মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

নিবেদিতা আইচ'এর গল্প: বিগ্রহ



একটা হিলহিলে হাওয়ায় গাছের পাতাগুলো নড়ে উঠতেই বিপুলের গা ছমছম করে উঠলো। ভোরের ছায়ান্ধকার এখনো কাটতে শুরু করেনি। কান পাতলে শিশিরের শব্দ শোনা যায়। ভট্টাচার্য বাড়ির পূজা এবার নমো নমো করে হবার কথা থাকলেও প্যান্ডেল প্রতিবারের মতোই জাঁকজমক করে করেছে। বাড়ি ফেরার পথে বিপুল দেখেছে মস্ত বড় প্যান্ডেলটা। লাল নীল মরিচ বাতিগুলো তখনো নেভেনি।

বাতাসে ধুপধুনোর সুঘ্রাণ। রাজীবদের শিউলি গাছটা ফুলে ফুলে সাদা হয়ে আছে। পথের উপরেও ফুল ঝরে পড়েছে। বুক ভরে ঘ্রাণ নিতে নিতে আসছিল বিপুল দাশগুপ্ত। চারুকলা থেকে পাস করে বের হবার পর একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করছে তিন বছর ধরে। এবার বাড়ি এলো প্রায় ছমাস পর। ঐচ্ছিক ছুটি নিয়েছে বিপুল। নইলে শুধু বিজয়ার ছুটিতে এতদূর জার্নি করে আসা পোষায় নাকি! মা প্রতিবারই লক্ষ্মী পূজা অব্দি থেকে যেতে জোরাজুরি করে। কিন্তু দশমীর বিকেলে বা পরদিন ভোরবেলা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয় ওকে।

একটু সামনে এগিয়েই অতনুদের বাড়ি। বাড়ির সামনে নতুন টিউবওয়েল। এর আগেরবার এটা দেখেনি বিপুল। প্রতিবারই বাড়ি এলে সে টের পায় চেনা দৃশ্যগুলি কেমন অল্প অল্প করে বদলে যাচ্ছে। ব্যাগটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে রেখে শার্টের হাতা গুটিয়ে নেয় সে। হ্যান্ডেলের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ভোরের মাধুর্যটা মুহূর্তেই খানখান হয়ে যায়। শীতল জলের ঝাপটায় গাটা শিরশির করে ওঠে ওর৷

দূরে বিষ্ণুমন্দিরের চূড়ায় বসে একটা বিশাল আকৃতির পাখি অদ্ভুত ভঙ্গিতে ডানা ঝাপটাচ্ছে। সেদিক থেকে চোখে সরিয়ে পাশের বাবলা গাছটার দিকে তাকাতেই একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। মনে হচ্ছে শরীর ধরে কেউ ঝাঁকাচ্ছে ওটাকে। গাছের পাতায় পাতায় যেন অশরীরি কিছু ভর করেছে।

বাকি পথটুকু বিপুল প্রায় ছুটতে ছুটতে গেল। সেই ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফেরার পথে যেমন হতো, বুকে থুতু দিয়ে রাম নাম জপতে জপতে আসতো ওরা। এ বয়সে এমন ভয় পাওয়া কি ছেলেমানুষি! পথটা পেরিয়ে এসে একটু দাঁড়ায় বিপুল। হাঁ করে বুক ভরে শ্বাস নেয়। সামনে তাকাতেই যেন দেখতে পায় সদর দরজায় মা দুর্গা দাঁড়িয়ে আছে। আহ্, এবার আর ভয় কিসের!

মা কাছে এলেই মিষ্টি একটা ঘ্রাণ নাকে ঝাপটা দিয়ে যেত। পূজার দিনগুলিতে ভোরবেলাতেই স্নান সেরে আহ্নিক করে ফেলত মা। চোখমুখ থাকত ভেজা ভেজা। বিপুল মনে মনে ভাবে, হয়ত হাত পাতলে এখনও সে সাগুমাখা কলা খেতে পাবে। আর মা আগের মত করেই বলে উঠবে, আগে স্নান সেরে আয় বাবু, গরম জল দিচ্ছি।

অনেকদিন পরপর বাড়ি এলে প্রথম দু'দিন শুধু মাকে দেখত দেখতেই কেটে যেত বিপুলের। কপালে সিঁদুরের ফোঁটাটা কেমন জ্বলজ্বল করতো, শাড়ির আঁচলে রাখা চাবির গোছাটা কেমন ঝনঝন করতো!মাকে মনে হতো যেন কিশোরবেলার প্রিয় উপন্যাসের কোনো চরিত্র। দুর্গার আরেক নাম গৌরি, মায়ের নামও তাই। বৌদি আর দিদিদের কখনো মা দুর্গা মনে হয়নি ওর। ওরা আজকালকার মেয়ে, অত বড় করে সিঁদুর টিদুর পরে না। মোটা মোটা শাঁখা নোয়াও না। সরু আর নিত্য নতুন ডিজাইনের চুড়ি চাই ওদের।

আজকে সপ্তমীপূজা। ভট্টাচার্য বাড়ির মন্ডপে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। এদিকের লোকজন সব ও বাড়িতেই অঞ্জলি দেয়। লাউডস্পিকারে চণ্ডীপাঠ হচ্ছে। বিপুল স্নান সেরে বের হয়েছে। এই সকাল সকাল বৌদি জোর করে একগাদা লুচি পায়েস খাওয়ালো। ভরপেট খেয়ে কেমন অস্বস্তি লাগছে এখন। হাঁটতে হাঁটতে দু'চক্কর দিলে আরাম পাবে বলে বেরিয়েছে সে। এ সুযোগে এলাকার প্রতিমাগুলোও দেখা হয়ে যাবে। তবু সন্ধ্যায় দল বেঁধে বের হওয়া চাই। নইলে বৌদি আর দিদিরা সব গাল ফোলায়।

হাঁটতে হাঁটতে অতনু, রাজীবলোচনদের বাড়ি পেরিয়ে আসে সে। মন্দিরের চূড়ার দিকে চোখ চলে যায়। ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়ে বিপুল। পাখিটা যায়নি এখনো। ভোরবেলায় সেই একই ভঙ্গিতে বসে ছিল। একসময় এই মন্দির নিয়ে অনেক জল্পনাকল্পনা করতো ওরা। আজ ভোরে অনেকদিন পর যে ভয়মিশ্রিত অস্বস্তিটা হয়েছিল এখন আর তা নেই। পুরো জায়গাটা জুড়ে বনগাঁদা, হাতিশুঁড়, লতাকস্তুরীরা অনেকদিন হলো জাঁকিয়ে বসেছে। শ্যাওলার পুরু স্তর ফুঁড়ে দেয়ালের শরীর থেকে চকচকে সবুজ ফার্ণ মাথা তুলে বেরিয়েছে। বিপুল সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে এগোচ্ছে। বহুদিন পর এদিকে এলো সে। কিশোর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরতো ওরা। মাগরিবের আজানের পর মন্দিরের ভেতর এক ঘন্টা থাকতে পারলেই পঞ্চাশ টাকা জেতা যেতো। সেসব বহুদিন আগেকার কথা। এখন বোধ হয় কেউ এমন বোকা বোকা বাজি ধরে না। কাছে যেতে যেতে বিপুল এবার একটু অবাক হলো কারণ একটু আগেও চূড়ায় যে পাখিটাকে দেখতে পেয়েছে সেটা এখন আর নেই। কখন চলে গেছে লক্ষও করেনি।

একসময় রৌদ্রপাড়ায় একমাত্র দর্শনীয় জায়গা ছিল এই মন্দিরটা। এমন পরিত্যক্ত মন্দির দেখতে এখন আর তেমন কেউ আসে না। তাছাড়া জমিটার মালিকানা নিয়েও বছরখানেক ধরে কী সব গণ্ডগোল চলছে।

মন্দিরের মূর্তিটা ভীষণ সুন্দর ছিল, কালচে রঙের, কষ্টিপাথরের। বিপুলের কাছে এখন যেটা আছে ঠিক ওটার মতো রঙ ছিল। ওর মনে আছে যতবারই সে প্রণাম করে মাথা তুলতো মনে হতো বিষ্ণুঠাকুর তার দিকেই তাকিয়ে আছেন। মাঝেমাঝে সে জায়গা বদল করেও দেখেছে। সব কোণ থেকেই মনে হতো বিগ্রহের দৃষ্টি তার দিকেই নিবদ্ধ। সেই মূর্তিটিই বছর পনেরো আগে একদিন হঠাৎ করে মন্দির থেকে বেদীসহ চুরি হয়ে গেল। এমন ঘটনার পর এলাকায় বেশ শোরগোল পড়ে গিয়েছিল।

বিপুলের মনে আছে সেবার পুরো পূজার ছুটিটা চুরির ঘটনা নিয়ে জল্পনা কল্পনা করে কাটিয়েছিল ওরা সবাই। দীর্ঘদিন ধরে কথিত আছে জমিদার কেশবচন্দ্রের দীঘিতে বিষ্ণুঠাকুরের ঐ বিগ্রহটা পাওয়া গিয়েছিল। সেও এক রূপকথার গল্পের মতো কাহিনী। প্রায় শত বছর আগে সাহা বাড়ির বড় ছেলে ভূপেন সাহা স্বপ্নে ঠাকুরের আদেশ পায়। আদেশ পাওয়া মাত্রই মাঝরাতে লোকটা ছুটে গিয়ে কেশবচন্দ্রের দীঘিতে ডুব দেয়। পরপর ছয়বার ডুব দিয়ে বিষ্ণুর বিগ্রহ, বেদী, পঞ্চপ্রদীপ, কোষা, ধুপদানি,পুষ্পদানি তুলে আনে৷

বিগ্রহ চুরির ব্যাপারটা অনেকেই মানতে পারেনি। তাদের ধারণা ছিল কোনো কারণে ঠাকুর অসন্তুষ্ট হয়েছেন তাই আবার জলে ফিরে গেছেন। কেউ কেউ তো প্রস্তাবও দিল দীঘিতে লোক নামাতে, জলে নামলে আবার সেখানেই নাকি পাওয়া যাবে কষ্টিপাথরের মূর্তিটি।

সেবার পূজার ছুটিতে বিপুল প্রথম কাদামাটি দিয়ে প্রতিমা বানাতে শুরু করে। ওর তৈরি বিষ্ণুমূর্তি দেখে বাড়ির সবাই অবাক হয়েছিল। মা গর্ব করে বলেছিল তার ছেলের হাতে যাদু আছে। মূর্তিটা দেখতে অনেকটাই মন্দিরের বিগ্রহটার মতোন। ফলে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে সে একের পর বিগ্রহ বানাতে থাকে। হয়ত একারণেই পরবর্তী জীবনে মৃৎশিল্প ওর পড়াশোনারও বিষয় হয়ে উঠেছে৷

মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াবার পর বিপুল আজকে যেন ছেলেবেলার সেই অদ্ভুত আমেজটা ফিরে পেলো। কেমন গা ছমছম করা পরিবেশ, কেমন একটা ঘোরগ্রস্ত মুহূর্ত! ঐ পশ্চিম দিকে কয়েক পা এগোলেই জমিদার কেশবচন্দ্রের দীঘিটা দেখা যায়। সেবার বিগ্রহ চুরি হয়ে যাবার পর ওটা খুঁজতে গিয়ে জলে ডুবে দুজন মারা গিয়েছিল। এরপর থেকে পুরো ব্যাপারটাই এই এলাকার লোকজনের কাছে অভিশপ্ত হয়ে গেছে। দীঘিটাও আর ব্যবহার করা হয় না। চুপিচুপি দীঘিতে ঢিল ছুঁড়তে যাওয়ার দুপুরগুলোর কথা মনে পড়ছে ওর।

এদিক ওদিক হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশ বেলা বাড়ছে। রোদের তেজে ঘামতে শুরু করেছে বিপুল। বৌদির ফোন এলো বলে সে ফিরে চললো এবার। যেতে যেতে ভাবলো আজকে মন্দিরের একটা স্কেচ আঁকবে। বহুদিন পর স্কেচ করতে ইচ্ছে করছে। ওর স্কেচবুকটাও বাড়িতে আছে, মা যত্ন করে তুলে রেখেছিল কোথাও ৷ বিপুল একা একা খুঁজে পাবে কিনা সেটাই প্রশ্ন।

আরো খানিকটা পায়চারি করে তারপর বাড়ি ফিরলো সে। বৌদি খেতে দিলো সবাইকে। এ বাড়িতে দশমীর আগ পর্যন্ত প্রতিদিনই নিরামিষ রান্না হয়। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত মা অন্তত পাঁচ পদের ব্যঞ্জন রান্না করতো। এসব ছাড়াও লুচি, পায়েশ, সন্দেশ তো থাকতোই। এবার বৌদি আর দিদিরা মিলে সেসব আয়োজন করছে। বিপুলকে এতদিন পরে কাছে পেয়ে ওরা থালা জুড়ে খাবার দিচ্ছে। কলকল করে কথা বলছিল ওরা সবাই।

খেতে খেতে অঞ্জলির কথা উঠতেই পরিবেশটা গুমোট হয়ে গেল। বড়দি কুমড়োর বড়া আনতে চলে গেল, মেজদি মাথা নিচু করে চুপচাপ খেয়েই চললো। আর বৌদি চোখের ইশারায় ওকে চুপ করতে বললেও বিপুল ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। তখন বাবা মৃদুগলায় বললেন অশৌচের এই বছরটা শেষ হতে আরো কদিন বাকি, এবছর তাই ওদের অঞ্জলি দেবার নিষেধ আছে।

এমন ভুলো মনের জন্য নিজের প্রতি প্রচণ্ড বিরক্ত হয় বিপুল। ওর মনেই থাকে না অত নিয়মটিয়ম। এখনো যে বছর গড়াতে আরো কয়েকটা দিন বাকি রয়েছে ভুলে গিয়েছিল। যেন মানুষটা এ বাড়িতেই কোথাও আছে, ডাকলেই সাড়া দেবে। কান পাতলেই তার চুড়ির শব্দ, চাবির ঝনঝন শোনা যাবে। বাড়ি ফিরলেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে বরাবরের মতোন।  

খাবার পর বৌদি এসে উপহারগুলো দেখতে চাইলে পরিবেশ যেন একটু হালকা হলো। দিদিরাও এলো পিছু পিছু। ওদের চোখেমুখে কৌতূহলের আভাস। প্রতিবারই এ মুহূর্তটা খুব উপভোগ করে বিপুল। ব্যাগ খুলে নতুন শাড়িগুলো ওদের হাতে দিল সে। দাদা আর বাবাকে দিল পাঞ্জাবি। মায়ের জন্য ইচ্ছে করেই এবার শাড়ি আনেনি। প্রতিবারই মা বলতো -গুচ্ছের টাকা খরচ না করে কিছু জমালেও পারিস! এ জন্মে আর হিসেব করে চলতে শিখলি না,ইত্যাদি। এবার আর মা বকবে না।

বৌদি আর দিদিরা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে এখনো। বিপুল এবার ব্যাগ থেকে কালো রঙের মূর্তিটা বের করলো। বিছানার ওপরেই রাখল ওটাকে। ওর হাতে তৈরি বেশ কিছু মূর্তি এখনো সাজানো আছে বসার ঘরের শোকেসে। সে পড়াশোনা করেছেই এ বিষয়ে। তাই মূর্তি দেখে প্রথমে কেউ অবাক হলো না। বৌদি এগিয়ে এসে হাতে নিল ওটাকে।

কালো রঙের নতুন এই মূর্তিটা দেখতে অনেকটা দুর্গা প্রতিমার মতো। তবে একে একে সেটা যখন সবার হাতে পৌঁছে গেল তখন কারো বুঝতে বাকি রইলো না মুখাবয়বটি কার।

বাবা কিছু একটা বলতে গিয়েও বললেন না৷ বোধ হয় একটা দীর্ঘশ্বাস গিলে ফেলে নিজের ঘরে চলে গেলেন। বৌদি আর দিদিরা এবার আর চোখের জল লুকালো না। ওরা বললো-ভালোই হলো, চলে যাবার এক বছরের মাথায় মা ফিরে এলো এ বাড়িতে, বিগ্রহের রূপ ধরে।



-------

রচনাকাল-সেপ্টেম্বর, ২০২০।



লেখক পরিচিতি:

নিবেদিতা আইচের জন্ম ২ এপ্রিল, চটগ্রাম। বাবার চাকুরীসূত্রে তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন মফস্বল শহরে। পেশায় চিকিৎসক। ব্যস্ততার ফাঁকে লেখালেখিতে মনের খোরাক খুঁজে পান। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ সমূহ–‘বিহঙ্গম’(২০২১), ‘নৈর্ঋতে’ (২০২০), ‘কিছু গল্প অবাঙমুখ’(২০১৮)।






কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন