শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

বনমালী মাল'এর গল্প : জলছবি



একটা গন্ধরাজ ফুটিফাটা ছায়া ফেলেছে। হলুদ আলোর বাল্ব যতটুকু পারছে, গোপনকে বেনাকাব করছে। তারই ফাঁকে গোপন নিয়ে কারবার চালাচ্ছে ঈশ্বর। মুখটা কোনোভাবে ছায়ায় থাকলেই হল। গায়ের বাকি অংশটুকু কেউ দেখলে বয়েই যায়। ছর ছর শব্দে পেচ্ছাব পড়ছে শুকনো পাতায়। যতটা পারছে শুকনো পাতা এড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করছে কিন্তু শব্দ তার পিছু ছাড়ছে না। এই জায়গা থেকে বোঝা যায়, ঈশ্বরের হাতে সবকিছু নেই।

ঘরের ভেতর অনেকগুলো ফাটল, গর্ত। কার্বলিক অ্যাসিডের শিশি। ছিপির ওপর পেরেক দিয়ে ফুটো করা। ঈশ্বর প্রতিটা গর্তের মুখে দু' চার ফোঁটা করে ছড়িয়ে দিয়ে কয়েকদিনের জন্য নিশ্চিন্ত হতে পারে। গর্তের ভেতর যদি কোনো সাপ থাকেও, সে ওই পথ এখন মাড়াবে না। কিছুদিন ঘুমে থেকে অপেক্ষা করবে। অন্ধকারে। এই অন্ধকার আত্মকেও অন্ধ করে।

এই ঘরে ঈশ্বর একা থাকে। এখন সে একলা ঘরে আলো মাখবে। অন্ধকার খাবে। এমন নির্জনতা সে পেয়েছে অনেক ত্যাগ স্বীকার করে। সুতোর পর সুতো জুড়ে এমনিতে সে নির্জনে একটা ভাবনা গাঁথতে পারে। কিন্তু আজ তার মন খুব চঞ্চল। অজানা একটা রাতপাখির আর্তি তাকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না। আজ একটু আগেই, বিকেল থাকতে থাকতে তার ওপর দিয়ে যে স্রোত বয়ে গেল, তা নির্জীব হতে পারে না। তার মনে হয়, প্রতিটা দৃশ্য আর ভাবনা ভেতরে ভেতরে অনেকখানি প্রাণ লুকিয়ে নিয়ে চলে, নাহলে...

বিকেলের চড়া রোদ তখনও হাঁফিয়ে ক্লান্ত হয়ে যায়নি। বসে বসে বই পড়ছিল ঈশ্বর। একলা ঘরের দরজায় ঘা।

--মোদের ছোপ ছোপ বাছুরটা মরে গেছে একটু আগে…
--
--একটু যাবি মোর সঙ্গে?
--

ঈশ্বরের পাশের ঘরের মেজো দাদু। পাকা আর ধূসর হয়ে যাওয়া চুল লেপ্টে আছে মাথায়। ছোপ ছোপ বাছুরটা মরে গেছে বলার সময় ঈশ্বর কোনো কারণ ছাড়াই দাদুর মাথার দিকে চেয়েছিল। শোক প্রকাশের সময় মানুষের চুলে কি কোনো বদল আসে!

--নাহ্

ইচ্ছে নেই, তবুও তাকে যেতে হবে সৎকারে। দাদুদের শোকের ভেতর ঈশ্বরের আরো কত কত মৃত ভাবনার শোক মুখ লুকোচ্ছে। দুটো দুটো ঠ্যাং জড়ো করে ভিজে খড়ের ছট দিয়ে বাঁধা হয়েছে নরম স্থির বাছুরটাকে। গলিয়ে দেওয়া হয়েছে একটা কাঁচা সবুজ অকালমৃত বাঁশ। দাদুর আর ঈশ্বরের কাঁধের মাঝে চার ঠ্যাং তুলে দোল খাচ্ছে দাদুদের ছোপ ছোপ বাছুরটা। তিন বন্দ জমির আল পেরিয়ে নতুন পুকুরের বাদাড়। হালি লকলকে ঘাস ঢেকে আছে মাটির শরীর। দক্ষিণ মাথা করে শেষবারের মতন শুইতে দেওয়া হল বাছুরটাকে। দাদুর দেখাদেখি ঈশ্বরও দু' আঙুলে কয়েকটা ঘাস ছিঁড়ে ছড়িয়ে দেয় বাছুরের গায়ে।

অরণ্যের ঘাস খা
পুষ্করিনীর জল খা
পালকের ঘরে জন্ম হ।

ঘরমুখো হয়েছে তারা। আর পেছন ফিরে তাকাতে নেই। আগে আগে ঈশ্বর আল ভাঙে পেছনের দাদুর লম্বা ছায়া মাড়াতে মাড়াতে। কাদা জমির ছোঁয়া লেগে রসালো আল কিছুটা পিচ্ছিল।

--এই ক' দিনের বাছুর কত্ত ভারি হইছে দেখছু!
--
--গরুটা তখন থিকে ডাকতিছে রে ঈশ্বর..
--
ঈশ্বর এমনই। কখন কোন্ ভাবনা থেকে কোন্ ভাবনায় লাফ দেয়, বলা মুশকিল। এখন এইমাত্র বাইরে বাছুরের সৎকার করেও ভেতরে মনে মনে সে অন্য কোনো ভাবনা কপচাচ্ছে। মেজো দাদুর কথাগুলো যেন এক ভাসমান পাখির ডাকের মতন শব্দটুকু গেঁথে দিয়ে ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। ছায়াগুলোর ভৌতিক চলনে তার এখন বেশি আগ্রহ। দুটো ছায়াই আল থেকে লটকে পড়ে সদ্য মই দেওয়া মসৃণ জমিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে।

ভাবুক ঈশ্বরের দু' চোখে যেন একটা অস্বচ্ছ পর্দা। সে সব দেখছে কিন্তু কোনোকিছুই ভালো করে দেখছে না। শুনেও শুনছে না কিংবা চুপ করে থেকেও কত কত কথা বলে চলেছে অবিরাম। হঠাৎ তার চোখ থেমে গেল। পায়ের গতি একটু মন্দ। তার ছায়া মই দেওয়া সমান জমির যে জায়গাটা অতিক্রম করছে, সেখানে একটা শামুক তার রস আর দাগ কেটে এঁকে গেছে। রেখা আর চুঁয়ানো জল জমে যে ছবি স্পষ্ট হয়েছে, তা ঈশ্বরের চোখে নতুন। মানুষের চোখের মতন প্রশস্ত মাঝ অংশ আর দুই প্রান্ত ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে মিলিয়ে গেছে বিন্দুতে। নিজের ছায়া পেরিয়ে যেতেই সেটা ঢেকে দিল দাদুর ছায়া। যতটুকু সময় ঈশ্বর সম্মুখ বা পার্শ্বিক চোখে দেখেছে, ততটুকুই।

দাদু বলেছে, পেছন ফিরে তাকাতে নেই।

এতক্ষণ পর ঈশ্বর কোনো একটা স্থির বিষয়ের ভাবনায় ডুবে যাচ্ছে। ওই একটু সময় ধ'রে দেখা ছবিটা ডালপালা মিলিয়ে তার মাথার চারপাশে একটা বিশাল ভারী ছায়া ফেলেছে। এই ছায়া থেকে আরো ঘন ছায়ার গভীরে যাওয়া যায় শুধু। আলোর উৎস এখানে ঈশ্বরের জানা নেই।

প্রথমে ঈশ্বর ওই কাদার ছবিটিকে চোখ ভেবে ভুল করলেও সেই ভুল বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। একটা কানাঘুষো কিংবা গোপন শোনা বর্ণনা আস্তে আস্তে তার সারা গায়ে শিহরণ তোলে।

--যোনি!

ঘরে ফিরে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে সে। নিশ্চল। তার একলা সঙ্গী পোষা সাদা ধবধবে বিড়ালটা খর চোখে লোম ফুলিয়ে স্থির চেয়ে আছে মাটির দিকে। কীভাবে বাইরের আকাশে লাল থেকে অন্ধকার নেমে এল, ঈশ্বর তার কিছুই জানে না। সে এখন সময়কে বন্ধক দিয়েছে ওই এক পলকের ছবি আর ভাবনার কাছে। এভাবে কতক্ষণ সে পড়ে ছিল, ভেবে দেখেনি। তলপেটে ভার আর চাপ বাড়তে বাড়তে যখন প্রায় অসহ্য ঠেকে তখন সে উঠে ঘরের আলোগুলো জ্বালে। গন্ধরাজের আড়ালে পেচ্ছাব করতে যায়। পেচ্ছাব করতে যাওয়ার আগে অব্দি তার সময়টা কেটেছে একটা প্রায় নির্বাক অচেতন ঘোরের মধ্যে। এমনকি যে ছবিটা সে এই বিকেলে দেখে এল, সেই ছবি থেকে সরে গিয়ে কোনোকিছু চোখের সামনে ভাসিয়ে তোলার চেষ্টা করেনি। পেছন ফিরে দেখার সংস্কার সে হেলায় উপেক্ষা করতে পারত, কিন্তু দাদু থাকায় সে তার হাঁটার বেগ থামিয়ে ভালো করে দেখতে পর্যন্ত পেল না। একটা বিশালাকায় পাখি যে হয়তো কোনোদিন দিনের আলো দেখেনি, ঈশ্বরের মাথা দিয়ে উড়ে গেল। শুধু কালো একটা চিহ্ন দগদগে শব্দ ছড়িয়ে অবাক করে গেল তাকে।

পেচ্ছাব করতে করতে গায়ে ঠান্ডা বাতাস লাগে। বদ্ধ ঘরের বাইরে এসে সে একটু একটু করে তার চেতনাকে আলগা করছে। ঈশ্বর এখন আবিষ্কারের আনন্দে।

--যোনি!

পাশাপাশি একটা বাঁজা ধানশিষের দুঃস্বপ্ন তার খড়ি ওঠা গালে চিড়চিড়ে স্বভাবে দাগ কেটে যায়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না দেখতে পাওয়ার যন্ত্রণা ঈশ্বরকে তলিয়ে দিচ্ছে কালপ্যাঁচার হুক হুক ডাকে। কত স্বাভাবিক আর ওই অন্ধকার-কালো গাছগুলোর মতন এখন বাস্তব মনে হচ্ছে তাকে। অন্ধকার আর সেই যোনির মধ্যে ঈশ্বর একটা অদ্ভূত কালো উট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন। কদাচিৎ যে মুখ নীচু করে। নারী আর নারীর শরীর সম্পর্কে ঈশ্বর এতদিন অনেক কিছু শুনেছে। কিন্তু যোনি নিয়ে তার কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। আজ একটা শিহরণ শিকড় পেয়েছে। অসংখ্য একাকীত্ব আর গোপন সরস জমি আজ ফুলেল বাগান। একটু দূরে অন্ধকারে ধাক্কা খাচ্ছে এক জোনাকি। তার ওই মৃদু অস্থির আলো এঁটে উঠতে পারছে না একঝাঁক কালোর সঙ্গে।

ঘরের ভেতর স্থির বসে আছে ঈশ্বর। ঝিঁঝির অক্লান্ত ডাকের সঙ্গে তার গোপন ভাবনা লেপ্টে চিটে আছে। টেবিলের উপর রাখা একটা বইয়ের কতগুলো পৃষ্ঠা একসাথে উড়ে গিয়ে মাঝামাঝি একটা অধ্যায়ের শুরুর শূন্যতাকে মেলে ধরেছে। রাত ঘন হতে হতে তরল হচ্ছে। একটুকরো জানালা দিয়ে গড়িয়ে আসছে রাত আর ঝিঁঝির আর্তি। ঈশ্বরের চোখ এখন অপ্রকৃত। ঘোলাটে লাল রঙ। সন্ধ্যা থেকে আজ সে কোনো বই খোলেনি।

ঘন ঘোরের মাঝেও ঈশ্বর মাটি নিয়ে খেলার শব্দ শুনতে পায়। কার্বলিক অ্যাসিড অগ্রাহ্য করে ইঁদুরগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে আসছে আলোর দিকে। এ যেন মৃত্যুর বিরুদ্ধে একটা নিখুঁত সাজানো মামলা। শিকার ধরার চেয়ে নিজেদের আলোকময় কামনায় সঁপে দেওয়াই যেন পরম ধর্ম। ওৎ পেতে আছে ঈশ্বরের পোষা বিড়ালটা। সবটুকু আলো শুষে নিয়ে সে এখন উজ্জ্বল হয়ে উঠছে ঈশ্বরের চোখে। ফোলা লোম। উত্তুঙ্গ লেজ। একটা ইঁদুর মুখভর্তি আলো খাচ্ছে, এমন সময় বিড়ালটা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর। পুকুর পাড় থেকে ব্যাঙের অস্পষ্ট গোঙানি ভেসে আসে।

বিকেলে মাটির যোনি নিখুঁত দেখার যে অতৃপ্তি ছিল, সন্ধ্যার পর থেকে ঈশ্বর প্রতি মুহূর্তে সেই অদেখা খুঁটিনাটি গুলো কল্পনা দিয়ে সাজিয়ে নিচ্ছে। বুননের কাঠি দুটো অবিরাম মেতে আছে সুতোর ঢলাঢলি ভাব জমাতে। একটি স্পষ্ট যোনির রূপ পেতে পেতে বিড়ালটা আরেকটা শিকারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে। বিছানায় শুয়ে পড়ে ঈশ্বর। বিড়ালটাকে মাঝরাতে জড়িয়ে ধরে। তার লোম আর গোঁফ সারারাত ঈশ্বরের স্বপ্নে বাজিদৌড় খেলছে।

সকালে ঈশ্বরের বিছানা ছাড়তে দেরি হয়। ক্লান্ত মনে হচ্ছে নিজেকে। এক সন্ধ্যার পেটে ডুব দিয়ে ঈশ্বর যেন কত চঞ্চল হয়ে গেছে। বিছানা ছাড়ার পর তার গায়ে চোখে একটুও তন্দ্রা লেগে নেই যেন। সারারাত বিড়ালটির সঙ্গে সে আনন্দে কাটিয়েছে। শারীরিক ক্লান্তি কোনোভাবেই তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। বাইরে তেজী রোদের আলো সবকিছু নিখুঁত ভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে। ঈশ্বর হাঁটছে সেই জমিটার দিকে। তার আগে আগে হাঁটছে তার বিড়ালটা। টানটান পা ফেলছে। তীক্ষ্ম লোমগুলো যেন এক একটা একাঘ্নি ফলা। কাল বিকেল থেকে ঈশ্বর যেসব কল্পনা মিশিয়ে রাতে নিজের জন্য ওই মনোময় জগৎ তৈরি করতে পেরেছিল, আজ তাকে আরো পুষ্ট করতে চায়।

জমিটার কাছে এসে হতাশ হয়ে পড়ে ঈশ্বর। এই এক রাতেই বাতাস আর মিহি জলের স্রোত যোনিটাকে অস্পষ্ট আবছায়া করে রেখেছে। তার মুখের ওপর দিয়ে কালো রঙের একটা ছায়া বয়ে গেল। এক পাখি তার বিশাল ডানার ছায়া দিয়ে প্রথমে অন্ধকার করে দিল যোনিকে। তারপর ডানা দিয়ে ঢেকে বসল সেটার উপর। ঈশ্বরের সমস্ত উত্তেজনা লোপ পেল নিমেষে। কাল থেকে তিলে তিলে গড়ে তোলা একটা জগৎ তার চোখের সামনে ক্ষয়ে ক্ষয়ে অন্ধকার হয়ে গেল।

ঈশ্বরকে পেছনে ফেলে তার পোষা বিড়ালটা এলোমেলো পা ফেলে ফিরে আসছে ঘরের দিকে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন