অমৃতা প্রীতমের গল্প: সেই লোকটা






বাংলা অনুবাদ: হারুন রশীদ

ই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পাচারকারী হলো নারী। একজন পুরুষ গোপনে আফিম কিংবা মারিজুয়ানার মতো জিনিস পাচার করতে পারে। বড়জোর স্বর্ণ কিংবা অথবা সরকারী গোপন তথ্য, তার বেশি কিছু নয়। এর চেয়ে বেশি কিছু সে পাচার করতেই পারে না। কিন্তু একজন নারী আস্ত একটা পুরুষের গোটা অস্তিত্বকেই লুকিয়ে রাখতে পারে। তারপক্ষে যতক্ষণ সম্ভব ততক্ষণ সে নিজের গর্ভের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে পারে। যখন সে আর লুকিয়ে রাখতে পারে না, তখন সেটা স্বীকার করে এবং প্রকাশ্যেই জানিয়ে দেয় লুকিয়ে রাখতে পারছে না। সেটা জানাতে গিয়ে কোনোরকম লজ্জাবোধ করে না। বরং গর্বের সাথেই জানায়। সে হয়তো মজা করে বলতে পারতো পাচার করা তার শুধু অধিকার নয়, পেশাগত কাজের অংশ। কারণ মানবজাতির বংশবিস্তারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই তার প্রধান কর্তব্য।

তো সেইভাবেই, আমার বাবার ইচ্ছে পুরণ করার জন্য আমার মা ঈশ্বরের কাছে একটা পুত্র সন্তান চাইলেন। প্রথমে তিনি স্থানীয় কবিরাজের কাছে গেলেন। তারপর গেলেন ফকিরের কাছে, তারপর গেলেন ভুডু বলে পরিচিত ডাইনীদের কাছে। এমনকি পীরের কবরেও ধর্না দিলেন, মৃত্যুর পরেও যাদের হাতে অলৌকিক ঘটনা ঘটাবার ক্ষমতা রয়েছে। তাতেও কাজ না হওয়াতে তিনি শিব মন্দিরে গেলেন, যাকে সৃষ্টিজগতের কারিগর বলা হয়। তিনি সন্তানের জন্য এমনই ভয়ানক উতলা হয়ে পড়েছিলেন। ঈশ্বর তাঁর আশা পুরণ না করা অবধি চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

ঈশ্বরকে নিজের দুর্ভাগ্যের কথা বলতে বলতে তিনি নিজের মতো করে একটা দর কষাকষি করেছেন। তিনি ঈশ্বরকে প্রস্তাব করেছেন যদি তিনি তার গর্ভে একটা পুত্র সন্তান দান করেন, তাহলে সেই সন্তানকে তিনি মন্দিরে সোপর্দ করবেন যাতে সে সারাজীবন ঈশ্বরের সেবা করে যেতে পারে।

এটা একটা অদ্ভুত ধরণের দর কষাকষি। তিনি বললেন, "তুমি দেখো আমি তোমাকে কী দিতে চাই। লোকে তোমার কাছে ময়দার তৈরি পিঠা, ভাত, মিঠাই, নারিকেল এসব নিয়ে হাজির হয়। অথবা মার্বেল পাথর দিয়ে মন্দিরের চাতাল বাধাই করে দেয় কিংবা সোনালী রং এর পত্র পল্লবে দেয়ালের অলঙ্করণ করে। অথচ আমি তোমাকে দিতে চাই জলজ্যান্ত একটা বালক, যে সারা জীবন তোমার সেবা করে যাবে।"

এহেন লোভনীয় প্রস্তাব পেয়ে ঈশ্বর রীতিমত একটা চাপের মধ্যে পড়ে গেলেন।

ওদিকে আমার বাবাকেও অন্য ধরণের একটা চাপের মধ্যে ফেলে দিলেন তিনি। বললেন, 'দেখো কী ভয়ানক যন্ত্রণাকাতর সময় পার হয়ে আসতে হয়েছে আমাকে। তবু আমি তোমার নাম রেখেছি, তোমার দেওয়া বীজকে আমি মরতে দেইনি। যদিও এই সন্তানটা তোমার কাছে থাকবে না, বুড়ো বয়সে তোমার কোনো কাজে আসবে না, তবু তুমি তার দিকে তাকিয়ে প্রাণ ভরে চোখের খিদে মেটাতে পারবে। অন্তত তোমার মনকে সান্ত্বনা দিতে পারবে দুনিয়াতে তোমার একটা পুত্রসন্তান আছে। দুনিয়ার আর দশটা ছেলেকে শুধু চোখেই দেখা যায়, কিন্তু ঈশ্বরের সেবায় উৎসর্গ করা একটা ছেলে, যার কাছে পুজো দেবার জন্য দূর দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে, তার কোনো তুলনা হয় না”।

সে কারণে মা প্রায়ই মন্দিরে আসতেন পুজো দিতে। বাবা আসতেন শুধু পূর্নিমা কিংবা উপবাসের দিনগুলোতে। হয়তো আমার জন্মের সময় মায়ের ওপর দিয়ে যা গেছে সেটা তিনি স্মরণ করেন সবসময়, সে কারণেই এখানে আসা তাঁর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

সেই আমি এখন বিশ বছরের যুবক, তাঁর সেই দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল।

একদম প্রথম পর্বের ঘটনা আমার মনে থাকার কথা না। শুনেছি জন্মের চল্লিশ দিন পর ঈশ্বরের কাছে দেওয়া পূর্বপ্রস্তুতি মোতাবেক মা আমাকে একটা গেরুয়া কাপড়ে মুড়িয়ে মন্দিরে রেখে দিলেন। আমি ভাবি মা আমাকে যখন শিবের পায়ের কাছে ঠাণ্ডা পাথরের ওপর রাখলেন, তখন আমি কতটা কান্না করেছিলাম। মা আমাকে যে গেরুয়া কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে রেখে গিয়েছিলেন, সেটা এখনো আমার কাছে আছে।

মন্দিরের প্রধান পুরোহিত, মোহান্ত কার্পা সাগর, শিবমূর্তির পায়ের কাছে থাকা আমার কপালটা স্পর্শ করলেন। তারপর আমাকে মায়ের কোলে তুলে দিয়ে বললেন, "এখন থেকে এই শিশুটা শিবের সন্তান। তার মা পার্বতী। আপনি শুধু তার দুধমা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এক বছর ধরে আপনি দুধ মায়ের ভূমিকা পালন শেষে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেবেন।"

অতঃপর এক বছরের জন্য আমাকে আমার মায়ের কাছে ধার দেওয়া হলো। আমি জানি না সেই এক বছরে আমি আমার মাকে ‘মা’ কিংবা অন্য কোনো সম্বোধন করেছিলাম না। সম্ভবত করিনি। কারণ আমার মুখে তাঁকে ডাকার মতো পরিচিত কিছু মনে পড়ে না।

আমি প্রায়ই কল্পনা করি গেরুয়া কাপড় মোড়ানো আমি প্রথম জন্মদিনে হামাগুড়ি দিয়ে মন্দিরের দেবদেবীর মূর্তির কাছে রাখা ফুলগুলোর দিকে এগিয়ে গেলাম এবং একটা ফুল তুলে মুখে দিলাম। কিন্তু বিস্বাদ লাগার ফলে আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলাম। মন্দিরের বুড়ো পুজারী সাইমঙ্গত রাম আমাকে বলেছিল আমার গলায় ফুলের পাপড়ি আটকে দমবন্ধ হবার যোগাড় হয়েছিল একবার। সে আঙুল ঢুকিয়ে আমার গলা থেকে ফুলের পাপড়ি বের করেছিল। তারপর আমাকে শান্ত করার জন্য একটা বাটিতে দুধ নিয়ে তাতে চিনি মিশিয়ে দেবমূর্তির সামনে পুজোর অর্ঘ্য হিসেবে রেখে আমাকে খেতে দিয়েছিল।

হয়তো আমি দিনের পর দিন আমার চারপাশে থাকা লোকদের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছি। দেখেছি সাইমঙ্গত রামের মুখ, দেখেছি গোবিন্দ সাধুর মুখ, দেখেছি মোহান্ত কার্পা সাগরের মুখ, দেখেছি শিব এবং পার্বতীর মুখ। সেই সাথে মন্দিরে পুজো দিতে আসা অসংখ্য ভক্তের মুখ। আসলে আমার কিছুই মনে নেই। আমার কাছে শুরু থেকেই সবগুলো মুখ দেখতে একইরকম।

মন্দিরের ভেতর একটা গুহা আছে। লোকে বলে এই গুহার মুখটা কাংরা উপত্যকায় গিয়ে শেষ হয়েছে। ঠিক যেখানে কৈলাস পর্বতের চুড়া সেখানে। কিন্তু এই গুহা দিয়ে কেউ অতটা পথ পাড়ি দেয়নি। যদি কেউ গিয়েও থাকে সেটা বহুযুগ আগের কথা। এটা শত শত মাইল দূরের পথ। কিন্তু এই সবই শোনাকথা। সবাই শুধু গল্পের এই অংশটুকুই দেখে, গুহার প্রবেশমুখটা। গুহার শেষ মাথা সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। আমি জানি আমিও কোনোদিন জানতে পারবো না। তবে এটা মনে হয় আমি যদি এই দীর্ঘ গুহাপথ দিয়ে প্রতিদিন কয়েক মাইল করে এগিয়ে যাই, আমি কোথাও গিয়ে পৌঁছাবো না। আমি শুধু যেতেই থাকবো। গুহার গোলাকার মুখটা অন্ধকার। যতই গভীরে যাবো অন্ধকার ততই গভীর হতে থাকবে।

'মা' শব্দটা আমি শুধু আমার গল্পের খাতিরে বললাম। ওই শব্দের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিদিন যে শত শত মহিলা মন্দিরে আসে, তিনি তাদের মধ্যে সাধারণ এক নারী মাত্র। তার সাথে আমার আবেগ অনুভূতির সম্পর্ক 'ওই মহিলা' পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। তাই আমি তাকে 'মা' না বলে 'ওই মহিলা' হিসেবে ডাকবো। মা শব্দটা আমার জন্য একটা নির্দয় কৌতুক। এটা যেমন আমার জন্য সত্যি, তেমনি তার ক্ষেত্রেও সত্যি। তার অবস্থা বেচারী পার্বতীর মতোই।

আমি প্রায়ই মন্দিরে আমার ঘুমানোর জায়গা থেকে উঠে যেখানে শিব এবং পার্বতীর বড় বড় মূর্তি দুটো রাখা আছে সেখানে ঘুরে বেড়াই । আমার কাছে তাদের দুজনকে দেখে মনে হয় একজন বয়স্ক কৃষক ও তার মধ্যবয়স্ক স্ত্রী হাত জোড় করে প্রার্থনা করছে একটা পুত্র সন্তানের জন্য। যেমনটি আমার বাবা এবং মা প্রার্থনা করেছিলেন তাদের যেন একটা পুত্র সন্তান দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়।

আমি দুজনের মূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়াই এবং মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করি- 'তোমরা কী একটা পুত্র সন্তান চাও? তুমি চাও, তুমি? ঠিক আছে, আমি আজ থেকে আমি নিজেকে তোমাদের পুত্র হিসেবে ঘোষণা করলাম’।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ