মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

সরকার আশরাফ'এর গল্প : প্রকৃতি-বিষয়ক জটিলতা

এখন থাক্যা আর কেউ শুক্কুরের বাড়ির ধার দিয়্যা যাবেন না। ওরা হলো বেজাতের বেজাত। কমিন্যের কমিন। এগ্যেরে ছাড় দেয়ার অর্থই হল নিজের উপর ইমানী দায়িত্বকে ছাড় দেয়া। এডা আমরা পারি না। শরিয়া আইন কি বলে? শরিয়া আইনে আছে, ব্যভিচারের দায়ে বিবাহিত বা বিবাহিতা অপরাধীর শাস্তি জনগণের সামনে পাথরের আঘাতে মৃত্যুদণ্ড, যাকে রজম বলে। আমরা তো আইনের বাইরে চলব্যের পারি না।

গলায় ঝুলানো মদিনা মিনার ছাপা গামছার কোণায় দাড়িভর্তি মুখটি মুছে আফতাব মৌলানা আবারও শুরু করেন, তাহলে কথা এইডাই ঠিক থাকলো, মর্জিনার ব্যভিচারের জন্যে যে শাস্তি শরিয়ায় আছে, তা কাল ঈদগাহ মাটত সগ্গুলির সামনে আল্লাহর দুনিয়ার সকল কাকপক্ষিগুলাক সাক্ষি থুয়্যা তাই করা হবি। আপনেরা যারা এডি জড়ো হচেন তারা সগ্গুলি যতো কামকাজই থাওক না ক্যা, সবারই কল্যে আসা লাগবি-- বলে সমাপ্তি টানেন।

আস্তে আস্তে সবাই উঠে পড়ে। মাঘের রোজা, তার ওপর খতমে তারাবি, এমনিতেই নামায শেষে কারো থাকবার কথা নয়। কিন্তু কুকামের বিচার। তাও আবার পাক রমজান মাসে। না থাক্যা গুনাগারি করবুনি ! রমজান মাস নিজের ইমান পোক্ত করার মাস। আর এই রমজান মাসে ব্যভিচারের বিচার। জেনা ! ওয়াসতাকফেরুল্লাহ।

আফতাব মৌলানার বাণীগুলো মুসল্লিদের মুখে মুখে ফেরে। সভায় উপস্থিত থেকে পবিত্র কিছু দায়িত্ব পালন করার আমেজ ছড়িয়ে পড়ে সবার চোখেমুখে। আত্মতৃপ্তির ঝিলিক ছিটকে পড়ে ইতস্তত। শুধু মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে রাখা কাঠের বাক্সের ভেতর সেন্ডেল খুঁজতে এসে মেজাজ বিগড়ে যায় কালু মুন্সির। মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার্থে মুসল্লিরা মসজিদে ঢোকার আগে এই বাক্সেই জুতা-সেন্ডেল রাখে। কালু মুন্সিও রেখেছিল অনেকটা ইচ্ছের বিরুদ্ধেই। ভয় ছিল, যদি কেউ লিয়্যে যায় ! আর হবি না ক্যা ! মঙ্গা কাত্তিকের বাজারে তিন কুড়ি আট টাকা দিয়া কেনা সেন্ডেল।

নামাজের শেষ কাতারে দাঁড়ানোর ফলে রুকুতে যাবার সাথে সাথে ঘাড় একটু বাঁকিয়ে হাতের ফাঁকফোকর দিয়ে জুতার বাক্সটিকে দেখে নেয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেনি কালু মুন্সি। নামাজ পড়তে পড়তে পেসাবের ভান করে সেন্ডেল জোড়া দেখেও গিয়েছিলো একবার। তকোন তো ঠিকই আছিলো। তালে লিলো কখন! মিটিং শেষ হলে হামিই তো পয়লা বার হয়্যা আসি !

সেন্ডেল চুরির বিষয়টি কালু মুন্সি থেকে দবির উদ্দিন খয়বর আলী হয়ে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে সকল মুসল্লিদের মাঝে। মৃদু একটা গুঞ্জন ওঠে চারদিকে। কালু মুন্সির তো রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ার উপক্রম। চুদির ব্যাটারা, নামাজ পড়ব্যার আসে না চুরিচামারি করব্যার আসে? শালারা আবার ওজাও থাকে। আল্লাহ পরকালে তোরক্যেরে ভেস্ত না, গোয়ার মধ্যে দিয়া ইয়ে ঠেল্যা দিবিহিনি-- খিস্তি ছাড়তে ছাড়তে শেষে খালি পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করে কালু মুন্সি।


২.

আফতাব মৌলানা যেন হাওয়ায় উড়ে চলেছে। মসজিদ থেকে রাস্তা, রাস্তা থেকে বাড়ি, বাড়ি থেকে এক ঝটকায় মৌটুসীর গাছ-নদী-মানুষ ছাড়িয়ে সোনাদিয়ার মাঠ-জঙ্গল পেরিয়ে সোহাগী, তারও পরে বনতুলসীর লোকালয় এবং আরও পরে বিষ্ণুপুরের বাঁশঝাড়ের ভেতরকার সরু রাস্তা দিয়ে দেবদারু বনের লাগোয়া মজাপুকুরের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে শন আর ঝাউয়ের ঝোঁপঝাড়ের ভেতর এসে নিঃশ্বাস ছাড়ে। আহ্, স্বস্তি। এই শন আর ঝাউয়ের ঝোঁপঝাড়ের ভেতরই ৭১-এর শেষে ডিসেম্বরের একটি রাত কাটিয়েছিলো আফতাব মৌলানা। টুপটাপ করে শন আর ঝাউয়ের মাথা থেকে গড়িয়ে পড়া শিশিরগুলো শব্দহীন বুলেট হয়ে বিঁধছিলো মাথায়, পিঠে, মেরুদণ্ডের হাড়ে।

প্রথম প্রথম এসব কিছুই বোধে আসেনি আফতাব মৌলানার। আসপে কি কর‍্যে? গুলিগুলান ১, ২, ৩, ৪ হয়ে ১১ জনের পাঁজর ফুড়্যা আসার আগেই হাঁটু মুড়্যা কাত হয়্যা পড়্যা গিয়্যা তবে না বাঁচা! তা না হলে কাসার জঙ্গলের মধ্যে ক্রলিং কর‌্যা হান্দাবার সুযোগও হল নাহিনি। আর জান তো জান, তেরোডার সাথে লিজের শরীলডাকও ছাইড়্যা দেওয়া লাগলহিনি বিষ্ণুপুরের শেয়াল-কুকুরের কাছে। কামড়া-কামড়ি কর‌্যা ছিড়্যা খালোহিনি।

জীবনটা বেঁচেছিল। কিন্তু ডান হাতের তর্জনী বাঁচাতে পারেনি আফতাব মৌলানা। একটা গুলি কখন যে ডান হাতের তর্জনীর গোড়ায় আঘাত করে বেরিয়ে গিয়েছিল, টেরই পায়নি কাৎ হয়ে পড়ে যাবার সময়। দীর্ঘক্ষণ পরে, শুক্কুর আলী দলবল নিয়ে ফিরে গেলে আস্তে আস্তে হামাগুড়ি দিয়ে শন আর ঝাউয়ের ঝোঁপঝাড়ের ভেতর ঢুকে ডান হাতের তর্জনীর গোড়ার ব্যথাটি প্রথম টের পায়। লক্ষ করে, ডান হাতের তর্জনীটি নেই। তার গোড়া থেকে চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ছে গাঢ় তরল। আরও লক্ষ করে, একটা চীনাজোঁক খোয়া যাওয়া তর্জনীর গোড়ায় আটকে আছে। জোঁকটা সম্ভবত এতোক্ষণ রক্ত চুষে চুষে বেঢপ মোটা হয়ে যাওয়ায় নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিলো না।

সেই থেকে আফতাব মৌলানা ১৯ আঙুলে, তাও আবার ডান হাতের তর্জনী খোয়া যাওয়া। এই খোয়া যাওয়া আঙুলটি তাকে ভুগিয়ে চলেছে আজ ৩২ বছর। ধর্মসভায় কিংবা মসজিদে মিলাদে ওয়াজ করার সময় কী যে কষ্ট হতো তা আফতাব মৌলানা ছাড়া আর কে জানে। এই নাদান বান্দারা, তোগ্যারে কি মরণ হবি না, তোমরা কি হাশরের ময়দানে-- বলতেই ডান হাতের তর্জনী আকাশমুখী করে তোলার কথা। কিন্তু আফতাব মৌলানা পারেনি। কখনও তর্জনীশূন্য হাতটি উপরে উঠে গেলে কেবল একটি মুঠিই চোখে পড়তো। প্রত্যক্ষ খিস্তিটি শুনতো তখনই। শালা আজাকারের বাচ্চা... ।

১৩ জন রাজাকারের দলটিকে নিয়ে শুক্কুর আলী যেদিন বিষ্ণুপুরের মজা পুকুরপাড়ের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে এনে লাইন করে দাঁড় করায়, সেদিন ২৭ ডিসেম্বর। রাত কতোই বা হবে। ৯টা কি ১০টা। গাঢ় কুয়াশায় চাঁদের ম্লান আলোও ফিক করে হেসে উঠেছিলো তখন। প্রথমে মৌটুসীর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবুল হোসেন মোল্লা, তারপর শান্তি কমিটির সেক্রেটারি আফতাব মৌলানা, তারপর শান্তি কমিটির সদস্য হোসেন আলীসহ অন্যরা। লাইনটা সাজানোও হয়েছিলো এভাবেই। একেবারে শেষ মুহূর্তে নিজের বুদ্ধির জোরেই আফতাব মৌলানা চলে আসে লাইনের শেষ ১৩ নম্বরে।

লাইন কর‌্যা আজাকার মারার মজাই আলাদা-- বলতো গোবিন্দ মণ্ডল। অপারেশন শেষে চোর-ছ্যাচড়-রাজাকার নিয়ে ফেরার পর রাজাকারগুলোকে আলাদা করে রাখতো গোবিন্দ মণ্ডল। এদের নিয়ে ইঁদুর-বিড়াল খেলতো। গোবিন্দের ভাষায়, আজাকার হলো হামাগ্যের অপারেশনের ইনিচপিরেশন। এই মালগুল্যাক অতো তাড়াতাড়ি খরচ করল্যে অপারেশনত যাওয়ার মজা পামু কুটি থাক্যা। তবে দিন সাতেকে ডজনখানেক রাজাকার জোগাড় হলে গোবিন্দ মণ্ডলকে আর আগলে রাখা যেতো না। রাজাকারগুলোকে শুয়োরের পাল বানিয়ে খেদিয়ে নিয়ে যেতো বিষ্ণুপুরের দেবদারু বনের লাগোয়া মজা-পুকুরপাড়ের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে।

চোর-ছ্যাঁচড়গুলোকে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখতো মাঠে। বলতো, এগল্যা, গুলি খাওয়ারও অধম। মরুকগে লাত্থিগুড়ি খায়্যা। মরতোও তাই। দিনে হৈ হৈ করে ছেলেপুলের দল হামলে পড়তো এদের উপর। কেউ কান টানতো, কেউ ঘুষি মারতো, কেউ-বা লাথি মেরে গুড়িয়ে দিতো বুকের পাঁজর। পিপাসায় ঠোঁটের আগায় দম লাফাতো। পানি দিতো না কেউ। মার আর হিম কুয়াশায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতো ২/৩ দিন। তারপর শুধু লাশ হয়ে যাওয়া।

পাশ থেকে আলো-আঁধারির ভেতর আবুল হোসেন মোল্লার বুক বরাবর এলএমজি তাক করে গোবিন্দ মণ্ডল শুধু শুক্কুর আলীর হুকুমের অপেক্ষায়। হুকুম তো হুকুম। সে শুধু শুক্কুর আলীর ইশারা মাত্র। শুক্কুর আলীসহ ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা গোবিন্দ মণ্ডলের পাশে দাঁড়ানো। সামনে ১৩ জন রাজাকার চোখবাঁধা অবস্থায় থরথর কাঁপছে।

শুক্কুর আলীর বাঁ হাতটা একবার উপরে উঠে নেমে যেতেই গোবিন্দ মণ্ডলের ২ হাতসহ সারা শরীরে ঝাঁকুনি ওঠে। সাথে সাথে আকাশে হাউই ছোটে। দশ বিশ শ’ হাজার লক্ষ কোটি হাউই। ১৩ জনের কেউ কেউ ২/৩ হাত লাফিয়ে উঠে নেতিয়ে পড়ে, কেউ-বা কাটা গাছের মতো গড়িয়ে যায়। একটানা গোঙানি উঠে চারদিকে। আর তারই ভেতর রক্তের ধারা নামে পুকুরের পাড় বেয়ে ক্রমশ নিচে।

দীর্ঘ দুই যুগে আফতাব মৌলানার অনেক কিছুই ভুলে যাবার কথা। ভুলে না গেলেও অন্তত সয়ে যাবার কথা। কিন্তু পারেনি। ডান হাতের খোয়া যাওয়া আঙুলটিই তাকে ভুলতে দেয়নি। জুম্মা কিংবা ওয়াক্ত নামাজের আগে-পরে ওয়াজ করতে গিয়ে যতোবার শুক্কুর আলীর চোখে চোখ পড়েছে, ততোবারই বিষ্ণুপুরের মজা-পুকুর পাড়ের ভয়াবহতা তাকে আছড়ে আছড়ে মেরেছে। আর একোন, শালার শুক্কুর আলী, তোমাক কে বাঁচাবি? হামাগ্যের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ইমানদার আবুল হোসেন মোল্লাক মারে‌্য ফেলার হিসাব লিমু না? খান সাহেবক্যেরেক দেশ থাক্যা তাড়্যে দিয়্যা ইসলামের যে ক্ষতি করিছু তার হিসাব লিমু না? লিমু। সব লিমু।


৩.

শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো আফতাব মৌলানা। দীর্ঘ অপেক্ষা। আর এ সুযোগটা করে দিয়েছে শুক্কুর আলীর মা-মরা মেয়ে মর্জিনা। মর্জিনারই-বা দোষ কুঠি। বাপে তো বিয়্যা দিছিল আগাপাছ দেখ্যাশুন্যাই। তকন কি কেউ জানিচ্ছিলো বছর ঘুরত্যে না ঘুরত্যেই মরদটা মরবি বাজ পড়্যা। তাও যদি কিছু থুয়্যা গেলোহিনি। থুয়্যা যাবিটাই-বা কি? থাকার মধ্যে গাওত হাতির লাকান বল ছাড়া আর আছিলোটা কি?

সুরুজ আলী কিছু রেখে যেতে পারেনি। মারা যাবার পর দেড় বিঘা জমি নিয়ে ৬ ভাইবোনে কাড়াকাড়ি। মর্জিনার ভাগ্যে কিছু জোটার কথা নয়। জোটেওনি কিছু। ২ মাসের মাথায় দেবর-ভাসুর মিলে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিলে বাপ শুক্কুর আলীই ভরসা। বাপ তো আর ফেলে দিতে পারে না। উঠলো বাপের বাড়িতেই। কিন্তু শরীর বলে তো কথা। বাপ তো খাবার দেয়, পরব্যারও দেয়। শরীল দেখে ক্যে!

শরীরটাই হয়েছিলো কাল। বাপের বাড়ি আসার ৯ মাসের মাথায় পাড়ার মেয়েদের কাছেই প্রথম ধরা পড়ে মর্জিনা। ধরা তাকে পড়তেই হতো আর ক’মাস পরে হলেও। তখন কি আর পেটটাকে আগলে রাখা যেতো!

মর্জিনার গতর ভারী হয়ে ওঠার খবর এ-বাড়ি ও-বাড়ি হয়ে আফতাব মৌলানার কানে পোঁছালে তার মুখভর্তি দাড়ির ভেতর দিয়ে রোশনাই বেরুতে থাকে। আফতাব মৌলানার মুখ থেকে এরকম রোশনাই ঠিকরে বেরিয়েছিলো যুদ্ধের সময়। তারপর তো দুই যুগ।

আফতাব মৌলানার ফতোয়া বাতাসে দুলতে দুলতে অন্ধকার আর কুয়াশার ফাঁকফোকর গলে রাতের মধ্যেই মর্জিনার কানে এসে থিতু হয়। মর্জিনার কি থিতু হওয়ার উপায় আছে? তার অস্থিরতা বাড়ে। বেলা উঠল্যেই তো সগ্গলে আস্যা হামল্যা পড়বি। মাথার চুল ধর‌্যা টান্যা লিয়্যা যাবি। বুড়া বাপটা তকন কি আর করব্যার পারবি। হামার সাত সাত তাকও লিয়্যা যাবি না! বেটির শাস্তি বাপেক দেখাবি না আফতাব মৌলানা! খালি দেখাবি না। দূর থেক্যা এড্যা-দুড্যা পাথর তার গায়তও ফিক্যা মারবি। ধিক্কার দিতে দিতে বাপের মুখত থুতু দিবি। শরমে হামার বাপটা মর‌্যা যাবি লো। বিড়বিড় করতে করতে ফুঁপিয়ে উঠে মর্জিনা। দুই হাতে মুখ ঢেকে নিঃশব্দ হওয়ার চেষ্টা করে নিষ্ফল হয়। ফোঁপানোটা আস্তে আস্তে কান্নায় দানা বাঁধে।

বেলা ওঠার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে মর্জিনা। তখনও গাছের নিচে, পাতার ফাঁকে, এলোমেলো গজিয়ে ওঠা ঘাসের আস্তরণে আঁধার হাঁটু ভেঙে থির বসে আছে। গুটি গুটি আঁধার মর্জিনার পথ চলায় সাহস যোগায়। তাড়াতাড়ি চল্যা যা মর্জিনা। হামরা তোমাক আড়াল কর‌্যা থুচি। কেউ দেখপ্যার পারবি না। হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালির কাছে নেমে আসা শাড়ির কান ধরে উপরে তুলে দ্রুত হাঁটতে থাকে মর্জিনা।

একঝাঁক অতিথি পাখি মর্জিনার মাথার উপর দিয়ে ক্যাঁক ক্যাঁক চিঁ চিঁ করে উড়ে গেলে গুটি গুটি আঁধার ঝুর ঝুর করে ভেঙে পড়ে। ততক্ষণে গাঢ় কুয়াশা দুই হাতে ঠেলে মৌটুসীর শেষ সীমানার মরা খালটার একহাঁটু পানি ভেঙে তীরে উঠে গেছে মর্জিনা।

আর ভয় নেই। এখন সামনে কেবল এক মাঠ। রাস্তা ছেড়ে উদোম মাঠের বুক মাড়িয়ে কোণাকুণি হাঁটতে থাকে মর্জিনা। ঠিক হাঁটা নয়। দৌড়াতে থাকে যেন। আফতাব মৌলানার কেতাবের ভয় এবার ফাঁকা মাঠের মতো ফাঁকা মনে হয় তার কাছে। মৌলানার ফতোয়াগুলোও যেন কুয়াশায় ভিজে ঠাণ্ডা হিম হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। বেলা ওঠার আগে কোনোভাবেই আর জড়ো করে শাণিত করে তোলা সম্ভব নয়। তার আগেই মর্জিনা মাঠ পেরিয়ে পৌঁছে যাবে সোনাদিয়া রেল স্টেশন। টেরেনটা যদি ধরব্যার পারি, তালে আপতাব মৌলবি তো আপতাব মৌলবি, কোন লটির ব্যাটাই ইয়েডাও ছিড়বার পারবি না।

স্টেশনে এসে হাঁপ ছাড়ে মর্জিনা। ট্রেন এসে তখনো পৌঁছায়নি। তবে ঢং ঢং ঘণ্টি বাজিয়ে ট্রেন আসার খবর জানিয়ে দিয়েছে পয়েন্টসম্যান। যে ২৫/৩০ জন মানুষ পায়চারি করছিলো, ঘণ্টির শব্দে তাদের ভেতর ব্যস্ততা বাড়ে। ওয়েটিং রুমের বারান্দায় ৪/৫টি বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে শুয়েছিলো এক মাঝ বয়সী মহিলা-- সেও উঠে চটের ব্যাগ গোছাতে শুরু করে। এ্যাগারে সাত মিশ্যা গ্যালে কেঙ্কা হয়? শাড়ির আঁচলটা টেনে বগলের পুটলিটিকে বুকে জড়িয়ে এতকিছু না ভেবে ভিড়ে যায়।

এবার তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে হারেসের ওপর। এই হারেসই তো বিয়ের আগেত্থিনি হামার পাচত লাগিছিল। বিদব্যে হবার পর জিগ্যার আঠার মত পাচে লাগ্যা আচিল। বলেছিল, মর্জিনা, হামি ডিবি পাচি। এবার তোক লিয়্যা আমেরিকাত চল্যা যামু।

ডিভির কথা আগেই শুনেছিলো মর্জিনা। শুনেছিলো, ডিবি পেলে আমরিকা যাওয়া যায়। আমরিকা তো আমরিকা না, বেহেস্তের বাগান।

সেই বাগানের হাতছানিতে পড়েছিল মর্জিনা। নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলো হারেসের কাছে। ঐ যে হারেস গ্যালো, যাবার সময় এনা দ্যাকাও কর‌্যা গ্যেল না। তা না হলে বুড়া বাপটাক একলা থুয়্যা চল্যা আসি আপতাব মৌলবির ভয়ে!


৪.

রমজানে সকাল নামে একটু দেরি করেই। সেহরির পর ফজর নামাজ পড়ে অনেকেই আরও কিছু সময় লেপকাঁথার ওমে শরীর গরম করে নেয়ার চেষ্টা করে। এই করেই শাহী মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে সকলের জড়ো হতে হতে ১০ টা পার হয়ে যায়। আফতাব মৌলানার কি আর সেসময় আছে? ফজর নামাজ শেষে ২/৪ জন নিয়ে মসজিদেই থেকে যায়। শলাপরামর্শ করে। পাথর জোগাড় করা, মাঠের মাঝখানে এক কোমর গর্ত করা-- সবকিছু হয় তার নেতৃত্বেই।

আফতাব মৌলানা দলবল নিয়ে যখন শুক্কুর আলীর বাড়ি পৌঁছে তখন মাঘের সূর্য সকালবেলার কুয়াশায় জমে ওঠা হিম শুষে শুষে কেবল সিঁটানো রোদ চারদিকে ছড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। রোদের ছিঁটেফোঁটা বেড়ার ফাঁকফোকড় গলে শুক্কুর আলীর ঘরে ঢুকে পড়লে শুক্কুর আলী বাইরে বেরিয়ে আসে। দেখে আফতাব মৌলানাসহ জনাপঞ্চাশেক মানুষ তার ঘরটিকে চারদিক থেকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস কথা বলছে। শুক্কুর আলীকে দেখে তৌহিদী জনতা এবার আরও ঘন হয়ে ক্ষিপ্রতার মশালটিকে উপারে তুলে ধরে। এ অবস্থায় অনেকটা ভূত দেখার মতো ঠেকে শুক্কুর আলীর কাছে। ক’দিন থেকে জ্বরে পড়ে শরীর এমনিতেই গুটানো। সকাল থেকে মর্জিনাও নেই। খাওয়া হয়নি এখনও। কিছু ভাবতে পারছিলো না সে।

শুক্কুর আলীকে কিছু ভেবে ওঠার সুযোগ না দিয়েই আফতাব মৌলানা বলে ওঠে :

-- মর্জিনা কুনটি?

-- মর্জিনাকে খুজিচ্ছেন কিসক আপনারা? পাল্টা প্রশ্ন করতে গিয়ে শুক্কুর আলীর ভাঙাস্বর আরও ভেঙে পড়ে।

-- কিসক খুজিচ্ছি তা পরে বুঝবানি। আগে কন মর্জিনা কুনটি? কালু মুন্সির যেন তর সইছিলো না।

-- মর্জিনা তো সকাল থাক্যা ঘরত নাই। কুনটি গ্যাছে তাও তো কব্যার পারিচ্ছি না।

-- কব্যার পারিচ্ছেন না ! কুনটি লুক্যা থুচেন তা কন না ক্যা।

-- কিন্তু মর্জিনাক কিসক খুজিচ্ছেন তা তো কচ্চেন না।

-- কিসক খুজিচ্ছি তা এখনও বুঝিচ্ছেন না? শালা বেটিক নিয়্যা ঘরত ব্যবসা করেন, আর এড্যা বুঝবার পারিচ্ছেন না !

আফতাব মৌলানার খুঁচায় চারদিকের হিম আর সিঁটানো রোদ আরও সিটিয়ে মুখ ঘুবড়ে পড়ে। মর্জিনা যে পোয়াতি হয়েছে-- এখবর শুক্কুর আলীও জানে। এ নিয়ে বাপ-মেয়েতে কথা কাটাকাটিও হয়েছে ক’দিন আগে। মর্জিনার বমি বমি ভাবটা দেখে বাপ হয়ে শুক্কুর আলীই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানবার চেষ্টা করেছিলো। মর্জিনা কোন রা করেনি। শুধু বাপের জেরার মুখে বলেছিলো-- হারেস। এই একটি শব্দই তার শেষ কথা। তারপর ৩ দিন হিম শীতল। ৪ দিনের মাথায় তো মর্জিনাই নেই।

-- কথা কন না ক্যা? মাঝ থেকে কে ১ জন খেকিয়ে ওঠে।

কী কথা বলতে পারে শুক্কুর আলী। তার ঘাড়টি কুঁজো হয়ে মাথাটি বুকের কাছে নেমে এলে বুকের ধুকধুক শব্দটি কানে ঠাস ঠাস আঘাত করে।

শুক্কুর আলীকে নীরব থাকতে দেখে ৬/৭ জন যুবা পুরুষ, থানায় খোঁজ করলে হয়তো এদের অনেকের নামেই নারী নির্যাতন মামলাসহ চুরি-ডাকাতির আলামতও পাওয়া যাবে, হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ে।

একটিই তো ঘর। খুঁজে দেখতে কতোক্ষণই লাগে। ধুপধাপ করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সবাই।

এতোক্ষণে জনাপঞ্চাশেক মানুষ ফুঁসে ওঠে। তারা মর্জিনাকে না পেয়ে শুক্কুর আলীকে টেনেহিঁচড়ে শাহী মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠের দিকে মেলা করে। বিড়বিড় করে কী যেন বলতে চাচ্ছিল শুক্কুর আলী। কে শোনে করা কথা। শুক্কুর আলীকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে মাঠের মাঝখানে যেখানে আফতাব মৌলানা নিজ হাতে এক কোমর গর্ত করে রেখেছিলো মর্জিনার জন্য, সেখানে এনে আছড়ে ফেলে।

শুক্কুর আলীকে ঘিরে আছে সবাই। একপাশে চেয়ার পেতে বসে আফতাব মৌলানা। দুই হাঁটুর মাঝখানে মাথা রেখে এবার শুক্কুর আলী বুকের আর কোন শব্দ শুনতে পায় কি?

-- মর্জিনা কুটি? জেরা শুরু করে আফতাব মৌলানা।

শুক্কুর আলীর কোন জবাব নেই। দুই হাঁটুর মাঝখানে মাথা রেখে ঠায় বসে আছে।

-- মর্জিনা কুটি?

এবারও কোন রা নেই।

একজন অতি উৎসাহী কিস্তি টুপি পরা মুসুল্লি জটলার ভেতর থেকে ছুটে এসে শুক্কুর আলীর দাড়ি ধরে চটাশ চটাশ ২ ঘা লাগিয়ে দেয়। ক হামারজাদা, তোর বেটিক কুটি থুচু। না কল্যে তোর ছাগলা দাড়ি কাট্যে গোয়ার মধ্যে পড় পড় কর‌্যা ঢুক্যা দিমু।

মোয়াজ্জিন খবির উদ্দিন কোত্থেকে একটা ব্লেড এনে শুক্কুর আলীর দাড়ি কাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। জোর করে দাড়ি কাটতে গিয়ে গালের চামড়া কেটে রক্তের ধারা নামে। সে ধারায় ভিজে যায় শুক্কুল আলীর বুক, পেট, লুঙ্গি, পায়ের আঙুল। মর্জিনার বাপকে আর মর্জিনার বাপ শুক্কুর আলী বলে চেনা যায় না তখন।

-- কুত্তার বাচ্চা কথা কয় না ক্যা-- বলতে বলতে আফতাব মৌলানা চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে ডান পায়ে শুক্কুর আলীর বুক বরাবর সাঁ করে লাথি মারে।

আফতাব মৌলানার লাথির ধাক্কা সামলাতে না পেরে অসুস্থ শুক্কুর আলী একটা অস্ফুট শব্দ করে কাৎ হয়ে পড়ে যায়।

তার আগে, লাথি মারার সময় চেড়েৎ করে একটা শব্দ হলেও আফতাব মৌলানার তখন খেয়াল হয়নি। খেয়াল হয় ফিরে এসে চেয়ারে বসার পর। দেখে, পায়ের দিকে লুঙ্গির পাড়টি বিঘতখানেক ছিঁড়ে হা হয়ে আছে। এতে করে বুনো ষাঁড়ের মতো ফুঁসতে থাকে আফতাব মৌলানা। এবার সে অন্যমানুষ। রাগে-ক্ষোভে ছিটকে পড়ছে যেন। শুক্কুর আলীকে কাঁচা খেয়ে ফেললেও সে রাগে পানি পড়বে না।

শুক্কুর আলী অসহায় পড়ে আছে মাঠের মাঝখানে। পড়ে পড়ে গোঙাচ্ছে।

এবার আফতাব মৌলানাসহ উপস্থিত সকলে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে। এভাবে মারতে থাকলে শুক্কুর আলী মরে যেতে পারে। সে এক মহা ঝামেলার ব্যাপার। থানা পুলিশ। কোট কাচারী। এ ঝামেলায় কে জড়াতে চায় !

কেতাবে জেনাগুনাগারির বিচারবিধান থাকলেও মেয়ের ব্যভিচারে বাপের কী শাস্তি হতে পারে এমন কোন ইঙ্গিত আফতাব মৌলানার জানা নেই। কিন্তু শাস্তি তো এনা দেওয়াই লাগবি। সকলে মিলে সিদ্ধান্ত হয়, ঝটকুকে ডাক্যা একটিন গু আন্যা শুক্কুর আলীর মাথাত ঢাল্যা দাও।

ঝটকুকে খুঁজতে হয়নি। মর্জিনার শাস্তি দেখার জন্যে অনেকের সাথে সেও এসে ভিড় করেছিলো। এড্যা তো যা-তা শাস্তি লয়। পাথর ফিক্যা মারা। অতএব, সেও এসেছিল।

ঝটকুর গু নিয়ে আসার আগেই ৩/৪ জন মিলে শুক্কুর আলীর হাত-পা বেঁধে ফেলে। এই ফাঁকে আফতাব মৌলানা গিয়েছিল পেচ্ছাব করতে। ঝটকুর তাড়াতাড়ি ফিরে আসায় সেও আর দেরি করেনি। পেচ্ছাব থেকে উঠার সময় শিশ্নের মাথায় কুলুপটা ঠেসে ধরে লুঙ্গির নীচের দিকটা একটু উপরে তুলে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে। শুক্কুর আলীর কাছে আসার কয়েক কদম আগেই অবশ্য কুলুপটি ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কুলুপটি দৃষ্টিসীমার মধ্যে পড়ায় অনেকেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকিয়ে দেখতে বাধ্য হয়। এ কুলুপ তো শুকনো মাটির ঢেলা নয়, কতগুলো লাল-নীল কাটা কাপড়ের পুটলি।

আফতাব মৌলানা চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে ছোট একটা ভাষণ দেয়ার চেষ্টা করেন। দ্যাকেন, আপনারা সগ্গলেই দ্যাকেন। বাপ হয়্যা মেয়্যাকে বেগানা বানাবার শাস্তিড্যা দ্যাকেন। আর আল্লাহর কাছে আমাগ্যেরে হাজারো শুকরিয়া যে-- বলতেই ডান হাতটি উপরে উঠে পড়ে। তখন সকলের দৃষ্টিতে পড়ে আফতার মৌলানার তর্জনীখোয়া হাতটি। এতোদিন ওয়াজ মাহফিলে আফতাব মৌলানার তর্জনীখোয়া হাতটি দেখে মুসুল্লিরা খিস্তি ছাড়লেও আজ ঈদগাহ মাঠে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে মাত্র। এতোদিনের আজাকারের বাচ্চা খিস্তিটি তাদের মুখ থেকে বেরোবার সাহস পায় না। বরং সেখানে জায়গা করে নেয় আত্মতৃপ্তির ঢেকুর। আর এই প্রথমবার খোয়া যাওয়া তর্জনীটির জন্য আফতাব মৌলানার কষ্টবোধের পরিবর্তে জেগে ওঠে তৌহিদী জোশেমোড়া প্রতিশোধের এক অহং। আফতাব মৌলানা বলেন-- এরকম শাস্তি আমরা সগ্গলে মিল্যা দিবার পারতিছি এ যে কতবড় ইমানী দায়িত্ব পালন তা একমাত্র উপরওয়ালাই জানেন। তিনিই মাফ করনেওয়ালা। সবাই বলেন সোবহানাল্লাহ।

চারদিক থেকে রব ওঠে-- সোবহানাল্লাহ।

এবার আফতাব মৌলানার ইশারায় ঝটকু পুরো ১ টিন গু উপস্থিত জনা পঞ্চাশেক মানুষের তুমুল উল্লাসের ভেতর মর্জিনার বাপ শুক্কুর আলীর মাথায় ঢেলে দেয়।

সে মুহূর্তে হালকা ঝিরিঝিরি পুবাল বাতাস ওঠে। বাতাসের আলতো ধাক্কায় গুয়ের নাকমুখচাপাবমিবমিগন্ধটি শুক্কুর আলীর গা ছেড়ে উল্লসিত মানুষগুলোর গতর মাড়িয়ে মেহরাবের ওপর দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ করে বাতাস থেমে যায়। এতে গুয়ের বদগন্ধটিও কাটা ঘুড়ির মতো মেহরাবের চূড়া হয়ে নিচে নেমে পড়ে।

মর্জিনাকে ধরে আনার জন্য শুক্কুর আলীর বাড়ি যাওয়া, মর্জিনাকে না পেয়ে মর্জিনার বাপ শুক্কুর আলীকে ধরে আনা, তারপর বেটির কুকর্মের জন্য বেটির বাপকে শাস্তি দেয়া এতসব করে সকলে বাড়ি ফিরে গেলেও আফতাব মৌলানার বাড়ি ফিরতে ফিরতে জোহর পার হয়ে আছর নামাজের ওয়াক্ত প্রায় হয়ে আসে। দেরি করিয়ে দিল আফতাব মৌলানার খাসবান্দা মোয়াজ্জিন খবির উদ্দিন। তারই বা দোষ কুনটি। ইঙ্কা সালিশ ছাড়্যা কেউ কি যাব্যার চায়! আর না গেল্যে ছুরির কাজটাই-বা করে ক্যাংকর‌্যা।

এদিকে গুয়ে জবজবে শরীর খোলা মাঠে পড়ে থাকতে থাকতে কখন যে শুক্কুর আলী থির হয়ে যায় তা মৌটুসীর কেউই টের পায় না।


৫.

টের পায় এশার নামাজের পর যখন পুলিশ আসায় আফতাব মৌলানাসহ ডাক পড়ে ৭/৮ জনের। সবার ভিতরই তখন ভয়ের দানাগুলো আস্তে আস্তে ফুটতে শুরু করে। তবুও ৭/৮ জনের সাথে উৎসুক আরও জন ১২/১৩ এসে জট পাকায়।

মৌটুসী আসার পথে অনেক কথাই শুনেছিলেন ওসি মিনহাজুল আবেদীন। চৌকিদার ইয়াদ আলী বলেছিলো, ছার ইঙ্কা মরা সারা জীবনে দেখিনি। সারা গায়ত কিলবিল করিচ্ছে গুপোকা। তাও কোনো অসুবিদ্যা হব্যার কতা আছিলো না। কিন্তু এমন বিচ্ছিরি গন্ধ, বুঝব্যারই পারিচ্ছেন ছার, সারা গায়ত পুরা একটিন গু, ধারে কাছে যাওয়ার উপায় নাই। মনে হলেই খালি বমি বমি লাগে।

মৌটুসী আসার পর থেকে চৌকিদার ইয়াদ আলীর কথার সাথে একটি জায়গায় মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন না ওসি মিনহাজুল আবেদীন । সারা গায়ে গু-পোকা, মল-- সবই ঠিক আছে। কিন্তু সেই বীভৎস গন্ধটি নেই। বরং ঈদগাহ মাঠে পা দেবার সাথে সাথে হালকা মিষ্টি একটা গন্ধ বাতাস কেটে কেটে নাকের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল।

হ্যাজাকের রূপালি আলোয় ওসি মিনহাজুল আবেদীন জনকুড়ি মানুষের উপস্থিতিতে শুক্কুর আলীর সুরতহাল রিপোর্ট লেখায় তৎপর হন।

-- লাশের নাম?

-- শুক্কুর আলী।

-- বয়স?

-- ৬০/৬৫ হবে।

-- পেশা?

-- বর্গাচাষি।

-- বাড়ি?

-- মৌটুসী পূর্বপাড়া।

-- সবাই কি শুক্কুর আলীকে চেনেন?

-- জ্বি, চিনি।

পরিচিতি পর্বের পর ওসি মিনহাজুল আবেদীনের মনোযোগ পড়ে মৃত শুক্কুর আলীর লাশের ওপর। রিপোর্টে লেখেন-- লাশের সারা শরীর গুয়ে জবজবে। দুই হাত পিঠমোড়া করে বাঁধা। দুই পায়ের অবস্থাও অনেকটা একই রকম। জোড় পায়ের বাঁধনটি পা দুটো পেঁচিয়ে গোড়ালি থেকে হাঁটু উপর পর্যন্ত উঠে গেছে। গায়ের আধ ময়লা কালচে চাদরটি এলোমেলোভাবে গুয়ে লেপ্টে আছে। লুঙ্গির গিঁট খুলে যাওয়ায় শিশ্নের মাথাটি উঁকি দিয়ে আছে। মাথাটি উত্তর দিকে রেখে পা দুটো ভাঁজ হয়ে দক্ষিণ দিকে পড়ে আছে। সারা গায়ে কিলবিল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে হলদে-সাদাটে গুপোকা। নাকের ছিদ্র, চোখ, মুখ, বুক, পিঠ, পাছা, আঙুলের ফাঁকফোকর সর্বত্র গুপোকা।

এই পর্যন্ত লিখে ওসি মিনহাজুল আবেদীন সুইপার ঝটকুকে বলেন-- ঝটকু, লাশটাকে একটু উল্টাতো দেখি বাপ।

সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির সময় প্রায়ই ডাক পড়ে ঝটকুর। ওসি মিনহাজুল আবেদীনের মুখ থেকে বাপ ডাক কখনও শুনেনি বলে আজ খটকা লাগে তার। আর পাবে কোত্থেকে! এমনি কর‌্যা আগে কেউ মরেছে না-কি যে শুনতে পাবে! গুয়ে গুয়ে নেয়ে উঠ্যা তবে মিত্যু !

ঝটকু পলিথিনে মোড়ানো দুই হাতে শুক্কুর আলীর হাত-পায়ের বাঁধন খুলে আস্তে করে লাশটিকে উল্টে দিলে বাম পাঁজরের কাটা জায়গাটি উন্মোচিত হয়। এতে ওসি মিনহাজুল আবেদীনসহ সকলের ভ্রু কুঁচকে উঠলেও আফতাব মৌলানা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন। এসময় হালকা একটা গন্ধ উঠে বাতাসে।

কাটা জায়গাটি ইঞ্চি দেড়েক লম্বা। শুক্কুর আলীর কালো চামড়া আরো কালো হয়ে কালোকেই উজ্জ্বল করে তুলছে এখানে। ওসি মিনহাজুল আবেদীন আরো লেখেন, ধারণা করা যায় কাটা জায়গাটি গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ভিতরে ঢুকে গেছে।

আস্তে আস্তে হালকা গন্ধটি রং বদলাতে থাকে। কটু বা গুয়ের গন্ধ নয়। মিষ্টি। অনেকটা জুঁই কিংবা গোলাপ কিংবা রজনীগন্ধা কিংবা বেলি ফুলের মতো। কিংবা কোনোটিই নয়। তবে এরকম একটা মিষ্টি গন্ধ উপস্থিত সকলকে আনমনা করে তোলে। ওসি মিনহাজুল আবেদীনের কলম থেমে যায়।

ওসি মিনহাজুল আবেদীন একে একে সকলকে ফুলের গন্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে কতগুলো শূন্য দৃষ্টি শুধু একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে দৃষ্টিতে বিস্ময়, কিছুটা ভয়। ভয় আর বিস্ময়ে আফতাব মৌলানার কপালে গভীর এবং মোটা ভাঁজ পড়ে। ভাঁজের ফাঁকফোকরে চিকচিক করে উঠে ঘাম অথবা কুয়াশার বিন্দুগুলো যা স্রোত হয়ে নেমে আসা জ্যোৎস্নায় চোখে পড়ে অনেকের।

জটলার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন ওসি মিনহাজুল আবেদীন। ফুলের গন্ধটি তখনও নাকের উপর মাছির মতো ঘুর ঘুর করে চলেছে।

ওসি মিনহাজুল আবেদীন টর্চের আলো ফেলেন মাঠের সর্বত্র। কোথাও কোন ফুলের গাছ নেই। কেবল মাঠের উত্তর-পূর্ব-দক্ষিণ দিকের সীমানা ধরে কয়েকটি শিমুল, আম, সজনে গাছ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কুয়াশায় ভিজছে।

মাঠের পশ্চিম দিকটা উদোম বিলের মতো ফাঁকা। তবে পশ্চিমা সীমানার ঠিক মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মেহরাব। হিমে জবুথবু। নতুন চুনকাম করায় মাঠ-জ্যোৎস্না মেহরাবের গায়ে পড়ে খলখলিয়ে উঠছে।

ওসি মিনহাজুল আবেদীন পায়ে পায়ে এগিয়ে যান সেদিকে। তার আগেই নাকের উপর ঘুরে বেড়ানো ফুলের গন্ধটি কুয়াশায় ডুব দিয়ে সোজা চলে আসে শুক্কুর আলীর বুক বরাবর। সেখানে জায়গা করে নেয় কয়েকটি গুপোকা। গুপোকাগুলো শির শির করে হাঁটে। নাকের ফুটো দিয়ে কিলবিল করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তখনই নাক-মুখ খিঁচিয়ে বিকট হাঁচি উঠে ওসি মিনহাজুল আবেদীনের। এতে গু-পোকাগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছিটকে পড়লেও গায়ে লাগা গুয়ের গন্ধটি থেকে যায়। বারবার রুমালে নাক মুছেও গন্ধটি সরাতে পারেন না ওসি মিনহাজুল আবেদীন।

ঘুরে ঘুরে মেহরাবের চারদিকে টর্চের আলো ফেলেন ওসি মিনহাজুল আবেদীন। কোথাও তেমন কিছু চোখে পড়ে না। মেহরাবের কাছেই উপুড় হয়ে পড়ে আছে চুনমাখা একটি বালতি। তার পাশে একটি ব্রাশ, একটি বদনা। সন্দেহের ঘোরে ওসি মিনহাজুল আবেদীন পা দিয়ে উল্টে দেন বালতিটি। কিছু নেই। ফাঁকা।

এবার মেহরাবের পাশে মিম্বারে উঠে আসেন ওসি মিনহাজুল আবেদীন। প্রথম সিঁড়ি মাড়িয়ে দ্বিতীয় সিঁড়িতে উঠার আগেই ওসি মিনহাজুল আবেদীনের নাকের ভেতর সুড়সুড়ি তোলে গুয়ের গন্ধটি যা এরই মধ্যে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে।

প্রথম সিঁড়িতে পা রাখার মুহূর্তেই কি মিম্বারটি নড়ে উঠেছিলো? তা না হলে পা দুটো কেঁপে উঠলো কেন? এতো কিছু ভাবার আগেই কেঁপে ওঠা পা নিয়েই মিম্বারের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সিঁড়ি হয়ে শেষ ধাপে উঠে আসেন ওসি মিনহাজুল আবেদীন। তখনই বদগন্ধটি পুরো ১টিন গু নিয়ে হামলে পড়ে ওসি মিনহাজুল আবেদীনের নাকে-মুখে। বিকট চিৎকারে কুয়াশায় ভেজা জ্যোৎস্নাকে কাঁপিয়ে তোলেন ওসি মিনহাজুল আবেদীন । এক লাফে নেমে আসেন মিম্বার থেকে। দ্রুত হাঁটতে থাকেন লাশ হয়ে পড়ে থাকা শুক্কুর আলীর দিকে।

বাঁশের চাটাইয়ে মোড়ানো মর্জিনার বাপ শুক্কুর আলীর লাশ রিক্সাভ্যানে তুলে রমজান আলো-আঁধারির মধ্যে মাঠ ত্যাগ করতে উদ্যত হলে ওসি মিনহাজুল আবেদীন শুক্কুর আলীর লাশের খুব কাছে এসে দাঁড়ান। তাঁর বাঁ হাতে তখনও সোনালি ডায়রিটি ধরা। ডান হাতের বলপেনটি আঙুলের ফাঁকফোকরের ভেতর হাঁসফাস করছে। নতুন করে ফুলের গন্ধের কথা মনে পড়ে ওসি মিনহাজুল আবেদীনের যদিও নাকের উপর ২/৩টি পাপড়ি মাছির মতো ঘুরঘুর করছে। একটু ঝুঁকে চাটাইয়ের ওপর দিয়ে শুক্কুর আলীর লাশের বাম পাঁজর বরাবর একটি লম্বা শ্বাস নেন ওসি মিনহাজুল আবেদীন। সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশায় নেয়ে ওঠা কতগুলো পাপড়ি হুড়মুড় করে ওসি মিনহাজুল আবেদীনের নাকের ভেতর দিয়ে ঢুকে একেবারে মগজে গিয়ে আসন গাড়ে।

চাটাইয়ে মোড়ানো শুক্কুর আলীর লাশ নিয়ে রমজান রিক্সাভ্যানটি কাঁচা রাস্তা ধরে অনেকদূর এগিয়ে গেলেও ওসি মিনহাজুল আবেদীন মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকেন। লাশের বাম পাঁজরের গর্ত, ফুলের গন্ধ, ঈদগাহ মাঠ, তার পশ্চিম পাশের মেহরাবে নাকমুখচাপাবমিবমিগন্ধ-- সবকিছু ওসি মিনহাজুল আবেদীনকে জাগতিক বোধবুদ্ধি থেকে ছুঁড়ে ফেলে। পকেট থেকে টর্চ বের করে ফের শুক্কুর আলীর লাশ হয়ে পড়ে থাকা জায়গাটায় আলো ফেলেন। নতুন কিছু চোখে পড়ে না। তবে যতোবারই আলো ফেলেন ততোবারই নাকের উপর মাছির মতো উড়ে বেড়ানো ফুলের পাপড়িগুলো নতুন করে গন্ধ ছড়ায়। পাশাপাশি নাকমুখচাপাবমিবমিগন্ধটি তাকে ভাবিয়ে তোলে। ১ পা ২ পা করে এগিয়ে যান মেহরাবের দিকে। তখন নাকের উপর ঘুরে বেড়ানো ফুলের পাপড়িগুলোর অস্তিত্ব হারিয়ে যায়। সেখানে জায়গা করে নেয় বদগন্ধটি।

ওসি মিনহাজুল আবেদীন টর্চ টিপে টিপে মেহরাবের চারদিক তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়ান। কোথাও এমন কিছু নেই যা থেকে বদগন্ধটি আসতে পারে। এবার মিম্বারের প্রথম এবং দ্বিতীয় সিঁড়ি ভেঙে তৃতীয় সিঁড়ি হয়ে শেষ ধাপে উঠে দাঁড়ান ওসি মিনহাজুল আবেদীন। তখনই নাকমুখচাপাবমিবমিগন্ধটি আদিম উগ্রতায় তার নাকের ভিতর থেকে ভিতরের দিকে সেঁধিয়ে যেতে থাকে। গন্ধটি সহ্য করতে না পেরে দ্রুত মিম্বার থেকে নেমে আসেন।

ওসি মিনহাজুল আবেদীন এবার সুরতহাল রিপোর্টের শেষ প্যারায় লেখেন-- লাশের সারা শরীর গুয়ে জবজবে থাকলেও কোন বদগন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল না। বরং তার পরিবর্তে লাশের বাম পাঁজরের ছুরিকাঘাত থেকে ক্রমাগত বেরিয়ে আসছিলো তাজা ফুলের গন্ধ যা অনেকটা জুঁই কিংবা গোলাপ কিংবা রজনীগন্ধা কিংবা বেলীফুলের মতো। এটি আমি সচেতনভাবে বহুবার অনুধাবন করেছি এবং আশপাশের অনেকেই করে থাকবে। আরও লেখেন-- ঈদগাহ মাঠের পশ্চিম পাশের মেহরাব যা শুক্কুর আলীর লাশ হয়ে পড়ে থাকার জায়গা থেকে শ’দেড়েক হাত পশ্চিমে অবস্থিত। সেখান থেকে ক্রমাগত উঠে আসছিলো বীভৎস উৎকট নাকমুখ উগলে আসা কাঁচাগুয়ের গন্ধ। এ গন্ধও আমি নিজে সচেতনভাবে বহুবার অনুধাবন করেছি এবং আশপাশের অনেকেই করে থাকবে।


৬.

পরদিন ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন শাহী মসজিদ থেকে ফজর নামাজ শেষে মেহরাবের পাশ দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় নাকমুখচাপাবমিবমিগন্ধটি মুসুল্লিদের নাকে মুখে থুতু ছিটিয়ে দেয়। এতে শুক্কুর আলীর কথা মনে পড়ে যায় আফতাব মৌলানাসহ অনেকের। বদগন্ধটি ফজর নামাজের সময় আফতাব মৌলানা মসজিদের মেহরাবেও পেয়েছিলো কি? ঠিক মনে করতে পারে না। এসময় বদগন্ধ ছাপিয়ে শুক্কুর আলীর লাশ হয়ে পড়ে থাকার জায়গাটি আবছা অন্ধকারেও মুসুল্লিদের নজর কাড়ে। সেখানে গুনগুন করে উড়ছিলো একঝাঁক মৌমাছি। মৌমাছিগুলোর গুনগুন শব্দে মুসুল্লিরা একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় সেদিকে। দেখতে পায় শুক্কুর আলীর লাশ হয়ে পড়ে থাকা জায়গাটি ছুঁয়ে লক্ষ লক্ষ মৌমাছি কুণ্ডলি পাকিয়ে আকাশ ফুঁড়ে যতদূর দৃষ্টি যায় উপরে উঠে গেছে। এরকম মৌমাছি তারা একবারই দেখেছিলো। তাদের ডানা কিংবা পা কিংবা মুখের রং আলাদা যা আবছা অন্ধকারেও সকলে বুঝতে পারে। এতে মুসুল্লিদের মধ্যে তেমন কোন ভাবান্তর না হলেও যখন দেখতে পায় মৌমাছিগুলোর গা থেকে ঠিকরে ঠিকরে বেরুচ্ছে আলোর দ্যুতি তখন তারা অবাক হয় অতীত স্মৃতিকাতরতা থেকে। সে আলোয় ভেসে যাচ্ছে ঈদগাহ মাঠ, তার সংলগ্ন চষাজমি, মৌটুসীর লোকালয়। মুসুল্লিদের ভেতর বিস্ময় জাগে যখন বুঝতে পারে উড়ন্ত মৌমাছিগুলোর ডানা থেকে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে নেশাধরা এক গন্ধ যা অনেকটা জুঁই কিংবা গোলাপ কিংবা রজনীগন্ধা কিংবা বেলী ফুলের মতো। ঠিক তাও নয়। তবে এরকম একটা গন্ধ তারা শুক্কুর আলীর সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির সময়ও পেয়েছিলো।


৭.

শোনা যায়, বছর সাতেক আগে গোবিন্দ মণ্ডল যে নাকি শুক্কুর আলীর সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে ৫ জন পাকসেনাসহ ২ জন রাজাকার একাই গুলি করে সাত সাতটি লাশের পোশাক এলএমজি’র মাথায় ঝুলিয়ে ক্যাম্পে ফিরেছিলো। তার লাশ হয়ে পড়ে থাকা জায়গাটি ছুঁয়েও এরকম মৌমাছি উড়ছিলো আকাশ বরাবর। মৌমাছিগুলোর আকারও ছিলো এগুলোর মতো। ঐ মৌমাছিগুলোর গা থেকেও ছিটকে পড়ছিলো আলোর দ্যুতি-- এ কথা এখন আফতাব মৌলানাসহ অনেকেরই মনে পড়ে। আরও মনে পড়ে, ঐ মৌমাছিগুলোর গা থেকেও একই রকম গন্ধ ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছিলো যে কারণে মৌটুসীর লোকজন দীর্ঘদিন আতর ব্যবহার করার প্রয়োজন বোধ করেনি।



লেখক পরিচিতি
সরকার আশরাফ
কথাসাহিত্যিক। প্রাবন্ধিক।
সম্পাদক : নিসর্গ
জন্ম নেত্রকোণা। বর্তমান ঢাকায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন