মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

মাহরীন ফেরদৌস'এর গল্প : এক কামরার ঘর



ধীরে ধীরে চোখ খুললাম আমি। মাথা ভার হয়ে আছে বেশ, সেই সাথে ধোঁয়াটে। মনে হচ্ছে অবেলায় ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখার পর যেমন লাগে তেমন কিছু। চারপাশে ভালো করে তাকানোর আগেই টের পেলাম শার্টের পকেটে মোবাইল ফোনটা শব্দ করছে, ঘরঘর, ঘরঘর। ফোন বের করে দেখি; আর মাত্র দুই পারসেন্ট চার্জ আছে, ‘স্টুপিড পাওয়ার সেভিং মোড। কোনোই লাভ হয় না।’ মনে মনে ভাবলাম। ব্যাগে চার্জার নিয়ে বের হইনি। একটা পাওয়ার ব্যাংক কিনব কিনব ভেবে কেনা হচ্ছে না। প্রক্যাস্টিনেশন? নাকি নিজের আদিখ্যেতা? জানা নেই।

- 'পানি আছে?’ কন্ঠ শুনে চমকে তাকাই। একি! এ দেখি বড় আপা! সে এখানে কীভাবে এল? ব্যাকপ্যাক থেকে হাতড়ে পানির বোতল বের করার চেষ্টা করতে থাকি। পোস্টার টিউব, কিছু ফাইল-খাতা ও বক্সের মাঝে বোতলটা পেয়েও যাই। পানি আছে মাত্র কয়েক ঢোঁক খাওয়ার মতো। আপার দিকে এগিয়ে দেই। আমার চোখে-মুখে ঘুরতে থাকে প্রশ্ন প্রশ্ন ভাব। তার আজকে অফিস নেই? আপা বোতলের পানি খাওয়ার জন্য ক্যাপ ঘোরাতে থাকে। আমার চারপাশটা হঠাৎ একই সাথে হয়ে ওঠে নীরব ও সরব। টের পাই কখন সে বোতলের সাদা ক্যাপটা ঘোরাল, ক্যাপটা খুলতেই ভেতর থেকে একটা ফাঁপা শব্দ বেরোল। আস্তে আস্তে সে সেটা এক হাতে মুঠো করে ধরে অন্যহাতে মুখের কাছে নিয়ে গেলো। ঢোঁক গিলল, পানি খাওয়ার আগেই। গলা শুকিয়ে ছিল; এরপর অল্প অল্প করে পানি খেতে শুরু করল। আমি তার নিঃশ্বাস, ভিজে ওঠা গলার ও পানির সব ধরণের শব্দ শুনতে পেলাম। শুনতে শুনতে ভারী হয়ে উঠল আমার নিঃশ্বাস। টানটান হয়ে এলো ইন্দ্রিয় ও চেতনা। যেন এখনই, ঠিক এখনই আমি শূন্যে লাফ দেব। সূক্ষ্ণ থেকে সূক্ষ্ণ শব্দও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। গায়ের সব লোম গেল দাঁড়িয়ে। সাথে সাথেই লম্বা করে শ্বাস নিতে শুরু করলাম আমি। এখনই বুকের ভেতরটুকু লক্ষ টন পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠবে, এর আগেই আমাকে শান্ত হতে হবে। এমন হয় আমার সাথে। কেন হয়, কবে থেকে হয় তাও বুঝতে পারছি। সত্যি বলতে এমন লাগাটা মন্দ লাগছে না। আরও অনেক কিছু অনুভব করতে পারছি। যেমন একাকীত্ব। ‘আপনারা কি কখনও একাকীত্ব অনুভব করেছেন? সত্যিকারের একাকীত্ব। কোন কবির বানোয়াট কবিতার মতো নয়। কিংবা কখনও উপেক্ষার কিংবা অপেক্ষার ঘ্রাণ নিতে পেরেছেন? এমন কি হয়েছে অদৃশ্য কিছু আপনার তর্জনী ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছে অনেক দূরের কোনো পথে?’ এসব কিছু আমার সাথে হয়েছে। শুধুই আমার সাথে।



আপার সাথেও অবশ্য অনেক কিছু হয়েছে। ও বিশ্বাস করত বাড়ির জুতা উপুড় করে রাখলে ঝগড়া হয়। থেকে থেকে জুতা উপুড় হয়ে পড়ে থাকত দরজার কাছে। ও বারবার ঠিক করত। হলুদ রঙ পরলে মনে করত কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে। নাকফুলের পাথর কিংবা পুশ হারিয়ে গেলে ভাবত তাঁর স্বামী মারা যাবে। এক শুক্রবার, নাকফুলটাই নাক থেকে পড়ে হারিয়ে গেল। সারাবাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সে পেল না। পাশের বাড়ির বাড়িওয়ালার পঙ্গু মেয়েটার সাথে জ্বিন ছিল। সন্ধ্যারাতে সেই জ্বিনকে ডাকা হলো নাকফুলের খোঁজে। সারা ঘর অন্ধকার, আগরবাতির তীব্র ঘ্রাণে নিঃশ্বাস নেওয়া দায়, মাথার ওপর শোঁ শোঁ করে ঘুরছে ফ্যান। তাতে আগরবাতির ঘ্রাণ আরও ছড়িয়ে যাচ্ছে। চারপাশে থাকা সবাই বিড়বিড় শব্দে দোয়া পড়ছিল। হঠাৎ ঠন করে একটা শব্দ হলো, কী যেন একটা পড়ল ঘরের মেঝেতে। আর জানালার বাইরে একটা বিড়াল শব্দ করে ডেকে উঠল। নিশ্চুপ হয়ে গেল সবাই। কে যেন লম্বা সালাম দিয়ে জ্বিনকে নাকফুলের কথা জিজ্ঞেস করল, আর এমন সময় সেই গহীন অন্ধকারের মাঝে প্রায় কঙ্কালসার দেহের ভেতর থেকে আরেকজন বজ্রকণ্ঠে বলে উঠল, “ দক্ষিণ পূর্ব দিকের ঘরের, ডানপাশে থাকা কাঠের আলমারির নিচে পড়ে আছে নাকফুল।”

শুকরিয়া, শুকরিয়া বলতে বলতে মুখে প্রায় ফেনা তুলে ফেলল ঘরের সবাই। ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দিল কেউ। অবাক হয়ে দেখলাম ঠকঠক শব্দ আসছে পঙ্গু মেয়েটির কাছ থেকে। তার বিকল দু হাতের হাড়ে অদ্ভুত ঠোকাঠুকি। তার মা ছুটে গিয়ে দোয়া দুরুদ পড়ে, মাথায় পানি দিয়ে তাকে ঠাণ্ডা করল। নাকফুলটা পাওয়া গিয়েছিল। ঠিক আলমারির নিচেই। আপা হাসল, হাসল আম্মা; প্রতিবেশীরা। সেই পঙ্গু মেয়েটা হেসেছিল নাকি জানতে পারিনি। 



আমার মনে পড়ে, ছোটবেলায় আপা নিজেকে ঘুমন্ত রাজকুমারী ভাবত। মনে করত সোনার কাঠি, রুপার কাঠি এদিক-সেদিক করে কোন এক রাজকুমার এসে তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যাবে। একদিন আমাদের বাড়িতে এলো এক অন্ধ ফকির। তাকে একটা বাক্সে করে খাবার দিতে গেলো। সে তখন প্রশ্ন করল, ‘বল দেখি মা, পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি জিনিসের নাম কী?’
আপা বলল, ‘চিনি।’ 



- ‘হলো নারে মা, ভুল বললি। কাষ্ঠ হেসে বলল ফকির। ‘পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি জিনিস হলো মানুষের মুখের কথা। সুন্দর কথার চেয়ে মিষ্টি কিছু নেই। মা রে, তুই আর ঘুমিয়ে থাকিস না। কেউ আসবে না। কটু হলেও এই সত্য কথা তোকে বলে গেলাম।’ এই বলে বাক্স আর লাঠি হাতে সেই অন্ধ ফকির বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল। আমিও তাই সেদিন থেকে আপাকে বলতাম, 'ওয়েক আপ, কেউ আসবে না তোমার জন্য প্রিন্সেস অরোরা। আর, ঘুমিয়ে থেকো না।’ 



আপার পানি খাওয়া শেষ। সে বোতলটা আমার দিকে এগিয়ে দেয়। আমি খালি বোতলটা হাতে নিই। পাশের দেয়ালে একটা বিশাল বড় ম্যাপ টাঙানো। এত এত দেশ, মহাদেশ থাকার পরও আমার কিউবার দিকে চোখ চলে যায়। ম্যাপে দেখতে পাই ক্যাপিটাল অফ কিউবা ‘হাভানা' শহরকে। এ শহরের ওল্ড টাউনেই আর্নেস্ট হেমিংওয়ে নিজের হাতে লিখেছিল, “মাই মোহিতো ইন লা বোদেগুইতা, মাই ড্যাকেরি ইন এল ফ্লোরিদিতা” এই লাইনটা আমার মাথায় বাজতে থাকে। যদিও আমি মনে করতে পারি না; কবে, কোথায় প্রথম পড়েছিলাম এই লাইন।

- ‘আর পানি নেই? থাকলে আম্মাকে দেওয়া যেত।’ আপা আমাকে বলে। আমি কিছুটা চমকে উঠি। আম্মা কোথায়? ডান পাশে তাকিয়ে দেখি বেঞ্চির মতো চেয়ারে বসে আছেন তিনি। তাকে ঘিরে কিছু ধোঁয়া কিংবা কুয়াশা। ঝাপসা লাগে। শীতকাল চলে এসেছে? ভোর নাকি এখন? এবার ভালো করে ঘরটা দেখি। না, ঘর নয়; কামরা। হয়ত ট্রেনের কিংবা উন্নত মানের বড় কোনো যাত্রীবাহী বাসের। আট বাই দশ ফুট ঘর। দেয়ালের রঙ হালকা সবুজ; কিংবা কালো। আবছা আলোতে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আপা ঘাড় কাত করে গাল চুলকাচ্ছে। তার মুখে বেশ কিছু ব্রণ। আমি সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। ব্রণ থাকলেও আপার মুখে কোনো দাগ নেই। পরিচ্ছন্ন, নমনীয় মুখ। পাঁচবেলা ওজু করার কারণে হয়ত তার ত্বকে আলাদা আর্দ্রতা আছে। আবার ঘরটা দেখি আমি, দেয়াল মসৃণ। খুব মৃদু একটা রঙের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। হয়ত রঙ করেছে অনেকদিন হয়নি। ঘরের কোণে ঝাড়বাতির মতো নকশা করা লালচে বাতি। দেয়ালে মস্ত বড় ম্যাপ। ব্যস। আর কিছু নেই। একটা জানালা থাকতে পারত হয়ত। সেটাও নেই। এমন জানালাহীন ঘর দেখতে ভালো লাগে না। আপার সাথে কোন ব্যাগ দেখে পাই না। টাকাপয়সা, ব্যাগ ছাড়া চলে এলো কী করে? নাকি কেউ জুতা উপুড় করে রেখেছিল বলে ঝগড়া হয়েছে কোনো। সে কারণে রাগ করে বের হয়ে এসেছে? না, না, তার তো অফিস ছিল। তাহলে হয়তো অফিসে কিছু হয়েছে। এদিকে আম্মাকে পাশে থাকার পরেও কেমন দূরের মনে হয়। এটা যদি একটা বাস বা ট্রেন হয় তাহলে এটা কোথায় যাচ্ছে? আপা কি জানে? জানে নিশ্চয়ই। এই কামরা থেকে বের হয়ে পানি খুঁজে পাওয়া যাবে তো? 



আমি ব্যাগপ্যাক কাঁধে নেই। হাতে পানির বোতল। পানি আনতে হবে। আপা চোখ তুলে আমার দিকে তাকায়। তারপর বলে, 'জলদি পানি নিয়ে আয়। যদি আনতে পারিস।’

আমি জানালাহীন ঘরটায় দরজা খুঁজতে থাকি। ডানে-বামে যেদিকেই তাকাই না কেন, প্রথমে খুঁজে পাই না কোথাও। এরপরেই দেখি আমার বসার জায়গার ঠিক পেছনেই একটা ছোট্ট দরজা। রঙ গাঢ় খয়েরি। সেই দরজা এতই ছোট যে একটা দশ বছরের শিশুকেও নিচু হয়ে যেতে হবে। আমি সেদিকে এগিয়ে যেতে থাকি। ব্যাগটা ভালো করে কাঁধে নিয়ে এরপর ঝুঁকে যাই। হামাগুড়ি দিয়ে অল্প করে এগোই। দরজার কাছে গিয়েই দেখি বাইরে থেকে একজোড়া চোখ আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মনে হয় আরেকটু হলেই চিৎকার করে উঠতাম। শেষ মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিই। একজন মহিলা। বয়স চল্লিশের কাছে হবে। কোঁকড়া চুল। দৃষ্টি যেন কেমন। তাকে কিছু বলব নাকি বলব না ভাবতে ভাবতে আমি পিছিয়ে যাই দেয়ালের দিকে। আপা ছুটে আসে পাশে। ‘আসেন আসেন’ বলে মহিলার এক হাত ধরে তাকে অনেকটাই টেনে কামরার ভেতর ঢোকায়। 



- ‘পানি আছে?’ কামরায় ঢুকেই ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে মহিলা। আপা আর আমি মুখ চাওয়া-চাওয়ি করি।

আপা বলে, 'আমার ভাই আনতে যাচ্ছে পানি।’

আমি অনিশ্চিত ভঙ্গিতে সায় জানাই।


মহিলা তখন বলে, 'আচ্ছা আমিও তাহলে তার সাথে গিয়ে পানি খেয়ে আসি।’ তাকে নিচু হয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে আপা কিছুটা অস্থিরতার সাথে বলে, 'কিন্তু আপনি তো যেতে পারবেন না।’ তারপর আমার দিকে ইশারা করে বলে, ‘আসলে আমার ভাইটাও হয়তো যেতে পারবে না। তবুও চেষ্টা করছিল। শুধু মনে হয় আম্মা পারবে। তাই না আম্মা?’ 



আম্মা কিছু বলেন না। শুধু মুখ তুলে তাকান। তার মুখের বলিরেখাগুলো কেমন প্রকট হয়ে একটা শিশুর এলোমেলো চিত্রকর্ম হয়ে যায়। আমি দেখতে পাই তিনি মুখ খুলছেন কথা বলার জন্য। ধীরে, ধীরে, খুব ধীরে। তার চোখের মণি বড় হচ্ছে, কিন্তু কথা আসছে না কিংবা বলছেন, কিন্তু শব্দ হচ্ছে না। আপা আম্মার দিকে কিছুটা ঝুঁকে বলেন, ‘আপনি পানি আনতে পারবেন আমাদের জন্য?’ আম্মার মুখটা লম্বাটে হতে থাকে। চোয়াল ঝুলে পড়ে যেন চামড়ার ভারে। এডভার্ট মাঞ্চের ‘দ্য স্ক্রিম’ নামের পেইন্টিং মতো লাগে আম্মার মুখটা। মনে হয় এখনই সে দুই হাত দুই কানে দিয়ে মুখ হা করে আর্তনাদ করে উঠবে। বোবা মানুষের মতো কিছু বলার জন্য মুখ ঘোরাতে থাকেন আম্মা। আমরা কিছুই শুনতে পাই না। পাশের মহিলা হঠাৎ ভয় পেয়ে যান।

বিড়বিড় করে বলেন, 'উনার কী হয়েছে?’ 


আপা বললেন, ‘কিছুই না। আমরা যে উনাকে দেখতে পাচ্ছি উনি জানেন। তাই এমন করছেন।’

- ‘দেখতে পাবেন না কেন? উনার চারপাশে এত ধোঁয়া কেন? উনি কি অসুস্থ?’ আবার প্রশ্ন করেন মহিলা। এবার যেন ভয়ের সাথে সাথে শঙ্কা যোগ দেয়। 



আপা সপ্রশ্নে তাকায় মহিলার দিকে, তারপর বলে- ‘আপনি জানেন না কিছু এখনও তাহলে?’ 



- ‘কী জানব?’ পাল্টা প্রশ্ন করে মহিলা। 



- ‘থাক বাদ দিন।’ আপা হাল ছেড়ে দেয়। এরপর গভীর মনোযোগে ম্যাপের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমার মনে হয় ম্যাপটা ঘুরছে অল্প অল্প করে মেঘের মতো। হলুদ, কমলা, গোলাপি, সবুজ, গাঢ় সবুজ, নীল সব রঙের ছড়াছড়ি। একদম উপরে ইংরেজিতে ক্যাপিটাল অক্ষরে লেখা ‘দ্য ওয়ার্ল্ড’। আপা সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। মহিলা তার উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখে যেন উষ্ণ হয়ে ওঠেন।

আবার ফ্যাসফ্যাসে স্বরে বলেন, 'বললেন না কী জানব?’ 



আপা উত্তর দেয় না। মহিলা এবার আমার দিকে তাকায়। আমি চুপ করে থাকি। ঘাড় হেঁট। আমি জানি না কিছুই। কী বলব আমি? উত্তরের আশা না দেখে মহিলা আবার নিচু দরজার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। আমি বুঝতে পারি সে আমাদের উন্মাদ বা পাগল ভেবে বের হয়ে যেতে চাচ্ছে। সে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যোগ নিতেই চঞ্চল হয়ে ওঠে আপা। ঝট করে ছুটে গিয়ে মহিলাকে ধরে ফেলে। ঝটকা মেরে তাকে সরাতে চান তিনি। ধমকে উঠে বলেন, 'আমাকে ছাড়ুন। যেতে দিন।’ 



আপা রীতিমত মরিয়া হয়ে আমার দিকে তাকায়। আমি কী করব বুঝে উঠতে পারি না। মহিলাকে ধরে রাখব? নাকি এভাবে এক মহিলাকে বাধা দিতে যাওয়া নিয়ে বড় কোনো ফ্যাসাদ ঘটবে? বুক ধুকপুক শুরু করে দেই। নিরুপায় হয়ে আপা আমাকে কোনক্রমে চোখের ইশারায় ডাকল। মহিলা এদিকে আপার সাথে ধস্তাধস্তি শুরু করে দিয়েছে। তাকে আটকে রাখতে পারছে না। আমি কাঁধের ব্যাগ ফেলে ছুটে গিয়ে মহিলার দুই হাত শক্ত করে ধরি।


- 'ছাড় আমাকে তোরা, ছাড়।’ তুই তোকারি শুরু করে দেন মহিলা। আমি দ্বিধায় ভুগতে ভুগতে ধরে রাখি তাকে।

আপার মুখ-চোখ শক্ত হয়ে আসে। সে আমাকে প্রায় ধমকে বলে, ‘বলে দে উনাকে সব।’ 



আমি বিস্মিত হয়ে তাকাই, ‘কী বলব?’ আমাকে কী বলতে বলা হচ্ছে বুঝে উঠতে পারি না। কী বলার ছিল এই মহিলাকে? আমি তো উনাকে চিনিই না। আগে কোনদিন দেখিনি। তাহলে কী বলার থাকতে পারে?

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে আপাই এবার চিৎকার করে ওঠে, - ‘শান্ত হন, শান্ত হন। আপনি এই ঘর থেকে বের হতে পারবেন না এখন। এখানে এসেছেন তাও তো বেশিক্ষণ হয়নি। সে জন্য তো আরও পারবেন না। শুধু শুধু চেষ্টা করলে আরও বিপদ হতে পারে।’ 



- ‘মানে?’ আর্তনাদ করে ওঠেন মহিলা। তার ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠ চিৎকারের জন্য দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ফিরে আসে। পারলে প্রতিধ্বনিত হয়। আপা এবার শক্ত হাতে আটকে ধরে মহিলাকে, তারপর কন্ঠ শান্ত করে বলে- ‘আপনি, আমি, আমরা এখানে সবাই এক রকম। না, আসলে ভুল বললাম, আমরা তিনজন এক। আম্মা আমাদের মতন নয়। উনি ভিন্ন। তবে আম্মা আমাদের দেখতে পাচ্ছেন। এই যে অদ্ভুত ধোঁয়া, এটা পৃথিবীর, প্রাণের। আপনি দিশেহারা না হবার চেষ্টা করুন। বাইরে বের হবার চেষ্টা করবেন না। আমরা বহুদূরে চলে যাচ্ছি। আর কিছুক্ষণ পর হয়তো আম্মাও আর আমাদের দেখতে পাবেন না। বাইরে কী হবে, কী আছে কে জানে? কেন অযথাই ঝামেলায় পড়বেন?’ 



‘আমরা তিনজন কেন এক? কেন ওই মহিলা ভিন্ন? তারমানে কী দাঁড়ায়?’ ভাঙা স্বরে এ টুকু বলেই প্রায় মাটিতে বসে পড়েন মহিলা। আর আমরা কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হু হু করে কেঁদে ওঠেন। এই প্রথম আমার মনে যেন বিষাদ জেগে ওঠে। এতক্ষণ কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারিনি। আপা সবকিছু বলার পরেও। মহিলার কান্নার দমকে আমার মনে পড়ে যায়, আমিও তো তাহলে চলে যাচ্ছি কোথাও। আগের কিছুতে আর ফিরে যাওয়া হবে না। কোথায় যাচ্ছি তাও জানি না। সব কিছু বাদ দিয়ে আমার তখন শুধু একজনের মুখ মনে পড়ে। যাকে রেখে এসেছি ফেলে আসা পুরানো জীবনে। কেমন ওলট-পালট লাগে আমার। কোনো কিছুর সাথে কোনো কিছুর পার্থক্য তুলে ধরতে পারি না। মনের মাঝে কেমন যেন ফাঁকা সংঘর্ষ কাজ করে। মনে হয় বিনা রক্তপাতেই ভেতরে ভেতরে একের পর এক গুলি খেয়ে যাচ্ছি। দেখতে পাই, আপা দুই হাতে জড়িয়ে ধরেছেন মহিলাকে। আর তিনি কেঁদেই যাচ্ছেন। 



অদৃশ্য এক যন্ত্রণা আমার কানের কাছে এসে বাঁশি বাজাতে থাকে। বেশি কিছু আর ভেবে উঠতে পারি না। দেখতে পাই, আম্মা ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় আরও ঝাপসা হয়ে যাচ্ছেন। আমি কয়েক মুহূর্ত থমকাই, তারপর নিপুণভাবে আমার পোস্টার টিউব থেকে কাগজ; ব্যাগ থেকে স্কেল আর পেন্সিল বক্স বের করি। খুব খুব দ্রুত এখন আমাকে একটা জরুরি কাজ করতে হবে। আম্মা থাকতে থাকতেই তাঁর শেষ অভিব্যক্তিটা আঁকতে হবে। যেভাবেই হোক। পাবলো পিকাসো, সালভাদোর দালি কিংবা এডভার্ট মাঞ্চের মতো না হলেও কারোও মতো; কিংবা আমার নিজের মতো। তবুও আঁকতে হবে। আমি মিডিয়াম সার্ফেস ড্রয়িং পেপারে প্রিয় ফ্যাবার ক্যাস্টেল পেন্সিল দিয়ে আঁকতে শুরু করি।

আমার আম্মা, প্রিয় আম্মা ধীরে ধীরে মুছে যাওয়া কোন স্মৃতির মতো ঝাপসা হতে থাকেন। আর আমি মেঝেতে কাগজ বিছিয়ে দ্রুত পেন্সিল চালাতে থাকি। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় প্রখর হয়ে যায়। মনে হয় আমার মাথার ভেতরে কোন সিঁড়ি জন্ম নিয়েছে, সেই সিঁড়ি বেয়ে আমি দ্রুত উঠে যাচ্ছি মহাকাশের দিকে। ধনুকের ছিলার মত টানটান হয়ে থাকি। যেন সময় থেমে যায়, কিংবা হয়তো থেমেই ছিল। আগে বুঝতে পারিনি। একবুক পানির তৃষ্ণা নিয়ে আমি তিন আঙুলে শক্ত করে কাঠপেন্সিলটা ধরে সাদা কাগজে ঘষতে থাকি। ঘষতেই থাকি।

সবুজ দেয়ালের ঘ্রাণ, রঙিন হয়ে থাকা বিশ্বম্যাপ, অপরিচিত এক মহিলার কান্নার শব্দ আর আপার গায়ের খুব চেনা ঘ্রাণে ভরে উঠতে থাকে এই ছোট্ট কামরাটা। 
 



1 টি মন্তব্য: