স্বাধীন একটা বরই গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। বাঁ পায়ে ভর, ডান পা পিছনের দিকে গোটানো। তার সবচেয়ে আয়েশি ভঙ্গি। এখন দাঁতে নখ খুঁটলে বোঝা যাবে, কিছু-একটা ভাবছে। কিন্তু এখন তা ঘটার সম্ভবনা নেই। কোঁচকানো কপাল ও বিরক্ত-মেশানো মুখে সে সামনে তাকায়। তারপর কপাল ও মুখে হাত ডলে। মুখময় ধুলো। চুল বেয়ে নামা ঘাম ঘুলোয় মিশেছে। চোখের পরদায়ও ধুলোর গাঢ় আস্তরণ। হয়তো আবার খলিসার হাটে যেতে হতে পারে।
স্বাধীন ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের রাস্তার দিকে দেখে। এখনও মানুষ আসছে। শ্রাদ্ধের অন্নদানের বাড়িতে মানুষ তো আসবেই। অন্তত সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত। সন্ধ্যার পরেও আত্মীয়-বান্ধব ও প্রতিবেশীরা আসবে। গ্রামবাসী যারা এই আয়োজনের মূল কাজগুলো সারছে, তাদের খেতে খেতে তার এক প্রহর পার হয়ে যাবে। সেই সকালে খেয়েছে সবাই। প্রত্যেকের চোখে এখন ক্লান্তি। আজ গরমও পড়েছে অভাবনীয়। ফাল্গুনের শুরুতেই সূর্যের এমন তাপ, এবার গরম পড়বে!
ঘণ্টাখানেক আগে ভাগ্নে মিলনের সঙ্গে খলিসার হাটে যাওয়ার সময় স্বাধীন তা বুঝেছে। গড়ানো দুপুরে পিঠ বেয়ে ঘাম নামছিল। মোটরবাইকে যেতে যেতে দুই দুই দিকের মাঠ থেকে উঠে আসা বাতাসেও কোনওভাবে থামছিল না ঘামের ওই স্রোত। তখন অবশ্য এসব ভাববার কোনও সুযোগ ছিল না। উলটো দিক থেকে হেঁটে আসা কাউকে কাউকে মানিক মোটরবাইকের গতি একটু কমিয়ে বলছিল, ‘তাড়াতাড়ি যান, তাড়াতাড়ি—’ এরপর ঘাড় ঘুরিয়ে স্বাধীনকে বলেছে, ‘কাকু, এরা সব মামাবাড়ি যায়!’
এ সময় স্বাধীন একবার জানতে চেয়েছে, ‘এই খলিসার হাটে পান পাবা? অত পান?’
‘পাব মনে হয়। চালতাখালির একজন আছে, এতক্ষণে চলে আসার কথা।’
মিলন মামাবাড়িতে থেকে কলেজে পড়ে। তার কথায় ভরসা কার যায়। নইলে থানা সদরে যেতে হবে, ‘খলিসার হাট শুনছি আর হাট নেই। পুরোপুরি বাজার।’
‘বাজারই তো, প্রতিদিন বসে।’
এতক্ষণে তারা খলিসার হাটে। এটা এখন আর হাট নয়, বাজার। প্রতিদিন বসে। শনি-মঙ্গলবারে হাট এখনও আছে। সেদিন ভিড় কিছু বাড়ে। তাছাড়া প্রতিদিন সকালে আর বিকেলের পরে বাজার বসে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে ঠাসা অনেকগুলো দোকান। চা-খানা, সেলুন, মিষ্টির দোকান, মোবাইল সার্ভিসিং সেন্টার, ফার্মেসি। কংক্রিটের বড়োসড়ো ব্রিজ পার হয়েই স্বাধীন বুঝেছে সব বদলে গেছে। বছর পঁয়তিরিশেক আগে শেষবার সে তার বড়োমামার সঙ্গে এক বিকেলে হাটে এসেছিল, তখন এসব কল্পনায়ও ছিল না। আগের সে মাটির রাস্তা নেই। দুই দিকের খাল ও এক দিকের নদী শুকিয়ে গেছে। আর থানা সদরের সঙ্গে পিচের রাস্তা হওয়ায় ওই গ্রামের মানুষের এই হাটে আসাও কমেছে। তার আগে অবশ্য তাদের মূল যোগাযোগ এই হাটের সঙ্গে ছিল। কিছুদিন আগে এদিকে পাকা রাস্তা হওয়ায় আবার যোগাযোগ বেড়েছে কিছুটা।
মিলন হাটখোলার মাঝখানে একটা দোকানের পাশে মোটরবাইক রেখেছে। তারপর স্বাধীনকে বলেছে, সে যদি চা খায় তো ওই এদিকের একটা দোকান খোলা আছে। এখন বিকালের আগে আগে দোকানদাররা সব বাড়ি। স্বাধীন সিগারেটের প্যাকেট বের করে দেখে, চারটা আছে। সে চায়ের দোকানে যাওয়ার আগে রাস্তার উলটো দিকে এক দোকানে দাঁড়ায়। দোকানদার বলে, ‘বেনসন দশটা আছে। আইজকে গাড়ি আসিনি।’
সিগারেট নিয়ে সে চায়ের দোকনে ঢুকতেই দেখে ফিরোজ। স্বাধীন একটু অবাক। সে জানে ফিরোজের বাড়ি এই খলিসায়। স্কুলে এ জন্যে ফিরোজ তাকে মাঝে মধ্যে ভাগ্নে ঢাকত। স্বাধীন বলে, ‘তুই, জেলা সদরের লোক এই জায়গায়?’
‘আমিও জিগোই তুই, রাজধানীর লোক এই জায়গায়?’
‘মামাবাড়ি আইচি।’
‘কলসকাঠি তোর মামাবাড়ি, সে তো জানি। কিন্তু ওই যে মিলনরে দেখলাম, ওর মামাবাড়ি তো আমিও যাব। সেই বাড়ি শ্রাদ্ধর খাওন। আমাগো কলেজ রোডের সুকোমলের এডা নানা শ্বশুরবাড়ি।’
‘সুকোমল আমার ভাগ্নিজামাই। মিলনের মেসোতো বোনের স্বামী। মিলন আমার মামাতো ভাইর ছেলে।’
ফিরোজ সব সময়ই প্রচুর মানুষের নাম-ধাম-সম্পর্ক মনে রাখতে পারে। এই অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামের লতায় পাতায় জাড়ো আত্মীয় স্বজনের সম্পর্ক-সম্বন্ধ জানা আছে। এই যে এবার জেলা সদরে দেখা হয়নি, স্বাধীন সরাসরি ভার্সিটি থেকে এখানে এসেছে, তাও অনুমান করে নেয়। এরপরই মুহূর্তে স্বাধীনকে ভড়কে দিয়ে বলেছিল, ‘ওই যার দোকানদে সিগারেট কিনলি তার জন্যি তোর বড়োমামা সারাডা জীবন আহত হইয়ে কাটাল। মরার আগেও তার বামহাতখান পুরোপুরি ভালো হইনি—’
ফিরোজের দিকে তাকিয়ে স্বাধীনের চোখের মণি ঘুরেছিল। ফাঁকে একবার চায়ের দোকানদারকেও দেখল। অল্প বয়েসি ছেলে। শুনেও শোনেনি অথবা শুনলেও বোঝেনি।
ফিরোজ বলল, ‘কী শুনিসনি? তহোনই তার আমাগো মতন বয়স, এই চুয়াল্লিশ পয়তাল্লিশ। বিকেলবেলা, এই হাটে। ওই জায়গায় ফায়ার হইল। ওই ব্যাটা পারত তোর মামারে সরাইয়ে দিতি। কিন্তু দেখাইয়ে দেল। আমার এই গ্রামে বাড়ি, বাড়ি তেমন থাকি না থাকি, এইসব শুনতি শুনতি বড়ো হইচি, যহোনই গ্রামে আইচি তহোনই শুনিচি—’
স্বাধীনও এই ঘটনার কিছুটা জানে। যদিও এদিকের প্রায় কিছুই সে চেনে না। আসেওনি তেমন। কিন্তু ওই ঘটনাটা তার জানা আছে। কাছেই নদী। গানবোটে পাকবাহিনীকে রাজাকাররা নিয়ে এসেছিল। হাটে সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা ছিল। ছোটোখাটো একটা যুদ্ধ। খণ্ডযুদ্ধ হয়তো-বা। মুক্তিযোদ্ধরা পিছু হটে। তারপরই যাদের যাদের সন্দেহ, যাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ, এমন পাঁচ জনকে হাটের মাঝখানে ফায়ার করে। ফিরোজের দাদা তাদের একজন। স্বাধীনের বড়োমামা লুকিয়ে ছিল একটা দেকানের পিছনে।
ফিরোজ বলেছে, ‘ওই দোকানের পিছনে তোর বড়োমামা পলাইল। দেখাইয়ে দিল ওই বেটা। সেদিন তো ওডা প্রায় ছাপড়া দোকান—’
স্বাধীন পারিবারিকভাবে ওই ঘটনার বর্ণনা বহুবার শুনেছে, যদিও বড়োমামা কখনও বলত না। কিন্তু ফিরোজ এখন এমনভাবে বলছে যেন সেদিন সে এখানেই ছিল। স্বাধীন ভাবল, মানুষ তো শুনতে শুনতে, ভাবতে ভাবতে, কল্পনা করে নিতে নিতে কোনও কোনও বিষয়কে চোখের সামনে দেখতে পায়। ফিরোজ তাই দেখছিল। যদিও তাদের তখন সবে জন্ম হয়েছে বা জন্মাবে।
ফিরোজ আরও বলল, ‘তোর বড়োমামা দোকানের পিছনে পলানোর পর আতাউর মেয়া দেখায়ে দিলি এক রাজাকারের গুলি খাইয়ে খালের নীচে পড়ল। তারপর ওই জায়গায় কেওড়া ঝোপটোপ ওইসবের ভিতরে পইড়ে কোনওমতো বাঁইচে গেল।’
স্বাধীন চায়ে চুমুক দিল। পকেট থেকে সিগারেট বের করে করে একটা ধরাল একটা ফিরোজকে দিল। এখন ওই ঘটনাটা শোনা তার কাছে অপ্রত্যাশিত। ফিরোজের তুলনায় এই বিষয়ে তার জানাশোনা ঝাপসা। ফিরোজ গ্রাম-গ্রামান্তরে রাজনৈতিক কারণে যোগাযোগের জন্যে আসে, এই গ্রামের ছেলে, এসব তার জানা। সামনে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন, এখনই হয়তো পার্টির নির্দেশের জনসংযোগ শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনের এখন তার কথা শুনতে যতটুকু মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন দিতে পারছে না। সে এখন এসেছে পান নিতে। দুই আড়ই পোন পচে না গেলে তার হয়তো এখানে আসাই হত না।
স্বাধীন বলেছিল, ‘যার কথা বললি, তার যদি ওই দোকান হয়, ওই দোকনের একজন সিগারেট দেয়ার সময় আমাগো কোন বাড়ি জিজ্ঞাসা করল।’
‘করবেই। এহোন ভালো সাজিছে।’
‘আমি বলিচি, আমারে চেনবেন নানে। আমি মেলা দূরের মানুষ। তারপর মিলনের কথা বললাম, মিলনরে চেনল। তখন উনি যাইচে বড়োমামার কথা বলল। বলল, তার সাথে খুব খাতির ছেল।’
‘ও সব বানানো কথা। আইজকাল কতজন কতজনের সাথে খাতিরের কথা কয়। একাত্তরের কাণ্ডকীর্তি ঢাকা দে। সব মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি সাজে!’
স্বাধীনের তখন বড়োমামার মুখখানা মনে পড়েছিল। অমন দীর্ঘদেহী সবল মানুষ। প্রায় অকেজো একখানা হাত নিয়ে কাটিয়ে দিল অর্ধেক জীবন। স্বাধীন অজন্ম তাই দেখেছে। বলত স্বাধীনতার ক্ষত। ভদ্রলোকের এ নিয়ে কোনও অনুযোগ ছিল না।
এ সময়ে মিলন এসেছিল। হাতে ঝোলানে দুই পোন পান। স্বাধীনকে মোটর সাইকের কাছে আসতে বলে। ফিরোজ জানাল, সন্ধ্যার পরে আবার দেখা হবে। সে আসবে।
বরইতলায় দাঁড়িয়ে স্বাধীন একটু আগের ঘটনার কিছুই ভাবে না। মুখ শুকনো। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। এখনও কয় বৈঠক বসবে, বোঝা যাচ্ছে না। আবার কোনও কারণে যদি খলিসার হাটের দিকে যেতে হয়। কখন কী লাগে। ফিরোজের সঙ্গে দেখা না-হওয়াই ভালো ছিল। ওখানে থেকে আসতে আসতে মিলন ওর নামেও কী সব উলটোপালটা বলল। ফিরোজও নাকি আজকাল ঝোঁকের মাথায় কথা বলে। মিলন এখানে থাকে, নিশ্চয় আশেপাশের গ্রামের কি ইউনিয়েনের এসব বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখে।
স্বাধীন গাছতলা থেকে উঠোনের একপাশে ধরে ঘরের দিকে এগোয়। ছোটোমামার কাছে জানতে চাইবে, আর কোনও কাজে কোথাও যেতে হবে কি না। এ সময় মাঝের বড়োঘরের দরজা দিয়ে একজন বেরিয়ে জানতে চায়, ‘ভাইডি, আছো ভালো?’
স্বাধীন তার মুখে দিকে তাকায়। চিনতে পারেনি। ভদ্রলোক ক্লিন শেভ। চেহরায় চেকনাই। সাধারণ গ্রামীণ মুখ নয়। একটু যেন আগন্তুক। তবু কেন যেন তার মনে হল, এখানেই তাকে দেখেছে। মামাবাড়ির সঙ্গে কোনও কোনওভাবে সম্পর্কিত। স্বাধীনকে বলে, ‘চেনতে পারোনি, না? আমি তোমার অভিজিৎদা।’
‘ও দাদা, চিনিচি!’
‘তোমার সব খোঁজ খবর রাখি। মাঝখানে ফ্রান্স না ইটালি গেছেলা পিএইচডির কাজে জানি। মাসি আর মোসোমশাইর কাছে এট্টু আগে তোমার কথা জানতি চাইলাম।’
একটা বৈঠকের খাওয়া শেষ। পায়ে পায়ে ধুলো উড়ছে। দুপুরের পর এত ধুলো ছিল না। সামিয়ানার নীচে ধীরে ধীরে ধুলো বেড়েছে। স্বাধীনের চোখে ধুলো সয় না। পরের বৈঠকের আগে জল না ছিটোলে টেকা যাবে না। যদিও এখন ভিড় পাৎলা। কাজে যুক্ত গ্রামবাসী আর নিকট পুরুষ আত্মীয় ছাড়া খেতে তেমন বাকি নেই। সে এর ভিতরে অভিজিতের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আচ্ছা। আপনি এগরিকালচার ডিপার্টমেন্টে ছিলেন না?’
স্বাধীন তাকে চিনতে পারায় অভিজিৎ খুশি, ‘এই তো চিনতে পারছো। এই বছর চাইরেক হয় রিটায়ার করলাম।’
স্বাধীন জানেন না এখন আর কী বলবে। অভিজিৎ বলে, ‘চলো, খালপাড়ের দিকে যাই। তোমার সাথে এতদিন পরে দেখা। প্রফেসর মানুষ।’ একটু এগিয়ে সে যোগ করে, ‘গেছেলা কোথায়? একেবারে উদ্ভ্রান্ত লাগদেচে!’
‘মিলনের সাথে পান আনতে। পান গেছে পইচে। দুই পোনের মতো পান লাগদো, ছোটোমামা বলল।’
‘ভালো মানুষরে পাঠাইছে এইবাড়ির ছোটোকাকায়। তুই এই সব পারো নাকি? খলিসার হাটে গেছেলা?’
‘হুঁ।’
‘এই তো দেলা মনডা খারাপ কইরে!’
‘কেন?’
‘ওই খলিসার হাটে এই বাড়ির বড়োকাকার বাম হাতে গুলি লাগিল, জানো তো? খালে সেদিন জল ছেলো বলে রক্ষা। ওই নিয়ে খাল পাড়ি দিয়ে, তখন ওই খাল কী চওড়া! তারপর আসল আমাগো বাড়ি। আমার তখন বয়স এই বছর কুড়ি। বিএসসি পড়ি।’
স্বাধীন বিস্ময়ে অভিজিতের মুখ দেখে। হয়তো তার বড়োমামার নামে আজকে অন্নদান বলেই সবার কথায় তার বিষয় ঘুরে ফিরে আসছে। কিন্তু স্বাধীনের মনে হয়, সে কিছুক্ষণ আগে খলিসার হাটে না গেলে হয়তো ওই প্রসঙ্গটা ঘুরে ফিরে আসত না। আগেও বড়োমামার হাতে গুলি লাগার প্রসঙ্গ শুনেছে, কিন্তু এমন পর-পর!
‘ওই দিনের পর থেকে আমাদের গ্রামে রাজাকারারা আসা শুরু করল। আসলে মুক্তিযোদ্ধরা ওদিন না-পারায় আর এই গ্রামের অনেক বাড়ির সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যোগাযোগ থাকায়, খলিসার হাটের আতাউর মেয়া আর নদীর ওপারের দিদার মেয়া ফতোয়া দেল, এই গ্রামের পুরুষদের সবাইর মুসলিম হতে হবে। বয়স্থা মেয়েদের মুসলমান ছেলেদের সঙ্গে বিয়ে দেতে হবে।’
‘তাই নাকি?’
‘তুমি জানবা কীভাবে? তোমার তহোন জন্মই হয়নি।’
‘হুঁ। আমি মার পেটে। আর আমাগো গ্রাম তো মুক্তিযোদ্ধা তাজুলবাহিনীর ঘাঁটি, সেখানে এসব ঘটেনি।’
‘তহোন তোমার বড়োমামা, ওই আহত মানুষটা, এই পাশাপাশি গ্রামের যারে যার পছন্দ বা গুরুজনদের যার সাথে যার বিয়ে হতি পারে, তাগো বিয়ে দিয়ে দেল।’
ঘটনার বর্ণনা দিতে দিতে অভিজিৎ হাসে, ‘ওই সময় আমারও বিয়ে হল, তোমার বউদি তহোন নাইনে পড়ে—’
স্বাধীনও হাসি চেপে রাখতে পারে না। কিন্তু এর ভিতর জানতে চায়, ‘আতাউর মেয়ার কি খলিসার হাটে দোকান আছে?’
‘হুঁ। তুমি দেহি চেনো। ওগো বাড়ি ওই পাশের বড়ো খালের ওপার, ওর ছেলে ইলেকশন করবে—’
‘আমার এক বন্ধুর সাথে আইজকে ওই জায়গায় দেখা হ’লি ওই দোকান দেখাল।’
এ সময় স্বাধীনকে কেউ ডাকে। তারপরই মিলন আসে, ‘ও মামা, আসেন—’ মিলন অভিজিৎকেও ডাকে। অভিজিৎ জানায়, সে খেয়েছে, এখন বাড়ির দিকে যাবে।
স্বাধীন ভাবে, কিছুক্ষণের ভিতরে একটা ঘটনা দুদিক থেকে এসে হঠাৎ মিলেমিশে গেল? অভাবিত!
মিলনের সঙ্গে বাড়ির ভিতরের দিকে এসে স্বাধীনের চোখে সব কিছু অস্পষ্ট লাগে। উঠোনে সামিয়ানার নীচে বেশ কয়েকটা লাইট। আলো তীব্র। কিন্তু ধুলো যেন বেড়েছে। চোখে-মুখে একবার জলের ঝাপটা দিতে পারলে হত। গত বৈঠকে সবাই খেয়ে ওঠার পরে কি জল ছিটানো হয়নি। নাকি তার নাগরিক চোখে এই পল্লি বিদ্যুতের আলো বড়ো ম্যাড়মেড়ে। আচ্ছা, বসার আগে উঠোন ঝাড়ু দেয়ায় ধুলো বেড়েছে। কেউ একজন জল ছিটোয়। তারপর বসার জন্যে পলিথিন লাছে একসঙ্গে কয়েকজন। এখন গ্রামে আর কলপাতায় খাওয়া হয় না। সে প্রথম বৈঠকের সময়েই বিষয়টা লক্ষ করেছে। এখন গ্রামের ডেকরেটর থেকে শয়ে-শয়ে ম্যালামাইন প্লেট ভাড়ায় আনায় যায়।
স্বাধীন বসার জন্যে উঠোনে লাছা পলিথিনের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আত্মীয়-স্বজন আর মামাদের জ্ঞাতি ও এই কাজে নিয়েজিত গ্রামবাসীর বসার জন্যে অপেক্ষা করে। খাওয়ার বিষয়টা এখন নিজেদের ভিতরে। কোনও তাগাদা নেই। খেতে বাকি আর হয়তো জনা পঞ্চাশেক। এ পর্যন্ত সব ভালো ভালোয় হয়েছে। একজন স্বাধীনকে বসতে বলে। শত হলেও সে ভাগ্নে।
এ সময় মিলন জানায়, ওই যে চেয়ারম্যান কাকা আসছে। কেউ উঠে দাঁড়ায়। মিলন স্বাধীনকে চেনায়, প্রথমে এই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, তারপর খলিসার হাটের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান সঙ্গে তার ভাইপো চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আর ফিরোজ।
তাদের কুশল বিনিময়ের পরে ফিরোজ দুজনের সঙ্গে স্বাধীনকে পরিচয় করিয়ে দেয়। তারপর স্বাধীনের ছোটোমামা ও মামাতো ভাইদের অনুরোধে তারা খেতে বসে।
খেতে খেতে কেউ কেউ স্বাধীনের বড়োমামার প্রশংসা করে। কেউ বলে এত মানুষের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আর মুক্তিযোদ্ধদের সহায়তা করে লোকটা আহত হল, কিন্তু কোনওদিন এসব নিয়ে ভাবেনি। আসলে মানুষের মতো মানুষ ছিলেন, দেশের জন্যে জীবন দিতেও ভয় ছিল না।
স্বাধীন শোনে। সে অন্তত এটুকু জানে, তার বড়োমামা এসব কোনওদিনও ভাবেনি। এমনকি হয়তো এত কিছু বুঝতও না।
‘এ ফিরোজ?’
স্বাধীনের ডানে ফিরোজ। তারও ডান দিকে দুজনার পরের জন ডেকেছে ফিরোজকে। বয়সে তাদের চেয়ে কিছু বড়ো।
‘ওনার ব্যাপারটা কেউ কোনওদিন আমাগো মাথায়ই দিইনি। অন্তত মারা যাওয়ার সময়ে এমপি সাহেবরে বললি এট্টা গার্ড অভ অনারের তো ব্যবস্থা করা যাত।’
তাদের সামনের কাতারে বসা গ্রামবাসী মাথা দোলায়। সত্যি তো, এমন সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে।
স্বাধীন ফিরোজের কাছে নীচু গলায় জানতে চায়, ‘লোকটা কে?’
‘বিকেলে দেহি বললাম তোরে—’ ফিরোজের গলা আরও নীচু খাদে, ‘আতাউর মেয়ার ছেলেÑখলিসা ইউনিয়নে এবার চেয়ারম্যানিতে দাঁড়াবে। পার্টির সিলেকশন।’
মুখ পর্যন্ত ভাতের গ্রাস তুলেছিল স্বাধীন। হাত সেখানে স্থির। ফিরোজ বলে, ‘কী, খা—’
স্বাধীনের মনে হয়, এখন সামনে অথবা ডানে ও বামে সার সার মানুষের একটা মুখও সে দেখতে পারছে না। ধুলোয় সব মলিন!
**********
লেখক পরিচিতি : প্রশান্ত মৃধা ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর বাগেরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাগেরহাট সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও সরকারি প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, সাহিত্যিক কলাম ও শিশু সাহিত্য মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবন বৈচিত্র্যময়। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ প্রায় অর্ধশত। সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কথাসাহিত্য পুরস্কার, সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার এবং জেমকন সাহিত্য পুরস্কার।

0 মন্তব্যসমূহ