মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকে  অনুবাদ : জয়া চৌধুরী 

হেরোইন ছাড়লাম। নিজের মফঃস্বল শহরটায় ফিরে এলাম। ভ্রাম্যমান চিকিৎসাগারে কৃত্রিম আফিং মেশানো মেতাদোনা ওষুধ দিয়ে আমার নেশা ছাড়ানোর চিকিৎসা শুরু করলাম। সামান্য কাজ করতে হত। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠা ছাড়াও টিভি দেখা আর রাতে ঘুমোনোর চেষ্টা করা। কিন্তু সেটা পারতাম না। কিছু একটা আমাকে বিশ্রাম নিতে কিংবা চোখ বুজতে দিত না। আর ততদিন সেটাই আমার দিনলিপি ছিল যতদিন না সেই দিনটা এল যেদিন আর পারলাম না। শহরের কেন্দ্রে একটা দোকান থেকে স্যুইম স্যুট কিনলাম এবং সমুদ্রতীরে চলে গেলাম। পরিপাটি করে স্যুইমিং স্যুট পরা, সঙ্গে একটা তোয়ালে আর একটা সাময়িকী। জলের বেশ খানিক কাছেই পাতলাম তোয়ালেটা আর টানটান করে শুয়ে পড়লাম। একটু ক্ষণ ভাবলাম স্নান করব কি করব না। স্নান করার জন্য মনের মধ্যে হাজারটা কারণ ভেসে উঠল। কিন্তু স্নান না করার জন্য ও হাজারটা কারণ ভাবলাম ( যেমন- ভাবলাম বাচ্চারাই কেবল ঢেউয়ে স্নান করে। ) তাই শেষ পর্যন্ত সময় কেটে গেল আর আমি বাড়িই ফিরে এলাম। পরদিন সকালে একটা সানস্ক্রীন মলম কিনলাম। এবং আবার সমুদ্রতীরে গেলাম।

বেলা বারোটার কাছাকাছি আমি ভ্রাম্যমান চিকিৎসাগারে গেলাম। ওষুধের ডোজটা নিলাম। চেনা কতগুলো মুখ দেখে কিছু হাই-ই হ্যালো করা গেল। কেউ কিন্তু বন্ধু বা বান্ধবী নয়। শুধু লাইনে দাঁড়ানো চিকিৎসাগারের কতগুলো চেনা মুখ, যারা আমায় স্যুইমিং স্যুটে দেখে ভিরমি খাচ্ছিল। কিন্তু আমি এমন ভাব করলাম যেন কিছুই হয় নি। পরে আবার সমুদ্রের তীরে ফিরে এলাম। এবার আমার সাঁতারের প্রথম জাঙ্গিয়াটা পরে। মনের ভেতর ইচ্ছে স্নান করার। যদিও সেটা পারি নি তবু এটাও আমার জন্য যথেষ্ট ছিল। পরের দিন আবার সমুদ্রতীরে ফিরে গেলাম। আবার সারা গায়ে সানস্ক্রীন মলম লাগালাম। তারপর বালিতে পড়ে পড়ে ঘুমোলাম। যখন জেগে উঠলাম খুব ক্লান্ত লাগছিল। 

আমার পিঠ একটুও রোদে পোড়ে নি, কিছুই হয় নি। এভাবে এক সপ্তাহ কেটে গেল কিংবা হয়ত দু’সপ্তাহ। আমার মনে নেই। আকটা কথাই নিশ্চিত ছিল যে প্রতিদিন আমি আরও একটু কালো হয়ে যাচ্ছিলাম। যদিও কারো সঙ্গে কথা বলতাম না, কিন্তু প্রতিদিন একটু একটু করে আমার মন ভালো হয়ে উঠছিল। কিংবা মনটা অন্যরকম হয়ে উঠছিল। মানে একরকম ছিল না মনটা। এবং আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারতা চোখে পড়ছিল। একদিন সমুদ্রতীরে এক বৃদ্ধ দম্পতি এল। এমনটাই আমি স্পষ্ট মনে করতে পারছি। ওনাদের দেখে মনে হচ্ছিল তাঁরা বহুবছর একসঙ্গে আছেন। মহিলা স্থূলকায়া কিংবা ভরাট স্বাস্থ্য। বয়স সত্তরের আশেপাশে হবে নিশ্চিত। আর ভদ্রলোক রোগা । কিংবা রোগার চেয়েও বেশি একেবারে কঙ্কালসার চেহারা, হাঁটছিলেন। আমি নিশ্চিত এ ব্যাপারটাই আমার দৃষ্টি আকর্ষণন করেছিল। কেননা সাধারণতঃ যারা সমুদ্রতীরে আসত আমি তাঁদের দিকে চেয়েও দেখতাম না। কিন্তু এদিকে আমার নজর আটকে গেল। আর কারণ টা হল ভদ্রলোকের রোগা হওয়ার ছিরি! ওনাকে দেখে ভয় পেলাম। যেন একটা মরা মানুষ আমার দিকে এগিয়ে আসছে। ভাবলাম বটে তবে আমার কাছে এলেন না। কেবল এক বিবাহিত মানুষ, বয়স পঁচাত্তরের কাছাকাছি হবে। ভদ্রমহিলা সত্তর...উল্টোটাও হতে পারে। মহিলাকে দেখে মনে হচ্ছিল ওনার সুন্দর স্বাস্থ্য উনি উপভোগ করেন। আর ভদ্রলোককে মনে হচ্ছিল যে কোন মুহূর্তে ছবি হয়ে যাবেন। কিংবা এটাই ওনার শেষ গ্রীষ্মকাল।

ভদ্রলোকদের দিক থেকে চোখ সরাতে আমাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হল। লোকটার মাথার খুলিটা প্রায় পাতলা চামড়া দিয়ে ঢাকা ছিল। তবে পরে আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল ওনাদের দিকে ত্যারছা চোখে তাকানো।কখনো বালির ওপর শুয়ে মুখ নিচু করে, কখনো হাত দুটো দিয়ে মুখটাকে ঢেকে কিংবা হাঁটাপথের পাশের বেঞ্চিতে বসে, সেই ফাঁকে গা থেকে টুসকি দিয়ে বালি ঝাড়ার ভান করছিলাম। আমার মনে পড়ে বাথরোব না পরেই ভদ্রমহিলা একটা বড় ছাতা সঙ্গে নিয়ে আসতেন যার ছায়া পড়ত বালিতে। সঙ্গে একটা ঢাউস বই থাকত, ছাতার নিচে বৃদ্ধা ঘন্টার পর ঘন্টা বই পড়তেন। আর সেই ফাঁকে কঙ্কালবাবু মানে ওনার স্বামী ভদ্রলোক বালির ওপর নিজেকে বিছিয়ে দিতেন। পরনে অদ্ভুত সুইমিং স্যুট। লোকটাকে দেখে মনে হত ‘তাঙ্গা’ পরে আছেন ( তাঙ্গা- এক ধরনের লাতিন আমেরিকার খেলা। শঙ্কু আকৃতির একটা কাঠের লাঠির মাথায় পয়সা রাখা থাকে। বাচ্চারা কাঠের বল ছুঁড়ে সেটাকে মাথা থেকে মাটিতে ফেলে। যে ফেলতে পারবে পয়সা গুলো তার। অনেকটা আমাদের দেশের ‘চারা’ খেলার মত। একটার ওপর একটা চারা সাজিয়ে সেটাকে রবারের বল দিয়ে টিপ করে ফেলার মত) । গোগ্রাসে সূর্যের আলোও শুষে নিচ্ছেন, যেটা দেখে আমার বহু পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে যেত। সেই ড্রাগাসক্ত নেশাড়ুরা যারা এক জায়গায় জট পাকিয়ে থাকে, যারা একমাত্র যে কাজটা পারে- নেশা করা। তারপর আমার মাথাটা ধরে যেত। সমুদ্রতীর থেকে বেরিয়ে পড়তাম। কাছাকাছি দোকানে খেতাম আঞ্চোয়া মাছের চপ (সারডিন মাছের মত) আর বিয়ার। তারপর ধূমপান করতাম আর বারের জানলা দিয়ে সমুদ্রের দিকে চেয়ে থাকতাম। তারপর আবার ফিরে আসতাম। আবার বুড়োবুড়িকে লক্ষ্য করতে থাকতাম। বৃদ্ধা ছাতার নিচে আর বৃদ্ধ সূর্যের তাপে নিজেকে সেঁকছেন। আর তারপর ঠিক একজন অদূরদর্শী হঠকারীর মত আমার কাঁদতে ইচ্ছে করত। 

নিজেকে জলে চুবিয়ে দিতাম। তারপর স্নান করতে থাকতাম। তারপর যখন ঢেউ গুলো থেকে নিজেকে অনেকটা দূরে সরিয়ে সূর্যের দিকে তাকাতাম। আমার অবাক লাগত এতটা দূরে থাকত সেটা। আকারে কতটা বড় আমাদের চেয়ে। তারপর ঢেউয়ের মাথায় চেপে স্নান করতাম। ( এই করতে গিয়ে দু’বার আমি ডুবে যাচ্ছিলাম।) যখন ফিরে আসতাম ঢেউয়ের ধাক্কায় দেখতাম তোয়ালের ওপর আছড়ে পড়েছি। তারপর অনেকক্ষণ বুকটা ধকধক করত আমার। কিন্তু সবসময় আমার চোখ বুড়োবুড়ির দিকে থাকত। পরে হয়ত বালির ওপর হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোতাম। যতক্ষণে চোখ খুলত ত্ততক্ষণে সমুদ্রতীর ফাঁকা হতে শুরু করেছে। কিন্তু বৃদ্ধ দম্পতি তখনো সেখানেই। বৃদ্ধা একটি উপন্যাস হাতে ছাতার নিচে আর বৃদ্ধ, মুখটা ওপরের দিকে করে চোখ বুজে পড়ে থাকতেন। খুলিটাকে অদ্ভুত দেখাত। প্রতিটি সেকেন্ড যেন উনি অনুভব করতেন আর উপভোগ করতেন। যদিও সূর্যের তেজ তখন কমে আসত। অন্য পাশে পর্বতমালা।

কিন্তু এই দৃশ্যটা ওনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হত না। জেগে উঠেই তক্ষুনি আমি এইসব জিনিস দেখতে পেতাম। সূর্যটাকে দেখতাম। তারপর পিঠে একটা ব্যথা অনুভব করতাম। যেন সেই বিকেলে গল্পের চেয়েও পিঠটা বেশি পুড়ে যেত। ওনাদের দেখতাম। তারপর উঠে পড়তাম। তোয়ালেটা গায়ে জড়িয়ে নিতাম। সমুদ্রতীরে রাখা বেঞ্চিগুলোর একটাতে বসতাম। বসে বসে বালি ঝাড়ার ভান করতাম যেগুলো মোটেই গায়ে লেগে থাকত না। ওখান থেকে সেই উচ্চতা থেকে সেই দম্পতিকে স্পষ্ট দেখা যেত। নিজেকে কখনো বলতাম ভদ্রলোক হয়ত এখনই মারা যাবেন না, কখনো নিজেকেই বিড়বিড় করে বলতাম যতটা ভাবছি ততটা খারাপ অবস্থা হয়ত ওনার নয়। সময় প্রতিফলিত হত আর সেই ফাঁকে দূরের সূর্যটা বহুতল বাড়িগুলোর মাথায় দীর্ঘ ছায়া ফেলত। তারপর বাড়ি চলে যেতাম। স্নান করে ফেলতাম। আমার লাল পিঠ টাকে দেখতাম। এমন করে লাল হয়ে থাকত সেটা যেন সেটা কখনই আমার পিঠ ছিল না। এমন পিঠ যেটাকে চিনতে আমার অনেক বছর লেগে যাবে। তারপর টেলিভিশন খুলতাম। এমন সব অনুষ্ঠান দেখতাম যার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারতাম না। ততক্ষনই দেখতাম যতক্ষণ না সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়ি।

পরের দিন আবার একই কাজ করতে ফিরে যেতাম। সমুদ্রতীর, ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাগার, আবার সমুদ্রতীর, আবার সেই বৃদ্ধ দম্পতি... একটা রুটিন যেটা মাঝে মাঝে ভেঙে যেত সমুদ্রতীরে অন্যদের আবির্ভাবে। যেমন একটি মেয়ে – সবসময় দাঁড়িয়ে থাকত কখনোই বালিতে শুত না। পোশাকও পরত নিম্নাঙ্গে একটা বিকিনি আর ওপরে নীল শার্ট। যদি বা কখনো সমুদ্রে নামত সেটাও হাঁটু পর্যন্ত জলে ভেজাত। বৃদ্ধা মহিলার মত এই মেয়েটাও বই পড়ত। তবে এর বেলায় মেয়েটা “পায়ে দাঁড়ানো বই পড়ুয়া মহিলা” হত। কখনো কখনো হাঁটু গেঁড়ে বসত, তবে সেটাও বিচিত্র ভঙ্গীতে। সঙ্গে একটা পরিষ্কার দেড় লিটারের পেপসির বোতল নিয়ে সেটা পান করতে করতে। তারপর বোতলটা তোয়ালের ওপর ফেলে যেত। তোয়ালেটা যে কেন আনত মেয়েটা জানি না। কখনই ও সেটার ওপর শুত না, জলেও ভেজাত না। মাঝে মাঝে মেয়েটিকে দেখলে আমার ভীষণ ভয় করত। খুব অদ্ভুত লাগত মেয়েটাকে। তবে বেশির ভাগ সময়ই ওকে দেখলে আমার কষ্ট হত। আরও অন্য সব অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিষ দেখতাম।

সমুদ্রতীরে এসব ব্যাপার ঘটেই থাকে। কেননা এটা এমন একটা জায়গা যেখানে সবাই আধা উলঙ্গই থাকে। কিন্তু তাদের কারো কোন গুরুত্ব থাকে না। একবার মনে হয় আমার মতই নেশা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে এমন একজন কে দেখেছিলাম। ঢেউয়ের দিকে যখন হেঁটে যাচ্ছিলাম ছেলেটাকে দেখলাম। ছেলেটা একটা বালির ঢিপির ওপর বসে ছিল সঙ্গে একটা হাঁটুর বয়সী বাচ্চা ছেলে। আরেকবার কজন রুশ কিশোরী দেখেছিলাম। তিনটে মেয়ে... সম্ভবতঃ বেশ্যা। তারা ফোনে কথা বলছিল, হাসছিল। কিন্তু সত্যি বলতে কি আমার কাছে বৃদ্ধ দম্পতি অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিল। এক অর্থে বিশেষতঃ এই জন্য যে বৃদ্ধ লোকটিকে যে কোন ভঙ্গীতেই মরমর দেখাত। আর যখনই একথা চিন্তা করতাম কিংবা যখন দেখতাম ঐ চিন্তাটাই আমার মাথার মধ্যে আসছে তার অনিবার্য ফল হল মাথায় উদ্ভট খেয়াল চাপত। যেমন ধরুন বৃদ্ধ লোকটি মারা গেলেন আর সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাস উঠল। একটা দানবীয় ঢেউয়ে শহরটা ভেসে গেল কিংবা শহরটা কাঁপতে কাঁপতে একটা ভয়ংকর ভূমিকম্প জনপদটাকেই অদৃশ্য করে দিল পুরোপুরি ধুলোর ঢেউয়ের মাধ্যমে। আর তখন ভাবতাম যা বলার কথা ছিল সব বলা হয়ে গেছে- এই ভাবনা আসা মাত্র দুহাতে মুখ ঢাকতাম আর কাঁদতে শুরু করতাম।

আর কাঁদতে কাঁদতে স্বপ্ন দেখতাম ( কিংবা কল্পনা করতাম) । সেটা ছিল রাত। আমরা রাত তিনটে পর্যন্ত কথা বলছি। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ছি। সমুদ্রতীরে বৃদ্ধ লোকটিকে দেখছি তোয়ালে পেতে টানটান শুয়ে আছেন। আর আকাশে, অন্য তারাদের পাশেই, কিন্তু অন্য তারাদের থেকে পৃথিবীর অনেকটা কাছে; একটা কালো সূর্য চকচক করছে। একটা বিশাল কালো সূর্য , নিঃশব্দ। আর আমি তীর থেকে নেমে যাচ্ছি। আমিও বালিতে শুয়ে পড়েছি। গোটা তীরে কেবল দুটো মানুষ আমি আর সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক। যখন চোখ খুলতাম আবার চোখে পড়ত রুশ বেশ্যা মেয়েগুলো আর সেই সবসময় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে। আর সেই প্রাক্তন নেশাড়ু বাচ্চাটাকে এক হাতে ধরে আমার দিকে চেয়ে আছে কৌতূহলী চোখে। বাচ্চাটা হয়ত জিজ্ঞেসও করছে যে এই লোকটা কে হবে ! এমন একটা লোক যার পিঠটা একদম ঝলসে লাল হয়ে গেছে। এমনকী বৃদ্ধা মহিলাটিও তাঁর টুপির ঠান্ডা তলাটা থেকে মুখ বাড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে আছেন। তাঁর অন্তহীন বই পড়াটা থামিয়ে হয়ত ফিসফিস করে বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করতেন চুপিচুপি কাঁদছে এই যুবক কে? একটা পঁয়ত্রিশ বছরের যুবক যার কেউ নেই। কিন্তু এটাই বাস্তব ছিল যে ছেলেটার ইচ্ছেটা আবার ফিরে আসছিল। জীবনের মূল্যটাও। আরও এক ঋতু বাঁচতে চলেছে সে।