অনুবাদ : অমিতাভ চক্রবর্ত্তী
এক আত্মীয়র বাড়ি বেড়িয়ে ফিরছিলাম আমরা। ব্যাডাগ্রী রোড থেকে যে ধূলো-বালি ভরা রাস্তাটা আমাদের বাড়ির দিকে চলে গিয়েছে, আমাদের পুরানো সাদা পূজো গাড়িটা সেই রাস্তায় ঢোকা মাত্র ভট-ভট ভট-ভট আওয়াজ করে তারপর একেবারে চুপ করে গেল।
আমরা হুড়মুড় করে নেমে পড়লাম। গাড়ির দরজা গরম হয়ে আছে, পাশের দিকের জানালার কাঁচ থেকে আলো ঝলসাচ্ছে।
গাড়ির তলার দিক থেকে পোড়া তেলের গন্ধ আসছে।
রাস্তাটা আমাদের জুতোর তলা পর্যন্ত পুড়িয়ে দিচ্ছে। মাথার উপর সূর্য একেবারে গনগন করে জ্বলছে। গরম বাতাসের স্তরে কিয়স্ক আর রাস্তার ধারের দোকানগুলো কাঁপা কাঁপা দেখাচ্ছে। জলের ট্যাঙ্কের পাশে একটা কালো রংয়ের কুকুর শুয়ে আছে। রাস্তার দুপাশে মেয়েরা সার দিয়ে বসে বীনের ঝোল আর কলাভাজা বিক্রী করছে। রেকর্ড বেচার দোকানগুলো থেকে হাইলাইফ মিউজিকের বজ্রনিনাদ উপচে পড়ে চারপাশের উত্তাপ আরো বাড়িয়ে তুলছে।
বাবা গাড়ির হুড তুলে ভিতরে উঁকি দিয়ে ইঞ্জিনের অবস্থাটা দেখলো। আমরা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছি, চেষ্টা করছি, যতটা পারা যায় সেই সব লোকগুলোর দৃষ্টির আড়ালে থাকতে - যে বুড়োরা বীয়ারের দোকানগুলোর ছাউনির নীচে বসে আমাদের দিকে নজর রাখছে, যে সব যুবকেরা ফালতু ঘুরে বেড়াচ্ছে, কাজ করতে করতে যেই সব মেয়েরা হাতের কাজ থামিয়ে ফেলেছে। এমনভাবে তাদের চোখগুলো তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে যেন তুমি একটা আহাম্মক। ঘেটোর একেবারে মধ্যিখানে এইভাবে একটা ভাঙ্গা গাড়িকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকতে নিজেদের অত্যন্ত বোকা বোকা লাগছিল।
আমি এগিয়ে গিয়ে দেখতে চাইলাম যে বাবা করছেটা কি। সে একটুক্ষণের জন্য আমার দিকে মুখ তুলে তাকালো, তার চশমার কাঁচে রোদের আলো ঠিকরে যাচ্ছিল। কপাল দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘাম গড়িয়ে নামছে। বাবা কোটটা খুলে ফেলেছে আর তার শার্টের বগলের জায়গা গোল হয়ে ভিজে উঠেছে।
বাবা তেল পরীক্ষা করল, প্লাগগুলো খুটখাট করল, এবং ইগনিশন করানোর চেষ্টা করল। গাড়ি চালু হল না।
‘গাড়িটা ঠেলতে হবে আমাদের,’ জানালো সে।
গাড়ির গা থেকে বের হওয়া তাপ আমাদের মাথা খারাপ করে দিচ্ছিল। বাবাকে বাদ দিয়ে আমরা মাত্র তিনজন। আমরা তিনজনই ছোট আর আমদের মনে হচ্ছিল আমরা যেন হেরে গেছি। একটা কুকুর দৌড়ে আমাদের পার হয়ে যেতে যেতে আমাদের দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করে চেঁচিয়ে নিল। পুরো ঘেটো আমাদের নিয়ে মজা পাচ্ছিল।
আমরা তিনজন গাড়িটাকে ঠেলা লাগালাম কিন্তু গাড়িটা নড়ল না। আরো একবার চেষ্টা করলাম আমরা কিন্তু সেটা এবারেও নড়লনা। রাস্তায় এখানে ওখানে কিছু কাঁচের টুকরোয় রোদ পড়ে মনে হচ্ছিল যেন সেগুলোতে আগুন ধরে গেছে।
লোকেরা আমাদের পার হয়ে যেতে যেতে একবার করে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে নিচ্ছিল। খাকি ট্রাউজার আর নোংরা সাদা শার্ট পরা লোকেরা, শোকোটো আর নানা রংচঙা শার্ট পরা লোকেরা, খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া শর্টস পরা লোকেরা, একের পর এক আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল, কেঊ একটিবারের জন্য আমাদের সাহায্য করতে থামলনা। একটি পরিবার, শুধু মহিলাদের, এক মা আর তার গোটা কয়েক মেয়ে, গাড়িটা নিয়ে কথা বলতে থেমেছিল কিছুক্ষণ। ওদের যখন দেখছি, আমরা তখন ঘামে ভিজে চুপচুপ করছি। ওরা কেউ ঘামছিল না। তাদের মুখগুলো ছিল সূর্যের আলোয় ভাসা মসৃণ জবাফুলের পাপড়ির মত।
ওরা চলে যাওয়ার পর বাবা বলল, ‘ছেলেরা, গাড়িটা ঠেলতে হবে তোমাদের, না হ’লে আমরা কোনদিন বাড়ি পৌঁছতে পারব না।’
বাড়ি খুব দূরে ছিল না। দু’শো গজেরও কম। কিন্তু, বাবা গাড়িটা ফেলে রেখে যেতে পারছিলনা কারণ সেটা করলে ফিরে আসতে আসতে গাড়ির আর কিছু পড়ে থাকবে না। ধারে কাছে গাড়ি সারাই করার কোন মিস্ত্রীও ছিল না। হয় গাড়িটা আমাদের ঠেলে ঠেলে নিয়ে যেতে হবে আর তা না হলে ওটা খোয়াতে হবে।
আমার আবার ঠেলা মারলাম, কিন্তু গাড়ি এক ইঞ্চিও নড়ল না।
‘আশপাশের লোকজনকে ডাকো তোমাদের সাহায্য করতে,’ বলল বাবা।
পথ-চলতি লোকজনদের জিজ্ঞেস করলাম আমরা - বয়স্কদের, অল্প বয়সী ছেলেদের, পানীয়ের দোকানের ছায়ায় গুলতানি করা লোকেদের, কিন্তু কেউ আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এল না।
আমাদের তিনজনের মধ্যে মেজ যে, তার নাম উরি। সে বলল, ‘লোকেদের কোন দায় নেই।’
উরির যন্ত্রবিদ্যায় খুব উৎসাহ। পথ-চলতি লোকেদের দিকে ও বেজার মুখে তাকিয়ে রইল।
‘আমাদেরও ওদের নিয়ে কোন দায় নেই। আয়, ঠেলি আবার,’ আমাদের মধ্যে সবার ছোট যে, তার নাম ‘এসসে,’ সেই এসসে মুখ খুলল এবার।
সে একেবারেই হার মানতে রাজি নয় এবং নিজে একাই ঠেলে যেতে থাকল। গাড়ির কোন হেলদোল নেই। হাল ছেড়ে দিল ও। আমরা দেখছিলাম, ঘেটো চুপচাপ আমাদের নজর করে যাচ্ছিল। মরচে ধরা, ফেলে দেওয়া একটা গাড়ির মাথায় চড়ে একটা সাদা বিড়ালও আমাদের দেখে যাচ্ছিল। নরন পানীয় বিক্রী করছিল যে মহিলা সেও রাস্তার ধার থেকে আমাদের দেখে যাচ্ছিল। সে আমার দিকে তাকিয়ে ঈশারায় তার ফ্যান্টা কেনার জন্য ডাকল। আমি মাথা নাড়লাম। বাবা ড্রাইভারের সীটে বসে সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া টানতে লাগল। আমরা ধারের জানলা দিয়ে সেই ধোঁয়ার পালকের মত ভেসে ভেসে বের হয়ে যাওয়া দেখতে থাকলাম।
‘কেঊ আমাদের সাহায্য করতে আসবেনা,’ বলল উরি, ‘আসতে পারত যদিও।’
‘ওই মেয়েগুলোকে জিজ্ঞেস করলে হয় না?’ বলল এসসে।
‘তুইই বল, আর তারপর দেখ ওরা কি বলে,’ উরির গলায় বিদ্রূপের ঝাঁঝ।
‘আমরা কি তবে এখানে স্রেফ দাঁড়িয়ে থাকব?’
‘আর কি করতে বলিস তুই?’
‘গরম লাগছে খুব।’
‘গাড়িতে গিয়ে বসে থাক।’
‘আমার পা দুটো পুড়ে যাচ্ছে।’
‘নাকি কান্না বন্ধ কর।’
‘আমি নাকি কান্না করছি না।’
‘থামবি তোরা দু’জন,’ বললাম আমি ‘আমার তেষ্টা পাচ্ছে।’
‘ওহো, ওনার তেষ্টা পাচ্ছে।’
মেয়েদের একটা দল আমাদের দিকে এগিয়ে এল। বেশ সুন্দর দেখতে তারা আর কোন অনুষ্ঠানে যাওয়ার মত সাজগোজ করা। ওরা গাড়ির কাছে এসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল সেটাকে। উরি ভান করছিল যেন ও গাড়ির পিছনটার দিকে তাকিয়ে আছে। এসসে মেয়েগুলোর দিকে তাকিয় তাদের জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমরা কি আমাদের গাড়িটা ঠেলতে হাত লাগাবে?’
মেয়েরা থামল এবং গাড়ির চারদিক দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে দেখল বাবা সিগারেটটা প্রায় শেষ করে এনেছে। ওরা নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলি করল। তারপর তাদের উঁচুহিলের জুতোগুলো খুলে রেখে ছয়জনের সবাই মিলে হাসতে হাসতে গাড়িটাকে হাল্কা করে ঠেলা দিল। আমরাও তাদের সাথে গাড়ি-ঠেলায় যোগ দিলাম কিন্তু তাদের হাসির চোটে আমাদের উৎসাহে ভাঁটা পড়ে গেল। গাড়ি এক চুলও নড়লনা এবং তারা হাত নামিয়ে নিল। পায়ের তলা থেকে ধূলো ঝেড়ে, হাসতে হাসতে আর আমরা কি সুন্দর দেখতে এইসব বলে আমাদের ঠাট্টা করতে করতে তারা তাদের জুতোগুলো পরে নিল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে, ধূলো-ওড়া রাস্তায় দূরে প্রবল তাপে তৈরী হওয়া মরীচিকার মায়ায় ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
তারা চলে যাওয়ার পর বাবা জিজ্ঞাসা করল ‘এই মেয়েগুলো কারা এসেছিল?’
‘ভালো মেয়ে সব,’ এসসে বলল, ‘আমাদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছিল।’
‘ওরা আমাদের নিয়ে মজা ওড়াচ্ছিল,’ বলল উরি।
বালি কাঁকড় ভরা এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় আমাদের ছায়াগুলো বেশ তীব্র আর গাঢ় হয়ে পড়েছিল। বাবা গাড়ি থেকে নেমে এসে কারবুরেটর নিয়ে আরো কিছুটা নাড়াচাড়া করল। হাতগুলো নোংরা হয়ে যাওয়ায় গাড়ির পিছনে সে যে ন্যাকড়াটা রেখে দিত সেইটা দিয়ে ভালো করে মুছে নিল। ঘেটো আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকা বন্ধ করেনি। ধূলো-বালি মাখা হতদরিদ্র কতগুলো বাচ্চা একটা দোকানের কার্নিশের নীচে জমা হয়েছিল, তারাও দেখছিল। ঐ একই দোকানে এক বুড়ো সিগারেট টানছিল আর একটা বোতল থেকে বীয়ার খাচ্ছিল। জল উপচানো চোখে সে আমাদের মেপে যাচ্ছিল। কয়লা বেচা লোকটা ওর বৌকে নিয়ে একটা ভাঙ্গাচোরা ছাতার নীচে বসেছিল। তারাও থেকে থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল।
এমনকি কুণ্ডলি পাকিয়ে পড়ে থাকা একটা কুকুরও আমাদের উপর নজরে রাখছিল।
‘আমরা কি করব, বাবা?’ জিজ্ঞাসা করল উরি।
‘কি আর করব? ঠেলব গাড়িটাকে।’
‘কিন্তু আমরা ত মাত্র তিনজন,’ বলল এসসে।
‘আমি তোমাদের সাহায্য করব,’ বাবা বলল। ‘আমি এই ড্রাইভারের দরজা ধরে ঠেলব। ইঞ্জিনটা চালু হওয়া মাত্র আমি লাফিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ব।’
বাবা ড্রাইভারের দরজা মেলে ধরে সেটাতে ভর দিয়ে গাড়িটাকে ঠেলতে থাকল। আমরা সবাই মিলে একজোট হয়ে গাড়িটার পিছন থেকে ওটাকে ঠেলতে থাকলাম। এই প্রথম গাড়িটা নড়ে উঠল। অল্প কয়েক ইঞ্চি এগোল, আমরা আরো জোরে ঠেলতে লাগলাম এবং গাড়িটা রাস্তা ধরে খানিকটা এগিয়ে গেল। যখন গাড়িতে একটু গতি এসে গেল, বাবা লাফিয়ে গাড়ির সীটে গিয়ে বসে পড়ল এবং থ্রট্ল্ আর গীয়ারে চাপ দিল। ইঞ্জিনটা গোঁ গোঁ করল, ক্র্যাঙ্ক করল, গজরাল কয়েকবার তারপর বসে গেল।
‘সাবাশ,’ বলল বাবা।
সে তার জামার হাতাদুটো গুটিয়ে নিল, আমরা আবার গাড়িটাকে ঠেলতে থাকলাম, বাবা ড্রাইভারের দরজা মেলে আর আমরা পিছন থেকে। আমরা গাড়িটাকে গড়াতে গড়াতে কয়লা বেচা লোকগুলোকে ছাড়িয়ে গেলাম, বাবা লাফ দিয়ে ড্রাইভারের সীটে চড়ে বসল, এক্সস্ট থেকে ভক ভক করে ধোঁয়া বের হল, ইঞ্জিন আরো জোরে ঘুরতে শুরু করল আর তারপর কাঁপতে কাঁপতে থেমে গেল।
‘হয়ে এসেছে প্রায়, চালিয়ে যাও বাচ্চারা!’ বাবা বলল।
আমাদের দম ফুরিয়ে গিয়েছিল। গাড়ির ধাতব গা আমাদের ছ্যাঁকা দিচ্ছিল। এক্সস্ট থেকে বের হওয়া ধোঁয়া আমদের শ্বাস-প্রশ্বাসে মিশে যাচ্ছিল। আবর্জনাময় রাস্তার দু’ধার থেকে আরো বেশি করে লোক এখন আমাদের দেখছিল। একটা মোটর সাইকেল গর্জন করে পাশ দিয়ে ছুটে গেল। তার পিছনের সীটে ছোট স্কার্ট পড়া একটি হাল্কা পাতলা চেহারার মেয়ে বসেছিল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসল।
‘আর পারছিনা, বাবা,’ বলল উরি। ‘একটা ফ্যান্টা পাওয়া যাবে?’
‘তোমরা সবাই ফ্যান্টা পাবে, আমরা বাড়ি পৌঁছানোর পর। কিন্তু প্রথমে আমাদের গাড়িটাকে চালু করতে হবে।’
আমরা গাড়ি ঘিরে দাঁড়িয়ে আছি। উরি দুই হাত বুকের কাছে আড়াআড়ি ভাবে ভাঁজ করে রয়েছে। এই সময় এসসে যে ছেলেগুলো আমাদের দেখে যাচ্ছিলো, তাদের দিকে তাকালো।
‘ওরা আমাদের দিকে এইভাবে তাকিয়ে আছে কেন? এই, তোমার আমাদের দিকে তাকিয়ে আছ কেন?’ চিৎকার করে বলল সে।
গোটা রাস্তা জুড়ে যারা এতক্ষণ আমাদের দিকে নজর দেয়নি তারাও এবার আমাদের দিকে ঘুরে তাকালো। আরো বেশি বেশি লোক এখন আমাদের দেখছে। এসসে এতে হতাশ হয়ে গাড়ির পিছনের সীটে গিয়ে বসে পড়ল।
‘এখন কি করবে, বাবা?’ জিজ্ঞাসা করল সে।
‘আমরা এটাকে চালু করে ছাড়ব।’
‘কি করে? কেউ ত আমাদের কোন সাহায্য করবে না। ওরা শুধু তাকিয়ে থাকবে।’
‘লোকেরা সবসময়ই তাকিয়ে থাকে। যখন তুমি সমস্যায় পড়েছ, তারা তাকিয়ে থাকে। তারা তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসে। এই নিয়ে তোমার মাথা খারাপ হতে দিওনা। তুমি কি করছ, সেইটা হল আসল কথা, তারা তাকিয়ে আছে কি না সেইটা নয়।’
‘কিন্তু তারা কেউ কোন সাহায্য করেনা কেন?’
‘তোমার যখন তাদের দরকার তখন কেঊ তোমায় সাহায্য করবে না।’
‘তা হলে কখন সাহায্য করবে তারা?’
‘যখন তোমার আর তাদেরকে দরকার নেই।’
‘কিন্তু সেটা ত খুব খারাপ ব্যাপার, তাই না?’
‘দুনিয়া এই রকমই, এসসে। যখন তাদের কাউকে তোমার কোন দরকার নেই, তারা তোমায় সাহায্য করার জন্য দলে দলে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর যখন তোমার তাদের পাওয়া দরকার, দেখবে কেউ কোথাও নেই।’
‘দুনিয়া এমন কেন বাবা?’
‘আমি জানি না।’
‘তা হলে কি করব আমরা?’
‘তোমায় শিখতে হবে তোমার নিজের কাজ তুমি নিজেই কিভাবে করতে পারো। অন্যদের উপর নির্ভর কোরোনা, তা না হলে তারা তোমায় ডুবিয়ে ছাড়বে।’
‘এখন তা হলে কি করব আমরা?’
‘ঠেলা লাগাব।’
‘শুধু আমরা?’
‘ঠিক তাই। আমরা এমনভাবে এই কাজটা করব যেন এই দুনিয়ায় আমরা ছাড়া আর কেউ নেই।’
‘তাই হবে, বাবা।’
এসসে পিছনের সীট থেকে নেমে এল। আমরা দুজনেই ঠেলতে শুরু করলাম। ঠেলতে ঠেলতে এসসে গোঙ্গাতে থাকল, চিৎকার করে চলল। আমরা দুজনেই গাড়িটাকে ঠেলে প্রায় তুলে ফেলা্র চেষ্টা করতে থাকলাম। একসময় ঘুরে দাঁড়িয়ে গাড়িটার গায়ে আমাদের পিছন ঠেকিয়ে পা দুটোকে মাটিতে গেঁথে দিয়ে ঠেলতে থাকলাম। গাড়ির ধাতিব অংশের ছোঁয়ায় আমাদের পিঠ যেন পুড়ে যাচ্ছিল। আমাদের সমস্ত রাগ আমরা গাড়িটাকে উপড়ে ফেলার জন্য ঢেলে দিচ্ছিলাম। তারপর একটু একটু করে আমাদের পায়ের তলায় মাটিটা সরতে শুরু করল। আমরা এখন আবার হাত দিয়ে ঠেলছি। উরি এসে আমাদের সাথে যোগ দিল। সেও আমাদের সাথে গাড়িটাকে মাটি থেকে তুলে ফেলার মত করে ঠেলতে শুরু করল। বাবা ড্রাইভারের সীট থেকে নেমে এসে গাড়ির খোলা দরজা ধরে ঠেলতে থাকল। আর আমরা দেখলাম গাড়িটাকে একটু একটু করে এগিয়ে নিতে পারছি। আমরা চালিয়ে গেলাম, ঠেলতে থাকলাম, ঠেলতে ঠেলতে দৌড়ানোর মত অবস্থা হল। বাবা উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিল। আমরা কোকা-কোলা বিক্রির কিয়স্ক ছাড়িয়ে গেলাম, টায়ার-বেচার দোকান, চুল কাটার দোকান, সেই হোটেলটা যেখানে ছায়ায় বসে শরীর বেচা মেয়েরা পাখার হাওয়া খাচ্ছিল, সব ছাড়িয়ে গেলাম।
গাড়ি এখন গড়গড়িয়ে এগিয়ে চলছিল, আর আমরাও ঠেলতে ঠেলতে দৌড়চ্ছিলাম। বাবা গাড়িতে উঠতে সময় নিচ্ছিল। সে আমাদের আরো, আরো তাড়াতাড়ি চলতে বলছিল। আমাদের আর কোন ক্লান্তি লাগছিল না। গাড়ি এখন এগিয়ে চলেছে। আমরা কোন কিছু খেয়াল করে ওঠার আগেই দেখি, আমাদের বেশ ঘেঁষাঘেঁষি করে দৌড়তে হচ্ছে, কারণ হঠাৎ করে আরো অনেকগুলো হাত আমাদের সাথে এসে যোগ দিয়েছে। আমরা এখন বিশাল গতি পেয়ে গিয়েছি। ইঞ্জিনটা একবার গর্জন করল তারপর ধরফড় করে একটা ঝটকা মেরে বেঁচে উঠল। এক্সস্টটা কাশল একবার, তারপর এক লাফে গাড়িটা আমাদের ছেড়ে অনেকটা এগিয়ে গেল আর আমরা মুখে হাওয়ার ঝাপটা নিয়ে রাস্তা ধরে তার দিকে ছুটে চল্লাম।
আমরা যখন গাড়িটা ধরার জন্য দৌড়াচ্ছি, দেখি, আমদের সাথে সাথে একটা ভিড়ও দৌড়োচ্ছে, সেখানে লোকেরা রয়েছে, ছেলেরা, এমনকি বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা। তারা সবাই হাসছিল। তাদের ধন্যবাদ জানানোর আগেই দেখলাম তারা রাস্তার দুপাশে মিলিয়ে গেছে, ফিরে গেছে তাদের কিয়স্কগুলোয়, বেচা-কেনায়, অলস গুলতানিতে। শুধু ময়লা ছেঁড়া হাফ প্যান্ট পরা একটা ছোট ছেলে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে হাত নেড়ে যাচ্ছে।
বাবা আস্তে করে গিয়ারটা ছাড়ল তারপর আমাদের তুলে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরে এল।
লেখক পরিচিতিঃ
বেন ওকরি। স্যার বেন ওকরি। কবি এবং ঔপন্যাসিক। জন্ম নাইজেরিয়ায়, নাগরিকত্বে ব্রিটিশ।
বলা হয়, উত্তর-আধুনিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যে আফ্রিকার সবচেয়ে সফল সাহিত্যিকদের একজন তিনি। সালমান রাশদি আর গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ-এর সাথে তুলনা করা হয় তাঁর। ১৯৯১-এ ‘দি ফেমিশড রোড’ উপন্যাসের জন্য বুকার পুরস্কার পান। অসংখ্য পুরস্কার আর সম্মানের অধিকারি বেন ওকরিকে ২০২৩-এ বৃটিশ সরকার সাহিত্য-সেবার জন্য স্যার উপাধিতে ভূষিত করে।
ওকরির ছোট গল্পে বাস্তবের উপস্থিতি উপন্যাসের তুলনায় বেশি। বর্তমান গল্পটিতে একটি ঘেটো এলাকায় গল্পের কথক একটি ছোট বাচ্চা যখন তার থেকেও ছোট আরো দুই ভাইয়ের সাথে তার বাবার গাড়িতে চেপে ফিরছিল, বড় রাস্তা ছেড়ে পাড়ার রাস্তায় ঢুকে গাড়িটি খারাপ হয়ে থেমে যায়। এরপর বাচ্চারা ও তাদের বাবা গাড়িটিকে ঠেলতে ঠেলতে একসময় সেটিকে আবার চালু করে উঠতে পারে। অনুপুঙ্খ বর্ণনায় ওকরি পুরো ঘটানাটিকে চলমান ছবির কোলাজে আমাদের সামনে তুলে ধরেন। আর এই অত্যন্ত বাস্তব বর্ণনার মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে জীবনের কিছু অমোঘ সত্য উন্মোচিত হয়ে যায়।


0 মন্তব্যসমূহ