বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

শামসুদ্দীন আবুল কালামে'র গল্প: পথ জানা নাই

মাউলতলার গফুর আলী ওরফে গহুরালি প্রায় উন্মান্তের মতো এক-খানা কোদাল দিয়া গ্রামের একমাত্র সড়কটাকে ক্ষতবিক্ষত করিয়া ফেলিতেছিল।

তাহার এই মত্তজনোচিত কার্যের পশ্চাতে একটা ইতিহাস আছে; দীর্ঘ এক কাহিনীও বলিতে পারো তাহাকে। একটু সহানুভূতির সহিত সে ইতহাস বিচার করিলে তাহার এ কার্যের একটা সমর্থনও হয়তো খুঁজিয়া পাওয়া যায়। নহিলে যে সড়ক একদা সকলেরই সমবেত চেষ্টায় গ্রামের উন্নতিকল্পে গড়িয়া উঠিয়াছিল, এমন কী গহুরালিও যাহার জন্য তাহার স্বল্প জমির বিরাট একটা অংশ ছাড়িয়া দিতে পারিয়াছিল, হঠাৎ তাহা ভাঙিয়া ফেলিবার জন্য সে-ই বা এমন উন্মুত্তবৎ হইয়া উঠিবে কেন?

এই গতযুদ্ধের পূর্বকাল পর্যন্ত পূর্ব-পাকিস্তানের সুদূর দক্ষিণ অঞ্চলের যে গ্রামগুলি বহির্জগতের সহিত একপ্রকার সম্পর্কশূন্য থাকিয়াই সম্পূর্ণ মধ্যযুগীয় জীবনযাত্রা যাপন করিতেছিল, এই মাউলতলা গ্রামও তাহাদের একটি। বিরাট এই দেশের ইতিহাসে রাজ্যরাষ্ট্রের ভাঙা-গড়া বহুবার ঘটিয়াছে; সুদূর দিল্লী কিংবা ঢাকা মুর্শিদাবাদের বাদশাহী তখতে কতো রাজশক্তির উত্থান পতন ঘটিয়াছে - মগ, পর্তুগীজ, বর্গীর বন্যা কতোবার কতো স্থানে ঝড় তুলিয়া বহিয়া গেছে, কিন্তু মাউল তলার স্বকীয় জীবনযাত্রায় তাহা কিছুমাত্র আলোড়ন তুলিতে পারে নাই। ইংরেজ সভ্যতা সনাতন ভারতবর্ষীয় কৃষ্টি সংস্কৃতির মর্ম-মূল ধরিয়া নাড়া দিয়াছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু তবু এই যুদ্ধের পুর্ব-কাল পর্যন্ত মাউলতলা গ্রামে তাহার কোনো বিশেষ প্রভাব অনুভূত হয় নাই।

অন্তত: এই সড়কটি নির্মিত হইবার পূর্ব-পর্যন্তও মাউলতলা সম্পূর্ণ স্বীয় স্বাতন্ত্র্য লইয়াই বাঁচিয়া ছিল।তখনকার মাউলতলার কথা এখন হয়তো নিছক কাহিনীর মতোই শোনাইবে তোমাদের কাছে। এখানকার মৃত্তিকাসংলগ্ন জীবনগুলি তখন সংগ্রাম করিয়া ক্ষেতে ক্ষেতে শস্য ফলাইত; ভোগের অধিকার লইয়া আদিম বীরত্ব সহকারে মধ্যযুগীয় অস্ত্রশস্ত্র লইয়া লড়াই করিত, জোর করিয়া ধরিয়া আনা মেয়েমানুষকে বিবাহ করিয়া ভালোবাসিত আর অবসর কালে গান কিংবা পালা বাঁধিয়া আনন্দ উৎসব করিত। বাহিরের জগতের সহিত কোনোরূপ যোগাযোগ একপ্রকার ছিল না বলিলেই চলে। জীবনযাত্রার একটা একান্ত নিজস্ব ও স্বয়ংসম্পুর্ণ রীতি ও পদ্ধতি ছিল। বিংশ শতাব্দীর বণিক-সভতার কিছুমাত্র স্পর্শ তাহা ব্যাহত করে নাই।

কিন্তু ক্রমে করিল-

একদিন এই গ্রামেরই একজন পুরুষ তরুণ বয়সে ছিটকাইয়া বাহিরে গিয়া পড়িয়াছিল; ধরিতে পারো এখন হইতে সে প্রায় চল্লিশ বৎসর পূর্বেকার কথা। সে যখন আবার ফিরিয়া আসিল তখন সাথে করিয়া সে শুধু ধন সম্পদই আনিল না, আপাতদৃষ্টিতে উন্নততর আরেক জীবনপদ্ধতি ও সভ্যতা যেন সে তাহার চিন্তা-কর্ম-চারিত্র্যে বহন করিয়া আনিল। কৌতূহলীচিন্তে দীন মাউলতলাবাসীরা সেদিন তাহার চারিদিকে আসিয়া ভিড় করিল। সে কহিল-এই মাউলতলার বিল-খাল, ঐ বিশখালী; আড়িয়ালখাঁরও ওপাশে, রাজার যে কাছারীতে সকলে বছরে একবার খাজনা দিতে যায়, -তাহারও দূরে এরকটা দেশ আছে - শহর তাহার নাম, -সেই দেশের সহিত সেই দেশের জীবনের সহিত পরিচিত না হইলে এই গগুগ্রাম মাউলতলায় এমন হীনভাবে জীবন কাটাইবার কোনোই অর্থ হয় না। মানুষ হইতে হইলে,ভালো ভাবে জীবনধারণ করিতে হইলে ঐসব শহর বন্দরের সহিত যোগাযোগ একান্ত দরকার। এবং সেক্ষেত্রে তাহার প্রস্তাব হইল, অবিলম্বে এই যোগাযোগের প্রথম প্রচেষ্টা হিসাবে একটা সড়ক নির্মাণ করিতে হইবে। জোনাবালি হাওলাদার সেদিন এমন ইচ্ছাও প্রকাশ করিল যে এখন হইতে তাহার স্বীয় জন্মভূমি মাউলতলার উন্নতি করাই তাহার জীবনের সর্বাপেক্ষা বড়ো কর্তব্য বলিয়া মনে করিবে। চেষ্টা চরিত্র করিয়া জেলা বোর্ডের দ্বারা সে এই সড়ক প্রস্তুতের বন্দোবস্তও করিয়া ফেলিল। মাউলতলার স্বল্পসংখ্যক সঙ্গতিপন্ন যাহারা, তাহারা প্রচণ্ড উৎসাহে গ্রামোন্নয়নের তথা স্ব স্ব জীবনোন্নয়নের কাজে লাগিয়া গেল।

কিন্তু মুশাকিল বাধাইল এই গহুরালির মতো দরিদ্র প্রজারা। সড়ক প্রস্তুতের জন্য তাহাদের জমির যে অংশখানি পড়িবে তাহা তাহারা কিছুতেই ছাড়িয়া দিতে রাজি হইতেছিল না। গহুরালি বলিল: মোডে পাঁচকুড়া আমার ভুঁই, হের দুই কুড়াই সড়কে খাইলে আমি খামু কী?

জোনাবালি জবাব দিয়াছে : আরে মেয়া, কেবল ক্ষেতের ধান বেচইয়াই পয়সা হয় শেখছো এতাকাল। সড়কটা হইতে দেওনা দেখবা উপায়ের আরো কতো রাস্তা খুলইয়া যায়। কইলাম যে, এ সড়করে সড়ক বলইয়াই ভাইব্যোনা, এ তারো চাইয়া বড়ো জিনিস। সবকথা তো বোঝবানা, তউ কই হোনো এ রাস্তা নোতুন জীবনেরো।

গহুরালি কী বুঝিয়াছে, প্রতিবাদের তীব্রতা কিছুটা কমিয়াছিল বৈ কী। একে জোনাবালির মতো ধনী মানী লোকের কথা; তাহার উপরে স্বপ্নের মতো সে দেশের বর্ণনা শুনিয়া তাহারও মন তখন এক অদ্ভুত সম্ভাবনায় ভরিয়া উঠিয়াছিল। এই সড়কের কল্যাণে বাস্তবিকই যে জীবনের সম্মুখে এক নোতুন পথ প্রসারিত হইয়া পড়িবেনা তাহা কে বলিতে পারে। জোনাবালির বাড়ি হইতে বাহির হইয়া তাহার যে জমিখানার উপর সড়ক যাইবার কথা, তাহার উপর আসিয়া দাঁড়াইল।

এখনও - এই আগ্রহায়ণের শেষেও প্রায় গোড়ালির উপর পর্যন্ত সেখানে কাদায় ডুবিয়া যায়। ধান পাকিতেছে, তাহার শীষগুলি নুইয়া পড়িয়াছে স্তবের মতো, অধিকাংশই লুটাইয়া পড়িয়োছে কাদার মধ্যে। মজা বিলের জমি - এমন হইবেই। কোনো বৎসরই লাভজনক ফসল এখান হইতে পাওয়া যায়না। পানি জমিয়াই প্রায় অর্ধেকেরও বেশি ফসল নষ্ট করিয়া ফলে। তবু এদিনে ক্ষেতখানার দিকে চাহিয়া তাহার মন ভরিয়া উঠিত এতাকাল; আজ কী জানি কেন মনটা খুব বিরস হইয়া উঠিল। মনে মনে ভাবিল আর কাঁহাতক এইভাবে দুটি দুটি ধান খুঁটিয়া জীবন চালানো যায়। তাহার চেয়ে সম্মুখে যে নয়া-জীবনের হাতছানি তাহাকে বরণ করিয়াই দেখুক না এবার। জোনাবালির কথায় সুখসমৃদ্ধি, মানুষ হইয়া বাঁচিয়া থাকা সবই নাকি তাহাদেরও জীবনে সম্ভব হইতে পারে। শুধু যে আবহে যে রীতিতে জীবন চলিত এতোকাল তাহাকে পালটাইয়া নোতুন করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে। দোষ কী, দেখুকই না একবার পরখ করিয়া। জোনাবালি, দশবৎসর পূর্বেও যাহার পিতা উদয়াস্ত পরিশ্রম করিয়া এক মুষ্টি অন্ন সংস্থান করিতে পারিত না, তাহারই পুত্র যখন আজ সেই জগতের কল্যাণে জীবনে অগাধ ধন ঐশ্বর্য সমৃদ্ধি আহরণ করিতে পারিয়াছে, তাহারাই বা কেন তাহাদের তাকৎ হিম্মত লইয়া ভাগ্য বদলাইতে পারিবে না?

বাড়ী ফিরিয়া স্ত্রীকে কহিল : ঠিক করলাম, রাস্তার লইগ্যা দিমু জমিটা ছাড়ইয়া।

বউটি অল্পবয়সী হইলেও বুদ্ধি নিতান্ত কম ছিল না, ভাত বাড়িয়া দিতে দিতে হঠাৎ থামিয়া অবাক তাহার দিকে চাহিয়া রহিল কিছুকাল; কহিল : তা হইলে খাম কী? :অতোশতো ভাবতে গেলে কী আর দ্যাশের দশের কাম হয়? সকলেরই মঙ্গলের জন্য যে কাম তার লইগ্যা সকলেরই কিছু কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই হইবে। গহুরালি অবিকল জোনাবালির কথাগুলি স্ত্রীকে বেশ ভারিক্কিচালে শুনাইয়া দিল। স্ত্রী তবু খুঁত খুঁত করিল: বুঝিনা দ্যাশের দশের কাম কারে কয় - মৌলবী সাইবে তো কইয়া গেলে বেশ আছি, আমরা, রাস্তা-ফাস্তা বানাইয়া এম্নে-ওম্নে গেলে জীবনে আরো কষ্ট বাড়বে ছাড়া কমবে না। আরো কইলেন বোলে হগোলডিরে বাইর অওনইয়া স্বভাবে পাইছে, এয়া ভালো লক্ষণ না।

: থুইয়া দেও হের কথা। নোতুন কোনো জিনিস করতে গেলে একদল মানুষ চাইর দিক দিয়া এরহম বাধা দেয়ই।

স্ত্রী তবু বলিল : না হয় বোঝলাম দশের উপগারের কাম। তউ ওয়া কী আমাগো করা সাজে, যাগো খাইয়া

পড়ইয়াও বাড়তি আছে হেরা করুক গিয়া। রাস্তা আমাগো অইলেই বা কী না অইলেই বাকী।
গহুরালি কহিল : মাইয়া মান্ষের বুদ্ধি তো! যে জিনিষ যার নাই, হের লাইগ্যা তারই তো বেশি আহইট। যাগো আছে তাগো গরজ কী। সক্কলের মঙ্গল মাইনিই তো আমাগোও মঙ্গল।

পরে সে হাজেরাকে ক্ষেতের যে উঁচু-পাড়ে তাহাদের বাড়ি, তাহারই কিনারে ডাকিয়া লইয়া গেল। জোনাবালির নিকটে রাস্তার বর্ণনা সে যেমন যেমন শুনিয়াছে ঠিক সেইভাবেই তাহার নিকট বর্ণনা করিয়া গেল। আঙ্গুল দিয়া দেখাইল শাদা মেঘের ভেলা ভাসানো নীল আকাশের নিচের রৌদ্র ঝিলমিল দিগন্তের দিকটা। সবুজ বনানীর সীমারেখায়, কাশবনের উদ্দাম ইশারায় সে দিগন্ত যেন কোন সুদূর স্বপ্ন-রাজ্যে হারাইয়া গিয়াছে। -আর মুখে সে আবৃত্তি করিল জোনাবালির সেই কথা কয়টি,

: এ কী কেবল সড়ক । একটা নোতুন জীবনেরো রাস্তা। সুখের আর সমৃদ্ধির-

হাজেরা আর সে সেই সড়ককে কল্পনায় দূর হইতে দূরে বিছাইয়া চলিল। পৃথিবী যতোখানি তাহাদের ধারণায় কুলায়, যেন তাহার শেষ সীমানা অবধি। এতোকাল আচরিত জীবনের প্রতি মনে মনে তখন বিদ্রোহ উদ্দাম হইয়া উঠিয়াছে; উন্নততর জীবনের জন্য মনের গতি তখন বাধা-বন্ধহারা। এই সড়ক তাহাদের সে কামনাকে পরিপূর্ণ করিতে পারিবে কী না তাহা বিচারের সাধ্য তাহাদের ছিল না, বিশ্বাসেই তাহারা উজ্জীবিত হইয়া উঠিয়াছে। গহুরালি জোনাবালিরও তুলনায় অপরূপ বর্ণনায় ভবিষ্যৎ জীবনের যে চিত্র হাজেরার সম্মুখে তুলিয়া ধরিল সরলা গ্রাম্য তরুণী হাজেরা অর্ধ-বিশ্বাস অর্ধ-অবিশ্বাসে তাহা দেখিয়া রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। গহুরালির হাত স্পর্শ করিয়া বারংবার সে জিজ্ঞাসা করিল,

: সত্য? হাচইও?

: দেখবাই ভবিষ্যতে।

কিন্তু ভবিষ্যৎ কথাটির ব্যাপ্তি বড়ো বেশি। সময় সময় তাহার অন্ত প্রত্যক্ষ করিতেছি বলিয়া মনে হইলেও, তবু কার্যকালে তাহার অন্ত খুজিয়া পাওয়া মুশকিল। গহুরালিও তাহার পরিমাপ করিতে পারিল না।

অবশেষে সমস্ত বাধাবিপন্তি ও প্রতিকূলতা কাটাইয়া সড়ক নির্মাণ শেষ হইল। জোনাবালি দুই দুইটা গরু জবেহ করিয়া শ্রমিকদের আপ্যায়িত করিল। সে মেজবানে গ্রামের অধিকাংশ লোক শরীক হইল। রাত্রে বসিল পালাগানের আসর। এমন উৎসব এখানকার নিস্তরঙ্গ জীবন বড়ো বহুবার করে নাই।পুরুষেরা একে একে প্রায় সকলেই একবার করিয়া শহর ঘুরিয়া আসিল। এবং সকলেই আসিল কিছু না কিছু সেই সভ্য-জগতের চিহ্ন লইয়া। প্রথম উন্মাদনাটুকু কাটাইয়া লোকে অবশেষে সড়কের উপর গোরু বাঁধিত; ক্ষেতে কাজ করিতে করিতে তাহারই পাশে বসিয়া গল্প করিত; হুঁকা টানিত-আর তাহারই ফাঁকে ফাঁকে গ্রামের চারি পাঁচটি যুবক ভাগ্যান্বেষণে বহির্গত হইয়া গেল।

গহুরালিও একদিন যে কয়টা পীরহান ছিল একে একে সব কয়টা পরিয়া মাথায় মুখে ভালো করিয়া তেল মাখিয়া প্রসাধন করিয়া একখানা তেল চকচকে বাঁধানো লাঠি হাতে করিয়া তিনদিন ধরিয়া শহর বন্দর ঘুরিয়া দেখিয়া আসিল জোনাবালির কথার চাক্ষুষ প্রমাণ এইবার মিলিল। সত্যই তো, এখানকার মানুষেরা সত্যই অভিনব। সুখে-ঐশ্বর্ষে পরিপূর্ণ আরেক জাতের মানুষের সেখানে বাস। তাহাদের প্রতিটি চালচলন, কথাবার্তা, জীবনরীতি গহুরালির নিকট পরম লোভনীয় বলিয়া প্রতিভাত হইল। কিন্তু তবু সব দেখিয়া শুনিয়া একটু দুঃখ বরাবরই তাহার মনে খচখচ করিয়া বিঁধিতে লাগিল উহাদের যেন ধরা ছোঁয়া - কিংবা নাগাল পাওয়া যাইতেছিল না। তাহার মতো দীন দরিদ্রের প্রতি সকলেই ভ্রুক্ষেপহীন, দুইদন্ড থামিয়া এখানে কেহই তো তাহার কুশলও জিজ্ঞাসা করে না। জিজ্ঞাসা করে না কোথায় নিবাস, কোথায় ঠিকানা; তাহাদের মাউলতলাতে অপরিচিতকেও সম্ভাষণের যে রীতি তাহা এখানে নাই। এমন কী কেহ চোখ তুলিয়া তাকায়োনা, যদিও বা কেহ কখনো তাকাইয়াছে গহুরালি বড়ো অস্বস্তি বোধ করিয়াছে সে দৃষ্টির সম্মুখে। সে দৃষ্টিতে মায়া নয়, মমতা নয়, আত্মীয়তার শুভ ইঙ্গিতও নয়, শুধু তাচ্ছিল্যমাখা বলিয়াই বোধ হইয়াছে তাহার: কেবল রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিয়াছিল সে সন্ধ্যাকালে বাজারের পথ দিয়া যাইবার সময়; দুইধারে সারি সারি মেয়েরা - কেহ বিলোল চোখে তাহার দিকে তাকাইয়া ছিল, কেহ বা আহ্বানও করিয়াছিল হাতছানিতে। তাহাকে উপলক্ষ্য করিয়াই একটি মেয়ের কী কথায় সকলে যখন হাসিয়া উঠিল, গহুরালি ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া তাড়াতাড়ি সেখান হইতে চলিয়া আসিয়াছিল। ব্যাপারটা কী বুঝিতে পারে নাই। তবু একটি মেয়ের চোখের চাওয়াটুকু ভালো লাগিয়াছিল।

দ্বিতীয়দিন সন্ধ্যাকালে সে আবার সেই পথে গেল। সেই মেয়েটি তখনো সেখানে দাঁড়াইয়া। গহুরালি তাহার নিকট দিয়া যাইবার সময় সে একটু মধুর করিয়া হাসিল। গহুরালির মাথায় মধ্যে কেমন গোলমাল হইয়া গেল; হা করিয়া অনেকক্ষণ পর্যন্ত অর্ধ-চেতনের মতো সে সেখানে দাঁড়াইয়া রহিল।

মেয়েটি হাতছানি দিয়া তাহাকে কাছে ডাকিল : আয়েন।

গহুরালি সম্মোহিতের মতো তাহাকে অনুসরণ করিল ।

মেয়েটি তাহাকে লইয়া গেল হোগলাপাতার চাঁচ দিয়া বেড়া বুনানো ছোটো একটা ঘরে। একপাশে একটা বিছানা, অন্য দিকে ছোটো একটা হ্যারিকেন। মেয়েটি আলোটা উস্কাইয়া দিয়া তাহার কাছে আসিয়া বসিল : নোতুন আইছো গ্রাম থেইক্যা, না? গহুরালি মাথা দোলাইল। : বেশ! তা, ট্যাক ভারি আছে তো? দশ টাকার কম কাম অইবোনা, কইলাম। দেহি কতো আছে, -বলিয়া মেয়েটি তাহার কোমরে হাত দিল। গহুরালি যেমন রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল তেমনি ভয়ও পাইল। বাধা দিবার চেষ্টা করিয়াও তাহার ছলনায় শেষ পর্যন্ত সে ভুলিয়া গেল।

পাঁচ মিনিট পরেই গহুরালির প্রায় সবি আদায় করিয়া মেয়েটি তাহাকে উঠাইয়া দিল : আরো রইলে টাকা আরো দেওয়া লাগবে, এহোন যাও মিয়া।

প্রতিদানে গহুরালি কী পাইল তাহা সে-ই জানে। তবে এই অনাত্মীয়দেশে আত্মীয়তা বলিয়া, সহৃদয়তা বলিয়া সে যাহা ভাবিয়াছিল, তাহা একেবারে চুরমার হইয়া ভাঙিয়া গেল।

মনে মনে গভীর ভাবে সে উপলব্ধি করিল এখানে পয়সার মূল্যে সব জিনিষের যাচাই। পয়সাই এখানকার জীবন নিয়ন্ত্রিত করিতেছে। প্রাণের কোনো মূল্য ইহারা দেয়না । বড়ো একাকী আর নিঃসঙ্গ বলিয়া বোধ হইতে লাগিল তাহার। তৃতীয় দিন সকালে একটা বিরূপ বিরস মন লইয়া সে গ্রামের পথ ধরিল।

তবু সারাপথ ভাবিয়া চিন্তিয়া সে এই পয়সার ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ জীবনকে গড়িয়া তুলিবার সংকল্প করিল। এবং পয়সা উপার্জনের পথ খুঁজিতেই তখন হইতে তাহার ব্যস্ততা শুরু হইল। হতাশ হইয়া এপথে কিছু করা গেলনা বলিয়া অন্য চেষ্টার দিকে ঝুঁকিয়া পড়ার মতো মুখ তো তাহার নাই। মনে মনে একটু দমিয়া পড়িলেও স্ত্রীর নিকট যে বাহাদুরি করিয়াছে একদা- তাহারই জন্য সে হাল ছাড়িল না। শুধু সে একাই নয়, আরো পাঁচ জন মিলিয়া তরিতরকারী, মাছ যে যাহা জোটাইতে পারে তাহা লইয়াই সে পথে আসা যাওয়া করিতে লাগিল। এমন যে থানকুনি পাতা - যাহা এখানে বনে বাদাড়ে অজস্র জন্মায়, কেহ ফিরিয়াও দেখেনা, শহরে তাহাতেও পয়সা। এমনি করিয়া ধীরে ধীরে গ্রামীণ প্রতিটি বস্তু শহরের পথে নীত হইতে লাগিল। হাজেরা একদিন পরিহাস করিয়া কহিল : যা শুরু করলা, শেষকালে আমাগোও না বাজারে লইয়া যাও।

গহুরালি তখন বেশ দুপয়সা উপার্জন করিতেছে। দেখিতে দেখিতে বছর তিনেকের মধ্যে খোড়ো-ঘরের চাল ফেলিয়া সে টিনই তুলিয়া ফেলিল। যাহারা জোনাবালির কথায় সংশয় প্রকাশ করিয়াছিল, এবার তাহাদেরও চোখ খুলিল।

কিন্ত এইপথে শহরের ফৌজদারী দেওয়ানীতেও ছুটাছুটি শুরু হইল ধীরে ধীরে। শাদামাটা সরল জীবনে আসিতে লাগিল কূটবুদ্ধি আর কৌশলের দড়িজাল। এই সড়কেরই চারিদিকে প্রচুর গলি-ঘুঁজিরও সৃষ্টি হইল। অনেক বাঁক, অনেক মোড়। মাউলতলা জটিল হইয়া উঠিল। বুঝিবা তাহার প্রভাব পড়িল এখানকার লোকের মনেরও উপর।

এমন কী একদিন এই সড়কের উপরেই সামান্য গোরুতে ধান খাওয়ার বিষয় লইয়া দুইদলে লড়াই এবং একটা খুন পর্যন্ত হইয়া গেল।

জোনাবালি খবর পাইয়া ছুটিতে ছুটিতে যখন আসিয়া পৌঁছিল তখন খুন তো একটা হইয়া গিয়াছেই আর তাহার এতো সাধের সড়কের একটা অংশও ঢিল তৈরির কাজে উড়িয়া গিয়াছে ।সকলকে ডাকিয়া কহিল : সড়ক কী এয়ার লাইগ্যা বানাইছেলাম আমরা? আকাটমূর্খ জানোয়ারের দল! জোনাবালির ভৎর্সনায় কাহারও মুখে কোনো সন্তুষ্টির চিহ্ন বা ভাবান্তর দেখা গেল না। থানা মামলা-আদালত লইয়াই তখন তাহাদের চিন্তা।

ইতিমধ্যে যুদ্ধ লাগিল।

তাহার ঢেউ এ পথ বাহিয়া এবার আসিল এখানেও। এ দেশের ইতিহাসে তাহা এই প্রথম, রাজ্য-স্বার্থ লইয়া ভাঙাগড়ায় এই সব গ্রামের কোনো পরিবর্তন ঘটে নাই কোনোদিন, কিন্তু অতীতের শতশত বৎসরে যাহা ঘটে নাই, দুই শত বৎসরের ইংরেজ শাসনের ফলে এবার এখানে তাহাই আত্মপ্রকাশ করিল।

চালডালের দাম বাড়িল। দাম চড়িল সব জিনিসের কমিল কেবল জীবনের । ধীরে ধীরে এই সড়ক বাহিয়াই আসিল মন্বন্তর আসিল রোগ-ব্যাধি, চোরাবাজার আর দুর্নীতির উত্তাল জোয়ার। তাহার সম্মুখে যতোটুকু নিরুদ্বিগ্নতা ছিল, তাহা কোথায় ভাসিয়া গেল।

সুশাসনে নিযুক্ত সরকারী কর্মচারী আসে এই পথ বাহিয়া, আবার, ঘুষ পকেটে লইয়া ফিরিয়া যায়। শহরের সাহেবের বাবুর্চিখানায় কাজ করে যে লুৎফর তাহার সহিত আসগর উল্লার সোমত্ত কন্যা কুলসুম উধাও হইয়া যায়। লড়াই ফেরত ইউসুফের স্ত্রী কঠিন স্ত্রীরোগে হাত পা মুখে ঘা লইয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। আর আসে তরিতরকারি, কাঠ, মুরগী -হ্যানোত্যানো নানা জিনিস কিনিতে মিলিটারীর দালাল।

ঘটনাচক্রে তাহাদের একজনের সহিত গহুরালির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়া গেল। তখন মন্বন্তরের কাল। গহুরালির নিদারুণ কষ্ট। ভাবিল, তাহাকে ধরিয়া যদি কোনো একটা উপায় মিলিয়া যায়। কিন্তু উপায় হইলনা কিছুই; কেবল একদিন সকালে ঘুম হইতে উঠিয়া গহুরালি হাজেরাকে খুঁজিয়া পাইল না। আর সে দালালেরও আর দেখা মিলিল না। খুঁজিতে খুঁজিতে প্রায় মাইল সাতেক দূরে একজন চাষীর কাছে সংবাদ পাওয়া গেল, হ্যা, খুব বিহানবেলা এই পথ বাহিয়াই একটি মেয়েমানুষকে একজন পুরুষের সঙ্গে সে যাইতে দেখিয়াছে বটে।

মন্বন্তরে গহুরালি নিঃস্ব হইয়াছিল বাহিরে, এবারে হইল অন্তরে৷ নিঝুম হইয়া দুটি দিন সে বাড়িতে পড়িয়া রহিল। মনের আবেগ, ক্ষোভ, দুঃখ অনুতাপ কিংবা রাগ কোনো ভাষা পাইল না, রূপ পাইল না; কেবল এক সময় ক্ষিপ্তের মতো একখানা কোদাল হাতে লইয়া সে নিজের যে জমি খানার উপর দিয়া সড়কটা গিয়াছে, সে দিকে ছুটিয়া গেল।

গ্রামে রাষ্ট্র হইয়া গেল স্ত্রীর শোকে গহুরালি পাগল হইয়া গিয়াছে। শুনিয়া সকলে তাহাকে দেখিতে আসিল।

গহুরালি তখন বাস্তবিকই উন্মাদের মতো অবিশ্রান্তভাবে সড়কটাকে কোপাইতেছে। তাহার সব দুর্দশার মূল যেন ঐ সড়ক এই ভাবেই সে তাহাকে ভাঙিয়া মাটিতে মিশাইয়া ফেলিবার জন্য মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে। একার চেষ্টাতে সে পারিবে কী না তাহা একবারও তাহার মনে হইল না।

সকলে প্রশ্ন করিল: আহাহা, এ করো কী গহুরালি?

ভাঙতে আছি। হাত না থামাইয়াই, চোখ তুলিয়া না চাহিয়াই গহুরালি জবাব দিল।

: ক্যান?

:ভুল, ভুল অইছিলো এ রাস্তা বানাইন্যা। আমরা যে রাস্তা চাইছেলাম হেয়া এ না; ঠিক অয় নাই।

-কোদাল চালাইবার ফাঁকে ফাঁকে গহুরালি যেন স্বগতঃভাবেই কথাগুলি বলিয়া গেল।
সকলের ইচ্ছা হইল জিজ্ঞাসা করে ঠিক হইত কী হইলে, কিন্ত গহুরালি দূরের কথা তাহারা নিজেরাও কী তাহা জানিত! অন্য কোনো নয়া-সড়কের স্বপ্ন তো তাহাদের মনে কেহ জাগায় নাই।















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন