সোমবার, ২৮ মার্চ, ২০২২

আলী নূরের ধারাবাহিক স্মৃতিকথা: তুচ্ছদিনের গান


পর্ব ষোলো


ঢাকায় এসে আমরা শান্তিনগরে উঠি, মিনুবুবুর বাসায়। এটাকে মনোরমা দেবীর বাড়ি বলা হত। বেশ সুন্দর, সামনে বড়োসড়োএকখণ্ড জমি। এতে অনেক লাউ আর টমেটো ফলাত উড়ে চাষিরা। এই বাসার ঠিক উল্টোদিকে ছিল ‘বাগান বাড়ি’ নামে একটিসুন্দর বাসা। একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, ইউসুফ সাহেব থাকতেন এই বাড়িতে। তাঁর বিরূদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছিল, যাআলোচনার বিষয় ছিল তখন। সেই মামলায় তাঁর শাস্তি হয়। এই বাড়ি পরে ইকবাল-সেলিনার বাবা হাবিবুললাহ বাহার কিনেনেন। এ বাড়িতে অনেক কবি সাহিত্যিকরা আসতেন বাহার সাহেবকে দেখতে। এর পাশের বাড়ি ‘মোস্তফা মঞ্জিল’, কবি গোলামমোস্তফার। ওঁর ছোট ছেলে পাশা আমার বন্ধু । খুব সাজানো-গোছানো ভেতরটা। বসবার ঘরে সুন্দর সব আসবাব তার সঙ্গেএকটা পিয়ানো আর একটা বড় দাঁড়ানো পেন্ডুলাম ঘড়ি ঘরটাকে আভিজাত্য দেয়। এই পিয়ানোতে হাত চালিয়ে পাশাপরবর্তীকালে বিলেতে গিয়ে পিয়ানো শিখে একজন প্রখ্যাত পিয়ানো-বাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মোস্তফা সাহেবের বাকি তিনছেলেরা সবাই খ্যাতনামা । সবার বড় মোস্তফা আনোয়ার ভারতীয় বিমান বাহিনীতে একজন তুখোড় জঙ্গি-পাইলট হিসাবেসুনাম অর্জন করেন। তার ছোট মোস্তফা আজিজ একজন চিত্রশিল্পী, বিশেষ করে পোট্রেট-শিল্পী হিসাবে সুপরিচিত। আজিজভাই একজন দক্ষ কিশোর সংগঠকও ছিলেন। আজিজ ভাইয়ের পর খ্যাতনামা শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, মোস্তফা মনোয়ার।বাংলা দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে মোস্তফা মনোয়ারের পরিচয় তিনি নিজেই। মোস্তফা মঞ্জিলের পরের বাড়িটি কেনেন ড. আনিসুজ্জামানের বাবা প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথ, ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন। সামনে এগিয়ে যেতে স্থপতি মযহারুল ইসলামের বাড়ি।এপথে আরো এগিয়ে গেলে ‘ক্ষেত্র ভিলা’। এই বাড়ির টুকরি সেন তাঁর শরীর চর্চার জন্য তরুণদের কাছে প্রিয় ছিলেন। তারপরআরো খানিকটা গেলে শান্তিনগর পুরোনো পোস্ট অফিস। তার পাশে ‘শচীবাস’। মোটকথা, পার্টিশনের পূর্বে পুরানা পল্টন থেকেশুরু করে রামকৃষ্ণপুর, শান্তিনগর, চামেলীবাগ, সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ ইন্দ্রপুরী পর্যন্ত এই শহরতলী এলাকাটা ছিল হিন্দুদের বাস।কিছু হিন্দু পরিবার পার্টিশনের পর পরই তাদের বাড়িঘর পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত কতক মুসলমান পরিবারের কাছে বদল কিংবাবিক্রি করে ওপার বাংলায় চলে যান।এই সময়েই এইসব বাড়িঘর কিছু মুসলমান পরিবার কিনে নেন কিংবা তাদের ও-পারেরসম্পত্তির সঙ্গে বদল করেন। আমাদের চামেলীবাগের বাড়ি কেনা হয় ১৯৪৮ এর মাঝামাঝি। কিন্তু অনেক হিন্দু বাড়িই অবিক্রিত ছিল। এসব বেশিরভাগ বাড়ি বিক্রি হয় ১৯৫০ এর জঘন্যতম দাঙ্গার পর। এবং তখন এদের ন্যায্য দাম পাওয়া ছিল একদুরাশা।

শান্তিনগর এলাকায় একটি সুন্দর বাড়ি ছিল সাগর বাবুর। এখন যেখানে হোয়াইটহল কমিউনিটি সেন্টার তার পুবপাশ ঘিরে যেগলিটি গেছে তার মাথায় ছিল সাগরবাবুর সুদৃশ্য বাংলো বাড়ি এবং সামনে এক অতি মনোরম বাগান। সাগরবাবু নিজ হাতেতার যত্ন নিতেন। কত রকমের ফুলগাছ ছিল, কত রকমের গোলাপ। আমি রোজ যেতাম। সাগরবাবু আমাকে একটি একটি করেগাছ এবং ফুল চেনাতেন। সাগরবাবু বিপত্নিক ছিলেন, এবং একলাই বাস করতেন এই বাড়িতে। নিঃসঙ্গ জীবনে তাঁর এই ফুলফোটানোর খেলায় আমিও মেতে উঠি।আমার ফুলের শখ তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া।

এই সময়টাতে শান্তিনগর এলাকায় চোরের ভারি উপদ্রব ছিল।বড়ভাইরা মিলে রাতে পাড়ায় পাড়ায় পাহারা দেবার জন্য ডিফেন্সসোসাইটি করলেন।প্রত্যেক বাড়ি থেকে একজন করে সবল ব্যক্তি রাতের পাহারায় নামবেন। হাতে থাকত টর্চ আর লাঠি। ক্ষেত্রভিলার টুকরি সেন একাই ছিলেন একশ। তার হাতে থাকত একটা তলোয়ার। বড়ভাই ছিলেন দলের লিডার। তিনিও কিছু কমছিলেন না-- মুগুর ভেঁজে, বার্বেল করে শরীর বানানো। চুরি দমন হল। টুকরি সেনের তলোয়ারটা বড়ভাইয়ের হাত হয়ে আমারহাত পর্যন্ত পৌঁছায় একসময়।

ঢাকা আসার কয়েকদিনের মধ্যে ভর্তি হলাম সিদ্ধেশ্বরী স্কুলে, ক্লাস সিক্স-এ। বেশির ভাগ ছাত্র, শিক্ষক হিন্দু। ওদের চালচলনআচার-ব্যবহার ভারি ভদ্র। ভালো লাগল প্রথম দেখাতেই। প্রথম বন্ধুত্ব হলো যে ছেলেটির সঙ্গে তার নাম দীপক। হালকা-লম্বাগড়ন, শ্যামলা রং, ভারি মিষ্টি চেহারা। ওদের দোতালা বাড়িটা শান্তিনগরে দেখার মত ছিল। দীপক ওদের বাসায় নিয়ে গেলআমাকে। ওর বোন বোধ করি কলেজে পড়তেন। সাদা নীল পাড়ের শাড়িতে দেখেছিলাম। সাধাসিধে পোষাকেই থাকতেন বরাবরকিন্তু বেশ একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর। সব কামরাগুলো পরিপাটি করে সাজানো। কাঠের উপর কাজ করা বেশ সুন্দর সবআসবাবপত্র। ঝকঝকে পলিশ করা। দিদির কামরায় সুন্দর একটা অরগান হারমোনিয়াম ছিল। পায়ে চেপে বাজাতে হতো। দিদিরবীন্দ্রনাথের গান গাইতেন। দীপকের সঙ্গে মিশতে আমার খুব ভালো লাগত।ওদের পরিবারের সবাই খুব মার্জিত ছিল, অন্যরকম লাগত।

দীপকদের বাসার পুবদিকে ছিল ফরমুজুল হক সাহেবের একটি টিনের সুন্দর বাংলো। শহীদ সোহরোয়ার্দী যখন অবিভক্তবাংলার চীফ মিনিস্টার তখন উনি ছিলেন সোহরোয়ার্দী সাহেবের প্রাইভেট সেক্রেটারি।উল্লেখ্য শহীদ সোহরোয়ার্দী যখন পূর্বপাকিস্তানে মুসলীম লীগ বিরোধী রাজনীতি আরম্ভ করেন, তখন তাঁকে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হত যে পূর্ব পাকিস্তানে তাঁরকোন স্থায়ী আবাস নেই। সেই সময় ফরমজুল হক সাহেব শান্তিনগরে এক বিঘা জমির উপর তাঁর এই সুদৃশ্য বাংলো বাড়িটিশহীদ সোহরোয়ার্দীর নামে দান করে দেন। আমার এই বাড়িতে যাওয়া শুরু যখন শুনি এ বাড়িতে রেকর্ডের গান বাজে। হকসাহেবের স্ত্রী ছিলেন খুব ফর্সা এবং সুন্দরী।বাসায় ছিল হিজ মাস্টার্স ভয়েসের তখনকার সবচেয়ে অভিজাত এবং দামী আলমারীসাইজের গ্রামোফোন। রেকর্ডও ছিল প্রচুর। হক সাহেব রাজনীতি নিয়ে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন। খালাম্মার নিঃসঙ্গ সময় কাটতোগান শুনে। আর আমি তাঁর স্নেহের অধিকার পেলাম গান শোনা নিয়ে। এঁদের সন্তান আলমগীর পরবর্তীকালে একজন জনপ্রিয়পপ গায়ক হিসাবে সারা পাকিস্তান মাতিয়ে রাখে।
 
এই সময় আর যেসব ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হল তারা সবাই আমার ক্লাসের এবং সবাই হিন্দু। এরা হচ্ছে বাবুল, শঙ্কর, অনুকুল, অজিত, খগেন আর জ্ঞান গাঙ্গুলি। বাবুল শঙ্কররা থাকত এখন যেটা নয়া পল্টন ওখানটায়। তখন নাম ছিল রামকৃষ্ণপুর।জ্ঞান গাঙ্গুলি থাকত শান্তিনগর চৌরাস্তার মোড়ে সুপরিচিত গাঙ্গুলি হাউস, ‘নবীন কুটিরে’। বাড়ির সামনে অনেক খোলা জায়গাতার পাশেই একটা মাঝারী আকারের পুকুর। এই বাড়ি পরবর্তীতে সাদু’র বান্ধবী ডা. রীনার স্বামী ডা. ফরহাদের পরিবার কিনেনেন। ডা. ফরহাদরা দুই ভাই। ফরহাদ ভাই ও জাহেদ ভাই। ওরা দুজনেই দেখতে ছিলেন ভারি সুদর্শন। জাহেদ ভাই কিছুদিনআগে মারা যান। এদের এক বোন, প্যাথলজিষ্ট ডা. বদরু ভাইয়ের স্ত্রী।

সিদ্ধেশ্বরী স্কুলের হেডমাষ্টার ছিলেন তারাশঙ্কর বাবু। মাথাভরা সাদা চুল, যেন এক কাশবন। চিরুনির ছোঁয়া পেয়েছে কোনোদিনমনে হত না। পায়ে কেম্বিসের জুতা, গোড়ালীর দিকটা চটিজুতোর মত করে দুমড়ানো। ধবধবে ধুতির ওপর একটা সাদা ফুলসার্ট, কাঁধে পাট করা সাদা চাদর, হাতে কিছু বই, মাথায় ছাতি । আনমনে চলেছেন স্কুলের দিকে, নয় স্কুল-ফেরত, এখনও চোখে ভাসে।সরল সোজা মানুষ, আদর্শ শিক্ষকের এক প্রতিমূর্তি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়া সত্বেও তখনও উর্দু ইত্যাদি সব চালু হয়নি।আমাদেরকে সংস্কৃত পড়তে হল প্রথম কয়েক মাস। পণ্ডিত স্যার ছিলেন সন্তোষ বাবু। এখন শান্তিবাগ যেখানে ঐদিকে অনেকজায়গা জুড়ে ছিল তাঁর কুটির। চারদিকে ফলের গাছ- জামরুল, সফেদা, গোলাপজাম ইত্যাদি। এছাড়া আম, কাঠাল, লিচু তোছিলই। সন্তোষ স্যারের অভাবের সংসার। মেজাজটা তাঁর সব সময় থাকতো তিরিক্ষি হয়ে। ব্যাকরণ কৌমুদি বুঝতে ছাত্রদের তাঁরওখানে ঘনঘন যেতে হতো। উদ্দেশ্যটা ব্যাকরণ শেখার চাইতে পাকা সফেদা-জামরুলের দিকে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলপাড়া নিয়ে কোন কথা ছিল না, কিন্তু ব্যাকরণ কৌমুদী বোঝানোর জন্য বারবার পীড়াপীড়ি করলে বিরক্ত হয়ে বলতেন, বাবারা, তিরিশ টাকা বেতনে এর চেয়ে বেশি কৌমুদী হয় না।পঞ্চাশের দাঙ্গার পর সন্তোষ স্যার পরিবারসহ চলে যান ওপার বাংলায় আরো অনেকের মত।

সন্তোষ স্যার থাকাকালীন সময়েই প্রথম আরবি চালু হল। মৌলভী স্যার এলেন। ভারি কড়া মানুষ। কিন্তু কোনো গোড়ামী ছিলনা। অচিরেই তাঁর বন্ধুত্ব হয়ে গেল পণ্ডিত স্যারের সঙ্গে। এই সময় বেশ কিছু মুসলমান ছেলে এসে গেল। হোসেন-মাসুদ দুই ভাই, ভালো ছাত্র। আমাদের বাড়ীর পেছনেই ওরা বাড়ি কিনলো। ওদিকে মালিবাগের দিকে ওয়াজেদুল, তুখোড় ছেলে। মাউথ অর্গানবাজায়, বিড়ি খায়, রাত-বিরোতে ইন্দ্রপূরীর ঘন জঙ্গল দিয়ে বাড়ী ফেরে। একেবারে সাক্ষাৎ ইন্দ্রনাথ। ক্লাস সেভেনের প্রথমদিকেই ভর্তি হল গোলাম পীর। ফর্সা, ভারী সুন্দর সপ্রতিভ ছেলে। সিদ্ধেশ্বরীর দিকে ওদের বাসার নাম ছিল ‘আলীপুর হাউস’।ক’দিন পরই ওরা চলে গেল চিটাগাং। আর দেখা হয়নি কোনো দিন । ক্লাস সিক্সের গোড়ার দিকে কিংবা ক্লাস সেভেনে ভারিজাঁকজমক করে সরস্বতী পুজা হলো। সন্ধ্যায় আরতির সময় আমরা সবাই হাজির থাকতাম।

স্কুলের সব ব্যাপারে আমি আর শিরী বু’ নিত্য সঙ্গী। ও আমার এক ক্লাস উপরে পড়ত।পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। ডিবেটিংকরত ক্লাস সেভেন থেকেই। শিরী বুবুর ক্লাসের দুই বান্ধবী, বকুল আর রওশন আরা ছিলেন তখনকার নামকরা দুই গায়িকা।দু’জনেই রেডিওর নিয়মিত শিল্পী। বকুল আপা ছিলেন ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর মেয়ে।দুজনেই আমাকে খুব স্নেহকরতেন। আরেকজন ছিলেন রওনাক জাহান, ক্যাপ্টেন পরে মেজর জেনারেল আজমেরীর বোন।

সরস্বতী পুজা শেষে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরেই খুব আনন্দ কোলাহলে মেতে উঠলাম আমরা ক’ভাই বোন। হঠাৎ শিরিবু আদর করেখাট থেকে আমাকে টেনে নামাতে গেলে পিঠের দিকটায় বুকের হাড়ে কেমন একটা চোট লাগে। আমি আর কোন মতেই নড়তে বাকথা বলতে পারছিলাম না। এই অবস্থায় আমাকে শান্তিনগরে তখনকার প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথ ডা. মোয়াজ্জেম হোসনের বাসায়নিয়ে গেলে তিনি ওষুধ দেন। এমন হরিষে বিষাদের কারণে শিরীবু নিজেকে ভীষণ অপরাধী ভাবতে লাগলেন। বেশ কিছু সময়, প্রায় বছর দু এক লেগেছিল আমার সম্পূর্ণ সারতে। ছেলেবেলায় আমার এমন সব দুর্ঘটনার কথায় আম্মা খুব শঙ্কিত থাকত।কারণ আমার জমজ বোন লিলি ছয় মাস বয়সে কাজের মেয়ের কোল থেকে পড়ে গিয়ে মাথার আঘাতে মারা যায়। দুর্ঘটনারকথায় মনে পড়ে, আব্বা, আম্মা, আমি এক জোৎস্নারাতে আমাদের মকিমপুরের বাড়ির উঠোনে মাদুর পেতে শুয়েছিলাম। আমারমুখে কয়েকটা পয়সা ছিল। দশ পয়সা দেখতে ছিল আধুলির মত। চাঁদ দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা পয়সা আমার গলায় আটকেগিয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি ওটা না বের করতে পারছিলাম, না পারছিলাম গিলতে। মনে হল মরে যাচ্ছি তবুআব্বা আম্মাকে বুঝতে দেই না কিছু। এক সময় অতি কস্টে পয়সাটা নেমে যায় গলা থেকে। পরের দিন আম্মাকে বলতে ডাক্তার-বদ্যি নিয়ে হুলুস্থূল কান্ড। সবাই বললেন, আর ভয় নেই।
 
সেভেনে উঠতে দেখি এক নতুন বিষয়, অ্যালজেব্রা। যাদবের পাটীগণিত ছিল এতোদিন তার সঙ্গে জুটলো কে.পি. বসুরবীজগণিত। কালিজীবন স্যার পড়াতেন অ্যালজেব্রা। বার্ষিক পরীক্ষার দুয়েক মাস থাকতে কালিজীবন স্যারকে রাখা হলোআমাকে অ্যালজেব্রাতে পাকা করে তোলার জন্য। পেতেন মাসিক দশ টাকা। স্যার আরো তিন, চার বাসায় পড়াতেন। সন্ধ্যার পরবের হতেন একটা হারিকেন হাতে করে। হিন্দু মাস্টাররা একটা আতঙ্কের মধ্যে অনিশ্চিত জীবন নিয়ে চলছিলেন। তাঁরা বুঝতেপারছিলেন তাঁদের এ দেশ ছেড়ে যেতে হবে এক সময়, কিন্ত কারো কাছেই এমন কোনো আর্থিক সঙ্গতি ছিল না যে সম্পূর্ণপরিবারকে এক দেশ থেকে উন্মূল করে আরেক দেশে গিয়ে নতুন করে বসবাস করবেন। সেই কারণে কোনোভাবে একটু উপরিরোজগারের চেষ্টায় এইসব নিরীহ মাস্টারমশাইরা সন্ধ্যা থেকে রাত ন’টা দশটা পর্যন্ত হারিকেন হাতে এদিকে শান্তিনগরচামেলীবাগ থেকে শুরু করে ওদিকে মালীবাগ পর্যন্ত প্রাইভেট টিউশনি করে বেড়াতেন। তাতেও কূল মিলল না। পঞ্চাশের দাঙ্গায়সব তছনছ হয়ে গেল। যে যেভাবে পারলেন প্রান বাঁচাতে নিজের দেশ, পরিচিত আবাস, ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমালেন; অধিকাংশ ক্ষেত্রে উদ্বাস্তু হয়ে।



পর্ব সতেরো


আমাদের চামেলীবাগের বাড়ি কেনা হয় ১৯৪৮ সালের মাঝামাঝি। এই বাড়িটি ছিল শান্তি নগেরের পুরোনো পোস্ট অফিসেরপোস্ট মাস্টার প্রমোদ মুখার্জীর। ভারী সুন্দর ছিলেন এই ভদ্রলোক। উজ্জ্বল গায়ের রং, বড় বড় চোখ, যেন কোনো জমিদার।সামনের বারান্দায় ড্রপওয়ালের মাঝখানটায় একটা সাদা পাথরের ফলকে সুন্দর করে লেখা ছিল ‘মুখুজ্যে বাড়ি’।পঞ্চাশেরদাঙ্গার সময় বড় ভাই ফলকটা নামিয়ে ফেলেন। এক বিঘার জমির উপর সুন্দর দালান। তখনকার দিনে নয় হাজার টাকায় কেনাহয়েছিল।চারটি শোবার কামড়া, সামনে পেছনে প্রশস্ত বারান্দা, সুন্দর রান্না ঘর। পুবপাশে পাকা গোসলখানা সঙ্গেই একটিবাঁধানো ইঁদারা।খানিকটা দূরে দুটো পাকা টয়লেট। তখনকার দিনে হিন্দু বাড়িতে এটাচড বাথরুম কিংবা টয়লেট থাকতোনা।একটা বালতিতে দড়ি লাগিয়ে কুয়া থেকে পানি তুলে ছেলেরা কুয়াতলাতে গোসল সেরে নিত। আর মেয়েদের জন্য গোসলখানারহাউস ভর্তি করা হতো। ভারি পরিচ্ছন্ন ছিল এই গোসলখানাটা। বাড়ি ও গোসলখানার মাঝামাঝি জায়গায় ছিল কিছুজবাফুলের গাছ। বোধ করি দৈনন্দিন পূজার জন্যই জবা গাছের আয়োজন। কাছেই ছিল দুটি করমচা গাছ, একটি সাধারণরঙের অন্যটি সাদা। সাদা করমচা পাকতে আরম্ভ করলে প্রথমে সিদুঁর রং হয় তারপর কেমন জাম রং। করমচা গাছের পাতা এবংঝোপ ভারি সুন্দর। পাতার রঙ খুব গাঢ় । আমার খুব ভালো লাগতো দেখতে। বাড়ির চারপাশে অনেক ফলের গাছ ছিল। আমগাছ, বরই গাছ, আতা গাছ। বাড়ির সামনে একটা বিরাট খোলা মাঠ, চারিদিকে কাঁঠাল গাছ। এই জমিটাও আব্বা কিনে নেনআলাদা করে। এখন আর কিছু নেই। নেই সামনের মাঠটাও। রাজারবাগ পুলিশ লাইন করার জন্য আমাদের সব জায়গাঅ্যাকোয়ার হয়ে গেল। সামনের মাঠ গেল, পুবের বেশ খানিকটা খালি জায়গা গেল। আমাদের প্রিয় গোসলখানাও যাবার পথে।আব্বা অনেক তদ্বির করে গোসলখানাটা বাঁচাতে পারলেন। কিন্তু বাড়িটার আর কোনো শ্রী বলতে থাকল না। একসময়ের এইবাড়ির সামনের মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলতাম একাধিক কোর্ট কেটে। তার পরের কাবুলদের মাঠে খেলা হতো ফুটবল। খোকা ভাই, মোরশেদ ভাই, হীরা ভাইরা সব বুট পরে খেলতেন। হোসেন, ওয়াজেদুল ওরাও খবু ভালো ফুটবল খেলতো। আমি ভয় পেতামশরীর দিয়ে খেলতে হতো বলে।খেলাটাই তখনকার দিনে বড় বিনোদন। বিকেলের আগেই সবাই হাজির হতেন মাঠে। বড়রাছোটদের তাগিদ দিতেন। মাঠে নেমে নিজেরা খেলতেন ছোটদের দলে নিয়ে তাদের তালিম দিতেন। খোকাভাই, মোর্শেদ ভাইপড়তেন মেডিকেলে। ফুটবলে দারুণ নেশা। রীতিমত জার্সি পরে সবাই মাঠে নামতেন। রোজ খেলা হত। খোকা ভাই, মোরশেদভাই ফরোয়ার্ডে খেলতেন। হীরা ভাই ছিলেন ব্যাকে। খসরু খুব ভালো গোলরক্ষক ছিল। হোসেন ওয়াজেদুল উইং এ অর্থাৎলেফট ও রাইট আউটে খেলত। আমাদের ফুটবল টিমের ম্যাচ খেলাতে প্রায়ই খেলতে আসতেন তখনকার অনেক নামীখেলোয়ার যেমন, নুরুদ্দিন ভাই, মাহূতটুলীর বাহরাম ভাই, দুজনেই খেলতেন সেন্টার ফরোয়ার্ডে। ওয়াজেদুলের মেজভাইআজিজুল ইসলাম আজুভাই খেলতেন লেফটআউটে। তখন ফুটবলই ছিল সবচেয়ে প্রিয় খেলা। নুরুদ্দিন ভাই ছিলেনসেজভাইর বন্ধু। অনুজ হিসাবে আমার সঙ্গে তাঁর এখনও একটা স্নেহের সম্পর্ক আছে। কাপ্তান নুর নামে তিনি একজন জনপ্রিয়গল্পলেখক।
 
এখন যেখানটা পুলিশ লাইনের পুকুর তার পুব দিকে একটা উঁচু মাঠের মতো ছিল। অনেক জলপাই গাছ ছিল ওখানটায়।একপাশে একটা ভাঙ্গা কুয়া। কয়েক ঘর পরিত্যক্ত বসত বাড়ির শূন্যভিটা। হয়ত বিক্রি করা সম্ভব হয়নি । আরো এগিয়ে গেলে, প্রখ্যাত সাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের বাসা। এই পরিত্যক্ত এলাকায় আমাদের ড্রিল স্যারের আগ্রহে এক শীতের মওশুমে ক্রিকেট খেলার আয়োজন হলো। আমাকে স্লিপে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হলো ওদিক দিয়ে বল যেতেই যেন ধরে ফেলি।ক্রিকেট খেলার আমি কিছুই জানতাম না। কে জানি ব্যাট করছিল। একটা বল আমার একেবারে মুখের কাছ দিয়ে উড়ে যাচিছল।অজান্তে— আত্মরক্ষার তাগিদেই বোধ করি, আমার দু’হাত উঠে এলো। খপ্ করে বলটা ধরে ফেললাম। চারিদিকে হাততালি।এমন একটি দর্শনীয় ক্যাচের জন্য আমাকে একজন প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটার হিসাবে গন্য করা হল। কিন্তু হায় এর পর আরকোনো দিন কোনো সহজ ক্যাচও ধরতে পারিনি। এবং স্বাভাবিক কারণই আমার আর টিমে স্থান হলো না।

হেমন্তের আগমনে এইসব নিচু জমির উপর দিয়ে ঘুড়ি ওড়াবার ধুম লেগে যেত। তখনও রাজারবাগ পুলিশ লাইন হয়নি।ওয়াজেদুল পুরানো ঢাকার আরমানীটোলার ছেলে। ঘুড়িতে মাঞ্জা দেওয়ার অনেক কৌশল ওর জানা। কদিনেই ও সবার গুরু হয়েউঠলো। একবার ওর মাঞ্জা দেওয়া সুতায় একটা চিল ডানা জড়িয়ে পড়লে ও দক্ষতার সঙ্গে দ্রুত সুতা ছাড়তে লাগলো। চিলটামাটিতে এসে পড়লো। একটা ডানার অর্ধেকটা কেটে গেছে মাঞ্জা সুতার ঘষায়। চিলটাকে সেই পরিত্যক্ত কুযায় ফেলে দেয়া হল।আমি রোজই দেখতে যেতাম। না খেতে পেয়ে কদিন পর মারা যায় চিলটা। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল । ওদিকে ওয়াজেদুলকিংবদন্তীর নায়ক হয়ে গেল। ওর ছিল বহু প্রতিভা। ভালো গান করত, মাউথ অর্গান বাজাত, রণপা’ দিয়ে অনেকদুর হাঁটা, স্কেটিং করা ওর কাছে ছিল অতি সহজ। সবচেয়ে বড় কথা, বিড়ি টেনে ভোঁস ভোঁস করে ধোঁয়া ছেড়ে রাত করে ইন্দ্রপুরীর নির্জনপথ দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারত।একটি সাক্ষাত ইন্দ্রনাথ।ওর বড় ভাই শিল্পী আমিনুল ইসলাম, আরেক ভাই আজিজুল ইসলাম(আজু ভাই) নামকরা ফটোগ্রাফার, কৃষি বিভাগে চীফ ফটোগ্রাফার ছিলেন। ওয়াজেদুলদের পাশের বাড়িটা ছিল ওর বড় বোনের।

১৯৫১ এর দিকে ওদের বাড়িতে একটা বিরাট ডাকাতি হয়। আমরা ক'ভাই, বড়ভাই মেজভাই সেজভাই গরমের কারণে সামনেরবারান্দায় ঘুমাতাম। একরাতে এলোমেলো বন্দুকের গুলির আওয়াজে ঘুম ভাঙতে দেখি সামনে দিয়ে কারা যেন গুলি ছুড়তেছুড়তে ছুটে যাচেছ। ভোরে শুনলাম গতরাতে ওয়াজেদুলদের বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল। আগে থেকেই ইনফরমারের মাধ্যমে খবরপেয়ে একদল পুলিশ ওঁৎ পেতে থাকে পাশে ওর বোনের বাড়ীর রান্না ঘরে। গভীর রাতে ডাকাতদল এসে পড়লে পুলিশের দল গুলিছুড়লে ডাকাত দল পাল্টা গুলি চালায়। এতে একজন দারোগাসহ দুজন কনেস্টবল আহত হয়। পুলিশের প্রচন্ড গুলির মুখেডাকাতদল পিছু হটতে থাকে। কিন্তু ডাকাতদলের মধ্যে যে পুলিশের ইনফরমার সে ছিল খোঁড়া। ডাকাতদলের পিছু হাঁটার সময়পা চালিয়ে যেতে পারেনি। ডাকাতের গুলি খেয়ে পুলিশ বেপরোয়া হয়ে ভোর রাতে তাদের এই ইনফরমারটিকেই অতি কাছ থেকেরিভলবারের গুলিতে হত্যা করে। তখনকার পুলিশ আইজি ছিলেন দোহা সাহেব। আমাদের শান্তিনগরের দিকেই বাড়ি বানান।পরে চলে আসেন ইন্দিরা রোডে। তিনি পুলিশদের খুব ভর্ৎসনা করলেন।

আমাদের বাড়ি কেনার সময় পাশাপাশি বাড়ি কিনেছিলেন ডা. শামসুল হুদা, আমাদের একদম পাশের পশ্চিমের বাড়ি কেনেনপাবলিক হেলথের ক্যাশিয়ার রাজ্জাক খান সাহেব, ডা. লুৎফর ও গুনুর বাবা। আমাদের উত্তরের বাড়ি কেনেন দৌলত আহম্মেদখান খাদিম। তিনি ছিলেন ঢাকা হাইকোর্টের সহকারি রেজিস্টার। মাসদু হোসেনের বাবা। এদের বড়ভাই আতাউর রহমান খানখাদিম সেবার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করেন। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্র ও শিক্ষক। তিনিঅকৃতদার ছিলেন। থাকতেন ঢাকা হলে। ২৫ শে মার্চের কালরাত্রিতে ঢাকা হলে অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে পাকিস্তানি সৈন্যদেরগুলিতে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন।
 
এই এলাকায় ইলেকট্রিসিটি ছিল না।বিকেল পড়তেই হারিকেন ও টেবিল ল্যাম্পের সব চিমনি পরিস্কার করে কেরোসিন ভরেসাজিয়ে রাখতো বাড়ির মেয়েরা। সন্ধ্যায় প্রতি ঘরে আলোর ব্যবস্থা এই হারিকেনই। কোন পানির কলও ছিল না। ইঁদারার পানিইভরসা। বায়ান্নোর দিকে পাশের বাড়ির ক্যাশিয়ার সাহেব তাঁর অফিস থেকে একটা টিউবওয়েল বসালে সবাই টিউবওয়েলেরপানি খেত পেল। কলতলাটা সুন্দর করে বাঁধানো ছিল। ১৯৫৮ সালে আমি করাচি থেকে ফিরে এই এলাকায় বিরাট পরিবর্তন দেখতে পাই, বাড়ি বাড়ি বিজলি বাতি আর পানির কল।
 
মালিবাগের মোড়ে ইন্দ্রপুরী যাবার মুখে ছিল খগেনদের বাড়ি, বিরাট দালান।ছাদের চারদিকে সুন্দর রেলিং ঘেরা। খগেন ছিলআমার সহপাঠি। ও আর আমি অনেক দুপুর-বিকেল কাটিয়েছি এই ছাদে দাঁড়িয়ে। ওদের একটা টিয়া পাখি ছিল, কথা বলত।পাশেই ছিল অনুকুলদের বাড়ি। অনুকুল-অজিত দুই ভাই। ওদের বিধবা মা স্বামীর ভিটে আঁকড়ে পড়ে ছিলেন পঞ্চাশের ভয়ঙ্করদাঙ্গার পরেও। ওদের ছিল কষ্টের সংসার। অনুকুল শেষ পর্য ̈ন্ত মানসিক ভাবে অপ্রকৃতস্থ হয়ে পড়ে। ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বযখন আমি ১৯৪৮ সালের মার্চে এসে ভর্তি হই সিদ্ধেশ্বরী ̄স্কুলে ক্লাস সিক্সে তখন থেকে। অনুকুল, দীপক, বাবুল, শংকর, জ্ঞানগাঙ্গুলী এবং খগেন ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু ছিল না তখন।
 
সেই সময় ঢাকার প্রধান বিনোদন ছিল ঘোড়ার রেস। রবিবার সকাল থেকে রেসকোর্স ভরে উঠত দর্শকে, কেউ রেস খেলতে, বাকিরা দেখতে। রেসের পরিচালনায় ছিল ঢাকা ক্লাব। এখন যেখানটায় পুলিশ কন্ট্রোল রুম ওখানটায় ছিল দর্শক গ্যালারি।সঙ্গেই ছিল স্কোর বোর্ড। এই রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় জিন্নাহ সাহেব ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।সময়টা ছিল ১৯৪৮ এর মাঝামাঝি, আমাদের ঢাকা আসার পর পরই। আমি গিয়েছিলাম মেজভাইয়ের সঙ্গে। মনে পড়েমেজভাই আমাকে কাঁধে চড়িয়ে জিন্নাহ সাহেবকে দেখিয়েছিলেন।এই রেসকোর্স মাঠে সেবার বিরাট এক এগজিবিশান হয়।বিশেষ আকর্ষন ছিল পি.সি. সরকারের ম্যাজিক। প্রচন্ড ভিড় হত। মেজভাইয়ের হাত ধরে কদিন পর পরই যেতাম। ম্যাজিকদেখার পাগল আমি। তা গ্রামে বেদে মেয়েদের হোক কিংবা শহরে পথের পাশের ক্যানভাসারদের হোক। সেবার স্কুলে সেজভাইয়েরবন্ধু হারুনভাই এক চমৎকার ম্যাজিক শো করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।সেজভাই ছিলেন সহকারী। আমি বাড়ি বাড়িটিকেট বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা তুলে দিয়েছিলাম। টিকেটের বিশেষ আকর্ষন ছিল এর সুন্দর ডিজাইন। কাইয়ূম ভাইয়ের আঁকামাছের আশায় এক পায়ে দাঁড়ানো একটি বকের ছবি।
 
এই রেসকোর্সের মাঠেই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের অবিস্মরণীয় ভাষণ শুনতে যাই সেজভাই আর আমি একসঙ্গে। কী বিশালজনসমুদ্র! একটি মিছিলে দেখার মত ছিল তীরধনুকে সজ্জিত একদল সাঁওতাল তরুণ।




  পর্ব আঠারো

ঢাকায় আসার কিছুদিন পর থেকেই আমাদের সংসারে বেশ অনটন দেখা দিল। শহরে জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল। তার উপরে দেশবিভাগের কারণে ঢাকার লোকসংখ্যা বাড়তে থাকল হু হু করে। পাল্লা দিয়ে চালডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামওবাড়তে থাকল। নিবিড় রেশনব্যবস্থা চালু হলো। পরিবারের প্রত্যেকের নামে রেশনকার্ড। তাই দিয়ে শান্তিনগর মোড়ের রেশনদোকান থেকে সাপ্তাহিক রেশন তুলতে কখনো সেজভাই কখনো আমি যেতাম। গ্রামে যখন ছিলাম কোন কিছুই কিনতে হতো নানুন ছাড়া।নিজেদের ক্ষেতের ফসল এবং তার আয় দিয়ে সারা বছর সচ্ছলভাবে চলে যেত। গ্রামে জীবনযাত্রার ব্যয় ছিল নগন্য।সেইসব সুফলা অনেক জমি বিক্রি করে দিয়ে ঢাকায় আসা হয়েছে । বাড়িও কেনা হয়েছে মোটামুটি ভালো দামে। গ্রামের বাকি সবজমিজমা থেকে আর তেমন আয় পাওয়া যাচ্ছিল না। অনুপস্থিত ভূস্বামীর বেলায় এমনটিই হয়। পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউনেই। বড় ভাই ষাট টাকা বেতনে দৈনিক ইত্তেহাদে রিপোর্টারের চাকুরি করেন। অভাব সব দিক থেকে চেপে ধরল। আম্মা কীভাবেসংসার তরীকে ভাসিয়ে রাখলেন এই দুঃসময়ে তিনিই জানেন। বিক্রি হয়ে যেতে থাকল একটার পর একটা শখের জিনিস।সেলাইর কল গেল, কদিন পরই গেল আমার শখের গ্রামোফোন। এই দুঃসময় পরিবারের ছোট বড় সবাই খুব ধৈর্য্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে। ফলে তখনকার কঠিন জীবনযাত্রা একবারের মতোও অসহনীয় মনে হয়নি আমাদের। আব্বার পরম ধৈর্য, আম্মার শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরা, ভাই-বোনদের পরস্পরের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ সংসারটাকে সেদিন বাঁচিয়ে রেখেছিল সববিপর্যয় থেকে।

১৯৫০ এর দাঙ্গার পর নতুন নতুন রিফিইজির আগমনে খাদ্যাভাব তীব্র হল।রেশনে মাথাপিছু চালের পরিমান কমিয়ে পাঁউরুটিদেয়া শুরু হল পরিবারের সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে কুপনের মাধ্যমে। আমি রেশন দোকান থেকে প্রতি বিকালে ষোলটা পাঁউরুটিআনতাম। কিছুদিন পর পাউরুটির পরিবর্তে দেওয়া হলো টিন ভর্তি হল্যান্ডের আলু, ছোট ছোট টুকরো করা। এগুলো গরমপানিতে দিলে ফুলে উঠত। তাই দিয়ে চলতো রাতের খাবার। সব কিছুর অভাব সব দিকে। জ্বালানীর অভাব তীব্র। জনসন রোডে জজ কোর্টের বিপরীতে তিন তলায় সিভিল সাপ্লাইর অফিস থেকে কয়লার পারমিট আনতে হত। মেজভাই ইংরেজীতে দরখাস্তলেখা শিখিয়ে দিলেন। আমি দরখাস্ত লিখে লাইনে দাঁড়িয়ে কয়লার পারমিট নিতাম। জানলাম জ্বালানী কয়লাকে ‘কোক’ বলে। এই পারমিট নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ির পথের শেষ প্রান্তে কয়লার দোকান থেকে কয়লা কিনে বাড়ি আনাটা ছিল আরেককষ্টের ব্যাপার।

ঠিক করা হলো, আমাদের ক’জন শিরীবুবু, জেবনবুবু, বুলু আর আমাকে নিয়ে আব্বা-আম্মা কুমিল্লায় থাকবেন কিছুদিন। তাতেঢাকা থাকার অত্যধিক খরচের কিছুটা লাঘব হবে, অন্যদিকে গ্রামের জায়গা-জমির তদারকী সহজতর হবে। আমি ক্লাস এইটেউঠতেই ১৯৫০ এর জানুয়ারির প্রথম দিকে আবার যাত্রা কুমিল্লা অভিমুখে।

বাসা নেওয়া হয় মোগলটুলির উল্টোদিকে বঙ্গ বিদ্যালয়ের পেছনে মোহর আলী মোক্তারের বাড়ি। টিনের ঘর, সামনে ছোট একটাবারান্দা। এ বাড়িটা খুব ছোট, আমার একদম পছন্দ ছিলনা। কিন্তু ইলেক্ট্রিকের উজ্জ্বল আলো এবং ফ্যানের ঠান্ডা বাতাসেরকারণে আমার বিরূপ মনোভাব কেটে যেতে বেশিদিন লাগল না।

শিরীবু, জেবনবুকে ভর্তি করা হলো ফয়জুন্নেছা স্কুলে। এবং থাকার ব্যবস্থা করা হল

হোষ্টেলে। মাঝে মাঝে শিরীবুদের হোস্টেলে যেতাম। শিরীবুর হোস্টেলে বান্ধবীরা ভীষণ আদর করতো আমাকে । শিরীবুরবান্ধবীদের মধ্যে ছিলেন গাইনোকোলজিস্ট, ডা. ফরিদা- ডা. ওয়াদুদের স্ত্রী, এবং সম্ভবত ডা. টি, এইচ খানের স্ত্রী ডা. ফরিদাও।

বঙ্গ বিদ্যালয়ে দু’এক সপ্তাহ ক্লাস করার পর আমাকে ভর্তি করা হলো জিলা স্কুলে ক্লাস এইটে। মোহর আলী মোক্তারের ছেলেবেনু আমার সহপাঠী। ওর সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হলো। আর বন্ধুত্ব হলো ওর চাচাতো ভাই খোরশেদ আলমের সঙ্গে, আমাদের একক্লাস উপরে পড়তো। তুখোড় ক্যারম খেলত। সেই সুবাদে মেজভাইয়ের সঙ্গে খুব ভাব। মোহর আলী মোক্তারের বড় ছেলে ফজলুল করিম সাহেব ভিক্টোরিয়া কলেজের পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক ছিলেন, পড়াতেন সিভিক্স-ইকোনমিক্স । তিনিফুলার হোষ্টেলের সুপারিনটেনডেন্টও ছিলেন। সপরিবারে ফুলার হোষ্টেলেই থাকতেন ।
 
এই বাসার পাশেই উত্তর দিকে এক বিরাট বাঁধানো পুকুর ছিল - লালার দিঘী। ব্যাস্ আমাকে আর পায় কে। রোজই এই পুকুরেসাঁতার কেটে গোসল করি। এই সময় মেজভাইও ছিলেন আমাদের সঙ্গে, আই,এস,সি পরীক্ষা দেবার জন্য। দিঘীটি এখন আরনেই । ভরাট করে বাাড়িঘরে ভরে গেছে সবটা। কুমিল্লায় রিকসার খুব চল ছিল, যেমন ঢাকায় ছিল ঘোড়ার গাড়ীর। কুমিল্লাতেও প্রথম দিকে কিছু কিছু ঘোড়ার গাড়ী ছিল। কিন্তু খুব কম। এই সময়ে মেয়েরা রিক্সায় পর্দা ছাড়া চলতোনা। রিকসার চারদিকেএকটা আস্ত শাড়ি পেঁচিয়ে ঘেরাটোপের ব্যবস্থা করা হতো। ভেতরে মেয়েরা বসতো। পায়ের নীচে বসতো ছোট কাজের ছেলে কিংবামেয়ে। এই ভাবেই মেয়েরা তাদের পরিবারের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করত।
 
এই বাসায় বিশেষ সুবিধা লাগছিলনা বলে ক’দিন পরই বাসা বদলান হলো। এবার গেলাম চরতায়, আব্বার বাল্যবন্ধু মন্ত্রীমফিজুদ্দিন সাহেবের বাড়ীতে। সুন্দর দালান, অনেকগুলো কামড়া। লম্বা বারান্দা, সামনে বিরাট উঠোন। ইলেকট্রিক বাতি আরপাখা আমার জন্য খুব আকর্ষণের ব্যাপার হলো। এখান থেকে হেঁটে হেঁটে জিলা স্কুলে যাই ফুলার হোষ্টেলের পাশ দিয়ে। ফিরতামচরতার ভিতর দিয়ে। অনেক পথ। আমি ক্লান্ত হয়ে যেতাম। কিন্তু এই ক্লান্তি সত্বেও একটা আনন্দের বিষয় ছিল। পথের পাশেছিল একটা টিন ঝালাইয়ের দোকান। টিন কেটে কেটে শিশার ঝালাই দিয়ে বিভিন্ন ধরনের জিনিষ তৈরী করতেন একমনে বসেএক বৃদ্ধ ঝালাইকার, যাদের ইংরেজীতে Tinsmith বলা হয়। শত ক্লান্তিতেও আমি এখানে কিছুক্ষণ না কাটিয়ে যেতে পারতামনা। বৃদ্ধের চোখে একটা চশমা, কাঁচগুলোর একটা ঘোলা অন্যটা ফাঁটা। ডাটের বদলে কানে সূতা পেঁচিয়ে চশমাটা বেশ আটকেরাখা হত। এটি দিয়ে কী করে ও সঠিক মাপে টিন কাটতো এবং সূক্ষ্ম ভাবে সেসব ঝালাই করতো সে এক আশ্চর্য ব্যাপার।নিখুঁত করে বানাতো মুড়ি রাখার টিন, কোনটিতে সামনে কাঁচ লাগানো। মেরামতের জন্য আসতো হ্যারিকেন। পুরনো তলা ফেলেদিয়ে নতুন তলা ঝালাই করে লাগিয়ে দেয়া হত। টিন রিভেট করে জুড়ে অনেক কিছু করা হত। আমি আশ্চর্য হয়ে দেখতাম।
 
এই বাড়ীর পাশেরটাই ছিল মোরশেদের মামার বাড়ি।মোরশেদের ছোট মামার নাম আমার নামে ছিল। শীতের সকালেমোরশেদের নানা বাড়ী গিয়ে ওর ছোট মামা আলীনুরের সঙ্গে গল্প করতাম। এই এলাকাটা খুব নিরিবিলি আর বাসাটাও ছিল খবুসুন্দর। আমি সাদা হাফ প্যান্টের ভিতর সাদা সার্ট গুঁজে, সাদা ফুল মোজা আর বাটার কালো নটিবয় সু পরে বেশ পরিপাটি হয়েস্কুলে যেতাম। ছেলেরা আমার এত বাবুয়ানা ভালো চোখে দেখত না।

কী কারণে জানিনা কিছুদিন পর এ বাসাও ছাড়তে হলো। এবার উঠলাম রানীর বাজারের সংলগ্ন এখন যেটা কুমিল্লা চেম্বার অবকমার্স ঐ বাড়ীটাতে। বেশ বড়ো সড়ো বাড়ী। অনেক গুলো কামড়া। সামনে পেছনে বারান্দা। ঐ বাড়ীতে আরেকটি পরিবারথাকত। একই রান্নাঘর ব্যবহার হত। ওদের একটি মেয়ে নাম রুবী- আমার খেলার সাথী হল।পাশের একটি দোতালা বাসায়থাকতেন এক সার্কেল অফিসার।তাঁর দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রী তখনকার দিনে সালোয়ার কামিজ পড়তেন। ভারি র্স্মার্ট মহিলা।একহাতে বন্দুক দিয়ে গুলি করতে পারতেন। আমি বুলু তার ভীষণ ভক্ত হয়ে পড়লাম। এখানেও একফালি ডোবার মত পাওয়াগেল। মোহাজের কারখানার ঠিক পেছনটাতে।
 
পুকুর ডোবা যেমন হাঁসের তেমন আমারও প্রাণ। রোজ নেমে পড়ি এই ডোবায়। তলাটা কাঁদায় ভরা আর ভারী অপরিষ্কার।পুরানো টিন ভাংগা আর কাঁচ ভাংগায় ভরা। একদিন দুপুরে গোসল করতে নেমে পায়ে কীরকম একটা লাগতে পা তুলে দেখি বাঁপায়ের উপরের পাতাটা কনে আঙুলের কাছ থেকে প্রায় গোড়ালী পর্যন্ত চিরে গেছে হা করে। কোন ধারালো কাঁচের টুকরোই হবে।ভয়ে বাসায় কাউকে বললাম না। নিজেই কাপড় ছিড়ে ব্যান্ডেজ বাঁধলাম। কিন্তু বিকেল পর্য ̈ন্ত পায়ের ব্যাথায় মুখ বিকৃত হয়েআসছিল। আম্মা ধরে ফেললেন। তৎক্ষনাৎ আব্বা নিয়ে গেলেন মোগলটুলীতে ডাঃ তৈয়ব আলীর চেম্বারে। তিনি ক্ষতের আকারদেখে ভারী চিন্তিত হলেন। কোন রকম ব্যাথানাশক ইনজেকশন কিংবা ওষুধ ছাড়াই এই লম্বা চিরে যাওয়া হাঁ করা ক্ষতটাকেজুতোর ফিতে বাঁধার মতো করে সেলাই করে দিলেন। একদিন পর পর ড্রেসিং করতে যেতে হত তাঁর চেম্বারে। অনেকদিনভুগেছিলাম।
 
এই সময় ঢাকায় প্রচন্ড হিন্দু- মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়। শুনতাম শাঁখারীবাজার, কাঁসারীপট্টি, লক্ষ্মীবাজার এলাকায় অনেককেহত্যা করা হয়েছে। ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, সুত্রাপুর , নওয়াবপুর এলাকায় তখন অনেক হিন্দুরা ছিলেন। এই সব দাঙ্গা ভারত থেকেআগত বিহারী রিফিউজিদের দ্বারা কিংবা প্ররোচনায় ঘটত। তারা বিহারের দাঙ্গার প্রতিশোধের লক্ষ্যে এক দারুন প্রতিহিংসানিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শুনতাম ভৈরব-আশুগঞ্জের কাছে চেন টেনে ট্রেন থামিয়ে কামড়ায় কামড়ায় গিয়ে হিন্দু যাত্রীদের মেরেসব লাশ নীচের মেঘনা নদীতে ফেলে দিত। আমি ভীষণ কাতর হয়ে পড়তাম। আমি শৈশবকাল থেকেই হিন্দুদের সঙ্গেঅন্তরঙ্গভাবে মিশে এসেছি। আমার ঢাকার বন্ধুদের কথা মনে হতো। দীপকের কথা বাবুল শংকরদের কথা।
 
দাঙ্গা শেষ হতে আমরা ফিরে এলাম ঢাকায়। আমার পা নিয়ে তখনও খুঁড়িয়ে চলি। রাত নটার দিকে পৌছলাম ফুলবাড়ীয়া স্টেশনে একটা ঘোড়াগাড়ি করে বেশ অনেক রাতে পৌঁছানো গেল বাসায়। অনেক রাত অবধি সেজ ভাই বড় ভাই এর মুখে শুনলাম দাঙ্গার বিভীষিকা আর নিষ্ঠুরতার কথা। শুনলাম আমাদের স্কুলের দপ্তরী সনাতনকে কেমন নিষ্ঠুরভাবে ছুরি দিয়ে হত্যা করে একটা বস্তায় মুখ বেঁধে লাশটা পাশের মুদি দোকানের চৌকির নিচে ফেলে রেখেছিল। প্রভাত ময়রা মরণচাঁদের দৈ ফেরি করতে আসত আমাদের এদিকে। আব্বা ওর একজন নিয়মিত গ্রাহক। সেকালে এক পাতিল দৈ এর দাম ছিল এক টাকা।শুনলাম ওকেও মেরে ফেলা হয়েছে। গরুগাড়ি করে গরুর ভুষি বেচতে আসতো এক নিরীহ অবাঙালি বুড়ো গাড়িচালক। পাটিতে একটি দাঁতও নেই। আম্মা ও এলে চিড়া-মুড়ি আর এক গ্লাস দুধ দিত। ওর মত লোককে মারা যায় একথা ভাবা যায় না।শুনলাম দল বেঁধে বিহারী গুন্ডারা এসে বাড়ি বাড়ি খোঁজ করত হিন্দুদের। বড়ভাই ভীষণ সাহসী ছিলেন। রনজিৎদের পরিবারকে এনে আমাদের বাসায় রেখেছিলেন। বিহারীদের শত অনুরোধ ভয়ভীতিতে ওদের হাতে তুলে দেননি।
 
এই জঘন্যতম দাঙ্গা শুধু প্রতিহিংসার হত্যাকাণ্ড নয়, হিন্দুদের দোকানপাট লুটতরাজ এবং বাড়িঘর থেকে উৎখাত করে সেসবদখল করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। পটুয়াটুলি, ইসলামপুরের সব বড় বড় কাপড়ের দোকান, ঘড়ির দোকান এবং সোনার দোকান লুট হয়। লুট হয় ইসলামপুরের প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান কালাচাঁদ গন্ধবণিক ও সীতারাম ভাণ্ডার। পল্টনে সেলিমাবাদ রেস্টুরেন্টের সঙ্গেছিল একটি মিষ্টির দোকান, সেটিও লুট হয়। অনেক তথাকথিতে ভদ্রলোকদের দেখা গেছে একটি ডিনার সেট কিংবা একটারেডিওসেট নিয়ে সগর্বে এবং সানন্দে বাসায় ফিরতে।

আমি ফিরে এসে দেখি হিন্দু পরিবার গুলো কেউ নেই। রণজিৎরা চলে গেছে। যামিনী ডাক্তারের পরিবার চলে গেছেন। সুবোধবাবু ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার। এখন যেটা সামাদ সাহেবের বাসা ওটা ছিল সুবোধ বাবুদের। চলে গেছে নবীনকুটিরের গাঙ্গুলিরা, আমার সহপাঠি বন্ধু জ্ঞান গাঙ্গুলির পরিবার। চলে গেছেন সাগর বাবু তাঁর শখের বাগান ফেলে। হেডস্যারতারাশংকর বাবু, এ্যালজেব্রা স্যার কালীজীবন বাবু, পন্ডিত স্যার সন্তোষ বাবু কেউ নেই। আমি ভাবতাম, না থাকুক, বেঁচে যেনথাকেন । সামনের এক মাড়োয়ারী ব্যাবসায়ী মুদির দোকান চালাত। বাড়ীটা পরে কাবুলরা কিনে নেয়। ওই মাড়োয়ারী দোকানদারচলে গেছে। ওদিকে গোঁসাইবাড়ীর অনেক পরিবার নেই। সিদ্ধেশ্বরীর ‘কুঞ্জনিবাস’ খালি । পোষ্ট অফিসের এক দিকে ‘শচীবাস’।ওখানেও কেউ নেই। রামচন্দ্রপুর যেটি এখন নয়া পল্টন ওখানে থাকত আমার সহপাঠি বন্ধু বাবুল শংকরেরা, ওরা নেই।শান্তিনগরে দীপকরা নেই। এক নিষ্ঠুর তান্ডবে সব কিছু তছনছ হয়ে গেল।রেখে গেল আমার বালক মনে এক নিষ্ঠুর ক্ষতচিহ্ন যা আমাকে আজও কস্ট দেয়।

  চলবে.....
 
 
লেখক পরিচিতি:
আলী নূর
পেশায় আইনজীবী।

বই পড়া, গানশোনা, ফুল ফোটানো, নাটক কিংবা ওড়িশি নৃত্য অথবা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত এইসব নিয়েই তাঁর আনন্দযাপন। তাঁর নানা শখের মধ্যে দেশভ্রমণ, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি এবং সিনেমাটোগ্রাফি অন্যতম। তিনি জীবনযাপন নয় জীবন উদযাপনে বিশ্বাসী।

বৃটিশ-ভারত, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ এই তিন কাল তিনি দেখেছেন, দেখছেন। তুচ্ছদিনের গান কেবল তাঁর জীবনের গল্প নয় বরং গল্পচ্ছলে ইতিহাসের পরিভ্রমণ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন