অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত
ছোটখাটো ভদ্রমহিলা। স্বাভাবিকভাবেই শরীরে বক্ররেখার বাহুল্য বোঝা যায় না। তবুও নিজেকে আবৃত রাখার ব্যাপারে রীতিমত সচেতন। একই পোশাকে রোজ দেখি, রঙচটা হলদে রঙের পদার্থের পোশাক – খাকিও বলা যায়। ওই রঙেরই কয়েকটি বোতাম পোশাক থেকে আলগাভাবে ঝোলে। টুপি কোনও দিনই পরতে দেখিনি। সোনালি কিন্তু মলিন কেশ, তবে মসৃণ, অবিন্যস্ত নয়, কিন্তু একটু ঢিলে করেই বাঁধা। আঁটসাঁট করে পোশাক পরলেও বেশ চটপটে আর সাবলীল। তবে বলতেই হবে, নিজেকে সাবলীল দেখানোর জন্য একটু বেশিই তৎপর। কোমরে হাত রেখে বিস্ময়কর দ্রুততার সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানোটি ওঁর খুবই পছন্দের ভঙ্গি। ওঁকে নিয়ে যে ধারণাটি আমার মনে গেঁথে গিয়েছে সেটি হল যে ওঁর হাতের মত আরও একটি হাত আমি আগে কখনও যেটির আঙ্গুলগুলি একে অপরের থেকে এতটাই স্পষ্টভাবে বিভক্ত। কিন্তু ওঁর হাতদুটি পুরোপুরিই স্বাভাবিক। শারীরবৃত্তীয় কোনও ত্রুটি আছে বলা যাবে না।
এখন ব্যাপার এই রকম যে এই ছোটখাটো মহিলা আমার ওপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। প্রতি মুহূর্তেই উনি আমার কোনও না কোনও দোষ খুঁজে বের করবেন। আমি নাকি সর্বদাই ওঁকে রাগিয়ে দিই, কারণে অকারণে ওঁকে বিরক্ত করি। জীবনকে যদি ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নেওয়া যায়, আর প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশকে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই ওঁর কাছে নিশ্চিতভাবে বিরক্তিকর। কী কারণে ওঁর বিরক্তির উদ্রেক ঘটাই, প্রায়ই ভাবি আমি! এমন তো হতেই পারে – ওঁর সৌন্দর্যবোধ, ন্যায়বোধ, অভ্যেস, রুচি, প্রত্যাশা – প্রতিটি ব্যাপারেই আমি বেমানান। এই ধরণের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু কেন উনি আমাকে সহ্যই করতে পারেন না? আমাদের মধ্যে এমন কোনও সম্পর্কই নেই যার জন্য ওঁকে বাধ্যতামূলকভাবে আমার জন্য কষ্ট সহ্য করতে হবে! সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ হিসেবে উনি আমাকে এড়িয়ে যেতেই পারেন। কথাটা তো সত্যি! আমাকে এড়িয়ে গেলে অবশ্যই কোনও প্রতিবাদ করব না, বরং খুশিই হব! কেবল আমার অস্তিত্বকে অগ্রাহ্য করার মত মনকে তৈরি করে নিতে হবে। তাছাড়া নিজের অস্তিত্বটি আমি গায়ের জোরে ওঁর ওপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টাও করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। তাহলে তো ওঁর কষ্ট সহ্য করার কারণটিও আর থাকবে না। নিজেকে নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র চিন্তিত নই। ওঁর আচরণ অবশ্যই আমার অশান্তির কারণ, কিন্তু সেটি নিয়েও আমি চিন্তিত নই। ব্যাপারটিকে আমি গুরুত্বই দিচ্ছি না, কারণ বুঝতেই পারছি, ওঁর যন্ত্রণার তীব্রতার তুলনায় আমার অশান্তি নিতান্তই তুচ্ছ। তা সত্ত্বেও আমি ভাল করেই জানি যে কষ্ট সহ্য করার বিলাস ওঁর নেই। আমাকে শোধরানোর বাসনাও ওঁর নেই। এমনও নয় যে ওঁর আবিষ্কার করা দোষগুলি না শোধরাতে পারলে আমি অসুবিধায় পড়ে যাব। আমার সুবিধে অসুবিধে নিয়ে ওঁর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়েই উনি চিন্তিত, অর্থাৎ আমার জন্য যে নির্যাতন ওঁকে সইতে হল তার প্রতিশোধ নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এই নির্যাতনের নিবারণ করা। বারংবার এই বিড়ম্বনার সম্মুখীন হওয়ার হাত থেকে কীভাবে রেহাই পেতে পারেন সেই ব্যাপারে আমি একবার ওঁকে সদুপদেশ দেবার চেষ্টা করেছিলাম। কেবলমাত্র এটুকুতেই ওঁর যে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া হল, সেটা দেখে দ্বিতীয়বার আর এই চেষ্টা করবই না।
তাছাড়া আপনাদের যদি মনে হয় ভদ্রমহিলার বিরক্তিজনিত শারীরিক পীড়ার জন্য আমার ওপরেও কিছুটা দায়িত্ব বর্তায়, তাহলে নাহয় সেটা আমি মেনেই নিলাম। তবে একটি কথা আমাকে বলতেই হবে যে উনি প্রায় সম্পূর্ণভাবেই আমার অপরিচিত, এবং আমার কারণে অথবা বলা ভাল আমাকে দেখলেই ওঁর বিরক্তির উদ্রেক হওয়ার কারণে আমি পুরোপুরি উদাসীন, সেটিও সত্য নয়। উনি যে শারীরিকভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, সেটি তো নিজের চোখেই দেখছি। ফলে ব্যাপারটি লঘুভাবে উড়িয়ে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মাঝে মাঝেই আমি খবর পাই – ইদানিং বেশ ঘন ঘনই পাই – সকালের দিকে আবার নাকি ওঁকে ফ্যাঁকাসে দেখায়, চোখদুটি ঢুলু ঢুলু। মাথার যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছেন বলে মনে হয়। কাজ করা নাকি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ওঁর আত্মীয়স্বজনরা এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন। ওঁর শারীরিক এবং মানসিক পীড়ার কারণ খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কিছুই আবিষ্কার করে উঠতে পারেননি। একমাত্র আমিই এর কারণ সম্ভন্ধে ওয়াকিবহাল। সেই পুরনো কিন্তু পুনরাবৃত্তিমূলক হয়রানি! তবে এটাও সত্যি যে আমি ওঁর আত্মীয়স্বজনদের মত উদ্বিগ্ন নই। উনি যথেষ্ট দৃঢ়, যথেষ্ট একগুঁয়ে। কেউ যদি নিজেকে এতটাই হয়রান হতে হচ্ছে বলে মনে করেন তাহলে হয়রানির পরিণাম থেকে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতাও রাখেন। আমার তো সন্দেহই হয় – অন্তত কিছু মাত্রায় – উনি হয়রান হবার ভান করেন – যাতে সকলের সন্দেহই আমার দিকে ঘুরে যায়। নিছক আমার অস্তিত্বের জন্যই এত হয়রানি, এই কথা খোলাখুলি বলতে ওঁর মানে লাগে। ওঁর বিশ্বাস, সকলের কাছে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করলে ওঁর মর্যাদা হানি ঘটবে। কেবল মাত্র আমার প্রতি ঘৃণা – অন্তহীন ঘৃণা – ওঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। ক্রমশ আমার প্রতি বৈরিভাবাপন্ন হয়ে উঠেছেন। তার ওপরে আবার এরকম একটি নোংরা ব্যাপার নিয়ে জনসমক্ষে অসন্তোষ ব্যক্ত করলে ওঁরই মর্যাদাহানি হবে সেই ব্যাপারে উনি অবগত আছেন। অপর দিকে নীরবে যন্ত্রণা সহ্য করে যাওয়ার পাত্রীও উনি নন। অতএব উনি মাঝামাঝি একটি রাস্তা বেছে নিয়েছেন। মুখ ফুটে একটিও অভিযোগ করবেন না, তবে ইশারায় ইঙ্গিতে গোপন করে রাখা অভিযোগগুলি সর্বজনীন করে দেবেন। মনে মনে হয়ত ভাবেন যে একবার যদি সাধারণ মানুষ কঠিন চোখে আমার দিকে তাকায়, তাহলেই আমার প্রতি সর্বজনীন অসন্তোষ তৈরি হবে। ফলে সর্বশক্তিমান সমাজের আদালতে আমার অপরাধের বিচার অনেক কঠোরতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে। এই ব্যাপারে ওঁর নিজস্ব ক্ষমতা সীমিত। তাই সমষ্টির হাতে ফয়সালার ভার তুলে দিয়ে উনিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আমাকে অগ্রাহ্য করতে পারবেন। বাস্তবিকই যদি মনে মনে উনি এই আশাই পোষণ করে থাকেন, তাহলে উনি নিজেই নিজেকে ধোঁকা দিচ্ছেন। সমাজ মোটেই ওঁর ভূমিকা নিজেদের হাতে তুলে নেবে না। আমার ওপর কড়া নজর রাখলেও সমাজ আমার বিরুদ্ধে অন্তহীন অভিযোগ খুঁজে পাবে না। উনি যেরকম ভাবেন আমি ততটা অপদার্থ নই। বড়াই করার কোনও ইচ্ছেই নেই, বিশেষত বর্তমান প্রেক্ষাপটে। তবু যদি ধরেই নেওয়া হয় যে নির্দিষ্ট উপযোগিতার মাপকাঠিতে আমাকে অন্যদের থেকে আলাদা করা যায় না, কিন্তু বিপরীতার্থক মানদণ্ডেও যে দৃষ্টি-আকর্ষণকারী হই না সেটি বলাই বাহুল্য। কেবল ওঁরই কাছে, একমাত্র ওঁর ছিদ্রান্বেষী দৃষ্টিতে, আমি এইভাবে চিহ্নিত হয়ে যাই। শত চেষ্টা করেও উনি অন্য কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবেন না। তাহলে কি এই দিক থেকে আমি যথেষ্ট নিশ্চিন্ত হতে পারি? না, আসলে পারি না। আমার আচরণের জন্যই উনি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এরকম একটি অপবাদ ছড়িয়ে পড়তেই পারে। তাছাড়া কিছু খোচড় তো থাকেই – পরনিন্দা পরচর্চায় অতিউৎসাহী – ওরা মহিলার ফন্দি ধরে ফেলেছে, অন্তত ধরে ফেলেছে এরকম একটা ভান করে। ফলে বিশ্বসংসার কৌতুহল দেখিয়ে এসে জানতে চাইতেই পারে যে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আমি বেচারি ভদ্রমহিলাকে জ্বালাতন করি, বা কেন আমি নিজেকে শুধরে নিচ্ছি না, বা আমি কি জ্বালাতন করে ওই মহিলাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে চাই! অথবা ওঁকে জ্বালাতন করার বদভ্যেসটি বন্ধ করবার সুবুদ্ধি করে হবে! আমার কৈফিয়ত চাইতেই পারে! তবে জবাব দেওয়াটা বেশ শক্ত। ওঁর অসুস্থতার লক্ষণগুলি যে আমার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না সেটা বলে দিতে হবে নাকি? অর্থাৎ মানুষের মনে অপ্রীতিকর ধারণা তৈরি হতে দেওয়া যে ওদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেকে অপরাধবোধ মুক্ত করছি – সেটাও আবার চূড়ান্ত অভদ্রতার সঙ্গে! নাকি খোলাখুলি বলেই দেব উনি যে অসুস্থ এই কথা আমি বিশ্বাসই করি না, উনি সম্পূর্ণ অচেনা একজন ভদ্রমহিলা, তাই ওঁর জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতি আমার নেই, আর ওঁর আর আমার মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই, সবটুকুই ওঁর মনগড়া! ওরা আমাকে একেবারেই বিশ্বাস করবে না সেই কথা বলছি না, বরং বলতে চাইছি যে ওরা আমাকে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোনোটাই করবে না। আমার সঙ্গে আলোচনা করে নেবার প্রয়োজন যে বোধ করবে না সেই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। একজন দুর্বল, অসুস্থ মহিলাকে নিয়ে যে বক্রোক্তি করলাম সেটিই বড় করে দেখবে। লাভ নয় লোকসানই হবে আমার। আমি যাই বলি না কেন, জনসাধারণকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারব না যে ওরা সন্দেহ করলেও আমাদের দুজনের মধ্যে কোনও রকম প্রণয়ের সম্বন্ধই নেই। এরকম কোনও সম্পর্কের অস্তিত্ব যে নেই সেটি তো দিনের আলোর মত স্পষ্ট। আর অস্তিত্ব যদিই বা থাকত, গরজটিও তো আমার দিক থেকেই হবার কথা। ওঁর কঠোর ন্যায়পরায়ণতা এবং অদম্য যুক্তিবোধের নির্মম পরিণাম যদি আমাকে সহ্য করতে না হত, তাহলে আমিই হয়ত ভদ্রমহিলার গুণগ্রাহী হয়ে পড়তাম! সে যা হোক, ওঁর তরফ থেকে আমার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টাই ছিল না। আর নিখাদ সততার সঙ্গে সেটি তিনি বুঝিয়েও দিয়েছিলেন। ওঁর এই নিখাদ সততার ওপরেই আমি ভরসা রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম আমাদের দুজনের সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার এই রণকৌশল যতই ওঁর পছন্দের হোক না কেন, অন্তত এই রকম কিছু করে বসার মত পুরোপুরি আত্মবিস্মৃত হবেন না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিশ্বসংসার সর্বদা এই ব্যাপারে অসংবেদনশীলদের মত ওঁর বিচারবিবেচনাকেই নির্ভুল বলে মেনে নিয়ে আমার বিরুদ্ধেই রায় দেবেন।
অতএব আমার সমনে একটি পথই খোলা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব – বিশ্বসংসারের হস্তক্ষেপ করার সম্ভাবনা প্রবল হওয়ার আগেই – ওঁর প্রতিক্রিয়ায় বদল আনা। ওঁর বিরক্তি উৎপাদন হয়ত পুরোপুরি বন্ধ করা অসম্ভব, তবুও কিছুটা তো কমানোর চেষ্টা করাই যায়। প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করি যে আমি কি আমার বর্তমান অবস্থায় এতটাই সন্তুষ্ট যে এই অবস্থায় রদবদলের কোনও প্রয়োজন অনুভব করি না! কিছু কিছু ব্যাপারে আমি নিজের মধ্যেও কি বদল আনতে পারি না? কেবলমাত্র এই বদমেজাজি মহিলার অহংবোধকে প্রশ্রয় দেওয়া ছাড়া আর কোনও প্রয়োজনই নেই সেটা জানা সত্ত্বেও! আর আমি কিন্তু আন্তরিকভাবেই চেষ্টা করেছি, সযত্নে এবং সচেতনভাবে। সদ্ভাব দেখিয়েই চেষ্টা করেছি, যথেষ্ট উৎসাহ দেখিয়েছি। স্বতঃস্ফূর্তভাবেই করেছি এবং সকলেই সেটি অনুভব করেছেন। ওঁর মনোযোগ আকর্ষণ করারও দরকার পড়েনি। কোনও কিছু নজর করবার ব্যাপারে উনি আমার থেকেও অনেক বেশি তৎপর। আমার আচার আচরণ থেকেই আমার উদ্দেশ্য বুঝে নিয়েছিলেন। তবুও উনি আমার প্রচেষ্টাকে আমলই দিলেন না। কী কারণে উনি আমার সঙ্গে এরকম অন্যায্য ব্যবহার করতে পারলেন? আমাকে সহ্য করতে না পারাটা ওঁর মজ্জাগত ব্যারাম। সহজে সারবার নয়, এমনকি আমার অস্তিত্বহীনতাও ওঁকে সারাতে পারবে না। যেমন ধরুন, আমার আত্মহত্যার খবর পেলেও আমাকে নিয়ে ওঁর অপরিসীম ঘৃণা কমবে না। এই মহিলা তো যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। তাহলে কেন আমার মত পক্ষপাতশূন্য হয়ে অবস্থাটি বিশ্লেষণ করতে পারছেন না? কেন বুঝতে পারছেন না যে আমার আমার আন্তরিক ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও, আমার কোনও দোষ না থাকা সত্ত্বেও, আমারও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে? নাকি আমার সঙ্গে লড়াই করার নেশায় ক্রমাগত বিফলমনোরথ হয়ে অসীম হতাশায় তলিয়ে যাচ্ছেন। আমিও অনেক সময় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে বিড়বিড় করে গজগজ করতে থাকি। এরকম অবস্থায় আমাদের দুজনের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভবই নয়! যেমন ধরুন, প্রতিদিন খুশি মনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সকালের স্নিগ্ধতা উপভোগ করতে করতে যাই। যেতে যেতে ভদ্রমহিলার দর্শন পাব। আমাকে দেখা মাত্র ওঁর মুখ ব্যাজার হয়ে উঠবে, ঠোঁট কুঁকড়ে যাবে, খুঁতখুঁতে চোখে এমনভাবে আমাকে দেখবেন যেন বিরক্তির কারণটি ওঁর আগে থেকেই জানা। ক্ষণিকের জন্যই তাকানো, তবে খুবই মর্মভেদী দৃষ্টি। তেতো হাসিতে ভরে উঠবে মুখ। নিজেকে সামলানোর জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন। অথবা মাথা নীচু করে আমাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করবেন। ততক্ষণে ফ্যাঁকাসে হয়ে কাঁপতে আরম্ভ করেছেন!
সম্প্রতি একজন ভাল বন্ধুর কাছে আমার বিড়ম্বনার কথা উল্লেখ না করে থাকতে পারলাম না। খুব বিস্তারিতভাবে কিছু বলিনি, এবং তেমন গুরুত্ব দিয়েও বলিনি। একদম হালকা চালে বলা। কিন্তু অবাক হয়ে উপলব্ধি করলাম, নিজের কাছেও ব্যাপারটি জীবনে প্রথমবার স্বীকার করে নিলাম। তবে বহির্জগতের সঙ্গে আমার সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যপারটি মোটেই লঘুভাবে নিতে পারিনি। সব থেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হল আমার বন্ধু কিন্তু ব্যাপারটিকে উপেক্ষা করল না, বেশ গুরুত্ব দিয়েি মতামত ব্যক্ত করল, কিন্তু কিছুতেই একটি বিশেষ ব্যাপারকে গুরুত্বই দিল না, এবং ওর মতামত থেকে টলানোও গেল না। উলটে গম্ভীর মুখে কিছুদিন বেড়িয়ে আসার পরামর্শ দিল আমাকে। আর কোনও পরামর্শই এই পরামর্শের মত দুর্বোধ্য হতে পারে না। আপাতদৃষ্টিতে পরামর্শটি অত্যন্ত সরল বলেই মনে হবে, সকলেরই তাই মনে হবে। কিন্তু বাস্তবে অতটা সোজা নয়। মনে হতেই পারে আমার অনুপস্থিতে নিপুণভাবে সমস্যাটির সমাধান করে ফেলা যাবে! কিন্তু সে হবার নয়। প্রথমত, আমি নিশ্চিন্ত মনে বেড়াতে যেতে পারব না। বাঁধাধরা কিছু নিয়ম আমাকে মেনে চলতে হলেও সেগুলো যেন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে না যায়। অনাবশ্যকভাবে তৃতীয় কোনও ব্যক্তিকে আমাদের নিতান্তই সাধারণ ব্যক্তিগত ব্যাপারের মধ্যে টেনে না আনা হয়, অর্থাৎ আমার শান্তি বিঘ্নিত হবার মত লক্ষণীয় পরিবর্তন যেন না ঘটে। অযথা কথা চালাচালি হওয়াটাও কিন্তু এরই মধ্যে পড়ে। এই ব্যাপারে অবশ্য আমার বন্ধুর মন্তব্যটি অসুবিধেজনক বলা যায় না। নতুন কথা কিছু বলেনি, তবুও আমার মৌলিক চিন্তাভাবনাকে শক্তিই জুগিয়েছে।
ভাল করে একবার ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতির পরিবর্তন মূল বিষয়ের তেমন রদবদল ঘটায়নি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ওঁর স্নায়বিক চাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ার জন্যই এই বিড়ম্বনা। আংশিকভাবে হলেও আমার এই মনোভাবটা অনেকেই মেনে নিয়েছেন। পুরুষালী অহংবোধের ছোঁয়া থাকতেই পারে, তবে অনুভবটা ভেতর থেকেই এসেছে। অবশ্য একটানা মানসিক বিপর্যয়ও আংশিকভাবে এই অবস্থার জন্য দায়ী। এই মানসিকতা সহজে কাটিয়ে ওঠাও যায় না।
সমস্যাটি গুরুতর হলেও সহজে এর সমাধান হওয়ার নয় – এই কথাটি বুঝতে পারলেই আমার অস্থির ভাবটা কমে আসে। তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেবার প্রবণতা মানুষের মধ্যে থাকে, বিশেষ করে বয়স যদি কম হয়। অপরিণত অভিযোগকারিণী আমার দর্শন পেলেই অবসন্ন হৃদয়ে চেয়ারে এলিয়ে পড়েন, দু’চোখ দিয়ে অশ্রুধারা ঝরে পড়ে। ভয়ে ভয়ে ভাবি এই বুঝি সেই নির্ণায়ক মুহূর্ত যখন ওঁকে অসম্মান করার ব্যাপারে আমার কৈফিয়ত তলব করা হবে। যথারীতি, এর সমাধান বা যৌক্তিকতা নিয়ে একটি কথাও উচ্চারিত হবে না। ভদ্রমহিলা অসুস্থ বোধ করার জন্য তৈরি হয়েই থাকেন। ওঁর প্রতিটি প্রতিক্রিয়া নিয়ে মাথা ঘামানোর জন্য লোকজনদের যথেষ্ট সময় নেই। প্রতি বছর অনেক কিছুই ঘটে। অনেক পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। কখনও শোরগোল তুলে ঘটে, আবার কখনও নীরবে ঘটে। তবে সব মিলিয়ে রেশ একটা থেকেই যায়। ঝামেলা লাগার গন্ধ পাওয়ার জন্য অনেকেই উদগ্রীব হয়ে থাকে। তাহলে রসেবশে অনেকটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যেতে পারে। বেকার কিছু মানুষ আছে। কোনও না কোনও অজুহাতে ঝামেলার গন্ধ শোঁকার জন্য আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে, এবং সুযোগ পেয়েও যায়। বিশেষ করে ওরা যদি আত্মীয়স্বজন হয়। ওরা এটা করতেই ভালবাসে, তবে আমি ওদের চিনে ফেলেছি, এটাই যা তফাৎ। আগে আমি ভাবতাম, ওরা নানান ঞ্জায়গা থেকে এখানে এসে ভিড় করবে। ফলে ওদের গায়ের জোর অনেক বেড়ে যাবে আর সেই জোর খাটিয়ে কোনও না কোনও একটা মহত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আমার ওপর চাপিয়ে দেবে। আজ আমি বুঝে গিয়েছি যে এই বিপদটা বহুদিন আগে থেকেই ছিল, আর সেই বিপদের সঙ্গে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে তার কোনও সম্পর্কই নেই। আর সেই সিদ্ধান্তকে আমিই বা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ভেবে এসেছি? ধরুন যদি কোনও সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছনো যায় – এমন কথা বলছি না যে সিদ্ধান্তটা আগামীকালই নেওয়া হয়ে যাবে, বা তার পরের দিন, কিংবা হয়ত কোনওদিনই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না – হয়ত বিশ্বসংসার ব্যাপারটা নিয়ে আগ্রহই দেখাবে না – অথচ আমি গলা ফাটিয়ে বলতে থাকব যে এই ব্যাপারে কথা বলবার কোনও এখতিয়ারই ওদের নেই – বাধ্য হয়েই আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে এই বিশৃঙ্খলা থেকে অক্ষত অবস্থায় আমি বেরিয়ে আসতে পারব না। তবে একটা কথা সকলেই বুঝতে পারবে যে বিশ্বসংসারে আমিও খুব একটা অপরিচিত মুখ নই, মাথা উঁচু রেখে জীবনযাপন করেছি। মানুষকে বিশ্বাস করেছি, মানুষের বিশ্বাসযোগ্যও হতে পেরেছি। আর ঠিক এই কারণেই অসুখী ভদ্রমহিলাটি – আমার জীবনে যাঁর আবির্ভাব বেশ দেরী করেই হয়েছে এবং যে ভদ্রমহিলাকে একমাত্র আমি ছাড়া বাকি সকলে অনেকদিন আগেই পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ বলে চিনে ফেলত এবং অবান্তর বিলাপ করার সুযোগ দিত না, উলটে নিঃশব্দে পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখত। কেউ জানতেও পারত না। যে শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য আমি বহু বছর ধরে সম্মান লাভ করে এসেছি, ভদ্রমহিলা বড় জোর আমার সেই যোগ্যতা নিয়ে কদর্য মন্তব্য করে আমাকে কলঙ্কিত করতে পারেন। ব্যাপারটা এখন এই পর্যায়েই আছে, আর সেটা নিয়ে আমি মোটেও বিচলিত বোধ করি না।
সময়ের সাথে সাথে ক্রমশ আমার সহনশীলতা অবশ্যই কমে আসছে, তবে এর সাথে পুরো ঘটনার প্রকৃত গুরুত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ হয়ত কাউকে অনবরত বিরক্ত করে যাবে, আর যে বিরক্ত হচ্ছে সে হয়ত জানে যে বিরক্ত হওয়ার কোনও মানেই হয় না, তবুও তার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবেই। আপনি বিচলিত হয়ে পড়বেন। আংশিকভাবে হলেও শারীরিক অস্বস্তি বোধ করবেন। কী হতে পারে সেটা নিয়ে ভাববেন। তবে আদৌ কোনও কিছু ঘটবে বলে আপনি মনে করেন না। কিছু পরিমাণে এটি বয়স বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ। কম বয়সে অনেক কিছুই আকর্ষক মনে হত। ভাল লাগার ব্যস্ততায় অপছন্দের জিনিসগুলো লক্ষ্যই করতাম না। নজরেই পড়ত না, এমনকি বালক বয়সের ঘটনাও বয়সকালে কেবল স্মৃতি হিসেবেই থেকে যেত। সব কিছুরই গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না, তবে নতুন করে ফিরে পাওয়ার ইচ্ছে হয় না। সব কিছুই সতর্কভাবে নজর করা হয়, বয়সের অভিজ্ঞতা দিয়ে সতর্ক চোখে দেখা। খুব একটা কঠিন কাজ নয়। তবে কখনওই বাস্তব অবস্থাকে খাটো করে দেখা হয় না।
ফলে, যেভাবেই ব্যাপারটিকে দেখি না কেন, সেটি ক্রমশ আরও বেশি বোধগম্য হয়ে ওঠে। সেই ভাবনাটিই বজায় রাখতে চাই। সম্পূর্ণ ব্যাপারটিকে হালকা চালেই নেব। তাহলেই জীবনটা আগের মতই মসৃণ ভাবে চলতে থাকবে, দীর্ঘ সময় ধরেই। বিশ্বসংসার আমাকে কিছুতেই বিচলিত করতে পারবে না, ভদ্রমহিলা যতই ক্ষোভ দেখান না কেন! ·
লেখক পরিচিতি : ফ্রানৎস কাফকা গত শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখক। তাঁকে বলা হয় হয় সাহিত্যে আধুনিকতাবাদের প্রবর্তক। তাঁর স্থান বিশ্বসাহিত্যে অন্যতম প্রধান চিরায়ত লেখক হিসেবে। জন্মেছিলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের প্রাগে, ৩ জুলাই ১৮৮৩ সালে এবং মৃত্যুবরণ করেন ৩ জুন ১৯২৪ সালে। কাফকা ছিলেন একজন জার্মান-ভাষী ইহুদি চেক লেখক।


0 মন্তব্যসমূহ