সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

শাশ্বত গাঙ্গুলী'র গল্প : গন্ধ



(১)

আপনার পায়ে পড়ছি ডাক্তারবাবু, দয়া করে আমাকে বাঁচান। হাউ হাউ করে নাকের জল মুখের জল বের করতে করতে আমি প্রায় ডাক্তারের পায়ে পড়তে গেলাম। ডাক্তারবাবু সবে দরজা ঠেলে ঢুকছিলেন, নাক কুঁচকে চট করে দু পা পিছনে সরে গেলেন। কী একটা বললেন, আমি ঠিক বুঝে উঠলুম না। বোধহয় বুঝতে পারলেন উনি। জার্মানের বদলে এবার ইংরিজিতে বললেন, "পিছনে উঠে বসুন শান্ত হয়ে। একটু জল খান।"
আমি একটু নিজেকে সামলে নিলাম। কোটের প্যান্টটা ধুলোয় ধুলাক্কার হয়ে গেছে। একটু ঝেড়ে আবার নিজেকে খানিক জোর করে শান্ত করে চেয়ারে উঠে বসলাম। পাশের টেবিলে জল ছিল। ঢক করে একঢোক খেয়ে নিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমার বড় তাড়াতাড়ি গলা শুকিয়ে যায় আসলে।

ঠাণ্ডা জলটা গলায় পড়তে একটু শান্ত হলাম। একটু লজ্জা লজ্জা লাগতে লাগল। আসলে এতক্ষণ বসেছিলাম, ডাক্তারবাবু আসতে আর ঠিক নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি। এই গত কদিনের উৎকণ্ঠা সব কেমন একসঙ্গে বেরিয়ে এসেছে অসংলগ্ন কথার মতো।

"দেখুন মিঃ...”
"গাঙ্গুলী।"
"গ্যাংগুলি।" ডাক্তারবাবু একটু অনভ্যাসের হোঁচট খেতে খেতে কথাগুলো জিভ নাড়িয়ে আউড়ে নিলেন।। তারপরে সামনে ঝুঁকে বসলেন, "দেখুন মিস্টার গ্যাংগুলি, আমি অতটা ভালো ইংরিজি বলতে পারি না। তবে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। আপনার প্রাথমিক রিপোর্টটা আমি দেখেছি, রক্ত পরীক্ষার ফল না আসা অবধি বাকি কিছু বলতে পারছি না। আমার প্রাথমিক ধারণা এটা কোনো একটা থার্ড ওয়ার্ল্ড ডিজিজ হতে পারে। আপনি সম্প্রতি ভারতবর্ষে গেছিলেন তো?”

"হ্যাঁ ডাক্তারবাবু, এই তো এক সপ্তা হল ফিরেছি। গেছিলাম বলতে তেইশ দিনের জন্য, তবে একদম সব ঠিকঠাক জায়গাতেই ছিলাম কিন্তু -”

ডাক্তারবাবু নাক কুঁচকে একটা হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিলেন। "অ্যানা, জানলাটা একটু খুলে দে তো। কেমন বদ্ধ লাগছে ঘরটা"

অ্যানা, অর্থাৎ ডাক্তারবাবু যাকে ডাকছিল, সে এতক্ষণ দরজার ধারে চুপ করে দাঁড়িয়ে নাক খুঁটছিল। ভেবেছিল বোধহয় এখানে বসে আমি নজর করিনি। তা সেরকম ভাবে করিনি তা একরকম ঠিকও বটে। এরকম মরণ বাঁচন অবস্থায় কি আর অন্যদিকে নজর যায়? তাও ওই অভ্যাসের বশেই যেটুকু। তন্বী চেহারা, সোনালি চুল, নাকের দুটো ফুটোর মাঝখানের পাতায় একটা নথ পরা - বেশ একটু চোখ যাবে না? মানে অভদ্রতামোর মতো কিছু না - অশিক্ষিতের মতো হাঁ করে তাকিয়ে থাকব সেরকমও না কিন্তু -

"হ্যাঁ মিস্টার গ্যাংগুলী - বলুন এবার।"

আমি আবার গ্লাসটা টেবিল থেকে তুলে জল খেলাম। অ্যানার থেকে চোখ ফিরিয়ে একবার ডাক্তারবাবুর দিকে দেখলাম। ডাক্তারবাবুকেও আদতে বেশ সুন্দরী দেখতে, জার্মান মেয়েরা এমনিই দেখতে একটু সুন্দরী হয়। একটু ক্লান্ত, কেমন ঘন বাদামী চুল যত্ন নেন না বটে হয়তো সময় পান না কিন্তু একটা খামখেয়ালী ব্যাপার রয়েছে।

গ্লাসের জল শেষ হয়ে গেছে। গ্লাসটা নামিয়ে আমি মাথা ঝাঁকালাম একবার। হ্যাঁ আমি প্রায় ত্রিশ বছরের যুবক বটে মন সোজা রাখা নিতান্তই দায় কিন্তু না এখন ঠিক ঠিক ব্যাপারটায় মন দিতে হবে। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম, হ্যাঁ ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল একটা মাছি দিয়ে।
“মাছি?”

(২)

হ্যাঁ, নিতান্তই ভনভনে একটা মাছি।

ডাক্তারবাবু আমার কথা শুনে খানিক হাঁ করেই তাকিয়েছিলেন বটে, কিন্তু আমিই বা কি বলি? রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এ কথাই ভাবছিলাম। ডাক্তারবাবু নাহয় আমাকে ভাগিয়ে দিলেন, তারপরে অ্যানাকেও জার্মানে কি একটা বললেন দুজনেই বেশ মুখ টিপে হেসে উঠল। কিন্তু আমিই বা কি বলতাম? যা সত্যি, তা না বলে কি মিছিমিছি বানিয়ে বলতাম?

গত সপ্তায়, বা আরো ভালো করে বললে ঠিক তিনদিন আগে শুক্রবার আমি সুপারমার্কেটে বাজার করছিলাম। সবে তিন চারদিন হল কলকাতা থেকে ফিরেছি, বুমি একখানা লম্বা ফর্দ ধরিয়ে দিয়েছে বাজার করে আনবার জন্য। দিনখানা বেশ মনে আছে, বাইরে ভ্যাপসা গরম একটা অবস্থা। গাছের পাতা নড়ছে না, এক ফোঁটা হাওয়া পর্যন্ত নেই। সুপারমার্কেটের ভিতরে অবশ্য কিচ্ছুটি বোঝার জো নেই, বেশ এসির ফুরফুরে হাওয়া আসছে, ঝকঝকে তকতকে সব। কলকাতার মত নয়, বাড়ি ফিরলেই ভ্যাপসা গরমে ওই নোংরা বাজারে - মা গো!

যাইহোক, তাই এহেন সুন্দর সাজানো তকতকে বাজারের ভিতর মাছিটাকে দেখে তাই অবাকই হয়েছিলাম। ক্যাশ কাউন্টারের পাশে একটা থামের উপর বসে কেমন নিশ্চিন্তে নড়ছে, পা ঘসঘস করছে। আমি যখন এই সুন্দর সাজানো সুপারমার্কেটের মধ্যে এই একফোঁটা চোনা মাছিটাকে খানিক বিস্ময়ের সঙ্গেই দেখছিলাম, তখনই আমার নাকে এল গন্ধটা।

গন্ধ? হ্যাঁ, গন্ধ। প্রথমটায় খুব মৃদু, যে অবস্থায় ঠিক ভালো না খারাপ গন্ধ বলে ওঠা যায় না, নাক টেনে জোরে ঘ্রাণ নিয়ে বিচার করতে ইচ্ছে করে গন্ধটা ভালো না খারাপ, ভিজে বগলের ঘামের বন্ধ না পরোটাগলির কাবাবের গন্ধ?

অবশ্য এই জানা না জানা অবস্থাটা স্থায়ী হল কয়েক মুহূর্তই মাত্র। তারপরেই প্রায় বমিতে সকালের ভাত উঠে আসবার মতো অবস্থা। নাক বন্ধ করে মুখ দিয়ে শ্বাস নিয়ে নিতে নিতে ঘুরে বিশেষ কষ্ট না করেই অবশ্য দেখতে পেলাম এই গন্ধের উৎস কোথায়, বা আরো ভালো করে বললে কে - সেই সাক্ষাৎ মৎস্যগন্ধা সত্যবতীকে। তা তিনি একজন মহিলা, গৃহহীন বা চলতি ভাষায় এখানের লোকেরা যাকে বলে "হোবো"। বাদামি চামড়া, তাপ্পি দেওয়া প্যাণ্ট, গরমকালেও জামার উপরে চাপানো অনেকগুলো নোংরা জ্যাকেট, মাথার চুল উসকোখুসকো যত্নহীন, সঙ্গে একটা গুচ্ছের প্লাস্টিকের ব্যাগ। তা এই মূর্তিমান মৎস্যগন্ধা, তিনি সুপারমার্কেটে ঢুকেছেন, কিছু একটা কিনেছেন এবং এখন আমি যে ক্যাশ কাউন্টারের লাইনটায় দাঁড়িয়েছি ঠিক তার পাশের কাউন্টারটায় এসে দাঁড়িয়েছেন।

আর এমনভাবেই দাঁড়িয়েছেন যে তাঁর আশেপাশের লোকরা আর কেউই ঠিক কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এমনিতে জার্মানরা খুব ইংরিজিতে যাকে বলে প্যাসিভ অ্যাগ্রেসিভ জাতি - সরাসরি মুখের উপর কথা বলে না। বরং খুবই বিতৃষ্ণার সঙ্গে বেশ একটা দুর্বাসাসুলভ 'এই ভস্ম করে দেব' দৃষ্টিতে কটমট করে তাকিয়ে থাকে। তা এই সত্যবতী মৎস্যগন্ধাকে দেখে, বা বলা ভালো, শুঁকে বোধহয় আর সেই কটমট করে দৃষ্টিতেও যথেষ্ট হচ্ছে না। আমি দিব্যি দেখলুম বেশ কয়েকজন মানে মানে ওই লাইনটা থেকে এদিক ওদিক সরে পড়ল।

আমার কাউন্টারে যে জার্মান মহিলাটি ছিলেন তিনি কাউন্টারের তলা থেকে একটা সুগন্ধীর বোতল বের করে একবার নাড়িয়ে চারদিকে স্প্রে করে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে চারদিকটা বেশ একটা লেবু লেবু গন্ধে ভরে গেল। কাউন্টারের মহিলাটির জামার ট্যাগ বলছে তাঁর নাম অ্যানিকা, তা অ্যানিকা একবার তাঁর স্বভাবসিদ্ধ জার্মান স্বভাবে কটমট করে একবার পিছনের কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে তারপরে ফিরে আবার আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে একটা প্রশ্রয়ের হাসি দিলেন।

মানেটা পরিষ্কার। "কোথা থেকে যে আসে এরা সব...” খানিক স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে, খানিক শোনানোর মত করে বলে উঠলাম। একবার নাক কুঁচকানোর ভঙ্গি করে হাসিটা ফেরত দিলাম।

একটা অদ্ভুত কুণ্ঠা আমার মধ্যে চেপে বসছিল, মৎস্যগন্ধার বাদামী চামড়া মুখের গড়ন দেখা ইস্তক ভাবছিলাম আমার সামনের এই অপরিচিত মহিলাটি আমাদের এক গোত্রে ফেলে দেবেন না তো?

তা দেন না। অ্যানিকার প্রশ্রয়ের হাসি জানান দেয় আমি ভালো বিদেশী। ফুরফুরে লেবুর গন্ধের মধ্যে হাত ঝাপটিয়ে একলা মাছিটাকে তাড়াতে তাড়াতে ব্যাগে জিনিসপাতি ভরে সুপারমার্কেট থেকে বেরিয়ে আসি।

(৩)
"আজকে জানিস সুপারমার্কেটে কী হয়েছে?” বাড়ি ঢুকে বাজারের ব্যাগ নামিয়ে জুতো খুলতে খুলতে বললাম আমি। বুমি কোমর বেঁধে ঘর ঝাড়পোঁচ করছিল। আমি ইণ্ডিয়া থেকে ফিরেছি সেই আনন্দে বন্ধুদের আবদারে কাল সন্ধেবেলা পার্টি দিচ্ছি বুমি আর আমি, তারই প্রস্তুতি আরকি। আমি ফিরেছি দেখে দরজার কাছে এসেই এক ধাক্কায় খানিকটা ছিটকে সরে গেল। "উফ মা গো কত ঘেমেছিস রে রাস্তায়? গা থেকে কীরকম গন্ধ বেরোচ্ছে তা দেখা হয়েছে?”

আমি জুতো খুলে কান এঁটো করা অসভ্যের মতো হাসি দিলাম, "আয় না, কাছে আয়।"

"ইউ আর সাচ আ পিগ। যা গিয়ে স্নান কর।" জার্মানি আসা ইস্তক বুমি আজকাল কথায় কথায় বেশ ফটর ফটর ইংরিজি বলে। বা হয়তো তার আগেও বলতো, আমি কি আর দেখতে গেছি? সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়া মেয়ে, একটু ইংরিজি বলবে তাতে আর আপত্তি থাকতে পারে কি? আপত্তি তুলেছিল অবশ্য আমার মা, বলেছিল কুল গোত্র সবই তো ভালো বাবু, কিন্তু এত সব বেশিবেশি পড়াশুনা করে এসেছে তো - , বাকিটা আর শেষ করেনি। আমি তো ছবি দেখে চ্যাটে কথা বলেই কাত, কাজেই "তুমি আর তোমার যত সব সেকেলে ধারণা" বলে দাবড়ে আর বাকিটা এগোতে দিইনি।

সেও প্রায় বছরখানেক আগের কথা। এক বছর মতন বিয়ে হয়েছে, কাজেই ঠিক সদ্যবিবাহিত আর বলা না গেলেও এখনো বেশ একটা টাটকা সুবাস আছে গোটা ব্যাপারটায়। কেউ হাঁ হাঁ করে উঠবার আগেই তবে বলে দি, বুমি কোনো মঙ্গলগ্রহের নাম নয়, দস্তুরমত বর্ধমানের কুলীন ব্রাহ্মণনাম - ভূমিসুতা ব্যানার্জী। জার্মানি আসা ইস্তক অজস্রবার নামের উচ্চারণ ব্যাখ্যা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ভূমিসুতা শেষ অবধি প্রথমে ভূমি, তারপরে জার্মান উচ্চারণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বুমিতে পর্যবাসিত হয়েছে। আর আমারও এমন অভ্যেস হয়ে গেছে যে আমিও এখন বুমি বুমি বলা শুরু করে দিয়েছি।

বাজারের ব্যাগ তুলে স্নান করতে গেলাম। জামা খুলে বগল তুলে শুঁকে দেখলাম, সত্যি বুমি ভুল কিছু বলেনি। একটা বিশ্রী পচা গন্ধ বেরোচ্ছে এতক্ষণ রোদ্দুরে ঘুরে ঘুরে। অনেকটা আজকের সুপারমার্কেটের ওই...দৃশ্যটা মনে ভেসে উঠতেই গা টা কেমন ঘিনঘিন করে উঠল। তাড়াতাড়ি জামাটা খুলে ফেললাম। কনুইইয়ের কাছের চামড়ায় কিছু লেগে আছে কি? কীরকম একটা কুঁচকে গেছে যেন চামড়াটা - হবে নির্ঘাত নোংরা লেগেছে, সাবান ঘষলেই চলে যাবে। শাওয়ারটা চালিয়ে দিলাম, চালিয়ে জলের ধারার তলায় দাঁড়াতেই -

"কি, বাজার হল?” চমকে উঠলাম আমি। স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় একটা হাত নীচের দিকে চলে গেছিল, সেইটা সরিয়ে বেজার মুখে বললাম, "ও, তুমি।"

"হ্যাঁ আমি। আমি, শাশ্বত গাঙ্গুলী।"

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সাবানটা তুলে বগলে ঘষতে লাগলাম। খানিকক্ষণ সব চুপচাপ। তারপরে শাওয়ারের পর্দার ওপার থেকে আবার আওয়াজ এল, "আজকে সুপারমার্কেটে কাজটা কি ভালো হল?”

"কী কাজ? আমি তো কিছুই করিনি। বাজার করেছি, সোজা বাড়ি চলে এসেছি।"

আধা স্বচ্ছ শাওয়ারের পর্দার ওপারে কালো অবয়বটা খানিক সরতে লাগল। গরম জলের ধোঁয়ায় গোটা বাথরুমটা ভরে গেছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলাম একটা আঙুল বাথরুমের আয়নাটার গায়ে দাগ কাটছে। আমি আবার বগল সাফ করায় মন দিলাম। আবার খানিকক্ষণ সব চুপ। আমি সাবান ছেড়ে মাথায় শ্যাম্পু করা শুরু করেছি ইতিমধ্যেই।

"কী পাও এই ভালো বিদেশীর তকমা গায়ে মেখে?”

আমার হাতের ধাক্কা লেগে শ্যাম্পুর বোতলটা পড়ে গেল। কথাটা শুনে শ্যাম্পু না ধুয়েই চোখ খুলে ফেলেছি, চোখ জ্বালা করছে তাইতে। বাঁ হাতের কনুই দিয়ে চোখ ঘষতে ঘষতে পর্দাটা সরালাম। কিছু একটা কড়া কথা বলব মনে মনে স্থির করে। কিন্তু পর্দার ওপারে ততক্ষণে আর কেউ নেই, গোটা বাথরুমটাই ফাঁকা।

(৪)

কলকল করে লোক আসা শুরু করে দিয়েছে। মৃদু স্বরে জ্যাজ বাজছে। আমি দু হাতে করে ওয়াইনের পানপাত্র নিয়ে ছুটছি, এর হাতে ওর হাতে দিচ্ছি। ইংরিজি হিন্দি মিশিয়ে হালকা আলাপ গল্প চলছে। "ইণ্ডিয়া কেমন ঘুরলে? ম্যারেড লাইফ কেমন লাগছে?” ভালো, ভালো, সবের উত্তরই ভালো।

বুমির আর যাই হোক, বাড়িটাকে সাজিয়েছে বড় সুন্দর করে। প্রথম যারা এসেছে সবাই বেশ চমৎকৃত হয়ে প্রশংসা করছে। বাহারি লাইটিং, নিজেহাতে বাছা ফার্নিচার, ক্যাটালগ থেকে তুলে আনা ইন্টেরিয়র ডিজাইন। আসলে এই নতুন চাকরিটা পাওয়ার আগে তো অঢেল সময় ছিল, কী আর করবে ঘরে বসে বসে? খরচ করে, সুন্দর করে সব সাজিয়েছে।

"হোয়্যার ইজ ইয়োর ওয়াইফ?” কলিং বেল শুনে দরজাটা খুলেই খানিক কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। এরা নিশ্চয় বুমির নতুন অফিসের কলিগ, আর এই কায়দা করে যে লোকটা জার্মান এক্সেন্টে বলল, ওই জশ না কী বেশ নাম? মুখে জোর করে একটা হাসি এনে অভ্যর্থনা জানালাম, বারান্দার দিকে বুমির দিকে দেখিয়ে দিলাম। এখন আমার ওইদিকে যাওয়া চলবে না।

কেন চলবে না? আসলে গোটা ব্যাপারটাই একটু বোকাবোকা। রাগলে আমার এমন মাথার ঠিক থাকে না, তখন কী যে বলে ফেলি মুখ ফসকে -

খানিকক্ষণ আগে, পার্টি শুরু হব হব করছে সব প্রস্তুতি শেষ, কী কুক্ষণে আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আজ কে কে আসবে তোর অফিস থেকে?”

দুজনে মিলে রান্নাঘর থেকে চিনামাটির প্লেটে ফল চিজ বয়ে আনছিলাম। বুমি আমার চোখটা খানিক এড়িয়েই বলল, "কৃত্তিকা, ইসাবেলা, সুসানা আর...জশ।" শেষেরটা যেন খানিক ঠিক চিন্তা না করেই শেষপাতে ঠেলে দেবার মতো।

না, রাগ আমি করিনি। খুব শান্ত গলায় স্থিরকণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছি, "জশ? যে জশ তোকে যেচে কফি খাওয়াতে নিয়ে যায়, দিয়ে পয়সা দিতে দেয় না? যে জশ তোকে স্রেফ 'বন্ধুত্বের' খাতিরে রোলার স্কেটিং করতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল?”

"কী বলতে চাইছিসটা কী! হোয়াট আর ইউ ট্রাইং টু ইমপ্লাই!”

“এত পড়াশুনা করেছিস, আর এই সোজা কথাটা বুঝতে পারছিস না?”

"আমার ছেলে বন্ধু থাকলেই তোর গা জ্বলে কেন রে? নাকি আমার চাকরিটাই সহ্য হয় না? তাহলে আমাকে ছেড়ে কোনো গাঁইয়া মেয়েকে বিয়ে করতে পারতিস, সে এসে তোর পা ধরে বসে থাকত! আর বন্ধুর কথা বলছিস! তুই কলকাতায় ফিরে কী করিস -”

ঝনঝন করে একটা শব্দ। বুমি হাউমাউ করে উঠল। "আমার সাধের চায়না! এক্ষুণি লোকজন আসবে, কী করছিস তুই এটা? কে পরিষ্কার করবে এখন এইসব?”

একটা মৃদু হাসি খেলে যায় আমার মুখে। "তোর সাধের জশকেই নাহয় বলিস পরিষ্কার করতে।"

এরকম ঝগড়া আমাদের মাঝেমধ্যে হয়। সাধারণত বুমি হয় কাঁদতে শুরু করে, নয়তো রাগে উল্টোপাল্টা বলতে শুরু করে। কিন্তু আজকে বুমি আমার কথাটা শেষ কথাটা শুনে একদম চুপ করে গেল। চুপচাপ হাঁটু গেড়ে বসে ভাঙা চিনেমাটির টুকরো কুড়োতে লাগল। আমি এরকম অপ্রত্যাশিত ব্যাপারে খানিক অবাকই হলাম বলতে পারি, জোর করে আরো একটু খোঁচানোর জন্যেই বললাম, "কী রে, মুখে বাক্যি সরছে না কেন?”

বুমি তাও কিছু বলল না। এবার আমার একটু ভয় ভয় লাগতে লাগল। আজ হয়তো একটু বেশিই বলে ফেলেছি। আসলে রাগ হলে সবসময় কি অত মাথার ঠিক রাখা যায়? বুমির কাঁধে আলতো একটা হাত রাখলাম, "এই বুমি।"

বুমি শক্ত হয়ে গেল। খুব আস্তে আস্তে নীচু গলায় বলল, "ডোন্ট টাচ মি। আই ক্যান নট লুক অ্যাট ইউ রাইট নাও। আজ সন্ধেবেলা তুই আমার সামনে আসবি না, কথা বলবি না। মিষ্টি করে হাসবি, লোকজনের সঙ্গে ভদ্রতা করবি, আর আমাকে এড়িয়ে চলবি। বুঝেছিস? এবার সরে যা এখান থেকে।"

আমি আর কথা না বলে সরে আসি। এখনও তাই মনে মনে যতই ঘুষি মেরে ওই সাদা নাকটা ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছা করুক, জশকে বারান্দার দিকে দেখিয়েই ক্ষান্ত দিলাম। আসলে বুমির এরকম মূর্তি আমি কোনোদিন দেখিনি। ঠিকাছে, আজকের মতো নাহয় বুমিরই জিত হোক। মাথার মধ্যে একটা কাঁটা খচখচ করতেই থাকে, তাও জোর করে তার থেকে মন ঘোরাই। বাড়িতে ত্রিশ জন অতিথি। তাদের সবার পানের, খাবারের তদারকির দায়িত্ব করতে হবে।

গলার কাছটা কেমন দমবন্ধ লাগছে। স্যুটটা পরেছি বলেই হয়তো বেশিই গরম লাগছে? গলার একটা বোতাম আলগা করলাম, মুখে একটা হাসি টেনে আবার পানপাত্র নিয়ে এর হাতে ওর হাতে দিতে লাগলাম। ছেঁড়া ছেঁড়া হিন্দিতে ইংরিজিতে কথা ভেসে আসছে এদিক ওদিক থেকে।

"চীন উইঘুরদের নিয়ে কী করছে দেখেছেন? জাস্ট হরিবল...”

"হ্যাঁ আমি আর সুসানা তো গতবারে মরক্কোয় ঘুরে এলাম। এত সুন্দর দেশটা, কিন্তু কি পভার্টি...”

একবার উঁকি মারতে বারান্দার কাছ থেকে ঘুরে এলাম। বুমি ওর অফিসের কলিগদের সঙ্গে হেসে হেসে গল্প করছে। "আই অ্যাম সরি, কিন্তু বর্ধমান কিন্তু পুরো গ্রাম...” বুমির কলিগ কৃত্তিকা খাস দক্ষিণ কলকাতার মেয়ে, সে প্রায় লুটিয়ে পুটিয়ে হেসে বলছে। ততক্ষণে আবার খানিক সরে এসেছি, বুমির মুখটা দেখতে পেলাম না অবশ্য, দরজায় ঢাকা পড়ে গেছে। আবার চট করে ঘরের অন্যদিকে সরে এলাম।

"...দেখো ইণ্ডিয়ার আসল সমস্যা হচ্ছে রিজার্ভেশন সিস্টেম। আরে এই তো গাঙ্গুলী! আমি ঠিক বলছি কিনা বলো? যোগ্য লোককে যোগ্য জায়গায় না বসিয়ে কখনও দেশের উন্নতি সম্ভব?”

আমার নাম শুনে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। আমার অফিসের কলিগ চতুর্বেদী তার আইরিশ প্রেমিকা আর অচেনা কোনো একটা হরিণনয়নী বাদামী চুল জার্মান মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। মেয়েটা কে? কার সঙ্গে এসেছে? আমার সঙ্গে আলাপ করিয়েছে কেউ নিশ্চয়, কিন্তু আমার কিছুই মনে পড়ছে না, বরং মাথাটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে। মুখের হাসিটা এখনও সাঁটা রয়েছে তো?

সব খানিকক্ষণ চুপচাপ। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে কেন? আমাকে কি কিছু বলতে হবে?

"মিস্টার গ্যাংগুলী, আপনি ঠিক আছেন?” শেষে হরিণনয়নীই খানিক চিন্তিত গলায় নিস্তব্ধতা ভাঙল। "আপনি দরদর করে ঘামছেন কিন্তু।"

"না না ঠিক থাকবে না কেন। আর দুপাত্তর দরকার শুধু, কি বল গাঙ্গুলী?” চতুর্বেদী বেশ একটা বিরাশি সিক্কার চাপড় চাপায় আমার কাঁধে। আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল। কাঁধে চাপড় লেগে মনে হল পড়েই যাব এবার। হেঁ হেঁ করে একটা ছুতো দিয়ে কোনোরকমে সরে এলাম।

অস্বাভাবিক গরম লাগছে। আর গোটা ফ্ল্যাটটাই কী বদ্ধ। জানলা খোলা, বারান্দার দরজা খোলা, তাও এরকম বদ্ধ লাগছে কেন? বদ্ধ হাওয়ার মধ্যে ঘাম, সুগন্ধী, প্রসাধন, মাস্কারা সবের গন্ধ মিশে কেমন একটা বিশ্রী পচা গন্ধ ঘরের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে যেন। অনেকটা সেই -
ঝনঝন।
আমার হাত থেকে একটা ওয়াইনের গ্লাস পড়ে গেছে। ঘরের সবাই কথা থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সব চুপচাপ, ছুঁচ পড়া নিস্তব্ধতা চারদিকে, এমনকি জ্যাজের রেকর্ডটা পর্যন্ত থেমে গেছে। "সরি" আমি এক হাত দিয়ে কপালটা মুছলাম, দেখলাম ব্লেজারের হাতাটা পুরো সপসপে ভিজে গেল। "সরি” আমি আবার বললাম, "আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি। জাস্ট হাত থেকে পড়ে গেল।"

কেউ একজন কাগজের রোল নিয়ে এসেছে, মাটি থেকে ভাঙা কাঁচের টুকরো তুলছে। বাকি সবাই আবার নিজের কথায় ফিরে গেছে। "এক্সকিউজ মি" আমি কোনোরকমে বিড়বিড় করে বললাম। যে লোকটা কাঁচের টুকরো কুড়াচ্ছিল সে মাথা তুলেও তাকাল না। "এক্সকিউজ মি" আমি আবার খানিক পিছোতে পিছোতে বললাম। হাত থেকে অন্য পানপাত্রটা নামিয়ে রেখে ঘর থেকে বেরোলাম। আর একটুক্ষণও আমি এই ব্লেজারটা এই জামাটা পরে থাকলে এবার নির্ঘাত দমবন্ধ হয়েই মরে যাব। হোঁচট খেতে খেতে কোনোরকমে বাথরুম অবধি পৌঁছে ঢুকে বেসিনে হড়হড় করে একদলা বমি করে দিলাম। খানিকটা জল মদ চিজের টুকরো মেশানো বমি বেরিয়ে এল। বমিটা জল দিয়ে ধুতে ধুতে ব্লেজারটা কোনোরকমে খুলে ফেললাম। তারপরে জামাটাও। কল খুলে মাথায় মুখে গায়ে খানিক ঠাণ্ডা জল দিতে একটু শান্ত হলাম। আঁচলে ভরে খানিকটা জল মাথায় দিলাম। তারপরে চোখ খুলে আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখে তারপরে পিছনের দিকে তাকিয়ে বিস্বাদের সঙ্গে বলে উঠলাম, "তুমি! কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছ এখানে?”

বাথরুমের দূরের অন্ধকার কোণা থেকে অবয়বটা খানিক এগিয়ে এল। খানিক চুপ করে থেকে বলল। "হ্যাঁ, আমি।"


(৫)

গলাটা প্রায় একটু দুঃখী শোনাল কি? তা শোনাক, তাতে আমি কি করব? "কী চাই তোমার?” খানিক রূঢ় গলাতেই জিজ্ঞেস করলাম।

"চাই?” উল্টোদিকের গলাটা খানিকটা থমকাল যেন। তারপরে ভেবে উত্তর এল, "না, চাই বিশেষ কিছুই না।"

আবার খানিকক্ষণ চুপচাপ। কোণার পিসোয়াতে খানিক হিসির শব্দ, তারপরে জল ফ্লাশের আওয়াজ। কালো অবয়বটা আবার নড়ে নড়ে আমার দিকে খানিকটা এল। "আচ্ছা ওই ঘরে তোমার বন্ধু কজন আছে?”

"কজন মানে? বেশিরভাগই তো আমার বন্ধু। আর বাকিরা হয় বুমির বন্ধু, নয়তো কারোর সঙ্গে এসেছে।"

"তাই? আচ্ছা বেশ, তাই নাহয়।"

আমি কিছু বলি না। গলার স্বরটা হঠাৎ পাল্টে মৃদু হয়ে যায়। "আচ্ছা তোমার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত কবে মনে আছে?”

"তা থাকবে না কেন?” আমি হেসে ফেলি। "আমি আর বাবুন মিলে গরমের ছুটিতে জামরুল চুরি করছিলাম। মা জানতে পেরে খুব মেরেছিল, এক সপ্তা বাড়ি থেকে বেরোতে দেয়নি। তখনই তো...”

"তুমি ভারী কল্পনাপ্রবণ ছিলে, সারাক্ষণ আজগুবি ভাবতে।"

"তা ভাবতাম।"

"বলতে উপন্যাস লিখবে, বাংলায়, ইংরিজিতে।"

"তা বলতাম।"

“তুমি আর বাবুন খুব বদমাইশি করতে একসঙ্গে। ফল চুরি, লোকের বাড়ির কাঁচ ভাঙা কত কাণ্ড! যেমন ঝগড়া, তারপরে আবার তেমনি গলায় গলায় মিল -”

"জোড়া বাঁদর, বাবলুস্যার বলত। কেমন আছে বাবুন কে জানে? কলেজের পর থেকে আর কথা হয়নি। শেষ শুনেছিলাম চাকরি ছেড়ে দিয়েছে, একটু পাগল পাগল হয়ে গেছে নাকি।"

আবার সব চুপচাপ খানিকক্ষণ। গলাটা প্রায় আরেকটু কোমল হয়ে আসে কি? "শেষ কবে লিখেছিলে মনে আছে?”

"ক্লাস ইলেভেন। প্রেমে পড়ে। জয়েন্টের পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে। খুবই খাজা লিখতাম।"

"তা লিখতে। তবু লিখতে।"

"তবু লিখতাম, তা ঠিক।"

"কবিতা পড়তে ভালোবাসতে। বাংলা কবিতা।"

"বাসতাম। এখনও বাসি। এত ব্যস্ততাতেও এই একটা অভ্যেস রয়ে গেছে, ফাঁকে ফাঁকে। সুযোগ পেলে।"

"আগের থেকে অনেক কম যদিও।"

"তা ঠিক। সময় কই। কাজের যা চাপ অফিসে। আর সামনের মাসেই রিটায়ারমেন্ট আছে একটা, এত্ত অফিস পলিটিক্স তাই নিয়ে, কে প্রোমোশানটা পাবে। আমি না পেলে কেরিয়ারটা সত্যিই স্ট্যাগন্যান্ট হয়ে যেতে পারে। সেই নিয়েই চিন্তায়।"

সব খানিক চুপচাপ। আবার পিসোয়ার পাশ থেকে গলার স্বর ভেসে আসে, এইবারে আরোই কোমল, কষ্ট করে শুনতে হয়। "তুমি অনেক বদলে গেছ, গাঙ্গুলী।"

"তা হয়তো বদলেছি। উপায় কী? হাওয়ায় ভেসে কি চলা যায় সারাটা জীবন?"

"কলেজের বামপন্থী থেকে এখন কর্পোরেটের চাকর। চতুর্বেদীর অন্যায় কথা শুনে নীরবে মাথা নাড়াও।"

"চতুর্বেদী আমার প্রোমোশানের জন্য পুশ করছে। বিনা কারণে ওর সঙ্গে ঝামেলা করে লাভটা কিছু হবে? আর জীবনটা কি এতই সহজ? চাকরি না পেলে মাইনে না পেলে কীকরে চলবে? বাবা মাকে মাসের মাইনে থেকে টাকা না পাঠালে তাদের কীকরে চলবে? দুদিন পরে বুমির বাচ্চা হলে কীকরে চলবে? এত বেছেবুছে কি জীবন চালানো যায়?” আমি বাথরুমের মেঝেতে বসেছিলাম। উঠে পড়লাম। জামাটা গায়ে দিয়ে হাতে মুখে জল দিয়ে বেরোতেই হবে। বাইরে কে কী ভাবছে, বুমি একা কীকরেই বা সব ম্যানেজ করছে?

জামাটা আবার গায়ে দেবার জন্য তুলতে গিয়ে নিজের ডানহাতের দিকে চোখ পড়তেই প্রায় চিৎকার করে উঠলাম। কনুইয়ের কাছে নোংরা লেগেছে ভেবেছিলাম যেইখানটায়, সেই দাগটা আরো বেড়ে বিশ্রী হয়ে গেছে। উপরে উঠতে উঠতে প্রায় বাহুমূল ছুঁয়ে ফেলেছে, চামড়াটা কেমন কুৎসিৎ বিকৃত হয়ে গেছে, কুঁচকে ঝুলে পড়েছে। কলটা খুলে পাগলের মতো জল দিয়ে সাবান দিয়ে ঘষতে লাগলাম। কী হয়েছে আমার হাতে, আমার চামড়ায় এটা?

বাথরুমের ঠাণ্ডা মেঝেতেই ধপাস করে বসে পড়লাম। কেন হচ্ছে আমার সঙ্গেই এরকম? কী অপরাধ আমার? চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। শত চেষ্টাতেও নিজেকে থামাতে না পেরে ফোঁপাতে শুরু করলাম। ইশ কেউ যদি শুনে ফেলে, কী ভাববে? ত্রিশ বছরের যুবক, বাথরুমের দরজা বন্ধ করে কাঁদছে? কী লজ্জার! তাও কি থামতে পারছি?

দ্রাম দ্রাম। বাথরুমের দরজায় একটা ধাক্কার শব্দ। "কী করছিস আধঘন্টা ধরে? আমাকে সব ম্যানেজ করতে দিয়ে কোথায় গেছিস?”

বুমির গলা। আমি হতচকিত হয়ে উঠে দাঁড়াই। কোনোরকমে চোখমুখ মুছে দরজা খুলে বেরিয়ে আসি।

"তোর উপর কি কোনো ব্যাপারেই ডিপেণ্ড করা যায় না?” বুমির মুখটা রাগে লাল হয়ে গেছে। "সবাই জিজ্ঞেস করছে গাঙ্গুলী কোথায়, গাঙ্গুলী কোথায়! আমাকে এম্ব্যারাস করাই কি তোর একমাত্র কাজ?”

আমি কোনো যুৎসই জবাব খুঁজে পাই না। তড়িঘড়ি জামার হাতার বোতামগুলো আটকে আবার ব্লেজারটা গায়ে চাপাতে যাই। বুমি আমার দিকে শেষ একবার শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, “গায়ে একটু সেন্ট স্প্রে করে যা, বিশ্রী গন্ধ বেরোচ্ছে। দোহাই, আজকে অন্তত আর আমাকে এম্ব্যারাস করিস না।"

বুমি বেডরুমের দরজা ঠেলে বেরিয়ে যায়। আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকি। বদ্ধ ঘর নয়, গরম দিন নয়, সুগন্ধী, আতর, মাস্কারা কিছুই নয়, তাহলে কি আমি? পর্দার আড়ালে চোখের কোণা দিয়ে চলাফেরা নজর করি। "তাহলে কি আমি? আমার গা থেকেই কি পচা গন্ধ বেরোচ্ছে?”

পর্দার আড়ালে ছায়াটা কোনো কথা বলে না। ড্রেসিং টেবিল থেকে সুগন্ধীর বোতলটা তুলে গায়ে পাগলের মতো স্প্রে করতে থাকি। জামার হাতাটা খুলে দেখতে সাহস হয় না। এখন আবার আমাকে ওইখানে যেতে হবে, ওই ঘরে যেতে হবে? কি আছে ওইখানে? কতগুলো মাংসপিণ্ড চলাফেরা করছে, মুখ দিয়ে শব্দ করছে, কেউ কেউ অন্য কোন পিণ্ডটাকে আজ রাত্তিরে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে সেইসব ভাবছে, তারমধ্যে আমাকে যেতে হবে?

"আমি কিছুতেই ওই ওদের মাঝখানে যেতে পারব না।" পর্দাটা হাওয়ায় সরে যায়। ছায়া সরে গিয়ে মুখে একঝলক শেষ বিকেলের আলো পড়ে। গাঙ্গুলী আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে, রাস্তার খোঁড়া কুকুরের দিকে যেরকম করুণা করে তাকায় মানুষ ঠিক সেরকম।

"এরকম ভাবে তাকিয়ে থেকো না" না চাইতেও আমার গলা থেকে একটা চিৎকার বেরিয়ে আসে। উত্তেজিত হয়ে ড্রেসিং টেবিলে লাথি মেরে বসি, আয়নার কাঁচটা ঝনঝন করে ওঠে, আমি পা চেপে ধরে বসে পড়ি। এক্ষুণি বুমি আবার ছুটে আসবে, চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে। আমাকে আবার ওই ঘরটায় টেনে নিয়ে যেতে চাইবে।

আমি খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেডরুম লাগোয়া ছোট বারান্দাটায় আসি। আমাদের ফ্ল্যাটটা দোতলায় মাত্র। চাইলে কি এখান থেকে…

পিছনে বুমির গলা শুনতে পাই যেন মনে হয়। তাই কি? নাকি আমার মনের ভুল? আর অত ভাববার সময় নেই। এই বাড়িতে, এই ঘরে, এই মানুষগুলোর সঙ্গে আর এক মুহূর্ত থাকলেও আমি পাগল হয়ে যাব। দু পা দিয়ে বারান্দার রেলিং পেরিয়ে একেবারে ধার বরাবর দাঁড়ালাম। পাশের বাড়ির বারান্দা থেকে একটা কুকুর হাঁ করে আমার কাণ্ডকারখানা দেখছে।

আমার ভয় করছে। নীচের লাফটা খুব বেশি না হলেও বেমক্কা পড়লে হাত বা পা ভাঙতেই পারে। ঘরের ভিতরে একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম, বুমি, এইবারে অন্তত আর কোনো সন্দেহ নেই। পাশের বারান্দা থেকে কুকুরটা হঠাৎ একবার জোরে চেঁচিয়ে উঠল। আমি একটা ঢোক গিলে লাফ মারলাম।


(৬)

শুক্রবার বিকেলে সুপারমার্কেটে মাছি দেখা থেকে শনিবার সন্ধেবেলা অবধি এই ঘটনা। আর এখন সোমবার ডাক্তার দেখিয়ে এই আমি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। এর মধ্যে ঠিক কী কী ঘটেছে? আমার ভাগ্যে দারুণ কোনো শিকে ছিঁড়েছে কি? বা এই দুর্ভাগ্যের মধ্যে আরো দারুণ দুর্লক্ষণ কিছু দেখা দিয়েছে, দুর্যোধনের জন্ম বা যুধিষ্ঠিরের মিথ্যাচারণের মত? না তার কোনোটাই হয়নি। আমার এই পাগল পাগল অবস্থাটায় বাকি দুনিয়াটার স্রেফ কিচ্ছু যায় আসেনি - প্রচণ্ড নির্লিপ্তভাবে সে ঠিক আগের মতো চলেই চলেছে চলেই চলেছে।

একেবারেই কিছু যায় আসেনি কি? নাকি সে আমার অভিমানের কথা? ডাক্তার যে শেষ অবধি দেখানো গেল সেটাকেও এক হিসাবে সৌভাগ্যই বলা যায়না কি? শনিবার লাফ দেবার সময় ওই অবস্থায় ফোন মানিব্যাগ কিছুই সঙ্গে নিয়ে লাফাইনি। ক্রেডিট কার্ড, পরিচয়পত্র, হেলথ ইন্স্যুরেন্সের কার্ড সবই তো তার ভিতরে! নেহাত আমার প্যান্টের পকেটে সব সময়েই কিছু টাকাপয়সা রাখা থাকে আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য। তাতে রবিবার দিনের দুবেলা খাওয়া বাদ দিয়ে আর যেটুকু পয়সা বেঁচে ছিল তার গোটাটাই ডাক্তারের ফি দিতে কেটে গেল। হাসপাতালে গেলে তো হেলথ ইন্স্যুরেন্সের কার্ড, পরিচয়পত্র ছাড়া ভুলেও ভর্তি নেবে না। কাজেই রবিবারটা কাটিয়ে সোমবার প্রাইভেট চেম্বারে হত্যে দেওয়া ছাড়া আর উপায়ও ছিল না। এখানের বেশিরভাগ ডাক্তার আবার টাকা দিলেও নিতে চায় না, বলে হেলথ ইন্স্যুরেন্সের কার্ড দেখান। কান্নাকাটি করে হাত জড়ো করে পায়ে পড়ে সাতবার পেরিয়ে আটবারের বার কোনরকমে ডাক্তার যাও বা দেখানো গেল তা তিনিও কি আশার আলো দিতে পারলেন এতটুকু? পারলেন না। এর থেকে টাকাটা কোনো একটা সস্তার হোটেলে দিলে দুটো রাত খোলা পার্কে শুয়ে কাটাতে হত না।

একটা বন্ধ দোকানের সার্শিতে গ্রাফিটির ফাঁক দিয়ে নিজের চেহারা দেখে চমকে উঠলাম। নিজের অবস্থায় নিজেরই হাসি পেয়ে গেল। কে ওটা জানলার কাঁচে আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রয়েছে? আমার ফোন নেই, আমার পাসপোর্ট সঙ্গে নেই, চারপাশে আমাকে চেনে এরকম একটা লোক নেই। তাইলে কে আমি? কী আমার পরিচয়?

কী আবার! গৃহহীন, হোবো! আমার উশকোখুশকো চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, তার উপরে আমার গা থেকে ক্রমশ বাড়ছে এরকম পচা গন্ধ! আমার স্যুটখানা দুদিন ধুলো খেয়ে এখনো একেবারে আস্তাকুঁড়েতে শোবার মত মলিন হয়নি ঠিক, কিন্তু তাতে আরো বেশি সংদের সর্দার বেখাপ্পা বেমানান লাগছে।

"কি, মজা লাগছে?” জানলার কাঁচে পিছনের বাড়ির ছায়ায় চিরপরিচিত অবয়বটাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম। গাঙ্গুলী কিছু বলল না, সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে তখনও নিষ্পলকে।

“তাও ওই বাড়িতে আমি ফেরত যাব না। বুঝেছ?" আমি চেঁচিয়ে বললাম। গাঙ্গুলী চোখ নামিয়ে নিল, মাথাটা সরিয়ে নিল।

"তুমিও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? তুমিও?” না চাইতেও আমার গলায় একটা আকুতি, "আমি সারাদিন কিছু খাইনি। আমার খিদে পেয়েছে। এদিকে পকেটে পয়সা কত দেখবে? পঞ্চাশ সেন্ট। পঞ্চাশ সেন্ট! তাও কিছু বলবে না?" শেষ কথাগুলো বলতে গিয়ে গলাটা প্রায় ধরে গেল। গাঙ্গুলী তাও চুপ করে থাকল। আমার প্রচণ্ড রাগ হতে লাগল। মাটি থেকে একটা পাথরের টুকরো কুড়িয়ে সোজা জানলার সার্শিটাকে তাক করে ছুঁড়ে দিলাম। পাথরটা ঠিকরে একদিকে পড়ে গেল। জানলাটা ভাঙল না বটে, তবে একখানা ফাটল ধরেছে বেশ বোঝা গেল।

আমার ভয় করতে লাগল। আশেপাশে দু একজন লোক দাঁড়িয়ে পড়েছে। একটা টাকমাথা লোক ফোন তুলে নম্বর ডায়াল করছে। পুলিশকে ফোন করে যদি?

আমি যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগোতে লাগলাম। টাকমাথা যদি সত্যিই পুলিশকে ফোন করে থাকে তাহলে এক্ষুণিই পুলিশের গাড়ি চলে আসবে। আর তারপর? কী বলব আমি? এমনিই কলকাতার অভ্যাসে পুলিশকে আমার ভারী ভয়, পাসপোর্ট ছাড়া কিছু ছাড়া দেখলে কী করবে তারা আমায়?

"এইই" ফিসফিসে একটা গলার শব্দ শুনে ফিরে তাকালাম। একটা অন্ধকার গলির মধ্যে থেকে কেউ হাতছানি দিয়ে আমাকে ডাকছে। আমি খানিক সন্দিহান হয়েই এগোলাম। কাছে যেতে অবশ্য বুঝলাম ইনিও একজন হোবো। নানারঙের তাপ্পি মারা একটা মলিন জামা, ঝুলকালির দাগ লাগা একটা বহু পুরানো প্যান্ট, আর হাতে মুখে বসন্তের গুটি বিশ্রী হয়ে রয়েছে। তা এহেন বেরঙা জামা আমাকে জার্মানে কিছু একটা বলল। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি দেখে অধৈর্য হয়ে হাত দিয়ে দেখাতে লাগল। মানেটা পরিষ্কার, আমি যেন ওর সঙ্গে যাই।

যাব কি? জার্মানি আসা ইস্তক হোবোদের প্রতি একটা খুব ঘেন্না ভয়ের সংমিশ্রণ আমার মনের মধ্যে একেবারে সেঁটে বসে আছে। মানে সেটা শুধু আমি বলে নয়, অধিকাংশ জার্মান এই মানুষগুলোকে ভয় পায় ঘেন্না করে। তাদের উন্নত সভ্যতার, সুসজ্জিত শহরের বাগানের মধ্যে মধ্যে এই মানুষগুলো এক একটা ঘুণপোকার দাগ। তারা স্নান করে না, খেয়ে নির্দিষ্ট ডাস্টবিনের পরিবর্তে যত্রতত্র নোংরা ছড়ায়, বিলাসবহুল ক্লাবের গোপন কামরার জায়গায় খোলা রাস্তায় ড্রাগ নেয়। প্রতি মুহূর্তে তারা যেন সুমহান প্রথম বিশ্বের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকফ্যাক করে দাঁত বের করে হেসে চলেছে।

অবশ্য 'তারা' বলে আর কাকেই বা বোঝাচ্ছি? যে লোকগুলো আমার খানিক পিছনে আমার দিকে সন্দিহান চোখে চেয়ে আছে, তাদের চোখে আমি কাদেরই বা দলে? সুসজ্জিত সভ্য মানুষের?

খানিক ভয় সন্দেহ নিয়েই বেরঙা জামার পিছন পিছন হাঁটা লাগালাম। অন্ধকার গলিঘুঁজি বরাবর সে এগোতে লাগল, আর মাঝেমধ্যে আমার দিকে ফিরে জার্মানে কীসব বলতে লাগল। এই গলি ওই গলি পেরিয়ে শেষ অবধি আমাকে একটা পরিত্যক্ত পার্কিং লটে নিয়ে এল। সেইখানে আধো অন্ধকারে খুব ভালো বুঝতে না পারলেও আরো তিন চারজন যে রয়েছে সেটা বুঝতে পারলাম।

বেরঙা জামা বাকিদের উদ্দেশ্য করে আমাকে দেখিয়ে জার্মানে আরো কিছু একটা বলল। বাকি সবাই বেশ হেসে উঠল সেইসব শুনে। আমার গাল বোধহয় লাল হয়ে উঠেছে নিজের অজান্তেই। কোথায় এসে পড়েছি আমি? হায় ভগবান!

শেষের কথাগুলো মনে মনের জায়গায় জোরে বলে ফেলেছিলাম কি? হঠাত বসে ছিল যারা তাদের মধ্যে একজন পরিষ্কার বাংলায় বলে ওঠে, "আরে দেশোয়ালি ভাই যে! আস আস এদিকে আস।"

বাংলা? এখানে? অন্ধকারে চোখটা অনেকটা সয়ে এসেছে। চোখ পিটপিট করতে করতে চিনে নিতে অসুবিধা হয় না। সেই বহু জ্যাকেট, জটাধারী চুল, আর সব থেকে বড় কথা তার দিকে হেঁটে যেতে যেতে ভক করে নাকে ভেসে আসা বমি উঠে আসা গন্ধ – মৎস্যগন্ধা।

মৎস্যগন্ধা জার্মানে বাকিদের কিছু বলে। সে কি এদের নেতাগোছের কিছু? হোক না হোক, বাকিরাও সরে টরে আমাকে খানিক জায়গা করে দেয়। আমি খানিক কুণ্ঠা নিয়ে মৎস্যগন্ধার পাশে জড়োসড়ো হয়ে বসি।

"কি চাঁদ? এতদিন এখানে থেকে একটা জার্মান কথা বলতে শেখোনি কেন?” আমি চুপ করে থাকি। কীই বা বলব? মৎস্যগন্ধা একটু নরম হয়। "তোমাকে তো নতুন দেখছি। ভাগ্যিস জ্যাকুব দেখতে পেয়ে ধরে নিয়ে এল। নইলে তো পুলিশ আসলে এক্ষুণি ঝামেলায় পড়তে।"

আমি আবার কিছু বলি না। হাতদুটো জড়ো করে হাঁটুর উপর রেখেছি, একটু ভয় করছেনা তেমন নয়। মৎস্যগন্ধা আরো নরম হয়। "খাবে কিছু? খিদে পেয়েছে?”

আমি আর থাকতে পারি না। গলাটা ব্যাথা করতে থাকে, শত চেষ্টাতেও চোখের কোণা থেকে এক ফোঁটা জল বেরিয়ে আসে। "আরে আরে কাঁদে যে।" শশব্যস্ত হয়ে মৎস্যগন্ধা জাকুবকে কিছু বলে। জাকুব খানিক গজগজ করলেও মাথা নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে যায়। খানিক বাদে কোনো একটা দোকান থেকে একটা কাবাব রোল নিয়ে আসে, আমার হাতে দেয়।

"তুমি ভিগান নও তো বাপু?” মৎস্যগন্ধা আমার কাঁধে একটা হাত রেখে জিজ্ঞেস করে। আমি ঘাড় নাড়তে নাড়তে কাবাব রোলে কামড় বসাই। খিদে সত্যিই পেয়েছিল। আরো কিছু বলছে মৎস্যগন্ধা, চারপাশের লোকজনও। আমার সেদিকে মন নেই। আমি শুধু প্রায় হাভাতে গেলার মতো করে খেয়ে যাচ্ছি।


(৭)

"এই দেশের সরকারের কাছে আমরা একটা সংখ্যা। এই বড় বড় বাড়ির মানুষদের কাছে আমরা একটা আপদ। এই যে তুই" মৎস্যগন্ধা শুয়ে ছিল, এতক্ষণে উঠে বসে, "তোর কাছেও আমি আমরা একটা আপদ। আমরা সারাদিন শুয়ে থাকি, ড্রাগ নিই, আমাদের গায়ে গন্ধ। ভুলে যেতে চাচ্ছিস, কিন্তু ভুলে যেতে পারছিস না। ঠিক কিনা?”

আমি চুপ করে থাকলাম। কীই বা বলব? মৎস্যগন্ধা কোনো উত্তর আশা করছিল বলেও মনে হল না, “অথচ আমরা তো শুধুই সংখ্যা নই। ওই জ্যাকুব ইশকুল পাশ, এখনও বই পড়ে রোজ। মাল্টের বাবা মেরে সাত বছর বয়সে ওকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে চলে গেছিল। নিনা চাকরি খুইয়ে বাড়িভাড়া না দিতে পেরে রাস্তায় এসে পড়েছে। আর আমি -”

মৎস্যগন্ধার কথায় ছেদ পড়ে। জ্যাকুব হঠাৎ এসে কিছু একটা বলে। মৎস্যগন্ধা সেই শুনে বসা থেকে একেবারে উঠে দাঁড়ায়। আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলে, "সন্ধে হয়ে গেছে। আমি জ্যাকুব আমরা এবার একটা কাজে যাব। এডভেঞ্চারও বলতে পারিস। আসবি নাকি আমাদের সঙ্গে?”

"কাজ? কী কাজ?”

“নিউমার্কেটের গলিটা চিনিস?”

আমি ঘাড় নাড়ি। দেশী বিদেশী বিলাসবহুল ব্র্যাণ্ডের দোকানগুলো ওইখানে পরপর সাজানো থাকে। কতবার গেছি বুমি আর আমি। জারা গুচ্চি প্রাদা একের পর এক সুন্দর সুন্দর সাজানো তকতকে দোকান, কাঁচের শোকেসে পরপর লোভনীয় সব সামগ্রী।

"কালকে মাল্টেকে ওইখানে একটা দোকানে খুব ঝামেলা করেছে। বসেছিল, তুলে দিয়েছে, গায়ে জল ঢেলে দিয়েছে। আমরা তাই আজকে সোজা গিয়ে দোকানের দরজায় হিসি করব" মৎস্যগন্ধা একটা অসভ্য ইঙ্গিত দেখায়, "আর কাঁচের জানলায় হাগা লেপটাব। দেখি তারপরে কালকে সকালে কেমন লাগে।"

আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। আমার বিস্ময়টা বোধহয় বেশিই প্রকট হয়ে পড়েছিল। জ্যাকুব মৎস্যগন্ধা দুজনেই আমার মুখের দিকে চেয়ে হা হা করে হাসিতে ফেটে পড়ে।

"তুই কথা কম বলিস, কিন্তু তুই মানুষটি বড়ই রগুড়ে।" মৎস্যগন্ধা আমার কাঁধে একটা হাত দেয়, “তুই বাড়ি যা ভাইটি। তোর গাড়ি বাড়ি বউ চাকরি সবই লাগবে, তুই বাড়ি যা। তুই এখনো তৈরি নোস।" কাঁধের চাপটা একটু বাড়িয়ে তারপরে মৎস্যগন্ধা হঠাৎ ছেড়ে দেয়।

আমি তৈরি নই? কথাটার মানে কী? মৎস্যগন্ধা জাকুব চলে যায়। আমি খানিক টলতে টলতে পরিত্যক্ত পার্কিং লটটা ছেড়ে বেরিয়ে আসি।

এই গলিগুলো একটাও আমার চেনা নয়। গলি বরাবর ধরে হাঁটতে থাকি। দূরে পিছনের রাস্তায় একটা পুলিশের গাড়ি চলে যায়। হলদে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় বন্ধ দোকানের সার্শির দিকে তাকাই, গাঙ্গুলী নিস্তব্ধে আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে থাকে। সব চুপচাপ, শুনসান, আমি একা।

হঠাৎ পুলিশ সাইরেনের শব্দ। আর গলা, ওটা বুমির গলা নাকি? কোনদিক থেকে আসছে? আমার এই চেহারা দেখলে কী ভাববে? আমি দিকবিদিকজ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করি। সামনের দিক থেকে আরো একটা পুলিশের গাড়ি আসছে। আমি দিক পাল্টাই, একটা সরু গলিতে ঢুকে পড়ি। একটা আধা সমাপ্ত বহুতল বাড়ির কাঠামো দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফিতে পেরিয়ে জঞ্জালের স্তূপ পেরিয়ে আমি সোজা ঢুকে পড়ি। গলিটায় আরো কারোর পায়ের শব্দ শোনা যায় কি?

মিস্ত্রিদের কাজ করার জন্য একটা সিঁড়ি উঠে গেছে একেবারে বাড়ির সোজা উপর অবধি। আমি সোজা সেটা বেয়ে উঠতে শুরু করি। কত তলা বাড়িটা? দশ? বারো?

উঠে এসেছি প্রায় উপরে। নীচে ধাতব সিঁড়িতে নির্ঘাত পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। কে আসছে আমার পিছনে? মৎস্যগন্ধা? বুমি? পুলিশ? আমাকে ধরে আবার বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে নাকি? নাকি জানলায় পাথর ছুঁড়েছি বলে ফাটকে পুরবে?

একদম উপরে এসে গেছি। এই তলাটাই এখনো তৈরি হয়নি। ইস্পাতের বীম নানা এদিক ওদিক চলে গেছে। জোরে হাওয়া দিচ্ছে, গোটা কাঠামোটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। উপরে আকাশ মেঘলা অন্ধকার, কোলনের অধিকাংশ দিন অধিকাংশ রাতই যেমন মেঘলা ধূসর কেটে যায় ঠিক সেরকম।

আমি বীম বরাবর একেবারে ধারে এসে দাঁড়িয়েছি। নীচে সোজা নেমে গেছে মাটি অবধি, কতদূর? একশো ফুট? দেড়শো ফুট? এ তো আমার দোতলার ফ্ল্যাটের বারান্দা নয়, এইখান থেকে লাফ দিলে হাত ভাঙা পা ভাঙা নিয়ে ভাবতে হবে না। পিছনে কোনো একটা শব্দ শুনতে পাই। কেউ কি আমার নাম ধরে ডাকছে?

আবার এক ঝলক হাওয়া দেয়। আমি প্রায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। ইস্পাতের বীমটা কাঁপছে। আমার কান্না পাচ্ছে কেন?

আমার কাঁধে একটা ছোঁয়া লাগে কি? আমার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে, "আমি পচে গেছি গাঙ্গুলী। আমার হাত, আমার চামড়া, আমার পেটের ভিতর থেকে পচতে শুরু করেছি। আমার হাত দেখো, আমার গায়ের অবস্থা দেখো। হাঁ করলে টের পাই, আমার পাকস্থলীর ভিতর থেকে দম বন্ধ করা দুর্গন্ধ বেরিয়ে আসছে। আমি থাকি, না থাকি, কী যায় আসে? বলো? কার যায় আসে? ওই চতুর্বেদীর? বুমির? বাবুনের? তুমিও আমাকে ছেড়ে চলে গেলে গাঙ্গুলী, তুমিও আর আমার সঙ্গে কথা বলো না।" আমি হাপুস নয়নে কাঁদছি।

দুটো অবিস্তৃত হাত পিছন থেকে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমার চোখদুটো বন্ধ করে দেয়। হাতদুটো ঠাণ্ডা, নরম, কমনীয়, গাছের ছায়ার মতো। মাথার পিছনে একটা ভার অনুভব করি, কেউ যেন আমার ঘাড়ের খাঁজে মাথা ঠেকিয়েছে। কেউ কিছু বলছে কি? কীসের শব্দ শুনছি আমি? সমুদ্রের শঙ্খধ্বনি, গন্ধর্বদের কুহকী গান, বুদ্ধের জলদগম্ভীর স্বর?

"আমি সবসময় আছি তো তোমার সঙ্গে।" আমি চকিতে ঘুরে ফিরি। কে দাঁড়িয়ে ওখানে? বাবুন, মা, ভূমিসুতা, মৎস্যগন্ধা? চোখের জলের মধ্যে থেকে পরিষ্কার বুঝতে পারি না। সে আমার হাতদুটো তার নিজের হাতে নেয়। আমি আবার কাঁদতে শুরু করি। কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ি। হাতদুটো এসে পিঠের উপর থেকে আমাকে শালের মতো করে, বিশাল বটবৃক্ষের মতো করে জড়িয়ে ধরে। আমি চোখ মুছে উপরে তাকাই।

মেঘ সরে গিয়ে চাঁদের একখানা ফালি দেখা যায়। মৃদু আলোয় দেখি গাঙ্গুলী নিষ্পলকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তার দু চোখে জল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন