মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

তৃষ্ণা বসাকের গল্প : দূরে আকাশ শামিয়ানা



মুনাই টলমল পায়ে সদর দরজায় এসে দাঁড়াল। সে যে বাইরে এসেছে কেউ খেয়াল করেনি। সুযোগ পেলেই সে এখানটায় এসে দাঁড়ায়, রাস্তা দিয়ে যত লোক যায়, সবাইকে হাত নেড়ে ডাকে। বিজয়া বলেন কোনদিন কে এসে তুলে নিয়ে যাবে। বড় ছেলেমেয়েগুলোকে বলেন ওর ওপর নজর রাখতে, যথাসম্ভব চেষ্টাও করে তারা, কিন্তু কোন ফাঁকে সে বেরিয়ে যায় কে জানে। শুধু যদি গিয়ে বাইরের পইঠেয় বসে থাকত, তাও হত। সে যাবে আর রাজ্যের লোককে ডাকাডাকি করবে। অন্য দিনের তুলনায় হাটবারে এ রাস্তায় লোক চলাচল বেশি। বুধ আর শুক্র হাট বসে রাজারামপুরে। এত বড় হাট আশেপাশের গাঁয়ে বসে না, তাই চারপাঁচখানা গাঁ ভেঙে আসে লোকে। বারাদ্রোণ, একতারা, বেড়ান্দরী। হাটে কতরকম জিনিস , বিশেষ করে এ হাটের গামছার খুব নাম। আর সবচেয়ে ভালো লাগে চুড়ো করে সাজানো ডাল আর নানা শস্যবীজ দেখতে। সিমের বীজ, কুমড়োবীজ। অন্যপাশে মাছের পসরায় গোলগোল থলথলে মতো কী সব। ওগুলো নাকি কচ্ছপের ডিম। একবার মানিনীমাসী নিয়ে গেছিল মুনাইকে কোলে করে। মুনাই তার কোল থেকে ঝুঁকে পড়ে দেখতে দেখতে বলে উঠেছিল ‘দে দে কাবো কাবো’ মানিনীমাসী তাকে রাখতেই পারে না, কোনরকমে একঠোঙা কটকটি কিনে হাতে দিয়ে ভুলিয়েছিল। তারপর বাড়িতে এনে বাইরের পইঠেয় বসিয়ে বলেছিল ‘নোনোকে নে আর ঝদি কোনদিন যাই! বামুনের ঘরের মেয়ে, বলে কি না কচ্ছপের ডিম খাবে! মাগো!’

বিজয়া শুনে ঠোঁট শক্ত করে বলেছিলেন ‘শিশু নারায়ণ! ও কি বুঝে বলেছে। তুমি বা ওকে হাটের ভিড়ে নিয়ে গেলে কোন সাহসে? কতবার বলেছি আমাকে না বলে বাচ্চাদের কোথাও নিয়ে যাবে না’

সেই থেকে মানিনীমাসী আর মুনাইকে সহজে কোথাও নিয়ে যায় না। মুনাই হাজার কান্নাকাটি করলেও সে শক্ত মুখে বলে ‘বাব্বা আর ঝাই! ঝা খাণ্ডার মা। ছেলেপিলেকে যেন মুটোয় পুরে রেকেচে। এ গেরামে তোমার মার মতো যদি মা দেকেছি।’ মুনাইয়ের বয়স এখনো পাঁচ হয়নি, তাই মানিনীমাসীর কথাগুলো সে ভালো বুঝতে পারে না। তবে এটুকু বুঝতে পারে মাকে মানিনীমাসী পছন্দ করে না। মুনাই ভাবে সেও তো পছন্দ করে না মাকে। খালি এটা খেও না, ওখানে যেও না, কেন ইজের পরোনি, কেন চুল আঁচড়ানো নেই, কেন ধুলো ঘাঁটছ সারাদিন? তার খুব কান্না পায় হঠাৎ। বড়দির ফিরতে কত দেরি হচ্ছে! বড়দি ছাড়া তাকে কেউ ভালবাসে না এই বাড়িতে। বড়দি এসেই তাকে কোলে তুলে নেবে, হাত পা ধুইয়ে পরিষ্কার জামা পরিয়ে দেবে, মুখে পাউডার মাখিয়ে কাজল পরাবে, চুল আঁচড়িয়ে টেনে বেঁধে দেবে, দুটো বিনুনি, বিনুনির নিচে লাল ফিতে দিয়ে আবার ফুল করা। বড়দি পারেও কত কী!কি সুন্দর লাল ফিতে পাটে পাটে ভাঁজ করে গোলাপ ফুল বানাতে পারে। মা পারে কিছু? ছাই পারে। যখনি দেখো উনুনের ধারে বসে বাবার জন্যে পরোটা বেলছে। কেন, মুনাইয়ের কি পরোটা খেতে ইচ্ছে করে না? খুব করে। পরোটা চাইলে মা খালি দুধ ভাত খেতে দেবে। বলবে, পরে নাকি কেউ দুধ খেতে দেবে না। যত বাজে কথা। বেশি রেগে গেলে আবার ঠোঁট টিপে বলবে ‘অধিক সন্তানের জননী হওয়া কী যে পাপ’ এর মানে দিদিকে জিগ্যেস করেছিল মুনাই। দিদি বলেছে তারা অনেকগুলো ভাইবোন মাকে দিনরাত জ্বালায়, তাই মা দুঃখে এই কথা বলেছে।

মুনাই চোখ মুছতে মুছতে দেখল বড়দি আসছে হাটের পুকুরঘাটের পাশ দিয়ে। তার ছোট্ট বুকটা আনন্দে ছটফট করে উঠল, তার ইচ্ছে করল এক ছুটে বড়দির কাছে চলে যায়, এই রাস্তাটুকু বড়দির কোলে চড়ে আসে। সবাই দেখুক সে বড়দির কোলে চড়ে আসছে। মা তো তাকে কোলে নেয় না, রাত্তিরে কোল ঘেঁষে শুতে গেলে কেবল বলে ‘একটু শুতে দে, আর পারি না এদের জ্বালায়! সারাদিন তোদের জন্যে খেটে খেটে হাড়মাস কালি করব, আবার রাতের ঘুমটুকুও পাব না!’ চাই না অমন মা! ঠোঁট ফুলিয়ে ভাবল মুনাই। তার তো বড়দি আছে, রাতে এখন থেকে সে বড়দির কাছেই শোবে। বড়দি সারাদিন থাকলে তার কত ভালো। বড়দি স্নান করায়, খাওয়ায়, সাজিয়ে দ্যায়, বিকেলে খাদি মন্দিরে বেড়াতে নিয়ে যায়, আর কত গান শোনায়, বড়দির গানের রেশ সারাদিন তার সঙ্গে থাকে।

বড়দির মতো গুছিয়ে কাজ কেউ পারে না। সকালে তাড়াহুড়ো করে বড়দি মাখম, ডিম সেদ্ধ, আলু সেদ্ধ, ভাত খেয়ে চলে যায়, তখন তাকেও খাইয়ে দ্যায়।

মুনাই ছুটে গেল বড়দির কোলে উঠবে বলে। দেবীও ছুটে এল ভয় পেয়ে। এই রাস্তায় বড় গাড়ি চলে না ঠিকই, কিন্তু একটা জোরে চলা সাইকেল বা ভ্যানের সামনে পড়লেই তো গেল!ছোট্ট মানুষ, টাল সামলাতে পারবে না, আর রাস্তার যা ছিরি, বাসরাস্তার মতো পিচের রাস্তা তো নয়, খোয়া ওঠা, একবার পড়লেই হাঁটুর নুন ছাল উঠে যাবে।

মুনাইকে কোলে তুলে দেবী অন্যমনস্ক হয়ে যায়। এই রাস্তায়ও তো গাড়ি আসত, একটা না অনেকগুলো, শুটিং হত, মাধু মানে মাধুরী সাহা, নায়িকা, সেটা যে তার প্রথম ছবি বোঝাই যায়নি, পাহাড়ী স্যান্যালের সঙ্গে সমানে সমানে অভিনয় করে গেছে।ওই একটা সিনেমা সে দেখেছিল টকি হাউসে গিয়ে। একটা লোক এসে অনেকগুলো পাস দিয়ে গিয়েছিল। সেই তার প্রথম সিনেমা দেখা।সত্যি বলতে কি, সেই শেষ সিনেমাও হলে গিয়ে। তারপর মাঝে মাঝে ইস্কুল মাঠে পর্দা টাঙ্গিয়ে যে সিনেমা দেখানো হয়, সেখানে দুএকবার দেখেছে সে। লব কুশ, বিল্বমঙ্গল। সেসব কেমন বাচ্চা বাচ্চা লাগে দেখতে।

‘সুরের ভুবন’ সিনেমাটা যে খুব ভালো হবে, তা শুটিং দেখেই বোঝা গেছিল। গ্রামের লোক ভেঙে পড়ত শুটিং দেখতে। তারা মাধুর অভিনয় দেখে ফিসফিসিয়ে বলত ‘হবে না, বাঙাল মেয়ে তো, ওরা হচ্ছে জার্মানের জাত’

ইতিহাস বইতে জার্মানদের কথা পড়েছে দেবী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইহুদি নিধন। লোকে কেন বাঙ্গালদের জার্মান বলে কে জানে? ওরা তো ইহুদি। যারা বারবার দেশ হারায়। দেশ হারা, ভিটে ছাড়া বলেই তো অত জেদ কিছু করে দেখানোর। তার মতো মা আর ঠাকুমার রাঁধা গরম ভাত ঘি দুবেলা খেয়ে কিছু করা যায় কি? কিচ্ছু হবে না তার। কিচ্ছু না।

মায়ের জেদে এ গ্রামে মেয়েদের স্কুল খুলেছিল। মার জেদ আর শ্যামাপিসির অক্লান্ত চেষ্টায়। সেই স্কুলের প্রথম ছাত্রী ছিল পাঁচ জন। দেবী, পাশের গাঁ কঙ্কপুকুরের কাঁড়ারদের তিনটে মেয়ে, আর যতীন হালদারের বোন জবা হালদার। সেই স্কুল ক্লাস এইটের বেশি বাড়ানো গেল না কিছুতেই। পড়াই বন্ধ হয়ে যেত দেবীর। আবার সেই মার জেদ। দেবী ক্লাস এইটে হাজিপুর গার্লস স্কুলে ভর্তি হল। সেই শুরু তার বাসে যাতায়াত।

প্রতিবার যখনই সঙ্কট এসেছে, মা এমন বিপত্তারিণী হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দেবী টের পায়, মাও আস্তে আস্তে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, তার জীবনের আশা যেন নিভে আসছে। হবে নাই বা কেন? এখন এই মুনাইকে নিয়ে তারা মোট নজন ভাইবোন। ক্রমাগত সন্তান ধারণ করতে করতে, সন্তানের জন্ম ও লালন করতে করতে ফুরিয়ে যাচ্ছেন বিজয়া। আর খাওয়া দাওয়াও তো সেভাবে পান না। তারা ন ভাই বোন মিলেই সব খেয়ে নেয়, আর তাদের চেয়েও বেশি খায় মনে হয় বাবা। বাবা-অন্ত প্রাণ দেবীর কেমন মন খারাপ হয় ভাবলে। বাবা বরাবর সকালে উঠে চা দিয়ে মুড়ি আর মাখা সন্দেশ খায়, আর তখন ডেকে ডেকে তাদের ভাই বোনদের খাওয়ায়। কিন্তু সে কখনো দেখেনি মার জন্যে বাবা কিছু এনেছে আলাদা করে, বা বলেছে, এটা তোদের মা খেতে ভালবাসে।

মা বাবাকে ডাকে বড়বাবু, আপনি বলে। ‘বড়বাবু আপনি কি এখন চা খাবেন?’ ‘বড়বাবু এখন কি আপনার চানের জল বসাব?’ বাবা কিন্তু মার নাম ধরে ডাকে। বিজয়া। আর তুমি করে। অল্পই ডাকে, কিন্তু ডাকলে বিজয়া বলেই। দেবী ভাবে সম্পর্কটা আসলে কী? একজন উঠোনে দাঁড়িয়ে, আর একজন বারান্দায়?

মাধু বলেছিল, ওর বাবা নাকি কোথায় হারিয়ে গেছে। ঢাকার শাঁখারিটোলায় একটা সোনার দোকানে কাজ করত, এছাড়া সোনার দোকানের ধুলো ঝাঁট দিয়ে সোনা সংগ্রহ করত বছরের এক দিন। ঢাকায় দাঙ্গা লাগলে সে আর নাকি ফেরেনি। মা এক কাকার সঙ্গে তাকে নিয়ে অনেক ভাসতে ভাসতে এদেশে এসেছে। আহিরীটোলায় একটা ঘুপচি ঘরে থাকত তারা। মাধু তাকে চুপিচুপি বলেছে সেই কাকা নাকি রাতে তার মার সঙ্গেই শুত। একদিন বেলায় মা স্নানে গেলে তার বুকে হাত দিয়ে বলেছিল ‘গোলাপ তো ভালই ফুটসে’। মা এলে বলতে মা অমনি তাকে নিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর ছেড়ে, একটা মন্দিরে পড়ে থাকত তারা। সেখানে অজয় সরখেলের মা তাকে দেখে ছেলেকে বলে, ‘পরের সিনেমায় নিতে পারিস একে। উদবাস্তু মেয়ে, কিন্তু সুন্দর চেহারা।’

মুনাই বড়দির কোল থেকে ছটফটিয়ে নেমে এসে বলল ‘বড়দি, আমি একটা গান পারি, শুনবি?’ বলে সে দেবীর সম্মতির অপেক্ষা না করে কচি গলায় গাইতে শুরু করে-

‘ম্লান আলোকে ফুটলি কেন গোলকচাঁপা ফুল/ ভূষণহীনা বনদেবী কার হবি তুই দুল?’

দেবীর বুকে মৃদু ব্যথার মতো ঢুকে আসে গানটা। শুটিঙের শেষ দিনে এই গানটাই নন্দীদের পুকুরঘাটে বসে মাধুকে শুনিয়েছিল সে।সেইদিন পাহাড়ী স্যান্যালের শুটিং ছিল না। দেবী মন খারাপ করে ভেবেছিল আর কোনদিন মানুষটার সঙ্গে দেখা হল না তার। তখনি ঘাটের মাথায় এসে দঁড়িয়েছিলেন পাহাড়ী, তাদের ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন চণ্ডীমণ্ডপে, সেখানে কাকে দিয়ে যেন একটা অদ্ভুত বাক্স মতো জিনিস আনিয়েছিলেন, তার মধ্যে চাপিয়েছিলেন একটা গোল চাকতি। অমনি তাদের রাজারামপুরের আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল এক স্বর্গীয় সুরমূর্ছনা- ‘আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে/ আমার নয়ন দুটি শুধুই তোমারে চাহে ব্যথার বাদলে যায় ছেয়ে’

সেই অনুভূতির কথা ভাবলে আজো গায়ে কাঁটা দ্যায় দেবীর। লতা মঙ্গেশকর। খুব ছোটবেলায় গরিফায় এঁর একটা গান শুনে সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে পড়েছিল। ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে, মেরে লাল দুপাট্টা মলমল কা’ সেই লতা মঙ্গেশকর নাকি বাঙালি নন, মারাঠি, কিন্তু ‘আকাশপ্রদীপ জ্বলে’ শুনে সে কথা কে ধরতে পারবে? সেদিন ওই গোল চাকতি, যাকে বলে রেকর্ড, তার ওপরের কাগজের ঢাকায় তাঁর ছবি দেখে তার মুগ্ধতা আরও বেড়ে গিয়েছিল। সাদা শাড়ির আঁচল দিয়ে গা ঢাকা, দুটো মোটা মোটা বিনুনি বুকের ওপর দিয়ে নেমে এসেছে, শ্যামলা গোলগাল শান্ত মুখ। দেখে চমকে উঠেছিল । এ তো অবিকল সে। তার মতোই শ্যামলা, গোলগাল, শান্ত মুখ, তার মাথাতেও তো এত চুল। সেইদিন থেকেই সে লতাকে গুরু মেনেছে। পোশাকে আশাকেও সে লতাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে। ওইরকমই মোটা দুই বিনুনি হয় তার, কোন সাজগোজ নেই, শাড়ির আঁচল ঘুরিয়ে গা ঢাকা, তবে সে সাদা শাড়ি একদম পরতে পারে না। সাদা তার দু চক্ষের বিষ। তাছাড়া তাদের এই গ্রামের দিকে সাদা শাড়ি পরলে নিন্দে হবে। বলবে বিয়ে না হতেই বিধবার বেশ! বিয়ের কথায় দেবীর কী যেন মনে পড়ে গেল। কলেজে স্নিগ্ধা বলে একটা মেয়ে আছে, মাঝে মাঝেই কলকাতায় ওর মামার বাড়ি বেড়াতে যায়, সেখানে অনেক সিনেমা দেখে, গানের জলসা দেখে, সিনেমার ম্যাগাজিন পড়ে। সে পরশু বলেছে লতা মঙ্গেশকর নাকি বিয়ে করেননি। খুব ছোটবেলায় বাবা মারা যাবার পর এগারো বছরের মেয়ে সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। প্রথমদিকে নাকি সিনেমায় পার্ট করেছে, তারপর আস্তে আস্তে গানের জগতে আসে। মা, চার বোন আর এক ভাইয়ের বিরাট সংসার। আশা, ঊষা, মীনা আর হৃদয়নাথ। স্নিগ্ধা বলেছিল, লতা মাকে খুব ভালবাসে। শুনতে শুনতে বুকের মধ্যে উথালপাথাল করছিল দেবীর। তাদেরও তো খুব অভাবের সংসার। বাবা গানের টিউশনি করে কত সামান্য উপার্জন করে। প্রায়ই ধার করতে হয় এদিক ওদিক। যদিও গ্রামে আর টাউনেও শিবেন্দ্র খুব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, এমনকি বাসে পর্যন্ত টিকিট কাটতে হয় না অধিকাংশ দিন, তবু দেবীর চারপাশে কেমন এক দুঃখের ছায়া ঘিরে থাকে। মা একা আর কত পারবে? সে চলে গেলে কে দেখবে এই ভাইবোনগুলোকে? বিশেষ করে এই মুনাইকে? সে ঠিক করে, সেও লতার মতো কোনদিন বিয়ে করবে না, মা বাবা ভাই বোনকে দেখবে। সংসার চালাবে। গান গেয়েও যে সংসার চালানো যায়, তা তো লতাই দেখিয়ে দিয়েছে। সে হঠাৎ মুনাইকে বুকে চেপে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দ্যায় তাকে। ‘আমি কোনদিন বিয়ে করব না রে মুনাই, কোনদিন তোকে ছেড়ে যাব না’ মুনাই কী বোঝে কে জানে, সে আনন্দে বড়দিকে আরো জড়িয়ে ধরে।



বুঝবে না কেউ বুঝবে না

শিবেন্দ্রর যে ভাইটি কুঁকড়াহাটিতে থাকে, তার ছোট ছেলের অন্নপ্রাশন আজ।খোকো যেতে পারবে না, তার আজ একটা চাকরির পরীক্ষা আছে। ঠাকুর ঠাকুর করে যদি হয়ে যায়।মেজ বিজু চারদিন আগে চলে গেছে। একটা ছুতো পেলেই হল। ইস্কুল কামাই করে বসে থাকবে। বছরের মধ্যে কতবার সে নৈহাটি পালায় তার ঠিক নেই। দেবীর পরে বিনতা, কালো, দাঁত উঁচু বলে শিবেন্দ্র ওকে পছন্দ করেন না। বিনতা, বিন্তি সেটা জানে ভালো ভাবে, তাই সে বাবার থেকে একটু দূরে দূরে থাকে। তাকে দেখতে ভালো নয়, বড়দির মতো গানের গলাও তার নেই। এজন্যে সে একটু গুটিয়ে থাকে যেন। কেউ লক্ষ্য করেনি কী ভালো নাচে সে। একদিন দেবী গাইছিল ‘আমি যার নূপুরের ছন্দ বেণু তার সুর, কে সেই সুন্দর কে?’ বিন্তি খিড়কি পুকুরধারে গিয়ে কাঁদছিল। কারণ সকালে বাবাকে চা দিতে গিয়ে প্লেটে চা চলকে পড়ে গেছিল, বাবা চেঁচিয়ে উঠে বলল ‘ বিজয়া, কতবার বলেছি কেলেন্দিটাকে দিয়ে চা পাঠাবে না।’

দেবীর গান শুনে চোখ মুছতে মুছতে ছুটে এল বিন্তি, এই ক্লাস এইটেই সে শাড়ি ধরেছে। আসলে বিজয়া আর আগের মতো জামা সেলাই করে দিতে পারেন না, তাই শাড়িই পরতে হয় বেশি বিন্তিকে। দেবীও এইটের পর থেকে শাড়ি ধরেছিল, হাজিপুর গার্লসের নাইন থেকেই ইউনিফর্ম শাড়ি, লাল পাড় সাদা শাড়ি। দুখানা শাড়ি ছিল তার। ফকিরচাঁদ কলেজে ভর্তি হবার পর সেই শাড়ি আর লাগে না। বিন্তি সেগুলো পরে। সেই লাল পাড় সাদা শাড়ির আঁচল কোমরে পেঁচিয়ে সে নাচতে শুরু করল। ‘আমি যার বরষার আনন্দ কেকা/ নৃত্যের সঙ্গিনী যামিনী রেখা/ যে মম অঙ্গে কাঁকন কেয়ূর, কে সেই সুন্দর কে?’ দেবী গান গাইতে গাইতে অবাক হয়ে দেখল, নাচের ছন্দে ছন্দে কালো দাঁত উঁচু মেয়েটা কখন যেন অপরূপা হয়ে উঠেছে, তার চোখ মুখে কি আকুতি, কোন সুন্দরের প্রতীক্ষা করছে তার সেই অসুন্দর বোন? তার গলাটা একটু কেঁপে উঠল। তার মনেও কি কোন সুন্দরের প্রতীক্ষা আছে? সে বুঝতে পারে না। সেই যে কয়েক বছর আগে মাধু, মাধুরী সাহা এসেছিল, সে তার কানে কানে কত কথা বলেছিল, কে শুটিংর সময় ইচ্ছে করে তাকে জাপটে ধরেছিল, কে তার বুক ছুঁয়ে দিয়েছিল, সে বলেছিল, ‘মেয়েমানুষের কোথাও শান্তি নেই বুঝলি, বিশেষ করে এই ফিল্ম লাইনে, সব হায়নারা ওত পেতে আছে’।তারপর সে গলা নামিয়ে যেন কোন গোপন কথা বলছে, দেবীকে বলেছিল ‘রজনীমাসী কি বলেছে জানিস, বলেছে, শরীর হচ্ছে তোর জমানো টাকা, সেই টাকা ভাঙ্গিয়ে খেতে হবে। তাই হিসেব করে চলিস মাধু, বেহিসেবী হয়েছিস কি তোকে ঝেঁটিয়ে আস্তাকুঁড়ে ফেলবে। তখন সোনাগাছিতেও জায়গা হবে না’

দেবী অবাক হয়ে বলেছিল ‘সোনাগাছি কী গো?’

মাধু গালে হাত দিয়ে বলেছিল ‘তুই তো অবাক করলি দেবী! এই গাঁয়েও তো আছে রে। তোদের কাওরা পাড়ায়। আরে সারা দুনিয়ায় আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় সারা দুনিয়াটাই সোনাগাছি’

দেবী তাও বোঝে নি। কাউকে জিগ্যেস করতেও সাহস হয়নি।একবার একটা গালাগাল শিখে এসে বাড়িতে বলতে, মা উঠোনে পড়ে থাকা নারকেল ডেগো দিয়ে পিটিয়ে তো ছিলই, তার ওপর মুখে গোবর পুরে দিয়েছিল। দেবী বমি করে করে হাল্লাক হয়ে গেছিল। কোন বাজে কথা শুনলেই তার মুখে গোবরের স্বাদ উঠে আসে। সোনাগাছি যে একটা বাজে কথা –একথা আন্দাজ করতে পেরে কাউকেই জিগ্যেস করতে পারেনি সে।

বিন্তির নাচ দেখে তার মনে কীসের যেন বেদনা উথলে উঠল। কী যেন পায়নি সে। নাকি কোন রহস্যের খুব কাছে চলে এসেছে তার মন? একটা ঘটনা ঘটেছে কদিন আগে। কলেজের ফাংশন হয়েছে , সেখানে সে গান গেয়েছিল। গানটা গাওয়ার সময় একটু অপরাধ বোধ হয়েছে তার। তার গুরুর গান না গেয়ে এই প্রথম সে অন্য কারো গান গাইল। আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘ও আমার ছোট্ট পাখি চন্দনা।’ গাওয়ার পর খুব নামডাক হয়েছে তার। কিন্তু খুব সমস্যাও হচ্ছে। কলেজ যাতায়াতের পথে ছেলেরা তাকে দেখলেই বলছে –‘ওই যে ছোট্ট পাখি চন্দনা যাচ্ছে’। এমনিই স্বভাব লাজুক দেবী, এতে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। কলেজে যাওয়াটাই তার একটা বিড়ম্বনা হয়ে গেছে। তার ওপর সেদিন লজিক ক্লাসের পর, ক্লাসরুম যখন একেবারে ফাঁকা, সবাই এখন নদীর ধারে গিয়ে বসে, দেবী কোথাও যায় না, বিজয়া পই পই করে বলে দিয়েছেন, অনেক লড়াই করে তোমাকে পড়তে পাঠালাম এতদূর, আমার মুখ পুড়িও না, এমন কিছু করো না, যাতে পরের বোনগুলোকে আর না পড়তে পাঠান বড়বাবু। তাই অফ পিরিয়ডে সে ক্লাসেই বসে থাকে। সেদিনও জানলার ধারের একটা বেঞ্চে বসে ছিল। নদীটা এখান থেকে দেখা যায়। দেখতে দেখতে সে গুনগুন করছিল ‘বাদল কালো ঘিরল গো, সব নাও তীরে এসে ভিড়ল গো’ সত্যি নদীর বুকে কালো মেঘ নেমে এসেছে, মেঘ তো নয়, যেন কৃষ্ণের বিস্তৃত বক্ষপট। নদী যেন রাধার নীল আঁচল। তার ওপর ঝুঁকে এসেছে মেঘ। মনটা কেমন উদাস হয়ে গেছিল দেবীর। ও বুঝতে পারেনি, কখন যেন সেই ছেলেটা ওর সামনের বেঞ্চে এসে বসে, ওর দিকে কী একটা বাড়িয়ে দিয়েছে। দেবী চমকে তাকিয়ে দেখল রফিকুল, রফিকুল একটা গোলাপ ফুল ওর দিকে বাড়িয়ে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে কেমন নরম ঝালর। কোন ছেলের চোখ এত নরম হতে পারে? বাবা আর দাদা সবসময় তিরিক্ষি।বাবা যদিও তাকে খুব ভালবাসে, কোথাও কারো বাড়ি কিছু খেতে দিলে পকেটে পুরে নিয়ে আসে শুধু তার জন্যে, তাকেই একমাত্র হাতে ধরে গান শেখায় বাবা, কিন্তু বাবার সবকিছুর মধ্যেই একটা ভীতিপ্রদ ব্যাপার।আর দাদা খোকো, সে কেন জানি, খুব ঈর্ষা করে তাকে। ছোটবেলায় তো কথায় কথায় মারত। এখন মারতে পারে না, কিন্তু যাবতীয় খাটনির কাজ চাপায় তার ওপর। জামাকাপড় কাচা, ইস্ত্রি করা, গার্গলের জল করে দেওয়া। একদিন বলেছিল জুতো পালিশ করে দিতে। শুনে বিজয়া ভয়ানক রেগে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন ‘মেয়েরা হচ্ছে দুর্গার অংশ, কখনো তাদের দিয়ে জুতো পালিশ করাবে না, পা টেপাবে না। মেয়েদের গায়ে পা দেবে না’ বিজয়া বারবার বলেন ভাই বোন হচ্ছে দাঁত আর জিভ। জিভ সারাক্ষণ দাঁতকে মুছে সাফ রাখে , অথচ দাঁত এত বেইমান, সুযোগ পেলেই জিভকে কামড়ে দ্যায়।

দেবী আশ্চর্য হয়ে গেল। ফুল, ঠাকুরের পুজোয় ছাড়া সে যেখানে দেখেছে সেটা খাদি মন্দির। নামেই মন্দির, সেখানে কোন দেবতার পুজো হয় না। সারাদিন নানান কর্ম যজ্ঞ চলে। সুতো কাটা।দাতব্য চিকিৎসা। রাস্তা সাফাই। সেখানে গেট দিয়ে ঢুকেই মস্ত গোলাপ বাগান, শীতে গাঁদা ছাড়াও আরও কত মরশুমি ফুল ফোটে, অত নাম জানে না দেবী। তাকে মুগ্ধ করে দ্যায় গোলাপ। বইয়ের পাতার বাইরে সেই প্রথম গোলাপ দেখেছে দেবী। কিন্তু তা ছেঁড়ার কথা কখনো মনে হয়নি। খুব দুষ্টু ছেলেরাও , যারা সারা পাড়ার বাগানের ফলমূল চুরি করে খায়, পুজোর ফুল চুরি করে, তারাও কখনো খাদি মন্দিরের ফুল ছেঁড়ে না। তবে খাদি মন্দিরের সেই দিন আর নেই। আগের মতো অত লোক থাকেনা। চরকা চালানোর শব্দে সারা গ্রাম জেগে থাকত, এখন দু তিনটে বড়জোর। বিনয় ঠাকুরের শরীর পড়ে গেছে। ওদের ভেতরে ভেতরে নাকি অনেক অশান্তি। দেবী অত জানে না। তাকে গান গাইতে ডেকেছিল একবার গান্ধী জয়ন্তীতে, সে গিয়ে রঘুপতি রাঘব রাজা রাম, গেয়ে এসেছে।বাবাকেও ডেকেছিল, বাবা যায়নি। বলেছিল ‘সবসময় আমার সঙ্গে গাইলে, তোর তো কোনদিন একা গান গাইবার সাহস হবে না’ আসল ব্যাপারটা যে তা নয়, দেবী তা বুঝতে পারে। বিনয় ঠাকুর এই অঞ্চলের অঘোষিত রাজা, খাদি মন্দিরেও তাঁর অনেক অবদান আছে, বাবার সঙ্গে তিনি মৌখিক ভদ্রতা যথেষ্ট করেন। কিন্তু গানের প্রকৃত সমঝদার তিনি নন। যেবার গান্ধী এসেছিলেন হাজিপুরে, গান্ধীর সভায় গান গাওয়ার জন্যে বাবাকে ডেকেছিলেন বিনয় ঠাকুর । তখন দেবী একরত্তি শিশু। বাবা অনেক যত্নে দেশ রাগের ওপর একটা গান বেঁধে নিয়ে গিয়েছিলেন ওঁকে শোনাবেন বলে। বিনয় ঠাকুর শোনেননি। তাঁর সারাদিন একটা যন্ত্রের মতো চলে। বাবা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন, অপমানিত হয়েছিলেন। দেবী বুঝতে পারে শিল্পী মানুষের মনটা একটা চারাগাছের মতো। উৎসাহ, সহানুভূতি, প্রশংসা না পেলে , তা একা একা মরে যায়। আর যত্ন ভালোবাসায় লকলকিয়ে বাড়ে।

রফিকুলের বাড়ানো গোলাপ দেখে সে অবাক হয়ে বলে উঠেছিল ‘আমার জন্যে? গোলাপ? কেন?’

রফিকুল চোখের পাতা মাটির দিকে নামিয়ে বলেছিল ‘আপনি যে কিন্নরকণ্ঠী। আপনার গলায় সাত সুর পোষা পাখির মতো খেলা করে। আপনার ছোট্ট পাখি চন্দনা শুনে আমি একটা কবিতা লিখেছি, পড়বেন?’

দেবীর দিকে অনুমতির জন্যে তাকাল রফিকুল। ছেলেরা যে কোন ব্যাপারে মেয়েদের অনুমতি নেয়, সেটাও প্রথম দেখল দেবী। সে অভিভূতের মতো ঘাড় নাড়ল। রফিকুল সসংকোচে পকেট থেকে একটা কাগজ বার করল, বংগলিপি খাতার লাইন টানা পৃষ্ঠায় লেখা।

দেবী পড়ছিল -

‘ও আমার গানের পাখি,
তুমি মোর সুরের সাকী
আমার এই মন পেয়ালা
গানে গানে ভরবে নাকি?

তুমি মোর সুরের দেবী
নিশিদিন তাহাই ভাবি
চরণে ঠাঁই মিললে
এ জীবন পূর্ণ সবই’

দেবী পড়ছিল, পড়তে পড়তে তার মন তোলপাড় করছিল। কিন্তু ভ্রূ কুঁচকে যাচ্ছিল। সে বলে ফেলল ‘গুরুচণ্ডালী দোষ আছে যে অনেক।’ তারপর সে কাগজটা রফিকুলকে ফিরিয়ে বলল ‘আপনি রাখুন। শুদ্ধ করে লিখে দেবেন’

রফিকুল লজ্জায় মরে গিয়ে বলল ‘আমার এই দোষটা বড় হয়, তবে বানান ভুল পেলেন কি?’

আরেকবার কাগজটা ধরে ভালো করে দেখল দেবী। নাহ বানান ভুল নেই একটাও। হাতের লেখাও মুক্তোর মতো। গুরুচণ্ডালী দোষের কথা না বললে চলছিল না? সে কবিতার কী-ই বা বোঝে? বাবা যদিও অনেক রাত অব্দি জেগে লেখে ডায়েরিতে। এক পুরনো ছাত্র, এখন কলকাতায় মস্ত চাকরি করে, সে এনে দ্যায় ডায়েরি প্রতিবার। সেই ডায়েরিতে বাবা দিনলিপি লেখে, তাতে জমা খরচের হিসেবই বেশি, মানে কত টাকা কার কাছে পায়, কত টাকা কার কাছে ধার আছে, বাজার বাবদ কত খরচ হল। দেবী একদিন বাবার বিছানা তুলতে গিয়ে খুলে দেখেছে, সেই ডায়েরিতে ধারের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। তা বাড়ারই কথা। তারা এখন মোট নয় ভাই বোন। আর ঠাকুমাও তো আছেন। এছাড়া অতিথি লেগেই আছে। আর আছে বারোমাসের ছাত্র ছাত্রীরা। তবে রবিবার ছাড়া তাদের জলখাবার দেওয়া হয় না আর। চা বিস্কুটেই সারা হয়। যদিও সে নিয়ম প্রায়ই শিথিল হয় বাবার জবরদস্তিতে। অনেকেই মাঝে মাঝে মিস্টি বা শাক সব্জি নিয়ে আসে। তখন তাদের কিছু পাঠাতেই হয়।

জমা খরচ ছাড়াও, বাবা ছোট ছোট করে দিনলিপি লেখে। অধৈর্য দু এক শব্দের লেখা নয়, বেশ খুঁটিয়ে লেখা। কোথায় গেছে, কাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কী কথা হল, সব।আর লেখে গান। এমন শব্দ চয়ন, যাতে সুর দিয়ে গাওয়া যায়। সেই গান যে কবিতার থেকে আলাদা তা দেবী বোঝে। আরও বোঝে এই জন্যে যে গরিফার বড়মাসীর ছেলে তাকে আজকালকার কিছু কবিতা শুনিয়েছে। একটা পত্রিকা দিয়ে গেছে। তাতে সেও একটা কবিতা লিখেছে।পত্রিকার নাম নবসূর্য। সব কবিতার মধ্যেই খিদে, কান্না, অভাব। পড়ে কষ্ট হয়েছিল দেবীর। সে যে গান গায় তার মধ্যে তো এসব নেই। ভাতের অভাব, কাপড়ের অভাব, যা আজকাল সে বুঝতে পারে সংসারে। মা কীভাবে চালায় এই সংসার, শুধু গানের টিউশনি নির্ভর, তাদের তো এক ছটাক জমিও নেই কোথাও। চাল ডাল সব কিনে খেতে হয়। তরিতরকারি, মাছ, ডিম সবই। পেছনে পুকুরটা তাদের নিজস্ব, সেখানে জাল ফেলে মাছ ধরা হয় আলেকালে। হাটের মাছই ভরসা। সব্জির বাগান করলেই করা যেত। কিন্তু কারো ওসব গা নেই। উঠোনে আম আর পেয়ারা গাছ ছাড়া একটা বক ফুল গাছ, বেসন বা চালগুঁড়ি দিয়ে বড়া খাওয়া। আর টালির চালে লতিয়ে ওঠা লাউ, কুমড়ো। কিন্তু সে তো হঠাৎ পাওয়া, তার ভরসায় এই এত বড় পরিবার, যার দুবেলা খেতে ২৪ টা পেট, তার চলে কি? বাবা ডায়েরি লেখা ছাড়াও আর একটা জিনিস লেখে জানে দেবী। তা হচ্ছে ছোট চিরকুট , যাকে বলা যায় হাতচিঠি, ‘আমার পুত্রকে পাঠাইতেছি। অনুগ্রহ করিয়া ওর হাতে পঞ্চাশটি টাকা দিবেন’ পুত্রের নাম বদলে যায়, যদিও যায় একজনই। দাদা তো কখনোই যাবে না। মেজভাই প্রায়ই নৈহাটি চলে যায়, সেজর একটু সাহেবি হাবভাব। যাবার মধ্যে রইল নভাই। সে খুব শান্ত স্বভাব, মা বলে অষ্টম গর্ভের সন্তান, বিরাট কিছু করবে। অনেক ব্যাপারেই সে মায়ের ভরসা। ছোট্ট ঠাকুরঘরে আলো ঢুকত না, লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়তে অসুবিধে হত, সে একটা টালি বদলে এক ফালি কাচ কোথা থেকে যোগাড় করে লাগিয়ে দিয়েছে, এখন ঠাকুরঘর আলো ঝলমল করে। চালে কুমড়োলতা তুলে দেওয়া, কিংবা কোথায় সস্তায় চাল পাওয়া যায়, তার সন্ধান করা –এসবই এই অষ্টম গর্ভ দিয়ে হয়। তাকেই বাবা বেশি পাঠায় চিরকুট দিয়ে। সে মুখে কিছু বলে না, কিন্তু দেবী দেখেছে ফেরার পর সে খিড়কি পুকুর ধারে বসে বসে মুখ গুঁজে কাঁদে। তার অপমানবোধ বড় তীব্র, কিন্তু মা বাবা ভাই বোনের কষ্টও সে উপেক্ষা করতে পারে না।

দেবী ভাবে তার কোন গানে কি এই কষ্টগুলো ধরা আছে? গানের ভাষায় কষ্ট আছে। সে বিরহের কষ্ট, দেখা না হওয়ার কষ্ট। দেবী ভেবে দেখল রফিকুলের জন্যে তার কোন কষ্ট হচ্ছে না সেভাবে। কিন্তু ওর প্রেম স্বীকার না করার কষ্টও তো আছে। তার ওপর রফিকুল একটা কথা বলেছিল, সেটা দেবীর মাথায় ঘুরছে। রফিকুল বলেছিল ‘আপনি ছোট্ট পাখি চন্দনা গানটা অপূর্ব গেয়েছেন। কিন্তু ওটা তো আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান, আপনি শুধু লতার গান গাইবেন, শুধু লতার। আর আরও পরে আপনার নিজের গান হবে। আমি সে গানের কথা লিখে দেব। তখন দেখবেন সবাই আপনার গান গাইছে।’

দেবী ভেবেছিল রফিকুল বুঝি ঠাট্টা করছে। কই না তো? ওর চোখে জ্বলন্ত বিশ্বাস দেখল সে।

বিন্তির ডাকে তার ঘোর ভাঙল ‘ও বড়দি, আজ তোমার গানে মন নেই কেন গো? আমার নাচ কেমন হল? যাও, তুমি তো কিছু দেখই নি।’

দেবী একটু লজ্জা পেয়ে গেল। কিন্তু সে তো সবার বড়দি, তাই গম্ভীর গলায় বলল ‘গান, নাচ এসব কি মানুষকে শোনাবার দেখাবার জন্যে? এসব ঠাকুর দেখে। ওই গানটা শুনিস নি অঞ্জলি লহ মোর, সঙ্গীতে’

বিন্তি অমনি আবদার করল ‘ওই গানটা জানি আমি, তুমি একটু গাও না, লক্ষ্মী বড়দি’

‘আজ তুই গা দেখি একটা গান’

বিন্তি কিছুতেই গাইতে চায় না কারো সামনে, অনেক জোরাজুরির পর সে গাইল ‘কেন বঞ্চিত হব চরণে, আমি কত আশা করে বসে আছি পাব জীবনে না হয় মরণে’

দেবী স্তব্ধ হয়ে বসে রইল সেই গানের সামনে। বিন্তির গলার রেঞ্জ খুব বেশি না, গলায় কাজ নেই তেমন, যাকে বলে ফ্ল্যাট গলা, কিন্তু কি দরদ! ওইটুকু মেয়ে এই গানের ব্যথা তুলে আনল কী করে? নাকি ও নিজেকেই গাইছে, নিজের কালো কুরূপ নিয়ে লোকের তাচ্ছিল্য, উপেক্ষার যন্ত্রণা এভাবে নিঙড়ে দিচ্ছে গানে? দেবী তার থেকে বয়সে ছোট বোনের কাছে একটা মূল্যবান শিক্ষা পেল সেদিন। গান শুধু গলা দিয়ে গাইলে হয় না, হৃদয় দিয়ে, সমস্ত শরীর মন দিয়ে গাইতে হয়।

মাকে নিয়ে নভাই এগিয়ে গেছে, ওর হাতে একটা বড় ব্যাগ, পেছন পেছন সেজ বোন ললিতা। ডাক্তারখানা স্টপেজ থেকে বাসে জেটিঘাট, সেখান থেকে লঞ্চে কুঁকড়োহাটি। দেবী মুনাইকে কোলে নিয়ে শেষে বেরল। ওর কাঁধে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ। ন কাকিমা দু বছর আগে দিয়েছিল। এর মধ্যে একটা সোনার আংটি আছে, এটা বাবা রূপশ্রী জুয়েলার্স থেকে বাকিতে কিনেছে, দেবী জানে। দেবী পেছন ফিরে বিন্তিকে বলল ‘দরজাটা লাগিয়ে দে বিন্তি, কাল বিকেলেই চলে আসব আমরা। সাবধানে থাকিস’

বিন্তি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইল কিছু না বলে, ওর চোখে জল টলটল করছিল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন