অনুবাদ- ফাহ্মিদা বারী
ছয়টা বাজতে ছয় মিনিট বাকি আছে… নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের ইনফরমেশন বুথের ওপরে রাখা বিশাল ঘড়িটা সময় জানান দিলো।
লম্বা তরুণ আর্মি অফিসারটি তার রোদে পুড়ে যাওয়া মুখটা ওপরে তুলল। চোখদুটোকে সরু করে সে একদম সঠিক সময়টা টুকে নেওয়ার চেষ্টা করল। তার বুকটা প্রতি মুহূর্তেই অদ্ভুত এক স্পন্দনে তাকে আলোড়িত করে তুলছিল। মাত্র ছয় মিনিট পরেই সে এমন একজন নারীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে চলেছে যে বিগত তেরটা মাস তার জীবনে বিশেষ এক জায়গা দখল করে বসেছিল। যে নারীকে সে এখন অব্দি চোখে দেখেনি, কিন্তু যার লেখা প্রতিটি বাক্য তাকে এক অপূর্ব সঞ্জীবনী সুধায় জীবন্ত করে রেখেছিল।
লেফটেন্যান্ট ব্ল্যানফোর্ড বিশেষভাবে একটি দিনের কথা মনে করতে পারে। সেদিন ভীষণ রকম যুদ্ধ চলছিল আর তাদের বিমানটি এক ঝাঁক শত্রু বিমানের মধ্যে গিয়ে পড়েছিল।
একবার নিজের কোনো এক চিঠিতে ব্ল্যানফোর্ড সেই নারীর কাছে স্বীকার করেছিল, তার প্রচণ্ড ভয় লাগে মাঝে মাঝে। হয়ত সৈন্যদের এরকম ভয়ভীতি থাকাটা খুব বেশি স্বাভাবিক ব্যাপার না!
সেদিনের সেই ভয়ানক যুদ্ধের মাত্র কিছুদিন আগেই সে মেয়েটির কাছ থেকে জবাব পেয়েছিল, ‘অবশ্যই তোমার ভয় লাগতে পারে। সব সাহসী পুরুষেরই ভয় লাগে। এটা তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। এর পরেরবার যখন তুমি নিজের সঙ্গে এরকম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়বে, তখন তুমি কল্পনায় আমার গলার আওয়াজ শোনার চেষ্টা করবে।
তুমি কল্পনা করে নিও যেন আমি তোমার কানে কানে আবৃত্তি করছি... ‘’মৃত্যুর ছায়াঢাকা উপত্যকার মধ্য দিয়ে পার হতে হলেও আমি কোনো অশুভ কিছুরই ভয় করি না! কারণ আমি জানি তুমি আমার সঙ্গে আছো!’’
ব্ল্যানফোর্ড সেই ভয়ানক যুদ্ধের মুহূর্তেও মেয়েটির বলা সেই বাক্যগুলোকে মনে করতে পেরেছিল। আর সেটাই তার শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছিল।
আজ সে ঐ কণ্ঠস্বরকে সামনাসামনি শুনতে যাচ্ছে। এই তো আর মাত্র কিছুক্ষণ! ছয়টা বাজতে আর মাত্র চার মিনিট বাকি!
একটা মেয়ে তার খুব কাছ ঘেঁষে চলে গেল। ব্ল্যানফোর্ড তার দিকে চোখ তুলে তাকালো। এই মেয়েটি তার পোশাকে একটি গোলাপ গুঁজেছে ঠিকই, কিন্তু এটি সেই ছোট্ট লাল গোলাপ নয় যে ব্যাপারে তাদের মধ্যে কথা হয়েছিল। তাছাড়া এই মেয়েটির বয়স খুব অল্প, মাত্র ১৮ বছর। তাকে চিঠি লেখা সেই নারী হলিসমেনেল, তাকে বলেছিল যে তার বয়স ৩০ বছর। এটা জানার পরে ব্ল্যানফোর্ড বলেছিল, ‘তাতে কী হয়েছে? আমার বয়স তো ৩২!’ যদিও তার বয়স ছিল ২৮ বছর।
স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ব্ল্যানফোর্ডের মন চলে গিয়েছিল সেই বইয়ের পাতায় যেটি সে ট্রেনিং ক্যাম্পে বসে বসে পড়েছিল। বইটি ছিল সমারসেট মমের লেখা উপন্যাস ‘অফ হিউম্যান বন্ডেজ’। পুরো বইটা জুড়ে একটি মেয়েলী হাতের লেখায় ছোট ছোট নোট করা ছিল, যা সে বইটা পড়তে পড়তে লিখেছিল। এর আগে ব্ল্যানফোর্ডের ধারণাতেও ছিল না যে, একজন মেয়ে কখনো এতটা কোমলতা ও সহমর্মিতা দিয়ে একটা পুরুষের মনকে বুঝতে পারে! বুকপ্লেটে মেয়েটির নাম লেখা ছিল, ‘হলিস মেনেল’।
এরপর নিউইয়র্ক সিটি টেলিফোন গাইড থেকে ব্ল্যানফোর্ড মেয়েটির ঠিকানা খুঁজে বের করেছিল। এরপর থেকে সে মেয়েটাকে চিঠি লিখেছে এবং প্রতিবারই মেয়েটি তার চিঠির জবাব দিয়েছে। ব্ল্যানফোর্ডের সেই ক্যাম্পের সময় ফুরিয়ে এসেছিল এবং তাকে অন্য এক জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তবু সে মেয়েটাকে চিঠি লেখা বন্ধ করেনি আর হলিস মেনেলও পরম বিশ্বস্ততার সঙ্গে তার প্রতিটি চিঠির উত্তর দিয়ে চলছিল। এমনকি যখন মেনেল ব্ল্যানফোর্ডের চিঠি পেত না, তখনো তাকে কিছু না কিছু লিখে পাঠাত। ব্ল্যানফোর্ড এতদিনে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, সে মেয়েটিকে ভালোবাসে আর মেয়েটিও তাকে ভালোবাসে।
কিন্তু তার শত অনুরোধ সত্ত্বেও হলিস মেনেল ব্ল্যানফোর্ডকে তার কোনো ছবি পাঠায়নি।
সে এটার ব্যাখ্যা দিয়েছে এভাবে, ‘যদি আমার প্রতি তোমার অনুভূতি সত্যি হয়, তাহলে আমার চেহারা এতে কোনোরকম প্রভাব ফেলতে পারবে না। ধরো আমি যদি সুন্দরী হই, তাহলে এটাই আমাকে সবসময় তাড়া করে ফিরবে যে তুমি হয়ত আমার চেহারার জন্য আমার ব্যাপারে একটা সুযোগ নিয়েছিলে। আর এই জাতীয় ভালোবাসাকে আমি ভীষণভাবে ঘৃণা করি। আর ধরো, আমি যদি দেখতে সাদামাটা হই (তুমি নিশ্চয়ই মানবে যে, সেটা হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি) তাহলে আমি সবসময় এই ভয়ে থাকব যে, তুমি নিতান্তই বাধ্য হয়ে আমাকে চিঠি লিখতে। কারণ তুমি ছিলে একা। হয়ত তোমার এমন কেউ ছিল না, যাকে তুমি তোমার মনের কথাগুলো জানাতে পারো। আমাকে ছবি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করো না প্লিজ! তুমি যখন নিউইয়র্কে আসবে তখনই তুমি আমাকে দেখো আর তোমার সিদ্ধান্ত নিজেই নিও।’
আর মাত্র এক মিনিট বাকি আছে ছয়টা বাজতে! ব্ল্যানফোর্ড তার হাতে ধরা বইটার পাতা উল্টাল আর হঠাৎ তার হৃৎপিণ্ডটা একটা বেমক্কা লাফ দিয়ে উঠল। একটি তরুণী মেয়ে ঠিক তার দিকেই এগিয়ে আসছে! মেয়েটি দীর্ঘাঙ্গী এবং হাল্কা পাতলা গড়নের। তার সোনালী কোঁকড়ানো চুলগুলো নাজুক এক জোড়া কানের পাশ ঘেঁষে সযত্নে এলিয়ে পড়েছে পিঠের ওপরে। মেয়েটির চোখজোড়া ফুলের মতো নীল, ঠোঁট আর চিবুকে জড়ো হয়েছে এক মোহনীয় ঋজুতা। ধূসর সবুজ জামায় মেয়েটিকে দেখাচ্ছিল যেন বসন্তের এক টুকরো সবুজ বার্তা, যা শক্তি আর তারুণ্যের উদ্দীপনায় ঝলমল করছে!
ব্ল্যানফোর্ড কোনো কিছু না ভেবেই মেয়েটিকে অনুসরণ করতে চাইল। এমনকি মেয়েটির পোশাকে যে কোনো গোলাপ এঁটে রাখা নেই, এটাও তার চোখ এড়িয়ে গেল। ব্ল্যানফোর্ডকে এগুতে দেখে মেয়েটির ঠোঁটে অদ্ভুত এক মাদকতাময় হাসি ছড়িয়ে পড়ল। চেহারাতে আবেদন ফুটিয়ে তুলে মেয়েটি গুনগুনিয়ে বলে উঠল, ‘যোদ্ধা, তুমি কি আমার সাথেই আসছ নাকি?’
মেয়েটির দিকে আরো এক পা এগুতে যাবে, ঠিক এমন সময় ব্ল্যানফোর্ডের দেখা হয়ে গেল হলিস মেনেলর সঙ্গে। মেয়েটির ঠিক পেছনেই সে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি একজন চল্লিশোর্ধ মহিলা, মাথার চুলগুলো আঁটসাঁট হয়ে এঁটে আছে তার টুপিটার মধ্যে।
তাকে মোটা বললে কম বলা হয়। একটা কম হিলের জুতার মধ্যে তার মোটা পুরু গোড়ালিযুক্ত পা দুটো শক্ত হয়ে ঢুকে ছিল। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও তিনি তার কুঁচকানো কোটের ওপরে ঠিকই একটা লাল গোলাপ পরে ছিলেন।
ব্ল্যানফোর্ড ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেল, সবুজ জামা পরা মেয়েটি দ্রুত সেই জায়গা ছেড়ে চলে গেল।
ব্ল্যানফোর্ডের কাছে মনে হলো, তার সত্তা যেন দুইটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
তার মনের একটি সত্তা খুব সূক্ষ্মভাবে সেই মেয়েটিকে অনুসরণ করতে চাইছে। অথচ যে উজ্জ্বল আত্মা তাকে এতদিন ধরে সাহচর্য আর মমতা দিয়ে ধরে রেখেছিল এবং যে এখন তার এত কাছে দাঁড়িয়ে আছে, মনের আরেকটি সত্তা গভীরভাবে চাইছে তার সঙ্গে দেখা করতে। সে দেখতে পাচ্ছে তার মোটা মুখখানার ভাবটি খুব নরম ও সংবেদনশীল। তার ধূসর চোখজোড়ায় আবৃত হয়ে আছে মেঘমেদুর বলিরেখা।
লেফটেন্যান্ট ব্ল্যানফোর্ডের মন তাকে নিষ্ঠুর হতে সম্মতি দিলো না।
‘অফ হিউম্যান বন্ডেজ’ এর পড়া কপিটি সে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল, যেটি দেখে হলিস মেনেল তাকে চিনতে পারবে। এটা হয়ত ভালোবাসা হবে না, কিন্তু তার চাইতেও দামি কিছু হবে। হতে পারে এটার নাম বন্ধুত্ব ... যেটার জন্য ব্ল্যানফোর্ড সবসময় মেনেলের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল এবং থাকবে।
ব্ল্যানফোর্ড তার কাঁধটাকে সোজা করে মেনেলকে একটা স্যালুট করল। তারপর বইটি তার দিকে মেলে ধরল। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও ব্ল্যানফোর্ড যখন মুখ খুলল, আশাভঙ্গের তিক্ততাটুকু তার মুখ চেপে রাখতে পারল না। ব্ল্যানফোর্ড বলল, ‘হ্যালো... আমি লেফটেন্যান্ট ব্ল্যানফোর্ড এবং আপনি... মিস মেনেল.. আমার খুব ভালো লাগছে যে আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে পেরেছেন। আমি কি আপনাকে... মানে ... ডিনারে নিয়ে যেতে পারি?’
ভদ্রমহিলার মুখ একটা প্রশস্ত হাসিতে ভরে উঠল।
মায়াভরা কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, ‘দেখো বাছা, আমি তো বুঝতে পারছি না এসবের মানে কী! এইমাত্র সবুজ জামা পরা যে তরুণী মেয়েটি এই জায়গাটা অতিক্রম করল সে আমাকে পরার জন্য একটা গোলাপ দিয়ে বলল, তুমি যদি আমাকে তোমার সঙ্গে বাইরে যাওয়ার প্রস্তাব দাও তাহলে আমি যেন তোমাকে জানাই যে, সে রাস্তার ওপাশের একটা রেস্টুরেন্টে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
তিনি আরো বললেন, এটা এক জাতীয় পরীক্ষা... যা সে তোমার ওপরে প্রয়োগ করেছে!’
---------
লেখক পরিচিতি: সুলেমিথ ঈশ কিশোর (সংক্ষেপে এস আই কিশোর) একজন আমেরিকান লেখিকা। তিনি ধর্মীয় এবং শিশু সাহিত্যের জন্য বেশি পরিচিত ছিলেন। এস আই কিশোর জন্মেছিলেন লন্ডনে, ১৮৯৬ সালে। তার বাবা ইহুদি শিশু সাহিত্যের জন্য সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে এস আই কিশোর তার লেখালেখি শুরু করেন এবং দশ বছর বয়সেই তার বেশ কিছু কবিতা ব্রিটিশ প্রকাশনায় প্রকাশিত হয়। যখন তার বয়স তের বছর তখন তার পরিবারটি ব্রিটেন থেকে আমেরিকার নিউইয়র্কে চলে যায়।
তার লেখা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ‘এপোয়েনমেন্ট উইথ লাভ’ তার একটি ক্লাসিক লাভ স্টোরি যা ১৯৪৩ সালের ‘কলিয়ার’ ম্যাগাজিনের সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
১৯৭৭ সালের জুনে এস আই কিশোর মারা যান।
অনুবাদক পরিচিতি: ফাহমিদা বারী। গল্পকার।ঔপন্যাসিক। অনুবাদক।
গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত তার বারোটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
বর্তমানে তিনি ঢাকায় বসবাস করছেন।


3 মন্তব্যসমূহ
খুব ভালো লাগল গল্পটি। অনুবাদ এত সুন্দর!
উত্তরমুছুনদারুণ লাগল
উত্তরমুছুনখুব সাবলীল অনুবাদ! মনে হচ্ছিল ব্ল্যানফোর্ড আর মেনেল এর প্রতিটি অনুভূতি অনুভব করতে পারছিলাম। গল্পটাও সুন্দর। অনুবাদের জন্য আরও ভালো লেগেছে।
উত্তরমুছুন