শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

আন্দ্রেস নিউম্যানের গল্প: বালিতে একটি রেখা

talented reader: a literary journal: Talking to Ourselves, But Who Is  Listening?
 
 
স্প্যানিশ থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তর: অ্যালিসন এন্ট্রেকিন
বাংলা ভাষান্তর: মোস্তাক শরীফ

পা দিয়ে পর্বত বানাচ্ছিল রুথ। উষ্ণ বালুতে ছোট ছোট ঢিবি বানাচ্ছিল বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে, গড়েপিটে ঠিক করছিল, পায়ের গোড়ালি দিয়ে যত্ন করে মসৃণ করছিল, গভীর মনোযোগে দেখছিল, ভেঙে দিচ্ছিল। তারপর শুরু করছিল ফের গোড়া থেকে। লাল হয়ে আছে পায়ের পাতা, ব্যথা করছে সৌরপাথরের মতো। নখে লাগানো কাল রাতের রঙ এখনও আছে।বালু খুঁড়ে ছাতাটা বের করছিল হর্হে, অন্তত চেষ্টা করছিল করার। ‘নতুন একটা আমার কিনতেই হবে দেখছি,’ বিড়বিড় করছিল খোঁড়াখুঁড়ির ফাঁকে। হর্হের কথা শুনতে না পাবার ভান করল রুথ, যদিও বিরক্ত লাগছিল খুব। আর সবকিছুর মতো ছোট্ট একটা ব্যাপার, বলাই বাহুল্য। অস্ফুট শব্দ করে ছাতা থেকে ঝটতি হাত সরিয়ে নিল হর্হে, ছাতার আংটা বা কিছু একটার খোঁচা লেগেছে আঙ্গুলে। ছোট্ট ব্যাপার, রুথ ভাবল, কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, হর্হে বলেনি-‘আমাদের নতুন ছাতা কিনতে হবে,’, বলেছে-‘আমার কিনতে হবে।’ এক ঝটকায় ছাতার উপরের অংশটি গোটাতে সক্ষম হলো হর্হে। পেছনে হাত রেখে নিরিখ করল ওটাকে, যেন পরাজিত কোনো প্রাণীর শেষ প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায় আছে।

দৈবক্রমে বা যেভাবেই হোক, ঘটনা হচ্ছে, হর্হে বলেছে ‘আমি, ও কিন্তু ‘আমরা’ বলেনি, রুথ ভাবল। ছাতা উঁচু করে ধরল হর্হে। ওটার মাথার দিকটায় ডালপালা মেলেছে মরচে, ভেজা বালুতে মাখামাখি জিনিসটি। রুথের বানানো ছোট ঢিবিগুলো খেয়াল করল সে। তারপর চোখ গেল চটির কারণে তৈরি হওয়া পায়ের কালসিটেগুলোর দিকে, পা বেয়ে উপরে উঠে পেট পর্যন্ত গেল দৃষ্টি, নাভির আশেপাশের ভাঁজগুলোর ওপর থামল। ফের উঠতে শুরু করেছে শরীর বেয়ে, যেন সেতু পেরোচ্ছে এমন ভঙ্গিতে পার হলো দুই স্তনের মাঝখানের জায়গাটি, তারপর বালুমাখা চুলের গুচ্ছে এবং সেখান থেকে পিছলে নেমে এলো রুথের চোখে। হর্হে বুঝতে পারল, বিচ চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসে এক হাতে রোদের তাপ থেকে চোখ বাঁচিয়ে এতক্ষণ ধরে তাকেই নিরীক্ষণ করছিল রুথ। বিব্রত লাগল তার, যদিও জানে না কেন। হাসল সে, হাসির সঙ্গে নাকের কাছটায় কুঁকড়ে গেল। মুখোভঙ্গিটা আরোপিত মনে হলো রুথের, বেগুনি সূর্যের দিকে যেহেতু পাশ ফিরে আছে সে। ছাতাটা উঁচু করে ধরল হর্হে, বিড়ম্বনাকর একটা স্মারকচিহ্নের মতো। ‘তো, সাহায্য করবে তুমি?’ নিজের গলা নিজের কানেই শ্লেষাত্মক শোনাল, যতটা নরম শোনাবে ভেবেছিল ততটা নয়। নাক কোঁচকাল ফের, ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সমুদ্রের দিকে। আর তখনই রুথের বিস্ময়কর জবাবটা কানে এল তার:

‘নড়বে না।’

টেনিস খেলার একটা র‌্যাকেট রুথের হাতে, র‌্যাকেটের মাথাটা তার উরুতে রাখা।

‘বল লাগবে নাকি?’ হর্হে শুধাল।

‘আমি চাই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো তুমি,’ রুথ বলল।

র‌্যাকেটটা তুলল সে, উঠে দাঁড়াল, ধীরে ধীরে একটা রেখা টানল বালিতে। খুব যে সোজা হয়েছে তা নয়, মিটারখানেক লম্বা, স্বামীর কাছ থেকে তাকে আলাদা করেছে সেটি। দাগ টানা শেষ করে নামিয়ে রাখল র‌্যাকেটটা। বিচ চেয়ারে ফের হেলান দিয়ে এক পায়ের ওপর রাখল অন্য পা।

‘খুব সুন্দর,’ আধা কৌতূহলী আর আধা বিরক্ত হর্হের গলা।

‘পছন্দ হয়েছে?’ শুধাল রুথ। ‘তাহলে ওটার এপাশে এসো না।’

সৈকতজুড়ে ভেজা বাতাস বইতে শুরু করেছে, বা হতে পারে এইমাত্র সেটি খেয়াল করেছে হর্হে। ছাতা ও হাতে ধরা বাকি জিনিসপত্র নামিয়ে রাখার সময় নেই তার। তার চেয়েও বড় কথা, রুথের সঙ্গে খেলা করারও সময় নেই। ক্লান্ত সে। ঘুমাতে পারেনি খুব একটা। ঘর্মাক্ত ত্বক, যেন বালু জমে আছে। স্নান করার এবং পেটে কিছু দেয়ার তাগাদা অনুভব করছে খুব।

‘বুঝতে পারলাম না,’ সে বলল।

‘সেটা আমিও বুঝতে পারছি,’ রুথ বলল।

‘আচ্ছা, তুমি যাবে নাকি যাবে না?’

‘যা খুশি করো। তবে দাগের এপাশে আসবে না।’

‘দাগের এপাশে আসবে না বলতে কী বোঝাতে চাইছ?’

‘এই তো, বুঝতে পেরেছ দেখছি।’

হাতের জিনিসগুলো ফেলে দিল হর্হে। বালুতে পড়ার পর ওগুলো যে পরিমাণ শব্দ করল অস্বাভাবিক মনে হল তার কাছে। রুথ খানিকটা চমকাল, তবে চেয়ার ছেড়ে উঠল না। বামে থেকে ডানে, রেখাটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জরিপ করল হর্হে, যেন কিছু একটা লেখা আছে ওটাতে। এক পা এগোলো রুথের দিকে, খেয়াল করল, পেছনে সরে বসে চেয়ারের হাতলদুটো আঁকড়ে ধরেছে সে।

‘একটা কৌতুক এটা, তাই না?’

‘উঁহু, মজার কোনো ব্যাপার না এটা।’

‘দেখো সোনা,’ হর্হের পা-টা দাগের খুব কাছে। ‘ঠিক কী ঘটছে? হয়েছেটা কী? মানুষ সব চলে যাচ্ছে দেখতে পাচ্ছ না? দেরি হয়ে গেছে, আমাদেরও যাওয়া উচিত। অবুঝের মতো আচরণ করছ কেন?’

‘সবাই চলে যাচ্ছে অথচ আমি যাচ্ছি না, এজন্য আমি অবুঝ?’

‘তুমি অবুঝ কারণ তোমার কী হয়েছে আমি বুঝতে পারছি না।’

‘বাহ! কী দারুণ ব্যাপার!’

‘রুথ,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে এমন একটা ভঙ্গি করল হর্হে যেন রুথকে ছুঁতে যাচ্ছে। ‘তুমি কি আরো কিছুক্ষণ থাকতে চাও?’

‘একমাত্র যে জিনিসটা আমি চাই,’ রুথ বলল, ‘তা হচ্ছে, তুমি দাগের ওপাশে থাকবে।’

‘কোন পাশে? ওহ মাথা খারাপ হয়ে যাবে আমার!’

‘ঐ পাশে।’

হর্হের সন্দেহভরা হাসিতে রাগের একটা কুঞ্চন চোখে পড়ল রুথের, গালে দেখা দিয়েই মিলিয়ে যাওয়া হালকা একটা কাঁপুনি। এমন একটা ক্ষোভ, সৌজন্যের ভান করে যেটিকে সামাল দেয়ার কায়দা ভালোই জানে সে। হ্যাঁ, ক্ষোভ একটা আছে। হঠাৎ মনে হলো এস্পার-ওস্পারের সময় হয়ে গেছে।

‘হর্হে, এই দাগটা আমার, ঠিক আছে?’

‘পুরো একটা পাগলামি,’ হর্হে বলল।

‘নিশ্চয়ই। সেজন্যই তো।’

‘শোনো, তোমার জিনিসপত্র আমাকে দাও। চলো হেঁটে আসি।’

‘চুপ। পেছনে যাও।’

‘দাগের কথা ভুলে যাও, চলো হাঁটতে যাই।’

‘দাগটা আমার।’

‘ছেলেমানুষী করো না, রুথ। আমি ক্লান্ত...’

‘কিসের জন্য ক্লান্ত? বলো, বলে ফেল, ক্লান্তিটা কী কারণে?’

বুকে দু-হাত ভাঁজ করে শরীর পেছনে হেলাল হর্হে, যেন বাতাসের ধাক্কা খেয়েছে। রুথের কথার দ্ব্যর্থবোধকতা এতক্ষণে স্পষ্ট হয়েছে তার কাছে। যা বলার স্পষ্ট বলবে, ঠিক করল।

‘ঠিক হচ্ছে না এটা। আমার কথা আক্ষরিক অর্থে নিয়েছ তুমি। উঁহু, তার চেয়েও খারাপ। ঘটনা হলো, যখন তুমি আঘাত পাও তখন আমার কথা আলঙ্কারিক অর্থে নাও আর যখন নিজের মর্জির সঙ্গে মেলে তখন নাও আক্ষরিকভাবে।’

‘সত্যি? এরকমই ভাবো তুমি হর্হে?’

‘উদাহরণ দিয়ে বলি। এইমাত্র তোমাকে বললাম আমি ক্লান্ত, সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তের ভূমিকা নিয়ে নিলে তুমি, যেন আমি বলেছি তোমাকে নিয়ে আমি ক্লান্ত। আর...’

‘ঠিক ওটাই কি আসলে বলতে চাওনি তুমি? মনের গভীর থেকে? ভালো করে ভাবো। এমনও হতে পারে ভালো কিছু আসতে পারে ভাবনাটা থেকে। বলো, সমস্যা নেই। আমারও বলার আছে কিছু। কী জিনিস সেটা যা এত ক্লান্ত করে দেয় তোমাকে?’

‘এভাবে পারব না আমি রুথ।’

‘কী পারবে না এভাবে? কথা বলতে? আন্তরিক হতে?’

‘এভাবে কথা বলতে পারব না,’ বলল হর্হে। ফেলে দেয়া জিনিসগুলো তুলছে এক এক করে।

‘আচ্ছা!’ সাগরের ঢেউয়ের দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল রুথ।

হঠাৎ হাতের সব কিছু ফেলে দিয়ে রুথের চেয়ার আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করল হর্হে। আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে হাত তুলল রুথ এবং হর্হে বুঝতে পারল, এটা ভান নয় তার। থমকে দাঁড়াল সে, রেখাটির ঠিক সামনে। ঐ তো রেখাটি, আঙ্গুলের মাথা ছুঁয়ে আছে তার। আরেক পা সামনে বাড়বে কিনা ভাবল। দাপাদাপি করবে? বালুতে পা ঘষে শেষ করে দেবে জিনিসটাকে? বোকার মতো দোনোমনো করছে কেন বুঝতে পারল না সে। শক্ত আর উঁচু করে রেখেছে কাঁধদুটো, তবে নড়ল না জায়গা থেকে।

‘তুমি কি এখানেই ব্যাপারটা থামাতে চাও?’ জিজ্ঞেস করল সে। মুখ থেকে কথাটা বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে শাপান্ত করল প্রশ্নটা এভাবে করার জন্য।

‘কোন ব্যাপারটা?’ রুথ শুধাল, যন্ত্রণা ও খুশি দুটোই মিশে আছে তার হাসিতে।

‘এভাবে জেরা করার ব্যাপারটা! এই জেরা করা এবং হাস্যকর এই রেখা।’

‘আমাদের আলাপচারিতা খুব বেশি বিরক্তিকর মনে হলে এখন থামাতে পারি ওটা। যদি ঘরে ফিরতে চাও, যাও, মজা করে রাতের খাবার খাও। কিন্তু ঐ রেখাটির ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। ওটা হাস্যকর নয় এবং ওটার এপাশে আসার চেষ্টা করো না। সাবধান করে দিচ্ছি।’

‘তোমাকে শোধরানো সম্ভব না, জানো এটা?’

‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও, জানি।’

হতবুদ্ধি অবস্থার মধ্যেও রুথের উত্তরটির অকপটতা টের পেল হর্হে। হাঁটু গেড়ে বসে ফের জিনিসপত্র তুলতে শুরু করল, বিড়বিড় করছে নিচুগলায়। সঙ্গে থাকা ঝুড়ির ভেতরের সবকিছু বের করল এক এক করে। ত্বক তামাটে করার লোশনের বোতলগুলো সাজাল একাধিকবার, রাগী ভঙ্গীতে গোছাল পত্রিকাগুলো, তোয়ালেগুলো ফের ভাঁজ করল। চকিতের জন্য রুথের মনে হলো হর্হের চোখে অশ্রু দেখতে পেয়েছে। অবশ্য ধীরে ধীরে নিজেকে সুস্থির করতেও দেখল।

‘তুমি কি পরীক্ষা করছ আমাকে?’ রুথের চোখাচোখি তাকিয়ে প্রশ্ন করল হর্হে।

প্রশ্নটির নির্মম সরলতা হর্হের মহত্ত্বের ভাবটা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিয়েছে, রুথ লক্ষ করল। যেন সে ভুল করতে পারে, কিন্তু মিথ্যা বলবে না তার সঙ্গে; যেন যে কোনোভাবে বিশ্বাসভঙ্গ করতে পারে, পারে না কেবল বিদ্বেষ দেখাতে। তালগোল হারানো মানুষের মতো পায়ের কাছে তাকে বসে থাকতে দেখল রুথ। কাঁধ ঝুলে পড়েছে, ক’বছর আগের চেয়েও চুল কম মাথায়, চেনা চেনা, তবু অচেনা। হর্হেকে আঘাত করা ও আঘাত থেকে বাঁচানো একইসঙ্গে দুরকম তাড়নাই বোধ করল রুথ।

‘অন্যদের ওপর ছড়ি ঘোরাও তুমি,’ সে বলল, ‘কিন্তু সবসময় ভয়ে থাকো তোমার ভুলের বিচার করবে মানুষ। ব্যাপারটা দুঃখজনক, আমার কাছে।’

‘তাই নাকি? আহা কী গভীর চিন্তা! তোমার নিজের কী অবস্থা?’

‘আমার? কখনো স্ববিরোধিতা দেখেছ আমার মধ্যে? আমি কখন বুঝতে পারি যে আমার ভুল হয়েছে? সবসময়। বিশ্বাস করো। আসল কথা হচ্ছে আমি বোকা। সাহস নেই। হুকুম মেনে চলি। এমন একভাবে জীবন কাটাতে পারব বলে ভাবি যা আসলে পারব না। একথা যখন উঠলই, এর চেয়ে খারাপ যে কী আমি জানি না। হয়তো কয়েকটা ব্যাপার বুঝতে না পারা, বা বুঝতে পারা কিন্তু সে ব্যাপারে কিছু না করা। এ কারণেই দাগটা টেনেছি, বুঝেছ? হ্যাঁ, এটা ছেলেমানুষি। এটা নোংরা এবং তুচ্ছ। তবু গোটা গ্রীষ্মে যা যা করেছি তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রুথের পেছনে কোথাও হারিয়ে গেছে হর্হের দৃষ্টি, যেন রুথের কথাগুলোর গমনপথকে অনুসরণ করছে, বিরক্তি আর অবিশ্বাসের দোলাচলে হালকা দোলাচ্ছে মাথাটা। শ্লেষাত্মক একটা ভাব ফুটল চেহারায়, হাসতে শুরু করল সে। কাশির মতো শোনাল হাসিটা।

‘কী, কিছু বলবে না তাহলে? পাল থেকে সব বাতাস বেরিয়ে গেছে?’ রুথ বলল।

‘উল্টোপাল্টা আচরণ করছ তুমি।’

‘কথাগুলো উল্টোপাল্টা মনে হচ্ছে তোমার কাছে?’

‘জানি না,’ হর্হে বলল, সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘উল্টোপাল্টা হয়তো নয়, অহঙ্কারী।’

‘স্রেফ অহঙ্কারের ব্যাপার নয় এটি হর্হে, নীতির ব্যাপার।’

‘হুম। একটা কথা কি জানো, প্রচুর নীতিনৈতিকতা থাকতে পারে তোমার, যত খুশি বিশ্লেষণীও হতে পারো, ভাবতে পারো তুমি খুব সাহসী, কিন্তু আসলে যা করছ সেটা হচ্ছে একটা দাগের পেছনে লুকোচ্ছ। লুকোচ্ছ! কাজেই একটা উপকার করো আমার, মুছে দাও দাগটা, তোমার জিনিসপত্র নাও এবং চলো খেতে খেতে ঠান্ডা মাথায় আলাপ করি। দাগটা পার হচ্ছি আমি, দুঃখিত। সবকিছুরই সীমা আছে, আমার ধৈর্যেরও।’

ছেড়ে দেয়া স্প্রিংয়ের মতো উঠে দাঁড়াল রুথ, বিচ চেয়ারটা উল্টে পড়ল তার ধাক্কায়। দ্বিধায় ভুগছে হর্হে, এক পা-ও বাড়ায়নি এখনও।

‘সবকিছুর সীমা আছে, জানি আমি!’ চিৎকার করে উঠল রুথ। ‘এবং এটাও জানি, তুমি চাও আমি লুকিয়ে থাকি। কিন্তু অন্তত এবার আর নিজেকে ধাপ্পা দিও না। তুমি রাতের খাবার চাও না, চাও সন্ধি করতে। সেটা পাবে না, শুনছো? ততক্ষণ পাবে না যতক্ষণ চূড়ান্তভাবে মেনে নিচ্ছ, এ রেখা সেদিন মুছবে যেদিন আমি চাইব, যেদিন তোমার ধৈর্য শেষ হবে সেদিন নয়।’

‘তোমার গা জোয়ারি দেখে অবাক লাগছে। ওদিকে আবার এন্তার অভিযোগ করছ আমাকে নিয়ে। নিষেধ করছ তোমার কাছে যেতে। আমিতো এমন করছি না তোমার সঙ্গে।’

‘হর্হে, সোনা। শোনো,’ গলার স্বর নামিয়ে, কপালের ওপর পড়া চুলগুলোকে ঠিক করে নিয়ে চেয়ার সোজা করে ফের বসল রুথ। ‘আমি চাই মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোনো, ঠিক আছে? ব্যাপার এই নয় যে রেখা একটা। ব্যাপার হচ্ছে, রেখা দুটো। বুঝতে পেরেছ? সবসময়ই দুটো। তোমারটা আমি দেখতে পাই। অন্তত দেখার চেষ্টা করি। আছে ওটা, আমি জানি। কোনো না কোনো জায়গায়। তোমাকে একটা পরামর্শ দিই। আমার রেখাটা কেবল আমি বললে মুছবে, এ ব্যাপারটাকে যদি অন্যায় বলে মনে হয় তাহলে নিজেও একটা রেখা টেনে নাও। খুব সহজ। তোমার র‌্যাকেট দিয়ে। টানো একটা রেখা!’

গলা ছেড়ে হেসে উঠল হর্হে।

‘মজা করছি না আমি। তোমার নিয়মগুলো ব্যাখ্যা করো আমাকে। তোমার সীমারেখাটা দেখাও। বলো-এই দাগের এপাশে এসো না। দেখবে কখনো ওটা মোছার চেষ্টা করব না আমি।’

‘চালাকিটা দারুণ! অবশ্যই ওটা মুছবে না তুমি, কারণ জীবনেও ওরকম দাগ টানব না আমি। এমন কিছু করার কথা মাথাতেও আসবে না আমার।’

‘কিন্তু যদি টানো তাহলে কতদূর যাবে ওটা? আমার জানা দরকার।’

‘কোথাও যাবে না। কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না আমি। স্বাভাবিক আচরণ আমার পছন্দ। যেখানে খুশি সেখানে যেতে চাই। লড়াই করার মতো কিছু থাকলে তবেই শুধু লড়াই করতে চাই।’

‘আর আমি চাই তুমি তোমার ছোট্ট পৃথিবীটির বাইরে একটু তাকাও। সামান্য একটু শ্রদ্ধা করো কয়েকটা জিনিসকে,’ রুথ বলল।

‘তোমার কাছে আমার একমাত্র চাওয়া আমাকে ভালোবাসো তুমি,’ হর্হে বলল।

চোখের পলক ফেলল রুথ কয়েকবার। দু’হাত দিয়ে চোখ ডলল, যেন বিকেলভর তাকে ঘা দিয়ে যাওয়া সমস্ত ভেজা বাতাসকে মুছে ফেলতে চাইছে।

‘এর চেয়ে বাজে উত্তর দেয়া সম্ভব ছিল না,’ বলল সে।

দুঃখ আর বিস্ময়ভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল হর্হে। কাছে গিয়ে সান্ত্বনা দেবে কিনা ভাবল একবার; পরক্ষণেই ভাবল, ঠিক হবে না সেটা। শিরদাঁড়ায় যন্ত্রণা করে উঠল তার, ব্যথা করছে পেশীতে। সূর্যের গোলকটাকে গিলে নিয়েছে সমুদ্র। দু’হাতে মুখ ঢেকেছে রুথ। রেখাটির দিকে ফের তাকাল হর্হে, এক মিটারের চেয়ে লম্বা মনে হচ্ছে ওটাকে এখন।

------------------------------------------------------------------------------------------------
মূল গল্প: A LINE IN THE SAND by Andrés Neuman Translated from Spanish by Alison Entrekin


লেখক পরিচিতি:
আন্দ্রেস নিউম্যানের জন্ম ১৯৭৭ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে। বর্তমানে বসবাস করছেন স্পেনের গ্রানাডায়। বাইশ বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস ‘বারিলোচে’ প্রকাশের পরই সাহিত্যামোদীদের নজরে আসেন নিউম্যান। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণ সাহিত্য, প্রবন্ধ-সাহিত্যের সব শাখাতেই সমান স্বচ্ছন্দ। স্প্যানিশ ভাষাভাষী প্রতিশ্রুতিন লেখকদের মধ্যে আছেন নিউম্যান আছেন সম্মুখসারিতে। সাহিত্যিক তেজু কোল-এর মতে, ‘এ সময়ের অপরিহার্য লেখকদের একজন হয়ে ওঠা নিউম্যানের নিয়তিনির্দিষ্ট।’ কবিতার জন্য হাইপেরিয়ন পুরস্কার, আলফাগুয়ারা পুরস্কার, স্প্যানিশ ন্যাশনাল ক্রিটিকস পুরস্কার পেয়েছেন। ইংরেজিতে অনূদিত তাঁর ‘ট্রাভেলার অব দ্য সেঞ্চুরি’ (এল ভায়াজেরো ডেল সিগলো) উপন্যাসটি তালিকাভুক্ত হয়েছিল বেস্ট ট্রান্সলেটেড বুক অ্যাওয়ার্ড, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফরেন ফিকশন অ্যাওয়ার্ড ও ইন্টারন্যাশনাল ডাবলিন লিটারেরি অ্যাওয়ার্ডের জন্য। ছোটগল্পের সংকলন ‘দ্য থিংস উই ডোন্ট ডু’ লাভ করেছে ফায়ারক্র্যাকার অ্যাওয়ার্ড ফর ফিকশন। এ পর্যন্ত বাইশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে আন্দ্রেস নিউম্যানের সাহিত্যকর্ম।

 

অনুবাদক পরিচিতি:

মোস্তাক শরীফ

কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক।

শিক্ষকতায় নিযুক্ত আছেন। ঢাকায় থাকেন।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন