সোমবার, ২৮ মার্চ, ২০২২

সমকালীন আমেরিকান ছোটগল্প: মোজাফফর হোসেন




ধুনিক ছোটগল্প সাহিত্যের সাম্প্রতিকতম শাখা হিসেবে পরিচিত হলেও আমরা অনুমান করতে পারি, গল্প দিয়েই সাহিত্যের শুরু। শুধু সাহিত্য না সবধরনের শিল্পফর্মের মূলে আছে গল্প। গল্পটাকে মানুষ বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছে কেবল বিনোদনের বায়বীয় উপকরণ হিসেবে নয়, নিজস্ব গোত্রের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ইতিহাস ধরে রাখার জন্যও। এই কারণে গল্পগুলোকে কোনো না কোনোভাবে সংরক্ষণ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। প্রথমে সেটি করা হয় গুহা-অলঙ্করণের মাধ্যমে। এ পর্যায়ের গল্পগুলো ছিল প্রধানত কথারূপক (fable)। 
অর্থাৎ গল্পের চরিত্ররা কেবল জীবজন্তু বা পশুপাখি। বন্যপ্রাণীদের স্বভাব-প্রবণতা আদিম মানুষের ভালো করেই জানা ছিল। তাদের সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো যুক্ত করেই গল্পগুলো নির্মিত। কিন্তু মানুষের কল্পনাশক্তি দৃষ্টিশক্তিকে ছাড়িয়ে যায় ক্রমেই। মানুষ এমন কিছু চরিত্র গল্পে সৃষ্টি করে যেগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। গল্পের ড্রাগন, পাখাওয়ালা দৈত্যদানব এগুলো গল্পের প্রয়োজনেই সৃষ্টি হয়। গল্পে আস্তে আস্তে মানুষ নিজেকেও চরিত্র হিসেবে ভাবতে থাকে। অর্থাৎ জন্ম হয় উপরূপকের (Parable)। বিরূপ প্রকৃতি-হিংস্র জন্তুদের সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকা মানুষ তখন এসব গল্পে নিজেকে নিজেদের গোষ্ঠীর রক্ষাকর্তার ভূমিকায় চিত্রিত করে। গোত্রে গোত্রে, মানুষে-মানুষে সংঘাত-শত্রু বাড়তে থাকলে গল্পে নেতিবাচক চরিত্রে আবির্ভূত হতে থাকে মানুষ। মানুষের চেহারা তখন হয়ে যায় দৈত্যদানবের মতো। এভাবে ফেবল-প্যারাবল থেকে চলে আসে রূপকথা। ‘ফেয়ারি টেল’ থেকে ‘ফেয়ারি’ শব্দটা বাদ দিলে থাকে ‘টেল’ অর্থাৎ আখ্যায়িকা। আখ্যায়িকার মধ্যে ছোটগল্প এবং উপন্যাস দুয়েরই লক্ষণ বিদ্যমান।

কিন্তু গল্প আধুনিক চেহারা ধারণ করেছে এই সেদিন, দুজন মার্কিন গল্পকার এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন : নাথানিয়েল হথর্ন ও এডগার এলান পো। ১৮৩৭ সালে প্রকাশিত হথর্নের ‘টুয়াইস টোল্ড টেলস’ গল্প সংকলনকে বলা হয় ইংরেজি ভাষায় প্রথম আধুনিক ছোটগল্পের বই। আধুনিক ছোটগল্পের সৌন্দর্য হলো এর কোনো ধরা-বাঁধা ছক নেই। ফেবল, প্যারাবল, ফেয়ারি টেল, ফ্যান্টাসি, মিথ, এলিগরি—এসবের বিনির্মাণ করার অবাধ অধিকার তার আছে। আবার নীতিশিক্ষার কোনো দায় নেই। হথর্নের সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় আধুনিক ছোটগল্পের আরেক প্রবক্তা হলেন এডগার এলান পো (১৮০৯-১৮৪৯)। তিনি ছোটগল্পের প্রথমদিককার তাত্ত্বিকও বটে। হথর্নের ‘টুয়াইস-টোল্ড টেলস’ গল্প সংকলনটির ‘দ্য টেল অ্যান্ড ইটস ইফেক্ট’ শিরোনামে যে রিভিউ পো করেন, সেখানে তিনি ছোটগল্পের আকর্ষণীয় সূচনা, টানটান উত্তেজনা দিয়ে শেষ এই হিসেবে ছোটগল্পের যে চরিত্র দাড় করিয়েছিলেন আজও তা ছোটগল্পের আদর্শমান বলে বিবেচনা করা হয়।

এরপর উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছোটগল্পের পুরোধা লেখককে আমরা পেয়েছি। কিন্তু আমেরিকায় এডগার এলান পোর পর থেকে ছোটগল্পে যে পরিমাণ নিরীক্ষা হয়েছে তা অন্য ভাষার ছোটগল্পে হয়নি।

প্রথম ধাপে, উনবিংশ শতকে, আমেরিকা থেকে উঠে আসেন বিশ্বসেরা বেশ কয়েকজন ছোটগল্পকার। ওয়াশিংটন আর্ভিং (১৭৮৩–১৮৫৯), হারমান মেলভিলে (১৮১৯–১৮৯১), লুইসা মে অ্যালকট (১৮৩২-১৮৮৮), মার্ক টোয়েন (১৮৩৫–১৯১০), অ্যামব্রস বিয়ার্স (১৮৪২–১৯১৪), হেনরি জেমস (১৮৪৩-১৯১৬), কেট শপা (১৮৫০-১৯০৪), শার্লট পারকিন্স গিলম্যান (১৮৬০–১৯৩৫), ও’ হেনরি (১৮৬২–১৯১০), স্টিফেন ক্রেন (১৮৭১–১৯০০), উইলা ক্যাথার (১৮৭৩-১৯৪৭), জ্যাক লন্ডন (১৮৭৬–১৯১৬) প্রমুখ লেখকের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। দ্বিতীয় ধাপে আমরা উল্লেখ করতে পারি, জেমস থার্বার (১৮৯৪-১৯৬১), মারজরি কিনান রলিংস (১৮৯৬-১৯৫৩), উইলিয়াম ফকনার (১৮৯৭-১৯৬২), আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (১৮৯৯-১৯৬১), জন চিভার (১৯১২-১৯৮২), শের্লি জ্যাকসন (১৯১৬-১৯৬৫), স্কট ফিটজারল্ড (১৯২০-১৯৪০), ফ্লানারি ও’কনর (১৯২৫-১৯৬৪)-সহ আরো অনেক প্রখ্যাত মার্কিন গল্পকারের কথা যাঁদের প্রভাব শুধু আমেরিকার সাহিত্যে গোটা বিশ্বসাহিত্যে পড়েছে।

সাম্প্রতিক এবং সমকালীন মার্কিন সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পকাররা হলেন টনি মরিসন, ফিলিপ রথ, জয়েস ক্যারল ওটস, লিডিয়া ডেভিস, জর্জ সন্ডার্স, রবার্ট ওলেন বাটলার, টবিয়াস উলফ, জেনিফার এগান, জো মেনো, জুনোট ডায়াজ, লরি মুর, ওটেসা মাসফেগ প্রমুখ। পাশাপাশি চিমামান্দা আদিচি, ঝুম্পা লাহিড়ি, ভারতী মুখার্জি, অনিতা দেশাই, কিরণ দেশাইয়ের মতো বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান ডায়াসপোরা লেখক আমেরিকার ছোটগল্পকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন।

আমেরিকার ছোটগল্পের সঙ্গে ইউরোপীয় ছোটগল্পের প্রবণতাগত কিছু পার্থক্য আছে। আমেরিকার ছোটগল্পে অ্যাডভেঞ্চার, ফান্টাসি, মিথ এবং গথিক প্রভৃতি প্রকরণের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি। এই কারণে আমেরিকার ছোটগল্প কিছুটা জনপ্রিয় ধারার। এটা মোটাদাগে বলা। কারণ, বৈচিত্র্যও মার্কিন ছোটগল্পে কম নেই। মোটাদাগে, এডগার এলান পো, ও হেনরি, ফকনার এবং হেমিংওয়ে—এই চার পুরোধা লেখক চার ধরনের ছোটগল্পের প্রবক্তা হিসেবে কাজ করেছেন। এলান পো তাঁর গল্পে গথিক ও অবাস্তব-অব্যাখ্যাত উপকরণ ব্যবহার করেছেন, ও’ হেনরির সিগনেচার তাঁর টুইস্টে, নির্ভার-নির্মেদ গদ্যে যুদ্ধোত্তর বাস্তবতা তুলে এনেছেন হেমিংওয়ে এবং গীতল গদ্যে আমেরিকার নিজস্বতা তুলে ধরেছেন ফকনার।

সমকালে এসে যুক্ত হয়েছে আরো কিছু মৌলপ্রবণতা। আমেরিকার ছোটগল্প এখন আরো বেশি ছড়িয়ে পড়েছে কাঠামো এবং বিষয়বস্তুতে। সমকালীন মার্কিন গল্প কতটা ঐতিহ্যমুখী কতটা নতুন পথের সন্ধানী—সেই চিত্রটা উঠে এসেছে গল্পপাঠের বর্তমান সংখ্যায়।

এ সংখ্যার গল্পাংশে থাকছে জয়েস ক্যারল ওটসের সর্বাধিক পঠিত গল্প Where Are You Going, Where Have You Been, অমিতাভ চক্রবর্ত্তীর অনুবাদে।  গল্পটি ১৯৬৬ সালে রচিত, পরবর্তীসময়ে এর কাহিনি অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। উপল দাশগুপ্তের অনুবাদে থাকছে লিডিয়া ডেভিসের গল্প A Few Things Wrong With Me। আমরা জানি ডেভিস ছোটগল্পে ম্যান বুকার পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি ছোটগল্পের পাশাপাশি চমৎকার অণুগল্প লিখে থাকেন। সম্প্রতি ম্যান বুকার পুরস্কার পান জর্জ সন্ডার্স। তাঁর দুটি গল্প থাকছে, The Mom of Bold Action অনুবাদ করেছেন বেগম জাহান আরা এবং Love Letter অনুবাদ করেছেন মৌসুমী কাদের। লারা ভ্যাপনিয়নের Fisher vs Spassky অনুবাদ করেছেন এলহাম হোসেন, এডাম লেভিনের A Lot of Things Have Happened অনুবাদ করেছেন রাবেয়া রব্বানী, নাহার তৃণা অনুবাদ করেছেন মার্কিন সাহিত্যের পুরোধা লেখক টনি মরিসনের গল্প Sweetness, লরি মুরের Referential শীর্ষক গল্পটি অনুবাদ করেছেন মাহরীন ফেরদৌস। ওত্তেসা মসফেগের The Locked Room গল্পটি অনুবাদ করেছেন ফজল হাসান, রেমন্ড কারভারের গল্প Errand অনুবাদ করেছেন বিপ্লব বিশ্বাস।

সাক্ষাৎকার অংশে থাকছে সাহিত্যে নোবেলজয়ী মার্কিন লেখক টনি মরিসনের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। অনুবাদ করেছেন উৎপল দাশগুপ্ত। পাশাপাশি গল্পপাঠের নিয়মিত আয়োজন হিসেবে বাংলা ভাষার ক্লাসিক ও সমকালীন লেখকদের একগুচ্ছ গল্প পাঠের সুযোগ পাচ্ছেন গল্পপাঠের গল্পপ্রেমী পাঠকেরা।

আমি সকলকে গল্পের এই ‘অকৃত্রিম’ ভুবনে স্বাগত জানাই।




লেখক পরিচিতি:
মোজাফফর হোসেন
কথাসাহিত্যিক। প্রাবন্ধিক। অনুবাদক
ঢাকায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন