শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৭

রুমা মোদকের গল্প : ভালো থেকো ফুল...


যদিও সেদিন টুকটুকির কারণে বখাটেরা আমাকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিয়েছিলো তবুও তৃতীয়বারের মতো যেদিন টুকটুকি পালালো আর শহরময় ঢি ঢি পড়ে গেলো, আমি কিন্তু ওর উপরে মোটেও রাগ করতে পারলাম না। কেননা সেদিন সন্ধ্যায় ওর মুখে যে অপার্থিব হাসিটি দেখেছিলাম, সেটি ছিল তার অপরূপ সৌন্দর্যের চেয়েও অধিকতর ঝলমল।কেননা তার দু মাস তিন দিন আগে আমি টুকটুকিকে মোবাইলে এসএমএস পাঠিয়েছিলাম, ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল ভালো থেকো।

আর তারও কুড়ি বছর সাতমাস আগে আমি টুকটুকির প্রেমে পড়েছিলাম আর একমাস আটদিন আগে আমি টুকটুকিকে জড়িয়ে ধরেছিলাম আর পনের বছর নয় মাস আগে টুকটুকিকে দেখেছিলাম শ্রী দূর্গা জুয়েলার্সে হীরের আংটিখানা দরদাম করতে।

থাই গ্লাসের উপর ফুল-পাতার নকশায় “আপনার সৌন্দর্যে আনে শিল্পের ছোঁয়া-শ্রী দূর্গা জুয়েলার্স”, প্রতিশ্রুত বাণী ছাপিয়ে দোকানের ভিতরে হীরার দ্যুতির মতো চমকে উঠা ঐশ্বরিয়ার সালংকারা মুখচ্ছবি দিনমান ঝলসায় মাথার উপর ছাদ ফুড়ে তেড়ে আসা আলোর জোয়ারে। দুখানা দুর্মূল্য ইলিশের আঁষটে গন্ধমাখা বাজারের থলে হাতে নিয়ে এক কেজি খাসির মাংসের জন্য মাখন কসাই এর ডেরার দিকে যেতে যেতে শ্রী দূর্গা জুয়েলার্স এর ঐশ্বরিয়ার বর্নাঢ্য সৌন্দর্য ম্লান করা টুকটুকির সৌন্দর্য দেখেই কি না কে জানে, আমার হুট করে মনে পড়ে গেল মা বলেছিলেন একবার স্যাকরার ঘর ঘুরে আসতে। ঘরে যা দু এক ভরি গয়না আছে মায়ের বিয়েতে পাওয়া, তার নকশা আর ডিজাইন সব হালে অচল, পুরোনোটা বদলে নতুন নিলে কেমন দরদাম পড়বে জেনে আসতে। রিক্সা ড্রাইভারকে বিদায় দিয়ে সামনের মুদি দোকানদারকে যথেষ্ট অনুনয়-বিনয়ে গলিয়ে তার দোকানে বাজারের থলেখানা রেখে যখন শ্রী-দূর্গা জুয়েলার্স এ ঢুকি, তখন অবশ্য পুরানো গয়না, নতুন গয়না ইত্যাদি প্রয়োজনসমূহের কথা বেমালুম ভুলে যাই। দেখি টুকটুকির সাথে থাকা ছেলেটা প্রচ- খেপে দোকান কর্মচারিকে মারতে যাচ্ছে। ব্যাটাও যেমন। অর্ধেক দাম রেখে ওদের চাহিদামতো বাকিতে আংটিটা দিয়ে দিলে ল্যাঠা চুকে যায়, যেখানে সাথের ছেলেটা রানিং এমপির ভাতিজা, তায় আবার পুত্রহীন এমপির পুত্রসম, মোটরবাইকে যার দাপট অবিরাম গত কয়েক মাস ধরে বিস্ময়ে দেখছে এলাকাবাসী কিন্তু ব্যাটা দেবে না। এমপির ভ্রাতুষ্পুত্রের উদ্ধত ঘুষির মুখেও সে নির্বিকার রেকর্ড বাজিয়েই যাচ্ছে-মালিকের নিষেধ আছে...., মালিকের নিষেধ আছে...টুকটুকির টানা হ্যাঁচড়ায় ছেলেটি কর্মচারির শার্টের কলার ছেড়ে বার-দুয়েক চেষ্টা চালায় মালিকের ফোনে, অতপর না পেয়ে টুকটুকি তার বাঁ হাতের অনামিকা থেকে যখন চমকানো হীরের আংটিখানা খুলে দেয়, তখন তার মুখে অপমান-অপ্রাপ্তি-হতাশা ইত্যাদি মিলেমিশে যে অচেনা আলোছায়া খেলা করে তা দেখে দোকান কর্মচারী কাজটা কতোটা অন্যায় হয়েছে ভাবতে পারে কিনা জানি না, তবে আমার কাছে ফরজ হয়ে দাঁড়ায় খুলে রেখে যাওয়া আংটিখানা আবার টুকটুকির অনামিকায় উঠিয়ে দেয়া। ‘এক্সিট’ লেখা গ্লাসের দরজা ঠেলে বের হয়ে এমপির ভ্রাতুষ্পুত্রের মোটর বাইকের পিছনে বসে ফুড়–ৎ করে হাওয়া হয়ে যাওয়ার সময় দেখতে না পাওয়ার যে উপেক্ষাটুকু আমার জন্য টুকটুকি রেখে যায় আমি তা মোটেও গায়ে না মেখে কর্মচারির গুছিয়ে রাখা আংটিখানা খুব ভালো করে দেখে নেই। মনে মনে হিসাব করি আংটিখানার যা দাম, এটি কিনতে আমার কতোদিন লাগতে পারে কিংবা এটি আমি আদৌ কিনতে পারবো কি ন কোনোদিন! আর কিনলেও তা টুকটুকির অনামিকায় উঠিয়ে দিতে পারবো কি না ভাবতে ভাবতে হিসাবের টাকা থেকে দশ টাকায় একটা ফিল্টার সিগারেট কিনে মুদী দোকানদারকে খুশি করার চেষ্টা করে আবার মাখান কসাই এর ডেরার পথ ধরি এক কেজি খাসির মাংসের সন্ধানে।

আর পরদিন দুই লাখ টাকা কাবিন, ত্রিশজন বরযাত্রী আর দু ভরি গহনার আদান-প্রদানে সবচেয়ে বড় বোনের বিয়ের পাকা কথা সেরে পাত্রপক্ষ চলে যাবার পর, শোকেস থেকে খুলে আনা চিনামাটির পিরীচে মেহমানদের রেখে যাওয়া খাসির মাংসের তলানি ঝোল দিয়ে পোলাও এর লোকমা মুখে তুলে নিতে নিতে বন্ধু পাভেল এর কল আসে মোবাইলে। পাভেল জানায়, টুকটুকি এমপির ভাতিজার সাথে পালিয়েছে। সারা শহরে রটে যাওয়া খবরটা আমার কাছে পাচারে পাভেলের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই, আসলে পাভেলই আমার একমাত্র বন্ধু যে টুকটুকির প্রতি আমার অসম দুর্বলতার বিষয়টি জানে। টুকটুকি যখন স্কুলে যায়, তখন রিক্সায় উঠার সময় পায়ের পাতা ছুঁয়ে থাকা সালোয়ারখানা একটু উপরে উঠে গেলে ওর ধবধবে ফর্সা পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকার বুভুক্ষু দৃষ্টিটা কেবল পাভেলরই চেনা। না, আমার বলতে হয়নি কিছুই। সময় পেলে আমি যেমন পাভেলের সিডির দোকানে আড্ডা পেটাই, আসবে পাভেলও আমার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হ্যানিম্যান হোমিও ক্লিনিকে সময় কাটাতে কাটাতে নিজ বুদ্ধিগুনে বুঝে নিয়েছে। কিন্তু পাভেলের ফোনে আমার প্রেমিক মন যতোটা বিক্ষিপ্ত হবার কথা, ততোটাই নিস্পৃহতার সুরেই বোধকরি পাভেল কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে দেয়। টুকটুকি কোথায় গেল কী বৃত্তান্ত ইত্যাদি জানার কোনো কৌতুহলই আমার মাঝে জাগে না, যতোটা জেগে থাকে অমূল্য কিংবা দুর্মূল্য হীরের আংটিটির জন্য বেদনা। টুকটুকির পালিয়ে যাবার খবরটি শুনার পর আমি মোটামুটি সিদ্ধান্তে স্থিত হই, ওখানা আমিই কিনে দেবোই টুকটুকিকে। যে করেই হোক, বলা বাহুল্য সেই মূহুর্তে এটিই হয়ে উঠে আমার আগামী জীবনের লক্ষ্য।

টুকটুকিকে আমি যেদিন জড়িয়ে ধরেছিলাম, মনে হয়েছিলো এই মূহুর্তের পর আমার আর বেঁচে না থাকলেও চলে, কিংবা এর চেয়ে বেশি কিছু আমার একজীবনে প্রত্যাশা ছিলো না, হবেও না। সেদিন আশাহত হলেও কেন জানি টুকটুকি খুব বাধা দেয়নি, আমি দুহাত বাড়িয়ে উন্মত্তের মতো ওকে জড়িয়ে ধরলাম, ওর ঘাড়ের সুগন্ধে মুখ ঘষলাম, এবং আমি ঠিক জানতাম না কী করবো, এবং সেদিন টুকটুকির মাঝে সমর্পন ছিলো। কিন্তু সেদিনও আমার হীরের আংটিখানা কেনা হয়নি। আগের দিন ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে দেখেছিলাম হাজার সাতেক টাকা পড়ে আছে। অথচ আংটিখানার দাম তার কয়েকগুন। নিজের উপর খানিক আক্ষেপ জেগেছিল। বিশটি বছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছি আমি, অথচ আজ বড়বোনের ছেলের খতনা, মেজবোনের বরের গলব্লাডার স্টোনের অপারেশান, মায়ের চোখের ছানি অপারেশান, ছোটবোনের সিজার তো কাল রান্নাঘরের খুঁটি পাল্টানো ব্যাংকে জমা টাকাটা পাঁচ অংকের ঘরে পৌঁছানো মাত্রই কেমন দৈবপাকে প্রয়োজনগুলো সামনে এসে দাঁড়ায়। আমি অগ্রাহ্য করতে পারি না। বোনদের মায়ের জীবনের প্রয়োজনের চেয়ে প্রেমিকার হীরের আংটির প্রয়োজনটাও বড় করে ভাবলে নিশ্চয়ই আমি আর মানুষ থাকিনা, কিন্তু হীরের আংটির প্রয়োজনটাও যে কম বড় নয়, নিজেকে ছাড়া কাউকে আর বুঝতে পারি না, চাইও না। টুকটুকি অবশ্য সে আংটির ইতিবৃত্ত মোটেই জানে না। ও অপেক্ষায় ছিলো আর কারো, ও আমার বাসায় এসেছিলো আর কারো জন্য। ও সত্যিই ভেবেছিলো। বিদেশ ফেরত কোনো নীরব প্রেমিক সত্যি ওকে বিশ বছর ধরে গোপনে ভালোবেসে যাচ্ছে। আমি মুঠোফোনে ক্ষুদেবার্তায় ওকে যা বলেছি বারংবার। যতোবার বলেছি, ও অবাক হয়েছে, বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে। কেমন করে আমি জার্মানি থেকেও ওর সম্পর্কে সব জানি। স-ব। অথচ কী অসীম গভীরতায় গভীর প্রনয়ের কথা এতোদিন মুখ ফুটে প্রকাশ করিনি পর্যন্ত । আমি ঠিক ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে টের পেয়েছি আমি যতোটা কৌশলে ওর দুর্বলতা স্পর্শ করছি, ও ততোটাই সরলতায় আত্মসমর্পন করছে। আমার ষষ্ঠইন্দ্রিয় আমাকে জানিয়েছিলো যে কী টুকটুকির দুর্বলতা, আর মানুষের দুর্বলতা স্পর্শ করাই হলো তার কাছে যাওয়ার সবচেয়ে সহজতর উপায়। পরপর দুবার পালিয়ে বিয়ে করার পর শহরময় ওর যে কুখ্যাতি, আমি প্রথমেই তাতে বুলিয়েছিলাম প্রশ্রয়ের সান্ত¡না। প্রথমবার, বয়স যখন ওর সবে ষোল বছর সাতমাস, যদিও সে পালিয়েছিল এমপির ভাতিজার সাথে, তবু টুকটুকির বিত্তশালী ও প্রতাপশালী পিতা অপ্রাপ্তবয়ষ্কের সার্টিফিকেট দিয়ে খুব সহজেই ওকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। কাজটি আরো সহজ করে দিয়েছিল এমপি সাহেবের সহযোগিতা। ক্ষমতা উপভোগের চতুর্মুখি সুসময়ে পচা শামুকে পা কাটার ঝুঁকি তিনি নিতে চাননি বলে ব্যাপারটি না ঘাঁটাঘাঁটি করে আপোষে টুকটুকিকে বাপের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে ভাতিজাকে বিদেশ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ওর বর্তমান অসহায়ত্বের প্রতি আমার অসীম মমত্ব ওকে যতোই মুগ্ধ করছিল, আমি ততোই সাবধান ছিলাম ও এটাকে দয়া বা করুণা না ভাবুক। যদিও আমি নিশ্চিত জানতাম হীরের আংটি খুঁজে ফেরা টুকটুকি আমার সত্যিকারের পরিচয় জানলে আমার সুক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ সব ঢিল ছুঁড়ে ফেলে দেবে আমার জানালা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা টলটলে দীঘিতে। কিন্তু আমি সেসব ভয়াবহ পরিণতি কল্পনায় না এনে ওকে ক্রমাগত বলে গেছি, বলেই গেছি। লোকে যতোই মন্দ বলুক, ওরই বা দোষ কী! দ্বিতীয়বার গৃহশিক্ষকের সাথে পালিয়ে যাবার পর গৃহশিক্ষকের মৃত্যু না হলে ওর তো আসলে আর ফিরে আসার প্রয়োজন ছিল না পিতৃ-মাতৃহীন ভাই আর ভাই বউদের সাজানো সংসারে উটকো ঝামেলা হয়ে। যে উটকো ঝামেলা এখন উপড়ে ফেললেই তাদের সংসারে শান্তি ফিরে। ওর এখন ভীষণ একটা আশ্রয় দরকার। মানসিক, শারিরীক, সামাজিক। কী নিশ্চিন্তে ও বিশ্বাস করে যায় জার্মান প্রবাসী মানুষটির প্রতি। সে বিশ্বাস আমার মতো নগন্য হোমিওপ্যাথ মানুষে নয় মোটেও জেনেও আমি হ্যানিম্যান হোমিও ক্লিনিকের বাক্সে আর্নিকা, থুজা সাজাতে সাজাতে কথার পিঠে কথাগুলোও সাজাতে থাকি। অতপর রাত গভীর হলে দূর থেকে যখন একটা কুকুরের একটানা আর্তনাদ ভেসে আসে বিষন্ন অন্ধকার চিরে চিরে, পৃথিবীতে পুরানো ফ্যানের ঘটর ঘটর আওয়াজ ছাড়া আর কোনো সাক্ষী থাকে না, তখন বালিশের নীচ থেকে মুঠোফোনটা তুলে এনে ডায়াল করি টুকটুকির নাম্বারে, স্বপ্ন বুনি। কয়েকমাসের মধ্যেই আমি আবার জার্মানী চলে যাবো, যাবার আগে হীরের আংটি বিনিময় করে বিয়েটা সেরে ফেলবো, আর গিয়ে মাস কয়েকের মধ্যেই ওকে নিয়ে যাবো, আর ফিরবো না আমরা এই অবিবেচক অসুস্থ নির্দয় সমাজের কাছে। আমি চোখ বন্ধ করে বলে যাই, মশারির ফাঁক গলে ঢুকে পড়া কানের কাছে ভনভন করা মশাটার উড়াউড়ি অগ্রাহ্য করি। ক্ষমা করে দেই দীর্ঘকাল ব্যবহারে ক্ষয়ে যাওয়া ফ্যানটার বাতাস না দিতে পারার অক্ষমতা। ভ্যাপসা গরমে ঘামতে ঘামতে আমি দেখি হীরের আংটির ঠিকরে পরা ঔজ্জ্বল্য, চোখ বন্ধ করে হাঁটতে থাকি ঝকঝকে অচেনা এক শহরের রাস্তা ধরে; আমার হাতে হাত রেখে হাঁটে টুকটুকি। স্বপ্নে ভাসতে ভাসতে একদিন আমি টুকটুকিকে রাজি করিয়ে ফেলি দেখা করতে। কল্পিত প্রেমিকটির সাথে দেখা করতে আমার বাড়ি পর্যন্ত ও চলেই আসে শেষ পর্যন্ত। প্রতারিতের তীব্র রোষে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবো বর্তমান সহ পুরো ভবিষ্যৎ নিয়ে, জেনেও আমি পরিচয়টা প্রকাশের লোভটুকু সামলাতে পারি না। কিন্তু স্বপ্ন কিংবা আশাভঙ্গের বেদনা কিংবা প্রতারিত হবার ক্ষোভ কিছুই আমি দেখিনা টুকটুকির দৃষ্টিতে, দেখি অসহায়ত্বের অশ্রু। যে অশ্রু মূহুর্তের জন্য ওকে টেনে নিয়ে যায় আত্মসমর্পনে। যে অসহায়ত্বের সুযোগটুকু আমি নেই। থরো থরো বুকে, কাঁপা হাতে আমি ওকে জড়িয়ে ধরি......, আমার কুড়ি বছর আটমাসের অপেক্ষা পরিণতি পায়, এই প্রথমবার, হ্যাঁ আমি নিশ্চিত শেষবারও..........।

কুড়ি বছর আট মাস আগে যেদিন টুকটুকির মা টুকটুকির হাত ধরে স্কুল ফিরতি পথে আমার হ্যানিম্যান হোমিও ক্লিনিকে ঢুকেছিল, তখন আমি দেয়ালে তারকাঁটা স্কচটেপ সহযোগে মহাত্মা হ্যানিম্যানকে কোনোরকমে বসানোর চেষ্টা করছি। অকাল প্রয়াত বাবার এই হোমিও ক্লিনিকে এই আপাত বসা যে একদিন চিরস্থায়ীই হয়ে যাবে আমার জন্য তখনো ভেবে উঠতে পারিনি। গঞ্জের কলেজে সবে ইন্টার ক্লাসে ভর্তি হয়েছি। ঘরে অনুঢ়া তিনজন কলেজগামী বোন আর না গ্রাম না শহর এলাকায় একতলা বাসাটা রেখে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার বাবা যখন হঠাৎ মাঝ উঠানে মাথা ঘুরে পড়েই নাই হয়ে যান, তখন পরিবারটির উপর কেমন অনিশ্চিত অন্ধকার নেমে আসে, তা অপরিণত বয়সের কারণে আমি তেমন টের না পেলেও আমার মা পেয়েছিলেন। বাবা-ন্যাওটা হওয়ার কারণে জ্বরে “রাশটক্স", পেট ব্যাথায় “ নাক্স" ওষুধের গুটিকয় নাম জানার সীমিত জ্ঞান তখন ভীষণ কাজে দিয়েছিল। দুবেলা ভাত যোগাড়ের জন্য মা বসিয়ে দিয়েছিলেন হ্যানিম্যান হোমিও ক্লিনিকের দরজা খুলে। আমি না জানলেও মা জানতেন সবে উন্নয়নের জোয়ার লাগা এই শহরটিতে হোমিওপ্যাথি ওষুধ নিতে কিছু মানুষ আসে বিশ্বাসে আর কিছু স্বল্প খরচের খাতিরে। ভুল-ভাল প্রয়োগে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না খুব। একটি পরিবার বাঁচানোর জন্য তাই যৎসামান্য জ্ঞানে চর্চা চালানো খুব অন্যায় কিছু নয়। টুকটুকির মা আসতেন প্রথমটার খাতিরে। নইলে স্বামী যার ডাকসাইটে ঠিকাদার, বনেদী ধনী, শহরতলীতের যাদের একমাত্র তিনতলা বাড়িটিকেই মোবাইল টাওয়ারের সাথে পাল্লা দিয়ে অনেক দূর থেকে আমগাছ জামগাছ বাঁশগাছের ঝোঁপ ডিঙিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, এই শহরে যাদেরই একমাত্র নিশ্চিতভাবে জেলা সদর পার হয়ে রাজধানীতে বড় হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য রয়েছে এবং মৃত্যুর আগে শেষ মূহুর্তে তাকে নিয়েও যাওয়া হয়েছিল, সে কেন জরায়ূ টিউমারের চিকিৎসার জন্য হ্যানিম্যান হোমিও ক্লিনিকের উপরেই ভরসা করবে? মৃত পিতার জন্য শোক আর আমার জন্য আর্শীবাদ বরাদ্দ করে তিনি প্রথম দিনই টুকটুকিকে বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে- দেখছাইন বে বাবা, খাওনঅ রুছি নাই কেরে। সবে হ্যানিম্যান হোমিও ক্লিনিকে বসা আমি বিজ্ঞের মতো অজ্ঞতা লুকিয়ে টুকটুকির মোম রঙা তুলতুলে হাতখানা হাতে নিয়ে পালস গুনতে গুনতে আমি ভিতরে হঠাৎ জনপদ ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া ভূমিকম্প টের পাই, বাবার কাছ থেকে শেখা পদ্ধতিতে জিহবার রং দেখতে দেখতে ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তুপের ভিতর নিজেকে হারিয়ে ফেলি জন্মের মতো। কাঁপা হাতে চোখের রং দেখতে দেখতে ওর দৃষ্টির ছিপে আটকে যাই মাছের মতো, বুঝে নেই আগামী জীবনেও এই ছিপে আটকানো মৃত্যুই অনিবার্য পরিণতি। এই অনুভূতির সাথে আগে আমার আর পরিচয় হয়নি কখনো।

বোনেদের বিয়ে হয়ে যাবার পর, মায়ের মৃত্যুর পর লক্ষ্মীর স্পর্শহীন বাড়িটা ছাড়া বাড়ির মতো, মধ্যরাতে হ্যানিম্যান হোমিও ক্লিনিকের ঝাঁপ ফেলে, বুয়ার রান্না করা তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে মশারির ভিতর পাভেলের কাছ থেকে ধার করে আনা সেকেন্ডহ্যান্ড ল্যাপটপটি নিয়ে প্রবেশ করি একমাত্র আশ্রয়ে, মুভি দেখায়। পাভেলের সিডির দোকানে বসতে বসতেই যে নেশায় পেয়েছে আমাকে। শাকিব-অপু, সোহম- শ্রাবন্তী, দেব- শুভশ্রীর সংগে একাকীত্বের ভয়াবহ আক্রমণ থেকে বেঁচে যায় আমার রাতগুলি। সহজ সমীকরণের নায়ক-নায়িকা ভিলেন এর রসায়ন ছাপিয়ে সেদিন হঠাৎ চোখ এবং মন আটকে যায় বিদ্যা বালানে, আলো-আঁধারিতে ধীর পায়ের ছন্দময় পদক্ষেপে বিদ্যা বালান বলতে থাকে- ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল ভালো থেকো।অবাক হয়ে যাই, আরে এতো আমার মনের কথা! বারবার পজ অপশন টিপে টিপে কবিতাটা টাইপ করে ফেলি মুঠোফোনে, ধরা পড়ে গেলে জানালা গলিয়ে ঐ একলা দাঁড়িয়ে থাকা ডোবাটার টলটলে জলে চিরতরে ডুবিয়ে দেবো সিমকার্ডটা।এর চেয়ে বেশি কিছু আমার আর কী বলার আছে টুকটুকিকে, ভাবতে ভাবতে দুঃসাহসী হাতে ক্ষুদেবার্তাটা পাঠিয়ে দেই টুকটুকির নাম্বারে। মাত্র দু মাস তিন দিন আগে, আর আমাকে রাজ্যের শিহরণ সুখ আর বিস্ময়ে ডুবিয়ে পরদিন টুকটুকি প্রত্যুত্তর পাঠায় ‘কে আপনি?’ হিতাহিত-পরিনতি ভাবনা শূন্য আমি অতপর এগিয়ে যেতে থাকি, সত্য নিয়ে, মিথ্যা নিয়ে, যেটুকু ওর জানি সব সত্যি, যেটুকু আমার জানাই পুরোটাই মিথ্যে। মিথ্যেটুকু না বললে যে আমার সকালের অপেক্ষাটা মিথ্যে হয়ে যেতো, ওর দুঃখগুলো অপেক্ষাগুলো অসহায়ত্বটুকু ওকে আমার বাসা পর্যন্ত টেনে আনতো না মোটেই। বাস্তবে একখানা হীরের আংটি কেনায় অক্ষম আমি যে কল্পনায় ওকে হীরের আংটি কিনে দেয়ার মতো সক্ষম হয়ে উঠি। স্বপ্নের মতো গল্পের মতো ওকে কাছে পাবার যোগ্যতার মতো সক্ষম।

তাৎক্ষনিক আবেগ-বিহ্বলতা কেটে যাবার পর আমার অযোগ্য অক্ষমতাকে ক্ষমা করতে পারেনি টুকটুকি, শুনতে পাই, উপজেলা সদরের হাসপাতালের সদ্য আগত এক ডাক্তারের প্রেমে আবার পড়েছে টুকটুকি। একদিন হাসপাতালের ব্যাচেলর কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে আসার সময় পথ আগলে দাঁড়ানো বখাটে ছেলেদের হাত থেকে টুকটুকিকে বাঁচাতে গিয়ে ওদের সম্মিলিত হাতের উপুর্যুপরি চড়-ঘুষি খেয়ে বিপর্যস্ত লুটিয়ে পরতে পরতে আমি ঝাপসা চোখে দেখতে পাই, ডাক্তারের হাতে হাত রেখে সত্যি সত্যি টুকটুকি নিরাপদে হারিয়ে যাচ্ছে বড় রাস্তার পথ ধরে.......।

সেদিন সন্ধ্যায় হাতে মাথায় ব্যান্ডেজ বাধা আমি বাসায় ফিরতে ফিরতে তাদের আবিষ্কার করি শ্রী দূর্গা জুয়েলার্সের উজ্জ্বল আলোর নীচে, ঝলমল হাসছে টুকটুকি, ঠিক ওর সৌন্দর্যের মতোই মাথা ঘুরিয়ে দেয়া সে ঝলমলে হাসি, ভাবি বোধহয় হীরের আংটিটা এবার কিনা হয়েছে ওর। আবারো শহরময় ঢি ঢি পড়ে গেলেও আমার মোটেও ঈর্ষা জাগে না, আমি গায়ের সমস্ত ব্যাথা অস্বীকার করে কবিতা পড়ি, ভালো থেকো ফুল.....মিষ্টি বকুল.......।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন