অমৃতা প্রীতমের গল্প: কপিলার শেষ প্রহর






বাংলা অনুবাদ: মৌসুমী বিলকিস




হালকা হলুদাভ বাদামী রঙের মিশ্রণে বিরল তার ত্বক। সংবেদনশীল তার দু জোড়া স্তনবৃন্ত পাতি কালো, ঝুলে পড়া বা বলীরেখাগ্রস্ত মাংস পিণ্ড নয়। বরং এই কালো আভা গোলাপীকে করেছে আরও মনোরম। এজন্যই গ্রামবাসীদের কাছে সে কপিলা গরু নামে পরিচিত।

কপিলা তার ভাঙা পাগুলো নিয়েই ওঠার চেষ্টা করে। খুরগুলোকে মাটিতে স্থাপন ক’রে মরিয়া চেষ্টা করে সোজা হয়ে দাঁড়াবার। প্রত্যেক বারই টলমল করতে করতে শক্ত মাটিতে অসহায় আছড়ে পড়ে।

এখন তার শরীরে এতটুকু নড়াচড়ার চিহ্ন নেই। ধুঁকতে ধুঁকতে পাথর চাটার বাসনায় বের করে জিভ। পাথরের পরিবর্তে জিভে ঠেকে নিজেরই রক্তের নোনা স্বাদ। রাতে সে দেখেছিল অন্য গরুদেরও। এখন তাদের শরীর মাংসের বিশাল বিশাল টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে চারপাশে।

দূরাগত কথা বাজে তার কানে। একটা কণ্ঠ গর্জে ওঠে, ‘পবিত্র গোমাতার ওপর একি নৃশংসতা! এইসব পাপী, অপরাধীদের ওপর ঈশ্বরের অভিশাপ নেমে আসুক যারা নিরীহ গরুগুলোকে হত্যা করেছে।’

আরেকটি উত্তেজিত কন্ঠ শোনা যায়, ‘যে দেশে এরম ঘটে সে দেশের বিবেক বলে কিছু নেই! এই দেশ অবশ্যই অবলা গরুর রক্তের স্রোতে ভেসে যাবে।’

ধনুকের মতো বাঁকানো আকাশের গায়ে অনুরণীত হতে থাকে এরকম অজস্র কথা। এ যেন অন্ধকার থেকে উঠে আসা স্বরসমূহ যা উদীয় সূর্যরশ্মির গায়ে আছড়ে পড়ে।

কপিলার শরীর এক শূন্যতার ভেতর ডুবে যেতে থাকে, খুরগুলো গেঁথে যায় রক্তের স্রোতে।

পরক্ষণেই বোঝে উইনিফর্ম পরা কিছু মানুষ তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছে। প্রস্তরীভূত চোখে তাদের দেখে। একটু দূরে একটা উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষও ঠাহর করতে পারে।


‘কী হয়েছিল?’, কেউ জানতে চায়।

বিনয়ে নুয়ে পড়া স্বরে উত্তর আসে, ‘উড়ানের আগে সমস্ত প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিই। ১৯ নং রানওয়েতে প্লেন দাঁড় করাই। সমস্ত ব্রেকগুলো খুলে দিয়ে ছ’হাজার আরপিএম-এ পাওয়ার রেখে, টেক অফ করার জন্য ইঞ্জিনের গতি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করি। বাইরে, রানওয়েতে আলো ছাড়া কিছুই দেখতে পাইনি।’

‘তারপর কী হল?’, বিরক্ত হয়ে কেউ জানতে চায়।

উত্তর আসে, ‘এরোপ্লেন চলতে শুরু করে, গতি বেড়ে যায়, মাঝের ইনডিকেটরে গতি দেখাচ্ছিল ১৩৫ নট। আমি নিয়ন্ত্রণ দন্ডটা টানি এবং ইনস্ট্রুমেন্ট প্যানেলের দিকে তাকাই। প্লেনের নোজ হুইল ওপরে উঠে যায় আর পর্যায়ক্রমিক মারাত্মক ঝাঁকুনি ও ধাক্কা অনুভব করি।’

সে বলে, ‘আমি সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে ব্রেকগুলো কষে দিই। আমার মনে হচ্ছিল কেউ যেন হিংস্রভাবে প্লেনটা নাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রথমে মনে করেছিলাম, বোধহয় প্লেনের টায়ার ফেটে গেছে বা রানওয়েতে পিছলে গিয়ে গাছগুলোর দিকে চলে গেছে। এরোপ্লেনের নীচের দিক মাটিতে সশব্দে ঘষা খায় এবং প্লেনের চারপাশ থেকে আগুনের ফুলকি বেরোতে শুরু করে।’

তাকে বাধা দিয়ে আগের কন্ঠ বলে, ‘সে সময় নেভিগেটর কোথায় ছিল?’

একটি নতুন স্বর মধ্যস্থতা করে, ‘স্যার, আমিই এই প্লেনের নেভিগেটর। টেক অফের সময় ক্র্যাশ সিট-এ ছিলাম। হঠাৎ করেই প্লেনটা থেমে যায়, তখন প্রবেশ দরজা খোলার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু দরজা আটকে গেছিল। তারপর দেখতে পাই প্লেনের নাকের দিকটা একেবারে ভেঙেচুরে একটা বড় ফুটো তৈরি হয়েছে। সেই ফুটো দিয়েই বাইরে বেরিয়ে আসি।’

কেউ একজন পাইলটকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনি কী করে বের হলেন?’

বিনীত গলায় উত্তর আসে, ‘বেরিয়ে আসার একটাই উপায় ছিল, স্যার; আসনের ওপরের ঢাকনি দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসা। বোতাম টিপলাম আর ঢাকনিটা প্রবল বেগে খুলে গেলো এবং সঙ্গে সঙ্গে আবার শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল। সে সময় প্লেনটা স্থির দাঁড়িয়ে। তারপর বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। মনে হল প্লেনের মধ্যে আমাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। দু হাত দিয়ে ছাউনিটা তোলার চেষ্টা করেও পারলাম না। তারপর মাথা দিয়ে ছাউনি খোলার চেষ্টা করলাম। বলা যায় কঠিন একটা কুস্তি করে দু হাত দিয়ে ছাউনি খুলতে সক্ষম হলাম। ছাউনিটা আধখোলা হতেই ঝাঁপ দিয়ে বেরিয়ে এলাম। বেরিয়ে দেখি প্লেনের ডান দিকের পাখা ভেঙে গেছে। রানওয়ে একেবারে রক্তের নদী। প্রচুর গরু মরে পড়ে আছে। ভয় করছিল যে প্লেনে আগুন ধরে যাবে। ফলে আমরা দৌড়তে শুরু করি এবং অনেক দূরে এসে থামি।’

একজন গর্জন করে ওঠে, ‘কিন্তু গরুগুলো কী করে বিমান-এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে?’

খুব দ্রুত একজন উত্তর দেয়, ‘স্যার, এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। ঘটনাটা সত্যিই অবিশ্বাস্য!’

ক্ষুব্ধ এক গম্ভীর গলা বলে ওঠে, ‘দ্রুত এর তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু এই মুহূর্তে তোমরা বিপদের মুখে। সংরক্ষিত এলাকার বাইরে বেরিও না। গরুদের ধাক্কা দেওয়ার জন্য আমাদের বিরুদ্ধে পাশের গ্রামে বিক্ষোভ চলছে।’


কপিলা বোঝে তার আয়ু ধীরে ধীরে কমে আসছে। চোখ খুলছে, পিটপিট করছে এবং আবার বুঁজে যাচ্ছে। একটা ভারী পর্দার মতো চোখের পাতা নেমে আসতে চায়ছে। ধীরে ধীরে আলো কমে হচ্ছে অন্ধকার। মনে হয় অনেক মানুষ আশেপাশে জমা হয়েছে, সে শুনতে পায় অনেক কন্ঠস্বর।

কেউ জানতে চায়, ‘মরা গরুগুলো কাদের?’

কপিলা ভেতরে ভেতরে কেঁপে ওঠে। চোখ তুলে তাকানোর চেষ্টা করতেই একটা নিস্তব্ধতা অনুভব করে।

কেউ পরিষ্কার গলায় চেঁচিয়ে বলে, ‘যাদের গরু তারা নাম দিয়ে যাও। মরা গরুর জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।’

তারপর কথার পর কথা, কান্না আর তীক্ষ্ণ চিৎকার আছড়ে পড়ে বাতাসে।

‘এটা আমার গরু, স্যার।’

‘এই সাদা গরুটা আমার। আমার নাম শেরা।’

‘ওটা আমার গরু, স্যার। আমার নাম হামামা।’

‘তিনটে বাঁটের এই গরুটা আমার। আমার নাম রাখা।’

‘লেজ নেই গরুটা আমার, স্যার।’

‘এই গরু আমার...’

‘ওই গরুটা...’

‘ওই যে ওটা...’

এই ছড়ানো ছিটানো মাংস-টুকরো ও রক্ত মথিত দৃশ্যের নিস্তব্ধতা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় লোকজনের চিৎকারে।

একটা বজ্রকন্ঠ চেঁচিয়ে ওঠে, ‘এবার বুঝেছি! দশটা মরা গরুর জন্য কুড়িটা নাম জমা পড়েছে। মিথ্যেবাদীর দল!’

কপিলা গরু-মালিকদের চিনে নেওয়ার জন্য চোখ খোলে। কয়েকজনকে চিনতে পারে, তবে কিছু লোক অচেনা। কেউ জানে না তারা কোথা থেকে এসেছে। কপিলা নিজের প্রতিপালক মোহনাকে চিনতে পারে। নিজের বাছুরের কথা মনে পড়ে তার। সমস্ত শক্তি দিয়ে সে প্রাণপণে চেঁচানোর চেষ্টা করে। কিন্তু একটা দলা পাকানো অনুভব গলা চেপে ধরে।

একটা কন্ঠ বাতাসে আছড়ে পড়ে, ‘ক্ষতিপূরণের লোভে তোমরা নাম লেখাতে চায়ছো। ও! তোমাদের খেলা এবার বুঝেছি। একেকটা প্রতারক, ঠকবাজ!’

কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকজন পালায়। একটা শ্বাসরুদ্ধকারী অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে এই মৃত্যু উপত্যকায়। কপিলা বুঝতে পারে না এই অন্ধকার আসন্ন রাত্রির নাকি তার চারপাশে ওঁত পেতে থাকা মৃত্যুর যে মৃত্যু সুযোগ পেলেই তাকে গিলে নিয়ে চলে যাবে কোন সুদূর প্রদেশে। এক পলকের নিস্তব্ধতায় যেন হাজার বছর কেটে যায়।

একটা কন্ঠ চেঁচিয়ে ওঠে, ‘বলো, চৌকিদার, বিমান-ক্ষেত্রের সংরক্ষিত এলাকায় গরু কী করে ঢুকে পড়তে পারে? আমরা জানতে পেরেছি প্রতি রাতে এখানে গোপনে গরু ছেড়ে দেওয়া হয় চরে বেড়াবার জন্য। গরু মালিকরা প্রতি মাসে তোমাকে ঘুষ দেয়। এবার এই কেলেঙ্কারির জন্য তোমাকে কাঠগড়ায় তোলা হবে।’

কপিলার জীবন এক অস্পষ্ট আভার মতো জেগে থাকে। শরীরে বসা মাছি তাড়ানোর জন্য সে লেজ নাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার লেজও অসাড়, চলৎশক্তিহীন।

কেউ একজন বুটের শব্দে মাটি কাঁপিয়ে হেঁটে আসে। চ্যাঁচায়, ‘মৃত গরুদের মালিক বলে যে কুড়িজন দাবি জানিয়েছিল তারা কোথায়? এখন তো দেখি এই মরা পশুদের দায় কেউ নিতে রাজি নয়। এরা সবাই বলছে এগুলো তাদের গরু নয়, কারণ তারা ভাল করেই জানে ওরা আমাদের উড়োজাহাজের যা ক্ষতি করেছে তার মূল্য পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা। এখন সব দোষ গরুগুলোর ওপর গিয়ে পড়েছে।’

কপিলা তার প্রতিপালকের মুখ দেখার আকাক্ষা অনুভব করে। কিন্তু মোহনা আগেই সেখান থেকে পালিয়েছে। মনের মধ্যে অজস্র স্মৃতি আনাগোনা করে।

একবার তার মনিব মোহনা এত অসুস্থ হয়ে পড়ে যে সবাই আশা ছেড়ে দেয়। কোনও সাধু তাকে পরামর্শ দেয়, এক মঙ্গলবার আটার গোল্লা বানিয়ে নিজে হাতে গরুকে খাওয়াতে। এবং কি এক অলৌকিকতায় মোহনা সেরে ওঠে।

কপিলার অসাড়, প্রাণহীন অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো এক অধরা আশার ক্ষুধায় অদ্ভুত অনুভূতিতে জেগে ওঠে। আটার গোল্লা! সেই মঙ্গলবারটা তার মনের ভেতর ভেসে ওঠে। আজ কি মঙ্গলবার? আমার প্রতিপালক কোথায়? তার কোনও প্রতিপালক কি আদৌ ছিল? এখন কে আর তাকে আপন করে নেবে? সে এখন জড়পিণ্ড মাত্র।

প্রস্তরীভূত চোখ অস্পষ্ট দেখে সামনে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে কেউ। হয়তো মোহনা ফিরে এসেছে তার নিষ্প্রাণ গরুর শরীরে নরম হাত বুলিয়ে দেবে বলে।

মায়াবী চোখ প্রাণপণে চেষ্টা করে চোখের পাতা খোলার। এক নরম স্পর্শের উষ্ণতা শরীরময় ছড়িয়ে পড়ে। কোনকিছু তাকে স্পর্শ করছে, ভেলভেটের মতো, সিল্কের মতো সে স্পর্শ। মোহনার আদরযত্ন করা হাতের থেকেও নরম এবং উষ্ণ।

বুজে থাকা চোখ সামান্য তুলে সে বুঝতে পারে কে তাকে ছুঁয়ে আছে। এ যে তারই সত্তা, তারই জীবনের ধন, তারই বাছুর!

কোথা থেকে ঠিক তার বাছা এসে পড়েছে। কোথা থেকে এলো সে?

তার জীবনের ধন, তারই বাছুর চেটে দিচ্ছে আসন্ন মৃত্যুতে ঢলে পড়া মায়ের শরীর। একটা অপ্রতিহত ঢেউ ধাক্কা দেয় তাকে, ভাসিয়ে নিয়ে যায় দূরে, বহু দূরে।

---------

খুশবন্ত সিং-এর ইংরেজি ভাষান্তর ‘This is my cow, sir!’ থেকে।

পাঠসূত্র: কপিলা: ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণে স্বর্গীয় গাভী কামধেনুর অপর নাম কপিলা। কপিলা কামধেনুর সন্তান বলেও উল্লিখিত আছে অন্যান্য পুরাণে। এই গল্পে পবিত্র গাভীকে অর্থের লোভে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ভারতেও ব্যবসা, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ক্ষমতা দখলের অস্ত্র হয়ে উঠেছে গরু।

এক মুনির নামও কপিলা, যিনি সাংখ্য দর্শনের প্রবর্তক।

মঙ্গলবারে আটার গোল্লা: এই কুসংস্কার অমৃতার অন্যান্য গল্পেও এসেছে। তবে সব ক্ষেত্রে এরকম অলৌকিকতা ঘটেনি।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ