সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৩

এলিস মুনরোর সাক্ষাৎকার : গল্পলেখার শৈলী

গল্পকার এলিস মুনরো এবছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি কানাডার নাগরিক। বয়স এখন ৮২ বৎসর। কিছুদিন আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন আর লিখবেন না। অবসর নিলেন। লিখতে শুরু করেছিলেন স্কুল জীবন থেকে।

এলিস মুনরোর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দি প্যারিস রিভিউ পত্রিকায়। সেটা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। এখন থেকে একুশ বছর আগে।  সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মোনা সিমসন ও জেন ম্যাককুলচ।
এই সাক্ষাৎকারটি ২১ বছর আগে প্রকাশিত হলেও তার তাৎপর্য এখনও ফুরিয়ে যায়নি। একজন গল্পকারের লেখার ভুবনটি, লেখার শৈলীটি লেখক ও পাঠকের জন্য অবশ্য পাঠ্য হয়ে ওঠে যখন লেখক তাঁর কালকে অতিক্রম করে যান।
মূল লেখাটি অনুবাদ করছেন গল্পপাঠ অনুবাদ টিম। অনুবাদে ভাবের দিকটি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আক্ষরিক আঙ্গিককে নয়। 




এলিস মুনরোর সাক্ষাৎকার : গল্পলেখার শৈলী
সরাসরি নিউ ইয়র্ক থেকে ক্লিন্টন শহরে কোনো প্লেন নেই। ক্লিন্টন শহরটি কানাডার অন্টারিও রাজ্যে  অবস্থিত। এই শহরটিতে মাত্র ৩০০০ লোক বাস করে। এর মধ্যে এলিস মুনরো বাস করেন বছরের অধিকাংশ সময়ে। 

জুন মাসের এক খুব সকালে আমরা 
 নিউ ইয়র্কের লাগুর্ডিয়া এয়ারপোর্ট ত্যাগ করি। টরেন্টোতে গিয়ে একটি গাড়ি ভাড়া করি। তিন ঘন্টা গাড়ি চালানোর পর দেখতে পেলাম রাস্তাগুলো খুব ছোটো থেকে কেবল আরো ছোট হয়ে যাচ্ছে। একটা গ্রামের পথে চলে গেছে। সন্ধ্যার দিয়ে এভাবে চলার পরে আমরা একটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। এই বাড়িটিই এলিস মুনরোর। তিনি তার দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে থাকেন। ভদ্রলোকের নাম গোবি ফ্রেমলিন।

বাড়িটির পেছনে একটি উঠোন আছে। আছে অদ্ভুত একটি  ফুল বাগান। এই বাড়িটিতেই এলিস মুনরোর দ্বিতীয় স্বামী ফ্রেমলিন জন্মেছেন কথা বলার ফাঁকে এলিস মুনরো রান্নাঘরে- রাতের খাবার বানাচ্ছিলেন। অতি সাধারণ সে খাবার। খাবার থেকে স্থানীয় সব্জির ঘ্রাণ আসছিল।

এলিস মুনরোর খাবার ঘরের ফ্লোর থেকে ছাদ অব্দি বই আর বই। এক পাশে ছোটো একটি টেবিল। তার উপরে সেকেলে একটি টাইপ রাইটার। এখানেই এলিস মুনরো লেখালেখির কাজ করেন। 

কিছুক্ষণের মধ্যেই এলিস মুনরো আমাদেরকে নিয়ে এলেন গোদ্রিজ শহরে। এটা একটু বড় শহর। সেখানে বেডফোর্ড হোটেলে আস্তানা গাড়ি।   আদালত বিল্ডিং পার হয়ে হোটেলটিতে যেতে হয়। হোটেলটি একটা উনিশ শতকের বিল্ডিং। ঘরগুলি বেশ ভালো। জোড়া ঘর। কোনো এয়ার কন্ডিশন নেই।

এরকমই একটি ঘরের কথা এলিস মুনরো লিখেছিলেন তাঁর একটি গল্পে। গল্পটিতে লিখেছিলেন
এ রকম একটি ঘরে থাকতেন একজন লাইব্রেরীয়ান অথবা একজন স্কুল শিক্ষক থাকতেন।

পরের দিন এলিস মুনরোর বাড়িতে তাঁর সঙ্গে আমরা কথাবার্তা বলি। এই আলাপের সময়ে  টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করিনি
। নিজের বাড়িতে এলিস মুনরো গল্পগুজব করতে অপছন্দ করেন না। কিন্তু সাক্ষাৎকার দিতে রাজী নন। সাক্ষাৎকারের জন্য তিনি আমাদের হোটেলের ছোটো ঘরটিই বেছে নেন। তাঁর সোজা কথাবাড়ির ঘরে বসে কথা বলা যায় না। সংসারের নানা ধরনের ব্যাপার মনোযোগ ছিন্ন করে। 

এলিস মুনরো আর এলিস মুনরোর স্বামী দুজনই এশহর থেকে থেকে বিশ মাইল দুরত্বের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। আশেপাশের প্রায় প্রতিটি বাড়ির ইতিহাস তাঁদের নখদর্পণে। গোড্রিচে একটা গ্রন্থাগার আছে। তবে সবচেয়ে কাছের বইয়ের দোকানটা ক্রেমলিন শহর থেকে ত্রিশ মাইল দূরে। জায়গাটি তিনি ভালোবাসেন। এজায়গায় তিনি খেয়েপরে বড় হয়েছেন। ফলে এখানের জন্য এক ধরনের মায়া আছে।

এ এলাকার সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে কিছু খোঁজ খবর জানতে চাইলাম তাঁর কাছে। এলিস মুনরো আমাদেরকে একটা পুরনো-ভাঙা পোড়ো বাড়ির পাশে নিয়ে গেলেন। বাড়িটাতে একজন লোক কুঁজো হয়ে বসেছিল। তার গায়ে জামা ছিলনা। কয়েকটা বিড়াল পরিবেষ্টিত হয়ে একটা টাইপরাইটারের উপর উবুড় হয়ে বসেছিলেন। এলিস মুনরো লোকটিকে দেখিয়ে বললেন, প্রতিদিন ঝুল বারান্দায় একে বসে থাকতে দেখি। রোদ বৃষ্টিতেও তার নড়ন চড়ন নাই।এলিস মুনরো বলছিলেন, "লোকটাকে আমি চিনি না। সে এখানে কি করে জানি না। জানার অনেক চেষ্টা করেছি। উনি কী লিখছেন আমার জানার খুব ইচ্ছে। এখনো জানতে পারিনি।

যে বাড়িটিতে এলিস মুনরো বেড়ে উঠেছিলেন সে বাড়িটিতে শেষ দিন গিয়েছিলাম। এলিস মুনরোই যাওয়ার হদিশ বলে দিয়েছিলেন। একারণে খুঁজে পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। কয়েকটি কানাগলি পার হয়ে সেখানে পৌঁছেছিলাম।

বাড়িটা তাঁর বাবা বানিয়েছিলেন। ওখানে উনি শেয়ালের ফার্ম আর পশমের কারখানা খুলেছিলেন। একটা কাঁচা রাস্তার শেষ মাথায় ইটের সুন্দর বাড়িটার অবস্থান। বাড়িটার সামনে একটা খোলা মাঠ। মাঠটাতে একটা ছোটো বিমান দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেখান থেকে হাওয়ার চাঞ্চল্য টের পাওয়া যায়। বোঝা যায় বিমানটি চালানো হয় না বেশ কিছুদিন। বিমানটা দেখে আমাদের মনে হচ্ছিল বিমানচালক একজন গ্রাম্যবউকে নিতে এসেছে। ঠিক এরকম একটো বিমানের গল্প লিখেছেন এলিস মুনরো তাঁর "হোয়াইট ডাম্প-এ। "হাউ আই মেট মাই হাজবেন্ড" গল্পে লিখেছিলেন--একজন যুবক বিমানচালক স্টান্টম্যান একটা মাঠে বিমান নিয়ে নেমেছে।
অন্টারিও রাজ্যের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি অনেকটাই আমেরিকার মিডওয়েস্টের মতো। এলিস মুনরো অতি সাধাসিধে। রসবোধে পরিমিত। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণকালতক তিনি সাতটি ছোটগল্প সংগ্রহ ও একটি উপন্যাসও লিখেছেন। তিনি তখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটা পুরষ্কার পেয়েছেন। তার মাঝে আছে কানাডার সবচেয়ে সম্মানজনক সাহিত্য পুরষ্কার "গভর্নর-জেনারেল পুরষ্কার", "ও-হেনরি পুরষ্কার" ইত্যাদি। তিনি দি নিউ ইয়র্কার-এর নিয়মিত লেখিকা। তাঁর গল্প নিয়মিত আমেরিকার শ্রেষ্ঠ ছোট গল্পসংগ্রহগুলোতে প্রকাশিত হয়। এত সব সম্মানজনক অর্জন সত্ত্বেও এলিস মুনরো খুবই বিনয়ী। তাকে দেখে মনেই হয় না তিনি এতো মহান কিছু লিখেছেন—পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর মাঝে বিখ্যাত লেখকসুলভ কোন ঔদ্ধত্য বা উন্নাসিকতা নেই। তাঁকে দেখলে বিখ্যাত লেখকগোছের কেউ মনেও হয় না। মনে হয় সবে লিখতে শুরু করেছেন। নিজের লেখা সম্পর্কে তিনি বলেন—এটা তেমন কঠিন কাজ না। যে কোনো লেখকই একটু চেষ্টা করলে এরকম লিখতে পারেন। এলিস মুনরো কথাটা শুনতে সহজ হলেও কিন্তু করাটা কঠিন। তাঁর লেখার যে এক ধরনের সরলতা আছে তা তিনি বহু বছর ধরে অনেক লেখালেখি করার পরেই অর্জন করেছেন। একটু একটু করে হাত পাকিয়েছেন। বস্তুত তাঁর লেখার সহজতা ও সরলতা অত্যন্ত বিরল। সিন্থিয়া ওজিক বলেছেন “তিনি আমাদের চেখভ এবং তিনি তাঁর আর সব সমসাময়িকদেরও ছাড়িয়ে যাবেন।"
------------------------------------------------------------------------------------------------------

 সাক্ষাৎকার : প্রথম পর্ব

সাক্ষাৎকারগ্রহণকর্তা : আপনি যে বাড়িটাতে বড় হয়েছিলেন আমরা আজ সকালে সেখানে ঘুরতে ঙ্গিয়েছিলাম। আপনি কি আপনার গোটা শৈশবকালটা ওখানটায় কাটিয়েছেন?

এলিস মুনরো : 
আমার বাবা মরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত পর্যন্ত ঐ বাড়িতে ছিলাম। বাবা ঐ বাড়িটির কাছেই একটি খামার গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে শিয়াল পালতেন। আর পশম তৈরী হত। এখন বাড়িটা সেরকম আর নেই। অনেকটাই পালটে গেছে। এখন সেখানে একটা বিউটি পার্লার হয়েছে। এটা কালের পরিবর্তন। আমার ধারণা বাড়ির পিছনে যে রান্নাঘরটা ছিল তা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।
 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকর্তা : তারপর কি আপনি সেখানে গিয়েছেন?

এলিস মুনরো :
না। যাইনি। তবে যদি ঐ বাড়িটাতে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেলে আমি যেতাম। গেলে বসার ঘরটা একটু দেখতাম। অই ঘরটাতে আমার বাবা ঘর গরম করার একটা ফায়ার প্লেস বানিয়েছিলেন। ওটা আমার দেখার ইচ্ছে করে। মাঝে মাঝে ভাবি বাড়িটাতে একবার যাব। গিয়ে সেখানে পার্লারে ঢুকবো। সেখানে আমার নখগুলো কেটে সাজিয়ে নিয়ে আসব।


সাক্ষাৎকারগ্রহণকর্তা : আমরা ঐ বাড়ির সামনের মাঠটাতে একটা বিমান দেখেছিলাম। ওটা দেখে আপনার "হোয়াইট ডাম্প" আর "হাউ আই মেট মাই হাজবেন্ড" গল্পগুলোর কথা মনে পড়ছিল।

এলিস মুনরো :
হ্যা। মাঠটা কিছু দিনের জন্য বিমানবন্দর ছিল। ঐখানের খামারটার মালিকের বিমান উড়ানোর শখ ছিল। তিনি একটা ছোট্ট বিমান কিনছিলেন। চাষবাস ওনার পছন্দ ছিল না। তাই উনি চাষবাস বাদ দিয়ে ফ্লাইট ইন্সট্রাক্টর হন। উনি আমার দেখা সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান ও সুদর্শন পুরুষদের একজন। উনি এখনও বেঁচে আছেন। পঁচাত্তর বছর বয়সে লোকটি অবসর নেন। সম্ভবত অবসরের তিন মাসের ভেতরে তিনি ভ্রমণে বের হন। তখন একটা সব অদ্ভুত রোগে পড়েছিলেন। গুহা-গহব্বরে যে সব বুনো বাদুড় থাকে তারা এই রোগটি ছড়ায়।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকর্তা : আপনার প্রথম গল্পের বই ডাঞ্চ অফ দা হ্যাপি শেডস
। এ বইতে আপনার শৈশবের স্মৃতি জড়ানো  এই এলাকাটার খুব স্পষ্ঠভাবে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি শোনা যায়। আপনার জীবনের কোন সময়কে নিয়ে এই গল্পগুলোলিখছিলেন?

এলিস মুনরো : 
ওই গল্পগুলা পনেরো বছর ধরে লিখছিলাম। এর মধ্যে প্রথম গল্পটির নাম "দা ডে অফ দা বাটারফ্লাই। ওটা লেখার সময় আমার বয়স ছিল একুশ। আমি বেশ ভালো মনে করতে পারি "থ্যাংকস ফর দা রাইড গল্পটি লেখার সময়টিকে। সে সময়ে আমার প্রথম সন্তান আমার পাশে একটি দোলনায় শুয়ে থাকত। তখন আমার বয়স মাত্র ২২। "দা পিচ অফ উট্রেশট" লিখেছিলাম ত্রিশের ভেতর। তারও অনেক পরে লিখেছিলাম "ইমেজ"। আমার বয়স যখন ৩০ পার হয়ে গেছে তখন লিখেছি ওয়াকার ব্রাদারস কাউবয় গল্পটি। এটা ঐ বইয়ের শেষ গল্পটি। এই গল্পটি আসলে অনেক দিন ধরে লেখা হয়েছে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকর্তা : ওই গল্পগুলা এখন আপনার কেমন লাগেঐ গল্পগুলি কি আবার মাঝে মাঝে পড়ে দেখেন? 

এলিস মুনরো : 


ওই বইটাতে “দা শাইনিং হাউজ" নামে একটা গল্প আছে, ওটা আমার প্রথম দিকের লেখা। গল্পটি আমি পড়েছিলাম টরেন্টোতে বছর দুই তিন আগে। টরেন্টোর হারবার ফ্রন্ট থেকে বহু বছর ধরে একটি পত্রিকা বের হয়। নাম টামারাক রিভিউ। ওখানে আমি আগে লিখতাম। এই পুরনো ওইতিহ্যবাহী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তারা একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেখানে ঐ পত্রিকায় সেই বহু বছর আগে প্রকাশিত আমার “দা শাইনিং হাউজ গল্পটি পড়েছিলাম। গল্পটি এতোদিন পরে পড়া ছিল আমার জন্য খুব কঠিন কাজ।

আমার ধারণা আমার বয়স যখন মাত্র ২২ বছর তখন গল্পটি লিখেছিলাম। গল্পটি পড়ার সময় ধীড়ে ধীরে আমি একটু একটু করে গল্পটি সংশোধন করছিলাম। আমার চোখে পুরনো দিনের লেখার শৈলীটি ধরা পড়ছিল। মনে হয়েছিল এই লেখার শৈলী সেকেলে এবং অতি সাধারণ। এক একটা প্যারাগ্রাফ পড়ছিলাম আর ঠিক করছিলাম। কিন্তু একটি অনুষ্ঠানে গল্প পড়ার সময়ে পুরোটা সংশোধন করা সম্ভব নয়। অতো সময় পাওয়া যায় না। আমি যখনই পুরনো লেখা পড়ি তখনই এরকম অনেক কিছু দেখতে পাই যা আমি এখন আর লিখি না। বাতিল করে দিয়েছি। লোকজন পঞ্চাশের দশকে এই ধরনের শৈলী ব্যবহার করত।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকর্তা : আপনি লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর তা কি ফের সংশোধন করেন? পূনর্লিখন করেন? যেমন প্রুস্ত তাঁর "রিমেম্ব্রান্স অফ থিংস পাস্ট" বইটির প্রথম খণ্ডটি মরার আগে নতুন করে আবার লিখেছিলেন।

এলিস মুনরো : 


জ্বী। আমি এটা আমি করি। ধরুন--হেনরি জেমস তার পুরনো লেখাগুলি খুঁটে খুঁটে পড়তেন। কোনো লেখাতে যখনই তিনি কোনো ধরনের অস্পষ্ট ভাব দেখতেন বা মনে করতেন যে তিনি যা বলতে চাইছেন তা সহজ করে বলতে পারছেন না। খুব প্যাচালো ও জটিল হয়ে উঠছে। পাঠক তার লেখাটির ভাব ধরতে পারবেন না। তিনি তখন এগুলো ঠিক করে দিতেন। সহজ সাধারণ স্পষ্ট করে আবার লিখতেন।

এধরনের কাজ আমিও করি। আমার ছোটো গল্প "ক্যারিড অ্যাওয়ে" গল্পটা ১৯৯১র সেরা মার্কিন ছোট গল্প সংগ্রহে প্রকাশ হয়েছিল। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরে গল্পটি বারবার পড়ে দেখছিলাম। ওটা পড়ার পর মনে হয়েছিল একটা অনুচ্ছেদ বদলানোর দরকার। অনুচ্ছেদটি খুবই ছোট। মাত্র দুলাইনের। তবে ছোটো হলেও তা ছিল গল্পটির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। চোখে পড়া মাত্র আমি কলম ধরে অনুচ্ছেদটি নতুন করে লিখেছিলাম। লিখেছিলাম বইটির মার্জিনে। তখন তখনই এই সংশোধন কাজটি করে ফেলেছিলাম যাতে করে বইটির নতুন সংস্করণে ভুলটি পাঠকের চোখে আর না পড়ে। মাঝে মাঝে আমি এরকম করে আমার গল্পগুলো খুঁটে খুঁটে দেখি। বুঝতে পারি আমি যখন গল্পগুলি লিখেছিলাম তখন এক ধরনের ঘোরের মধ্যে থেকে লিখেছি। ফলে কিছু কিছু ফাঁক ফোকর থেকে গেছে। কিন্তু এখন যখন গল্পগুলো পড়েছি তখন তো আর ঘোরের মধ্যে নেই। গল্পের সেই নির্মাণ সময়ের উত্তেজনার মধ্যেও নেই। নতুন একজন পাঠক অথবা সমালোচকের চোখে নতুন করে দেখতে পাই। ভুল ধরা পড়ে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকর্তা : আপনি একবার বলছিলেন যে আপনার লেখা শেষ না হলে তা কোন বন্ধুকে দেখান না।

এলিস মুনরো :  ঠিকই বলেছেন। যখন আমি লিখছি কোনো গল্প
যতক্ষণ না পর্যন্ত আমার গল্পটি সম্পূর্ণভাবে লেখা না হয় ততক্ষণ অব্দি কাউকে দেখাই না। 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকর্তা : সম্পাদকদের উপর আপনি কতটা নির্ভর করেন? 

এলিস মুনরো : 
সম্পাদনা নিয়ে আমার প্রথম বড় অভিজ্ঞতা হয় দা নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় কাজ শুরু করার পর থেকে। এর আগে সম্পাদকদের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপির তঈরী করার সময়ে টুকটাক পরামর্শ নিতাম। এর বেশি নয়। সম্পাদকদের সঙ্গে কাজ করার আগে তাদের সঙ্গে লেখকদের একটা বোঝা-পড়া থাকা দরকার। সেটা না হলে সম্পাদকের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয়। একজন সম্পাদক মনে করেছিলেন উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েল গল্পগুলো কিছুই হয়নি। আমি সেটা মনে করি করিনি। এক্ষেত্রে যিনি কথাটি বলছেন, সমালোচনাটি করছেন, তার তীক্ষ্ণ চোখ থাকতে হবে। আমার কাছে তার কথা বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে।

চিফ ম্যাকগ্রাথ আমার প্রথম সম্পাদক। তাঁকে পেয়েছিলাম নিউ ইয়র্কার থেকে। তিনি খুব দক্ষ সম্পাদক। আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়েছি—আমি আমার লেখাতে যা লিখতে চেয়েছি এই লোকটি তা বুঝতে পেরেছেন। আমার লেখা যে সব সময় খুব বেশি কাটাছেড়া করতে হত তা নয়। তিনি আমাকে অনেক পরামর্শ দিতেন। তার পরামর্শ মোতাবেক আমি "দা টার্কিশ সেজন" গল্পটা আবার নতুন করে লিখেছিলাম। আমার সঙ্গে আলোচনার আগে বইটি তিনি আগেই কিনে পড়ে নিয়েছিলেন। আমি ভেবেছিলাম যে রকম করে আমি গল্পটি লিখেছি নতুন সংস্করণে ঠিক সেইভাবেই প্রকাশিত হবে। তিনি গল্পটিতে কোনো দুর্বলতা খুঁজে পাবেন না। কোনো সংশোধন করার পরামর্শ দেওয়ার মত কিছু নেই। তিনি আমার লেখাটিকেই মেনে নেবেন। সেটা তিনি করেননি। তিনি বলেছিলেন আমাকে, ওকে, ঠিক আছে। তোমার গল্পের বইটি নতুন করে বের হোক। কিন্তু বের হলে একজন পাঠক হিসেবে গল্পটির মধ্যে এই এই জিনিসগুলো ভালো দেখতে পাচ্ছি। আবার এই এই জিনিসগুলো বদলালে গল্পটি আরো ভালো হবে। এই এই জিনিসগুলো আমি দেখতে চাই একজন সৎ পাঠক হিসেবে। তুমি আমার কথা মেনে নেবে তা কিন্তু আমি বলছি না। তবে আমি যে কথাগুলি তোমাকে বলছি সেগুলো নিয়ে তুমি আমি কথা বলতে পারি। তিনি কখনোই আমাকে বলেননি যে আপনার এগুলো অবশ্যই বদলাতে হবে। আমরা খোলা মনে গল্পটি নিয়ে বিস্তর আলাপ করেছি। এভাবে আমি অনেক ভালো গল্প পেয়েছি বলেই আমার মনে হয়।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকর্তা  : সম্পাদকের সাথে এই বোঝাপড়া কিভাবে হতফোনে না মেইলেআপনি কখনো সরাসরি দা নিউ ইয়র্কারের অফিসে গিয়েছিলেন?

এলিস মুনরো : 
মেইলে হত। ফোনেও আলাপ হত; কিন্তু সরাসরি কয়েকবার মাত্র দেখা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :  বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরুর আগে থেকেই কি আপনি একজন সিরিয়াস লেখক ছিলেন?

এলিস মুনরো :হ্যা। আমার টাকা পয়সা ছিল না, তাই আর কিছু হওয়ার সুযোগও ছিল না। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র দুবছরের জন্য বৃত্তি দেওয়া হত, তাই আমি জানতাম ওখানে আমি মাত্র দুবছর থাকতে পারব। এই সময়টা আমার জীবনে ছোট্ট একটা অবকাশ যাপনের মত, জীবনের একটা অসাধারণ সময়। কৈশোরে নিজ বাড়ীটা দেখাশুনার দায়িত্বটা ছিল আমার উপর। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলাম, বাড়ীর কাজটা আর আমাকে করতে হলনা

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :  এই দুই বছর শেষেই কি আপনি বিয়ে করলেন?

এলিস মুনরো : বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দ্বিতীয় বর্ষের পরেই আমি বিয়ে করি। আমার বয়স তখন বিশ। আমরা ভ্যাঙ্কুভার গেলাম। বিয়ে করা একটা দারূণ ব্যাপার – একটা বিরাট অভিযান, অভিযাত্রা। আমরা দেশের ভিতরেই দূর থেকে দুরান্তরে চলে যাই। আমার বিশ আর তার বাইশ বছর বয়স। আমরা ইতিমধ্যেই নিজেদেরকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মত করে তৈরী করে ফেলি। আমরা একটি বাড়ী কেনার কথা ভাবি এবং ভাবি আমাদের একজন শিশু নেওয়ার কথা এএজিনিষগুলো তাড়াতাড়িই হয়ে যায়। আমার প্রথম সন্তান হয় আমার একুশ বছর বয়সে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :  আর আপনি কি এসব কিছুর মাঝেই লিখতে থাকেন?

এলিস মুনরো : অন্তঃসত্ত্বা কালীন পুরো সময়টাতেই আমি মরিয়া হয়ে লিখি, কারণ আমি জানতাম এর পরে আর আমি লিখতে পারব না। প্রতিটি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাইআমাকে একটা শক্তির যোগান দিত যাতে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই আমি বিরাট একটা কিছু শেষ করতে পারি। আসলে আমি তেমন মহৎ কিছুই করতে পারিনি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : শহরের এক হৃদয়হীন বালকের পটভূমিতে আপনি “থ্যাক্স ফর দি রাইড” বইটি লিখেছেন। ছেলেটি নিজ শহর থেকেই রাতে কোন একটি মেয়েকে তুলে নিয়ে আসে। এবং মেয়েটির সাথে রাত কাটায়। কখনও মেয়েটির প্রতি আকৃষ্ট হয়, কখনও বা মেয়েটির দারিদ্রের প্রতি বিক্ষিপ্ত হয়। এটা লক্ষনীয়, যে সময়টাতে এই গল্পটি আপনার মাথায় আসে তখন আপনার নিজের জীবনটি কিন্তু স্বচ্ছল ভাবে গুছিয়ে নিয়ে এসেছেন।

এলিস মুনরো : যে সামারে আমার বড় মেয়েটি আমার পেটে, আমার স্বামীর এক বন্ধু আমাদের বাড়ীতে বেড়াতে আসে। সে প্রায় মাস খানেক থাকে। সে ন্যাশনাল ফিল্ম বোর্ডে কাজ করত এবং তখন সে একটি ছবি বানাচ্ছিল। সে আমাদেরকে অনেক কিছু বলত – আমরা স্বভাবতই তার সাথে আড্ডা মারতাম। কখনও সখনও আমাদের নিজেদের কথাও যোগ করতাম। জর্জিয়ান বে এলাকার একটা ছোট শহরে যখন সে থাকত সেই তখনকার একটা গল্প বলছিল, একটা ছেলে একটা মেয়ের সাথে মেলামেশা করত। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা কী করে থাকে তার সাথে আমার স্বামীর বন্ধুটি পরিচিত ছিল না।  কিন্তু আমি ভালভাবেই পরিচিত ছিলাম। কাজেই তাৎক্ষনিক ভাবেই আমি মেয়েটি, তার পরিবার এবং তার অবস্থান বেশ ভালভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। এবং মনে হয়, ঠিক এর পরেই আমি গল্পটি লিখে ফেলি। এই সময়টাতেই আমার মেয়েটি দোলনা থেকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : প্রথম বইটি প্রকাশের সময় আপনার বয়স কত ছিল?

এলিস মুনরো :আমার বয়স তখন প্রায় ছত্রিশ। কয়েক বছর ধরে আমি এই সব গল্প লিখতে থাকি। পরিশেষে রেয়ারসন প্রেস নামে কানাডার এক প্রকাশনা সংস্থার একজন এডিটর আমাকে চিঠি লিখেন। ম্যাকগ্র-হিল পরে অবশ্য প্রকাশনাটি কিনে নেয়। তিনি জানতে চান একটা বইয়ের জন্য যথেষ্ট গল্প আমার আছে কিনা। শুরুতে তিনি আমার গল্প এবং অন্য দুই-তিনজন লেখকের গল্প নিয়ে একটা বই বের করতে চেয়েছিলেন। তিনি সেটা বাদ দিয়ে আমাকে অন্য যে এডিটরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি বললেন, “আপনি যদি আরও তিনটি গল্প লিখতে পারেন তাহলে তা দিয়েই একটা বই বের করতে পারি।” কাজেই বইটি বেরোবার আগের বছরই আমি “ইমেজ”, “ওয়াকার ব্রাদারস কাউবয়” এবং “পোস্টকার্ড” লিখে ফেলি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :  এই গল্পগুলো কি আপনি কোন সাময়িকীতে প্রকাশ করেছিলেন?

এলিস মুনরো : বেশীর ভাগই টামার‍্যাক রিভিউ তে প্রকাশিত হয়েছে। এটা একটি ছোট্ট কিন্তু সুন্দর এবং সাহসী সাময়িকী। এডিটর বলেছিলেন যে একমাত্র তিনিই সাময়িকীটির সমস্ত পাঠকদেরকে প্রথম নামে চিনেন।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : কখনও কি আপনি কোন বিশেষ সময়ে লিখেছেন?

এলিস মুনরো : বাচ্চারা স্কুলে গেলেই আমি লেখার সময় পেতাম। কাজেই ঐ বছর গুলোতে আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমার স্বামী এবং আমার একটি বইয়ের দোকান ছিল। দোকানের কাজ ছাড়াও আমি দুপুর পর্যন্ত বাড়ীতে কাজ করতাম। কাজের ফাকে আমি লিখতাম। পরে যখন প্রতিদিন আমি দোকানে কাজ করতাম না। সবাই লাঞ্চে আসার আগ পর্যন্ত আমি লিখতাম। লাঞ্চ সেরে তারা চলে গেলে আমি আবার লিখতাম, প্রায় আড়াইটা নাগাদ। তারপর একটু কপি এবং বাড়ীর কাজ। এসব করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসত।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :  মেয়েরা বড় হয়ে স্কুলে যাওয়া শুরুর আগে?

এলিস মুনরো : তারা ঘুমুত।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :  ওরা যখন ঘুমুত, তখন আপনি লিখতেন?

এলিস মুনরো : হ্যা। দুপুরের পর একটা থেকে তিনটা পর্যন্ত। আমি অনেক কিছু লিখতাম যা তেমন ভাল কিছু নয়। কিন্তু সেগুলো অবশ্যই ছিল সৃষ্টিশীল। যে বছর আমি আমার দ্বিতীয় বই, “লাইভস অফ গার্লস এন্ড ওইমেন” লিখি, আমি খুবই সৃষ্টিশীল ছিলাম। আমার এক মেয়ের বন্ধু আমাদের সাথেই থাকত। তাই সব মিলিয়ে আমার চার চারটি মেয়ে ছিল তখন; এবং আমাকে সপ্তাহে দুদিন কাজ করতে হত। আমি প্রায় মধ্য রাতের পর সকাল একটা পর্যন্ত কাজ করতাম। তারপর আবার সকাল ছয়টাতেই উঠে যেতাম। আপনি হয়ত বুঝতে পারবেন, আমার মনে পড়ে, আমি প্রায়ই কী সব বিভৎস কিছু ভাবতাম, আমি বুঝি মারাই যাব বা আমার হার্ট এট্যাক হবে। আমার বয়স তখন মাত্র উনচল্লিশের মত। অথচ এসব আমার মাথায় চেপে থাকত। তারপর আমি ভাবলাম, বেশ, এসব যদি হয়ও, তাতে কী? আমি তো এর মধ্যে অনেকই লিখে ফেলেছি। সবাই এসব লেখার মূল্যায়ন করতে পারবে! এটা এক ধরণের মরিয়া হয়ে উঠার মত ছিল। এত শক্তি এখন আর আমার নেই।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :  “জীবন” নিয়ে লেখার প্রসেসটা কী?
এলিস মুনরো :এ বিষয়ে লেখার দিনটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। দিনটা ছিল জানুয়ারী মাসের রবিবার।  রবিবারে দোকান খোলা থাকে না সত্বেও আমি দোকানে গেলাম।  তারপর ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। আমার স্বামী বলেছিলেন তিনি ডিনার সেরে নিবেন, তাই বিকেলটা আমার হাতে ছিল। মনে পড়ে আমার চারপাশের সব বিখ্যাত সাহিত্য গ্রন্থগুলোর কথা। আমি নিজেকে নির্বোধ ভাবলাম – ‘তুমি কী করছ এখানে!’ তারপর আমি অফিস কক্ষে গেলাম। আমার মাকে নিয়ে যে অংশটা লিখতে শুরু করলাম তার নাম, “প্রিন্সেস আইডা”। আমার মাকে নিয়ে লেখা অংশটা আমার জীবনে মূখ্য বিষয়। আমার অন্তরে সারাক্ষন এটাই ঘুরাফেরা করত। আমি হয়তো বিশ্রাম নিচ্ছি, তখনও এটাই আসবে। কাজে বিরতি নিয়ে আমি একদিন এটাই লিখতে শুরু করলাম। তারপর আমি একটা বিরাট ভুল করলাম। আমি এটাকে বাচ্চা বয়সীদের মত করে একটা সাধারণ উপন্যাস হিসেবে লিখতে চেষ্টা করলাম। মার্চ মাসের দিকে দেখলাম এটা ঠিক পথে এগুচ্ছে না। এটা আমার কাছে ঠিক মনে হল না। আমি ভাবলাম এটা বাদই দিতে হবে। আমি খুবই বিমর্ষ হলাম। তারপর আমার মাথায় এল আমি এটাকে বিভক্ত করে যদি গল্পাকারে লিখি, তাহলেই আমি এটাকে সঠিক করে লিখতে পারব। এ থেকে আমি শিখলাম আমি সত্য ঘটনা নিয়ে কোনদিন উপন্যাস লিখতে চাইনি, কারণ আমি ওভাবে ভাবতে পারিনি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : কিছু গল্পের সমষ্টি হওয়ার কারনে, “দি বেগার মেইড”ও একটা উপন্যাসের মতই।

এলিস মুনরো : বেশী করে দ্বিতীয়-অনুমান করতে চাইনা।  কিন্তু আমি প্রায়ই অন্য আর একটা গল্পের সিরিজ লিখতে চাইতাম। আমার নতুন বই, “ওপেন সিক্রেট”এ অনেক চরিত্র আছে যা পূনরাবৃত হয়েছে। “ভ্যান্ডালস” এর বি দাউদকে “ক্যারিড এওয়ে”তে ছোট একটি মেয়ে হিসেবে রূপায়িত করা হয়েছে; এই কালেকশনে এটাই প্রথম গল্প। 

বিলি দাউদ লিবারিয়্যানের ছেলে। এদের সবাইকে “স্পেসশীপস হ্যাভ লান্ডেড”এ উপস্থাপন করা হয়েছে। এই গল্পগুলোতে এরকম পূনরাবৃতি করা হয়ত ঠিক হয়নি। একটা গল্পের কাঠামো নিয়ে ভাবতে গেলে তা অন্য আর একটা গল্পের সাথে মিলে যেতে পারে, একটা প্রচ্ছন্ন শক্তি বা প্রবনতা কাজ করে। এটা হতে দেওয়া ঠিক নয়। আমার মনে হয় না আমি এরকম সিরিজ আবার লিখব। ধারণাটা কিন্তু আমার ভালই লাগে। ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ড একটি চিঠিতে এরকম কিছু একটা বলেছিলেন – আমার উপন্যাস লেখার ইচ্ছা আছে, আমি চাইব এসব লিখে যাওয়ার আগে যেন আমার মৃত্যু না ঘটে। বিক্ষিপ্ত বিষয় নিয়ে গল্প লিখতে গেলে এসব ছোটখাট অনুভূতিমুক্ত থাকা কষ্টকর হতেই পারে। আমি নিশ্চিত, তারপরেও আপনি চেখভ বা অন্যদেরকে ভাবতে পারেন।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :  চেখভ সব সময়ই একটা উপন্যাস লিখতে চাইতেন। তিনি নাম দিতে চেয়েছিলেন, “স্টরিস ফ্রম দি লাইভস অফ মাই ফ্রেইন্ডস।”

এলিস মুনরো : আমি তা জানি। এবং সব কিছুর একটা অবয়ব দিতে পারার অনুভূতিটা যে কী বৃহৎ তা আমি জানি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :  যখন একটা গল্প লিখতে শুরু করেন তখনই কী আপনি জানেন গল্পটা কী হবে?

এলিস মুনরো : সব সময় না। যে গল্পটা ভাল হবে তা সাধারণত পরিবর্তন এবং পরিমার্জনের মধ্য দিয়েই হয়। এই মূহুর্তে আমি “কোল্ড” নিয়ে একটা গল্প লিখছি। প্রত্যেকদিন সকালেই আমি এটা নিয়ে কাজ করছি। ব্যাপারটা বেশ ভাল লাগার মত। কিন্তু আমি ঠিক যেন পছন্দ করিনা, কিন্তু তবুও মনে হয়, কোন এক সময় আমি এটাকে সিরিয়াসলি নেব। সাধারণতঃ লেখা শুরুর আগে গল্পের চরিত্রগুলো সমন্ধে আমার সম্যক পরিচিতি হয়ে যায়। কোন লেখাতে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারলে, গল্পটা আমার মাথায় অনেক সময় ধরে ঘোরপাক খেতে থাকে। তারপর যখন লিখতে শুরু করি তখন আমি গল্পের গভীরে চলে যাই। এই মূহুর্তে আমি সব নোটবুকে সব ভরে রাখছি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :  আপনি নোটবুক ব্যবহার করেন?

এলিস মুনরো : আমার প্রচুর নোটবুক আছে যা বিচ্ছিরি লেখায় ভর্তি। নোটবুকগুলোতে সাধারণত যেকোন জিনিষ টুকে রাখি। অনেক সময় অবাক হই, আমি আমার প্রথম পান্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবি – এসব টোকাটুকির কি আদৌ প্রয়োজন ছিল! আপনি জানেন, আমি অন্য লেখকদের চেয়ে আলাদা। অন্যেরা আশীর্বাদপুষ্ট, তড়তড় করে উপরে উঠে যায়। আমি যা কিছুই করতে চেষ্টা করিনা কেন, আমার জন্য অত সহজে কিছুই হয় না।  আমি অনেক সময় ভুল দিকে চলে যাই এবং তারপর নিজেকেই ফিরিয়ে আনতে হয়।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : আপনি কী ভাবে অনুধাবন করেন যে আপনি ভুলে দিকে আছেন?

এলিস মুনরো : একদিন আমি হয়তো লিখে ভাবলাম আমি খুব ভালই লিখেছি; আমি দিনে সাধারণত যে পরিমান লিখি তার চেয়ে অনেক বেশীই লিখলাম। কিন্তু পরের দিন সকালে উঠেই আমি অনুধাবন করি আমি এটা নিয়ে কাজ করব না। যখন কাজটার ধারে কাছে যেতে আমার দারূণ বিরক্তি লাগে তখন নিজেকে জোড় করেই চালিয়ে নিতে হয়, তখন আমি বুঝি মারাত্মক ভুল একটা কিছু হচ্ছে। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সময় যা হয়, আমি একটা পর্যায়ে পৌছার যথেষ্ট আগে ভাগেই বুঝতে পারি আমি গল্পটা বাদ দিতে যাচ্ছি। একদিন কি দুদিন আমার ডিপ্রেসন বা বিমর্ষতায় কাটে। আমি তখন অন্য কিছু লেখার চেষ্টা করি। এটা যেন প্রেম-ভালবাসার মতঃ আপনি রাগে-অভিমানে সব অবসাদ কাটিয়ে উঠতে, না ভেবে-চিনতে অজানা নতুন কারও সাথে সম্পর্ক করলেন যাকে আপনি আদৌ পছন্দ করেন না। এরপর, হঠাৎ করেই কোন বাতিল করা গল্পের জন্যই নতুন আংগিক আমার মাথায় আসে, আমি দেখতে পাই গল্পটার নতুন রূপ। কিন্তু এরকম তখনই হয়, যখন একটা গল্পকে বাতিল করে দিই। আমি বলি, নাহ্‌, এটা দিয়ে কিছু হবে না; এটা বাদ।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :  সব সময় কি এরকম করতে পারেন?


এলিস মুনরো : অনেক সময় আমি তা পারিনা, এবং আমার সারা দিন কাটে বাজে মেজাজে। এরকম সময়টা আমার জন্য বেশ বিরক্তিকর। জেরী যদি আমাকে কিছু বলে বা ঘর এবং বাইরে বার বার আসা-যাওয়া করে অথবা বেশী শব্দ করে আমি ভীষণ বিরক্ত বোধ করি। যদি সে কোন গান ধরে বা এরকম কিছু করে তা খুবই অসহনীয় মনে হয়। আমি একটা কিছু ভাবতে চেষ্টা করি এবং দেওয়ালে মাথা ঠুকতে যাই; আমি এতসব সহ্য করতে পারিনা। আমার এরকম বেশ কিছুক্ষণ চলে, তারপর ঠিক হয়ে যায়। ব্যাপারটি একসপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে, পুরো ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করি, তারপর ভুলতে চেষ্টা করি, বা অন্য কিছু ভাবতে চেষ্টা করি, যখন আমি গ্রোসারী স্টোরে যাই অথবা গাড়ীতে কোথাও যাই তখন সহসাই স্বাভাবিকতায় ফিরে আসি। আমি অবশ্যই ভাবব, স্বচ্ছভাবে আমাকে ভাবতেই হবে, আমার এই অভ্যাসটা অবশ্যই পরিহার করতে হবে, আর এসব লোকেরা তো বিবাহিত নয়। এটা হবে একটা বড় মাত্রিক মৌলিক পরিবর্তন।


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : এবং এটা হলো প্রায় বিশ বছর পরে?
এলিস মুনরো:  হুম। বিশ বছরের বেশি পরে, এবং এর মধ্যে আমাদের কখনো দেখাও হয় নি। আমি যেমনটা আশা করেছিলাম তাকেও দেখে একটু এমন মনে হলো না। একদিন হঠাত সে ফোন করে বললো- আমি গ্যারি ফ্রেমলিন। আমি ক্লিনটন এ আছি, ভাবছিলাম একদিন আমরা একসাথে লাঞ্চ করতে পারি কীনা!আমি জানতাম ওর বাড়ি ক্লিনটন এ, ভাবলাম ও হয়তো বাবা-মার সাথে দেখা করতে এসেছে। তখন আমি জানতাম সে অটোয়াতে থাকে, কারো কাছ থেকে শুনেছিলাম। ভাবলাম, তার স্ত্রী-ছেলেমেয়ে হয়তো অটোয়াতেই আছে, এখানে সে বাবা-মাকে দেখতে এসেছে, এর মাঝে হয়তো ভেবেছে  পুরোনো কোনো বন্ধুর সাথে বসে লাঞ্চ করবে। সে আসার আগে পর্যন্ত আমি তাই ভাবছিলাম। আসার পর জানলাম সে ক্লিনটনেই থাকে, স্ত্রী-পুত্র বলে কিছু নেই। আমরা একটা ক্লাবে দেখা করলাম, তিনটা করে মার্টিনি খেলাম লাঞ্চেই। হয়তো, আমরা দুজনই কিছুটা নার্ভাস ছিলাম। তবে, কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা বেশ ঘনিষ্ট হয়ে ওঠলাম। সম্ভবত দুপুর শেষ হতে না হতেই আমরা একসাথে থাকার ব্যাপারে কথা বলতে শুরু করলাম। এটা খুব দ্রুতই হয়ে গেল। খুব সম্ভবত, আমি ওয়েস্টার্ন ঐ টার্ম এর শিক্ষকতা শেষ করেই ক্লিনটনে এলাম এবং যে বাড়িতে সে মায়ের দেখাশোনা করার জন্য ফিরে এসেছে ঐ বাড়িতেই একসাথে থাকতে শুরু করলাম।


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : আপনি লেখালেখির উদ্দেশ্যে সেই সিদ্ধান্তটা নেন নি?

এলিস মুনরো : আমি লেখালেখির কথা চিন্তা করে কখনোই কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। এবং এখন পর্যন্ত এটা ছেড়ে দেবো এ কথাও ভাবিনি। লেখালেখির জন্য আলাদা কোনো পরিবেশ-পরিস্থিতির প্রয়োজন আছে কীনা এটা আমি এখনও বুঝতে পারিনি। একমাত্র চাকুরীগুলোর সময়ে, যখন আমাকে লেখক হিসেবে অফিস-টেবিল-চেয়ার দিয়ে দেয়া হলো তখন আমি লিখতে পারি নি।


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : এ ব্যাপারটা উঠে এসেছে আপনার শুরুর দিককার গল্প দ্যা অফিস- একজন ভদ্রমহিলা অফিস ভাড়া নেয় লেখালেখির জন্য, এরপর বাড়ির মালিকের কারণে মন দিতে পারে না এবং শেষে সে ওখান থেকে সরে চলে আসে।

এলিস মুনরো : ওটা বাস্তবের অভিজ্ঞতা থেকেই লিখেছি। আমি একটা অফিস নিয়েছিলাম এবং সত্যিকার অর্থেই একমাত্র ঐ গল্পটা ছাড়া আমি আর কিছু লিখতে পারিনি। বাড়ির মালিক সবসময়ই ব্যাঘাত ঘটাতো এবং যখন সে ব্যাঘাত ঘটনা বন্ধ করতো তখনো আমি কাজ করতে পারতাম না। এবং এছাড়াও যখনই আমার লেখালেখির জন্য কোনো অফিস ছিল তখনো আমি লিখতে পারিনি। যখন আমি ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডে আবাসিক লেখক হিসেবে কাজ করতাম, সেখানে আমার একটা অফিস ছিল, ইংরেজী বিভাগে, একটা খুবই অভিজাত-সুন্দর অফিস। কেউ আমাকে চিনতো না সেখানে, কেউ দেখাও করতে আসতো না। সেখানে অবশ্য কেউ লেখক হতে চায়ওনি। এটা ছিল অনেকটা ফ্লোরিডার মতো, ওরা বিকিনি পরে সবসময় ঘুরে বেড়ায়। সুতরাং আমার তখন প্রচুর সময় ছিল, অফিস ছিল, আমি বসে বসে শুধুই ভাবতাম। আমি কিছুই করতে পারছিলাম না, আমার করার কথা-- কিন্তু সে এক নিথর দশা।


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : ভ্যানক্যুভার এ কি উপকরণ এর অভাব ছিল?


এলিস মুনরো: আমি শহরতলীর দিকে ছিলাম। প্রথমে উত্তর ভ্যানক্যুভার, এরপর পশ্চিম ভ্যানক্যুভার। উত্তর ভ্যানক্যুভার এ পুরুষরা সকালে উঠে চলে যেত, ফিরতো রাতে, সারাদিন এটা ছিল শিশু আর গৃহিনীদের অবাসস্থল। সবার মধ্যে মিলেমিশে থাকার মত একটা ব্যাপার ছিল, একা থাকাটাই বরং কঠিন ছিল। ভ্যাক্যুয়াম-ক্লিনিং ইত্যাদি নিয়ে প্রতিযোগাতামূলক আলোচনা হত, আমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম। যখন আমার একটামাত্র বাচ্চা ছিল, তখন আমি তাকে স্টলার এ করে নিয়ে মাইলের পর মাইল হেটে বেড়িয়েছি কফি পার্টিগুলো এড়িয়ে চলার জন্য। এটা আমি যে পরিবেশে বড় হয়েছি এরচেয়ে অনেক ভিন্নরকম ছিল। কিছু ব্যাপারে ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা- যেমন গুরত্বপূর্ণ কোন আলোচনা। অনুমোদিত আনন্দ, নুমোদিত মতামত, নারী হয়ে থাকার অনুমোদিত উপায় এমন কিছু অনুমোদন এ আবদ্ধ ছিল জীবন।   একমাত্র বেরিয়ে আসার উপায় ছিল পার্টিতে অন্য নারীর স্বামীদের সাথে ঠাট্টা-মশকরা। এছাড়া পুরুষরা নারীদের সাথে তেমন একটা কথা বলতো না, যদিও বলতো- বলতো অবজ্ঞার সাথে। পুরুষরা মেয়েদের কথা বলা পছন্দ করতো না, করতো না মেয়েরাও। সুতরাং পৃথিবী বলতে ছিল মেয়েলি আড্ডা, খাবার নিয়ে অথবা উলের সংরক্ষ পদ্ধতি নিয়ে।  পশ্চিম ভ্যানক্যুভার ছিল কিছুটা মিশ্র ধরনের, আমার কিছু ভালো বন্ধু হয়েছিল।  আমরা বই নিয়ে, কুৎসা নিয়ে গল্প করতাম, হাসাহাসি করতাম হাই-স্কুলের মেয়েদের মত। এটা নিয়ে আমি লিখতে চাই, লেখা হয়নি এখনো, সেই কম বয়সী নারীদের শহরতলী, যেখানে তারা একে অন্যকে বাচিয়ে রাখে। তবে ভিক্টোরিয়ায় গিয়ে বইয়ের দোকান খুলে বসাটা ছিল সবচেয়ে চমৎকার একটা ব্যাপার। চমৎকার ছিল কারণ, শহরের সব লোক বইয়ের দোকানে আসতো আর আমাদের সাথে গল্প করতো।


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : বইয়ের দোকান শুরু করার আইডিয়া কিভাবে পেলেন?

এলিস মুনরো : জিম শহরের বড়  ডিপার্টমেন্ট স্টোর ইটন ছেড়ে যেতে চাচ্ছিল। কি ধরণের ব্যবসা করা যায় এটা নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা- আমি বললাম, দেখো! আমরা যদি একটা বইয়ের দোকান দেই তাহলে আমিও তোমাকে সাহায্য করতে পারি!সবাই ভাবছিল এই বুঝি আমরা শেষ! অনেকটা তাইই হয়েছিল। আমি খুবই দ্ররিদ্র হয়ে পড়েছিলাম, তবে তখন আমার দুটো মেয়েই স্কুলে যেতে শুরু করে, সুতরাং পুরোটা সময় আমি দোকানে কাজ করতে পারতাম। বিয়ের পরে ওটাই ছিল আমার সবচেয়ে আনন্দের সময়।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : আপনার এই ভাবনা ছিল যে বিয়েটা আসলে টিকবে না?

এলিস মুনরো : আমি ভিক্টোরিয়ান যূগের মেয়েদের মত ছিলাম- বিয়ে করার চাপ ছিল, একজনের মনে হলো এটাই হয়তো মুক্তির উপায়ঃ মানে আমি নাচলাম, বিয়ে করলাম, এরপরই আসল জীবন শুরু হলো। আমার মনে হয় আমি বিয়ে করেছিলাম লেখালেখি করার জন্য, সেটেল হয়ে অন্যান্য গুরত্বপূর্ণ দিকে মন দেয়ার জন্য। এখন মনে হয়, তখন আসলে আমি অনেক কঠিন হৃদয়ের ছিলাম। এখন বরং আমি অনেক বেশি গতানুগতিক।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : যেকোনো তরুণ শিল্পীকেই কি কঠিন হৃদয়ের হতে হয় না?

এলিস মুনরো : মেয়ে হলে সমস্যাটা বেশি হয়। সারাক্ষই ছেলেমেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করতাম- তোমরা ঠিক আছো তো? ছেলেমেয়েদের দিকে পূর্ণ মনোযোগ আমি দিতে পারিনি। এমন না যে আমি ওদের অবজ্ঞা করেছি কিন্তু পুরোপুরি আমি দিতে পারি নি! আমার বড় মেয়েটা যখন দুই বছর বয়স, আমি যখন টাইপরাইটারে বসে লিখতাম, মেয়েটা হয়তো কাছে আসতো, আমি এক হাতে দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে রেখে অন্য হাত দিয়ে লিখতাম। যখন বাচ্চাদের আমাকে প্রয়োজন ছিল, তখন আমি লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত। আর এখন যখন আমাকে ওদের প্রয়োজন, আমি কী যে ভালোবাসি ওদেরকে। আমি ঘরের মধ্যে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াই আর ভাবি-- এখানে একসময় অনেক পারিবারিক ডিনার হতো।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : প্রথম বইয়ের জন্য আপনি গভর্ণর জেনারেল পুরষ্কার পেলেন যেটা আপনার দেশের পুলিৎজার এর মতো। প্রথম বইয়েই এত বড় পুরষ্কার পাওয়ার মত ব্যাপার আমেরিকায় খুব কমই হয়েছে। যখন হয়েছে এরপরে লেখকের ক্যারিয়ার নিয়েই বরং সমস্যায় পড়তে হয়েছে।

এলিস মুনরো : আমি ঠিক তরুণ ছিলাম না তখন, এটা হলো একটা বিষয়। তবে, এটা কঠিন সময় ছিল। প্রায় এক বছর আমি কিছুই লিখতে পারিনি এটা ভাবতে ভাবতে যে আমাকে একটা উপন্যাস এ কাজ করতে হবে। বড় কোনো বেস্ট সেলার লেখার মতো চাপ আমার ছিল না, যেমনটা এমি ট্যান এর ক্ষেত্রে হয়েছে তার প্রথম বইয়ে। যদিও আমার বইটা গভর্ণর জেনারেল পুরষ্কার পেয়েছে- কেউ এটা সম্পর্কে জানতোও না। তুমি যদি দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে, ওরা দিতে পারতো না।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : সমালোচনা আপনার কাছে কতটা গুরত্বপূর্ণ? আপনার কি মনে হয় আপনি ওদের কাছ থেকে কিছু শিখতে পেরেছেন? কখনো ওদের কাছ থীক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন?

এলিস মুনরো : হ্যা এবং না, কারণ আসলেই সমালোচনা থেকে তুমি আসলেই খুব বেশি শিখতে পারবে না, তবে আঘাত পেতে পারো। একটা খারাপ সমালোচনা জনসম্মুখে অপমানিত হওয়ার মত ব্যাপার। যদিও এটা কোনো ব্যাপার না, স্টজে দাঁড়িয়ে অপমানিত হওয়ার চেয়ে হাততালি পাওয়া নিশ্চয়ই ভালো।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : এখন কেমন পড়ছেন? এমন কোনো বই আছে যা আপনার জীবনে খুব প্রভাব ফেলেছে?

এলিস মুনরো : ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত পড়া আসলেই আমার জীবন ছিল। আমি বইয়ের মধ্যেই বাস করতাম। দক্ষি আমেরিকার লেখকরা আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে যে আমি আসলে, ছোট শহর, মফস্বলের লোকজন ইত্যাদি যা আমি দেখেছি তা নিয়ে লিখতে পারি। তবে দক্ষিণের লেখকদের মধ্যে নারী লেখকরাই আমাকে উদ্ভুদ্ধ করেছে বেশি। ফকনার আমার খুব একটা পছন্দ ছিল না। আমার বরঙ পছন্দ ছিল এডোরা ওয়েল্টি, ফ্লেনারি ওকনার, ক্যাথরিন এন পর্টার, কার্সন ম্যাকক্যুলারস। একটা অনুভূতি কাজ করতো যে মেয়েরা আসলে প্রান্তিক, তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে লিখতে পারে।


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : যেটা আপনিও সবসময় করেছেন।

এলিস মুনরো : হুম। আমার কাছে মনে হয়েছে ওটাই আমার জগত, যেখানে মূলধারার বাস্তব জীবনের বড় উপন্যাসগুলো ছিল পুরুষ লেখকদের জগত। আমি জানিনা এমন প্রান্তিক নিয়ে পড়ে থাকার ধারণা আমি কোথা থেকে পেলাম। হতে পারে আমি এমন পরিবেশে বড় হয়েছি। আমি খুবই বিরক্ত হয়েছি প্রথম যখন আমি ডি এইচ লরেন্স পড়ি। আমি বিরক্ত হয়েছি নারীদের যৌনতা বিষয়ে লেখকদের মনোভাব দেখে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু দেখাতে পারবেন যা নিয়ে আপনি বিরক্ত হয়েছেন?

এলিস মুনরো : এটা অনেকটা- আমি নিজে যখন অন্য লেখকদের লেখার উপকরণ তখন আমি কিভাবে নিজে লেখক হবো?

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : জাদু-বাস্তবতা নিয়ে আপনার মনোভাব কী?

এলিস মুনরো : ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সল্যিচ্যুড আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু ঠিক আদর্শ হিসেবে গ্রহ করার মতো আমার কাছে মনে হয় নি। এটা সহজ মনে হয় কিন্তু আসলে তা না। পিপড়েরা বাচ্চা বহন করে নিয়ে যায়, কুমারী আকাশের সীমানা ছোয়, প্যাট্রিয়ার্চ মারা গেলে ফুলবৃষ্টি হয় এগুলো চমকপ্রদ। কিন্তু উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েল এর সো লং, সী ইয়ু টুমরোর মতো চমকপ্রদ এবং অবোধ্য, যেখানে কুকুর একটা চরিত্র। সে এমন একটা সাধারণ বিষয় নিয়ে লিখছে কিন্তু কত অসাধারণ করে!  


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : আপনার নতুন কিছু গল্পে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এলিস মুনরো : পাঁচবছর আগে যখন আমি যখন আমি ফ্রেন্ড অব মাই ইয়ুথ-এর গল্পগুলো নিয়ে কাজ করছিলাম তখন ভিন্ন-বাস্তবতা নিয়ে একটা গল্প লেখার কথা ভাবছিলাম। আমি লিখিনি কারণ আমার মনে হয়েছে শেষে হয়তো আমি ট্যোয়েলাইট জোন ধরণের কিছু একটা করে বসবো। খুব মূল্যহীন কিছু একটা। আমি ভয় পেলাম, তবুও আমি লিখলাম ক্যারিড এওয়ে আমি ওটা নিয়ে কী কী করলাম এবং এরপর ওরকমভাবে শেষ করলাম। হয়তো বয়সেরও কোনো ব্যাপার আছে। কি ঘটেছে তা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির একতা পরিবর্তন, কী ঘটতে পারতো তা না বরং কী ঘটেছে আসলে। এমন অসংলগ্ন বাস্তবতা আমার নিজের জীবনে আছে, আমি অন্যদের জীবনেও দেখি। এটা একটা সমস্যা ছিল- আমি কেন উপন্যাস লিখতে পারি না, একসাথে এতকিছু জড়াজড়ি করে থাকতে আমি কখনো দেখিনি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : আত্মবিশ্বাসের ব্যাপারে কী বলবেন? এতবছরে কী কিছু পরিবর্তন হয়েছে?

এলিস মুনরো : লেখালেখিতে আমার সবসময়ই আত্মবিশ্বাস ছিল, এর সাথে এমন একটা ধারণা ছিল যে সেই আত্মবিশ্বাসটা আসলে ঠিক যুতসই হচ্ছে না পুরোপুরি। আমার মনে হয় বোকা হওয়ার কারণেই আমার এতটা আত্মবিশ্বাস। যে কোনো মূলধারা থেকে আমি এতটাই দূরে সরে থেকেছি যে আমি অনুধাবন করতে পেরেছি মেয়েরা পুরুষদের মতো এত সহজেই লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না, যেমন পারে না, নিচু শ্রেণীর লোকজন। যদি তুমি জানো যে তুমি এমন একটা শহরে মোটামোটি লিখতে পারছো যেখানে কেউ পড়েই না, তোমার কাছে মনে হতেই পারে এটা হয়তো অলৌকিক কোনো পুরষ্কার!


প্রশ্নকর্তাঃ সত্যিই কি এমন কোন নার্স ছিল ?
এলিস মুনরো : না, নার্সকে আমি তৈরি করেছিলাম কিন্তু তার নামটা আমাকে দেয়া হয়েছিল। এখান থেকে প্রায় দশ কিমি দূরে, ব্লাইদ থিয়েটারে একটা ফাণ্ড-রেইজিং ইভেন্ট হয়েছিল। প্রত্যেকেই কিছু না কিছু দিয়েছিল নীলাম থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য। একজন এই আইডিয়াটা দিয়েছিল যে আমার পরের গল্পের কোন একটা চরিত্রের নাম সংগ্রহের জন্য আমি নীলাম ডাকতে পারি এবং সর্বোচ্চ বিডারের নামই আমি ব্যবহার করব। টরন্টোর একজন ভদ্রমহিলা একটি চরিত্র হওয়ার জন্য চারশো ডলার দিলেন। তার নাম ছিল অড্রে অ্যাটকিনসন। হঠাৎ করেই আমার মনে হল যে, ইনিই সেই নার্স। তার সাথে আমার কখনও কথা হয়নি। আশা করি তিনি কিছু মনে করেননি।

প্রশ্নকর্তাঃ গল্পের শুরুটা কেমন ছিল?
এলিস মুনরো : গল্পটা যখন আমি লিখতে শুরু করি, আমি অন্টারিও থেকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার পথে আমাদের অজস্র ট্রিপগুলির একটায় ছিলাম; প্রত্যেক বছর ফল-এ আমরা ড্রাইভ করে বেরিয়ে যাই আর স্প্রিং-এ ফিরে আসি। ফলে আমি তো লিখছিলাম না। কিন্তু আমি রাত্রে মোটেলে এমন একটা পরিবার সম্পর্কে ভাবছিলাম। তখনই আমার মায়ের পুরো গল্পটা জমাট বাঁধে, তারপরে মাকে ঘিরে আমার গল্প বলাটা, আর আমি দেখতে পাই যে এটা আসলে কি নিয়ে। আমি বলব যে গল্পটা সহজেই এসেছিল। আমার কোন সমস্যাই হয়নি। আমি আমার মায়ের চরিত্র এতবার এঁকেছি – তার প্রতি আমার অনুভূতি, যে সেসব নিয়ে আমাকে ভাবতেই হয়নি।

প্রশ্নকর্তাঃ আপনার কাজের মধ্যে অনেক মা আছেন। এই বিশেষ মাটি অন্য গল্পেও এসেছেন, এবং তাকে খুবই আসল মনে হয়। আবার দ্য বেগার মেইড গল্পে রোজ-এর সৎ মা ফ্লো-কেও তাইই মনে হয়।
এলিস মুনরো :  কিন্তু ফ্লো কোন আসল চরিত্র ছিল না। আমার পরিচিত মানুষদের মতই ছিল সে, এমন একটা মিশ্র চরিত্র যাকে নিয়ে লেখকরা কথা বলেন। আমার মনে হয় ফ্লো জোর করে করা একটা চরিত্র কেননা ওই গল্পটা আমি সেই সময় লিখি যখন আমি তেইশ বছর দূরে থাকার পর আবার এখানে ফিরে এসে থাকতে শুরু করেছিলাম। এখানকার সম্পূর্ণ সংস্কৃতিটা আমাকে প্রচন্ড ভাবে নাড়িয়ে দেয়। এখানে ফিরে বাস্তবের দুনিয়ার সাথে সংস্পর্শে এসে আমার মনে হল, যে পৃথিবীটা আমি ব্যবহার করছিলাম, আমার শৈশবের পৃথিবী, তা শুধুই আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করতে থাকা এক পৃথিবী। ফ্লো সেই বাস্তবেরই এক প্রতিচ্ছবি আমার স্মৃতির তুলনায় অনেক বেশি কর্কশ।

প্রশ্নকর্তাঃ আপনি প্রচুর ঘোরেন, কিন্তু আপনার কাজে যেন মূলত গ্রাম্য একটি সংবেদনশীলতা ফুটে ওঠে। আপনার কি মনে হয় যে আপনি এখানে যে গল্পগুলি শোনেন, তা আপনার জন্য অনেক বেশি সমৃদ্ধ, নাকি আপনি যখন শহরে থেকেছেন তখনও আপনার জীবন থেকে এভাবেই রসদ সংগ্রহ করেছেন ?
এলিস মুনরো : মফস্বলে থাকলে অনেক বেশি কিছু কানে আসে, সব রকম মানুষের সম্পর্কেই। সেক্ষেত্রে শহরে নিজের মতো মানুষদের সম্পর্কেই বেশি কথা শোনা যায়। মহিলা হলে বান্ধবীদের থেকে অনেক কথা জানা যায়। ভিক্টোরিয়ায় কাটানো দিনগুলি থেকে আমি পেয়েছিলাম ‘ডিফারেন্টলি’, আর ‘হোয়াইট ডাম্প’-এরও অনেকটা। ‘ফিট্‌স’ গল্পটা পেয়েছিলাম এখানে ষাটের ঘরে থাকা এক দম্পতির খুন-আত্মহত্যার বাস্তব এবং সাংঘাতিক ঘটনাটা থেকে। শহরে থাকলে, আমি এ সম্পর্কে শুধু কাগজে পড়তে পেতাম; সমস্ত সুতোগুলো ধরতে পারতাম না।

প্রশ্নকর্তাঃ নানাকিছু তৈরি করা বা মিশ্রণ ঘটানোটা কি আপনার পক্ষে সহজ?
এলিস মুনরো : আগের থেকে এখন অনেকই কম ব্যক্তিগত লেখালেখি করি আজকাল, খুবই সহজ একটা কারণে। নিজের শৈশব তো ব্যবহার করে ফেলতেই হয়, যদি না, উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েল-এর মতো, পিছনে বারবার ফিরে গিয়ে আরো সুন্দর নতুন মাত্রা তাতে যোগ করার ক্ষমতা থাকে। পরবর্তী জীবনের গভীর ব্যক্তিগত উপকরণ হল আপনার সন্তান। বাবা-মা চলে গেলে তাদের সম্পর্কে লেখা যায়, কিন্তু তারপরেও আপনার সন্তানরা থেকে যায়, এবং আপনি চাইবেন যে তারা যেন নার্সিং হোমে এসে আপনার সাথে দেখা করে যায়। পরামর্শযোগ্য হয়ত এই যে লক্ষ্য করে গল্প লেখার দিকেই ক্রমশ এগিয়ে যাওয়া উচিত।

প্রশ্নকর্তাঃ আপনার পারিবারিক গল্প বাদ দিলে, আপনার অনেক গল্পকেই ঐতিহাসিক মনে হয়। আপনি কি এই ধরনের উপকরণ খোঁজেন নাকি অপেক্ষা করে থাকেন এইসবের দেখা পাওয়ার জন্য?
এলিস মুনরো : উপকরণ সংগ্রহ করা নিয়ে আমার কখনও কোন সমস্যা হয়নি। তা সামনে আসার জন্য আমি অপেক্ষা করি এবং তা সবসময়ই সামনে আসে। সেই উপকরণের সমস্তটা সামলে নিয়ে ব্যবহার করাটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ঐতিহাসিক গল্পগুলির জন্য আমাকে অনেক গবেষণা করতে হয়েছে। বউ বছর ধরে একজন ভিক্টোরিয় লেখিকাকে নিয়ে গল্প লেখার কথা আমার মাথায় ছিল, তিনি এই অঞ্চলেরই একজন লেখিকা। শুধু আমার যা চাই সেই রকম কবিতা খুঁজে পাচ্ছিলাম না; পুরোটাই হাস্যকর রকমের অবাস্তব ছিল। তার থেকে একটু ভাল জিনিষ দরকার ছিল আমার। সুতরাং আমি লিখতে আরম্ভ করলাম। ওই গল্পটা লেখার সময় প্রচুর পুরানো খবরের কাগজ দেখেছি, আমার স্বামীর যে সব জিনিষ চারপাশে রয়েছে – অন্টারিওতে যেখানে আমরা থাকি, সেই হিউরন কাউন্টি নিয়ে তিনি ঐতিহাসিক গবেষণা করেন। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত ভূতত্ত্ববিদ। ‘ওয়ালি’ নামে যে শহরটা আমি লেখায় এনেছি, তার সম্পর্কে আমি খুব পরিচ্ছন্ন ধারণা পেয়ে গিয়েছিলাম। খবরের কাগজের ক্লিপিংস থেকেও খুব ভাল ইমেজ আমি পেয়ে যাই। তারপর, যখন আমার সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য দরকার হল, গ্রন্থাগারের লোকটিকে দিয়ে আমি মাঝে মাঝে সেইসব কাজগুলি করিয়ে নিতাম। পুরানো গাড়ি বা ওই ধরনের কিছু বা ’৫০-এর দশকের প্রেসবাইটেরিয়ান চার্চ সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া ইত্যাদি। উনি ভীষণ ভাল। উনি এইসব কাজ করতে পছন্দ করেন।

প্রশ্নকর্তাঃ আর সেইসব আন্টিরা, যে অসাধারণ আন্টিরা গল্পে আসেন।
এলিস মুনরো : আমাদের জীবনে আমার আন্ট্‌ আর আমার ঠাকুমা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। যতই হোক, আমার পরিবার শহরের সবচেয়ে কুখ্যাত অঞ্চলে একটা প্রায় ভেঙে পড়া ফক্স-মিঙ্ক ফার্মের রোজগারের উপরে দাঁড়িয়ে ছিল, আর তারা থাকতেন আসল শহরে, সুন্দর একটা বাড়িতে, এবং বনেদিয়ানাটা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। ফলে সব সময়ই তাদের আর আমাদের বাড়ির মধ্যে সব সময়েই একটা চাপ থাকত, কিন্তু ওই চাপটা পাওয়াটা আমার জন্য খুবই দরকার ছিল। যখন ছোট ছিলাম আমার এসব ভালই লাগত। কিন্তু কৈশোরে পৌঁছে এটা জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়ে পৌঁছে আমার জীবনের মুখ্য ভূমিকায় আর আমার মা ছিলেন না, যদিও তিনি অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ ছিলেন; মান যিনি স্থির করবেন সেই মানুষ্টির ভূমিকায় তিনি আর ছিলেন না। সুতরাং এই বয়স্কা মহিলারা সেই জায়গাতে এলেন, এবং যদিও তারা এমন কোন মান নির্ধারণ করেন নি যাতে আমার আগ্রহ ছিল, একটা চাপের পরিস্থিতি অনবরতই ছিল যা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

প্রশ্নকর্তাঃ লাইভ্‌স অব গার্লস অ্যান্ড উইমেন-এ মা ও মেয়ে যেভাবে শহরে থাকতে আসে, সেভাবে আপনি তাহলে আসলেই থাকেন নি ?
এলিস মুনরো : একবার শীতের সময় সেরকমই হয়েছিল। এক শীতে আমার মা স্থির করেছিলেন যে তিনি শহরে একটা বাড়ি ভাড়া নিতে চান, এবং তিনি তাই করলেন। তিনি মহিলাদের জন্য লাঞ্চ পার্টি রাখলেন, সোসাইটিতে নিজের একটা জায়গা করে নিতে চেষ্টা করলেন যা তার পক্ষে একেবারেই অগম্য ছিল। ফলে তিনি সেটা পারলেন না। ওখানে কোন বোঝাপড়ার ব্যাপারই ছিল না। ফার্মহাউসে ফিরে আসার কথা আমার মনে পড়ে, যেখানে শুধু পুরুষরাই ছিল, আমার বাবা এবং আমার ভাই। ওখানে কোনকিছুর কোন প্যাটার্ন আর দেখা যেত না। যেন বাড়ির মধ্যে কাদা ভর্তি হয়ে গেছে।

প্রশ্নকর্তাঃ এমন কোন গল্প আছে যা আপনার পছন্দ কিন্তু অন্যদের পছন্দ না?
এলিস মুনরো : দ্য মুন ইন দ্য অরেঞ্জ স্ট্রিট স্কেটিং রিংক’ গল্পটা আমার বেশ পছন্দের ছিল, কিন্তু গেরির ওই গল্পটা পছন্দ হয়নি। ওর শৈশবের কথা যা ও আমাকে বলেছিল, তার সূত্র থেকেই এই গল্পটা লেখা। ফলে ও হয়ত ভেবেছিল যে গল্পটা অনেক অন্যরকম হবে। আমি ভেবেছিলাম ওর গল্পটা পছন্দ হবে, আমার কোন সন্দেহ ছিল না। আর তখন ও বলল, “তোমার সেরা গল্পগুলির একটা এটা নয়।” সেবারই কেবল আমার লেখা কোনকিছু নিয়ে আমাদের মধ্যে সমস্যা হয়েছিল। সেই থেকে, আমার সামনে কোন কিছু পড়ার ব্যাপারে ও রীতিমত সতর্ক থাকে, আর তারপরে যদি ওর পছন্দ হয় তবে ও সেটা বলে, আবার হয়ত কিছু বললই না। আমার মনে হয় বিয়েতে এভাবেই হয়ত সব সামলাতে হয়।

প্রশ্নকর্তাঃ আপনি যেখানে বড় হয়েছেন, তার থেকে বিশ কিমি-রও কম দূরত্বে গেরির বাড়ি ছিল। ওনার কথাসূত্র, এবং শৈশবস্মৃতি কি আপনার কাছে আপনার প্রথম স্বামী জিম-এর জীবনস্মৃতির তুলনায় বেশি ব্যবহারযোগ্য?
এলিস মুনরো : না, জিম ছিলেন টরন্টোর কাছাকাছি অঞ্চলের মানুষ। কিন্তু তার জীবনের প্রেক্ষাপট খুবই আলাদা ছিল। তিনি উচ্চ-মধ্যবিত্ত ধরনের একটি শহরের বাসিন্দা ছিলেন যেখানে অধিকাংশ লোকই টরন্টোয় কাজ করত এবং পেশাদার ছিল। চিভার নিউ ইয়র্কের আশেপাশে ওই ধরনের মফস্বল সম্পর্কে লিখেছিলেন। এই শ্রেণীর মানুষদের সাথে আমার আগে কখনও পরিচয় ছিল না, ফলে তাদের ভাবনাচিন্তা আমার কাছে অসম্ভব আগ্রহের বিষয় ছিল, কিন্তু তা গল্পের সূত্র তৈরি করতে পারেনি। আমি বোধহয় অনেকদিন ধরেই ওই ধরনের যাপনকে গ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই আক্রমণাত্মক ছিলাম; ওই সময় আমি অনেকটা বামপন্থী ভাবাপন্ন ছিলাম। আর গেরি আমাকে যা বলে তার অনেকটাই আমি আমার বেড়ে ওঠার দিনগুলি থেকেও মনে করতে পারি – যদিও মফস্বলের একটা ছেলের জীবন আর ফার্মে একটা মেয়ের জীবনের মধ্যে চূড়ান্ত তফাৎ রয়েছে। গেরির জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময় বোধহয় ছিল ওর সাত থেকে চোদ্দ বছর বয়সের মাঝখানের সময়টা, যখন ছেলেরা দল বেঁধে এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। তারা সমাজবিরোধী ছিল না, তবে যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াত, যে কোন মফস্বল শহরের মধ্যেকার আরেকটা উপ-সংস্কৃতির মত। মেয়েরা কখনই এইসব ব্যাপারের অংশ ছিল না। আমাদের বান্ধবীদের সব সময়ই ছোট দল থাকত, আমাদের অত স্বাধীনতা ছিল না। ফলে এইসব শুনতে ভালই লাগত।

প্রশ্নকর্তাঃ এই অঞ্চলের বাইরে আপনি কতদিন ছিলেন?
এলিস মুনরো : ১৯৫১-এর শেষদিকে আমার বিয়ে হল। ভ্যাঙ্কুভারে থাকতে গেলাম, ১৯৬৩ অবধি সেখানে ছিলাম, তারপর আমরা ভিক্টোরিয়াতে চলে আসি যেখানে আমাদের বইয়ের দোকানটা খোলা হল মুনরোজ। আমি ফিরে আসি, সেটা বোধহয় ১৯৭৩-এর সামার। সুতরাং আমি ভিক্টোরিয়াতে দশ বছর মাত্র কাটিয়েছি। কুড়ি বছর ধরে আমি বিবাহিত ছিলাম।

প্রশ্নকর্তাঃ আপনি গেরির সাথে দেখা হওয়ার পরে ইস্টে চলে এলেন, নাকি কাজের জন্য?
এলিস মুনরো : কাজের জন্য। তাছাড়া ভিক্টোরিয়াতে আমার প্রথম স্বামীর সাথে দশ বছর ধরে থাকছিলামও। এক বা দুই বছর ধরে বিয়েটা কার্যকরী হচ্ছিল না। ছোট শহর ছিল। পরিচিত একদল বন্ধুবান্ধব থাকে যেখানে সবাই সবাইকে চেনে, আর আমার মনে হচ্ছিল যে একটা বিয়ে যদি ভেঙে যেতে থাকে, সেই একই পরিবেশে থেকে যাওয়া খুবই কঠিন। আমার মনে হল আমাদের জন্য ওটাই ভাল হবে, আর ও আসতে পারল না যেহেতু ওর বইয়ের দোকানটা ছিল। টরন্টোর বাইরে ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে আমি সৃষ্টিশীল লেখালেখি শিখানোর একটা কাজের প্রস্তাব পেলাম। কিন্তু কাজটা আমি করতেই পারিনি। আমার বিরক্তি লাগত। ফলে, টাকাপয়সা একেবারে না থাকা সত্ত্বেও আমি কাজটা ছেড়ে দিই।

প্রশ্নকর্তাঃ আপনার ফিকশন পড়াতে ভাল লাগত না ?
এলিস মুনরো : না! ভয়ানক ব্যাপার ছিল। সেটা ১৯৭৩। ইয়র্ক ক্যানাডার অন্যতম প্রগতিশীল ইউনিভার্সিটি ছিল। তা সত্ত্বেও, আমার ক্লাসে শুধু ছাত্রই ছিল, একটি মেয়ে ছাড়া যে কখনও বলার সুযোগই পেত না। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে যা ফ্যাশনেবল মনে হত ওরা তাই করছিল – একইসাথে দুর্বোধ্য এবং খুবই সাধারণ হওয়ার মত একটা ব্যাপার; অন্য কিছু মেনে নেয়ার ক্ষমতা ওদের ছিল না। আমার জন্য চেঁচিয়ে পালটা উত্তর দেয়া এবং কিছু ধারনা যাতে আমি তখনও শান দিইনি, সেসব নিয়ে কথা বলার বিষয়টা খুবই আগ্রহের ছিল; কিন্তু আমি জানতাম না কী ভাবে ওদের ভিতরে পৌঁছাতে পারি, কী ভাবে ওদের প্রতিপক্ষ না হতে পারি। হয়ত এখন জানি। কিন্তু তার সাথে লেখালেখির কোন সম্পর্ক আছে বলে মনে হত না – বরং টেলিভিশন বা ওইরকম কোথাও চাকরি পাওয়ার ব্যাপারে ভাল একটা প্রশিক্ষণ, ক্লিশেগুলিতেই ভালো রকম মানানসই হয়ে ওঠা। আমার সেইসব পালটানোর ক্ষমতা থাকা উচিত ছিল, কিন্তু আমি তা পারিনি। আমার এক ছাত্র ছিল যে ওই ক্লাসে ছিল না, আমার কাছে একটা গল্প নিয়ে এসেছিল। আমার মনে আছে, গল্পটা এত ভাল ছিল যে আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। কেননা আমার ছাত্রদের কোন ভাল কিছু লিখতে আমি বহুদিন দেখিনি। মেয়েটা জিজ্ঞাসা করেছিল, আমি আপনার ক্লাসে কী ভাবে ভর্তি হতে পারি? আমি বলেছিলাম, হোয়ো না। আমার ক্লাসের ধারেকাছেও এসো না, আমায় শুধু তোমার কাজগুলি দেখিয়ে যেও। সে পরে লেখিকা হয়েছে। একমাত্র সেই হতে পেরেছে।

প্রশ্নকর্তাঃ ক্যানাডার মত ইউএসএ-তেও কি ক্রিয়েটিভ রাইটিং স্কুল বেড়েছে ?
এলিস মুনরো :  না, ততটাও নয়। আইওয়ার মত কিছু আমাদের এখানে নেই। তবে রাইটিং ডিপার্টমেন্টগুলিতে পড়ানোর পেশা রয়েছে। আমার এদের জন্য খারাপ লাগত কেননা এদের বই বেরোয় না। আমি যা রোজগার করতে পারব তার অন্তত তিনগুন টাকা ওরা রোজগার করছিল, এই বিষয়টা আমার মধ্যে তেমন ভাবে প্রভাব ফেলেনি।

প্রশ্নকর্তাঃ আপনার গল্পের বেশির ভাগই অন্টারিওর পটভূমিকায় লেখা বলে মনে হয়। আপনি কি এখন এখানে থাকার ব্যাপারটা বেছে নিতেন, নাকি এটা পুরোই পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত ছিল?

এলিস মুনরো : যেহেতু এখানে থাকা হয়ে গেছে, আমি বেছে নিতাম। এটা গেরির মায়ের বাড়ি, আর ও এখানে ওর মায়ের যত্ন নেয়ার জন্য থাকছিল। আর আমার বাবা আর সৎ মাও এই এলাকাতেই ছিলেন; আমরা মনে করেছিলাম যে অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও আমরা এই বৃদ্ধ মানুষগুলির যত্ন নেব, আর তারপরে আমরা অন্য কোথাও যাব। তারপরে, বিভিন্ন কারণে, সেইসব আর হয়ে ওঠেনি। ওরা চলে গেছেন অনেকদিনই, তবু আমরা এখানে রয়ে গেছি। এখনও থেকে যাওয়ার অন্যতম কারণ হল, এই ল্যান্ডস্কেপ আমাদের দুজনের জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভীষণ বড় একটা বিষয় যা আমাদের দুজনের মধ্যে রয়েছে। গেরিকে ধন্যবাদ – আমি ভীষণভাবে এই বিষয়ে কৃতজ্ঞ থাকি। অন্য কোন ল্যান্ডস্কেপ, দেশ, লেক বা শহর আমি এইভাবে গ্রহণ করতে পারতাম না। আর সেটা আমি এখন বুঝতে পারি, তাই আমি কখনও এখান থেকে যাব না।




------------------------------------------------------------------------------------------------------
(চলমান। বাকী পর্বগুলো আসছে।)




গল্পপাঠ অনুবাদ টিম : 

নৃপেন্দ্রনাথ সরকার, 

কাজী মামুন, অরণ্য,
শ্রাবণী এণ্ডোচৌধুরী, 

দোলন চাঁপা চক্রবর্তী

৪টি মন্তব্য:

  1. ভালো লাগলো- এলিস মুনরোর লেখার কোন অনুবাদ আছে বাংলায়?

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ২০১৬ তে নতুন শতক নামের একটি পত্রিকা এলিস মুনরো সংখ্যা করছে। তাতে উনার গল্পের অনুবাদ পাবেন

      মুছুন
  2. এই সাক্ষৎকারটি আমি কিছুদিন আগে ইংরেজিতে পড়েছি, আজ বাংলা অনুবাদ পড়তে পেরে আনন্দিত হলাম

    উত্তরমুছুন