মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

মাহবুব আলী'র গল্প : বংশীবাদক ও আকাশপরি উপাখ্যান




অনেক রাতে যেখানে সেটি রাখে, হাতড়িয়ে দেখল; নাই। ওই-সময় কাকে ডেকে জিজ্ঞেস করে? মন মুহূর্তে খারাপ হয়ে গেল। সে ঘুলঘুলি জানালা দিয়ে আলোছায়া অন্ধকারে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে কিছুক্ষণ। গোরস্তানের বুকে চঞ্চল হয়ে উঠেছে জোনাকিরা। ঝোঁপঝাড়ের মধ্যখানে ডোবায় দু-চারটি শাপলা গোলাপি-লাল বা শ্বেতশুভ্র জেগে থাকে অথবা ক্লান্ত ঘুমিয়ে পড়েছে। আজ পূর্ণিমা। চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় ঝকঝক বাঁধানো কয়েকটি সাদা কবর। কোনো নামফলক বা এপিটাফ ছায়া ছায়া আবছা দেখা যায়। অর্থশালী সক্ষম মানুষেরা মৃত শরীরের জন্য জায়গাটুকু কিনে নিতে পারে, গরিব মানুষ অসহায়; শেষ শয়ানেও করুণা কাঙাল। এদিক-ওদিক পরিত্যক্ত কোনো কোণায় আশ্রয় নেয়। সে গরিব। একদিন তারও মৃত্যু হবে। অবধারিত সত্য। পালানোর পথ নেই। সুতরাং সেও একদিন ভঙুর মাটির তলায় চলে যাবে। অপর জগতের জন্য কারও দু-চারটি দোয়া-দরূদ। বুকের উপর কয়েকটি খেঁজুর কাটা। শেয়াল-কুকুরে যাতে তুলে ফেলে খুবলে নিতে না পারে। তারপর একদিন মাটির স্তরের পর স্তর জমে উঠবে। সে ধীরে ধীরে আরও নিচে নেমে যাবে। কবরের দৃশ্যমান উপরে কোনো ইট-বাঁধানো নামফলক কিংবা এপিটাফ থাকবে না। সে অবশ্য অনেক পরের কথা। আয়ু গড়পরতা ষাট বছর হলে এখনো সাঁইত্রিশ বছর দেরি। জীবনের এই সময়ে বিষাদ ঘেটে মন খারাপ করতে চায় না, কিন্তু মন খারাপ হয়ে গেছে; কী করে ভালো হবে? বিছানায় তোষকের নিচে যা রেখেছিল, যত্নে তুলে রাখে; আতিপাতি খুঁজে পাওয়া গেল না। নাই। একেবারে গায়েব। এখন কী করে? তবে কি চোকির নিচে পড়ে গেছে?

সে শুয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবনায় ডুবে যেতে যেতে কী ভেবে একবার নেমে আসে। মেঝের উপর দাঁড়িয়ে দূর ভাবনায় ভেসে যায়। আরও একবার দেখা দরকার। কোথাও গড়িয়ে গেছে কি না? দিয়াশলাই জ্বালিয়ে বেশ ধীরস্থির চোকির নিচে দৃষ্টি ছড়িয়ে দেখতে থাকে। ডেকচি-হাঁড়ি-পাতিল-দুটো টিনের বাক্স আর বিবিধ জঞ্জালের ভেতর জমাট অন্ধকার। এরমধ্যে কোথায় তার তেল চকচকে বাঁশের বাঁশি? নিশ্চয় কেউ সরিয়েছে। কে হতে পারে? বাবা...অবশ্যই বাবা। বুড়ো বাঁশি বাজাতে দেয় না। সেদিন মা বেশ আদুরে গলায় আবারও আপত্তি তোলে, -

‘ফয়জুল এইলা ছাড়ি দি বা।’

‘কী ছাড়ি দিম?’

সে মনে মনে চমকে ওঠে। ইদানীং সিগারেট বেশি হয়ে যাচ্ছে। শফিক-বাবুলের পাল্লায় পড়ে কলকিতেও দু-চারবার টান দেয়া হলো। এসব আর করা যাবে না। মায়ের নাকে নিশ্চয় ভুরভুর গন্ধ পৌঁছে গেছে। তখন প্রায় মধ্যরাত। সাড়ে বারো পৌনে এক। সেকেন্ড শো সিনেমা দেখে ঘরে ফেরা। রাত নটায় আঙিনার পুবে ইট-প্রাচীরের দেয়ালের মধ্যখানে টিনের দরজা বন্ধ। বাবা চারিদিক দেখেশুনে তালা মেরে দেয়। তারপর শুয়ে পড়ে। সেই রাতে খোলা ছিল। মা জেগে অপেক্ষায়। তার সাড়া পেয়ে আলগোছে দরজা খুলে দেয়। তার মা, আদরের মা; জগতের সেরা বন্ধু। মা ফিসফিস করে কী বলে ঠিকমতো শুনতে না পেলেও সব বুঝে নেয়। মনজুড়ে ফুরফুরে ফুর্তি। চোখের মণিতে দোল দোল নাচের দৃশ্য। নিষিদ্ধ দোল। সে চমকে-থমকে ইশারা বুঝে নিজের ঘরে খেতে বসে। মা তরকারি গরম করে দেয়, কিন্তু ভাত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে; তপ্ত ঝোল প্লেটে পড়ে চর্বি হয়ে নেতিয়ে পড়ে। গরুর মাংস হয়তো দু-দিন আগের। বাসি। বাবা সহজ-সরল মানুষ। বাজারে প্রায়শ ঠকে আসে। তাকে বাজার করতে দেয় না। আসলে বিশ্বাস করে না। বাজারে দু-চার টাকা এদিক-ওদিক হলে সে তো নিজের ছেলেই নেবে নাকি? অথচ মোক্ষম যুক্তি সিগারেট খাওয়ার টাকা দিতে রাজী নয়। সে না হয় না দিক, কিন্তু সামান্য শখ, মনের আনন্দ, একটু বাঁশির সুর তোলা; সেও বন্ধ করতে হবে? সে তা পারবে না। আঙুলের ফাঁকে কমলা রং চর্বি জমে গেছে। দুপুরের লালশাক ঘাসের মতো লাগে। উপায় নেই। সে খেতে থাকে। কি যে ভেবে চলে, নাকি সে-সব দৃশ্যছবি; আকস্মিক নির্দেশে চমকে ওঠে। দু-চোখে প্রশ্ন।

‘ওই বাঁশি। তোর বাপ পছন্দ করে না।’

‘বুড়ার সামনে তো বাজাই না।’

‘হ্যাঁ রে বাপকে বুড়া কয় কেউ? কষ্ট পাইবে না?...তুই বাজাবু, শাখের জিনিস, মোর আপত্তি নাই; কিন্তুক বাপের সামনে নাহায়। গোরস্তানত্‌ যায়া ন। কত বাও-বাতাস, ভূত-প্রেত-অপদেবতা ঘুরি বেড়ায়।’

‘পরিও তো থাকে। ডুমুর গাছোত বসি বাঁশি শোনে।’

‘হুহ্‌ পরি নামিবি! তোক বিয়া করিবি। বায়ও!’

‘ক্যান একটা পরি যদু তোর বউ হয়া আইসে, মন্দ কি! ধন-দৌলত উথিলি পড়িবি না? হারার কুনো কষ্ট থাকিবি না।’

‘স্বপন দেখেছু ন?’

মা হাসে। সেই হাসি ভারি অদ্ভুত মায়াময়। মা খুব ভালবাসে তাকে। রাত জেগে সামলায়। আঙিনা পেরিয়ে শজনে গাছের বাঁ-ধারে টিনের দরজা। সেখানে কাঠের রড লাগানো হয়। একটি তালা। বাবার রোজকার কাজ। ফয়জুল যেদিন রাতে দেরি করে ফেলে, দেরি হয়; তালা লাগানোর ডিউটি মায়ের। পৃথিবীর সকল মা বুঝি এরকম। চকিতে কত ভাবনা-দৃশ্যছবি ভেসে যায়। সে বিয়ে করেছে। অত্যন্ত সুন্দর চেহারার এক মেয়ে, তার বউ, মায়ের কাছে বসে থাকে। সেবা যত্ন করে। অলস দুপুরে দু-জনের গল্প-আলাপ-হাসি-আনন্দ বাতাসে ধীরলয়ে ভেসে যায়। সেই মুহূর্তে ছায়াছবিতে দেখা পরির মুখছবি ভেসে উঠে। তার উজ্জ্বল সফেদ দুটো পালক ডানা। আলো ঝলমল বর্ণিল পোশাক। সোনালি রং জাদুর কাঠি হাতে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। চোখের দৃষ্টিতে সলাজ আহবান। ফয়জুল কী করে! সেই পরির চেহারা কখনো তীব্র স্ফুলিঙ্গ-আলো কখনো অস্বচ্ছ প্রচ্ছায়া। সে ধাঁধায় পড়ে যায়। কে সেই পরি? পাশের বাড়ির বুশরা নাকি সত্যি সত্যি সেলুলয়েডের ফিতেয় জমে থাকা রূপসী? সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। শ্রুতিতে কখনো বেজে ওঠে গানের কলি। নদীতে পালতোলা নৌকোয় নায়িকার আদুরে ঢং-এ শরীর হেলিয়ে গান গাওয়া। ঠোঁটের আলতো প্রসারে রহস্যময় হাসি। এসবের কোনোকিছুই কপালে নেই তার। গরিব মানুষের দুঃসাধ্য স্বপ্ন। অলীক এসব দৃশ্যছবি কল্পনায় বেঁচে থাকা। সে এমন স্বপ্নবিলাসী থাকতে চায় না। পরি নামাতে হবে। গোরস্তানে জ্বিন-ভূত-পরি সব আছে। বাঁশির সুরে সুরে তাদের টেনে এনে চেয়ে নেবে কোনো বর। সে চাইবে টাকা। টাকাই একমাত্র ঈশ্বর। অশেষ ক্ষমতা। টাকা দিয়ে সাজিয়ে নেবে জীবন...বেঁচে থাকা। পূরণ করবে সকল স্বপ্নসাধ। মায়ের মুখে হাসি। বাবার বিষণ্ন মুখ মুছে দেবে। কিন্তু পরি নামছে কই? আর বাঁশি...সেটি গেল কোথায়?

শেষ দুটো কাঠি জ্বালিয়ে খুঁজতে শুরু করে পুনরায়। এবার মনোযোগি দৃষ্টি খুব ধীরস্থির রাখার চেষ্টা নেয়। একপাশ থেকে অন্যপাশে স্ক্যানিং চলে। কিন্তু...না নেই। কে করল নিষ্ঠুর এই কাজ? বাবা নয়...অন্য কেউ। কে কে? সে মনে করার চেষ্টা করে। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত কে কে তার ঘরে এসেছে? ঘর তো নয়, বৈঠকখানা, যে কেউ এলে এখানে বসে; তাকে সরে যেতে হয়। রাস্তায় নেমে দাঁড়িয়ে থাকে। গলির মাথায় পান-সিগারেট আর পটেটো চিপস দোকান। কয়েকজন মানুষ বসে কিংবা দাঁড়িয়ে থাকে। ইদানীং রায়হান মিয়া ফ্লাক্সে চা বসিয়েছে। সেই চা তৈরি করে মলি। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ার পর সমুদয় পাঠ শেষ। কলেজের কোন্‌ ছোকরার হাত ধরে নাকি পালিয়ে থেকেছিল প্রায় এক মাস। পাড়ায় দু-এক সপ্তাহ জোর ফিসফাস চলে। তারপর সব শেষ। সব মিথ্যে রটনা। মলি আসলে মামার বাড়িতে ছিল। সেখানে তো যেতেই পারে নাকি? ফয়জুলের এসব বিষয়-ঘটনাপ্রবাহ মনে কোনো ঢেউ তোলে না। সে আপনমনে নিজের পৃথিবীতে ঘুরপাক খায়। তবে তখন থেকে বেশ চেনা হয় মলিকে। চোখের দেখায় মন্দ লাগে না। ফরসা মুখছবি, টিকালো নাক, তার ডান অথবা বাঁ-পাশে সাদা পাথরের বড় নাকফুল, কখনো রোদের আলোয় ঝলমল করে। মাথায় একরাশ চুল। চোখের দৃষ্টিতে কোনো রহস্যময় হাসি অথবা কৌতুক। সেই তুলনায় অনেক শান্ত-নির্জীব বুশরা। কখনো দশটি বাক্যের বিপরীতে একটি একমাত্রার জবাব। তবে তার কোনো রটনা নেই। কোনো ঘটনা নেই। সুন্দর ধৈর্যশীল দৃঢ় সংযম। আনটাচ্‌ড। কে না চায় অনাঘ্রাত পুষ্প শুকে নিতে। মলি? কে জানে কি? তবে যতটুকু রটনা কিছু তো ঘটনা বটে। কে জানে কোথায় কোন্‌ জায়গায় কী করেছে। তাকে নিয়ে প্রেম প্রেম গেম চলে জীবন-পাথার যাত্রা চলে না। এসব অবশ্য তেমন ভাবনার নয়। অলস দুপুরে ঘুম ঘুম অবসরে দু-একটি মাছির সুড়সুড়ি বিরক্তি মাত্র। এলোমেলো নিষ্পাপ ভাবনা অথবা নিষিদ্ধ লুকোচুরি খেলা। ফয়জুলের কিছু হলো না। একজন বান্ধবী, যার সঙ্গে কলেজ কিংবা ক্যাফেটারিয়ার নিরিবিলি ছায়ান্ধকার কোণায় আইসক্রিমে চুমুক দেয়। পার্কের জেসমিন ঝাড়ের নির্জন লাজুক সময়ে কোনো অচেনা চুম্বন। দিন যায় একা একা ছায়াছবির দৃশ্যছবি কল্পনায়। ববিতার নাটুকে সংলাপ। শাবানার স্বামীভক্তির শক্তি দেখে। আহা বুশরা কবে যে তোমায় একবার জড়িয়ে ধরতে পারব! অথচ সেদিন বিকেলে কলাভবনের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়ার নিচে কত কথা বলে যায় বুশরা। কোনো অস্থির চাপল্য নয়। যেনবা শাসন। কেন এমন করে বলে সে? নির্মোহ আবেগহীন বৈষয়িক। কে জানে তার মনে কোনো ভালবাসা বা প্রেম আছে কি না, অথবা সবকিছুই একতরফা ফয়জুলের? বিকেল কেমন অদ্ভুত অসহনীয় আর লাজুক-মূঢ় হয়ে ওঠে। ফয়জুল কথামতো ঠিক ঠিক আগামী একমাস বুশরার সঙ্গে দেখা করবে না। সে পরীক্ষা দিক। ভালোভাবে পাশ করুক। ফয়জুল তার সবকথা মেনে নেবে। কে জানে একদিন ধাক্কা মেরে ছ্যাঁকা দিলেও কিছু মনে করবে না। তার মনের দরজা খোলা...উন্মুক্ত রেখে দেবে। সে যে গোলাপ, সুগন্ধি বিলিয়েই সার্থক জীবন; তার মন খারাপ হয়ে যায়। সন্ধের সময় এদিক-ওদিক সাইকেল চালিয়ে অকারণ ঘোরে। গোপালগঞ্জ বাজারে মানুষের হই-হুল্লোড় আর চেঁচামেচি শোনে। রাত নেমে আসে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি। কোন্‌ফাঁকে বাঁশের একটি বাঁশি কিনে নেয়। এই তো সেদিনের কথা। এবার বাঁশি বাজিয়ে সময় পার।

মলি সংক্রান্ত গুজব ঘটনার শেষ-সময়ে, মামাবাড়ি থেকে ফিরে আসার পর; সত্যিকারার্থে ফয়জুলের সেদিকে দৃষ্টি পড়ল। মলি অসুন্দর কোথায়? গরিবের ঘরে আকাশের চাঁদ। আলোয় আলোয় চারিদিক ছড়িয়ে পড়েছে। কৈশোর পেরোতে না পেরোতে একেবারে গৃহিণী রূপ। শোনা যায়, সে-সময় বিয়ের কথাবার্তা চালাচালি হচ্ছে। পাত্রপক্ষ পছন্দ করে, কিন্তু যার পেছনে গুজব, রটনার ঘটনা...ঘটনার রটনা; তার শুভকাজ হয় না। মলির বাবা রায়হান মিয়ার দোকানে অনেকেই চা-সিগারেট খেতে আসে। দোকানের হুডের সঙ্গে মালভোগ আর সাগর কলা ঝুলে থাকে। কেউ কেউ বেছে বেছে টেনে ছিঁড়ে ছিলে মুখে নেয়। কারও কারও কৌতূহল কলার মোচার মতো ঝুলঝুল দোল খায়।

‘তারপর রায়হান, বেটির বিয়ের খবর কী?’

‘চেষ্টা চলছে ভাইজান। এই হচ্ছে-হচ্ছে করে, কী আর বলবেন; অনেক টাকা দরকার।’

মানুষজন নির্বিকার থাকে। মনের মধ্যে কৌতুক-সুখ। মলির বাড়ি পালিয়ে যাওয়া ঘটনা তা হলে সত্য। এমন মেয়েকে বিয়ে করবে কে? যার সারা গায়ে কালো দাগ। কলঙ্ক চিহ্ন। মেয়েদের ললাটে একবার লেগে গেলে আগুন-টিপের মতো জ্বলজ্বল করে। মন জ্বলে-পুড়ে খাক। মলির আর বিয়ে হচ্ছে না। পুরুষ মানুষ কাড়া-না-কাড়া হাজারটা কু-কাজ করলেও কোনো দাগ নেই। সেই দাগ ওয়াশেবল। ধোপার কাছে সাদা-ময়লা কাপড় দাও, চায়ের দাগ-পান-খয়ের, যা হোক; সাবান-সোডা ঘষে ঘসে লেবু দিয়ে পরিষ্কার করা যায়। কোনো দাগ--স্পট নেই। একেবারে আনকোরা নতুন--ফ্রেশ। কিন্তু মেয়েমানুষের কলঙ্ক সারাজীবনের পাপচিহ্ন। মানুষের কেউ কেউ মনে মনে কত কী ভাবে। ভাবনার কি শেষ আছে? এদের অলস সময় পরের গু ঘাটতে ঘাটতেই শেষ। নিজের শরীর-মন দেখার ফুরসত নেই। ফয়জুল আড়ালে-আবডালে এসব শোনে। সেও কত কি ভাবে। কখনো পাপ-কল্পনায় ভেসে যায়। কখনো মলির উপর মনের কোণায় মায়া জেগে ওঠে। আহা দেখতে এত সুন্দর মেয়ে! কোনোসময় বুশরার জায়গায় তাকে বসিয়ে কল্পনায় ভাসে। জীবনে একটি পুণ্য কাজ করতে তো পারে। ‘তুমি যে আমার, ওগো তুমি যে আমার।’ বিয়ে? সে করা যায়। মন শুধু মন ছুঁয়েছে। কোনো আপত্তি নেই। কবুল-কবুল-তিন কবুল। কিন্তু খাওয়াবে কী? নিজেই বাপের হোটেলে চলে-ফিরে। পকেটে পাঁচটি টাকা থাকে না যে, কাউকে নিয়ে জলযোগে বসে শিঙাড়া-কচুরি খায়। বুশরা আর কতদিন বিল মেটায়? নিজেকে তখন মাটিতে মিশিয়ে ফেলে ফয়জুল। এসব আজগুবি মহৎ ভাবনা ছেড়ে মনের লাগাম টেনে ধরা ভালো। কি-সব যাচ্ছেতাই ভাবনায় ভেসে যাওয়া? সামনে ডিগ্রি পরীক্ষা। পাশ কোর্সের মেয়াদ দু-বছর, অথচ তিন পেরিয়ে যায় যায়। ইংরেজি-বাংলায় তেমন সমস্যা মনে হয় না, কিন্তু ভূগোল বড্ড জ্বালায়। কিছুতেই বাগে আসে না। অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ কর্কটক্রান্তি-মকরক্রান্তি, কখনো আহ্নিক আর বার্ষিকগতির চক্রে পড়ে মন গতিহারা দিশেহারা। বুশরা কিংবা মলি...মলি কিংবা বুশরা, সব শালা আওরাত; আওরাত কা মক্কর দুনিয়াকা চক্কর, যে শালা বোঝেনি সে খায় ঠক্কর। সেই তুলনায় বাঁশি বাজানো ভালো। গভীর রাতের নিরিবিলিতে গোরস্তানে ধ্যান করা যায়। কে জানে যদি কোনোদিন আকাশ থেকে এক পরি নেমে আসে, কিংবা জলের তলা থেকে ভেসে ওঠে জলপরি; কপাল খুলে গেল। জীবনে আর কি চাই? ফয়জুল বাঁশি বাজায়। সুরে-বেসুরে নিঃসীম বাতাসে মনে মনে আবেগ-দোলা।

মলি মাঝে মধ্যে বাবার সঙ্গে দোকানে বসে। কোনোদিন একলা। প্রায়শ নির্জন দুপুর কিংবা বিকেলের সূচনা। ওর বাবা সে-সময়ে বাড়িতে বিশ্রাম নেয়। ফয়জুল তখন চা খেতে কত বাহানা করে। বুকের কোণায় দূরাগত বাতাস ভেসে ভেসে মন রাঙায়। মলি চা তৈরি করে। দুই ফ্লাক্সে কম করেও আট-দশ কাপ লালচে-খয়েরি লিকার। মানুষ র-চা পছন্দ করে। এই চা খেলে নাকি চেহারায় জেল্লা খোলে। কে জানে মলি এই চা খায় কি না। ফয়জুলের ভালো লাগে। কখনো কখনো চোখ ফেরাতে পারে না। নিষ্পলক কবিতা লেখা হয়। ইদানীং এই রোগ ধরেছে। রাত জেগে জেগে লাইনের পর লাইন মিলিয়ে কথা সাজানো। সে-সব হয় কি না কে জানে, মনে আহলাদ আসে; সাধ জাগে একদিন বুশরাকে পড়ে শোনাবে। তাকে নিয়েই তো স্বপ্ন-কল্পনা-মায়াজাল। তারপর মলি আবার ব্যস্ত। কারও জন্য দুধ-চা, কনডেন্সড মিল্‌ক মেশাতে থাকে, টুং টুং শব্দ ঝংকার, কারও জন্য পেঁয়াজি-বড়া কিংবা টোস্ট-বিস্কুট এগিয়ে দেয়। কখনো শরীর বাঁকিয়ে কলা ছেঁড়ে। বুকের ওড়না সরে যায়। মানুষের চোখে পাপ। চোখের দেখায় সুখ হাতড়ায়। ফয়জুল চা খায়। সিগারেটে টান দেয়। সবদিকে নজর। কেউ কেউ চা খেতে খেতে মলির সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করে। এসবও দেখা হয়। চোখ এড়িয়ে যায় না। বাতাস ঠেলে অনেক কথা কানে এসে ধাক্কা মারে। বুকে বজ্রপাত। মনের কোণায় অদ্ভুত জ্বালা। সহ্য হয় না। নিজেকে কষ্ট শাসনে সামলায়। মলি তার কে? না বান্ধবী না পেয়ারের মানুষ। একই গলির দু-চারটি বাড়ি পেরিয়ে একেবারে শেষপ্রান্তের প্রতিবেশি। ইদানীং মলি তেমন করে আর বসে না। রায়হান মিয়া কনডেন্সড মিল্‌ক মিশিয়ে গ্রাহকের দিকে চা তুলে ধরে। ফয়জুল খেয়ে দেখেছে। তেমন স্বাদ নেই। মলি যে চা তৈরি করে চমৎকার স্বাদ। আসলে মলির হাতের স্পর্শে জাদু আছে। কার না ম্যাজিক দেখতে ভালো লাগে। ফয়জুল ম্যাজিকের ভক্ত।

একদিন সন্ধের আগে আগে রাস্তায় দেখা হয়। প্রায়শ হয়, কিন্তু তেমন একলা নয়; অথবা অন্যকিছু আবেগ সময়। ফয়জুল সাইকেল থেকে নেমে মুখে হাসি তুলে ধরে। চোখে চোখে কত কথা। কত তাল-লয়-সুর-গান কে জানে।

‘ওই চা বিবি, একদিন বাড়িতে দাওয়াত করে চা খাওয়াবি না?’

‘কেন বে বাপের কাছে খাবি।’

‘ওই বুড়ার থেকে বুড়ার মেয়ের হাতে খাওয়ার মজাই আলাদা রে।...তো বল কবে যাব?’

‘আজ আয় এশার নামাজের পর।’

মলি হিসহিস সুরে কানের কাছে বলে উঠে। হাসির ঝংকার বাতাসে কাঁপে। ফয়জুল তো সে-রকমই চায়। যেমন বেণি তেমনই রবে, চুল ভেজাব না...না না না চুল ভেজাব না। মনে সাহস বাড়ে। গলির ধারে অযত্নে বেড়ে ওঠা শজনের এক ডাল থেকে দুটো শালিক লাফিয়ে অন্য জায়গায় বসে। দুই শাখাতেই দোল দোল দোলা। ফয়জুল একবার ডানে আরেকবার বাঁয়ে তাকিয়ে অস্ফুট খই ভাজে।

‘সেদিন দুপুরে তোর ওখানে গেলাম। তুই ছিলি না। তোর বাপ হুংকার দিয়ে বলে...কে? বাপ রে বাপ! কোথায় গিয়েছিলি?’

‘কোন্‌ দিন? আমি তো বাজার যাই। কখনো সওদাপাতি করতে হয়।’

‘তুই বাজার যাস? বুড়া কী করে?’

‘দূর বে! ওভাবে বলিস কেন?...তো কি জন্য গিয়েছিলি বল।’

‘কেন যে গেলাম! মনে নাই। হে হে হে!’

‘শালা, সবসময় ঝাড়ি! ভেবেছিস মা-মরা মেয়ে একলা আছে, ফুর্তি করে আসি...না?’

‘আ রে না না...বিয়ের প্রস্তাব দিতে গিয়েছিলাম।’

‘যা বে ভাগ, বাপের হোটেলে খাস; আর বিয়া করার শখ।’

‘তুই এমনই বলবি। মাই সুইট হার্ট। আমাকে বিয়ে করবি না? তোর বাপের দোকানে বড়া ভাজব নাহয়। ঘরজামাই।’

‘দূর শালা!...যা ভাগ।’

‘হা হা হা!’

তারপর গলিতে কেউ হেঁটে আসে। অচেনা মানুষ। ফয়জুল ভদ্র মানুষের মতো সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এই যখন-তখন ভালোমানুষ সেজে নেয়ার কায়দা বেশ রপ্ত হয়েছে। মানুষটি এগিয়ে তাদের ক্রস করে সামনে এগোয়। উত্তরে গোরস্তানের মধ্য দিয়ে সরু রাস্তা। শাল-সেগুনের শুকনো পাতা ছড়িয়ে আছে। মানুষের হেঁটে চলার খস খস...মচ মচ শব্দ মিলিয়ে যায়। ফয়জুলের মনে হয়, সেও এবার যেতে পারে। এইসব খুনসুটি বুকে শুধু থিরথির কাঁপন ধরায়। ভালোই লাগে। মজা আর মজা। তারপর দু-পা এগোতে পেছন থেকে বলে উঠে মলি, -

‘কি রে আসবি তো?’

‘আসব না মানে! আবশ্যই আসব। আই লাভ ইউ ডার্লিং।’

‘শালা-আ!’

ফয়জুলের বুকে কাঁপন দোলা। সকাল থেকে জমে থাকা অকারণ রাগ সকারণ ক্লেদ মুছে যেতে শুরু করে, অথবা করে না, সবকিছু মিলেমিশে অন্যরকম ভালোলাগা ছড়িয়ে যায়। অনেক দূর হেঁটে আসতে হয়েছে। রাস্তার ধারে ফুটপাতে দু-একজন মেকানিক বসে। তারা কাঠের বাক্সে বিবিধ যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করে। একটি পাম্পার, তেল-মবিল প্যাঁচপেঁচে, এককোণায় দাঁড়িয়ে থাকে। ফয়জুল কোনো কোনোদিন এগিয়ে যায়।

‘মামা পাম্পারটা নিলাম।’

সালাম মিয়ার কথা বলার সময় আর ধৈর্য নেই। রিকশার পেছন চাকা খুলে-টুলে পেরেশান একশা। পানখাওয়া কালো-লাল ঠোঁট ঝুলে আরও মোটা বেঢপ। সে একপলক তাকিয়ে চিনে রাখে শুধু। ফয়জুল হেহ্‌ হেহ্‌ শব্দে বুকের শ্বাস ঠেলে ঠেলে চাকায় বাতাস ভরে। কাজ শেষে একটি সিঁকি এগিয়ে দেয়। আজ ঘটনা অন্য। মনমেজাজ রেগেমেগে চড়চড়ি। কোন্‌ শালা যে সাইকেলের চাকায় আলপিন ফুটিয়েছে, একবার দেখা পেলে হয়; ট্রিপল এইচ ঘুসি বরাদ্দ। তাকে কি পাওয়া যায়? হারামজাদা জারুয়ার পয়দা। অবশেষে সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে আসতে হয় অনেক দূর। অবশ্য আজ চৌরঙ্গির এককোণায় চুপচাপ বিড়ি টানছিল সালাম মিয়া। সেই লিক খুঁজে পেতে আর সারাতে সারাতে এক-দেড় ঘণ্টা। তারপর সাইকেলে উঠে সব মনে পড়ে যায়। পকেটে তেমন টাকা-পয়সা নেই। বাবা টাকা-পয়সা খুব একটা দেয় না। কারণ ছেলে বিড়ি-সিগারেট ফুকবে। কোথাও তিনপাত্তি খেলবে। মেলায় গিয়ে হাউজিতে টাকা খোয়াবে। বাবার এই অবিশ্বাসের কারণ মাতৃকুল। মায়ের একমাত্র ভাই, উচ্ছন্নে যাওয়া মানুষ; সেভাবেই নাকি পৈতৃক সম্পত্তি শেষ করেছে। ইয়ার বন্ধু-বান্ধব, আনন্দ ফুর্তি, বেয়াড়া অভ্যেস; ইত্যাদি। কিসের মধ্যে কি...পান্তাভাতে ঘি। মামার সঙ্গে তার তুলনা! ফয়জুলের দোষ কোথায়? ছেলেমেয়ে বড় হলে তার অনেককিছু লাগে, হাতখরচা বা পকেটমানি; কিন্তু বাবা দেন না। অনেক আবেদনের পর যা জোটে তার পরিমাণ অল্প। নিজের দু-এক প্যাকেট বগুলা সিগারেট আর টুকিটাকি ব্যয়ে ঘাটতি বাজেট। সবচেয়ে বড় কথা যার সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন অথবা কখনো কখনো প্রতীক্ষার দেখা হয়, তাকে নিয়ে কোনো ক্যাফেতে বসে, একটি মিমি বা আইসক্রিম কিনে দেয়ার সাধ্য হয় না। এসব ভাবনার মধ্যে এই যে কিছুক্ষণ আগে যে রাগ দেখিয়ে এলো, অশ্রাব্য গালিগালাজ আর বাক্যধারা বর্ষণ; সমুদয় বিষয় বড় বিব্রত করে তোলে। আলম মামা কী ভেবে বসল কে জানে। তার বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনে অজানা অপরাধীকে যা-তা, যা বলা ঠিক নয়। ফয়জুলের মুখ খারাপ। সার্ভিস ল্যাট্রিনের মাটির চাড়ি কিংবা টিন, মানুষের গুয়ে ভরতি হয়; সে সব উগড়ে দেয়। নিজের গায়ে ছড়িয়ে যায়। কেন এমন করল আজ? সে তো সহজে রাগে না। অনেক শান্ত স্থির মানুষ। ধৈর্যশীল। আজ কোন্‌ লঘুগুরু কারণে মাথা আউলা? কোনো উত্তর নেই। মানুষের মন বড় বিচিত্র। রংধনুর মতো রং পালটায়।

শেষ ফাল্গুনের দিন। সারারাত কাছে কোথাও বৃষ্টি ঝরেছে। সকাল থেকে হিম হিম বাতাস। ফয়জুল কলেজে দুপুর পর্যন্ত এদিক-ওদিক পায়চারি করে। অনেকে দলবেঁধে আড্ডায় গল্পগুজব। বাতাসে কথার কলরোল হাসির ফোয়ারা। তার তেমন বন্ধু নেই। যে কজনের সঙ্গে কমবেশি সখ্যতা, তারা আসেনি; কিংবা এসে চলে গেছে। কোনো ক্লাস হবে না। কলেজ ছাত্র পরিষদের কী কী দাবি আদায়ে ক্লাস বয়কটের ডাক। আজকাল এসবই হয়। গণতন্ত্র। তন্ত্র...মন্ত্র...গণতন্ত্র। সব ভুয়া। মূর্খের শাসন। তার ভালো লাগে না। অবশেষে সাইকেল স্ট্যান্ড গিয়ে মুখ আরও কালো। কেউ ঝামা ঘষে দিয়েছে যেমন জ্বলুনি হতে থাকে। কোন্‌ যে বেজন্মার কাজ...তাকে যুতমতো গাল পাড়ে। তার বাবা-মা, জন্ম সঠিক কি না, কোন্‌ পদ্ধতি বা আসনের প্রজনন কিছুই ছাড়ে না। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে রোদ-ছায়ায় শরীর তাপায় আলম মামা। কলেজ পিওন। আধবুড়ো মানুষ। তার ঠোঁট দু-কান অবধি নড়ে উঠে। সেখান থেকেই কৌতুক জিজ্ঞাসা ছুড়ে দেয়।

‘কী হইল্‌ ব্যাটা ফয়জুল? কী ব্যাপার?’

‘মামা আপনি সারাদিন গার্ড থাকেন, কোন্‌ শালা কী করে দেখেন না? দেখতে পারেন না?’

‘কাক কাক দেখে রাখিম মামা? সবাই তো তোর মতো ছাত্র। কিন্তু ঘটনাখান কী কও তো?’

‘ঘটনা আবার কি? কোন্‌ মাদারচোদ্‌ সামনের চাকায় আলপিন মেরেছে। এখন বলেন তো দেড়-দুই মাইল রাস্তা কীভাবে যাই?’

‘এগুলা কুকুরচোদা মা-বাপের সন্তান বাপ...সামনের দোকান থাকি লিক সারাই নে।’

‘টাকা তো নাই মামা।’

‘চার টাকার ব্যাপার।’

সেই চারটি টাকা পকেটে নেই। শেষে বাধ্য হয়ে মামার কাছে হাত পাততে হয়। তারপর সাইকেল টেনে টেনে চৌরঙ্গি মোড় পর্যন্ত হেঁটে যেতে কত বিরক্তি! এমনিতেই সকাল থেকে বুকে তুষের আগুন জ্বলছে। একটি ভালো প্যান্ট-সার্ট নেই। সেই তিন বছর আগের পাজামা পরে এসেছে। সাদা রং জ্বলে-পুড়ে ঘোলা। পাঞ্জাবি নেই। একটি হাফহাতা সার্ট। সেও নীল-লাল-সাদা-কালো রঙের স্ট্রাইপ চেক। নিজেকে সারাক্ষণ ক্লাউনের মতো লাগে। এসবের মধ্যে অভাবিত এই ঘটনা। দুর্ঘটনা। অগত্যা সাইকেল হাতে ধরে এগোতেই মনে হলো, এ-ও সকলেই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে; ভারি কৌতুক মজা! ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল। তার চোখ-মুখ সামনের চুপসানো চাকার মতো ফ্যাকাশে মলিন। এ ছাড়া আর কী করতে পারে? নিজেকে সামলানো বড় মুশকিল। কোথায় তুলে রাখে রাগ? চোখ আচমকা গরম হয়। বত্রিশ দাঁত কিড়মিড় করে। মাথায় আগুন জ্বলে ধিকধিক। অবশেষে গলির মুখে এসে মলির সঙ্গে দেখা। মন উন্মন। সব রাগ-বিরক্তি-হতাশা আগুনে জল পড়ে মুছে যায়। দুর্বল মানুষ রাগ করে, সে তেমন নয়, কখনো হবে না; এসব ভাবতে বেশ ভালো লাগে। সে কথা শেষে মলির দিকে পেছন ফিরে তাকালে, আশ্চর্য সেও তার চোখে চোখ রেখে হেসে ওঠে। মিঠেল দুষ্টুমি হাসি। একটু আশকারা। একেই বোধকরি বলে মনের টান নাকি কোইন্সিডেন্স? মলি আসলেই সুন্দর। মানুষজন শুধু শুধু হিংসেয় জ্বলে।

আজ পূর্ণিমা তিথি। নীল জোছনা। সিনেমা হল থেকে বেরিয়েই আকাশে উজ্জ্বল ঘনঘটা দেখে অভিভূত ফয়জুল। বিশেষ একটি রাত। শোনা যায় চাঁদের এমন বাহারি জোছনা নাকি এগারো বছরে একবার আসে। কোনো বিশেষ কারণ নিশ্চয়ই আছে। আজ রাতে বাঁশির সুরে সুরে অনেক আবাহন দূর আকাশে ছড়িয়ে দিতে মন চায়। সে চোকির নিচ ওলটপালট করে ফেলে আর কি! অবশেষে বাঁশি। মুড়ির টিন সরাতে আলগোছে গড়িয়ে পেছনে নেমে যায়। তখন অনেক রাত। পশ্চিম-দক্ষিণ আকাশে চাঁদ জেগে আছে। ফয়জুল প্রাচীর টপকে রাস্তায় নামে। দরজায় তালা। বাতাসে বাতাবি লেবু আর গন্ধরাজের মিলিত মাতাল সুবাস। মন'র ঢেউয়ে ভাঁজে ভাঁজে কোন্‌ অচেনার ডাক দেয়। কখনো শিহরন কখনো মন কেমন কেমন শূন্য হাহাকার। মন কি তবে মলির ডাকে সাড়া দিতে চায়? অথবা সেই ডুমুর গাছের ছায়া ছায়া অন্ধকার? দৃষ্টি সম্মুখে মরে যাওয়া ডোবা। সে বলে পদ্মপুকুর। এখনো আধমরা শুয়ে থাকে একাকী। একলা প্রহর। বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম, তারপর বর্ষার জলে টইটম্বুর হয়। ফ্যাকাশে-ম্লান শাপলা নতুন জীবনের আস্বাদনে জেগে ওঠে তখন। মানুষের জীবনও তো এমন। একসময় উদাসী ফাল্গুনে মন রঙে রঙে সাজে, গ্রীষ্মে মন পুড়ে যায়, অবশেষে বর্ষার জলে সবুজে সবুজে ময়ূরী নৃত্য। তার হলো কি? কোনোকিছু ঠিক করতে পারে না। গলির শেষপ্রান্ত পেরিয়ে গোরস্তানের ডুমুর গাছের নিচে বসে, অথচ কথা ছিল; কী কথা তাহার সাথে? ঝোপঝাড়ের জোনাকিরা ক্লান্ত ফিকে। ছায়াপথ একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে নক্ষত্রের বিনেসুতোর মালা গেঁথে রেখেছে। আলোর প্রভায় সব ভেসে যায়। কোথাও ছায়া ছায়া রহস্য ফিসফিস ডাকে। ফয়জুল বাঁশি বাজায়। আজ রাতে মন কোনো পরির ঘুম ভাঙাবে বলে। মলির কথা মনে নেই। বুশরার? সুরের মায়াজাল জোছনার পরতে পরতে কোন্‌ বেভুল ঠিকানা খুঁজে নিতে চায়। কোনো দিশা নেই। মন দিশেহারা মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে আপনার মাঝে বিলীন। কতক্ষণ? অনেকক্ষণ কি? সে জানে না, কোনো বোধ নেই; তারপর সহসা মনে হয়, কে যেন আলোর মৃদু ঝলকানি তুলে পদ্মপুকুরের ওপাশে নেমে এলো। অথবা সবকিছু মায়া-বিভ্রম। ব্যাখ্যাতীত কোনো জাদু, কিংবা কল্পনা; হ্যালুসিনেশন। কেউ তার ধ্যানভঙ্গ করতে চায়। এমনই নাকি হয়। যখন কেউ এক মাত্রা থেকে অন্য মাত্রায় যেতে চায়, প্রবেশপথ উন্মুক্ত হতে থাকে, নতুন ভুবনে আসতে চায়; তেমনই তো হয়। সে বাঁশি বাজায়। বাঁশি আপনমনে বেজে চলে। একসময় মনে হয়, তার কথায় বাঁশি বাজে না, বাঁশির মায়াটানে ভেসে যায় সে। কোথায় কোন্‌ জগতে কে জানে। সে জানে না।

তারপর সেই ছায়া সামনে এগিয়ে আসে। চাঁদের আলো ফ্যাকাশে হতে শুরু করেছে। এখন শুধু রাত, নীল জোছনা, একটি ছায়া, আকাশ পরি আর সে। এমনই তো চেয়েছে। অনেক সাধনা করে তবে কারও ভাগ্যে মেলে। কারও সাধনায় জীবন পাতন। বাঁশির সুরে সুরে কত ভাবনা। মন-উন্মন স্বপ্ন ভেলা ভেসে যায়। ফয়জুল কি মোহাচ্ছন্ন হয়ে গেল? এই যে বসে আছে, অথবা বসেছিল, ডুমুর গাছের নিচে, চোখের সামনে পাণ্ডুর শাপলা-পদ্ম ছায়া ছায়া দৃশ্য অবয়ব, বাতাসে বাতাবি লেবু আর গন্ধরাজের সৌরভ, মাদক মৌতাত রাত; আকস্মিক একটি ডাকে ভেঙে যায়।

‘এই তোর কথা বে? তোর জন্যে বসে আছি, আর কৃষ্ণ সেজে বাঁশি বাজাস?’

‘কে কে তুমি? পরি? আকাশ থেকে নেমে এলে কখন?’

‘আ বে আমি, আমি রাধা...রাধা।’

ফয়জুলের মাথায় টোকা পড়ে। নেশা নেশা ঘুম ঘুম সম্মোহন সময়। সবকিছু বুঝে নিতে একটু তো দেরি হয়। বাঁশি থেমে গেছে। চারিদিক নিজ্‌ঝুম নিস্তব্ধ। কোথাও কোনো শব্দ নেই। উচ্চিংড়ে-ঘুগরে কিংবা রাতচরা পাখি কেউ কোনো আওয়াজ তোলে না। এবার...এবার বুঝতে পারে সে। মলির সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। সে যেতে পারেনি। এগারো বছর পর নীল জোছনা। এমন নিশুতি রাতে তো মলি নয়, কোনো পরি নেমে আসার কথা; আকাশপরি। সে ভালো করে চোখ রগড়ে নেয়। অস্বচ্ছ কুয়াশা রাতে ঘোর কি কাটে? পরি অথবা মলি...নাকি মলির ছদ্মবেশে কোনো পরি? সে যেই হোক, গোরস্তানের ভয় এড়িয়ে যে আসতে পারে, সে পরি; আকাশপরি। পরি তাকে বর দেবে। জীবনের ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়া সাধ-আহলাদ-সুখ কোনোকিছুই আর অপূরণীয় থাকবে না। তার মনের কোণায় বাঁশির সুর ঢেউদোলা তোলে। তারপর হাতে হাত। মধুর স্পর্শ। আহা কি কোমল! একটু কি ভেজা ভেজা লাগে? অদ্ভুত সুবাস আর নিশ্বাসের থিরথির কম্পন? এই রাতে ঠিক যেমন বয়ে যায় বসন্ত বাতাস।

তারপর দু-জন মানুষের ছায়া গলির শেষপ্রান্তে একটি ছাপরা ঘরে এসে দাঁড়ায়। কী কথা হয় তাদের মধ্যে কে জানে। রাতের মতো রহস্যময় ফিসফিস। তারা একজন আরেকজনকে জড়িয়ে থাকে। জন্ম জন্মান্তরের সঙ্গী। তখন কেউ একজন একটু দূরে দু-চোখের বাতি জ্বালিয়ে অন্ধকার দেখে যায়। নীল জোছনার চাঁদ অনেক নিচে নেমে গেছে। অস্বচ্ছ ছায়া ছায়া আবছায়া রাত। একটি রাত ভোরকে ডাকে। সকালকে আহবান। তার চোখ কোনো সকাল দেখতে থাকে। যেভাবে ফয়জুল কোন্‌ মায়ায় সম্মোহিত অথবা জেনেবুঝে এগিয়ে যায়। এগিয়ে যায়।

রায়হান মিয়া ঠিক সে-সময়ে আলগোছে দরজার বাইরে শিকল তুলে দেয়।

_ _ _



লেখক:
মাহবুব আলী
প্রভাষক 
দিনাজপুর সদর, বাংলাদেশ

প্রকাশিত বই:
১. ছোটগল্পের নির্মাণশৈলী (সাহিত্য ও সাংবাদিকতা) ২. অস্তিত্বের পলায়ন (গল্প) ৩. পিঙ্গল বিকেলের আয়নায় (গল্প) ৪. অযোগ্যতার সংজ্ঞা (গল্প) ৫. ভয় (গল্প) ৬. রাত পাহারা চোখ (গল্প) ৭. গোপনীয়তার অলিগলি (গল্প)

প্রকাশক: জয়তী বুকস্ ঢাকা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন