শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

পাঠ-প্রতিক্রিয়া দেশভাগের বয়ান : -ভাসিয়ে দিয়েছি কপোতাক্ষ জলে

গীতা দাস

আমি সুযোগ পেলেই বই কিনি এবং পড়ি। তবে যা কিনি সব পড়ে শেষ করতে পারছি না। আমার চাকরিটি প্রায়শই আমার ব্যক্তিগত সময় দাবি করে। সংসারতো আছেই। এটাকে কোন সমস্যাই মনে হয় না। কারণ, আমার মাসিক আয়ের সব যেমন খরচ করে ফেলতে পারিনা এবং ফেলিনা, সঞ্চয়করি। তবে তা কৃপণতা করে নয়।

তেমন যে বই কিনিস বই তখন পড়ে ফেলতে পারিনা। সংগ্রহে থাকে। ধীরে ধীরে পড়ি। বই সঞ্চয় করি । আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে নগদ সঞ্চয় হয়, বইয়ের সঞ্চয়ের হিসাব এর থেকে আলাদা। বই কিনি, পড়ি, কিন্তু পড়লওে সঞ্চয় ফুরায় না, বরং বাড়ে।


অমর মিত্রের জন্মদিনে মনোজ মিত্র ও অমর মিত্রের “ভাসিয়ে দিয়েছি কপোতাক্ষ জলে” কিনে আমার বই ব্যাংক ব্যালেন্সকে সমৃদ্ধ করেছিলাম। তবে এ বইটি পড়ার জন্য সেলফের আরও পেছনের সারিতে ছিল। কুলদা রায় এ বইটি আমার টেবিলে এনে রাখতে উদ্ধুদ্ধ করলেন। । দেশভাগ নিয়ে রায় সাহেবের কোথাও কোন আবেগ থেকেই যেন এ বিষয়ক সব বই পত্রে তিনি ভীষণ আগ্রহী। কাজেই এ লেখাটি কুলদা রায় কর্তৃক উদ্ধুদ্ধ করণের ফসল।

ভাসিয়ে দিয়েছি কপোতাক্ষ জলে। কী! দুই সহোদর কী ভাসিয়ে দিয়েছেন কপোতাক্ষ জলে? পূবর্পুরুষের স্মৃতি আর ভিটে? না, অন্য কিছু।

পড়তে শুরু করলাম। মনোজ মিত্রের “বেলা খুব ছোট” শুরু একটা সাপ নিয়ে। যে সাপ “করে নাকো ফোঁসফাঁস মারে নাকো ঢুঁশঢাঁশ।’ সাপটি কি সম্প্রীতি ও সাম্প্রদায়িক সমঝোতা !

মনোজ মিত্রের ঠাকুমা হেম নলিনী দুধের শিশুকে চিঠি লিখতেন। ঠাকুমা হেম নলিনী লিখেছেন--- “দুগ্ধ পছন্দ না হৈলে মুখে নিয়া ফেলিয়া দিবে, কক্ষনো ঢোক গিলিবে না।”

এ চিঠি দেশভাগের রাজনৈতিক দলিলের মত নয় কি? কঠিন ভাষায় অবুঝ শিশুকে চিঠির মত। নিরীহও নিস্তরঙ্গ যাপিত জীবনকে যা তছনছ করে দিয়েছিল ! ধনী,অন্ত্যজ, শিক্ষিত, নিরক্ষর , এপারের ওপারের সব সংখ্যালঘু গোষ্ঠির বেলায় যা প্রযোজ্য। সবাইকে দুধের মত দেশভাগ পছন্দ না হলওে অবশ্য ঢোক গিলতেই হয়েছিল।

যে কোন মানুষ যখন বাধ্যতামূলক দেশত্যাগ করে সে সারা জীবন এক অসম্পূর্ণ জীবনকে বয়ে বেড়ায়, স্মৃতির বোঝায় থাকে ন্যূব্জ। সে দেশত্যাগ ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় হোক। সাম্প্রদায়িকতার আশংকায় তাড়িত হয়ে হোক বা সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে বিতাড়িত হয়ে হোক । দেশত্যাগীদের ভেতর ভেতরে কি ক্ষয়ে যেতে থাকে বিশ্বাসবোধও! মিত্রদের ঠাকুমা হেমনলিনী দেশত্যাগের পর পনের বছর বাঁচলওে দূর্গার মুখ দেখেন নি। বলেছেন, যে দেশভাগকে ঠাকুর ঠেকাতে পারেননি—তাকে মুখ দেখাই কী করে। দেশভাগ, দেশত্যাগের মত কঠিন বাস্তবতা মানুষকে লৌকিক করেছে। অলৌকিকতার ওপরে আস্থা কমিয়েছে।

মনোজ মিত্রের কাছে বেত্রবতী নদীর কূলের“ আমাদের সেই লম্বু তালগাছটার মতো অত উঁচুতে মাথা তুলতে আজ পযর্ন্ত কোন্ও বৃক্ষকে দেখিনি আমি।”

এটাই প্রেম। দেশপ্রেম। নিকষিত হেম। যে কোন প্রেমের মত দেশপ্রেমও যুক্তি মানে না। দেশভাগ যে প্রেমকে জ্বলুনিতে পরিণত করেছে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মিহির সেনগুপ্ত এবং অন্য আরও অনেকের মত অমর মিত্রও “শিকড়ের খোঁজে” বাংলাদেশে এসেছেন। সাথে ছিল সাত বন্ধু, যাদের সবার দেশ বাংলাদেশে নয়। আফসার আহমেদ ভারতীয় হলেও তার স্বজনরা দেশত্যাগী। ভারতত্যাগী বাংলাদেশী। দেশভাগ দু’দেশেরই সংখ্যালঘুদের পরিবারকে ভাগ করেছে-- বিচ্ছিন্ন করেছে । একান্নবর্তী পরিবারকে করেছে দূরবর্তী। এখানে আমি আমার মায়ের বেদনাকে অনুভব করেছি। চার ভাই ও দুই বোন ভারতে আর আমার মা বাংলাদেশে।

এসব আবেগে মথিত হয়েই অমর মিত্রের লতায় পাতায় জড়ানো শিকড়ের ভাঁজ খোলার চেষ্টা। তাকে তার পূব র্পুরুষেরা এদেশে আসার পর মেঘ হয়ে ছায়া দিয়ে রেখেছিল।

সাতক্ষীরায় এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পঞ্চাশ বছর যাবৎ লাল খেরোয় মোড়া রেজিস্টারে আগলে রেখেছেন কিছু নাম। তিনি দেখাচ্ছেন স্কুলের রেজিস্ট্রার খুলে অমর মিত্রকে তাঁর অগ্রজ মনোজ মিত্রের নাম। সেই ১৯৪৭ সালে এই স্কুলে মনোজ মিত্র পড়তেন। সেই নামটি দেখাচ্ছেন অমর মিত্রকে পঞ্চাশ বছরে পরে। যখন মনোজ মিত্র পড়তেন—অনুজ অমর মিত্রের তখনও জন্মই হয়নি। এই প্রধান শিক্ষকও যে দেশভাগে অবিশ্বাসী এক দেশপ্রেমী, প্রতিবেশী প্রেমী এবং সংবেদনশীল এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।

দেশভাগ অমর মিত্রদের মত বহু পরিবারকে--ব্যক্তিকে হাহাকারে নিমজ্জিত করেছে, আবার অসাম্প্রদায়িক চেতনায় এক থালায় ভাত খাইয়েছে --- বিষ বৃক্ষকেও পড়ে ফেলার কাজে নিরন্তর ব্যপৃত রাখছে।

“ভাসিয়ে দিয়েছি কপোতাক্ষ জলে” ভাসান নয়, ভাসিয়ে দিয়েছে না দিতে বাধ্য হয়েছে ? আসলে ভাসাতে পারেন নি। ভাসানো সম্ভব নয়। উচিতও নয়। প্রয়োজনও নেই।

বইটিতে অগ্রজ নাট্যকার মনোজ মিত্র মাটির প্রতিমা সৃষ্টির মত পটভূমি তৈরি করে দিযেছেন, কাঠামোটি বসিয়েছেন , অনুজ কথাশিল্পী অমর মিত্র এটিকে বেঁধেছেন।


যাহোক,দেশভাগের বাস্তবতা ব্যক্তির পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে, মানসিক জগতকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যে র্বিপযস্ত করেছে এরই সফল বয়ান “ভাসিয়ে দিয়েছি কপোতাক্ষ জলে”।







লেখক পরিচিতি
গীতা দাস

নরসিংদীতে জন্ম। এখন থাকেন ঢাকায়। চাকরি করেন ইউনিসেফে।
প্রবন্ধ লেখেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন