ইতালো কালভিনোর গল্প : মহাশূন্যে একটি চিহ্ন



মূল গল্প : A Sign in Space)
ভাষান্তর: রঞ্জনা ব্যানার্জী

সূর্য আমাদের ছায়াপথের বহিঃসীমায় থাকায়, কক্ষপথটি সম্পূর্ণ ঘুরে আসতে ওর প্রায় দশকোটি বছর লেগে যায়।

ঠিক, এতটাই সময় লাগে একদিনও কম নয়, Qfwfq বলেছিলেন, একবার পরিভ্রমণকালে মহাশূন্যের কোনো এক বিন্দুতে একটা চিহ্ন এঁকেছিলাম, যাতে করে দশকোটি বছর পরে ফের সেই অবস্থান পেরোনোর সময় আমি যেন তাকে খুঁজে নিতে পারি।

কী ধরনের চিহ্ন? এটি ব্যাখ্যা করা কঠিন কেননা চিহ্ন বললেই তোমরা সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু ভেবে বস যা অন্যকিছুর চেয়ে আলাদা, কিন্তু সেই সময় কোনোকিছুই অন্যকিছু থেকে ভিন্নতর ছিল না ; চিহ্ন বললেই তোমাদের মনে যেমনটি ভাসে- একটা কিছুর প্রয়োগে বানানো কিংবা হাত দিয়েই তৈরি কোনো ছাপ যা অনুসঙ্গটি কিংবা হাতটি সরিয়ে নিলেও রয়ে যায়- কিন্তু সেই সময়ে কোনো ধরনের অনুসঙ্গ তো নয়ই এমন কি হাত, দাঁত নাক এসবের কিছুই ছিল না, সমস্ত কিছু এসেছে পরে , অ নে ক পরে। চিহ্নের আকারের বিষয়টি নিয়ে তোমরা বলতেই পার, এটা তো কোনো সমস্যা না, যে কোনো আকারকেই চিহ্ন ভেবে নেওয়া যায়, কারণ চিহ্নের কাজ হলো কেবলমাত্র চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া, ভিন্ন কিংবা অনুরূপ যেমন আকারেরই হোক কিসসু এসে যায় না: আবারও বলি তোমাদের মতো নবীনদের পক্ষে এমনতরো বলা সহজ কিন্তু সেই সময়ে আমার সামনে অনুসরণযোগ্য কোনো নমুনাই ছিল না যাতে আমি বলতে পারি যে আমি এই রকমই কিছু অথবা অন্যরকম কিছু তৈরি করতে চাই। নকল করবার মতো কোনো কিছুই ছিল না। কেউ জানতো না রেখা দেখতে কেমন, সোজা না বাঁকা, বিন্দু অথবা স্ফিতি কিংবা গহ্‌বর সম্পর্কেও কোনো ধারণা ছিল না। আমি যে একটি চিহ্নের ভাবনা ধারন করেছি, সেটিই ছিল প্রকৃত সত্য,কিংবা বলতে পারি, আমি যে একটি চিহ্ন তৈরি করবার ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম, মহাশূণ্যের বিশেষ একটি স্থানে- অন্য কোনোখানে নয় অথবা আমি চিহ্ন তৈরির উদ্দেশ্য একটা কিছু তৈরি করেছি, মোদ্দা কথা হলো সব কিছু মিলিয়ে সত্য এই যে, আমি একটি চিহ্ন তৈরি করে ফেলেছিলাম।

অন্য দিকে, এটিই ছিল মহাশূন্যে প্রথম কোনো নির্মাণ, অন্তত আমাদের ছায়াপথের কক্ষপথে প্রথম তো বটেই – সেই বিবেচনায় আমাকে স্বীকার করতেই হয় আমার চিহ্নটি বেশ ভালোই হয়েছিল। দৃশ্যমান ছিল কি? এ আবার কেমন প্রশ্ন! সেই দিনগুলোতে এইসব চাক্ষুষ করবার জন্য কি কারও চোখ ছিল? কোনো কিছুই কেউ দেখতে পেতো না, এমন কি দেখার প্রশ্নও কখনও মনেই জাগেনি। চেনা যেতো কি না সেই প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারি, হ্যাঁ তা যেতো: এ বিষয়ে ভুল করার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না, কেননা মহাশূন্যে উপস্থিত সকল কিছুই হুবহু একই ছিল, অবিভেদ্য, বিপরীতক্রমে এটিই ছিল একমাত্র চিহ্নযুক্ত কিছু।

অতঃপর গ্রহপুঞ্জেরা তাদের কক্ষ পরিক্রমণে এবং সৌরমণ্ডলও তার নিজস্ব গতিপথে চলমান রইল, আমিও এই আবর্তনের সংগতে সেই চিহ্নটি ক্রমশ পেরিয়ে গিয়েছিলাম, অগুন্তি কক্ষপথ আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। কিন্তু আমার মন সবসময় স্থানটিতে ফিরবার এবং চিহ্নটিকে ফের দেখবার

আকুতিতে আচ্ছন্ন থাকতো- কিংবা দেখতে পেলে কীভাবে চিনব তাকে, সেই অজানা অসীমে চেনা চিহ্নটি পেয়ে আমার উচ্ছ্বাসই বা কেমন হবে- পরবর্তী এক কোটি আলোকবর্ষের পরিভ্রমণে এমন চেনা কিছু দেখবো না -শতবর্ষ কিংবা হাজারবর্ষ ধরে অন্য কোনো কিছুও দেখতে পাবো না এবং আবার যখন তার কাছে পৌঁছাব সে ঠিক তেমনই থাকবে, তার নির্দিষ্ট জায়গাটিতে , ঠিক যেভাবে আমি রেখে এসেছিলাম, সরল এবং আভরণহীন, সোজা কথায় অবিকল সেই ছাপটি নিয়ে ঠিক যেমনটি আমি তাকে দিয়েছিলাম।

ছায়াপথটি তার তারার ঝালর, গ্রহপুঞ্জ, মেঘের গুঁড়ো সমেত ধীর-ঘূর্ণন অব্যাহত রেখেছিল এবং এর ধার ঘেঁষে সূর্যও চলছিল নিজস্ব নিয়মে। কেবল আমার চিহ্নটিই ছিল নিশ্চল, একদম এলেবেলে কোনো জায়গায় সকল কক্ষপথের নাগালের বাইরে (এই ব্যবস্থাটি সম্পন্ন করতে আমাকে ছায়াপথের ধার ছাড়িয়ে খানিক ঝুঁকে তাকে স্থাপন করতে হয়েছিল যেন এই ঘুর্ণায়মান ব্রহ্মাণ্ড তাকে চূর্ণ না করতে পারে) , খুব সাধারণ জায়গায় থাকলেও বিন্দুটি সাধারণ ছিল না কেননা এটিই একমাত্র বিন্দু যা নিশ্চিতভাবে সেখানে অবস্থান করছিল এবং বিন্দুগুলিকে সনাক্ত করার সূত্র হিসেবে একে কাজে লাগানো যেতে পারতো।

আমি দিনরাত এই চিহ্নটির চিন্তাতেই মগ্ন থাকতাম, অন্য কিছু নিয়ে ভাবতেই পারতাম না; সত্যি বলতে কি সেটিই ছিল আমার জন্য চিন্তা করবার মতো প্রথম কোনো বিষয়; অথবা এভাবেও বলা যায় : কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করা সম্ভবই ছিল না, কারণ প্রথমতঃ চিন্তা করবার মতো কোনো বিষয়ই ছিল না এবং দ্বিতীয়তঃ চিন্তা উস্কাতে পারে এমন চিহ্নসূত্রও ছিল না। কিন্তু যে মুহূর্তে চিহ্নটি উৎকীর্ণ হলো, তখনই চিহ্ন নিয়ে কারো চিন্তা করার সম্ভাবনাটি সম্ভব হলো, বিষয়টি এক অর্থে এমন দাঁড়াল যে চিহ্নটিই একমাত্র বস্তু, যা নিয়ে চিন্তা করা যায় এবং যে বিষয়টিকে নিয়ে চিহ্ন সংক্রান্ত চিন্তাটি করা হচ্ছে সে নিজেই সেই চিহ্ন।

অর্থাৎ ঘটনা দাঁড়াল এমন : চিহ্নটি একটি অবস্থানকে সূচিত করছিল একইভাবে সেই স্থানটিতে একটি চিহ্ন অবস্থান করছিল (এই বিষয়টিই বরং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কেননা অবস্থানের বিন্যাস অগুন্তি হলেও চিহ্ন কিন্তু একটিই) আবার চিহ্নটি যেমন আমার করা, আমার উপস্থিতির প্রমাণও সে, কেননা এটিই আমার করা একমাত্র চিহ্ন এবং আমি একমাত্র জন যে কিনা কোনো চিহ্ন সৃষ্টি করেছিল। এটি একটি নামের মতোই, সেই বিন্দুটির নাম এবং আমার নিজেরও নাম বটে যা আমি সেই স্থানটিতে স্বাক্ষর করেছিলাম; এক কথায় এই নামটিই নামাঙ্কিত করবার মতো জিনিসগুলির জন্য পাওয়া একমাত্র নাম।

ছায়াপথটির কক্ষপথ ধরে আমাদের ব্রহ্মাণ্ড নিরন্তর দূরে সরছিল কিন্তু সেই চিহ্নটি তার আদি অবস্থানেই স্থির ছিল, যেখানে আমি তাকে ফেলে এসেছিলাম, একই সময়ে চিহ্নটি আমাকেও চিহ্নিত করেছিল, তাকে আমি ধারণ করেছিলাম, সে আমার ভেতরে বসত গেড়েছিল, আমাকে পুরোপুরি দখল করে ফেলেছিল, অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক স্থাপনের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা দেখা দিলেই চিহ্নটি আমাদের মাঝে উদয় হতো। আমাদের আবার দেখা হওয়ার মাঝের সময়টিতে আমি চিহ্নটিকে উৎস ধরে অন্য চিহ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারতাম এবং নানা চিহ্নের সমন্বয়ও করতে পারতাম, অনুরূপ চিহ্ন বা বিভিন্ন চিহ্নের বৈসাদৃশ্যের সারণি তৈরি করতে পারতাম। কিন্তু ইতোমধ্যেই সেই প্রথম চিহ্ন সৃষ্টির ক্ষণটির পরে বহু সহস্র বছর পেরিয়ে গিয়েছিল ( ক্ষণ না বলে বরং কয়েক পলক বলাই শ্রেয়, কেননা আমাদের ছায়াপথের অবিরাম ঘুর্ণনের মাঝে ঐটুকু সময়েই আমি আঁকটা দিয়েছিলাম) আর যখন তার সকল খুঁটিনাটি আমি মনে বসানো জরুরি মনে করলাম (সামান্যতম বিচ্যুতি অন্য কোনো চিহ্ন যদি আঁকতাম তার সঙ্গে আগের চিহ্নটির তফাৎ ধরা মুশকিল হয়ে দাঁড়াত।) আমি আবিষ্কার করলাম যদিও আমি এর ছক, সার্বিক বাহ্যিক আকৃতিটা মনে করতে পারছিলাম,এর কিছু কিছু জিনিস আমার স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে গেছে, আমি বলতে চাইছি যখনই আমি একে খন্ডাংশে ভাবতাম তখনই মাঝের কিছু অংশ আমার মনে পড়তো না, সেটি কি এমন ছিল কিংবা অন্যরকম। চিহ্নটিকে চোখের সামনে বসিয়ে মনোযোগ দিয়ে অনুশীলন করবার প্রয়োজন অনুভব করতাম তখন, কিন্তু চিহ্নটি তখনও আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে, বহুদূরে, আমাদের মধ্যেকার দূরত্ব কতটা তখনও জানি না আমি, কেননা আমি এটি তৈরি করবার কালে সময়কেই মূখ্য করেছিলাম, ওর সঙ্গে ফের আমার দেখা হতে ঠিক কত সময় লাগবে সেটাই বিবেচ্য ছিল এবং যতক্ষণ না আমি ওকে আবার খুঁজে পাচ্ছি ততক্ষণ এই দূরত্বের বিষয়টি জানা সম্ভবপর নয়।

ব্যাপার হলো যদিও চিহ্নটি তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে আমি ভাবছিলাম না কিন্তু এটি কীভাবে তৈরি হলো তার ব্যাখ্যায় আমি নানা অনুমান এবং তত্ত্ব খাড়া করছিলাম – যার উপর ভিত্তি করেই আমি কোনো চিহ্নের টিকে থাকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম এবং সঠিক চিহ্নটির কাছাকাছি আকারটি পাওয়ার জন্যে আমি কম সম্ভাব্য আকার গুলিকে বাতিল করছিলাম। অবশ্য এইসব কাল্পনিক চিহ্নগুলি অনিবার্য কারণে অদৃশ্য হতো কারণ তুলনামূলক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় স্মারক চিহ্নটি আমার সামনে ছিল না। আমি মগজের আনাচকানাচ ঘেঁটে ( ছায়াপথটি তখন সেই শূন্যতার কোমল বিছানায় অবিরাম এপাশ ওপাশ করে যাচ্ছিল এবং পরমাণুর জ্বলন এবং বিকিরণও চলছিল সমান তালে) অবশেষে বুঝতে পারলাম আমি সেই চিহ্নটিকে গুলিয়ে ফেলেছি এবং আমার স্মৃতিতে যা ভাসছে তা হলো এর আন্তঃপরিবর্তনশীল খুচরো টুকরো, যা আসলে সেই বড় চিহ্নটির ভেতরের খুদে চিহ্নাবলী এবং এদের যে কোনো একটির সামান্যতম পরিবর্তন মূল চিহ্নটিকে আমূল পালটে দিচ্ছে, মোদ্দা কথা হলো আমি আমার চিহ্নটি দেখতে কেমন তা বেমালুম ভুলে বসে আছি এবং প্রাণান্ত চেষ্টা করেও কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না।

আমি কি হতাশাগ্রস্ত হয়েছিলাম? না, যদিও এই বিস্মৃতি বিরক্তিকর ছিল তবে অসংশোধনীয় নয়। যাই ঘটুক না কেন, আমি জানতাম চিহ্নটি নিঃশব্দ এবং নিশ্চল থেকেই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি ঠিক পৌঁছে যাব, ওকে খুঁজে পাবো, এবং তখনই আমার মনঃসংযোগের ছেঁড়া সুতোগুলো জোড়া লেগে যাবে। মোটামুটিভাবে অনুমানে হিসাব করে বুঝেছিলাম আমরা আমাদের প্রায় অর্ধেক পরিভ্রমণ সম্পূর্ণ করে ফেলেছি: আমাকে কেবল ধৈর্য ধরে রাখতে হবে, পরের অর্ধেক সাধারণত দ্রুতই শেষ হয়। এখন আমাকে কেবল এটা মনে রাখতে হবে যে, চিহ্নটি টিকে আছে এবং আমি তাকে ফের দেখতে পাব।

দিনের পেছনে দিন বয়ে যাচ্ছিল এবং একদিন মনে হলো আমি কাছাকাছি চলে এসেছি। উত্তেজনায় আমার আর তর সইছিল না, খানিক পরেই আমি চিহ্নটির মুখোমুখি হবো। এটি এখানেই তো ছিল, না আরেকটু দূরে হয়তো বা, আচ্ছা একশ পর্যন্ত গুনতে থাকি…এটা কি অদৃশ্য হয়ে গেল? আমরা কি এর মধ্যেই ওকে পেরিয়ে গিয়েছিলাম? আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমার চিহ্নটি হয়তো আছে কিন্তু কোথায় কে জানে, হয়তো আমাদের কক্ষপথের ঘুর্ণন সীমার একেবারে বাইরে, অনেক পেছনে কোথাও। আমি আমার গাণিতিক হিসাব নিরূপণে মহাকর্ষিক ক্ষেত্রের প্রভাবে গ্রহ-নক্ষত্রের আন্দোলনের বিষয়টি ধর্তব্যে আনিনি যা তাদের ডালিয়া ফুলের পাপড়ির বিন্যাসের মতোই অনিয়মিত কক্ষপথ অনুসরণের কারণ ঘটায়। এরপরে শত সহস্র বছর ধরে আমার নিজের গণনায় ভ্রান্তির খোঁজে নিজেকে নিপিড়ন করে চলেছিলাম আমি: অতঃপর বুঝতে পেরেছিলাম ,আমাদের পরিক্রমায় সেই বিশেষ স্থানটি প্রতি ছায়াবর্ষ নয় বরং তিন ছায়াবর্ষ পরপর ফেরে, অর্থাৎ প্রতি ছয়কোটি আলোকবর্ষ পরে। যখন তুমি দুই কোটি বছর প্রতিক্ষা করতে পেরে যাও তখন ছয় কোটি বছরের প্রতিক্ষা করাও অসম্ভব নয়; কাজেই আমি ফের অপেক্ষা করছিলাম; অপেক্ষার এই সময় সুদীর্ঘ ঠিক কিন্তু আমি তো আর পদব্রজে ভ্রমণ করছিলাম না, আমি চলছিলাম আলোকবর্ষ ধরে গ্রহ নক্ষত্রের উপর লাফিয়ে, যেন এক অশ্মারোহী যার অশ্বখুড়ের আঘাতে বিজলি চমকায়;আমি তখন উত্তেজনার তুঙ্গে; মনে হচ্ছিল সেই চিহ্নটি, সেই স্থান, নাম – আমার একমাত্র লক্ষ্য সেই লক্ষ্য অর্জনের যাত্রাপথেই এগোচ্ছি আমি…।

আমি দ্বিতীয় কক্ষপথ এবং তৃতীয়টিও সম্পূর্ণ করলাম। আমি পৌঁছে গিয়েছিলাম। প্রচণ্ড চিৎকার বেরিয়ে এসেছিল আমার ভেতর থেকে। সেই বিন্দুতে যেখানে আমার চিহ্নটি ছিল, সেখানে একটি আকারবিহীন আঁচড় , একটি অভিঘাত, মহাশূন্যের ঘর্ষণের ছেঁড়াখোড়া ছাপ। আমি নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলাম: সেই চিহ্ন, সেই বিন্দু, সেই জিনিস যা আমার অস্তিত্বের প্রমাণ- আমিই সেই বিশেষ বিন্দুতে চিহ্নটি সৃষ্টি করেছিলাম- সেই চিহ্নটিই তো আমি। চিহ্নবিহীন মহাশূন্য, আবার সেই নিঃসীম গহ্‌বর, যার শুরু কিংবা শেষ নেই কোনো, সেই বিবমিষাময় শূন্য গহবরে সবকিছু এমন কি আমিও হারিয়ে গিয়েছিলাম। ( এখন আমাকে এই জ্ঞান দিতে এসো না যে, বিন্দুটা মেরামত করলেই তো ল্যাঠা চুকে যেত, কিন্তু আমার চিহ্ন ছিল সেটি, একে মুছে দেওয়ার অর্থ আমাকে মুছে দেওয়ার সমানই; নিশ্চিহ্ন করা মানে চিহ্নটিকে অস্বীকার করা, অতএব একটি বিন্দুকে পরবর্তী বিন্দু এবং ক্রমশ অন্যান্য বিন্দু থেকে পার্থক্য করার প্রয়াসটি বিফল হলো।)

আমার মন ভেঙে গিয়েছিল এবং বহু আলোকবর্ষ আমি নিজেকে অথর্বের মতো কেবল টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম। যখন আমি শেষমেশ চোখ মেললাম (এরই মধ্যে আমাদের পৃথিবীটিও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছিল, এবং তারই ফলশ্রুতিতে প্রাণের উন্মেষ ঘটতে শুরু করেছিল), এমন কিছু দেখতে পেলাম যা আমি কখনোই দেখব বলে আশা করিনি। আমি আমার চিহ্নটিকে দেখতে পেয়েছিলাম, কিন্তু সেটি নয় অনুরূপ আরেকটি চিহ্ন, এই চিহ্নটি নিঃসন্দেহে আমার চিহ্নটিরই প্রতিরূপ, আমি দেখা মাত্রই বুঝে গিয়েছিলাম এটি কিছুতেই আমার চিহ্নটি নয়, এটা বড় বেশি চ্যাপ্টা এবং হেলাফেলায় যেনতেন ভাবে করা, বড় দম্ভভরে কেউ আমারটির বিচ্ছিরী নকল করেছে , নকলটির উপস্থিতি আমাকে আমার সেই পরম বিশুদ্ধ নির্মিতিকে মনে পড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এই চতুর খেলা খেলল কে? আমি কিছুতেই এই ধাঁধার সমাধান করতে পারছিলাম না। অবশেষে অসংখ্য হিসাব নিকেশের পরে আমি একটি মীমাংসায় পৌঁছাতে পেরেছিলাম: অন্য কোনো সৌরজগৎ যার ছায়াপথ আমাদের আগে এই কক্ষপথ পরিভ্রমণ করে গেছে, সেইখানেই কোনো এক Kgwgk (এই নামটি আমি পরের যুগের নামের সন্নিবেশ থেকে পরবর্তীতে যুক্ত করেছিলাম) হিংসুটে স্বভাবী কেউ ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে আমার চিহ্নটি ধ্বংস করবার স্পৃহায় মুছে তো দিয়েছেই এবং এর পরে অত্যন্ত অশ্লীল ভাবে কারচুপি করে আরেকটি চিহ্ন তৈরির চেষ্টা করেছে।

পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছিল যে এটি কোনো কিছুকে চিহ্নিত করবার উদ্দেশ্যে নয় বরং এই Kgwgk আমার অনন্য চিহ্নটিকেই নকল করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার সকল অনুভূতিকে ছাপিয়ে একটি ইচ্ছাই প্রকট হয়ে উঠেছিল যে কিছুতেই আমার এই প্রতিদ্বন্দ্বীকে আমাকে ছাড়িয়ে যেতে দেবো না আমি : তৎক্ষনাৎ সেই মহাশূন্যে একটি নতুন চিহ্ন তৈরির পণ করেছিলাম, যা দেখে Kgwgk ঈর্ষায় জর্জরিত হবে। আমার সেই প্রথম চিহ্নটি নির্মাণের চেষ্টার মাঝখানে প্রায় সত্তরকোটি বছর পেরিয়ে গেলেও আমি প্রচণ্ড মনোবল নিয়ে কাজে নেমে পড়েছিলাম। কিন্তু ইতোমধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেছে, আমাদের বিশ্ব যেমনটি আমি উল্লেখ করেছিলাম ক্রমশ নিজস্ব একটি আকার প্রাপ্ত হচ্ছে, এবং তাতে সকল বিমূর্ত নানা কার্যকারণে স্বরূপে সাড়া দিতে আড়ম্ভ করেছিল, এবং সেই সময়ে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম এই সকল আকৃতি সুদীর্ঘ আয়ু পাবে ( যদিও আমাদের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল : এর সপক্ষে সাম্প্রতিক কালের একটি উদাহরণ উপস্থাপন করা যেতে পারে : ডাইনোসর) , কাজেই আমার নতুন চিহ্নটি আমাদের সময়ের দৃষ্টিভঙ্গির স্মারক, কিংবা আমাদের সময়ের শৈলী হিসেবে নিতে চাইলেও নেওয়া যেতে পারে যখন সবকিছু একটি বিশেষ ঘরানার প্রতিভূ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ যাই হোক আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি আমি সত্যিকার অর্থে এই কাজটি নিয়ে তৃপ্ত ছিলাম এবং সেই প্রথম চিহ্নটি হারিয়ে যাওয়ার অনুশোচনাও মন থেকে দূর হয়ে গিয়েছিল, কারণ আমার কাছে মনে হয়েছিল নতুন চিহ্নটি সৌন্দর্যের মাধুর্য্যে প্রথমটিকে ছাপিয়ে গেছে।

কিন্তু সেই আলোকবর্ষেই আমরা ক্রমশ বুঝতে শুরু করেছিলাম যে এই মহাবিশ্বের আকারসমূহ সেই সময় পর্যন্ত সাময়িক এবং তারা সকলেই একের পর এক পরিবর্তনের মধ্যে যাবে। এবং এই চেতন পুরোনো প্রতিচ্ছবি গুলো নিয়ে একধরনের বিরক্তি তৈরী করছিল, এমন কি তাদের স্মৃতিও আমাদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। আমি একধরনের মানসিক পীড়নে আচ্ছন্ন হচ্ছিলাম: আমি সেই চিহ্নটিকে মহাশূন্যে রেখেছিলাম, যাকে একদা আমার কাছে অতি সুন্দর এবং অকৃত্রিম মনে হয়েছিল যা কিনা তার কাজের জন্য যথার্থ মনে হয়েছিল, আমার স্মৃতিপটে এখন সেটির সকল ন্যায্যতা অপ্রয়োজনীয় মনে হতে শুরু করেছিল, মনে হচ্ছিল এটি একটি মান্ধাতার আমলের ধারণার প্রতিনিধি এবং অর্বাচীনের মতো সকল কিছুকে মেনে নেওয়ার আমার প্রবৃত্তির একটি স্মারক যা কি না আমার মতো প্রজ্ঞাবানের যথাসময়েই প্রত্যাখ্যান করা উচিত ছিল। অন্যভাবে যদি বলি, আমি সেই চিহ্নিটি নিয়ে লজ্জিত ছিলাম যেটি শতবর্ষ ধরে টিকে ছিল, মহাবিশ্ব তার পাশ কেটে বেরিয়ে গেছে এবং সে সেখানে নিজের তো বটেই এবং আমার নিজেরও সেই ক্ষণস্থায়ী কালটির অর্বাচিন দৃষ্টিভংগির স্মারক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছিল। আমি তার কথা মনে করলেই লজ্জায় কুঁকড়ে যেতাম ( এবং আমি প্রতিনিয়তই তার কথা মনে করতাম), যুগ যুগ ধরে এই লজ্জা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল: আমার এই গ্লানি ঢাকতে আমি হামাগুড়ি দিয়ে জ্বালামুখের খাদে নেমে গিয়েছিলাম, অনুশোচনা্র ছোবলে আমি মহাদেশগুলোকে ঢেকে রাখা হিমবাহের চুড়ায় দাঁত ডুবিয়ে লুকিয়েছিলাম। একটাই চিন্তা আমাকে অহর্নিশ পীড়ন করতো তা হলো Kgwgk আমার অগ্রগামী ছায়াপথ ধরে পরিভ্রমণ করছে ফলে আমি চিহ্নটি মুছে ফেলবার আগেই সে এটি দেখে ফেলবে এবং তার যেমন অসভ্য স্বভাব তাতে ঠিক জানি সে আমাকে বিদ্রুপ করবে, আমাকে উপহাস করবার অসৎ উদ্দেশ্যেই এই চিহ্নটির নানা বিকৃত রূপ সে কক্ষপথের পরিসীমার আনাচকানাচ ভরিয়ে ফেলবে।

কিন্তু দেখা গেল, গ্রহক্ষেত্রের জটিল সময়ঘড়ি আমার পক্ষেই রইল, Kgwgk তারকাপুঞ্জ আমার চিহ্নটির দেখা পেল না, অন্যদিকে আমাদের সৌরজগত প্রথম কক্ষপথ ঘুর্ণন সম্পন্নের শেষ মুহূর্তে আমি সময়মতই সেখানে পৌঁছেছিলাম, এতটা কাছে ছিলাম যে আমি সযতনে সম্পূর্ণভাবে চিহ্নটি মুছে দিতে পেরেছিলাম।

অতঃপর এই মহাবিশ্বে আমার করা কোনো চিহ্নই রইল না আর। আমি আরেকটি আঁকা শুরু করতে পারতাম, কিন্তু আমি জেনে গেছি অন্যেরা কেবল চিহ্নটিকে নয় এর প্রস্তুতকর্তাকেও বিচার করতে ছাড়ে না এবং অতিক্রান্ত আলোকবর্ষের মননের পরিবর্তনের সংগে ধারণাগুলির বীক্ষণ চলে, অর্থাৎ পূর্ববর্তী ধারণার টেকা না- টেকা অগ্রবর্তী ধারণার প্রকৃতির উপরই নির্ভরশীল থাকে; এক কথায় যে চিহ্নটি আমি এই সময়ে যথার্থ মনে করছি বিশ কিংবা ষাট কোটি বছর পরে এটি আমাকে অযৌক্তিক হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। অন্যদিকে, আমাকে স্মৃতিকাতর করতো আমার করা সেই প্রথম চিহ্নটি যা Kgwgk নির্মমভাবে মুছে দিয়েছিল সেই চিহ্নটি কালের আঁচড় এবং সকল পরিবর্তনকে অগ্রাহ্য করে আমার মগজে টিকে গিয়েছিল, সেই চিহ্নটি যা কি না চিহ্নসংক্রান্ত ধারণা তৈরি হওয়ার আগেই সৃষ্টি হয়েছিল, যা সকল আকারের পুরোধা হিসেবেই চিহ্নিত হতে পারতো কেননা সেটি ছিল কেবল চিহ্ন অন্যকিছু নয়।

সেই চিহ্নটি ভিন্ন অন্য কোনো চিহ্ন আমাকে উৎসাহী করেনি আর এবং সেই চিহ্নটিও কোটি বছর আগে ভুলে গিয়েছিলাম আমি। কাজেই প্রকৃত চিহ্ন তৈরিতে অপারগ ছিলাম কিন্তু Kgwgk কে বিরক্ত করবার ইচ্ছেটা আমার রয়ে গিয়েছিল, ফলে আমি ভুলভাল চিহ্ন বানানো শুরু করেছিলাম, মহাশূন্যে একটা গোলাকার গর্ত, দাগ এইসব ছোটখাটো চালাকি যা কেবল Kgwgk র মতো মাথামোটারাই চিহ্ন ভেবে ভুল করতে পারে। এবং সত্যিই সে এর প্রতিটিই ক্রোধে উন্মাদ হয়েই যেন মুছে চলছিল (আমার পরবর্তী পরিক্রমায় আমি তা আবিষ্কার করছিলাম) এমনই অপ্রতিরোধ্য লক্ষ্যে স্থির থাকার জন্য তাকে নিশ্চয় অনেক পরিশ্রম করতে হচ্ছিল ( বলা বাহুল্য, ওর বোকামির দৌড় মাপতে আমি এইসব মিথ্যা চিহ্ন মহাশূন্য জুড়ে সবখানে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম)।

এক কক্ষপথ থেকে অন্য কক্ষপথে পাড়ি দেওয়ার সময় চিহ্ন নিশ্চিহ্নের এইসব ঘটনা দেখতে দেখতে (ইতোমধ্যে ছায়াপথে পরিভ্রমণের বিষয়টি আমার কাছে লক্ষ্যহীন ক্লান্তিকর যাত্রায় পরিণত হয়েছিল), আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছিলাম : আলোকবর্ষ অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মোছামুছির চিহ্নগুলিও ক্রমশ আবছা হচ্ছিল, এবং এর নিচ থেকে আমি যে সব মিথ্যা চিহ্ন এঁকেছিলাম তারা আবার ভেসে উঠছিল। এই উদ্ঘাটন আমাকে বিমর্ষ নয় বরং নতুন করে আশান্বিত করছিল। যদি Kgwgk এর চিহ্নসব এভাবে মুছে যেতে পারে, তবে সেই বিন্দুতেও একই ঘটনা ঘটবে এবং আমার চিহ্নটি তার অকৃত্রিম শৌর্যে দৃশ্যমান হবে!

আমার প্রত্যাশা ফের ডানা মেলল, এবং আমার দিনগুলো আবার উৎকন্ঠায় পূর্ণ হতে লাগল। আমাদের ছায়াপথটি নিজের গনগনে তাওয়ায় অমলেট বনে গিয়েছিল, সে নিজেই তাওয়া আবার সোনালি ডিমটিও যেন নিজেই; এবং আমিও তাতে ভাজা হচ্ছিলাম আমার নিজের অস্থিরতার উত্তাপে।

কিন্তু যত সময় যেতে লাগল, মহাশূন্য আর আগের মতো বিস্তীর্ণ, রঙহীন, অসীম পারাবার রইল না। পরিভ্রমণের সময় যাত্রাপথে বিন্দু দিয়ে চিহ্নিত করবার ধারণা- আমার কিংবা Kgwgk র মনে যেমনটি এসেছিল – অনেকেরই তেমন ঘটেছে, অন্যান্য ছায়াপথের কোটি কোটি গ্রহ নক্ষত্রের মধ্যে তা বিস্তৃত হয়েছিল এবং আমি বিরামহীন যাত্রাপথে এদের মতোই কিছু কিংবা এক জোড়া এমনকি এক ডজন, কখনও দ্বিমাত্রিক আঁক অথবা কোথাও ত্রিমাত্রিক কঠিন কিছু ( যেমন পলিহেড্রনসমূহ) অথবা এমন কি অনেক যত্নে নির্মিত চতুর্মাত্রিক এবং সকলকিছু। ব্যাপারটা এমনই ঘটল যে, যখন আমি আমার চিহ্নের স্থানটিতে পৌঁছালাম আমি পাঁচ পাঁচটি চিহ্ন দেখতে পেলাম, সব একখানে এবং কিছুতেই আমার নিজস্ব চিহ্নটি চিনতে পারছিলাম না। এটিই সেটি, নাহ্‌ ঐটা হবে, নয়া, নয়া ওটা বড় বেশি আধুনিক মনে হচ্ছে, অথবা এটা সবচেয়ে প্রাচীনও হতে পারে; আমি আমার হাতের কাজ বলে মনে হচ্ছে না, আমি কখনই এমন কিছু বানাতে চাইতাম না… এবং এরই মধ্যে আমার ছায়াপথটি মহাশূন্যে তার যাত্রায় বিরাম দেয়নি এবং এইসব পুরোনো এবং নতুন চিহ্নদের আমি পেরিয়ে যাচ্ছিলাম, কোথাও আমার চিহ্নটির মিল খুঁজে পাইনি।

আমি যখন বলি যে আমার জন্যে এর পরের আলোকবর্ষগুলি চরম মন্দের ছিল তখন কিন্তু মোটেও বাড়িয়ে বলি না। আমি আমার খোঁজ অব্যাহত রেখেছিলাম এবং দেখছিলাম মহাকাশের চিহ্নগুলি ক্রমশ স্ফীত হচ্ছে, মহাবিশ্বের যে কেউ সুযোগ পেলেই যেভাবেই হোক নিশ্চিতভাবে তার একটি চিহ্ন রেখে যাচ্ছিল, এবং আমাদের দুনিয়ার জন্যেও এটি সত্য ছিল, যতবারই আমি ফিরতাম আমি দেখতাম এখানে ভিড় বেড়েছে, বিশ্ব এবং মহাকাশ যেন পরস্পরের দর্পন-প্রতিবিম্ব হয়ে উঠেছিল, দুটোতেই নিপুনভাবে সূক্ষ্ম চিত্রলিপি কিংবা ভাবলিপি দিয়ে সাজানো হয়েছে, প্রত্যেকটি কোনো চিহ্ন হতেও পারে কিংবা নয়: আগ্নেয়গিরির পাথুড়ে পিণ্ড, মরুভূমিতে হাওয়ার তোড়ে জমাট বাঁধা বালিয়াড়ির চুড়ো, ময়ূরের পুচ্ছে সহস্র চোখের সন্নিবেশ ( ক্রমশ চিহ্নের ভেতরে বসতের অভ্যাস আমাদের অযুতনিযুত জিনিসকে চিহ্ন ভাবতে প্রণোদনা দিচ্ছিল, অথচ এরা ওখানেই ছিল, কোনোকিছু সূচিত করতে নয় কেবল নিজের অস্তিত্ত্ব নিয়েই উপস্থিত ছিল সেখানে; এদেরকে নিজেদের চিহ্ন হিসেবে পরিবর্তিত করা হয়েছিল এবং চিহ্নের কারবারিদের স্বার্থে এদেরকে চিহ্নসমূহের সারণিতে যুক্ত করা হয়েছিল।)ভঙ্গুর শিলার দেয়ালের গায়ে আগুনের শিখার ছাপ, চার-শ- সাতাশ-তম খাঁজটি, সমাধিস্তম্ভের কিনারের সামান্য বাঁকানো কোণ, কোনো ঝড়ের ভিডিওতে আলোকরেখার সারণি, ( এই চিহ্নের সারি বৃদ্ধি পেয়ে চিহ্নের চিহ্ন হিসেবে আবারো চিহ্নসারি তৈরি হওয়া, কোনো চিহ্নের এমন অসংখ্যবারের পুনরাবৃত্তিতে একই কিংবা সবসময়ই খানিক অন্যরকম চিহ্ন তৈরি হয় কারণ উদ্দেশ্যযুক্ত চিহ্নের স্বার্থে একে চিহ্নযুক্ত করা হয় যদিও সেখানে সে অতর্কিতেই উদিত হয়েছিল), সান্ধ্যকালীন পত্রিকার ইংরেজি R এর ল্যাজে কালি থেবড়ে কাগজে সুতো সদৃশ ত্রুটি, মেলবোর্ন ফেরিঘাটের আলকাতরার দেয়ালের আটলক্ষ স্তরের একটি, কোনো গ্রাফের বক্ররেখা, পিচঢালা পথে গাড়ির চাকার গতির ছাপ, কিংবা ক্রমোজোম…যখন তখন আমি চেঁচিয়ে উঠতাম: এই তো এটাই! এবং এক মুহূর্তের জন্য আমি নিশ্চিত হতাম আমি আমার চিহ্নটিকে খুঁজে পেয়েছি , পৃথিবীতে হোক কিংবা মহাশূন্যে তাতে কোনো কিছু যেত আসতো না, কারণ চিহ্নসূত্রেই সীমানাহীন এক ধারাবাহিক বিস্তার স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল ।

এখন মহাবিশ্বে ধারক এবং ধৃত বলে কোনো কিছু ছিল না আর, বরং একের পরে এক চিহ্নের স্তুপ জমাট বেঁধে সমগ্র মহাশূন্যের আয়তনকে ছেয়ে ফেলেছিল; এতে অবিরাম ফুটকি নির্মিত হচ্ছিল , সূক্ষ্মভাবে, রেখার সমাবেশ,আঁচড়, অভিক্ষেপ এবং নানারকম খোদাই; মহাশূন্য সকলদিকেই বিস্তৃত হয়েছিল, সকল তলে। এখানে আর কোনোভাবেই কোনো সূচক বিন্দু স্থাপনের উপায় ছিল না: ছায়াপথ তার আবর্তন অব্যাহত রেখেছিল কিন্তু আমি সেই হিসেবের নিকেশ রাখতে পারিনি, যে কোনো বিন্দুই তার ফেরার চিহ্ন-বিন্দু হতে পারতো, চিহ্নের স্তুপের ভেতরের যে কোনো একটি আমার সেই চিহ্নটি হতে পারতো, কিন্তু তাকে খুঁজে পেলেও কোনো কাজ হতো না আর, কেননা এটি পরিষ্কার যে চিহ্নবিহীন মহাশূন্যের স্বাধীন অস্তিত্ত্ব নেই, হয়তো কোনোকালেই ছিল না।


অনুবাদক পরিচিতি
রঞ্জনা ব্যানার্জী
গল্পকার, অনুবাদক
কানাডা।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ