বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

দেবেশ রায়'এর গল্প : নিরস্ত্রীকরণ কেন ?

যদি এমন একটা অন্ধকার জায়গায় আরো-অন্ধকার কামরাটার মধ্যে ঘণ্টা আড়াই থেকে চার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, যেখানে কামরা থেকে নামলেই আজ সরল পরস্পরসংলগ্ন ও পরস্পরবিচ্ছিন্ন রেললাইন, মাথার ওপর আজ তার, স্তম্ভিত অন্ধকারের মত স্তম্ভ, মাঝেমধ্যে সেই স্তম্ভিত অস্কারের মাথায় মৃত নক্ষত্রের নীল বা লাল আলো, রেল লাইনের পাশে মাটিতে পড়ে থাকা লাল বা নীল আলো, যেন অন্ধকার বা নক্ষত্র বা মেঘের আকারে সর্বদাই যে-সৌরজগৎ আমাদের পরিপ্রেক্ষিত-- সেখানে চরম বিপর্যয়ের ফলে কিছু নক্ষত্র কিঞ্চিৎপরিমাণ সুর্য ও কিয়দাংশিক সূর্য ঐ থামগুলোর মাথায়, রেল লাইনের পাশে, যত্রতত্র, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। অথচ ফার্লংখানেক দুরে রেলস্টেশনের ব্রিজ, প্ল্যাটফর্ম, এমনকি তার ওপর লোকজনকেও—কেবলমাত্র প্রখর আলোর নীচে কয়েক মুহুর্তের জন্য হলেও—দেখা যায়, রেলস্টেশনের চত্বরঘেরা রাস্তায় রিক্সা-মোটর ইত্যাদির আসাযাওয়া প্রভৃতি বোঝা যায়, এমনকি মাঝেমধ্যে কোনো-কোনো মোটরের হেডলাইটের আলো গিয়ার-চেঞ্জের সঙ্গে মিশে এই কামরা পর্যন্ত আসে ও সেই মোটর-রিক্সা-স্ট্যাণ্ডের চ্যাঁচামেচি-গোলমাল দুরত্বে পরিশ্রুত হয়ে খুব দামি গাড়ির হর্নের মত কানে এসে পৌঁছয়। তবে, এই অন্ধকারে নির্বাসনের বর্তমানের সঙ্গে মাইল চল্লিশ দূরের মফস্বল স্টেশনে লোকাল গাড়ির সঙ্গে কলকাতায় যাবার অন্য জুড়ে দেয়া এই-একটা থ্র-কোচের দরজায় জীবনযুদ্ধের মত ঠেলাঠেলির অতীত ও আরো কতক্ষণ অপেক্ষা করার পর ফুলকি ছড়াতে ছড়াতে বন্যার মত বেগে এই কামরাটাকে অন্ধকার থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ট্রেনের আবির্ভাবের ভবিষ্যৎ—সব কিছুর যোগে নিজেদের বৃহত্তর কোনো শক্তির কবলিত আত্ম-স্বতন্ত্র্যহীন বলে মনে হয়। এই অধীনতাবোধ এই ট্রেনের যাত্রীদের কুললক্ষণ।

সেই অন্ধকারের মধ্যে নির্বাসিত নিরালোক কামরার গভীরতর অন্ধকারের ভেতর দুই নারীর মধ্যে এরকম সংলাপ চলছিল : 

‘ওখানকার লোকজনও ছাড়তে চায়, বলে চাকরি ছেড়ে দিন, আমাদের এখানে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করুন, নিজের ডিসপেন্সারি করুন, লোকজনের ভিড় সে লেগেই আছে, শেষে দিন পেছুতে-গেছুতে এইবার যেতেই হল।’ 

ভদ্রমহিলার গলার স্বর মাঝারি দামের জর্দা খাওয়া হাফ-খানদানি । বোঝা যায় না বেশি কথা বলার জন্য বনেদিয়ানা নষ্ট হয়েছে, নাকি পুরো বনেদিয়ানা তৈরিই হয়নি। 

‘সে ত সত্যি। এক জায়গায় থাকলেই লোকজনের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয়, মায়া পড়ে যায়।’ দ্বিতীয় ভদ্রমহিলা কণ্ঠস্বর নিষ্প্রভ, কিন্তু নিবে যায়নি; খুব বুঝেশুনে খরচ করা, মিতব্যয়ী। 

দ্বিতীয়া একই বেঞ্চের জানলার দিকটা নিয়েছেন। তিনি পা ছড়িয়ে বেশি জায়গা নেয়ায়-- তার সঙ্গে বছর দশেকের একটি ছেলে আছে, বোধহয় তাকে শোয়বার সঞ্চয়-- প্রথমার বেশি জায়গা জোটেনি। অথচ নিজের নতুন শাড়ি পরা মেয়েটির সতীত্ব সংরক্ষিত করার জন্য একটি নিরাপদ জায়গা তার প্রয়োজন। 

অন্ধকারের মধ্যে অন্য খুপরিটায় একটি বাচ্চা তারস্বরে কাঁদছে। দরজার হাতল ধরে দূরদৃশ্যদর্শনরত কোনো অন্যমনস্ক যুবক চেঁচিয়ে এমন একটা গান গাইছে যার সুরে রামপ্রসাদী গানের বক্তব্য কিন্তু কথায় শারীরিক সান্নিধ্যের আতুরতা, ফলে হ্রস্ব, ধন্যাত্মক। 

দুই নারীর সংলাপ। 

প্রথমা—‘ উনি গেলেন কিছু খাবার-দাবার কিনে আনতে, আমার আবার রাস্তার খাবার পেটে সয়না ।’ 

দ্বিতীয়া—‘তাহলে বাড়ি থেকে বানিয়ে আনলেই পারতেন। আমি ত এনেছি।এ শ্রীমানের আবার আমার ধাত। ট্রেনের খাবার খেলেই পেটের গোলমাল। আর--এক ছেলের আবার উল্টো।ব তিনি হটেলে খেতে গেছেন।’ 

প্রথমা—‘আর বলবেন না দিদি, দোকানে যেয়ে খয়ে শরীর নষ্ট করবে, তারপরদ ধকল সামলাতে হবে আমাদের। তুই বোস না খুকু এদিকে।’ 

দ্বিতীয়া পা একটুও সরালেন না—‘থাক না একটু জানালায় দাঁড়িয়ে। চব্বিশ ঘন্টা বসে থাকতে-থাকতে এর পর ত হাতেপায়ে খিল ধরে যাবে।’ 

বাচ্চাটার কান্না ঘিরে একটি পুরুষ ও একটি রমণীতে এই প্রকার কথোপকথন চলছিল। 

পুরুষ—‘দাও না একটু বুকের দুধ।’ 

রমণী—‘দিচ্ছি না নাকি? দেখছ ত’মুখেই নেয় না—’ 

[পুরুষ—‘কী বিপদ! সারারাত এভাবে কাঁদলে—’ 

রমণী—‘ না, না, এখুনি ঘুমিয়ে পড়বে। সোনা সোনা--ওই দেখো আলো। ভু-উ-স—হো-ই যা-- ঝিক-ঝিক ঝিক।’ 


অতঃপর কান্না ও কান্না-থামানো ক্রমাগত উচ্চগ্রামে উঠতে উঠতে এমন একটা স্তরে পৌঁছল যখন পুরুষ ‘দাও দেখি আমার কাছে’ বলে নিয়ে সেই গান-গাওয়া যুবকের পাশ দিয়ে হাতল ধরে ঝুলে লাল-নীল আলোয় ও জটিল রেলপথে বিশৃঙ্খল অন্ধকারে নেমে গেল। রমণী অন্ধকারের জানলায় নিজেকে উৎকণ্ঠ করে সেই প্রান্তরে ভ্রাম্যমাণ কান্নার পিছু পিছু দৃষ্টি ঘোরাতে লাগল। 

দুই নারীর সংলাপ। 

দ্বিতীয়া—‘প্রথম পোয়াতি, বোঘহয় বাচ্চা নিয়ে বাপের বাড়ি থেকে যাচ্ছে।’ এতৎসহ কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞের হাসি। 

প্রথমা-- ‘শিখবে শিখবে, আমরাও-কি আর একদিনে শিখেছি ?’ 

দ্বিতীয়া—‘আপনার কটি ?’ 

প্রথমা—এই তো মেয়ে। আর, এক ছেলে কলকাতায় ডাক্তারি পড়ে।’ 

দ্বিতীয়া—‘ বাপের পেশা?’ 

প্রথমা—‘হ্যাঁ, অন্তত রিটায়ার করবার সময় ওঁর প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকা দিয়ে একটা ওষুধের দোকান করে দেয়া যাবে। আর কিছু না হোক, ওষুধ বেচে ত খেতে পারবে।’ 

দ্বিতীয়—‘তা কেন বলছেন? ও দেখবেন আপনাদের চাইতে বেশি। কামাবে।’ 

গায়ক-যুবা হঠাৎ একলাফে কামরা থেকে নেমে পায়চারি করতে লাগল। অত জোরে লাফের পর অতটুকু পায়চারি মোটেই ওকে মানায় না! বাচ্চার কান্নাটা হঠাৎ হাউইয়ের মত উঁচুতে উঠলে রমণী দরজায় গিয়ে ‘এই’ বলে চেঁচাতেই পুরুষ তার হাতে বাচ্চাকে তুলে দিতে বাচ্চা মায়ের বুকে মুখ গোঁজে। রমণী নিজের আসনে এসে বসে। পুরুষ মাটি থেকে জানালার দিকে উগ্র হয়ে বলে—‘স্টেশনে খোঁজ করব নাকি, দুধটু যদি—রমণী—‘যাও, বকবক কোরো না।’ 

‘ খেতে গেছে।’ 

‘আমাকে নিয়ে গেল না কেন?’ 

‘তোমার খাবার ত এখানেই আছে।' 

‘ওর খাবারও ত আছে—’ 

‘চুপ করো,ঐ দেখ পাহাড়ের আলো দেখা যাচ্ছে—’ 

প্রথমা—‘এটিই বুঝি কোলের?’ 

দ্বিতীয়া—‘হ্যাঁ। পাঁচ ছেলে চার মেয়ে।'. 

প্রথমা মনে-মনে ভাবলেন, এতবার গর্ভবতী ভদ্রমহিলার পাশে তার খুকিকে বসতে দেয়া উচিত কি না! 

প্রথমা—‘ভদ্রলোক কীকরেন?’ 

দ্বিতীয়া—‘ছেলেরা দাঁড়িয়ে গেছে, এখন কিছু করেন না।’ 

প্রথমা—‘ বড় ছেলে কী করে?' 

দ্বিতীয়া-‘বিলেতি কোম্পানির ওষুধের-কী রে খোকা?’ 

খোকা ঘাড় ঘুরিয়ে ‘রিপ্রেসেনটেটিভ' বলে আবার ঘাড় ফিরিয়ে নিল। 

প্রথমা—‘ কোন কোম্পানির ? 

খোকা এবার আছের আদেশের অপেক্ষা না করেই ঘাড় ফিরিয়ে নামটা বলল। ডাক্তারের স্ত্রী বুঝে উঠতে পারলেন না যে রিপ্রেসেনটেটিভের মায়ের সঙ্গে বেশি কথা বলা তার উচিত কি না। তাই তিনি অন্য ছেলেদের পরিচয় জানতে চাইলেন। 

দ্বিতীয়া জানালেন—‘মেজছেলে বাড়িতে থেকে এক স্কুলে চাকরি করে। ন-ছেলে কলকাতায় খবরের কাগজ অফিসে চাকরি করে। তার কাছে সেজছেলে -এম-এ পড়ে। সেজছেলের সঙ্গে যাচ্ছি।’ 

‘ছেলেমেয়ের বিয়ে দেননি?’ 

‘হ্যাঁ, বড়ছেলে আর বড় দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি।’ ইক চায়? 

''তাহলে তো দিদি, আপনি ঝাড়া হাত-পা--’ 

এরপর একসঙ্গে নিম্নলিখিত ব্যাপারগুলো ঘটল : সূর্য উঠলে মৃত্যু রোধ হবে এ-রকম বর-পাওয়া কোনো পৌরাণিক বীরের মত সবগুলো লোকের একমুখী দৃষ্টি, সূর্যের প্রখরতম রশ্মির মত মৃদু আলো, বাঙলাদেশের যাত্রায় যেরকম বেগ ও প্রচণ্ডতার সঙ্গে বিবেকের পরিবর্তন দেখানো হয়— সেইরকম দ্রুত প্রচণ্ড বেগে সব কিছু কাঁপিয়ে ও আলোকিত করে ট্রেনের আগমন, আর সঙ্গে সঙ্গে এই কামরার অন্যান্য যেসব যাত্রী এতক্ষণ প্রবাদবাক্যের বহ্নিমুখমুমুক্ষু পতঙ্গের মত প্ল্যাটফর্মের আলোর বৃত্তে ঘুরঘুর করছিল—তাঁৱা সূর্যোদয়ে নীড়ছাড়া পাখিদের মত সমবেতভাৰে আলোকিত হয়ে এই কামরার দিকে ছুটে এল। যে নিজের নাস্তিকতা ও ভগবদবিরোধিতাকে এত কম আঘাতে আস্তিক ও ঈশ্বরমুখী কর তোলে, যাত্রাগানের সেই অত্যন্ত অনির্ভরঘোগ্য, ক্ষণে-ক্ষণে হৃৎপরিবর্তনকারী চরিত্র এই ট্রেন আর এই সমবেত চরিত্রের তুলনা হল কেন? এই আত্মপরিবর্তনে সে কি পুনরায় নাস্তিকতায় প্রস্থানের পথ রেখে দিয়েছে। 

ট্রেনের ইঞ্জিন এসে এই-কামরাটাকে নিয়ে যাবে। সবাই তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। 

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এম. এ. পড়া সেজছেলে সিগারেট খাচ্ছিল। ট্রেনটা -হু হু করে ছুটে চলেছে। মরা একটা জ্যোৎস্না আছে আকাশে। ফলে পরিবেশ বিচিত্র জটিল অবাস্তব রূপ নিয়েছে। ট্রেনের জানলা দিয়ে গলে আলো বাইরে পড়েছে। খরস্রোতা নদীর মত সে-আলো ট্রেনের সঙ্গে-সঙ্গে ছুটছে। 

প্রথম খুপরিতে সর্ব জায়গাটায়গার ব্যবস্থা করে সেজছেলে এখানে এসেছে। ট্রাঙ্কের ওপর বেডিঙ দিয়ে চাদর বিছিয়ে সকন্যা প্রথমার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। হাঁটু পর্যন্ত ঘোমটা দিয়ে এক মাড়োয়ারি ভদ্রমহিলা ও পাশে সদানিদ্রিত তার রক্ষকের পাশে ডাক্তারবাবু বোধহয় এতক্ষণে কাত হয়ে পড়েছেন। কোত্থেকে পোর্টফোলিও ব্যাগওয়ালা এক ভদ্রলোক এসে দলের সঙ্গে মিশে গেছেন। তিনি এক বাঙ্কে, সেজছেলে এক বাঙ্কে। 

সবাই মিলে বেশ শুয়ে যাওয়া যাচ্ছে। ডাক্তারবাবুর মেয়ের জন্য একটু লোভ আছে সেজছেলের মনে । সে বাঙ্কে চলে গেল। 

সেই শিশুকেন্দ্রিক পুরুষ-রমণীতে সংলাপ। 

পুরুষ—‘নাও এখন দুধটা খাইয়ে দাও।’ 

রমণী—‘এখনি?’ 

পুরুষ—‘আবার কী, রাত্রি দশটা বেজে গেছে--' 

রমণী—‘ ঐ ব্যাগ থেকে স্পিরিট-ল্যাম্পটা বের করো।’ 

পুরুষ—‘কই? এ ত গেলাস—’ 

রমণী—‘ঐ ত ওর নীচে, আর-ই, তোমার বাটিটা—’ 

পুরুষ--‘আমার বাটি ?” 

বঊটি হেসে ফেলল। বরটি স্পিরিট ল্যাম্প, বাটি ও দুধের বোতল বের করতে-করতে বলল, ‘যাক। তুমি তাহলে এখনো ঠাট্টা-তামাসা বোঝা? 

কোলের বাচ্চার কপালে হাত বুলিয়ে বৌটি বলল,'কেন?’ 

স্পিরিট-ল্যাম্প জ্বালতে জ্বালতে ভদ্রলোক—‘গত চারদিন ত দেখিনি, তাই।’ 

বৌটি চোখ নিচু করে বাচ্চার ভুরুতে আঙুল দিয়ে—‘আহা-হা।' 

স্পিরিট-ল্যাম্পের ওপর বাটি চাপিয়ে দুধ ঢালতে ঢালতে ভদ্রলোক—“তুমি আড়াই মাসের এক বাচ্চা নিয়ে আমার দিকে যেভাবে গত চারদিন তাকিয়েছ, তাতে ত মনে হচ্ছিল আমি তোমার ভাসুরঠাকুর বা মেশোমশাই।' 

‘কী যে বলোনা, তোমার মাথার ঠিক নেই।' 

‘যাক, কপালে আরো কী লেখা আছে কে জানে? এখন বাচ্চার দুধ গরম করতে হচ্ছে, এরপর হয়ত—’ 

‘তা করতে হবে না নাকি? আমার কি একার দায়?' বলে বৌটি বাটি থেকে এক ঝিনুক দুধ তুলে বাচ্চার মুখে দিতেই বাচ্চা তারস্বরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। 

ভদ্রলোক বিদ্যুৎস্পৃষ্টবৎ দাঁড়িয়ে উঠে বললেন—‘হল ত, দুধ খাওয়ানোটাও শেখোনি?’ 

‘খ্যাঁচ খ্যাঁচ করো না ত, চুপ করে বসে থাকো।' 

‘হ্যাঁ। সারাদিন এক ঝিনুক দুধ পড়ল না পেটে, আমি ত চুপ করেই থাকব।' 

‘তাহলে তুমিই খাওয়াও।' 

বাঙ্কের ওপর সামনের বেঞ্চিতে সেই গীতরসিক যুবক তার আরো তিন বন্ধুসহ শুয়ে। এই প্রচণ্ড ঝগড়ায় তাদের একজন—‘ঘুমের বারটা বেজে গেছে—’ 

পাশের খুপরির দ্বিতীয়া, অর্থাৎ খোকা ও সেজছেলের মা উঠলেন! এখন আর জায়গা যাবার ভয় নেই। বললেন—রুনু, তোর ঠাণ্ডা লাগছে না ত?’ 

সেজছেলে বলল—‘না।' ভদ্রমহিলা এ-খুপরিতে এসে নতুন পিতাকে বললেন-‘উঠুন।’ 

‘আঁ’ বলে ভদ্রলোক উঠলেন। খোকার মা তার জায়গায় বসতে-বসতে বৌটিকে শুধোলেন—‘প্রথম বাচ্চা?’ বৌটি ‘হ্যাঁ” বলে দুবার মাথা ঝাঁকাল। খোকার মা বৌটির কোল থেকে বাচ্চাকে কোলে নিলেন। বাচ্চা আরো কেঁদে উঠল। বৌটি আবার নেবার জন্য হাত বাড়াতেই খোকার মা বললেন-‘আৱে রাখো।’ তারপর বাটি থেকে এক ঝিনুক দুধ নিয়ে কান্নার জন্যে হাঁ-করা বাচ্চার গলায় ঢেলে দিলেন। হঠাৎ কান্না থেমে গেল, ঢোকৎ করে একটা শব্দ। তারপর আবার প্রচণ্ডতর কান্না। আবার এক ঝিনুক। ঢোকৎ। বাচ্চার। বাবা চেঁচিয়ে উঠল—‘বিষম লাগবে।' খোকার মা বললেন- ‘ওদিকে যাও ত হে, আমি ন-ছেলেমেয়ের মা। শোনো মা , ঝিনুকের মধ্যে এ-রকম এক আঙুল ডুবিয়ে খাওয়াবে।' ভদ্রলোক হঠাৎ বৌটির ওপর রেগে গিয়ে বললেন—‘বাতাস দাও না —দেখছ না ঘেমে গেছে।’ পেছন থেকে একটা পাখা বের করে বৌটি হাওয়া দিতে শুরু করল। ততক্ষণে দুধও শেষ। 

বাচ্চাকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে-দিতে খোকার মা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাড়িতে নিশ্চয়ই মা আছেন?’ 

বৌটি হাসল। 

‘আর শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়ি?’ 

মেয়েটি আবার হাসল। 

‘ব্যাস, ঐ বুড়ির কোলে ফেলে দেবে—সব ঠিক হয়ে যাবে।’ 

দ্বিতীয়া নিজের জায়গায় ফিরে গেলেন। বাচ্চা তার মায়ের শাড়ির ভাঁজে অদৃশ্য। বাচ্চার বাবা একটা সিগারেট ধরিয়ে বাচ্চার মায়ের পাশে বসতে-বসতে বলল,’তুমি একটি অপদার্থ।’ 

‘হ্যাঁ, বলা খুব সোজা মশাই। তোমার হলে বুঝতে।' 

‘এ কি আমার না নাকি?’ 

‘এই, কী যে বলো, খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু, বাঃ, আমি তাই বলেছি নাকি, কোনো মানে হয় না।' 

এই সংলাপের কিছু অংশ নিঃসন্দেহে চার যুবকের কানে গেছে। তাদের একজন--‘মদন, কটা বাজে রে?’ 

'এই ধর সাড়ে দশ, পনে এগার—’ 

‘এখুনি শুরু ?' বলে একজন খুব কুঁকিয়ে পাশ ফিরল। 

‘মদন" 

‘এ্যাঁ’ 

‘তোর নামটা এত খারাপ কেন রে?’ 

‘পছন্দ না-হয় বদলে নে। লাইনে দাঁড়িয়েছি, তোদর পছন্দটা ত আগে দেখতে হবে।’ 

‘এই, সিগারেট দে।‘ একজন উঠে বসে—‘শালা পরীক্ষায় যে কী হয়—’ 

‘কী আবার হবে। আমেরিকার স্পুটনিক। দশবার আছাড় খেয়ে এগারবারে পাশ করবি—' 

‘ওসব কথা ছাড়ো চাঁদ, তৈরি ত করেছে—সে দশবারেই হোক, এগারবারেই হোক।' 

আর-একটি গলায়--'রাত্রি বারটার কাছাকাছি। রাজনীতি নিষেধ।' 

‘মাইরি-যুদ্ধ যুদ্ধ এ-চ্যাঁচানি আর ভাল লাগে না। কী দরকার বাবা আমাদের পরীক্ষা দেয়া, পাশ করা, চাকরি খোঁজা-- কোনদিন ফটাস করে বোমা ফাটাবে, ব্যস, ভবলীলা সাঙ্গ।’ 

সিগারেটটা জানলা দিয়ে গলিয়ে শুয়ে পড়তে-পড়তে—‘তার চাইতে, মেয়ে-ছেলে-ফেলে দিয়ে দে, দুদিন ফুর্তিফার্তি করে টেঁসে যাই।' 

‘নো স্ল্যাঙ প্লিজ।’ 

‘আরে আমার মানিক রে । রাত্রিবেলা ট্রেনে যাচ্ছি, একা-একা, খিস্তি করব না । তোমার গোঁফজোড়া নিয়ে আমি কী করব বলতে পারো?’ 

‘শালা তোর গোঁফটা কাট মাইরি, তোকে শেষে মিনিস্টার বানিয়ে দেবে।’ 

‘মাইরি, আর ভাল্‌ লাগে না। কলকাতা যাচ্ছি, ধর, এই ট্রেনটা এ্যাকসিডেন্ট হল।’ 

‘এ্যাকসিডেন্ট ইজ এ্যাকসিডেন্ট।’ 

“হ্যাঁ, যখন সমস্ত নিয়মকানুন মেনে, সব দিকে নজর রেখে, সব কিছু ঠিক মত ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও কিছু হয়-- তখন বলা যায় এ্যাকসিডেন্ট। ত এদের শালা ইঞ্জিন বানাবে, চাকা লাগবে না--ওটাকে এ্যাকসিডেন্ট বলে না, বুঝলি? আচ্ছা ওটা না-হয় এ্যাকসিডেন্ট, ধর ডাকাত উঠল—উঠে তোর কাছে তোর প্রাণটা ছাড়া কিছু পেল না, ঐটি নিয়ে চলে গেল—’ 

‘আরে বাবা, মরার জন্য অত ডাকাত-ফাকাতের দরকার কী, রটিয়ে দিলেই হয় যে অসুখে মারা গেছে –’ 

খুকির মা আপাদমস্তক চাদর দিয়ে খুকিকে ঢেকে রেখেছেন। বাঙ্কের ওপর এম. এ. পড়া সেজছেলে খুকির মুখ দেখতে পারছে না। মেয়েটাও মুখটা বের করছে না। ওঃ! কী দোষ ছিল রাতের ট্রেনের একটি মাত্র মেয়ের একটু চঞ্চলা হতে?’ 

গাড়িটা স্টেশনে থামার জন্য বাঁশি বাজাতে ও বেগ কমাতে শুরু করতেই সেজছেলের বিপরীত বাঙ্কে পোর্টফোলিও ব্যাগসহ ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন—‘দরজার ছিটকিনি আটকে দিয়েছেন?’ 

সেজছেলে ইতিমধ্যেই বিরক্ত। সে পাশ ফিরে শুতে-শুতে বলল, ‘গাড়িটা তো আর আমি র্রিজার্ভ করিনি।’ 

বাঙ্ক থেকে নামতে-নামতে পোর্টফোলিও বললেন, ‘মাসে দুবার আমাকে এই লাইনে যাতায়াত করতে হয়। এই স্টেশন থেকে চোর ওঠা শুরু হয়।’ 

ডাক্তারবাবু বেঞ্চের ওপর উঠে এসেছেন; 'অ্যাঁ ? চোর?' 

বেঞ্চের নীচে জুতোজোড়া খুঁজতে খুঁজতে পোর্টফোলিও বললেন, ‘জি.আর পি-তে গিয়ে খবর নিন, এ-ট্রেনে রোজ রাত্রিতে পাঁচসাতটা চুরি হবেই।’ 

ডাক্তারবাবু একবার নিজের সব মালপত্রের দিকে তাকালেন। পাশের খুপরিতে গিয়ে পোর্টফোলিও জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনারা সব কলকাতা ত?’ বর উত্তর দিল, 'হ্যাঁ'। যুবকদের একজন। উত্তর দিল, ‘হু’। অতঃপর দরজার ছিটকিনি আটকে দিয়ে ‘যতই ঠেলাঠেলি চেঁচামেচি করুক, স্টেশন ছাড়া কিছুতেই দরজা খুলবেন না' বলে ভদ্রলোক নিজের জায়গাতে ফিরতেই ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা, এ-রাস্তায় কী খুব চুরি হয়?’ 

‘প্রতি রাতে পাঁচসাতটা।’ 

‘কী চুরি হয়?’ 

‘পারলে ট্রাঙ্ক, স্যুটকেস, বেডিঙ-- মানুষ অব্দি। আর না-পারলে গলার হার, কানের দুল-- এইসব ।’ 

শুনে খুকির মা উঠে বসায়, খুকির মুখ থেকে চাদরটা সরে গিয়েছিল বটে, কিন্তু এমন হা করে চুরির গল্প শুনছে খুকি, যে, সেজছেলে সযত্নে বাঁধা বেণীর ফ্রেমে ' আঁটা একটা অতি কচি মুখ 

পোর্টফোলিও এইসব গল্প বলছিল, ‘আরে মশাই, ভাবা যায়, এই ত সেদিন। রাচি এক্সপ্রেসে—দেখেছেন তা কাগজে? ভাবা যায়, যাতে ডেডবডি ধৱা নাপড়ে, সেজন্য হাত-পা-মাথা কেটে-কেটে ছড়াতে-ছড়াতে গেছে। তারপর ঐ যে, চারটি কলেজের মেয়ে কোত্থেকে ফিরছিল, ব্যাস। তারপর দুন এক্সপ্রেসে নাকি এক বাচ্চাকে, তার মায়ের কোল থেকে, চলন্ত গাড়িতে, নিয়ে নেমে গেছে, আর তারপর টাকা ডিমাণ্ড করে চিঠি দিয়েছে।’ 

বৌটি বাচ্চাকে তার বুকে জড়িয়ে বলল, 'যত সব বাজে কথা।’ 

বরটি বলল, ‘হ্যাঁ, ফার্স্ট ক্লাস ছেড়ে তোমার এই থার্ডক্লাসে আসতে যাবে কে?' বৌটি বলল, ‘ফার্স্ট ক্লাসের চাইতে থার্ডক্লাসে ঢোকা অনেক সহজ, দরজাটা খুলো না বাবা।’ 

বাঙ্কের ওপর থেকে এক যুবক গলা জড়িয়ে বলল, 'কেন, মনে নেই আপনাদের সেই বিরাট কেস?' ডাক্তারবাবুর গলা শোনা গেল, ‘কী? কী?’ আর-এক যুবক চাপা গলায় বলল, ‘কী হচ্ছে? এই? দাঁড়া-না, মজা করি বলে গল্পবলা যুবক পাশের খুপরির দিকে মুখটা বাড়িয়ে বলল, 'সেই যে, খুন করে ট্রাঙ্কে ভরে জংশন স্টেশনে নেমে গিয়ে পরের দিন আর-এক ট্রেনে ওটা বুক করে দিয়ে বাবু অন্য ট্রেনে উঠে বসলেন।’ ডাক্তারবাবুর স্ত্রীর গলা শোনা গেল, ‘অ্যাঁ?' যুবকটি আরো উৎসাহের সঙ্গে বলা শুরু করল,‘আর সেই যে--।’ আর-একটি যুবকের কণ্ঠ এই যুবককে থামিয়ে দিল, ‘এই চুপ কর ত। এ-ট্রেনে ওসব কিছু হয় না, আপনারা ঘুমুন, দরজাটা না খুললেই হল।’ প্রথম যুবকের আক্ষেপ, 'ওঃ, শালা সাধুপুরুষ এসেছেন? দিতাম একটু ভয় খাইয়ে।’ 


রাতটাকে দুভাগে চিরে যেন অন্ধবেগে ট্রেনটা বেয়ে চলেছে। কামরায় বসে ট্রেনের গর্জন, দুলুনি, আর মাঝে-মাঝে কাঁপা বাঁশি শুনে মনে হয় দুটো লোহার লাইনের ওপর বাষ্পচালিত ইঞ্জিন নয়, যার কর্তৃত্ব অন্ধ নিয়তির হাতে তেমনি কোনো যন্ত্রের ওপর নিজেদের এই জীবনরক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অথচ এই ইঞ্জিন মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে অন্ধকার থেকে এই কামরাটাকে উদ্ধার করে এনেছিল। তখন এই ইঞ্জিনকেই মনে হয়েছিল জীবনবিধাতা। বস্তুত এই কামরাটায় মাত্র কিছুক্ষণ আগে জীবনটা যে মধুর-- তার অনস্বীকার্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। আবার এইমাত্র সেই জীবনে মৃত্যুও যে ধ্রুব এবং তার আক্রমণের স্থানকাল ভেদ নেই তারও স্বীকৃতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, জীবনটা যেন বড়লোকের বাড়ির নানারঙা জানলা, কোনটা ঠিক রঙ তা বোঝা যায় না। অর্থাৎ, যাত্রাগানের সেই দায়িত্বহীন চরিত্রটির সঙ্গে এবার ট্রেনের এই নবজাত শিশু থেকে প্রায় পঞ্চাশোর্ধ্ব ডাক্তারের জীবনের তুলনা হয়ে যায়-- আস্তিকতা-নাস্তিকতা, জীবন-মৃত্যু ইত্যাদিতে যে প্রতিনিয়তই নিজেকে বিশ্বাসী করছে। 

তার প্রাণভোমরা নিহত হয়েছে টের পেয়ে মরবার জন্য রাক্ষসের ছোটার মত বা শেলাহত লক্ষ্মণকে বাঁচাবার জন্য গন্ধমাদন নিয়ে পৌরাণিক বীরের ছোটার মত ট্রেনটা ছুটছে। এই কামরার ভেতরে তখন সনাতন জীবনের এমন একটা ছবি--যা দেখে ইতিহাসকে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, মনে হয়, জীবন একটি প্রাচীন ভাস্কর্য, সহস্রাব্দের দ্বারা যার স্থায়ী সৌন্দর্য পরীক্ষিত। ছবিটা এই প্রকার : বাচ্চাকে বুকে নিয়ে সেই নতুন বৌটি বরের কোলে মাথা রেখে হাঁটু মুড়ে ঘুমিয়ে আছে,বরের একটি হাত বৌয়ের খোঁপার ওপর; কামরার আলো কমে যাওয়ায়, নাকি রাত্রি গভীর হওয়ায় খুকির মুখটা ধীরে ধীরে ভরে উঠছে, সেজছেলে তাকিয়ে আছে-- যেন একটি কুঁড়ির ফুল হওয়া দেখছে; সেজছেলের মা খোকাকে সবখানি জায়গা ছেড়ে দিয়ে নিজে সামান্য একটু জায়গায় কুঁকড়ে আছেন। 

ইতিহাসের প্রভাবমুক্ত এই আদি ও অকৃত্রিম সনাতন জীবন কামরায় নিয়ে খামোকা ট্রেনটা পথের মাঝখানে একবার থেমে, খানিকক্ষণ বাঁশি বাজিয়ে আবার চলা শুরু করল। আর তার কিছুক্ষণ পরই দরজায় সেই অমোঘ শব্দ-- যে-শব্দে শতাব্দীর নাম, বৎসরের নাম, আর গ্রহের নামটা মনে করিয়ে দেয়।’ 

প্রথমে খুব আস্তে আস্তে দুবার, আর যেন প্রায় আদেশের মত ‘দরজাটা খুলুন।’ কথাটা সবাই শুনেছিল, কেউ সাড়া দিল না। বারকয়েক ঐ কণ্ঠস্বর শান্ত নির্দেশের মত থেকে ‘দরজাটা খুলুন’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। ট্রেন তার ক্ষণবিরতির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তখন আবার বেগ নিচ্ছে। ডাক্তারবাবু উঠে বসলেন। সেই একই কণ্ঠস্বরে ‘দরজাটা খুলুন’ শুনে ডাক্তারবাবু দাঁড়ালেন। এবং পরের পর ‘দরজাটা খুলুন’ শুনেই পোর্টফোলিও ভদ্রলোককে ধাক্কা দিলেন। ‘চুপচাপ শুয়ে থাকুন, দরজা খুলবেন না,’ বলে ভদ্রলোক পাশ ফিরলেন। ডাক্তারবাবু বসে পড়লেন। ‘দরজাটা খুলুন।’ সেজছেলে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে মশাই, দরজাটা খুলে দিন না।' ডাক্তারবাবু কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘দরজা খোলাটা কি ঠিক হবে, মানে স্টেশন আসার আগে?’ করুন গে যা ইচ্ছে' সেজছেলে পাশ ফিরল। ‘এই সুভাষ, দরজাটা খুলে দে ত’, চার যুবকের এক যুবক বলল। ‘দরজাটা খুলুন-না,' এবার বড় করুণ শোনল গলাটা। ট্রেন তখন পূর্ণবেগে চলেছে। বাইরে একটি লোক ঝুলছে, এই কথাটি বোধহয় সবাইকেই খানিকটা অস্থির করল। এক যুবক ডাক্তারকে বলল, কেননা ডাক্তার তখন এই খুপরিতে এসে দাঁড়িয়েছেন—‘যান না, দরজাটা খুলে দিন ।’ ‘দেব’ ডাক্তার এগুলেন। আর-এক যুবক—‘হ্যাঁ দিন, মানে ছিটকিনিটা দরজার আড়াল থেকে খুলবেন, মানে দরজাটা খুললে আপনি যাতে তার আড়ালে পড়েন।’ ‘মানে?’ ডাক্তারবাবুর প্রশ্ন শুনে যুবকটি হেসে উঠল, ‘না না। এমনি বলছিলাম। যান, খুলে দিন।’ ডাক্তারবাবু দরজার কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকলেন, ‘তারপর ছিটকিনিটায় হাত দিতেই দরজায় প্রথম লাথিটা পড়ল, ‘দরজাটা খুলুন, খুলুন—’ আর সঙ্গে সঙ্গে সেই লাখি আর চিৎকারকে যেন ডুবিয়ে দিতে ট্রেন বাঁশি বাজিয়ে গমগম করে একটি ক্যালভার্ট পেরিয়ে গেল। ডাক্তারবাবু পিছিয়ে এলেন আর এই কামরার মানুষগুলো একসঙ্গে জেগে উঠল।চিত্রবৎ। 

দরজায় সেই করাঘাতে পদাঘাতে পূর্ববর্তী সনাতন জীবনের বিপর্যয় এরকম: বৌটির খোপা ভেঙে কাঁধের ওপর, চারজন যুবকই মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে, সেজছেলে আর পোর্টফোলিও পর পর, ঘুমন্ত খোকাকে আঁকড়ে সেজছেলের মা বসে, খুকিকে রেখে ডাক্তারগিন্নি স্বামীকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে, খুকি যেন সেই মুহূর্তেই বয়ঃসন্ধি পেরুল। 

শতাব্দীর নাম, খিস্টাব্দের নাম আর এই গ্রহের নামের প্রশ্নটা চাকায় চাকায় গমগম করে বেজে চারপাশে ছুটে যাচ্ছে। 

‘বাঁচান, বাঁচান, দরজাটা খুলুন, খু-লু-ন’--দরজায় লাথির শব্দ, তার সঙ্গে টিনের জানলায় ঘুষি। ছিটকিনিটা থরথর করে কেঁপে উঠল। সেই চার যুবকের একজন গম্ভীরভাবে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ছিটকিনিতে হাত দিল। আর সেই নতুন-পিতা তার কাঁধে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, 'কী করছেন?’ 

‘দেখতেই পাচ্ছেন’—যুবকটি ছিটকিনি খুলতে গেল। 

‘দরজা খুলুন।’ দরজায় লাথি পড়তেই ছিটকিনিটা কেঁপে উঠল। 

‘দরজা খুলবেন না', বলে সেই নতুন-পিতা, যুবকটির হাত ছিটকিনি থেকে এক হ্যাঁচকায় সরিয়ে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল। 

বাকি তিনজন যুবকের একজন তখন এগিয়ে এসেছে, 'মানে?’ 

‘মানে, দরজা খুলতে দেব না।' 

‘মানে, ঐ লোকটা মারা যাবে?’ 

‘মারা যাবে কেন ? নেক্সট স্টেশনে খুলব।' 

‘ততক্ষণ ঐ লোকটা হ্যাঁণ্ডেল ধরে ঝুলবে?’ 

পেছন থেকে পোর্টফোলিও চিৎকার করে উঠল, 'কিসের লোক মশাই ? মাঠের মাঝখানে ট্রেন থামল, আর তারপরই ‘দরজা খুলুন।’ কোত্থেকে আসবে লোকটা? খবরদার, দরজা খুলবেন না।’ 

‘হ্যাঁ, দরজাটা না-খোলাই বোধহয় ভাল হবে’, ডাক্তারবাবু বললেন। 

‘দরজাটা খুলুন, মারা গেলাম, খুলুন’, লাথি ও ঘুষি এবারও পড়ল, কিন্তু নতুন- পিতা দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে ছিটকিনিটায় ঝনঝন করে কোন শব্দ হল না। 

অকস্মাৎ ওপাশের হাঁটু পর্যন্ত ঘোমটা দেয়া সেই ভদ্রমহিলা চিৎকার করে কেঁদে উঠতেই, সেই কান্নার শব্দে চমকে জেগে খোকা কাঁদতে শুরু করে দিল, খোকাকে বুকে জড়িয়ে ‘ঠাকুর ঠাকুর’ করে খোকার মা বসে পড়লেন, 'মা' বলে খুকি তার মাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল, আর বাচ্চা বুকে পাগলের মত প্রথম খুপরির নতুন-মা ছিটকে এসে পড়ল দ্বিতীয় খুপরিতে। 

দরজায় মাথা কোটার শব্দ ‘খুলুন, খুলুন--দরজাটা খুলুন।'. 

‘আপনারা কি মানুষটাকে মেরে ফেলবেন নাকি?’ একটি যুবক এগিয়ে এল।নতুন-বাবাকে এক হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে দিল। আর ফলে ট্রেনের দুলুনির সঙ্গে সঙ্গে টুকুর টুকুর করে ছিটকিনিটা দুলল, আর পোর্টফোলিও পাগলের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে বললেন, ‘খবরদার, দরজা খুলবেন না।’ 

পদার্টফোলিও আর নতুন-বাবা পাশাপাশি দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে। যুবকটি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আপনারা কি লোকটাকে খুন করতে চান?’ 

‘আপনারা কি এতগুলো লোককে খুন করতে চান’, পোর্টফোলিও চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘রাস্তার মাঝখানে-থামা গাড়িতে লোক উঠবে কোখেকে মশাই?' 

‘আপনাদের মত লোকের ত আর অভাব নেই, এতক্ষণ হয়ত অন্য কামরায় ঝুলছিল।' 

‘দরজাটা খুলুন, দরজাটা খুলুন, বাঁচান—’ 

ট্রেনটাকে যেন ভূতে পেয়েছে এত প্রচণ্ড শব্দ উঠছে। একটা সঙ্কীর্ণ দরজার এ-পাশে ও-পাশে জীবন, মৃত্যু, হত্যা, জন্ম সব মিলেমিশে একাকার। দরজাটা স্বচ্ছন্দে প্রশ্নচিহ্নের আকার নিতে পারত। 

‘আমরা দরজা খুলব’, একজন যুবক নিশ্চিত পদক্ষেপে এগিয়ে এল। আর, ওদিককার পাঁচটি নারী একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, ‘না—আঁ।' আঁ--টা শেষে কান্নায় ভেঙে ট্রেনের শব্দের সঙ্গে মিশে গেল। 

‘দরজা খুলতে দেব না’, শ্লেষাজড়িত কণ্ঠে ডাক্তারবাবুর এই কথা সমস্ত ঘটনাকে যেন চম মুহূর্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। 

যুবকটি পোর্টফোলি ও ও নতুন-বাবার সম্মুখে এসে বলল, 'সরুন।’ 

‘না।‘ 

সেজছেলে এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি। তার মা ও ভাইয়ের কথা মনে রেখে শুধু ভেবেছে—যদি মা ও ভাই না থাকত তবে ত আমি নিশ্চিত যুবকদের দিকে যোগ দিতাম। মা আর ভাই আছে বলে আমি ওদের বিপক্ষতা করি কী করে? এইবার সে বলল, ‘ঐ জানলাটা খুলে আগে দেখে নিন না, তাহলেই ত ল্যাঠা, চুকে যায়।’ 

‘না না না, জানলা খুলবেন না--’ বলে দরজার কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে সেজছেলেকে টেনে নিয়ে কানে-কানে কী বললেন পোর্টফোলিও। সেজছেলে বিস্ফারিত চোখে চার যুবকের দিকে তাকাল। সেই একই কথা পোর্টফোলিও নতুন-বাবাকে কানে-কানে বললেন। নতুন-বাবা হঠাৎ ভুরু কুঁচকে দরজা খোলার পরের বিপদকে সামনে দেখল এমন করে তাকাল। ‘কী’, বলে ডাক্তারবাবু কানটা এগিয়ে দিলেন, তারপর শুনে ‘এ্যাঁ'বলে দেয়ালে হেলান দিয়ে প্রায় মূর্ছা গেলেন। 

চার যুবকের এক যুবক চিৎকার করে উঠল, ‘এই চলে আয়—’ 

আর-একজন—‘না, যাব না? একটি লোক মারা যাচ্ছে, আর—’ 

আগের জন—‘চলে আয়, দেখছিস না, ওঁরা আমাদের ডাকাতদলের লোক বলে সন্দেহ করছেন।’ বাইরে প্রবল কান্নার মত গলায় ‘দরজাটা খুলুন’, সটাৎ শব্দ করে ট্রেনটা বোধহয় একটা পোড়ো গুমটি পেরিয়ে গেল। সেই যুবক বলল, ‘এর পর কিছু হলে—’ 

সেই চার যুবক মানুষের প্রেতাত্মা হয়ে পেছনে হাঁটা শুরু করল, তারপর খুপরির মুখটাতে এসেই ঘুরে তাড়াতাড়ি আড়ালে চলে গেল; এই আলোতেও ওরা পরস্পরকে দেখতে চাইছিল না। যদি ওরা দরজা খোলে, আর যদি বাইরের লোকটা চোরডাকাত কিছু হয়, যা হওয়ায় সামান্যতম সম্ভাবনা আছে, না-হওয়ার সম্ভাবনা ততোধিক, তবে ওদের হাজতবাস করতে হতে পারে-- আত্মরক্ষার এই প্রত্যক্ষ প্রশ্নে হয়ত-বা ওরা বাইরের ঐ হয়ত দুর্বল আশ্রয়প্রার্থীকে হত্যা করল। হত্যা না-করেও বিপদ, আর আত্মরক্ষা না-করেও গ্লানি। অথচ নিয়মিত ব্যবধানে দরজায় আঘাত পড়ছে। আর সোঁ সোঁ শব্দে শতাব্দীর নাম, খ্রিস্টাব্দের নাম, গ্রহের নাম জিজ্ঞাসা করতে-করতে ট্রেনটা ছুটছে। 

ডাক্তারবাবু, পোর্টফোলিও, নতুন-বাবা, সেজপুত্র দরজা ছেড়ে দাঁড়িয়েছেন, আর ছিটকিনিটা টুক টুক করে দুলছে। সবাই মাঝে মধ্যে ওটার দিকে তাকাচ্ছেন, যেন ওটা একটা জীবিত অস্তিত্ব। 

আর এই চারজনই নিজেদের ভেতর দিকে তাকিয়ে চিন্তা করছে—আত্মরক্ষা করার মৌলিক অধিকার খাটাতে গিয়ে, মৃত্যুকে হটাবার মৌলিক মানবিক অধিকারকে কি দরজার বাইরে ফেলে দেয়া হল। এপার্টফোলিও অবিশ্যি একবার ছিটকিনিটায় হাত দিলেন, তারপর হেসে এই তিনজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাদের সঙ্গে ফ্যামিলি আছে, আমি ত একা, একবার খুলে দেখলে—।’ কিন্তু কেউ কোনো সাড়া না দেওয়ায় তিনি ঐ দরজাটার ওপরই খানিকটা এলিয়ে পড়লেন-- প্রতিরোধের জন্য নয়, নিজেকে সেই জীবন বা মৃত্যুর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ করবার জন্য। নাকি তিনি ঐ চার যুবককে যে-সন্দেহ করেছেন, তাঁকেও আর সবাই সেই সন্দেহ করবে, যদি তিনি দরজা খোলেন ! 

এই সঙ্কীর্ণ কাঠের দরজায় কে আঘাত করছে? হত্যা না মৃত্যু? এই চার যুবক কোন দলের? মারবার না বাঁচাবার? এই চার মানুষ কী চায়? মারতে না বাঁচতে ? জীবন কি এই কামরায় নারী আর শিশুতে কাঁদছে, নাকি বাইরে হ্যাঁণ্ডেল ধরে ঝুলছে ? এটা কী বাঁচা না মারা ? ট্রেন, এই বাষ্পচালিত মহান যন্ত্র, কামরার ভেতরের লোকগুলোকে বাঁচাচ্ছে, নাকি বাইরের লোকটাকে মারছে? সঙ্গমরত দুই সাপের মত বিচিত্র জটিল বন্ধনীতে আশ্লিষ্ট এই দুই প্রশ্নের আলাদা দেহ চেনা যায় না। 

বাইরে ট্রেন প্রবল শব্দে হু হু গর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড বাঁশি বাজিয়ে বাঁক নিচ্ছে। আগুনের ফুলকি ছুঁড়ছে আকাশে। 

পরের স্টেশনে দরজা খুলে কাউকে পাওয়া গেল না। 

ঘন্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে থেকে যারা শেষে একটা বড় গাড়ির সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে পথে বেরিয়েছিল, তারা আত্মরক্ষার আরাম ও স্বস্তি এবং হত্যাকারীর বিষাদ ও গ্লানিতে আর-এক মানুষ হয়ে গন্তব্যে পৌঁছেছিল। কিন্তু মানুষগুলিই বদলে যাওয়ায় গন্তব্যও আর স্থির থাকেনি। 



------
১৯৬২ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন