মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

খায়রুল আনাম'এর গল্প : শ্যামলী


অফিসের এক জরুরী মিটিং-এ সিয়াটেল শহরে এসেছি। লাঞ্চের সময় এক ফাঁকে বন্ধু মৃণালকে একটা ফোন ঠুকে দিলাম। ও জিজ্ঞেস করল, “এতদিন পরে তুই হঠাৎ ? শিকাগো থেকে বলছিস?”

“আরে বাবা, না। তোদের শহরে অফিসের একটা বিশেষ কাজে এসেছি। মনে পড়ল তোরা এখানে থাকিস। আর ফোন নম্বরটা সঙ্গেই ছিল”।

“তাহলে এক কাজ কর। মিটিংয়ের জন্য হোটেলে থাকবি থাক। লাঞ্চও নিশ্চয়ই ওদের সঙ্গে করতে হবে। পাঁচটা বিশ মিনিটে তোর হোটেলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকবি। আমি তুলে নেব। আমাদের বাসায় ডিনার করবি। গপসপ হবে। তারপর রাত্রে তো্র হোটেলে নামিয়ে দিয়ে আসব। যে ক’দিন আছিস, রোজ আমাদের বাসায় একসঙ্গে ডিনার করব। রুমার হাতের রান্নার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। তোর আসার খবর পেয়ে, এটা ওটা খাওয়াতে পারলে ও খুব খুশি হবে”।

বন্ধু ও তার পরিবারের সঙ্গে এতদিন পরে দেখা হবে, বিশেষ করে সত্তরের দশকের আমেরিকায় অচেনা শহরে অন্তত একবেলা বাঙ্গালী খানা খেতে পারব জানতে পেরে মনটা বেশ খলবলে হয়ে উঠেছিল। অথচ, ওদের বাড়ীতে গিয়ে দেখি, কোথায় রান্না? ডাইনিং টেবিলে ওর বৌ সেজেগুজে বসে আছে। ও সোজা উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে বলল, “একটু অসুবিধা হয়ে গেছে, বুঝলে। আমাদের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর স্ত্রী মাস খানেক আগে মারা গেছে। কাজে আটকা পড়ে আমরা ঐদিন যেতে পারিনি। আজকে তার শ্রাদ্ধ। আমাদের যেতেই হবে। তুমি কি কিছু মনে করবে, আমাদের সঙ্গে যেতে? অবশ্য ইচ্ছা করলে এখানে বসে টিভি দেখতে পার। আমরা তাড়াতাড়ি চলে আসব”।

“পাগল নাকি? আমি ফাঁকা বাড়ীতে বসে একা একা টিভি দেখব? কিছুই মনে করব না। চল তো, কোথায় যেতে হবে”।

বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শ্রাদ্ধ বাড়িতে পৌঁছাতে আমাদের এক ঘন্টার বেশি লেগে গেল। দেখলাম, সবাই টাক মাথা, রোগা পটকা এক ভদ্রলোককে আলিঙ্গন করে সান্ত্বনা দেবার চেষ্ঠা করছে। আর ভদ্রলোক মৃদু হেসে সবাইকে বসতে বলছেন। বাড়ির মধ্যে কেমন একটা থমথমে পরিবেশ। মৃণাল আমাকে ওনার কাছে নিয়ে, “আমার বন্ধু, শিকাগো থেকে এসেছে”, বলে পরিচয় করিয়ে দিল। দেখলাম ভদ্রলোক নিজের দুঃখকষ্ঠ চেপে রেখে, অন্যদের ছেড়ে, আমাকে বিশেষ যত্ন করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একজনকে উঠিয়ে সে জায়গায় আমাকে বসার ব্যবস্থা পর্য্যন্ত করলেন। একটু পরে বুফে সিস্টেমে পরিবেশিত ডিনার খেতে ডাইনিং রুমে ডেকে নিয়ে গেলেন। গাড়িতে মৃণাল বলেছিল, ভদ্রমহিলা ওখানকার বাঙ্গালী সমাজের মধ্যমণি ছিলেন। গান, বাজনা, আবৃত্তি, বাচ্চাদের বাংলা শিক্ষা দেওয়া, পুজো আচ্চা সব কিছুতেই তিনি এক ধাপ এগিয়ে থাকতেন। হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেওয়ালে টাঙ্গানো তাঁর নানা অনুষ্ঠানের ছবি সে কথাই জানান দিচ্ছিল। ঘুরতে ঘুরতে ঘরের এক কোণে ফ্রেমে বাঁধানো বড় একটা ছবি দেখে কেমন যেন একটা খটকা লাগল। দ্বিতীয়বার খাবার নিতে ডাইনিং টেবিলের দিকে যেতে, ঐ ভদ্রলোক এক তরুণীকে ধরে নিয়ে এসে আমাকে বললেন, “এ হলো রূপালী, আমাদের একমাত্র মেয়ে। এবার কলেজে যাবে”।

“কনগ্রাচুলেশান্স”। তারপর ‘হাই’ বলার জন্য রূপালীর মুখের দিকে তাকাতেই বুকের মধ্যে হঠাৎ ধড়াস করে উঠল। হাই আর বলা হলো না, হা পর্য্যন্ত বলেই যেন গলাটা আটকে গেল। এ তো অবিকল সেই পাহাড়ী ঝর্ণা, অনেক আগে দেখা সেই যুবতী শ্যামলী ঘোষ! আবার গিয়ে সেই বড় ছবিটার সামনে দাঁড়ালাম। ছবিটা মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলার হলেও খেয়াল করে দেখলে মানুষটার কম বয়সী চেহারার সঙ্গে মিল পেতে কষ্ট হয় না। চেয়ারে ফিরে এসে বাইশ বছর আগের কথা মনে করার চেষ্টা করলাম।

দমদম এয়ারপোর্টে এক দম্পতি, কে কে শিকাগো যাচ্ছে জানতে চাইলে আমি মাথা নাড়াই। ব্যাস, তাতেই কুপোকাৎ। প্রথমবার আমেরিকায় স্বামীর বাড়িতে যাত্রী, তাঁদের বিবাহিত আর্য্যকন্যাকে দেখেশুনে গন্তব্যস্থলে পোঁছে দেবার দায়িত্বটা ঘাড়ে পড়ে গেল। উপরোধে ঢেঁকি গেলা আর কাকে বলে! একে জোয়ান মেয়ে, তার উপর বাঙ্গালী বাবা মা বলে কথা। মেয়ে নাকি এর আগে কখনও প্লেনেই ওঠেনি, আমেরিকা তো হনুজ দূর অস্ত। অতএব, আর পাঁচটা দিলদরিয়া বাঙ্গালী যুবকের মতো আমি এগিয়ে গিয়ে মেয়ের ক্যারি-অন লাগেজটা হাতে নিয়ে বললুম, “চলুন”। প্লেনে উঠে দেখা গেল, তার সীটের আরো পাঁচ সারি পেরিয়ে আমার সীট। ঘণ্টা খানেক প্লেন চলার পর, একবার পেছনে তাকিয়ে দেখি ঐ মেয়ে হাতছানি দিয়ে আমাকে ডাকছে। কাছে গিয়ে বললাম, “কোন অসুবিধা?”

“ভীষণ শীত লাগছে। কোথা থেকে যেন হু হু করে কনকনে ঠান্ডা বাতাস আসছে। কি যে করি?”

বাতাসটা বন্ধ করে দিয়ে নিজের সীটে গিয়ে চোখ বোজাই, যদি একটু ঘুম আসে। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে পাশের সীটের ভদ্রলোক কানের কাছে এসে বললেন, “উনি আপনাকে আবার ডাকছেন। একসঙ্গে সিট পান নি বুঝি?” পেছন ফিরে দেখি ঐ মেয়ে আগের চেয়ে আরো জোরে হাতছানি দিয়ে ডেকে চলেছে।

আবার গিয়ে জিজ্ঞাসা করি, “নতুন কোন অসুবিধা?”

“কিছু ভাল লাগছে না জানেন, টোটালি বোর্‌ড। শালা, একটা কথা বলার লোকও নেই। এদিকে মাইগ্রেনের জ্বালায় ঘুমও আসছে না। পাশের খালি সীটটা দেখিয়ে বলল, “এখানে একটু বসবেন, প্লীজ?”

“আচ্ছা, বাট ভেরি ব্রিফলি”, বলে একটু দুরত্ব রেখে বসলাম।

“আপনি শিকাগোতে কতদিন ধরে আছেন?”

“এই......”

“এই মানে কি? সময়টা তো বললেন না।”

“এই মানে পাঁচ সাত বছর হবে মনে হয়। আপনি?”

“বারে, বাবার মুখেই তো শুনলেন, আমি প্রথমবার আমেরিকা যাচ্ছি। আমার থাকার কথা উঠছে কি করে?”

এরপর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ছেলেগুলো কেন যে এত গবেট হয় !”

“কিছু বললেন? মনে করার মতো কিছু প্রশ্ন করে থাকলে স্যরি। আসলে জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম, আপনার হাজব্যান্ড কোথায়...”

ঝট করে কথাটা কেড়ে নিয়ে ওর উত্তর, “ও এখন ছাত্র, ইউনিভার্সিটি অব উইস্কনসিন, ম্যাডিসন-এ। আচ্ছা, আপনি তো শীতের শহরে থাকেন। কখনো বরফ পড়া দেখেছেন? উহ্‌, বরফ পড়া দেখতে কি যে মজা! লাইট হাউসে সিনেমা দেখতে গিয়ে দেখেছি, পেঁজা তুলোর মতো সুন্দর সাদা সাদা বরফ পড়ছে। আর মানুষ তার উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, কেউ কেউ কুকুরে- টানা স্লেজ গাড়ী চালাচ্ছে, কেউ কেউ গান বাজনার সুরে তালে স্কেটিং করছে। আহা, কি সুন্দর সে সব দৃশ্য!”

“যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে বরফের কোন দুর্ভিক্ষ হবে না। প্রাণ ভরে বরফ দেখতে, ছুঁতে ও তার উপর দিয়ে নিজেই হাঁটা চলা করতে পারবেন। ইন ফ্যাক্ট, আপনি এখনই উঠে প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে বরফ দেখতে পাবেন। প্লেনটা এখন পাহাড় পর্বতের উপর দিয়ে যাচ্ছে”।

“তাই? সত্যি বলছেন? এখনই বরফ দেখতে পাব? দেখি তো...” বলেই শ্যামলী (নামটা ওর বাবা বলেছিল) দৌড়ে চলে গেল প্লেনের জানলায়।

“আহ্‌, কি চমৎকার, নয়নাভিরাম দৃশ্য! ঠিক সেই লাইট হাউসে সিনেমায় দেখার মতো। সত্যিই চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের চুড়া, মেঘ, বরফ, যেন সব সুন্দরের সমাহার। এই যে মশাই, এখানে চলে আসুন। আসুন না প্লীজ। আরে আসুন তো”।

একজন অপরিচিতের কাছে কোন অনুনয়, বিনয় নয়, যেন মুর্তিমান আদেশ।

“কি হলো? আবার নতুন কোন অসুবিধা?”

“সেই তখন থেকে কেবল অসুবিধা অসুবিধা করে যাচ্ছেন। কেন বলুন তো? অসুবিধা ছাড়া আমার মধ্যে আর কিছু কি দেখতে পান না? ...... স্যরি, হঠাৎ মাথাটা গরম হয়ে গেল। একমাত্র সন্তান তো। তাই আদর পেয়ে এই অবস্থা। মেজাজটা সদাই টং থাকে। যাক গে, আমি জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম, এটা যদি হিমালয় হয়, তাহলে আমাদের দেব দেবীদের বাড়ীঘর কোনগুলো? ভাগিরথীর উৎস সন্ধানেতে পড়েছিলাম, ‘নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ’ জিজ্ঞেস করায় নদী বলেছিল, ‘মহাদেবের জটা হইতে’। আচ্ছা এখানে মহাদেবের জটা কোনটা একটু দেখাবেন? খুব ইচ্ছে করছে। জানেন, ওটা পড়ার পর থেকে কল্পনা করতাম, বড় হয়ে একদিন মহাদেবের জটা দেখতে যাব। আজ ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন”।

“ জটা কোনটা আমি ঠিক জানিনা। আচ্ছা দেখছি” বলে বাইরে দেখার জন্য পরের জানালাটার দিকে এগুচ্ছিলাম। শ্যামলী খপ করে হাতটা টেনে ধরে বলল, “ও জানালার দিকে যাচ্ছেন কেন? আমার জানালায় না থাকলে আমাকে কি করে দেখাবেন?” এই বলে সে আমার ঘাড় ধরে টেনে এনে মাথাটা তার মাথার পাশে রাখলো।

ঐটুকু জানালার মধ্যে দুজনে ঠাসাঠাসি করে দেখতে গিয়ে তার গালে গাল ঠেকে যাছে, মাথার চুল এসে মুখে পড়ছে, হাত দিয়ে দেখাবার সময় তার হাতের সঙ্গে বার বার ঘসাঘসি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শ্যামলীর সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। ঐ ছোট ফটক দিয়ে দুজনে ঘেঁসাঘেঁসি করে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে পাহাড়ের উপরে বিছানো বরফ ও তার উপর দিয়ে ভেসে যাওয়া সারি সারি মেঘ দেখে চলেছি। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে শ্যামলী বলে উঠল, ”ঐ দেখুন, ঐ যে বড় গোলমাথা মেঘটা, যেটার নীচের দিকটা সরু লেজের মত হয়ে পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচূ চূড়ার বরফে এসে ঠেকেছে, মনে হয়, ওটাই মহাদেবের জটা”।

বললাম, “তাইতো”!

“আর তার আশে পাশে মাঝারি, ছোট যে সব চুড়া দেখা যাচ্ছে, ওগুলোই মনে হয় অন্যান্য দেবদবীদের বাড়ি”।

“মনে হয় একদম ঠিক ধরেছেন। এতদিনে একটা দারুণ রহস্য ভেদ করা গেল। থ্যাংক ইউ”।

নিজের আবিষ্কারে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে খুশির চোটে শ্যামলী হঠাৎ আমাকে সজোরে আলিঙ্গন করে বসল। তারপর নিজের এমন আচরণে লজ্জা পেয়ে তার সীটে এসে বসল। খালি চার সীটের রো’র প্রথমটায় আমাকে বসতে ইঙ্গিত করে বাকি তিন সিট নিয়ে শুয়ে পড়ে বলল, “এখন যদি একটু ঘুমাতে না পারি, তাহলে মাইগ্রেনের ব্যথায় আমি বোধ হয় সত্যি সত্যি মরেই যাব। মাথায় একটু হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিন না প্লীজ। আমাকে বাঁচান”।

প্লেন হিথ্রোর কাছাকাছি আসতে চোখটা একটু খুলে বলল, “আমরা কি তাহলে শিকাগো এসে পড়লাম?”

“না, আমরা এখন লন্ডনের হিথ্রো এয়ারপোর্টে নামছি। ওখানে লে ওভার। আমাদের প্লেনও বদল করতে হবে”। হিথ্রো এয়ার পোর্টে লে-ওভারের সময়টা‍য় কফি শপে কফি খেতে খেতে আমাদের আরও অনেক কথাবার্তা হলো। সেন্ট জেভিয়ার্সে ওর কলেজ লাইফ, ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ানশীপ, ইন্টার কলেজ ডিবেটে প্রথম পুরস্কার, কলেজের সেকেন্ড বয়-এর সঙ্গে রেগুলার ফুচকা খেতে যাওয়া, তারপর বাবা মায়ের চাপে আমেরিকা থেকে দেশে বেড়াতে আসা এক ছাত্রের সঙ্গে হুট করে বিয়ে। এয়ারপোর্টের নানা দোকানে ঘোরার সময় ওর জন্য ডিউটি ফ্রি শপ থেকে একটা বড় ক্যাডবেরি চকোলেটের প্যাকেট আর ওর স্বামীর জন্য একটা বড় মার্লবোরো সিগারেটের প্যাকেট উপহার দিলাম। প্রথমে হাঁ হাঁ করে উঠলেও দেখলাম সে বেশ খুশিই হলো। শিকাগো নামার পর তাকে “এয়ার কানাডা” তে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরলাম।


মাস তিনেক পরে মহিলা কন্ঠে এক ফোন, “আমরা আজ শিকাগোর ডিভন এভিনিউতে বাজার করতে এসেছি। আসতে পারি?”

“অবশ্যই পারেন। কিন্তু কে বলছেন, আমি তো ......”

“বারে, এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন? ঠিক আছে আসব না, যান”।

“আরে ছি, ছি। আসবেন না কেন? আমি আসলে ঠিক ধরতে......”

“যাব্বাবা, শ্যামলী, বরফ, মহাদেবের জটা - এত তাড়াতাড়ি হাওয়া হয়ে গেল? আপনারা পুরুষরা পারেন বটে।”

“ওঃ, হ্যাঁ হ্যাঁ, স্যরি। এখন সব মনে পড়েছে। প্লেনের ব্যাপার। আচ্ছা, আমি ডিরেকশান দিয়ে দিচ্ছি”।

ও ঘর থেকে বৌ এসে বলল, “কার সঙ্গে অত কথা বললে? আর অমন কাঁচু মাঁচু করছিলে কেন? কারা আসছে?”

বউকে ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করতে গেলে সে আরো ক্ষেপে গিয়ে বলল, “বাড়িতে বৌ বাচ্চা রেখে বাইরে এইসব করে বেড়ান হচ্ছে? লজ্জা করে না?” বলে সে দুম দাম করে পা ফেলে চলে গেল।

ঘন্টা দেড়েক পরে তিন মূর্তি হাজির। শ্যামলীই পরিচয় করিয়ে দিল, “আমার স্বামী শ্রী গগন ভট্টাচার্য্য। মেটালার্জিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পি, এইচ ডি করছে আর উনি তার কলিগ, মিঃ মালহোত্রা”।

ততক্ষণে বাড়ির ভুমিকম্পনটা থেমেছে। আরতি বেরিয়ে এসে ওদেরকে এমনভাবে আপ্যায়ন করল, যেন তারা ওর কত দিনের চেনা। বাচ্চা মেয়ে টুম্পাও শ্যামলীর কোলে বসে ওদের সঙ্গে কিচির মিচির শুরু করে দিল। ভুরিভোজ করিয়ে ওদেরকে বিদায় নেবার সময় আরতি তাদেরকে আবার আসার জন্য খুব আন্তরিকভাবে নিমন্ত্রণ জানালো। লক্ষ্য করে দেখলাম, আরতি ও টুম্পাকে দেখে শ্যামলী প্রথমে যেন বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল। তারপর দ্রুত সামলে নিয়ে নর্মাল হয়ে যায়। কিন্তু ওদেরকে হাসি মুখে বিদায় দিলেও আরতির নর্মাল হতে পুরো সাড়ে তিন সপ্তাহ লেগেছিল। তবে ঐ দেখা হবার পর আর শ্যামলীদের কোন খোঁজ খবর রাখা হয়নি। ওরাও আর কোন যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেনি।

কানের কাছে “কাকু” ডাক শুনে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। “মৃণাল কাকু বলছিলেন, আপনি নাকি শিকাগো থাকেন? জানেন, আমার মা সারাজীবন কেবল শিকাগোর কথা বলত আর ওখানে বেড়াতে যেতে চাইত। আমেরিকা, কানাডা, মেক্সিকো, সাউথ আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার নানা দেশ আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি। কিন্তু শিকাগো যাবার প্রোগ্রাম হলেই বাবার যেন কি সব কাজ পড়ে যেত। তাই ওখানে আর কখনও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। মা পণ করেছিল, শিকাগো সে যাবেই। আমার খুব ভালো রেজাল্ট ছিল বলে আমি বার্কলে, স্ট্যানফোর্ড ও প্রিন্সটন-এ চান্স পেয়েছিলাম। কিন্তু মা বলেছিল, তোকে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতেই পড়তে হবে, ইকোনমিক্স নিয়ে । বায় দি গ্রেস অব গড, আমি ওখানেও অ্যাকসেপ্টেড হয়েছি। মা’র স্বপ্ন সার্থক হয়েছে। দুঃখের বিষয়, মা সেটা দেখে যেতে পারল না। আর তার কোনদিন ওখানে যাওয়াও হয়ে উঠবে না।

শিকাগোতে থাকার সময়, মাঝে মাঝে কি আপনার ওখানে বেড়াতে আসতে পারি, আংকেল?”

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন