বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : বলে যাই জীবনের গপ্পো

অনুবাদক :  মাসুদুজ্জামান |

আত্মকথার খুঁটিনাটি দিয়ে সাজানো মার্কেসের ‘বলে যাই জীবনের গপ্পো’। ত্রয়ীআত্মকথা লেখার ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু লিখে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন শুধু এর প্রথম খণ্ডটি। কিন্তু এই আত্মকথার ভেতরে বুনে দিয়েছেন সেই সময়ের জনজীবন, স্থান আর নানা ঘটনা। মার্কেসের পরিবার, কাজ, রাজনীতি, বই, গান, প্রিয় কলোম্বিয়া, যে-কলোম্বিয়ার ইতিহাস অন্তরালে থেকে গিয়েছিল; তার সবই উন্মোচিত হয়েছে তার জীবনের গপ্পে আর উপন্যাসে।
উপন্যাসের মতোই তীক্ষ্ণ, অন্তর্ভেদী এক পর্যবেক্ষক আর হিস্পানি ভাষার মহান শিল্পী হিসেবে এখানেও উপস্থিত মার্কেস। এই আত্মজীবনীটি আবেগ আর প্যাশনে এমনভাবে জড়ানো যে এটি হয়ে উঠেছে মার্কেসের আখ্যানসমগ্রের পরিপূরক অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ। এখানে মার্কেসের এই আত্মজীবনীর প্রথম অংশটি প্রকাশিত হলো। অনুবাদ করেছেন মাসুদুজ্জামান।

বাড়িটা বেঁচে দেওয়ার সময় মা আমাকে তার সঙ্গে যেতে বললেন। পরিবারের সবাই তখন থাকে দূরের একটা শহরে। সেই শহর থেকে ওই দিন সকালেই তিনি এসে পৌঁছুলেন। আমাকে কীভাবে খুঁজে পাবেন তাও তার জানা ছিল না। পরিচিত জনদের কাছে আমার খোঁজ করলেন। ওরা তাকে বললো, মুন্ডো পাঠাগার অথবা কাছের কোনো কাফেতে আমাকে পাওয়া যেতে পারে। ওখানে প্রতিদিন দুবার আমি আমার লেখক বন্ধুদের সঙ্গে জম্পেস আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতাম। যিনি তাকে আমার হদিশ দিয়েছিলেন, তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, “সাবধান, ওরা সব খ্যাপাটের দল।” ঠিক বারোটায় তিনি এসে পৌঁছুলেন। টেবিলের ওপর প্রদর্শনের জন্য রাখা রাশি রাশি বইপত্তর পেরিয়ে কোমল শান্ত পায়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। মধুর দিনগুলোতে তার মুখে যে স্মিত হাসি লেগে থাকতো, সেরকম হাসি হাসি মুখ নিয়ে সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকালেন। আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবার আগেই বললেন :
“এই, চিনতে পারছিস না, আমি তোর মা।”

কিছু একটা ঘটে যাওয়ায় অনেক বদলে গেছেন তিনি। প্রথম দর্শনে তাই আমি তাকে চিনে উঠতে পারিনি। তার বয়েস তখন পয়তাল্লিশ বছর। এগারো সন্তানের জন্মদাত্রী তিনি। এর অর্থ, দশ বছর তাকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় জীবন কাটাতে হয়েছিল। এর পরের দশ বছর কেটেছে সন্তান লালন-পালন করে। ফলে, অকালেই তার চুলে পাক ধরে। বিস্ফারিত চোখ দুটি মনে হতো চোখের গহ্বর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। বাইফোকাল চশমার ভেতরে তির তির করে কাঁপছে। মায়ের মৃত্যুশোকের কারণে তিনি পরেছেন সনাতনি শোকের পোশাক। কিন্তু তখনও বিয়ের দিনের সেই রোমান প্রতিকৃতির মতো ঠিকরে বেরুচ্ছিল চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য। শরতের মৃদুমন্দ বাতাসে তাকে আরও মহিমান্বিত লাগছিল। সবকিছুর আগে, এমনকী আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরবারও আগে, তিনি তার স্বভাবসুলভ উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠলেন :
“আমি তোকে বলতে এসেছি, দয়া করে আমার সঙ্গে চল, বাড়িটা বিক্রি করে দে।”

কোন বাড়ি, কোথাকার বাড়ি, আমাকে তার এতসব কথা বলবার কোনো দরকার পড়ল না। কেননা এই পৃথিবীতে আমাদের একটাই বাড়ি ছিল : আরাকাতাকার দাদার সেই প্রাচীন বাড়ি। আমার সৌভাগ্য, ওই বাড়িতে আমি জন্মেছিলাম, যদিও আট বছর বয়সের পর আর ওই বাড়িতে আর কখনও বাস করা হয়নি। আইনশাস্ত্রে ছটা সেমিস্টার দারুণ আগ্রহ নিয়ে পড়বার পর দুম করে পড়াশোনাটা ছেড়ে দিলাম। কিন্তু তখন হাতের কাছে অন্য যা কিছু পেতাম গ্রোগ্রাসে পড়তাম। হিস্পানি স্বর্ণযুগের অনবদ্য সব কবিতা স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করে সময় কাটাতাম। অনুবাদের সূত্রে তখন আমি অনেক কিছু পড়ে ফেলেছি। ধার করে এসব বই পড়ছি। লক্ষ্য ছিল এইসব বই পড়ে উপন্যাসের শৈলীটা শেখা, এর কায়দাকানুন রপ্ত করা। ইতিমধ্যে পত্রপত্রিকার বিশেষ বিশেষ সংখ্যায় আমার ছটা গল্প বেরিয়ে গেছে। বন্ধুরা গল্পগুলো নিয়ে উচ্ছ্বসিত। ওই লেখাগুলো সমালোচকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিল। পরের মাসেই আমি তেইশ বছরে পা দিলাম। সামরিক বাহিনিতে যোগ দেওয়ার বয়স তখন আমার পেরিয়ে গেছে। দু-দুবার গনোরিয়ার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ওঠা ঝানু সৈনিক আমি। কোনো নিষেধ বা বাছবিচার নেই। প্রতিদিন সবচেয়ে কড়া তামাকের ষাটটার মতো সিগারেট টেনে চলেছি। অবসর সময়টাকে তখন আমি দুই ভাগে ভাগ করে ফেললাম। একদিকে বারাঁকুইলা এবং অন্যদিকে কলোম্বিয়ার ক্যারিবীয় সমুদ্র উপকুল কার্তাহেনা ইন্দিয়াসের মধ্যে সময় কাটাচ্ছি। হেরালদো পত্রিকায় প্রতিদিন সংবাদভাষ্য লেখার সূত্রে যে টাকাপয়সা পাচ্ছিলাম, তাতে আমার দিন কাটছিল রাজার হালে। পত্রিকার এই কাজটা আমার কাছে তেমন গুরুভার বলে মনে হয়নি। রাতে যেখানে যেমন ঘুমোচ্ছিলাম, সম্ভাব্য সেরা সব সঙ্গীর সঙ্গে। আমার জীবনের উচ্চাভিলাষী অনিশ্চয়তা আর ধুন্দুমার নৈরাজ্য, কোনো কিছুই আমাকে নিবৃত্ত করতে পারছিল না। একদঙ্গল অবিচ্ছিন্ন বন্ধু আর আমি, কানাকড়ি না থাকলেও একটা পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এই ভাবনাটা এসেছিল আলফসোঁ ফুয়েঁমেয়রের মাথায়, তিন বছর ধরে সে কাজ করছিল কী করে কাগজটা বের করা যায়। এর চেয়ে বেশি কে কী আর চাইতে পারে?

সুরুচির অভাবে নয়, দারিদ্র্যের কারণে বিশ বছর বয়সী আমার চলনবলন আর পোশাকের ধরনটা কী হতে পারে, অনুমান করতে পারছিলাম : না-কামানো গোঁফ, উশকোখুশকো চুল, জিনস, ফুলহাতার উড়ন্ত শার্ট আর পরিব্রাজকের একজোড়া চপ্পল। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে, আমি কাছাকাছি আছি না জেনে, একটা মেয়ে, যাকে আমি আগে থেকে চিনতাম, একজনকে বলেই বসল, “বেচারা গাবিতো উচ্ছন্নে গেছে।” ফলে, মা যখন আমাকে বাড়ি বিক্রির সময় তার সঙ্গে যেতে বললেন, কোনো বাধা বা দ্বিধাদ্বন্দ্বে আমাকে ভুগতে হয়নি। মা শুধু বললেন, তার হাতে প্রয়োজনীয় টাকাপয়সা নেই। আমি গর্বের সঙ্গে বললাম, এ নিয়ে তুমি ভেবো না, আমার নিজের খরচ আমি নিজেই চালিয়ে নিতে পারবো।
যে পত্রিকায় আমি কাজ করতাম, তাদের ওপর নির্ভর করে চলা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠলো। প্রতিদিন সংবাদভাষ্যের জন্য তারা আমাকে তিন পেসো দিত, আর কারো অনুপস্থিতিতে সম্পাদকীয় লিখলে দিত চার পেসো। এত কম টাকায় চলাটা ছিল সত্যি কঠিন। আমি টাকা ধার করতে চাইতাম, কিন্তু ম্যানেজার আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে ইতিমধ্যে আমি পঞ্চাশ পেসো বেশি নিয়ে ফেলেছি। ওই দিন বিকেলে আমি একটা গর্হিত কাজ করে ফেললাম, যা আমার কোনো বন্ধু করতে পারতো না। বইয়ের দোকানের পাশেই ছিল একটা কাফে — কাফে কলোম্বিয়া। ওই কাফের দরোজার কাছে দাঁড়ানো ডন র‌্যামোঁ ভিনের দিকে এগিয়ে গেলাম। ভিনে ছিলেন কাতালানের বয়স্ক এক শিক্ষক আর বইবিক্রেতা। ওর কাছে দশ পেসো ধার চাইলাম। কিন্তু তার কাছে তখন ছিল মাত্র ছয় পেসো।

মা বা আমি, কেউই ভাবতে পারিনি যে দুদিনের ওই মামুলি যাত্রা এতটা অনিবার্য হয়ে উঠবে। দীর্ঘতম আর কঠোর পরিশ্রমসাপেক্ষ জীবনও এর জন্যে যথেষ্ট ছিল না। আজ, পঁচাত্তর বছর পেরিয়ে আসার পর মনে হচ্ছে, জীবনে যত ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পেশা হিসেবে লেখক হয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটাই ছিল. বলা যায়, আমার সমগ্র জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
বয়োঃসন্ধির আগে অতীতের চাইতে ভবিষ্যতের মধ্যে স্মৃতি এসে ভর করতো, স্মৃতির প্রতি আমাকে আগ্রহী করে তুলেছিল। নগর সম্পর্কিত স্মৃতির সঞ্চয় তাই আমার মধ্যে কখনও নস্টালজিয়ার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে আদর্শায়িত হতে পারেনি। স্মৃতিটা যেমন ছিল সেইভাবেই আমি স্মৃতিটাকে দেখেছি : বসবাসের দারুণ একটা জায়গা, যেখানে সবাই সবাইকে চেনে। স্বচ্ছতোয়া জলের নদীকূলে এর অবস্থান। নদীর জলটাও যেন ঝকঝকে বিশাল পাথর আর প্রাগৈতিহাসিক শাদা ডিমের বিছানার ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে। সেই প্রদোষকালে, বিশেষ করে ডিসেম্বর মাসে, বৃষ্টিরহিত দিনে, যখন বাতাস হিরকের মতো দ্যুতিময়, সান্তা মার্তার সিয়েরা নেভাদা এবং এর তুষারশুভ্র চূড়াগুলো যেন অন্যপারের কলাখেতের ওপর নুয়ে পড়ত। সেখান থেকে দেখা যেত পিঁপড়ের মতো আওয়ার্ক ইন্ডিয়ানদের সার সার চলা, যেন ওরা পাহাড় চূড়ায় পৌঁছুতে চায়। তাদের পিঠে আদার বস্তা, জীবনটাকে সুসহ করে তুলবার জন্য চিবুচ্ছে কোকের গুলি। শিশু হিসেবে আমরা স্বপ্ন দেখতাম অফুরন্ত তুষারের স্তূপ দিয়ে গোল গোল বল বানাবার, এরপর সেই বল নিয়ে অগ্নি ঝলমল কঠিন রাস্তায় যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। দাবদাহ ছিল দুঃসহ, বিশেষ করে দুপুরে, বয়স্করাও প্রতিদিন এই বিস্ময়কর আবহাওয়া নিয়ে অভিযোগ করতেন। যেদিন আমার জন্ম হয়েছিল, সেই দিন থেকেই শুনে এসেছি, একবার নয় বারবার, রোদের তাপে যন্ত্রপাতি গরম হয়ে যাওয়ায় ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির রেলপথ আর ডেরাগুলো রাতের বেলা তৈরি করা হচ্ছিল। এতটাই গরম পড়েছিল যে তপ্ত যন্ত্রপাতি হাতে ধরে রাখা যেত না।

আরাকাতাকা থেকে বারাঁকুইলা যাওয়া যেত সরু একটা খালের মাঝ দিয়ে লক্করঝক্কর মার্কা মোটর লঞ্চে। এটাই হচ্ছে চলাচলের একমাত্র পথ। ঔপনিবেশিক আমলে ক্রীতদাসদের দিয়ে এই পথটা খনন করা হয়েছিল। এরপর সিয়েনাগা পেরুলেই কর্দমাক্ত, পরিত্যক্ত জলের বিশাল জলাভূমি। এই জলাভূমি পেরিয়ে গেলেই সেই রহস্যময় শহর, শহরটার নামও সিয়েনাগা। সেখান থেকে তুমি প্রতিদিনের ট্রেনে চড়ে বসতে পার, এই পথটাই হয়ে উঠেছে দেশের সেরা পথ। বিশাল বিশাল ঘন কলাবাগানের মাঝ দিয়ে এই ট্রেনে চড়েই শেষ গন্তব্যে পৌঁছুনো যায়। পথে পথে ট্রেনগুলো গ্রামের বেশ কিছু তপ্ত ধুলিধূসরিত জনশূন্য স্টেশনে অযথাই থামে আর কালক্ষেপ করে। ঠিক কার্নিভালের আগে, অসময়ের ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, ১৯৫০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, শনিবার, সন্ধ্যা সাতটায় আমি আর মা এই পথ ধরেই যাত্রা শুরু করি। ট্যাঁকে ছিল সাকুল্যে বত্রিশ পেসো। এই পুঁজি নিয়ে বাড়ি পৌঁছাতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, এমনকী মা যে-দামে বাড়িটা বিক্রি করবেন বলে ভেবে রেখেছেন, সেই দামে বাড়িটা যদি বিক্রি করা নাও যায়, তবুও।

বাণিজ্যবায়ু সেদিন এতটাই ঝোড়ো বেগে বইছিল যে নদীবন্দরে এসে দারুণ সমস্যায় পড়ে গেলাম। মা কিছুতেই নৌকায় উঠতে রাজি হচ্ছিলেন না। তার সঙ্গত কারণও ছিল। লঞ্চগুলো ছিল নিউ অরলিন্সের বাষ্পীয় ইঞ্জিনচালিত জাহাজের ছোট ছোট সংস্করণ। গ্যাসচালিত এই যানটি যখন চলা শুরু করলো তখন তীব্র জ্বরে প্রচ- কাঁপুনি আসার মতো সবকিছু থরথর করে কাঁপছিল। ছোট্ট একটা ঘর ছিল; সেই ঘরে বিভিন্ন উচ্চতায় হুকের সঙ্গে দোলনা বেঁধে দোলশয্যা খাটাবার ব্যবস্থা ছিল। ছিল কাঠের বেঞ্চ। সেই বেঞ্চে যাত্রীরা ব্যবসার নানা লটবহর, বাক্সপ্যাটরা, মুরগীর ঝুড়ি, এমনকী জলজ্যান্ত শুয়োর নিয়ে কোনোক্রমে কনুইয়ের সঙ্গে কনুই ঠেকিয়ে ঘেঁষাঘেষি করে বসে ছিল। ছিল সৈনিকদের খাটিয়া টাঙানো দমবন্ধ করা শ্বাসরুদ্ধকর কয়েকটা কেবিন। প্রতিটি কেবিনে টাঙানো থাকতো দুটো খাটিয়া। সবসময় ওই কেবিনগুলো ছোটখাট চেহারার জীর্ণ পোশাক পরা বেশ্যাদের দ্বারা ঠাসা থাকতো। যাত্রাপথে এরাই দিত জরুরি সেবা। যেহেতু কেবিন এখানে বিনা পয়সায় মিলবে না, আর আমরাও যেহেতু কোনো দোলশয্যা সঙ্গে করে আনিনি, ফলে, ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে মাঝপথের দুটো লোহার চেয়ার দখল করে বসে পড়লাম। শুরু হলো রাত্রিযাপনের প্রস্তুতি।

বেশ ভয় পাচ্ছিলেন তিনি। আমরা যখন মাগদালেনা নদীটা অতিক্রম করছি, দমকা ঝড় এসে দিগ্ভ্রান্ত জাহাজটার ওপর আছড়ে পড়লো। মোহনার কাছাকাছি আসতেই নদীটা সমুদ্রের মেজাজ পেয়ে ফুঁসে উঠলো। আগেই আমি বন্দরে আসার পর সস্তা দামের একগাদা সিগারেট কিনে রেখেছিলাম। সিগারেটগুলো কালো তামাক দিয়ে তৈরি। সস্তা দামের এমন কাগজ দিয়ে মোড়ানো, যা হয়তো প্যাকেট বাঁধার কাজে ব্যবহার করা হয়। ওই দিনগুলোতে আমার যেমন স্বভাব ছিল, সিগারেটের পর সিগারেট খেতে থাকলাম। ছুঁড়ে ফেলার আগে একটা জলন্ত সিগারেটের শেষাংশ দিয়ে আরেকটা ধরিয়ে আরও একবার পড়ছিলাম লাইট ইন আগস্ট। ওইসময় উইলিয়াম ফকনার ছিলেন আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত অভিভাবক দানব। মা তার জপমালা বুকে আঁকড়ে ধরে ঈশ্বরের নাম জপ করে চলেছেন, যেন ওই জপমালাটি একটা নোঙর তোলার কাছি, যা দিয়ে কোনো ট্রাক্টরকে শূন্যে তুলে ধরা যাবে অথবা শূন্যে একটা বিমানকে ঝুলিয়ে রাখা যাবে। বরাবরের মতো নিজের জন্য তিনি কিছুই যাঞ্ছা করেননি, তার যা কিছু চাওয়া তা ওই অনাথ এগারো সন্তানের দীর্ঘ জীবন আর সমৃদ্ধির জন্যে। যেখানে পৌঁছুবার কথা সেখানে তার প্রার্থনাটা পৌঁছেছিল মনে হয়। কেননা জাহাজটা প্রণালির মধ্যে ঢোকার পর বৃষ্টি প্রশমিত হয়ে এলো, বাতাসের তোড়ও এতটা তীব্র ছিল না যাতে মশককুল বিতাড়িত হয়ে শূন্যে মিলিয়ে যেতে পারে। মা জপমালাটা সরিয়ে রাখলেন, ডুবে গেলেন দীর্ঘ নৈঃশব্দ্যে, লক্ষ করতে থাকলেন আমাদের চারপাশের প্রবহমান জীবন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন