শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

ডোনাল্ড বার্থেলমি'এর গল্প: ফ্লোরেন্স গ্রীন ৮১


ভাষান্তরঃ উৎপল দাশগুপ্ত
 
ফ্লোরেন্স গ্রীনের সঙ্গে ডিনার। বুড়ি খুকি আজ হুজুগে মেতে আছেন। দুম করে বলে দিলেনঃ নতুন কোনো দেশে যেতে ইচ্ছে করছে আমার। সবাই ভাবতে বসল কী বলতে চাইছেন। কিন্তু ফ্লোরেন্স কোনও কৈফিয়তও দিলেন না, খোলসা করেও কিছু বললেন না। বেশ একটা পরিতৃপ্তির হাসি নিয়ে চকিতে টেবিলের চারপাশে নজর ঘুরিয়েই, মুখে কুলুপ আঁটলেন! তারপরেই আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। ওঁর ডানদিকে বসা মেয়েটি নতুন এখানে, ব্যাপার-স্যাপার কিছুই বোধগম্য হল না ওর। বরাভয় দেবার ভঙ্গিতে তাকালাম ওর দিকে (দৃষ্টি দিয়ে বোঝাতে চাইলাম, “অত ব্যস্ত হবার দরকার নেই ক্যাথলীন, পরে আমার বাড়িতে এস, নিরিবিলিতে তোমাকে বুঝিয়ে বলবখন।”) বিশ্বের চতুর্থ দীর্ঘতম নদীর গভীর খাতে মসূরের ফলন হয় – সাইবেরিয়ার ওব নদীতে – ৩২০০ মাইল। কেময়১ আর মাৎসু২ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। 
 
“আত্মবিশ্বাসের জায়গা ধরে এগিয়ে যাওয়াটাই দূরদর্শিতা। সম্ভাব্য কোন পথটা আমাদের পক্ষে সব চাইতে অনুকূল? যাতে দ্বীপগুলো ওরা কব্জা করতে না পারে। দ্বীপগুলো অবশ্য বাসযোগ্য নয় মোটেই!” বাস্কারভিল – বিখ্যাত লেখক হবার তাগিদে যে ওয়েস্টপোর্ট, কানেক্টিকাটের ফেমাস রাইটার্স স্কুলে পড়াশোনা করছে – খুব উত্তেজিত হয়ে নোট নিয়ে চলেছে। নতুন মেয়েটির দুটি স্তনই আমার সচিবের হাঁটুর মতই প্রকট আর বিরক্তিকর। ফ্লোরেন্স সাড়ম্বরে “জান নিশ্চয়ই, ওপরতলার বাথরুম থেকে জল গড়াচ্ছে” বলে সান্ধ্য আসর শুরু করলেন। কেময় আর মাৎসু নিয়ে হারমান কাহ্‌নের কী ধারণা? মনে পড়ছে না, মনে পড়ছে না …
 
এই বাস্কারভিল! হারামজাদা, তুই নাকি বিখাত লেখক হতে চাস! জীবনটা কীভাবে কাটাচ্ছিস সেটা একবারও ভেবে দেখেছিস? এটাকে কি জীবন কাটানো বলে? যে সব লোককে তোর দরকার, তারা কি কেউ এসেছে তোর জীবনে? সব ভালয় ভালয় চলছে? উলটে তুই এক জে ডি র‍্যাটক্লিফেই মজে আছিস! স্যান্টা অ্যানা, ক্যালিফোর্নিয়া – এটা হল যুক্তরাষ্ট্রের সব থেকে ছোট শহর। এক লক্ষের ওপর লোক থাকে শহরটাতে, যার মধ্যে ১ লক্ষ ৩৫০ জন বাসিন্দাই প্রশান্ত মহাসাগরের বালবোয়া উপকূলে সন্ধেবেলা বসে জীবনধারণ নিয়ে মাথা ঘামিয়েই চলেছে! বয়স তো আমারও কম! কিন্তু আমি এক বিস্ময়কর প্রতিভা, ঠিক ঠিক জায়গায় খুঁটি ধরে রেখেছি। বাধ্য হয়েই কথাবার্তায় একটু তোষামোদ বজায় রাখতে হয় (ভয় হয়, হয়ত আপনারা বিরক্ত হবেন)। ছোট্ট একটা ম্যাগাজ়িনের সম্পাদনা করি। সে অবশ্য আমার ‘বাঁয়ে হাত কা খেল’! খুবই পাণ্ডিত্যপূর্ণ আর অসাধারণ ম্যাগাজ়িন। নাম হল ‘দ্য জার্নাল অভ টেনশন রিডাকশন’ (সামাজিক-মনস্তাত্বিক গবেষণা, উচ্চস্তরীয় বিতর্কমূলক আলোচনা, পাঠকের চিঠি, ইঁদুরদের মধ্যে উদ্বেগ)। একটু অরূচিকর লাগল, তাই না? অরূচিকর, তাতে সন্দেহ নেই। তবে ফ্লোরেন্স গ্রীন যদি টাকাকড়ি নিয়ে অন্য দেশে পাড়ি জমান, তাহলে ছাপার খরচ কে দেবে? বলুন! ‘দ্য জার্নাল অভ টেনশন রিডাকশন’-এর একটা প্রবন্ধের অংশবিশেষঃ “মনোরোগী আর মনস্তত্ববিদের মোলাকাত হবার অতিপরিচিত উদাহরণ টেনে বলা যেতে পারে, মানসিক উদ্বেগের অন্যতম কারণ হল রোগীর মনে ডাক্তারবাবুকে একঘেয়ে বকবকানিতে ক্লান্ত করে দেবার ভয়।” সিগারেট খাওয়ার বা হাত ধোওয়ার জন্য প্রতি ঘন্টায় একবার করে মিনিট দশেকের যে ফাঁক পান, সেই সময় হয়ত ডাক্তারবাবুও তাঁর নিজস্ব সমস্যা নিয়ে অধীর হয়ে পড়েন। হে পাঠক, যাদের সাইবেরিয়ার ৩২০০ মাইল লম্বা ওব নদী সম্বন্ধে বলা হল, হয়ত যতটুকু চেয়েছিলেন, তার থেকে বেশিই, এর মধ্যে আমাদের দু’পক্ষেরই কিছু ভূমিকা আছে – আপনার এবং আমারঃ আপনি হলেন গিয়ে সেই ডাক্তারবাবু (প্রতি ঘন্টায় গিয়ে হাত ধুয়ে আসছেন), আর আমি – আমি হলাম – আমার মনে হয়, ঘাবড়ে যাওয়া সেই মনোরোগী। খুব – খুবই বুদ্ধিদীপ্তভাবে, আমার সমস্যাটা আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। নাকি, একঘেয়ে বকবকানিতে আপনাকে ক্লান্ত করে ফেলছি? কোনটা? ‘দ্য জার্নাল অভ টেনশন রিডাকশন’ যে কোনো ধরণের সমস্যা নিয়েই – সে সর্বব্যাপী উত্তেজনাকর পরিস্থিতিই হোক (ওব নদীর ধারে ড্রামের আওয়াজ) কিংবা পারস্পরিক সম্পর্কই হোক (বাস্কারভিল আর নতুন মেয়েটি) – পর্যালোচনা করে। আমরা মনে করি, সমগ্র বিশ্ব আজ অভূতপূর্ব উত্তেজক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছে। আমি নিজেই এর এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মুষ্টিবদ্ধ হাতের মত আমার পেট শক্ত হয়ে থাকে। এখানে তোষামোদের সুরটা খেয়াল করলেন? আমাকে স্বস্তি পেতে হলে – আমার শক্ত পেটের কথাই বলছি – কয়েক কোয়ার্ট ফ্লেশম্যান’স জিন৩ গলাধঃকরণ করা দরকার। দেখেছি উত্তেজনা প্রশমনের ব্যাপারে ফ্লেশম্যান’স তুলনাহীন। আমি চাই, ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান্টা অ্যানা শহরের প্রত্যেক রাস্তার মোড়ে ফ্লেশম্যান’স-এর বিনামূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা হোক। এবং অন্যান্য শহরেও। কথাটা একটু গুরুত্ব দিয়েই ভাবুন না! 
 
নতুন মেয়েটি বেশ রোগা। রোগা এবং অসম্পূর্ণ। বিসদৃশভাবে উন্নত বক্ষ গাজ়প্যাশো৪ আর ওর সম্ভাবনাময় কালো চোখের মাঝখানে এসে বাধা তৈরি করছে। মুখ হাঁ করলেই যে ব্যাঙ লাফিয়ে পড়বে, এ আমি নিশ্চিত! ইচ্ছে করছিল শার্ট খুলে আমার পরিপাটি ছাতি, খোদাই করা তলপেট সুসম্বদ্ধ চওড়া কাঁধ ওকে দেখাই। জ্যাকসন নিজেকে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার অধিবাসী বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। অ্যামোস কেন্ড্যাল, ওঁর জীবনীকার, দক্ষিণ ক্যারোলাইনার ল্যাঙ্কাস্টারকে ওঁর জন্মস্থান বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু প্যারটন তথ্যপ্রমাণসহ দেখিয়েছেন যে জ্যাকসনের জন্ম উত্তর ক্যারোলাইনার ইউনিয়ন কাউন্টিতে, যা কিনা দক্ষিণ ক্যারোলাইনা থেকে সিকি মাইল দূরেও নয়। জ্যাকসন আমার চোখে একজন নায়ক, অবশ্য জনশ্রুতিতে বিশ্বাস করলে ওঁর কাঁধের পেশি মোটেই সুসম্বদ্ধ নয়। ভারোত্তলন আমিও করে থাকি, কবিতাও লিখি, আর জ্যাকসনের একজন ভক্ত। একটি অ্যাবরশন আর চারটি গর্ভপাতের পিতৃত্বের দাবী আছে আমার। বউ না থাকা সত্ত্বেও; আপনাদের মধ্যে কেউ এমন কৃতিত্ব দাবী করতে পারেন কি? বাস্কারভিলের সমস্যা হল – ওয়েস্টপোর্টের ফেমাস রাইটার্স স্কুলেই শুধু নয়, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই –ও খুবই ঢিলে। “ছেলেটা বড়ই ঢিলে,” ওর প্রথম শিক্ষক মন্তব্য করেছিলেন। “ছেলেটাকে খুব ঢিলে বললেও কম বলা হয়,” বলেছেন ওর দ্বিতীয় শিক্ষক। আর তৃতীয় শিক্ষকের মন্তব্য, “হারামজাদা নম্বর ওয়ান ঢিলে!” এঁদের প্রত্যেকেই ঠিক কথা বলেছেন, শতকরা একশ ভাগ ঠিক। তা সত্ত্বেও আমি অ্যান্ড্র্যু জ্যাকসন আর অ্যাবরশনের কথা জেনেছি। আপনারা যারা ক্যালিফর্নিয়ার স্যান্টা অ্যানার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিলেন, এবং অন্যান্য শহরেও, আপনারা কোনোটাই জানতেন না। “এই সব ক্ষেত্রে রোগী ডাক্তারবাবুকে খাপছাড়া স্বভাবের একজন অত্যন্ত পরিশীলিত ভোক্তা বলে মনে করেন – বিরল মানসিকতার প্রকৃত সমঝদার। ফলে বাস্তব অবস্থার তুলনায়, সে নিজেকে অধিক বর্ণময় করে উপস্থাপন করে, একটু বা বেশিই খামখেয়ালি (বা একটু বেশিই অসুস্থ)। অথবা কল্পনার জোয়ারে ভেসে নিজেকে রসিক ও বুদ্ধিমান প্রমাণ করার চেষ্টা করে।” বুঝতে পারলেন? ব্যাপারটা বেশ বোধগম্য, তাই নয় কি? যে ম্যাগাজ়িনটা আমরা চালাই তাতে মনের ঝটিকাবহুল প্রদেশে চলতে থাকা এইসব দরকারি এবং বোধগম্য ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে আলোকপাত করে থাকি। উত্তেজনা প্রশমনে ফ্লেশম্যান’স জিনের নিদান আমি খোলাখুলি দিতে পারি না। তবে প্রতিভাসম্পন্ন এক পরিচিতের ‘অ্যালকোহল রিকনসিডারড’ নামে একটা প্রবন্ধ আমি ছেপেছি। মদ্যপান নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী এই বিশাল দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মনস্তত্ব বিভাগের গোপন মদ্যপানকারীরা লিখিতভাবে এই প্রবন্ধটির সমর্থন করে কিন্তু বাক্যবিন্যাসে সতর্কতা অবলম্বন করে চিঠি পাঠিয়েছেন … 
 
“হারামজাদা নম্বর ওয়ান ঢিলে!” ওর তৃতীয় শিক্ষক বলেছিলেন। বলেছিলেন অনগ্রসর ছাত্রদের জন্য বিশেষ কার্যক্রম চালু করার ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য ডাকা একটা মিটিং-এ। বলাই বাহুল্য, সেই আলোচনায় বাস্কারভিলের নাম সামনে উঠে এসেছিল। তরুণ বাস্কারভিল, সঙ্কুচিতভাবে সৈকতে বসে নিস্তেজ টেক্সাস চোখ থেকে বালি ঝাড়তে ব্যস্ত। বেদনার্ত আঙুল দিয়ে ডাকযোগে জো ওয়েন্ডারের কাছ থেকে আসা $২০ মূল্যের প্যামফ্লেট আঁকড়ে ধরা। ‘ট্রেনার অভ টেরর ফাইটার্স’ (বাস্কারভিল ভাবছিল এগুলো কি ফায়ার ফাইটার জাতীয় কিছু? আতঙ্ক দূর করার কাজে এগুলো কি কার্যকারী? নাকি আতঙ্ক কমানোর ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করে, যা কিনা বাস্কারভিলের দুরূহ উদ্দেশ্যে)। তখনও কিন্তু মনে মনে ওর উপন্যাস ‘দ্য চিল্ড্রেন’স আর্মি’র ছক কষে যাচ্ছিল, যে উপন্যাস কী করে লিখতে হবে সেটা শেখার জন্যই ওর এই ফেমাস রাইটার্স স্কুলে আসা। “কাজটা তুমি সুনামের সঙ্গেই করবে,” রেজিস্ট্রার ওকে বললেন। বাস্কারভিলের প্রতিভার সম্যক ফলাফল ওঁর সামনেই রাখা ছিল, তবে সেটা উনি পড়ে দেখেননি। “তুমি ক্যাশিয়ারের অফিসে এখুনি চলে যাও।” “ডক্টর, ‘দ্য চিল্ড্রেন’স আর্মি’ নামে আমি একটা বৃহৎ উপন্যাস লিখছি!” (বাদামি হাত লাল রঙের গাজরের ওপর রাখা ওই পিঙ্গল ডক্টরের নাম কেন আমি পামেলা হান্সফোর্ড জনসন ভাবলাম? কেন মনে হল এরকম?) ফ্লোরেন্স গ্রীন ৮১ বছর বয়সী মোটাসোটা বুড়ি খুকি, বুড়ির নীলচে পা আর অনেক টাকা। পৃথিবীর গহন পাহাড়কে টানে, আর যিনি আপনাকে টেক্সাকো৫ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন, তাঁর বিচক্ষণতাকে আমি সেলাম জানাই! টেক্সাকো আমার হৃদয়কে চুরমার করে, টেক্সাকো খুবই গ্লানিকর। যখন ফ্লোরেন্স মোটাসোটা ছোট্টখাট্টো খুকি ছিলেন না, সেই সময় ওঁর স্বামী মিস্টার গ্রীনের সঙ্গে গ্রাফ জ়্যেপেলিনে৬ করে একবার সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন। ওখানকার প্রকাণ্ড বৈঠকখানায় – ওঁর মনে পড়ে – প্রকাণ্ড একটা পিয়ানো রাখা ছিল। নামজাদা পিয়ানোবাদক, ম্যান্ড্রেক দ্য ম্যাজিশিয়ানও জাহাজে ছিলেন। বহু অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁকে বাজাতে সম্মত করা যায়নি। জ়্যেপেলিনরা হিলিয়াম ব্যবহার করতে পারত না। সেই দেশের সরকার জ়্যেপেলিনের মালিকদের কাছে হিলিয়াম বিক্রি করতে অসম্মত হয়েছিল। মনে হয় আমার দ্বিতীয় বইয়ের নাম আমি দেব ‘হাইড্রোজেন আফটার লেকহার্স্ট’। সন্ধের অর্ধেকটা আমরা ওপরতলার বাথরুমের সমস্যা শুনলামঃ “একজনকে ডেকেছিলাম ওটা দেখবার জন্য। তা সে বলল যে নতুন লাগাতে গেলে দুশো পঁচিশ ডলার লাগবে। বললাম যে আমি নতুন লাগাতে চাই না। চাইছি এটাকেই যদি মেরামত করা যায়।” ফ্লোরেন্সের জন্য নতুন একটার অর্ডার দিয়ে দেব নাকি, যেটা ঘন হিলিয়াম থেকে বানানো? কাজটা কি কৃপাপ্রার্থীসুলভ বলে বোঝা যাবে? আচ্ছা, উনি কি ওঁর জীবন নিয়ে মাথা ঘামান? “ও বলছিল আমারটা নাকি পুরোনো ধরণের। এখন নাকি ওটার খুচরো কলকব্জা তৈরিই হয় না।” স্যুপ পরিবেশনের সময় সেই রহস্যময় উক্তিটি করে এখন উনি টেবিলে নিজের জায়গায় বসে আলুথালু হয়ে ঘুমোচ্ছেন (নতুন কোনো দেশে যেতে ইচ্ছে করছে আমার!)। নিজের জীবন সম্বন্ধে একটি কথাও বলেননি … মেরুপ্রদেশে পৃথিবীর ব্যাস ৭৮৯৯.৯৯ মাইল অথচ নিরক্ষরেখার কাছে তা হল ৭৯২৬.৬৮ মাইল। খেয়াল করুন কী বললাম, আর কথাটা মনে গেঁথে নিন। আমার উল্টোদিকে তামাটে রঙের যে মানুষটি বসে আছেন, আমি নিশ্চিত যে উনি একজন ডাক্তার। ডাক্তারসুলভ বেশ একটা গ্রাম্ভারি ভাব (আমাকে দরকার পড়ে আর আমি অপরিহার্য) চোখেমুখে ফুটে উঠছে। আলোচনার সময় মাঝে মাঝে ঝুঁকে পড়ছেন, যেন বলতে চাইছেনঃ একবার আমাকে বিদেশ সচিব বানিয়ে দাও, তারপর দেখতে থাক আমি কী কী করি। “একটা কথা বলি আপনাদের, ওখানে চিনেরা গিজগিজ করছে।” প্রজ্ঞার কিডনি একেবারে! ফ্লোড়েন্স গ্রীনের একটাই মাত্র কিডনি, আমার কিডনিতে পাথর আছে, ফেমাস রাইটার্স স্কুলের ফেকাল্টি দল বেঁধে বাস্কারভিলকে তাক করে পাথর ছুঁড়েছিল, পাঠক্রমের প্রথম অনুশীলনী পেশ করার জন্যঃ আঙ্গিকসর্বস্বতার অভিযোগে। ফ্লোরেন্স যে ডাক্তারদের ব্যাপারে দুর্বল এটা সবাই জানে, কে জানে কেন যে আমি প্রথম আলাপের দিন থেকে নিজেকে ডাক্তার হিসেবে ঘোষণা করিনি? তাহলে বলতেই পারতাম যে টাকাটা খুব জরুরি একটা গবেষণামূলক প্রকল্পের জন্য (সরীসৃপদের শরীরে তেজস্ক্রিয় কণার ব্যবহার), পাকস্থলীর ক্যান্সার নিয়ে গবেষণার সঙ্গে যা ওতপ্রোত ভাবে জড়ানো (ক্ষুদ্রান্তের সঙ্গে সরীসৃপদের আকারে খুব মিল)। টাকাটা তাহলে অনেক সহজেই পাওয়া যেত, ক্যানসারকে ভয় পান ফ্লোরেন্স, নিউ মেক্সিকোর বিপর্যয়ের মত বৃষ্টিধারা হয়ে টাকা ঝরে পড়ত। বয়সে তরুণ হলেও, আমি খুবই প্রতিভাবান, আর খুবই খোশামুদে। বাঁ হাত দিয়ে ছোট্ট একটা ম্যাগাজ়িনের সম্পাদনা করি আমি, যার নামটা হল … বলেছি না সে কথা? কথাটা কি আপনারা মেনে নিয়েছেন? ওর নাম আসলে ক্যাথলীন নয়, জোয়ান গ্রাহাম, যখন আমাদের আলাপ করিয়ে দেওয়া হল, তখন বলেছিল, “ও, আপনি কি ডালাসের মানুষ, মিস্টার বাস্কারভিল?” না জোয়ান সোনা, আমি বেনগাজ়ির লোক, রাষ্ট্রসংঘ এখানে পাঠিয়েছে আমাকে, মাটিতে শুইয়ে তোমার ওই সুন্দর নিতম্বের আস্বাদ নেওয়ার জন্য, এটা অবশ্য বলিনি তখন, কিন্তু সেটাই বলা উচিৎ ছিল, তাহলেই সোনায় সোহাগা হত। মেয়েটা যখন জানতে চাইল ও কী করে, তখন বাস্কারভিল নিজেকে একজন আমেরিকান ভারোত্তলক এবং কবি হিসেবে পরিচয় দিল (মানে বলতে চাইলঃ অন্য পুরুষদের তুলনায় আমি বেশি শক্তিশালী আর বেশি বাকপটু)। “ওটা নড়াচড়া করতে পারে,” পিয়ানোর দিকে আঙুল দেখিয়ে ম্যান্ড্রেক বলেছিলেন, যদিও ওটার মধ্যে সামান্য নড়াচড়ারও কোনও লক্ষণ অন্য কেউ দেখতে পাননি। ওঁর ব্যক্তিত্ব এতটাই সম্মোহনী ছিল যে কেউ প্রতিবাদ করার সাহসও পায়নি (ফ্লোরেন্স বলেন, পিয়ানোটা বৈঠকখানার জমি আঁকড়ে বসেছিল, ঠিক যেমন জিব্রালটর সমুদ্রকে আঁকড়ে বসে আছে)। 
 
যে ভদ্রলোক মূল ভূখণ্ডের চিনেদের দাবিয়ে দিচ্ছিলেন, ঘাড়ের পেছনে কিছু খুঁজলেন, সম্ভবত চর্বিজনিত কোনও ফোঁড়া (ওটা আমি সারিয়ে তুলতে পারি; খেলা তত্ত্বের ওপর ছোট একটা লেখা হবে আমার যন্ত্র)। ম্যান্ড্রেক যদি বাজাতেন, কী হত? কী হত যদি উনি যন্ত্রটির সামনে বসতেন, হাত ওঠাতেন, আর … কী? প্রধান প্রধান সমুদ্র, আপনারা প্রধান প্রধান সমুদ্র সম্বন্ধে শুনতে চান? ফ্লোরেন্সকে জাগিয়ে তোলা হল; লোকজন প্রশ্ন করতে শুরু করছেন। এই দেশে না থাকতে চাইলে, কোন দেশে? ইতালি? “না,” পান্নার অলঙ্কারের ভেতর থেকে হেসে বললেন, “ইতালিতে নয়। ইতালি আমি গিয়েছি। মিস্টার গ্রীন যদিও ইতালি খুবই পছন্দ করতেন।” ডাক্তারবাবুকে একঘেয়েমিতে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য, এই রোগী অন্য সব নমুনার থেকে আলাদা কিছু নন; নিজের অনন্যতা প্রমাণ করার জন্য রোগী জান লড়িয়ে দেন। এটা অবশ্যই মনোবিকলনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাবার একটা কৌশল। পরিচিতির কিনারায় দাঁড়িয়ে পাক্কা আমেরিকান এক বাবু ফ্লোরেন্সকে বলেছিলেন, “পশ্চিমের বাগান থেকে বিদায় নেবার সময় হয়ে গেছে সিরিল কনৌলি ৬ক।” মন্তব্যটা ওঁকে খুশি করেছিল, আনন্দ দেবার মতই মন্তব্য, আর এই মন্তব্যের জোরেই বাস্কারভিল পুনঃ নিমন্ত্রিত হয়েছিল, দ্বিতীয় সাক্ষাতেও ও দ্বিতীয় একটি মন্তব্য করে, যেটা হল, “বন্ধুত্বের ফুল ম্লান হবার আগেই বন্ধুত্ব ম্লান হয়ে গেল৭ জারট্রুড স্টেইন”৭ জোয়ানকে মনে হচ্ছে ভোগ৮-এর বিস্ময়কর মেয়েদের একজন, মাইকোনোস৯ দ্বীপের টিলার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা, উত্তেজক স্বল্পবাস পরিহিতা তরুণীর মত, নাভি থেকে যার উর্ধাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত। “ওটা নড়াচড়া করতে পারে,” বললেন ম্যান্ড্রেক, আর যাদুবলে পিয়ানোটা ভূমি থেকে কয়েক ইঞ্চি নিজেকে উঠিয়ে নিয়ে সাবধানে বল্ডুইন নৃত্যের ছন্দে ডাইনে বাঁয়ে দুলতে লাগল। “ওটা নড়াচড়া করতে পারে,” অন্য যাত্রীরা সম্মোহিতের মত একমত হল। “ওটা নড়াচড়া করতে পারে,” জোয়ান গ্যাজ়প্যাশোটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল। ওটা একপাশ থেকে অন্যপাশে হাইনজ়ের সংগুপ্ত কম্প্র ছন্দে দোলায়মান। আমি স্যুপের উদ্দেশ্যে খুব কড়া করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করলাম, আর জোয়ান সকৃতজ্ঞভাবে হাসল, আমার দিকে তাকিয়ে নয়, পামেলা হ্যান্সফোর্ড জনসনের দিকে তাকিয়ে। ভার্জিন আইল্যান্ডস হয়ত? “আমরা ১৯২৫ সালে গেছিলাম, মিস্টার গ্রীনের বদহজমের মত হয়েছিল, সারা রাত জেগে বসেছিলাম ওঁর পেটের জন্য আর মাছির জন্য, মাছিগুলো এমন যে তোমরা বিশ্বাসই করতে চাইবে না।” ওরা মনে হয় ভুল প্রশ্ন করছে, প্রশ্নটা কোথায় না হয়ে হওয়া উচিৎ কেন? “সেদিন পড়ছিলাম চিয়াংএর তালিকাভুক্ত লোকদের গড় বয়স হল সাঁইতিরিশ। এই রকম একটা দল নিয়ে তোমরা খুব কিছু একটা করে উঠতে পারবে না।” কথাটা সত্যি, আমি নিজেই সাঁইতিরিশ, আর চিয়াংকে যদি আমার মতন লোকের ওপর ভরসা রাখতে হয় তাহলে মূল ভূখণ্ডকে বিদায় জানিয়ে দেওয়াই ভাল। আর হ্যাঁ, ধীমান বার্তালাপের চেয়ে ভাল কিছুই হতে পারে না, কেবল উলঙ্গ নারীর সঙ্গে বিছানায় শুয়ে অঙ্গসংবাহন করা আর এগমন্ট লাইট ইট্যালিক১০ ছাড়া। 
 
লোকটার মন্থরতা সত্ত্বেও – যেটা আমি আগেই উল্লেখ করেছি এবং যে কারণে ওরই জন্য প্রস্তুত চমৎকার পাঠক্রমকে আত্মস্থ করতে ওর অসুবিধে হত – বাস্কারভিলের উত্তরণ কখনও বাধাপ্রাপ্ত হয়নি, বরং বলা যেতে পারে হামেশাই ‘উন্নীত’ হয়েছে। এর কারণ সম্ভবত অন্য কোনও বালকের জন্য ওই জায়গাটা খালি করার দরকার ছিল (বাস্কারভিল ততদিনে চিহ্নিত হয়ে গেছে, বালক হিসেবে ওর বুদ্ধির প্রতীয়মান বিকাশ আর উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও)। এমন অনেকেই ছিল, সত্যি বলছি, যারা কল্পনাও করতে পারেনি যে ও নিজেকে ছ’ফুট পর্যন্ত প্রসারিত করতে পারবে, তা সত্ত্বেও অ্যান্ড্র্যু জ্যাকসন, হিলিয়াম-হাইড্রোজেন আর অ্যাবরশন নিয়েই ওর শিক্ষার দৌড়, আমার মা আর বাবা কোথায় এখন? জবাব দিন আমাকে! ১৯৪৫এর বৃত্তাকার এক মধ্যাহ্নে – বৃষ্টি পড়ছিল, ফ্লোরেন্সের কথায়, এত জোরে যে ব্রেজ়ন সী১১ কানায় কানায় ভরে উঠবে – উত্তরের শয়নকক্ষের একটি শেজ়১২-এর ওপর উনি পারিপাট্যহীনভাবে বসেছিলেন (উত্তরের শয়নকক্ষের দেওয়ালে একই ধরণের ফ্রেমে বাধানো ফ্লোরেন্সের আঠেরো থেকে একাশি বছর বয়সের কুড়িটি ছবি) আর লাইফ-এর একটি সংখ্যা পাঠ করছিলেন। এই সংখ্যায় বুকেনওয়াল্ড১৩ থেকে প্রথম পাওয়া ছবিগুলি ছিল, চোখ সরিয়ে নিতে পারছিলেন না, প্রবন্ধটি পাঠ করলেন, বা প্রবন্ধের কিছু অংশ পাঠ করলেন, তারপর উনি বমি করে ফেললেন। একটু সুস্থ হয়ে প্রবন্ধটি আবার করে পড়লেন, কিন্তু না বুঝেই। নির্মূল করে ফেলা হল এর মানে কী? মানে আর কিছুই না, একজন প্রত্যক্ষদর্শী উল্লেখ করেছেন যে শবদেহে ভর্তি একটি ট্রাকের ওপর একটি ছোট মেয়েকে, যার একটি মাত্র পা, জীবন্ত অবস্থায় ছুঁড়ে ফেলা হল জ্বালিয়ে দেবার জন্য। ফ্লোরেন্স অসুস্থ হয়ে পড়লেন। গ্রীনব্রায়ার নামে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার একটি রেজ়র্টে কালবিলম্ব না করে চলে গেলেন। উনি পরে আমাকে প্রধান সমুদ্র, দক্ষিণ চিন সাগর, ইয়েলো সাগর, আন্দামান, ওখটস্ক সম্বন্ধে বলার অনুমতি দিলেন। “আপনাকে একজন ভারোত্তলক বলেই মনে করেছিলাম,” জোয়ান বলল। “কবি বলে ভাবনি?” বাস্কারভিল জবাব দিল। “আপনি কী লিখেছেন?” ও জিগ্যেস করল। “সাধারণত আমি টিপ্পনী করে থাকি,” আমি বললাম। “টিপ্পনী করা সাহিত্য নয়,” ও বলল। “এছাড়া আমার একটা উপন্যাসও আছে,” আমি বললাম। “সামনের মঙ্গলবার বারো বছর পূর্ণ হবে।” “প্রকাশিত হয়েছে?” ও জানতে চাইল। “শেষ হয়নি এখনও,” বললাম, “তবে খুবই হিংসাত্মক আর আবশ্যক। একটি সৈন্যবাহিনীর কথা, বুঝেছ, ছেলেমেয়েদের নিয়ে, মানে বলতে চাইছি কমবয়সি ছেলেমেয়ে, তবে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত – এম-১, কার্বাইন, .৩০ আর .৫০ ক্যালিবারের মেশিন গান, ১০৫ মর্টার, রেকয়েললেস রাইফেল, সবকটাই কার্যক্ষম। সেনাপতি হল এদের কেন্দ্রীয় চরিত্র, পনেরো বছর বয়স। শহরের একটা পার্কে একদিন বাহিনী এসে হাজির হল, আর তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর জনগণকে হত্যা করতে শুরু করল। বুঝতে পারলে?” “আমার ভাল লাগবে বলে মনে হচ্ছে না,” জোয়ান বলল। “ভাল আমারও লাগে না,” বাস্কারভিল বলল, “তবে আমার ভাল না লাগায় কিছুই এসে যায় না। মিস্টার হেনরি জেমস যেন এক বেদনাদায়ক কর্তব্য করছেন মনে করে উপন্যাস লিখে থাকেন অস্কার ওয়াইল্ড ১৪।”
 
ফ্লোরেন্স কি নিজের জীবন নিয়ে ভাবেন? “ও বলছিল আমারটা নাকি পুরোনো ধরণের। এখন নাকি ওটার খুচরো কলকব্জা তৈরিই হয় না।” গত বছর ফ্লোরেন্স পীস কোর-এ যোগদান করার চেষ্টা করেছিলেন এবং যখন ওঁর আবেদন নামঞ্জুর হল, টেলিফোনে সভাপতির কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। “অ্যান্ড্র্যু বোনেদের কাজের তারিফ আমি সব সময় করেছি,” জোয়ান বলল। কেমন জ্বর-জ্বর লাগছে আমার; আমার জ্বরটা একটু দেখবেন ডাক্তারবাবু? ওই আকাট অর্ধশিক্ষিত বাস্কারভিলটা, টেলারের নিউ ইয়র্ক স্টেট ম্যামজ়ি১৫, হাতের কাছে যতটুকু পেয়েছে, সাবড়ে দিয়েছে আর তার মধ্যেই নিজের সুবৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে দিবাস্বপ্নে মশগুল থেকেছে। ফ্রান্স? জাপান? “জাপান নয় ডিয়ার, জাপানে সময়টা খুব ভালই কাটিয়েছি, তবে এখন আর ওখানে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। ফ্রান্সেই আমার আদরের ভাইঝি আছে, ভার্সাইয়ের কাছে ওদের বাইশ একর আছে, ওর বর একজন কাউন্ট আর বায়োকেমিস্ট, দারুণ ব্যাপার তাই না?” সবাই ঘাড় নাড়ল, ওরা বোঝে দারুণ ব্যপার কাকে বলে। প্রধান সমুদ্রগুলো দারুণ ব্যাপার, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ হ্রদগুলো দারুণ, মেট্রিক পদ্ধতি দারুণ ব্যাপার, এসো ফ্লোরেন্স গ্রীন বেবি, একসঙ্গে মিলে কিছু মাপা যাক। আমি আপনাকে এক একক গোল্ডেন মাইক্রনের বিনিময়ে একটি ওয়ালআইড হেক্টোমিটার দেব। টেবিল জুড়ে নৈঃশব্দ, ঠিক যেন জনতা ৩০০ মিলিয়ন ডলারের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ফ্লোরেন্সের ৩০০ মিলিয়ন ডলার আছে, সেটা বলেছি কি? একাশি বছরের ফ্লোরেন্স গ্রীনের পা নীলচে আর ওঁর ৩০০ মিলিয়ন ডলার আছে, ১৯৩২ সালে বেতার ঘোষক নরম্যান ব্রোকেনশায়ারের কণ্ঠস্বরের প্রেমে পড়েছিলেন, বেশ এক উড়ু উড়ু ভাবে। “ইতিমধ্যে, এডনা গ্যাদারের বর, যিনি আমাকে চার্চে নিয়ে যেতেন, বন্দরে বেশ বড়সড় চাকরি করতেন, ভালই রোজগার করতেন বলে মনে হয়, ওঁর দ্বিতীয় স্বামী, প্রথম স্বামী ছিলেন পিট ডাফ যিনি ভালই ফেঁসে গেছিলেন, তখন কোথায় যেন ছিলাম আমি? ওহ হ্যাঁ, যখন পল মনে করিয়ে দিল আর বলল হার্নিয়ার জন্য ও আসতে পারবে না – ওর হার্নিয়ার ব্যাপারে শুনেছ নিশ্চয়ই – জন বলল ও এসে ব্যাপারটা দেখবে। একটা কথা খেয়াল রেখো, আমি কিন্তু পুরো সময়টা নীচকলের* বাথরুমটাই ব্যবহার করছিলাম।” বাস্তবিকই, বেতার শ্রোতা হিসেবে ফ্লোরেন্সের পুরো ইতিহাসটাই বেশ চিত্তাকর্ষক। সত্যি কথা বলতে কী, “বেতার শ্রোতা হিসেবে ফ্লোরেন্স গ্রীনের সম্পূর্ণ ইতিহাস” এই নামে একটা গবেষণাপত্র লিখে ফেলব বলে ঠিক করেছি। অথবা সপ্তদশ শতাব্দীর ধারায়, “বেতার শ্রোতা হিসেবে ফ্লোরেন্স গ্রীনের সম্পূর্ণ এবং তথ্যনির্ভর ইতিহাস।” কিংবা ধরুন … খুব একঘেয়ে লাগছে, তাই না, বুঝতে পারছি, শুধু এটুকু আমায় বলতে দিন, এখনও ওঁর প্রাচীন স্বরযন্ত্র থেকে সেই উচ্ছ্বসিত ধ্বনি নির্গত হতে পারে যা ক্যাপটেন মিডনাইটকে আলাপ করিয়ে দিতে … টেবিল জুড়ে নৈঃশব্দ, তারপরে সবাই আমরা ভয়ানক এক স্তব্ধতায় জড়িয়ে পড়লাম, সুবৃহৎ এক বন্ধনীতে (এখানে আমি ফ্লোরেন্সের ছড়ি সংগ্রহের বর্ণনা সন্নিবিষ্ট করতে চাই। একটি বিশেষ কক্ষে ফ্লোরেন্সের ছড়ি সংগ্রহ সার বেঁধে রাখা থাকে। একশ’র মত ছড়ি আছেঃ মসৃণ কালো ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার ছড়ি, এবং অসমতল রুক্ষ অ্যালপেনস্টক, ব্ল্যাকথর্ন এবং কোয়ার্টারস্টাফ, কাজেল এবং সোয়্যাগার ছড়ি, বাঁশ এবং আয়রনউডের, মেপল আর পিচ্ছিল এম কাঠের, ট্যাঞ্জিয়ার, মেইন, জ়ুরিখ, পানামা সিটি, ক্যুইবেক, টোগল্যান্ড, ড্যাকোটা আর বোর্নিওর ছড়ি – পৃথক পৃথক খাঁজকাটা কুঠুরিতে রাখা, দেখে অস্ত্রাগারের অস্ত্র রাখবার তাকের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কোথাও বেড়াতে গেলেই ফ্লোরেন্স সেই জায়গার এক বা একাধিক ছড়ি কিনে ফেলেন। কিছু কিছু ছড়ি নিজেও বানিয়ে নেন, কাঁচা কাঠের ওপর থেকে বাকল ছাড়িয়ে যত্ন করে শুকিয়ে পলেস্তারার পর পলেস্তারা বার্নিশ ঘষে, সন্ধেবেলা ডিনারের পর অন্তহীনভাবে পালিশ করতে থাকেন) যার ব্যাপ্তি ওখটস্ক সাগরের ৫৯০,০০০ বর্গমাইলের মতই বিশাল। মনে পড়ে লেক্সিংটনের এক জার্মান রেস্তোরাঁয় বসে আমার সিডেল১৬ থেকে বুদ্বুদ ওড়াচ্ছিলাম, পাশের টেবিলে ছ’জন জার্মান বসে, তরুণ জার্মান, ওরা হাসাহাসি করতে করতে কথা বলছিল। ফ্লোরেন্স গ্রীনের আজকের টেবিলে একজন কবি রয়েছেন, অনওয়ার্ড ক্রিশ্চান না কী যেন নাম, চশমার ডাঁটি দুটো চওড়া রুপোর, প্রকৃত কবি বা ভারোত্তলকদের শিং থেকে তৈরি ফ্যাকাসে বাদামি ডাঁটি নয়, আর যাঁর কবিতা নিশ্চিত এইভাবে শুরু হয়ঃ “আমার ঝনঝনাময় দিনের ভেতর দিয়ে …” ওঁর টিপ্পনী নিয়ে একটু অস্বস্তি বোধ করছি, ওঁর টিপ্পনী কি আমার টিপ্পনীর চেয়ে উত্তম? হাজার হলেও চটকদার টিপ্পনীর ঔৎকর্ষ বিচার করেই আমাদের চয়ন করা হয়ে থাকে, কী বলছেন ওঁকে উনি? আর জোয়ানকে? কী পট্টি পরাতে চাইছেন ওঁর কানে কানে? খুব লোভ হচ্ছিল দ্রুত কাছে চলে যেতে আর ফেমাস রাইটার্স স্কুল থেকে সম্মানের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রমাণ দাখিল করতে বলার। “দ্য চিলড্রেন’স আর্মির” থেকে বেশি চটকদার আর আবশ্যক আর কী হতে পারে, যেমন “আওয়ার লেডি অভ দ্য সরোজ়” – চতুর্থ শ্রেণীতে আমরা সিস্টার স্কল্যাস্টিকার ক্ষমাহীন তত্ত্বাবধানে গাইতাম, “সত্যের ধ্বজাবাহী যুবশক্তির বাহিনী”। একটা আলপিনের ডগায় কজন ফেরেশ্তার নৃত্য করা সম্ভব, সেটা উনি নির্ভুলভাবে জানতেন…
 
আমি বুঝে ফেলেছি যে ফ্লোরেন্স জীবনের সমস্যাগুলো এড়িয়ে থাকতে চান। যতটা অসুখী, উনি নিজেকে তার থেকেও বেশি অসুখী বলে প্রতিপন্ন করতে চান। মনে মনে নিজেকে আরও বেশি চিত্তাকর্ষক করে তুলতে চান। আমাদের একঘেয়ে লাগবে কিনা এই নিয়ে উনি ভয়ে ভয়ে থাকেন। নিজের অনন্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন উনি। সত্যি সত্যি উনি কোথাও চলে যেতে চান না। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ হ্রদ সম্বন্ধে অনওয়ার্ড ক্রিশ্চানের কি কিছু জানা আছে? প্রয়োজনে কর্মচারীকে বরখাস্ত করতে হয়। আপনাকে আমি বরখাস্ত করলাম, উজ্জ্বলতা আমার পরিচয় জানে বলে মনে হয়। টেম্পলহফ থেকে একটি গাড়িতে করে আমেরিকান অঞ্চলের একটি হোটেল অভিমুখে গেলেন, নাম নথীভুক্ত করালেন, খাদ্য গ্রহণ করলেন, লবিতে একটি চেয়ারে বসে আমেরিকান লেফটেন্যান্ট, কর্নেল আর জার্মান মেয়দের দেখলেন কিছুক্ষণ, তারপর রাস্তায় বেরিয়ে এলেন। প্রথম যে জার্মান লোকটার দেখা উনি পেলেন সে একজন পুলিশ, রাস্তার যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে। ইউনিফর্মে ছিল। ট্র্যাফিক আইল্যান্ডের দিকে এগিয়ে এসে ওর ইউনিফর্মের হাতা ধরে টান দিলেন। খুব নম্রভাবে সম্ভ্রান্ত আমেরিকান বৃদ্ধাটির দিকে ও ঝুঁকল। উনি হাতের ছড়িটা তুললেন – ইয়েলোস্টোন থেকে ১৯২৭ সালে কেনা – তারপর সজোরে বাড়ি দিয়ে ওর মাথা ফাটিয়ে দিলেন। লোকটা রাস্তার মাঝখানে ধুপ করে পড়ে গেল। তারপর ফ্লোরেন্স এলোমেলোভাবে প্লাজ়ার দিকে ছড়ি হাতে ছুটলেন, সামনে যারাই পড়ল – পুরুষ মহিলা – তাদের নির্বিচারে মারতে মারতে – যতক্ষণ না কেউ এসে ওঁকে থামাল। সম্বোধনের রীতি, আমি কি আপনাদের সম্বোধনের রীতি সম্পর্কে পাঁচালি শোনাব? ফ্লোরেন্স যা করেছিলেন সেটাই ফ্লোরেন্স করেছিলেন, বেশিও নয় কমও নয়, ওঁকে হেপাজতে নিয়ে মিলিটারি বিমানে করে এই দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। “আপনারা ছেলেমেয়েদের সবাইকে হত্যা করতে দিলেন কেন?” “তার কারণ সবার বিনাশসাধন আগেই হয়ে গেছিল। সবাই ছিল সম্পূর্ণরূপে মৃত। আপনি, আমি এবং অনওয়ার্ড ক্রিশ্চান।” “আপনি পুরোপুরি নিশ্চিত নন।” “কথাটা সত্যি।” একজন আর্ল১৭-এর কনিষ্ঠ পুত্রের স্ত্রীর চিঠি এই ভাবে শুরু হয়েছেঃ ম্যাডাম … “ব্যাড যখন আমাদের কাছে এলেন আমরা নিচের তলার বাথরুমে ছিলাম। ব্যাড মিস্টার গ্রীনের বোন আর উনি সিঁড়ি চড়তে পারেন না।” ক্যাসাব্লাঙ্কায়১৮ গেলে কেমন হয়? স্যান্টা ক্রুজ়ে১৯? ফুনশ্যালে২০? মালাগাতে২১? ভালেট্টায়২২? ইরাক্লিওনে২৩? সামোসে২৪? হাইফাতে২৫? কোতোর বে’তে২৬? দুব্রোভনিকে২৭? “আমি অন্য কোথাও যেতে চাই,” ফ্লরেন্স বললেন। “এমন কোথাও, যেখানে সবকিছুই অন্যরকম।” প্রতিভা পরীক্ষায়, ফেমাস রাইটার্স স্কুলে প্রবেশের জন্য – প্রয়োজনীয় তবে পর্যাপ্ত শর্ত নয় – বাস্কেরভিল পেশ করেছিল "ইমপ্রেশনস অভ অ্যাক্রন" যা শুরু হয়েছিল: "অ্যাক্রন! অ্যাক্রনের রাস্তাঘাটে ছোট ছোট ট্রানজ়িস্টর হাতে মানুষের ভিড়, যেগুলো চালিয়ে রাখা হয়েছিল।” 
 
ফ্লোরেন্সের একটি ক্লাব আছে। প্রত্যেক মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেই ক্লাবের সদস্যরা ইন্ডিয়ানা ব্যুলেভার্ডে তাঁর অনুভূমিক প্রাসাদোপম পুরাতন বাসায় মিলিত হন। ক্লাবটি হল কয়েকজন পুরুষের একটি গোষ্ঠী, যাঁরা এখানে একত্রিত হয়ে ফ্লোরেন্স গ্রীনকে প্রশস্তি করে লেখা কবিতা পাঠ এবং শ্রবণ করেন। সদস্যতা পেতে হলে একটি কবিতা রচনা করা জরুরি। কবিতাগুলি সাধারণত এইভাবে শুরু হয়ঃ “ফ্লোরেন্স গ্রীন একাশি/ তবুও আছে ওঁর মুখে হাসি …” অনওয়ার্ড ক্রিশ্চানের কবিতা শুরু হয়েছেঃ “আমার ঝনঝনাময় দিনের ভেতর দিয়ে …” এই সব কবিতা ফ্লোরেন্স ওঁর বটুয়াতে নিয়ে ঘোরেন, স্টেপল করা বিশাল এক ময়লা বাণ্ডিল। সন্দেহ নেই যে ফ্লোরেন্স গ্রীন প্রভূত ধনী এবং অসম্ভব স্বার্থপর আর খামখেয়ালি এক বুড়ি! ছ’টি পরিবর্তক পরিবর্তন সাধন করে ওঁকে খামখেয়ালি হিসেবে মনে করবার সুযোগ করে দেয়। “কিন্তু আপনারা জীবন্ত বাস্তবকে উপলব্ধি করতে পারেননি, এটাই হল নিষ্কর্ষ!” উত্তেজিতভাবে হোসার্ল২৮ একবার বলেছিলেন। আমার পক্ষেও কখনোই সম্ভব হবে না। ওর পরীক্ষক (তিনি কি জে ডি র‍্যাটক্লিফ ছিলেন?) খুব কড়া ভাষায় বলেছিলেন, “বাস্কারভিল, তুমি ঠিক একটা ব্ল্যাঙ্ক রাউন্ডের২৯ মত, অপ্রাসঙ্গিকতা সাহিত্য নয়।” “সাহিত্যের উদ্দেশ্যে হল,” খুব সাড়ম্বরে বাস্কারভিল জবাব দিয়েছিল, “রোঁয়াওয়ালা কোনও অদ্ভুত জিনিস সৃষ্টি করা যা আপনার হৃদয়বিদীর্ণ করতে সক্ষম হবে।” জোয়ান বলল, “আমার দুটি সন্তান।” “এরকম কেন করলে?” আমি জানতে চাইলাম। “জানি না,” ও বলল। ওর জবাবের নম্রতা আমাকে বিদ্ধ করল। পামেলা হান্সফোর্ড জনসন শুনছিলেন, ওঁর মুখের পেশি লাফিয়ে উঠল, যেটা ছটফটানি হিসেবে বর্ণনা করা যায়। “এটা তো ভয়ানক কথা,” উনি বললেন। ঠিকই বলেছেন উনি, ঠিক, একদম ঠিক, ও যা বলল তা হল প্রথম ভয়ানক কথা। আমাদের টিপ্পনী দিয়েই আমরা পরস্পরের মূল্যায়ণ করি, এই সব টিপ্পনীর জোরেই এবং অ্যান্ড্র্যু বোনদের নিয়ে বলা কথার ভিত্তিতে, প্রেম সম্ভবপর হয়। মানিব্যাগে আমি একটি আট অনুচ্ছেদের সাধারণ নির্দেশ বহন করে থাকি, যা আমার তরুণ নিষ্কলঙ্ক সৈন্যদের অ্যাডজুট্যান্ট জারি করেছিল: “(১) এই বাহিনীতে তোমরা সামিল হয়েছ, কারণ তোমরা তাই চেয়েছিলে। তাই সেনাপতি যা যা বলবেন, সেগুলো তোমাদের মান্য করে চলতে হবে। সেনাপতির কথা অমান্য করলে তোমাদের ঘাড় ধরে বাহিনী থেকে বের করে দেওয়া হবে। (২) সেনাপতি যা বলবেন সেটা সম্পাদন করাই সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য। (৩) সেনাপতি বলছেন তিনি আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত কেউ অস্ত্র চালাবে না। যখন সেনাবাহিনী কোনোকিছুর ওপরে অস্ত্রপ্রয়োগ করবে, তখন সেটা সকলে মিলে করাটা খুবই জরুরি। খুবই জরুরি এটা, যারা সেটা করবে না, তাদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে বাহিনী থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া হবে। (৪) সকলে মিলে অস্ত্র চালানোর সময়ে যে আওয়াজ হবে, তাতে ভয় পাবে না। এতে তোমাদের আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। (৫) সেনাপতি যা করাতে চাইছেন তার জন্য তোমাদের পর্যাপ্ত গুলি দেওয়া হয়েছে। যাদের গুলি লক্ষভ্রষ্ট হবে তাদের নতুন করে দেওয়া হবে না। (৬) যারা সেনাবাহিনীতে নেই তাদের সঙ্গে কথা বলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। অন্য লোকেরা সেনাবাহিনীকে বুঝতে পারে না। (৭) এটি একটি গম্ভীর সেনাবাহিনী এবং কেউ যদি হাসাহাসি করে তবে তার অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে বাহিনী থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া হবে। (৮) সেনাপতি এখন যা করতে চাইছেন তা হল শত্রুদের খুঁজে বের করে নির্মূল করে ফেলা।”
 
আমি এমন কোথাও যেতে চাই যেখানে সব কিছুই অন্যরকম। একটি সরল এবং নিখুঁত ভাবনা। সম্পূর্ণ অন্যতার থেকে কম কিছুতেই বুড়ি খুকির প্রত্যাশা পূরণ হবে না। ডিনার শেষ হল। আমরা ন্যাপকিন ঠোঁটের ওপর রাখলাম। আমাদের কেময় আর মাৎসু’র কথাই রইল, অস্থায়িভাবেই খুব সম্ভব; ওপরের বাথরুম থেকে বেমেরামত অবস্থাতে জল গড়াচ্ছে; আমার মনে হচ্ছে টাকা সরে যাচ্ছে, আমার দিক থেকে সরে যাচ্ছে। আমি তরুণ কিন্তু খুবই প্রতিভাশালী, খুবই কৃপাপ্রার্থীসুলভ, একটা পত্রিকার সম্পাদনা করে থাকি … সে সব তো আগেই বলেছি। অন্ধকারাচ্ছন্ন হলঘরে আমি জোয়ানের হলুদ পোশাকের ওপর ঘাড়ের পাশ দিয়ে হাতটা ফেলে দিলাম। কাজটা বিপজ্জনক, কিন্তু সবটুকু এক সঙ্গে পাওয়ার এটাই উপায়। এবার অনওয়ার্ড ক্রিশ্চান এসে পড়লেন নিজের হলুদ ওভারকোটটা পুনরাধিকার করবার জন্য। ফ্লোরেন্সকে কেউই খুব একটা গুরুত্ব দেননি, তিনশ মিলিয়ন ডলারের মালকিনকে আবার কী করে গুরুত্ব দেওয়া যায়? তবে আমি জানি, কাল যখন টেলিফোন করব, কোনও জবাব পাওয়া যাবে না। ইরাক্লিওন? সামোস? হাইফা? কোতোর বে? এর কোনো জায়গাতেই উনি থাকবেন না, অন্য জায়গায় থাকবেন যেখানে সব কিছুই অন্যরকম। বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। আমার বর্ষা-নীল ফোক্সওয়াগনে করে বর্ষা-কালো রাস্তা ধরে এগোলাম, ভাবতে ভাবতে, খুবই সহজবোধ্য কারণে, ভার্দি৩০ রেকোয়েম৩১ নিয়ে। আমার ছোট্ট গাড়িটা নিয়ে রাস্তায় আমি বোকা-বৃত্ত সৃষ্টি করে চলেছি, এই প্রথম মন দিয়ে কিয়েরি৩২ আওড়ালাম।

 
পাদটীকাঃ

১ কেময় – তাইওয়ান দ্বীপ আর চিনের মূল ভূখণ্ডের মাঝখানে তাইওয়ান প্রণালীতে অবস্থিত চিন প্রজাতন্ত্রের (তাইওয়ানের) একটি কাউন্টি। কিনমেন নামেও বলা হয়।

২ মাৎসু – পূর্ব চিন সাগরে অবস্থিত ৩৬টি দ্বীপ নিয়ে একটি দ্বীপপুঞ্জ। চীন প্রজাতন্ত্রের (তাইওয়ানের) লিয়েনচিয়াং কাউন্টি)।

৩ ফ্লেশম্যান’স জিন – আমেরিকায় উৎপাদিত এক ধরণের সুগন্ধিত জিন পানীয়।

৪ গাজ়প্যাশো – এক ধরণের স্প্যানিশ স্যুপ

৫ টেক্সাকো – শেভ্রন কর্পোরেশনের অধীনস্থ আমেরিকান তেল কোম্পানি।

৬ গ্রাফ জ়্যেপেলিন – বিমানবাহী জার্মান যুদ্ধ জাহাজ। একই নামে এই রকম দুটি জাহাজ তৈরি করা হয়েছিল।

৬ক - পশ্চিমের বাগান থেকে বিদায় নেবার সময় হয়ে গেছে - সিরিল কনৌলির একটি উক্তি।

৭ বন্ধুত্বের ফুল ম্লান হবার আগেই বন্ধুত্ব ম্লান হয়ে গেল – আমেরিকান কবি জারট্রুড স্টেইনের একটি কবিতার নাম।

৮ ভোগ (Vogue) – নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় ফ্যাশন আর লাইফস্টাইল ম্যাগাজ়িন।

৯ মাইকোনোস – একটি গ্রীক দ্বীপ। এখানে বাতাসের তীব্র গতির জন্য একে ‘দ্য আইল্যান্ড অভ ত্য উইন্ডস’ও বলা হয়। প্রাকৃতিক দৃশ্য আর মনোরম সমুদ্রসৈকতের জন্য ধনী ব্যক্তিদের কাছে দ্বীপটি খুব জনপ্রিয়।

১০ এগমন্ট লাইট ইট্যালিক – একটি ইংরেজি ফন্ট।

১১ ব্রেজ়ন সী – কিংবদন্তি অনুসারে জেরুজ়ালেমের মন্দিরে রাখা একটা চওড়া গামলা। পুরোহিতদের আচমন করার জন্য রাজা সলোমন এটি নির্মাণ করিয়েছিলেন।

১২ শেজ় – আচ্ছাদনহীন হালকা ঘোড়ার গাড়ি।

১৩ বুকেনওয়াল্ড – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জার্মানির একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।

১৪ মিস্টার হেনরি জেমস যেন এক বেদনাদায়ক কর্তব্য করছেন মনে করে উপন্যাস লিখে থাকেন – অস্কার ওয়াইল্ডের একটি উক্তি।

১৫ ম্যামজ়ি – (Malmsey) শক্তিবর্ধক মিষ্ট স্বাদের মাদেইরা দ্বীপের ওয়াইন (মদিরা)।

১৬ সিডেল – এক ধরণের বিয়ার পান করার মগ।

১৭ আর্ল – ব্রিটেনের এক শ্রেণীর সম্ভ্রান্ত মানুষের উপাধি।

১৮ ক্যাসাব্লাঙ্কা – মরোক্কোর সব থেকে বড় শহর। সমুদ্র বন্দর।

১৯ স্যান্টা ক্রুজ় – ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্র শহর।

২০ ফুনশ্যাল – মাদেইরার রাজধানী এবং প্রধান বন্দর।

২১ মালাগা – স্পেনের একটি সমুদ্র বন্দর।

২২ ভালেট্টা – মাল্টার রাজধানী এবং প্রধান সমুদ্র বন্দর।

২৩ ইরাক্লিওন – গ্রীসদেশের একটি শহর।

২৪ সামোস – এজিয়ান সাগরে গ্রীসদেশের একটি দ্বীপ। পশ্চিম তুরস্কর কাছে।

২৫ হাইফা – ইজ়রায়েলের প্রধান বন্দর।

২৬ কোতোর বে – অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে মন্টেনেগ্রোর একটি উপসাগর (খাড়ি)।

২৭ দুব্রোভনিক – ক্রোয়েশিয়ার একটি বন্দর।

২৮ হোসার্ল – এডমন্ড হোসার্ল – একজন জার্মান দার্শনিক।

২৯ ব্ল্যাঙ্ক রাউন্ড – বন্দুকের যে গুলিতে বারুদ থাকে কিন্তু সীসা থাকে না, সেই রকম গুলি চালানো।

৩০ ভার্দি – একজন ইতালিয়ান সঙ্গীতকার।

৩১ রেকোয়েম – মৃতের আত্মার শান্তি কামনায় বিষাদ গাথা।

৩২ কিয়েরি – ঈশ্বরের করুণা প্রার্থনা করা।

* নীচকলের বাথরুম (Downstaics bathroom) – ফ্লোরেন্সের কথায় জড়তা এসেছে বোঝাবার জন্যই খুব সম্ভব লেখক ব্যবহার করেছেন। নীচের তলার বাথরুমের কথা বলতে চেয়ে এটা মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে।


লেখক পরিচিতিঃ

ডোনাল্ড বার্থেলমি (১৯৩১ – ১৯৮৯) – আমেরিকান ছোটগল্প লেখক এবং ঔপন্যাসিক। পোস্ট-মডার্ন শৈলীর। ওঁর রচনাগুলি গতানুগতিক ধারার থেকে যথেষ্টই আলাদা। অসংলগ্ন বাক্য, বাক্যাংশ এবং বাক্যবন্ধ ব্যবহারের ফলে লেখাগুলি বিভ্রান্তিকর বলে মনে হয় পাঠকের। বর্তমান গল্পটি লেখকের ‘কাম ব্যাক ডঃ ক্যালিগরি’ গল্পসংগ্রহের প্রথম ছোটগল্প – ফ্লোরেন্স গ্রীন ইজ ৮১।
 
 

অনুবাদক পরিচিতি:
উৎপল দাশগুপ্ত
অনুবাদক। ফটোগ্রাফার
কলকাতায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন