অনুবাদঃ ফজল হাসান

রহস্যপূর্ণ অতিথিসেবকের নিমন্ত্রণে আমরা জাঁকাল মেঝেতে উপস্থিত হয়েছিলাম । খোলা জায়গায় ভোজের সামগ্রী সাজিয়ে রাখা হয়েছিল । সেখানে আমাদের মধ্যে অনেকেই উপস্থিত ছিল । অনেকে আসনে বসেছিল এবং বাদবাকিরা আসনের পেছনে দাঁড়িয়েছিল । আমরা সংখ্যায় ছিলাম অনেক । তাই প্রত্যেকের কাছে খাবার পরিবেশন করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল, অথবা পরিবেশ দেখে সেই রকম অনুভূতি হয়েছিল ।


একটা সময়ে মনে হয়েছিল যে, সবাই বোধহয় খাবার নেওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে এবং আমরা বন্য হয়ে যাবো, খালি হাত দিয়ে খাবো এবং টেবিলে উপর পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা খাবারের জন্য লড়াই করবো । সেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি অনেকক্ষণ স্থায়ী ছিল । 

আমাদের নিমন্ত্রণকর্তা কিছু করেনি এবং কিছু বলেওনি । আমাদের মধ্যে কেউ নিশ্চিত ছিল না যে, তখন কি করা সমীচীন ছিল । চারপাশে বিদ্রোহের গুমোট হাওয়া বিরাজমান ছিল । তারপর অদ্ভূত এক ঘটনা ঘটে । যারা আসনে বসা ছিল, তারা চেয়ার ছেড়ে উঠে নিজেরাই নিজেদের খাবার পরিবেশন করে এবং খেতে শুরু করে । আমরা শান্ত ভাবে খাবার খেয়ে শেষ করি । আমার স্ত্রী পাশে বসেছিলেন । খাবার ছিল সুস্বাদু এবং চমৎকার । 

আমাদের পেছনে যারা দাঁড়িয়েছিল, তারা খাবার খায়নি এবং নড়াচড়াও করেনি । তবে ওদের ভয়ে আমরা খানিকটা সতর্কতার সঙ্গে খাবার খেয়েছি । ওরা শুধু আমাদের খাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল । 

আমরা যারা খাচ্ছিলাম, তারা কী কোন অপরাধবোধ অনুভব করেছিলাম ? সে-টা ছিল জটিল অনুভূতি । এধরনের পরিস্থিতিতে উদ্ধার পাবার কোন পথ খোলা থাকে না । যারা টেবিলে বসা ছিল, তারা খেয়েছে । সে-টাই সব। সে-টাই শেষ । 

আমরা সময় নিয়ে ধীরে-সুস্থে খাওয়া-দাওয়া শেষ করি । তবে যারা আমাদের পেছনে দাঁড়িয়েছিল, একসময় ওরা বিড়বিড় শুরু করে । একসময় ওদের মধ্যে একজন গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলে: 

‘প্রথম যিনি আমাদের খাবার দিবেন, তিনি পাবেন ... ’ 

কিছু খাবার দেওয়ার জন্য আমি অনুপ্রাণিত হই । কিন্তু কাকে দিব ? কোথায় শুরু করবো ? পরিস্থিতি ছিল অসম্ভব । যে দিকে দৃষ্টি ফেরাই না কেন, ওরা সব দিকে দাঁড়িয়ে আছে । তারপর হয়তো আমার অবস্থা মেরুকরণ সৃষ্টি করবে । তখন আমি এবং ওরা থাকবো । ঘটনা কিন্তু কিছুতেই এভাবে আরম্ভ হয়নি । আমরা সবাই ভোজসভায় ছিলাম । এমন হয়েছে যে, আমি চেয়ারে বসেছি এবং খাওয়া শুরু করেছি । ওরা চেয়ারে বসেনি এবং খাবারও খায়নি । ওরা কিছু করেনি, এমনকি টেবিলের কাছে এসে প্লেট নেয়নি এবং নিজেরা নিজেদের খাবার পরিবেশন করেনি । ওদেরকে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের খাওয়া পর্যবেক্ষণ করার কেউ হুকুম জারি করেনি । ওরা নিজেরাই করেছে । 

সুতরাং উল্টোদিকে ঘুরে ওদেরকে খাবার দিতে হলে স্বভাবতই ওদের সঙ্গে চোখাচোখি হবে এবং ওদেরকে নিচু শ্রেনীর বলে মনে হবে । সত্যি ওরা যখন এধরনের ব্যবহার করে, তখন সবকিছু এমন মনে হয় । 

খাওয়ার সময় আমরা বিড়বিড় শব্দ উপেক্ষা করি এবং একসময় খাওয়ার পর্ব চুকিয়ে ফেলি । তারপর আমরা আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি এবং খামার বাড়ির অন্যান্য দর্শনীয় জায়গা পরিদর্শনের জন্য নিমন্ত্রণকর্তার সাদর আমন্ত্রণ গ্রহণ করি । স্বাভাবিক ভাবে প্রচুর খাদ্য-খাবার অবশিষ্ট থেকে গেছে । 

আমার স্ত্রী এবং আমি প্রায় সবার শেষে টেবিল ছাড়ি । আমরা উঠে দাঁড়ানোর পর আমি আমাদের পেছনের দিকে ফিরে তাকাই । সেখান মাত্র তিনজনকে দেখতে পেয়ে আমি বিস্মিত হই । সর্বসাকুল্যে তাই ? আমার মনে হয়েছে সংখ্যায় ওরা আরো বেশি হবে, জনতার মতো । হয়তো সেখানে সংখ্যায় ওরা অনেক ছিল, কিন্তু কেউ বোধহয় চলে গেছে, নয়তো আশা পরিত্যাগ করেছে, নতুবা পটল তুলেছে। 

যাহোক, আমরা যখন খাচ্ছিলাম, তখন আমার কেন জানি মাঝে মাঝে মনে হয়েছে যে, ওরা আমাদের পেছন দিকে ছুরি চালালে কোন কিছুই বাঁধা দিতে পারতো না । 

আমার স্ত্রী এবং আমি অন্যান্যদের সঙ্গে ঐশ্বর্য্যমন্ডিত খামার বাড়ির বাগানের দিকে হেঁটে যাই । 

গনগনে সূর্য্যের আলোয় আলোকিত স্বপ্নিল দিন ছিল । 



লেখক পরিচিতি: বেন ওকরি নাইজেরিয়ার একজন জনপ্রিয় এবং সফল ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও কবি। তাকে উত্তর-আধুনিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশক আফ্রিকার লেখকদের মধ্যে অন্যতম সাহিত্যিক হিসেবে গণ্য করা হয় । তিনি ১৯৫৯ সালের ১৫ মার্চে দক্ষিণ নাইজেরিয়ার মিন্না শহরে জন্মগ্রহণ করেন । মাত্র দু’বছর বয়সে তিনি বাবা-মার সঙ্গে লন্ডনে পাড়ি দেন । তবে ১৯৬৮ সালে তিনি লাগোসে ফিরে আসেন । পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য পুনরায় লন্ডনে যান এবং এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশনা করেন । লাগোসে থাকাকালীন সময়ে গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, মাতৃভূমির প্রতি গভীর মমতা এবং স্বদেশী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তার লেখার মূল বিষয় । যদিও কবিতা দিয়ে তিনি সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন, কিন্তু তেমন সাড়া ফেলতে না পেরে ছোটগল্প লেখায় মনোনিবেশ করেন । মাত্র একুশ বছর বয়সে তার প্রথম উপন্যাস ‘ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড শ্যাডোস’ প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশের পরপরই তার নাম বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে । তবে সবচেয়ে প্রশংসিত এবং আলোড়িত উপন্যাস ‘দ্য ফ্যামিস্ড রোড’ এবং এই উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৯১ সালে ‘ম্যান বুকার’ পুরস্কার অর্জণ করেন । তার প্রথম গল্পসংকলন ‘ইন্সিডেন্টস্ অ্যাট দ্য শ্রাইন’ ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় । তার অন্য দু’টি গল্পগ্রন্থ হলো ‘স্টার্স অফ দ্য নিউ ক্যার্ফু’ (১৯৮৮) এবং ‘টেইলস্ অফ ফ্রীডম’ (২০০৭) ।‘অ্যন আফ্রিকান এলেজি’ (১৯৯৭), ‘মেন্টাল ফাইট’ (১৯৯৯) এবং ‘ওয়াইল্ড’ (২০১২) তার কবিতার বই । তার অনেক উপন্যাস এবং ছোটগল্প বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে । অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার ছাড়াও তাকে বৃটেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সন্মানিত ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করা হয় । বর্তমানে তিনি লন্ডনে বসবাস করেন । 

গল্পসূত্র: ‘ওদের এবং আমাদের রহস্যময় উদ্বেগ’ গল্পটি বেন ওকরির ইংরেজিতে ‘দ্য মিসট্যরিয়াস অ্যাংজাইঅ্যাটি অফ দেম অ্যান্ড আস’ গল্পের অনুবাদ । গল্পটি লেখকের ‘টেইলস্ অফ ফ্রিডম’ গল্পসংকলন থেকে নেওয়া হয়েছে । 





অনুবাদক
ফজল হাসান
গল্পকার। অনুবাদক।
অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন।