এলি স্মিথের গল্প: ছোট গল্প আসলে কেমন?




অনুবাদ: মৌসুমী বিলকিস


আমার পাশের টেবিলে দুজন। একজন তরুণ, আরেকজন প্রবীণ। দেখে বাবা-ছেলে মনে হলেও তাঁদের বোঝাপড়ায় বাবা-ছেলের চেনা ছকের শীতল সংযম বা প্রচ্ছন্ন রাগ কোনটাই নেই। হয়তো এই দৃশ্যটা বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পরিণতি, এক কাপ কফি পানের মধ্যবর্তী সময়ে ছেলের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে ওই প্রবীণ বাবা হওয়ার চেষ্টা করছেন আর বাবার উপস্থিতিতে ছেলে চেষ্টা করছে পূর্ণবয়স্ক হওয়ার। সম্ভবত ঠিক ভাবছি না। বরং এরকমও হতে পারে, বয়স্কজন গ্রীষ্মকালীন সপ্তাহান্তগুলিতে বিচ্ছেদ হওয়া পরিবারটির ছোট্ট বাচ্চাটির জন্য পারিবারিক বন্ধুর ভূমিকা পালন করতেন। তিনি জানতেন তাঁর দায়িত্ব, আর এখন দেখুন, ছেলেটি বড় হয়ে গেছে, তিনি হয়েছেন প্রবীণ, এবং এই দুজনের মধ্যে একটা অনুচ্চারিত বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে, ইত্যাদি।

আমি তাঁদের বিষয়ে কল্পনা করা বন্ধ করলাম। মনে হচ্ছে আমার ভাবনা ভুলই হবে। বরং আমি তাঁদের কথোপকথনে মন দিলাম। তাঁরা সাহিত্য নিয়ে কথা বলছেন, তাঁদের কথোপকথন আমাকে বেশ আগ্রহী করে তুললো, যদিও এরকম আলোচনা শুনতে অনেকেই আগ্রহী নয়। উপন্যাস ও ছোটগল্পের পার্থক্য নিয়ে কথা বলছে তরুণ। উপন্যাস, তাঁর মতে, থলথলে বয়স্ক গণিকা।

‘থলথলে বয়স্ক গণিকা!’, প্রবীণের চোখে কৌতুক।

‘একটু বেশিই ব্যবহৃত, ঘরোয়া, উষ্ণ এবং সুপরিচিত’, তরুণ বলে, ‘আসলেই বহু ব্যবহারে জীর্ণ, একটু বেশিই ঢিলেঢালা আর শিথিল।’

‘ঢিলেঢালা আর শিথিল!’, হাসেন প্রবীণ।

‘অন্যদিকে, তুলনায়, ছোটগল্প চটুল এক দেবী, এক ছিপছিপে অপ্সরা। খুব কম লেখক ছোটগল্পের দক্ষ শিল্পী হতে পেরেছেন বলেই ছোটগল্প এখনও যথেষ্ট তন্বী হয়ে আছে।’

‘যথেষ্ট তন্বী!’, প্রবীণ ঠোঁট প্রসারিত করে হাসেন।

এতটাও বয়স্ক নন তিনি যে যৌবনের কথা মনে করতে পারবেন না, খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন ঠিক এইভাবে কথা বলা কিছুটা লজ্জার বলে বিবেচিত হত। অলস ভঙ্গীতে ভাবছিলাম আমার সংগৃহীত বইগুলোর মধ্যে কতগুলো বিছানায় সহজলভ্য হতে পারে, আর কতগুলোই বা যৌন ক্রিয়ায় পারদর্শী হতে পারে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিই, বন্ধুকে কল করার জন্য মোবাইল বের করি, যে বন্ধুর সঙ্গে সাধারণত শুক্রবার সকালে এই ক্যাফেতে আসি।

আমার এই বন্ধু ছোটগল্প বিষয়টা গুলে খেয়েছে। জীবনের অনেকটা সময় সে ব্যয় করেছে ছোটগল্প পড়তে, ছোটগল্পের ওপর লিখতে, ছোটগল্প লেখার টেকনিক শেখাতে, এমনকি কখনও কখনও ছোটগল্প লিখতেও। সে এত ছোটগল্প পড়েছে যে সেসব গল্পের অস্তিত্ব অনেকের ধারণার বাইরে, বা সেগুলির বিষয়ে জানার আগ্রহও নেই অনেকের। আমার মনে হয় এটাকে বলা যায় ছোটগল্পের সঙ্গে তার আজীবন আসক্তির প্রকাশ। যদিও তার এমন কিছু বয়স নয়, সেই সকালে সে তিরিশের শেষের কোঠায়। এটাকে বলা যায় এক ধরণের ‘এখন পর্যন্ত তার জীবনের ভালবাসা’। কিন্তু সারা পৃথিবী জুড়ে যারা ছোটগল্প লিখেছেন বা এখনও লিখছেন তাঁদের সম্পর্কে তার জ্ঞান এত গভীর যে এরকম মানুষ আমার চেনা জানার মধ্যে নেই।

কয়েক বছর আগের ওই শুক্রবারটিতে আমার এই বন্ধু হসপিটালে ভর্তি। কারণ কেমোথেরাপি সেশন তার প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সাদা রক্তকণিকা ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং আক্কেল দাঁত সংক্রামিত হয়েছিল।

হাসপাতালের ফোন সিস্টেমের যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর নিজের সম্পর্কে নানান কিছু বলে চললো, সেসব শুনলাম, তারপর রোবটের মতো আমাকে আমারই ফোন নম্বর শোনালো, আমার বন্ধু কাসিয়ার নাম ভুল উচ্চারণ করলো, তারপর জানালো এইসব শোনার জন্য আমার কত চার্জ কাটা হচ্ছে, তারপর জানালো আমার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার জন্য প্রতি মিনিটে কত টাকা গুণতে হবে। তারপর ফোনের সংযোগ দিল।

‘হাই, আমি বলছি।’

‘তুমি কি মোবাইল থেকে কল করছো?’, বন্ধু জানতে চাইলো। ‘কেটে দাও এলি, এদের কল সিস্টেম খুবই খরচ সাপেক্ষ। আমি তোমাকে রিং ব্যাক করছি।’

‘এ নিয়ে ভেবো না’, আমি বলি, ‘ঝটপট বলে নিচ্ছি। ছোটগল্প মানে কী দেবী আর অপ্সরা, আর উপন্যাস মানে পড়ন্ত বেলার পতিতা?’

‘এর মানে কী!’

‘এক পড়ন্ত বেলার পতিতা, কিছুটা ডিকেন্সীয় ধরণের হয়তো’, আমি বলি, ‘যেমন বই-এ আছে সেই পতিতার কথা যে ডেভিড নিভেনকে যৌনক্রিয়া কীভাবে করতে হয় শিখিয়েছিলেন।’

‘ডেভিড নিভেন?’

‘জানোই তো, ‘The Moon's a Balloon’ বইটিতে আছে তিনি এক যৌনকর্মীর কাছে যান, তখন তাঁর বয়স চৌদ্দর কোঠায় হবে, আর যৌনকর্মী ছিলেন খুবই মধুর স্বভাবের, আর তাঁর কাছেই তাঁর যৌনশিক্ষা শুরু, আর তিনি তাঁর কুমারত্ব বিসর্জন দেন, আর তিনি মোজা পরে ছিলেন, অথবা সেই যৌনকর্মী মোজা পরে ছিলেন, আমার ঠিক মনে নেই। যাই হোক, সেই যৌনকর্মী তাঁর সঙ্গে খুবই মধুর ব্যবহার করেছিলেন, তারপর তিনি অনেক পরে যখন দেখা করতে যান সেই যৌনকর্মী বিগত যৌবনা এবং তখন ডেভিড পৃথিবী বিখ্যাত মুভি তারকা। সেই যৌনকর্মীর জন্য অনেক উপহার নিয়ে গিয়েছিলেন, কেননা তিনি খুবই ভাল মানুষ এবং সহৃদয়তার মূল্য দিতে জানেন। আর ছোটগল্প কি প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে তুলনীয়?’

‘ছোটগল্প প্রিন্সেস ডায়ানার মতো,’ বন্ধু বলে, ‘ঠিকই’।

বুঝলাম, ক্যাফে থেকে চলে যাওয়ার তোড়জোড় করছেন সেই দুই ব্যক্তি এবং আমাকে কৌতূহল নিয়ে দেখছেন। ফোনটা কান থেকে সরাই।

‘তোমাদের অপ্সরা তত্ত্ব বিষয়ে আমার বন্ধুর মতামত নিচ্ছি।’

একটু অবাক হয়েই তাঁরা আমাকে দেখলেন। দুজনেই একবারও পিছনে না তাকিয়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেলেন।

একটু আগেই শোনা দুজনের কথোপকথন বন্ধুকে জানাই।

‘ডায়ানার কথাই মনে এসেছিল, কারণ, আমার ধারণা, তিনি কিছুটা অপ্সরার মতো।’, আমি বলি, ‘কোনও দেবীর কথা মনে করতে পারছি না যিনি অপ্সরার মতো। যেসব দেবীর কথা মাথায় আসছে, যেমন কালী, শীলা-না-গিগ, বা অ্যাফ্রোদিতি, সে তো শক্তিরূপিণী, ওই যে হরিণ হত্যা। হরিণ মারেনি কি?’

‘ছোটগল্প কেন অপ্সরার মতো?’, কাসিয়া বলে, ‘অশ্লীল কৌতুকের মতো শোনাচ্ছে। হা!’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে’, আমি বলি, ‘তাহলে বলো, ছোটগল্প কেন অপ্সরার মতো?’

‘ভাবনার বিষয়’, সে বলে, ‘হাসপাতালের বিছানায় বসে ভাবার একটা বিষয় পাওয়া গেল।’

কুড়ি বছরের বেশিই হবে আমাদের বন্ধুত্ব, শুনলে মনে হয় যেন কত বছরের বিষয়, কিন্তু আদতে পুরাতন বোধটাই আসে না। ‘দীর্ঘ’ আর ‘হ্রস্ব’ খুব আপেক্ষিক। সবথেকে দীর্ঘ ছিল হাসপাতালে কাটানো কাসিয়ার প্রতিটি দিন। ক্যানসার ওয়ার্ডে আজ তার দশমতম দী-ই-র্ঘ দিন, যেখানে তাকে অ্যান্টিবায়োটিকের ককটেল দিয়ে ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছিল এবং তার তাপমাত্রা কমার আর সাদা রক্তকণিকার সংখ্যা বাড়ার অপেক্ষা চলছিল। যখন এই দুটি ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত পরিবর্তন পৃথিবীতে ঘটবে, তখন তাকে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। অন্যদিকে, তার চারপাশের ক্যানসার ওয়ার্ডটাই বেদনাময়। দীর্ঘ দশটি দিনের পর এই নিরবচ্ছিন্ন বেদনার ভার, আপনার কাছে ‘হ্রস্ব’ মনে হতে পারে যদি আপনি এবিষয়ে ভাবতে বাধ্য না হন বা পরিস্থিতি আপনাকে ভাবাতে বাধ্য না করে, কিন্তু ধরুন এবিষয়ে ভাবছেন বা পরিস্থিতি আপনাকে এসবের ভেতরে এনে ফেলেছে এবং আপনাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাহলে তা প্রায় মহাকাব্যের মতো দীর্ঘ।

সেই বিকেলে কাসিয়া আমার উত্তর-যন্ত্রে একটি ভয়েস-মেসেজ পাঠায়। তার কণ্ঠ ভেদ করে আমি শুনতে পাই হাসপাতালের ধাতব সব শব্দ আর অন্যান্য মানুষদের কথাও।

‘আচ্ছা, শোনো, 'অপ্সরা' বলতে তুমি ঠিক কী বোঝাতে চাও তার ওপর নির্ভর করছে। ফলে, বলা যেতে পারে, ছোটগল্প অপ্সরার মতো, কারণ স্যাটায়াররা সব সময় তার সঙ্গে শুতে চায়। ছোটগল্প অপ্সরার মতো, কারণ দুজনেই পাহাড়ে, বনে, ঝরনা বা নদীর কোলে, উপত্যকায় বা শীতল গুহায় থাকতে ভালোবাসে। ছোটগল্প অপ্সরার মতো কারণ তা আর্টেমিসের ভ্রমণসঙ্গী হতে ভালবাসে। এই পর্যন্ত এমন কিছু মজা হলো না, জানি, কিন্তু আমি এটা নিয়ে ভাবছি।’

ফোন রাখার শব্দ শুনলাম। ‘মেসেজ রেকর্ড হয়েছে তিনটে তেতাল্লিশ মিনিটে,’—আমার উত্তরযন্ত্র যান্ত্রিকভাবে জানাল। আমি কাসিয়াকে রিং ব্যাক করলাম, এবং সকালের মতোই শুনলাম হসপিটালের কল সিস্টেমের যান্ত্রিক কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি। আমি কিছু বলার আগে ফোন ধরেই সে বললো:

‘শোনো! শোনো! ছোটগল্প নিম্ফোম্যানিয়াক, কারণ দুজনেই যেখানে সেখানে শুয়ে পড়ে—বা একাধিক সংকলনে জায়গা করে নেয়—কিন্তু আনন্দের জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেয় না।’

হো হো করে হেসে উঠলাম।

‘ছোটগল্প বিগত যৌবনা পতিতার মতো নয়, সেটা তো উপন্যাস, হা হা,’ সেও হাসিতে ফেটে পড়ে।

‘দুপুরে বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বললেন, তুমি ট্রাউট ধরার জন্য 'nymph' ব্যবহার করতে পারো। এটা কৃত্রিম মাছিযুক্ত এক ধরনের মাছ ধরার দণ্ড। তিনি বললেন, এমন লোক আছেন যারা সব সময় নিজেদের সঙ্গে ম্যাগনিফাইং গ্লাস রাখেন, যাতে তারা আসল 'nymph'-দের দেখতে পান এবং আরও নিখুঁতভাবে কৃত্রিম মাছি-দণ্ড বানাতে পারেন।’

‘শোন,’ আমি বলি, ‘এই পৃথিবী বিস্ময়কর জিনিসে ভর্তি।’

‘জানি,’ বলে সে, ‘সংকলন-কৌতুকটা নিয়ে কী বলো?’

‘দশে ছয়।’

‘খুব খারাপ তাহলে,’ বলে সে। ‘আচ্ছা। আমি আরও ভালো করে ভাবার চেষ্টা করব।’

‘হয়তো তোমার ‘অপ্সরা-মাছি’ আমার ভাবনায় ইন্ধন যোগাবে।’ আমি বলি।

‘হা হা,’ হাসে কাসিয়া। ‘কিন্তু আমাকে আজ বিকেলের জন্য অপ্সরা ছেড়ে হারসেপটিন-এর লেজ ধরতে হবে।’

‘হা ভগবান!’ আমি বলি।

‘আমি ক্লান্ত,’ বলে সে, ‘আমরা চিঠির খসড়া লিখছি।’

‘ক্যানসারের ওষুধ কখন ক্যানসারের ওষুধ নয়?’

‘যখন মানুষ সেটা কিনতে পারে না। হা হা।’ হাসে কাসিয়া।

‘অনেক ভালোবাসা,’ আমি বলি।

‘তোমাকেও,’ সে বলে, ‘এক কাপ চা?’

‘বানাচ্ছি। শিগগির কথা হবে।’

ফোন কাটার শব্দ শুনি। ফোনটা রেখে রান্নাঘরে গিয়ে ইলেকট্রিক কেটলি চালু করি। দেখি, জল ফুটছে, বাষ্প বেরোচ্ছে কেটলির মুখ থেকে। কাপে ঢালি ফুটন্ত জল, জলে টি-ব্যাগ ডোবাই। চায়ে চুমুক দিতে দিতে দেখি, অন্য কাপটি থেকে বাষ্প উড়ছে। এটাই কাসিয়ার ‘হারসেপটিন-লেজ’-এর অর্থ।

হারসেপটিন কিছুদিন ধরে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহার হচ্ছে। আমি আর কাসিয়া যে সময় এইসব কথা বলছি সেই সময় ডাক্তাররা সদ্য আবিষ্কার করেছেন কিছু মহিলার (যারা অতিরিক্ত HER2 প্রোটিন উৎপন্ন করে) প্রাথমিক স্তরের রোগের ক্ষেত্রে ওষুধটি সত্যিই কার্যকর। সঠিক রোগীর ওপর প্রয়োগ করা হলে ওষুধটি ক্যানসার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। বিশ্বজুড়ে ডাক্তাররা বিষয়টা নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন, কারণ ওষুধটি স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় একটি মূলগত পরিবর্তন নির্দেশ করছিল।

কাসিয়ার কাছ থেকে শোনার আগে অব্দি এসব বিষয়ে কিছুই জানতাম না, এবং সেও জানত না, যতক্ষণ না ওই বছরের এপ্রিল মাসে এক ডাক্তারের খুঁজে পাওয়া একটি ‘ছোট্ট সত্য’, দুই সেন্টিমিটারেরও কম হবে, তার জীবনে এক দৈনন্দিন মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। তখন আগস্ট মাস। মে মাসে তার ডাক্তার তাকে বলেছিলেন, হারসেপটিন কতটা কার্যকর এবং কেমোথেরাপি শেষে সে এনএইচএস (ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস) -এর মাধ্যমে ওষুধটি অবশ্যই পাবে। তারপর জুলাইয়ের শেষে তার ডাক্তারের সঙ্গে পিসিটি-র একজন সদস্য দেখা করেন। পিসিটি-র অর্থ প্রাইমারি, কেয়ার এবং ট্রাস্ট, যে সংস্থাটি এনএইচএস-এর তহবিল সম্পর্কিত বিষয় দেখভাল করে। পিসিটি-র সদস্য কাসিয়ার ডাক্তারকে নির্দেশ দেন, হাসপাতালের ক্যাচমেন্ট এলাকায় আক্রান্ত মহিলাদের হারসেপটিনের কার্যকারিতার বিষয়ে কিছু না জানাতে, যতক্ষণ না নাইস (NICE) নামক একটি দল ওষুধটির খরচ-সাশ্রয়ের বিষয়ে অনুমোদন দেয়। সেই সময় তারা ভেবেছিল ওষুধটির অনুমোদন পেতে প্রায় ন’মাস বা এক বছর সময় লাগতে পারে (এই সময়সীমা আমার বন্ধু এবং আরও অনেক মহিলার জন্য খুব দেরি হয়ে যাবে)। যদিও কাসিয়া জানত, যদি সে চায়, তখনই বুপা (BUPA)-র মাধ্যমে হারসেপটিন কিনতে পারে, যার খরচ আনুমানিক সাতাশ হাজার পাউন্ড, তখনকার হিসেবে। এ ধরণের ঘটনা এখনই, আপনার কাছাকাছি কোথাও, কোনো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ওষুধের ক্ষেত্রে ঘটছে।

‘প্রাইমারি’, ‘কেয়ার’, ‘ট্রাস্ট’, ‘নাইস’।

অপ্সরার বিষয়ে একটি ছোটগল্প, বেশিরভাগ মানুষ মনে করে তারা ইতোমধ্যেই জানে (এই একই জিনিস ঘটেছিল সাহিত্যের প্রথমতম ম্যানিফেস্টোগুলোর ক্ষেত্রেও যাকে আমরা এখন অ্যানোরেক্সিয়া বলে জানি)।

ইকো একজন ওরিয়াড, যারা এক শ্রেণির পর্বত অপ্সরা। অপ্সরা এবং মেষপালকদের মধ্যে গৌরবময় বাগ্মীতার জন্য যেমন পরিচিত ছিলেন, তেমন তাঁর অপ্সরা বন্ধুদের দেবী জুনো-র ক্রোধ থেকে বাঁচাতে পারার জন্যও জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর বন্ধুরা পাহাড়ের ঢালে রোদে শরীর এলিয়ে দিতেন। তাঁদের অলসতা ধরার জন্য দেবী জুনো পাহাড়ের কোনও একদিক থেকে চলে আসতেন। ইকো নিজের প্রতিভাবলে জানতেন দেবী জুনো কখন আসবেন। অলসতা ছেড়ে অত্যন্ত ক্ষীপ্রতায় দেবীকে পথের মধ্যে থামিয়ে দিতেন গল্পে আর কথাবার্তায়। কথা আর গল্পে তিনি দেবীকে এতটাই ব্যস্ত করে ফেলতেন যে সেই অবসরে অপ্সরাসকল কাজ শুরু করতেন, এমনভাবে যেন তাঁরা কখনও রোদ পোহান না।

যখন জুনো বুঝলেন ইকো কী করেছেন, বেশ রেগেই গেলেন। অভিশাপ-আঙুল ইকোর দিকে তাক করলেন এবং তাঁর মাথায় প্রথম যে উপযুক্ত অভিশাপটি এল, সেটি ছুঁড়ে দিলেন।

‘এখন থেকে,’ জুনো বললেন, ‘তুমি শুধু সেই শব্দগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে পারবে যেগুলো অন্যদের কাছ থেকে একটু আগে শুনেছ। ঠিক তো?’

‘ঠিক তো?’ ইকো বললেন।

তাঁর চোখ বড় বড় হল। মুখ হল প্রসারিত।

‘এটাই তোমার ভাগ্য’, জুনো বললেন।

‘তোমার দুর্ভাগ্য’, ইকোর জবাব।

‘ঠিক আছে, আমি ফিরে যাচ্ছি শিকারে’, জুনো বললেন।

‘বিকারে।’ ইকো উত্তর দিলেন।

আসলে, ইকোর এই ছোট্ট দ্রোহটা আমি তৈরি করছি। ওভিডের মূল গল্পে ইকো মোটেও বিদ্রোহী নয়। নিজের ইচ্ছেমতো কথা বলা এবং বন্ধুদের বাঁচানোর দক্ষতা কেড়ে নেওয়ার পর ইকোর জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না - গল্পের দিক থেকে – শুধুই এক বালকের প্রেমে পড়া ছাড়া, বালক নিজের প্রতি ভালবাসায় এতটাই মগ্ন যে সারাদিন নিজের বাসনার প্রতিচ্ছবি দেখে কাটায়, এবং শেষপর্যন্ত ক্ষীণকায় হয়ে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যায় (তবে তার মৃত্যু হয় না, বালক থেকে সে ছোট সাদা ফুলে রূপান্তরিত হয়)।

ইকোও হয়ে ওঠেন ক্ষীণকায়। তাঁর ওজন কমে যেতে থাকে। তিনি চোখে পড়ার মতো শুকিয়ে যান, তারপর শুধুই হাড়সর্বস্ব হয়ে যান, এবং তাঁর জন্য শেষে পড়ে থাকে কুয়াশার শব্দের মতো কান্না, অবয়বহীন ভাসমান এক পিনপিনে শব্দ, অন্যদের কথা বার বার অনুকরণের যন্ত্রণা।

এখন বরং, ঠিক এর বিপ্রতীপ গল্প, বছর কুড়ি আগে কাসিয়ার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হওয়ার কথা বলা যাক।

আমি তখন কেমব্রিজে পোস্টগ্র্যাজুয়েটের শিক্ষার্থী, আর আমার গলার করুণ অবস্থা। গলা ব্যথা বা সর্দির কথা বলছি না কিন্তু, বরং বলছি একটা হায়ারার্কি সিস্টেমের সুরক্ষিত পরিবেশে মেয়েরা তখন পর্যন্তও কিছুটা অদ্ভুত বলে বিবেচিত হত এবং বছর দুয়েকের এই পরিস্থিতিতে আমার নিজস্ব স্বর হারিয়ে গিয়েছিল।

ফলে সেমিনার হলের একেবারে পিছনে বসে ঠিকমতো আর শুনছিলামও না, এবং হঠাৎই, একটি কণ্ঠস্বর শুনলাম। আমার সামনে থেকে ভেসে আসা একটি মেয়ের কণ্ঠ। সে সরাসরি বক্তা এবং সেমিনারের সভাপতিকে আমেরিকান লেখক কার্সন ম্যাককালার্স সম্পর্কে একটি প্রশ্ন করে।

‘কারণ আমার মনে হয়, ম্যাককালার্স এই আলোচনার প্রতিটি স্তরে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক,’ কণ্ঠস্বরটি বলে।

এমন স্পষ্ট কণ্ঠের অভিঘাতে বক্তা এবং সভাপতি দুজনেই একটু ধাক্কা খান। সভাপতি গলা খাঁকারি দেন।

নিজের অজান্তেই সামনের দিকে ঝুঁকে বসি। গত কয়েক বছরের মধ্যে এমনভাবে কাউকে কথা বলতে শুনিনি, এমন খুল্লামখুল্লা এবং নির্ভীক জ্ঞান ও স্পষ্টভাষিতায়। আরও একটি কারণ: সেদিন সকালেই এক স্নাতক ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলাম, যিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে কোনও শিক্ষককে খুঁজে পাচ্ছিলেন না ম্যাককালার্স সম্পর্কিত ডিজারটেশন পেপারের যিনি তত্ত্বাবধায়ক হতে পারেন। মনে হচ্ছিল যারা পড়ানোর যোগ্য তাঁরা কেউই ম্যাককালার্স পড়েননি।

‘যাই হোক, আমি বলব যে আপনি ম্যাককালার্সকে সমান উচ্চতায় বসাবেন না।’ হেনরি জেমস-পরবর্তী সাহিত্য বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়া ব্যক্তি বলেন।
‘আসলে, বিষয় হল, আমি একেবারেই একমত নই,’ সেই কণ্ঠ জানায়।

আমি জোরে হেসে উঠি। সেমিনার হলে যা একেবারেই অস্বাভাবিক; এই অসম্ভব শব্দের উৎস সন্ধানে সবাই পিছন ফিরে তাকায়। নতুন মেয়ে শান্ত স্বরে প্রশ্ন করে চলে, যেগুলোর উত্তর কেউ দেয় না। আমি মনে করতে পারি, সে উল্লেখ করেছিল ম্যাককালার্সের একটি প্রিয় প্রবচন: ‘মানবিক কোনকিছুই আমার কাছে অচেনা নয়।’

সেমিনার শেষে সেই মেয়ের পিছনে ছুটলাম। রাস্তায় থামালাম তাকে। তখন শীতকাল। সে পরেছে লাল রঙের কোট।
সে তার নাম বলল। আমি নিজেও শুনলাম, আমারই কণ্ঠ তাকে আমার নাম জানিয়ে দিচ্ছে।

ফ্রানৎস কাফকা বলছেন, ছোটগল্প পাখির সন্ধানে থাকা এক খাঁচা। (কাফকা মারা গেছেন চুরাশি বছর আগে। তবু এখনও বলতে পারি, ‘কাফকা বলছেন’। এই হল মৃত্যুর সঙ্গে শিল্পের অন্যতম বোঝাপড়া।)

ৎসভেতান তোদোরভ বলছেন, ছোটগল্পর বিশেষত্ব এর সংক্ষিপ্ততা, যা আমাদের ভুলে যাওয়ার অবসর দেয় না যে এ কেবল সাহিত্যই, বাস্তব জীবন নয়।

নাদিন গর্ডিমার বলছেন, ছোটগল্প একেবারেই বর্তমান মুহূর্তে নিবদ্ধ, যেমন অন্ধকারে অসংখ্য জোনাকি পোকার ঝলকানি।

এলিজাবেথ বোয়েন বলছেন, ছোটগল্প উপন্যাসের থেকে বিশেষ রকম ঘনীভবনের সুবিধা পায়, ফলে প্রতিটি ছোটগল্প নিজস্ব শর্তে কাহিনি বুনে চলে।

ইউডোরা ওয়েলটি বলছেন, ছোটগল্প প্রায়শই নিজের সেরা স্বার্থটি জটিলতাময় করে। এই কারণটিই ছোটগল্পকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

হেনরি জেমস বলছেন, ছোটগল্প, তার ঘনত্বের কারণে, জটিলতা এবং ধারাবাহিকতার বিষয়ে এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে।

হোর্হে লুইস বর্হেস বলছেন, ছোটগল্পই সেই ঔপন্যাসিকদের জন্য নিখুঁত রূপ যারা পনেরো পৃষ্ঠার বেশি লিখতে অলসতায় আক্রান্ত হন।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলছেন, ছোটগল্পগুলি তাদের নিজস্ব পরিবর্তন এবং গতিতে তৈরি। এমনকি যখন একটি গল্পকে গতিহীন মনে হয় এবং আপনি তার মধ্যে কোনো ক্ষীণতম চলনও দেখতে পান না, তবুও গল্পটি সম্ভবত পরিবর্তন এবং গতির মধ্যে রয়েছে, কেবল আপনি তা অনুভব করতে পারছেন না।

উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস বলছেন, ছোটগল্প, অন্ধকারে জ্বলে ওঠা একটি দেশলাই কাঠির ঝলকানি, মানুষের জীবনের সংক্ষিপ্ততা, ভাঙন এবং একইসাথে সম্পূর্ণতা বর্ণনা করার জন্য একমাত্র প্রকৃত ‘ফর্ম’।

ওয়াল্টার বেনজামিন বলছেন, ছোটগল্পগুলি বাস্তবের থেকেও শক্তিশালী, জীবন্ত মুহূর্ত। কারণ তা বাস্তবতার মুক্তি দিতে দিতে চলে, বাস্তবতার পরেও জীবন্ত রাখে মুহূর্ত, যখন বাস্তবতার মৃত্যু নিশ্চিত।

সিনথিয়া ওজিক বলছেন, ছোটগল্প এবং উপন্যাসের মধ্যে পার্থক্য- উপন্যাস তার চলনপথে পাঠককে বদলে দেয়, যদি তা সত্যিই কার্যকরী ভালো উপন্যাস হয়। কিন্তু ছোটগল্প পরী-কাহিনীর নায়কের পাওয়া জাদু-উপহার যেন – পরিপূর্ণ, শক্তিশালী। তবে সেই শক্তি হয়তো তখনো অনাবিষ্কৃত, যা হাতে নিয়ে বা পকেটে গুঁজে জঙ্গলের পথে অনিশ্চিত-রহস্যময় যাত্রায় এগিয়ে যাওয়া যায়।

গ্রেস প্যালি বলছেন, তিনি শুধুই ছোটগল্প লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কারণ শিল্প খুব দীর্ঘ এবং জীবন খুব সংক্ষিপ্ত। এবং ছোটগল্প, স্বভাবতই জীবন সম্পর্কিত, আর স্বয়ং জীবন সবসময় আলাপচারিতা এবং তর্কে উপস্থিত।

অ্যালিস মুনরো বলছেন, প্রতিটি ছোটগল্প কমপক্ষে দুটি ছোটগল্প।

ক্যাফেতে আমার পাশের টেবিলে দুজন পুরুষ ছিলেন। একজন তরুণ, একজন প্রবীণ। আমরা একই ক্যাফেতে খুব কম সময় ছিলাম, কিন্তু আমাদের গভীর মতপার্থক্য থেকে বুঝতে পেরেছিলাম এর মধ্যে একটি ছোটগল্প রয়েছে।

এই গল্পটি আমার বন্ধু কাসিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে লেখা হয়েছে, তার (এবং সকলের) অক্লান্ত ভাষাশক্তির উদযাপনে – উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একাধিক কারণের একটি হল অনেক বেশি মানুষ তাদের প্রয়োজনের সময় সেই বিশেষ ওষুধটি পেতে সক্ষম হয়েছিল।

তাহলে কখন ছোটগল্প অপ্সরার মতো?

যখন প্রতিধ্বনি উত্তর হয়ে ফিরে আসে।

***
মূলগল্প: True short story by Ali Smith

পাঠসূত্র:

ছোটগল্প আসলে কেমন?: গল্পটি ‘True Short Story’ থেকে ভাষান্তরিত। ‘The First Person and Other Stories’ (2008) গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। মূল গল্পে যেভাবে প্যারাগ্রাফ, সংলাপ ইত্যাদির প্রচলিত ভিজুয়াল ভাঙা হয়েছে তা হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি। প্রথমে হুবহু চেষ্টা করেছিলাম এবং দেখলাম ভাষান্তরের ভিজুয়াল অনেকটাই পাল্টে যাচ্ছে, ফলে পাঠকের সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

যেমন, ভাষান্তরে একটা প্যারাগ্রাফের শেষ বাক্যটি হয়তো পাতার একেবারে ডানদিকের শেষ অব্দি বিস্তৃত হয়েছে। ফলে পরের প্যারাগ্রাফের আগে যদি স্পেস না ছাড়ি তবে দুটো মিলে একটাই প্যারাগ্রাফ বলে মনে হচ্ছে। আবার যদি দুই প্যারাগ্রাফের মাঝে স্পেস না ছেড়ে পরের প্যারাগ্রাফের শুরুর লাইনের আগে পাতার বাঁ দিকে কিছুটা স্পেস ছেড়ে শুরু করি তাহলেও দেখতে মোটেও ভাল লাগছে না।

মূল গল্পে সংলাপ একেবারে মুক্ত করে রেখেছেন এলি স্মিথ। আমি ঊর্দ্ধ কমার মধ্যে রেখেছি। ফলে সব মিলিয়ে মূল এবং ভাষান্তরের কিছু ফারাক রয়েই গেল।

অপ্সরা: মূল গল্পে ‘nymph’ শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে। nymph প্রাচীন গ্রীক লোককথার প্রকৃতি দেবী যারা সবসময়ই অবিবাহিত এবং আকর্ষণীয় সুন্দরী। এই ধারণার সঙ্গে ভারতীয় অপ্সরাদের প্রভূত সাদৃশ্য থাকায় অনুবাদে এই শব্দটিই ব্যবহার করেছি।

ডেভিড নিভেন: তিনি হলিউড ক্লাসিক ফিল্মের অন্যতম অভিনেতা। সেরা অভিনেতা হিসেবে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পান ‘Separate Tables’ ফিল্মের জন্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য ফিল্ম ‘The Bishop's Wife’, ‘Around the World in 80 Days’, ‘The Pink Panther’, ‘Casino Royale’ ইত্যাদি। তাঁর শৈশবের স্মৃতিকথা ‘The Moon's a Balloon’-এর প্রসঙ্গ এসেছে গল্পটিতে। এই স্মৃতিকথার সিক্যুয়েল ‘Bring on the Empty Horses’।

শীলা-না-গিগ: অনেক গবেষক মনে করেন ইনি খ্রিস্টপূর্ব সময়ের লোকদেবী। এখন পর্যন্ত এই দেবীর ভাস্কর্য, ম্যুরাল বা মোটিফ পাওয়া গেছে। পুরনো অনেক ইউরোপিয়ান স্থাপত্য, দুর্গ বা গির্জায় এই দেবীর অবয়ব স্থাপত্যশিল্পের অঙ্গ। আয়ারল্যান্ড, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন ইত্যাদি দেশেও ভাস্কর্য মিলেছে। অতিরিক্ত বড় যোনি ভাস্কর্যগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ভারতীয় ‘লজ্জা গৌরি’ দেবীর সঙ্গে অনেক মিল আছে। তা ছাড়াও সারা পৃথিবী জুড়েই একই ধরণের আরও অনেক প্রাচীন ফিগার-মোটিফ পাওয়া যায় যারা মানব সভ্যতার অতিরিক্ত ‘সভ্য’ হওয়ার চাপে বা কোনও ক্ষমতাশালী ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বা হারিয়ে গেছে।

Nymph: এক ধরণের মাছি যার লার্ভা মাছ ধরার জন্য ব্যবহৃত হয় (fishing fly)। এই মাছির লার্ভা নকল করে একটা দণ্ডে জুড়ে মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করা হয়।

Catchment area: হাসপাতালের চারপাশের এলাকা সাধারণত যেখান থেকে রোগীরা নির্দিষ্ট হাসপাতালে পরিষেবা নিতে আসে। গল্পে স্তন ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের হারসেপটিন ওষুধটি পাওয়ার বিষয়ে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার কথা এসেছে।

BUPA: আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা British United Provident Association। প্রধানত স্বাস্থ্যবীমা, স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা, এবং হাসপাতালের পরিষেবা বিষয়ে কাজ করে। যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যসেবার বিষয় দেখভাল করে। সাধারণত ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবীমার জন্য সংস্থাটি পরিচিত। এই সংস্থার মাধ্যমে ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যরা নির্দিষ্ট খরচের বিনিময়ে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পেতে পারে। এই গল্পে কাসিয়ার হারসেপটিন ওষুধটি কেনার প্রসঙ্গে বুপা-র প্রসঙ্গ এসেছে।

ইকো: প্রাচীন রোমান কবি অভিডের প্রধান সৃষ্টি ‘মেটামরফোসিস’ কাহিনি-কাব্যে ইকোর কাহিনিও আছে। জুনোর অভিশাপের পর ইকোর শরীর ক্ষীণতর হতে হতে হারিয়ে যায়। পড়ে থাকে তাঁর কন্ঠ। আজও পাহাড়ে পাহাড়ে তাঁর দেহহীন কন্ঠ ঘুরে বেড়ায়।

পাহাড়ে গেলে অবশ্যই পরীক্ষা করে দেখবেন আপনার কথার প্রতিধ্বনি ফিরে আসছে কিনা। যদি আসে তাহলে জানবেন তিনিই ইকো, আপনার আশেপাশেই আছেন।

যা হোক, গল্পটিতে যে বালকের কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ ইকো যার প্রেমে পড়েছেন সে নার্সিসাস। সে আবার জলে প্রতিফলিত নিজের ছায়ার প্রেমে এতই মগ্ন যে জীবনের সবকিছু, এমনকি খাওয়া দাওয়া ছেড়ে শুধু নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রুগ্ন হয়ে ফুলে পরিণত হয়। এই ফুলের নামও নার্সিসাস। এই ফুলও জলের ওপর ঝুঁকে পড়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। একইভাবে ইকোর শরীরও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এই বিষয়টিকে আধুনিক অ্যানোরেক্সিয়া নেরভোসা রোগের প্রাচীন সাহিত্যিক উদাহরণ বলে গল্পটিতে জানিয়েছেন লেখক।

অন্যদিকে কেম্ব্রিজের হায়রারকি সিস্টেমে লেখকের নিজস্ব কন্ঠ হারিয়ে যাওয়া যেন ইকোর জীবনেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারতো। কিন্তু কাসিয়ার কন্ঠ বাঁচিয়ে দেয়। এই গল্পের ইকোও ছোট্ট করে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করেন।

Hunt, Cunt, Sorted, Sordid: এই শব্দগুলো লেখক যেভাবে ব্যবহার করেছেন ভাষান্তরে হয়তো একই বিষয় হবে না, তবে, আমার বিশ্বাস ইকোর বিদ্রোহটা বোঝা যাবে। মূল গল্পে আছে-

That’s you sorted, Juno said.

You sordid, Echo said.

Right. I’m off back to the hunt, Juno said.

The cunt, Echo said.

ভাষান্তরে-

‘এটাই তোমার ভাগ্য’, জুনো বললেন।

‘তোমার দুর্ভাগ্য’, ইকোর জবাব।

‘ঠিক আছে, আমি ফিরে যাচ্ছি শিকারে’, জুনো বললেন।

‘বিকারে।’ ইকো উত্তর দিলেন।

কার্সন ম্যাককালার্স: প্রখ্যাত আমেরিকান লেখক। তাঁর কিছু গ্রন্থ ‘The Heart Is a Lonely Hunter’, ‘Reflections in a Golden Eye’, ‘The Member of the Wedding’, ‘Ballad of the Sad Café’ ইত্য্যাদি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে মেয়ে লেখক বা লেখক হিসেবে তিনি কতটা ব্রাত্য এবং অপ্রধান হিসেবে বিবেচিত হতেন তা এই গল্পে উঠে এসেছে।

হেনরি জেমস: ব্রিটিশ-আমেরিকান লেখক। ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সাহিত্য সমালোচক। তাঁর লেখা আধুনিক সাহিত্যের ভিত দৃঢ় করেছিল বলে মনে করা হয়। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘The Portrait of a Lady’, ‘The Ambassadors’, ‘The Wings of the Dove’, ‘The Golden Bowl’ ইত্যাদি।

ৎসভেতান তোদোরভ (Tzvetan Todorov): সাহিত্যতাত্ত্বিক, দার্শনিক, ইতিহাসবিদ। ফরাসিতে লিখেছেন, যদিও তাঁর মাতৃভাষা বুলগেরিয়ান। সাহিত্যের বর্ণনামূলক কাঠামো বিশ্লেষণে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যের ন্যারেটিভ স্ট্রাকচার বিষয়ে লিখলেও তাঁর তত্ত্ব সিনেমার এবং যে কোনও দৃশ্য মাধ্যমের ন্যারেটিভেও প্রয়োগ করা হয়।

যৌনগল্প বিশ্লেষণে তাঁর কাজ ‘The Fantastic: A Structural Approach to a Literary Genre’ রসিক মহলে আদৃত হয়েছে। তিনি অনেক বই লিখেছেন। তার মধ্যে কয়েকটি ‘The Conquest of America: The Question of the Other’, ‘Facing the Extreme: Moral Life in the Concentration Camps’, ‘On Human Diversity’ ইত্যাদি।

অনুবাদক পরিচিতি: মৌসুমী বিলকিস। কবি, গল্পকার, অনুবাদক ও চলচ্চিত্র পরিচালক। জন্ম ৭ আগস্ট, ১৯৭৭, কলকাতা থেকে প্রায় দুশ কিমি দূরে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ইন্দো-ইতালীয় ফিল্ম স্কুল রূপকলা কেন্দ্র থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে পোস্ট-গ্রাজুয়েট।

প্রকাশিত বই: এবং আমার চুলগুলি ফণা তুলছে (কবিতা, ২০১৮), একাকী কয়েকটি জীবন ও অন্যান্য (গল্পগ্রন্থ, ২০১৭), হলদে শাড়িটি ও অন্যান্য অণুগল্প (২০১৮)

উপন্যাস: একা এবং এক রাত্রি (সাহিত্য ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এবং অগ্রন্থিত)

পরিচালিত চলচ্চিত্র: কবি (তথ্যচিত্র, ২০০৪), শবনম (শর্ট ফিকশন, ২০০৪), আবাদ (ডকু-ফিকশন, ২০০৭), Voix de Femmes Indiennes (যুগ্ম পরিচালনা, ডকু-ফিকশন, ২০১৮) ইত্যাদি।

নির্মীয়মাণ চলচ্চিত্র: Walking Through The Fire (তথ্যচিত্র), Bach in the Afternoon (শর্ট ফিকশন), Sound Of Cosmic Self (তথ্যচিত্র) ইত্যাদি।

সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ-সহ অনেক প্রথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে। চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে প্রায়শই তার লেখা প্রকাশিত হয় কলকাতার বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা, লিটিল ও ডিজিটাল ম্যাগাজিনে।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ