বেন ওকরি'র গল্প: প্রহেলিকা


অনুবাদ : ফারহানা আনন্দময়ী


‘আপনি কি জানেন, আমাদের দু’টো করে দেহ আছে?’ কবি জিজ্ঞেস করলেন।

‘দুইটা দেহ?’

‘হ্যাঁ। একটা দেখা যায়। আরেকটা অদৃশ্য।‘ তারা দুজনেই রেস্তরাঁয় বসে অপেক্ষা করছিলেন, একটা থিয়েটারে চ্যারিটি অনুষ্ঠানে ফটো তুলবার জন্য। কবির কথা শুনে অভিনেতা একটু ঘুরে বসলেন তার দিকে ফিরে। যেন তাকে দেখা যাচ্ছিল না এতক্ষণ, গলার আওয়াজ শুনে কবি দৃশ্যমান হলেন।

‘এটা কীভাবে সম্ভব?’

‘একবার ভাবেন তো অঙ্গহানির বিষয়টা।‘

‘অঙ্গহানির কোন্‌টা ভাববো?’

‘ছেদ হওয়া অঙ্গটাকে অনুভব করা।‘

‘এরও একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। ‘নার্ভ এন্ডিং ‘- এটার জন্যই আমরা সেটা অনুভব করি।‘

‘হারিয়ে ফেলা অঙ্গটি দৃশ্যমান অঙ্গটিকে ছাড়িয়ে যায়।‘

‘কিন্তু তার কি কোনো অনুভূতি থাকে?’

‘আমরা যদি মনে করি আমাদের দু’টো দেহ আছে, তাহলে এটাও ধরে নেয়া যায়, আমাদের মগজও আছে দু’টো।‘

‘দু’টো মগজ?’

‘দৃশ্যমান অঙ্গটি দৃশ্যমান মগজ দিয়ে অনুভব করে আর অদৃশ্য অঙ্গটি অনুভব করে অদৃশ্য মগজের মাধ্যমে।‘

সন্দেহভরা দৃষ্টিতে অভিনেতাটি এবার কবির দিকে তাকালেন।

‘তাহলে কি অদৃশ্য মগজটাকে আমরা মন বলতে পারি?’

‘এসব ধারণা আপনি কোত্থেকে পেয়েছেন?’ কাঁধটা একটু ঝাঁকিয়ে জানতে চাইলেন কবি।

পাশের টেবিলে বসে ছিলেন একজন ইংরেজি ঔপন্যাসিক। তিনি এতক্ষণ ধরে ওদের আলাপ শুনছিলেন খুব মনযোগ দিয়ে। খুব শিঘ্রি তার পরের উপন্যাসটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, যার বিষয়বস্তু হলো জীবন এবং মৃত্যু।

যে থিয়েটারটা ওদের দেখার কথা, সেটা হলো মাহ্‌লারের ইহুদিবাদ থেকে খ্রিশ্চিয়ানবাদের রূপান্তর বিষয়ে। ভিয়েনায় একজন জ্যোষ্ঠ পরিচালক হিসেবে যোগদানের জন্য তিনি রূপান্তরিত হন। এটা একটা চ্যারিটি মঞ্চায়ন। একজন আলোকচিত্রী এসে আমন্ত্রিত অতিথিদেরকে ডেকে নিয়ে গেলেন একসাথে একটা ফটো তোলার জন্য, যে ফটোটা চ্যারিটি সংগ্রহে কাজে লাগবে। তাদের এই আলাপচারিতা জারি রইলো আরো বাস্তবনিষ্ঠ হয়ে।
 
এরপরে কবি দেখলেন সেই অভিনেতা চ্যারিটি শো’এ নিজে অংশ নিচ্ছেন। থিয়েটারের পরে সেটা দেখানো হলো। পুরো পরিবেশনাটি কবি ভালোলাগা নিয়েই উপভোগ করলেন। কিন্তু সেই ঔপন্যাসিক নারীটি মিলনায়তন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন থিয়েটারের মধ্যবিরতিতে।
 
কবি যতখানি উপভোগ করেছিলেন নাটকটি, বেশিরভাগ দর্শকের কাছে অতটা ভালো লাগেনি। তিনি সহজমনেই বিষয়টা দেখেছেন। কিছু পরিশ্রমী মানুষ একটা সৃষ্টিশীল কাজ করেছে, এটাকে তিনি বরং প্রশংসাই করেছেন। নিজেকে উন্নাসিক দেখানোর প্রয়োজন মনে করেননি এ ক্ষেত্রে। এ নাটক যদি তাকে কিছুটা উদ্দীপনা দেয়, উজ্জীবিত করে, নাটকে যদি কিছু হাস্যরস থাকে, তো সবটা মিলিয়ে তিনি সন্তুষ্ট। তিনি ভেবেছেন, মঞ্চের অভিনেতাদের কাছ থেকে এত বেশি কিছু আশা করার কিছু নেই। সেটা খুবই চাপের হয়ে যায় এবং জীবনটাও নিরস হয়ে যায় তাতে।
 
নাটকশেষে ওখানে উপস্থিত এক ইহুদি দম্পতির সাথে আলাপ জমালেন কবি। কথা বলছিলেন তাদের প্রিয় নাটক আর্থার মিলারের ‘দ্য ক্রিসিবল’ নিয়ে।

‘কেন এটা পছন্দের?’ তিনি লোকটাকে জিজ্ঞেস করলেন।

লোকটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন,

‘দারুণ একটা মেটাফোর আছে। আর আপনার কোনটা পছন্দের?’

কবি জবাব দিলেন, ‘দ্য চেরি অর্চার্ড।‘

‘কেন?’

‘এটায় একটা বিভ্রান্তিকর স্বচ্ছতা আছে।‘

‘এটুকুই সব?’

‘না’

‘তাহলে আর কী?’

‘একটা দারুণ কাব্যিক বর্ণনা আর রহস্যময় রূপক আছে এ নাটকে।‘

এবার লোকটার স্ত্রী বললেন, ‘ভালো কারণ বলেছেন আপনি।‘
 
খানিক পরেই সেই অভিনেতার সাথে দেখা হয়ে গেল কবির, তারা একে অপরকে উষ্ণতার সাথে সম্ভাষণ জানালেন।

‘আমি আমার নাটকে আপনাকে অভিনেতা হিসেবে পেতে চাই।‘ বললেন কবি।

‘আপনি নাটক লেখেন?’

‘লিখি মানে, কুড়ি বছর ধরে ওটা আমার কাপবোর্ডে রেখে পরিণত করছি।‘

অভিনেতাটি উৎসাহী হয়ে বললেন, ‘আপনি কি একবার আসবেন? আমার নাটক দেখতে?’

‘আপনার নাটক?’ কবি জিজ্ঞেস করলেন।

‘হ্যাঁ,একটা নাটক আমি নির্দেশনা দিয়েছি।‘

‘আমি খুশি হবো দেখতে পেলে।‘

‘তারিখ ঠিক করে টিকেট নেবার জন্য আমি আপনাকে ফোন করবো তাহলে।‘ বেরিয়ে যাবার আগে বয়স্ক অভিনেতাটি বলে গেলেন।


*
 
এক সপ্তাহ পার হবার পরে সেই অভিনেতা ফোন করলেন কবিকে, বুধবারে নাটক দেখার টিকেট পাওয়া গেছে। অবশ্য সেটা বাতিলও হলো, কেননা সে রাতে আবার সেই অভিনেতার সাংবাদিক সম্মেলন পড়ে গেল। তিনি সেদিন একটু মানসিক চাপে থাকবেন, সেরকমটা জানালেন। এরপরের বুধবারে টিকেট নিশ্চিত করে কবিকে তিনি জানালেন। এবং নাটক দেখার পরে রাতের খাবারটাও একসাথে খাওয়ার নেমন্তন্ন দিলেন।

‘আমি কি আমার সঙ্গীকে সঙ্গে আনতে পারি?’

‘অবশ্যই।‘
 
সেদিন খোদ অভিনেতা এবং কবি দুজনেই পৌঁছুতে দেরি করে ফেললেন। কবির সঙ্গী বরং ওদের আগে ঠিক সময়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন। সেই সময়টাতে পুরো বিশ্ব একটু অস্থির অবস্থায় ছিল আফগানিস্থানের যুদ্ধ নিয়ে। টুইন টাওয়ারের ঘটনার প্রেক্ষিতে আমেরিকা তখন বোমা ফেলছিল আফগানিস্থানে। পুরো বিশ্বই কেমন যেন ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। এ টানাপোড়েন কতদিন পর্যন্ত চলবে কেউই নিশ্চিত হতে পারছিল না। পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষেরা সারাক্ষণ আতঙ্কে ছিল, কখন আবার একটা সন্ত্রাসী হামলা হয় আর তাতে তাদের জীবনযাত্রা আবার স্থবির হয়ে পড়ে! কেমন একটা অদ্ভুত সময়, একটা নতুন শতাব্দীর আগুনজন্ম যেন।
 
সেইরকম একটা টলোমলো সময়ের মধ্যেই তারা সেদিন জড়ো হলেন কোর্ট থিয়েটার বারে। অল্প পানীয় পান করে তারা গেলেন নাটক দেখতে। তিনটা স্বগতোক্তির সিরিজ দিয়ে সাজানো এ নাটক। দু’টো মাত্র চরিত্র এ নাটকে। খুব একটা সুখকর অভিজ্ঞতা না হলেও, নাটকটায় একেবারেই কিছু উপভোগ্য নেই, তাও নয়। নাটকশেষে তারা নিচে নেমে এলেন এবং ডিনার করতে গেলেন ‘কোমো লারিও’তে।
 
ডিনার দারুণ ছিল। ওদের হোস্ট সেই বয়স্ক অভিনেতা মানুষটিও খুব প্রাণোচ্ছল এবং ভালো ছিলেন। তিনি শ্রোতা হিসেবে খুব মনযোগী আর অন্যদেরকে উদ্দীপ্ত করতে পারেন সহজে। তিনি একজন স্কটিশ, সেটা বোঝা গেল। ভাগ্যও তার সহায় হয়েছিল, তিনি একটু দেরিতে হলেও খ্যাতি পেয়েছিলেন অভিনয়ে আর তার চরিত্রটা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল শক্ত হয়ে। তিনি মানসিকভাবে অবিচল থাকতে পারতেন। এইসমস্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্যের জন্য তার সঙ্গ খুব আরামদায়ক। তিনি বাস্তববাদী হলেও জীবনে হাস্যরস উপভোগ করতেন।
 
তাদের টেবিলের দুই টেবিল পরেই দুজন স্টকহোল্ডার বসে আড্ডা দিচ্ছিল। তারাও নিজেরা কৌতুক বলে জোরে জোরে হাসছিল। সেই অভিনেতা বিরক্তচোখে ওদের দিকে তাকালেন।
 
তারাও নিজেদের টেবিলে বসে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ জমালেন। তাদের শৈশব, বিভিন্ন বিখ্যাত নাটক যা কোনো সময়ে নিন্দুক বন্ধুদের নিন্দে কুড়িয়েছে। সেইসব নাটক নিয়েও তারা কথা বলছিলেন, যা তাদের খুব পছন্দ হয়েছিল কিংবা যেটা বিরক্তিকর লেগেছিল। যেসব নির্দেশকরা খ্যাতি পেয়েছিল, যেসব অভিনেতারা জনপ্রিয়তার দৌড় থেকে ছিটকে পড়েছে, তাদেরকে নিয়ে বা কোনো ভীতির জন্য নতুন নাটক লেখা হচ্ছে না, এরকম বিবিধ বিষয়ে কথা চলছিল। কিন্তু তারা রহস্যটা নিয়ে কেউই মুখ খোলেননি।
 
‘আপনার নাটকটা নিয়ে কিছু বলুন।‘

কবি একটু লজ্জিত মুখে বিস্তারিত বলতে শুরু করলেন, এবং সেই অভিনেতার জন্য বিশেষ যে চরিত্রটা রাখা হয়েছে, সেটা নিয়েও বললেন।

‘এটা কখন পড়তে পারবো আমি?’

‘আরো খানিকটা কাজ বাকি আছে। হয়তো আগামী এক কিংবা দু’মাসের মধ্যেই পারবেন।‘

‘নাটকটা পড়তে আমার খুব ভালো লাগবে, যখন নাটকটা পুরো শেষ হবে লেখা।‘
 
ডিনার শেষ হলে তারা ক্যাপাচিনো আর চা পান করেন। বিলটা চুকিয়ে দিলেন সেই বয়স্ক অভিনেতাই, সাথে কিছু বখশিস। বেরিয়ে যাবার সময়ে সেই পাশের টেবিলটার দিকে আবারো একটু চোখ রাঙিয়ে গেলেন। বাইরে তখন অক্টোবরের হিমের রাত্রি।
 
ট্যাক্সি ডাকতে ডাকতে অভিনেতা বললেন, ‘আমি আপনাদেরকে গন্তব্যে নামিয়ে দেব?’

‘না, না, অজস্র ধন্যবাদ। আমরা বরং হেঁটেই ফিরবো।‘

‘ঠিক বলছেন তো?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। আবারো ধন্যবাদ আপনাকে।‘

‘আমার কিন্তু কোনো সমস্যা হতো না।‘

‘আপনি অনেক সদয় একজন মানুষ। কিন্তু হেঁটে যেতেই আমাদের ভালো লাগবে।‘

তারা পরস্পরকে বিদায় বললেন, এবং ট্যাক্সিতে উঠে চলে গেলেন সেই অভিনেতা।

*

ওরা অভিনেতার প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিলেন কারণ তারা হেঁটেই ফিরতে চেয়েছিলেন। হাঁটতে ভালোবাসেন ওরা। কবি আর তার সঙ্গী, যিনি একজন চিত্রশিল্পী, দুজনেই সবখানে হেঁটে হেঁটে ঘুরতেন। মাঠে-পথে কথা বলতে বলতেই ওরা হাঁটতেন।
 
বৃষ্টি হচ্ছিল। হাওয়া বইছিল জোরে জোরে, ফুটপাথটাও ভেজা। গাছগুলো কেমন শান্ত ছিল আর হাওয়াটাও শীতল। ওরা আরো কিছুক্ষণ হাঁটতে চাইছিলেন, তারপর এগিয়ে গিয়ে রাতের শেষ বাসটা ধরে বাড়ি ফিরবেন, এরকমই ছিল তাদের ভাবনা।
 
রাস্তার ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিলেন নাটকটা নিয়ে। নাটকটা ওদের খুব একটা ভালো না লাগলেও, অভিনেতাকে খুব পছন্দ হয়েছিল। তাদের নিজেদের দর্শন আর মতামতের বাঁকগুলো ঘুরে আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে একটা জায়গায় এসে পৌঁছুতে চাইলেন তারা। আরেকটু এগিয়ে বাস-স্টপের কাছে এসে থামলেন। তবে সেটা তাদের নিয়মিত যাতায়াতের বাসস্টপ থেকে অনেকটাই দূরে। অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা বাড়ির নিকটবর্তী বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। বৃষ্টির জন্য রাস্তাঘাট নীরব হয়ে পড়েছিল একদম।
 
তারা যখন অপেক্ষা করছিলেন বাসের জন্য, ঠিক সে সময়ে হঠাৎ চকচকে কালো একটা গাড়ি এসে থামলো ওদের সামনে, ভূতের মতো। একেবারে ধুম করে এসে হাজির হলো গাড়িটা, একেবারেই আকস্মিক এবং খুব নিঃশব্দে। জোরে পিছলে এসে থেমে গেল। চালকের আসনে একজন সুদর্শন তরুণ বসা ছিল। তার চোখেমুখে কী একটা অশুভ ছায়া তারা দেখতে পেলেন, যেটা ব্যাখ্যার অতীত। গাড়ির সামনের আসনের জানালার কাচটা নামিয়ে দিয়ে, তরুণটি নির্বাক তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে।
 
ঠিক সেই মুহূর্তেই, বিরান সেই রাস্তায়, হঠাৎ করেই দেখা গেল নাইটক্লাবের একজন দ্বার-রক্ষককে। দরজার ফাঁকের আলোতে সে দৃশ্যমান হলো। কালো স্যুট আর সাদা শার্টে সে ছিল বিশালাকার দেহসৌষ্ঠবের একজন মানুষ। সে ঘুরে তাকালো তাদের দুজনের দিকে।

এবার সেই তরুণটি কথা বলে উঠলো।

‘স্লোওন স্ট্রিট?’

হতে পারে সে একজন ইওরোপিয়ান, জার্মান অথবা ইটালিয়ান।

‘আমি ঠিক জানি না এটা কোথায়।‘ উত্তর দিলেন কবির সঙ্গী মেয়েটি।

‘আমরা এই এলাকার বাসিন্দা নই।‘ কবি জানালেন।

‘স্লোওন স্ট্রিট?’ গাড়ির ছেলেটি জিজ্ঞেস করলো আবারো।

ওই দ্বার-রক্ষককে দেখিয়ে কবি বললেন,’ওই ছোড়াকে জিজ্ঞেস করো।‘
 
গাড়ির সেই রহস্যময় ছেলেটি দেখিয়ে দেয়া রাস্তার দিকে তাকালো না। সে সময় নিচ্ছিল। অপেক্ষা করছিল। ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে কেমন একটা প্রশ্নবোধক হাসি হাসলো। একটা অদ্ভুত ভঙ্গীতে বসে ছিল সে, অন্ধকারে তার চোখটা কেমন অবোধ্য মনে হচ্ছিল। প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি সময় ধরে সে অপেক্ষমান রইলো। যেন আরো কিছু তার চাইবার আছে, কিংবা সে ওদেরকে সেই সুযোগটা দিতে চাইছে, ওরা তার কাছে কিছু চেয়ে নিক।
 
এবার মেয়েটি উদ্যোগী হয়ে বললো, ‘আপনি অন্য কারো কাছে জিজ্ঞেস করতে পারেন।‘

এটাই যেন ঘোরটাকে ভেঙে দিল। কিছু বুঝে উঠবার আগেই সাই করে মিলিয়ে গেল গাড়িটা। যেভাবে এসেছিল, ঠিক একইভাবে মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হলো গাড়িটা। এবার ওরা অন্য চিন্তায় ফিরে এলেন।
 
গাড়িটা যেখানে ছিল, সেখানে ওরা খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। অর্থহীন অদ্ভুত কিছু ঘটনা ওদেরকে কেমন অস্থির করে তুলেছিল।

সম্বিত ফিরে পেয়ে কবি বললেন, ‘আমরা আদতে কিসের জন্য অপেক্ষা করছি?’

‘কিছুর জন্য না। চলো, হাঁটি।‘ আঁকিয়ে বললেন।

‘হ্যাঁ, চলো।‘

‘সুন্দর একটা হাওয়া বইছে।‘
 
তারা হেঁটে একটা চত্বরে এলেন, প্রায় ফাঁকা। আরো রাস্তা ছিল হেঁটে যাবার, কিন্তু তারা বাস-স্টপের জন্য দাঁড়ালেন। যদিও অনেক দেরি হয়ে গেছিল। চত্বরটায় তারা দাঁড়িয়েই রইলেন অনেকক্ষণ ধরে। ফাঁকা রাস্তা দেখছিলেন, আশেপাশের বাড়িঘরদোর দেখছিলেন, ফাঁকা ট্যাক্সিগুলোর চলে যাওয়া দেখছিলেন। কিছুর জন্য তাদের অপেক্ষা ছিল না।
 
‘চলো, নাইটসব্রিজের দিকটায় যাই।‘ বললেন কবি।

‘আচ্ছা। এই রাস্তা ধরে যাই।‘ সামনে একটা রাস্তা দেখিয়ে বললেন মেয়েটি। পরে বুঝলেন, এটাই সেই স্লোওন স্ট্রিট।

‘না, না। বরং ওই রাস্তাটা ধরে এগোই। এটা কেমন নির্জন, মরা-মরা।‘

‘হয়তো সময়টা ঠিক নয় এই পথে যাবার।‘

‘অন্য রাস্তাটা বরং অনেক জীবন্ত।‘
 
রাস্তাটা পার হলেন তারা। খুব সুন্দর আর স্বচ্ছ একটা রাত। হাওয়াটাও উষ্ণ, আরামপ্রদ। মন ভালো করার জন্য যথেষ্ট। কবি আর তার বান্ধবীর মধ্যে একটা ভালোলাগার দারুণ তরঙ্গ খেলা করছিল। মেয়েটি খুব খুশি ছিল, এই পরিবেশটা ওকে সুখি করে তুলছিল। মনে পড়ছিল কোনো একসময় ইটালিতে কোনো এক ছুটির সন্ধ্যার কথা। সুন্দর রাস্তায় এদিকওদিক ঘোরাফেরা আর মৃদু রোমান্সের সুবাস তার স্মৃতিতে ভেসে এলো।
 
বাস-স্টপে পৌঁছে ওদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে, এমন একটা বাস পেয়ে গেলেন ওরা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন তারা বাসে না-উঠে। হেঁটে ফিরতেই তাদের মন চাইছিল, তবু বাস-স্টপে দাঁড়িয়ে সময়টা কাটাচ্ছিলেন। এটা করছিলেন মূলতঃ কবি। তিনি চুপ করে দাঁড়িয়ে কিছু ভাবছিলেন, কিছু অনুভব করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কী অনুভব করছেন সেটা তিনি নিজেই টের পেলেন না। শুধু ওই চেতনাটুকু ছিল, যে, কিছু একটা ঘটছে, কিছু একটা দেখছেন তিনি। দেখলেন দূরে একটা লাল দোতলা বাস; যেখানে তারা ছিলেন। কোনো কথা বলছিলেন না তিনি। অসংখ্য ভাবনা তাকে তাড়িত করছিল।
 
দুজনেই ওরা নিশ্চুপ দাঁড়িয়েছিলেন। কবি রাতটাকে দেখছিলেন, দেখছিলেন রাতের আকাশের তারা। কিছু ভাবছিলেন না সেই মুহূর্তে।
 
‘সি-ওয়ান’ সঙ্গী মেয়েটি কথা বলে উঠলেন।

কবি মাথা নামিয়ে দেখলেন, শুনতে পেলেন মেয়েটি বলছেন,’একটা দেখো।‘ 
 
তিনি তাকিয়ে দেখলেন একটা বাস, গন্তব্যের প্যানেলে লেখা সে বিখ্যাত ‘সি-ওয়ান’। কবি বললেন, ‘আমি দুটো দেখতে পাচ্ছি।‘ 
মেয়েটি আবারো বললেন, ‘সি-ওয়ান।‘

‘আমি দু্টো বাস দেখতে পাচ্ছি।‘ খুব চালাকি করে উত্তরটা দিতে চাইলেন তিনি। কিন্তু মাথার মধ্যে ঘুরছিল একটু আগে শোনা ওই শব্দবন্ধটাই।
 
সি-ওয়ান বাসটা এসে ওদের সামনে থামলো। দরজাটা আপনা-আপনি খুলে যেতেই দেখা গেল চালক একজন আফ্রিকান। একজন যাত্রী নেমে যেতেই বাসটা আবার চলতে শুরু করলো।
 
দ্বিতীয় বাসটাও সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল, কবি এতক্ষণ যেদিকে তাকিয়েছিলেন। লাল রঙের একটা দোতলা বাস, স্লোওন স্ট্রিটের মোড়টায়। তারা দুজনেই তাকিয়ে ছিলেন ওদিকে। মিহি একটা হাওয়া বইছিল বিপরীত দিক থেকে।

হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়ে কবি শুনতে পেলেন তার বান্ধবীর গলার স্বর।

‘ওই দেখো, একটা চার্চ।‘
 
খানিকটা সতর্কভঙ্গীতে কবি ফিরে তাকিয়ে দেখলেন চার্চটিকে। একটু বেখাপ্পা, অদ্ভুত ধরণের, তবে সুন্দর। ইতালির মনোরম শহরে এমন রয়েছে। কোনো অচেনা শহরে ঘুরতে ঘুরতে কিছু একটা দেখে বিস্ময়ে থমকে যাবার মতো।

ছোট রাস্তাটার শেষ মাথায় বাস-স্টপের ঠিক উল্টোদিকে ওই চার্চটি। তার প্রসারিত চূড়াটি রাতের আকাশে এক মোহময় অবয়ব তৈরি করেছিল।
 
মেয়েটি বললেন,’এটা কেমন স্বপ্নের মতো লাগছে।‘

কবি অবশ্য অতটা মুগ্ধ না হয়ে চার্চটিকে একটু সাধারণভাবেই দেখলেন।

‘কিছু একটা নেই-নেই মনে হচ্ছে চার্চে।‘ কবি বললেন।

‘কী নেই মনে হচ্ছে?’

‘আমি ঠিক জানি না। তবে অনুভব করছি, একটা কিছু এখানে অনুপস্থিত।‘

‘কী সেটা?’

কবি চুপ করে রইলেন। এই নেই-নেই বিষয়টা তাকে অন্যমনস্ক করে তুললো। এদিক-ওদিক তাকালেন তিনি। হঠাৎ কিছু একটা দেখতে পেয়ে বললেন,

‘আমি একটা দেখেছি।‘

‘কী?’

চোখ ঘুরিয়ে কবি তাকে দেখালেন। মেয়েটিও দেখতে পেলেন সেটা। রাস্তার ঠিক মাঝখানে আলোকমালার মতো দেখা গেল স্পষ্ট। চৌকো আকারের ম্যানহোলের মতো কিছু দিয়ে বানানো। দেখার প্রেক্ষিতে এটা সুন্দর, স্বর্ণালি ক্রসের মতো। এটা দেখার পরে দৃষ্টি অবধারিত ভাবে চার্চের দিকে চলে যাচ্ছিল, আবার চার্চ থেকে চোখ ফিরছিল সেই সোনালি ক্রসের দিকে। বাস-স্টপ থেকে কেবল এই দুটো জিনিসই দৃশ্যমান হচ্ছিল।
 
মেয়েটি বললেন, ‘এটা একটা গোপন সংকেত।‘

‘মানে বলছো, যারা এটা দেখতে আগ্রহী তারাই দেখতে পায়।‘

‘অনেককিছুই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। আমরা খেয়াল করি না। তাই না?’

‘আমরা তাকাই। কিন্তু কিছুই দেখতে পাই না।‘

‘আমরা কিছু মন দিয়ে দেখি না।‘

‘কেন তোমার এমন মনে হচ্ছে?’

‘আমি জানি না। হতে পারে, রহস্যময় সেই জগত থেকে আমরা দূরে সরে এসেছি অনেকটা।‘
 
চার্চ আর সেই ক্রসচিহ্নের দিকে তাকিয়ে তাদের মনোজগতে অনেকরকম ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিল; নৈঃশব্দ্যের মধ্যে অনেকগুলো সম্ভাবনা। তারা টের পাচ্ছিলেন তাদের বাস্তব জগতের মধ্যেও অন্য একটা গোপন জগত প্রবেশ করছে। অনেক ভাবনার মধ্যেও তারা একটা ধারণায় স্থির হচ্ছিলেন, এটা অবিশ্বাস্য কিন্তু অসম্ভব নয়। সম-মানসিকতার না হলে সেই ধারণাটা ভাগ করে নেয়া সম্ভব নয়।
 
এরপর যে বাসটি অনন্তসময় ধরে লাল-বাতির সিগন্যালে দাঁড়িয়ে দেরি করছিল আসতে, সেটা বাস-স্টপে এলো। বাসটা যাত্রীশূন্য ছিল। ওদের দিকে তাকিয়ে হাসলো চালক। তারা বাসটায় চড়ে উপরের তলায় গিয়ে, সামনের দিকে বড়ো একটা জানালার পাশের আসনে গিয়ে বসলেন, এবং তাকিয়ে রইলেন সেই অদেখা প্রহেলিকাময় জগতের দিকে।

-----------

মূলগল্প: Mysteries

অনুবাদক পরিচিতি:
ফারহানা আনন্দময়ী
কবি। অনুবাদক
চট্টগ্রামে থাকেন।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ