বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

শামসুজ্জামান হীরা'র গল্প : আপস

ফ্রিডম ফাইটার, মুক্তিযোদ্ধা, চমৎকার! আমাদের মন্ত্রী মহোদয়কে তো হরহামেশা রাজাকার বলে গালি দেন — তাঁর কাছে কাজ নিয়ে আসতে রুচিতে বাধল না? ঠোঁটের কোণে শ্লেষ-মেশানো একচিলতে হাসি টেনে বলে কৃষি-মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব।

থতমত খায় নাসিম। ঠিক লোকের কাছে এসেছে তো! সাকলাইন যে বলল, — প্রোগ্রেসিভ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক; তা হলে? চেম্বারে ঢোকার সময় ভালোভাবেই তো দেখল, নেমপ্লেটে স্পষ্ট লেখা — মো: ইলিয়াচ সরদার, সিনিয়র সহকারী সচিব। নামের বানানটাও চোখে ধাক্কা দিয়েছে ওর — উঁচু পর্যায়ের অফিসারদের নামের বানান সচরাচর এ-ধারা নজরে পড়ে না।


– না বলছিলাম কি স্যার — সাকলাইন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ও-ই আপনার কথা বলল: জড়তা-জড়ানো কণ্ঠে বলে নাসিম।

– তাই? সাকলাইন সাহেব আমারও খুব প্রিয়জন; শ্রদ্ধা করি। আপনার বন্ধু বুঝি?

– বন্ধু মানে, ও-ই তো বলতে গেলে এখন আমার একমাত্র বন্ধু, ওনলি বুজম ফ্রেল্ড। আমার বেশ কজন বন্ধু অবশ্য আপনাদের সার্ভিসেও ছিল। স্বরাষ্ট্র-সচিব মাহবুব, রিটায়ার করেছে দুবছর আগে; ইফতিখার প্ল্যানিং কমিশনের মেম্বার ছিল রিটায়ারমেন্টের আগে, আরও কে কে যেন ছিল, নামও মনে থাকে না ছাই! আমার বন্ধু মানে তো বুড়ো — বুড়োরা রিটায়ার করে। এখন আর কেউ নেই চেনাজানা — ।

– যাঁদের নাম বলছেন, শুনেই ঘাবড়ে যাচ্ছি — এতসব বিখ্যাত লোক আপনার বন্ধু; এ-রকম দু-একজন বন্ধু থাকলেই তো যে-কেউ বর্তে যেতে পারে।

লোকটা কী বোঝাতে চাইছে! অস্বস্তি বোধ করে নাসিম। নিজের ওপরই রাগ ঝাড়ে: শালা, বড় বেশি কথা বলি আমি; শোধরানো দরকার এ দোষটা —। গলার কাছে হাত নিয়ে শার্টের বোতাম অযথাই নাড়াচাড়া করতে থাকে। ফুলস্পিডে-ঘোরা ফ্যানের নিচে বসা, অথচ কপালে চিকন ঘাম। হাতের আঙ্গুলে টেনে ঘাম ঝাড়ে। রুমাল আনতে মনে নেই। ইদানীং ভারি মনভুলো হয়ে পড়েছে। বয়স তো কম হল না — বাষট্টি পেরিয়ে তেষট্টিতে পা । তার ওপর বছর তিনেক আগে হয়ে গেল মাইল্ড স্ট্রোক। শরীরে ধস নেমেছে সেই থেকে।

– তো ঝটপট্ বলে ফেলুন কী উপকার করতে পারি আপনার? যেকোনও সময় বড়সাহেবের ডাক পড়তে পারে।

ইলিয়াসের কথায় সম্বিত ফিরে পায় নাসিম।

– জি, আপনি যে কী ভীষণ বিজি, দেখতেই পাচ্ছি; ফোনের পর ফোন; মনে হচ্ছে পুরো মন্ত্রণালয়ের কাজ আপনাকে একাই সামলাতে হয়। সাকলাইন অবশ্য সবই বলেছে আমাকে। এখন বুঝতে পারছি, ও যা-বলেছে আপনি তা-থেকেও বেশি, মানে... : হাত কচলাতে কচলাতে বলে নাসিম।

– এসব বলতেই কি এসেছেন? ইলিয়াসের কুঞ্চিত ভ্রূ।

– না, মানে স্যার, আমি এসেছি একটা কাজ নিয়ে, কাজটা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এনজিওতে চাকরি করি। বুড়ো বয়সেও এনজিওতে চাকরি করা যায়। এনভায়রনমেন্ট ফ্রেন্ডলি এগ্রিকালচার, মানে পরিবেশবান্ধব কৃষি, — এই নামে একটা প্রজেক্ট প্রপ্রোজাল জমা দিতে যাচ্ছি — মন্ত্রী মহোদয়ের সুপারিশ থাকলে পিপিটা অ্যাপ্রুভ হয়ে যাবে সিওর। সুপারিশ ছাড়া কিছুই হয় না, জানেনই তো। আপনি চাইলে আমার এই উপকারটা করতে পারেন — ।

– কী যে ধারণা আপনার! আই অ্যাম এ পেটি অফিসার — তলব না করলে মন্ত্রীর কামরায় ঢোকাই আমার পক্ষে কঠিন, তদবির করা তো দূরের কথা। তাছাড়া ওই লোকটার সামনে নিতান্ত বাধ্য না হলে যাই না — (চাপাস্বরে) আই হেইট দ্য রাজাকারস্ — !

বিস্ময় নিয়ে ইলিয়াসের দিকে তাকায় নাসিম। তাহলে সাকলাইন ঠিকই বলেছে। কিন্তু এত পষ্টাপষ্টি এভাবে কথা বলতে পারে একজন সরকারি কর্মকর্তা — তাজ্জব ব্যাপার!

– দেশটা যাচ্ছে কোন দিকে; আপনি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা, বলুন তো দেশটা যাচ্ছে কোন দিকে? ফাইল নাড়াচাড়া করতে করতে জিজ্ঞেস করে ইলিয়াস।

অপ্রতিভভাবটা কেটে গেছে নাসিমের। ইলিয়াসের প্রশ্নের জবাব দিতে যাবে, ঠিক তখুনই বেজে ওঠে ফোন। ফোনে আলাপ সেরে ইলিয়াস বলে : জয়েন্ট সেক্রেটারি স্যারের ওখানে যেতে হবে। আপনি কি বসবেন?

– আপনি বললে বসি স্যার — তেমন কোনও তাড়া নেই।

– ঠিক আছে, (পিয়নকে লক্ষ করে) মেহমানকে চা দাও।

একটু চাঁচাছোলা কথা বলে এই যা; লোকটা এমনিতে ভালই — ভাবে নাসিম। ছিপছিপে শ্যামলামত, মাঝারি আকৃতি, বয়স চল্লিশের নিচে বলেই মনে হয়। পরনে স্ট্রাইপ শার্ট, ম্যাচ করে গলায় ঝোলানো মেরুন রঙের টাই। ব্যাক-ব্রাশ-করা মাথাভর্তি চুল। একটা ফাইল বগলদাবা করে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে ইলিয়াস।



২.

ছেলেবেলা থেকেই নাসিম একরোখা আর হুজুগে। কিছু করার ঝোঁক চাপলে তা করা চাই-ই। তবে কোনও কাজেই দীর্ঘদিন লেগে থাকা ওর ধাতে সইত না। পড়াশোনায় মনোযোগী হল তো নাওয়া-খাওয়া ভুলে বইয়ে মুখ-গুঁজে পড়ে-থাকা — ক্লাশে ফার্স্ট কি সেকেন্ড। ব্যস্, এভারেস্ট জয় হয়ে গেছে — ভাবখানা এমনই; এখন অন্যকিছুতে চমক লাগাও।

নাসিমের বাবা সহজ-সরল মানুষ; সিরাজগঞ্জ শহরে এক প্রাইমারি স্কুলের টিচার; ছেলেকে নিয়ে তাঁর বড় আশা। ছেলে যে-বছর ক্লাশে ফার্স্ট হয়, তিনি তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে এ-কথা সে-কথার শেষে টেনে আনেন পুত্রপ্রসঙ্গ। বড় হলে ছেলে যে তাঁর জেলা-ম্যাজিস্ট্রেট হবে সে-কথা না বলে স্বস্তি পান না।

ক্লাশ নাইনে উঠেই নাসিমের শখ হল, ক্রিকেটার হবে। তখন ব্যাটিঙে পাকিস্তানের হানিফ মোহাম্মদের রমরমা ফর্ম। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হলের বলের সে কী গতি! লাফ দিয়ে উঠে নাকি বল ছোড়ে। রেডিওতে সারাদিন কান-পেতে খেলা শোনে নাসিম। কখনও হানিফ হতে চায় — ব্যাটিঙে মন দেয়; আবার কখনও ওয়েসলি হল। বলের গতি যা-ই হোক ছোড়ার ঠিক আগখানটায় শূন্যে লম্ফ দিতেই হবে!

ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফল যা দাঁড়াল তাতে বাপের মুখ আমসত্ত্ব। তবু তিনি হাল ছাড়বার পাত্র নন; রেজাল্ট দিয়ে কী হবে, ছেলে তাঁর পাকিস্তান ক্রিকেট টিমে চান্স পেয়ে যাবে — টেস্ট খেলবে নির্ঘাত। কোনও বাঙালি কি এ-পর্যন্ত টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছে ?

শহরের একমাত্র কলেজে ভর্তি হয় নাসিম। কলেজে প্রথম দিককার দিনগুলো কাটে নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণায়। ক্লাশের প্রায় সবাই ছাত্র হিসেবে ওর থেকে ভালো। লেকচার ফলো করতে পারে না ঠিকমত। হতাশার ঘুণ কুরে কুরে খেতে থাকে ওকে। কিন্তু কিছুদিন যেতে-না-যেতেই আবার চাঙা হয়ে ওঠে; জুটে যায় বেশ কজন বন্ধু। প্রথাবদ্ধ জীবনে বীতশ্রদ্ধ ওর এই বন্ধুরা গল্প-কবিতা লেখে চুটিয়ে। নাসিমকেও পেয়ে বসে লেখালেখির নেশায়। ওর কোনও কবিতা কাগজে ছাপা হলে বাবার সে-কী আনন্দ! যাকে পান তাকেই দেখান; কি বুঝলে হে, আমার খোকা একদিন দেশের সেরা কবি হবে, ঠিক বলিনি ?

বেশ কবছর লেখালেখিতে মেতে থেকে হঠাৎ কি জানি কী ভেবে পড়াশোনায় দারুণ সিরিয়াস হয়ে পড়ে নাসিম। রেজাল্ট দেখে সবারই এককথা, — জিনিয়াস বটে!

ওর চাচাতো ভাই ব্যবসা করত চাটগাঁয়। সুদূর উত্তরবঙ্গ ছেড়ে চলে আসে তার কাছে। ওখানে থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা।

ঊনসত্তরের ছাত্র-আন্দোলন যখন তুঙ্গে, রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে নাসিম। পার্টির নেতাদের মন দেখতে দেখতেই জয় করে ফেলে। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় নেতৃত্বের সিড়ি ভেঙে তরতরিয়ে ওপরে উঠতে থাকে। পড়াশোনা আবারও শিকেয়। খবরটা বাপের কানে পৌঁছতে দেরি হয় না। তাঁর কিন্তু এতটুকু আফসোস বা দুশ্চিন্তা নেই। বরং বদ্ধধারণা, যেভাবে রাজনীতিতে উন্নতি করছে — একদিন না একদিন ছেলে তাঁর মন্ত্রীটন্ত্রি বনে যেতেও পারে ! মন্ত্রীর বাবা হওয়া কি চাট্টিখানি কথা ! কিন্তু একাত্তরে যখন তিনি শুনলেন, ছেলে যুদ্ধে গেছে, তখন কিছুটা বিচলিত হলেন বৈকি। যুদ্ধে যাওয়া মানে, হয় জেতা না হয় মরা। একমাত্র পুত্রের দ্বিতীয় পরিণতির কথা ভাবতেও বুক কেঁপে ওঠে তাঁর। কিন্তু মনকে প্রবোধ দেন, — ছেলে আমার বীর; কজন যুদ্ধ করার সাহস রাখে, তাও আবার পাকিস্তানি দুর্ধর্ষ ফৌজের সঙ্গে! বাঙালির জয় হবেই। স্বাধীন দেশে বীরদের নামের তালিকার শীর্ষে স্থান পাবে নাসিমের নাম ।


৩.

ট্রেনিংশেষে, ভারত থেকে ফিরে এসে নাসিমদের গেরিলাদলটি আশ্রয় নেয় পার্টির এক বিশ্বস্ত সমর্থকের বাড়িতে। শ্রীপুর, চট্টগ্রাম শহর থেকে বহুদূরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এক পাড়াগাঁ। গাঁয়ের একপ্রান্তে বিরাট এলাকা নিয়ে বাড়িটি।

গেরিলা দলটিকে নেতৃত্ব দেবার দায়িত্ব বর্তায় নাসিমের ওপর। যথেষ্ট সমস্যায় পড়ে যায় ও। বিশ্ববিদ্যালয় আর অজপাড়াগাঁ — বিস্তর ব্যবধান; কথাবার্তা আচার-আচরণ এতটাই অচেনা, দুর্বোধ্য ঠেকে ওর কাছে; কীভাবে এগোবে বুঝে উঠতে হিমশিম খায়। দলে যারা স্থানীয় যোদ্ধা, সিদ্ধান্ত নিতে অনেকটাই ওদের ওপর নির্ভর করতে হয়। রাস্তাঘাট, এলাকাবাসী সম্পর্কে ধারণা ওদের বেশি। ভাষার ব্যাপারটাও তো ছোট করে দেখবার নয়। ভাষার ভিন্নতার কারণে স্থানীয় লোকদের সঙ্গে ইচ্ছা থাকলেও মিশতে পারে না নাসিম।

খানসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আগে শুরু করা যাক ওদের দোসরদের নির্মূল করার কাজ। আগাছা পরিষ্কার হলে পাক-হানাদারদেরকে ঘায়েল করা সহজতর হবে। হাতিয়ার চালানোতেও হাত পাকবে। ফায়ারিং রেঞ্জে প্রাকটিস করা ছাড়া জীবন্ত কোনও টার্গেট তো এ-পর্যন্ত জোটেনি।

শিকারের সন্ধান পেতে দেরি হয় না। পাশের গ্রাম ধরলার মোকসেদ বেজায় বাড় বেড়েছে, স্থানীয় লোকেরা জানায়, — মুক্তিযুদ্ধকে সে ব্যঙ্গ করে চুক্তিযুদ্ধ বলে — হিন্দুস্থানের কাছে দেশ বিক্রি করে দেওয়ার চুক্তি। প্রতিবেশীর সঙ্গে জমিজমা নিয়ে বিরোধ, হুমকি দেয়, — বাড়াবাড়ি করলে পাকসেনা ডেকে এনে জানে শেষ করে দেবে। বালুচ এক সেপাই সেদিন কী খাতির করেই না ওকে ‘বগলা’ সিগারেট খাইয়েছে, সে-কথা বলতেও ভোলে না। কদিন আগে পাকসেনারা ওর সহায়তায় হিন্দুবাড়িগুলো পুড়িয়েছে। ওর বিরুদ্ধে ভূরিভূরি অভিযোগ।

নাসিমের দল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, দালালনিধনের কাজ শুরু হবে মোকসেদকে দিয়েই। রাত দুটোর দিকে ছ-জনের একটি দল নিয়ে নাসিম পৌঁছে যায় মোকসেদের বাড়ি। তরজার বেড়া, টিনের চৌচালা ঘর; ছোট্ট একটা ছাপরা, রান্নাবান্নার কাজ ওখানটায় হয় বলে মনে হল। পাশেই গোয়াল। চোনা আর গোবরের ঝাঁজাল গন্ধে বাতাস ভারী। স্থানীয় এক যোদ্ধাকে ইশারায় দরজায় কড়া নাড়তে বলে নাসিম। কড়া নাড়ে। ভেতর থেকে কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। আবার কড়া নাড়ে, বেশ জোরে জোরে।

এবার মেয়েলি কণ্ঠে সাড়া মেলে: ইবা কনলে, এত রাইতত্ কনে ডাকেয যে?

– দরজা খোলন, মোকসেদ বদ্দার লয় কথা আছে: বলে যোদ্ধাটি।

– মোকসেদর শইল গম ন, গুম যার; দিনত্ আইস্য: মেয়েলি কণ্ঠ জানায়।

– ইত্তুরি দরকার, দরজা খোলন —

দরজা খুলে দেয় বয়স্কা এক মহিলা, মোকসেদের মা-ই হবে হয়ত। সশস্ত্র লোকদের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আতঙ্কিত বৃদ্ধা ঝট্ করে ফের দরজা লাগানোর চেষ্টা করে — পারে না। হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে নাসিমের দল । মোকসেদের স্ত্রীর কোল থেকে বছরখানেকের শিশুটি মাটির মেঝেতে পড়ে তারস্বরে কান্না জুড়ে দেয়। মোকসেদকে ধরতে একটুও বেগ পেতে হয় না। ঘরে কান্নার রোল। মা বুক চাপড়ে আহাজারি করতে থাকে; বউ এসে নাসিমের পা চেপে ধরে হাউমাউ কাঁদকে কাঁদতে বলে: আঁ’র সোয়ামি কোনও দোষ ন গরে — ইতানেরে ধরি নেন যে কিল্লাই? আল্লা, ও আল্লা আই কি পাপ করগি, কইন্ ন পারি — ।

মায়ের আহাজারি, ছোট্ট শিশুটির কান্না, যুবতী স্ত্রীর বিলাপ নাসিমকে বিচলিত করে। নিজেকে সংযত রেখে শান্ত কণ্ঠে বলে : কান্না থামান, ওকে নিয়ে যাচ্ছি, নির্দোষ হলে কোনও ক্ষতি হবে না — কথা দিচ্ছি ... ।

মোকসেদকে নিয়ে ওরা বেরিয়ে আসে। পেছনে কান্না আর বিলাপ চলতেই থাকে। কিছুটা পথ হাঁটার পর ওরা এসে থামে ফাঁকা এক মাঠে। মাঠের একপাশে ঝাঁকড়ামাথা বটগাছ — গাছের গোড়ার চারদিক গোল করে ইট দিয়ে বাঁধানো । মাঠটির পাশ দিয়ে প্রবাহিত সরু খাল। খালের কিনার-ঘেঁষে ঢোলকলমি আর কাঁশবন। ঝিঁঝিঁর বিরামহীন তীক্ষ্ণ রব — ব্যাঙের একঘেয়ে ডাক; দূরে কোথাও একটা শেয়াল গলা ছেড়ে একটু আওয়াজ তুলেছে কি একসঙ্গে বেশ কটা কুকুরের ক্রদ্ধ হুংকার।

মোকসেদের হাত পিঠমোড়া করে বাঁধা। রোগামত লোকটা নির্বিকার, ছ-জন সশস্ত্র গেরিলাকে যেন আমলই দিচ্ছে না। ওকে একজন যোদ্ধার হেফাজতে রেখে বাকি পাঁচজন একটু তফাতে গিয়ে বটতলার গোল গাঁথনির ওপর বসে।

– লোকটাকে দেখে কিন্তু আমার বড় ধরনের কোনও ক্রিমিনাল বলে মনে হচ্ছে না; শুধু পাকিস্তানপন্থি হওয়ার কারণে একজনকে গুরুদণ্ড দেওয়া বোধ হয় উচিত নয়: বলে নাসিম।

– কী-যে বলেন লিডার, এখন এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না, আসলে ওর রগে রগে শয়তানি, এ-এলাকায় ও-ই হচ্ছে দালালদের সর্দার: যোদ্ধাদের মধ্য থেকে কে একজন বলে ওঠে।

– তাই যদি হবে তাহলে ওর ঘরদোরের এ-হাল কেন? মোকসেদ...

নাসিমকে কথা শেষ করতে দেয় না ইকরাম, রগচটা আর একগুয়ে; অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে ওঠে: একটা দালাল ধরে তাকে নিয়ে এত গবেষণা কেন? হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্টে বিচার হচ্ছে মনে হয়। তো জজ সাহেব, আমরা এ-নিয়ে আর সময় নষ্ট করতে চাই না। দালাল ধরেছি, খতম করে ঘরে ফিরে যাব, ব্যস্। পাকবাহিনী নিরাপরাধ লোক ধরেও পাখির মতো মেরে হাতের নিশানা পরখ করে, আর আমরা কিনা দালাল ধরে বসেছি তার বিচার করতে —।

– পাকসেনারা পশু — জল্লাদ, আমরা কি তাই? নির্বিচারে হত্যা করতে হবে কারও সম্পর্কে অভিযোগ থাকলেই? এমনও তো হতে পারে জমিজমা বা অন্যকোনও বিরোধ থাকায় কেউ ওর বিরুদ্ধে বাড়িয়ে বলেছে। হতে পারে না?

– হল না হয়, এখন কি করতে চান সোজাসুজি বলেন, মারবেন না জামাই আদর করে ঘরে নিয়ে পৌঁছে দেবেন?

– মারতে হলে মারব, মারার পর আর কিছু করার থাকবে না। সেজন্যই এত কথা, এত পরামর্শ — । ঠিক আছে, কাজটা সোজাসাপ্টাভাবেই সেরে ফেলি তা হলে। আমরা এখানে পাঁচজন, কার কি মত, শুনি?

চারজন-ই মেরে ফেলার পক্ষে মত দেয়।

নাসিম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আলোচনার ইতি টানে — এগিয়ে যায় মোকসেদের দিকে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে মোকসেদ। নাসিমের ইচ্ছা হয় ওকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে। কষ্ট করে চেপে রাখে সে-ইচ্ছা। জিজ্ঞেস করে : শরীর কেমন আপনার? মা বলছিলেন অসুস্থ — ।

– শইল আমিশা যেন্ থাকে — : ফ্যাসফেসে গলায় মোকসেদের জবাব।

– আপনাকে আমরা এখন কি করব, কিছু ভাবছেন?

– ধইরগেন যেত্তে মারি ফেলিত্ পারন...।

– কোনও শেষ-ইচ্ছা আছে আপনার?

– না।

অসম্ভব বিস্ময় নাসিমকে বাকহীন করে তোলে। লোকটা কি মানসিক ভারসাম্যহীন? সাধারণ একজন গেঁয়োচাষা, একটুকুও পাত্তা দিচ্ছে না মানুষের কাছে সবচেয়ে ভীতিকর যে-পরিণতি, তাকে!

খালের ধারে ওরা ছ-জন — সঙ্গে মোকসেদ। ইকরামকে লক্ষ করে নাসিম বলে: কাজটা তাহলে তুমিই সারো — ।

নাসিম অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ঝোপঝাড়ে জমে-থাকা গাঢ় অন্ধকারে জোনাকিদের নিঃশব্দ কম্পন দেখে কেমন এক ফাঁকা দৃষ্টি নিয়ে।

ছত্রিশ বছর আগেকার ওই রাতের স্মৃতি কেন জানি এখনও মাঝেমধ্যেই তাড়া করে ফেরে নাসিমকে। অনেকগুলো সফল অপারেশন ওরা করেছে। অ্যামবুশে মেরেছে পাকসেনা; — রাজাকার ও দালাল মেরেছে অনেক। কিন্তু ওই রাতের ঘটনার স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি এখনও। বুড়ি মায়ের আহাজারি, যুবতী বৌয়ের বিলাপ, ছোট্ট শিশুটির কোল-থেকে পড়ে গিয়ে চিল্লানো— । দেশ স্বাধীন হবার পর জানা গিয়েছিল, মোকসেদ পাকিস্তানের পক্ষে ছিল ঠিকই, কিন্তু এমন কোনও অপরাধ করেনি যেজন্য অমন দণ্ড পেতে পারে। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু ধুয়েমুছে গেলেও, এখনও মনের অনেক গভীরে কেমন একটা খচখচানি অনুভব করে নাসিম। ছোট্ট শিশুটি, যদি বেঁচে থেকে থাকে, এখন যোয়ান। কী করছে ও এখন? খেতখামারি নাকি অন্যকোনও কাজ? যদি একবার যাওয়া যেত ধরলা গ্রামে!


চিন্তার জাল ছিঁড়ে যায়। কক্ষে প্রবেশ করে ইলিয়াস। একটা ফাইল টেবিলে রাখতে রাখতে দ্রুতলয়ে বলে: অনেকক্ষণ ধরে বসে আছেন, আই অ্যাম সরি! খুব জরুরি কাজে আটকা পড়ে গেছিলাম। চা-বিস্কিট দিয়েছিল আপনাকে?

– জি — ।

– তো বলুন কী যেন বলছিলেন? আমার ব্যবহারে মাইন্ড করেছেন বোধ হয় — ।

– কী যে বলেন, মাইন্ড করব মানে? সত্যি বলতে কি, এরই মধ্যে আপনি আমার মনে যে কী গভীর ছাপ ফেলেছেন...। তো বলছিলাম কি স্যার, প্রজেক্ট প্রপ্রোজালটাতে মন্ত্রীর রেকমেন্ডেশন থাকলে বিরাট উপকার হত আমার; কাজটা পাওয়া যেত। কোনোভাবে যদি...

– আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ করার সময় এ-রকম একটা দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন? বাই দ্য ওয়ে, আমার মামাও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ওনার কাছে থেকেই বড় হয়েছি; স্কুল, কলেজ তারপর ঢাকা ভার্সিটি। নিজের ছেলের মতই উনি দেখতেন আমাকে। মামার মুখ থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে শিহরিত হতাম। পঁচানব্বই সালে মারা যান — স্টমাক ক্যান্সার। মৃত্যুর আগপর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আঁকড়ে ছিলেন তিনি। মামা মারা যাবার পর সংসারের বোঝা এসে চাপে আমার ওপর । ইচ্ছা ছিল অন্য কিছু হবার — তা আর হওয়া হল কই! চাকরিতেই ঢুকে গেলাম।

– কী করতেন আপনার মামা?

– ফেনী শহরে একটা মনিহারি দোকান ছিল। ব্যবসা তেমন চলত না। টেনেটুনে কোনোমতে সংসার চালাতেন। সংসারের লোক বলতে মামা,মামি আর আমি। জানেন, নিঃসন্তান মামা আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। প্রায়ই বলতেন: যে-রকম দেশ পাব ভেবে যুদ্ধ করেছিলাম এই কি সে-দেশ? ঘাতকের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ে। চুনোমাছ মেরে হাতে কাদা মেখেছি — রাঘববোয়ালরা এখন দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা — কী লাভ হল বল্? তোরা যারা যোয়ান — পাকসেনাদের দোসর ওই বেজম্মাগুলোকে কক্ষনো ক্ষমা করিস না!

– আপনার বাবা কি করতেন, স্যার?

– সে অনেক কথা; থাক, মেলা প্যাচাল পেড়ে ফেললাম। বাবাকে দেখিনি, মা’র স্মৃতিও তেমন নেই । মামা-ই ছিলেন বলতে গেলে আমার সবকিছু। কিন্তু তাঁর কথা রাখতে পারলাম কই, একাত্তরের ঘাতক — বদরবাহিনী-প্রধানের মন্ত্রণালয়ে শেষপর্যন্ত চাকরি করতে হচ্ছে আমাকে!

– কী করবেন স্যার, বাঁচতে হলে সবাইকে আপস করতেই হয়। নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে পারিচয় দেই, অথচ একটা প্রজেক্ট পাওয়ার আশায় আমিও তো সুপারিশ নিতে এসেছি আপনি যার কথা বললেন সে-রকম একজন লোকের কাছে ।

– থাক ওসব কথা; পিপিটা রেখে যান, দেখা যাক কি করা যায়। এক মুক্তিযোদ্ধা প্রায়ই আসে আমার কাছে; জোট-সরকারের মূল দলের ডাকসাইটে নেতা; ওকে দিয়ে কাজটা করানো যায় কিনা দেখব।

আশ্বস্ত হয় নাসিম। লোকটার কথায় যথেষ্ট আন্তরিকতা; তাছাড়া খোলাখুলি কথা বলতে অভ্যস্ত—, অনেক কথাই বলল যা সাধারণত সরকারি কর্মকর্তারা ওভাবে বলে না।

প্রকল্প-প্রস্তাবটা সিনিয়র সহকারী সচিবের হাতে তুলে দেয় নাসিম।

– ফাইন, খুব সুন্দরভাবে তৈরি-করা পিপি তো! চোখ বুলিয়ে মন্তব্য করে সিনিয়র সহকারী সচিব।

– আপনার বাড়ি ফেনীর কোথায়, স্যার? আমি ফেনীর অনেক জায়গায় এনজিওর কাজে গেছি — চিনতেও পারি।

– মামার আদি বাড়ি ফেনীর শর্শদীতে, পরে শহরে এসে সেটেল্ড হন। ছোটকাল থেকেই তো মামাবাড়িতে। পৈত্রিক বাড়ি চট্টগ্রামের ধরলা গ্রামে। কেউ নেই ওখানে, যাওয়া হয় না— । নড়েচড়ে বসে নাসিম। ধরলা — চট্টগ্রামের ধরলা; ছত্রিশ বছর আগেকার স্মৃতি জেগে ওঠে ওর মনে।

– ধরলা আমার খুব পরিচিত জায়গা — যুদ্ধের সময় তো ওখানেই ছিলাম। কোন বাড়িটা আপনাদের, স্যার?

– সরদার বাড়ি। আমার বাবার নাম মোকসেদ সরদার; সাধারণ কৃষক ছিলেন — আপনার চেনবার কথা নয়।

————


কৈফিয়ত:

গল্পটিতে ব্যবহৃত চট্টগ্রামের ভাষা কারও কারও কাছে সঠিক মনে না-ও হতে পারে।ইচ্ছা করেই এমনটা করা হয়েছে।নির্ভেজাল চাটগেঁয়ে ভাষা ব্যবহার করলে অন্য অঞ্চলের পাঠকদের কাছে তা দুর্বোধ্য ঠেকতে পারে। তারপরও কিছু শব্দ, যেমন, বদ্দা(বড়দা),লয়(সঙ্গে),গম(ভালো),ইত্তুরি(এখনই), আমিশা(হামেশা)ব্যবহৃত হল — গল্পের আমেজ বজায় রাখতে।





২টি মন্তব্য:

  1. মুক্তিযোদ্ধা শামসুজ্জামান হীরার ব্যক্তিগত জীবনে রাজাকারদের আজকের উত্থানে ৭১ এর কোন মুকসেদ হয়ত মাঝে মাঝে উঁকি দেয়। এরই সফল প্রতিফলন তাঁর গল্পে।

    উত্তরমুছুন
  2. চমৎকার একটি গল্প। অনেকদিন আগেই প্রথম আলোতে পড়েছিলাম। খুব ভালো লেগেছিল। বিশেষ করে শেষটা। গল্পপাঠে পুনরায় পড়ে আবারও ভালো লাগল।

    উত্তরমুছুন