সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৫

রুমা মোদক : ২০১৫ সালে পড়া গল্পের সালতামামি

গল্পপাঠ : ১.
২০১৫ সালে কত সংখ্যক গল্প পড়েছেন?

রুমা মোদক : ১
২০১৫ সালে বেশ গল্প পড়া হয়েছে। তার মধ্যে যে-কয়টা বই এর নাম মনে পড়ছে সেগুলো হলো-

১. মন ও শরীরের গন্ধ/ আরিফ রুবেদ, 
২. দেহ ও দেহাতীত/হুমায়ুন মালিক, 
৩. বেলা অবেলার গল্প- সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম,
৪. বৃষ্টি চিহ্নিত জল- কুলদা রায়, 
৫. কয়েকটি বিহ্বল গল্প--শাহাদুজ্জামান,
৬. কালি ও কলম ছোটগল্প সংখ্যা-সহ বেশ ক'টি সংখ্যা।
প্রথম আলো, কালের খেয়া, গল্পপাঠ, রাইজিং বিডি. কম, অনলাইন নানা নিউজ পোর্টালের শিল্প-সাহিত্য পেইজের গল্প। ঈদসংখ্যা, সানন্দা, দেশে প্রকাশিত বেশ ক'টি ছোটগল্প। এছাড়া ব্রাত্য বসু এবং সেলিম আল দীন-এর বেশ কয়েকটি নাটক, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী'র বেশ কয়েকটি বই পড়া হয়েছে। সর্বশেষ পড়েছি হরিশংকর জলদাসের 'জলপুত্র'।


গল্পপাঠ : ২
কোন কোন মাধ্যম থেকে গল্পগুলো পড়েছেন?

রুমা মোদক : ২. 
খুব ভাল বা মনে দাগ কেটে যাওয়া বলতে আমি যা বুঝি যে গল্পটি পড়ে বোধ ও বুদ্ধি আলোড়িত হয়, দীর্ঘদিন অন্তর্জগত দখল করে থাকে 'আত্মজা ও একটি করবী গাছ'-এর মতো। তেমন গল্প আর পড়ছি কই? তবু যে-দু'য়েকটা গল্পের কথা এই মুহূর্ত মনে করতে পারছি, তা সম্ভবত বোধে গেঁথে যাবার কারণেই, সেগুলো হল- আকিমুন রহমানের- আগাগোড়া সুখবাসী, বিশ্বজিৎ চৌধুরীর- পরী, কুলদা রায়ের- সুবলসখার বিবাহবৃত্তান্ত, অমর মিত্রের- মেলার দিকে ঘর, শাহাদুজ্জামানের- অগল্প।


গল্পপাঠ : ৩
কোন কোন গল্পকারের গল্প পড়েছেন?

রুমা মোদক : ৩. 
কোন কোন গল্পকারের গল্প পড়েছি তা উপরে উল্লেখ করেছি। সব মিলিয়ে শ' তিনেকের নিচে হবে না।


গল্পপাঠ : ৪
ভাল-লাগা গল্পগুলোর কয়েকটি নাম করুন। গল্পগুলো ভাল হয়ে উঠেছে কী কী কারণে সেগুলো উল্লেখ করুন।

রুমা মোদক : ৪. 
গল্প পড়ে ভাল লাগার অনেকগুলো কারণের মধ্যে আমার খুব নিজস্ব একটি কারণ আছে। সমালোচকদের সমালোচনায় আঙ্গিক ভাষা বিষয় প্রভৃতি নিরীক্ষা অভিনবত্ব জাতীয় বিবেচ্য বিষয়গুলো আমার ভাল-লাগাকে প্রভাবিত করে খুব সামান্য মাত্রায়।

আমার ভাল লাগে সেই গল্পগুলো যে-গল্পগুলো পড়লে এর বিষয় চরিত্রকে আমার খুব আপন আর চেনা মনে হয়। মনে হয় এই চরিত্রগুলো আমার অন্তর্জগতে বাস করে। এই বিষয়টা আমার জানাকে অভিঘাত করেছে। আমিও পারতাম এদের নিয়ে লিখতে। ঠিক এরকম একটি গল্প আমারও লেখার সাধ হয়। এই গল্পগুলোকেই আমি ভাল গল্প বলি।

এদিক থেকে আকিমুন রহমানের কামরুন চরিত্রটি কিংবা বিশ্বজিৎ চৌধুরীর সেই পতিতা মেয়েটি, অমর মিত্রের মেলার দিকে ঘর-এর যে নির্মম জীবন-বাস্তবতা, কুলদা রায়ের রিলিফ এর চাল আর দীঘা চালের ভাত ঘিরে যে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, আর শাহাদুজ্জামান-এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রজন্মের লেখকদের মানসিক জটিলতা এর সবগুলোই যেন কোথায় আমার খুব চেনা গল্প। খুব চেনা চরিত্র। পড়া শেষে মনে হয়েছে আমি যদি এমন একটি গল্প লিখতে পারতাম।
দীপেন ভট্টাচার্যের  'নিস্তার মোল্লার মহাভারত' গল্পটি পড়ার পর  জাস্ট স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম কয়েক মিনিট।


গল্পপাঠ : ৫
সেরা গল্পটি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ বলুন।

রুমা মোদক : ৫. 
সেরা গল্প আমি বলব শাহাদুজ্জামানের 'অগল্প' গল্পটিকে। যে-গল্পটি লিখতে গিয়ে তিনি প্রথমে জানাচ্ছেন গল্পকার হিসেবে জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জনটি নিয়ে তিনি লিখতে চান। তার এই প্রাথমিক ভূমিকাটুকু যেন প্রজন্মের সমস্ত লেখকের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছে। গল্পটির পরতে পরতে তিনি লেখকদের সীমাবদ্ধতাগুলি চিহ্নিত করছেন, কনফেস করছেন। স্বপ্ন এবং বাস্তবতার ঘোরটিকে সনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। আর অগল্পের শেষে তিনি কনফেস করছেন না মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি আপাতত কিছু লিখবেন না। সমস্ত গল্পের শেষে আমরা আবিষ্কার করি পুরো গল্পটি কেমন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি সিম্বোলিক ভাষ্য হয়ে উঠেছে। আমি যদিও গল্পের মাঝে গল্প খুঁজি। গল্পহীনতার গল্পের নিরীক্ষায় বিশ্বাস করি না। সে-অর্থে এই-গল্পটিতে কোনও গল্প না থাকা সত্ত্বেও আমার ভীষণ ভাল লেগেছের

গল্পপাঠ : ৬
আপনি কি মনে করেন- এই গল্পগুলো বাংলাদেশের চিরায়ত গল্পগুলোর সমতুল্য বা তাদেরকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে?

রুমা মোদক : ৬.
চিরায়ত গল্প বলতে আমি যা বুঝি কালোত্তীর্ণ গল্প, তা কি হতে পেরেছে কোনও? হ্যাঁ, অমর মিত্রের 'মেলার দিকে ঘর', একটি মাস্টার পিস। এটি 'আত্মজা ও একটি করবী গাছ' গল্পটির মতো কালোত্তীর্ণ রচনা।


গল্পপাঠ : ৭
বিদেশি গল্পের সঙ্গে এ গল্পগুলোর মানকে কীভাবে তুলনা করবেন?

রুমা মোদক : ৭. 
কথাটা খুব সম্ভবত শহীদ কাদরির কোনো ইন্টারভিউতে পড়েছি ( স্মৃতি থেকে বলছি, স্মৃতি প্রতারক হলে ক্ষমা করবেন পাঠক) তিনি বলেছিলেন আমরা কি পাঠককে বিদেশী সাহিত্য সম্পর্কে না জানালে জাতে উঠিনা। তারা তো সেভাবে আমাদের পড়ে না। ( হুবহু উদ্ধৃতি নয়)। কথাটা ভীষণ মনে ধরেছে আমার। আমরা পাঠক লেখকরা অনেকেই তো বহু ভাষাবিদ নই। আমরা বিদেশি সাহিত্য বলতে যা পড়ি তা মূল ভাষা থেকে ইংরেজি কিংবা ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ। প্রত্যেক দেশের সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। প্রত্যেক ভাষার আলাদা ফ্রেইজ, দ্ব্যর্থবোধক শব্দ, বাক্য গঠনরীতি আছে। সে অর্থে অনুবাদের নামে আমরা পড়ি তা মূলত আঙ্গিক আর বিষয়। আমি মনে করি ভাষাভঙ্গিমার কারণে অনেক ভুল ইন্টারপ্রিটেশনের সুযোগ থাকে। তবু পড়ি। একজন মার্কেজ একজন বোর্হেস একজন কাফকা না পড়লে আমি বিশ্বসাহিত্যের গতিপ্রকৃতির বাইরে থেকে যাই।

এখন আমি কোনওভাবেই তাদের মানের সাথে আমাদের মানের তুলনা করব না। আমি বরং গুরুত্ব দেব আমাদের সাহিত্যকে বিশ্বের পাঠকের হাতে তুলে দেবার উপরেই।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন