মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

শামান সাত্ত্বিকের গল্প: ফিরে দেখা মেয়েকে



চাকু দিয়ে বুকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলতে থাকে তাকে। এবার কি করবে? বিশাল টোরন্টো লেকে ফেলে দেয়া ছাড়া …

ঘুম থেকে উঠে সে এদিক ওদিক তাকায়, গতকালের রাতের ঘটনা মনে পড়ে। ঘুমাতে দেয়নি তাকে সহজে। অনেক রাত করে ঘুমাতে হয়েছে। হাত-মুখ বেশ ভাল করে ধুয়ে নিয়েছিলো সে। চোখে-মুখে জলের ঝাপটাও দিয়েছিলো।

এখন সকাল গড়িয়ে দুপুর। ব্রেকফাস্টটা হলো না। ব্রাঞ্চটাই সারতে হলো। ব্রেকফাস্টের ডিমের অমলেটের সাথে দু'টো পরোটা ভেজে নিয়ে। কড়া এক দুধ-চাও বানিয়ে নিলো। কিচেন সংলগ্ন ব্যাক-ইয়ার্ডের দিকে তাকালো একবার। ওখানে সামারে চাষাবাদ হয় স্বল্প-বিস্তর। এখন তুষারে পরিপূর্ণ।

অনেকদিন থেকে তার মনে হচ্ছিল, গুলি মেরে লোকটার খুলি উড়িয়ে দেবে। অপরাধ জগতে ঢুকে যেভাবেই হোক একটা পিস্তল সংগ্রহ করতেই হবে। আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়া না কি আজকাল কোন ফাইটই জমে না। মানুষ যে কিভাবে নির্বিকার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে মগজ উড়িয়ে দেয়। আজকাল থ্রিলারে মন খুব মজে গেছে সামিলের। সিরিয়াস ফিল্মের চাইতে থ্রিলারে আকর্ষণ এখন বেশি, নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে। থ্রিলার দেখতে দেখতে সে প্রায়ই সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ঘুমে বুঁদ হয়ে পড়ে …

অনেকটা অচৈতন্যের মত পড়ে থেকে মেয়েটা কাতরাচ্ছে। দু'তিন ছায়ামূর্তি এক ঘরে। কেমন পোড়ো বাড়ি অথবা পোড়ো বাড়ি ভাব। সূর্যের চমৎকার মিষ্টি আলো এসে পড়েছে মেয়েটার মুখের বামপাশের উর্ধ্বাংশে। এক চোখে, কপালে, চুলে। মেয়েটার কাতরানো মাথা একবার বাঁয়ে হেলছে, আরেকবার ডানে, এক ছন্দময়তায়। ঘাড় থেকে শরীরের নিম্নাংশ মনে হচ্ছে অবশ, একটুও নড়ছে না। সূর্যালো যে কাতরানো কিশোরীর সৌন্দর্যকে বহুমাত্রায় বাড়িয়ে তোলে, সেটা সূর্যের মিষ্টি আলোর ছোঁয়া না দেখলে কিছুতেই বোঝা যেত না। হঠাৎ করে একটা ডাক শুনে মেয়েটা, দূরে কোথা হতে, "বেলীইইইই" - এক কোমল আদুরে ডাক - মার মতো। ঘরের আধো আলোতে ছায়ামূর্তিদের পুরুষ রূপ টের পাওয়া যায়। তারা কিশোরীর নগ্ন শরীরের দিকে তাকিয়ে সুখ-উদ্যাপনের আনন্দে ডুকরে হাসছে। দলা করা কিশোরীর পোশাকগুলি ছুঁড়ে ফেলে একজন তার উদোম শরীরের উপর। তারপর আরেক প্রস্থ হাসে।

কিশোরী তার শরীরের উপরে এসে পড়া পিঙ্ক রঙের পাতলা জ্যাকেটের উপর হাত রাখে। তার ছোট্ট সেলফোনের অস্তিত্ব টের পায়। বাইরে দু'টো গাড়ীর শব্দ পাওয়া যায়। অনেকটা পুলিশের গাড়ীর শব্দ। তিন পুরুষমূর্তি তটস্থ হয়ে উঠে । কোনরকমে দ্রুত তাদের পোশাক-আশাক গায়ে তুলে দিয়ে হুড়মুড় করে গাড়ীর শব্দের বিপরীত দিকের দরজা দিয়ে বের হওয়ার উদ্যোগ নেয়। এ সময় এক ঝলক আলো তাদের উপর এসে পড়ে। সূর্যের আলো থেকে এই আলোর পার্থক্য তাড়াহুড়োয় তারা বুঝে উঠে না।

এর কিছু সময় পর মার্থা অগাস্টিন বেলী-র ফেসবুক ওয়ালে দু'টো ছবি ভেসে উঠে। প্রথমটি তার আলুথালু চুল, ক্লান্ত মুখাবয়বে মিষ্টি সূর্যালো। অন্যটি তিন পুরুষের দরজার দিকে ধাবিত হবার দৃশ্য। পেছনের দু’জনের চেহারা মোটামুটি বোঝা গেলেও সামনের জনেরটা সহজে বোঝা যায় না। একের পর এক লাইক, লাভ, ওয়াও-তে ভরে উঠছে প্রথম ছবিটি। কেউ কেউ কমেন্টে প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে যা্‌য়, কেউ বলে, দারুণ।

সামিল আহমেদ তার ব্যবসায়িক অফিসে বসে ভাবছে ...। হঠাৎ করে দরজা ঠেলে আফতাব মুবিন তার অফিসে এসে ঢুকে। পেছনে আরো দু’জন। সে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। সামিল হতবাক হয়ে পড়ে। কোন এক সন্মোহনে, সেও হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে বসে। আফতাব কোমল স্বরে বলে, ভাই, আপনার কাছে সব রেখে গেলাম। আশা করি, সব ভালোভাবে দেখাশোনা করবেন। সামিল আঁৎকে উঠে। এই রকম আঁৎকে উঠতো সে, সময়ে সময়ে বাংলাদেশে । হ্যান্ডশেক থেকে হাত ছাড়িয়ে নিলে সে এক ঝটকা খায়। এই লোকটাকেই তো গতরাতে সে চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। তার ব্যবসার পার্টনার। বছর কয়েক আগে ক্যানাডায় এসে রাতারাতি কয়েকটা ব্যবসা গড়ে তোলে অন্টারিও-র ইটোবিকোক এলাকায়। তার রিয়েল স্টেট ব্যবসার সাথে সামিল জড়িত। গতবছর উদীয়মান একজন ব্যবসায়ী হিসেবে ইটোবিকোক বিজনেস ম্যাগাজিনে আফতাব মুবিনের নাম উঠে আসে। রাতারাতি একজন সফল অভিবাসী হিসেবে প্রশংসার ঢল বয়ে যায়। তার উপর করা ফিচারের সর্বশেষ লাইনটি ছিল, আমরা কি আফতাব মুবিনের মত এমন সফল অভিবাসী ক্যানাডায় আরো বেশি বেশি পেতে পারি না!? এখানকার এক রাজনৈতিক দলের সাথেও আফতাব মুবিনের সুসম্পর্ক। নিয়মিত তাদের ফান্ড রাইজিং-এ ভাল অংক কন্ট্রিবিউট করতেন। এক সময় শোনা গেল, এই সফল ব্যবসায়ী আফতাব মুবিন নন। তার আসল নাম, ইসমাইল পাটোয়ারী। একজন দাগী আসামী। বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় পালিয়ে নাম পরিবর্তন করে হন আফতাব মুবিন। ধর্ষণ, হত্যা, টেন্ডারবাজী, ব্যাংকের টাকা দেশের বাহিরে পাচার, এরকম বেশ কিছু অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। অনেকগুলো মামলা রয়েছে বাংলাদেশে । ইসমাইল পাটোয়ারীর ছবির সাথে আফতাব মুবিনের যথেষ্ট মিল। টোরন্টোর-র দৈনিক পত্রিকায় এ নিয়ে উঠেছে সচিত্র প্রতিবেদন। ইন্টারপোলকে সজাগ করা হয়েছে।

অফিসের দরজায় টোকা পড়ে। এক উচ্ছল কিশোরী কন্ঠ দরজা ফাঁক করে উঁচুস্বরে বলে উঠে, মে আই কাম ইন, স্যার।

সামিলের শান্ত উত্তর, আয় মা।

বাবা আজ আমায় জুডো ক্লাসে ড্রপ করে দিবে? তুমি তো বোধ হয় একটু পরে বের হচ্ছো।

তোর সাইকেলের কি হলো?

সমস্যা হচ্ছিল। বাসায় রেখে এসেছি।

ও, ঠিক আছে। কিছু খেয়েছিস?

হ্যাঁ, স্কুলেই সেরে এসেছি।

সামিল কতটুকু চেনে তার মেয়েকে। বলতে হয়, ধীরে ধীরে চিনে উঠছে। সাইকেল তার প্রিয় খুব। দেশে জিদ ধরেছিল, বয়স যখন তার বারো। তার সাইকেল লাগবে, সে সাইকেল চালানো শিখবে। পাড়ায় সাইকেল চালাতো। কিন্তু বেশিদিন পারে নি। পাড়ার টিনএজসহ সবধরণের রোমিওদের উৎপাত। বাসা থেকে বেরুলে যেমন বিপদ, বাসায় ফিরতেও তেমন বিপদ। সামিলের আঁৎকে উঠাটা তখন থেকে শুরু হয়। একদিন রিনিতা জিদ করে, সে জুড়ো বা কারাতে শিখবে। কারণ, তার উপর পাড়ার কোন ছেলের আক্রমণ এলে তা জুডো বা কারাতে দিয়ে মোকাবেলা করবে। সামিল তাকে জুডোতে ভর্তি করিয়ে দিলো। তারপরও যখন সামিল মেয়ের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকায়, একটা বিদঘুটে আতংক তাকে গ্রাস করে। সে নিজেও সুদর্শন, রিনিতা-র মাও সুদর্শনা, বাঙালি মেয়ে হিসেবে তার উচ্চতাও চোখ কেড়ে নেয়ার মত। রিনিতাও তাই সুদর্শনা, শ্যামলিমা। রিনিতা ক্লাস নাইনে উঠতে না উঠতেই সামিল আহমেদ ক্যানাডা থাকার পারমানেন্ট ভিসা পেয়ে যায়। অতঃপর দেরী না করে পুরো পরিবার নিয়ে দ্রুত ক্যানাডায় পাড়ি জমায়।

এখন এই বিকেল বেলা মেয়েকে দেখে তার বেশ মায়া মায়া ভাব জাগে। রিনিতা তার নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নিচ্ছে। এই তো সেদিন, শহরগামী সাবওয়ের ট্রেনে এক বয়স্ক লোক তার প্রতি অশ্লীল ইঙ্গিত করে যাচ্ছিল। দেরী না করে ট্রেনেই সে সাহায্যের জন্য কল করে বসে। ফলশ্রুতিতে পুলিশ এসে লোকটাকে ট্রেন থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। রিনিতার থেকে ঘটনা শুনে সামিল নতুন করে আঁৎকে উঠেছিল। তারপর ভাবল, ও, এটা তো বাংলাদেশ নয়।

সামিল এবার তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মেয়েকে বলে, চল মা।


লেখক পরিচিত
শামান সাত্ত্বিক
চলচ্চিত্র নির্মাণটা ধ্যাণ-জ্ঞান হলেও, অনিয়মিত কাব্য চর্চা ও গল্প রচনা অনেকটা হালকা নেশার মতই। মূলতঃ ব্লগ লিখতে লিখতেই একসময় বুঝে উঠেছেন লেখার চর্চা চালিয়ে যাওয়া জীবনের জন্য অপরিহার্য।
কানাডাতে থাকেন। 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন