শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

পাঠ-প্রতিক্রিয়া : অমর মিত্রের উপন্যাস দশমী দিবসে

বিসর্জনের কাহিনী 


ড. দীপেন ভট্টাচার্য

বহু দূর থেকে, অমাবস্যারআঁধারেএকঅশ্বারোহীধাবমান, ঘোড়ারখুরেরআঘাতে কেঁপে উঠছে মাটি, কিন্তু দিগন্তের ঘুমন্ত গ্রামবাসীর কানে সেই কম্পন পৌঁছাচ্ছে না। ঠিক মধ্যরাতে সেই অশ্ব ঢুকে পড়ে গ্রামে। ঘুম ভেঙ্গে যায় গ্রামবাসীর। দুয়ারে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত চোখে তার দেখে অশ্বারোহীর ধারালো তরবারির ফলার আঘাতে জন্ম হয়েছে এক বিশাল ফাটলের, তাদের গ্রাম দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। শুধু তাদের গ্রাম নয়, যতদূর তাদের চোখ গেল তারা দেখল, সেই ফাটল, তারা যাকে দেশ বলত, তার মাঝ দিয়ে চলে গেছে। গভীর সেই ফাটল তা আর জোড়া লাগবার নয়। দেশ ভাগ হয়ে গেল যখন তারা ঘুমিয়ে ছিল। সাতষট্টি বছর কেটে গেছে তারপর।

দেশ ভাগের কথা বললে এমনই একটা দৃশ্য আমার মনে ভেসে ওঠে, সেই অশ্বারোহীর পরনে ছিল কাল উত্তরীয়। মানুষের ভাগ্য একরাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের এক্সপেরিমেন্টের ফলে কেমন বদলে যায়। তাঁর রচনা শৈলীর জন্য বহু পুরস্কার-প্রাপ্ত গল্পকার অমর মিত্র তাঁর নতুন উপন্যাস 'দশমী দিবসে',সেই এক্সপেরিমেন্টের ফসল, ফাটল পার হয়ে আসা চরিত্রদের অনুসরণ করেছেন। সেই চরিত্ররা শিকড়-উপড়ানো, কিন্তু নতুন জীবনে ফেলা আসা অতীতের জন্য তাদের দিয়ে লেখক হৃদয়-মোচড়ানো হাহাকারকরান নি, বরং এমন একটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের জাল বুনেছেন যার থেকে আমাদের সহজে মুক্তি নেই। আমরাও যেন হয়ে যাই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় দিক-নির্দেশহীনভাবে ভেসে যাওয়া রিফিউজি।

এমনি এক রিফিউজি বীরাঙ্গনা দাসী। এই বর্ষিয়সী নারী যশোরের সাগরদাঁড়িতে ফেলে এসেছেন তাঁর অতীতকে, কিন্তু নিয়ে এসেছেন স্মৃতি। সেই স্মৃতি স্থির থাকতে দেয় না বীরা দিদমাকে, বসিরহাট আর দিল্লীর মাঝে আপার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসে পুত্র ও কন্যার অবহেলার মধ্যে ছুটতে থাকেন তিনি, আবৃত্তি করেন

"সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে।
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;
সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া-যন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!- "

বীরাঙ্গনা দাসী মাইকেল মধুসূদনের জ্ঞাতি, হয়তো দূরসম্পর্কের নাতনী, মধু কবির মতই ছেড়ে এসেছেন তাঁর জন্মভূমি কপোতাক্ষ তীরের সাগরদাঁড়ি। মধু কবির মতই সেই হারানো জন্মস্থান ও হারানো নদী ঘুমে আর জাগরণে, স্বপ্নে ও চলনে তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কবি যেমন সাগরদাঁড়ির সঙ্গে তাঁর নাড়ীর সম্পর্ক ছিন্ন করে, ধর্মান্তরিত হয়ে, পৃথিবীর বুকে চালিত হয়েছিলেন, কিন্তু সম্পূর্ণ হতে পারেন নি, ঠিক তেমনই বীরা দাসী খণ্ডিত ভারতের বুকে পূর্ণাঙ্গ হতে পারেন নি।লক্ষণের হাতে যজ্ঞগৃহে নিরস্ত্র পুত্র ইন্দ্রজিতের মৃত্যুর পরে লঙ্কার হাহাকার দিয়ে মেঘনাদ বধ কাব্য শেষ হয়, বীরা দাসী আবৃত্তি করেন -

"করি স্নান সিন্ধু নীরে, রক্ষেদল এবে
ফিরিলা লঙ্কার পানে, আর্দ্র অশ্রুনীরে-
বিসর্জি প্রতিমা যেন দশমী দিবসে
সপ্ত দিবানশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে।।"

দশমী দিবসে দেবীকে যেমন ভাসিয়ে দেওয়া হয়, দেশ-দেবীকে সেভাবেই যেন বিসর্জন দেওয়া হয়েছে, তাঁকে আর পূর্ণাঙ্গ রূপে দেখা যাবে না কখনই। তাই এই উপন্যাসের নামও হয়েছে দশমী দিবসে।

মধ্যরাতের অশ্বারোহী মানুষকে সময় দিল না, মানুষে মানুষে অবিশ্বাস, ধর্মে-ধর্মে হানাহানি, জমির টান ও জমির লোভ সব মিলিয়ে সেই যে অভাগা বাঙ্গালী ভিটেমাটি ছাড়ল, আর ফিরে যাওয়া হল না। পূর্ব থেকে পশ্চিমে গেল রিফিউজি স্রোত, পশ্চিম থেকে পূবেও এল। বীরা দিদমা বললেন, পিতৃ-ত্যাজ্য মধুসূদন সেই যে সাগরদাঁড়ি ছাড়লেন, তার আর ফিরে যাওয়া হল না। দেখা হয়েছিল কি তার সাথে শেষবারের মত মাতা জাহ্নবীর কপোতাক্ষকূলে বিদায়ঘাটে অশ্রুঘাটে? লেখক কাহিনীর প্রারম্ভেই লিখছেন, "কবি মধুসূদন, মা জাহ্নবীকে নিয়ে যে বিদায়ঘাটের যে কাহিনী শুনেছিলাম আমি, সেই বিদায়ঘাটই আমাকে প্ররোচিত করেছে এই উপন্যাস লিখতে। আর মেঘনাদবধ কাব্য, মেঘনাদের মৃত্যু, রাবণের হাহাকার, মধুর জীবন। দেশভাগে সমস্ত দেশই হয়ে ওঠে বিদায়ের ঘাট।"

বিদায় ঘাট আর অশ্রু ঘাটের মাঝে অমর মিত্রের লেখনী পাঠককে একটা বিষাদপূর্ণ ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায়। আমি এখান একটি অনুচ্ছেদের উল্লেখ করব। বীরা দাসী হাবলুকে নিয়ে মধুসূদনের সমাধিস্থলে গিয়েছেন, লেখক লিখছেন -

"কত কালের প্রাচীন ছায়া এখানে। বুনো আম, জাম, তেঁতুল, কদম, কালকাসুন্দে হলুদ ফুলের রাধাচূড়া, বট। বর্ষা নামছে, হয়ে গেছে অল্পবিস্তর দিনকয় আগে। মাটি নরম। নরম মাটির ওপর শুকনো মরা পাতার ভিজেছে। ঠিক দুপুর বেলা। বিস্তীর্ণ গোরস্থান নিঃঝুম হয়ে পড়ে আছে। কোথাও কেউ নেই। যারা এসেছিল তারা কোনো কোনো বাঁধানো কবরের উপর শাদা, নীল, হলুদ, লাল, বেগনি--নানা রকম ফুল ছড়িয়ে দিয়ে চলে গেছে। বাকি মৃতরা কেউ ফুলের অপেক্ষা করে নেই। কফিনের ভেতর হাড়গোড় নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। কোথায় শুয়ে আছে মধু, এই জীবনের মধু, বুড়ি মেম রেবেকা বিনবিনিয়ে বলে, সে আমাকে বিটরে করল বীরা, আমি সপনেও ভাবি না এমন যে হইতে পারে কখনো।"

গাছ আর মাটির ভেজা বর্ণনায় আমার প্রথমেই মূহ্যমান হয়ে পড়ি। তারপর বুঝি বীরা দাসী এখানে মধুসূদন-প্রত্যাক্ষিত তাঁর প্রথম স্ত্রী রেবেকার সঙ্গে কথা বলছেন। সাত বছরের স্ত্রী রেবেকা ও চারটি সন্ততিকে মাদ্রাজে ছেড়ে কলকাতায় এসে মধুসূদন হেনরিয়েটার (আঁরিয়েতা) ঘর বাঁধলেন। বিয়ে করতে পারলেন না, কারণ রেবেকা বিচ্ছেদের অনুমতি দেন নি। পরবর্তীকালে রেবেকার সাথে তাঁর চারটি ছেলে মেয়ের মধুসূদন যে কোন খোঁজ রেখেছিলেন ইতিহাসে তার কোন সন্ধান মেলে না। রেবেকার প্রতি কবির এই ব্যবহার যেন দেশত্যাগী মানুষের অসম্পূর্ণতারই নিদর্শন। মেঘনাদের অন্যায় মৃত্যু যে কবিকে সাংঘাতিকভাবে উদ্বেলিত করেছিল, তাঁর নিজের জীবনের ট্রাজেডি তাঁকে কতখানি প্রভাবিত করেছিল তা আমাদের জানা নেই। অমর মিত্র চমৎকার ভাবে রেবেকারই এক প্রতিভূকে মধুসূদনের সমাধিস্থলে নিয়ে এসেছেন, তাঁকে দিয়ে বলিয়েছেন রেবেকার অজানা গাঁথা। রেবেকার শোক-কাহিনী আমি আর কোথাও পড়ি নি, বাঙ্গালী পাঠকের মনকে রেবেকার সেই মর্মস্পর্শী গান যে ছুঁয়ে যাবে তাতে আমার সন্দেহ নেই।

তরুণ হাবলু (অমিতাভ রায়) এই গল্পের আর একটি চরিত্র। বিভাগ-উত্তর নতুন ভারতে সে স্বপ্ন দেখে বিভাগ বিমোচনের। হাবলু বীরা দাসীর কাছে মাইকেলের কথা শোনে। দ্বিখণ্ডিত ভারত সে মানতে পারে না, সে পূর্ব পাকিস্তান ফিরে যায়, সেখানে তার মা-বাবা বর্তমান, বাল্যপ্রেম মরিয়ম, বন্ধু অজেত। ছুটে গেছে সে সাগরদাঁড়িতে, সেখানে দেখা হয়েছে পশ্চিম বাংলা থেকে আগত পূর্ব পরিচিত সফিউদ্দিনের সাথে। অজেত, মরিয়ম, সফিউদ্দিনের কাছ থেকে হাবলু শোনে পূর্ব পাকিস্তানের নতুন বিন্যাসের কাহিনী, উর্দূ ও বাংলার সংঘাত। কিন্তু হাবলু পূব দেশে থাকতে পারে না, ফিরে আসে আবার। সে যেতে চায় দিল্লী। মহাত্মা গান্ধী নেই, কিন্তু পণ্ডিত নেহেরু তো আছেন, তাঁকে বুঝিয়ে বললে নিশ্চয় এই ফাটল আবার বুঁজে যাবে, হিন্দুস্থান পাকিস্থান আলাদা থাকবে না। হয়তো ফিরে পাবে তার ছোটবেলার ময়রমকে। নেহেরু নিরূপায় থাকেন রাজঘাটে গান্ধীর সমাধির সামনে। বাপু গেছেন দাঙ্গা থামাতে। জীবন তারপর চলে যায় কুড়ি কুড়ি বছর পার। হাবলু বড় হয়ে যায় অমিতাভ রায় হয়ে, বাল্যপ্রেম টিয়া, ময়রম কোথায় হারিয়ে যায়, ১৯৭১ হয়, তাতে আরো কত কেউ হারিয়ে যায়। কিন্তু দেশভাগের প্রায়শ্চিত্ত শেষ হয় না, এমন কি বিংশ শতকেও আধুনিক বিশ্বের সন্ত্রাসের হাত থেকে হাবলুর উত্তরসূরীরাও রেহাই পায় না।

যে আপার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসে করে বীরা দিদমা কলকাতা থেকে দিল্লী যেতেন সেই এক্সপ্রেসের আর ঢাকা যাওয়া হয় না, লাহোর পর্যন্ত পৌঁছায় না সেই ট্রেন। বীরা ট্রেনেই মারা যান।

গোরস্থানের প্রাচীন ছায়া আমাদের এখনো ছেড়ে যায় নি। হয়তো আজ থেকে দু হাজার বছর পরে সেই ছায়া চলে যাবে, অন্য সূর্য উঠবে, এই কাহিনীর আর কোন পদধ্বনি শোনা যাবে না, যেমন আমরা আমাদের গভীর সময়ের পূর্বপুরুষদের আর স্মরণ করতে পারি না। কিন্তু এই সময়ে এই অতীত বিভাজন আমাদের উত্তরাধিকার। সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যারা গিয়েছেন, কিংবা তাঁদের উত্তরসূরীরা যাঁরা এই ফাটলের ইতিহাসে আগ্রহী, তাঁদের মন সেই প্রাচীন ছায়ায় বিষন্ন। হয়তো এখানে রেবেকাই হচ্ছে দেশ, সেই দেশ ফাট্ল-উত্তর প্রজন্মকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, বলছে, "আমাকে বিটরে করলে তোমরা, আমি সপনেও ভাবি না এমন যে হইতে পারে কখনো।"

কিন্তু ইতিহাস নির্মোহ, অতীতের বিট্রেয়াল বর্তমানের বাস্তব। সেই বাস্তবতা মেনে নিয়েই মানুষ সুখী জীবন গড়তে চায়। 'দশমী দিবসে' খণ্ডিত মানুষের কাহিনী পড়ে আমরা পূর্ণাঙ্গ হবার স্বপ্ন দেখি। বন্ধুবর কুলদা রায়ের কল্যাণেলেখক অমর মিত্রের সঙ্গে আমার স্বল্পক্ষণের জন্য ফোনে কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিল, অমায়িক অমরদা আমাকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দশমী দিবসের প্রতিটি চরিত্র তাঁর আত্মীয় ও বন্ধু মহলে বিরাজমান ছিল, তার মধ্যে বীরাঙ্গনা দাসীও ছিলেন। তাঁর এই কথাটি ' 'দশমী দিবসে' উপন্যাসের প্রতিটি বাক্যকে আমার মনে মূর্ত করেছে আরো গভীরভাবে।


ড. দীপেন (দেবদর্শী) ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯৫৯ সালে। আদি নিবাস টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায়।

ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল, নটরডেম কলেজ ও ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাসার (NASA) গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইনস্টিটিউটে গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিআর) গামা-রশ্মি জ্যোতির্বিদ হিসেবে যোগ দেন। মহাশুন্য থেকে আসা গামা-রশ্মি পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে বায়ুমণ্ডলের ওপরে বেলুনবাহিত দূরবীন ওঠানোর অভিযানসমূহে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ায় রিভারসাইড কলেজে অধ্যাপক। 

দীপেন ভট্টাচার্য বাংলাদেশের বিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ্ভাবে যুক্ত। ১৯৭৫ সাথে বন্ধুদের সহযোগিতায় 'অনুসন্ধিৎসু চক্র' নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা ছাড়াও তাঁর নিওলিথ স্বপ্নঅভিজিৎ নক্ষত্রের আলো ও দিতার ঘড়ি নামে বিজ্ঞান-কল্পকাহিনিভিত্তিক ভিন্ন স্বাদের তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন