অনুবাদ : মৌসুমী বিলকিস

একসময় গ্যাংম্যান হিসেবে কাজ করতেন সেমিয়ন ইভানভ। তার ছোট্ট ঘরটি থেকে দশ ভার্স্ট গেলেই পড়ত রেল স্টেশন, অপরদিকের স্টেশনে যেতে গেলে বারো ভার্স্ট অতিক্রম করতে হতো। আগের বছর চার ভার্স্ট দূরে একটা তুলো-কল চালু হয়েছিল যার চিমনি বনভূমির ওপারে এমনভাবে মাথা উঁচু করে থাকত যেন-বা একটা নিরেট-ঘন ছায়া। চারপাশে বসতি বলতে দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য গ্যাংম্যানদের ছোট ছোট ঘর।

সেমিয়ন ইভানভের শরীর একেবারেই বিগড়ে গিয়েছিল। বছর নয়েক আগে তিনি এক সেনা অফিসারের পরিচারক ছিলেন, যুদ্ধ চলাকালীন অফিসারের ফাইফরমাশ খাটতেন। তীব্র রোদে ঝলসে, কনকনে ঠান্ডায় জমে, এক-এক দিনে অনিচ্ছাতেও ছল্লিশ বা পঞ্চাশ ভার্স্ট হেঁটে খিদেয় অবসন্ন হয়েছেন। তবু গরম, ঠান্ডা, বৃষ্টি বা ঝলমলে রোদ— আবহাওয়া যা-ই হোক-না কেন, হেঁটে যেতে বাধ্য করা হয়েছে তাকে। চারদিক থেকে ছুটেছে সাঁই সাঁই গুলি। ঈশ্বর করুণাময়! একটা গুলিও স্পর্শ করেনি তার শরীর।

সেমিয়নের সৈন্যদল একসময় একেবারে সম্মুখ সমরে পড়েছিল। পুরো একটি সপ্তাহ ধরে তুর্কিদের সঙ্গে চলেছিল খণ্ডযুদ্ধ। দুই বিবদমান সৈন্যবাহিনীর মাঝখানের দূরত্ব বলতে একটিমাত্র গভীর খাদ। ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত চলত অবিরাম গুলি বিনিময়। প্রতিদিন তিন-তিনবার ধোঁয়া ওঠা সামোভার এবং সেনা অফিসারের খাবার তাকে নিয়ে যেতে হতো সৈন্য শিবিরের রান্নাঘর থেকে যুদ্ধস্থল পর্যন্ত। তার চারপাশ দিয়ে সাঁই সাঁই গুলি ছুটে এসে নিষ্ঠুর শব্দে আছড়ে পড়ত পাথরে পাথরে। সেমিয়ন ভয়ে কেঁপে উঠতেন, কখনও-বা কেঁদেই ফেলতেন, তবুও নিজের কাজ করে যেতেন। সেনা অফিসাররা তার বিষয়ে বেজায় খুশি, কেননা তিনি জোগান দিতেন গরম গরম চা।

যুদ্ধ শেষে অক্ষত শরীরে ফিরে এসেছিলেন সেমিয়ন, যদিও শরীর বাতরোগে প্রায় অচল। এতসবের পরেও চরম দুঃখ পিছু ছাড়েনি। বাড়ি ফিরে জানতে পেরেছেন বৃদ্ধ বাবা, এবং চার বছরের ছোট্ট ছেলেটি আর নেই। সেমিয়ন এবং তাঁর বউ একেবারে নিঃস্ব বোধ করেছেন। যেন সমস্ত জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন, কিছুই যেন আর করতে পারবেন না। বাতে জর্জরিত শরীর নিয়ে চাষবাস করাও অসম্ভব। ফলে অন্য কোনও কাজের সুযোগ না-থাকায় গ্রামত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। কাজের সন্ধানে নতুন নতুন জায়গায় ঘোরাঘুরি শুরু করেছেন দু’জনে। কিছুদিন রেলপথ বরাবর খেরসন ও দনশ্চিনায় অবস্থান করেছেন, কিন্তু সুবিধে কিছুই হয়নি। শেষমেশ তার বউ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছেন আর সেমিয়ন একাই এদিক-সেদিক ঘুরেছেন।

একদিন ঘটনাচক্রে একটি রেল ইঞ্জিনে চড়ে যেতে যেতে যাত্রাপথের এক স্টেশনে সেমিয়নের মনে হলো স্টেশন মাস্টারের মুখ বড় চেনা। স্টেশন মাস্টারও তাকে দেখেছেন, পরস্পর তাকিয়ে আছেন পরস্পরের দিকে। এভাবেই কেটে গেছে কিছুক্ষণ। তার পর দু’জনে দু’জনকে চিনতে পেরেছেন। সেমিয়নের সৈন্যদলের এক অফিসার ছিলেন স্টেশন মাস্টার।

“ইভানভ না?” জানতে চেয়েছেন তিনি।

“হ্যাঁ, হুজুর।”

“তা, এখানে কী ব্যাপার?”

সেমিয়ন সব কথা বিস্তারিত জানিয়েছেন।

“সে তো হলো, এখন যাও কোথা?”

“আমি ঠিক জানি না।”

“গাধা কোথাকার! ‘জানি না’ মানে কী?”

“ওই, যা এতক্ষণ বলছিলাম, হুজুর। যাওয়ার নির্দিষ্ট কোনও জায়গা নেই। আমাকে একটা কাজ

খুঁজে পেতেই হবে, হুজুর।”

স্টেশন মাস্টার তার দিকে তাকিয়ে রইলেন, কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, তার পর বললেন, “আমি বলি কী, সেমিয়ন, কিছুদিন এই স্টেশনেই থাকো। আমার মনে আছে তুমি বিবাহিত। তা তোমার বউ কোথায়?”

“হ্যাঁ, হুজুর, বিয়ে করেছি। বউ কুর্স্ক-এর এক বিশাল ব্যবসায়ীর বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ

করে।”

“ঠিক আছে, এক কাজ করো, তোমার বউকে এখানে চলে আসতে লিখে দাও। রেলে যাতায়াতের জন্য একটা ফ্রি পাস দিয়ে দেবো। এই স্টেশনে গ্যাংম্যানের একটা পদ খালি আছে। আমাদের চিফ-এর কাছে তোমার জন্য তদ্বির করব।”

“সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব, হুজুর।” সেমিয়ন উত্তর দিয়েছেন।

সেমিয়ন এই স্টেশনেই ঘাঁটি গেড়েছেন; রান্নাঘরের কাজে সাহায্য করেছেন, জ্বালানি কাঠ কেটেছেন, স্টেশনের সামনেটা পরিষ্কার করেছেন এবং প্ল্যাটফর্মও ঝাঁট দিয়েছেন। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে তার বউ এসে গেছেন, আর সেমিয়ন বউকে নিয়ে একটা হাত-চালিত রেল-ট্রলিতে চেপে তার ছোট্ট ঘরে এসেছেন। ঘরটি একেবারে আনকোরা এবং উষ্ণতায় আরামদায়ক, অঢেল জ্বালানি কাঠের ব্যবস্থা-সহ। ছিল একটি সবজিবাগানও, আগের গ্যাংম্যানের; রেলপথের উঁচু বাঁধের দু’পাশে প্রায় আধা-দেসিয়াতিন পরিমাণ চাষের জমি। আনন্দে ভেসে গেছেন সেমিয়ন। চাষবাসের বাসনা আবার মাথাচাড়া দিয়েছে, একটি গরু ও একটি ঘোড়া কেনার স্বপ্নও দেখেছেন।

কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই তাকে দেওয়া হয়েছে—সবুজ এবং লাল পতাকা, দুটি লণ্ঠন, একটি শিঙা, একটি হাতুড়ি, নাট টাইট করার জন্য একটি রেঞ্জ, একটি লোহার গাঁইতি, একটি কোদাল, একটি ঝাঁটা, কিছু বোল্ট এবং পেরেক। তারসঙ্গে একটি নিয়মনীতির বই আর ট্রেনের টাইমটেবল। প্রথম দিকে রাতে ঘুমোতে পারতেন না সেমিয়ন, ফলে পুরো টাইমটেবিল মন দিয়ে মুখস্থ করে ফেলেছেন। ট্রেন আসার নির্ধারিত সময়ের দু’ঘণ্টা আগেই তিনি রেল ট্র্যাক ঘুরে ঘুরে দেখেছেন, যেটুকু তাঁর দায়িত্ব এলাকার মধ্যে পড়ে। তার পর নিজের ছোট্ট ঘরটির সামনের বেঞ্চে বসে শোনার চেষ্টা করেছেন রেল লাইনের কম্পন, বা দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের শব্দ। নিয়মনীতির বইটাও মুখস্থ করে ফেলেছেন, যদিও প্রতিটি শব্দ বানান করে করে পড়তে হয়েছে।

তখন গরমকাল, কাজকর্মও তেমন ভারী কিছু নয়, লাইন থেকে বরফ সরানোর ঝক্কি নেই, ট্রেন চলাচলও খুব কম। সেমিয়ন নিজের দায়িত্ব-এলাকার এক ভার্স্ট লাইন দু’বার করে দেখে নিয়েছেন, নাট-বল্টু ঢিলে হয়ে গেলে টাইট করে দিয়েছেন, রেলপথের লেভেল ঠিক আছে কি না দেখেছেন, জল নিষ্কাশনের পাইপগুলো পরীক্ষা করেছেন, তার পর ছোট্ট ঘরটিতে ফিরে নিজের কাজ করেছেন। একটাই শুধু সমস্যা—একটা ছোট কাজও নিজের ইচ্ছেয় করা যায় না, ওপরওয়ালার অনুমতি নিতে হয়। ক্রমে ক্রমে সেমিয়ন এবং তার বউ একঘেয়েমিতে বিরক্ত হয়ে উঠেছেন।

এভাবেই মাস দু’য়েক কেটে গেছে। সেমিয়ন তার চারপাশের গ্যাংম্যান পড়শিদের সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করেছেন। তাদেরই একজন অত্যন্ত বৃদ্ধ, যাকে অনেকদিন থেকেই চাকরি থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার কথা ভাবছিল কর্তৃপক্ষ। তিনি তার ছোট্ট ঘর থেকে বের হতেন না, সব কাজ করতেন তার বউ। আর-একজন গ্যাংম্যান, বয়সে তরুণ, আর তার ঘরটি স্টেশনের কাছে, রোগা কিন্তু পেটানো চেহারা। সেমিয়নের সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয় রেল লাইনের ওপর, দু’জনের ঘরের মাঝামাঝি জায়গায়, সেমিয়ন টুপি খুলে অভিবাদন জানান। “আপনার মঙ্গল কামনা করি, প্রিয় পড়শি আমার।”

পড়শি একবার সন্দেহের চোখে তাকিয়েছেন, “আপনি কেমন আছেন?”, বলেই বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না-করে পিছন ফিরে চলে গেছেন।

এরপর সেমিয়নের ও পড়শি যুবকের বউরাও পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছেন, সেমিয়নের বউ কুশল জিজ্ঞাসা করেছেন, কিন্তু পড়শি বউ কোনও উত্তর দেননি।

কোনও একদিন পড়শি বউ-এর সঙ্গে সেমিয়নের দেখা হয়েছে, সেমিয়ন বলেছেন, “হ্যাঁ গো বউ, তোমার বর তেমন কথাবার্তা বলে না, নাকি?”

মেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছেন, “এত কথা বলারই-বা কী আছে? প্রত্যেকেই কাজে ব্যস্ত। আপনি নিজের চরকায় তেল দিন। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করবেন।”

যাই হোক, মাসখানের পর তাদের সম্পর্ক কিছুটা সহজ হয়েছে। পড়শি তরুণ ভাসিলি এবং সেমিয়ন একসঙ্গে রেল লাইন ধরে হেঁটেছেন, কালভার্টের কিনারে বসে পাইপের ধোঁয়া ছেড়েছেন আর পরস্পরের জীবনের গল্প করেছেন। অবশ্য ভাসিলি বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থেকেছেন, আর সেমিয়ন বলেছেন নিজের গ্রামের কথা, যুদ্ধের দীর্ঘ অভিযানের নানান অভিজ্ঞতার কথা।

“আমার জীবনে দুঃখ-কষ্টের অভাব ছিল না”, তিনি বলেছেন, “ভাবতে অবাক লাগে, আমার তেমন করে সত্যিকারের বাঁচার মতো বাঁচা হয়নি। ঈশ্বর আমাকে সুখ দেননি, কিন্তু তিনি যা দেবেন তা-ই আমি মাথা পেতে নেব। এই তো হলো আসল কথা, প্রিয় ভাসিলি স্তেপানিচ।”

ভাসিলি স্তেপানিচ রেল লাইনের ওপর পাইপ ঠুকে ছাই ঝেড়েছেন, তার পর উঠে দাঁড়িয়েছেন, বলেছেন, “মানুষের পিছু নেয় ভাগ্য নয়, মানুষ। মানুষের চেয়ে নিষ্ঠুর কোনও জন্তু নেই পৃথিবীতে। নেকড়ে নেকড়েকে খায় না, কিন্তু মানুষ মানুষকে সহজেই গিলে খায়।”

“আরে না না, বন্ধু, এমন কথা বলতে নেই। নেকড়েও নেকড়েকে খায়।”

“মুখে যা এলো বললাম। কিন্তু কথা তো ঠিকই, মানুষের চেয়ে নিষ্ঠুর আর কেউ নেই। মানুষের ধৃষ্টতা আর লোভ না-থাকলে পৃথিবীটা বেঁচে থাকার মতো হতো। সবাই যেন হুল ফোটাতে চায়, কামড়ে খেয়ে ছিঁড়ে ফেলতে চায়।”

সেমিয়ন একটু চুপ করে থেকেছেন, তার পর বলেছেন, “জানি না, ভাই, তুমি হয়তো ঠিকই বলছ। অথবা ঈশ্বর হয়তো এরকমই চায়।”

“আসলে তোমার সঙ্গে এসব আলোচনার কোনও মানে হয় না। ঈশ্বরের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে সব দুঃখ-কষ্ট চুপচাপ সহ্য করে যাওয়ার মানে, বুঝলে ভাই, মানুষ না, পশুর মতো বেঁচে থাকা। এটুকুই বলার।” কথা শেষ হতেই বিদায় না-জানিয়েই হনহন করে হাঁটা লাগিয়েছেন ভাসিলি।

সেমিয়নও দাঁড়িয়েছেন, “ওহে পড়শি”, তিনি ডেকেছেন, “এত রাগ কীসের?” কিন্তু ভাসিলি ফিরেও তাকাননি, হেঁটে আরও দূরে চলে গেছেন।

সেমিয়ন তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকেছেন যতক্ষণ-না একটা বাঁক পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছেন ভাসিলি। তার পর বাড়ি ফিরে বউকে বলেছেন, “আরিনা, আমাদের পড়শি ছেলেটি কেমন যেন, ঠিক ভালো মানুষ বলা যায় না।”

তবে দু’জনের মধ্যে মনোমালিন্য হয়নি। পরে যখন আবার তাদের দেখা হয়েছে, সেই একই বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন।

“শোনো, দোস্ত, মানুষের জন্যই এই ছোট্ট ছোট্ট ঘরগুলোতে মাথা গুঁজে কোনওরকমে আমাদের থাকতে হচ্ছে।”

“তাতে ক্ষতিটা কী? এতটাও খারাপ নয়। এই ছোট্ট ঘরেও তো দিব্বি থাকা যায়।”, বলেছেন সেমিয়ন।

“এরকম ছোট্ট ঘরে বসবাস করা, তাহলে…বাহ!... তোমার অনেক অভিজ্ঞতা, কিন্তু শিখেছ অল্পই। জীবনে এতকিছু দেখেছ, কিন্তু বোঝোনি কিছুই। এইটুকু ঘরে গরীব মানুষদের গুঁজে দেওয়ার মধ্যে কীরকম মঙ্গল তুমি দেখতে পাচ্ছ? মানুষের বেশে নরখাদকরা তোমাকে গিলে খাচ্ছে। তোমার শেষ রক্তবিন্দুটুকু শুষে নিচ্ছে, যখন বুড়ো হয়ে যাবে তোমাকে ওরা ছুঁড়ে ফেলে দেবে, যেভাবে ওরা শূয়রকে ভুসি ছুঁড়ে দেয়। কত মাইনে পাও তুমি?”

“ওই তো, বারো রুবল, তেমন কিছু নয়, ভাসিলি।”

“আর আমি পাই সাড়ে তেরো রুবল। কেন? নিয়মমতো আমাদের মাসে পনেরো রুবল দেওয়ার কথা কোম্পানির, সঙ্গে জ্বালানি এবং আলোর ব্যবস্থাও। তা হলে বলো, কে ঠিক করল যে তুমি বারো আর আমি সাড়ে তেরো রুবল পাবো? ভালো করে ভেবে দেখ! তুমি বলছ কিনা এত কম পারিশ্রমিকের ওপর নির্ভর করে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে? ভেবে দেখো, আধ রুবল বা তিন রুবলের ব্যাপার না—পুরো পনেরো রুবল যদি তারা দিত তবুও ব্যাপারটা একই থাকত। শোনো, গত মাসে আমি স্টেশনে গেলাম। আমাদের ডিরেক্টরকে যেতে দেখলাম। হ্যাঁ, তাকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তার জন্য আলাদা একটা কামরা বরাদ্দ ছিল। তিনি কোচ থেকে নেমে এসে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিলেন… আমি এখানে বেশিদিন থাকব না, আমি কোথাও চলে যাব, কোথাও-একটা, যেদিকে দু’চোখ যায়।”

“কিন্তু যাবে কোথায়, ভাসিলি? বরং এতেই সন্তুষ্ট থাকো। এখানে তোমার ঘর আছে, প্রয়োজনীয় উষ্ণতা আছে, একটু হলেও চাষের জমি আছে। তোমার বউ-ও খুব পরিশ্রমী।”

“জমি! আমার জমিটা একবার ভালো করে দেখে এসো। জমিতে কিচ্ছু নেই—একফোঁটা সবুজও না। গেল বসন্তে কয়েকটা বাঁধাকপির চারা বসিয়েছিলাম। আসবি তো আই ঠিক সেই সময় ইন্সপেক্টর এসে হাজির। এসেই বললেন, ‘এগুলো কী লাগিয়েছ? আমাকে জানাওনি কেন? আমার অনুমতি ছাড়াই গাছ লাগালে? সব উপড়ে ফেলে দাও, শিকড়সুদ্ধ।’ ওইদিন তিনি মদ খেয়েছিলেন, মাতাল একটা। অন্যদিন হলে হয়তো কিছুই বলতেন না, কিন্তু সেদিন ওইরকম বললেন। ফল হলো জরিমানা, আমাকে তিন রুবল দিতে হলো।”

ভাসিলি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন, তার পর নিচু স্বরে বললেন, “আর একটু হলেই লোকটাকে খতম করে দিতাম।”

“তোমার মাথাগরম।”

“না, আমি মাথাগরম নই। আমি সত্যিটাই বলি আর ভাবি। দেখবে, আমার হাতেই ওর নাক ফাটবে একদিন। আমি ওপরওয়ালার কাছে নালিশ করব।” ভাসিলি সত্যিই নালিশ করেছিল।

একদিন ওপরওয়ালা, মানে চিফ অফিসার, রেল লাইন পরিদর্শনে এসেছিলেন। কেননা তিন দিন পর সেন্ট পিটার্সবার্গ-এর ক’জন হোমরাচোমরার এই রেল লাইন ধরে যাওয়ার কথা ছিল। ওই ব্যক্তিরা একটা তদন্ত কমিশনের মাথায় ছিলেন, ফলে তাদের যাত্রাকালের আগে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না দেখে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। রেল লাইনের জন্য নির্দিষ্ট পাথর বিছানো হলো, পথ সমতল করা হলো, স্লিপারগুলো সাবধানে পরীক্ষা করা হলো, পেরেকগুলো খানিকটা পোঁতা হলো, নাটগুলো আঁটা হলো, খুঁটিগুলোতে রং করা হলো, এবং লেভেল ক্রসিংগুলোতে হলুদ বালি ছিটানোর আদেশ দেওয়া হলো।

পড়শি বৃদ্ধ গ্যাংম্যানকে তার বউ ঘর থেকে বের করেছেন যাতে বৃদ্ধ আগাছা পরিষ্কার করতে পারেন। সেমিয়ন টানা এক সপ্তাহ ধরে কাজ করে গেলেন। তিনি সবকিছু গুছিয়ে নিলেন, নিজের কাফতানটি সেলাই করে নিলেন, পিতলের পরিচয় ফলকটি মেজেঘষে পরিষ্কার করলেন যতক্ষণ-না সেটি ঝকঝকে হয়ে উঠল। ভাসিলিও প্রচুর পরিশ্রম করলেন। হাতে চালানো রেল-ট্রলিতে চড়ে এসে পড়লেন চিফ অফিসার, চারজন রেলকর্মী ট্রলির হাতল ও লিভার চালাচ্ছিলেন আর ছয়টি চাকা শব্দ করে গড়িয়ে যাচ্ছিল। ট্রলির গতি ছিল ঘণ্টায় কুড়ি ভার্স্ট, তবুও চাকার অনবরত শব্দ থামছিল না। সেমিয়নের ছোট্ট ঘরটির সামনে এসে ট্রলি থামতেই, সেমিয়ন দৌড়ে বাইরে এলেন, সৈনিকসুলভ ভঙ্গিতে রিপোর্ট করলেন। সমস্তই ঠিকঠাক আছে বলে মনে হলো।

“এখানে কতদিন আছ?” চিফ অফিসার জানতে চাইলেন।

“দুসরা মে থেকে, হুজুর।”

“বেশ, বেশ। তা ১৬৪ নং ঘরে কে থাকেন?”

ট্রাফিক ইন্সপেক্টর, ওই ট্রলিতেই ছিলেন, উত্তর দিলেন, “ভাসিলি স্পিরিদভ।”

“স্পিরিদভ… স্পিরিদভ…ও, আচ্ছা! সেই লোকটা-না, যার বিরুদ্ধে একটা নোট পাঠিয়েছিলে গত বছর?”

“হ্যাঁ, ঠিক।”

“আচ্ছা! চলো, ভাসিলিকে এবার দেখতে হচ্ছে।”

রেলকর্মীরা ট্রলির হাতলে চাপ দিলেন, চলতে শুরু করল ট্রলি। সেমিয়ন ট্রলিটাকে চলে যেতে দেখলেন, ভাবলেন, “এদের সঙ্গে ভাসিলির একটা ঝামেলা হবেই।”

ঘণ্টা দুয়েক বাদে রাউন্ডে বেরোলেন সেমিয়ন। দূর থেকে দেখলেন একটা লোক হেঁটে আসছে। লোকটির মাথায় সাদা কিছু একটা। ভালো করে লোকটাকে খেয়াল করলেন সেমিয়ন। এ তো ভাসিলি! হাতে লাঠি, কাঁধে পোঁটলা, একটা রুমাল দিয়ে তার গাল-মাথা জড়ানো।

“কোথায় চললে?”, সেমিয়ন চেঁচিয়ে বললেন।

ভাসিলি একেবারে কাছে এসে থামলেন। তাকে খুব বিবর্ণ দেখাচ্ছিল, সাদা চকের মতো যেন, চোখদুটো অস্বাভাবিক। তার দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে, সেরকম কণ্ঠে বিড়বিড় করলেন, “শহরে… মস্কোতে… হেড অফিসে।”

“হেড অফিস! ও! বুঝেছি, অভিযোগ জানাতে যাচ্ছ। যেও না। ভুলে যাও, ভাসিলি।”

“না, সেমিয়ন, ভুলে গেলে চলবে না। ভুলে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। দেখো, আমার মুখে ঘুষি মেরেছে, রক্ত বের করে ছেড়েছে। আজীবন মনে থাকবে। ওদের ছেড়ে দেবো না।”

সেমিয়ন তার হাত ধরে বললেন, “ছেড়ে দাও, ভাসিলি। ভালো কথাই বলছি। অভিযোগ করে তোমার কিছুই উন্নতি হবে না।”

“উন্নতি! জানি, কিছুই বদলাবে না। ভাগ্য নিয়ে বলছিলে-না তুমি? ঠিকই বলেছিলে। কিন্তু কাউকে-না-কাউকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে।”

“কিন্তু, কী হয়েছিল বলো তো।”

“কী হয়েছিল? চিফ সবকিছু খুঁটিয়ে দেখছিল, এমনকি আমার ঘরের ভেতরে ঢুকেও দেখল। আগেই বুঝেছিলাম, আমাকে সে এতটুকু রেয়াত করবে না। ফলে সবকিছু ঠিকঠাক করে গুছিয়ে রেখেছিলাম। সে যখন চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে, ঠিক সেই সময় আমার অভিযোগের বিষয়টা তুললাম। অমনি সে চিৎকার করে উঠল, ‘সরকারি তদন্তদল আসছে আর তুমি আমাকে সবজি বাগানের অভিযোগ শোনাচ্ছ? প্রিভি কাউন্সিলর আসছেন, আর তুমি আমাকে বাঁধাকপি নিয়ে বিরক্ত করছ!’ আমি ধৈর্য হারালাম, দু’চারটে কথা বললাম। তেমনকিছু না কিন্তু, খুব সামান্যই কথা। কিন্তু তাতেই রেগে গেল, ঘুষি মারল আমার মুখে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম, কিছুই করলাম না, যেন-বা সে যা করেছে একদম ঠিক করেছে। ওরা চলে গেল, নিজেকে সামলে নিলাম, মুখ পরিষ্কার করলাম, তার পর বেরিয়ে পড়লাম।”

“আর তোমার ঘর?”

“আমার বউ ঘরেই থাকছে। কাজকর্ম সামলে নেবে। রেলের কাজ নিয়ে আমার আর কিচ্ছু যায় আসে না।”

ভাসিলি অযথাই পোশাক ঠিক করলেন, “বিদায়, সেমিয়ন। হেড অফিসে কেউ আমার কথা শুনবে কি না জানি না।”

“তুমি কি হেঁটেই যাবে ঠিক করেছ?”

“স্টেশনে গিয়ে একটা মালগাড়িতে উঠে পড়ার চেষ্টা করব। কালকেই মস্কো পৌঁছে যাব।”

দুই পড়শি পরস্পরকে বিদায় জানালেন। ভাসিলি ফেরেনি। রাতদিন খেটে কাজকর্ম সব একাই সামলালেন ওর বউ। কাজকর্ম করতে করতে ঘুমোনোর সময় পেলেন না, স্বামীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তৃতীয় দিনে তদন্ত কমিশনের সদস্যরা এসে গেল। একটি মালবাহী ভ্যান, দুটি ফার্স্ট-ক্লাস সেলুন-কোচের সামনে একটা ইঞ্জিন। কিন্তু তখনও ভাসিলির কোনো খবর নেই। চতুর্থ দিনে ভাসিলির বউ-এর সঙ্গে দেখা হলো সেমিয়নের। কেঁদে কেঁদে মুখ ফুলেছে, চোখদুটো লালচে।

“ভাসিলি ফিরেছে?”, জানতে চেয়েছিলেন সেমিয়ন। দুই হাত নেড়ে একটা ভঙ্গি করে, উত্তর না-দিয়েই চলে গেলেন ভাসিলির বউ।

বিশেষ এক ধরণের বাঁশ দিয়ে ছোটোবেলায় বাঁশি বানাতে শিখেছিলেন সেমিয়ন। আগুনে পুড়িয়ে বাঁশের ভেতরের শাঁস বের করে ফাঁপা করে নিতেন, প্রয়োজনমতো ছিদ্র বানাতেন, ফুটো করতেন, বাঁশের একপ্রান্তে মাউথপিস বসাতেন, তার পর এমন সুন্দর করে টিউন করতেন যে প্রায় যে-কোনও সুর বাজানো যেত। অবসর সময়ে বেশ কিছু বাঁশি তিনি বানাতেন, মালগাড়ির ব্রেকম্যানদের মাধ্যমে শহরের বাজারে পাঠাতেন। বাঁশি প্রতি তিনি পেতেন দুই কোপেক।

তদন্ত কমিশন যেদিন এলো ঠিক তার পরের দিন ছ’টার ট্রেনের দায়িত্ব বউকে দিয়ে বাঁশের লাঠি সংগ্রহের উদ্দেশে জঙ্গলে রওনা দিলেন সেমিয়ন। রেলপথের যে অংশ তিনি দেখভাল করেন তার একপ্রান্তে, যেখানে রেলপথটি হঠাৎ করেই একেবারে বেঁকে গেছে, সেখানে পৌঁছে রেলবাঁধ থেকে নেমে পাহাড়ের পাদদেশের জঙ্গলে ঢুকে পড়লেন। প্রায় আধা ভার্স্ট গেলেই একটা বড় জলাশয়। জলাশয়ের ধারে চমৎকার বাঁশের ঝাড়। একগোছা বাঁশের লাঠি কেটে বোঝা বানিয়ে সেমিয়ন ফিরতি পথে চললেন।

তখন সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, চারদিক এমন শান্ত যে পাখির কিচিরমিচির আর পায়ের নিচের শুকনো ডালপালা ভাঙার শব্দ তীব্রভাবে কানে লাগে। তাড়াতাড়ি হাঁটা দিলেন, তার মনে হলো যেন লোহা দিয়ে লোহার ওপর আঘাতের ঝনঝন শব্দ শুনতে পেলেন। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন। যে রেলপথে দেখাশোনা করেন তিনি সেখানে তো আজ কোনও কাজ চলছে না। তা হলে এর মানে কী?

জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি, সামনে উঁচু রেলবাঁধ। রেলবাঁধের ওপর একজন লোক উবু হয়ে বসে খুব ব্যস্ত হয়ে কিছু করছে। সেমিয়ন হামাগুড়ি দিয়ে লোকটার দিকে এগোতে লাগলেন। তার মনে হলো লোকটা রেল লাইনের নাটগুলো আলগা করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি দেখলেন, লোকটি উঠে দাঁড়াল, হাতে লোহার গাঁইতি। লোকটি একটা রেল উপড়ে ফেলেছে, যাতে লাইনটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেমিয়নের চোখে যেন কুয়াশা নেমে এলো, চিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু গলা দিয়ে একটা শব্দও বেরোল না। আরে, এ তো ভাসিলি! সেমিয়ন দ্রুত রেলবাঁধ বেয়ে উঠতে লাগলেন। ঠিক তখনই ভাসিলি শাবল আর রেঞ্জ নিয়ে গড়িয়ে পড়লেন বাঁধের অন্যদিকে।

“ভাসিলি, এই ভাসিলি, দয়া করে ওপরে উঠে এসো। রেঞ্জ আর গাঁইতি আমাকে দাও। দু’জনে মিলে লাইনটা জুড়ে দিই। কেউ কিচ্ছু জানতে পারবে না। ওপরে এসো। এসে পাপমুক্ত করো নিজেকে।”

ভাসিলি একবারও ফিরে তাকালেন না। জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

বিচ্ছিন্ন লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন সেমিয়ন। বাঁশের বোঝাটি মাটিতে ফেললেন। ট্রেন আসার সময় হয়ে গেছে, মালগাড়ি নয়, যাত্রীবাহী ট্রেন। তার কাছে কিছুই নেই যা দিয়ে তিনি ট্রেনটা থামাতে পারেন, একটি পতাকাও নাগালের মধ্যে নেই। একা একা তিনি লাইনটা মেরামত করতে পারবেন না, খালি হাতে বিচ্ছিন্ন নাটবল্টুগুলোও জুড়ে দিতে পারবেন না। এই মুহূর্তে একছুটে নিজের ঘরে চলে যাওয়া উচিত, ছুটে নিজের ঘরে গিয়ে লাইন মেরামতের যন্ত্রপাতি নিয়ে আসাই একমাত্র উপায়। “হে ঈশ্বর, সহায় হও!”, বিড়বিড় করলেন তিনি।

সেমিয়ন নিজের ঘরের দিকে প্রাণপণে দৌড়তে শুরু করলেন। হাঁপিয়ে উঠছেন, বার বার পড়ে যাচ্ছেন, তবু থামছেন না। জঙ্গল ছাড়িয়ে দৌড়চ্ছেন, তার ঘর তখন মাত্র কয়েকশো ফুট দূরে, খুব বেশি দূরে নয়, ঠিক তখন জঙ্গলের ওপারের কারখানায় ছ’টার সাইরেন বেজে ওঠে। আর মাত্র দু’মিনিটের মধ্যে সাত নম্বর ট্রেন আসবে। “হা ভগবান, নিরপরাধ মানুষগুলোকে দয়া করো!” সেমিয়ন স্পষ্ট দেখতে পেলেন ইঞ্জিনের বাঁ-দিকের চাকা বিচ্ছিন্ন রেলের সঙ্গে ধাক্কা খেল, প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠল, একপাশে কাত হয়ে স্লিপারগুলো ছিঁড়েফুঁড়ে ফেলল, ঠিক এখানেই, রেলপথ বাঁক নিয়েছে, আর রেলবাঁধটি সত্তর ফুট উঁচু, ইঞ্জিনটি সেখান থেকে গড়িয়ে পড়বে নিচে… থার্ড ক্লাস কামরাগুলো মানুষে গিজগিজ করছে… ছোট ছোট শিশু… নিশ্চিন্তে বসে আছে, কল্পনাও করতে পারছে না কী ভীষণ বিপদ তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। “হা ঈশ্বর! কী করব বলে দাও। না, ঘর থেকে যন্ত্রপাতি নিয়ে সময় থাকতে ফিরে আসা অসম্ভব।”

সেমিয়ন ঘরের দিকে গেলেন না, পিছন ফিরে আগের থেকেও জোরে দৌড়তে শুরু করলেন। যেন একটা যন্ত্রের মতো দৌড়চ্ছেন, অন্ধের মতো, কী করবেন নিজেও জানেন না। উপড়ে ফেলা লাইনের কাছে পৌঁছলেন, তার লাঠির বোঝাটাও ওখানেই পড়ে। ঝুঁকে পড়লেন, যন্ত্রচালিতের মতো একটা লাঠি তুলে নিলেন, আবার ছুটলেন। মনে হচ্ছিল ট্রেনটা যেন কাছে এসে গেছে। শুনতে পেলেন দূর থেকে ভেসে আসা হুইসল, শুনলেন নিস্তব্ধতাও, এমনকি লাইনের মৃদু কাঁপুনিও অনুভব করলেন। কিন্তু তখন তার সব শক্তি শেষ হয়ে গেছে, দৌড়নোর ক্ষমতা নেই, সেই ভয়ঙ্কর জায়গাটি থেকে ছ’ফুট দূরে থেমে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেল, আক্ষরিক অর্থেই ঝলকের মতো। মাথার টুপিটি খুললেন, সেখান থেকে একটা সুতির স্কার্ফ বের করলেন, বুটজুতোর ওপরে গোঁজা ছুরি টেনে বের করলেন, বুকের ওপর হাত এনে বাতাসে ক্রশ চিহ্ন আঁকলেন, বিড়বিড় করলেন, “আশীর্বাদ করো, ঈশ্বর!”

বাঁ-হাতের কনুই-এর একটু ওপরে ছুরিটা অনেকটা গভীরে ঢুকিয়ে দিলেন, ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ল, উষ্ণ স্রোতের মতো। রক্তে ভিজিয়ে নিলেন স্কার্ফ, ভাজ-পড়া স্কার্ফটি ঠিক করে নিলেন, লাঠির মাথায় বেঁধে নিলেন, লাল সংকেত-পতাকার মতো উঁচুতে তুলে ধরলেন।

পতাকা নাড়তে লাগলেন। ট্রেনটা ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। হয়তো চালক তাকে দেখতে পাবেন না—ট্রেন আরও কাছে চলে আসবে, এত ভারী একটা ট্রেন ছ’ফুটের মধ্যে থামানো সম্ভব নয়।

এদিকে তার হাতে অবিরাম রক্ত ঝরছে। ক্ষতস্থানের দু’পাশ চেপে ধরলেন, কিন্তু রক্ত ঝরা বন্ধ হলো না। তিনি আসলে বেশ গভীর ক্ষত করে ফেলেছেন। মাথা ঘুরতে লাগল, চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে লাগল কালো কালো বিন্দু, তার পর সব অন্ধকার। আর কানে একটানা ভোঁ ভোঁ শব্দ। তিনি ট্রেন দেখতে পাচ্ছেন না, ট্রেনের শব্দও শুনতে পাচ্ছেন না। তার সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে ছিল একটিমাত্র চিন্তায়, “আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। আমি পড়ে যাব, পতাকাটাও পড়ে যাবে। ট্রেন আমাকে পিষে দেবে। হা ঈশ্বর, সহায় হও।”

তার চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার, চেতনা লুপ্ত, পতাকা খসে পড়ল হাত থেকে; কিন্তু পতাকাটি মাটিতে পড়ল না। আর একজনের হাত পতাকাটি ধরে ফেলল, উঁচু করে ধরে নাড়তে লাগল এগিয়ে-আসা ট্রেন লক্ষ্য করে। ইঞ্জিনিয়ার পতাকা দেখতে পেলেন, রেগুলেটর বন্ধ করলেন, ইঞ্জিনের বাষ্পের গতি বিপরীতমুখী করলেন, ট্রেন ধীরে ধীরে থেমে গেল।

মানুষজন কামরা থেকে নেমে ভিড় জমালো। দেখল একজন অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে রেল লাইনের পাশের হাঁটার জন্য নির্দিষ্ট রাস্তায়, রক্তাক্ত, আর একজনের হাতের লাঠিতে রক্তমাখা কাপড় বাঁধা।

ভাসিলি চারদিকে তাকালেন। মাথা নিচু করলেন, বললেন, “আমাকে বেঁধে ফেলো। আমি রেল লাইন উপড়েছি।” ·


[মূলগল্প :The Signal by Vsevolod Mikhailovich Garshin]


লেখক পরিচিতি : ভসেভোলোদ মিখাইলোভিচ গারশিন (Vsevolod Mikhailovich Garshin) একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান রুশ লেখক, যার সাহিত্যজীবন ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী। ১৮৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করা এই লেখক উনিশ শতকের রুশ সাহিত্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পকার হিসেবে পরিচিত। তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিমাণ খুব বেশি নয়, তবে প্রতিটি গল্পই আবেগ ও ভাবনার দিক থেকে ভীষণ গভীর। তাঁর প্রথম গল্প 'ফোর ডেজ' (Four Days) প্রকাশিত হওয়ার পরেই তিনি রাতারাতি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। গল্পটি রুশ-তুর্ক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা, যেখানে একজন আহত রুশ সৈনিকের চার দিনের একাকী মানসিক যুদ্ধের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গারশিন যুদ্ধ এবং যুদ্ধের মানসিক যন্ত্রণাকে ভীষণ বাস্তবানুগভাবে রূপ দিয়েছিলেন।

মানুষ হিসেবে গারশিন ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল মনের । জীবনের শুরু থেকেই তিনি মানসিক অবসাদের শিকার ছিলেন, যা তাঁর লেখার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর গল্পগুলোতে প্রায়শই বিষাদ, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং মানসিক যন্ত্রণার কথা ফুটে ওঠে। 'দ্য সিগন্যাল' (The Signal) তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং বহুল পঠিত গল্প।

গারশিনের গল্পগুলো রুশ ছোটগল্পের রূপ ও গঠন তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। তাঁর লেখার ভঙ্গি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, নাটকীয় এবং সংবেদনশীল, যা পাঠকদের গভীরভাবে স্পর্শ করে। তাঁর লেখার মধ্যে সমকালীন রুশ সমাজের বিভিন্ন সমস্যা এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে ওঠে। 

জীবনের একটা পর্যায়ে তাঁর মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ স্তরে পৌঁছায়। ১৮৮৮ সালে, মাত্র ৩৩ বছর বয়সে, ভসেভোলোদ মিখাইলোভিচ গারশিন আত্মহত্যা করেন। যদিও তাঁর জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, তবে তাঁর সাহিত্যকর্ম রুশ সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

...............................
পাঠসূত্র :
গ্যাংম্যান: track-walker-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করেছি, কারণ এই শব্দটিই পরিচিত। রেল লাইন পাহারা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিম্নপদস্থ কর্মচারী।
ভার্স্ট (verst): একসময় রাশিয়ায় দূরত্বের একক হিসেবে ব্যবহৃত হতো; ১ ভার্স্ট প্রায় ১.০৬৭ কিলোমিটার বা ০.৬৬ মাইল।
দেসিয়াতিন (dessiatin): রাশিয়ায় একসময় ব্যবহৃত হতো ভূমি পরিমাপের একক হিসেবে; এক দেসিয়াতিন প্রায় ১.০৯ হেক্টর বা ২.৭ একর-এর সমান।
প্রিভি কাউন্সিল (Privy Councillors): রুশ সাম্রাজ্যের একটি আমলাতান্ত্রিক পদ।
কোপেক (kopek): রাশিয়ান পয়সা। একশ’ কোপেকে এক রুবল। রুশ শব্দ 'কোপিয়ো' (Kopeyo) থেকে কোপেক শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ বল্লম বা বর্শা। চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকে যখন এই মুদ্রা তৈরি শুরু হয়, তখন মুদ্রার গায়ে বল্লমহাতে এক অশ্বারোহীর ছবি আঁকা থাকত। সেখান থেকেই এর নাম হয়ে যায় কোপেক।
রুশ সাহিত্য বা গল্প-উপন্যাসে (যেমন তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি বা চেখভের লেখায়) সাধারণ মানুষের অতি ক্ষুদ্র হিসেব বা দারিদ্র্য বোঝাতে প্রায়ই এই 'কোপেক' শব্দের উল্লেখ দেখা যায়।
রুবল (Ruble): রাশিয়ান কারেন্সি।