বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

ফুকোর হাসি, একটি গ্রন্থের জন্ম এবং বোর্হেস

রাজু আলাউদ্দিন

ফরাসী দার্শনিক মিশেল ফুকো তাঁর বস্তুর বিন্যাস (Order of Things) গ্রন্থের বীজ কীভাবে পেলেন সে-সম্পর্কে তিনি বইটির ভূমিকায় হোর্হে লুইস বোর্হেসের একটি লেখার উল্লেখ করেছিলেন। লেখাটির নাম তিনি ভূমিকার কোথাও উল্লেখ করেননি, কিন্তু আমরা জানি বোর্হেসের এই লেখাটির নাম ‘জন উইলকিন্সের বিশ্লেষী ভাষা’। লেখাটি পড়তে গিয়ে প্রচণ্ড হাসিতে তাঁর–এমন কি আমাদেরও–পরিচিত সব ভাবুকতার, যে-ভাবুকতায় আমরা অভ্যস্ত এবং যা আমাদের দেশ-কালের লক্ষণ-চিহ্নে শোভিত, আর ‘ভিন্ন’ ও ‘অভিন্ন’-এর মধ্যেকার বর্ষীয়ান যে ভেদস্তম্ভটি যুগ যুগ ধরে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিলো, তা ভেঙে পড়ে।
কী এমন রয়েছে বোর্হেসের ঐ লেখায় যা ফুকোর অনুভূতিতে তীব্র হাসির সঞ্চার করতে পারে, যে-হাসির তীব্রতায় খানখান হয়ে যাবে আমাদের এতকালের চিন্তা-জগতের প্রচলিত সব বিন্যাস? ফুকো জানাচ্ছেন যে বোর্হেসের লেখাটিতে এক চীনা বিশ্বকোষের (বোর্হেসের উদ্ভাবিত, এমনকি বোর্হেসের এই লেখাটিও প্রবন্ধের ছদ্মবেশে আসলে একটি গল্প) উল্লেখ রয়েছে যেখানে প্রাণীদের ভাগ করা হয়েছে এভাবে “(ক) সম্রাটের যারা মালিকানাধীন, (খ) যারা সুবাসিত, (গ) যাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, (ঘ) চোষণকারী শুকোর ছানা, (ঙ) মৎস্যকন্যা, (চ) কাল্পনিক, (ছ) পথকুকুর (জ) এই বিভাগে যাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, (ঝ) পাগলের মতো যারা কাঁপুনি দেয়, (ঞ) যারা অগণ্য, (ট) উটের লোমের ব্রাশে যাদের আঁচড়ানো হয়েছে (ঠ) অন্যান্যরা (ড) এইমাত্র যারা কোনো ফুলদানি ভেঙ্গেছে (ঢ) দূর থেকে যাদের মাছি বলে ভ্রম হয়।” এই বর্গীকরণের মধ্যে অন্য এক ভাবনা-পদ্ধতির অদ্ভুত আনন্দের প্রকাশ আমাদেরকে সচকিত করে তোলে। যেমনটা করেছে এ কালের গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মিশেল ফুকোকে।


এই অদ্ভুদ বর্গীকরণ বা বিন্যাসক্রমে ফুকো বোর্হেসের অসাধারণ কল্পনা-মনীষার অভিনব দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করেই যে কেবল হেসেছেন তা নয়, এর মধ্যে তিনি প্রথাবিরোধী প্রবণতাকেও অসম্ভব গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন। ফুকোর কাছে এটা এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে যার ভিত্তিতে জ্ঞান ও তত্ত্ব সম্ভব হয়ে ওঠে এবং যে-বিন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে জ্ঞান-বিজ্ঞান একটি কাঠামো ধারণ করে তার চরিত্রের প্রতি এই বর্গীকরণ ফ্যান্টাসির জমকালো জড়োয়া পড়ে তুলে ধরেছে কিছুটা সংশয়। এবং একই সঙ্গে এক বিকল্প প্রস্তাবনাও। ব্যাপারটা যদি বোর্হেসের অনন্য কল্পনামনীষা থেকে উৎসারিত এক দুর্মর ফ্যান্টাসির দৃষ্টান্তেই সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলে ফুকোর অট্টহাসি কেবল আমোদের মধ্যেই মিলিয়ে যেত। কিন্তু তা যায়নি। এর অন্তর্নিহিত জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্ন ফুকোকে উদ্বুদ্ধ করেছে বস্তুর বিন্যাসনামে এক গ্রন্থ রচনায়। আর গোটা ভূমিকাটাই হচ্ছে এই ফ্যান্টাস্টিক বর্গীকরণের পরিপ্রেক্ষিতে বইটি রচনার কৈফিয়ত।১

সবাই জানেন বোর্হেস কোন দার্শনিক নন, নিজে কখনো তা দাবীও করেন নি। কিন্তু তাঁর লেখার গোপন দার্শনিক ইশারাকে পাঠক কখনোই এড়িয়ে যেতে পারেন না। যদিও তাঁর লেখা অন্তিম বিচারে দর্শনের ছদ্মবেশে যেমন সাহিত্য নয়, কিংবা সাহিত্যের ছদ্মবেশে দর্শনও নয়, বরং বোর্হেসের ভাষায় “দর্শনের সাহিত্যিক সম্ভাবনা” ২ (Las Posibilidades literarias de la filosofia) মাত্র যেখানে দর্শন বা জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য উপকরণ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে সমবেত নন, বরং একই পরিবারের সদস্য। বোর্হেস এদেরকে ব্যবহার করেন দার্শনিকতা ফলানোর উদ্দেশ্যে যতটা নয়, তার চেয়ে বরং এক নিখুঁত গল্প বলার উপায় হিসেবে। আর এই গল্পের মাধ্যমে তিনি আশ্চর্য শিল্পকুশলতায় মানবচরিত্রের এমন সব রহস্য ও জ্ঞানের নিগূঢ় কূটাভাসকে তুলে ধরেন যে তা ক্রমশঃ এক দার্শনিক উন্মীলনে বহুমাত্রিক ও সর্বজনীন রূপ ধারণ করতে থাকে। শুধু এইটুকুর মধ্যেই যদি তাঁর বৈশিষ্ট্য সীমাবদ্ধ থাকতো, প্রিয় পাঠক, আমি জানি আপনি হয়তো বললেন, তা এ পর্যন্ত যা বলা হলো তা বোর্হেসের আগে বা সমকালের কিংবা তাঁর পরবর্তী কোনো কোনো মহৎ লেখক যে করেননি তাতো নয়। তিনি তাহলে তাঁদের মতোই আরেকজন মহৎ লেখক মাত্র। যেমনটা কাফকা, জয়েস, কিংবা দস্তয়েভস্তি বা তলস্তয়ে আমরা দেখতে পাই। কিন্তু বোর্হেস এদের মতো মহৎ হয়েও অদ্ভুত রকমের আলাদা বৈশিষ্ট্য অর্জন করে নিয়েছেন তাঁর লেখায় একেবারেই অভিনব ও নিজস্ব কিছু নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রয়োগের মাধ্যমে। ঠিক এই কারণে গোটা লাতিন আমেরিকাতে তো বটেই, এমনকি এর বাইরের অন্যসব লেখকদের জন্যও বোর্হেস শিল্প-কৌশল ও বিষয়-মুক্তির ক্ষেত্রে এক অনিবার্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে শ্রদ্ধেয় হয়ে আছেন। পরবর্তী প্রজন্মের উপর বোর্হেসের প্রভাব কতটা গভীর ও ব্যাপ্ত তার প্রমাণ পাওয়া যাবে মারিও ভার্গাস যোসা, গিইয়ের্মো কাবরেরা ইনফান্তে বা কার্লোস ফুয়েন্তেসের মন্তব্যে। ফুয়েন্তেসতো স্পষ্ট করেই বলেছেন, কেবল গল্পের ক্ষেত্রেই নয়, এমনকি উপন্যাসও তার আগ্রাসী সংক্রাম থেকে রেহাই পায় না: “ Without his prose, there would be no modern novel in south America today”৩

এ কথা সবারই জানা যে বোর্হেস কখনোই উপন্যাস লেখেননি অথচ লাতিন আমেরিকায় তাঁর প্রভাব এড়িয়ে আধুনিক কোনো উপন্যাসও অসম্ভব। এর কারণ, সেই গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে বিশ্বব্যাপী সাহিত্যের আধুনিকতার যুগে তিনি লিখছিলেন উত্তর-আধুনিক বৈশিষ্টের গল্পসমূহ৪ এমন এক ভাষায় যে-ভাষায় তখনো পর্যন্ত গল্পে বা উপন্যাসে আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যগুলোই ঠিক মতো ফোটেনি। মূলত তাঁর মৌলিকতা, প্রথাবিরোধী বৈশিষ্ট্য, কল্পনা-শক্তির প্রাচুর্য এবং সুগভীর নন্দনতাত্ত্বিক দূরদর্শিতাই সম্ভব করে তুলেছিল প্রতিভার উল্লম্ফন। স্প্যানিশ সাহিত্যে বোর্হেসের দানবীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে পেরুর কথাসাহিত্যিক বার্গাস যোসা বলেছিলেন, “আমাকে যদি একজনের নাম বেছে নিতে বলা হয় তাহলে আমি বোর্হেসের কথাই বলবো। কারণ তিনি যে-জগৎ তৈরি করেছেন তা আমার কাছে একেবারে মৌলিক মনে হয়। বিপুল মৌলিকতার পাশাপাশি তিনি তীব্র কল্পনাশক্তি আর সংস্কৃতির দ্বারা এতটাই সমৃদ্ধ ছিলেন যে তা একান্তভাবে তাঁর নিজস্ব। আর এছাড়া বোর্হেসের ভাষাতো আছেই, যা আমাদের ঐতিহ্যবাহী পথের বাইরে উন্মোচন করেছে এক নতুন পথের।
স্প্যানিশ হচ্ছে এমন এক ভাষা যার ঝোঁকটা উচ্ছ্বাস, আতিশয্য ও অত্যুক্তির দিকে। আমাদের মহান লেখকরা ছিলেন বাগাড়ম্বরপূর্ণ। সের্বান্তেস থেকে অর্তেগা ই গাসেত, বাইয়ে ইনক্লান কিংবা আলফন্সো রেইয়েস পর্যন্ত। বোর্হেস এর বিপরীতে পুরোপুরি মিতভাষী, সংক্ষিপ্ত এবং যথাযথ। স্প্যানিশ ভাষায় তিনিই একমাত্র লেখক যিনি অসংখ্য শব্দের মতোই অসংখ্য ধারণার (Ideas) অধিকারী। তিনি আমাদের কালের এক মহান লেখক।”৫ বিষয় এবং শিল্প-কুশলতায় তাঁর নতুন নতুন উদ্ভাবনা এতটাই যে পরবর্তী প্রজন্মের প্রায় সব প্রতিভাবান লেখকই লিখতে গিয়ে কমবেশি তাঁর দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে থাকতে পারেননি, তা সে রাজনৈতিকভাবে যে মতেরই হোন না কেন। সম্ভবত সে কারণেই কুবার লেখক কাব্রেরা ইনফান্তে একেবারে সংশয়হীন চরমপন্থা অবলম্বন করে বলতে পারেন: “বোর্হেসের প্রভাব এড়িয়ে লাতিন আমেরিকায় লিখছেন এরকম একজন লেখকও নেই (No hay un solo escritor hispanamericano que escirba ahora Y que Pueda echar a un lado la influencia de Borges)।”৬ইনফান্তের এই বক্তব্য যে মোটেই অত্যুক্তি নয় আমরা তার প্রমাণ পাব গার্সিয়া মার্কেস, হুলিও কোর্তাসার, সেভেরো সার্দুই, মারিও বার্গাস যোসা, হোসে সারামাগো, ওরহান পামুক, আলেসানদ্রো বারিককো, হুয়ান হোসে আররেওলা কিংবা উদ্ভট কল্পনাকাহিনীর স্রষ্ট্রা উরুগুয়াইয়ের লেখক ফেলিসবের্তো এরনানদেস-এর লেখার কোনো না কোনো অংশে। আর এই প্রভাব কেবল লাতিন আমেরিকান লেখকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, “he has helped writers from all over the world.”৭


এটাতো সত্যি যে, কোন লেখকই–তা তিনি যত প্রতিভাবান এবং অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যেরই হোন না কেন–আকাশ থেকে নাজেল হন না। তার পেছনে থাকে স্থানিক ও পারিবারিক আবহ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্বয় ও গোপন উদ্দীপনা। ঠাকুর-পরিবারের মতোই বোর্হেস পরিবারেও ছিলো শিল্পচর্চার এক অনুকূল আবহ। বনেদী এই বোর্হেস পরিবারে এসে মিশেছে স্প্যানিশ, ইংরেজ (নর্দাম্বারল্যান্ড) এবং পর্তুগীজ-ইহুদী রক্ত ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য। পিতৃ এবং মাতৃকূল উভয় দিক থেকেই বোর্হেস পরিবারের পূর্বপুরুষরা আর্হেন্তিনার রাজনীতি এবং ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে আছেন। মাতৃকূলে জন্ম বোর্হেসের পূর্ব-পুরুষ ফ্রান্সিসকো নার্সিসো দে লাপ্রিদা ১৮১৬ সালে যে তুকুমান কংগ্রেসের সভাপতিত্ব করেন তা ছিলো আর্হেন্তিনার স্বাধীনতা-ঘোষণাকারী ঐতিহাসিক কংগ্রেস। ১৮২৯ সালে তিনি, গৃহযুদ্ধে মারা যান। মাতৃকুলের আরেক পূর্বপুরুষ কর্ণেল ইসিদোরো সুয়ারেসও আর্হেন্তিনার স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং স্বৈরাচারী রোসাস সরকারের রোষানাল বাঁচার জন্য উরুগুয়াইয়ে নির্বাসিত জীবন যাপন করেন। পিতৃকুলে জন্ম এডওয়ার্ড ইয়ং হ্যাসলাম ছিলেন বোর্হেসের বাবার নানা। পিতৃকুল থেকেও বোর্হেস পরিবারে রয়েছে সামরিক ঐতিহ্য কিন্তু লেখক বোর্হেস এই পিতৃকূলের যে-জিনিটি উত্তরাধিকার সূত্রে বহন করেছেন তা হলো বিদ্যাচর্চা এবং লেখালেখির ঐতিহ্য। এডওয়ার্ড হ্যাসলাম জন্মসূত্রে ইংরেজ হলেও পড়াশুনা করেছেন জার্মানীর হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তাঁর কোর্স-এর ভাষা ছিলো ল্যাটিন।
আর্হেন্তিনার রিও দে লা প্লাতা থেকে প্রকাশিত তৎকালীন Daily News, Herald এবং The Southern-এর মতো ইংরেজী পত্রিকাগুলোর সম্পাদক ছিলেন তিনি।৮ এডোয়ার্ড হ্যাসলাম-এর দ্বিতীয় সন্তান কন্যা ফ্রান্সেস এর্গন হ্যাসলাম-এর সাথে বিয়ে হয় কর্নেল ফ্রানসিস্কো ইসিদোরো বোর্হেসের। কর্নেল ফ্রান্সিসকোর দুই সন্তানের একজন হলেন হোর্হে গিইয়ের্মো বোর্হেস (১৮৭৪-১৯৩৮)। হোর্হে গিইয়ের্মো বিয়ে করেন লেওনোর রিতা আসেবেদোকে। এদের সংসারে ১৮৯৯ সালের ২৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকাল ৮ টায় জন্মগ্রহণ করেন হোর্হে ফ্রান্সিসকো ইসিদোরো লুইস বোর্হেস। পরবর্তীকালে যিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে উঠবেন শুধু হোর্হে লুইস বোর্হেস নামে। উত্তরাধিকারসূত্রে বোর্হেস ইংরেজী এবং স্প্যানিশকে পেয়েছেন মাতৃভাষা হিসেবে। ইংরেজী ভাষায় তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য ছিলো এতটাই যে পরবর্তীকালে তিনি যখন সহস্র এক আরব্য রজনী বা দোন কিহোতে স্প্যানিশে পড়েন তখন তাঁর কাছে মনে হয়েছিল এ বুঝি ইংরেজী থেকে বাজে স্প্যানিশে অনূদিত সংস্করণ।৯ দ্বিভাষী পারিবারিক আবহের সঙ্গে ছিলো ইরেজী গ্রন্থে সমৃদ্ধ পিতার ব্যক্তিগত পাঠাগার যা লাজুক স্বভাবের বালক বোর্হেসের মনগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো। পরিণত বয়সে বোর্হেস ‘আত্মজৈবনিক প্রবন্ধ’-এ এই গ্রন্থাগারের কথা স্মরণ করে বলেছেন: “যদি আমার জীবনের প্রধান ঘটনার কথা জানতে চাওয়া হয়, তাহলে আমার বাবার গ্রন্থাগারের কথাই বলবো। মাঝেমধ্যে ভাবি আমি কখনোই ওই গ্রন্থাগারের বাইরে সময় নষ্ট করিনি।”১০ আসলে, বোর্হেসের শিক্ষাদীক্ষা সেই ছোটবেলা থেকেই গ্রন্থাগার-কেন্দ্রিক অর্থাৎ প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দী তিনি কখনোই মাড়াননি। এর কারণ মূলত তাঁর বাবার প্রভাব। তাঁর বাবা ছিলেন সুশিক্ষিত, রুচিশীল, মার্জিত স্বভাবের মানুষ। ধ্যান-ধারণায় ছিলেন নৈরাজ্যবাদী (Anarchist ) এবং বিশ্বাসের দিক থেকে ছিলেন স্পেনসারের সাগরেদ। ফলে রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত সব কিছুতেই তিনি ছিলেন আস্থাহীন।১১ এ কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোর্হেসের অন্তর্ভুক্তি ঘটে ৯ বছর বয়সে। জ্ঞানের প্রবল অনুরাগ আর সাহিত্যের প্রতি গভীর পিপাসা—এসবই বোর্হেস পেয়েছেন তাঁর বাবার সূত্রে। ইংরেজী ভাষায় সুশিক্ষিত হোর্হে গিইয়ের্মো আইন পেশার চর্চা করলেও তা ভালো না লাগায় শিক্ষকতার পেশাতেই স্থিত হন। শিক্ষাদানের বিষয় ছিলো মনোবিজ্ঞান। ভালোবাসতেন শেলী, কীটস আর সুইনবার্ন। পাঠক হিসেবে তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিলো দুটি বিষয়ে। এক. অধিবিদ্যা এবং মনোবিজ্ঞান সম্পর্কিত বইপত্র (বার্কলি, হিউম, রয়েস এবং উইলিয়াম জেমস)। দুই. সাহিত্য এবং প্রাচ্য সম্পর্কে বইপত্র (লেন, বার্টন এবং পেইন)। বোর্হেসের ভাষায়: “আসলে তিনিই আমার কাছে কবিতার শক্তিকে প্রকাশ করেন।” কবিতার শক্তির পাশাপাশি দর্শনের প্রাথমিক শিক্ষাও বোর্হেস পেয়েছিলেন পিতার কাছেই এবং এই কাজটি তিনি করেছেন বোর্হেসের এমন এক বয়সে যখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে তার কোনো রকম ধারণাই জন্মায়নি। গতির অসম্ভবতা সম্পর্কে একিলিস, কচ্ছপ এবং তীর বিষয়ক জেনোর কূটাভাস (Paradox)-এর সাথে বোর্হেসকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। বার্কলির নাম উল্লেখ না করেই তার ভাববাদের প্রাথমিক বিষয়গুলোর সাথেও পরিচয় করিয়ে দেন বালক বোর্হেসকে। তাঁর এই দিক্ষা বোর্হেসের পরবর্তী জীবনে বিরাট ভূমিকা রেখেছিলো। এসবের সাথে পরিচয় বা অনুরাগই শুধু নয়, এমনকি লেখালেখির প্রবণতাও তিনি প্রথমত পিতার সূত্রেই পেয়েছেন। সাহিত্য-প্রীতির সুবাদে তাঁর বাবার সাথে বন্ধুত্ব ছিলো তখনকার গন্যমান্য অনেক লেখকের সাথেই। মাসেদোনিও ফের্নান্দেস ছিলেন এদের মধ্যে অন্যতম, উজ্জ্বল। পরবর্তীকালে এই পিতৃবন্ধুর প্রভাব বোর্হেসের জীবনে ছিলো অপরিমেয়। তখনকার সমসাময়িক লেখকদের সাথে কেবল বন্ধুত্বই নয়, হোর্হে গিইয়ের্মো লেখালেখিও করতেন। যদিও তা সাহিত্যের গভীর মানদন্ডে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। কিন্তু লেখক হিসেবে বোর্হেসের বেড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ রচনার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আজ সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে তাঁর বাবার অনেক ব্যর্থ প্রবণতাগুলোকেই তিনি বীজ আকারে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন গোপনে এবং সেই প্রবণতাগুলোকে বোর্হেসীয় ধরনে বিকশিত করেছেন। তার দু একটি নমুনা এখানে হাজির করলেই পাঠকদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথের বাবা, দেবেন্দ্রনাথ যেমন ফার্সী ভাষার কবি হাফিজের ভক্ত ছিলেন, বোর্হেসের বাবারও অনুরাগ ছিলো ঐ একই ভাষার আরেক কবি ওমর খৈয়ামের প্রতি। ফিটজেরাল্ডের ইংরেজী অনুবাদের ভিত্তিতে তিনি স্প্যানিশে ওমর খৈয়ামের অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন। এবং সেই অনুবাদ ছিলো মূল ছন্দের অনুগামী। আরব্য রজনীর ঘরানায় প্রাচ্য উপাখ্যানের একটি বই লিখলেও তা আর প্রকাশ করেননি বা নিজেই তা ধ্বংস করে ফেলেন। আরও একটি বইও তিনি লিখেছিলেন। প্রবন্ধের এক সংকলন এবং যথারীতি তা ধ্বংসের হাতে তুলে দেন। ‘শূন্যতার প্রতি’ (Hacia la nada ) নামে একটি নাটকও তিনি লিখেছিলেন। বেশ কিছু সনেটও তিনি লিখেছিলেন এবং তা প্রকাশিতও হয়েছিলো বিভিন্ন পত্রিকায়। তবে বই আকারে তাঁর একমাত্র প্রকাশিত লেখা একটি উপন্যাস এল কাউদিইয়ো (El Caudillo) যার বিষয়বস্তু আর্হেন্তিনার এন্ত্রে রিওস-এর ইতিহাস। বইটি ১৯২১ সালে মাইয়োরকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো। বাবার মতো তাঁর মা লেওনোর আসেবেদোও ছিলেন সাহিত্যের প্রবল অনুরাগী। স্বামীর মতো মৌলিক কিছু না লিখলেও ইংরেজী থেকে স্প্যানিশে বেশ কিছু অনুবাদ করেছেন। উইলিয়াম সারোইয়ান-এর দ্য হিউম্যান কমেডির অনুবাদ প্রকাশিত হলে বুয়েনোস আইরেস আর্মেনিয়ান সোসাইটি এ জন্য তাঁকে সম্মাননা জানান। এ ছাড়া হথর্ন, মেলভিল, ভার্জিনিয়া উলফ, ফকনার-এর লেখাসহ শিল্প বিষয়ক হার্বার্ট রীড-এর একটি বইয়ের তর্জমাও করেছেন।
বাবা মা ছাড়াও বোর্হেসের পিতৃ-পরিবারের অন্যান্যদের মধ্যেও সাহিত্য চর্চার ঐতিহ্য প্রবাহিত ছিলো। হোর্হে গিইয়ের্মোর Great uncle হুয়ান ক্রিসোসতোমো লাফিনুর এবং তাঁর Cousin আলবারো মেলিয়ান লাফিনুর, দুজনই ছিলেন কবি। ১৯১৪ সালে প্রাচ্য সাহিত্যের প্রধান অনুবাদক কার্লোস মুসস্ওি সায়েন্স পেনঞার অনুবাদ Rubaiyat De Omar-al-khayyam প্রকাশিত হয়, তখন এর ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন মেলিয়ান লাফিনুর। পিতৃপুরুষদের এই বিদ্যাচর্চার ঐতিহ্য যে বোর্হেসের লেখক হওয়ার পক্ষে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়। সম্ভবত এ কারণে বোর্হেস মাত্র ছয় বছর বয়সে সের্বান্তেসের প্রভাবে ‘লা বিসেরা ফাতাল’ (La visera Fatal) নামে জীবনের প্রথম গল্পটি লেখেন স্প্যানিশে। ঐ একই বছর অর্থাৎ ১৯০৬ সালে গ্রিক পুরান নিয়ে ইংরেজীতে লেখেন আরেকটি লেখা। এই নমুনাগুলো থেকেই বোঝা যায় গল্প এবং প্রবন্ধ লেখার মকশো তিনি ঐ শিশু বয়সেই শুরু করেন। মায়ের ভাষ্য থেকে জানা যায়, বোর্হেসের বয়স যখন ছয় তখন তিনি বাবা গিইয়ের্মো বোর্হেসকে লেখক হওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন।১২অন্যদিকে, বোর্হেসের আত্মজীবনীমূলক লেখাটিতে তিনি নিজেই জানাচ্ছেন যে “পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে আমার বাবা যে-সাহিত্যিক বিধিলিপি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তা যে আমাকে পূূরণ করতে হবে সেটা না বললেও আমার বাল্যকাল থেকেই বুঝা যাচ্ছিলো।”১৩ সুতরাং ছয় বছর বয়সেই যে বোর্হেস লেখার মকশো শুরু করবেন এটা মোটেই আশ্চর্যের কিছু নয়। আমরা দেখবো চার বছর পরে তিনি অস্কার ওয়াইল্ড-এর ‘হ্যাপি প্রিন্স’ অনুবাদ করবেন ইংরেজী থেকে স্প্যানিশে যা বুয়েনোস আইরেস-এর দৈনিক পত্রিকা El Pais-এ মুদ্রিত হয়।”১৪
‘হ্যাপি প্রিন্স’ প্রকাশের পর, পরবর্তী চার বছর অর্থাৎ ১৯১৪ সালে জেনেভার উদ্দেশ্যে বুয়েনোস আইরেস ত্যাগ করার আগে আর কোনো লেখা তিনি লিখেছিলেন কিনা বা প্রকাশিত হয়েছিলো কিনা তা আমাদের জানা নেই। তবে, সাহিত্য বিষয়ক পড়াশুনা অব্যাহত ছিলো নিশ্চিতভাবেই। মার্ক টোয়েনেরহাকলবেরী ফিন, এইচ জি ওয়েলস, এডগার এ্যালান পো, লংফেলো, চার্লস ডিকেন্স, লুইস ক্যারল, রিচার্ড বার্টন-এর অনুবাদে আরব্য রজনী, ট্রেজার আইল্যান্ড, দন কিহোতে–কৈশোরের এই সব লেখক এবং গ্রন্থসমূহ বোর্হেসের পরবর্তী জীবনে যে গভীর প্রভাব রেখেছিলো তা আমরা দেখতে পাবো যখন এদের কাউকে কাউকে নিয়ে বা এদের কোন না কোন বই সম্পর্কে বোর্হেসীয় ঘরানার অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের প্রবন্ধগুলো লিখছেন। আরব্য রজনী ছিলো আমৃত্যু তাঁর প্রিয় বইগুলোর একটি। এ নিয়ে তিনি একাধিক প্রবন্ধও লিখেছেন। দন কিহোতে সম্পর্কেও তিনি একই রকম অনুরাগ বজায় রেখেছিলেন।
১৯১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারী বোর্হেস পরিবার জেনেভার উদ্দেশ্যে পারি জমান পিতা হোর্হে গিইয়ের্মোর অন্ধত্ব নিরাময়ের আশায়। কিন্তু তাঁদের কোনো ধারণাই ছিলো না যে এই বছরই ইতিহাসের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের বিশাল একটি অংশকে ক্ষতবিক্ষত করে দেবে। বিশ্বযুদ্ধের হল্কা থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার আশায় জেনেভাতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা, অন্তত যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত। এই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি ভর্তি হন জেনেভা শহরের কেলভিন কলেজে। জেনেভাপ্রবাস বোর্হেসের জীবনে একাধিক কারণে খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত যে-কলেজে তিনি পড়াশুনা করেছেন সেখানে শিক্ষাদান করা হতো ফরাসি ভাষার মাধ্যমে। ফলে ফরাসি ভাষাটি তিনি রপ্ত করে নিয়েছিলেন চার বছরের প্রবাসজীবনে। যদিও এ ভাষাটিকে তিনি কখনোই পছন্দ করতে পারেননি। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে বোর্হেসের বিশ্বময় খ্যাতির সূত্রপাত ঘটে যে ভাষায় সেটি ফরাসি; ফরাসি ভাষাতেই তাঁর রচনার প্রথম অনুবাদ হয় ১৯৩৯ সালের ২৫ এপ্রিল নেস্তর ইবাররার মাধ্যমে এবং পরে ১৯৫১ সালে ফিকসিওনেস-এর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ বের হয় ফরাসি সমালোচক ও সমাজবিজ্ঞানী রজার কাইলোয়ার মাধ্যমে।১৫যাইহোক, জেনেভা থাকাকালেই আলেমানও শিখেছিলেন একেবারেই ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং উদ্যোগে। দ্বিতীয় যে-কারণে তাঁর জেনেভার প্রবাসজীবন গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আলেমান শেখার ফলে তিনি জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ার এবং নীটশের রচনার সাথে পরিচিতি হন। এবং হুইটম্যানের সাথেও প্রথম পরিচয় আলেমান ভাষার মাধ্যমে, যে-হুইটম্যানকে তিনি কাব্য-বিচারে বহুদিন যাবৎ আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করতেন।
ভাষা আর সাহিত্যের প্রতি তার ভালোবাসা এতটাই গভীর এবং আবেগময় ছিলো যে ১৯১৮ সালে জেনেভা থেকে স্পেনে গিয়ে যখন বহুভাষী পণ্ডিত ও অনুবাদক রাফায়েল কান্সিনোস আসেন্স-এর সাথে পরিচিত হন তখন তিনি রীতিমত মুগ্ধ হন এবং মনে মনে তাকে গুরু বলে বরণ করেন। পনেরটি ভাষায় দক্ষ এই গুরুর কথা তিনি সারাজীবন কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেছেন। তিনি পনেরটি ভাষা শুধু জানতেনই না এই সব ভাষা থেকে বিস্তর অনুবাদও করছেন। মূল ভাষা থেকে জন গলসওয়ার্দির সমগ্র রচনাবলী, ডি কুইনসির কিছু রচনা, ফরাসী লেখক আঁরি বারবুস-এর লা এফেয়ার ও আরও অন্যান্য ফরাসি লেখকদের লেখা স্প্যানিশে অনুবাদ করেছেন। জার্মান এবং রুশ ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন গ্যোটে এবং দস্তয়েভস্কি। মূল আরবী থেকে সহস্র এক আরব্য রজনী এবং কোরান শরীফ। পাঠকরা জেনে আনন্দিত হবেন যে রবীন্দ্রনাথের মানব ধর্ম ১৬(Religion del hombre) গ্রন্থেরও অনুবাদ করেছেন তিনি( তবে বাংলা থেকে নয়, ইংরেজি অনুবাদের ভিত্তিতে)। এছাড়া গ্রীক, লাতিন এবং হিব্রু থেকে আরও অন্যান্য অনুবাদতো আছেই। মোট কথা, তিনি ছিলেন বহু সংস্কৃতি ও বহু ভাষার এক মুখর মোহনা। এমন ব্যক্তিত্ব বোর্হেসের কাছে আদর্শ হয়ে উঠবেন এটা খুবই স্বাভাবিক, কারণ আমরা দেখবো বোর্হেস নিজেও পরবর্তী জীবনে পাঠে, ভাষা চর্চায়, সাহিত্যাদর্শে এবং কথোপকথনে ঠিক ও রকমই হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি পরবর্তী জীবনে, স্পেনের বিখ্যাত দার্শনিক ওর্তেগা-ই গাসেৎ এবং স্পেনের কাস্তিল অঞ্চল সম্পর্কে যে-বিরূপ ধারণা ব্যক্ত করেছেন তাও মনে হয় গুরু কান্সিনোস আসেন্স থেকে পাওয়া। কারণ তার গুরুর বিরাগ ছিল দার্শনিক গাসেৎ-এর প্রতি।
স্পেনে চার বছরের প্রবাসজীবন আরও একটি কারণেও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত এই গুরুর সংস্পর্শে আসার কারণেই লাতিন এবং আরবীভাষা শেখার ব্যাপারেও আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। আরবী তিনি কতটা রপ্ত করতে পেরেছিলেন জানা যায় না, তবে লাতিন তিনি করায়ত্ত করেছিলেন পুরোপুরি। তৃতীয় আরেকটি কারণেও বোর্হেসের স্পেন-প্রবাস ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় তিনি তখনকার Ultraista সাহিত্যিক আন্দোলনের শরীক হয়ে ওঠেন। Ultra, Grecia ইত্যাদি সাহিত্য পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন এবং একই সাথে পরিচিত হন তখনকার বয়োজেষ্ঠ্য তারকা-লেখকদের সাথে যেমন হিমেনেস, রামোন গোমেস দে লা ছেরনা প্রমুখ। পাশাপাশি অনুবাদ করেছেন জার্মান এক্সপ্রেসনিস্ট কবিদের কবিতা। ইংরেজী এবং ফরাসি থেকেও স্প্যানিশে বেশ কিছু লেখা অনুবাদ করেন।
লেখক হিসেবে বোর্হেসের সত্যিকারের প্রথম সূচনা স্পেনেই। কবিতা এবং অনুবাদের পাশাপাশি প্রবন্ধ লেখার সূচনাও সেখানে। এমনকি এ সময় তিনি দুটি বইয়ের পান্ডুলিপি তৈরি করলেও তা কখনোই প্রকাশ করেন নি। এদের একটি কবিতার বই, রুশ বিপ্লবে উদ্ধুদ্ধ হয়ে লিখেছিলেন “লাল ছন্দ” (Los Ritmos Rojos), অন্যটি প্রবন্ধের এক সংকলন “তিক্ষ্নতমের তাস” (Los Naipes del tahur), অনেকটা স্প্যানিশ লেখক পিও বারোহার প্রভাবে লেখা সাহিত্যিক এবং রাজনৈতিক প্রবন্ধসমূহ। পরবর্তী জীবনে তিনি প্রবন্ধে কবিতায় এবং গল্পে যে স্থিতি, গভীরতা এবং সূক্ষ্ম শিল্প-কুশলতা অর্জন করেছিলেন সে তুলনায় অপ্রকাশিত পান্ডুলিপিদ্বয় ছিলো তারুণ্যের অগভীর কলস্বর, আবেগের নিরুদ্দেশ চেতনায় বৈশিষ্টহীন। বোর্হেস নিজেও এ ব্যাপারে সচেতন ছিলেন বলেই দেশে ফেরার আগেই তা ধ্বংস করে ফেলেন।
প্রায় সাত বছর পর বোর্হেস সপরিবারে দেশে ফেরেন ১৯২১ সালের মার্চ মাসে। বুয়েনোস আইরেসের নতুন নতুন রাস্তাঘাট, দালান কোঠা, শহরের বিস্তার, সব কিছুই তাঁকে এতটাই অভিভূত করেছিলো যে তাঁর কাছে “এটা ছিলো ঘরে ফেরার চেয়ে বেশি কিছু, এ ছিলো এক পুনরাবিস্কার” (It was more than a homecoming; it was a rediscover)। এই ঘরে ফেরা আর পুনরাবিস্কারের শিহরণ তাঁর কবি-মনকে যে কতটা সৃজনমুখর করে তুলেছিলো তার প্রমাণ আমরা দেখতে পাবো ১৯২১ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে লেখা এবং পরবর্তী বছরে (১৯২৩) তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত বুয়েনোস আইরেস-এর জন্য আকুলতা (Fervor de Buenos Aires) গ্রন্থে।
ইংরেজ লেখক টমাস হার্ডির মতো বোর্হেসেরও শুরু এবং শেষ কবিতা দিয়ে। মৃত্যুর এক বছর আগে প্রকাশিত তাঁর সর্বশেষ বইটিও কবিতার বই: ষড়যন্ত্রকারী (Los Conjurados)। অসাধারণ সব গল্প, প্রারাবোল আর প্রবন্ধ লেখা সত্ত্বেও বোর্হেস নিজেকে প্রথমত এবং প্রধানত কবি হিসেবেই বিবেচনা করেছেন সব সময়। আর এটাতো সত্যি যে তাঁর গল্পগুলো গল্পের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করার পরেও তা সবসময় কবি মনের গভীরতম বোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত। জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার অভিন্ন আত্মার এই কাব্যময় সৌরভ বহু আগেই পেয়েছিলেন বলেই তিনি আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন: “The Speech of genuine thinking is by nature Poetic. it needs not take the shape of verse. The voice of thought must be poetic because poetry is the saying of thought”. বোর্হেস হয়তো এই কারণে তাঁর অন্য সব সত্ত্বার চেয়ে কবি সত্ত্বাকে বেশি গুরুত্বের সাথে দেখতেন। কারণ এটা তাঁর অন্য সব সত্ত্বার কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭১ সালে বোর্হেস তাই আমাদেরকে কোন রকম দ্বিধা ছাড়াই বলছেন যে, “In the long run, Perhaps I shall stand or Fall by my poems”১৭ তাঁর এই বক্তব্য থেকেই বুঝা যায় তিনি কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন তাঁর কবিতাকে বা কবিসত্ত্বাকে।
তাঁর প্রথম কবিতার বই বুয়েনোস আইরেসের জন্য আকুলতাএকাধিক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯২১ সালে বোর্হেস যখন দেশে ফেরেন তখন স্পেনের মাটিতে জন্ম নেয়া Ultraism-এর একটি আর্হেন্তিনীয় সংস্করণ তৈরি করেন বুয়েনোস আইরেসে। এখানকারই একটি পত্রিকা ‘দিয়ারিও স্পানঞল’-এ প্রকাশিত বেশ কিছু রচনায় তিনি তাঁর নিজস্ব নন্দনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন যা Ultraism-এর সাহিত্য আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে বিরাট ভূমিকা রাখে। একই বছর নভেম্বরে তাঁর চাচাত ভাই গিইয়ের্মো হুয়ান, নোরা ল্যাং, রবের্তো আর্তেই, এদুয়ার্দ গনজালেস লানুছা এবং ফ্রান্সিস্কো পিনঞেরোর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন তাঁদের প্রথম সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রিজমা’ (Prisma)। এটি ছিলো ছাপাখানায় মুদ্রিত দেয়াল পত্রিকা। মাত্র দুটো সংখ্যা বেরিয়েছিলো। কাছাকাছি সময়ে অন্য একটি সাহিত্য পত্রিকা ‘নসত্রোস’-এ বোর্হেস প্রকাশ করেন Ultraism ইশতেহার। এই আন্দোলন স্পেনের Ultraism-এর বিদেশী সংস্করণ হলেও তা হুবহু অনুকরণ ছিলো না মোটেই। তা আলাদা হয়ে গিয়েছিলো বোর্হেসের নিজস্ব নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে যার বিকীরণ আমরা দেখতে পাবো তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থে। রোমান্টিক মেজাজ থেকে উৎসারিত এই বইয়ের বেশির ভাগ কবিতায়ই উপস্থাপিত হয়েছে শহরের অচেনা মোড়, নিঃসঙ্গ স্থানসমূহ আর সূর্যাস্ত; কবিতার বিষয় হিসেবে এসব নিতান্তই সাধারণ কিন্তু নতুন নতুন রূপক, ফ্রি ভার্স ছন্দের উদ্বোধন এবং এদেরকে (হাইনরিশ) “হাইনের The North Sea-এর আদলে বিন্যাস্ত”১৮ করাই ছিলো বোর্হেসের লক্ষ্য। সর্বোপরি, আরও যেটা গুরুত্বপূর্ণ তাহলো এই বইয়ের মাধ্যমে তিনি, অধিবিদ্যক অনুষঙ্গের ব্যবহার করেন যা আমরা তাঁর পরবর্তী জীবনে সর্বদাই প্রধান প্রবণতা হিসেবে উদযাপিত হতে দেখবো। এই বইয়ের অন্তর্গত ‘ভোর’ কবিতার কিছু অংশ পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি:
পুনরায় অনুভব করি আমি শোপেনহাওয়ার,
বার্কলির তীব্র অনুমান :
পৃথিবী মনেরই কারুকাজ
আত্মার স্বপ্ন এক,
………………….
যদি সবই বস্তুবিহীন
আর যদি জনপূর্ণ বুয়েনোস আইরেস
তুল্য হয় জটিল আবর্তে পড়া সৈন্যের মতো
তাহলে তা খোয়াবের চেয়ে বেশি কিছু নয়।
‘ট্লন, উকবার, অরবিস টারশিয়াস,’ ‘প্ররোহী পথের বাগান,’ ‘চক্রাকার ধ্বংস,’ ‘মৃত্যু এবং কম্পাস’ অথবা ‘গোপন দৈব’ নামক গল্পগুলোতে বোর্হেস অধিবিদ্যক চেতনার পরিপ্রেক্ষিতে স্বপ্ন ও বাস্তবতার যে ভ্রাতৃবন্ধন রচনা করেছিলেন তার বীজ বোনা ছিলো এই প্রথম কাব্যগ্রন্থেই। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মজৈবনিক প্রবন্ধে বোর্হেস তাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেন না: “আমি কখনোই ঐ বইয়ের বাইরে ঘোরাফেরা করিনি। আমি মনে করি ঐ বইয়ে যে বিষয়গুলো ছিলো, আমার পরবর্তী লেখায় সেগুলোকেই কেবল বিকশিত করেছি; আমার মনে হয় জীবদ্দশায় আমি কেবল একটি বই-ই বারবার লিখে যাচ্ছি।”১৯
১৯২১ সালে দেশে ফেরার পর বোর্হেসের সাহিত্যিক জীবনে একটি বড় ঘটনা লেখক মাসেদোনিও ফের্নান্দেস-এর সাথে পরিচয়। স্প্যানিশভাষী পাঠকরা আজকাল তাঁকে হয়তো স্মরণ করেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই নতুন নতুন ভাবনার উদ্ভাবক। চিন্তার দিক থেকে ছিলেন একেবারেই মৌলিক। সহজাত প্রবৃত্তির দার্শনিক মাসেদোনিও বোর্হেসের জীবনে যে-প্রভাব রেখেছেন তা আর কোনো লেখকই রাখেননি। রাফায়েল কান্সিনোস আসসেন্স-এর মতো তিনি বহুভাষী পন্ডিত ছিলেন না বটে কিন্তু চিন্তায় তিনি এতটাই স্বচ্ছল ও সজীব ছিলেন যে বোর্হেস তাঁর সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি রাতভর আড্ডা দিয়ে কখনোই ক্লান্ত বোধ করেননি।

কান্সিনোস ছিলেন প্রায় সর্বজ্ঞ; এক জীবন্ত গ্রন্থাগার। মাসেদোনিও ছিলেন বিশুদ্ধ চিন্তার এক স্বতঃস্ফূর্ত ফোয়ারা। কান্সিনোস-এর কাছে বোর্হেস শিখেছিলেন বহু ভাষায় বহু পাঠের আনন্দ আর মাসেদোনিওর কাছে শিখেছেন দার্শনিক চিন্তায় সিক্ত হওয়ার আমোদ। বোর্হেসের লেখক জীবনে যে এই দুজনের মেলবন্ধন ঘটেছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই, তবে মাসেদোনিওর প্রভাব বোর্হেসে অনেক বেশি গভীর। আমি শুধু দুএকটি উদাহরণ দিয়ে মাসেদোনিওর প্রসঙ্গটি শেষ করতে চাই। বোর্হেস সম্পর্কে হুয়ান হোসে সায়ের-এর একটি লেখা পাঠকরা নিশ্চয় লক্ষ্য করে থাকবেন যেখানে বলা হয়েছে মাসেদোনিও দুটি উপন্যাস লিখেছিলেন, একটি “ আদ্রিয়ানা বুয়েনোস আইরেস যেটির উপশিরোনাম ‘সবশেষ খারাপ উপন্যাস’ অন্যটির নাম শ্বাশত উপন্যাসের স্মৃতিশালা যার উপশিরোনাম হচ্ছে ‘প্রথম ভালো উপন্যাস’। সবশেষ খারাপ উপন্যাসটি হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস নিয়ে একটা প্যারোডি। সাংস্কৃতিক কারখানা যাকে বলা হয় বা অভিহিত করা হচ্ছে সেখানে আন্তুর্জাতিক পর্যায়ের সকল সাহিত্যে আজও কিভাবে এর চর্চা হচ্ছে তা নিয়ে এক কৌতুকাবহ উপন্যাস। মাসেদোনিও ফের্নান্দেস-এর ‘প্রথম ভালো উপন্যাস’ বা ‘শ্বাশত উপন্যাসের স্মৃতিশালা’ মূলত একরাশ ভূমিকা; গোটা উপন্যাসটিই হচ্ছে প্রকাশিতব্য এক উপন্যাসের ভূমিকাসমূহের এক দীর্ঘ তালিকা যে-উপন্যাস আর কখনোই প্রকাশিত হয় না।”২০ উপন্যাস লেখা নিয়ে এই নেতিবাচক কৌতুক, Mocary বা Joke যাই বলি না কেন; এর ছাপ বোর্হেসের জীবনে সব সময়ই রয়ে গেছে। জীবনে কখনোই উপন্যাস লেখেন নি। এমনকি উপন্যাস না লেখার পেছনে যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন; “যার মৌখিক (Oral) প্রকাশ কয়েক মিনিটেই করা সম্ভব তার জন্য পাঁচশ পৃষ্ঠা নেয়ার কী দরকার? ” মাসেদোনিওর এই দুটি বইয়ের অন্য আরেকটি দিকও বোর্হেসকে প্রভাবিত করেছিলো। যেমন, নাম এবং উপশিরোনামের মাধ্যমে গ্রন্থের মূল বিষয়টিকে পরস্পর-বিরোধী করে তোলার কৌতুকাবহ বৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালে বোর্হেসের ‘সময়ের নতুন খন্ডন’ (New Refutation of time) নামক মক-সীরিয়াস (Mock Serious) প্রবন্ধে ব্যবহার করেছেন। বোর্হেস নিজেই এক সাক্ষাৎকারে এই কৌতুকের কথা স্বীকার করেছেন: “শিরোনামের মধ্যে এক পরিহাস (Irony) লুকিয়ে আছে, সময়ের যদি অস্তিত্বই না থাকে, তা হলে তা খন্ডন করবে কীভাবে। কিন্তু আমি যখন একে ‘সময়ের নতুন খণ্ডন’ বলে অভিহিত করি, তখন আমি নিজেকে নিয়ে এক ধরনের মজা (Joke) করছি। ” মাসেদোনিও-কৌতুকের প্রবণতাকে বোর্হেস আরও সূক্ষ্ম এবং পরোক্ষভাবে ব্যবহার করেছেন তাঁর বিখ্যাত ‘পিয়ের মেনার্ড, দন কিহোতের লেখক’ গল্পেও। এই গল্পের বিষয় বা শৈলী একান্তই বোর্হেসীয় কিন্তু এর কৌতুককর ভঙ্গীর উপর রয়েছে মাসেদোনিওর দূরাগত প্রভাব। মাসেদোনিওর প্রভাব বোর্হেসের উপর আরেকটি ক্ষেত্রেও রয়েছে। মাসেদোনিওর মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস নিয়ে যে-নেতিবাচক প্যারোডির শুরু, বোর্হেসে এসে তা শুধু নেতিবাচকই নয়, পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানে এসে শেষ হয়। এই কারণে আমরা লক্ষ্য করবো যে-ওর্তেগা ই গাসেৎকে বোর্হেসের প্রথম গুরু কান্সিনোস বাজে দার্শনিক হিসেবে অবজ্ঞা করেছেন, বোর্হেস তাঁকে উড়িয়ে দিয়েছেন মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের ওকালতির অভিযোগে। এমন কি তাঁর প্রথম গুরুর অনুসারে দার্শনিক হিসেবেও গাসেৎকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন নি।
মাসেদোনিও আলাপ আলোচনায় বলতেন আমরা হচ্ছি স্বপ্নের তৈরি, তিনি বিশ্বাস করতেন যে আমরা স্বপ্নের জগতে বাস করি। সত্য জানা সম্ভব কিনা এ নিয়েও ছিলো তাঁর সংশয়। মাসেদোনিওর এরকম ধারণা ও সংশয়, আমরা এখন জানি, তা শোপেনহাওয়ার, বার্কলি প্রমুখের প্রতিধ্বনি হলেও বোর্হেসের নির্মিত জগত থেকে তা ভিন্ন কিছু নয়। তাঁর অসাধারণ চিন্তা-শক্তি আর প্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্বের জন্য বোর্হেস তাঁর প্রতি সব সময়ই ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। ভালোবাসার এই মানুষটি সম্পর্কে বোর্হেসের চূড়ান্ত বক্তব্য ছিলো এই রকম: “মাসেদোনিওর মতো আর কেউ-ই আমার উপর এত গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেন নি।”

১৯২১ থেকে ১৯২৩ সাল এই একটি দশক বোর্হেসের জীবন নিবেদিত ছিলো পুরোপুরি কবিতা এবং প্রবন্ধ রচনায়। পাশাপাশি এই সময়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে ‘প্রোয়া’ (Proa) নামক সাহিত্য পত্রিকার সাথে সংযুক্ত হওয়া এবং আর্হেন্তিনার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক রিকার্দো গুইরাল্দেসেরsup>২১* সাথে পরিচয় ঘটার কারণে। পাশাপাশি ‘মার্তিন ফিয়েররো’ নামক আর্হেন্তিনার প্রভাবশালী সাহিত্য পত্রিকার নিয়মিত লেখক হয়ে ওঠেন এবং ১৯২৫ সালে পরিচিত হন লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং Sur-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সাথে। এই একই বছর প্রকাশিত হয় বোর্হেসের দ্বিতীয় কবিতার বই লুনা দে এনফ্রেন্তে (Luna de Enfrente) এবং তাঁর প্রথম প্রবন্ধের বইইনকিসিসিওনেস (Inquisiciones)। ১৯২৬ সালে বের হয় তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধের বই আমার আশার আয়তন (El tamaño de mi Esperanza) এবং ১৯২৮ সালে তৃতীয় প্রবন্ধের বইআর্হেন্তিনোদের ভাষা ( El idioma de los Argentinos)। মাঝে চার বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ১৯৩২ সালে আলোচনা(Discusion) নামে তাঁর চতুর্থ প্রবন্ধের বই। ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয় তাঁর আরও একটি কবিতার বই সান মার্তিন নোটবুক (Cuaderno san Martin) ১৯২৯ সালে। কবিতার বই দিয়ে আত্মপ্রকাশ হলেও বোর্হেসের সৃষ্টির প্রথম দশক কবিতা এবং প্রবন্ধ, পাশাপাশি দুই যমজ নদীর মতো প্রবাহিত ছিলো।
ইনকিসিসিওনেস-এর মাধ্যমে যে-প্রাবন্ধিক বোর্হেসের শুরু তার শেষ ১৯৮২ সালে প্রকাশিত দান্তে সম্পর্কে নয়টি প্রবন্ধ(Nueve ensayos Dantescos) গ্রন্থের মাধ্যমে।ইনকিসিসিওনেস-এ স্পেন এবং বুয়েনোস আইরেস-এ সংঘটিত Ultraist সাহিত্য-আন্দোলন, পুরোনো এবং নতুন আর্ভগার্দ লেখক, যেমন তাঁর গুরু রাফায়েল কান্সিনোস, রামোন গোমেস দে লা ছেরনা, জেমস জয়েস-এর ইউলিসিস এবং আর্হেন্তিনার গাউচো (Gaucho) লেখকদের রচনাকর্ম আলোচিত হয়েছে। এবং এদের রচনাকর্ম আলোচনার সূত্রে বোর্হেস নতুন শিল্পতত্ত্বের উপকরণসমূহ বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছেন বিভিন্ন প্রবন্ধে। সাহিত্যের বাস্তবতা এবং বাস্তবতার সাহিত্য নিয়ে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ তার পরবর্তী গল্পসমূহের শিল্পতাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরির জন্য মাঠ পর্যায়ের কাজের আদি নমুনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে এই বইটি। পাশাপাশি বজায় ছিলো সাহিত্যে আঞ্চলিকতাবাদ বা স্বাদেশিকতার মোটাদাগের উপস্থিতি নিয়ে তাঁর উদ্বেগ। এমনকিআলোচনা গ্রন্থেও তা অটুট ছিলো, তবে তা গুণগতভাবে বদলে গেছে অনেকটাই। এই গ্রন্থে এসে তিনি প্রথাবাহী কিছু কিছু ধারণাকে আক্রমন করেছেন; তবে তা করেছেন মার্জিত উপায়ে সুক্ষ্নতর রসবোধের মাধ্যমে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বোর্হেসের নিজস্ব শিল্পতত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ রূপটি পাওয়ার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ১৯৫২ সালে প্রকাশিত অন্য ইনকিসিসিওনেস (Otras Inquisiciones) বইটির জন্য।

প্রায় ছেষট্টি বছরের দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে বোর্হেস বারশ’র মতো প্রবন্ধ, ভূমিকা, পুস্তকালোচনা, চলচিত্র-সমালোচনা, অভিভাষণ, সংক্ষিপ্ত-জীবনী (Capsule Biographies), ঐতিহাসিক জরিপ এবং রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা লিখেছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে তার সীমাহীন কৌতূহল আর অপরিমেয় পাণ্ডিত্য এই প্রবন্ধগুলোকে দিয়েছে একেবারেই ভিন্ন এক চেহারা, বিপুল ও বিরল সব তথ্য এবং অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের ফলে এগুলো এতটাই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে যে-কোন পাঠকের পক্ষেই তা একান্তভাবে বোর্হেসীয় বলে শনাক্ত করা সম্ভব। এই সব প্রবন্ধে তথ্যের যে-সন্নিবেশ আমরা দেখি তাও প্রায়শ আহরিত ঐতিহাসিক তথ্যের নির্জনতম জায়গাগুলো থেকে অর্থাৎ আজকাল অনেকেই যে-সব তথ্যসমূহ খুব একটা নেড়েচেড়েও দেখেন না। প্রচলিত ও অপ্রচলিত সব ধরনের তথ্যের সন্নিবেশে বোর্হেস তাঁর প্রবন্ধের মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় সামগ্রিক চেহারা আমাদের সামনে হাজির করেন। তাঁর প্রবন্ধের তুলনা দেয়া যেতে পারে তাঁরই রচিত বিখ্যাত গল্প ‘আলেফ’-এর সাথে যেখানে বুয়েনোস আইরেস-এ অবস্থিত এক বেজমেন্ট-এর উল্লেখ করা হয়েছে, যে-বেজমেন্ট থেকে পৃথিবীর সব কিছু দেখা যায়।
অক্তাবিও পাস বোর্হেসের প্রবন্ধের বৈশিষ্ট সম্পর্কে যে-মন্তব্য করেছেন তা প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় বোর্হেসের অনুরাগীদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি এই সুযোগে: “তাঁর প্রবন্ধগুলো অবিস্মরণীয়, প্রধানত তাদের মৌলিকত্ব, বৈচিত্রময়তা ও ভঙ্গীর জন্য। কৌতুকবোধ, গাম্ভীর্য, তীক্ষ্নতা এবং হঠাৎ করেই অসামান্য বাঁক। স্পেনীয় ভাষায় আর কেউ ওরকমটি লেখেননি। বোর্হেসের আদর্শ রেইয়েস ছিলেন আরো নির্ভুল ও স্বচ্ছন্দ, কিন্তু কম সূক্ষ্ম ও বিস্ময়ের। অনেক বেশি শব্দে বলেছেন কম; আর বোর্হেসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিলো পরিমিতির মধ্যে অপরিমেয়কে ঠাসা। তবে অতিশয়োক্তি করেন না; গ্রেসিয়ানের মতো প্রতিভার সূঁচ দিয়ে তিনি শব্দকে বাক্যের শরীরে গাঁথেননি কিংবা অনুচ্ছেদকে একটি সুষম বাগানে পরিণত করেননি। সারল্য এবং অত্যাশ্চর্যতা—এই দুই বিপরীত স্বর্ণকে বোর্হেস উন্মুক্ত করেছেন। প্রায়শঃই এ দুটোকে তিনি একত্রিক করতেন এবং এর ফলাফল ছিলো অবিস্মরণীয়: অসাধারণের স্বাভাবিকতা ও পরিচিতির অদ্ভুতত্ব’২২। এসবের পাশাপাশি তাঁর প্রবন্ধগুলোর রয়েছে এক গল্পসুলভ চরিত্র, অভাবনীয় মোচড়, তির্যকতা, এবং অচিন্তনীয় সমাপ্তি। কখনো কখনো তা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে আপাত-দৃষ্টিতে চরিত্র-বিরোধী কাব্যময়তার দুর্লভ আভায়। তাঁর কৌতুকাবহ বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘সময়ের নতুন খন্ডন’-এর বাক্যগুলো শেষ হয়েছে এভাবে ‘সময় হচ্ছে সারাৎসার যা থেকে জন্ম আমার। সময় হলো নদী আমাকে যা ভাসিয়ে নিয়ে যায়; তবে আমিই নদী; এ হচ্ছে এক বাঘ যা আমায় ছিন্নভিন্ন করে, তবে আমিই বাঘ; এ হচ্ছে এক আগুন যা আমায় খেয়ে ফেলে, তবে আমিই সেই আগুন।’
সন্দেহ নেই যে এই সমাপ্তি আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় তারই এক প্রিয় লেখক এমার্সনের Brahma নামক কবিতার সেই চরণগুলা যেখানে তিনি বলছেন:
They recon ill who leave me out;
When me they fly, I am the wings;
I am the doubter and the doubt,
I am the hymn the Brahmin sings.

এধরনের কাব্যবোধ ও গুণের সংশ্লেষে তিনি কোন কোন প্রবন্ধকে নিয়ে গেছেন বাচনিক সৌন্দর্যের স্বর্গে। কখনো কখনো কোন লেখক নিয়ে মাত্র এক পৃষ্ঠার ছোট আলোচনায় গভীরতা, তুল্যমূল্য ও পাঠ অভিজ্ঞতার আবেগময় দীপ্তিসহ হাজির হন তিনি। বিরুদ্ধ মতকে কখনো কখনো খন্ডন করেন তীর্যকতা ও শ্লেষের ক্ষুরধার অস্ত্রে। এর এক উদাহরণ দেখা যাবে দস্তয়েভস্কির Demons এর আলোচনা প্রসঙ্গে। রুশ সাহিত্য সম্পর্কে যদিও তিনি খুব একটা সপ্রশংস ছিলেন না, তবে চেখফ ছিলেন এর ব্যতিক্রম এবং দস্তয়েভস্কির কোন কোন রচনাও।Demons-এর স্প্যানীশ সংস্করণের ভূমিকা তিনি শেষ করেছেন এইভাবে :“রুশ সাহিত্য সংকলনের এক ভূমিকায় ভøাদিমির নবোকভ বলেছেন যে অন্তর্ভুক্ত করার মতো দন্তয়েভস্কির একটি পাতাও তিনি খুঁজে পাননি। এর মানে হচ্ছে এই যে দস্তয়েভস্কিকে প্রতিটি পাতা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয় বরং বইয়ের তাবৎ পৃষ্ঠার সামগ্রিকতা দিয়েই বিচার করা উচিৎ।”২৩

প্রবন্ধে তাঁর আকস্মিক মোচড় বা অভাবনীয় উপসংহারের দুয়েকটি দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাবো ‘কাফকা এবং তার পূর্বসূরী’ প্রবন্ধে। প্রবন্ধের শুরু কাফকার আগের লেখকদের মধ্যে কাফকার বীজ অনুসন্ধানের মাধ্যমে। বোর্হেস একের পর এক জেনোর কুটাভাস (Paradoxes), নবম শতকের লেখক হান ইউ, কিয়ের্কেগার্ড প্রমুখের রচনার সাথে কাফকার সাদৃশ্য তুলে ধরেছেন।
অর্থাৎ কাফকা এদের দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু বোর্হেস তাঁর যাদুকরী বিশ্লেষণ শক্তি এবং অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে আমাদেরকে ভাবনার উল্টো স্রোতে নিয়ে বলেন: “এই সমস্ত লেখায়ই (পূর্বসূরীদের) আমরা কাফকার মেজাজ কম বেশি খুঁজে পাই, কিন্তু কাফকা যদি একটি বাক্যও না লিখতেন, তাহলে এই গুণটি আমরা উপলব্ধি করতাম না। … মূল ব্যাপার হচ্ছে সব লেখকই তাঁর নিজের পূর্বসূরী সৃষ্টি করেন।” বোর্হেসের আগে আর কোনো লেখকই পূর্ববর্তী লেখকদের সাথে পরবর্তী লেখকদের ধারণার ঐক্যকে এভাবে ব্যাখ্যা করেননি। শুধুমাত্র সৃষ্টিশীল লেখকই নয়, এমন কি অনুবাদকদের সম্পর্কেও তার ধারণা এতটাই নতুন এবং চমৎকারিত্বে ভরা যে অনুবাদককে আপনি প্রচলিত ধারণায় ‘অনুবাদক’ না বলে আরেক ‘সৃষ্টিশীল’ লেখক বলেই মেনে নেবেন। ‘এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ডের ধাঁধা’ প্রবন্ধে ওমর খৈয়াম এবং তাঁর অনুবাদক ফিটজেরাল্ড সম্পর্কে আমাদেরকে এটা বিশ্বাস করাতে পারেন যে “যে-কোন যৌথ (Collaboration) কাজই রহস্যময়। এই ক্ষেত্রে একজন ইংরেজ এবং একজন ইরানীর মধ্যে সেটা ছিলো আরও বেশি, কারণ উভয়ই ছিলেন খুব ভিন্ন প্রকৃতির এবং জীবনে তাদের কোন বন্ধুত্ব হয়নি। মৃত্যু, নিয়তির উত্থান-পতন এবং সময়ই একজনের সাথে আরেকজনের পরিচয় ঘটিয়েছিলো এবং উভয় মিলে পরিণত হয়েছিলেন একজন কবিতে।”

জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেছিলেন, কবিতা ও জীবন: একই বস্তুর দুই রকম উৎসারণ। বোর্হেসের ক্ষেত্রে একথা ছিলো সর্বাংশে সত্য। তার জীবন ছিলো পুরোপুরি সাহিত্যকেন্দ্রিক। এমনকি, লেখালেখির বাইরে যৌবনে বা মধ্যবয়সে যে-সব পেশায় নিয়োজিত ছিলেন সেগুলোও ছিলো সাহিত্য-সম্পর্কিত বা গ্রন্থকেন্দ্রিক। দু দু’বার তিনি গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই পেশা ছিলো তাঁর জন্য পুরোপুরি যথাযথ এবং প্রবণতার অনুকূল। ফলে গ্রন্থ এবং সাহিত্যিক আবহের বাইরে তাঁর অন্য কোন জীবন ছিলো না। এই কারণে ব্যক্তি-বোর্হেস এবং লেখক-বোর্হেসের মধ্যে তাঁর কাছে কোন পার্থক্য ছিলো না। তাঁর সেই আত্মজৈবনিক বিখ্যাত প্যারাবল ‘বোর্হেস এবং আমি’র কথা নিশ্চয় সবার মনে পরবে যেখানে তিনি বলেছেন যে : ‘আমি বাঁচি, নিজেকে বেঁচে থাকতে দেই যাতে বোর্হেস তার সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারে।’ কিন্তু শেষ বাক্যটিতে দুই বোর্হেস-এর ভেদরেখাটি সস্পর্কে আমাদেরকে গভীর সন্ধিগ্ধ করে তোলেন এই বলে : ‘জানি না আমাদের মধ্যে কে এই পাতাটি লিখছে’। আমরা তা কখনোই জানতে পারবো না কারণ দুই বোর্হেসের জীবন ছিলো গভীরতর অর্থেই অবিভাজ্য। তবু, আমাদের কৌতূহল থেকেই যায় ব্যক্তি-বোর্হেস সম্পর্কে যিনি লেখক বোর্হেসকে সাহিত্য সৃষ্টির সুযোগ করে দেন।


হে প্রেম হে নৈঃশব্দ
বলেছিলাম যে ১৯২১ থেকে ১৯৩২ এই একটি দশক ছিলো বোর্হেসের কবিতা এবং প্রবন্ধের সূচনাকাল। প্রথম প্রেমেরও সূচনা এই সময়কালের মধ্যেই। ১৯২১ সালে বোর্হেসের পরিচয় হয় কন্সেপসিওন গেররেরোর সাথে। বোর্হেসের জীবনে প্রথম প্রেম। দুই বছরেরও বেশি সময় টিকে ছিলো তাঁদের এই সম্পর্ক। বোর্হেসের দিক থেকে এ সম্পর্ক ছিলো খুবই গভীর, যে কারণে আমরা দেখবো বোর্হেসের বাবার চোখের চিকিৎসার জন্য যখন দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপে যান তখন প্রেমিকা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ভাবনা তাঁকে গভীরভাবে বিষণ্ন করে তুলেছিলো। এই সময় তাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন বেশ কিছু কবিতাও। তার সাথে বিয়ের পরিকল্পনাও করেছিলেন বোর্হেস। কিন্তু ইউরোপ থেকে ফিরে তিনি প্রেমিকাকে যখন লম্বা বেণির পরিবর্তে খাটো চুল আর সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত দেখতে পান তখন সেখানেই সম্পর্কের ইতি টানেন। বোর্হেসের একাধিক প্রেমের মধ্যে এটাই একমাত্র যেখানে তিনিই কাউকে ত্যাগ করলেন। অন্যদিকে, বাকি সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে বোর্হেসই ছিলেন বরাবর পরিত্যক্ত (Toda Las demas Vecces el abandonado sera siempre el. ২৪)। বোর্হেসের জীবনে এক গভীর পরিহাস এই যে যিনি সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক অনিবার্য ব্যক্তিত্ব, তিনিই নারীদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত হয়েছেন বারবার। প্রায় ২৩ বছর পর তিনি আবারও যখন প্রেমে পড়েন তার চেয়ে অর্ধেক বয়সী এস্তেলা কান্তোর সাথে, তখনও তিনি ভাবেননি যে এস্তেলা অনতিবিলম্বে সংসার পাতবেন, বোর্হেসের সাথে নয়, অন্য কারো সাথে। বোর্হেস আরও একবার হতাশার অতলে নিমজ্জিত হন। কিন্তু ভালোবাসার আগুন তাতে নির্বাপিত হয়ে যায়নি চিরকালের জন্য। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিয়ের প্রস্তাব করেছিলেন Ultraist যুগের সাহিত্য সহযাত্রী নোরা ল্যাং, সেসিলিয়া ইনহেনিয়েরোস এবং তাঁর সচিব ও ভ্রমণসঙ্গী মারিয়া এস্তের বাসকেসকে। কারোর পক্ষ থেকেই অনুকূল সাড়া মেলেনি। অবশেষে ৬৮ বছর বয়সে সাড়া মেলে এমন একজনের কাছ থেকে যিনি ছিলেন বোর্হেসের যৌবনের প্রেমিকাদের একজন। বোর্হেসের প্রেম উপেক্ষা করে তিনিও বিয়ে করেছিলেন অন্য কাউকে, তবে এখন তিনি বিধবা। তিনি এল্সা আস্তেতে। বোর্হেসের প্রথম দিককার ফরাসী অনুবাদক নেস্তর ইবাররার স্ত্রীর সাত বোনের একজন এই আস্তেতে। বিয়ে টিকেছে মাত্র তিন বছর। এই তিন বছরের অভিজ্ঞতাকে তিনি নথিবদ্ধ বা অভিহিত করেছেন ‘তিনটি বছর জলাঞ্জলী’ (Tres años Perdidos) বলে। এর পরও তিনি বিয়ে করেছিলেন আরও একবার, মৃত্যুর মাত্র মাস দেড়েক আগে তাঁর শেষ জীবনের ভ্রমণসঙ্গী ও শিক্ষার্থী মারিয়া কোদামাকে। যদিও এই বিয়ে যতটা না স্বেচ্ছায় তারও চেয়ে বেশি কোদামার সঙ্গ, সহযোগিতা যত্নআত্তির প্রতি এক পুরস্কার হিসেবেই মনে করেন সবাই।

নারীর মধ্যে তিনি দীর্ঘস্থায়ী আশ্রয় না পেলেও গ্রন্থের অন্তহীন নির্জন প্রান্তরে তাঁর তৃপ্ত পদচারণাকে তিনি নিয়তির আশীর্বাদ হিসেবেই বরণ করে নিয়েছেন। এর বাইরে আরও একটি প্রান্তর তিনি নিজে নিজে রচনা করে গেছেন–সৃষ্টির প্রান্তর–তার অসাধারণ সাহিত্যসম্ভার: কবিতা, প্রবন্ধ এবং গল্পসমূহ। আমরা এ পর্যন্ত বোর্হেসের কবিতা এবং প্রবন্ধের সাথে খানিকটা পরিচিত হলেও গল্পকার বোর্হেস সম্পর্কে কিছুই জানতে পারিনি। বিশ্বব্যাপী বোর্হেসের প্রধান পরিচয় মূলত গল্পকার হিসেবে হলেও গল্পকার বোর্হেসের আত্মপ্রকাশ কিন্তু তিনটি কবিতার বই বুয়েনোস আইরেসের জন্য আকুলতা (Fervor de Buenos Aires, 1923) সামনের চাঁদ (Luna de Enfrente, 1925), সান মার্তিন নোটবুক (Cuaderno San martin, 1929) এবং পাঁচটি প্রবন্ধের বই ইনকিসিসিওন(Inquisiciones, 1925), আমার আশার আয়তন (El tamaño de mi esperanza, 1926) আর্হেন্তিনোদের ভাষা(El idioma de Los Argentinos,1928) এবারিস্তো কাররিয়েগো (Evaristo Carriego, 1930) আলোচনা(Discusion, 1932 ) প্রকাশেরও পরে। ‘ক্রিতিকা’ (Critica) নামের তৎকালীন পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে বোর্হেসের গল্প প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে, আর গ্রন্থকারে গল্পের প্রকাশ ঘটে বছর দুয়েক পরে, ১৯৩৫ সালে। অখ্যাতির বিশ্বজনীন ইতিহাস (Historia Universal de la Infamia)–এই বইয়ের মাধ্যমে বোর্হেস তাঁর বৈশিষ্ট্যের এবং প্রবণতার মৌলিকতা নিয়ে হাজির হন স্প্যানিশ সাহিত্য। সত্যি ঘটনাকে কীভাবে কল্পনায় বা অবাস্তবতায় উত্তীর্ণ করতে হয় কিংবা উল্টোভাবে বললে কল্পনাকে কীভাবে বাস্তবের ঘটনার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করা সম্ভব তার দুঃসাহসিক কাজের সূত্রপাত ঘটে এই বইয়ের মাধ্যমে। পরবর্তীতে সাহিত্যতাত্ত্বিকরা যাকে ‘ফিকটিশাস ফ্যাক্ট এবং ফ্যাকচ্যুয়াল ফিকশন’ বলে চিহ্নিত করেন তার শুরু বোর্হেসের মাধ্যমেই। যদিও অখ্যাতির বিশ্বজনীন ইতিহাস-এ ফ্যান্টাসির বোর্হেসীয় বৈশিষ্ট্য থাকলেও তা অধিবিদ্যক রসে স্নাত হয়নি। আমরা সেটা ঘটতে দেখবো আরো পরে প্ররোহী পথের বাগান নামক গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলোর মধ্যে যেটি স্প্যানিশ ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪১ সালে। তিন বছর পর এই গ্রন্থের গল্পগুলোইফিকসিওনেস (Ficciones) গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয় আরও কিছু গল্পের সঙ্গে। এই গ্রন্থের যে গল্পগুলো বিশ্বব্যাপী পরিচিত এবং আলোচিত তার কয়েকটি আমরা এখানে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরখ করার চেষ্টা করবো। আমাদের হয়তো মনে পরবেফিকসিওনেসই ছিলো বহির্বিশ্বে প্রবেশের ক্ষেত্রে বোর্হেসের প্রথম পাসপোর্ট। এই গ্রন্থের আশ্চর্য মৌলিকতা এবং নতুন সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গী সাহিত্যের পাঠক, গবেষক, সমালোচক ও সাহিত্যতাত্ত্বিকদের মধ্যে সীমাহীন চাঞ্চল্য এনে দিয়েছিলো। এটি এখন সাহিত্যের এক ক্যানোনিক্যাল (Canonical) কাজ। তৎকালীন লাতিন আমেরিকান রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক পরিপ্রেক্ষিতে ফিকসিওনেস-এর চারিত্রিক অভিনবত্ব ও গুরুত্ব বোঝার জন্য আমাদেরকে ফিরে তাকাতে হবে ১৯০৮ সালে প্রকাশিত আর্হেন্তিনার লেখক এনরিকে লাররেতা’র দন রামিরোর গৌরব (La gloria de Don Ramiro) নামক উপন্যাসের প্রতি। এটি ছিলো আধুনিকতাবাদ (Modernism)-এর সর্বশেষ প্রধান উপন্যাস। স্পেনের স্বর্ণযুগের সামরিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক শিল্পময় জাগরণ ঘটে এই উপন্যাসে। আবার এই উপন্যাসের মাধ্যমেই সূত্রপাত উপন্যাসের সেই ধারাটির যে-ধারায় একের পর এক যুক্ত হতে দেখা যাবে মেহিকোর মারিয়ানো আসুয়েলার নিচের মহল (Los de abajo,1915) চিলের এদুর্য়াদ বাররিও’রগর্দভ-ভ্রাতা (El Hermano asno 1922), কোলোম্বিয়ার হোসে এউস্তাসিও রিবেরা’র হট্টগোল (La Voragine, 1924), আর্হেন্তিনার রিকার্দো গুইরাল্দেসের দন সেগুন্দ সোম্ব্রা (Don Segundo Sombra, 1926) এবং বেনেসুয়েলার রোমুলো গাইয়েগোসের দোনঞা বারবারা (Doña Bárbara, 1929)। ইউরোপীয় উপন্যাসে ইতিমধ্যে যে-সব শিল্পকৌশল ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো তার কিছু কিছু এই সব লেখকরা এই উপন্যাসগুলোতে প্রয়োগ করেছিলেন। আবার অন্যদিকে, তাঁরা ইউরোপীয় উপন্যাসের বিষয়বস্তুর অনুকরণ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রেখেছিলেন, বিশেষ করে ফরাসী বাস্তববাদী ধারার অনুকরণ থেকে বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন লাতিন আমেরিকার সমস্যা, জীবনশৈলী এবং মূল্যবোধসমূহ। এই কারণে আমরা দেখবো রিবেরা, গুইরাল্দেস এবং গাইয়েগোস তাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন সমতল ভূমি অথবা বিপুল, শূন্য বনরাশির প্রতি। এই ধরনের বিষয়ের নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁরা Naturalist ধারার প্রধান প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। এর পরের দশকের লাতিন আমেরিকান ঔপন্যাসিকরা পূর্বসূরীদের এড়িয়ে নতুন কিছুই করতে পারেননি বরং পূর্ববর্তীদেরই অনুসরণ করেছেন। কখনো কখনো বিষয়ের ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছেন আদিবাসীদের জীবনযাপন ও দৃষ্টিভঙ্গী অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে। ফের্নান্দো সররেন্তিনোর সাথে ১৯৭২ সালে এক সাক্ষাৎকারে বোর্হেস এই সময়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন যে, “আমরা সবাই মনে করি লাতিন আমেরিকার প্রায় সর্বত্রই সাহিত্য রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক ছাড়া আর কিছু নয়, এ হচ্ছে সময় কাটানোর লোকসাহিত্য কিংবা লাতিন আমেরিকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিবরণ।”২৫ এই বক্তব্যে কিছুটা অত্যুক্তি থাকলেও মূলধারাটি কিন্তু ঐ রকমই ছিলো। সাদামাটা বাস্তবতার বাইরে গিয়ে কথাসাহিত্যকে যে নতুন এবং ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীতে চাঙ্গা করে তোলা সম্ভব তা কারোর ভাবনাতেই তখনও পর্যন্ত আসেনি। ষাটের দশকে কুবার লেখক আলেহো কার্পেন্তিয়েরও বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, “আমার করণীয় সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পর থেকেই ভেবেছি লাতিন আমেরিকার লেখকদের উচিৎ অপ্রকাশিত বাস্তবতাকে প্রকাশ করা। এবং সর্বোপরি সাহিত্যকে বিশ্বজনীন মূল্যবোধে উত্তীর্ণ করার মাধ্যমে স্থানিকতার তকমা থেকে বেরিয়ে টিপিক্যালিজম ও ন্যাটিভিজম থেকে মুক্ত করা।’’২৬ কার্পেন্তিয়েরের এই বক্তব্য প্রকাশেরও কয়েক বছর আগে অর্থাৎ ১৯৫১ সালে বোর্হেস তাঁর ‘আর্হেন্তিনীয় লেখক ও ঐতিহ্য’ প্রবন্ধে বলেছিলেন “স্থানিকতা (Local Color) বিষয়ক আর্হেন্তীয় বিশ্বাসটি সাম্প্রতিক ইউরোপীয় ধারণা, যা জাতীয়তাবাদীদের বিদেশী ধারণা বলে পরিহার করা উচিৎ’’ লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যে এর পরে প্রথম যে-পালাবদটি ঘটে তা ফ্রান্সের পরাবাস্তববাদের সূত্রে গুয়াতেমালার লেখক মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস ও আলেহো কার্পেন্তিয়ের মাধ্যমে। আস্তুরিয়াস তাঁর মি: প্রেসিডেন্ট (El Senor President 1946) এ যখন বলেন যে “বাস্তবতা এবং স্বপ্নের মাঝে পার্থক্যটা পুরোপুরি যান্ত্রিক” (Entre la realidad Y el sueño la diferencia es Puramente Mecanica), তখন বুঝতে পারি কথাসাহিত্য তার প্রচলিত গৎ থেকে ভিন্ন পথে হাটতে শুরু করেছে। কিন্তু যে বইটি লাতিন আমেরিকার উপন্যাস এবং গল্পের প্রচলিত গৎ বা কাঠামোcj পুরোপুরি দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে সেটি বোর্হেসের ফিকসিওনেস। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের মানচিত্রকে পুরোপুরি পাল্টে দেয়ার জন্য যে গ্রন্থটিকে এককভাবে সবচেয়ে বেশি দায়ী করা যায় সেটি এই গ্রন্থ। কিন্তু বোর্হেস প্রবহমান বাস্তববাদী বা ন্যাটারালিস্ট ধারার বাইরে গিয়ে কেন তার বইযের এমন শিরোনাম বেছে নিলেন তা খতিয়ে দেখা উচিত। আমরা জানি ফিকশন (Fiction) শব্দের অর্থ কল্পনানির্ভর গল্প। অন্তত অভিধান আমাদেরকে তাই বলে। বোর্হেস কেন তাঁর গল্পের বইয়ের নাম কল্পনানির্ভর গল্প বা কল্পকাহিনী (Fiction) রাখলেন তা আমরা বুঝতে পারবো যখন বাস্তবতা এবং বিশ্বজগত সম্পর্কে তাঁর ধারণাসমূহের সাথে পরিচিত হবো। ‘জন উইলকিন্সের বিশ্লেষনী ভাষা’ নামক প্রবন্ধে তিনি বলছেন “বিশ্বজগত কী জিনিস আমরা কেউ জানি না” (No sabemos Que Cosa es el universo) কিংবা ‘ধাঁধার দর্পণ’ প্রবন্ধে তিনি বলেন : “পৃথিবী অর্থপূর্ণ– এ ব্যাপারে সন্দেহ আছে” (Es dudoso Que el mundo tenga sentido) এবং বাস্তবের ধারণা সম্পর্কে তিনি আমাদেরকে সতর্ক করে দেন এই বলে যে সত্যি সত্যিই যদি ‘বাস্তবতা’ থেকে থাকে তাহলে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব কিনা সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে যায়। এসব কথা যে তিনি নিতান্ত কাব্যিক হেঁয়ালি, ভাষার চাতুরি দিয়ে অর্থহীন বিভ্রম তৈরির জন্য বলেন না তা আমরা লক্ষ্য করবো যখন তিনি এই সব চিন্তার অনুকূলে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির ইতিহাস, দর্শন ও সংস্কৃতি থেকে সাক্ষাৎ তলব করেন। অতএব, বাস্তবিকই যদি না জানি ‘বাস্তব’ আসলে কী, তাহলে কল্পকাহিনী (Fictions) এবং সত্য ঘটনা (Fact)– এই দুইয়ের পার্থক্য আমরা মানবো কী করে। সুতরাং ‘নির্মিত বাস্তবতা(Fictions) দৃষ্ট-বাস্তবতার(Fact) মতোই বাস্তব। কিংবা উল্টোভাবে বললে, দৃষ্ট বাস্তবতা বর্ণনার ক্ষেত্রে আমাদের যে কোন উদ্যোগই কল্পকাহিনী (Fiction) হতে বাধ্য। এইখানেই হচ্ছে বোর্হেসের Ficciones গল্পগ্রন্থের নামকরণের অভিপ্রায়। বোর্হেস বিষয়ক অক্তাবিও পাস তাঁর পূর্বোক্ত প্রবন্ধে বোর্হেসের গল্পের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন যে “বোর্হেসের কবিতা ও গল্পসমূহ একজন কবি ও অধিবিদ্যকের যৌথ আবিষ্কার। এ কারণে এগুলো মানবজাতির দুটো কেন্দ্রীয় মনোবৃত্তি কল্পনা ও যুক্তিকে পরিতৃপ্ত করে।” অর্থাৎ কবির কল্পনা ও দার্শনিকের যুক্তি– পরস্পরবিরোধী এই দুই প্রবণতাকে তিনি প্রতিটি গল্পে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে আমাদের কাছে তা মোটেই বিসদৃশ মনে হয় না, বরং মনে হয় পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। প্রথমেই দেখা যাক তাঁর ‘ট্লোন, উকবার, অরবিস টারশিয়াস’ নামক গল্পটি। কাল্পনিক এক গ্রহের উল্লেখ দিয়ে গল্পের শুরু। আমাদের পৃথিবীরই এক উল্টো সংস্করণ। এ হচ্ছে এক জগত যেখানে বস্তুর (Matter) কোন অস্তিত্ব নেই; কাল্পনিক বিষয়ই হচ্ছে সেখানে ‘বাস্তব’। আঠার শতকের ইংরেজ দার্শনিক জর্জ বার্কলীর বাস্তবতা সম্পর্কিত তত্ত্বের ভিত্তিতে তৈরি এক জগত। এখানকার, মানে “উকবারের সাহিত্য ছিলো অদ্ভুত চরিত্রের এবং দেশটির মহাকাব্য ও কিংবদন্তী কখনোই বাস্তবের কথা উল্লেখ করেনি” আর “এই গ্রহের জাতিগুলো সহজাতভাবেই ভাববাদী। তাদের ভাষার এবং তার নানা শাখার যেমন, ধর্ম, সাহিত্য ও অধিবিদ্যা- এসবের পূর্বশর্ত হচ্ছে ভাববাদ।” এমনকি এর ভাষার চরিত্রও একেবারে আলাদা, কারণ একাধিক বিশেষণের সমাহারে গঠিত হয় বিশেষ্যপদ। “এই গ্রহের লোকজন বিশ্বকে একটি ধারাবাহিক মানসিক প্রক্রিয়া বলে মনে করে।” এছাড়া “ট্লনের দার্শনিকরা সত্যের, এমন কি সত্যের কাছাকাছি কোন কিছুর অন্বেষণ করেন না। তারা বরং খুঁজছেন এক ধরনের বিস্ময়। তারা অধিবিদ্যাকে কাল্পনিক (ফ্যান্টাস্টিক) সাহিত্যের শাখা বলে জ্ঞান করে”। গল্পটি আদ্যপান্ত পাঠ শেষে পাঠক লক্ষ্য করবেন যে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের এই ভিন্ন গ্রহের বর্ণনার মাধ্যমে বোর্হেস মানবজাতির চিন্তাজগতের আদলটি ধীরে ধীরে উপস্থাপন করতে থাকেন। এই ভিনগ্রহের বর্ণনা যতই এগিয়ে যেতে থাকে, তিনি ধীরে ধীরে এর উপর আমাদের পৃথিবীরই ছায়া ফেলতে থাকেন; জ্ঞানের একেবারেই ভিন্ন এক তাত্ত্বিক ভিত্তিতে উপস্থাপনের মাধ্যমে এই গ্রহটিকে বোর্হেস আমাদেরই এক অপ্রকাশ্য জগত হিসেবে ক্রমশঃ উন্মোচন করতে থাকেন। কল্পনার মাধ্যমে বোর্হেস প্রবেশ করেন বাস্তব জগতে। শুধু বাস্তব জগতই নয়, এমনকি তিনি তৎকালীন বিশ্বের রাজনৈতিক ঘটনাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে ভোলেন না। এই গল্পের ব্যাখ্যার সূত্রে ফ্যান্টাসি, অধিবিদ্যা এবং দর্শন বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীকে পাঠকদের কাছে পরিস্কার করে তুলতে চাই। কারণ, এই গল্পের মতো তাঁর অন্যান্য গল্পেও উক্ত বিষয়গুলো আকর্ষণীয় ফাঁদ হিসেবে পাতা রয়েছে মোমিন পাঠকদের জন্য। এসবের পাশাপাশি তাঁর গল্পগুলোর রয়েছে ছদ্মগাম্ভীর্যের অদ্ভুতুড়ে বৈশিষ্ট্য যা বুদ্ধিমান, বিদগ্ধ পাঠকদেরও বিপাকে ফেলে দেয়। তাঁর গল্প পাঠ মানে পাপীষ্ঠের পুলসিরাত পার হওয়া। অর্থাৎ হড়কে যাওয়ার সম্ভাবনাটা মাত্র এক চুল অসতর্কতার ওপর নির্ভর করে। অতএব সতর্কতার সঙ্গে তাকালে দেখবো ট্লনের দার্শনিকদের মতো বোর্হেস (যেন বোর্হেস নিজেও একটি কাল্পনিক চরিত্র ছাড়া কিছু নন!) নিজেও বিশ্বাস করেন যে অধিবিদ্যা এবং ধর্মতত্ত্ব কাল্পনিক (ফ্যান্টাসি) সাহিত্যেরই এক শাখা। ফলে গল্পে যখন তিনি এই বিষয়গুলো ব্যাবহার করেন, তিনি তখন এসব ব্যবহার করেন নিছকই গল্পের কাঠামো হিসেবে; কোন দার্শনিক সত্যে পৌঁছার জন্যে নয়। কারণ তিনি “সত্যের কাছাকাছি কোন কিছুর অন্বেষন করেন না।” “বরং এক ধরনের বিস্ময়”-এর মুখোমুখি পাঠককে দাড় করানোই তাঁর লক্ষ্য।
বোর্হেসের সব ধরনের লেখাতেই বিভিন্ন দার্শনিক শৃঙ্খলার উপর্যুপরি উল্লেখ পাঠকদের মনে এই ধারণার জন্ম দিতে পারে যে দর্শনের দ্বারা যিনি এতটা পরিস্নাত তাঁর দার্শনিক অবস্থানটি আসলে কী? আমরা জানি যে বোর্হেস ছোটবেলা থেকেই দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট, এমনকি শোপেনহাওয়ার এবং নীটশের প্রতি তাঁর অনুরাগও একেবারে খোলামেলা এবং অকৃত্রিম। কিন্তু তা সত্ত্বেও ফরাসী সাহিত্য সমালোচক আঁদ্রে মারোয়ার ভাষায়, “বোর্হেস অধিবিদ্যার দ্বারা আকৃষ্ট হলেও কোন (দার্শনিক) শৃঙ্খলাকেই সত্য বলে মেনে নেননি। এগুলো থেকে বোর্হেস তাঁর মনের জন্য এক খেলা তৈরি করেছেন। তাঁর নিজের মধ্যে তিনি দুটি প্রবণতা আবিষ্কার করেন; একটি হচ্ছে ধর্মীয় এবং দার্শনিক ধারণাগুলোকে তাদের নান্দনিক মূল্যের জন্য শ্রদ্ধা করা।”২৭ মারিয়া এস্তের বাসকেস-এর সাথে এক গ্রন্থ-দৈর্ঘ সাক্ষাৎকারে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গীটি বোর্হেস যেভাবে পরিস্কার করেছেন তা পাঠকদের কাছে প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করছি :
প্রশ্ন: এন্ডারসন ইম্বার্ট এর এক তত্ত্বে এটা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করে বলেন যে সব ধরনের দার্শনিক ধারা সম্পর্কে বিপুল জ্ঞান-সম্পন্ন বোর্হেস গভীরতম অর্থে নাস্তিবাদী (Nihilista)। প্রতিটি গল্পে সুনির্দিষ্ট দার্শনিক দিক তুলে ধরলেও এর কোনটিতেই তিনি গভীরভাবে অংশগ্রহণ করেন না।
বোর্হেস: এন্ডারসন ইম্বার্ট-এর এই ব্যাখ্যাকে আমার কাছে সঠিক বলে মনে হয়। এটা সত্য আমি দার্শনিকও নই, অধিবিদ্যকও নই; আমি যা করেছি তা হলো দর্শনের সাহিত্যিক সম্ভাবনাগুলোকে– বিনীতভাবে বললে– ব্যবহার করা বা আবিষ্কার করা। মনে হয় এটাই নিয়ম (Licito)।

বোর্হেসের দার্শনিক বিশ্বাস সম্পর্কে বাসকেস-এর অন্য এক প্রশ্নের জবাবে বোর্হেস বলেন : “ভাববাদী হলে, যেমন, এটা হবে এক নিশ্চয়তা, কিন্তু আমার মধ্যে সেই নিশ্চয়তা নেই; আমার বরং সন্দেহ আছে এ বিষয়ে। বার্কলির যুক্তি হচ্ছে বিশ্বজগত এক স্বপ্ন–আমি যদি এই বিশ্বাসে একমত হতাম তাহলে এটাকে নিশ্চয়তা বলা যেত, কিন্তু আমি তো এ ব্যাপারে নিশ্চিত নই। এমনকি এ সবই যে স্বপ্ন সে ব্যাপারেও আমি নিশ্চিত নই।” ২৮


গোলকধাঁধার প্রভু
গোয়েন্দা-গল্পের প্রতি বোর্হেসের আসক্তির কথা মনে হয় সবাই জানেন। একাধিক গোয়েন্দা-গল্পকার সম্পর্কে তিনি যেমন লিখেছেন, তেমনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সাহিত্যের এই শাখার প্রতি তাঁর আসক্তির কথা জানিয়েছেনও। আসক্তির মূল কারণ বোর্হেসের শৈল্পিক চরিত্রের সাথে এই শাখার ঘনিষ্টতা। প্রথমত গোয়েন্দাগল্পে প্লটের কাঠামোকে গড়ে উঠতে হয় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে যা বোর্হেসের প্রায় সব গল্পেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। অধিকন্তু, বোর্হেসের গল্প সুক্ষ্ম অসংখ্য আলংকারিক কারুকার্যে এতটাই ঠাঁসা যে গল্পের প্রতিটি বাক্য মহৎ কোন কবিতার প্রতিটি শব্দের মতোই অনুপম ঔজ্জ্বল্য পাঠককে আলোকিত করে রাখে। এমনকি, তিনি যখন গোয়েন্দাগল্পের মতো জনপ্রিয় সাহিত্য-কাঠামো ব্যবহার করে গল্প লেখেন তখনও এই সব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের সামনে তিনি আবির্ভূত হন। বোর্হেসের সন্ধিৎসু পাঠকরা হয়তো জানেন যে ইংরেজী ভাষায় বোর্হেসের প্রথম যে লেখাটি প্রকাশিত হয় সেটি এক গোয়েন্দাগল্প এবং তা প্রকাশিত হয় ‘এলারী কুইন মিস্টেরী ম্যাগাজিন’-এর ১৯৪৮ আগস্ট সংখ্যায়। কিন্তু বোর্হেসের এই ধারার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি গল্পের একটি হচ্ছে ‘মৃত্যু এবং কম্পাস’ আর অন্যটি ‘প্ররোহী পথের বাগান’। ‘মৃত্যু এবং কম্পাস’ বহিরঙ্গে এটি পুরোপুরি গোয়েন্দাগল্প। কিন্তু এর অভ্যন্তরে এমন একটি স্তর রয়েছে যেখান থেকে বিচ্ছুরিত হয় অন্য একটি অর্থ। ডি. পি গাল্লাঘের-এর মতে এটি বুদ্ধি(Intellect)র অহমিকা সম্পর্কে এক সতর্ককারী গল্প। গল্পে আমরা দেখবো গোয়েন্দা লনরট যুক্তির সাহায্যে তিনটি খুনের রহস্য উন্মোচনে এগিয়ে যান। কিন্তু সম্ভাব্য চতুর্থ খুনের ঘটনাটি উন্মোচন করতে গিয়ে নিজেই ঘাতক স্কার্লাক-এর শিকার হন। সমালোচকদের মতে লনরট এবং স্কার্লাক আসলে ড: জেকিল এন্ড মি: হাইড- এর মতোই দ্বৈত-চরিত্র। কারণ গোয়েন্দা এবং ঘাতক উভয়ই লাল রংয়ের প্রতীক বহন করছে। দুজনেরই নামের একটি অংশ লাল রংয়ের ইঙ্গিতবাহী। সমালোচক এমির রদ্রিগেছ মনেগালের মতে, এই গল্পে লনরট চক্রাকার সময়ের ধারণাকে তুলে ধরে। কারণ গল্পে অন্য এক সময়, অন্য এক সাক্ষাৎ এবং অন্য এক সম্ভাব্য খুনের উল্লেখ আমরা দেখতে পাবো। এর পাশাপাশি মনেগাল অন্য একটি অর্থেরও ইঙ্গিত করেন। তিনি মনে করেন লনরট এবং স্কার্লাক যথাক্রমে পুরানের হাবিল এবং কাবিল চরিত্রে রূপান্তরিত হন এবং পরস্পর পরস্পরকে খুঁজে ফেরেন হত্যার জন্যে। আরও একটি অর্থের প্রতিও কেউ কেউ ইঙ্গিত করেন এই বলে যে এই দুজন আসলে একই লোক এবং একজন আরেকজনকে হত্যার মাধ্যমে গল্পটি হয়ে ওঠে আত্মহত্যার রূপক। এই ধরনের ব্যাখ্যার সঙ্গে তারা বোর্হেসের সেই ধারণার সাযুজ্য তুলে ধরেন যেখানে তিনি বলেছেন যে “সব মানুষই হয়ে ওঠে একজন এবং কেউ নিজেই হয়ে ওঠেন তার নশ্বর প্রতিপক্ষ”, কিন্তু এই ব্যাখ্যার একটা সমস্যা হচ্ছে এই যে লনরটের আত্মহত্যার কারণটি গল্পে অনুপস্থিত যদি না যুক্তিশীলতার (Rational) আতিশয্যই ইচ্ছা-মৃত্যুকে প্ররোচিত করে থাকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই অর্থ এবং ব্যাখ্যার একাধিক ধরন গুজে দেয়ার পরও গল্পটিকে তিনি এমন করে তুলেছেন যে তা যে-কোন শহরের আবার একই সঙ্গে বুয়েনোস আইরেসের পরোক্ষ উল্লেখের মাধ্যমে দিয়েছেন স্থানিকতার গোপন ব্যঞ্জনা। অথচ “ ‘মৃত্যু এবং কম্পাস’ গল্পে কিন্তু বুয়েনোস আইরেসের নামও উচ্চারণ করা হয় না। কিন্তু গল্পটা তার ওই শহরেরই কাব্যিক দর্শন- প্রকৃতিবাদী দৃষ্টিতে লেখা ‘রাস্তার লোক’ জাতীয় গল্পের চেয়ে অনেক বেশি। লেখক নিজেই ব্যাখ্যা করে বলেন : ‘মৃত্যু এবং কম্পাস’ এক ধরনের দুঃস্বপ্ন, এমন দুঃস্বপ্ন যাতে রয়েছে বুয়োনোস আইরেসের উপাদান। এই সব উপদান দুঃস্বপ্ন দ্বারা বিকৃত। পাসেও কোলন (Paseao Colon)-এর কথা মনে পড়ে এবং একে আমি বলি রু দ তোলে (Rue de Toulon) , আদ্রোগে (Adrogue)-এর খামার বাড়িগুলোর কথাও মনে পড়ে এবং ওদেরকে আমি অভিহিত করি ত্রিস্তে লে রয় (Triste Le Roy) বলে। এই গল্প ছাপা হলে বন্ধুরা বললো যে যা লিখেছি তাতে ওরা বুয়েনোস আইরেসের শহরতলীর পরিচয় কিছুটা পেয়েছে। কিন্তু আমি তো ওই পরিচয়ের সন্ধানে বার হইনি, নিজেকে স্বপ্নের হাতেই সঁপে দিয়েছিলাম। এ জন্য আগে বৃথাই যা খুঁজেছি তা মনে হয় বহু বছর পর এসে উদ্ধার করতে পারলাম। বোর্হেস যা খুঁজেছেন তা বুয়েনোস আইরেস এবং সে কথা তা প্রথম কাব্যগ্রন্থেই জানতে পারি কি হন্যে হয়ে খুঁজেছেন তিনি Fervor de Buenos Aires-এ, কিন্তু শেষে বুয়েনোস আইরেসের বাস্তবতা এলো কেবল স্বপ্নের মাধ্যমে অর্থাৎ কল্পনার মাধ্যমে। ” ২৯
‘মুত্যু এবং কম্পাস’-এর মত আরেক জমজমাট গোয়েন্দা গল্প ‘প্ররোহী পথের বাগান’। যদিও গোয়েন্দা গল্পের মুখোশে এর একটি স্তরে রয়েছে গল্পের ভেতরে গল্প, অন্য একটি স্তরে রয়েছে গোলকধাঁধা যা অস্তিত্ব বা বাস্তবতার প্রতীক রূপে উপস্থিত। এর বাইরে আরও একটি স্তরও রয়েছে যেখানে বোর্হেস এমন এক চৈনিক উপন্যাসের উল্লেখ করেছেন, যেখানে “সীমাসংখ্যাহীন সময়ের সিরিজ কল্পনা করেছেন তিনি (উপন্যাসিক), যে-সময়গুলো ক্রমে বেড়ে উঠছে, ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে, পরস্পর থেকে দূরে যাচ্ছে, আবার এসে মিলিত হচ্ছে। আর প্রতিটি সম্ভাবনাকেই আলিঙ্গন করছে তার জটাজাল- শতাব্দীর পর শতাব্দী যার সূত্রগুলো একে অপরের সাথে মিলিত হচ্ছে, শাখা বিস্তার করে চলেছে পরস্পরকে অতিক্রম কিংবা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাচ্ছে,” অর্থাৎ চৈনিক উপন্যাসের নামে বোর্হেস এমন অদ্ভুত এক উপন্যাসের কল্পনা করেছেন যেখানে প্রতিটি ঘটনার নানা রকম সম্ভাবনা, সূচনা এবং সমাপ্তি রয়েছে এবং প্রতিটি ঘটনা ক্রমাগত বিস্তার করে শাখা-প্রশাখা। আবার এর কোনো কোনো ঘটনা উপ-ঘটনা, কোনো কোনো শাখাপ্রশাখা অন্যটির সাথে মিলিত হয় বা সমান্তরাল বয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো কল্পিত এই উপন্যাসটিও এক সময় পাঠকের অজান্তেই গল্পের সক্রিয় এক পটভূমিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। অর্থাৎ প্লটের এমনই এক অবিভাজ্য অংশ হয়ে ওঠে যে মুহূর্তের জন্যও একে উড়ে-এসে-জুড়ে-বসেছে বলে মনে হয় না। গল্পের শুরুতেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর পক্ষে এক চীনা গুপ্তচরের উল্লেখ দেখি। তার নাম ইউৎ সুন। তার উপর দায়িত্ব ছিলো জার্মান বাহিনীকে এক গোপন সংকেত পাঠানো। কাহিনীর এক পর্যায়ে তার সাথে পরিচয় ঘটে এক প্রবীন চীনাতত্ত্ববিদের যিনি ৎসুনের পুর্বপুরুষ সুই পেনের উপন্যাসের পাণ্ডুলিপির পাঠোদ্ধারে নিয়োজিত। গুপ্তচর ৎসুন শেষ পর্যন্ত এই চীনাতত্ত্ববিদকে হত্যা করেন। যাকে হত্যা করা হয় তার নাম আলবার্ট। গুপ্তচরের দরকার ছিলো এই নামেরই একজনকে হত্যা করা যাতে জার্মান বাহিনীকে তিনি বেলজিয়ামের আলবার্ট শহর আক্রমণের সংকেত পাঠাতে পারেন। আলবার্টকে হত্যার মাধ্যমে তিনি সেই সংকেত পাঠান। এই গল্পের একটি প্রধান দিক হচ্ছে এর গোলকধাঁধাময় চরিত্র। যে-কোনো প্ররোহী পথের বাগান গোলকধাঁধাময় হতে বাধ্য এবং লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শুধু বিষয় নয় গল্পের কাঠামোও গোলকধাঁধাপূর্ণ। ইউ ৎসুন যখন তার ভবিষ্যত শিকারের বাসায় এসে পৌঁছান তখন তিনি আবিষ্কার করেন বাগানের রূপটি গোলকধাঁধার মতো। আলবার্ট-এর সাথে তার সাক্ষাতে তিনি জানতে পারেন যে ইনি চীনাতত্ববিদ এবং ৎসুনের এক পূর্বপুরুষ ৎসুই পেন-এর পান্ডুলিপি নিয়ে কাজ করছেন, ৎসুন জানতেন যে ৎসুই পেন দুটো উদ্যোগ নিয়েছিলেন: একটি হচ্ছে গোলকধাঁধা নির্মাণ আর অন্যটি হচ্ছে অন্তহীন এক উপন্যাস রচনা। মৃত্যু ও অজানা এক গুপ্তঘাতকের দ্বারা নিহত হন তিনি। পরে কেউই তার সেই গোলকধাঁধার সন্ধান পাননি আর ঐ উপন্যাসটিকে মনে করা হয়েছে এক অসমাপ্ত পাগলামি বলে। পরে আলবার্ট-এর কাছে ৎসুন ধাঁধার সমানধানটি খুঁজে পান: উপন্যাসটি হচ্ছে তার গড়া সেই গোলকধাঁধা। এই বিষয়কে অবলম্বন করে বোর্হেস নিজেও গল্পটিকে আরেক গোলকধাঁধায় পরিণত করেন। পাঠক গল্পের মধ্যে পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বোর্হেস গল্পের মধ্যে প্লটের শাখাপ্রশাখা বিস্তার করতে থাকেন। একদিকে উপন্যাসটি যেমন গোলকধাঁধার সমতুল্য, গোলকধাঁধা তেমনিই জীবনের সমতুল্য। সমতুল্যের এই শিল্পকৌশল সৃজনের মাধ্যমে বোর্হেস একটিকে অন্যটির আয়না হিসাবে ব্যাবহার করতে থাকেন যাতে গল্পটি এক অন্তহীন আয়নামহলের রূপ ধারণ করে। পাশাপাশি এরই মধ্যে বোর্হেস জমিয়ে তোলেন সময় নিয়ে তার অতুলনীয় খেলা। সময়ের প্রতিটি সম্ভাবনাকে ধারণ করেন, কিন্তু এমনও ভাবতে বাধ্য হন যে “সব কিছুই এই মুহূর্তেই ঘটে, একেবারে এই মুহূর্তে। শতাব্দীর পিছে পিছে ধায় শতাব্দী। কিন্তু ঘটনা কেবল বর্তমানকালেই ঘটে…।” “তাই কেবল বর্তমানকালেই আমরা কাহিনী পাঠ করি, এবং গল্প যদি ঘটনার একমাত্র সত্য বৃত্তান্ত বলে দাবীও করে, আমরা পাঠকেরা এ-রকম ঐক্যের প্রয়াসকে ভন্ডুল করে দেই। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো কাহিনীকার কিন্তু গল্পের পরিসরে “একই মহাকাব্যিক অধ্যায়ের” দুটো সংস্করণ পাঠ করেন। অর্থৎ তিনি কেবল প্রথম রক্ষণশীল সংস্করণটিই পড়েন না বরং দ্বিতীয় অরক্ষণশীল সংস্করণও পাঠ করেন। তিনি মহাকাব্যিক অধ্যায় নির্বাচন করেন, কিংবা বলা যায় ইচ্ছে করলে উভয় বা বহু ইতিহাসের অস্তিত্ব একই সঙ্গে ধারণ করেন। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের বিচারে এর অর্থ হলো এই যে বোর্হেসের পাঠক কেবল বিজয়ই পাঠ করেন না, প্রতি-বিজয়ও পড়েন, কেবল সংস্কারই পাঠ করেন না প্রতি-সংস্কারও পড়েন এবং অবশ্যই বোর্হেসীয় রাজনৈতিক বিচারে কেবল বিপ্লবই নয়, প্রতি-বিপ্লবও পাঠ করেন।”৩০ ইতিহাসের, সময়ের, ঘটনার, সর্বোপরি মানব অস্তিত্বের বৈপরীত্যপূর্ণ চরিত্রের প্রতিনিধি আলবার্ট আমাদেরকে এও জানান : “সম্ভাব্য অনেকগুলো অতীতের কোনোটিতে আপনি আমার শত্রু ছিলেন, আবার অন্য কোনটিতে ছিলেন আমার বন্ধু।” বোর্হেসকে যে বিষয়টি সব সময়ই ভাবিত করে তাহলো উপস্থিতি বনাম অনুপস্থিতির রহস্য। এ এমন এক রহস্য যা প্রত্যেক পাঠক নিজের ধরণে ভিন্নভাবে সমাধান করতে পারেন। কোনো দাবারু যেমন বলতে পারেন : না দেয়া চালটাও দেয়া চালটার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এই গল্পে বোর্হেস দাবার চালের সেই অদৃশ্য অনুপস্থিতিকে নিপুণ শিল্পকুশলতায় ব্যবহার করেছেন। উপস্থিতির সঙ্গে বা বিপক্ষে অনুপস্থিতির ব্যবহার, এ কেবল তাঁর শিল্পকৌশলই নয়, তাঁর নিজের দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শূন্য জায়গা পূরণ করার পক্ষে এক দার্শনিক অবস্থানও বটে। এ কারণে তিনি নতুন ধরনের আখ্যানের পাশাপাশি তৈরি করেন নতুন শিল্পতত্ত্ব*৩১ যে শিল্পতত্ত্ব পাঠ আর সৃষ্টির স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করে তোলে। ‘প্ররোহী পথের বাগান’-এ প্রত্যেক পাঠকই ভিন্ন ভিন্ন শাখা প্রশাখায় ঘুরে বেড়াতে পারেন। পাঠকের জন্য এ হয়ে ওঠে এক মুক্ত রচনা।
‘দন কিহোতের লেখক পিয়ের মেনার্ড’ হচ্ছে সে রকমই এক মুক্ত রচনার আরেক চোখ ধাঁধানো উদাহরণ। একটু পরে আমরা সে গল্পটিও নেড়েচেড়ে দেখবো, তার আগে এই প্রসঙ্গে আমি ফরাসি সাহিত্যতাত্ত্বিক রোলাঁ বার্থ-এর পাঠকের ভূমিকা সম্পর্কিত সেই বিখ্যাত ধারণাটির কথা বোর্হেসের পাঠকদের একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যিনি ১৯৬৮ সালে ‘রচয়িতার মৃত্যু’ ঘোষণা করেছিলেন। সাহিত্য সমালোচনা এবং সমালোচনামূলক ভাবনার কেন্দ্র থেকে রচয়িতা নামক চরিত্রটির বিলুপ্তিই ছিলো তার মূল লক্ষ্য। ‘রচয়িতার মৃত্যু’ প্রবন্ধে তিনি পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, টেক্সট কোন শব্দরাশি নয় যা একটি ঈশ্বরতত্ত্বগত অর্থ (রচয়িতা- ঈশ্বরের বার্তা) প্রদান করে বরং এটি এমন এক বহুমাত্রিক ক্ষেত্র যেখানে বিভিন্ন ধরনের লেখা, যার কোনটাই মৌলিক নয়, মিশ্রিত হয় এবং পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।” বার্থই প্রথম তাত্ত্বিক অর্থে পাঠকের পাঠের আনন্দ এবং নিজস্ব ধরনে পাঠ করার অধিকারকে নিশ্চিত করে তুলেছিলেন। ফরাসি সাহিত্যে যদিও মালার্মে এবং ভালেরির মধ্যে এ-সম্পর্কিত ধারণার বীজ আগে থেকেই ছিলো কিন্তু এর সুস্পষ্ট সাহিত্যিক (Texual) পেক্ষাপট তখনও ছিলো না। সুস্পষ্ট ও সচেতন প্রেক্ষাপটটি আমরা দেখতে পাই ইউরোপের বাইরে প্রান্তীয় অঞ্চলের লেখক বোর্হেসের মধ্যে। ‘প্ররোহী পথের বাগান’ সেই প্রেক্ষাপটেরই এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত উপন্যাস মিঃ প্রেসিডেন্ট-এ আস্তুরিয়াস যে বলেছিলেন : “বাস্তবতা আর স্বপ্নের মধ্যে পার্থক্যটা পুরোপুরি যান্ত্রিক” তার সূচনা আমাদের কথাসাহিত্যে বোর্হেসের মাধ্যমে ঘটতে দেখি অনেক আগেই। বোর্হেসের যে-গল্পটিতে আমরা এর সুনির্দিষ্ট এবং ঘনীভূত প্রকাশ দেখতে পাই সেটি ‘চক্রাকার ধ্বংস’। ১৯৪০ সালে এটি ওকাম্পো সম্পাদিত ‘দক্ষিণ’ (SUR) পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। গল্পটির মূল বিষয় স্বপ্ন এবং এর কেন্দ্রীয় চরিত্র এক আদিবাসী পুরুষ যিনি অগ্নিউপাসক, যিনি সিন্ধান্ত নেন এক সন্তানকে স্বপ্নে দেখার এবং শেষ পর্যন্ত তার স্বপ্নকে আমরা বাস্তবে অনূদিত হতে দেখি। এই গল্পের আয়নায় আমরা অন্য এক অর্থকে প্রতিবিম্বিত অবস্থায় পাই : ইচ্ছাকৃত, সুসংগঠিত এবং নিয়মতান্ত্রিক স্বপ্নের মাধ্যমে জীবন ও কাল্পনিক সৃষ্টির মাঝে সমান্তরালতার এক প্রকাশ। এই ধরনের সমান্তরালতার পাশাপাশি তার বহু গল্পের কেন্দ্রবিন্দু কূটাভাষ (paradox), বিভ্রম (Ilusion) অথবা বহু-অর্থের সন্নিবেশ। ডাচ শিল্পী এম.সি এশার-এর লিথোগ্রাফগুলোতে আমরা যেমনটি দেখতে পাই। ‘বিশ্বাসঘাতক ও বীরবিষয়ক’ এবং ‘ধর্মতাত্ত্বিকগণ’-এ পরস্পরবিরোধী দুটি চরিত্র আসলে একই ব্যক্তির দ্বৈত-রূপকে বোর্হেস তুলে ধরেছেন। ‘আস্টেরিয়নের ঘর’, গল্পে আমরা দেখি এক অদ্ভূত কূটাভাস: যে-ঘর তাকে রক্ষা করে সেটি আসলে তার জন্য এক কারাগার। ‘ব্যাবিলনের লটারী’ গল্পে বোর্হেস মানবজাতির লক্ষ্যহীন গোলকধাঁধাময় অস্তিত্বের আপাত শৃঙ্খলার মধ্যে নিহিত এক বিশৃঙ্খল বাস্তবতাকে তুলে ধরেন। জীবনের উদ্দেশ্যহীন গোলকধাঁধার মধ্যে আমরা অর্থের অনুসন্ধান করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত অন্য এক বিশৃঙ্খলার মধ্যেই নিজেদের আবিষ্কার করি। ‘ব্যাবিলনের লটারী’ গল্পের বয়ানকারীর তর্জনীহীনতাকে তিনি প্রতীকায়িত করে তোলেন উদ্দেশ্যহীন বা দিকবিহীন অস্তিত্বকে। ‘ব্যাবেলের গ্রন্থাগার’-এ আমরা অস্তিত্বের অনুুসন্ধান এবং এর ব্যাখ্যাকে আরও বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হতে দেখি। গল্পে আখ্যানকার খুঁজে ফেরেন ‘ক্যাটালগের ক্যাটালগ,’ ‘অন্য সব বইয়ের এক যথাযথ সারাৎসার,’ এক সামগ্রিক গ্রন্থ। বিজ্ঞানে যেমন, পদার্থবিজ্ঞানীরা প্রকৃতির জটিলতাকে ন্যূনতম সংখ্যক একীভূত ধারণার ভিত্তিতে বুঝবার আকাঙ্ক্ষায় ‘মহান একীভুত তত্ত্ব’ (Grand unified theory) উদ্ভাবনের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত, বোর্হেসও যেন একইভাবে গোটা বিশ্বের অস্তিত্বের রূপকে একটি মাত্র গ্রন্থে দেখতে চান। এমনকি আরও বেশি উচ্চাশায় ভর করে তিনি এও ভেবেছিলেন, “কেমন হয় যদি, বোর্হেস বলেন, সকল ভাষা, সকল অভিব্যক্তি, সমগ্র কবিতা কেবল একটি পংক্তিতে, বা এমনকি একটি মাত্র শব্দে সংকুচিত করা যায়?”( Norman Thomas di-Giovanni,The Lesson of the Master, p-49) শুনতে অসম্ভব লাগে, কিন্তু যেহেতু বোর্হেস তাই এর সম্ভাব্যতা কল্পনা করা অসম্ভব নয়। তার এই বক্তব্যের পক্ষে আমাদের মনে পরবে ‘প্যারাবল অব দ্য প্যালেস’ নামক সেই খর্বাকৃতির আখ্যান যেখানে ধারণাকে সংকুচিত করে প্রায় এমন এক বিন্দুতে আনা হয় যেখানে বোর্হেসের গল্পের নায়ক বোর্হেসীয় উচ্চাশায় ব্যক্ত করেন এই কথা “কাব্যে ছিল মাত্র একটি চরণ; অন্যেরা বলেন এতে ছিল মাত্র একটি শব্দ।” এসব আমাদের কাছে যতই অসম্ভব মনে হোক না কেন বোর্হেসের কল্পলোকে এসব ছিল এক স্বাভাবিক ঘটনা। কিংবা এভাবেও বলা যায় এটা যেমন বোর্হেসের কাছেই কেবল আশা করা সম্ভব, তেমনিভাবে এ কেবল তাঁর পক্ষেই রচনা করা সম্ভব। “বোর্হেস বিশ্বাস করতেন অসীমতা মহাজাগতিকতাকে একটি পাতার পরিসরে ঠাঁই দেয়া সম্ভব”।৩২ আর শুধু এই গল্পেই নয় তার অন্যান্য গল্পেও, এমনকি তাঁর অন্যান্য প্যারাবোল এবং প্রবন্ধগুলোতেও আমরা লক্ষ্য করবো ধারণার জগতে তার উল্লেখযোগ্য মিতব্যয়িতা।


সময় নিয়ে খেলা

বোর্হেসের সতর্ক পাঠকদের কাছে এটা মোটেই অজানা নয় যে বোর্হেসের একটি প্রধান এবং প্রিয় বিষয় সময়। ‘সময়’ নিয়ে তার মতো আর কোনো লেখকই বোধহয় এতটা খেলেননি। তিনি নিজে একাধিকবার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে স্বীকারও করেছেন যে ‘সময় দ্বারা আমি সব সময়ই আবিষ্ট।’ সুতরাং সময় তার লেখায় খুবই জটিল এক উপাদান হিসাবে থাকবে- এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু যেটা অস্বাভাবিক এবং বিস্ময়কর তা হলো সময় নিয়ে তার খেলার অদ্ভুত ধরনসমূহ। বস্তুর বাস্তবতা সম্পর্কিত বার্কলীয় ধারণা তিনি যেমন অতিক্রম করেছেন বিভিন্ন গল্পে, তেমনি ‘সময়’-এর নেতিকরণের সূত্রে তিনি বার্কলী এবং হিউম- উভকেই অতিক্রম করেছিলেন। সমালোচক আলবার্ট ব্যাগ্বির ভাষায় : “সচেতনতা(প্রকৃত এবং আনুমানিক)র বাইরে যদি বস্তুর অস্তিত্ব না থাকে এবং প্রত্যেক মানসিক সচেতনতার বাইরেও যদি আত্মার (spirit) অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে প্রত্যেক বর্তমান মুহূর্তের বাইরে ‘সময়’-এর অস্তিত্ব থাকবে না– বোর্হেসের এই বক্তব্য নির্ভুল”। এই অর্থে বোর্হেস প্রতিটি মুহূর্তকে স্বাধীন বলে মনে করেন। এর আগে আমরা দেখেছি সময়ের অসংখ্য ধারাকে তিনি কীভাবে গ্রেফতার করেছেন তাঁর ‘প্ররোহী পথের বাগান’ গল্পে। তাঁর ‘গোপন দৈব’ গল্পে আমরা দেখবো সময়-এর উপর তিনি কীভাবে প্রভুত্ব করেছেন। গল্পের শুরুতে তিনি কোরান শরীফ থেকে একটি আয়াত উদ্ধৃত করেছেন : “এবং আল্লাহ তাকে একশত বৎসর মৃত করিয়া রাখিলেন এবং অতঃপর তাহাকে পুনরায় জীবিত করিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন : তুমি কত দিন এখানে আছো? সে বলিলো একদিন অথবা একদিনের কিয়দংশ।” বোর্হেস গল্পটিতে সময় নিয়ে স্বাধীনভাবে যে খেলাধুলা করবেন তার ইঙ্গিত তিনি গল্পের শুরুতে এই এপিগ্রাফের মাধ্যমেই দিয়ে রেখেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত এই গল্পটি চারটি অংশে বিভাজিত। প্রথম অংশ গল্পের নায়ক লাদিককে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির বর্ণনা এবং গেস্টাপোদের হাতে তার গ্রেফতার। দ্বিতীয়ত, তার ‘শক্রগণ’ নামের নাটক, তৃতীয়ত, তার প্রার্থনা এবং ঈশ্বর কর্তৃক তার প্রার্থনা কবুল আর সবশেষে দৈব (Miracle) ঘটনা। গল্পে রয়েছে স্বপ্নের মধ্যে দাবা খেলার এক প্রসঙ্গ যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এতে অংশগ্রহণ করে। সমালোচক এবং বোর্হেসের অনুবাদক জেমস ই. ইরবি মনে করেন লাদিক এক মুহূর্তে তার গোটা নাটকটি শেষ-করতে-পারার-গল্পের-তুঙ্গ-মুহূর্তের সাথে বৈপরীত্য তুলে ধরার লক্ষ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম অবধি দীর্ঘস্থায়ী দাবা খেলার স্বপ্নটি বোর্হেসকে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছে। সময়-কেন্দ্রিক এই বৈপরীত্য তুলে ধরেই বোর্হেস তৃপ্ত হন না, এর সঙ্গে আরও কিছু খেলাও যুক্ত করেন। আমরা দেখবো লাদিককে যেদিন গ্রেফতার করা হয় তার দশদিন পর তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করা হবে। গল্পে তিনি এই দশদিনের এক বিরতি রচনা করেন এবং এই বিরতির ফাঁকে পাঠকদের মধ্যে দুটো ধারণা সুকৌশলে গুঁজে দেন : প্রথমত, লাদিক কর্তৃক ভবিষ্যত ঘটনার বিস্তারিত কল্পনা হচ্ছে ঘটনা প্রতিরোধ করার চেষ্টা (অর্থাৎ কল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতকে বদলে ফেলা ) ‘দ্বিতীয়ত’ মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে বেঁচে থাকা মানে অমরত্বের সাদৃশ্য অর্জন করা। এই দুটো ধারণাকে বোর্হেস যুক্ত করেন সময়কে কল্পনার মাধ্যমে জয় করার লক্ষ্যে। শতাব্দীর পর শতাব্দীর দীর্ঘ পরিসরে দাবা খেলার মতো একটি ঘটনাকে তিনি যেমন ঘটতে দেখান অন্যদিকে, একটি নাটক লেখার মতো জটিল কাজকে ঘটতে দেখান মাত্র মুহূর্তের পরিসরে। সময়কে তিনি ইচ্ছেমত লম্বা করেন আবার কখনো তা মুহূর্তের পরিসরে সংকুচিত করে নেন। যদিও এই মুহূর্তের পরিসর আসলে এক বছরের সমান। কারণ ‘ঈশ্বরের কাছে একটা পুরো বছর চেয়েছিলেন তিনি তার নাটক শেষ করার জন্য, সর্বশক্তিমান তা মঞ্জুর করেছেন।’ দীর্ঘকরণ এবং সংকোচনের পাশাপাশি বোর্হেস সময়কে এক পর্যায়ে নিশ্চলও করে রাখেন। সময়ের উপর তাঁর প্রভুত্বের সূত্রে আমাদের হয়তো মনে পড়বে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ব্যাখ্যার সুবিধার্থে তারই কল্পিত সেই উদাহরণটি যেখানে কেউ একজন মহাকাশ-যানে মহাকাশের কোথাও যে-সময় অতিবাহিত করেছেন তা পৃথিবীর সময়ের হিসাবে ছিলো বহুগুণ। দেশ-কালের প্রেক্ষিতের ভিন্নতার কারণে সময়ের এই ভিন্নতা আমাদের কাছে বোর্হেসীর কল্পকাহিনীর জগতকে, অন্তত এই ‘গোপন দৈব’কে আরও বেশি বিশ্বাস্য করে তোলে। বোর্হেসের এই ‘গোপন দৈব’ যেন বিজ্ঞানের আধুনিক ধারণার সাথে পাল্লা দেয়ার এক সাহিত্যিক প্রচেষ্টা। কিংবা উল্টোভাবে এও কি বলা যায় না যে পদার্থবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক তাত্ত্বিক ধারণাসমূহ কল্পকাহিনীর নায়কের মতো আমাদেরকে সময় সম্পর্কিত গোড়া বিশ্বাসের দানবের হাত থেকে মুক্ত করে নিয়ে গেছে সেই বিশ্বাসে যেখানে :
Time became a more personal concept, relative to the observer who measured it. when one tried to unify gravity with quantum mechanics one had to introduce the ideas of imaginary time. (Stephen W. Hawking, A brief history of time, Bantam Books. 1988, p.143.)


রচয়িতার মৃত্যু, পাঠকের উত্থান

বোর্হেসের কাছে সাহিত্য সৃষ্টি মানে পূর্ববর্তী সাহিত্যকর্মকে কিংবা সাহিত্যকর্মের নির্যাসকে ভিন্নভাবে বিন্যাসের খেলা, মার্কিন লেখক জন বার্থ যাকে Literature of Exhaustion বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ, পূর্ববর্তী লেখকদের বা রচনার নির্যাসকে লেখার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা। কখনো কখনো তাঁর গল্পের, কবিতার বা প্যারাবোলের মূল বিষয় হিসেবে অবলম্বন করেছেন পূর্বসূরীদেরকে বা তাদের রচনাকর্মকে। হয়তো এই কারণে তাঁর মধ্যে বহু লেখকের প্রতিধ্বনি আমরা দেখতে পাই। সম্ভবত তাঁর মতো অন্য আর দ্বিতীয় লেখক নেই যার মধ্যে একই সঙ্গে অসংখ্য লেখকের কন্ঠস্বর খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু এইসব কন্ঠস্বর তাঁকে বৈশিষ্ট্যহীন, গৌণ কিংবা মৌলিকতা-বর্জিত করে ফেলেনি বরং এই বহু স্বরের প্রাচুর্য তাকে এনে দিয়েছিলো নতুন নতুন রাগ তৈরির সুবিধা। অর্থাৎ তাঁর উপর যত বেশি লেখকের প্রভাব পড়েছে তিনি যেন ততবেশি সৃষ্টিশীল হয়ে উঠেছেন, তাঁর কল্পনাশক্তি বেশি প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে যা প্রকারান্তরে নিশ্চিত করে তুলেছে সৃষ্টির প্রাচুর্য এবং বৈচিত্র্য, এবং সর্বোপরি মৌলিকতা। পিকাসো এবং সালভাদর দালি যেমন ক্লাসিক্যাল এবং রেনেসাঁ যুগের একাধিক শিল্পীর শিল্পকর্মের সৃষ্টিশীল অনুকরণ করেছেন বোর্হেসও তেমনি সাহিত্যে সেই কাজ করেছেন তাঁর পূর্ববর্তীদের গুরুত্বপুর্ণ রচনার কখনো কৌতুককর ভঙ্গীতে কখনো কৌতুক এবং ছদ্ম-গাম্ভীর্যের মিশেলে সৃজনশীল পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে। পাঠ যে এক সৃজনশীলকর্ম বোর্হেস তা একাধিক গল্পে আমাদেরকে দেখিয়েছেন। যে-কোনো রচনা পাঠ মানেই তা নতুনভাবে পুনর্বিন্যাস অর্থাৎ নতুন এক সৃষ্টি। ‘দন কিহোতের লেখক পিয়ের মেনার্ড’ গল্পে বোর্হেস এই বিষয়টি মক সিরিয়াস (Mock-Serious) ভঙ্গীতে আমাদের সামনে আরও বেশি উপভোগ্য করে তুলে ধরেন। এটি যেমন নিছকই এক উপভোগ্য গল্প, তেমনি এটি পাঠের এক নতুন কাব্যতত্ত্ব (poetics of Reading)ও বটে যে-কাব্যতত্ত্ব বলে যে কেবল লেখালেখির মাধ্যমেই সৃষ্টি হয় না, পাঠের মাধ্যমেও সৃষ্টি হতে পারে। এই গল্পের বিশদ আলোচনার আগে আমরা বোর্হেসের পূর্ববর্তী কয়েকটি লেখায় এ-বিষয়ক ধারণার আদি-রূপটির দিকে তাকাতে পারি। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত কবিতার বই বুয়েনোস আইরেসের জন্য আকুলতার ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন : “পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে যদি কিছু সফল কবিতা বা অন্য কিছু থেকে থাকে, তাহলে পাঠকের আগেই তা লিখে ফেলার ঔদ্ধত্যের জন্য আমাকে যেন মার্জনা করেন। আমরা সবাই একজন; আমাদের পারম্পর্যহীন মনের চেহারা অনেকটা অভিন্ন, আর পরিবেশ-পরিস্থিতি আমাদেরকে এতটাই প্রভাবিত করে যে ঘটনাক্রমে আপনি পাঠক আর আমি আমার কবিতাগুলোর- অনিশ্চিত, উদ্দীপ্ত লেখক” অর্থাৎ বোর্হেস এই ভূমিকাতে পাঠক এবং লেখকের মনের অভিন্নতা এবং সৃজনশীলতা সম্পর্কে তখন থেকেই সজাগ এবং আরও পরে পাঠকের এই ভূমিকার কথা তিনি আরও পরিষ্কার করে জানান ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত গল্পের বই “কুখ্যাতির বিশ্বজনীন ইতিহাস”-এর ভূমিকায়: “আমার মতে, ভালো পাঠকরা এমনকি ভালো লেখকদের চেয়েও দুর্লভ ও বিরলতর কবি। লেখার পরের কাজটিই পাঠ: বিনীত, অপ্রকাশিত এবং মননশীল এক কাজ।” বোর্হেস অনেক পরে, অর্থাৎ ‘পিরের মেনার্ড’ লেখারও অনেক পরে, একই মনোভাব বজায় রেখেছিলেন। এর আরেকটি নজির আমরা দেখতে পাবো ১৯৬৪ সালে প্রকাশিতকাব্যসমগ্র (Obra poetica)র ভূমিকায়: “আপেলের স্বাদ (বার্কলীর ভাষায়) আপেলের মধ্যে নয়, থালার সাথে এর সংযোগের মধ্যে, একইভাবে (আমি বলবো) গ্রন্থের পৃষ্ঠায় মুদ্রিত পংক্তির মধ্যে নয়, পাঠক এবং কবিতার সংযোগের মধ্যেই কবিতার অবস্থান।” ‘পিরের মেনার্ড’ গল্পে পাঠকের ভূমিকা এবং সৃজনশীলতা কতটা রোমাঞ্চকর, তুঙ্গস্পর্শী হতে পারে তার এক বিরল দৃষ্টান্ত বোর্হেস আমাদের সামনে হাজির করেছেন। গল্পের প্রথম অংশে আমরা দেখবো পিয়ের মেনার্ড-এর রচনাকর্ম সম্পর্কে একটা ছোটখাটো বিতর্ক, তার এই রচনাকর্মের মধ্যে রয়েছেন বেনামী বয়ানকারী, ম্যাডাম হেনরী ব্যাচেলিয়র নামের এক উঁচুসমাজের নারী যিনি কবিতা লেখায় নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন আর আছেন মেনার্ড-এর সাহিত্যিক বান্ধবী কাউন্টেস অব বাগনোরেজিও যিনি বিয়ে করেন এক মার্কিন মানবহিতৈষীকে। গল্পের শুরুর দিকেই বয়ানকারী আমাদের সামনে তুলে ধরেন মেনার্ড-এর কাজের এক দীর্ঘ ফিরিস্তি। গল্পের দ্বিতীয় অংশে দন কিহোতে নামের স্প্যানিশ উপন্যাসটি আক্ষরিকভাবে মেনার্ড-এর পুনর্লিখন সম্পর্কে বয়ানকারীর মন্তব্য। বোর্হেস এখানে কিছুটা শ্লেষ ছুঁড়ে দিয়েছেন সের্বান্তেসপন্থীদের প্রতি যারা ইতিমধ্যে স্প্যানিশ সাহিত্যে মহামারী হিসাবে পরিচিত। দন কিহোতে লেখার উদ্যোগ আসলে নতুন কিছু নয়। ১৬১৪ সালের দিকে অর্থাৎ দন কিহোতে-এর দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশের বছরখানেক আগেই ছদ্মনামী লেখক আলোন্সো ফের্নান্দেস দে আবেইয়ানেদা তার নিজের লেখা দ্বিতীয় খন্ডটি প্রকাশ করেন। আরো পরে একুয়াদরের লেখক হুয়ান মন্তালবো এবং স্পেনের বিখ্যাত লেখক মিগেল দে উনামুনো এবং আসোরিনও দন কিহোতে এবং এর চরিত্রসমূহের নিজ নিজ সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এদের কেউ-ই উপন্যাসটি আক্ষরিকভাবে লিখে পুনঃপ্রকাশের উদ্যোগ নেননি। এইখানেই মেনার্ড-এর পাগলামীপূর্ণ উচ্চাশী কর্মকান্ডের সাথে অন্যদের পার্থক্য। গল্পে আমরা দেখবো মূল উপন্যাসের সাথে তুলনা করে বয়ানকারী বলছেন যে মেনার্ড-এর লেখা হুবহু হলেও অর্থ পুরোপুরি ভিন্ন : “সের্বান্তেস এবং মেনার্ড এর লেখা দুটো মৌখিকভাবে হুবহু এক কিন্তু পরবর্তীজনের লেখাটি প্রায় সীমাহীন সমৃদ্ধ। তার নিন্দুকেরা হয়তো বলবেন এটা বড় বেশি অস্পষ্ট কিন্তু অস্পষ্টতাই সমৃদ্ধি। মেনার্ড-এর দন কিহোতের সাথে সের্বান্তেসের কিহোতের তুলনা এক আশ্চর্য আবিষ্কারের মতো। দ্বিতীয়জন, যেমন, লিখেছেন (দন কিহোতে, প্রথম পর্ব, নবম অধ্যায়) : …সত্য, ইতিহাস যার জননী, যে সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী, কীর্তিসমূহের সংরক্ষক, অতীতের সাক্ষী, বর্তমানের তুলনা ও উদাহরণ এবং ভবিষ্যতের পরামর্শক। সপ্তদশ শতাব্দীর ‘সাধারণ প্রতিভা’ সের্বান্তেসের লেখা এই ফিরিস্তি ইতিহাসের নিছক গালভরা প্রশংসা। বিপরীতে, মেনার্ড লেখেন : …সত্য, ইতিহাস যার জননী, যে সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী, কীর্তিসমূহের সংরক্ষক, অতীতের সাক্ষী, বর্তমানের তুলনা ও উদাহরণ এবং ভবিষ্যতের পরামর্শক। ইতিহাস সত্যের জননী- ধারণাটি বিস্ময়কর। উইলিয়াম জেমসের সমসাময়িক মেনার্ড ইতিহাসকে বাস্তবের এক অনুসন্ধান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেননি; করেছেন এর উৎস হিসেবে। তার কাছে ঐতিহাসিক সত্য যা ঘটেছে তা নয়, বরং যা ঘটেছে বলে আমরা ভাবি, তাই। শেষ অংশটুকু- বর্তমানের তুলনা ও উদাহরণ আর ভবিষ্যতের পরামর্শক- নির্লজ্জভাবে বাস্তবতার প্রতিধ্বনি। দুজনের রচনাশৈলীর পার্থক্যও খুব সহজে চোখে পড়ে। মেনার্ড-এর, শেষ বিচারে যিনি বিদেশী, অপ্রচলিত শৈলী, এক ধরনের অস্বাভাবিকতা দ্বারা পিষ্ট। অন্যদিকে, তার পূর্ববর্তীজন, যিনি সাদামাটা স্প্যানিশ ভাষাকে খুবই স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করতেন, তিনি এতোটা ভুক্তভোগী নন।” এই গল্পের উৎস এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে চোখ-কান খোলা রাখলেই পাঠক লক্ষ্য করবেন যে এর মধ্যে রয়েছে এক কৌতুক (Joke) যা অন্য এক কৌতুকে মোড়ানো। দন কিহোতে নিজেই ছিলো এক ব্যঙ্গ (Satire) তৎকালীন বীরবিষয়ক (Chivalric) রোমান্সগুলোর প্রতি। এমনকি, সের্বান্তেস নিজেও দন কিহোতের আসল লেখক হিসেবে ‘আরব ঐতিহাসিক’ সিদে হামেতে বেনেন্জেলির (Cide Hamete Benengeli) উল্লেখের মাধ্যমে বীরবিষয়ক রোমান্সগুলোর৩৩ ‘সত্য, কেবল সত্য’ বলার ভান লক্ষ্য করে হেসেছেন। সুতরাং যিনি (সের্বান্তেস)-পূর্ববর্তী রচনাগুলোকে (Chivalric Romance) গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে ব্যাঙ্গ করেছেন তিনি নিজেও পিয়ের মেনার্ড-এর মাধ্যমে একইভাবে ব্যাঙ্গ-শরে বিদ্ধ। অর্থাৎ যাদের কৃতিত্ব হরণ করে দন কিহোতে গড়ে উঠেছে, সেই দন কিহোতেরই প্যারোডির মাধ্যমে কৃতিত্ব হরণ করে গড়ে উঠেছে পিয়ের মেনার্ড-এর দন কিহোতে। বোর্হেস অবশ্য আমাদেরকে এই গল্পের কোথাও সে-কথা বলেন না। তাঁর নিজের কৌতুকটি (Joke) অবশ্য অন্য এক লক্ষ্যে তাক করা। মেনার্ডের রচনাকে কেন্দ্র করে বোর্হেসের সমলোচনামূলক ভেল্কিবাজির চোখ ধাঁধানো কর্মকান্ডের চেয়ে যা আরও বেশি অপ্রত্যাশিত রূপে আবির্ভূত হয় তা হলো গল্পের শেষ অংশ: “মেনার্ড, নতুন এক পদ্ধতি- স্বেচ্ছাকৃত কাল বিপর্যয় এবং ভূয়া গুনারোপের পদ্ধতির মাধ্যমে– পাঠের মন্থর এবং প্রাথমিক শিল্পকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। এই পদ্ধতির সীমাহীন প্রয়োগ-সম্ভাবনাসহ আমাদেরকে এমনভাবে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে যেন ‘ওডেসী’ লিখা হয়েছে ‘ইনিদ’-এর পরে আর মাদাম হেনরী ব্যাচেলিয়র-এর Le Jardin du Cenlauve যেন তাঁর নিজেরই লেখা। এই পদ্ধতি নিরসতম বইকেও অ্যাডভেঞ্চারে ভরে তোলে। Imitatio Christi গ্রন্থের জন্য লুইস ফের্দিনান্দ সেলিনে বা জেমস জয়েসকে কৃতিত্ব দেয়াটা কি এই ক্ষীণ আধ্যাত্মিক উপদেশমালার পর্যাপ্ত সতেজকরণ নয়? ” আগেই বলেছি যে এই গল্পের মাধ্যমে বোর্হেস, লেখা নয়, পাঠের ভিত্তিতে এক নতুন কাব্যতত্ত্বের ভিত নির্মাণ করেছেন। বিখ্যাত ফরাসী সমালোচক জেরার জেনে বোর্হেসের গল্পের এই দিকটি দ্বারা এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে ১৯৬৪ সালে তিনি La litrature Sclon Borges নামে এক প্রবন্ধ লিখে তাঁর সেই মুগ্ধতা প্রকাশ করেন: “একটি বইয়ের সময়কাল তার লেখার সময়কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পাঠ এবং স্মৃতির অসীম কালের মধ্যে তার অবস্থান। গ্রন্থসমূহের অর্থ তাদের পেছনে পরে থাকে না, থাকে সামনে; আমাদের ভেতরে: বই কোন পূর্ব-প্রস্তুত অর্থ নয়, … এ হচ্ছে কাঠামোর (Forms) এক ভান্ডার যা অর্থে প্রাণবন্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছে।” ৩৪

‘ফিকসিওনেস’ বা কল্পকাহিনীর পরেও বোর্হেসের আরও অন্তত গুরুত্বপূর্ণ চারটি গল্পের বই বেরিয়েছিলো: এল আলেফ (El Aleph, 1949), মৃত্যু এবং কম্পাস (La muerte y la brujula 1951)। ব্রদির প্রতিবেদন (El informe de Brodie, 1970) এবং বালি পুস্তক (El Libro de Arena, 1975)। মূলত এল আলেফ নামক গল্পের বই বেরোনোর পর থেকেই অনেকটা অন্ধ হয়ে যান বোর্হেস। কিন্তু অন্ধত্ব তাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে পারেনি কখনো। অন্ধ অবস্থায়ই লিখেছেন ‘ব্রদির প্রতিবেদন’-এর মতো জমজমাট ফ্যন্টাসীধর্মী গল্প কিংবা নির্মাণকারী (El Hacedor 1960)-র প্যারাবলসমূহ যা তাঁর গভীর ভাবনার ঘনীভূত রূপ। আর এইসব গল্প এবং প্যারাবলের বাইরে লিখেছেন এককভাবে অন্তত ছয়টি প্রবন্ধের বই। এছাড়া আদোল্ফো বিওই কাসারেস, সিলভিনা ওকাম্পো, বেতিনা এদেলবা, মারগারিতা গেররেরো, দেলিয়া ইনহেনিয়েরোস, আলিসিয়া হুরাদো, লুইসা মের্সেদেস লেবিনসন, মারিয়া এস্তের বাসকেস, এস্তের ছেম্বোরাইন দে তররেস, মারিয়া কোদামা প্রমুখের সঙ্গে লিখেছেন বা সম্পাদনা করেছেন অসংখ্য বই। তবে সত্যিকারের সাড়া জাগানো গল্পগুলো তিনি অন্ধ হওয়ার আগেই লিখেছেন বলে আমি মনে করি; দু একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। ১৯৪৯ সালের ২৬ জুন প্রকাশিত হয় তার এল আলেফ নামক গল্পগ্রন্থ। ‘এল আলেফ’ নামে একটি গল্পও এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আছে ‘জহির’ নামে অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প। দুটো গল্পেই আমরা দেখবো মূল চরিত্র আসলে বোর্হেস নিজেই। পানশালা (Bar) থেকে পাওয়া ২০ সেন্টের এক আর্হেন্তিনীয় মুদ্রায় আবিষ্ট হওয়া এক লোকের গল্প বুনতে গিয়ে বোর্হেস ‘জহির’ গল্পে ব্যবহার করেন যাদুকরী মুদ্রা সম্পর্কে (ইহুদী) কাবালিস্টিক কুসংস্কার। এক পর্যায়ে মুদ্রা ত্যাগ করলেও এটা সম্পর্কে তার ভাবনা কখনোই থেমে থাকে না বরং এটা তাকে যেন তাড়িয়ে বেড়ায়। আসলে এই মুদ্রার সূত্রে আখ্যানকার নায়িকা তেওদেলিনার প্রতি কামজ আবেশের এক প্রতীকি ইশারা তৈরি করেন। মুদ্রায় আবিষ্ঠ হওয়া মানে নায়িকার সৌন্দর্য, তার তাচ্ছিল্যময় চরিত্র এবং তাঁর অবিস্মরণীয় স্মৃতির প্রতি আবিষ্ঠ হওয়া। কিন্তু কামজ আবেশকে লুকিয়ে রাখেন তার পান্ডিত্যপূর্ণ কাবালিস্টিক ব্যাখ্যার আড়ালে। একই ঘটনা ঘটে ‘আলেফ’-এর ক্ষেত্রেও। ‘আলেফ’-এর নায়িকা বেয়াত্রিস বিতার্বো যিনি আখ্যানকারকে অবজ্ঞাই করেন। বেয়াত্রিসের সমান্তরাল আরেকটি চরিত্র হচ্ছে তারই আত্মীয় কবি কার্লোস আর্হেন্তিনো দানেরি যিনি একটি কবিতায় গোটা বিশ্বকে ধারণ করার উচ্চাশা পোষণ করেন। ‘আলেফ’ আসলে ডিভাইন কমেডির এক ব্যাঙ্গাত্মক মিনিয়েচার। এই অর্থে বোর্হেস হচ্ছেন দান্তে আর বেয়াত্রিস বিতার্বো হচ্ছেন দান্তের বেয়াত্রিস পোর্তিনারি। আর কার্লোস আর্হেন্তিনো দানেরি একই সঙ্গে দান্তে এবং ভার্জিল। ভার্জিলের মতো তিনিও অন্য জগতের দৃশ্য অবলোকনের এক গাইড হিসাবে আবির্ভূত হন। কিন্তু দুজনের মধ্যে পার্থক্য অনেক। দান্তে যেখানে ডিভাইন কমেডির মতো বিশাল রচনায় বিশ্বজগতকে ধারণ করার চেষ্টা করেন, বোর্হেস সে-কাজটা সেরে ফেলেন মাত্র কয়েক পৃষ্ঠায়। আর আলেফ হয়ে ওঠে “পৃথিবীর একমাত্র স্থান যেখানে সব স্থানের উপস্থিতি- যে কোন দিক থেকে দেখুন, সেখানে নেই কোন বিভ্রান্তি বা মিশ্রণ।” এই গল্পের কিংবা বলা ভালো বোর্হেসের গল্পগুলো আলোচনার সূত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনই পরিষ্কার করে নেয়া ভালো। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন যে বোর্হেসের এই সব কল্পকাহিনী বা ফ্যান্টাসীধর্মী লেখাগুলোয় তাঁর দেশ এবং কালের উপস্থিতি কতটুকু কিংবা আদৌ কি আছে? যে-কোন মহৎ লেখকেরই উদ্দেশ্য সার্বজনীন বা বিশ্বজনীন হয়ে ওঠা কিন্তু তার দেশ, কাল এবং ইতিহাসকে বাদ নিয়ে নয়। কিন্তু বোর্হেস যেহেতু এই বিষয়গুলো তাঁর গল্পে সরাসরি নিয়ে আসেন না, তাই কোনো কোনো পাঠকদের মধ্যে এই ধরনের প্রশ্ন উঁকি দিতে পারে। এই প্রসঙ্গে আমি কার্লোস ফুয়েন্তেসের একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবো যেখানে এই বিষয়টি তিনি অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে বোর্হেসের রচনার ব্যাখ্যা করেছেন: “এ ছাড়াও ইতিহাস নিয়ে ফিকশন লেখার আরও দু’জাতীয় প্রবণতা রয়েছে। দুটোই আর্হেন্তিনীয় লেখকদের হাতে চালু হয়েছে আর সেটাই ছিলো স্বাভাবিক, কেননা, এটাই একমাত্র লাতিন আমেরিকান দেশ যার ইতিহাস অল্প। প্রাচীন রসিকতায় বলে, মেহিকোবাসীরা এসেছে আসতেকদের থেকে আর আর্হেন্তিনোরা এসেছে জাহাজ থেকে। পৃথিবীর অন্য কোন জাতিকেই বোধ করি এত শোরগোল করে ইতিহাসের বাইরে নিজের ইতিহাস আবিষ্কার করে নিতে হয়নি, তৈরি করে নিতে হয়নি এমন এক ভাষিক ইতিহাস যা তাদের সংস্কৃতির আর্তনাদ থেকে উদ্ভুত, সে-আর্তনাদ মুহুর্মুহু বলছে: দয়া করে আমাকে ভাষিক রূপ দাও। এ জাতীয় ইতিহাসের ঐতিহাসিকতার মূল উৎস অবশ্যই বোর্হেস। The Aleph- এর সমস্ত কাল আর, The Library of Babel-এর সমস্ত গ্রন্থ হলো ঐ দেশে যে যথেষ্ট পরিমানে মায়াদের ধ্বংসস্তূপ কিংবা ইনকাদের দালানকোঠা নেই, সেই অভাব পূরণ।”৩৫ বোর্হেস নিজেও কখনো কখনো দেশ, কাল, ইতিহাস সম্পর্কিত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। সমকালীন রাজনীতি বা সমাজের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কী ভাবনেত তিনি এ বিষয়ে? আমরা সরাসরি তাঁর মুখ থেকে জেনে নেব আসলে তিনি কী-ভাবতেন:
“প্রশ্ন: সমকালের রাজনীতি এবং সামাজিক বিষয়ে কথাসাহিত্যকে (Fiction) যুক্ত থাকতে হবে- এই ধারণাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
বোর্হেস: আমি মনে করি এটা সবসময়ই যুক্ত আছে। এ নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই। সমসাময়িক হওয়ার ফলে, আমাদের কালের ধরন এবং রীতিতেই আমাদেরকে লিখতে হবে। আমি যদি একটি গল্প লিখি- এমনকি চাঁদের একজন মানুষকে নিয়ে- তা আর্হেন্তিনীয় গল্পই হবে, কারণ আমি একজন আর্হেন্তিনীয়; এবং তা হয়ে উঠবে পশ্চিমী সভ্যতার অভিমুখী কারণ আমি ঐ সভ্যতারই অংশিদার, আমার মনে হয় না এ ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকা উচিৎ। উদাহরণ হিসাবে ফ্লবেয়ার- এর সালাম্বো উপন্যাসটিই দেখা যাক। তিনি এটাকে কার্থেজীয় (Corthaginian) উপন্যাস বলতেন, কিন্তু যে-কেউ দেখলেই বুঝবেন যে এটা লেখা হয়েছিল উনিশ শতকের এক ফরাশী বাস্তববাদীর হাতে। ……আমার মনে হয় না আপনার শতাব্দী, আপনার মতামতের প্রতি অনুগত থাকার চেষ্টা করা উচিৎ। কারণ আপনি সারাক্ষণ তা হয়েই আছেন। আপনার নির্দিষ্ট একটি স্বর আছে, আছে লেখার ধরন, আপনি চাইলেও এ থেকে দূরে সরে যেতে পারবেন না। সুতরাং আধুনিক বা সমসাময়িক হওয়া নিয়ে এত ভাবনার কী আছে, যেহেতু আপনি অন্যকিছু হতে পারছেন না?”৩৬


সম্পাদক বোর্হেস

বোর্হেস তাঁর দীর্ঘ ৮৬ বছরের জীবনে সম্পাদনা করেছেন একাধিক ছোট পত্রিকা, কোন কোনটির ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ছোট পত্রিকা ছাড়াও দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য-সাময়িকী এবং নানান ধরনের সংকলন-গ্রন্থের সম্পাদনার। ১৯২১ সালে মাদ্রিদ থেকে ফিরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রিস্মা’ নামে একটি সাহিত্য-পত্রিকা। এটি ছিলো মূলত দেয়াল-পত্রিকা। সাকুল্যে দুই সংখ্যা বেরিয়েছিলো মাত্র। কিন্তু ‘প্রিস্মা’ আর না বেরুলেও পরের বছরই তিনি বন্ধু ও সহযাত্রী এদুয়ার্দ গনছালেস্ লানুছা এবং গুরু মাসেদোনিও ফের্নান্দেস-এর সাথে ‘প্রোয়া’ প্রকাশ এবং সম্পাদনায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। কয়েকটি সংখ্যা বেরোনোর পর তা বন্ধ হয়ে যায়। বছর খানেক পরে, ১৯২৪ সালে, আর্হেন্তিনার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক রিকার্দ গুইরাল্দেশ-এর সাথে দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘প্রোয়া’ প্রতিষ্ঠা এবং সম্পাদনা শুরু করেন। অন্যদিকে ‘মার্তিন ফিয়েররো’ নামে অন্য আরেকটি পত্রিকায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯২৫ সালে ঔপন্যাসিক রিকার্দো বোর্হেসকে পরিচয় করিয়ে দেন ‘সুর’ (sur) পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদিকা বিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সাথে। ওকাম্পো তাঁকে অচিরেই অন্তর্ভুক্ত করে নেন ‘সুর’-এর সম্পাদনা পরিষদের একজন হিসেবে। ১৯৩৩ সালে বুয়েনোস আইরেসের গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ‘ক্রিতিকা’-র সাহিত্য-সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪০ সালে সিলভিনা এবং কাসারেস-এর সাথে ‘উৎকল্পনা (Fantastic) সাহিত্য সংকলন’ প্রকাশ করেন। ১৯৪৩ সালে কাসারেস-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশ করেন শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা গল্প। ১৯৪৫ সালে সিলভিনা বুলরিখ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশ করেন এল কমপাদ্রিতো। ১৯৪৬ সালে নতুন সাহিত্য পত্রিকা ‘আনালেস দে বুয়েনোস আইরেস’-এর সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৫১ সালে দেলিয়া ইনহেনিয়েরোস-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় জার্মান সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করেন। একই বছর প্রকাশ করেন কাসারেস-এর সাথে শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা গল্প-এর দ্বিতীয় খন্ড। ১৯৫৭ সালে মার্গারিতা গেররেরো’র সাথে যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশ করেন কাল্পনিক প্রাণীদের নির্দেশিকা।


বিতর্ক, বিদ্বেষ নাকি মিথ্যাচার?

বোর্হেসের সাহিত্যের কয়েকটি দিক সম্পর্কে কিছু কিছু বিতর্ক হয়তো পাঠকরা লক্ষ্য করে থাকবেন। তাঁর নিজের দেশেই পঞ্চাশের দশকের একেবারে গোড়ার দিকে একটি বিতর্ক শুরু হয়েছিলো সামাজিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর সাহিত্যকে মূল্যায়নের সূত্রে। যদিও খুব বেশি দূর এগোয়নি সে বিতর্ক। কারণ যারা এই বিতর্কে নেমেছিলেন তারা কেউ-ই যতটা না সাহিত্য তার চেয়ে বেশি ছিলেন কট্টর রাজনৈতিক মতাদর্শের বা জাতীয়তাবাদী মনোভাবের দ্বারা উদ্বুদ্ধ। এদের একজন এইচ.এ.মুরেনা আর অন্যজন ছিলেন হোর্হে আবেলার্দো রামোস। রামোস ছিলেন এক ভূয়া-মার্ক্সবাদী যিনি বিশ্বাস করতেন যে স্বৈরাচারী পেরন হচ্ছেন শ্রমিকদের আসল নেতা। এ দুজন ছাড়াও, সমালোচকদের মধ্যে ছিলেন আর্তুরো হুয়ারেতচে এবং হুয়ান হোসে এরনান্দেস আররেগি। এরা সবাই মিলে বোর্হেসের বিপক্ষে লেখার এক নিষ্ঠুর অভিযান পরিচালনা করেন।৩৭ যেমনটা ঘটেছিলো তিরিশের দশকে জীবনানন্দ দাশের বিরুদ্ধে। আমি সেই সময়কার বিতর্কের ইতিহাস দিয়ে পাঠককে ক্লান্ত করতে চাই না। কারণ এখন এটা পরিষ্কার যে লাতিন আমেরিকান কোনো লেখকই বোর্হেসের সাহিত্যের সামাজিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আর বিতর্কের বিষয় বলে মনে করেন না। তবে গুয়াতেমালার গুরুত্বপূর্ণ লেখক মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস বোর্হেসকে ইউরোপীয় ঘরানার লেখক৩৮ বলে যে মন্তব্য করেছেন তা কতটা সঠিক- এ ব্যাপারে আমাদের গভীর সন্দেহ আছে। এই মন্তব্যটি যদি তিনি বোর্হেসের সাহিত্যিক কর্মকান্ডের ভিত্তিতে করে থাকেন, তা হলে সে অর্থে, আস্তুরিয়াস নিজেও ইউরোপীয় ঘরানার লেখক, কারণ তিনি নিজে স্প্যানিশ সাহিত্যে যে নতুন ধরনের উপন্যাসের সূচনা করেন তার পেছনে পরোক্ষ উদ্দীপক শক্তি হিসেবে কাজ করেছিলো ফরাসী পরাবাস্তববাদী আদর্শ। সেই আস্তুরিয়াস নিজেও কি ইউরোপীয় ঘরানার লেখক হিসাবে চিহ্নিত হবেন? আমার মনে হয় না তিনি এতে করে ইউরোপীয় ঘরানার লেখক হয়ে গেছেন। এটা সত্যি যে বোর্হেসের লেখায় ইউরোপীয় সংস্কৃতির দেদার উল্লেখ আমরা দেখতে পাই, কিন্তু এসব তাঁকে মোটেই ইউরোপীয় করে ফেলেনি। তাছাড়া লাতিন আমেরিকার সংস্কৃতির মধ্যে কি ইউরোপীয় সংস্কৃতির উপাদান নেই? লাতিন আমেরিকাকে কিন্তু এজন্য কেউ ইউরোপের অংশ বলে বিবেচনা করেন না। সুতরাং বোর্হেসকে ইউরোপীয় ঘরানার লেখক বলার মাধ্যমে আস্তুরিয়াস যদি বোর্হেসের লাতিন আমেরিকান লেখক হওয়ার ব্যর্থতার প্রতি ইঙ্গিত করে থাকেন তাহলে সেটা এক ভুল ইঙ্গিত কিংবা নিতান্তই বিদ্বেষ-প্রসূত মন্তব্য ছাড়া আর কিছু নয়। ভুলে গেলে চলবে না যে স্প্যানিশ সাহিত্যে বোর্হেস কেবল নতুন শৈলী এবং বিকল্প ঐতিহ্যেরই নির্দেশনা দেননি, মূলত তিনিই ছিলেন সম্ভাবনা এবং চরিত্রের দিক থেকে সত্যিকারের প্রথম লাতিন আমেরিকান লেখক। বিলীন অতীতের কৃত্রিম পুনর্গঠনের পরিবর্তে তাঁর লেখা এমন এক সাহিত্যিক কল্পনার জগতকে তুলে ধরলো যেখানে আধুনিক চিন্তার সাথে প্রাসঙ্গিক সব সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে। ‘আভেরুশের সন্ধান’ ‘এমা ছুনস’ এবং ‘আলমুতাসিমের নৈকট্য’– এই গল্পগুলোয় কেবল পশ্চিমী এবং আরবি সংস্কৃতির সহাবস্থানই চিত্রিত হয়নি, একই সঙ্গে তা আমাদের সামনে তুলে ধরেছে বহুত্ব ও বহুত্বের সম্মিলিত ক্রিয়ার শক্তি যা উত্তর-কালের গোটা লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিংবা অন্যভাবে বলা যার লাতিন আমেরিকান আধুনিক কথাসাহিত্যের নন্দনতাত্ত্বিক ভিত্তিটা রচনা করেন বোর্হেস।
বোর্হেস সম্পর্কিত ফুয়েন্তেসের লেখার মধ্যেই আমরা এই বিষয়ের একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা এবং উত্তর খুঁজে পাবো। ফুয়েন্তেসের ভাষায় ‘‘মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস এবং আলেহো কার্পেন্তিয়েরের মতো তিনি আমাদের সংস্কৃতির ইন্ডিয়ান কি আফ্রিকান উপকরণের কথা বলেন না।’’ তবে তা না বললেও ‘‘বোর্হেস লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের জন্য এ কথাটিই পরিষ্কার করলেন যে আমরা বহু বিচিত্র কাল ও স্থানে বাস করি, আমরা বহু বিচিত্র সংস্কৃতিরই প্রকাশ ঘটাই।’’ —-‘‘হয়তো তাঁর পক্ষেই সম্ভব পাশ্চাত্যের সামগ্রিকতা ধারণ করে ইউরোকেন্দ্রিকতার সীমাবদ্ধতা দেখানো।’’ শুধু ফুয়েন্তেসই নন, পেরুর লেখক মারিও বার্গাস ইয়োসাও কিন্তু বোর্হেসের এই দিকটি সম্পর্কে একই মত পোষণ করেন : ‘‘সুদূরে অবস্থান করেও এই আর্হেন্তিনীয় কবি ও গল্পকার পাশ্চাত্যকে যতটা সম্পূর্ণ ও অনুপুঙ্খভাবে আত্মস্থ করেছেন খুব কম ইউরোপীয় লেখকই তা পেরেছেন। বোর্হেসের সমসাময়িকদের ভেতর কে আর সমান স্বাচ্ছন্দ্যে ষ্ক্যান্ডিনেভীয় পুরান, অ্যাঙ্গলো-স্যাক্সন কবিতা, জার্মান দর্শন, স্পেনের স্বর্ণযুগের সাহিত্য, ইংরেজ কবি, দান্তে, হোমার এবং ইউরোপীয় অনুবাদের মাধ্যমে পাওয়া দূর ও মধ্যপ্রাচ্যের কিংবদন্তী ও পুরান ব্যবহার করতে পেরেছেন? কিন্তু এজন্য বোর্হেস ইউরোপীয় হয়ে যাননি।’’ বোর্হেস নিজেও এ বিষয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন যে, “ইউরোপীয়দের ব্যাপারে আমাদের একটা সুবিধা হচ্ছে এই যে আমরা হচ্ছি, হতে পারি ভালো ইউরোপীয় এবং তাদের চেয়েও বেশি ইউরোপীয়। কারণ একজন ইতালীয় শুধুই ইতালীয় হওয়ার মনোরম ঝুঁকি বহন করে এবং একজন ইংরেজ শুধুই ইংরেজ হওয়ার। অন্যদিকে, আমরা গোটা পশ্চিমী সংস্কৃতির উওরাধিকারী। একটি বাদ দিয়ে অন্যটিতে মনযোগী হওয়ার দরকার পড়ে না আমাদের। যা-ইচ্ছা করি আমরা তাই এবং তা-ই হয়ে উঠতে পারি।’’৩৯

বোর্হেস সম্পর্কে আরেকটি অভিযোগ অবশ্য সাম্প্রতিক এবং তা দূরে কোথাও নয়, কোলকাতার এক বাংলাভাষী লেখক-অনুবাদকের। অনুবাদে যার প্রতিভা রীতিমত ইর্ষণীয়। তিনি আমার প্রিয় অনুবাদকদের একজন। তিনি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদেশী সাহিত্যকে বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে পরিচিত করার ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা অতুলনীয়। আমার প্রিয় এই অনুবাদক বোর্হেস সম্পর্কে যে মন্তব্য বা অভিযোগ করেছেন তা পাঠকদের সুবিধার্থে উদ্ধৃত করছি এখানে ‘‘এমন নয় যে নিছক অধ্যাত্মবাদী নন্দনতাত্ত্বিক লাতিন আমেরিকায় কেউ ছিলো না—আর্হেন্তিনার হোর্হে লুইস বোর্হেসের নামই মনে পড়ে যাবে আমাদের যার শিল্পিতা লেখকের কাছে ইর্ষণীয় মনে হলেও যিনি তার ফাসিস্ত মতবাদের জন্য (তার রচনার পরতে পরতে ভাঁজে ভাঁজে মিশে আছে সে মতবাদ, তিনিই বলেছিলেন ফ্রাঙ্কোর গুন্ডারা ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকাকে অনেক আগেই কেন খুন করেননি।) শেষ পর্যন্ত তিনি কোথাও পৌঁছুতে পারেন নি, বরং জীবদ্দশাতেই জাদুঘরের সামগ্রী হয়ে উঠেছিলেন।’’৪০মানবের মতো মার্ক্সবাদী বামপন্থীদের সমস্যা এই যে এরা অন্যের মুখে ঝাল খেয়ে অভ্যস্থ। আমার ধারণা, বোর্হেসের লেখা তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েননি। আর পড়ে থাকলেও বোঝেননি কিছুই। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো মানবেন্দ্র বোর্হেস না-পড়ে বা না-বুঝেই বাংলাভাষী পাঠকদেরকে বোর্হেস সম্পর্কে রীতিমত বিভ্রান্তিকর, ভুল এবং একেবারেই মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। একজন বামপন্থী মার্ক্সবাদী লেখক-অনুবাদকের মধ্যে কী করে এতগুলো মিথ্যা এবং ভুল তথ্যের সমাবেশ ঘটতে পারে তা ভেবে আমি রীতিমত বিস্মিত। প্রথমেই দেখা যাক ‘আধ্যাত্মবাদী নন্দনতাত্ত্বিক’ বলতে তিনি কী বুঝাতে চেয়েছেন। এ রকম কোন সাহিত্যিক পরিভাষা আছে কিনা আমি জানি না আর থাকলেও আমার কাছে তা পরিষ্কার নয়। কোন অর্থে বা কেন আধ্যাত্মবাদী তা কিন্তু তিনি পরিষ্কার করেন নি। সেটা কি এই কারণে যে তিনি বামপন্থী বা মার্ক্সবাদী লেখক ছিলেন না? সেটা কি এই কারণে যে তিনি তথাকথিত সমাজবিপ্লব নিয়ে কোনো লাল রংয়ের সস্তা সাহিত্য রচনা করেননি বলে? লাতিন আমেরিকার বামধারার যে-সব লেখকের লেখা মানবেন্দ্র প্রশংসা করেন বা অনুবাদ করেন তাঁদের কেউ-ই কিন্তু এই ধরনের ভুয়া অভিযোগ কখনো তোলেননি বোর্হেসের বিরুদ্ধে। বামপন্থী বা মার্ক্সবাদী না হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু বোর্হেসকে তাঁরা লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের মুক্তিদাতা হিসেবেই সমীহ করেন। আমার এই ভূমিকাতেই পাঠক আশা করি তা লক্ষ্য করে থাকবেন। কট্টর বামপন্থী বা মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সাহিত্যের বিচার কত ঠুনকো এবং হাস্যকর হতে পারে আমরা কাফফার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই তা দেখেছি। ‘‘যথার্থ মার্ক্সবাদী ভাবুকের কাছে আমরা আরেকটুকু ধৈর্য্যময় বিশ্লেষণের প্রত্যাশা করি।’’৪১
বলেছেন বোর্হেসের মধ্যে ‘‘ফাসিস্ত মতবাদ’’ রয়েছে, “এমনকি তাঁর রচনার পরতে পরতে ভাঁজে ভাঁজে মিশে আছে যে মতবাদ।” জানি না বোর্হেসের কোন লেখাতে তিনি ফাসিস্ত মতবাদ খুঁজে পেয়েছেন। আমি কিন্তু তার কোন লেখাতেই সে রকম কিছু খুঁজে পাইনি। এমনকি, লেখার বাইরে, বোর্হেসের ব্যক্তি জীবনেও ফাসিস্ত মতাদর্শ সমর্থনের কোন প্রমাণ পাইনি। বরং উল্টোটাই ঘটতে দেখেছি। স্বৈরাচারী সামরিক শাসক হুয়ান দোমিংগো পেরন যখন ১৯৪৬ সালে আর্হেন্তিনার রাষ্ট্র-ক্ষমতা কুক্ষিগত করে তখন পেরন-বিরোধী প্রচারপত্রে স্বাক্ষর করার অপরাধে তাঁকে বুয়েনোস আইরেস গণপাঠাগারের গ্রন্থাগারিকের পদ থেকে চ্যুত করে পশু খামারের পর্যবেক্ষণের পদে ন্যস্ত করা হয়। এমনকি, তাঁর মাকে (বার্ধক্যের কারণে) নিজগৃহে এবং বোন নোরাকে জেলে মাস খানেকের জন্য অন্তরীণ রাখা হয়। মানবেন্দ্রর অবগতির জন্য এই ফাঁকে এও জানিয়ে রাখতে চাই যে ১৯৫০ সালে তাকে ‘‘পেরন-বিরোধী আর্হেন্তিনীয় লেখক সমিতির সভাপতি হিসেবে মনোনীত’’৪২করা হয়। শুধু পেরন-ই নয়, ছিলেন ফাসিস্ত ফ্রাঙ্কোরও বিরুদ্ধে তিনি। স্প্যানিশ সাহিত্যের পণ্ডিত এবং বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্যামাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমে এও জানতে পারছি যে ‘‘During the Spanish Civil war he (Borges) has said his sympathies lay with the Repaublicans as his friends belonged to the anti-Franco Camp.”৪৩শুধু মন্তব্য বা বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না তার ফাসিস্তবিরোধী মনোভাব, এমনকি লিখিতভাবেও তিনি ফাসিস্ত মতবাদের দোসর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। ১৯৪৬ সালের আগস্ট সংখ্যার ‘দক্ষিণ’ (sur) পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লেখেন ‘‘স্বৈরাচার জন্ম দেয় নির্যাতন, স্বৈরাচার জন্ম দেয় চাটুকারিতা, স্বৈরাচার জন্ম দেয় নিষ্ঠুরতা, এমনকি আরও জঘন্য ব্যাপার হচ্ছে এই যে তা জন্ম দেয় নির্বোধ কর্মকান্ডের … লেখকদের অন্যতম এক কর্তব্য হচ্ছে এই দুঃখজনক একঘেয়ে বিষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা।’’৪৪
এটা সত্যি যে তিনি রাজনৈতিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বামপন্থী ছিলেন না, ছিলেন রক্ষণশীল। তিনি নাৎসীবাদের বিরুদ্ধে যেমন বলেছেন, তেমনি কম্যুনিজমের বিরুদ্ধেও বলেছেন। কিন্তু তাঁর এই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস দিয়ে নিজের সাহিত্যকে কখনো কলুষিত করেননি। সাহিত্যে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এসব বিষয় এড়িয়ে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কেবল একটি ভুল করেছিলেন চিলির তৎকালীন স্বৈরশাসক আউগুস্ত পিনোশেৎ-এর সঙ্গে ভোজের নিমন্ত্রণ রক্ষা করে। এজন্য তাঁকে দেশী-বিদেশী গঞ্জনা কম সহ্য করতে হয়নি। হতে পারে পিনোশেৎ-এর তৎকালীন বুদ্ধিজীবী মহলের কারো কারোর অনুরোধে বোর্হেস এই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। হতে পারে বোর্হেসকে নিমন্ত্রণের মাধ্যমে স্বৈরাচারী পিনোশেৎ সাধারণ্যে গ্রহণযোগ্যতা লাভের ধান্দাই করেছিলেন। যেমনটা ঘটেছিলো ইতালিতে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে ফাসিস্ত মুসোলিনির দাওয়াত রক্ষা করার ফলে। কিন্তু ভুলটি তিনি কোন সুযোগ লাভের আশায় বা ফায়দা লোটার আশায় করেননি। চিলির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট অনরিস কাউসা গ্রহণ করতে গেলে চিলির প্রেসিডেন্ট তাঁর সম্মানে ভোজের আয়োজন করেন। কিন্তু বোর্হেস নিতান্তই সৎ বলে পরবর্তীকালে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে এটি ছিলো তাঁর ভুল সিদ্ধান্ত। এই একটি কলঙ্ক ছাড়া বোর্হেসের জীবনে আর কোন নিন্দনীয় ঘটনা আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু আমাদের স্মরণ করা উচিৎ যে একজন লেখককে শেষ পর্যন্ত বিচার করা হবে তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্যে আর এই সাহিত্যকর্মকে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সাথে মিলিয়ে দেখলে চলবে না। মানবেন্দ্রর অভিযোগের আরেকটি অংশ হচ্ছে: ‘‘তিনিই বলেছিলেন ফ্রাঙ্কোর গুন্ডারা ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকাকে অনেক আগেই কেন খুন করেনি।’’ জানি না মানবেন্দ্র এই উদ্ভট উক্তি কোত্থেকে পেয়েছেন। তিনি এই উদ্ধৃতির কোন উৎস নির্দেশ করেননি। করলে ভালো হতো। দ্রুতই শনাক্ত করার সুবিধা হতো। কিন্তু আমি তাঁর স্প্যানিশ এবং ইংরেজীতে অনূদিত রচনাবলীর কোথাও এমন উক্তি খুঁজে পাইনি। তাঁর দেয়া সাক্ষাৎকারগুলোতেও নয়। রিচার্ড বার্জিন-এর সাথে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের৪৫ এক পর্যায়ে লোরকার প্রসঙ্গ এসেছে। সেইটাই যদি তার অনুল্লিখিত উৎস হয়ে থাকে তাহলে আমি এখানে ইংরেজী সংস্করণটাই হুবহু উদ্বৃত করছি পাঠকদের বিচার করার সুবিধার জন্য :
Burgin : What about the plays of Lorca?
Borges : I don’t like them. I never could enjoy Lorca.
Burgin : Or his poetry either?
Borges : No, I saw yerma and I found it so silly that I walked away. I couldn’t stand it. Yet I suppose that’s a blind spot because………….
Burgin : Lorca, for some reason, is idealized in this country.
Borges : I suppose he had the good luck to be executed, No? I had an hours chat with him in Buenos Aires. He struck me as a kind of play actor, No? Living up to a certain role. I mean being a professional Andalusian.*

বোর্হেস যা বলেছেন—যদি আক্ষরিক অনুবাদ করি—-তাহলো এই যে: ‘‘মনে হয় খুন হওয়াটা তার জন্য সৌভাগ্যই বয়ে এনেছিলো।(I suppose he had the good luck to be executed, No?)” ‘খুন হওয়াটাকে’ তিনি কেন সৌভাগ্য বলছেন? এই সাক্ষাৎকারে বুঝা যাচ্ছে বোর্হেস লোরকার কবিতা বা নাটক, কোনটাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। কিন্তু বোর্হেস গুরুত্বপূর্ণ মনে না করলেও লোরকা ততদিনে স্পেনে এবং লাতিন আমেরিকায় দারুণ জনপ্রিয় এবং পরিচিত ব্যক্তিত্ব। অতএব, তাঁর এই জনপ্রিয়তা বা খ্যাতির একটা ভিত্তিতো থাকতেই হবে। কী সেই ভিত্তি? বোর্হেসের মতে, সেই ভিত্তি যতটা না সাহিত্য তার চেয়ে বেশি ঐ অল্প বয়সে খুন হওয়া। সেই অর্থেই বোর্হেস একে সৌভাগ্য বলে অভিহিত করেছেন। এই বক্তব্যের কোথাও ‘‘ফ্রাঙ্কোর গুন্ডারা ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকাকে অনেক আগেই কেন খুন করেনি!’’ —এরকম ইঙ্গিত নেই। জানি না এর বাইরে অন্য কোন গোপনসূত্র মানবেন্দ্রর ঝুলিতে আছে কিনা।
কেউ যদি না-বুঝে কোনো তথ্য বা বক্তব্য পেশ করেন তাকে আমরা বলি ‘ভুল’। আর যদি সঠিক জেনেও ভিন্ন তথ্য দেন তাহলে আমরা তাকে বলি ‘মিথ্যাচার’। আর যদি কেউ নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে অবহিত না হয়ে সে বিষয়ে বক্তব্য পেষ করেন সেটাকে আমরা বলি ‘অজ্ঞতা-প্রসূত’। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলেই পাঠক বুঝতে পারবেন মানবেন্দ্র কতটা মিথ্যে কথা বলতে পারেন। মানবেন্দ্র যখন বলেন ‘‘শেষ পর্যন্ত তিনি (বোর্হেস) কোথাও পৌঁছতে পারেননি, বরং জীবদ্দশাতেই জাদুঘরের সামগ্রী হয়ে উঠেছেন।’’ তখন আমি বুঝতে পারি না, একে মানবেন্দ্রর ভুল, মিথ্যাচার নাকি অজ্ঞতা-প্রসূত বক্তব্য বলবো। মার্কিন লেখক অধ্যাপক ও অনুবাদক Clark M. Zlotchew আমাদেরকে দিচ্ছেন ঠিক বিপরীত এক চিত্র:
Jorge Luis Borges is the most eminent Latin American writer of the twentieth century. It is even safe to say that he is the best known and most admired living writer in the Spanish language. Translated into all the major tongues, his poetry, essays, and short fiction are among the most important pieces of modern world literature. very few authors are as widely praised, criticized, loved, abhorred, discussed, or argued over. ৪৬ আমি যতদূর জানি তিরিশের দশকের একেবারে গোড়া থেকেই তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য আলোচিত হতে শুরু করেন আর্হেন্তিনার নেতৃস্থানীয় দৈনিক এবং সাহিত্য পত্রিকায়। গত শতাব্দীর বিশ-এর দশকেই আর্হেন্তিনার প্রধান ঔপন্যাসিক রিকার্দো গুইরাল্দেস প্রবন্ধ লিখে বোর্হেস প্রতিভার স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এই বলে Borges was among those young writers who had a mission to reform and renew Argentine Literature. (Beatriz Sarlo, Jorge Luis Borges, verso, New York, 1993, p-26)। অন্যদিকে ১৯৩৯ সালে নেস্তর ইবারবার মাধ্যমে ফরাসী ভাষায় তাঁর লেখার অনুবাদের সূত্রে বিদেশে পরিচিত এবং আলোচিত হতে শুরু করেন। এখন পর্যন্ত তাঁর উপর যে কত অসংখ্য গ্রন্থ এবং প্রবন্ধ লেখা হয়েছে তার হিসেব করা সত্যি এক কঠিন কাজ। মানবেন্দ্রর মতো কোনো অধ্যাপক যদি সেই কাজে আত্মনিয়োগ করেন তাহলে আমি নিশ্চিত যে তাঁর সম্পর্কে শুধু রচনাপঞ্জীর একটা তালিকা দিয়েই শত পৃষ্ঠার গ্রন্থ অনায়াসেই তৈরি করতে পারবেন। বোর্হেস বহির্বিশ্বে কেবল লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের প্রথম আলোচিত ব্যক্তিত্বই নন, সম্ভবত সর্বাধিক আলোচিত ব্যক্তিত্ব।


উল্লেখপঞ্জী

১. Michel Foucault, Order of things, vintage Book, April 1994,P. 15-24
২. Maria Esther Vazquez, Borges: Sus dias Y su Tempo, Punto de Lectuva, Spain Mayo 2001, P.137
৩. Norman Thomas di Giovanni, Borges on writing, E.P. Duttos & Co. 1973, P.9.
৪. Historia Universal de La Infamia বা অখ্যাতির বিশ্বজনীন ইতিহাস গ্রন্থের গল্পগুলো আর্হেন্তিনার Critica নামক দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হতে শুরু করে ১৯৩৩ সালে। আর El Jardin de senderos Que se bifurcan বা প্ররোহী পথের বাগান-এর গল্পগুলো ১৯৪১ সালে বই বেরোনোর আগেই তা বিভিন্ন পত্রিকায় কয়েক বছর আগেই প্রকাশিত হয়েছিলো। মারিয়া তাঁর Borges: Sus dias Y su Tiempo গ্রন্থের Cronologia অংশে জানাচ্ছেন যে ‘দন কিহোতের লেখক পিয়ের মেনার্ড’ গল্পটি লেখা হয়েছিলো ১৯৩৮ সালে। দেখুন পৃষ্ঠা: ৩১৮। এ ছাড়া ‘The Approch to almutasim’ গল্পটি লেখা হয়েছিলো ১৯৩৫ সালে। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন Jorge Luis Borges, The Aleph and other stories 1933-1969, Edited and translated by Norman Thomas di Giovanni, Bantam, November 1971, P. 167.
৫. Contemporary literary Criticism, VOL-85, P. 378.
৬. Interview of Guillermo Cabrera Infante with Rita Guibert, Revista Iberoamericana, vol-37, P. 552.
৭. Norman Thomas di Giovanni, Borges on writing, E.P. Duttos & Co, 1973,P.9.
৮. Alejando Vaccaro, Borges: Una biografia en imagenes, Ediciones B Argentina, Ira edicion 2005, P. 24-25.
৯. বোর্হেস স্প্যানিশে পড়তে শেখার আগে ইংরেজীতেই প্রথম বই পড়তে শেখেন: “All the foregoing books I read in English. when later I read Don Quijote in original, it sounded like a bad translation to me.’’ (Jorge Luis Borges, The Aleph and other stories 1933-1969, Edited and translated by Norman Thomas Digiovanni, Bantam, November 1971, P. 141.)
১০. Jorge Luis Borges, The Aleph and other stories 1933-1969, Edited and translated by Norman Thomas di Giovanni, Bantam, November 1971, P. 140.
১১. Jorge Luis Borges, The Aleph and other stories 1933-1969, Edited and translated by Norman Thomas di Giovanni, Bantam, November 1971, P. 143.
১২. Emir Rodriguez monegal, Jorge Luis Borges: A literary Biography, Paragon House publishers, 1988, P.76.মনেগাল অবশ্য এই তথ্যটি উদ্ধৃত করেছেন ফরাসী লেখক Jean De milleret Entretions avee Jorge Luis Borges, Paris, Piese Belfond, 1967 লেখা থেকে।
১৩. Jorge Lues Borges, The Aleph and other stories 1933-1969, Edited and translated by Norman Thomas di Giovanni, Bantam, November 1971, P. 142.
১৪. বোর্হেসের চাচা আলবারো মেলিয়ান লাফিনুরের উদ্যোগে বোর্হেসের এই অনুবাদ মুদ্রিত হয় El Pais পত্রিকায় ২৫-১৯১০ সালে। বোর্হেস তার ‘আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধ’- এ বলেছেন তার ৯ বা ও রকম কোন বয়সে ছাপা হয়েছে। মারিয়া এসতের বাস্কেস তার Borges : Sus dias Y Su Tiempo গ্রন্থে সময়কাল ১৯০৮ হিসেবে উল্লেখ করেছেন (দেখুন:পৃষ্ঠা ৩৯৪)।
১৫. বোর্হেস বিষয়ক একই গ্রন্থে মারিয়া জানাচ্ছেন যে বোর্হেসের লেখার প্রথম অনুবাদ হয় নেস্তর ইবাররার মাধ্যমে ১৯৩৯ সালে ১৫ এপ্রিল। এবংকল্পকাহিনী (Ficciones) গল্পগ্রন্থের ফরাসী অনুবাদের সময়কালের সাথে অন্য গবেষক বা বোর্হেস-বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য না থাকলেও একটি বিষয়ে তথ্যের ভিন্নতা লক্ষণীয়: ১৯৫১ সালে ফরাসী ভাষায় প্রকাশিতকল্পকাহিনী (Ficciones)র অনুবাদক হিসেবে তিনি রোজার কাইলোয়ার পরিবর্তে P. Verdovoye- এর নাম উল্লেখ করেছেন। মারিয়ার এই তথ্যের সমর্থন লক্ষ্য করা যায় রাফায়েল ওলেয়া ফ্রাংকোর El otro Borges, El Primer Borges গ্রন্থের ১৫নং পৃষ্ঠার ফুটনোট অংশে। ফ্রাংকোর বইটি মেহিকোর অভিজাত প্রকাশনী Fondo de Cultura Economia থেকে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত। কিন্তু বোর্হেসের বন্ধু এবং বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ এমির রদ্রিগেছ মনেগালের বইয়ে বোর্হেসের প্রথম দুটি গল্প The Babylon Lottery ও Library of Babel- এর ফরাসী অনুবাদের সময়কাল অক্টোবর ১৯৪৪ এবং রোজার কাইলোয়ার মাধ্যমে তারই সম্পাদিত Letters Francaises পত্রিকায় প্রকাশিত এবং কল্পকাহিনীর পূর্ণাঙ্গ ফরাসী অনুবাদের প্রকাশকাল ১৯৫১ হলেও অনুবাদক হিসেবে মনেগাল উল্লেখ করেছেন রোজার কাইলোয়ার নাম। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন পৃষ্ঠা ১৮১ এবং ৪২০।
১৬. আমি নিজে তার অনূদিত কোরান শরীফ এবং রবীন্দ্রনাথের মানবধর্মবইয়ের স্প্যানীশ অনুবাদ দেখেছি। সে-অনুবাদে কভার পৃষ্টা কোরান শরীফ-এর লেখক হিসেবে তিনি হযরত মুহাম্মদের নাম উল্লেখ করেছেন। আর রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম তিনি বাংলা থেকে অনুবাদ করেছেন কিনা সে ব্যাপারে কোন ইঙ্গিত নেই।
১৭. Jorge Luis Borges, Selected Poens 1923-1967, Edited by Norman Thomas Digiovanni, penguins Books, 1972 P.XIII.
১৮. Jorge Luis Borges, Selected Poens 1923-1967, Edited by Norman Thomas Digiovanni, penguins Books, 1972 P. 291.
১৯. (Ed:) Norman Thomas di Giovanni, Borges on writing, E.P. Duttors & co,1973, P.63.
২০. Juan Jose Saer, El concepto de Ficciones, planeta,Mexico, 1997, P-283-284.
২১.* রবীন্দ্রনাথ আর্হেন্তিনায় ওকাম্পোর অতিথি থাকাকালে যে-কজন আর্হেন্তিনীয় সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের সাথে তাঁর পরিচয় হয়, রিকার্দো ছিলেন তাদের একজন।
২২. (compil) Miguel Capistran, Borges Y mexico, plaza Y Janes, mexico,1999,P.312-313
২৩. Jorge Luis Borges, Selected Non-Fictions, Edi: Eliot weinberger, penguins Books, 1999, P.517.
২৪. Bravo (Pilav) Y Paolette, (mario) Borges Verbal, Emece Fditores 1999, P.12.
২৫. Fernando Sorrentino, Siete Coversaciones con Jorge Luis Borges, Pardo, Buenos Aires, 1974, P.120
২৬. Alejo Carpentier (Ed:) Salvador Arias, Recopilacion de textos sobre Alejo Carpentien, Casa de los Americas, Habana, 1997,P.19.
২৭, ২৮. Maria Esther Vasquez, Borges: Sus dias y su Tiempo, punto de lectura, Spain, Mayo 2001, P. 137-138.
২৯. Norman Thomas di Giovanni, The Borges Tradition, Constable London, 1995, P. 61.
৩০. Norman Thomas di Giovanni, The Borges Tradition, Constable London, 1995, P. 68.
৩১. There are no legends in this land and not a single ghost walks through our streets. That is our disgrace. our lived reality is sndiase yet the lite at our imagination is paltary… Buenos Aires is now more then a city, it is a country, and we must find the poetry, the music the painting, the religion and the metaphysics appropriate to its greatness. That is the size of my hope and I invite you all to to become gods to work for its fulfillment.” Beatrih sarlo, Jorge Luis Borges, verso, New york, 1993, P. 20

৩২. Miguel Copistran, Borges y Mexico, plazay Janes Mexico, 1999, P. 317.
৩৩. দন কিহোতের কৌতুককর বা ব্যঙ্গাত্মক দিকটি বোঝার জন্য এর পূর্ববর্তী সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটটি জানা খুবই জরুরি। দন কিহোতে রচনার আগে স্প্যানিশ সাহিত্যে এক ধরনের বীরগাথা বা রোমান্স-এর ছড়াছড়ি ছিলো। আমাদিওস দে গাউলা ঠিক সে ধারার বীরগাথার এক উদাহরণ। আমাদের ভাষার ‘জঙ্গনামা’, ‘সোনাভান’ ইত্যাদির মতোই এই বীরগাথাগুলো। সের্বান্তেসের কৌতুকবান ছিলো এগুলোকেই লক্ষ্য করে।
৩৪. Emir Rodriguez Monegal, Jorge Luis Borges: A literary Biography, Paragon House publishers, New York, 1988, P. 331.
৩৫. (সম্পা:) রাজু আলাউদ্দিন, মেহিকান মনীষা, ঢাকা, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা: ৫৬.

৩৬. Norman Thomas di Giovanni, Borges on writing, E.P. Dutton co, 1973,P. 51.
৩৭. His stories were seen as elitist evasions from the ‘real’, his heterodox views on foreign influences were interpreted as extranjirigante (Foreign-Loving at the expense of the nation), critics such as Arturo Jauretche, Jorge Abelardo Ramos. and Juan Hernandez Arregui were harbingers of the new brutalism. Beatris sarlo, Jorge luis Borges, Verso 1993, P-XII.



৩৮. Rita Guibert: That reminds me that you said Borges was “a great writer, but one of the great European writers.”
Asturias: As an American-Indian, when I read Borges I get the impression that he’s a European author, deeply versed in European culture, a man whose interests are European, who is constantly analyzing his own Personality, his ego. There is plenty of European lucubration in his writings, and I don’t find American roots in it, our preferences, nor if you like our defects. This is no way decreases his stature as a great writer, but I question whether he is representative of Latin American Literature. (Rita Guibert, Seven voices,Translated from the Spanish by Frances Portsedge, Alfred A. Knopd New Your 1973, U.S.A. P-155.
৩৯. Maria Esther Vasquez, Borges: Sus dias y su Tiempo, punto de lectura, Spain, Mayo 2001, P. 370-171
৪০. মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হুয়ান রুলফোর কথাসমগ্র, প্রমা প্রকাশনী, কলকাতা ১৯৯০, পৃষ্ঠা: ২৭২.
৪১. শঙ্খ ঘোষ, ঐতিহ্যের বিস্তার, প্যাপিরাস, কলকাতা, ১৯৯১, পৃষ্ঠা : ১২৮.
৪২. Jorge Luis Borges, Fictions, (Ed & Trans:) Anthony Kerygan, American Library, ( in `Cronology’ section), P. xxxxvi.
৪৩. Shamu Ganguly, Hispanic Horizon/ No. 3. Monson 1986-87,New Delhi, P. 46.
৪৪. Jorge Luis Borges, Sur 142, Agosto, 1946, P 114-15.
৪৫. Richard Burgin, Conversation with Jorge Luis Borges, Discus Book, New York, 1970. P. 108-109.
*. লোরকা সম্পর্কে বোর্হেসের অনুরূপ মন্তব্য আরও একটি সাক্ষাতকারেও আছে। এটি আমি পেয়েছিলাম ইন্টারনেটে। ১৯৮০ সালের ২৫ এপ্রিল ডানিয়েল বার্নি, স্টিফেন ক্যাপ এবং চার্লস সিলভার – এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে বোর্হেস বলেন:
‘‘তবে আমি লোরকা-মুগ্ধ নই। দেখুন; এটা আমার এক সীমাবদ্ধতা, ভিজ্যুয়াল পোয়েট্টি আমার পছন্দ নয়। খামখেয়ালিপূর্ণ রূপক তার মূল লক্ষ্য। অবশ্যই, জানি তিনি খুবই সম্মানিত। আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতামও। নিউইয়র্কে তিনি বছরখানেক ছিলেন। এই এক বছরে তিনি একটি ইংরেজী শব্দও শেখেননি। কী আশ্চর্য? বুয়েনোস আইরেসে তার সাথে আমার একবার দেখা হয়েছিলো। খুন হওয়াটা তার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপারই হয়েছিলো। একজন কবির ক্ষেত্রে যা শ্রেষ্ঠতম ব্যাপার। এক চমৎকার মৃত্যু, তাই না? আলোড়িত করার মতো মৃত্যু এবং পরে আন্তোনিও মাচাদো তাকে নিয়ে সেই সুন্দর কবিতাটি লিখেছিলেন।” এখানেও মানবেন্দ্রর উদ্ধৃতির কোন প্রতিধ্বনি আমরা দেখতে পাই না।
ফের্নান্দো সররেন্তিনোকে দেয়া সাক্ষাৎকারেও আমরা লোরকা প্রসঙ্গ উত্থাপিত হতে দেখি। কিন্তু সেখানেও ‘‘ফ্রাঙ্কোর গুন্ডারা ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকাকে অনেক আগেই কেন খুন করেনি!’’–এমন কোনো কথা বোর্হেস বলেননি।
৪৬. Fernando Sorentino, Seven Conversation with Jorge Luis Borges, Tra: Clark M. Zlotchew, The Whistsore Publishing Company, Tory, New York, 1982, P-v11


লেখক পরিচিতি
রাজু আলাউদ্দিন
কবি। অনুবাদক। গবেষক। প্রবন্ধকার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন