সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

অলোক গোস্বামী'এর গল্প: একটি পুরুষতান্ত্রিক গল্প



--আপনি আমার নিকট হইতে কিরূপ ব্যবহার প্রত্যাশা করেন?

--একজন রাজা অন্য রাজার নিকট যেরূপ ব্যবহার প্রত্যাশা করে।
 
 
ঐতিহাসিক যাত্রা পালায় নানা রকম নাটুকে ডায়ালোগ থাকে বটে কিন্তু সেসবের ওপর ভিত্তি করে তো কেউ ইতিহাস খুঁজতে যায় না! হয়ত ইতিহাসের সপক্ষে সব সময় ঠোস সবুদ থাকে না জন্য কখনও সখনও কল্পনার সাহায্য নেয়া হয়। তাবলে ইতিহাস তো গল্পগাছা নয় যে তাতে কাল্পনিক সংলাপ পুরে দিয়ে মুখরোচক বানাতে হবে! তাহলে তো কণিষ্কের মুন্ডুহীনতা নিয়েও গণেশ মার্কা গল্পগাছা জুড়ে দেয়া হতো! এতদসত্বেও স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বইতে ওপরের সংলাপ দুটো কিভাবে যে সিলেবাসের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল কে জানে! পড়তে পড়তে বেশ শিহরণ জাগতো। মনে হতো, একেই তো বলে পৌরুষ! শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে মাথা নুয়ে আসতো এবং সেটা দুজনের পায়েই পড়তো। পরাজিত হয়েও যে সাহস দেখাতে পেরেছিল পুরু,সেটা তো নায়কদের একচেটিয়া। আর বিশ্বজয়ী আলেকজান্দার বিদেশী হয়েও যে মর্যাদা দিয়েছিল প্রতিপক্ষকে,সেটা কতজন দেখাতে পারে? জিও বস্‌ ।
 
যদিও কোন ক্লাসে পাঠ্য ছিল ওই সংলাপ দুটো, এখন আর মনে নেই। শুধু সেটুকু কেন, স্কুল জীবনে পড়া ইতিহাসের অনেক বিষয়ই বিলকুল হাপিস। অত যে দুলে দুলে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলো মুখস্ত করা হয়েছিল, আজ মাথায় হাতুড়ি পিটলেও তার একটা কারণও ছিটকে বেরুবে না।
 
সেটাই স্বাভাবিক। মস্তিষ্কের ধর্মই তো অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে খোপ থেকে বের করে দিয়ে নতুন তথ্যকে জায়গা করে দেয়া। টার্গেট আর মার্কেট গ্রাফ যার জীবনে বাপের নাম মনে রাখার চে’ও জরুরী সে কি ইতিহাস ধুয়ে জল খাবে?
 
কিন্তু তাই যদি হবে তাহলে আজও কিভাবে ওই সংলাপ দুটো মাথার ভেতর রয়ে গিয়েছে? অবশ্য রয়ে যে গিয়েছে সেটা সুমন ত্রিশ বছর ধরে টের পায়নি। হয়তো বাদবাকি জীবনটুকুতেও পেত না যদি আজ থেকে ঠিক সাত মাস একুশ দিন আগে ওই সংলাপ দুটো ঠিকরে না বেরুতো।
 
সাত মাস একুশ দিন না বলে সাত মাস একুশ রাত বলাটাই বোধহয় সঠিক হবে। দিন কিংবা রাত, যেটাই হোক না কেন, মোদ্দা হিসেবটা যে সাত মাস একুশ সেটার পক্ষে জীবন বাজী রেখেও বলতে পারে সুমন। এমন কী জয়ের ব্যাপারেও সে একশো শতাংশ নিশ্চিত। কারণ প্রমাণ হিসেবে সামনের টেবিলে মজুত আছে প্রেসক্রিপশনের স্তুপ। শুধু পড়ে থাকা নয়, ডক্টর মুখার্জির প্রশ্নবাণের হাত থেকে রেহাই পেতে সুমন খানিক আগেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে প্রথমদিনের প্রেসক্রিপশনটা এবং সেখান থেকেই প্রাপ্ত ওই সাত মাস একুশের হিসাবটা। আর তখনই শুধু সংলাপ দুটো নয়, নিমিষে চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠেছিল সেই অদ্ভুত রাতটাও।
 
রাতটা সত্যিই অদ্ভুত ছিল। অন্ততঃ সুমনের তেমনটাই মনে হয়েছিল। ভাবতেই পারেনি দিয়া সে রাতে নিয়ন্ত্রণ রেখাটা নিজের হাতে ভাঙবে। ব্যাপারটা এতটাই অবিশ্বাস্য ছিল যে সুমন জিজ্ঞেসটুকুও করতে পারেনি, নিয়ন্ত্রণ রেখাটা কেন টানা হয়েছিল! কেনই বা সেই রেখাটা পাঁচ বছর ধরে মেনে চলা হলো! মেনে যখন চলাই হলো তখন সেটার মেয়াদ আরও দুবছর বাড়িয়ে নিলে ক্ষতি কি ছিল?

--কেন, আরও দু বছর কেন? কী হতো দু বছর পর!
 
যেহেতু কথাগুলো বলেনি সুমন তাই দিয়ারও পাল্টা প্রশ্ন করার সুযোগ হয়নি। ভাগ্যিস হয়নি। নাহলে কিভাবে অভিজিৎের উপদেশের কথাটা বলতো সুমন?

--সাতটা বছর দাঁতে দাঁত চেপে থাকিস সুমন। বেশী জেদাজেদি করতে যাস না যেন।

যথারীতি অভিজিৎের কথার বিন্দু বিসর্গও বুঝতে পারেনি সুমন। অগত্যা বিশদে বুঝিয়েছিল অভিজিৎ।
 
--শোন সুমন, দাম্পত্যের প্রথম সাতটা বছর একেবারে গিলোটিনে মাথা রেখে কাটাতে হয় রে। পান থেকে চুণ খসলেই ঘচাং, ব্যস, ধড় মুন্ডু আলাদা। ফোর নাইন্টি এইট-এ। ভয়ঙ্কর ধারালো। নব্বই দিন টানা হাজতবাস। কোনো বাপ বাঁচাতে পারবে না। তারপর যদি জামিন পাস তাহলেও রেহাই নেই। নিজের নির্দোষিতা নিজেকেই প্রমাণ করতে হবে।
 
তখনও তো বিয়েটাই হয়নি, তার আগে এসব কী অলক্ষুণে কথা! ভালোবাসার বিয়েতে পান থেকে চুণ খসতে যাবে কেন? তবু সাংসারিক নিয়ম কানুন যেহেতু জানা নেই তাই ভালো করে বুঝে নিতে চেয়েছিল সুমন।

--কিন্তু সাতটা বছরই বা নির্দিষ্ট করা হলো কেন?

এবার হাত উল্টে দিয়েছিল অভিজিৎ।

--সে আমি কি করে বলবো! হয়তো বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ পেয়েছে ইগো ক্ল্যাশের ব্যাপারটা প্রথম সাতটা বছরে তীব্র থাকে। তারপর মিইয়ে আসে ক্রমশঃ। তখনও স্বামী স্ত্রী পরস্পরের বন্ধু না হতোে পারলেও, শত্রু থাকে না।
 
অভিজিতের দেয়া তথ্যটার প্রকৃত ভিত্তি থাকুক বা না থাকুক তবু আর দুটো বছর তো অপেক্ষা করা যেতই। সংবিধান অনুমোদিত সাতটা বছর পেরিয়ে যাবার পর নাহয় দিয়া সিদ্ধান্ত নিতো, এই জনযুদ্ধের আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা। হ্যাঁ, জনযুদ্ধই তো। জনগণের কামনায় যে যুদ্ধ তাকে অন্য কোন নামেই বা ডাকা যায়!
 
ভাগ্যিস সে রাতে সুমন মুখ ফসকে অভিজিতের নামটা বলে ফেলেনি। নামটা শুনলেই দিয়া নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে মনে করার চেষ্টা করতো, অভিজিৎ কে। তারপর দাঁত চিবিয়ে বলতো,“ওহ, দ্যাট জবলেস মুহুরী?”
 
অভিজিৎ আদৌ মুহুরী নয়, রীতিমত অ্যাডভোকেট। এবং কর্মহীন তো নয়ই বরং বেশ কয়েকটা জটিল কেস জেতার রেকর্ড ওর কোটের পকেটে আছে। সে কথা থাক। আপাততঃ সেই অদ্ভুত রাতের প্রসঙ্গ। অবশ্য সাত মাস একুশের আগেকার রাতটাকে যদি অদ্ভুত মনে হয়ে থাকে সুমনের, তাহলে বিয়ের রাতটা কি ছিল? অদ্ভুততর!
 
সে রাতে আচমকা দিয়ার মুখে প্রতিরোধক ব্যবস্থার কথা শুনে অবাক হয়েছিল সুমন, এ আবার কী! এ তো কোনো গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ঘুপ চুপ কাজ সেরে ফেলার ব্যাপার নয়, রীতিমত বৈধ স্ত্রীর সঙ্গে সমাজ সম্মত বিছানা পর্ব। কিছু যদি ঘটে যায়,যাবে। বরং যাওয়াটাই তো উচিত। মেঘে মেঘে বেলা তো কম হলো না!

কিন্তু দিয়ার বাণী,“এখন নয়, পরে, প্ল্যান করে।”
 
পরে মানে কবে! কিসের প্ল্যান! বেশী দেরী হয়ে গেলে তো, ছেলে ক্লাস ওয়ান-বাপ শ্মশান। যদিও এরপরও কিছুই বলতে পারেনি সুমন। রেসে নামার আগেই কেউ যদি আগে ভাগে দৌড়বাজের হাতে গ্লুকোজের গ্লাস ধরিয়ে দেয় তাহলে ঘাবড়ে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক।

তবে মুখে কিছু না বলতে পারলেও সেই রাতে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল সুমন, দিয়ার তানাশাহি যদি ভাঙতে না পারে তবে সে সাত পুত্র তিন কন্যার জন্ম দেয়া বাপের ব্যাটাই নয়!

সুমনের সেই প্রতিজ্ঞা পর্বে, প্রাচীন গল্পের মতো, বিধাতা পুরুষ নিশ্চয়ই অলক্ষে দাঁড়াইয়া হাসিয়াছিল। নাহলে সে বাপ কা ব্যাটা হওয়ার গৌরব থেকে লাগাতার বঞ্চিত হবে কেন!

--তোমাদের কাছে কি বিয়ে মানে শুধু এই?

কয়েক রাত ব্যূহ ভাঙার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে এবং ব্যর্থ হয়ে এবং একই প্রশ্ন শুনেও প্রশ্রয়ের হাসি উপহার দিয়েছে সুমন। তবে ব্যর্থতারও যেহেতু সীমা থাকে তাই এক সময় বিরক্তি মাখা গলায় পাল্টা প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়েছিল।

--তোমাদের, মানে!

--পুরুষদের?

রাগে শরীর জ্বলে উঠেছিল সুমনের। প্রেম পর্বে দিয়ার মুখে পুরুষ বিদ্বেষী কথা শুনতে খারাপ লাগতো না। নারীবাদকে ভালোবাসতে পারাটা তো প্রগতিশীলতারই লক্ষণ। তাছাড়া, ওসব তো চালু কথা। সবার দেখাদেখি বলা। তাবলে ভ্যালিড বিছানায়, রীতিমাফিক এবং প্রবৃত্তি সম্মত শয়নক্রীড়া কালে ওসব কথা কেন!

তবে কি দিয়া লেসবিয়ান? সেটা হওয়াটা যদিও প্রগতিশীলতার লক্ষণ কিন্তু তাহলে বিয়েতে রাজী হওয়া কেন? তাছাড়া দুজনের প্রেম পর্বটা তো আর পুরোপুরি নিরামিষ ছিল না। চুমোচুমি, একটু আধটু শরীর ছানাছানি তো ঘটেছে। কই,দিয়া তো তেমন আপত্তি করেনি!

--তাহলে?

পাশ ফিরে শুতে শুতে দিয়া জবাব দিয়েছিল,‘নাথিং।’

দিয়া তো আদেশ শুনিয়েই খালাস কিন্তু তারপরের রাতগুলো ওই অন বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস নিয়ে কিভাবে কেটেছে সেটা শুধু সুমনই জানে। ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সে সব রাতে নিজেকে সামলাতে সুমনকে বাধ্য হয়েই ছেলেবেলার মতো ছুটে যেতে হয়েছে টয়লেটে। জানলা দিয়ে উঁকি মারা চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে গিয়েছে মাল্যবানের কথাগুলো--

“রাত তিনটের সময় মেসের চৌবাচ্চার থেকে ফিরে এসে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে মাল্যবান ভাবছিল: তার জীবনের সারাৎসার মুহূর্তে তার স্ত্রী কোনো কাজে লাগে না।”

তো,যাকে মৃত জলাশয় ভেবে বাকি জীবনটা তৃষ্ণা বুকে চেপেই কাটিয়ে দেবে ভেবেছিল সুমন, আচমকা তাকে খ্যাপা নদীর মতো ফুঁসে উঠতে দেখলে সেই রাতটাকে অদ্ভুত মনে হতে বাধ্য।

ঢেউয়ের পর ঢেউ পাঠিয়ে গভীরে টেনে নিয়ে গিয়ে, নাকানি চোবানি খাইয়ে,পর্যুদস্ত করে, আবার অন্য ঢেউ মারফৎ ফিরিয়ে দিয়েছিল নদীটা, সত্যি বলতে কী, তখন কোনো কিছু ভাবার মতো দশাতেই ছিলনা সুমন। দূরের কোথাও থেকে এক ছটাক আলো ভেন্টিলেটার মারফৎ ঘরে ঢুকে অন্য দেয়ালে যে ফুলকারি সৃষ্টি করেছিল, মাথার নীচে একটা হাত রেখে, চিৎ হয়ে শুয়ে থেকে সুমন তাকিয়েছিল সেদিকে। খানিক পরে, ঢেউ নয়, স্বয়ং নদীটাই এগিয়ে এসেছিল, সুমনের বাইসেপ্স আর ট্রাইসেপ্সের মোহনায় মাথা রেখে,কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলেছিল,“তুমি আমার কাছে কী আশা করো?”

ওরকম একটা পরিস্থিতিতে মনোবিজ্ঞান, যৌনবিজ্ঞান, নিদেন পক্ষে সমাজ বিজ্ঞানের কোন সূত্র মনে পড়ার পরিবর্তে সুমনের মাথার ভেতরে ছিটকে উঠেছিল ঐতিহাসিক সেই সংলাপ দুটো, যা কিনা ভুলেই গিয়েছে বলে এতকাল মনে করতো!

কি উত্তর সেদিন দেয়া উচিৎ ছিল সুমনের,“রাজার মতো!”সেটা কি স্বাভাবিক শোনাত? হাসিতে ফেটে পড়তো না সুমনা! মাঝরাতে যেহেতু ‘টু’ শব্দটাও পৌঁছে যায় অনেক দূর তাই পাড়া প্রতিবেশীরাও জেনে যেত সুমন মন্ডল, যে কিনা বাপের দূরদৃষ্টির সুবাদে চা বাগানের স্কুলে না পড়ে শহরে পড়তে এসে, পড়াশোনায় তেমন আহামরি না হওয়া সত্বেও নিছক পিছড়ে বর্গের মানুষ হওয়ার সুবাদে একজন রাজ্য সরকারি চাকরি জুটিয়ে ফেলে নিজেকে পুরু ভাবছে!

বরং দিয়ার সঙ্গে আলেকজান্দারের অনেকটাই মিল আছে। দুজনেই দর্শনের ছাত্র। দুজনেরই দিগ্বিজয়ের নেশা। ফারাক শুধু এটুকই যে দিয়াকে সারা পৃথিবী ছুটে বেরাতে হয়নি। সবাই স্বেচ্ছায় মাথা বাড়িয়ে দিয়েছে নিহত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। আর সেই সব লাশ অবহেলায় টপকে টপকে এগিয়ে গিয়েছে দিয়া চ্যাটার্জি।

ভাগ্যিস থেমে থাকেনি! তাই তো সুমন মন্ডল সুযোগ পেয়েছিল লেডি চ্যাটার্জিস লাভার হওয়ার নাহলে সাধ্য কি ছিল ওই দামী লাশগুলোকেও ডিঙিয়ে আসার!

আচ্ছা,গ্যালাক্সির ভিড় থেকে দিয়া কেন এরকম একটা কক্ষচ্যুত তারাকে বেছে নিয়েছিল? কারণটা নিশ্চয়ই সুমনের ছ ফিটের কাছাকাছি মেদহীন চেহারাটা নয়! সেটা আর পাঁচজন মেয়ের কাছে আকর্ষণীয় মনে হলেও দিয়া চ্যাটার্জির বন্ধু তালিকায় ওরকম অনেক সুদর্শন পুরুষ ছিল। তাহলে?

অনেক ভেবেছে সুমন,কুল-কিনারা পায়নি। অগত্যা বিষয়টাকে নারীর জটিল মনস্তত্ব কিংবা অঘটন আজও ঘটে, এমন তালিকাভূক্ত করে মন থেকে মুছে দিয়েছে।

দিয়া অবশ্য বলেছিল,“তোমার সঙ্গে পরিচয়ের পর চারপাশের লোকগুলোকে কেমন যেন পানসে মনে হয়েছিল! মনে হয়েছিল তুমিই একমাত্র লিভিং সোল, বাট...।”

কন্ঠস্বর যতই স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুক দিয়া তবু বাক্যের মধ্যে অতীতকালের ব্যবহার,সর্বোপরি অসমাপিকা ক্রিয়া, কিছুই নজর এড়ায়নি সুমনের। সুতরাং কথাগুলোকে প্রশংসা হিসেবে না দেখে,আপশোস হিসেবেই দেখেছে এবং তার জন্য বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন হয়নি। এটাই তো স্বাভাবিক। দিয়ার বার্থ রাইটও বলা যায় কেননা একদা ভালো ভালো কলেজে, পরবর্তিতে দেশ বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে বক্তৃতা দিয়ে, শেষ জীবনে সরকারী শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে অবসর নেয়া প্রিয়নাথ চ্যাটার্জির কন্যা দিয়া চ্যাটার্জি, নামী কলেজের লেকচারার, এটুকু আপশোস করতেই পারে।

বিয়ের খবরটা জানাজানি হওয়ার পর দিয়ার আত্মীয়স্বজনরাও আপশোসটা গোপন করেনি। এহেন নীচু নজরের জন্য সরাসরি দিয়াকে ভৎর্সনা করেছিল। যদিও এটিকেট সমৃদ্ধ সেইসব নরনারীবৃন্দ সরাসরি কিছু বলেনি সুমনকে বরং বিয়ের রাতে আশীর্বাদ করেছিল, “উইশ য়ু বেস্ট অফ লাক।”

তবে সামনা সামনি না বলায় সুমন জানতে পারবেনা তেমনটা তো নয়। পতিনিন্দা সইতে না পেরে আত্মীদের মন্তব্যগুলো বলে ফেলেছিল দিয়া। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল, “প্লীজ ডোন্ট মাইন্ড।”

কী আশ্চর্য,সত্যি কথায় মাইন্ড করতে যাবে কেন সুমন! বরং এরচে’ও রূঢ় বাস্তব সহ্য করার ক্ষমতা তার চিরকাল রয়েছে। যেমন কিনা সুমনের দিককার আত্মীয় স্বজনেরাও এই বিয়েতে সুখী হয়নি। বিশেষ করে বন্ধুরা যে দিয়ার ফিগারে ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজ নিজ স্ত্রীর ন্যাতানো মাই টিপে টিপে জিঘাংসাময় সঙ্গমও করেছে, সেটাও সুমন জানে। এবং তাতে খারাপ লাগেনি। কেননা,আর কিছু না পারুক, নিজের লোকদের ঈর্ষার জোগানটুকু তো দিতে পেরেছে, এ-ই বা কম কী!

আচ্ছা,সেই রাতে,দিয়ার সেই ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর কি সুমন আদৌ দিয়েছিল? যদি দিয়ে থাকে,তবে সেটা কী ছিল! কিংবা দিয়া কি উত্তরের প্রত্যাশী ছিল? নাকি প্রশ্নটা করেই ফিরে গিয়েছিল স্বস্থানে, নির্ভেজাল দূরত্বে! এক প্রশ্নেই দশদিশি ঘুরতে থাকা সুমনের খেয়ালেই পড়েনি কিছু। সুতরাং মনেও নেই কিছু। আরও সত্যি করে বলতে গেলে বলতে হয়, গত সাত মাস একুশ দিন ধরে সেই রাতটার কথা ভুলেই ছিল সুমন। এখনও মনে পড়ত না যদি না ডক্টর বামদেব মুখার্জি,শহরের নামকরা ধাত্রীবিদ, ওরফে দিয়ার ডক্টর আঙ্কেল একটা স্ক্যান রিপোর্ট শূন্যে মেলে ধরে বেবির পজিশন, মাদারের হেল্‌থ কন্ডিশন ইত্যাদি প্রভৃতি বিষয়ে লাগাতার বকবকানি চালিয়ে যেতেন এবং সেই বাখোয়াজি সরাসরি সুমনের দিকে তাকিয়ে থেকে পেশ করায় এবং ডক্টর মুখার্জির ঝকঝকে চশমার দিকে একটানা তাকিয়ে থাকতে অস্বস্তি হওয়ায় টেবিলের দিকে তাকাতো এবং টেবিলের ওপর প্রেসক্রিপশনের স্তুপ না থাকতো।

হয়তো মনে পড়ার এই প্রক্রিয়াটাতে উৎসাহী না হয়ে বরং সুমনের বিস্মরণটা কারুর কাছে আপত্তির কারণ হতেই পারে। হয় হোক, সুমন নিরুপায়। গত সাত মাস একুশ দিন সময়টা যেহেতু তার কাছে বিবাহ পরবর্তি সাধারণ দিনগুলোর মতোই এসেছে সুতরাং প্রতি পলে তার পক্ষে মনে রাখা সম্ভব হয়নি, ওহহো,মাই ওয়াইফ ইজ ক্যারিং।

না, ঢাউস পেটওয়ালি বউকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে অপেক্ষারত হবু বাপদের সঙ্গে সৌজন্য তথা সাফল্যের হাসি বিনিময় করতে হয়নি সুমনকে। কোনো কৌতুহলীর চোখের সামনে শিশি কিংবা কৌটো তুলে ধরে আরও দশজনকে শোনানোর মতো উঁচুস্বরে বলতে হয়নি,“মিসেসের স্টুল, ইউরিনটা টেস্ট করাতে নিয়ে যাচ্ছি। না না,নাথিং রং। তবে ফার্স্ট ইস্যু তো তাই একটু কেয়ারফুল তো থাকতেই হয়। এমনিতে এভরিথিং ইজ গোয়িং ফাইন.....।”

এসব করতে হয়নি তার কারণ এটা নয় যে এহেন আচরণ সুমন মন্ডলের স্বভাববিরুদ্ধ। করতে না হওয়ার কারণ সে শুধু নিছকই হবু বাপ নয়, হি ইজ দিয়া চ্যাটার্জিস হাজব্যান্ড। হু ইজ দিয়া চ্যাটার্জি? প্রিয়নাথ চ্যাটার্জির একমাত্র মাতৃহীনা মেয়ে। আশা করা যায় এই শহরে, কে প্রিয়নাথ চ্যাটার্জি, সেই প্রশ্ন তোলার মতো কোনো উজবুক নেই।

সুতরাং দিয়ার যা পরিচিতি আছে এই শহরে তার কাছে সুমন একটিপ নস্যি মাত্র, উড়িয়ে দিতে ঝড়ের প্রয়োজন পড়েনা, সামান্য নিঃশ্বাসই যথেষ্ট। উদাহরণ হিসেবে আজকের এই সময়টার কথাই ধরা যাক। এই যে ডক্টর মুখার্জি প্রভূত যত্ন নিয়ে, আগ্রহের সঙ্গে সুমনকে পেশেন্টের অবস্থান বুঝিয়ে চলেছেন, এই সুযোগ কখনও আসতো যদি না উনি দিয়ার আঙ্কেল হতোেন! ভিজিটের কথা যদি বা বাদ দেয়া যায়, অ্যাপয়েন্টমেন্টটুকুও কি জুটতো?

সুতরাং গর্ভ বাঁধানোর সামান্য দায়টুকু ছাড়া বাদবাকি কোনো ব্যাপারেই সুমনের ওপর নির্ভর করেনি দিয়া। সুমনও অনায়াসে ভুলে যেতে পেরেছে দিয়া গর্ভবতী। সুতরাং জিজ্ঞেস করতে অসুবিধে হয়নি,“কী ব্যাপার, ক’দিন ধরে কলেজ যাচ্ছনা যে!”

উত্তরে খুলে বলেনি কিছু দিয়া। দাঁতে দাঁত চিপে বলেছে, “ইডিয়েট।”

দিয়ার কাছে হালকা খিস্তি হিসেবে,‘ফ্রড,লায়ার,চীট,ইডিয়েট’,ইত্যাদি এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের জন্য ‘বাস্টার্ড’ই যথেষ্ট। অথচ ওগুলো শুনলে অপমানিত হওয়ার পরিবর্তে হাসিই পায় সুমনের। এগুলো কোনো খিস্তি হলো! ওই শব্দগুলোকে শাদা বাংলায় ভৎর্সনাও বলা যায় না। সত্যি বলতে কি খিস্তির দিক থেকে শুধু ইংরেজী নয়, বাংলাভাষাটাও যথেষ্ট পিছিয়ে আছে। কানের ভেতর দিয়ে মরমে পশে যাবার ক্ষমতাটুকুই নেই। খিস্তি তো নয় যেন শিউলি ফুল,নিঃশব্দে ঝরে পড়ে যায়।

ভাগ্যিস,হিন্দি ভাষাটা ছিল। আহা, খিস্তি তো নয়, যেন নিউক্লিয়ার মিসাইল, ইহ জন্ম থেকে পরজন্মে ধেয়ে যাওয়ার শক্তি সম্পন্ন। সেই ছোটবেলায়, চা বাগানের স্কুলে যাবার পথে একটা মেথরটোলা ছিল। দু বেলা মা,বহেন মাখা বাতাস কেটে যেতে যেতে সুমন বুঝে গিয়েছে, খিস্তি কাহারে কয়।

যদিও প্রথম যেদিন দিয়া,‘বাস্টার্ড’শব্দটা উচ্চারণ করেছিল সহ্য করতে পারেনি সুমন। নাটুকে গলায় বলেছিল,“কিভাবে বাস্টার্ড চেনো তুমি? নিজেকে দিয়ে?”

উত্তরে দিয়া নিশ্চুপ থাকলেও ব্যাপারটা অত সহজে মেটেনি। খবরটা পৌঁছে দিয়েছিল বাপের বাড়িতে। সুমনকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন স্যার প্রিয়নাথ। মৃদু হেসে বলেছিলেন,“আমি কিছু জানতে চাইবো না। জানি, এসবই হওয়ার কথা। মা মরা মেয়ে,বরাবরই একটু জেদি টাইপের। তারপর তেমন ঘর সংসারও তো পায়নি। তোমাকেও বুঝতে হবে। তুমি তো জেনে বুঝেই এসেছো।”

সে রাতে না খাইয়ে ছাড়েননি প্রিয়নাথ। জামাইকে পাশে বসিয়ে খেতে খেতে শুনিয়েছিলেন সুমনের ডিপার্টমেন্টের বড়কর্তাদের মধ্যে কারা কারা ওঁর স্নেহধন্য। এমন কী তার আত্মীয় তালিকায় কারা কারা পুলিশের উচ্চপদস্থ, সেটা জানাতেও ভোলেননি।

যদিও তেমন সুযোগ পাননি প্রিয়নাথ। এরপর সুমন ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে দিয়ার হালকা পলকা খিস্তিগুলো। এছাড়া উপায় কি! কেননা ঘটনাটা শুনেই অভিজিৎ বলেছিল, “মা বাবাকে জানিয়ে দে, নব্বই দিন জেলের ভাত খাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে।”

সুমন তো অবাক।

--মা বাবা কী দোষ করলো! ওরা কবে এখানে থাকতে এসেছে?

অভিজিৎ পেশাদার গলায় জানিয়েছে, “ইট ম্যাটারস্‌ আ লিটল। ফোরনাইন্ট এইটের এ, আধুনিক নারীর রক্ষাকবচ। বিয়ের সাত বছরের মধ্যে স্ত্রী ইচ্ছে করলে শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেককে নব্বইদিন জেলের ভাত খাওয়াতে পারে। এবং তার জন্য একসঙ্গে থাকার প্রয়োজন পড়েনা।”

এরপর দিয়ার খিস্তিগুলোকে হাসি দিয়ে গ্রহণ করতে অসুবিধে হয়নি সুমনের। মনে হয়েছে,সাত বছরের এই বাধ্যতামূলক প্রেমকে কি নামে সম্বোধন করা যেতে পারে? লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা!

না, সেদিন সুমনের অজ্ঞতায় রেগে ওঠেনি দিয়া। ল্যাপটপে চোখ রেখে মুচকি হেসে বলেছে, “নাহ্‌, তোমাকে নিয়ে পারা যায়না। একই রকম রয়ে গেলে!”

সামান্য উত্তেজনাও গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি করতে পারে জেনে হয়তো সেদিন রাগারাগি করেনি দিয়া। হয়তো ভয় ছিল, পান থেকে চুন খসলেই যদি সুমনের মতোই আরেকজন উদোমাদা, পাগল, গোঁয়ার, নিষ্কর্মা, স্বার্থপরের জন্ম দিতে হয়। অবশ্য সবটাই সুমনের আজকের অনুমান। আজ মনে হচ্ছে, অতই যদি ভয় তবে গর্ভধারণের মতো সামান্য কাজটুকুর জন্য দিয়া কেন সুমনের ধার ধারতে গেল! জিন যে বীর্যবাহী সেই জ্ঞান কি দিয়ার নেই! কী প্রয়োজন ছিল সেই মারাত্মক ঝুঁকিটা নেয়ার? দিয়ার সংগ্রহে তো কতো সুবীর্যবানই ছিল! তাদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ সাহায্য না নিলেও, পরোক্ষে তো নেয়াই যেত। বীর্য সংগ্রহ এবং সংস্থাপনের কাজে ডক্টর মুখার্জি তো যথেষ্টই এলেমদার। অন্ততঃ এই শহরের রটনা তো তেমনটাই।

সে যা হোক, দিয়া কেন সুমনকে বাপ হওয়ার সুযোগ দিয়েছে সেটা দিয়াই ভালো বলতে পারবে। সুমন যেটুকু পারে তাহলো শুধুই অনুমান। অনুমান যেহেতু মানুষের নিজস্ব চিন্তা ভাবনার ওপর নির্ভরশীল সুতরাং সেই ভরসায় সুমনের উচিৎ নয় মুখ খোলা। বরং সরাসরি ডক্টর মুখার্জির কাছে আত্মসমর্পণ করে বলে দিতে পারে, “আপনার যা কিছু প্রশ্ন আছে সেসবের উত্তর আপনার আদরের নীসের কাছ থেকে জেনে নিন স্যার। আমি স্যার, সাতে পাঁচে নেই। ছাপোষা মানুষ। ফ্রড,চীট, ইডিয়েটও বলতে পারেন।এমন কী ঔদ্ধত্যের সীমা পেরিয়ে বাস্টার্ডও বলতে পারেন। যেহেতু এখনও সাত বছর পেরোয়নি সুতরাং আই ওন্ট মাইন্ড। শুধু দয়া করিয়া উৎপটাং প্রশ্ন মারফৎ আমাকে বিব্রত করিবেন না।”

কিন্তু সুমন যে সরাসরি ওসব কথা বলতে পারবেনা সেটা সুমনের চে’ ভালো কেউ জানেনা। এমন কী প্রশ্নে প্রশ্নে নাজেহাল হয়ে গেলেও নয়। কেননা এই শহরে ডক্টর বামদেব মুখার্জির সাফল্যের খ্যাতির পাশাপাশি চড়া মেজাজের খ্যাতিও আছে। বদমেজাজের নানা গল্প এখানকার বাতাসে ভাসে।

যদিও এখন অবধি তেমন কোনো নমুনা পেশ করেননি কিন্তু তার কারণ পেশেন্ট পার্টি সুমন মন্ডল নয়, স্যার প্রিয়নাথের একমাত্র জামাতা। একবার যদি সম্পর্কের গূঢ় রহস্যটা বুঝে ফেলতে পারেন তাহলেই দাঁতে দাঁত চেপে বলবেন,“সাতে পাঁচে থাকেন না কেন?”

উত্তরে সুমন কি বলতে পারবে,“মানে,প্রথম দিন থেকেই দিয়া আপনার কেয়ার অফে। এই সাত মাস একুশ দিন আপনাদের নিজস্ব। সারাদিন তো সুযোগ মেলেইনি কিছু জানার, এমন কী রাতেও নয়।”

এটিকেট মেনে হয়তো ডক্টর মুখার্জি কারণটা জানতে চাইবেননা তবু সুমনকে বলতেই হবে,“কনসিভ করার পর থেকেই তো দিয়া আলাদা ঘরে শুয়েছে। আমার নাকি ছোটলোকের মতো ঘুমের ঘোরে হাত পা ছোড়া,ভুল বকা স্বভাব। বুঝতেই পারছেন স্যার,আপনার নীস কতো অ্যালার্ট, এরপর কি আমার সাতেপাঁচে থাকাটা জরুরী মনে হয় আপনার?”

হয়তো চট জলদি উত্তর খুঁজে না পেয়ে চুপ করে যাবেন ডক্টর বামদেব, তবে সুযোগ খুঁজবেন ফের অপমান করার। রুম ফ্রেশনারের দাপটকে হেলায় হারিয়ে একবার যদি হুইস্কির গন্ধটা টেবিলেও ওপারে পৌঁছয় তাহলেই আর দেখতে হবেনা,সুযোগটা পেয়ে যাবেন ভদ্রলোক।

--সাতেপাঁচে না থাকা মানুষের তো টেনশন থাকার কথা নয়! তাহলে ড্রিংক করে এসেছেন কেন? সাতপাঁচহীন সাফল্যকে সেলিব্রেট করতে?

উত্তর দেবেনা সুমন। দেয়ার প্রয়োজন পড়বেনা। তিনটে কারণে।

কারণ নং ১-এক-দুপেগ মদ দিয়ে সাফল্যকে সেলিব্রেট করা যায়না।

কারণ নং ২-একা একা সেলিব্রেট করা যায়না। তার জন্য বন্ধুব্রিগেডের প্রয়োজন না পড়লেও ন্যূনতম একজন প্রয়োজন এবং সেই একজন অর্থাৎ অভিজিৎ এখন শহরের বাইরে।

কারণ নং ৩-সাফল্য থাকলে তবেই না সেলিব্রেশন!

অন্য কেউ সুমনের নীরবতাকে হয়তো লজ্জা হিসেবে গণ্য করে এরপর রেহাই দিতো কিন্তু ওসব ছেঁদো সেন্টিমেন্টকে পাত্তা দেয়ার মানুষ ডক্টর বামদেব মুখার্জি নন। তাই এরপরও বাঁকা স্বরে বলবেন,“সকাল থেকেই যে দিয়ার কন্ডিশন খারাপ সেটা বোঝেননি? নাকি স্ত্রীর দিকে তাকানোটাও ওই সাতপাঁচের ভেতরে!”

বাধ্য হয়ে সুমনকে কৈফিয়ৎ পেশ করতেই হবে।

--আজ স্যার অফিসে বিশেষ তাড়া ছিল, তাড়াতাড়ি বেরুতে হয়েছিল। তখনও দিয়া ঘুম থেকে ওঠেনি জন্য আর বিরক্ত করিনি।

--তাহলে তো আপনি কর্মবীর মোশায়! স্ত্রীকে উইশটুকু করার পর্যন্ত সময় নেই আপনার।

যতই ফাঁদ পাতুন বামদেব, এড়িয়ে যাবে সুমন।

--ওসব উইশ টুইশকে দিয়া ফালতু ন্যাকামি মনে করে। অন্ততঃ আমার কাছ থেকে। রেগে যায়। এ অবস্থায় ওকে রাগানোটা কি ঠিক হতো স্যার? তবে চিন্তা তো একটা ছিলই।

--চিন্তা যে কতটা ছিল সে তো বুঝতেই পারছি। নাহলে ফোন অ্যাটেন্ড না করে দিব্যি অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়ে বারে বসতে পারেন?

মদের প্রসঙ্গটা এড়াতে সুমনকে তাড়াতাড়ি বলতেই হবে, “ফোনটা যখন এসেছিল তখন সীটে ছিলাম না। যে ফোনটা ধরেছিল সে বলতে পারেনি ফোনটা কোথা থেকে এসেছিল। আমি নেই শুনেই ওপার থেকে নাকি লাইনটা কেটে দেয়া হয়েছিল!”

--সীটে ছিলেন না! কোথায় গিয়েছিলেন?

এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তেই পারবে সুমন, যাক,বুড়ো বাঘটা তবে ওয়েল ইনফর্মড নয়! তথ্যে ঘাটতি রয়েছে। অবশ্য ওটুকু ঘাটতি থাকারই কথা। সুমন তো কাউকে বলে সীট ছাড়েনি। আচমকা জানালায় চোখ যেতেই চমকে উঠেছিল, আররে, এত মেঘ জমলো কখন? সকালটা তো বেশ ঝলমলেই ছিল! তবে কি ফের সমুদ্রের ডিপ্রেশন জাগলো? ওফ, ব্যাটা ভোগেও বটে! মানুষকেও হার মানিয়ে দিচ্ছে।

ডিপ্রেশনটা ডীপ না হেভি, সেটা বুঝতে এরপর ছাদে গিয়েছিল সুমন। আকাশের দিকে তাকিয়ে রীতিমত সমাধিস' হওয়ার উপক্রম। শ্লেট রঙা আকাশটাকে পশ্চাদপট হিসেবে ব্যবহার করে একপাল বক উড়ে চলেছে পশ্চিম থেকে পুবে। শাদা কালোর অনবদ্য বৈপরিত্যে আকাশটা রীতিমত ঝলসে উঠছিল। দেখতে দেখতে সুমনের মনে হয়েছিল, এই দৃশ্যটা দেখানোর জন্যই কেউ তাকে টেনে নিয়ে এলো ছাদে!

--একা একা ছাদে দাঁড়িয়ে কী দেখছেন স্যার?

আচমকা প্রশ্নে ঘাড় ফিরিয়ে দেখেছিল সুমন। সুমনা সান্যাল। মাস ছয়েক হলো জয়েন করেছে। এর মধ্যেই অন্যদের দেখাদেখি ফাঁকিবাজিটা রপ্ত করে ফেলেছে। তবে ধরনটা আলাদা। পরনিন্দা না করে গল্পের বই পড়ে অফিসের সময় নষ্ট করে। দু-একবার হাতে নাতে ধরেও ফেলেছে সুমন। সুনন্দা তাড়াতাড়ি বইটা লুকিয়ে ফেলায় সুমনের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি, সুনন্দার রুচিটা কী ধরনের।

সেই সুযোগটা রাতারাতি হাজির হওয়ায় খুশী হয়েছিল সুমন।

--কাম অন। ভালো করে দ্যাখো আকাশটা, স্পেশালি ওই বকগুলোকে, তারপর বলো তো আমি কী ভাবছি?

সুনন্দাও মুগ্ধ চোখে দেখেছিল দৃশ্যটা,ততক্ষণ,যতক্ষণ না বকগুলো বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যায়। তারপর হেসে বলেছিল,“ওভাবে কিছু বলা যায়! আমি কি থট রিডার নাকি! অ্যাটলিস্ট একটা ক্লু দিন।”

সূত্র দিয়েছিল সুমন।

--ওক্কে, রামকৃষ্ণ রিলেটেড। খুব বাজার চালু গল্প। এবার বলো।

ফের আকাশের দিকে তাকিয়ে সুনন্দা বলেছিল,“কথায় কথায় যিনি সমাধিস্থ হতেন তার পক্ষে এমন দৃশ্যে সমাধিস্থ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। এটাকে বাজার চলতি গল্প বলে আন্ডার এস্টিমেট করছেন কেন? আপনার মতো লোকও তো এতক্ষণ ওই দৃশ্যেই আটকে ছিলেন!”

একজন অধস্তন কর্মচারির মুখে ওরকম তাচ্ছিল্য শুনে রেগে ওঠার কথাই ছিল সুমনের কিন্তু পারেনি। বরং সুনন্দার সাফল্যে খুশী হয়েছিল। আরও খানিকটা রাগিয়ে দিতে বলেছিল,“ওসব সমাধি ফমাধি ফালতু কথা। আসলে মৃগীরোগী ছিলেন, যখন তখন অ্যাটাক হতো। তোমরা ওকে দেবতা বানানোর জন্য রঙ চড়িয়েছ।”

সুনন্দ পাল্টা বলেছিল,“আমি ওঁকে দেবতা ভাবি কিনা সেটা জানিনা, তবে মৃগীরোগী যে ভাবিনা সেটা বলতে পারি।”

সুনন্দার কথাগুলো শুনতে শুনতে বুকের মধ্যে একটা উত্তেজন টের পেয়েছিল সুমন, ঘোড়দৌড়ের উত্তেজনা। বাজী ধরা ঘোড়াটাকে প্রথম পাকেই এগিয়ে যেতে দেখলে ঘাঘু রেসুরেও যেমন নিজেকে নির্বিকল্প রাখতে পারেনা, নিজের উত্তেজনা ধার দিয়ে ঘোড়াটাকে শেষ অবধি এগিয়ে দিতে চায়, সেভাবেই সুমন বলেছিল,“ফর ইয়োর ইনফর্মেশন, ভদ্রলোক কিন্তু ইমপোটেন্ট ছিলেন। সেই অক্ষমতা গোপন করতেই স্ত্রীকে দেবী সাজিয়ে পুজো করতেন। ইট ওয়াজ সিম্পলি চিটিং।”

এরপর আর দাঁড়ায়নি সুনন্দা, ছাদ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। যেতে যেতে বলে গিয়েছিল, “আপনার ইনফর্মেশান আপনার কাছেই থাকুক। কাকে পোটেন্সি বলে,সত্যি বলছি, জানিনা স্যার। চিটিং ছাড়া দাম্পত্য টেঁকে কিনা, সেটাও বলতে পারব না। মাফ করবেন।”

সুনন্দা নেমে যাবার পরও ছাদে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল সুমন,একা। মনে হয়েছিল, নামে যদি বৃষ্টি নামুক। বহুদিন পর ভিজবে, একা একা।

জমে থাকা মেঘ আচমকা কেটে যাওয়ায় নেমে এসেছিল বটে তবে সীটে ফিরে যাবার ইচ্ছে জাগেনি। বেরিয়ে পড়েছিল রাস্তায়। সেই রাস্তাটা যদি কোনো পানশালার ভেতরে ঢুকে যায়, কি করতে পারে সে?

উত্তর না পেয়ে এবারও নির্ঘাৎ প্যাঁচ কষবে তেএঁটে বামদেব মুখার্জি।

--অবশ্য আপনি বরাবরই সেলফিশ। মোর দ্যান আ ক্রিমিনাল। স্যরি টু সে। বাট, বাপের মৃত্যুসংবাদ পেয়েও যে ছেলে শেষ দেখাটুকু দেখতে যায়না, অশৌচ পালন করেনা, এমন কী শ্রাদ্ধশান্তিটুকুও না, তাকে কি বলা উচিৎ, রিয়ালি আই ডোন্ট নো।

এবার হাসতেই পারে সুমন। মুচকি নয়, হো হো। হেসে ঘরটাকে ফাটিয়ে দিয়ে বলতেই পারে, “আপনি নির্ঘাৎ কাম্যুর ‘আউটসাইডার’ পড়েছেন স্যার? পুরোটা না পড়লেও কয়েক পাতা। সেটুকুও না পড়ে থাকলে গল্পটা যে শুনেছেন সেটা বলতেই পারি। আমাকে তাই মর্সিউ বানিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু স্যার আমার সেই যোগ্যতাটুকুও নেই। কফিনের সামনে ঘুমিয়ে পড়ার মতো অতটা উদাসীন, বেপরোয়া হওয়া কি চাড্ডিখানি কথা! আপনি আমার সম্পর্কে পুরোটা জানেন না তাই ওসব বানাচ্ছেন। শুনুন তবে।

আমার বাবা বহুদিন আগেই মারা গিয়েছেন। আমি চাকরি পাবার পরপরই। যেদিন মেজদার ডিভোর্স কেসে বউদির পক্ষে সাক্ষী দিয়েছিলাম সেদিনই। কোর্টে দাঁড়িয়ে বলে দিয়েছিলাম, সাময়িক ভালো থাকলেও আমার মেজদা বরাবরই পাগল। আমাদের বাড়ি থেকে সেই তথ্য গোপন করে বিয়ে দেয়া হয়েছিল।

আমার সাক্ষে সেদিন মেজবৌদির লাভ হলেও আমার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল। আমার বাপ সেই শকটা সহ্য করতে না পেরে মরে গিয়েছিল,স্যার। এরপর যিনি বেঁচেছিলেন তিনি ছিলেন রাঙামাটি চা বাগানের হেডক্লার্ক বিমল মন্ডল। তিনি যেহেতু আমার কেউ নন তাই তার মৃত্যুতে আমার অশৌচ পালন কিংবা শ্রাদ্ধশান্তি করার প্রশ্নই ওঠেনা।”

সুমনের তথ্যে প্রচুর নাটকীয়তা থাকায় হয়তো কিছু বলতে পারবেননা ডক্টর মুখার্জি। বাধ্য হয়ে প্রসঙ্গ বদলাবেন।

--আচ্ছা, আপনি বিয়ে করেছিলেন কেন বলুন তো!

এবার দান ছাড়বে না সুমন। উঠে দাঁড়িয়ে মাল্যবান থেকে ফের উদ্ধৃতি দেবে।

--তিনটে ক্লু দিচ্ছি,আপনি বরং বেছে নিন স্যার।

মৃত্যুকে দলিত করবার জন্য?

জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য?

প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ তুলবার জন্য?

সুমনের এহেন দুঃসাহসে নিশ্চয়ই ঘাবড়ে যাবে বামদেব! তাড়াতাড়ি বলে উঠবেন,“আরে বসুন, বসুন। ডোন্ট গেট এক্সাইটেড। আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি।”

না, বসবে না সুমন। বরং উঠে চলে যাবে। যেতে যেতে বলে যাবে,“আপনি বাল বুঝেছেন। আপনার ক্ষমতাই নেই কাউকে বোঝার। আপনিও এক ধরনের ইমপোটেন্ট স্কাউন্ড্রেল।”

হঠাৎ চেয়ারের শব্দে চমকে ওঠে সুমন। ডক্টর বামদেব মুখার্জিকে টেবিল পেরিয়ে আসতে দেখে ঘাবড়ে যায়। তবে কি কথাগুলো বলেই ফেলেছে সুমন! এখন কী হবে!

টেনশন সহ্য করতে না পেরে টেবিলে মাথা নামিয়ে ফেলে সুমন। টের পায় পিঠে পড়ছে ভালুকের মৃদু চাপড়।

--ডোন্ট গেট নার্ভাস। আমরা তো আছি,নাকি? হোপ,উই উইল বি এ্যাবল টু হ্যান্ডেল। আপনি হাজব্যান্ড, রিস্ক ফ্যাক্টরটা জানিয়ে রাখা উচিৎ, তাই জানিয়ে রাখলাম। নাও ইউ ক্যান গো। তবে কাছাকাছি থাকবেন, আপনার ডিসিশন প্রয়োজন হতোে পারে।

ছিটকে বেরিয়ে এলো সুমন। খোলা হাওয়ার প্রয়োজন। তারচে’ও বেশী প্রয়োজন একটা সিগারেট এবং অনেকটা ধোঁয়ার।

--কী এতক্ষণ ভ্যাজর ভ্যাজর করছিলে মুখার্জির সঙ্গে? যত্তো সব ইরেসপন্সিবল জুটেছে আমারই কপালে। বলে কিনা, যা বলার হাজব্যান্ডকে বলবে! জানেনা তো হাজব্যান্ডের নমুনা।

সিগারেটের প্যাকেটটা বাধ্য হয়েই পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো সুমন। তাকালো চারদিকে। স্যার প্রিয়নাথ আজ সোজা ব্যাটে খেলতে শুরু করেছেন। সেটা অবশ্য একদিক থেকে ভালোই। মিষ্টি কথার মোড়কে প্রচ্ছন্ন হুমকির চে’ এভাবে সরাসরি মুখোশ খুলে বেরুনোটা পছন্দই করে সুমন। যদিও পাশাপাশি স্থান,কালটাও গুরুত্বপূর্ণ। এই নার্সিংহোমটা দামী হলেও নামীতো বটেই। সুতরাং ভিড়ও যথেষ্ট। তাদের কেউই সুমনকে না চিনলেও কেউ কেউ স্যার প্রিয়নাথ চ্যাটার্জিকে চিনতেও পারে। তারা প্রিয়নাথ স্যারের আসল রূপটা দেখে চমকে উঠতেও পারে।

দিয়ার ভাই বোধহয় বুঝতে পারলো ব্যাপারটা, তাড়াতাড়ি সামাল দেয়ার চেষ্টা করলো।

--কুল বাপি। দিস ইজ নট দ্য প্রপার টাইম। তাছাড়া ডক্টর মুখার্জিতো ঠিকই করেছেন। আফটার অল সুমনদাই তো দিদির লিগাল গার্ডিয়ান। উই আর জাস্ট থার্ড পার্সন।

কিন্তু পরিবেশকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করতে নারাজ স্যার প্রিয়নাথ।

--থামোহ। জাস্ট শাটাপ। আমায় ল দেখিয়োনা। তোমাদের ভাইবোনের অনেক বাড়াবাড়ি সহ্য করেছি। ইনাফ ইজ ইনাফ। নট আ সিঙ্গল ওয়র্ড আই ওয়ন্ট টু লিসন্‌ ফ্রম ইউ।

এবার সুমন সত্যিই অবাক। এ কী কথা! একগাদা আম পাবলিকের সামনে শ্রী কাঁঠাল চ্যাটার্জি কিনা তাঁর একমাত্র উত্তরাধিকারিকে ধমকাচ্ছেন! হঠাৎ কী হলো ভদ্রলোকের?

প্রিয়নাথের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়টা দ্বিগুণ হয়ে গেল সুমনের। এ কী চেহারা হয়েছে স্যারের! ধবধবে মুখটায় কে যেন কালি ঢেলে দিয়েছে! শার্টটাও ঠিকঠাক প্যান্টের ভেতর গোঁজা নেই। এমন কী টাইটাও একদিকে হেলে রয়েছে!

সুমনের খুব ইচ্ছে হলো প্রিয়নাথ চ্যাটার্জির কাঁধে মৃদু চাপড় দিয়ে বলার,“কাম অন স্যার। অত নার্ভাস হচ্ছেন কেন? পুরুষ মানুষের অত নার্ভাস হলে চলে? তাছাড়া চারদিকে এত ক্যাচ আপনার,ব্যাঙ্ক ভর্তি টাকা,আপনার মেয়ের কখনও খারাপ কিছু হতে পারে!”

নার্সিংহোমের গেটের দুপাশে দুটো শাদা আলোর গ্লোব বসানো রয়েছে,গ্লোব ঘিরে উড়ছে অজস্র পোকা। আলো ছোঁয়ার জন্য মরীয়া হয়ে উঠেছে। আশ্চর্য তো, ওদের কি চোখে পড়ছেনা গ্লোবের ভেতর মরে থাকা অজস্র পোকার শরীর? বুঝতে পারছে না, আলো ছোঁয়ার এই লোভ কি পরিণতি ডেকে আনতে পারে? নাকি ওই মৃত্যুই ওদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা!

ভাবতে ভাবতে মৃদু স্বরে বলে সুমন,“আপনি অত টেন্সড হবেন না। ডক্টর মুখার্জি বললেন, বেবির পজিশনে একটু গন্ডগোল থাকলেও সামলে নিতে পারবেন। বাকি সব ঠিকই আছে। সামান্য একটু আর্লি ডেলিভারি হলেও বেবির ওয়েট পারফেক্টলি নর্মাল। এরচে’ও অনেক ক্রিটিক্যাল কেস সামলেছেন উনি।”

চমকে সুমনের দিকে তাকালেন প্রিয়নাথ,

--বলেছে?

তারপর সুমনের হাতটা টেনে নিয়ে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন,“থ্যাঙ্কু, মাই ডিয়ার। বাঁচালে তুমি। ওফ, এতক্ষণ যা টেনশন হচ্ছিলো! ওদিকে দিয়াটাও বড্ড বাড়াবাড়ি করছিল। বলে কিনা, তুমি না আসা অবধি নার্সিংহোমে ভর্তি হবেনা। ওদিকে তোমায় কনট্যাক্ট করা যাচ্ছেনা, এদিকে মেয়েটার ব্লিডিং হচ্ছে, মাই গড, সে যে কী টেনশন! আমার সেরিব্রাল অ্যাটাক হওয়ার জোগাড়।”

প্রিয়নাথের মুঠোটা আলগা হতেই ছাড়িয়ে নিলো সুমন।


(দুই)

তেরোতম সিগারেটটা ধরিয়ে ওপরের দিকে ধোঁয়া ছাড়তে গিয়ে সুমনের চোখে পড়লো চারপাশের অন্ধকারের দৃঢ়তা ভাঙতে শুরু করেছে। আকাশের রঙটা যেন ছানার জল। দু-একটা তারা আছে বটে তবে সেগুলোও কেটে পড়ার তালে রয়েছে। অর্থাৎ সকাল হতে চলেছে। অর্থাৎ কাটিয়ে দেয়া গেল একটা দুঃস্বপ্নের রাত। একা একা অনেক রাত জেগে কাটিয়েছে সুমন, তবে সেসবের সঙ্গে কালকের রাতটার কিছু ফারাক রয়েছে। এই প্রথম কোনো রাত কারুর কথা ভেবে দুশ্চিন্তায় কাটিয়েছে। যতবার মাথাটা ঢলে পড়তে চেয়েছে ততবারই কে যেন সুমনের চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকুনি মেরে জাগিয়ে দিয়েছে! নার্সিংহোমের কোনো কর্মচারিকে ভিজিটর রুমের দিকে আসতে দেখলেই ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছে, তবে কি ডিসিশান জানানোর সময় এসে গিয়েছে? কি ডিসিশান দেবে সুমন? কোন অধিকারে? যে দিয়া গতকাল সুমনের অনুপসি'তিতে নার্সিংহোমে ভর্তি হতোে চায়নি সেই দিয়া তো সুমনের অচেনা! অচেনা কারুর ব্যাপারে ডিসিশান জানাবে কেন সুমন?

--আপনাকে স্যার ডাকছেন।

একজন ওয়ার্ডবয় এসে খবরটা দিতেই হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো সুমন। অর্থাৎ ঘটনাটা শেষ অবধি ঘটলোই!

ঘরের ভেতরে ঢুকতেই সুমনের চোখে পড়লো সোফার ওপর বেঁকেচুড়ে ঘুমোচ্ছে দিয়ার ভাই। শোয়ার ভঙ্গী দেখে কে বলবে স্যার প্রিয়নাথ চ্যাটার্জির একমাত্র উত্তরাধিকারি! ভাইয়ের পুরুষাকার নিয়েই না গর্ব ছিল দিয়ার?

ও.টির দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ডক্টর বামদেব মুখার্জি। পরণের ধরাচুড়ো দেখেই বোঝা যাচ্ছে সদ্য ও.টি থেকে বেরিয়েছেন। এমন কী হাতের গ্লাভসে রক্তও লেগে রয়েছে।

এসবই যে তাকে ঘাবড়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র,সেটা বুঝতে পেরে মনে মনে হাসে সুমন। ডক্টর মুখার্জির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করে,“হ্যাল্লো স্যার, হোপ ইউ হ্যাভ ডান দ্য জব সাকসেসফুলি?”

ভদ্রলোক খানিকটা হলেও যে টসকালেন সেটা নজর এড়ায় না সুমনের। তবু সেয়ানা লোক তো, তাই চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন,“ইট ওয়জ নট সো ইজি। অনেক ফাইট দিতে হয়েছে।”

কৃতজ্ঞতা মাখানো হাসি উপহার দিতে গিয়েও নিজেকে রুখলো সুমন।

--সো দ্যাট উই হ্যাভ সিলেক্টেড ইউ।

সুমনের মুখের দিকে তাকালেন ডক্টর বামদেব। কিছু বললেন না।

--বাই দ্য বাই, দিয়াকে একবার মিট করতে পারি?

পিছু ফিরলেন ডক্টর বামদেব মুখার্জি। নাকি পিছু হঠলেন! সে যা-ই হোক, ফের ঢুকে গেলেন অপারেশান থিয়েটারের ভেতরে। যেতে যেতে বলে গেলেন,“নট নাও। এখনও পুরোপুরি সেন্স ফেরেনি। বেডে দেয়া হলে দেখা করবেন। নাউ ইউ ক্যান সী ইয়োর চাইল্ড ওনলি।”

ডক্টর মুখার্জি ঢুকে যেতেই কোলে একটা তোয়ালের পুঁটলি নিয়ে ভেতর থেকে একজন আয়া বেরিয়ে এলো। একগাল হেসে বললো,“মোটা বখশিস দিতে হবে কিন্তু । আপনার ছেলে হয়েছে। বৌদির কাছে শুনেছি আপনার ছেলের শখ ছিল খুউব।”

আয়ার মুখের দিকে অবাক চোখে তাকালো সুমন,বলছে কি এই মহিলা! দিয়া এসব খোশ গল্প করেছে এই দুটাকার কামওয়ালির সঙ্গে! তাছাড়া সুমন কি আদৌ ওরকম কোনো শখের কথা জানিয়েছিল দিয়াকে? কবে? সাত মাস একুশ দিন আগেকার সেই অদ্ভুততর রাতে? নাকি সুমনের নাম করে বানিয়ে বানিয়ে বলেছে দিয়া!

তোয়ালে সরিয়ে ধবধবে পুতুলটাকে সুমনের সামনে তুলে ধরে আয়া। তারপর নবজাতকের কুঁকড়ে থাকা পা দুটো দুপাশে সরিয়ে দিতে দিতে বলে,“ভালো করে দেখে নিন, ছেলেই হয়েছে আপনার।”

বাইরে অন্ধকারের লেশমাত্র নেই। চারপাশ প্রথম আলোয় ছয়লাপ। সেই আলোয় সুমন দেখলো কড়ে আঙুলের চে’ও অনেক ছোট্ট একটা অঙ্কুর মাথা তুলে সাগ্রহে চেয়ে রয়েছে সুমনের দিকে। সেই অঙ্কুরের দিকে তাকিয়ে সুমন প্রশ্ন করে,“আপনি আমার কাছে কেমন ব্যবহার আশা করেন স্যার?”

অঙ্কুর উত্তর দেয়,“পুত্র যে ব্যবহার আশা করে তার পিতার কাছ থেকে!”

--আমি কেমন ব্যবহার আশা করবো আপনার কাছ থেকে?

--ছিঃ, পিতাকে প্রত্যাশা করতে নেই। তাকে শুধু দিয়ে যেতে হয়। দিয়ে দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করে যেতে হয়। যখন আমার দিন আসবে, এভাবেই আমার থেকে জন্ম হবে এমনই নতুন কোনো অঙ্কুরের, সেদিন থেকে আমারও প্রত্যাশার কাল ফুরোবে। শুরু হবে দেয়ার পালা। ইহাই পুরুষধর্ম।

সুমনকে নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘাবড়ে যায় আয়া।

--যা দেবেন তাড়াতাড়ি দিন। বেবিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। দুধ খাবে।

আয়ার ব্যস্ততা দেখে হেসে ফেলে সুমন। এরকম ঐতিহাসিক সংলাপ উচ্চারণের অপেক্ষাতেই তো ছিল সে। সেই সুযোগ যে করে দিলো তাকে কি বঞ্চিত করা যায়? সুমন কি তেমন বাপ,নাকি তেমন বাপের ব্যাটা?

পেছনের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সুমন,তারপর একমুঠো টাকা বের করে ছেলের পুরুষাঙ্গের চারপাশে ঘুরিয়ে ছড়িয়ে দেয় বাতাসে, পুরুর স্টাইলে ।



লেখক পরিচিতি:
অলোক গোস্বামী
কথাসাহিত্যিক।
শিলিগুড়িতে থাকেন।




1 টি মন্তব্য:

  1. আমি শিলিগুড়িতে থাকি না। বছর এগারো কোলকাতার বাসিন্দা। -- অলোক গোস্বামী।

    উত্তরমুছুন