মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

ইন্দ্রাণী দত্তের গল্প: ক্রিসমাস ইভ



 

১ 

ক্রিসমাসের সময় আশ্চর্য রকম ঘন কুয়াশা হয় এই সব দিকে। সন্ধ্যার পর হাইওয়ের ওপর দুম করে কুয়াশা নামলে অ্যাক্সিডেন্টের চান্স খুব বেশি- খাদে উল্টে পড়া গাড়ি দেখিয়ে প্রদীপ চৌহান এই সব বলছিল; তার এক হাত স্টীয়ারিংএ ছিল, অন্য হাত তুবড়ে যাওয়া গাড়ি দেখিয়েই এফ এম এর স্টেশন খুঁজছিল

ভোরের হাল্কা কুয়াশা আধ ঘন্টা হল উবে গেছে; এন এইচ সিক্সটি টু র ওপর প্রদীপের গাড়ি থেকে এখন আরাবল্লীর রেঞ্জ দেখা যাচ্ছে চমৎকার; প্রাচীন আগ্নেয়শিলার ভিজে ভাব কমে গিয়ে আনাচে কানাচে রোদ জমছে - পাথরের রং ঠাহর করা মুশকিল। পাহাড় পেরোলে মাইলের পর মাইল ধূ ধূ প্রান্তরে সবুজের চিহ্নমাত্র নেই- টুকরো টুকরো গাছের গুঁড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে - ঘন কালো রং, ভিতরে ফাঁপা- দূর থেকে মৃত ম্যামথের হাড় পাঁজরের মত লাগে। বিজন আর স্নিগ্ধা ছবি নিচ্ছিল পালা করে। গাবলু এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিল, দেড় ইঞ্চিটাক রোদ ওর কপাল থেকে নেমে চোখে পড়তেই বলল- গল্পটা পড়বে না?

স্নিগ্ধা মুড়ে রাখা রাজকাহিনী পড়তে শুরু করল গলা খাঁকরে-

-"এদিকে পাহাড়ের উপরে ভাঙা কেল্লায় দুটি বুড়ো আর তাঁদের সেই কুড়োনো মেয়েটি একটি পিদিমের একটুখানি আলোয় মস্ত-একখানা অন্ধকারের মধ্যে বসে গল্প করছেন আর কেল্লার ফটকে সিংহের মতো কটা চুল প্রকান্ড শিকারী কুকুর হিঙ্গুলিয়া ভাঙা দরজার চৌকাঠে মস্ত থাবা দুটো পেতে মুখটি বাড়িয়ে দুই কান খাড়া করে বাইরের দিকে চেয়ে রয়েছে-কেউ আসে কী না! ভিজে বাতাসে শিকারী কুকুরের কাছে রাতে-ফোটা বনফুলের গন্ধ ভেসে এল; তার পরেই কাদের পায়ের তলায় বনে কুটো ভাঙার একটুখানি শব্দ হল। কুকুর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে আস্তে আস্তে বার হল- জঙ্গলের পথে। " শুনছিস তো?

- হুঁ তো, একটু জল দাও না; জয়্পুর আর কতক্ষণ ?

- জয়্পুর কোথায়, যোধপুর। যোধপুর।

-হ্যাঁ হ্যাঁ। সরি। ভুলে গেছি। কখন পৌঁছব? তারপর উদয়পুর? এই হোটেলটা ভালো? টিভি থাকবে তো ?

- উফ.. গল্পটা শোন। শুনতে শুনতে পৌঁছে যাবি। আর নয় তো ঘুমিয়ে পড়।

-আমি হোটেলে ঘুমোবো। তুমি পড়ো-

-"বনের মধ্যে ভিজে পাহাড়ের তাত উঠছে। অন্ধকারে দু-চারটে জোনাকিপোকা লণ্ঠন জ্বালিয়ে কি যেন কি খুঁজে বেড়াচ্ছে! কুকুর পাহাড়ের পাকদন্ডির ধারে চুপটি করে গিয়ে দাঁড়াল। রাতের বেলায় অচেনা কাদের পায়ের শব্দ শুনে শিকারী কুকুরের চোখ দুটো জ্বলছে। কুকুর সজাগ হয়ে বসে আছে। কিন্তু-"

-কটা মানে কী ?

-অ্যাঁ!!

-এই যে পড়লে সিংহের মত কটা চুল-

- কটা মানে... কটা চোখ জানিস?

- না - দূর বলতে হবে না, বুঝেছি- লায়নের মত রঙ যেটা সেইরকম কুকুর-

-হ্যাঁ, পিঙ্গলবর্ণ

-কী?

-কিছু না, শোন। "যারা পাহাড়ে উঠছে , তারাও কম সজাগ নেই-পাকা শিকারী, পাকা যোদ্ধা রানা কুম্ভ, তাঁর -"

-পাকা ছেলে গাবলু

- বড্ড ফাজিল হয়েছিস! শোন চুপ করে। " আর মাড়োয়ারের যোধরাও!"

- যোধপুরের যোধরাও

- হ্যাঁ। " জানোয়ারের চোখ জ্বলছে কোন ঝোপের আড়ালে, সেটা এরা জোনাকির আলো বলে ভুল করলে না। রানার হাতের ছুরি সাঁ- করে গিয়ে বিঁধল হিঙ্গুলিয়ার বিশ্বাসী প্রাণটি ধুক- ধুক করছে ঠিক যেখানে! শিকারীর ছুরিতে কেল্লার একটি মাত্র রক্ষক, দুটি বুড়ো একটি কচি মেয়ের একমাত্র বন্ধু আর বিপদের সহায়- সেই সিংহের মতো হিঙ্গুলিয়া মরল- একটিবার কাতর স্বরে ডাক দিয়ে। সে যেন বলে গেল- সাবধান। ঝড়ের বাতাসের সেই শেষ-ডাক ছেড়ে দিয়ে কুকুর স্তব্ধ হল! রানার বড় স্ফূর্তি হয়েছিল যে তিনি কেল্লা নেবার মুখেই একটা মস্ত সিংহ শিকার করলেন। সঙ্গীরাও বললেন, রানা, এ বড় সুলক্ষণ। কিন্তু সেই ডাক যখন অন্ধকার চিরে পাহাড়ের চূড়োয় কেল্লার দিকে একটা কান্নার মতো ছুটে গেল, তখন সবার মুখ চুন হয়ে গেল। দেখলেন একটা কুকুর পড়ে আছে। তিনজন আস্তে আস্তে আবার চললেন। মনে কারু আর তেমন উৎসাহ রইল না।" অ্যাঁ! কী বলছ! কী বলছে রে ?

-বাথরুম ব্রেক। গাড়ি থামাতে বলছে বাবা। চিপস খাব মা।





বারমেরের কাছে চায়ের দোকানে বসে প্রদীপ বুলেটবাবার কথা তুলেছিল। হিন্দি ইংরিজি মিশিয়ে কথা বলে প্রদীপ- আজ সকালে ইংরিজির ভাগ সামান্য বেশি।

- যোধপুর এসেই গেছি প্রায়, বুলেটবাবার দর্শন করে নেবেন?

-বুলেটবাবা? স্নিগ্ধা হাঁ করল। ওর মুখের ভেতর থেকে বেরোনো হাওয়ার ঘনীভবন হচ্ছিল। বিজন বৌয়ের একটা ক্লোজ আপ নিয়ে বলল, " কাগজে পড়েছিলাম-কী একটা গাঁজাখুরি গল্প। ভুলে গেছি। একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল , না?"

-রয়াল এনফিল্ড সাড়ে তিনশো সি সি-

প্রদীপ এমনভাবে গোঁফে হাত দিল যেন নিজের নতুন বাইকের সামনে পোজ দিচ্ছে।

-কী হয়েছিল অ্যাকচুয়ালি?

- অনেক পুরোনো কথা- আমি তখন জয়শলমীরে-স্কুলে পড়ি- রাজস্থানের সব কটা নিউজপেপারে খবরটা বেরোলো।

-ন্যাশনাল ডেইলিতেও বেরিয়েছিল নিশ্চয়ই নইলে আমি আর পড়লাম কোথায়? ইয়াং ম্যান ছিল একজন না? লোকাল।

- হ্যাঁ। ওম সিং রাঠোর বাইকে করে পালির দিকে আসছিল। শেষ রাত। এই রকম সময়। ডিসেম্বর। বেজায় কুয়াশা নেমেছিল ভোরের দিকে। আলো কম। হয়ত কিছুটা মাতালও ছিল রাঠোর। রয়াল এনফিল্ড সাড়ে তিনশো সি সি গাছে ধাক্কা মেরে সটান খালের জলে। রাস্তার ধারে বড় খাল দেখলেন না? রাঠোর তো ওখানেই শেষ। স্পট ডেড। পুলিস এল, খাল থেকে বাইক তুলে থানায় নিয়ে গেল।

- হ্যাঁ হ্যাঁ তারপরই তো-

- প্রদীপকে বলতে দাও না-

- পরদিন, কী হল, থানা থেকে বাইক উধাও। খুঁজতে খুঁজতে সে বাইক পাওয়া গেল ঐ অ্যাক্সিডেন্টের স্পটে।

-মানে আবার খালের জলে?

- না ঐ গাছটার কাছে। যেখানে কলিশন হয়েছিল-

-তারপর?

পুলিশ ভাবল, লোক্যাল কোনো বদমাইশের কাজ হবে- প্র্যাকটিকাল জোক, বুঝলেন না? এবারে তাই থানায় বাইক ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে প্রথমেই ফুয়েল ট্যাঙ্ক খালি করে দিল তারপর তালা চাবি মেরে রেখে দিল। পরদিন সকালে সেই এক কান্ড! বাইক হাওয়া। আবার সেই অ্যাক্সিডেন্ট স্পটে বাইক। পুলিশ অনেক চেষ্টা করেছিল -পাহারা বসিয়ে, তালা নিয়ে, শিকল জড়িয়ে- কিন্তু প্রতিবারেই ভোর রাতে বাইক বেপাত্তা হয়ে খালের পাশে চলে আসত। তারপর রিপোর্টার এলো- কাগজে টাগজে বেরোলো। গ্রামে গ্রামে গল্পটা ছড়ালো। মন্দির তৈরি হয়ে গেল।

-মন্দির!

-হ্যাঁ, ঐ গাছের পাশে। পুলিশও আল্টিমেটলি বাইক ফিরিয়ে দিল মন্দিরে।

-পুজো হয়?

- এভরি ডে। চলুন দেখে আসবেন। সবাই বলে, ঐ থানে পুজো দিলে অ্যাক্সিডেন্ট হয় না। ফুল দেয়, আগরবাতি , সেই সঙ্গে কী দ্যায় জানেন?

-কী?

-খাবার টাবার কিছু হবে। জিলিপি?

- না স্যার। মদের বোতল। আমিও পুজো দি। প্রত্যেক ট্রিপের আগে।

-মানে মাল খেয়ে গাড়ি চালালেও কিছু হবে না! শালা!

- চুপ কর না, গাবলু আছে-

-আপনার গাড়িতে কোনো দিন অ্যাক্সিডেন্ট হয় নি?

"নেভার" বলে, গোঁফ মুচড়োলো প্রদীপ চৌহান।

যে গাছে ওম সিংএর রয়াল এনফিল্ড বুলেট ধাক্কা মেরেছিল, তাকে বিজন আর স্নিগ্ধার বড়ই শীর্ণ লাগছিল-জীর্ণ শীর্ণ তরু- মানতের লাল সোনালী জরিপাড় কাপড়, সোনালী বালায় ঢেকে আছে; পাশে উঁচু লাল বেদীর ওপর ওম সিং রাঠোরের সাড়ে তিনশো সি সি বাইক পুজো পায়। চারদিকে স্বচ্ছ প্লাস্টিকে ঘেরা- একঘেয়ে সুরে সমবেত গান হচ্ছে। ধুপের ধোঁয়া , ফুল, ভাঙা নারকোল, প্যাঁড়া বেদীর অন্যপাশে- মাথার ওপর ঠা ঠা রোদ নিয়ে ঘিয়ের বাতি জ্বলছিল; ওদের কপালে লাল তিলক আঁকল সেবায়েত, হাতে ধাগা বেঁধে দিল তারপর। গাবলুকে কোলে তুলে নিয়ে বাইকের সামনে হাসিমুখে পোজ দিয়েছিল প্রদীপ, ভিকট্রি সাইন দেখিয়েছিল।

 



উদয়পুর থেকে বেরিয়ে স্নিগ্ধা বলল, " সে কী ! আমরা হলদিঘাট যাবো না? প্রদীপ?"

- ও তো আমার লিস্টে নেই, ম্যাডাম।

-কেন? লিস্টে নেই কেন? উদয়পুর থেকে হলদিঘাট যাবো না? অ্যাঁ? হলদিঘাট লিস্টে নেই, একী করে সম্ভব?

- দেরি হয়ে যাবে ম্যাডাম। এরপর চিতোর দেখবেন, সেখান থেকে রন্থম্বোর রীচ করব। অনেক রাত হয়ে যাবে। রাস্তা ভালো নয় ম্যাডাম। জংলী জানোয়ার বেরোয়- লেপার্ড টেপার্ড।

- কত আর দেরি হবে? এই তো পথেই তো-

-আপনাদের এজেন্ট আমাদের কম্পানিকে যেমন যেমন বলেছেন, আমরা তো সেটাই ফলো করছি। আপনি কথা বলুন এজেন্টের সঙ্গে। আভি।

দুজনেরই গলার স্বর সামান্য চড়ছিল। ট্যুরের প্রথমেই প্রদীপের সঙ্গে স্নিগ্ধার সামান্য তর্কাতর্কি হয়েছিল- রাতে আজমের শরীফ দেখা নিয়ে। স্নিগ্ধা জেদ করেছিল, রাতের আজমের দেখবে, কাওয়ালি শুনবে। প্রদীপ আপত্তি করেছিল। ওর লিস্টে নেই বলেছিল। সেদিনের মত আজও মধ্যস্থতা করল বিজন; হিপ পকেটে হাত বুলিয়ে বলল, " এক্স্ট্রা দেব, কোম্পানিকে বলার দরকার নেই"। প্রদীপ হেসে এফ এমে মোর বোলে রে চালিয়ে দিয়েছিল।

- খুব দেরি করবেন না তো ওখানে?

-দেরি কেন হবে? জায়গাটা জাস্ট দেখব। মানে ঐ শুঁড়ি পথটা-

- আর গোলাপজল কিনবেন ম্যাডাম। হলদিঘাটির গোলাপজল ফেমাস খুব।

শুঁড়িপথ ছাড়াও হলদিঘাটে একটা মিউজিয়াম দেখতে পাবে- স্নিগ্ধা, বিজনের ধারণা ছিল না।

" দেখে আসুন, এলেনই যখন এতদূর" প্রদীপ হাত উল্টে সিগারেট ধরিয়ে চায়ের দোকানের দিকে হাঁটা মারল সটান।

গাবলু গাড়ি থেকে নামতে গাঁই গুঁই করছিল , তারপর মিউজিয়াম চত্ত্বরে বিশাল ঘোড়ার মূর্তি দেখে দৌড়ে গেল; আশেপাশে বর্ম পরা বর্শা হাতে যোদ্ধারা, হাতির শুঁড়ের ওপর সামনের দু পা তুলে দাঁড়িয়ে ঘোড়া - হাঁ করে দেখতে লাগল।

-চেতকের গল্প জানো তো খোকা? আমি গাইড আছি।

- না না গাইড লাগবে না আমাদের, আমরা জানি তো গল্প। ওকে বলব।

- সব তো জানবেন না। চেতকের সমাধি দেখাব। রক্ত তালাওএর গল্প বলব। খোকাবাবুর ভালো লাগবে- ইংলিশেও বলতে পারব।

- আচ্ছা ঠিক আছে। কত দিতে হবে? আমাদের হাতে বেশি সময় নেই কিন্তু-

মাথা নেড়ে চেতকের গল্প শুরু করে দিয়েছিল বুড়ো।

- খুব দৌড়েছিল চেতক, জানো খোকা?

-খুব?

- যুদ্ধে চোট খাওয়া ঘোড়া চেতক প্রভুকে নিয়ে দৌড়চ্ছে-

-প্রভু কি?

-রাণা প্রতাপজী, চেতক যাঁর ঘোড়া-

- চোট নিয়ে দৌড়োলো?

-হর্স ইজ আ নোবেল অ্যানিমাল, পড়েছ খোকা?

-কুকুরও তো। তুমি হাচির গল্প জানো? সেন্ট বার্নার্ড ডগের?

-মানুষ ছাড়া সবাই নোবল অ্যানিমাল , খোকা। নইলে কী আর ছোটো ছেলেকে গল্প বলে খেতে হয়? যাই হোক শোনো। চেতকের পা দিয়ে রক্ত পড়ছে ঝরঝর করে। হাতীর দাঁত বিঁধে গিয়েছিল তো। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে, চোখ বুজে আসছে চেতকের, একটা পা খোঁড়াই হয়ে গেছে, তবু দৌড়য় চেতক, পিছনে তলোয়ার নিয়ে, বর্শা নিয়ে , তীর ধনুক নিয়ে শত্রু ধেয়ে আসছে। শত্রু বোঝো তো? এনিমি এনিমি।

-যাদের সঙ্গে যুদ্ধ হচ্ছিল?

-হ্যাঁ। তো, চেতক দৌড়চ্ছে দৌড়চ্ছে, দৌড়চ্ছে- এক কিলোমিটার, দু কিলোমিটার, তিন কিলোমিটার, পাঁচ কিলোমিটার-

-পাঁচ কিলোমিটার?

- হ্যাঁ। তারপর সামনে নদী। কি করবে চেতক?

-নদী?

-এখানে নদী ছিল তো -

-কী করল চেতক?

-লং জাম্প জানো খোকা? সেই লং জাম্প দিল চেতক; মরিয়া হয়ে সবাই যা করে-মরণ ঝাঁপ । নদী পেরিয়ে গেল চেতক এক লাফে। মুখ থুবড়ে পড়ল ওপারে। আর উঠলনা।

চিতোর থেকে বেরোতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। তারপর সামনে বিয়ে বাড়ির দল- বাজনা , ঘোড়ার ওপর মুখ ঢাকা বর। গাবলু বলল, " দেখো, দেখো, রাণা প্রতাপজী।" বিজন ভিডিও নিল।

রাস্তা ফাঁকা পেতে প্রদীপ দাঁতে দাঁত চেপে স্পীড বাড়াচ্ছিল।

স্নিগ্ধা একবার ' আস্তে' বলে চুপ করে গিয়েছিল। রাস্তা এখানে আঁকা বাঁকা। পর পর বাঁক। চার নম্বর বাঁক পেরোতে সূর্য ডুবে গেল টুপ করে।




ধু ধু প্রান্তর আর পাহাড় পিছনে ফেলে এসেছিল ওরা। গাড়ির হেড লাইটে যতদূর দেখা যায়, অপ্রশস্ত রাস্তার দুধারে জঙ্গলের আভাস, অনেক দূরে দূরে গৃহস্থের আলো দেখা যাচ্ছিল প্রথমে, তারপর কুয়াশা নামল ঘন হয়ে; হেডলাইটের আলোয় সামনের পথটুকুই দেখা যায়। রেডিও বন্ধ করে খিঁচিয়ে উঠেছিল প্রদীপ।

-শুনলেন না তো। এখন দেখুন কী অবস্থা হ'ল। ফেঁসে গেলাম আমরা।

-কিছু হবে না প্রদীপ। ঠিক পৌঁছে যাব। রাস্তা এমন কিছু খারাপ তো নয়।

-আপনি এসে ধরুন না স্টীয়ারিং। শহুরে বাবু..

বিজনও মুখ খারাপ করতে যাচ্ছিল। স্নিগ্ধা ওর জ্যাকেটের হাতা টেনে ধরে বসাল।

-মাথা গরম করে লাভ আছে? আর একস্ট্রা টাকা তো দিচ্ছি-ই


-রাস্তায় একটা কিছু হয়ে গেলে আপনাদের ঐটাকায় কী হবে? টাকা টাকা টাকা-

বিজবিজ করতে করতে স্পীড বাড়াল প্রদীপ। রাস্তার বাঁকের হেডলাইটের আলো এমনভাবে গাছের গায়ে পড়ছিল যেন গাড়ি গিয়ে ধাক্কা মারবে গাছে; বুক ঢিবঢিব করে স্নিগ্ধার, পালির সেই সরু গাছের কথা মনে হয়- মানতের কাপড়, গয়নায় ঢাকা; পরক্ষণেই আলো রাস্তায় গিয়ে পড়ে- জোরে নিঃশ্বাস নেয় সে।

উদ্বেগ আর স্বস্তির এই দোলাচল ক্রমে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছিল ওদের। প্রদীপ আবার রেডিও চালিয়েছিল। স্নিগ্ধা, বিজন সীটে এলিয়ে বসেছিল। গাবলু ঘুমিয়ে পড়েছে।

এমন সময় বোম ফাটার মত আওয়াজ করে গাড়ি থেমে গিয়েছিল। তুমুল ঝাঁকুনিতে বিজন আর স্নিগ্ধার মাথা ঠুকে গেল গাড়ির ছাদে, প্লাস্টিকের ব্যাগের দুটো কাচের বোতল ছিটকে পড়ে চুরচুর হ'ল, গোলাপজলের গন্ধে ভরে গেল গাড়ি, গাবলু চেঁচিয়ে উঠল -মা কী হল?

"সতনাশ হো গিয়া-কিসিকো মার ডালা", ডুকরে উঠল প্রদীপ।

- সে কী!! মানুষ? অ্যাঁ মানুষ?

-জানি না-

- জানি না মানে?

-নামতে হবে। কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

" আমিও নামছি ", বিজন বলেছিল। জানলার ধারে বসা স্নিগ্ধা বলল, "নামাটা সেফ?"

- আরে লোকটাকে তো হাসপাতালে নিতে হবে-

স্নিগ্ধার গা গুলিয়ে টকজল উঠল- কোনোরকমে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে হড়হড় করে বমি করল রাস্তায়।

গাড়ির আলোয় যতটা দেখা যাচ্ছিল, তার বাইরে কুয়াশা। প্রদীপ আর বিজন টর্চ জ্বেলে আশে পাশে দেখছিল। এদিক ওদিক কুয়াশা ফুঁড়ে ঝোপঝাড় বেরিয়েছে। ফণিমনসার মত কাঁটা গাছ। সেইখানে অন্ধকারের একটা স্তূপ পড়ে আছে যেন। বিজনের বুক কেঁপে উঠল।

-প্রদীপ, ঐ যে, ঐ খানে-

দুটো টর্চের আলো কুয়াশা ছেঁড়ার চেষ্টা করছিল, অন্ধকারের পুঁটলির ওপর ফোকাস করতে চাইছিল- এবারে ঘন বাদামী রোম দেখা গেল এক ঝলক।

প্রদীপ বলল-" মানুষ নয়, জানোয়ার। কাছে যাবেন না" ।

-কী জানোয়ার?

-শের হো সাকতা, লেপার্ড ভি হো সাকতা। লেপার্ডের বাচ্চা হলে মা টা যদি আশেপাশে থাকে-

-আর হরিণ হলে? ফাইন দিতে হবে তো?

"গাবলু বেটা, ম্যাডাম, গাড়ি কে অন্দর, আভি" , প্রদীপ চেঁচিয়ে উঠল, তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিল লম্বা ডাল- দূর থেকে খোঁচা দিল অন্ধকার স্তূপে। একবার দুবার। বারবার। তারপর এগোলো। পিছনে বিজন। টর্চ জ্বলছে দুটো।

"জয় বুলেটবাবা", প্রদীপ চেঁচিয়ে উঠেছিল, " ভয় নেই স্যার, কুত্তা হ্যায়।"

-কুকুর? বুনো কুকুর?

-গলায় বকলশ- পোষা কুকুর।

- এখানে পোষা কুকুর কী করে এল?

-হয় স্যার। এ'রকম হয়। জানোয়ার পোষে মানুষ, যত্ন করে না, রাখতে জানে না। কখন পালিয়ে এসেছে, তারপর পথ ভুলে জঙ্গলে।

-শের নয়। মানুষ নয়। হরিণ নয়। জাস্ট কুকুর। সির্ফ এক কুত্তা।

-বুলেটবাবা বাঁচিয়ে দিলেন। কী বলেছিলাম স্যার? অন্ধকারে গোঁফ মুচড়োলো প্রদীপ। হা হা করে হাসছিল বিজন। গলার মাফলার, জ্যাকেট খুলে ফেলেছিল। ঘামে সর্বশরীর ভিজে গিয়েছে।

আর ঘন্টাখানেকের মধ্যে গাড়ি হাইওয়েতে উঠে পড়ে। ব্যাকসীটে গা এলিয়ে দম্পতি- খিদে খিদে পাচ্ছে। হোটেলে পৌঁছেই ডিনার দিতে বলবে- রুম সারভিস। এফ এমে পরদেশি পরদেশি জানা নেহি দিয়েছে। স্টীয়ারিংএ তাল ঠুকছে নিশ্চিন্ত চালক। মোবাইলে ফোর জি অ্যাভেলেবেল দেখাচ্ছে- টুং টাং টুং টাং মেসেজ ঢুকছে তিনটে মোবাইলে।

কুয়াশা কেটে গিয়ে তারাভরা আকাশ দেখা যাচ্ছিল- দূরে শহরের আলো। বালকটি কেবল ঘুমের মধ্যে ' হিঙ্গুলিয়া হিঙ্গুলিয়া' বলে কেঁদে উঠল হু হু করে।

--------------


লেখক পরিচিতি:

ইন্দ্রাণী দত্ত 

শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন, 'আমরা যখন সত্যিকারের সংযোগ চাই, আমরা যখন কথা বলি, আমরা ঠিক এমনই কিছু শব্দ খুঁজে নিতে চাই, এমনই কিছু কথা, যা অন্ধের স্পর্শের মতো একেবারে বুকের ভিতরে গিয়ে পৌঁছয়। পারি না হয়তো, কিন্তু খুঁজতে তবু হয়, সবসময়েই খুঁজে যেতে হয় শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ স্পর্শ।"

ইন্দ্রাণী খুঁজে চলেছেন ।

এ'যাবৎ প্রকাশিত দশটি গল্পের সংকলন-'পাড়াতুতো চাঁদ'।

 

 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন