অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

আমাদের গায়িকার নাম জোসেফিন। ওর গান না শুনে থাকলে, গানের শক্তি সম্বন্ধে আপনি কিছুই জানেন না। ওর গান শুনে মুগ্ধ হননি এমন কেউই নেই। ব্যাপারটা আরও আশ্চর্যের, কারণ আমাদের জাতটাই আসলে সঙ্গীতপ্রেমী নয়। শান্তির নীরবতাই আমাদের কাছে সবচেয়ে মধুর সুর। আমাদের জীবনটা বড়ই কঠিন। কোনোভাবে যদি এক মুহূর্তের জন্যও দৈনন্দিন চিন্তা-ঝামেলা ঝেড়ে ফেলতে পারি, সঙ্গীতের মতো এত সুদূর, এত বিলাসী অনুভূতির কাছে পৌঁছনোর ক্ষমতা আর থাকে না। তবে তা নিয়ে আমরা খুব একটা হাহুতাশও করি না। সেই ভালো লাগার অনুভূতির কাছাকাছি পৌঁছনোর আগেই আমাদের ব্যবহারিক বুদ্ধি, চালাকি, টিকে থাকার কৌশল—এসবই বড় হয়ে ওঠে। বরং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যবহারিক বুদ্ধিটাই আমাদের অমূল্য সম্পদ বলে মনে হয়। সেই সেয়ানা হাসিটুকুই আমাদের সব বিপদের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখে। কখনো-সখনো মনে হতেই পারে সুখের আকুলতা পূর্ণ করার একমাত্র উপায় হল সঙ্গীত – তবে সেই মনে হওয়াটা কালেভদ্রেই ঘটে। তবে জোসেফিন আলাদা। ও সঙ্গীত ভালবাসে। আর সেই ভালবাসাটা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেও পারে। সেটা ও একাই শুধু পারে। ও চলে গেলে গান আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাবে। কত দিনের জন্য হারিয়ে যাবে কে জানে?

বহুবার ভেবেছি, জোসেফিনের এই গানে এমন কী আছে! আমরা তো আসলে একেবারেই সঙ্গীতহীন। তাহলে আমরা ওর গান বুঝি কীভাবে? অন্তত, বুঝি বলেই তো মনে করি—যদিও জোসেফিন বলে, আমরা আদৌ বুঝি না। সবচেয়ে সহজ উত্তর হতে পারে—ওর গানের সৌন্দর্য এতই গভীর যে সবচেয়ে গোঁয়ার, অনুভূতিহীন প্রাণীও তার জাদু এড়িয়ে যেতে পারে না। আমি কিন্তু এই ব্যাখ্যাটি মেনে নিতে পারিনি। সত্যিই যদি সেটাই হত, ওর গান শুনতে শুনতে মনে হত এই অপূর্ব সুর আমরা আগে শুনিনি, এমনকি এই গান অনুভব করার ক্ষমতাটাও আমাদের নেই। প্রথমবারে যে কথা মনে হত, হাজারবার শোনার পরও সেটাই মনে হত। নিজেদের মধ্যে আমরা স্বীকার করেই নিয়েছিলাম যে নেহাৎ সঙ্গীতের বিচারে জোসেফিনের গানে অসাধারণ কিছুই নেই।

সত্যিই কি এটাকে গান বলা যেতে পারে? আমাদের মধ্যে সঙ্গীতবোধ তেমন না থাকলেও, গানকে ঘিরে কিছু নিজস্ব ঐতিহ্য কিন্তু আছে। পুরাকালে আমাদের পূর্ব প্রজন্মের সঙ্গীত ছিল। আমাদের লোককথায় তার উল্লেখ আছে। কিছু গান আজও টিকে আছে। তবে সত্যি বলতে কী এখন আর কেউ সেগুলো গাইতে পারে না। তাই গান বলতে কী বোঝায়, সে সম্পর্কে আমাদের একটা আবছা একটা ধারণা আছে, আর জোসেফিনের শিল্প কেন যেন সেই ধারণার সঙ্গে ঠিক মেলে না। সত্যিই কি ওটা গান? নাকি সেটা কেবল বাঁশির মতো এক ধরনের শিসধ্বনি? আর হ্যাঁ, শিসধ্বনির সঙ্গে আমরা তো যথেষ্ট পরিচিত। শিসধ্বনিই আমাদের জাতির একমাত্র প্রকৃত দক্ষতা—অথবা, একে দক্ষতা বলাও ঠিক নয়; এটা বরং আমাদের জীবনেরই এক চরিত্রগত প্রকাশ। শিসধ্বনিআমরা সকলেই দিই, কিন্তু সত্যি বলতে কী কেউ এটিকে শিল্প বলে দাবী করিনি। কোনও মনোযোগ না দিয়েই, সত্যি বলতে কী খেয়াল না করেই শিস দিই। এমনকি আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা জানেনই না যে শিস দেওয়া আমাদের অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। অতএব, সত্যিই যদি জোসেফিন গান গায় না, কেবল শিস দেয়, এবং খুব সম্ভবত – অন্তত আমার তাই মনে হয় – শিস দেবার প্রচলিত সীমাও অতিক্রম করে না, আসলে, হয়তো ওর ক্ষমতাও আমাদের সাধারণ শিসধ্বনির মান পর্যন্ত পৌঁছয় না, সাধারণ শ্রমিকও কাজ করতে করতে অনায়াসে যা করতে পারে – যদি সত্যিই তা-ই হয়, তাহলে তো তথাকথিত শিল্প নিয়ে জোসেফিনের দাবী তো নিঃসন্দেহে খণ্ডিত হয়ে যায়। তবুও সবার ওপর যে প্রভাব পড়ে, সেই রহস্যের কিনারা হওয়া জরুরি।

যাই হোক, জোসেফিনের সৃষ্টি নিছক শিসধ্বনি নয়। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ওর শিস শুনুন – অথবা শুনতে শুনতে নিজেকে পরীক্ষা করুন – কিংবা ধরুন, চারপাশের আরও অনেক কণ্ঠের মধ্যে জোসেফিনও গাইছে আর আপনি ওর স্বর আলাদা করে চিনতে, শেষ পর্যন্ত আপনার মনে হবে সেটি সাধারণ শিসধ্বনি বই আর কিছুই নয়। বড়োজোর স্বরের সুক্ষ্মতা কিংবা মোলায়েম কণ্ঠ আলাদা করে বোঝা যায়। অপর পক্ষে, আপনি ওর সামনে দাঁড়িয়ে শুনলে সেটিকে কেবল শসধ্বনি বলে মনে হবে না। ওর শিল্প বুঝতে হলে শোনাটাই যথেষ্ট নয়, ঈকেও দেখতে হবে। যদি ধরেও নিই, ওটি আমাদের নিত্যদিনের সেই সাধারণ শিসধ্বনি, তবুও অদ্ভুত এক পরিবেশ তৈরি হবে। একজন আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে উপস্থাপিত করছে, অথচ করছে এমন কিছু যা আমরা প্রতিদিনই করি। বাদাম ছাড়ানো কোনোমতেই শিল্প নয়। দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্য কেউ বাদাম ছাড়াতে বসে না। কিন্তু কেউ বাদাম ছাড়াতে বসে আর সত্যি সত্যিই তাতে কাজ হয়, তাহলে বিষয়টি আর স্রেফ বাদাম ছাড়ানো থাকে না। কিন্তু যেহেতু কাজটি বাদাম ছাড়ানো, আর সেটি অনায়াসেই করা যায়, তার মধ্যেও যে একটি শিল্প আছে সেটি নজর এড়িয়ে যায়। এই বাদাম ছাড়ানোর লোকটির শিল্পী হিসেবে প্রকৃত সত্তাটি প্রকাশিত হয়। আবার লোকটি যদি আমাদের বেশিরভাগের মত অতটা দক্ষতার সঙ্গে বাদাম ছাড়িয়ে উঠতে পারে না, সেটিও লক্ষণীয় হয়ে ওঠে।

হয়ত জোসেফিনের গায়কী অনুরূপ একটি ঘটনা। আমরা ওর এমন একটি গুণের প্রশংসা করি যে গুণের কদর নিজেদের ব্যাপারে কখনই করি না। প্রসঙ্গত, এই ব্যাপারে ও আমাদের সঙ্গে পুরোপুরি সহমত। একবার আমাদের শিসধ্বনির মধ্যে অভিনবত্বের অভাব নিয়ে – যে সুরটা প্রায়ই শোনা যায় – সেটা নিয়ে কেউ ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আমিও উপস্থিত ছিলাম সেখানে। জোসেফিন কথাটা সহ্য করতে পারেনি। সেদিন ওর মুখে যে উদ্ধত, দাম্ভিক হাসিটা ফুটে উঠেছিল, তেমন হাসি আমি জীবনে আর কখনও দেখিনি। ওপর ওপর ওকে দেখে আমার মনে হত যে ও কমনীয়তার নিখুঁত প্রতিমূর্তি। আমাদের জনজাতির মধ্যেও – যেখানে কোমল স্বভাবের নারীর অভাব নেই – বিস্ময়করভাবে ও চোখে পড়ার মত নরম এবং সুকোমল। কিন্তু সেই সময় ওকে মোটেই সুক্ষ্ম বা মার্জিত লাগছিল না। স্থুল ও অমার্জিত বলেই মনে হচ্ছিল। ও যেহেতু গভীরভাবে সংবেদনশালী, ব্যাপারটা সঙ্গে সঙ্গেই টের পেয়ে গেছিল, আর নিজেকে সামলে নিয়েছিল। যাই হোক,এভাবেই নিজের শিল্পকর্মের সঙ্গে আমাদের শিসধ্বনির যে কোনো সম্পর্ককে অস্বীকার করত। যারা বিপরীত মত পোষণ করত, কেন জানি না মনে হত, তাদের জন্য থাকত ওর একরাশ ঘৃণা আর অস্বীকৃত বিদ্বেষ। কোনও সাধারণ অহঙ্কার নয় এটা। ওর বিরোধীরাও ওর প্রশংসা করত, যেমন সাধারণ জনতা করে থাকে। আংশিকভাবে আমিও সেই দলেই পড়ি। তবে শুধু প্রশংসায় জোসেফিনের মন ভরত না, ঠিক যেভাবে প্রশংসিত হত চাইত সেভাবে প্রশংসিত হলেই ও খুশি হত। শুকনো প্রশংসা ওর কাছে অর্থহীন। ওর সামনে গিয়ে বসলেই ওকে সঠিকভাবে বোঝা যায়। দূরে থাকলেই বিরোধিতা করা সম্ভব। সামনে বসলেই বুঝতে পারবেন শিসধ্বনি বলে যেটা করছে, সেটি আদৌ শিসধ্বনি নয়।

যেহেতু শিস দেওয়া আমাদের অচেতন অভ্যেসগুলির অন্যতম, তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে—জোসেফিনের শ্রোতারাও ওর গানের সঙ্গে সুর মিলিয়েই শিস দিয়ে উঠবে। ওর শিল্প আমাদের ভালো লাগে, আর তৃপ্তি অনুভব করলেও আমরাও শিস দিয়ে গেয়ে উঠি। কিন্তু ওর শ্রোতারা কখনোই শিস দিয়ে ওঠে না। ওরা নেংটি ইঁদুরের মতই নিঃশব্দ হয়ে বসে থাকে। সেই সময় আমরা এতটাই নিস্তব্ধ হয়ে পড়ি, যেন এতদিন আকুল হয়ে যা চেয়েছি সেই শান্তিরই অংশীদার হয়ে উঠেছি—এবং যা অন্তত আমাদের নিজস্ব শিসধ্বনি আমাদের শুনতে বাধা দেয়। ওর গানই কি আমাদের সম্মোহিত করে – নাকি, ওর চিকন কণ্ঠস্বরকে ঘিরে থাকা গম্ভীর নীরবতাই আমাদের অন্য এক জগতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়? একবার হল কি, জোসেফিন গাইছে—ঠিক সেই সময় ছোট্ট সরল একটি মেয়ে একেবারে নিষ্পাপ ভঙ্গিতে হঠাৎ গেয়ে উঠল। সেই একই সুর, যেটি আমরা জোসেফিনের কাছ থেকেও শুনছিলাম। আমাদের সামনেই সেই শিসধ্বনি – রেওয়াজে পাকা হয়েও সামান্য দ্বিধাগ্রস্ত, আর নীচে দর্শকদের মাঝে শিশুদের কিচিরমিচির, যেন দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। দুটোর মধ্যে কোনো পার্থক্য আলাদা করে চেনা কার্যত অসম্ভব। তবুও ফিসফিস করে, হিসহিস করে বাধাদানকারীকে চুপ করালাম। তবে কোনও প্রয়োজন ছিল না, কারণ জোসেফিন যখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে, দুই হাত প্রসারিত করে আর কণ্ঠস্বরকে এমন চড়ায় তুলে (যার ওপরে আর যাওয়া সম্ভব নয়) শিস দিত, ও ভয়ে আর লজ্জায় নিজেই গুটিসুটি মেরে পালিয়ে যেত।

ও বরাবরই এমন। ঘটনা যতই তুচ্ছ হোক না কেন – যে কোনও ঘটনা – দর্শকাসন থেকে ভেসে আসা অস্বস্তিকর শব্দ, গুঞ্জন, কিংবা হঠাৎ আলো নিভে যাওয়ার মত সামান্য গোলোযোগ – নিজের গায়কীকে আরও প্রভাবশালী করে তোলার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করত। অদ্ভুত একটা বিশ্বাস ছিল ওর। সামনে বসা শ্রোতাদের কর্ণকুহরে ওর সুর নাকি পৌঁছয় না। ওরা কিন্তু উচ্ছ্বাস দেখায়, মুগ্ধতা প্রকাশ করার ব্যাপারেও কোনও কার্পণ্য নেই, তবুও ওর আশ মেটে না। ও যেন অনেক আগে থেকেই এটা মেনে নিতে শিখে নিয়েছে। অর্থাৎ যে কোনও গোলোযোগই ওর সুযোগ করে দেয়। বহির্জগতের যে কোনও ব্যাঘাতই ওর গানের বিশুদ্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় আর অনায়াসে সেই ব্যাঘাত কাটিয়ে ওঠে ও। আসলে এর মধ্যে ওর কোনও লড়াইই নেই, ও কেবল নিজের উপস্থিতিটাই সবার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমজনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। হয়ত গভীর কোনও উপলব্ধি হয়নি, অথচ ওদের মনে অস্পষ্ট শ্রদ্ধা মিশ্রিত অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

সামান্যতম গোলোযোগই যদি এত সুযোগ করে দিতে পারে, তাহল ব্যাপক গোলোযোগ হলে তো আর কথাই নেই! এমনিতেই তো আমাদের জীবন ব্যাঘাতে ভরপুর। প্রতিটি দিনই আমাদের জন্য অপ্রত্যাশিত কিছু নিয়ে আসে—সতর্কতা, আশা, আতঙ্ক, - কারোর পক্ষেই সব কিছু সহ্য করা সম্ভব নয়। তাই সর্বক্ষণ সঙ্গী সাথীদের ওপর ভরসা করতে হয়। তবে মাঝে মধ্যে সেটাও যথেষ্ট মনে হয় না। এমনও হয়, যে ক্লেশ আমার প্রাপ্য, সেটাই অজস্র বন্ধু ভাগাভাগি করে নেয়। আর তখনই জোসেফিন মনে হয় এটাই ওর প্রকৃষ্ট মুহূর্ত। জোসেফিন এই মুহূর্তের অপেক্ষাতেই থাকে। দুরুদুরু বুকে সুক্ষ্মতার আবরণে। মনে হয় গানের মধ্যে ওর সমস্ত সত্তাকে ডুবিয়ে দিয়েছে। মনে হয় যেন ওর গান ওকে নিংড়ে ছিবড়ে করে দিয়েছে, ও নিঃশেষিত হয়ে পড়েছে। যেন অরক্ষিত অবস্থায়, পরিত্যক্ত অবস্থায় নিজেকে মহানুভব ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছে। যেন গান গাওয়ায় তন্ময় হয়ে মেয়েটিকে শীতল নিঃশ্বাস সামান্য একটু স্পর্শ করেও ভেঙে ফেলতে পারে, এতটাই ভঙ্গুর লাগছিল ওকে। তবুও এই সময়ে ওকে দেখলে, আমাদের মত তথাকথিত বিরোধীরা মনে মনে বলে উঠি, “ও তো শিস দিয়ে ঠিক মত সুরও তুলতে পারে না। অতি সামান্য একটা সুর বের করতেও কী ভীষণ লড়াই করতে হয়! গান তো দুরস্ত, আমাদের মত সাধারণ সুরের ভাজটাও ওর কাছে রীতিমত একটা যুদ্ধ।” প্রথম প্রথম আমাদের এমনটাই মনে হত। তবে সে কেবল তাৎক্ষণিক একটা প্রতিক্রিয়া। ঠেকানো যায় না ঠিকই, তবে ধারণাটা ভাঙতে সময় লাগে না। আমরাও তখন ভিড়ের আবেগেই ভেসে যাই। গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে, প্রায় দম বন্ধ করে, একাগ্র হয়ে শুনতে থাকি।

আমাদের এই অস্থির, সদা-গতিশীল জনতাকে—যারা যেন কোনো অস্পষ্ট অভিসন্ধির টানে নিরন্তর ছুটে বেড়ায়—তাদের নিজের আশেপাশে টেনে আনতে জোসেফিনের বিশেষ কোনও প্রয়াস করারও প্রয়োজন হয় না। কেবল ওর সেই ভঙ্গি, পেছনে হেলানো মাথা, আধখোলা মুখ, ঊর্ধ্বমুখী দৃষ্টি – এইটুকুই যথেষ্ট। এর থেকে বোঝা যায় ও গান গাইতে চায়। এই কাজটা ও যখন চায় তখনই করতে পারে। বিশেষ কোনও জায়গার দরকার নেই। অনেক দূর থেকে দেখা যেতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতাও নেই। খামখেয়ালে বেছে নেওয়া কোনো আড়াল-আবডাল কোণ, কোনো নির্জন খুপরি—হলেই চলবে। ও যে গান গাইতে চলেছে এই খবরটা মুহূর্তের মধ্যে রাষ্ট্র হয়ে যাবে। দেখতে দেখতে সবাই ভিড় করে, সারি বেঁধে চলে আসবে। হ্যাঁ, এত কিছু সত্ত্বেও কিছু বাধা তো পড়বেই। আর জোসেফিন এই গোলযোগের মধ্যেই গান গাওয়া পছন্দ করত। নানা ধরনের বিপর্যয় ও দুর্দশা এসে এমনভাবে ঘিরে ধরত যে, শেষ পর্যন্ত আমাদের অনেকগুলো আলাদা পথ বেছে নিতে হত। আমাদের সদিচ্ছা থাকলেও, জোসেফিনের ইচ্ছেমতো এত তাড়াতাড়ি সবার জড়ো হওয়া সহজ ছিল না। আর তখন ওকে অনেকক্ষণ ধরে নিজের সেই জাঁকজমকপূর্ণ ভঙ্গিতে অপেক্ষা করে থাকতে হতো, অথচ শ্রোতার যথেষ্ট ভিড় হয়ে উঠত না। নিশ্চিতভাবে ও ক্ষেপে উঠত, মেঝেতে পা ঠুকত, মুখে যা আসতে বলে দিত। একজন তরুণীর মুখে সেই সব কথা মানায় না। এমনকি রাগে কামড়েও দিতে পারত। এরকম অসভ্যতা করার পরেও কিন্তু ওর বদনাম হত না। ওর অন্যায় আবদার সত্ত্বেও সকলেই ওর সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা করত। শ্রোতা জড়ো করার জন্য চারদিকে লোক পাঠানো হত, তবে ওকে জানতে দেওয়া হত না। আশেপাশে পথের ধারে দাঁড়িয়ে লোকেরা হাতছানি দিয়ে শ্রোতৃবৃন্দকে ডাকছে, তাড়াতাড়ি করে চলে আসতে বলছে। যতক্ষণ পর্যন্ত মোটামুটি ভিড়টা জমে উঠছে, এটা চলতে থাকবে।

জোসেফিনের প্রতি মানুষের এই অদ্ভুত টান কোথা থেকে আসে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যতটা কঠিন, তার গানের আসল মাহাত্ম্য ঠিক কী—সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও ততটাই কঠিন। প্রথম প্রশ্নটা আলাদা করে না তুললেও চলত। দ্বিতীয় প্রশ্নের মধেই সেটা বিলীন হয়ে যেত। যদি বলা যেত, মানুষ আসলে সম্পূর্ণভাবেই জোসেফিনের গানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ আমাদের লোকেদের স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না। আমরা আসলে কূটবুদ্ধিপ্রিয়— যদিও সেই কূটবুদ্ধি নিরীহ, শিশুসুলভ। ফিসফিসানি, কানাকানি, নীরবতার আড়ালে চলতে থাকা অন্তহীন কথাবার্তা। খুব সম্ভবত জোসেফিনও এটা অনুভব করে। আর সেই জন্যই নিজের ভঙ্গুর কণ্ঠের সমস্ত শক্তি দিয়ে ও এই প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়ে চলে।

তবে কোথায় থামতে হবে সেটা বুঝতে হবে। আমাদের জনজাতিকে একটা ছাঁচে ফেলে বিচার করলে ভুল হবে। কারণ, এত কিছু বলবার পরেও, আমরা জোসেফিনকে ভালোই বাসি। নিঃশর্ত, অন্ধ ভক্তির মতো নয় – তবু একটা গভীর টান আছে, যেটা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। তবে ভালোবাসি বলেই যে ওকে নিয়ে কখনও হাসতে পারি না, তেমনও নয়। উল্টোটাই বরং সত্যি। ওর মধ্যে এমন অনেক কিছু আছে, যেটা দেখলে হাসি পাওয়াটাই স্বাভাবিক। অনেকেই হয়তো মুখে স্বীকার করবে না, কিন্তু মনে মনে সবাই জানে। আসলে হাসি আমাদের স্বভাবের মধ্যেই মিশে আছে। জীবন আমাদের যতই ক্লেশ দিক, যতই বিপদ আর অনিশ্চয়তা আমাদের ঘিরে থাকুক, হাসি আমাদের কখনোই ছেড়ে যায় না। হাসি যেন আমাদের সংসারেরই এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সদা হাজির। অপেক্ষায় থাকে। তাই জোসেফিনকে নিয়ে হাসি, কিন্তু ছোটও করি না। আমরা ওকে নিয়ে যেমন হাসি, আবার আগলেও রাখি। এই দ্বৈত অনুভূতিতে কোনও বিরোধ নেই। দুটোই সমান সত্য। তবে জোসেফিনকে নিয়ে আমরা সেই অর্থে হাসি না, মানে বিদ্রূপ করে হাসি না। অনেক সময়ই আমার মনে হয়েছে, আমাদের লোকজনরা মনে করে জোসেফিনের সঙ্গে একটা অদ্ভুত দায়িত্বের সম্পর্ক আছে। এই ভঙ্গুর, অসহায় মেয়েটা – যে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা বলে ভাবতে ভালবাসে, আর অন্যদের থেকে আলাদা ভাবার জন্য নিজের গানকেই কারণ বলে মনে করে – কোনও এক অজ্ঞাত নিয়মে আমরা ওর অভিভাবক হয়ে পড়েছি। ওকে রক্ষা করা, সামলে রাখা, ভেঙে পড়তে না দেওয়া – সবই যেন আমাদের অঘোষিত কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। কেউ এর ব্যাখ্যা দিতে পারবে না। যুক্তি দেখাতে পারবে না। নিয়মের উল্লেখ করতে পারবে না। কিন্তু এই বিশ্বাসের বাস্তবতা নিয়ে কারও মনেই সংশয় নেই। যেন ব্যাখ্যার আগে থেকেই এর অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত। আর যাকে আমাদের কাছে গচ্ছিত বলে মনে করি, তাকে নিয়ে হাসাহাসি করা যায় না। শুধু সেটা অশোভন সেটাই নয়, যেন নিজেদের দায়িত্বের প্রতিই অবিশ্বাস দেখানো। তাই সব থেকে রুক্ষভাষী মানুষটিও একটা সীমারেখা অতিক্রম করে জোসেফিনকে আঘাত করতে পারে না। বড়জোর ওরা বলবে, “জোসেফিনকে দেখলে হাসি পায় না!” কথাটা শুনতে সাধারণ, কিন্তু আমাদের সকলের মনোভাবটাই এই কথাটায় লুকিয়ে আছে। ওকে নিয়ে হাসার অবকাশ নেই। আমাদের কাছে এটা আনন্দের বিষয় নয়, দায়িত্বের বোঝা। হয়তো এই জন্যই জোসেফিনকে আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারি না। যেমন নিঃশর্ত শ্রদ্ধা করি না ওকে, নির্মম উপহাসও করি না। ও একই সঙ্গে আমাদের বোঝা, দায়িত্ব, স্নেহের পাত্রী আর অনির্বচনীয় রহস্য।

অতএব বলা যেতে পারে আমরা জোসেফিনকে অপত্যস্নেহে আগলে রাখার চেষ্টা করি। সন্তান যেমন হাত বাড়িয়ে দিলে বোঝা যায় না যে ও আবদার করছে না হুকুম করছে, ঠিক তেমনই। তবুও পিতা নিজের সন্তানের হাত তো ধরবেনই। অনেকেই হয়তো ভাববেন আমাদের জাতির মধ্যে এই ধরণের পিতৃস্নেহ বা ধৈর্য দেখানোর লক্ষণ নেই। সাধারণ অবস্থায় কথাটা হয়তো অমুলক নয়। কিন্তু জোসেফিনের বেলায় সব হিসেব পালটে যায়। ওর জন্য আমরা স্নেহশীল, আদর্শ অভিভাবকই হয়ে পড়ি। কেউ এককভাবে হলে হয়তো পারত না, কিন্তু আসলে এটা হল আমাদের সামাজিক অনুভূতি, তাই সম্ভব হয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে আমাদের সীমিত ক্ষমতা, কিন্তু সমষ্টিগত ভাবে এর কোনও সীমা-পরিসীমাই থাকে না। জোসেফিনকে আমাদের উষ্ণতার বৃত্তের মধ্যে টেনে নিলেই হয়, তার বেশি কিছু করার দরকারই পড়ে না। এটাই ওর সবচেয়ে বড় আশ্রয়, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা। অবশ্য এসব কথা ওকে কেউ বলে না। বলার সাহসও নেই। সঙ্গে সঙ্গে ওর কাছ থেকে প্রতিবাদ ছুটে আসবে। “তোমাদের সুরক্ষার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন আমার নেই!” আমরা মনে মনে হেসে ফেলি। “সুরক্ষা নিয়ে এত বড় বড় কথা! তুমি তো আসলে শিসই দিচ্ছ, ওটাকে গান বলা যায় না!” কিন্তু ওর প্রতিবাদ সত্ত্বেও আমাদের বিশ্বাস টলে যায় না। উল্টে বিশ্বাসটা আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। শিশুরা যেমন ভালোবাসার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, অভিমান করে, অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে, জোসেফিনের আচরণও সেরকমই আমাদের মনে হয়। বাবা যেমন সিওন্তানের অবাধ্যতাকে ব্যক্তিগত অপমান বলে মনে করেন না, আমরাও জোসেফিনের আপত্তিকে গুরুত্ব দিলেও, মন থেকে অপমানিত বোধ করি না। আসলে আমাদের মনে হয়, প্রতিবাদ, আপত্তির মধ্যে দিয়ে ও যে আমাদের ওপরই নির্ভর করে আছে।

অবশ্য এই সম্পর্কের হিসেব দিয়েই সবকিছুর ব্যাখ্যা মিলবে না। জনগণ আর জোসেফিনের মধ্যে যে স্নেহ, দায়িত্ব আরে নির্ভরতার বন্ধন আছে, তার বাইরেও আরেকটা অদৃশ্য শক্তি কাজ করে – যেটা এত সহজে বোঝানো যাবে না। কারণ জোসেফিনের নিজস্ব, সম্পূর্ণ আলাদা একটা ধারণা আছে। আমরা ওকে রক্ষা করি সেটা ও মনেই করে না। বরং মনে করে ওই আমাদের রক্ষা করছে। আমাদের বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখে। আমার কঠিন সময় পার করে দেয়। আর সবটাই করে ওর গানের মধ্য দিয়ে। ওর দৃঢ় বিশ্বাস, ওর সম্মোহন করা সুরই আমাদের এক গভীর রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিক সংকটের অন্ধকার থেকে বের করে আনে। আমরা ওকে দুর্বল, অসহায় একজন মেয়ে হিসেবে দেখি যার জন্য যত্নের প্রয়োজন। আর এদিকে ও নিজেকে আমাদের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে দেখে।আমরা মনে করি ওকে আমরা আশ্রয় দিচ্ছি, আর ও মনে করে ও-ই হচ্ছে আমাদের আশ্রয়দাত্রী। দু’দলের দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎ থেকে এক আজব দূরত্ব তৈরি হয়। এর মধ্যে ভালোবাসা আছে, কিন্তু বোঝাপড়া নেই। নির্ভরতা আছে, অথচ নির্ভরতার অর্থ নিয়ে সহমতি নেই। এখানেই বোধহয় জোসেফিনের আসল রহস্য। ও আমাদের যতখানি প্রয়োজনের বস্তু, তারচেয়েও বেশি এক অপরিহার্য শক্তি। জোসেফিনের বিশ্বাস, ওর গান শুধু আমাদের সান্ত্বনা দেয় না – তার চেয়েও বড় কিছু করে। ও মনে করে, ওর সুর আমাদের দুর্ভাগ্যকে দূর করতে না পারলেও অন্তত সেই দুর্ভাগ্য সহ্য করার মতো শক্তি দেয়। অবশ্য কখনও কথাগুলো ঠিক এভাবে বলে না। অন্যভাবেও বলে না। ও এমনিতেই খুব কম কথা বলে। চারদিকে যখন সবাই কথা বলায় ব্যস্ত, নিজেদের মতামত, অভিযোগ আর ব্যাখ্যায় একে অপরকে ছাপিয়ে যেতে চায়, তখন ও চুপ করে থাকে। সেই নীরবতাই যেন ওর সবচেয়ে বড় বক্তব্য। ওর চোখের ঝলকই বলে দেয় অনেক কিছু। ঠোঁট শক্ত করে বন্ধ রাখার ভঙ্গিতেও ওর আত্মবিশ্বাসটা বোঝা যায়। আমাদের মধ্যে এরকম মানুষ খুব কমই আছে, যারা সত্যিই চুপ থাকতে পারে। আর সেই জন্যই জোসেফিনের এই নীরবতা আলাদা করে চোখে পড়ে। খারাপ খবর এলেই – আর জীবনে এমন দিন কম আসে না, যখন একটার পর একটা অশুভ খবর জমা হতে থাকে। এর মধ্যে কিছু সত্যি, কিছু মিথ্যে, কিছু আবার সত্যি-মিথ্যে মেশানো – আর ঠিক তখনই জোসেফিন উঠে দাঁড়ায়। এতক্ষণ ও ছিল ক্লান্তিতে কাহিল দুর্বল একটা মেয়ে। মুহূর্তের মধ্যেই ও পালটে যাবে। শরীর সোজা করে, গলা উঁচু করে চারপাশে তাকাতে থাকবে। ঠিক যেন ঝড় আসার আগে রাখাল ওর গরুর পালকে একবার দেখে নিচ্ছে – সবাই ঠিক আছে কি না, সবাই এখনও ওর আশ্রয়ে আছে কি না। সেই চোখে থাকে অদ্ভুত এক নিশ্চয়তা। বিপদ যাই হোক না কেন, ও আছে। ওর গান আছে। আর সেই জন্যই আমরাও টিকে আছি। অবশ্য এরকম দাবি তো শিশুরাও করে। ওদের নিজস্ব উচ্ছৃঙ্খল, লাগামহীন কল্পনার জগৎ থেকে। তবে জোসেফিনের দাবিকে এত সহজে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ ওর বিশ্বাসের পিছনে কল্পনার লাগামহীনতা একেবারেই নেই। ও অবশ্য আমাদের রক্ষাও করে না, শক্তিও দেয় না। যারা দুঃখ কষ্টে অভ্যস্ত, কঠোর সংযম করে চলে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, মৃত্যুর সঙ্গে পরিচিত, চারপাশের বেপরোয়া পরিবেশে ভীরু বলে মনে হতেই পারে কিন্তু আসলে সাহসী আর সৃষ্টিশীল, এই সব মানুষের ত্রাতা হিসেবে নিজেকে কল্পনা করে নেওয়া খুবই সহজ। এই সব মানুশরা বরাবরই যে কোনও উপায়েই নিজেদের রক্ষা করে এসেছে, হয়তো আত্মত্যাগের মূল্য দিয়েও। আমরা সাধারণতএইসব ইতিহাসের অনুসন্ধানে আগ্রহী হই না, কিন্তু ইতিহাসবিদরা আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যান। তবুও এই কথা ঠিক যে প্রত্যেক সংকটকালে আমরা জোসেফিনের গান বেশি মনোযোগ দিয়ে শুনি। যখনই কোনও আসন্ন বিপদের মধ্য দিয়ে আমরা যাই, ততই আমরা বেশি করে নম্র আর শান্ত হয়ে উঠি আর বেশি বেশি করে জোসেফিনের হুকুমদারির বশ হয়ে পড়ি। দল পাকাতে পারলে খুশি হই। একে অপরের কাছ ঘেঁষে দাঁড়াতে পারলে স্বস্তি বোধ করি, বিশেষ করে এসব করে আমাদের আসল যন্ত্রণাটা ভুলে থাকতে পারি।

কাছাকাছি ঘেঁষে দাঁড়াতে পারলেই আমরা আনন্দিত, বিশেষত যখন সেই বাহানাটি আমাদের মূল দুঃখ থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে রাখে। ঠিক যেন তাড়াহুড়ো করে পান করছি – হ্যাঁ ঠিক তাই – তাড়াহুড়ো করাটাই যেন জরুরি। লড়াইয়ে নামার আগে শান্তিসুধা শেষবারের মত পান করে নিচ্ছি। ঠিক গানের জলসা নয়, বরং গণসমাবেশ। এমন একটা সভা, যেখানে ওই শিস দেওয়ার মিহি আওয়াজটুকু ছাড়া পুরোপুরিই নিস্তব্ধ। মুহূর্তটা এতই গম্ভীর যে ফালতু গল্প করে সময় নষ্ট করার মানসিকতা আমাদের নেই।

ঠিক এইরকম একটা সম্পর্ক যে জোসেফিনকে খুশি করতে পারবে না, সেটা ঠিক। নিজের দোদুল্যমান চরিত্রের জন্য মনে মনে ছটফট করলেও, আসলে অনেক কিছুই ও দেখতে পায় না। অতিরিক্ত আত্মগরিমা ওকে অন্ধ করে রেখেছে। তাছাড়া ওকে দিয়ে আরও অনেক কিছুই নজরে না আনতে রাজি করাটা একেবারেই কঠিন নয়। আর এই ব্যাপারে একদল চাটুকর সদা তৎপর হয়ে থাকে। তাতে অবশ্য আমাদের খুবই উপকার হয়। তবে সভার এক কোণে বসে, সবার অলক্ষ্যে গান গেয়ে -সেই আত্মত্যাগ যতইবড় হোক না কেন - নিজের নজর কাড়ার অধিকার জলাঞ্জলি দেবার পাত্রীই ও নয়।

আর দরকারও পড়ে না। কারণ ওর শিল্পীসত্তা নজরে পড়তই। আসলে আমরা মূলত সম্পূর্ণ অন্য একটা বিষয় নিয়ে চিন্তিত, ওর গান নিয়ে ভাবিতই নই। অনেকে তো মুখ তুলেও তাকায় না, পাশের অনের গায়ে মুখ গুঁজে থাকে। মনে হবে জোসেফিনের সব পরিশ্রমই বৃথা। তবুও মানতেই হবে, ওর সেই মিহি সুরের কিছু একটা আমাদের ভেতরে ঠিকই এসে পৌঁছয়।যে কোনও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও, জোসেফিনের মিহি সুরটা শত্রুভাবাপন্ন দুয়ায় আমাদের নিজেদের দুর্দশাময় অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। তা সত্ত্বেও জোসেফিন কিন্তু দমে যায় না। বড় কোনও কৃতিত্ব না থাকলেও ওর অতিসাধারণ কণ্ঠস্বরই ওর অস্তিত্বটা টিকিয়ে রাখে, আমাদের মনে জায়গা করে নেয়। সেটাই আমাদের এক পরম শান্তি। কখনও যদি আমাদের মদ্যে সত্যিই একজন অসাধারণ গায়ক বা গায়িকার আবির্ভাব ঘটে, আমাদের কাছে সে অসহনীয় হয়ে উঠবে আর একযোগে আমরা এরকম একটা পরিবেশনার অর্থহীনতাকে প্রত্যাখ্যান করব। আমরা ওর গান শুনছি এটাই ওর গানের অসারতা প্রমাণ করে, জোসেফিনকে অন্তুত এই সত্য থেকে রেহাই দেওয়া হোক। সত্যিটা নিয়ে ওর মনে নিশ্চয়ই আবছা একটা ধারণা আছে, না হলে আমরা যে ওর গান শুনি, এই কথাটা মেনে নিতে ওর এত আপত্তি কেন? কিন্তু ও পরোয়া করে না। নিজের সুরের জোরে সব দ্বিধাকে উড়িয়ে দিয়ে ও গান গেয়েই যাবে!

তবুও বড় একটা সান্ত্বনা ওর আছে। কিছুটা গুরুত্ব দিয়ে ওর গান তো আমরা শুনি। হয়তো বড় মাপের শিল্পীর মর্যাদা দিয়ে। গানে এমন জাদু ফুটিয়ে তোলে, যা নামী শিল্পীও অনেক চেষ্টা করেও পেরে উঠত না। এই অসাধ্য সাধন কেবল ওর ভাঙা গলার পক্ষেই সম্ভব। আর এটার মূল কারণটা লুকিয়ে আছে আমাদের জীবনচর্যার মধ্যেই।

কিন্তু আমাদের লোকজন কেবল শিশুসুলভই নয়, অকালবৃদ্ধও বটে। এটা সত্যি যে, শিশুদের কিছু নির্দিষ্ট স্বাধীনতা আর নির্দিষ্ট গুরুত্ব দেওয়ার দাবি প্রায়ই করা হয় – যেমন কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চিন্ত থাকার অধিকার, কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই একটু ছোটাছুটি করা কিংবা খেলাধুলা করার অধিকার। এইসব অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে আর সেই অধিকার পুরণে সাহায্য করার কথা বলা হয়। এরকম দাবি উঠলে প্রায় সবাই একবাক্যে তা সমর্থন করে। সত্যি বলতে কী, এর চেয়ে ভালো দাবি আর হতেই পারে না। অথচ জীবনের রূঢ় বাস্তবে শিশুদের এই অধিকারটুকু দেওয়া সবচেয়ে বেশি অসম্ভব। দাবিগুলো আমরা মেনে নিই। নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা করে দাবিগুলো কার্যকর করার জন্য। তবে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা আবার পুরোনো অভ্যেসে ফিরে আসি। আসলে আমাদের জীবনযাত্রাটাই এরকম যে, বাচ্চা একটু হাঁটতে শিখে চারপাশটা চেনা শুরু করতে না করতেই ওকে বড়দের মতো নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। রুটি-রুজির টানে আমাদের এত জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে হয় যে চারদিকে শুধু অভাব আর অগুনতি শত্রু। বিপদ কখন কোথা থেকে আসতে পারে কেউ জানে না। তাই বেঁচে থাকার এই নির্মম লড়াই থেকে বাচ্চাদের আড়াল করে রাখা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। সেটা করতে গেলে বরং ওরা অকালেই শেষ হয়ে যাবে। এই মন খারাপ করা কারণগুলোর পাশাপাশি একটা ভালো দিকও আছে: সেটা হল আমাদের বিপুল বংশবৃদ্ধি। প্রতি প্রজন্মেই তো অগুনতি মানুষ। তাই একটা প্রজন্ম শেষ হতে না হতেই, পরের প্রজন্ম হুড়মুড়িয়ে নিজের জায়গা করে নেবার জন্য চলে আসে। শিশুদের বেশি দিন শিশু থাকার মতো সময়ই হয় না। অন্যান্য জনজাতির মানুষ অত্যন্ত সযত্নে শিশুদের বড় করে তোলে। ছোটদের জন্য স্কুল খোলে। ওখানকার শিশুরা, যারা দেশের ভবিষ্যৎ, ওই সব স্কুল থেকে তৈরি হয়ে বেরিয়ে আসে। বছরের পর বছর, দিনরাত যেন একই ধরণের বাচ্চাদের ঢল নেমে আসতেই থাকে। আমাদের কোনও স্কুল নেই। কিন্তু দেখতে না দেখতেই ঘরে ঘরে শিশুদের মেলা লেগে যায়। গলায় সুর ফোটার আগে পর্যন্ত কিচিরমিচির করে। হাঁটতে শেখার আগে পর্যন্ত হামাগুড়ি দেয়। আর নিজেদের চারপাশটা চিনে ওঠার আগে পর্যন্ত ভিড়ে গাদাগাদি করে সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। আমাদের বাচ্চারা! অন্যান্য স্কুলের মতো এখানে চেনা বাচ্চাদের পুনরাবৃত্তি হয় না। বরং একের পর এক নতুন নতুন বাচ্চার দল আসতেই থাকে। বিরামহীনভাবে, একদম অন্তহীনভাবে। একটা শিশুর দেখা পেতে না পেতেই ও বড় হয়ে যায়। অমনি হুড়মুড় করে পেছন পেছন চলে আসে এক ঝাঁক নতুন শিশুর দল। আনন্দে মাতোয়ারা, কিন্তু অগুনতি মুখের ভিড়ে কাউকে আলাদা করে চেনা যায় না। ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে যতই আনন্দের হোক না কেন, অন্যেরা আমাদের যতি হিংসে করুক না কেন, আমরা আমাদের শিশুদের সত্যিকারের শৈশবটা দিতে পারি না। ফলও আমাদের ভুগতে হয়। আমাদের সমাজে এক ধরনের গভীর, সহজে দূর করা যায় না এরকম শিশুসুলভ মানসিকতা এখনও টিকে আছে। যা আমাদের স্বভাবের সেরা বৈশিষ্ট্য – অর্থাৎ আমাদের অদ্বিতীয় সাধারণ অনুভূতিকে অগ্রাহ্য করে, মাঝে মাঝে আমরা বোকামি করে ফেলি, ঠিক যেভাবে শিশুরা অকারণে, অযথা, তাচ্ছিল্যভরে, কেবলমাত্র একটু মজা পাবার জন্য বোকার মতো কাজ করে থাকে। আমাদের যদিও এখন আর ওদের মতো মজা হয় না, তবুও ওদের মতো ছেলেমানুষী করবার স্বভাবটা রয়েই গেছে। আর আমাদের এই ছেলেমানুষী করার স্বভাব থেকে সব থেকে বেশি ফায়দা জোসেফিনই তুলত।

তবে এরকম স্বভাবের মানুষদের জোসেফিনের দেবার মতো বেশ অনেক কিছুই আছে। ওর জলসায় – বিশেষ করে সময়টা যদি কঠিন হত – দেখা যেত কেবল খুব অল্পবয়সিরাই এখনও ওকে গায়িকা হিসেবেই দেখত। অবাক হয়ে দেখত, ও কীভাবে ঠোঁট কুঁচকে, দাঁতের ফাঁক দিয়ে বাতাস ছেড়ে নিজের সুর সৃষ্টি করে আর নিজের সুরে নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায়। কীভাবে সেই ক্ষীণ হয়ে আসা সুর দিয়ে আরও নতুন নতুন কৃতিত্ব দেখাতে ব্যগ্র হয়ে উঠত। যেন নিজের সীমাকেও অতিক্রম করে যেতে চায়। তবে সাধারণ মানুষরা – ওদের বুঝতে অসুবিধে হয় না – ওরা নিজেদের ভেতরেই গুটিয়ে যেত। লড়াইয়ে যাবার আগে এই অল্প বিরতিটাই ওদের স্বপ্ন দেখার সময়। শরীরের টানটান ভাবটা যেন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। অস্থির, ক্লান্ত মনটা জনগণের উষ্ণ বিছানায় স্বস্তিতে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। স্বপ্ন দেখার মধ্যেই জোসেফিনের সরু স্বর দূর থেকে ভেসে আসছে। ও বলে গুনগুন করা, আর আমাদের কাছে হাপানোর আওয়াজ। যাই বলি না কেন, এই সময়েই ওর সুরের আসল মানেটা খুঁজে পাওয়া যায়। খুব কমই এরকম মুহূর্ত আসে যখন সংগীতকে প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। ওর এই সুরে থাকে আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কিছু স্মৃতি। আমাদের ব্যস্ত জীবনের একটা অংশও ওর সুরে থাকে। এমন একটা আনন্দ যাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। যা এখনও টিকে আছে, ধ্বংস করা যায় না। আড়ম্বর করে ঘোষণা করা নয়, বরং খুব চাপা গলায়, ফিসফিস করে বলা কথা। অন্তরঙ্গ, কখনও আবার একটু কর্কশ। এসবই এক ধরনের বাঁশির সুর। আর কী-ই বা হতে পারে? বাঁশির মতো এই সরল সুরই আমাদের ভাষা। তফাৎ কেবল এটুকুই – অনেকেই সারা জীবন্ধরে এই সুর তোলে, কিন্তু কী করছে সেটাই জানে না। কিন্তু জোসেফিনের দৈনন্দিন জীবনে এই সুর মুক্ত হয়ে আসে, আর অল্প সময়ের জন্য হলেও আমাদেরকেও মুক্ত করে। তাই আমরা এই পরিবেশনা হারাতে চাই না।

তবে এই অবস্থা থেকে জোসেফিনের দাবি, ও আমাদের নতুন শক্তি জোগায়, সেটা বেশ লম্বা রাস্তা। কথাটা সাধারণ মানুষদের জন্য সত্যি, জোসেফিনের চাটুকারদের জন্য নয়। ওরা তো সরাসরি তোষামোদের সুরে বলবে, “তাই যদি না হবে, তাহলে উনি এত লোক জড়ো করেন কীভাবে? আর সামনেই যখন সমূহ বিপদ রয়েছে? কেন সবাই ছুটে আসে, যখন এতে বিপদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে?”

‘তাহলে আর কীভাবেই বা বোঝানো যাবে,’ তারা একেবারে স্পষ্ট করে বলে, ‘কেন তিনি এত বিপুল জনসমাগম টানেন? বিশেষ করে যখন সামনে ভয়াবহ বিপদ উপস্থিত, তখনও মানুষ তাঁর দিকে এমনভাবে ছুটে আসে যে কখনও কখনও সেই বিপদের বিরুদ্ধে সময়মতো যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজও বাধাগ্রস্ত হয়।’ দুর্ভাগ্যবশত কথাটা সত্যি। তবে এটা জোসেফিনের গৌরবের অংশ বলা যায় না। বিশেষ করে যখন শত্রুর আক্রমণেই আমাদের জলসা দৈবাৎ ভেঙে যায় আর অনেক সঙ্গীই অনিবার্যভাবে প্রাণ হারান। সেটার জন্যে তো জোসেফিনকেই দায়ী করা চলে, কারণ শিস দিয়েই শত্রুকে ডেকে নিয়ে এসেছিল। অথচ নিজে নিরাপদ জায়গাতেই থাকে। অনুগতদের ঘেরাটোপে থেকে, নিঃশব্দে, খুব তাড়াতাড়ি পালিয়ে যায়। ভেতরে ভেতরে এই সত্যিটা সবাই জানে, কিন্তু তবুও পরের বারে আবারও ছুটে যাবে। যেখানেই হোক না কেন, যে কোনও সময়েই হোক না কেন, জোসেফিনের পছন্দের জায়গা হলেই হল। এর থেকে হয়তো সকলেই মেনে নেবে যে জোসেফিন সমস্ত আইনের ওপরে। ও যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। সবাইকে বিপদে ফেলে দিতে পারে। তবুও ওকে ক্ষমা করা হবে। যদি সত্যিই তাই হত, জোসেফিনের দাবিগুলোও বোঝা সম্ভব হত। আসলে এক অর্থে বলা যায়, জনগণ ওকে যে স্বাধীনতাটা দিয়েছে - অসাধারণ বিশেষ অধিকার, যা আর কাউকে দেওয়া হয় না আর যা নিজেদের নিয়মেরও বিরুদ্ধেও – ওকে যে কেউ বোঝে না সেটারই এক ধরণের স্বীকারোক্তি। ওরা যে ওকে বোঝে না সেটা জোসেফিনেরও অভিযোগ। ওরা ওর শিল্প নিয়ে অসহায়ভাবে মুগ্ধ। নিজেদের ওর যোগ্য বলে মনে করে না। তাই ওকে কষ্ট দেওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে যেন মরিয়া হয়েই এই বিশেষ ছাড়টা ওকে দিয়েছে। ওরা যেমন ওর শিল্প বুঝতে পারে না, মানুষটাকেও বুঝতে পারে না। সেই জন্যই ওর ইচ্ছে-অনিচ্ছেগুলোও নিজেদের কর্তৃত্বের আওতার বাইরে রেখে দিয়েছে। তবে কথাটা এভাবে বলাটাও সঠিক নয়। সম্ভবত ব্যক্তিগতভাবে জনগণ খুব সহজেই জোসেফিনের কাছে নতি স্বীকার করে নেয়। তবে কারও কাছেই যেমন ওরা নিঃশর্ত নতি স্বীকার করে না, জোসেফিনের কাছেও করে না। অনেক দিন ধরেই – হয়তো ওর শিল্পীজীবনের গোড়া থেকেই – গান গাইবে বলে অন্য সব ধরনের কাজের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাবার জন্য লড়াই করে এসেছে। ওর মতে, আমাদের উচিত ওকে রোজগারের চিন্তা থেকে এমনকি বেঁচে থাকার সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত সব দায়িত্ব থেকেই অব্যহতি দেওয়া। আর সম্ভবত গোটা বোঝাটাই জনগণের কাঁধে তুলে দিয়েছে। জোসেফিনের কিছু অন্ধ সমর্থক ছিল। ওরা মনে করত ওর এই অদ্ভুত দাবির মধ্যে নিশ্চয়ই যথেষ্ট যুক্তি আছে। তবে আমরা, সাধারণ জনগণরা, অন্যভাবে ভাবতাম। আমরা সরাসরি ওর বায়নাগুলো প্রত্যাখ্যান করে দিতাম। ওর দাবির সারবত্তাকে আমরা পাত্তাই দিতাম না। জোসেফিন বলে থাকে, কাজের চাপ নাকি ওর কণ্ঠস্বরের ক্ষতি করে। অথচ নিজেই স্বীকার করত যে গান গাওয়ার কষ্টের তুলনায় ওই সব কাজের চাপ তেমন কিছুই না। কিন্তু কাজের চাপের জন্য গান গাওয়ার পর যথেষ্ট বিশ্রাম নেবার সুযোগ পায় না। নতুন করে শক্তি সঞ্চারিত করতে পারে না। ক্লান্ত শরীরে গাইতে হয়, ফলে ওর শিল্পের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারে না। আমরা এক কান দিয়ে শুনতাম, অন্য কান দিয়ে বের করে দিতাম। আমরা নিজেদের এইসব বায়না নিয়ে বিচলিত হতেই দিতাম না। এই পাত্তা না দেওয়াটা এতই বোঝা যেত যে জোসেফিন হতবাক হয়ে যেত। দেখে মনে হত ও আপাতত হাল ছেড়েই দিয়েছে। নিজের নির্দিষ্ট কাজটা করে, গানও গায়। সাধ্য মতো ভালো করেই গায়। তবে এই শান্তি সাময়িক। কিছুদিনের মধ্যেই আবার নতুন শক্তি সঞ্চয় করে নিজের দাবি নিয়ে সোচ্চার হয়ে ওঠে। অসীম শক্তি ওর। তবে এখন মোটামুটি স্পষ্ট যে, মুখে ও যা দাবি করে, সেটা আসলে ওর লক্ষ্য নয়। কাজ নিয়ে ও ঘাবড়ায় না। আমাদের জাতের কাছে কাজকে ভয় পাওয়া একটা অজানা ব্যাপার। এমনকি দাবি মেনে নিলেও ও আগের মতোই জীবনযাপন করে চলে। কাজের জন্য ওর গানে কোনও বাধা আসত না। আর গানও তাতে আরও ভাল হয়ে উঠত না। আসলে ও চাইত ওর শিল্পকে প্রকাশ্যে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকৃতি দেওয়া হোক। যুগের পর যুগ লোকের মনে অমর হয়ে থেকে যাবে। এমন স্বীকৃত, যা ওর আগে কোনও শিল্পী পায়নি, এবং কেউ ওকে অতিক্রম করে যেতে পারবে না। লড়াইটা হয়তো অন্য দিক থেকে আরম্ভ করা উচিত ছিল। এখন ভুলটা বুঝতে পারছে। কিন্তু পিছু হটার উপায় নেই। তাহলে তো নিজের কাছেই মিথ্যে প্রতিপন্ন হয়ে পড়া। তাই ও দাবি আঁকড়ে থাকে, নইলে মনের জোর পাবে না।

ওর দাবি মোতাবেক সত্যিই যদি ওর অনেক শত্রু থাকত, তাহলে আঙ্গুল না নাড়িয়েই লড়াইটা বসে বসেই উপভোগ করতে পারত। আসলে ওর তেমন কোনও শত্রুই নেই। আপত্তি করার মতো এক-আধজন যদি থাকতও, সেই লড়াই দেখে খুব একটা মজা হত না। তখন মানুষ বিরল নির্মোহ মুখে এমন একটা ভাব করে থাকবে যেটা অন্য কোনও সময় প্রায় ওরা করেই না। ধরা যাক কেউ কেউ সেই দৃশ্য দেখে ভেতরে ভেতরে খুশিই হল। কিন্তু এরকম একটা নির্লিপ্ত অবস্থা ওদেরও হতে পারে এই অস্বস্তি থেকেই ভেতরে ভেতরে খুশি হওয়াটাকে উপভোগই করতে পারত না। দাবি কিংবা দাবির প্রত্যাখ্যান, কোনোটাই আসল কথা নয়। আসল ব্যাপারটা হল, দরকার পড়লে কী দৃঢ়তার সঙ্গে সমাজ নিজেদেরই একজন মানুষলে একঘরে করে দিতে পারে সেটাই। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হল কখনও আবার সেই মানুষকে অপত্য স্নেহের থেকেও বেশি মমতা, যত্ন আর বিনয় দিয়ে আগলে রাখে।

পুরো জনগণের বদলে যদি কেবল একটি মাত্র মানুষ থাকত, মনে হত যে সে কেবল জোসেফিনকে খুশি রাখার জন্যই ছাড় দিয়ে গেছে আর কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করে গেছে একদিন না একদিন যেন এই ব্যাপারে ইতি টানতেই হয়। প্রয়োজনের বাইরে গিয়েও মানিয়ে নিয়েছে, শুধু এই আশায় যে জোসেফিনের দাবি এমন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছবে যে সেটা মেনে নেওয়া সম্ভব হবে না। সরাসরি মুখের ওপরই না বলে দিতে পারবে। বাস্তবে কিন্তু মোটেও ব্যাপারটা সেরকম নয়। জনগণের এই ধরনের কৌশল করবার দরকারই পড়বে না। ওরা সত্যিই জোসেফিনকে শ্রদ্ধা করত। সেটা বহু পরীক্ষায় প্রমানিত। ওর দাবিগুলোই এমন বাড়াবাড়ি পর্যায়ের ছিল যে একজন শিশুও আন্দাজ করে নিতে পারত। এমনও হতে পারে, জোসেফিনের মনেও এই সন্দেহটা বাসা বেঁধেছিল। হয়তো ভেবেছিল, সবাই ইচ্ছে করেই ওকে প্রশ্রয় দেয় যাতে ভবিষ্যতে কখনও এক ধাক্কায় সব ফিরিয়ে দিতে পারে। আর এই সন্দেহ থেকেই প্রত্যাখ্যাত শিল্পী হিসেবে ওর যন্ত্রণাবোধ আরও তিক্ত, আরও গভীর হয়ে উঠেছিল।

মনের মধ্যে এই সন্দেহটা যদি থেকেও থাকে, ওকে লড়াই থেকে একচুলও নড়াতে পারেনি। বরং ইদানিং লড়াইটা আরও তীব্র হয়েছে। আগে ছিল শুধু কথার লড়াই। এখন নতুন নতুন হাতিয়ার তুলে নিয়েছে। ওর মনে হয় এগুলো আরও বেশি কার্যকর। আমাদের কিন্তু মনে হত, প্রতিপক্ষের নয়, ও নিজেরই বেশি ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

অনেকের ধারণা, জোসেফিন বুঝতে পেরেছে যে ওর বয়স বাড়ছে, ক্লান্তির ছাপ পড়ছে, তাই ও এত মরিয়া হয়ে উঠেছে। স্বীকৃতি লাভের লড়াইটা যেন শেষবারের মত জিতে নিতে পারে। আমার ধারণা অন্যরকম। সেটাই যদি হত, তাহলে ও আর জোসেফিনই থাকত না। নিজের চোখে ও বুড়িয়ে যায়নি। নিজের কন্ঠস্বরকে এখনও দুর্বল মনে করে না। বাস্তব পরিস্থিতি থেকে নয়, নিজের ওপর অটল বিশ্বাস আছে বলেই ও এই সব দাবি করে চলে। জয়ের মুকুটটা স্থানচ্যুত হয়েছে বলে সর্বোচ্চ সমান ফিরেইয়ে আনার জন্য ও মরিয়া নয়, বরং ও মনে করে ও এখনও সর্বোদ্দ সম্মানটাই পেয়ে চলেছে। ক্ষমতা থাকলে ও মুকুটটা আরও উঁচুতে তুলে রাখত।

জোসেফিন বাইরের বাধাকে পাত্তাই দেয় না। কিন্তু লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনে সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ কৌশলও ব্যবহার করতে ওর আপত্তি নেই। ওর কাছে একটাই সত্য – ওর দাবি ন্যায্য। তাহলে সেটা আদায়ের পথ নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? ওর বিশ্বাস, ভদ্রভাবে খেললে এই দুনিয়ায় জেতা যায় না। তাই গানের মঞ্চ ছেড়ে সে নেমেছে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে – যেখানে হারজিতটাই আসল। ওর সমর্থকেরা বলে, চাইলে ও এমন গান গাইতে পারে, যা সমর্থক থেকে সমালোচক – সবাইকেই ছুঁয়ে যাবে। কিন্তু ও শিল্পকে ছোট করবে না। আবার কাউকে খুশি করার জন্যও গান গাইবে না। তাই পরিস্থিতি বদলায় না। কিন্তু কাজ থেকে ছাড় পাওয়ার লড়াইয়ে ওর বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই। গানের স্বার্থেই। তবে গানটা এখানে ওর অস্ত্র নয়। এই লড়াইতে যে কোনও কৌশলই ওর কাছে বৈধ।

উদাহরণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাক, একটা গুজব ছড়াল, ওর দাবি না মানলে ও নাকি গানের জটিল অলংকারের অংশগুলো ছেঁটে দেবে। অলংকার নিয়ে আমি বিশেষ কিছু জানি না, তবে ওর গানে সেরকম কিছু আছে কিনা, সেটাও আলাদা করে টের পাইনি। তবু ঘোষণা করে দিল, এখনই পুরোপুরি তুলবে না, তবে ছোট করে দেবে। শুনতে পেলাম সেটাই নাকি করেছে। আমি অবশ্য আলাদা করে কিছু বুঝতে পারিনি। শ্রোতারাও আগের মতোই শুনল। অলংকার নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। ওর দাবির প্রতিও ওদের মনোভাবও একচুলও বদলালো না। তবে ওর এইসব ভাবনার মধ্যে একটা শিশুসুলভ আকর্ষণ আছে। ঠিক ওর চেহারাতেও যেটা আছে। একদিন বলল, আগের সিদ্ধান্তটা নাকি একটু বেশিই কঠোর হয়ে গেছে, তাই পরের অনুষ্ঠানে অলংকারসহই গাইবে। পরের আসরেই আবার মত বদলে ফেলল। এবার সত্যিই দীর্ঘ অলংকার বাদ দিয়ে দিল। ওর দাবি না মানা হলে আর ফেরাবে না। সিদ্ধান্ত বদলের ঘোষণা নিয়ে জনগণ অবশ্য তেমন গুরুত্বই দেয় না। প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের চিন্তায় ডুবে থাকে। শিশুরা অবিরাম বকবক করে যায়। বকুনি খায় কিন্তু পাত্তাই দেয় না, কারন সেই বকুনির মধ্যে স্নেহ মেশানো থাকে।

জোসেফিন কিন্তু সহজে হার মানার মেয়েই নয়। সেদিন যেমন জানাল, কাজ করতে গিয়ে পায়ে চোট লেগেছে। দাঁড়িয়ে না থাকলে ও নাকি গান গাইতে পারে না। তাই বাধ্য হয়েই এবার থেকে গানও ছোট করতে হবে। খুঁড়িয়ে হাঁটে, দু'জন ধরে নিয়ে আসে। অবশ্য কেউই বিশ্বাস করে না। শরীর যতই কোমল হোক, ও তো আমাদের মতোই খেটে খাওয়া মানুষ। সামান্য আঁচড় লাগলেই যদি খুঁড়িয়ে বেড়াতাম, তাহলে গোটা জাতটাই আর সোজা হয়ে হাঁটতে পারতাম না। তা সত্ত্বেও ওকে প্রায় বিকলাঙ্গের মতো করেই মঞ্চে আনা হয়। আর আগের থেকেও বেশি করুণ মুখে এসে হাজির হয়। সকলে কিন্তু আগের মতোই কৃতজ্ঞ চিত্তে, আনন্দের সঙ্গে ওর গান শোনে। গানটা শুধু তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল কিনা সেটা নিয়ে কেউই বিশেষ মাথা ঘামায় না।

চিরকাল তো আর খুঁড়িয়ে হাঁটার নাটক চালানো যায় না। তাই ওকে নতুন নতুন অজুহাত বের করতে হল। অবসাদ, মানসিক যন্ত্রণা, ভঙ্গুর শরীর। এখন শুধু জলসাই নয়, তার আগে একেবারে নাটক জমে ওঠে। জোসেফিনের চাটুকারের দল ওকে ঘিরে ধরে মিনতি করতে থাকবে – একবার অন্তত গান গাও। ভাব দেখায়, গান তো ও গাইতেই চায়, কিন্তু পেরে উঠছে না। ওকে সান্ত্বনা দেওয়া হয়, প্রশংসায় ভরিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে গান গাওয়ার কথা সেখানে ধরে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। চোখে জল, মুখে অসহায়তা—সবকিছুর শেষে সে রাজি হয়। কিন্তু গান শুরু করার ঠিক আগে মাথা নেড়ে জানিয়ে দেয়, না, হচ্ছে না। মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে। শেষমেশ, রহস্যময় অশ্রুভেজা চোখে, অসহায় মুখ করে রাজি হয়। কিন্তু গান শুরু করার ঠিক আগে মাথা নেড়ে জানায়, না, হচ্ছে না। মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে। তারপর আবার উঠে দাঁড়ায়। গান গায়। আমার অন্তত আগের চেয়ে আলাদা কিছু লাগে না। সমঝদার মানুষ হলে হয়তো গলায় হালকা একটা কাঁপুনি টের পেলেও পেতে পারেন। সেটাও বরং তার নাটককেই আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। যদিও সেটা আসলে ওরই জিত বলে মনে হয়। মজার ব্যাপার, অনুষ্ঠান শেষে ওকে আর মোটেই ক্লান্ত দেখায় না। ছোট ছোট দ্রুত পা ফেলে বেরিয়ে যায়। কারও সাহায্য নেয় না। আর ভিড়ের দিকে এমন নিরাসক্ত দৃষ্টিতে তাকায় মনে হয় যেন এই শ্রদ্ধাটুকুও ওর প্রাপ্য।

এভাবেই চলছিল সবকিছু। তারপর ঘটনাটা অন্যদিকে মোড় নিল। সেদিন জোসেফিনের মঞ্চে ওঠার কথা। কিন্তু ও উধাও। ওর চাটুকারের দল খুঁজল। তারপর অসংখ্য মানুষও ওর খোঁজে শামিল হল। সবাই ব্যর্থ। জোসেফিনের অন্তর্ধান। আর ও গান গাইতে চায় না। এমনকি কেউ এসে ওকে গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করে সেটাও চায় না। মনে হল এবারও সত্যি সত্যি আমাদের পরিত্যাগ করে চলে গেছে।

কী আশ্চর্য! এত বিচক্ষণ হয়েও এমন ভুল সিদ্ধান্ত নিল! যেন সিদ্ধান্ত নেবার মতো কিছুই ছিল না। অনিবার্য নিয়তি যেন ওকে চালিত করেছে। এই নিয়তির পরিণতি বিষণ্ণতায় ঘেরা। নিজেই নিজের গান থেকে সরিয়ে নিল। যে প্রভাব বিস্তার করে ও আমাদের হৃদয় আর চেতনাকে স্পর্শ করেছিল, সেটা নিজেই ধ্বংস করে দিল। আমাদের হৃদয়ের ভাষাই ও বোঝেনি, তাহলে এই প্রভাব ও অর্জন করল কীভাবে? ও হারিয়ে গেল। গান গাইতে অস্বীকার করল। আর জনগণ? ওরা শান্ত। হতাশা বলে কিছু দৃশ্যমান নেই। ঐক্যবদ্ধ সত্তার মতোই পথ চলতে লাগল। এমন এক জনগোষ্ঠী, যারা কেবল দিয়েই যায়, গ্রহণ করার স্বভাবটাই নেই। এমনকি জোসেফিনের কাছ থেকেও নয়।

জোসেফিনের গল্পের শেষটা এরকমই হবার ছিল। একটা সময় আসবে, ওর শিস দেওয়ার আওয়াজটা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে নীরব হয়ে যাবে। আমাদের দীর্ঘ যাত্রার ইতিহাসে জোসেফিন কেবল একটুখানি বিরতি। ওকে হারিয়ে ফেলার কষ্টও একসময় সামলে নেব। সহজ হবে না। সম্পূর্ণ নীরবতায় আমাদের সমাবেশগুলো তখন কীভাবে সম্ভব হবে? কিন্তু জোসেফিন থাকলেও কি সেগুলো নীরব ছিল না? ওর গাওয়া সেই আসল সুর কি সত্যিই আমাদের স্মৃতিতে রয়ে যাওয়া সুরের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল ছিল? ও যখন আমাদের মধ্যেই ছিল, তখনও ওর গান কি কেবল একটা স্মৃতিই ছিল না? এটাই কি তাহলে সেই কারণ নয়, যার জন্য আমাদের প্রজ্ঞায়, জোসেফিনের গানকে এমন উচ্চতায় তুলে রেখেছি, যেখানে তা আর কখনও হারিয়ে যেতে পারবে না?

শেষ পর্যন্ত হয়তো আমরা জোসেফিনকে তেমন করে হারাব না। আর জোসেফিন? যে পৃথিবীকে ও নিজের মতো করে এক অন্তহীন যন্ত্রণার জায়গা বলে ভেবেছে — বিশেষ মানুষের অদৃষ্টে লেখা যন্ত্রণা — সেখান থেকে মুক্ত হয়ে ও আনন্দের সঙ্গে মিলিয়ে যাবে আমাদের অগণিত নায়কদের ভিড়ে। ·