শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

অমর মিত্রের আত্মস্মৃতি : দেশভাগ—বেদনার উত্তরাধিকার

 স্বাধীনতা, দেশভাগের পর আমার জন্ম ১৯৫১-য় পূর্ববঙ্গতে। তখন তা ছিল পাকিস্তান। আমার পিতৃপুরুষের দেশ ছিল সাতক্ষীরার সন্নিকটে ধূলিহর গ্রামে। আমাদের ঠাকুরদা বিশ্বাস করেন নি, পার্টিশন নামের অদ্ভূত এক সিস্টেম টিকে থাকতে পারে। তাই সীমান্ত শহর বসিরহাটের গায়ের গ্রাম দন্ডীরহাটে বাড়ি করেছিলেন বাবা কাকাদের দিয়ে। যদি কোনোদিন সীমান্তের দাগ মুছে যায় আমরা আবার আমাদের গ্রামে ফিরে যাব।


আমাদের কপোতাক্ষ নদ, সুপুরিঘাটা, বড়দল স্টিমারঘাট, আমাদের বাগান, কালভৈরবের মন্দির ফিরে পাব। ফিরে পাব বাবার তৈরি করা ধূলিহর প্রাথমিক বিদ্যালয়, এজার শানা, মোজার শানাদের। এজার, মোজার শানা ছিলেন বাবার অতি অন্তরঙ্গ বন্ধু। তাঁরা আমাদের কলকাতার বাসায় এসেছেন অনেকবার। আমি দেখেছি ছোটবেলায়। ওপার থেকে কেউ এলে আমাদের ফ্ল্যাট বাড়িতে সাড়া পড়ে যেত। মনে হত তাঁরা যেন কোনো খবর নিয়ে এসেছেন, পার্টিশন উঠে গেছে। আমি আমাদের সেই গ্রামে চার-পাঁচ বছর বয়সেও থেকেছি। আমার ছোটকাকা ছিলেন কারমাইকেল মেডিকেল স্কুল থেকে পাশ করা এল,এম,এফ, ডাক্তার। জাপানি বোমা কলকাতায় পড়লে তাঁকে পুরো ডাক্তারি না পড়িয়ে ঠাকুরদা ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন গ্রামে। তিনি ধূলিহরে থেকে গিয়েছিলেন ১৯৬৫ পর্যন্ত। ওই অঞ্চলের খুব জনপ্রিয় চিকিৎসক ছিলেন তারাপদ মিত্র। ১৯৬৫-র যুদ্ধের পর তাঁকেও দেশ ছাড়তে হয়। দন্ডীরহাটে চলে আসেন।


আমার দেশভাগ জানা আমার মায়ের কাছে। দেশভাগ আমার মাকে দুমড়ে দিয়েছিল তা এখন টের পাই। না, আমাদের উদ্বাস্তু কলোনিতে থাকতে হয় নি। আমার বাবা সরকারী চাকরি করতেন। শেষে ছিলেন ঢাকার ভারতীয় হাই কমিশনে লিঁয়াজ অফিসার। তার আগে সিরাজগঞ্জ, মৈমনসিং, টাঙ্গাইল নানা জায়গায় কাটিয়েছেন। তখন আমার জন্ম হয় নি। মায়ের কাছে শোনা। মায়ের কাছে ধলা পাহাড়, যমুনা নদী, দাঙ্গার সময় কোনো এক তোয়াজ খাঁ রাত ভোর পাহারা দিত আমাদের বাসা, বাবা ফেরেন নি, ঋণসালিশীর শুনানীর জন্য গিয়েছেন দূর গাঁয়ে। ফজলুল হক ঋণগ্রস্ত চাষীদের ঋণ মকুবের আইন করেছিলেন। তা ঋণগ্রস্ত চাষীদের সিংহভাগ ছিল মুসলমান আর নমশূদ্র। বাবা তাঁদের ভালবাসা পেয়েছিলেন তাই আমাদের কিছু হয় নি। হ্যাঁ, তোয়াজ খাঁ ছিলেন কিন্তু বিহারী মুসলমান, বাবার অফিসের নৈশ প্রহরী। যখন ছেড়ে আসেন মা-বাবা তাঁর দুই সন্তান নিয়ে সেই ধলা পাহাড়ের দেশ, তোয়াজ খাঁ পাহারা দিয়ে নিয়ে এসেছিল যমুনার ঘাট পর্যন্ত। সব কথা মায়ের মুখে শোনা। মায়ের আমি কনিষ্ঠ পুত্র। মা রাতে আমাকে শোনাতেন তাঁর বাপের বাড়ি কপোতাক্ষ তীরের বাঁকা ভবানীপুর গ্রামের কথা। স্টিমারের ভোঁ, কপোতাক্ষর সেই সময়ের বিপুলতা, ঢেউ। মায়ের চোখের জল নিঃশব্দেই কপোতাক্ষতে মিশে যেত তখন। আমার দেশভাগ এই রকম। দন্ডীরহাট গ্রামের খুব কাছে ছিল সীমান্ত। আমি ছেলেবেলায় সীমান্ত দেখতে যেতাম, মনে আছে। ওই ওপারে আমাদের গ্রাম ছিল, যার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে, ভাবতেই গা সিরসির করে উঠত। আমাদের সাতক্ষীরা ছিল কাঁচা গোল্লা সন্দেশের জন্য সুখ্যাত। সেই কারিগরদের অনেকে দেশভাগের পর বসিরহাটে চলে আসেন। আমদের পরিবারে কোনো অনুষ্ঠান হলে কাঁচা গোল্লা আনা হয় বসিরহাট থেকে। এখনো। আমার মেয়ের বিয়ের সময়ও এসেছিল তা। আমাদের বাড়িতে তা সাতক্ষীরের সন্দেশ।


ছোটবেলায় আমাদের বেলগাছিয়ার ফ্ল্যাট বাড়িটি ছিল জংশন স্টেশনের মতো। ওপার ছেড়ে আসা নানা গ্রামের মানুষ, আত্মীয়, অনাত্মীয়রা আমাদের ফ্ল্যাটে এসে উঠতেন। তারপর ঠিকানা জোগাড় করে চলে যেতেন মেটেবুরুজ, মসলন্দপুর, বিরাটি, দমদম—নানা জায়গায়। সে ছিল হত অদ্ভূত এক ছেলেবেলা। রুশ দেশের গল্প সেই দাদুর দস্তানার মতো হয়ে গিয়েছিল আমাদের বাসা। আর এসোজন-বসোজনের বিরাম ছিল না। তাঁরা সব পূববঙ্গ থেকে আসা মানুষ। উতুলি, কাটপাড়া, রাঢ়ুলি, কুকরুলি, ফিংড়ি, বুধাহাটা---নিরন্তর এই সব গ্রামের নাম শুনতাম। আমার মাসিরা তাঁদের মেয়েদের পার করে দিয়ে ওপারে ছিলেন। মা-বাবা ছেড়ে সেইসব বালিকা বোনেরা আমাদের বাড়ি থাকত। ভেসে বেড়াত ভাইয়েরা। এক ভাই ছিল খড়গপুর, একভাই দমদম। এক বোন বেলগাছিয়া, আর এক বোন বসিরহাট। মেসো- মাসি এপারে আসবেন কী করে ? মেসো চিরকাল জমি নিয়ে থেকেছেন, এপারে এসে তো ভেসে যাবেন। কাজ করার অভ্যাস নেই। এসেছিলেন অবশ্য। রেশন দোকানে বিল কাটতেন। দুই মেসো এমনি, আর এক মেসো এসে চন্দননগরে বসত করেছিলেন। ভয়াবহ দারিদ্র ছিল ওপারের ভূমধ্যকারী সেই পরিবারের। তিনি ছিলেন চিত্রকর। পোরট্রেট করতেন অসামান্য। ওতেই জীবিকা। আর ছিল কমলালয় স্টোরে কী একটা কাজ। তাঁকে খালি পায়ে আমাদের বাড়ি আসতে দেখেছি । এইসবই আমার ছেলেবেলার পার্টিশন।


দেশভাগ কিন্তু সীমান্ত ভাগ আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ব্যতীত অন্যভাবে আমার কাছে এসেছে। এই ভাবে। আমার বউদির বাবা ছিলেন আমার বাবার ছেলেবেলার বন্ধু। আর বউদির দিদিমা ছিলেন আমাদের পূর্ব পরিচিতা। তিনি প্রায় সব হারা হয়ে এপারে আসেন। ছেলে বসিরহাট কোর্টের মুহুরি। তাঁর দুঃসম্পর্কের দাদু ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। আর পিসি মানকুমারী বসু। সেই বিধবা বৃদ্ধা শাদা থান কাপড়, বগলে থান আর শায়া শেমিজের পুটলি নিয়ে বসিরহাট আর দিল্লি করে বেড়াতেন। দিল্লিতে তাঁর জামাই। আর যাওয়া বা ফেরার সময় আমাদের বেলগেছের বাসায়। তাঁর কাছেই আমি প্রথম শুনি, ‘’ সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে / সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।‘’ মাইকেলের কপোতাক্ষ প্রশস্তি। তিনি আমাদের বোধ হয় মেঘনাদ বধ কাব্যের প্রথম কয়েক চরণও শোনাতেন স্মৃতি থেকে। তিনি ওপারে সব ফেলে এসেছিলেন, শুধু মহাকবি মাইকেল আর কপোতক্ষ নদের স্মৃতি নিয়ে এসেছিলেন। আরো কতজন যে আছেন। আমাদের গাঁয়ের হরে মামা, নমঃশূদ্র। বাবার সঙ্গে ঘুরতেন বাবার চাকরিস্থলে, সেই টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, ঢাকা। দেশভাগের পর হরে মামা টাকি রোডের ধারে কোথায় ঝুপড়ি বানিয়ে থাকতেন। নানা রকম কাজ করতেন। আইসক্রিম গাড়ি ঠেলতেন। আমাদের বলতেন, চলো খোকা, খোলাপোতা চল, আমি তুমারে আইসকিরিম খাওয়াব। খোলাপোতায় গিয়ে আইসক্রিম খাওয়া হয় নি আমার। হরে মামা সাহায্য নিতে আসতেন। মার কাছ থেকে শাড়ি ব্লাউজ, এটা ওটা, চাল গম—নিয়ে যেতেন। আবার হাত সাফাইওও করতেন। হাত টান ছিল তাঁর। মা সবসময় তাঁর পক্ষে। ধরা পড়ে গেলেও মা হরেমামার হয়ে কথা বলতেন। এই হল আমার দেশ ভাগ। দেশ ভাগ মানে মায়ের দুপুরে রেডিও পাকিস্তান শোনা, তারপর রেডিও বাংলাদেশ। মা শুনতেন আর আমাকে খবর দিতেন সাতক্ষীরের কোথায় নতুন ব্রিজ হল, কপিলমুনির ঘাট, কপোতাক্ষ নদে কী হল ? মা খবর শুনে আমাকে বলতেন। আর ডায়েরি লিখতেন গোপনে। সে এক গল্প। মা পারটিশনের কথা তাঁর অকাল প্রয়াত মা-বাবাকে জানাতেন চিঠির আকারে,

শ্রীচরণেষু মা,

তুমি শুনিলে দুঃখ পাইবে আমরা আর খুলনা জিলায় নাই। দেশ হিন্দু-মুসলমানে ভাগ হইয়া গিয়াছে। আমাদের গ্রাম আমার শ্বশুরবাড়ি, সাতক্ষীরা এখন আমাদের দেশ নাই, সব ছাড়িয়া আসিতে হইয়াছে .........।

না, আমি কোনো গল্প বলছি না আপনাদের। এইটা সত্য। মায়ের সেই ডায়েরি আমি পড়েছিলাম। রাখতে পারি নি, লজ্জিতা রাধারানি তা কেড়ে নিয়েছিলেন আমার কাছ থেকে। আর এবার হাতে এসেছিল তা। মায়ের মেজবোনের মৃত্যুর পর মা সেই সংবাদ জানিয়েছিলেন তাঁর মাকে। সবই সে ডায়েরিতে লিখে।


শ্রীচরণেষু মা,

মনু আর নাই। এপারে আসিয়া খুব কষ্ট পাইয়াছিল। অভাব আর রোগ তাহাকে খুব কষ্ট দিয়াছে। তুমি তাকে কোলে তুলিয়া লইয়ো......। দেখা হইয়াছ কি? …..

আসলে দেশভাগ বলতে আমি আমার মায়ের বেদনাকেই ধারণ করেছি। আমার ঠাকুরদা, ঠাকুমা, সেই হরে মামা, বউদির দিদিমা আরো বহুজনের বেদনাকেই ধারণ করেছি। মায়ের কাছ থেকে কপোতাক্ষ বর্ণনা শুনে, সেই দিদিমার কাছ থেকে মাইকেলের কপোতাক্ষ প্রশস্তি শুনে উত্তরাধিকার সূত্রে আমি কপোতাক্ষকে পেয়েছি। কপোতাক্ষ হারানোর বেদনা পেয়েছি। সব নদীকেই ওই নদী মনে হয় আমার। আমি অনেক লেখক বন্ধু আর শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে টাকি গিয়ে বহু রাত অবধি ইছামতীর কুলে বসে দেখতে পেয়েছিলাম অন্ধকারে আমার পিতৃপুরুষ ভেসে চলেছেন অকুল গাঙে। ওই ওপারে আমাদের ভিটে বাড়িতে হেরিকেন জ্বালিয়ে বসে আছে আমার বড় ঠাকুমা। ফিরে এসে একটি গল্প লিখেছিলাম, ‘নদীর ওপার’।

আমাদের এক লেখক বন্ধু তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তাঁর একটি নদী আছে। একটি গ্রাম আছে। জন্মভিটে আছে......ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি তাই নিয়ে লেখেন। শুনতে শুনতে আমি ভেবেছিলাম, আমার নেই। এসব কিছুই নেই। সব আমরা ওপারে ফেলে এসেছি। তাহলে আমার কি লেখা হবে না ? আমি পরে ভেবে দেখেছি, এই না থাকার কথাই তো আমি লিখি। আমার বন্ধু বলেছিলেন, অমর তুমি বড্ড ওপার ওপার করো, কেন করো, এইটাই তো তোমার দেশ, এই দেশের খাও, পরো...।

এইটা আমার দেশ তা কে না জানে? কিন্তু শিকড় যে টেনে ধরে। কেন তা কী করে জানব ? জীবনের দুর্জ্ঞেয় কিছু কথা তো থাকে। আমি ওপারে বড় হই নি, তাহলে কেন ওপার আমাকে নিরন্তর টানে। আমাদের সেই সামান্য গ্রাম, সামান্য ভিটে কেন টানে ? ৪-৫ বছরের স্মৃতি বড় হয়ে ছায়া ফেলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি আমাদের বেলগাছিয়া অঞ্চলের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলে ওষুধপ্ত্র কিনে ক’জনের সঙ্গে বনগাঁ গিয়ে বনবাদাড় পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে অনেক হেঁটে এক মুক্তিশিবিরে পৌঁছে গিয়েছিলাম। জয় বাংলা বলে এক মধ্যবয়সী মুক্তিযোদ্ধা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। আর ২০০০-এর বৈশাখে যখন গেলাম বাংলাদেশের খুলনায় আমন্ত্রিত হয়ে, রাতে খুলনার ডেপুটি কমিশনারকে আমি বলেছিলাম, দেখুন ঢাকা চট্টগ্রাম দেখার চেয়ে সাতক্ষীরে-ধুলিহর গ্রাম আমার কাছে অনেক বেশি টানে। নিজের পিতৃপুরুষের ভিটে দেখতে না পেলে বাংলাদেশ আমার দেখা হবে না। আমি এখান থেকেই কলকাতা ফিরে যাব। তো সেই সদাশয় ডেপুটি কমিশনার, আজহার আলি তালুকদার গাড়ি দিয়ে আমাকে পাঠিয়েছিলেন সাতক্ষীরে-ধুলিহর। গিয়ে দেখেছি আমার বাবার পত্তন করা সেই ইস্কুলে সব রেজিস্টার সযত্নে রেখেছেন মোজার শানার ছেলে। আমার পরিচয় শুনে তিনি আমাদের সকলকে নিয়ে গেলেন ইস্কুলের ভিতর। কিছু না বলে আলমারি খুলে একটি রেজিস্টার বের করে পাতা খুলে দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কার সই চিনতি পার?

আমার বাবার স্বাক্ষর। যত্ন করে রেখে দিয়েছেন তাঁরা। কেউ ভোলেন নি। সে যে কী অপরূপ অভিজ্ঞতা। আমি যখন ছুটছি ভিটের পিছন দিকের খিড়কির পুকুরটা দেখার জন্য। একজন বয়স্ক মানুষ মন্তব্য করলেন, ঠিক যেন তারা মিত্তির এয়েচে।

তারা মিত্তির—তারাপদ মিত্র আমার ছোটকাকা। ওই বয়সেই দেশ ছাড়েন। হ্যাঁ, আমি তাঁর উত্তরাধিকার নিয়েই তো প্রবেশ করেছি সেই গ্রামে, সেই ভিটেয়। আমার চোখে যে জল, সেই জল তো আমার নয়, তাঁদের জল। আমার মা-কাকিমাদের অশ্রু। আমরা গিয়েছিলাম সাগরদাড়ি, মধুকবির ভিটেয়। কপোতাক্ষ তীরে বসে আছি। সেই আমার প্রথম কপোতাক্ষ দেখা। ছোটনদী হয়ে গেছে। মজে গেছে অনেক। দেখে মন ভার। মা শুনলে কী ভাবে নেবেন ? তো এক যুবক আমাকে নদীতীরের একটি জায়গা দেখিয়ে বলল, ঐ জায়গার নাম বিদায়ঘাট। মধুসূদন বিলেত যাওয়ার আগে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। শেষবারের মতো বিদায় নিয়েছিলেন সাগরদাড়ি থেকে। তথ্যে ভুল আছে তো নিশ্চয়। বিলেত যাওয়ার সময় মা জাহ্নবী তো বেঁচে নেই। হয় তো মাদ্রাজ যাওয়ার সময় এসেছিলেন তিনি। মানুষের কল্পনাও হতে পারে। বিদায়ঘাট শব্দটি নিয়ে আমি ফিরেছিলাম। ‘সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে। সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।

আমার চোখে জল এসেছিল বউদির সেই দিদিমার মুখটি মনে পড়ায়। আমার চোখের সেই জল ছিল তাঁর বেদনার উত্তরাধিকার। সেই যে বিদায়ঘাট, তা হতে পারে সাগরদাড়ির মানুষের কল্পনা। তাঁদের গাঁয়ের ছেলে মধুর জন্য তাঁরা গর্বিত। আবার মধুর দারিদ্রপীড়িত জীবন, বিদেশযাত্রা তাদের বেদনাবিদ্ধ করেছিল, তাই ওই বিদায় ঘাটের কথা মনে করা। দেশভাগে কিন্তু সমস্ত দেশই, এপার ওপার বিদায়ঘাট হয়ে গিয়েছিল।




আসলে ছেলেবেলা থেকে শুধু ওপারের কথাই শুনেছি। এই যে আমার মেজ মেসোমশায়ের মৃত্যুর পর দুঃখিত বড়মামা আলাপ করছেন বাবার সঙ্গে, আপনি কি জানেন অশোকবাবু, কপোতাক্ষ শুকোয় গেছে, শ্মশান, শ্মশান, স্টিমার বন্ধ হয়ে গেছে।

কে বলল ?

কেন বড়বাড়ির নন্তু, গিয়েছিল ওপারে।

বাবা চুপ করে থাকলেন। বড়মামা উসখুস করতে লাগলেন, গাঙ শুকোলি তো মরুভূমি হয়ে যাবে, অত বড় গাঙ, হেঁটে পার হয় মানুষ, গাঙ ছাড়া মানুষ বাস করবে কী করে?

দেশভাগ সেই ৪৬-৪৭ থেকে পরপর ঘটে যাওয়া দাঙ্গা, আর অগণিত মানুষের ভিটে ত্যাগে শেষ হয়ে যায় নি। শেষ হয়ে যেতে পারে না। একটা কথা বলা হয়, দেশভাগ বাঙালি লেখককে তেমন বিচলিত করেনি, হাতে গোনা কিছু গল্প যার ভিতরে আমার মনে পড়ে কুলপতি ( দীনেশচন্দ্র রায় ) গল্পটির কথা। পারিবারিক কুলদেবতা নিয়ে এক গৃহবধূর সীমান্ত পার হয়ে আসার সেই গল্প আমাকে এখনো বিচলিত করে। আমাদের এই পারে নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে( অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়), কেয়াপাতার নৌকা( প্রফুল্ল রায় ) , এপারের লেখকদের সেই সময়ের বছর কুড়ি পরের এই ফসল। ওপারে সেই সূয দীঘল বাড়ি (আবু ইশহাক) বা আত্মজা ও একটি করবী গাছ( হাসান আজিজুল হক) একটি তুলসিগাছের কাহিনি( সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ ), এই মাত্র। পশ্চিম সীমান্তের মতো লেখা পূব সীমান্তে লেখা হয় নি। এইটা তো সত্য, মুসলমান যত সংখ্যায় এপার থেকে ওপারে গিয়েছিলেন ভিটে হারা দেশ-গ্রামহারা হয়ে, তার বহুগুন হিন্দু এপারে চলে এসেছিলেন। এদিকের অধিকাংশ লেখকের আদি নিবাস ছিল পূববঙ্গ। ওপারে তা নয়। হাতে গোনা কয়েকজন লেখক তার সাক্ষী, হাসান আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, এমনি কয়েকজন সৃষ্টিশীল লেখক।

লেখা তখন হয় নি, এখন হচ্ছে। এত বছর বাদে দেখছি বাঙলাভাষার লেখকরা বোধ হয় সময় নিয়েছিলেন সমস্তটা থিতিয়ে আসার জন্য। সময়কে দূর থেকে অনুধাবন করতে চেয়েছিলেন। আমার ঠাকুরদার মতো তারাও যেন বিশ্বাস করতে পারেন নি, এই সত্যই চির সত্য। তাই দেশ ভাগের কথা অনেক পরে, ৫০ বছরও পার করে তাঁরা লিখছেন, লেখা আবার যেন শুরু হয়েছে। আমি মাহমুদুল হকের কালো বরফ, হাসান আজিজুল হকের আগুন পাখির কথা বলছি। ওপারে আর কোনো তীব্র লেখা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। হাসান এবং মাহমুদুল হক এপারের মানুষ। তাঁরা তাদের সঞ্চিত বেদনার কথা অনেক বছর পরে লিখেছেন। আর এপারে দেবেশ রায় লেখেন এক মহৎ উপন্যাস, বরিশালের যোগেন মন্ডল। এতকাল অপেক্ষার পর আমরা দেশভাগের বেদনার কথা শুনতে পাচ্ছি। মাহমুদুল হক আমাকে মূহ্যমান করেছেন। তাঁর যে বেদনা সেই ১৯৪৭-এ উচ্ছিন্ন হওয়ার সময়, তা যেন আমার মা বাবার বেদনা। ওই যে তিনি বলছেন, ভাগ্যকুল তোরে মারব, তারপাশা তোরে মারব গোয়ালন্দ তোরে মারব......। রাতভর স্টিমার চলেছে। বারাসত থেকে, কাজিপাড়া শেঠপুকুর থুয়ে বালক মা বাবা দাদাকে নিয়ে চলেছে পদ্মার ভিতর দিয়ে। সারারাত। এক এক ঘাট আসে। তখন ক্রুদ্ধ বালক ওই কথা ভাবে। আমি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথাও বলব। দেশভাগ নিয়ে বড় উপন্যাস আলো নেই লিখতে লিখতে তিনি প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর সেই গল্প, তেওট তালে কনসার্ট, ঝিঁঝোটি দাদরা, ভিক্টোরিয়ার পরী, সে, ধারণ করে আছে গোপন বেদনা। আর ৭৬-এ পৌঁছে নাটককার মনোজ মিত্র যখন ওপারের কথা লিখে যান ‘গল্প না’ শিরোনামে, বা যখন লেখেন কপোতাক্ষর কথা ‘ভাসিয়ে দিয়েছি কপোতাক্ষ জলে’ ( আমি তাঁর সহ লেখক), সেও হয়ে ওঠে সঞ্চিত বেদনার উত্তরাধিকার।

আসলে দেশভাগ নিয়ে কথা কি শেষ হওয়ার? আর দেশভাগের কথা কি শুধু দাঙ্গার কথাই, এতটুকুতে তা আটকায়? পারটিশনের ৬৭ বছর বাদেও কোচবিহারের রাজা আর ঢাকার জমিদারের সেই খেয়ালি বন্টনের হলাহলে সৃষ্ট ছিটমহলে মানুষ কী ভাবে বাঁচে দেশহীন আর রাষ্ট্রহীন হয়ে ? এই নিয়ে উপন্যাস লেখা হয়েছে ওপারে। লিখেছেন সেলিনা হোসেন, ভূমি ও কুসুম। লেখা কত রকম ভাবে না হয়।

অতীন যখন ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে ‘র পর মানুষের ঘরবাড়ি লেখেন, এপারে বুনো জঙ্গল আর হোগলাবন পরিষ্কার করে উদ্বাস্তু ব্রাহ্মণ পরিবারের নতুন করে ঘরবাঁধার কথা লেখেন তা হয়ে ওঠে অনন্য আর এক উপন্যাস যা খন্ডিত দেশ আর জীবনের দর্পণ হয়ে ওঠে। দেশভাগ নিয়ে তা আর এক মহৎ উপন্যাস। আমি তো সেই দাঙ্গা দেখিনি, কিন্তু আমি বড় হতে হতে শুনেছি মায়ের মুখে হারানো গ্রাম, হারানো স্বজনের কথা। আত্মীয়স্বজনের কথা শুনেছি আমি কত। ভালমন্দ দুই শুনেছি। কারো মুখে সাম্প্রদায়িক ঘৃণার কথা যেমন শুনেছি, তেমনি বাড়ির অসাম্প্রদায়িক চেহারাও দেখেছি। ভাল-মন্দ দুই দেখতে দেখতে, ওপারে সব খুইয়ে আসা পরিবারের এপারে এসে ভেসে যাওয়া দেখতে দেখতে, মানুষের বেদনার কথা অনুভব করতে করতে আমার নিজের ভিতরে হারিয়ে যাওয়া দেশ যেন মহাবৃক্ষের ছায়া ফেলে রেখেছে। না হলে, ২০০০-এ হরিদাসপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভিতরে প্রবেশ করার পর যশোরের দিকে যখন যাচ্ছি, মাছের খারা হাতে এক বৃদ্ধকে দেখে কেন মনে হবে, আমার পিতামহ অন্নদাচরণ চলেছেন। কেন মনে হবে আমার প্রয়াত পিতৃপুরুষ, পিতামহী, মাতামহী, মাতামহ, প্রপিতামহ, প্র-প্র পিতামহ বাস করছেন বুঝি এই দেশে। মনে হয়েছিল মৃত্যুর পর তাঁরা স্বর্গেই গেছেন। আর স্বর্গ হলো সেই ধূলিহর বা বাঁকাভবানীপুর। কী এক অলীক ভাবনা। প্রপিতামহ যাদবচন্দ্র বা তাঁর পিতা লক্ষীনারায়ণ আমার জন্য অপেক্ষা করছেন ওই দেশে। এসব অলীক ভাবনা। কিন্তু তা এসেছিল কেন? ঘুরে ঘুরে আসে কেন? কেনই বা অনেক অনেক গল্পে চলে আসে দেশভাগ। সেই গল্প বাবাকে নিয়ে, মাকে নিয়ে। বা ধূলিহরের এক মেয়েকে নিয়ে যার বিয়ে হয়েছে পটুয়াখালি। আমি ইন্টারনেট-ফেসবুকে থাকি। খুঁজে খুঁজে বের করি সাতক্ষীরের মানুষ। খুলনা জেলার মানুষ। তাঁদের সঙ্গে বন্ধুতা করে আমি আমার জন্মভূমির কথা জানতে চাই। দেশভাগ কি ফুরিয়েছে? মোটেই না। ফুরোবার তো নয়। নয় বলেই আমার বউদির দিদিমা যিনি ছিলেন মাইকেলের নাতনি, তাঁকে নিয়ে এই বয়সে দেশভাগের কথাই লিখি এক উপন্যাস, দশমী দিবসে-তে। সেখানে সাগরদাঁড়ির বিদায়ঘাট হয়ে ওঠে সারা দেশেরই বিদায়ঘাট। ভিটে ছেড়েছে যে যেখান থেকে, সেই উঠন, সেই পথ হয়ে ওঠে বিদায়ঘাট। অনেকটা বড় করে লেখা, অনুভূতি আর উপলব্ধির কথা আছে সেখানে। যে দায়ের কথা বলা হয়েছে, দেশভাগ ও বাঙালি লেখকের দায়---সেই দায় পূরণ করা কিনা জানি না, লেখা যা আসে তা ভিতর থেকেই তো। না লিখে পারি না যখন, তখনই তো লেখা। আমার বাবার মৃত্যুর ঠিক একমাস আগে একটি গল্প লিখেছিলাম---হারানো নদীর স্রোত----সেই নদী কপোতাক্ষ। নারসিং হোমে তিনি যাদের দেখছেন, তারাই যেন ওপার থেকে আসছে বা এপার থেকে তাঁর সঙ্গে ওপারে ফিরে যাবে। আসলে তাঁর নিজের গ্রাম থেকে একজন এসেছিলেন অনেক খুঁজে খুঁজে একটি মৃত্যু সংবাদ নিয়ে। সেই ফেলে আসা পূববঙ্গ থেকে সেই গ্রামের এক বছর চল্লিশের মুসলমান যুবক এসেছিল তার মায়ের মৃত্যু সংবাদ নিয়ে। মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন খবরটা এপারে পৌঁছে দিতে। তারপর বৃদ্ধের সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়। এই গল্প এল নিজের ভিতর থেকে। বাবা যখন কাউকে চিনতে পারছেন না, সেই মুহূর্ত থেকে। তিনি যখন আমাকে না চিনতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন, ধুরোল থেকে এলেন ? তখনই আমি ধারণ করলাম তাঁর অবরুদ্ধ বেদনার পাহাড়। গল্পটি এল তারপর।

২৫—১২৫ গল্পে নিজের পিতৃপুরুষের গ্রামের ২৫ বছরের কন্যার সঙ্গে ফেসবুকসেবী মধ্যবয়সী ১২৫ বছরের নিজের পিতামহ হয়ে কথা বলে। কথা বলে সেই কন্যার ৯২ বছরের পিতামহর সঙ্গে টেলিফোনে। কথা বলে নিজের বয়স লুকিয়ে ১২৫ হয়ে। বুড়ো ৯২ তা বিশ্বাস করে। না করে কী উপায় ? বেদনা যে তিনিও ধারণ করেন। বন্ধু স্বজন প্রতিবেশীরা ওপারে চলে গেলে তিনিও কি এতদিন সুখে আছেন? মনে কি পড়ে না?



আসলে দেশভাগ এক নিরন্তর অনুভবের বিষয়। তার ক্ষত শুকোয় নি। তাই বাংলাদেশের সব আন্দোলনে মনে মনে তাঁদের সাথী হয়ে উঠি। যৌবনকালে মুক্তিযুদ্ধ আর এই বয়সে শাহবাগের আন্দোলন নিয়ে উত্তেজিত হয়ে থাকি। আর তা নানা ভাবে আমাকে আক্রান্ত করে। তাই দশমী দিবসে উপন্যাসে যেমন পুব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনের ছায়া থাকে, থাকেন মাইকেল হেনরিয়েটা রেবেকা জাহ্নবীমা.........সকলে। শূন্যের ঘর শূন্যের বাড়ি উপন্যাসেও থাকে নতুন গড়ে তোলা বাড়ির ভিতে ধূলিহরের মাটি পুতে দেওয়ার কথা। আর গল্পে তো তা ক্রমাগত আসে, এসেই যায়। বাংলাদেশ আসে স্বাভাবিক ভাবে। আসে দ্বিখন্ডিত স্বদেশের বেদনা। এই বেদনা উত্তরাধিকার সূত্রে বাঙালিজাতি ধারণ করেই থাকবে।


লেখক পরিচিতি
অমর মিত্র
জন্ম :৩০ আগস্ট১৯৫১

বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কাছে ধুলিহর গ্রামে | বিজ্ঞানের ছাত্র | কর্ম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক দপ্তরে | তিনি ২০০৬ সালে ধ্রুবপুত্র উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন।

প্রকাশিত বই : পাহাড়ের মত মানুষ, অমর মিত্রের শ্রেষ্ঠ গল্প, অর্ধেক রাত্রি, ডানা নেই উড়ে যায়, ধুলোগ্রাম, অশ্বচরিত, আগুনের গাড়ী,ধ্রুবপুত্র, নদীবসত, কৃষ্ণগহ্বর, আসনবনি, নিস্তব্দ নগর, প্রান্তরের অন্ধকার, ভি আই পি রোড, শ্যাম মিস্ত্রী কেমন ছিলেন, গজেন ভূঁইয়ার ফেরা, জনসমুদ্র, সবুজ রঙের শহর, সমাবেশ, সারিঘর, সুবর্ণরেখা, সোনাই ছিলো নদীর নাম, হাঁসপাহাড়ি।

পুরস্কার : সাহিত্য একাডেমী।

1 টি মন্তব্য:

  1. বিশয় পার্টিশন। এ বিষয় শুধু যে স্মৃতিমেদুরটাই ডেকে আনে তাই নয়। আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা তে দেখেছি এই স্মৃতি ভুলে যাবার একটা প্রচেষ্টাও পাশাপাশি চলে। জানি না , মনে পরে না। .. এই সব কথার ফাঁকে একটা সচেতন প্রচেষ্টা চলে সব কিছু ভুলে গিয়ে একেবারে নতুন কে প্রানপনে আঁকড়ে ধরার। ইটা কিন্তু আসে একটা পলায়ন বাদী এবং রক্ষনাত্মক জায়গা থেকে। একটা সাংঘাতিক বেদনার জায়গা কে ঢেকে দেওয়ার সে কি প্রানান্তকর প্রচেষ্টা। পরের প্রজন্ম যেন এই মেদুরতে না ভোগে, এই ধরনের একটা চিন্তা কি অবধূত ভাবে সমগ্র উদ্বাস্তু কলোনী গুলোতে সামূহিক ভাবে বিদ্যমান, একটা কল্লেচ্তিভে ইম্পসেদ কন্স্চীয়ুস্নেস চলছে।. সাহিত্যে কিন্তু এখনো ইটা আসে নি.

    উত্তরমুছুন