বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

মাদেলিন গোবেইলে’র সাথে সিমন দ্য বোভোয়া’র আলাপচারিতা

সিমন দ্য বোভোয়া (১৯০৮-১৯৮৬) একজন ফরাসি লেখক ও দার্শনিক। তিনি দর্শন,রাজনীতি ও
সামাজিক বিষয়াবলীর উপর প্রবন্ধ, উপন্যাস, জীবনী ও আত্মজীবনী রচনা করেন। বর্তমানে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তাঁর অধিবিদ্যামূলক উপন্যাস 'She Came to Stay' এবং 'The Mandarins' এবং ১৯৪৯ সালে লেখা তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ 'The Second Sex'-এর জন্য।  এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন 'মেদেলিন গোবেইল' যিনি অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে পড়েছিলেন এবং ১৯৬৪-১৯৭১ সাল পর্যন্ত অটোয়াতে কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরাসি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন।
পনের বছর বয়স থেকে তিনি (১৯৫৮) সালে সিমন দ্য বোভোয়াকে চিঠি লিখতে শুরু করেন এবং বোভোয়ার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁরা দুজনে বন্ধু ছিলেন। ফরাসী ভাষার এই মূল সাক্ষাতকারটির ইংরেজী ভাষান্তর করেছিলেন বানার্ড ফ্রিথম্যান, যা ১৯৬৫ সালে ‘প্যারিস রিভিউ’র বসন্ত-গ্রীষ্ম সংখ্যায় ছাপা হয়েছিলো। গল্পপাঠের জন্য ইংরেজী থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন মৌসুমী কাদের ও উম্মে হাবিবা সুমি।

প্রারম্ভকথা
সিমোন দ্য বোভোয়া আমাকে জাঁ জ্যেনে এবং জাঁ পল সার্ত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন যাদের সাক্ষাতকার আগেই পেয়েছিলাম। কিন্তু উনি তাঁর নিজের সাক্ষাতকার দিতে দ্বিধা বোধ করছিলেন। ‘কেন আমি আমার নিজের সম্পর্কে বলবো? তোমার কি মনে হয়না, আমার আত্মজীবনীমূলক তিনটি বইয়ে যথেষ্টই লিখে ফেলেছি’? তাঁকে রাজী করাতে আমার অনেকগুলো চিঠি চালাচালি করতে হয়েছে এবং কথাও বলতে হয়েছে। উনি এই শর্তে রাজী হয়েছিলেন যে এটি খুব দীর্ঘ হবেনা। সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছিল সিমোন দ্য বোভোয়া’র মনপারনেসে’র স্টুডিওতে। এটা সার্ত্রের এপার্টমেন্ট থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। একটা বিশাল রোদমাখা ঘরে বসে আমরা কাজটা করেছি যা আসলে বোভোয়া’র পড়া এবং বসার ঘর ছিল। বুকশেলফটা ঠাসা ছিল নীরস সব বইপত্রে। ‘সবচেয়ে ভাল বই গুলো’, ‘উনি বললেন, ‘আমার বন্ধুদের কাছে আছে যেগুলো আর ফেরত পাইনি’। টেবিলগুলো ছিল সব রঙিন জিনিষপত্র দিয়ে সাজান, যা নানা জায়গা ভ্রমণ করে সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু ঘরের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিষটি ছিল বোভোয়াকে উপহার দেয়া জ্যাকোমেটির হাতে বানানো একটি ল্যাম্প। সারা ঘর জুড়ে ছড়ানো ছিটানো ছিল ফোনোগ্রাফের রেকর্ড,যা ছিল বোভোয়ার কয়েকটি বিলাসিতার মধ্যে একটি। বোভোয়া’র অভিজাত চেহারা ছাড়াও তরতাজা গোলাপী গায়ের রঙ এবং স্বচ্ছ নীল চোখে তাকে খুবই তরুণ এবং প্রাণবন্ত দেখাতো। তাঁকে দেখে এমনটা মনে হত যে তিনি সবই জানেন এবং দেখতে পান, যা অনেকের সাহসকেই অনুপ্রাণিত করত। তিনি দ্রুত কথা বলতেন, অভদ্র না হয়ে সরাসরি কথা বলতেন। খুব হাসিখুশী আর বন্ধুসুলভ ছিলেন। 


মাদেলিন গোবেইল--
গত সাতবছর যাবৎ আপনি জীবনস্মৃতি লিখে যাচ্ছেন, যেখানে বারবার আপনি আপনার ‘নেশা ও জীবিকা’ সম্পর্কে বিস্মিত হয়েছেন। আমার মনে হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস হারিয়ে ফেলার ফলেই আপনি লেখক হবার দিকে ধাবিত হয়েছেন।

সিমন দ্য বোভোয়া--
সামান্য কিছু প্রতারণা ছাড়া একটা অতীত পর্যালোচনা করা খুব কঠিন। আমার লেখার ইচ্ছা অনেক আগে থেকেই ছিল। ৮ বছর বয়সে প্রথম গল্প লিখেছিলাম যেমনটা ঐ বয়েসে অনেকেই করে। তাতে এটা বোঝায় না যে তাদের সত্যিই লেখার ঝোঁক ছিল। আমার ক্ষেত্রে ‘লেখার প্রতি নেশা’টা কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কারণ আমি ধর্মীয় বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম; এটাও সত্যি যে, যখনই আমি বই পড়ি তখন সহজেই গভীরভাবে সেটি দ্বারা চালিত হই। যেমন জর্জ ইলিয়টের ‘দ্য মিল অন দ্য ফ্লস’,আমি ভীষণভাবে তার মতো হতে চেয়েছিলাম,এমন একজন যার বই অনেক পড়া হবে এবং পাঠককে মুগ্ধ করবে।


মাদেলিন গোবেইল--
আপনি কি কখনও ইংরেজি সাহিত্য দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি পড়া আমার একটা অন্যতম নেশা ছিল। ইংরেজি সাহিত্যের ‘শিশু সাহিত্য সম্ভার’ ফ্রেঞ্চ থেকেও মনমুগ্ধকর ছিল। আমার অসম্ভব ভাল লেগেছিল ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ পড়তে,‘পিটার প্যান’,‘জর্জ এলিয়ট’,এমনকি ‘রোজামন্ট লেহম্যান’ ও।

মাদেলিন গোবেইল --
‘ডাস্টি অ্যান্সার’?

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমার ঐ বইটির প্রতি প্রচন্ড আবেগ ছিল। যদিও এটা ‘ভালও নয় মন্দও নয়’ এমন একটি বই। আমার প্রজন্মের মেয়েরা এটি খুব পছন্দ করত। লেখক খুব অল্পবয়সী ছিলেন,প্রতিটি মেয়ে জুডির মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেতেন। বইটি ভীষণ বুদ্ধি করে এবং সূক্ষ্মভাবে লেখা হয়েছিল। নিজের কথা বলতে গেলে, আমি 'ইংলিশ বিশ্ববিদ্যালয়' এর জীবনকে ঈর্ষা করতাম। আমি বাড়িতে থাকতাম। আমার নিজের কোনো ঘর ছিল না। সত্যি বলতে কি, আমার কিছুই ছিল না। যদিও সে জীবনটি মুক্ত ছিল না,তবুও সেখানে একান্তে নিজের মতন থাকা যেত এবং এটা আমার কাছে খুব চমৎকার একটা ব্যাপার ছিল। বইটির লেখক কিশোর কিশোরীদের সব কাহিনীগুলো জানতেন -সুদর্শন ছেলেরা তাদের সম্পর্কে কতগুলো রহস্য নিয়ে হাজির হবে, এইসব। পরে অবশ্য আমি 'ব্রন্টে' আর ভার্জিনিয়া উলফ-এর বই ‘ওরল্যান্ডো,‘মিসেস ড্যা্লোওয়ে’ পড়েছি। ‘দ্য ওয়েভস’ নিয়ে আমার তেমন একটা আগ্রহ নেই কিন্তু উনার এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং-এর ওপর লেখা বইটা আমার খুব পছন্দ। 


মাদেলিন গোবেইল--
তাঁর জার্নাল সম্পর্কে আপনার কি অভিমত?

সিমন দ্য বোভোয়া--
ওটায় আমার আগ্রহ কম ছিল। এটা খুব বেশী সাহিত্য সংক্রান্ত ছিল। চমৎকারও ছিল বটে, কিন্তু আমার কাছে সেটা ছিল ‘বিদেশী’। প্রকাশের পর লোকে তাঁকে নিয়ে কি বলবে, তা নিয়ে তিনি খুব বেশী চিন্তিত থাকতেন। ‘আ রুম অব ওয়ানস ওন’ আমার খুব ভাল লেগেছিল, যেখানে তিনি নারীর অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন। এটা ছিল একটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ, কিন্তু মাথায় পেরেক ঠোকাবার মতন। ভার্জিনিয়া উলফ ছিলেন অন্যতম নারী লেখক যার প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। আপনি কি তার কোন ছবি দেখেছেন? একটা অসম্ভব নিঃসঙ্গ চেহারা... একভাবে বলা যায় যে তিনি 'কলেত' এর চেয়েও বেশি আগ্রহ জাগিয়েছেন। 'কলেত' শেষপর্যন্ত প্রেম,গৃহস্থালী কাজ, লন্ড্রি, ইস্ত্রি করা বা পোষা প্রাণীদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। 'ভার্জিনিয়া উলফ' অনেক অনেক বিশাল।


মাদেলিন গোবেইল--
আপনি কি তাঁর বইয়ের অনুবাদ পড়েছেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
না,ইংরেজিতে পড়েছি। আমি ইংরেজি বলার চেয়ে ভাল লিখতে পারি।

মাদেলিন গোবেইল --
একজন লেখকের জন্য কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কতটুকু প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন? ‘সরবোনে’ আপনি নিজে একজন ভীষণ মেধাবী ছাত্র ছিলেন আর সকলের প্রত্যাশা ছিল, শিক্ষক হিসেব দারুণ একটা পেশা হবে আপনার।

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমার শিক্ষা আমাকে দর্শন সম্পর্কে ভাসা-ভাসা ধারণা দিয়েছিল এবং এর প্রতি ধাঁরালো আগ্রহও তৈরী করেছিল। শিক্ষক হয়ে আমার অনেক সুবিধা হয়েছিল, যেমন, অনেকটা সময় পড়া, লেখা, আর জ্ঞান অর্জনে ব্যয় করতে পেরেছি। সেসব দিনে শিক্ষকদের কোনো বড় মাপের প্রোগ্রাম ছিলনা। আমার শিক্ষা আমাকে শক্ত ভিত দিয়েছিল কারণ রাজ্য পরীক্ষায় পাশ করতে হলে আপনাকে অবশ্যই সে সব বিষয়ে অনুসন্ধান করতে হবে যা আগে আপনি হয়ত পাত্তাই দেননি। আপনি শুধু সাধারণ সংস্কৃতি নিয়েই হয়ত ভাবছিলেন। তারা আমাকে এমন একটা নির্দিষ্ট একাডেমিক পদ্ধতিতে শিখিয়েছিল যা ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ এবং অন্য সব লেখালেখি, এবং পড়াশুনার জন্যও কাজে লেগেছিল। কিভাবে খুব দ্রুত বই পড়ে ফেলা যায়, যেমন, কোন কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেটি খুঁজে বের করা এবং শ্রেণীবিন্যাস করা,যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয় সেগুলোকে বাদ দিতে পারা,সংক্ষিপ্ত করতে এবং ঘাঁটতে পারা, ইত্যাদি।


মাদেলিন গোবেইল-- 
আপনি কি একজন ভাল শিক্ষক ছিলেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমার তা মনে হয়না,কারণ আমি শুধু মেধাবী ছাত্রদের প্রতি আগ্রহী ছিলাম আর বাকিদের প্রতি একদমই আগ্রহী ছিলাম না। অথচ একজন ভাল শিক্ষকের সবার প্রতিই সমান মনযোগী হওয়া উচিত। কিন্তু আপনি যদি দর্শন পড়ান আপনার কোন উপায় থাকবেনা। সবসময় চার বা পাঁচ জন ছাত্র থাকবে যারা সবসময় কথা বলবে,আর অন্যরা কিছু গ্রাহ্য করবে না। আমি তাদের নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাইনি।

মাদেলিন গোবেইল-- 
প্রকাশের দশ বছর আগে থেকেই আপনি লিখছিলেন। আপনার বয়স যখন পয়ত্রিশ তখন প্রথম আপনার লেখা প্রকাশিত হয়? আপনি হতাশ হননি?

সিমন দ্য বোভোয়া--
না,কারণ আমার সময়ে তরুন লেখকদের বই প্রকাশ হওয়াটাই অস্বাভাবিক ছিল। অবশ্যই দু-একটা ভিন্ন উদাহরণ ছিল,যেমন রেদিগ্যেট,যিনি ছিলেন একজন পরম বিস্ময়কর ব্যক্তি। যখন ‘নযিয়া’ এবং ‘দ্য ওয়াল’ বেরোল, ৩৫ বছরের আগে সার্ত্রে নিজেও নিজের কোন লেখা প্রকাশ করেননি। যখন আমার প্রথম প্রকাশ হবার মতো বই বাতিল হলো, আমি কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম। আর যখন ‘শি কেইম টু স্টে’-এর প্রথমখণ্ড বাতিল হয় সেটা ছিল ভীষণ কষ্টের। তখন আমার মনে হলো, আমার সময় নেয়া উচিত। আমি অনেক লেখককে চিনতাম যারা ধীরগতিতে শুরু করেছিলেন। আর লোকে সব সময় 'স্তেনঢ্যাল' এর কথা বলত,যিনি ৪০ বছর বয়স হবার আগে লেখা শুরু করেননি।

মাদেলিন গোবেইল-- 
উপন্যাস লেখার শুরুর দিকে আপনি কি কোন আমেরিকান লেখক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
‘শি কেইম টু স্টে’ লিখতে গিয়ে আমি অবশ্যই হেমিংওয়ে দ্বারা প্রভাবিত ছিলাম। তিনিই আমাদের শিখিয়েছিলেন সংলাপের সহজ সরল দিকগুলো এবং জীবনের ছোট ছোট বিষয়গুলোর গুরুত্ব কিভাবে তুলে ধরতে হয়।


মাদেলিন গোবেইল-- 
উপন্যাস লেখার সময় আপনি কি খুব সুক্ষ্ম পরিকল্পনা করে ছক আঁকেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি তা করিনি। দশ বছর ধরে একটি উপন্যাস লিখছিলাম এবং একইসঙ্গে আমার স্মৃতিকথা নিয়েও কাজ করছিলাম। উদাহরণ হিসেবে, যখন আমি ‘দা ম্যান্ডারিন্স’ লিখেছিলাম; তখন আমি চরিত্রগুলো এবং পরিবেশটাকে তৈরী করেছিলা্ম একটা আখ্যানকে ঘিরে, এবং একটু একটু করে সেই খসড়াটি একটা চেহারা পেয়েছিল। কিন্তু সাধারণত আমি প্লট নিয়ে কাজ করার অনেক আগেই উপন্যাস লিখতে শুরু করি।

মাদেলিন গোবেইল-- 
লোকে বলে,নিজের উপর আপনার ভীষণ আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নিয়মানুবর্তিতা আছে এবং এর ফলে আপনি কোনো একটি দিনও কাজ ছাড়া থাকেন না। আপনি কখন কাজ শুরু করেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি সবসময় কাজের তাড়ায় ছুটি, যদিও দিনের শুরুতেই সাধারণত কাজ করতে অপছন্দ করি। প্রথমে চা খাই,তারপর প্রায় ১০ টায় কাজ শুরু করি এবং ১ টা পর্যন্ত তা চালিয়ে যাই। তারপর বন্ধুবান্ধবের সাথে দেখা করি এবং বিকেল ৫ টায় আবার কাজে ফিরে যাই এবং ৯ টা পর্যন্ত কাজ করি। বিকেলে কাজ খুঁজে পেতে আমার কোন সমস্যা হয় না। আপনি চলে গেলে হয় আমি পত্রিকা পড়ব অথবা শপিং এ চলে যাব। বেশির ভাগ সময় কাজ করেই আমি আনন্দ পাই।


মাদেলিন গোবেইল 
সার্ত্রের সঙ্গে কখন দেখা হয়?

সিমন দ্য বোভোয়া
প্রতি সন্ধ্যাতেই, আর প্রায়ই দুপুরের খাবারের সময়ে। আমি সাধারণত সন্ধ্যায় তার বাড়িতে কাজ করি।


মাদেলিন গোবেইল-- 
এক এপার্টমেন্ট থেকে আরেক এপার্টমেন্টে যেতে বিরক্ত লাগে না?

সিমন দ্য বোভোয়া--
না। যেহেতু আমি পাণ্ডিত্যপূর্ণ বই লিখছি না,সব কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে যাই এবং তাতে খুব ভালই কাজ হয়।

মাদেলিন গোবেইল--
আপনি কি সঙ্গে সঙ্গে কাজে ডুবে যান?

সিমন দ্য বোভোয়া--
এটা নির্ভর করে আমি কি লিখছি তার ওপর। যদি কাজটা ভালভাবে এগিয়ে যায় তাহলে আমি পনের মিনিট বা আধাঘন্টা আগের দিন যা লিখেছিলাম তা পড়ি,আর কিছু টুকটাক ভুল সংশোধন করি। তারপর সেখান থেকেই আবার কাজ শুরু করি। কাজের সূত্র খুঁজে পেতে আগে যা লিখেছিলাম তা একবার পড়ে নিতেই হয়। 

মাদেলিন গোবেইল--
আপনার লেখক বন্ধুদেরও কি আপনার মতই অভ্যাস?

সিমন দ্য বোভোয়া--
না,এটা সম্পূর্ণ একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার। যেমন, গেনেত,একেবারে ভিন্নভাবে কাজ করেন। যখন তিনি কাজ করেন তখন ছয় মাস প্রতিদিন ১২ ঘন্টা করে কাজ করেন। আর কাজটি শেষ হবার পর বাকি ৬ মাস কিছু না করেই কাটিয়ে দিতে পারেন। যেমন বলেছি, ছুটির দু-তিন মাস ছাড়া আমি প্রতিদিনই কাজ করি। যখন আমি ভ্রমণ করি তখন সাধারণত কোন কাজই করিনা। আমি সারাবছর খুব অল্প পড়ি,আর যখন বেড়াতে যাই তখন হাতব্যাগ ভর্তি করে বই নিয়ে যাই,যা আমার আগে হয়ত পড়ার সময় হয়নি। কিন্তু যদি এই ভ্রমণটা এক মাস বা ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হয় তখন আমার অস্বস্তি হতে থাকে, বিশেষ করে যদি আমি দুই বই এর মধ্যে আটকে থাকি। কাজ না করলে আমি ক্লান্ত বোধ করি। 


মাদেলিন গোবেইল-- 
আপনার মূল পাণ্ডুলিপি কি সব সময় টানা হাতের লেখায় লেখেন? কে সেগুলোর পাঠোদ্ধার করে? নেলসন এলগ্রেন বলেন যে তিনি সেই অল্প ক’জনার মধ্যে একজন যিনি আপনার হাতের লেখা পড়তে পারেন।

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি জানি না কীভাবে টাইপ করতে হয়, কিন্তু আমার দুজন টাইপিস্ট আছেন যারা আমার লেখা পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করেন। আমি যখন আমার বই এর শেষ ভার্সনের ওপর কাজ করি, তখন আমি পান্ডুলিপি অনুকরণ করি। আমি খুব সতর্ক। অনেক শ্রম দেই। আমার লেখা মোটামুটি স্পষ্ট।

মাদেলিন গোবেইল-- 
'দ্যা ব্লাড অব আদার' এবং 'অল মেন আর মর্টাল'এ আপনি সমসাময়িক সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করেছেন। আপনি কি জয়েস বা ফকনার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
না,এটা এক ব্যক্তিগত চিন্তা ছিল। আমি সব সময় ক্ষণস্থায়ী সময় নিয়ে সচেতন ছিলাম। সব সময় ভেবেছি আমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে। এমনকি যখন আমার বয়স ১২ তখনও। আমি ভাবতাম ৩০ বছর হয়ে যাওয়া খুব বিব্রতকর। আমার মনে হতো, কিছু হারিয়ে গেছে। একই সঙ্গে আমি এ বিষয়েও সচেতন ছিলাম যে আমি কি অর্জন করতে পারতাম, আর জীবনের কিছুটা সময় আমাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছে। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে সময়ের চলে যাওয়াটাই আক্রান্ত করত আমাকে, একারণে যে মৃত্যু ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। আমার মতে, সময়ের সমস্যার সাথে মৃত্যুর যোগসূত্র রয়েছে,এই চিন্তা থেকে যে আমরা ক্ষয়ে যাওয়ার ভয় নিয়ে নিবিড়ভাবে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাচ্ছি ক্রমশ। এটা হলো, বরং সত্য যে সবকিছুরই ক্ষয় হয়,ভালোবাসা কমে যায়। সেটাও খুব ভয়ঙ্কর,যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমার এধরনের কোন ক্ষতি হয়নি কখনো। আমার জীবনে সবসময়ই দারুণ এক ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। আমি সব সময় প্যারিসে থেকেছি,কমবেশি একি পাড়ায়। সার্ত্রের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অনেক দিন বজায় ছিল। আমার অনেক পুরানো বন্ধু আছে যাদের সাথে আমার এখনও যোগাযোগ আছে। সুতরাং ব্যাপারটা এমন নয় যে আমি বোধ করছি ‘সময়’ সবকিছু ভেঙে দিচ্ছে, আবার এটাও সত্যি যে আমি সবসময় নিজেকে বহনও করেছি। এর মানে হচ্ছে যে, আমার পেছনে কত বছর চলে গেছে, কত বছর সামনে আছে। আমি তাদের মূল্যবান মনে করি। 

মাদেলিন গোবেইল--
আপনার স্মৃতিকথার দ্বিতীয়ভাগে সার্ত্রেকে নিয়ে আপনি একটা প্রাঞ্জল চিত্র এঁকেছেন যখন তিনি 'নযিয়া' লিখছিলেন। ক্রোধবশে আপনি তাঁকে একজন স্বঘোষিত দোষত্রুটিতে মোহাচ্ছন্ন মানুষ হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। একইসাথে আপনাদের সুখী দম্পতি বলেই মনে হয়েছে। তারপরও আপনার উপন্যাসগুলোতে আপনি 'মৃত্যুচিন্তা' বিষয়টি নিয়ে আবিষ্ট হয়ে ছিলেন যা সার্ত্রের লেখায় আমরা কখনও পাইনি।

সিমন দ্য বোভোয়া--
কিন্তু মনে করে দেখুন, সার্ত্রে তার ‘দ্যা ওয়ার্ডস’ এ কি বলেছেন। তিনি কখনও মৃত্যুর প্রতি অপরিমেয় অনিশ্চয়তা বোধ করেন না, অথচ তার শিক্ষার্থীরা, যেমন ‘নিজান’,‘আদেন’ ‘আরেবি’; এরা সবাই মৃত্যু চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিল। একরকমভাবে সার্ত্রে মনে করতেন তিনি অমর হবেন। সাহিত্যকর্মের উপর জীবন বাজি রেখেছিলেন তিনি, এই আশায় যে তাঁর কাজ বেঁচে থাকবে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত জীবন হারিয়ে যাবে এই সত্যটা জেনেও, আমার কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না। আমি সব সময় জানতাম যে জীবনের সাধারণ বিষয়গুলি হারিয়ে যাবেই, দৈনন্দিন কাজ, তার ভূমিকা, অতীত অভিজ্ঞতা। সার্ত্রে ভেবেছিলেন জীবন শব্দের ফাঁদে ধরা পড়বে,আর আমি ভেবেছি শব্দরা জীবন নয়,কিন্তু জীবনের একটি প্রজনন, যা মৃত,এটাই বলা যায়।

মাদেলিন গোবেইল --
এটাই সম্পূর্ণ নির্ভুল যুক্তি। কেউ কেউ দাবী করে যে উপন্যাসে জীবন বদলানোর ক্ষমতা আপনার নেই। তারা কটাক্ষ করে বলে যে, আপনার উপন্যাসের চরিত্রগুলি চারপাশের লোকেদেরই নকল করে লেখা।

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি জানি না। কল্পনা কি? দীর্ঘমেয়াদে,এটি একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় সাধারনত্ব অর্জনের বিষয়,সত্যের সত্য, মানুষ আসলে কীভাবে বাঁচে সেই সত্য । যে কাজগুলি বাস্তবসম্মত নয় সেগুলো আমাকে টানে না, যদি না সেগুলো পুরাদস্তুর উড়নচণ্ডে হয়; উদাহরণস্বরূপ,আলেক্সানডার দ্যুমা বা ভিক্টর হূগোর উপন্যাস যা একরকমের মহাকাব্য। কিন্তু আমি বানানো গল্পকে কাল্পনিক বলব না বরং কৃত্রিম কাজ বলব। যদি আমি নিজের স্বপক্ষে বলতে যাই, আমি তলস্তয় এর ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এর কথা বলব,যার প্রতিটি চরিত্রই বাস্তবজীবন থেকে নেয়া।

মাদেলিন গোবেইল--
আপনার লেখার চরিত্রগুলির দিকে ফেরা যাক। আপনি কীভাবে তাদের নাম বাছাই করেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি এটাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করিনা। ‘শি কেইম টু স্টে’ তে জেভিয়ার নামটা বেছে নিয়েছিলাম কারণ ঐ নামের শুধু একজনের সাথেই আমার দেখা হয়েছিল। আমি যখন নাম খুঁজি তখন টেলিফোন ডিরেকটরি ব্যবহার করি অথবা আগে পরিচয় হওয়া কারো নাম স্মরণ করার চেষ্টা করি।

মাদেলিন গোবেইল-- 
আপনি কোন চরিত্রগুলির সাথে অনেক বেশি সংযুক্ত?

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি জানি না। আমার মনে হয়, সম্পর্কের চেয়ে চরিত্রের প্রতি আমার কম আগ্রহ থাকে,তা সে সম্পর্কটা ভালোবাসারই হোক বা বন্ধুত্বেরই হোক। সমালোচক ক্লডি রয় এই বিষয়টি খুঁজে পেয়েছেন।

মাদেলিন গোবেইল-- 
আপনার প্রত্যেকটি উপন্যাসে আমরা একটা নারী চরিত্র পাই যে মিথ্যা ধারণা দিয়ে বিভ্রান্ত এবং আর পাগলামিতে আচ্ছন্ন। 

সিমন দ্য বোভোয়া--
অনেক আধুনিক নারীই এরকম। তাদের এমন ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করা হয় যা তারা নয়,উদাহরণস্বরূপ,নামকরা বেশ্যা হতে গেলে নকল ব্যক্তিত্বে পরিচিত হতে হয়। তারা একেবারে মানসিক বিকারের কাছাকাছি চলে যায়। আমি সেসব মেয়েদের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল। সুন্দর, ভারসাম্য বজায় রাখা গৃহিণী বা মায়েদের চেয়ে ওদের প্রতি আমার আগ্রহ বেশী। আরো নারী আছেন যাদের প্রতি আমার আগ্রহ আরো বেশী, তারা হলো, সৎ ও আত্মনির্ভরশীল নারী, যারা কাজ করে এবং সৃষ্টি করে।


মাদেলিন গোবেইল-- 
আপনার কোনো নারী চরিত্রই ভালোবাসা থেকে মুক্ত নয়। আপনি প্রেমের উপাদান পছন্দ করেন।

সিমন দ্য বোভোয়া--
প্রেম একটি দারুণ সুযোগ। সত্যিকারের ভালোবাসা খুবই দুর্লভ,নারী পুরুষেরা যারা এই অভিজ্ঞতাটি পায়, এটি তাদের জীবনকে ঋদ্ধ করে।

মাদেলিন গোবেইল--
আপনার উপন্যাসে মনে হয় নারীর, যেমন 'শি কেইম টু এর 'ফ্রান্সেইস', 'দ্য মান্দারিন' এর 'এনি'- যারা 
‌চরিত্রের দিক থেকে ভীষণ পরিপক্ক।

সিমন দ্য বোভোয়া--
এর কারণ হলো, সবকিছু সত্ত্বেও, নারীরা ভালবাসায় নিজের টুকু বেশি দেয়, কারণ তাদের অধিকাংশই শোষণ করতে পারে না। তারা সম্ভবত গভীর সহানুভূতি প্রকাশে আরও বেশি সক্ষম, যা ভালোবাসার মূল ভিত্তি। হয়ত এটাও হতে পারে যে আমি নারী বলেই পুরুষের চাইতে অনেক বেশী সহজেই নিজেকে উপস্থাপন করতে পারি। আমার নারী চরিত্রগুলি পুরুষ চরিত্র থেকেও বেশি সমৃদ্ধ।

মাদেলিন গোবেইল-- 
আপনি কখনও একজন আত্মনির্ভরশীল এবং সত্যিকার অর্থেই পুরোপুরি মুক্ত নারী চরিত্র তৈরী করেননি, যা, যে কোন ভাবেই হোক, ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এর তত্ত্বটির ব্যাখ্যা দেয়। কেন? 

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি নারীদের সেভাবেই দেখিয়েছি তারা যেমন,বিভক্ত মানুষ হিসেবে; সেভাবে নয়, যেভাবে হওয়া উচিত ছিল।

মাদেলিন গোবেইল-- 
আপনার দীর্ঘ উপন্যাস ‘দ্য মান্দারিন’ এর পরে আপনি গল্প লেখা বন্ধ করে দেন আর স্মৃতিকথার ওপর কাজ শুরু করেন। এই দুই ধরনের সাহিত্যের মধ্যে কোনটি কে আপনি অগ্রাধিকার দেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি দুটোই পছন্দ করি। সেগুলো বিভিন্ন ধরনের সন্তুষ্টি ও হতাশা সবই দেয়। ‘স্মৃতিকথা' লিখতে গিয়ে বাস্তবতাকে অনুসরণ করে লেখার ব্যাপারে আমি একমত ছিলাম। অন্য দিকে যখন কেউ দৈনন্দিন জীবনে্র বাস্তবতাগুলো অনুসরণ করে যেমন আমিও করেছি; তারপরও কিছু গভীরতার ব্যাপার থাকে, কিছু বিশেষ ধরনের পৌরানিক কাহিনী থাকে, যা অন্যরা উপেক্ষা করে। যাই হোক,উপন্যাসে,মানুষ এই দিগন্তগুলো প্রকাশ করতে পারে, যেমন দৈনন্দিন জীবনের বাড়তি রঙ; কিন্তু সেখানে কিছু বানানো উপাদান আছে যেটি ভীষন অস্বস্তিকর। মিথ্যাটুকু বাদ দিয়ে মানুষের উদ্ভাবনের প্রতি মনযোগী হওয়া উচিত। আমি অনেকদিন ধরেই আমার শৈশব আর যৌবন নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম,আমি তাদের সঙ্গে খুব গভীর একটা সম্পর্কও লালন করেছি, কিন্তু আমার কোন বইয়েই এর কোন ছিটেফোঁটা নেই। এমনকি আমার প্রথম উপন্যাস লেখার আগেই এই ‘হৃদয় থেকে হৃদয়ের কথোপকথন’ নিয়ে লেখার ইচ্ছা ছিল। এটা খুব আবেগি ইচ্ছা, খুব ব্যক্তিগত চাওয়া। ‘মেমোরিজ অব আ ডিউটিফুল ডটার’ এর পরে আমি অসন্তুষ্ট ছিলাম এবং অন্যকিছু করার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু পারিনি। আমি নিজেকে বলেছিলাম,‘আমি মুক্ত হবার জন্য যুদ্ধ করেছি। এই স্বাধীনতা দিয়ে আমি কি করলাম? এটা থেকে কী লাভ হলো?’ পরিণামটা শেষপর্যন্ত লিখেছিলাম, যা আমাকে ২১ বছর থেকে বর্তমান পর্যন্ত নিয়ে এসেছে, ‘দ্য প্রাইম অব লাইফ’ থেকে ‘ফোর্স অব সারকামস্টানসেস’ এ ।


মাদেলিন গোবেইল-- 
কয়েক বছর আগে ফর্মেন্টর এর লেখক সভায় কার্লো লেভি ‘দ্য প্রাইম অব লাইফ’ কে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রেমকাহিনী বলে উল্লেখ করেছেন। সার্ত্রে প্রথমবারের মতো একজন সাধারণ মানুষের মতন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আপনি সার্ত্রেকে এমনভাবে সকলের সামনে উপস্থাপন করেছেন, যে মানুষটাকে কেউ কখনো সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি,এমন একজন মানুষ যিনি ‘অদ্ভুত কাল্পনিক সার্ত্রে’ থেকে আলাদা।

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি এটা সচেতনভাবেই করেছি। তিনি চাননি যে আমি তাকে নিয়ে লিখি। কিন্তু শেষপর্যন্ত, তিনি যখন দেখলেন আমি যেভাবে কথা বলি সেভাবেই উনার সম্পর্কে বলছি, তখন তিনি আমাকে স্বাধীনভাবে বলতে দিলেন।

মাদেলিন গোবেইল-- 
আপনার মতে,ব্যাপারটা এমন কেন যে ২০ বছর ধরে এত খ্যাতির পরও লেখক সার্ত্রেকে এখনও ভুল বোঝা হয় এবং হিংস্রভাবে সমালোচক দ্বারা আক্রান্ত হতে হয় ?

সিমন দ্য বোভোয়া--
রাজনৈতিক কারণে। সার্ত্রে সেই মানুষ যিনি সেই শ্রেণীর খুব কড়া বিরোধিতা করেছেন যে শ্রেণীতে তার জন্ম, এবং যে কারণে তাকে বিশ্বাসঘাতক বলা হয়। কিন্তু এটা সেই শ্রেণী যাদের কাছে টাকা আছে এবং যারা বই কেনে। সার্ত্রের অবস্থা প্রচলিত মতবিরোধী। তিনি একজন বুর্জোয়াবিরোধী লেখক অথচ বুর্জোয়ারাই তার বই পড়ে, আর এটিকে তাদেরই একটি পণ্য হিসেবে প্রশংসা করে। বুর্জোয়াশ্রেণীর মধ্যে একচেটিয়া সাংস্কৃতিক আধিপত্য রয়েছে এবং তারা মনে করে যে সার্ত্রের জন্ম তারাই দিয়েছে। একইসঙ্গে তারা সার্ত্রেকে ঘৃণাও করে কারণ তিনি তাদের আক্রমণ করে লেখেন। 


মাদেলিন গোবেইল--
প্যারিস রিভিউয়ে হেমিংওয়ের সঙ্গে একটা সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন,‘আপনারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেন যে,একজন রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক লেখকের লেখা তখনই স্থায়িত্ব পাবে যখন আপনি পড়ার সময় রাজনৈতিক বিষয়গুলি বাদ দিয়ে পড়বেন। অবশ্যই, আপনি এবিষয়ে একমত হবেন না। কিন্তু আপনি কি তাহলে এখনও কোন মতাদর্শের প্রতি অঙ্গীকারে বিশ্বাস করেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
হেমিংওয়ে সেই ধরনের বিশেষ লেখক, যিনি কখনোই নিজের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে চাননি। আমি জানি তিনি স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু একজন সাংবাদিক হিসেবে। হেমিংওয়ে কখনোই গভীরভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি ভাবতেন, সাহিত্যে যা কিছু শাশ্ব্‌ত তা সময়ে বাঁধা নেই এবং সেগুলো অঙ্গীকারবদ্ধ হতে পারেনা। আমি একমত নই। বেশির ভাগ লেখকের ক্ষেত্রেই এটা তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ, যা আমি পছন্দ বা অপছন্দও করতে পারি। আগেকার দিনে এত বেশি লেখক ছিলনা যাদের কাজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধতা ছিল। এবং একজন পাঠক রুশোর ‘সোশাল কনট্রাকট’ যতটা আগ্রহ নিয়ে পড়েন ঠিক ততটা আগ্রহ নিয়েই ‘কনফেশনস’ পড়েন, কিন্তু কেউ আর ‘দ্য নিউ হেলইস’ পড়েন না। 


মাদেলিন গোবেইল-- 
যুদ্ধশেষের সময়কাল থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত সময়কে অস্তিত্ববাদের পূর্ণ বিকাশের সময়কাল বলে মনে করা হয়। বর্তমানে ‘নিউ নভেল’ একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে; এই যেমন, ‘দারিঘ্যু দ্যা রোশেল এবং রজার নেইমার’ এর মতন লেখকরা আছেন। 

সিমন দ্য বোভোয়া--
ফ্রান্সে অবশ্যই ডানপন্থার দিকে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি ঘটছে। ‘নিউ নভেল’ নিজেই ঠিক প্রতিক্রিয়াশীল নয়, যেমন নন এর লেখকেরা। সহানুভুতিশীল কেউ হয়ত বলতে পারেন যে তারা কিছু বুর্জোয়া রীতিনীতি থেকে দূরে থাকতে চান। এসব লেখকরা ঝামেলাজনক নন। শেষ পর্যন্ত, গ্যলিজম আমাদের কে ফিরিয়ে এনেছেন পেতাইঁজমের কাছে; এবং এরকম ক্ষেত্রে এটাই আশা করা যায় যে, ল্যা রোশেল এর মতন দালাল আর নেইমারের মতন চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীলদের খুব উচ্চমানের করে দেখা হবে। ‘বুর্জোয়াশ্রেণী’ আবার নিজের আসল চেহারায় ফিরে এসেছে, আর তা হলো ‘প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীর’ প্রতিনিধিত্ব করা। সাত্রে’র ‘দ্যা ওয়ার্ডস’ এর সাফল্যটা দেখুন। বেশ কিছু জিনিস আছে লক্ষ্য করার মতন। আমি বলছিনা যে এটাই তার সর্বশ্রেষ্ঠ বই, কিন্তু এটা সম্ভবত তাঁর শ্রেষ্ঠ বই গুলোর অন্যতম একটি। যে কোন মানদণ্ডে এটি একটি অসাধারণ বই; শিল্পমানের এক দারুণ প্রকাশ এবং আশ্চর্যজনক সুন্দরভাবে লেখা। একই সাথে বইটি এমন দারুণ সাফল্য পেয়েছে একারণে যে এটি কোন বিশেষ কিছুর জন্য 'অঙ্গীকারাবদ্ধ’ ছিলনা। সমালোচকেরা যখন বলেন যে, ‘নযিয়া’ লেখাটার সাথে এটাও তাঁর একটি শ্রেষ্ঠ লেখা, তখন মনে রাখতে হবে যে ‘নযিয়া’ তাঁর প্রথম দিককার লেখা, যেটাও কোন কিছুর জন্য 'অঙ্গীকারাবদ্ধ’ কোন লেখা ছিলনা; যা’ ডান ও বামপন্থী উভ্য়পক্ষের কাছে খুব দ্রুত সমাদৃত হয়েছে, যা তাঁর নাটকগুলোর ক্ষেত্রে ঘটেনি। একই ঘটনা আমার ‘দ্যা মেময়ারস অব অ্যা ডিউটিফুল ডটার’ এর ক্ষেত্রে ঘটেছে। বুর্জোয়া নারীরা তাদের নিজস্ব তারুণ্যকে লেখার মধ্য দিয়ে দেখতে পেয়ে আপ্লুত হয়েছিল। প্রতিবাদ শুরু হয় আমার লেখা ‘দ্যা প্রাইম অব লাইফ’ আর ‘ফোর্স অব সারকামসট্যান্সেস’ লেখা থেকে। এই তফাৎটা খুব স্পষ্ট এবং তীক্ষ্ণ। 

মাদেলিন গোবেইল--
‘ফোর্স অব সারকামসট্যান্সেস’ এর শেষাংশটা আলজেরীয় যুদ্ধের প্রতি নিবেদিত, যেক্ষেত্রে মনে হয় যে আপনি খুব ব্যক্তিগত করে প্রতিক্রিয়াগুলো দেখিয়েছেন। 

সিমন দ্য বোভোয়ার--
আমি রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা ও অনুভব করেছি, কিন্তু নিজে কখনো কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলাম না। ‘ফোর্স অব সারকামসট্যান্সেস’ এর পুরো শেষ অংশটা যুদ্ধকে ঘিরে। এটা ফ্রান্সে অরাজক মনে হতে পারে, যেহেতু এই যুদ্ধের সাথে ফ্রান্সের আর কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।


মাদেলিন গোবেইল--
আপনার কি এমন উপলব্ধি হয়নি যে মানুষ এটা ভুলে যেতে বাধ্য ছিল?

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি সেই অধ্যায় থেকে অনেক গুলো পাতা মুছে দিয়েছিলাম। আমি বুঝেছিলাম যে এটা একটা অরাজক ব্যাপার হবে। অন্যদিকে, আমি আসলেই এটা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম, এবং আশ্চর্য বোধ করেছি এটা দেখে যে মানুষ বিষয়টিকে এই পরিমাণে ভুলে গেছে। আপনি কি তরুণ পরিচালক রবার্ট এনরিকোর পরিচালিত ‘ল্যা বেল ভিয়ে’ ছবিটি দেখেছেন? মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গেছে, কারণ ছবিটাতে আলজেরিয়ান যুদ্ধ দেখানো হয়েছে। ‘ল্যা ফিগারো লিতেরাঘাইঘ’ এ ক্লদ মরিয়াক লিখলেন, ‘কেন আমরা প্যারাস্যুট সৈন্যদের গণ স্কয়ারে দেখি? এটা জীবনের সত্য নয়।’ কিন্তু আসলেতো এটি জীবনের সত্য ছিল। সেইন্ট জারমেইন দে প্রে তে সাত্রে’র জানালা দিয়ে প্রতিদিন এসবই দেখতাম। মানুষ ভুলে গেছে। তারা ভুলে যেতে চেয়েছে। তারা তাদের স্মৃতি ভুলে যেতে চেয়েছে। আর এই কারণেই, আলজেরিয়ান যুদ্ধ নিয়ে বলা কথার জন্য আক্রান্ত হব বলে যে ভেবেছিলাম, তা না ঘটে বিপরীতটা ঘটেছে; 'বার্ধক্য' আর 'মৃত্যু' নিয়ে কথা বলার জন্য বরং বেশি আক্রান্ত হয়েছি। আলজেরিয়ান যুদ্ধ প্রসঙ্গে সকল ফরাসীরা এখন এভাবে বিশ্বাস করে, যেন এটা কখনো ঘটেনি; যেন কেউ অত্যাচারিত হয়নি; যদি হয়েও থাকে তারা সবসময় নির্যাতনের বিরুদ্ধেই ছিল। 

মাদেলিন গোবেইল--
‘ফোর্স অব সারকামসট্যান্সেস’এর শেষে আপনি বলেছেন, 'সন্দেহ প্রবণতা নিয়ে যখন আমি 'সহজ বিশ্বাসী' কিশোরদের দিকে ফিরে তাকাই, তখন এতখানি প্রতারিত হয়েছি দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাই'। এই মন্তব্যটা সব ভুল বুঝাবুঝির কারণ ঘটিয়েছে বলে মনে হয়। 

সিমন দ্য বোভোয়া--
মানুষ, বিশেষ করে আমার শত্রুরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে যে 'আমার একটা ব্যর্থ জীবন', হয়তোবা একারণে যে, রাজনৈতিক চিন্তার স্তরে আমার ভুল ছিল, সেটা আমি স্বীকার করেছিলাম; অথবা এ কারণে যে সবকিছুর পরও একজন নারীর সন্তান থাকা উচিত এমন কথা আমি বলেছিলাম, ইত্যাদি। যে কেউ, যে আমার বই খেয়াল করে পড়ে, সে সহজেই বুঝতে পারবে যে, আমি ঠিক বিপরীতটাই বলেছি; কারো সাথে আমার কোন ঈর্ষা নেই, আমি আমার জীবন যেমন তা নিয়ে সম্পূর্ণভাবে সন্তুষ্ট; আমি যা করতে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তার সব পূরণ করেছি, এবং ফলশ্রুতিতে, যদি আমাকে এই জীবন আবার যাপন করতে দেয়া হত, তাহলে আমি ভিন্ন আর কোন ভাবে তা’ যাপন করতাম না। সন্তান নেই বলে আমার কখনও কোন অনুতাপ হয়নি; আমি যতটুকু যা চেয়েছি, তা হলো লেখালেখি করা। 

তাহলে 'প্রতারিত বোধ' কেন? যখন একজন মানুষ পৃথিবী সম্পর্কে অস্তিতবাদী মতবাদ পোষণ করে, যেমন আমি; তার কাছে মানুষের জীবনের পরষ্পর বিরোধিতাটা হল, একজন কিছু হতে চেষ্টা করছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিছক অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে আছে। একারণে এই অসঙ্গতি যে, আপনি সফল হবেন না জেনেও যখন একটা কিছু করার পরিকল্পনা করেন যা আপনি হামেশাই করেন; কিন্তু যখন আপনি পেছনে ঘুরে জীবনকে দেখেন, তখন দেখতে পান যে কেবলি আপনি অস্তিত্বটি নিয়েই বেঁচে আছেন। অন্যভাবে বলা যায়, আপনার জীবনে শক্ত কঠিন চিরস্থায়িত্ব বলে কিছু নেই যা ঈশ্বরের আছে ( যেমন 'ঈশ্বর' একটি অসম্ভব ধারণা বলে মনে করা হয়)। আপনার জীবন কেবলই 'একটি মানুষের জীবন'। 

কেউ বলতে পারেন, যেমন এলান বলেছেন, এবং তাঁর এই কথাটি আমার খুব প্রিয় যে, 'আমাদের কাছে কিছুই প্রতিশ্রুত নয়'। এক অর্থে এটা সত্যি, আরেক অর্থে নয়। কারণ, যে ছেলে বা মেয়েটি বুর্জোয়া সংস্কৃতি পেয়েছে, তার জন্য জীবনের অনেককিছুই নিশ্চিত। যে ছোটবেলায় একটা কঠিন জীবন পার করেছে, আমি মনে করি পরবর্তীতে সে বলবে না যে সে 'প্রতারিত' হয়েছে। কিন্তু যখন আমি বলেছি, যে আমি প্রতারিত হয়েছি, আমি সেই সতের বছরের মেয়েটার কথাই বলেছি, যে 'হেজেল ঝোপঝাড়ে'র কাছে বসে দিবাস্বপ্ন দেখছিল আর ভাবছিল তারপর সে কি করবে। আমি যা করতে চেয়েছি, তার সবই আমি করেছি, বই লিখেছি, নানান বিষয়ে শিখেছি; কিন্তু আমি একই রকমভাবে প্রতারিতই রয়ে গেছি কারণ এর বেশি আর কিছু করতে পারিনি। 

ম্যালাহরমেযে'র একটা উক্তি আছে যে 'দুঃখের সুগন্ধটি হ্রদয়ে থেকে যায়', আমি ভুলে গেছি এটা ঠিক কীভাবে থেকে যায়। আমার যা চাওয়া ছিল তা আমি পেয়েছি, এবং আমার সব বলা এবং করা হয়ে গেছে। অন্যরা কি চেয়েছে সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। একজন নারী মনোবিশ্লেষক একটি বুদ্ধিদীপ্ত চিঠিতে আমাকে লিখেছিলেন যে, 'বিশ্লেষণ শেষে এটাই বলা যায়, আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো, আকাঙ্ক্ষার নিজের মূল উদ্দেশ্যকে ছাড়িয়ে যায়'। সত্যি বলতে কি, যা আমি আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম তার সব আমি পেয়েছি; কিন্তু আকাঙ্ক্ষার ভেতরে সুপ্ত যে ‘বহুদূর ছাড়িয়ে যাবার ইচ্ছা’, সেটা অর্জিত হয়নি। কিন্তু সাধারণ অর্থে আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে। সকল সংস্কৃতিবোদ্ধা ও বুর্জোয়া আশাবাদীরা যেমন করে কাউকে কিছু পেতে উৎসাহিত করে, তরুণ বয়সে আমারও জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি ও চাওয়াগুলো তেমনই ছিল। কিন্তু আমার পাঠকেরা একইভাবে তাদেরকে উৎসাহিত না করার জন্য আমাকে অভিযুক্ত করে। সেটাই আমি বুঝিয়েছি; এবং আমি যা বলেছি এবং লিখেছি সেজন্য কোন অনুতাপ করিনি। 


মাদেলিন গোবেইল--
কিছু মানুষের ধারণা অন্তর্নিহিত ভাবে আপনার লেখায় একজন ঈশ্বরকে খোঁজার ব্যাপার আছে। 

সিমন দ্য বোভোয়া--
না। সার্ত্রে এবং আমি সবসময় বলেছি যে, একটা আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে তার মানে এই নয়যে আকাঙ্ক্ষাটিকে কোন বাস্তবতাকে অনুসরণ করতে হবে। দার্শনিক স্তর থেকে কান্ট ঠিক এটাই বলেছেন। কেউ একজন নানারকম হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে বলে বিশ্বাস করে তার মানে এই নয় যে এর পেছনে বড় কোন সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। মানুষের কোন কিছু হবার আকাঙ্ক্ষা আছে তার অর্থ এই না যে সে সেটাই হতে পারবে অথবা 'এই হতে চাওয়াটা' কেবলই একটা সম্ভাব্যতা। যে কোন মূল্যেই, 'এই হতে চাওয়াটা' একটি আকাঙ্খার প্রতিফলন এবং একই সময়ে একটি অস্তিত্বের বিদ্যমানতা। অস্তিত্বের বিদ্যমানতা এবং কিছু হতে চাইবার আকাঙ্ক্ষা এ দুয়ের মধ্যে সমন্বয় অসম্ভব। সার্ত্রে এবং আমি সবসময় এটা প্রত্যাখ্যান করেছি এবং যেটি ছিল আমাদের চিন্তার অনর্গত বিষয়। মানুষের মধ্যে একটি শূন্যতাবোধ আছে, এমনকি তার সকল অর্জনেও সেই শূন্যতাবোধ থাকে। এই হলো মোদ্দা কথা। আমি বলতে চাচ্ছি না যে আমি যা অর্জন করতে চেয়েছিলাম তা অর্জন করতে পারিনি; বরং যে অর্জনগুলো আমি করেছি সেগুলো মানুষের কাছে হয়ত কোনো 'অর্জন' নয়। উপরন্তু, একটি সরল অথবা উন্নাসিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে; কারণ মানুষ কল্পনা করে যে কেউ যদি সামাজিক পর্যায়ে সফল হন তাহলে অবশ্যই তাকে সাধারণ মানুষের মানদন্ডে নিঁখুত সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। কিন্তু সেটি ঠিক নয়।

"আমি প্রতারিত" এই কথাটির আসলে অন্য অনেক অর্থ আছে। উদাহরণস্বরূপ, জীবন আমাকে 'এই পৃথিবী যেমন' তেমনটি আবিষ্কার করতে শিখিয়েছে। বেশীর ভাগ মানুষের জন্যই এটি দূর্ভোগ, নিপীড়ন এবং অপুষ্টিতে ভরা; যখন আমি তরুন ছিলাম তখন কল্পনা করতাম যে, পৃথিবী আবিষ্কার করার অর্থই হল সুন্দর কিছু খুঁজে পাওয়া। কিন্তু তখন আমার এসব বিষয়গুলো জানা ছিলনা। সেই অর্থেও, আমি বুর্জোয়া আদর্শ দিয়ে প্রতারিত ছিলাম, এবং সেকারণেই আমি অন্যদের প্রতারিত হওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে চাইনি। 'কেন আমি বলি আমি প্রতারিত' সংক্ষেপে, এই জন্য যে, যেন এভাবে আর কেউ প্রতারিত না হয়। এটা একটি সামাজিক সমস্যাও বটে। অল্প অল্প করে আমি এই অসুখী পৃথিবীটাকে আবিষ্কার করেছি, তারপর আরো বেশী বেশী। সর্বোপরি আলজেরীয় যুদ্ধের সূত্রে এবং ভ্রমণ করার সময়ে এটা আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম।

মাদেলিন গোবেইল--
কিছু সমালোচক এবং পাঠক অনুভব করেছেন যে বার্ধক্য বিষয়টি নিয়ে আপনি অপ্রীতিকরভাবে বলেছেন।

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি যা বলেছি তা অনেকেই পছন্দ করেনি; কারণ তারা বিশ্বাস করতে চেয়েছিল যে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ই খুব সুখকর; যেমন শিশুরা নির্দোষ, সকল নববিবাহিতরা সুখী এবং সকল বৃদ্ধেরা নির্মল। আমি সারাজীবন এসব ধারণার বিরোধিতা করেছি। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, যে মুহুর্তে কেউ ঠিক বার্ধক্যে নয় কিন্তু প্রাক-বার্ধক্যে ঢোকে, তখন যদি তার সবও থাকে, যেমন ভালোবাসা থাকে, সকল কাজ শেষ হয়ে থাকে -তারপরও তার অস্তিত্বে এটি একটি বড় পরিবর্তন। যে পরিবর্তনটি অনেক কিছু হারাবার ফলেই ঘটে। কেউ যদি তাদের হারানোর জন্য দুঃখিত বোধ না করে তার মানে সে যা হারিয়েছে সে সেগুলোকে ভালোবাসেনি। আমি মনে করি যে যারা বার্ধক্য বা মৃত্যু কে খুব সহজেই মহিমান্বিত করে তারা আসলে জীবনকে ভালোবাসে না। অবশ্যই, বর্তমানের ফ্রান্সে আপনাকে বলতেই হবে যে, মৃত্যু সহ জীবনের সবকিছুই সুন্দর, মনোরম। 

মাদেলিন গোবেইল--
মানুষের প্রতারিত অবস্থাটি গভীরভাবে বেকেট অনুভব করতে পেরেছিলেন। উনি কি আপনাকে অন্যান্য নিউ নভেলিস্ট’ দের চাইতে বেশী আকর্ষণ করেছেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
অবশ্যই। 'সময়' কে কেন্দ্র করে যে কাজগুলো একজন 'নিউ নভেলে' খুঁজে পেতে পারে তার সবকিছুই ফকনারের কাজে পাওয়া সম্ভব। ফকনারই সেই ব্যক্তি যিনি তাঁদেরকে একাজটি করতে শিখিয়েছিলেন এবং আমার মতে তিনি এমন একজন যিনি এই কাজটি সবচেয়ে ভালভাবে করেন। বেকেট যেভাবে জীবনের অন্ধকার দিকগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন সেটি খুবই চমৎকার। যাইহোক, তিনি বিশ্বাস করেন যে জীবন অন্ধকার এবং শুধুমাত্র তাই। এবং আমিও বিশ্বাস করি যে জীবন অন্ধকারময়, এবং একইসংগে আমি জীবনকে ভালোবাসি। কিন্তু তাঁর সেই দৃঢ় বিশ্বাসই তার সবকিছুকে নষ্ট করে দিয়েছে বলে আমার মনে হয়। যখন এছাড়া আর কিছু বলার থাকেনা, তখন একথাটি পঞ্চাশ রকম করে বলার কিছু নেই। আমি মনে করি যে তার বেশীর ভাগ কাজই তার শুরুর দিকের লেখার পুনরাবৃত্তি। 'ওয়েটিং ফর গডো'তে 'এন্ডগেইমে'র পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, তবে দুর্বলভাবে। 


মাদেলিন গোবেইল--
সমসাময়িক আর কোন ফরাসী লেখক কি আপনাকে আকৃষ্ট করে?

সিমন দ্য বোভোয়া--
খুব বেশী না। আমি অনেক পান্ডুলিপি পাই; বিরক্তিকর বিষয় হল সেগুলোর বেশীভাগই যাচ্ছে তাই। বর্তমান সময়ে, 'ভিওলেত লেডজিউক'কে নিয়ে আমি খুবই উৎসাহী। ১৯৪৬ সালে 'ক্যামু' সম্পাদিত 'কালেকশন এস্পোয়াখ' এ তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশিত হয়। সমালোচকেরা তাঁর আকাশচুম্বী প্রশংসা করেছিলেন। সার্ত্রে, জ্যেনে, এবং জুয়ান্দুঁ তার লেখা খুব পছন্দ করেছিলেন। তার লেখা বেশী বিক্রি হয়নি। সম্প্রতি 'দ্যা বাস্টার্ড শিরোনামে তার একটি মহৎ আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে। যার ভূমিকাটি আগে প্রকাশিত হয়েছিল 'ল্যে তেম্প মদ্যেঘন'তে যে্টির প্রধান সম্পাদক ছিলেন 'সার্ত্রে'। আমি বইটিতে মুখবন্ধটি লিখেছিলাম কারণ আমি মনে করেছিলাম সে যুদ্ধ পরবর্তী ফরাসী লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে কম প্রশংসিতদের ভিতরে তিনি ছিলেন একজন। বর্তমান সময়ে ফ্রান্সে তিনি অনেক সাফল্য পাচ্ছেন। 

মাদেলিন গোবেইল--
এবং, সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে নিজেকে আপনি কোন স্থানে দেখেন?

সিমন দ্য বোভোয়া--
আমি জানিনা। কি দিয়ে একজনকে মূল্যায়ন করা হয়? কোলাহল, নিরবতা, ভবিষ্যত প্রজন্ম, পাঠকসংখ্যা, পাঠকস্বল্পতা, একটি নির্দিষ্ট সময়ে এটির গুরুত্ব? আমি মনে করি মানুষ কিছুকাল আমার লেখা পড়বে। অন্তত আমার পাঠকেরা আমাকে তাই বলে। নারীর সমস্যা নিয়ে আলোচনায় আমি কিছুটা অবদান রাখতে পেরেছি। পাঠকদের পাঠানো চিঠিপত্র থেকে সেটা আমি জানি। আমার কাজের সাহিত্য মানের বিষয়ে, কঠিন ভাষায় বলতে গেলে আমার নূন্যতম কোন ধারণা নেই।




অনুবাদক পরিচিতি

মৌসুমী কাদের
অনুবাদক। গল্পকার। সঙ্গীত শিল্পী
টরেন্টো, কানাডা।




উম্মে হাবিবা সুমী
ব্যারিস্টার। অনুবাদক।
টরেন্টো, কানাডা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন