টিমের ছবি সংবলিত ক্যালেন্ডার। আর এর পাশেই, টিমের ব্যানার জাতীয় একটা কিছু টানান। আর কিছু নেই। না পোস্টার, না ছবি। স্রেফ ঘিয়েরঙা ফক্ফকে দেয়াল। জানালায় শাদা পর্দা ঝুলছে। গোছান কামরা, সবকিছু জায়গামত। বইপত্র ছড়িয়ে নেই। মেঝেয় কাপড়চোপড়ও নেই। কামরাটা বাসিন্দার অতি যত্নবান ব্যক্তিত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে। কিংবা একজন মায়ের যিনি বাড়িঘর নিখুঁত রাখেন। অথবা দুজনেরই। বিষয়টা শেহেরজাদকে ভয় পাইয়ে দিল। কামরাটা বিশৃঙ্খল হলে, ওর কারসাজি চোখে পড়ত না। আবার, কামরার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, এর সুবিন্যস্ত শৃঙ্খলা ওকে আনন্দিত করল। ছেলেটা আদতেই এরকমই গোছাল।

আলগোছে নিচু হল শেহেরজাদ, ডেস্ক চেয়ারে বসে রইল কিছুক্ষণ। রোজ রাতে এখানেই লেখাপড়া করে ছেলেটা, ভাবল ও, হাতুড়ির ঘা পড়ছে বুকে। এক-এক করে ডেস্কে রাখা সামগ্রীগুলো তুলল ও, ঘোরালো আঙুলের ফাঁকে, গন্ধ শুঁকল, ঠোঁটের কাছে ধরল। ছেলেটার পেনসিল, ছেলেটার কাঁচি, ছেলেটার রুলার, ছেলেটার স্টেইপলার--তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিসগুলোই দ্যুতিমান হয়ে উঠল ওর কাছে। কারণ ছেলেটা ওগুলোর মালিক।

সাবধানে ডেস্কের দেরাজগুলো খুলল ও, ভেতরের জিনিসপত্র পরখ করল। একদম ওপরের দেরাজটা কয়েক অংশে বিভক্ত। প্রতিটা অংশে একটা ক্ষুদ্র ট্রেতে নানা ধরনের জিনিস আর স্মারকচিহ্ন ছড়ান ছিটান। দ্বিতীয় দেরাজের বেশিটাই ছেলেটা এমুহূর্তে যেসব ক্লাস নিচ্ছে সেগুলোর বইপত্তরে ঠাসা, আর একেবারে নিচেরটায় (সবচেয়ে গভীর যে দেরাজটা) স্তূপীকৃত পুরোন খবরকাগজ, নোটবুক আর পরীক্ষার খাতাপত্তর। প্রায় প্রতিটা জিনিসই স্কুল নয়ত ফুটবল সম্পর্কিত। ও আশা করেছিল ব্যক্তিগত কোনকিছু দেখতে পাবে--হয়ত ডায়েরি বা চিঠি--কিন্তু ডেস্কে তেমন কিছু ছিল না। এমনকি একটা ছবিও না। শেহেরজাদের কাছে এটা অস্বাভাবিক ঠেকল। স্কুল বা ফুটবলের বাইরে ওর কি কোন জীবন নেই? নাকি ব্যক্তিগত সবকিছু ও সতর্কতার সঙ্গে আড়াল করেছে, যেখানে কেউ সেটা দেখতে পাবে না?

তবু, স্রেফ ছেলেটার ডেস্কে বসে এবং তার হাতের লেখায় চোখ বুলিয়েই মুগ্ধ হয় শেহেরজা্দ। নিজেকে শান্ত করার জন্য চেয়ার ছাড়ল ও, মেঝেয় বসল। সিলিংয়ের দিকে তাকাল ও। চারপাশে পূর্ণ নীরবতা। আর এভাবেই, ল্যামপ্রের পৃথিবীতে ফিরে গেল ও।

‘অর্থাৎ,’ হাবারা জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কেবল ছেলেটার ঘরে ঢুকে ওর জিনিসপত্র ঘেঁটেছিলে, এবং মেঝেয় বসেছিলে?’

‘না,’ বলল শেহেরজাদ। ‘আরও আছে। আমি ওর কোন একটা জিনিস বাড়িতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। এমন কিছ যেটা ও রোজ নাড়াচাড়া করে বা একদম গায়ের সঙ্গে রাখে। কিন্তু সেটা এমন কিছু হওয়া চলবে যেটা না থাকলে ও টের পাবে। তাই ওর একটা পেনসিল চুরি করি আমি।’

‘মাত্র একটা পেনসিল?’

‘হ্যাঁ। যেটা ও ব্যবহার করত। কিন্তু শুধু চুরি করাই যথেষ্ট ছিল না। কারণ সেক্ষেত্রে ওটা একটা সাধারণ সিঁধেল চুরির ঘটনা হত। কাজটা আমার এই সত্যিটা চাপা পড়ত। শত হলেও, আমি ছিলাম প্রেমচোর।’

প্রেমচোর? হাবারার কাছে কথাটা কোন নির্বাক ছবির নামের মতো শোনায়।

‘তাই পেনসিলটার জায়গায় একটা কিছু রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। নিশান জাতীয় কোনকিছু। কাজটা আমি করেছি এর প্রমাণ হিশেবে। কাজটা স্রেফ চুরি নয়, বরং একধরনের বিনিময় এটা ঘোষণা করার জন্য। কিন্তু কী হতে পারে সেটা? মাথায় কোনকিছু খেলল না। আমার ন্যাপস্যাক আর পকেট আঁতিপাঁতি করেও কিছু পেলাম না। উপযুক্ত কিছু নিয়ে আসিনি বলে ধিক্কার দিলাম নিজেকে। শেষমেশ ঠিক করলাম একটা ট্যামপুন রেখে যাব। অবশ্যই যেটা ব্যবহার করা হয়নি, এবং তখনও প্লাস্টিক পেপারে মোড়ান রয়েছে। আমার পিরিয়ড ঘনিয়ে আসছিল, তাই নিরাপদ থাকার জন্য সবসময় সঙ্গে রাখছিলাম একটা। একদম নিচের দেরাজের পেছনে, যেখানে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখলাম জিনিসটা। আর এটাই জাগিয়ে তুলল আমাকে। মানে দেরাজের ভেতর লুকোনো ট্যামপুনটা আমার এই সত্যিটা। আর বোধকরি এতই জেগে উঠেছিলাম তখন যার ফলে একরকম এর পরপরই আমার পিরিয়ড শুরু হয়ে গেল।’

পেনসিলের বদলে ট্যামপুন, হাবারা ভাবল। আজ ডায়েরিতে বোধকরি এটাই তার লিখে রাখা উচিত: ‘প্রেমচোর, পেনসিল, ট্যামপুন।’ সে দেখতে চাইবে ওরা এর কী অর্থ করে!

‘ওর কামরায় বেশি হলে পনের মিনিট বা এরকম কিছু সময় ছিলাম। এর বেশি থাকতে পারিনি: ওটাই ছিল আমার কারও বাড়িতে সিঁদ কাটার প্রথম অভিজ্ঞতা। তাছাড়া ভয়ও পাচ্ছিলাম আমি থাকতে থাকতে কেউ এসে পড়তে পারে। সব পরিষ্কার নিশ্চিত হওয়ার জন্য নজর বোলালাম রাস্তায়, সন্তর্পণে দরজার বাইরে এসে তালা আটকে পাপোশের নিচে রেখে দিলাম চাবিটা। তারপর স্কুলে গেলাম। সঙ্গে ওর বহুমূল্য সেই পেনসিল ।’

চুপ করল শেহেরজাদ। হাবভাবে স্পষ্ট বোঝা যায় অতীতে ফিরে গেছে ও, এরপর যা যা ঘটেছিল সেগুলো একের পর এক দেখছে মনের পর্দায়।

‘আমার জীবনে ওই সপ্তাহটা ছিল সবচেয়ে সুখের,’ দীর্ঘ নীরবতার পর বলল ও। ‘পেনসিলটা দিয়ে নোটবুকে যা মনে এসেছিল তা-ই লিখেছি। ওটা শুঁকেছি, চুমু খেয়েছি, গালে ঘষেছি, আঙুলের ফাঁকে ঘুরিয়েছি। কখনও কখনও মুখে পুরে চুষেছি পর্যন্ত। একথা ঠিক, যত লিখছিলাম পেনসিলটা ততই ছোট হয়ে যাচ্ছিল বলে কষ্ট পাচ্ছিলাম ভীষণ, কিন্তু কিছুতেই নিজেকে সংবরণ করতে পারছিলাম না। যদি বেশি ছোট হয়ে যায়, ভাবলাম, আমি অনায়াসে ফিরে গিয়ে আরেকটা নিয়ে আসতে পারব। ওর ডেস্কে পেনসিল হোলডারে একগাদা পেনসিল রয়েছে। একটা খোয়া গেলে ও টেরও পাবে না। সম্ভবত এখনও দেরাজে লুকোনো ট্যামপুনটার হদিশ পায়নি। ভাবনাটা আমাকে ভীষণ শিহরিত করল--শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শিরশির অনুভূতি নেমে গেল নিচে। বাস্তব পৃথিবীতে ছেলেটা কখনও ফিরে তাকাবে না আমার দিকে, বা আমার অস্তিত্ব সম্পর্কে সে সজাগ এমন ইশারাও হয়ত দেবে না, এমন চিন্তা আমাকে এতটুকু বিচলিত করল না। কারণ আমি গোপনে ওর কিছু একটা--ওর অস্তিত্বের একটা অংশের দখল নিয়েছিলাম।’

দশদিন পর, আবার স্কুল পালালো শেহেরজাদ, ছেলেটার বাড়িতে দ্বিতীয়বারের মতো সিঁদ কাটল। তখন বেলা এগারটা। আগের মতই, পাপোশের নিচে থেকে চাবি বের করে দরজা খুলল ও। এবারও, ছেলেটার ঘর পরিপাটি করে গোছানো ছিল। প্রথমে, অনেকবার ব্যবহার করা যাবে এমন একটা পেনসিল বাছাই করল ও, সাবধানে নিজের পেনসিল বক্সে রাখল। তারপর আলগোছে শরীরটা এলিয়ে দিল ছেলেটার বিছানায়, হাত দুটো বুকের ওপর পরস্পর আলিঙ্গন করে আছে, দৃষ্টি ছাদের দিকে। এটাই সেই বিছানা যেখানে রোজ রাতে সে শোয়। ভাবনাটা চঞ্চল হয় ওর হৃদস্পন্দন, স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ফুসফুসে বাতাস ঢুকছে না, গলা হাড়, নিশ্বাস নিতে যন্ত্রণা হচ্ছে।

বিছানা ছাড়ল শেহেরজাদ, টানটান করল চাদর, তারপর--যা করেছিল পয়লা দফায়--বসে পড়ল মেঝেয়। ছাদের দিকে তাকাল ও। আমি এখনও ওর বিছানার লায়েক নই, শেহেরজাদ বলল নিজেকে। এটা সামলান এখনও যথেষ্ট কঠিন।

এই দফায়, ওই বাড়িতে আধঘণ্টা কাটালো শেহেরজাদ। দেরাজ থেকে টেনে বের করল ছেলেটার নোটবুক, পাতা উল্টে চোখ বোলালো। একটা বুক রিপোর্ট দেখতে পেয়ে পড়ল ওটা। রিপোর্টটা সোসেকি নাতসুমের উপন্যাস ককোরো সম্পর্কে। গরমের ছুটিতে বইটা পড়তে বলা হয়েছিল। চমৎকার হাতের লেখা ছেলেটার, সরাসরি ‘এ’ পাওয়া একজন ছাত্রের কাছে যেমন প্রত্যাশা করা হয়, কোথাও কোন ভুলভ্রান্তি নেই। ‘এক্সেলেন্ট’ গ্রেড পেয়েছে লেখাটা। এছাড়া আর কী-বা পেতে পারত ওটা? এমন নিখুঁত হাতের লেখার মোকাবেলায় যেকোন শিক্ষক আপনাআপনি ‘এক্সেলেন্ট’ গ্রেড দেবেন, তা তিনি লেখাটার এক লাইনও পড়ুন বা না পড়ুন।

দেরাজ আলমারির দিকে সরে গেল শেহেরজাদ, ভেতরের জামাকাপড় দেখল খতিয়ে। ছেলেটার আন্ডারওয়্যার আর মোজা। শার্ট এবং প্যান্ট। ফুটবল ইউনিফর্ম। সব নিখুঁতভাবে ভাঁজ করা। কোনটায় দাগ বা ছেঁড়া নেই। কাপড় ভাঁজ কি ও-ই করেছে? নাকি, যা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, ওর মা ভাঁজ করেছেন? ছেলেটার মায়ের প্রতি ঈর্ষার হুল অনুভব করল শেহেরজাদ। ওর জন্য রোজ তিনি এসব করার অধিকার রাখেন।

শেহেরজাদ ঝুঁকে দেরাজের কাপড়গুলো শুঁকল। সবকটিতে সদ্য কাচার গন্ধ আর রোদের সুরভি। ছাইরঙা একটা টি-শার্ট হাতে নিল ও, ভাঁজ খুলল ওটার, নিজের মুখে চেপে ধরল। বগলতলায় ছেলেটার ঘামের ক্ষীণ গন্ধাবশিষ্ট কি লেগে নেই? কিন্তু কিছুই ছিল না। তবু, কিছুক্ষণ জামাটা ওখানে ধরে রাখে ও, নাক দিয়ে গন্ধ নিল। নিজের জন্য শার্টটা রেখে দিতে চাইল ও। কিন্তু কাজটা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। জামাকাপড়গুলো খুব সুন্দর করে সাজানো-গোছানো। ছেলেটা (কিংবা ওর মা) হয়ত জানেন দেরাজে ঠিক কতগুলো টি-শার্ট রয়েছে। একটা খোয়া গেলে, নরক ভেঙে পড়তে পারে। টি-শার্টটা ফের ভাঁজ করে যথাস্থানে রেখে দিল শেহেরজাদ। এর বদলে, ডেস্কের একটা দেরাজ থেকে একটা ক্ষুদ্র ব্যাজ তুলে নিল ও। জিনিসটা দেখতে ফুটবলের মত। ছেলেটার গ্রেড স্কুলের সময়কার হয়ে থাকবে। শেহেরজাদ সন্দেহ আছে ও আদৌ টের পাবে ব্যাজটা নেই। অন্তত সহসাই লক্ষ করবে না। এসব ভাবতে ভাবতে, নিচের দেরাজে ট্যামপুনটার খোঁজ করল শেহেরজাদ। এখনও ওখানেই রয়েছে ওটা।

শেহেরজাদ কল্পনা করতে চেষ্টা করে ছেলেটার মা ওই ট্যামপুন আবিষ্কার করলে কী ঘটতে পারে। কী ভাববেন তিনি? জানতে চাইবেন কি ছেলের ডেস্কে ওটা এল কোত্থেকে? নাকি গোপন রাখবেন আবিষ্কারটা, মনের ভেতর বারবার ওলটপালট করবেন তাঁর অন্ধকার সন্দেহগুলো? শেহেরজা্দের কোন ধারণা নেই। তবে ট্যামপুনটা যথাস্থানে রেখে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল ও। শত হলেও, ওটা তার প্রথম অভিজ্ঞান।

দ্বিতীয় আগমনের স্মৃতিচিহ্ন হিশেবে পেছনে নিজের তিনগাছা চুল রেখে গেল শেহেরজাদ। আগের রাতে ওগুলো টেনে তুলেছে ও, প্লাস্টিকে জড়িয়ে একটা ছোট খামের ভেতর রেখে মুখ লাগিয়ে দিয়েছে। এখন ন্যাপস্যাক থেকে খামটা বের করে ও, সাবধানে ড্রয়ারের একটা পুরোন অঙ্ক খাতার ভেতর লুকিয়ে রাখে। চুল তিনটা সোজা ও কালো, খুব বেশি লম্বা বা খুব বেশি খাটো না। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া কেউ টের পাবে না ওগুলো কার, যদিও স্পষ্ট বোঝা যায় চুলগুলো একজন মেয়ের ।

ছেলেটার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা স্কুলে গেল শেহেরজাদ, বিকেলের প্রথম ক্লাসের জন্য ঠিকসময়ে পৌঁছুল। আবারও, দিন দশেক শান্ত রইল ও। মনে হল ছেলেটা ওর আরও নিকট হয়েছে। তবে, যেমনটা আপনারা প্রত্যাশা করতে পারেন, এই ঘটনাপ্রবাহ নির্ঝঞ্ঝাট হয়নি। শেহেরজাদ ঠিকই বলেছিল, মানুষের বাড়িতে সিঁদ কাটায় একধরনের আসক্তি রয়েছে।

গল্পের এ পর্যায়ে এসে বিছানার ধারে রাখা ঘড়িটার দিকে চকিতে তাকাল শেহেরজাদ, দেখল বিকেল ৪:৩২ বাজে। ‘যেতে হয়,’ ও বলল অনেকটা স্বগতোক্তির ঢংয়ে। বিছানা ছাড়ল একলাফে, শাদা প্যান্টিটা টেনে তুলল ওপরে, ব্রার হুক লাগাল, পা গলালো জিন্সের ভেতর, কালচে-নীল নাইকি সোয়েট শার্টটা টেনে নামালো মাথার ওপর দিয়ে। তারপর হাত ধুলো বাথরুমে গিয়ে, চুল ব্রাশ করল, বিদায় নিল ওর নীল মাজদা চালিয়ে।

একা, তায় হাতে কোন কাজ ছিল না, বিছানায় শুয়ে হাবারা এইমাত্র শেহেরজাদ যে গল্পটা বলেছে সেটা রোমন্থন করতে লাগল, একটু একটু করে উপভোগ করছে, ঠিক গরুর জাবর কাটার মত। কোথায় যাচ্ছে কাহিনীটা? ও অনুমান করতে চেষ্টা করল। শেহেরজা্দের অন্যান্য গল্পের মত এটারও কূলকিনারা পায় না ও। শেহেরজাদকে হাই স্কুল ছাত্রী হিশেবে কল্পনা করতে ওর কষ্ট হয়। তখন কি একহারা ছিল মেয়েটা, এখনকার চর্বি থেকে মুক্ত? স্কুল ইউনিফর্ম, শাদা মোজা, বিনুনি করা চুল?

তখনও খিদে পায়নি, তাই ডিনারের প্রস্তুতি শিকেয় তুলে, আধ-পড়া বইটায় ফিরে গেল হাবারা। কিন্তু মন বসাতে পারল না। সহপাঠীর কামরায় চোরের মত প্রবেশ করে তার জামা নিজের মুখে ঠেসে ধরা শেহেরজা্দের ছবি হাবারার কল্পনায় তখনও টাটকা। পরের ঘটনা জানার জন্য ও ছটফট করতে লাগল।

শেহেরজা্দের এরপর বাড়িটায় এল তিনদিন বাদে, উইকএন্ডের শেষে। বরাবরের মত, রসদ বোঝাই বড় একটা কাগজের ব্যাগ হাতে করে এল। ফ্রিজের খাবারদাবার হাতড়ে দেখল, মেয়াদ উত্তীর্ণগুলো বদলে রাখল, কাবার্ডের টিন এবং বোতলজাত সামগ্রী পরীক্ষা করল, মশলাপাতির কোনটা কমে এসেছে বোঝার জন্য ওগুলোর জোগান দেখল, এবং তারপর বাজারের একটা ফর্দ তৈরি করল। শীতল হওয়ার জন্য ফ্রিজে কয়েক বোতল পেরিয়ার রাখল ও। সবশেষে, সঙ্গে আনা কয়েকটা নতুন বই আর ডিভিডি সাজিয়ে রাখল টেবলে।

‘আর কোনকিছু দরকার তোমার বা চাই?’

‘মনে করতে পারছি না,’ জবাব দিল হাবারা।

এরপর, সবসময়ের মতো, বিছানায় গেল দুজনা এবং রতিক্রিয়া করল। পর্যাপ্ত সময় শৃঙ্গারের পর, কনডম পরে নিয়ে শেহেরজা্দের ভেতরে প্রবেশ করল হাবারা, এবং, পর্যাপ্ত সময় পর, বীর্যপাত ঘটাল। পেশাদার দৃষ্টিতে কনডমের ভেতরকার পদার্থ জরিপ করল শেহেরজাদ, তারপর খেই ধরল গল্পের।

আগের মতই, দ্বিতীয় দফা সিঁদ কাটার পর দিন দশেক সুখী, পরিতৃপ্ত বোধ করল শেহেরজাদ। ফুটবল ব্যাজটা লুকিয়ে রাখল পেনসিল বক্সে, ক্লাস চলাকালে মাঝে মাঝে আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করে। পেনসিলটা চিবোয়, সীসা চাটে। সারাক্ষণ ছেলেটার কামরার কথা ভেবে সারা হয়। ওর ডেস্ক, বিছানা যেখানে সে ঘুমোয়, ওর জামাকাপড়ে ঠাসা দেরাজ আলমারি, ওর ধবধবে শাদা জাঙ্গিয়া, এবং দেরাজে লুকোন ট্যামপুন আর তিনগাছা চুলের কথা ভাবল।

স্কুলের কাজে সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলল ও। ক্লাসে হয় ব্যাজ আর পেনসিল নাড়াচাড়া করে নয়ত দিবাস্বপ্নে আত্মসমর্পণ করল। যখন বাসায় ফেরে, হোমওয়ার্ক করতে বসার মত মনের অবস্থা থাকে না। গ্রেড নিয়ে শেহেরজা্দের কখনও সমস্যা হয়নি। প্রথমসারির ছাত্রী ছিল না, কিন্তু সর্বদা মনোযোগ দিয়ে দায়িত্বপালন করত। তাই ক্লাসে ও যখন শিক্ষকের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে ব্যর্থ হল, তিনি রাগ হওয়ার পরিবর্তে হতবাক হলেন বেশি। শেষমেশ লাঞ্চ বিরতির সময়ে স্টাফ রুমে তলব করলেন ওকে। ‘সমস্যাটা কী?’ শিক্ষক জানতে চাইলেন। ‘তোমাকে কোনকিছু কি জ্বালাচ্ছে?’ শেহেরজাদ কোনমতে বিড়বিড় করে অসুস্থতার অজুহাত দিল। ওর গোপনকথা কারও কাছে প্রকাশের জন্য একটু বেশি ভারি। এই বিষণ্নতা ওকে একাই এটা বহন করতে হবে।

‘ওর বাড়িতে সিঁদ কাটা আমার নেশা হয়ে উঠল,’ বলল শেহেরাজাদে। ‘বাধ্য হতাম আমি। বুঝতেই পারছ, কাজটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এমনকি আমিও বুঝতাম এটা। দুদিন আগে বা পরে কেউ কেউ না আমাকে দেখে ফেলবে ওখানে, পুলিশ ডাকবে। চিন্তাটা ভয়ে আমাকে কুঁকড়ে দিল। কিন্তু, ঘটনা একবার ঘটতে শুরু করার পর, কোন অবস্থাতেই আমার থামানোর উপায় রইল না। আমার দ্বিতীয় “দর্শনের” দশদিন পর আবার সেখানে গেলাম। কোন উপায় ছিল না গিয়ে। আমার মনে হচ্ছিল না গেলে আমি কঠিন গাড্ডায় পড়ে যাব। এখন ফিরে দেখলে মনে হয় আমি আসলেই পাগলামি করছিলাম।’

‘ঘন ঘন ক্লাস কামাইর জন্য স্কুলে সমস্যা হয়নি?’ হাবারা জিজ্ঞেস করল।

‘আমার মা-বাবা কাজ করতেন, ভীষণ ব্যস্ত মানুষ ছিলেন তাঁরা। আমার প্রতি নজর দেয়ার সময় ছিল না। তাছাড়া, এ পর্যন্ত আমি কোন ঝামেলা করিনি, কখনও তাদের অবাধ্য হইনি। ফলে তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন সব ব্যাপারে নাক না গলানোই সবচেয়ে উত্তম। সই জাল করে স্কুলকে চিঠি লেখা খুব সহজ ছিল। আমি আমার ক্লাস টিচারকে ব্যাখ্যা করেছিলাম আমার একটা স্বাস্থ্য সমস্যা আছে যে কারণে মাঝে মাঝে আধবেলা হাসপাতালে কাটাতে হয়। শিক্ষকরা এমনিতেই গলদঘর্ম থাকতেন যেসব ছেলেমেয়ে বেশিরভাগ সময়ে স্কুলে আসে না তাদের নিয়ে কী করা যায়, ফলে মাঝে-মধ্যে আমার আধবেলা কামাইতে উদ্বিগ্ন হলেন না।’

আবার শুরু করার আগে শেহেরাজাদে চকিতে বিছানার পাশে রাখা ঘড়িটা দেখে নিল।

‘পাপোশের নিচে থেকে চাবি নিয়ে আমি তৃতীয় দফার মত বাড়িতে প্রবেশ করলাম। আগের মতই শুনশান। না, যেকোন কারণেই হোক একটু বেশিই নীরব ছিল। রেফ্রিজারেটরটা শব্দ করে চলতে শুরু করায় কিঞ্চিত ঘাবড়ে গেলাম আমি। কোন অতিকায় জন্তুর নিশ্বাসের শব্দের মত ফোঁস ফোঁস করছিল ওটা। আমি ওখানে থাকা অবস্থায় ফোন বেজে উঠল। এত জোরে আর কর্কশ আওয়াজে বাজল ওটা যে মনে হল আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবে। ঘামে নেয়ে উঠলাম আমি। সঙ্গত কারণেই কেউ ফোন তুলল না; দশবার বেজে থেমে গেল ওটা। বাড়িটা আরও নিথর হয়ে গেল এরপর।’

সেদিন ছেলেটার বিছানায় অনেকক্ষণ হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে রইল শেহেরজাদ। এবার ওর হৃৎপিণ্ড আর উন্মত্তের মতো আঘাত করল না। স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারল ও। কল্পনায় দেখল ছেলেটা শান্তচিত্তে শুয়ে আছে পাশে; এমনকি এও মনে হল ছেলেটাকে ও ঘুমন্ত অবস্থায় লক্ষ করছে। ওর মনে হল, যদি হাত বাড়ায়, ছেলেটার পেশিবহুল বাহু ছুঁতে পারবে। অবশ্যই ছেলেটা ওর পাশে ছিল না। শেহেরজাদ আসলে দিবাস্বপ্নের আচ্ছন্নতায় পথ হারিয়েছিল।

ছেলেটার গন্ধ শোঁকার জন্য অদম্য তাড়না অনুভব করল ও। বিছানা থেকে উঠে দেরাজ আলমারির দিকে হেঁটে গেল, একটা দেরাজ খুলে ভেতরের শার্টগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। সবগুলোই ধোয়া, পরিপাটি করে ভাঁজ করা। ঠিক আগের মতই দাগহীন ওগুলো, কোন দুর্গন্ধ নেই। দৌড়ে একতলায় নেমে গেল ও। ওখানে, গোসলখানার পাশের কামরায় লন্ড্রি হ্যামপারটা পেয়ে সেটার ডালা সরাল। পরিবারের তিন সদস্য, মা, মেয়ে আর ছেলের অপরিষ্কার জামাকাপড় একত্রে রাখা। একদিনের বাসি, দেখে মনে হল। হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলল ওর মাথায়। পুরুষমানুষ পরে এমন একটা কাপড় টেনে বের করল শেহেরজাদ। একটা শাদা ক্রু-নেক টি-শার্ট। একঝলক গন্ধ নিল ও। অবধারিতভাবে একজন যুবকের সুবাস। এধরনের টক্ টক্ গন্ধ ও আগেও পেয়েছে, যখন পুরষ সহপাঠীরা আশেপাশে থাকে। তবে ঝাঁঝালো গন্ধ না। ওই গন্ধ ছেলেটার এই সত্য শেহেরজা্দের মনে অসীম আনন্দ বয়ে আনল। যখন বগলের পাশে নাক রেখে শ্বাস নিল, ওর মনে হল সে ছেলেটার বাহুডোরে বাঁধা পড়েছে।

টি-শার্ট হাতে, সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে গেল শেহেরজাদ, ছেলেটার বিছানায় শুয়ে পড়ল আবার। ওর শার্টে মুখ গুঁজল সে, লোভাতুর ভঙ্গিতে নিশ্বাস নিল। এখন নিম্নাঙ্গে ও একটা অসাড় অনুভূতি টের পায়। স্তনের বোঁটাও শক্ত হয়ে উঠছে। ওর পিরিয়ড কি অত্যাসন্ন? না, সময়টা এজন্য বেশি আগে। তবে কি যৌন তাড়না? যদি তা হয়. তাহলে এ ব্যাপারে ও কী করতে পারে? কোন ধারণা নেই ওর। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, এরকম পরিস্থিতিতে কিছুই করা যাবে না। এখানে, ছেলেটার কামরায়, ছেলেটার বিছানায় নয়।

শেষমেশ, শার্টটা বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল শেহেরজাদ। ঝুঁকি আছে এতে, সন্দেহ নেই। ছেলেটার মা টের পাওয়াই স্বাভাবিক, একটা শার্ট কম। এমনকি তিনি যদি বুঝতে নাও পারেন যে ওটা চুরি করা হয়েছে, তবু ওটা কোথায় গেল তা নিয়ে জল্পনা করবেন। নিজের বাড়ি এত নিষ্কলঙ্ক রাখেন যে মহিলা, তাঁর শুচিবাই না থেকেই পারে না। কোনকিছু খোয়া গেলে, সেটা না পাওয়া অবধি সারা বাড়ি তন্নতন্ন করবেন তিনি, ঠিক পুলিশের কুকুরের মত। সন্দেহ নেই, তিনি শেহেরজা্দের চিহ্ন তাঁর আদরের ছেলের ঘরেও আবিষ্কার করবেন। কিন্তু, সমস্যাটা উপলব্ধি করা সত্ত্বেও, শেহেরজাদ শার্টটার মায়া ত্যাগ করতে চাইল না। ওর মস্তিষ্ক তখন হৃদয়কে বশে আনার শক্তি হারিয়েছে।

শার্টটার জায়গায় কী রেখে যাওয়া যায় ও ভাবতে শুরু করল। নিজের প্যান্টিটাই ওর সেরা পছন্দ মনে হল। মামুলি জিনিস, সাধারণ, অপেক্ষাকৃত নতুন, এবং ওই সকালে আনকোরা। ছেলেটার ক্লসেটের একদম পেছনে ওটা লুকিয়ে রাখতে পারে ও। বদলি হিশেবে যথাযথ আর কিছু কি রেখে যাওয়া যায়? কিন্তু প্যান্টিটা খোলার পর ও দেখল ঊরুসন্ধি স্যাঁতসেঁতে। মনে হয় এটাও কামনা থেকেই বেরিয়েছে, ভাবল ও। নিজের ইন্দ্রিয়-লালসার দাগ লাগা কোনকিছু ওর কামরায় রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। এতে নিজেকে সে খাটোই করবে কেবল। প্যান্টিটা আবার জায়গামত টেনে তুলল ও, ভাবতে লাগল আর কী রেখে যাওয়া যায়।

গল্পে ছেদ টানল শেহেরজাদ। দীর্ঘক্ষণ একটা কথাও বলল না। চোখ বুজে নীরবে পড়ে রইল বিছানায়, ধীরলয়ে শ্বাস নিচ্ছে। ওর পাশে, হাবারাও তা-ই করল, গল্প আবার শুরু হওয়ার অপেক্ষায় থাকল।

অবশেষে, চোখ মেলল ও, মুখ খুলল। ‘এই যে, মিস্টার হাবারা,’ বলল। এই প্রথম তাকে নাম ধরে ডাকল ও।

হাবারা তাকাল ওর দিকে।

‘আমরা কি আরেকবার করতে পারি?’

‘মনে হয় আরেকবার পারব আমি,’ বলল হাবারা।

তো আবার সঙ্গম করল ওরা। এবারে, অবশ্যি, আগের বারের চেয়ে একদম ভিন্ন রকমের। উদ্দাম, কামার্ত, এবং দীর্ঘস্থায়ী। স্পষ্ট ধরা পড়ল শেহেরজা্দের পুলক। পরস্পর শক্তিশালী আক্ষেপ কম্পন ধরাল ওর দেহে। এমনকি মুখভঙ্গিও বদলে গেল। হাবারা ওইমুহূর্তে যৌবনের শেহেরজাদকে দেখতে পেল একঝলক। ওর আলিঙ্গনে বন্দি মহিলা এখন সতের বছরের অস্থির এক কিশোরী, যে কীভাবে যেন পঁয়ত্রিশের এক গৃহবধুর দেহে আটকা পড়েছে। মেয়েটাকে অনুভব করে হাবারা, চোখ বোজা, শরীরটা থেকে থেকে কেঁপে উঠছে, অপাপবিদ্ধ মনে একটি ছেলের ঘামে-ভেজা টি-শার্টের সৌরভের গন্ধ নিচ্ছে।

এই দফায়, শেহেরাজাদ মিলনের পর ওকে গল্প বলল না। ওর কনডমের ভেতরকার পদার্থও পরীক্ষা করে দেখল না। নিঃসাড়ে পাশাপাশি পড়ে রইল ওরা। মেয়েটার চোখ দুটো বিস্ফারিত, সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। জলের উজ্জ্বল উপরিতলের দিকে তাকিয়ে থাকা ল্যামপ্রের মত। কী চমৎকারই না হত, হাবারা ভাবে, যদি সেও ভিন্ন সময়ে বা স্থানে বাস করতে পারত, নোবুতাকা হাবারা নামের এই একক, সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত মানুষটাকে পেছনে ফেলে নামহীন ল্যামপ্রে হয়ে যেতে পারত। শেহেরজাদ আর নিজেকে পাশাপাশি কল্পনা করল হাবারা, ওদের চোষকগুলো একটা পাথরখণ্ডে আটকান, স্রোতের টানে শরীর দুলছে, দৃষ্টি ওপরে, সন্তর্পণে সাঁতরে যাওয়া নাদুসনুদুস ট্রাউটের জন্য ওত পেতে রয়েছে।

‘শেষপর্যন্ত শার্টের জায়গায় তুমি কী রেখে এসেছিলে?’ নীরবতা ভাঙল হাবারা। তক্ষুনি জবাব দিল না শেহেরজাদ।

‘কিছু না,’ অবশেষে বলল ও। ‘ওর গন্ধমাখা ওই শার্টের কাছে আসতে পারে এমন কিছুই আমি নিয়ে যাইনি। তাই শার্টটা নিয়ে চুপিসারে কেটে পড়ি। আর তখনই আমি ছিঁচকে চোরে পরিণত হলাম।’

বারোদিন পর শেহেরাজাদ চতুর্থবারের মত ছেলেটার বাড়িতে গিয়ে দেখল সামনের দরজায় নতুন তালা। দুপুরের রোদে তালার সোনালি রঙ ঝক্ঝক্ করছে, ওটার শক্তপোক্ত গঠন ঘোষণা করার জন্যই হয়ত-বা। পাপোশের নিচে কোন লুকোন চাবি ছিল না। স্পষ্টতই, ছেলেটার মা শার্ট খোয়া যাওয়ায় সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছেন। নিশ্চয় তন্নতন্ন করে খুঁজেছেন সব জায়গায়, এমন সব আলামত পেয়েছেন যেগুলো বলেছে তাঁর বাড়িতে রহস্যময় কিছু ঘটছে। অব্যর্থ অনুমান করেছেন সহজাত বোধ থেকে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ঘটনার এহেন অগ্রগতিতে হতাশ হল শেহেরজাদ, কিন্তু একই সঙ্গে নিজেকে নির্ভারও মনে হল। যেন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ, ওর কাঁধ থেকে বিশাল বোঝা সরিয়ে নিয়েছে। এর অর্থ ছেলেটার বাড়িতে আর আমাকে সিঁদ কাটা অব্যাহত রাখতে হবে না, সে ভাবল। কোন সন্দেহ নেই, তালা না বদলান হলে, অনন্তকাল ধরে চলত ওর হানা। এতেও কোন সন্দেহ নেই, প্রত্যেক দর্শনের সঙ্গে ওর আগ্রাসন বৃদ্ধি পেত। শেষপর্যন্ত, ও দোতলায় থাকা অবস্থায় পরিবারের কোন সদস্য এসে পড়তেন। পালানোর কোন রাস্তা থাকত না। কোন অজুহাতেই বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেত না। আগে হোক বা পরে, এই ভবিষ্যৎই অপেক্ষা করছিল ওর জন্য, যার ফল হত ভয়াবহ। এখন বিপদটা সে এড়াতে পেরেছে। এরকম বাজপাখির মত চোখ থাকার জন্য ছেলেটির মায়ের কাছে ওর বোধহয় কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করা উচিত, যদিও তাঁর সঙ্গে পরিচয় নেই ওর।

রোজ রাতে বিছানায় যাওয়ার আগে ছেলেটির টি-শার্টের ঘ্রাণ নেয় শেহেরজাদ। ওটা পাশে নিয়ে ঘুমায়। সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে একটা কাগজ জড়িয়ে লুকিয়ে রাখে জিনিসটা। তারপর, রাতের আহারশেষে, ওটা বের করে সোহাগ আর আঘ্রাণের জন্য। ওর শঙ্কা হয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গন্ধটা হাল্কা হয়ে যেতে পারে, কিন্তু তা ঘটে না। ছেলেটার ঘামের গন্ধ শার্টে চিরকালের জন্য ছড়িয়ে পড়েছে।

যেহেতু এখন আর সিঁদ কাটা অসম্ভব, শেহেরজা্দের মনের অবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল। ক্লাসে এখন কম দিবস্বপ্ন দেখে ও, শিক্ষকের কথা মাথায় প্রবেশ করতে শুরু করে। তবে, ওর প্রধান মনোযোগ শিক্ষকের কণ্ঠস্বরের প্রতি নয় বরং সহপাঠীর আচরণের দিকে। আড়ে নজর রাখে ওর ওপর, হাবভাবে পরিবর্তন বা কোন কারণে বিচলিত বোধ করার চিহ্ন দেখা যায় কিনা বুঝতে চেষ্টা করে। কিন্তু ছেলেটা একইরকম আচরণ করে। আগের মতই নির্বিকার চিত্তে মাথা পেছনে হেলিয়ে হাসে, প্রশ্ন করলে চকিতে উত্তর দেয়। ফুটবল অনুশীলনে তেমনি জোরে চেঁচায়, আর অতটাই ঘামে। কোন অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ করে না সে--একজন ঋজু তরুণকে দেখতে পায় শুধু, যে সদা-প্রফুল্ল জীবনযাপন করছে।

তবে, শেহেরজাদ একটা অশরীরী আত্মার কথা জানে যে ছেলেটির মাথার ওপর ঝুলে আছে। অথবা এর কাছাকাছি কিছু। আর কেউ জানে না, খুব সম্ভবত। কেবল সে (এবং, সেই অর্থে, সম্ভবত, ছেলেটির মা)। তৃতীয় দফা যখন সিঁদ কেটেছিল, বেশকিছু পর্নোগ্রাফিক ম্যাগাজিন আবিষ্কার করেছিল ও, ছেলেটির ক্লসেটের শেষপ্রান্তে চাতুর্যের সঙ্গে লুকিয়ে রাখা। সব নগ্ন মেয়েলোকের ছবি, পা ছড়িয়ে অকৃপণ ভঙ্গিতে যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করছে। কোন কোন ছবিতে সঙ্গমের দৃশ্য ছিল: অত্যন্ত অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে পুরষ লৌহদণ্ড-সদৃশ লিঙ্গ নারীদেহে প্রবিষ্ট করছে। শেহেরজাদ ইতিপূর্বে এরকম ছবি দেখেনি। ছেলেটার ডেস্কে বসে ধীরে ধীরে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টেছে ও, গভীর আগ্রহে প্রতিটা ছবি খুঁটিয়ে দেখেছে। অনুমান করেছে, ছবিগুলো দেখার সময়ে ছেলেটা হস্তমৈথুন করেছিল। কিন্তু ভাবনাটা ওর মধ্যে বিবমিষা জাগায় না। হস্তমৈথুনকে ও খুব স্বাভাবিক একটা কাজ হিশেবে ধরে নেয়। ওই শুক্রগুলোর কোথাও না কোথাও যেতে হবে, যেমন মেয়েদের পিরিয়ড হয়ে থাকে। অন্য কথায়, ছেলেটি আর দশটা কিশোরের মতই। দেবতা বা ঋষি কোনটাই নয়। শেহেরজাদ উপলব্ধি করে এই জ্ঞান তার মধ্যে স্বস্তি এনে দিয়েছে।

‘সিঁদ কাটা বন্ধ হওয়ার পর, ওর প্রতি আমার আসক্তি ঠাণ্ডা হয়ে এল। ধীরে ধীরে, জোয়ারের জল যেমন দীর্ঘ, গড়ানো সৈকত থেকে নেমে যায়। যেভাবেই হোক, আমি লক্ষ করলাম ওর শার্ট আগের চেয়ে কম শুঁকছি, পেনসিল আর ব্যাজ সোহাগে কম সময় ব্যয় করছি। জ্বরটা কেটে যাচ্ছিল। যতক্ষণ ওটা ছিল, আমি ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারছিলাম না। সবারই হয়ত জীবনের কোন না কোন সময়ে এরকম উন্মত্ত অবস্থা আসে। কিংবা ব্যাপারটা শুধু আমার ক্ষেত্রেই ঘটে থাকতে পারে। তোমার কী খবর? কখনও এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল কি?’

হাবারা মনে করতে চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুই স্মরণে আসে না। ‘না, এরকম চরম কিছু নেই, মনে হয় না,’ বলল সে।

শেহেরজাদকে খানিকটা হতাশ দেখাল ওর জবাবে।

‘যা-ই হোক, স্কুল পাশ করার পর আমি ভুলে গেলাম ওকে। এত দ্রুত আর সহজে, ব্যাপারটা উদ্ভট মনে হয়। কী ছিল ওর মধ্যে যা দেখে সতের বছরের আমি ওরকম প্রেমে পড়েছিলাম? যত চেষ্টাই করি, আমি কিছুই মনে করতে পারি না। জীবন আসলেই অদ্ভুত, না? এই মুহূর্তে তুমি হয়ত কোনকিছুতে বিমুগ্ধ হতে পার, জিনিসটাকে নিজের করার জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে রাজি থাক, কিন্তু এরপর কিছু সময় পার হয়, বা তোমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়, আর অমনি তুমি সবিস্ময়ে দেখ কীভাবে জিনিসটার দীপ্তি মলিন হয়ে গেছে। কী দেখছিলাম আমি? তুমি বিস্ময়বোধ কর। তো এটাই হল আমার ‘তালাভাঙা আর ভেতরে প্রবেশ’ করার পর্ব।’

কথাটা ও এভাবে বলল যেন পিকাসোর ব্লু পিরিয়ডের কথা বলছে, হাবারা ভাবল। তবে সে বুঝল আসলে মেয়েটা কী বলতে চাইছিল।

বিছানার পার্শ্বস্থিত ঘড়িটা চকিতে দেখল ও। যাওয়ার সময় হয়েছে।

‘সত্যি বলতে কি,’ শেহেরজাদ বলল একসময়, ‘কাহিনীটা এখানেই শেষ হয়নি। কয়েক বছর পর, আমি যখন নার্সিং স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, নিয়তির পরিহাস আবার আমাদের এক করল। ওর মা বিরাট ভূমিকা পালন করেছিলেন এতে; বস্তুত, পুরো ঘটনাটায় একধরনের ভূতুড়ে ব্যাপার ছিল--ঠিক যেমন পুরোন দিনের ভূতের গল্পে থাকত। ঘটনাগুলো অবিশ্বাস্য মোড় নিল। তুমি শুনতে চাও সেটা?’

‘ভালো লাগবে শুনতে,’ হাবারা বলল।

‘থাক, পরের বার যখন আসব নাহয় তখন বলব,’ শেহেরজাদ বলল। ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমাকে বাসায় ফিরে রাতের খাবার তৈরি করতে হবে।’

বিছানা ছাড়ল ও, জামাকাপড় পরল--প্যান্টি, স্টকিং, ক্যামিসল এবং, সবশেষে, স্কার্ট আর ব্লাউজ। হাবারা বিছানা থেকে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে ওর চলন দেখতে লাগল। ওর মনে হল মেয়েরা যেভাবে তাদের কাপড় পড়ে সেটা ওরা যেভাবে কাপড় ছাড়ে তারচেয়ে অনেকবেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।

‘বিশেষ কোন বই আনতে হবে তোমার জন্য?’ দরজা দিয়ে বেরোনর মুখে জানতে চাইল শেহেরজাদ।

‘না, তেমন কিছু মনে করতে পারছি না,’ বলল হাবারা। আসলে ও যা চাইছে, হাবারা ভাবল, শেহেরজাদ ওকে গল্পের বাকিটুকু বলে যাক। কিন্তু ভাবনাটাকে সে ভাষা দিল না। তা করলে জীবনে আর কখনই হয়ত শোনা হবে না ওটা।

সেই রাতে হাবারা আগে বিছানায় গেল। শেহেরজা্দের কথা ভাবল ও। হয়ত আর কোনদিনই ওকে দেখবে না। এটা চিন্তিত করে তাকে। সম্ভাবনাটা বড্ড বেশি বাস্তব। ব্যক্তিগত কোনকিছু--কোন প্রতিশ্রুতি, বা গূঢ় বোঝাপড়া--ওদেরকে ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ করেনি। ওদের সম্পর্কটা নেহাত ঘটনাচক্রে, অন্য কারও উদ্যোগে তৈরি হয়েছে, আবার সেই ব্যক্তির মর্জিতে ছিন্নও হতে পারে। অন্য কথায়, ওরা একটা চিকণ সুতোয় সংযুক্ত ছিল। সম্ভবত--না নিশ্চিতভাবেই--সুতোটা শেষপর্যন্ত ছিঁড়ে যাবেই, এবং ওর বলা অদ্ভুত ও অপরিচিত গল্পগুলো সে ভুলে যাবে। প্রশ্নটা হচ্ছে কখন তা ঘটবে।

এমনটিও ঘটতে পারে, একপর্যায়ে, পুরোপুরি খর্বিত হবে ওর স্বাধীনতা, আর তখন কেবল শেহেরজাদ নয়, সব নারীই ওর জীবন থেকে হারিয়ে যাবে। জীবনে আর কখনও ওদের দেহের উষ্ণ আর্দ্রতায় সে প্রবেশ করতে পারবে না। আর কখনও প্রতিক্রিয়ায় ওদের কাঁপন অুভব করবে না। যৌনকর্মে ছেদ পড়ার চেয়েও হাবারার কাছে সম্ভবত আরও পীড়াদায়ক হল পারস্পরিক অন্তরঙ্গতার মুহূর্তগুলো হারিয়ে যাওয়া। নারীসঙ্গ ওকে বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করার পাশাপাশি বাস্তবতটাকেই পুরো অস্বীকারের সুযোগ দিয়েছিল। এই সুযোগটাই ওকে প্রচুর পরিমাণে দিয়েছিল শেহেরজাদ--বস্তুত, ওর দান শেষ হওয়ার নয়। আর সেটা হারানোর সম্ভাবনাই হাবারাকে সবচেয়ে দুঃখী করে তুলল।

চোখ বুজল হাবারা, শেহেরজাদকে নিয়ে ভাবনা বন্ধ করল। এর পরিবর্তে, ল্যামপ্রের কথা ভাবতে লাগল। পাথরখণ্ডে আটকে থাকা চোয়ালবিহীন ল্যামপ্রে, জলজউদ্ভিদের আড়ালে লুকোন, স্রোতের টানে সামনে-পেছনে দুলছে। নিজেকে ওদেরই একজন কল্পনা করল ও, একটা ট্রাউটের আগমনের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও, একটাও ট্রাউটের দেখা মিলল না। নাদুসনুদুস না, রোগাপটকাও না। শেষপর্যন্ত অস্ত গেল সূর্য, আর হাবারার জগৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হল।

(ইংরেজি অনুবাদ টেড গুসেন)




অনুবাদক পরিচিতি
রওশন জামিল 
অনুবাদক। গল্পকার।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। 

২টি মন্তব্য:

  1. অনুবাদক একজন আস্ত মৌলিক গল্পকার। বাথরুম চেপে কিশোর বয়সীর মতো রুদ্ধশ্বাসে পড়লাম। বাংলাদেশে সম্ভব না হল্ও বাংলাভাষায় গল্পটি পড়লাম। কুলদা রায়, গল্প পাঠের কাছে কৃতজ্ঞ।

    উত্তরমুছুন